বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
গল্পের নাম- অশীতিপর শিক্ষাগুরু
লেখকের নাম- মাজহারুল মোর্শেদ
পৃথিবীতে মানুষ-কে কোথায়, কবে, কার ঘরে, কোন মায়ের গর্ভে জন্ম নেবে সেটা যেমন আগে থেকেই সব ঠিক-ঠাক করে রাখেন সৃষ্টিকর্তা, তেমনি জন্মের পরও কে কোথায় কিভাবে বড় হয়ে উঠবেন সেটিও নির্ধারণ করে রাখেন তিনি। কেউ হয়তো অভিমান করে বলতে পারে আমার জন্মটা যদি রাজার ঘরে হতো! তাহলে আমি রাজার সন্তান হতে পারতাম। এতো কষ্ট করে আমার রোজগার করার কোন মানে হয়? আসলে সেটা সৃষ্টিকর্তাই ভালো বোঝেন।
আমার জন্ম যে গ্রামে সে হিসেবে গোটা গ্রামবাসী সৃষ্টিকর্তার উপর অভিমান করতেই পারে। কারণ গ্রামের নিরানব্বই ভাগ মানুষই গরিব, ভুমিহীন, দিন এনে দিন খায়, ঘর আছে তার দুয়ার নাই, পান্তা আছে তো নুন নাই এমন অবস্থা। ঝড়-বৃষ্টি আর মহাকালের সাথে যুদ্ধ করে তারা টিকে আছে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। একটু বৃষ্টি হলেই ঘরের চাল দিয়ে দরদর করে পানি পড়ে। তখন ঘর আর বাহিরের মধ্যে কিঞ্চিত তফাত দেখা যায়।
আমাদের বসবাসের ঘরটার এতটাই ভগ্নদশা ছিলো যে, একটু ভাড়ি বৃষ্টি হলেই ঘরের ভেতর মাথা লুকানোর জায়গা থাকে না। ঘরের চালে যে সব ফুটো দিয়ে রাতে তারা দেখা যায়, পুরোনো ছেঁড়া কাথা বিছিয়ে দিয়ে সে সব ফুটো বন্ধ করে দেন বাবা। কখন অবশ্য বৃষ্টির পানি একটু কম পড়ে।
প্রত্যেক দিন সকালে নগ্ন পায়ে হেঁটে আমরা মক্তবে যেতাম। কারণ সেÐেলের অনেক দাম ছিলো তখন, আমাদের অনেকেরই নিজের কোন সেÐেল ছিলোনা।
দাদুর বয়সের অনেক বৃদ্ধ মানুষকে পায়ের সেণ্ডেল হাতে নিয়ে রাস্তায় হেঁটে যেতে দেখেছি।
যাহোক, পাড়ার মক্তবই ছিলো আমাদের একমাত্র শিক্ষালয়। যেখানে ধমীয় শিক্ষার পাশাপাশি বাংলা শিশুশিক্ষা বইও পড়ানো হতো। শিষ্টাচারের চেয়ে শাসন বেশি, পড়ার চেয়ে মার বেশি। কথা-বার্তা, চাল-চলনে একটু উনিশ-বিশ হলে তোর কোন কথাই নেই-গুনে গুনে পঞ্চাশবার কান ধরে উঠ-বোস আর মাথা নিচু করে পাছায় অগণিত মার। অগণিত বললাম এ কারণে যে, পাছায় মারের হিসেবটা লজ্জায় কেউ কোন দিন গুণতো না বা লজ্জায় কাউকে বলতেও পারতো না। পাড়ার অশীতিপর বৃদ্ধ যারা কাজ করার শক্তি নেই, কোমড় বেঁকে গেছে কেবল তারাই সেই মক্তব পড়ানোর সুযোগ পেতো। এখানে একটু বলে রাখি, অশীতিপর বৃদ্ধ শিক্ষাগুরুর কোমড়ে শক্তি নেইতো কি হয়েছে? হাত দিয়ে বেত চালানোর শক্তি ছিলো খোদা প্রাপ্ত। খুব কম দিনই গেছে যে, হাত পা লাল না করে, চোখের পানি না মুছে বাড়ি ফিরতে পেরেছি।
যাহোক, পঞ্চাশবার কান ধরে উঠ-বোস আর পাছা লাল করা মার খেয়েও
