বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
#নিউইয়র্কেরট্যাক্সিওলা
১
ধানমন্ডি লেকের পাড়ের এক চায়ের দোকান । দোকানের সামনে দুটো কাঠের বেঞ্চ । সপ্তাহের অন্যান্য দিনে বেঞ্চগুলোতে বসার জায়গা পাওয়া যায় না কিন্তু আজকে বেঞ্চগুলো একেবারে ফাঁকা কোন লোকজন নেই ।
রফিক বেঞ্চের এক কোনায় জবুথবু হয়ে বসে আছে । প্রতিদিনই বসে । আজ নভেম্বর মাসের সাতাশ তারিখ । প্রচণ্ড ঠাণ্ডা পড়েছে হঠাৎ এরকম ঠাণ্ডা পড়ার কারণ রফিক ধরতে পারছে না । শৈত্য প্রবাহ নাতো আবার ?
রফিক ভাবল , হাফ সুয়েটার পরে বাসা থেকে বের হওয়া উচিত হয়নি জ্যাকেট ফ্যাকেট কিছু পরা উচিত ছিল । সে ঘড়ির দিকে তাকাল । পাঁচটা বেজে পঁয়তাল্লিশ মিনিট । শীতের দিনগুলা ছোট !আকাশ অন্ধকার হতে শুরু করে । লেকের অনেকটা ঘন কুয়াশায় ঢাকা । আর দশ মিনিটের মধ্যে আলম না এলে উঠে পড়তে হবে । বাসায় অনেক কাজ । মিস্ত্রির খোঁজে বের করতে হবে তারপর তিন তলার ভাড়াটের বেসিন বদলে দিতে হবে । তিন মাসের মধ্যে এই নিয়ে দুবার বেসিন ভাঙ্গল। রফিক অনেক চিন্তা করেও বেসিন ভাঙ্গার কারণ বের করতে পারল না । তার মাথায় একই প্রশ্ন কিভাবে সিরামিকের তৈরি অতি শক্ত বেসিন কেউ ভেঙ্গে ফেলে ? ভাড়াটে প্রথমবার যখন বেসিন ভাঙ্গল সে কিছু বলেনি দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে তাই বলে দুবার ? ভাড়াটেকে প্রশ্ন করেও কোন সদুত্তর পায়নি । ভদ্রলোক তার দিকে তাকিয়ে বিচিত্র ভঙ্গিতে হাসলেন । তিনতলার ভাড়াটে আর তার স্ত্রী দুজনেই দেখতে অনেকটা ছোটখাটো হাতির মতন । ওজন দেড়শ কেজির কম না পালওয়ান পালওয়ান চেহারা অথচ কথা বলে মিনমিনেয়ে ব্যাপারটা অদ্ভুত ! সে খেয়াল করে দেখেছে মোটা মানুষের গলার স্বর সবসময় চিকন হয় আর চিকন মানুষের মোটা ! যেমন তাঁদের বাড়ির দারওয়ান । রোগা পটকা শরীর অথচ কথা বলে গমগমিয়ে ।
কেন এমন হয় ? কে জানে ?
সে নিজে মোটাও না আবার চিকনও না যাইহোক, ভাড়াটে ভদ্রলোক (!) যখন কথা বলেন রফিকের বেশিরভাগ সময় বলতে ইচ্ছে করে ভাইজান ভলিউম বাড়ান । চক্ষুলজ্জার কারণে বলা হয় না ।
আচ্ছা , এরা কি বাথরুমের মধ্যে মারামারি করে ? করাটা বিচিত্র না। দুজনের সম্পর্ক সাপে নেউলে । প্রায়ই এঁদের ফ্ল্যাট থেকে চিৎকার চ্যাঁচামেচি শোনা যায় । গালি উপর পিএইচডি ডিগ্রি দেয়ার কোন সিস্টেম থাকলে এরা অনায়াসে হনারারি ডিগ্রি পেয়ে যেত । কি সব গালির ভাষা ।
ভাড়াটিয়াদের এসব যন্ত্রণা ছাড়া রফিক বেশ সুখী একজন মানুষ । তার বাবা জাহাঙ্গীর সাহেব ছিলেন পিডিবির ইঞ্জিনিয়ার । ঘুষ খাওয়াকে তিনি তার জীবনের অন্যতম ব্রত হিসেবে নিয়েছিলেন । মৃত্যুর সময় তিনি তার তিন ছেলেকে ইশারায় কাছে ডাকলেন তখন তাঁর হাত কাঁপছে , বুক হাপরের মতন ওঠানামা করছে ।
তারপর শ্লেষ্মা জড়ানো কণ্ঠে আস্তে আস্তে বললেন বাবারা কাছে বস ।
আমার হাতে আর সময় বেশি নাই । তোমরা মিলে মিশে থাকবা আমাদের এই বাড়িটা আমি তোমাদের তিনজনের নামে লিখে দিয়েছি । আমার উকিল সোবহান সাব তোমাদের সাথে যোগাযোগ করবেন ।
তাঁর কথা বলার ধরন দেখেই বোঝা গেল কথা বলতে তাঁর কষ্ট হচ্ছে । রফিক তখন অনেক ছোট । তাঁর কান্না পাচ্ছিল সে তাঁর বাবার হাত বলেছিল,
আব্বা কথা বলবেন না , আপনার কষ্ট হচ্ছে ।
উনি রফিকের দিকে অবাক চোখে তাকালেন অনেক কষ্টে বললেন
আরে পাগলা ছেলে কাঁদে কেন ?