সেই অশীতিপর বৃদ্ধের কাছ থেকে আমি শিখেছিলাম কিভাবে লিখতে হয়, কিভাবে পড়তে হয়, কিভাবে বড়দের দেখলে সালাম দিতে হয়, তাঁদের মান্য করতে হয়। আমার অশীতিপর শিক্ষাগুরু আমাকে নিত্যদিন তাঁর পাশে বসাতো আমাকে আটকে রাখার জন্যে লম্বা বেতের চোখা মাথা আমার দু’পায়ের বুড়ো আঙ্গুলের মাঝখানে গেঁথে রাখতো। কারণ সুযোগ পেলেই আমি ভোঁ-দৌড় দিয়ে ছুটে পালাতাম। আমাকে শাস্তির ভয় দেখিয়ে কিংবা শাস্তি দিয়ে তিনি যে কোন সুবিধা করতে পারেননি, এটা তিনি নিশ্চিত করে বলতে পারেন।
একটা দিনের কথা আমার বেশ মনে পড়ে, স্মৃতির দেয়ালে এক রকম পেরেকের মতো আটকে আছে। সে দিনটি ছিলো জম্মাবার। আমার সকালবেলা একটু দেরিতে ঘুম ভাঙে। তাই তাড়াহুড়া করে বই খাতা বুকে নিয়ে সোজা দৌড় মক্তবের দিকে। দৌড়ে যেতে কিভাবে যেন রাস্তায় একটা বই পড়ে যায়। প্রবাদ আছে- “বিধি যদি বাম হয়, কাশিয়ার ঝোপই বাঘ হয়”। দুর্ভাগ্যক্রমে সেই বইটিরই পড়া ধরছিলেন আমার অশীতিপর শিক্ষাগুরু। এবার আমার রিডিং পড়ার পালা কিন্তু বই খুঁজে পাচ্ছিনা, আর পাবোই বা কিভাবে সেটাতো রাস্তায় পড়ে গেছে। পড়া না পাওয়ার দÐটা লঘু হলেও বই হারানোর দণ্ডটা, গুরু দণ্ডেনও অধিক। যার কোন মাপ নেই, শিক্ষাগুরু আমার ঘাড় ধরে মাথা নিচু করে পাছায় মেরে মেরে তাঁর লম্বা সেই চোখা মাথা বেতখানা ভেঙে ফেললেন। আমি প্রাণ পণে, শরীরের সব শক্তি দিয়ে তাঁকে একটা ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে মক্তব থেকে সেই যে দৌড় দিলাম, যে দৌড় আর থামে না না। যতোক্ষণ না পর্যন্ত মক্তব চোখর আড়াল হয়। মক্তব ছুটির সময় পার না হওয়া পর্যন্ত বাড়ি ফেরাটা আর এক ধরণের বিপদ। হাজারও প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। একটা সত্যের মুখে চাপা দিতে গিয়ে, বানিয়ে বানিয়ে কতো যে মিথ্যা কথা বলতে হবে তবুও ধরা পড়ে যাবার ভয়টাতো থেকেই যায়।
বেলা অনেক হয়ে গেছে এবার মক্তব ছুটি হবে। আমার অশীতিপর শিক্ষাগুরু যে পথে বাড়ি যান সে রাস্তার উপর বেশ কয়েকটা কাঠাল গাছ আছে। আমার মাথায় একটা শয়তানী বুদ্ধি ঢুকে গেলো, শিক্ষাগুরুকে মজা দেখানোর এর চেয়ে উপযুক্ত বুদ্ধি পৃথিবীতে আর একটিও নেই। বুদ্ধিটা মাথায় আসার পর আমি নিজেই-নিজের মস্তিষ্ককে বারবার ধন্যবাদ দিলাম। এরপর আমি কাঠাল গাছে উঠে একটা বেশ বড়সড় কাঁঠাল ছিঁড়ে ডালে গুরুর আসার অপেক্ষায় বসে রইলাম। আমি দূর থেকে দেখতে পাচ্ছিলাম গুরু আস্তে আস্তে আসছেন। গুরুকে দেখে আমার বুকের ভেতরটা কেমন ধক্ধক্ করছিলো। গুরু যেইমাত্র গাছের নিচে এসে পৌছে আমি টুক করে হাতের কাঁঠালটি গুরুর মাথার উপর ফেলে দেই। গুরু বাপরে! মা-রে! বলে চেঁচাতে চেঁচাতে মাটিতে পড়ে গেলো। আমি সেই সুযোগে এক লাফ দিয়ে গাছ থেকে নেমে পালিয়ে গেলাম। কিন্তু আমার শিক্ষাগুরুর চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে যেতে পারলেও, আমার বুকের ভেতরের শিক্ষাগুরুটার চোখকে কোন ভাবেই ফাঁকি দিতে পাচ্ছিলাম না। সে সারাক্ষণ আমাকে বেত্রাঘাত করতে লাগলো। আমার অশীতিপর বৃদ্ধ শিক্ষাগুরু সেই যে মক্তব ছেড়ে বিছানায় পড়ে গেলো অনেদিন সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারলেন না।
আমিও সেদিনের পর থেকে আর মক্তবে যাইনি, স্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম। আমার গুরু-শিষ্যের এ ন্যাক্কারজনক কাজের স্বাক্ষী আর কেউ না থাকলেও আমার সেই শৈশব কালের অবুজ বিবেক কোন ভাবেই আমাকে ক্ষমা করছে না। শিক্ষাগুরুর অসুখ বেশি হওয়ার খবর শোনার পর আমি সারারাত নির্ঘুম কাটালাম, সকালে উঠে সোজা গুরুর বাড়িতে গিয়ে তাঁর পা দু’খানা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করলাম। কোন অপরাধে আমি ক্ষমাপ্রার্থী সেটা গুরুকে জানাতে পারলাম না। কিন্তু তিনি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে যে ক্ষমার নিদর্শন রেখে গেলেন, তা ইতিহাসে বিরল। আমার বিবেক তবুও আমাকে ক্ষমা করলো না।
আমার জন্ম যে গ্রামে সেটি দেশের ভৌগলিক মানচিত্রে একটি চির অবহেলিত ছিটমহল নামে পরিচিত। চারিদিকে ভারত বেষ্টিত বাংলাদেশের একটুকরো ভূখণ্ড। গ্রামটি নয় ভারতের, নয় বাংলাদেশের। যদিও কাগজে কলমে বাংলাদেশের ছিটমহল কিন্ত দেশের মূল ভূখণ্ড সাথে এর কোন যোগাযোগ নেই। মূল ভূখণ্ড যেতে হলে অন্যদেশের উপর দিয়ে যেতে হয়। ফলে এখানে কোন প্রশাসন নেই, সরকার নেই, রাস্তাঘাট নেই, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই। এখানে খেয়ে পরে বেঁচে থাকা কেবল ভারতের অনুগ্রহে। বেঁচে থাকার যে মৌলিক চাহিদাগুলো তা পূরণ করার জন্য ভারতের মুখাপেক্ষী হতে হয়। এখানকার জমিতে উৎপাদিত ফসল, গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগী ভারতের হাট-বাজারে নিয়ে বিক্রি করতে হয় এবং নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস পত্র ভারত থেকেই আনতে হয়।
আমার জন্ম ও বেড়ে উঠা যেখানে, সেখানে মক্তব ছাড়া কোন ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বই ছিলো না। সবচেয়ে কাছের স্কুল আমাদের গ্রাম থেকে এতোটাই দূরে ছিলো যে আমার বয়সী কোন বাচ্চার পক্ষে দিনে দু’বার পায়ে হেঁটে সেখানে যাতায়াত করা ছিলো অসম্ভব। এমনকি, ঐ সময় পর্যন্ত আমি কোন ইঞ্জিনচালিত গাড়ি দেখিনি। তখন পর্যন্ত আমি কোন শহরও দেখিনি। বিদ্যুৎ সম্পর্কে আমার কোন ধারণা ছিলো না। তবে আমাদের বাড়িতে ছোট্ট একটা কাঠের বাক্সের মতো যন্ত্রে গান বাজতো। আমি ধরেই নিয়েছিলাম যে ঐ যন্ত্রটার ভেতরে ছোট ছোট মানুষ থাকে, যারা গান গায়। কৌতুহলে বুকটা ফেটে যেতো কিন্তু লজ্জায় মুখ ফুটে কাউকে বলতে পারিনি।
মক্তবে লেখা-পড়ার ফাঁকে ফাঁকে আমার নানা ভাই নিজেই শেখানো শুরু করলো। বিরক্তিকর অবস্থার মধ্য দিয়ে হলেও রাত জেগে জেগে পড়া মুখস্ত করতে হতো। একদিন নানা ভাই সকাল সকাল বেশ হাসি-খুশি মুখ নিয়ে আমার কাছে এসে বসলেন। তারপর বললেন- আজকে আর কোন বইয়ের পড়া পড়তে হবে না, তোকে একটি মজার ছড়া শোনাব তুই মন দিয়ে শুনে কাল আমাকে বলবি।
একবার শুনেই মুখস্ত! সেতো ইশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরের কাজ, আমার নয়।
কেন, ইশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরের কি দু’টো মাথা ছিলো?
তা না থাক, কিন্তু তাই বলে কোথায় তিনি আর কোথায় আমি।
নানা বললেন-আচ্ছা শোন পারলে ছড়াটা লিখে নে, ফাঁকি দিতে পাবি না।
আচ্ছা নানা ভাই বলেন-
I am very Sorry
Because my লম্বা দাড়ি
I shall go শুরবাড়ি
নানুর মুখে শুনেই ছড়াটি অর্ধেক মুখস্থ হয়ে গেলো। এ আনন্দে নানু তাকে কোলে নিয়ে সবাইকে ডেকে বলে তোমরা দেখে নিও আমার নানুভাই একদিন বড় হয়ে মানুষের মতো মানুষ হবে।
বাড়ির পাশেই ছিল স্যাঁকোয়া নদী। কোনো রকমে স্কুলটা ছুটি হলেই হলো, তারা সবাই মিলে একসাথে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়তাম। সাঁতার কেটে কেটে গোসল করা । অতঃপর পর চোখ লাল করে ভেজা কাপড়ে এক দৌড়ে বাড়ি ফেরা ইত্যাদি ছিলো নিত্যদিনের কাজ। পড়ালেখায় কখনো ক্লাসে ফার্স্ট ছাড়া সেকেন্ড হয়নি। কিন্তু পড়ালেখা করা ভালো লাগতো না। তাই স্কুল ছুটি হলেই ঘুরে বেড়ানো আর আমাদেয কে পায়। প্রায় প্রতিদিনই সন্ধ্যার পর নদীর ধারে বসে বড়রা দোতরা, বাঁশি ইত্যাদি বাজিয়ে গান করতো।
নদীর ধারে একটা বিশাল আকৃতির বটগাছ। তার নিচে ছোট্ট একটা কুঁড়েঘর সেখানে একজন মাত্র মধ্যবয়সী নারী একা একা থাকে। আশপাশের বাড়িগুলো থেকে চাল, ডাল যা পায় নিয়ে এসে রান্না করে খায়। তার পরনে গেরুয়া রঙের শাড়ি, গলায় কাঠির মালা, হাতে একটা একতারা। মাঝে মাঝে গাছের শিকড়ে বসে একতারা বাজিয়ে একা একা গুনগুন করে।
ছোট মানুষ হিসেবে ধ্রæবর মনের মধ্যে খুব কৌত‚হল জন্মে, চারদিকে ঝাড়-জঙ্গলে ভরা, মাঝখানে বটগাছের তলায় একটা ছোট্ট কুঁড়েঘর, বৃষ্টি-বাদল ও ঝড়ের রাতে একা একা সে কিভাবে থাকে? তার সাথে আর কোনো মানুষ থাকে না কেন? এভাবে কী মানুষ একা থাকতে পারে? ছোট মনের কৌত‚হল কখনও পিছু ছাড়ে না। খেলার অবসরে আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তাই একদিন দু’তিনজন বন্ধু মিলে দৌড়ে গিয়ে হাঁফাতে হাঁফাতে সেই কুঁড়েঘরের সামনে দাঁড়াই। এদিক-সেদিক তাকিয়ে দেখে সেই দিদিটা কোথাও নেই। তাহলে কি এখান থেকে চলে গেছে। কিন্তু না, পাশের ঠাকুরঘর থেকে কি যেন হাতে নিয়ে তিনি বেরিয়ে এলেন। তার পাশে গিয়ে দাঁড়াতে তিনি ভ‚ত দেখার মতো চমকে উঠলেন।
কে গো তোমরা, কি চাই?
না দিদি তুমি কোথায় থাকো তাই দেখতে এলাম।
হায়! ভগবান, বসো বসো। তোমাদেও কি খেতে দিই গো বাপু?
না দিদি, আমরা কিছু খাবো না এখন । আমরা শুধু তোমার বাড়ি দেখতে আসলাম।
তোমাদের বাড়ি কোথায় গো বাপু?
ঐ যে নদীর বড় গাছটা দেখা যায় ওটাই তো আমাদের বাড়ি। কালকে না তুমি আমাদের বাড়িতে গেলা। আমার মায়ের সাথে বসে গল্প করলা। তোমার মনে নেই?
না গো বাছা, আমার বেশি মনে থাকে না।
দিদি আমরা যাই। এই বলে সোজা বাড়ির মুখে দৌড় দিলাম।
যাহোক গ্রামের স্কুল না থাকায় এবার আমাকে ভর্তি হতে হলো পার্শ্ববর্তী ভারতের স্কুলে। কিন্তু দূরত্ব আর আমার বয়সের কথা চিন্তা করে মা প্রচন্ড উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন। বাবা তাঁকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, গ্রামের আরোও দু’চ্রজন ছেলে একই স্কুলে পড়তে যাবে। অনেকে ছিলো বয়সে আমার চেয়ে অনেক বড়। প্রচন্ড শীত কিংবা ঝড়-বৃষ্টির দিনে স্কুলে যাতাযাত করা খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার ছিলো। শৈশবের কোন কোন দৃশ্য এখনো আমার স্মৃতিতে জীবন্ত। কেরসিনের কূপির নিভু-নিভু আলোয় ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে পড়া মুখস্ত করা। আমাদের সেই মাটির চুলা, ওটার দাউদাউ আগুন, ছেকা রুটির বেহেস্তি সুবাস। কোন কিছুই আমি ভুলতে পারিনি এখনো।
পরদিন সকাল বেলা আমার খেলার সাথীরা এসে জুটলো। আজ কি খেলা হবে, কোথায় খেলা হবে, কারা কোন দলে খেলবে ইত্যাদি। এরই ফাঁকে একজন বললো যে, ওস্তাদজি (আমার অশীতিপর শিক্ষাগুরু যাকে আমরা ওস্তাদজি বলে ডাকতাম) নাকি আজ হাঁটতে গিয়ে উল্টে পড়ে গেছেন। তার কথাটা শেষ হতে না হতেই সবাই হা হা করে হাসতে শুরু করলো। তাদের হাসির ফিছনে যে কারণটি ছিলো-মাথা নিচু করে পাছা লাল করা মার।
ওস্তাদজির পড়ে যাওয়াটা, তাদের খুশির ব্যাপার হলেও আমার বুকের ভেতর প্রচণ্ড ভাবে আঘাৎ করলো। আমি এর এক মুহুর্ত দেরি না করে আমার শিক্ষাগুরু বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করলোম। আমার সঙ্গী-সাথীরাও পিছে পিছে হাঁটতে শুরু করলো।
আমার শিক্ষাগুররু বাড়ি যেয়ে দেখি, তিনি অনেকটা সেরে উঠেছেন। তবে শারীরিক দুর্বলতার কারণে নাকি পড়ে গিয়েছিলেন। আমি গুরুর পা ছুঁইয়ে সালাম করলাম। আর গরুর আরাগ্য লাভে নিজেই একটু সান্ত¦না পেলাম।
আমার কেন জানি মনে হতো জন্মভূমিতে আমার থাকা হবেনা, এই ভূমি থেকে আমাকে বিদায় নিতে হবে। আমার বিশ্বাস আমি অতিরঞ্জিত কিছু বলছিনা। আমার মনে হতো, নিজেকে আমি অন্য কোথাও আবিস্কার করবো অন্য কোথাও। কিন্তু কিভাবে? কোথায়? জানিনা বিষয়টা কিভাবে ঘটলো। আমি জেগে জেগে স্বপ্ন দেখতাম, বাংলাদেশের কোন স্কুলে আমি ভর্তি হবো। একদিন তাই হলো, ভারতের স্কুলে আর আমাদের যেতে দেয়া হচ্ছে না। তাই আমাকে বাংলাদেশের স্কুলে ভর্তি করা হবে। আমার স্বপ্ন সত্যি হতে চলেছে, আমাকে বাংলাদেশে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে রাতের অন্ধকারে ভারতীয় বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স অর্থাত বি,এস,এফ এর চোখ ফাঁকি দিয়ে ভারতীয় বর্ডার পার হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছি। আমার কেন জানি বারবার মায়ের কথা মনে পড়ছে। মুষলধারে বৃষ্টি, নীড় হারা চড়–ইয়ের মত আমি কাঁপছি। প্রচন্ড শীতে মা আমাকে একটি গামলায় গোসল করিয়ে দিচ্ছেন মা। কেন এই দৃশ্য তখন আমার মনে পড়লো আমি তাও বলতে পারব না। সাবানের ফেনা চোখে যাওয়ায় আমার সেকি চিৎকার! কী শান্ত মেজাজেই না মা বলেছিলেন, ‘তোকে বলেছি না, মাথায় সাবান দেবার সময় চোখ বন্ধ রাখবি।’
আমি যখন শহরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, আমার মনের আয়নায় গ্রামের সেই পাঠশালার (মক্তব) ছবি ঝিলিক দিয়ে উঠল। আমার সেই অশীতিপর বৃদ্ধ শিক্ষাগুরু যেখানে আমি কোরান পাঠ শিখেছিলাম, শিশুশিক্ষার বই পড়ে হাতে-কলমে লিখতে শিখেছিলাম। এগুলোই ছিল জ্ঞানের সিঁড়িতে আমার প্রথম পদক্ষেপ। আমি প্রাইমারি স্কুল পেরিয়ে এবার ভর্তি হলাম হাইস্কুলে।
অনেক দিন পর গামে ফিরে গিয়ে আমার মনে হয়েছিলো এ যেন এক মৃতপুরী। বাবার জানাজা করা আমার ভাগ্যে জোটেনি। জীবনে বাস্তবতা, কল্পনা আর স্মৃতির অংশীদারিত্ব কতখানি সেটা আমি ছাড়া আর কেউ জানতে পারবে না। যে সময় বয়ে গেছে আমার সত্তার ভেতর দিয়ে আমাকে বিচ্ছিন্ন করেছে আমার দেশ থেকে, দেশের মাটি থেকে, তার হিসেব চাওয়ার কেউ নেই। তাহলে কেন আমার মনে হয়, যে স্থানে আমি জন্মেছিলাম তা নিছক ভৌগলিক নয়? শৈশবেই একটা ক্ষীণ অনুভূতি আমাকে আবিষ্ট করে রাখতো।
আজ আমার গুরু নেই কিন্ত প্রায়শ্চিত্যস্বরূপ আমি প্রতিটি মৃত্যুদিবসে একগোছা ফুল নিয়ে হাজির হই তাঁর সমাধীতে। সমাধীর উপর আলতো করে ফুল দিয়ে, শ্রদ্ধায় নত হয়ে এখনও কেঁদে কেঁদে ক্ষমা প্রার্থনা করি।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now