বাবারে খুশি মনে বিদায় দাও এ কথা বলে পানি খেতে চাইলেন । এক কিছুক্ষণের মধ্যেই তার হেঁচকির মতন উঠলো । তিনি মারা গেলেন তার স্ত্রী মর্জিনা বেগমের হাত ধরে ।
রফিকের মা এখন তার সাথেই থাকেন । তার বাবার রেখে যাওয়া ধানমন্ডি সাত নাম্বার রোডের বিশাল একতলা বাড়িটি এখন দশ তলা এপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স । মাসে মাসে যা ভাড়া উঠে তা দিয়ে রফিকদের আগামী দু তিন পুরুষের কাজকর্ম না করলেও চলবে অতএব রফিকও কোন কাজকর্ম করে না । তার বড় দুই ভাই আমেরিকা প্রবাসী । একজন ওকলাহোমা স্টেট ইউনিভার্সিটির প্রফেসর । সাদা এক মহিলাকে বিয়ে করে ওখানেই থিতু হয়ে বসেছেন কখনও দেশে আসেন না । বছরে দুই ঈদে দুবার ফোন করেন এর বেশি কিছু না । তার মেঝ ভাই বড় ভাইয়ের ঠিক উল্টো চরিত্রের । সপ্তাহে দুদিন ফোন করেন থাকেন নিউ ইয়র্কে ট্যাক্সি চালান । স্টুডেন্ট ভিসায় গিয়েছিলেন পড়াশুনা আর হয়নি । সেখানে বাংলাদেশি এক মেয়ের প্রেমে পরলেন । তাকে বিয়ে করে এখন নিউ ইয়র্কের স্থায়ী বাসিন্দা । তাকে ফোন করলেই বলেন বুঝলি রফিক এই নচ্ছারের দেশে আর থাকব না । এ বছরই আমার শেষ বছর বলাই বাহুল্য তার শেষ বছর আর আসে না আর আসার কথাও না তার বিদেশে বড় হওয়া স্ত্রী বাংলাদেশের নাম শুনলে তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে অথচ তার আমেরিকায় জন্ম হওয়া তার পাঁচ বছর বয়সী ভাতিজি সামিরা বাংলাদেশের জন্য পাগল । বছর দুএক আগে দেশে এসেছিল।তখন তাঁর বয়স ছিল তিন অথচ কি বুদ্ধিমান মেয়ে । পটপট করে কথা বলে । রফিককে প্রতিদিন বিকেল বেলা ভাতিজিকে নিয়ে রিকশা ভ্রমণে বের হতে হত কোথাও থামাথামি নেই উদ্দেশ্য বিহীন ঘোরাফেরা । সামিরা লং ডিসটেন্সে মাঝেমধ্যে তার ছোট চাঁচুকে ফোন করে তার বাবা মা এটা জানেন না । বিল আসার পর রফিকের বড় ভাইয়ের চোখ কপালে ওঠে । সামিরার কথাবার্তা সবই রিকশা কেন্দ্রিক ।
যেমন ঃ
টাচু কি কর ?
কিছু নারে মা ঘুমাই ।
তুমি কি টালাদিন ঘুমাও ?
হাহাহা , তুই এতরাতে কি করছিস রে বুড়ি ?
ডিনাল খাই ।
কি খাচ্ছিস ?
চিপস আর কোক ? আমার প্লিও খাবার ।
ভাত খাস না কেন ?
ভাত মজা না “ইয়াক” !
রফিক হেঁসে বলল কোক কম খাবি পানি বেশি খাবি বুঝলি ?
ওয়াটার হ্যাজ নো ফ্লেভার চাচু ! সামিরার গলায় হতাশা !
তাহলে কোকই খা । জীবনে ফ্লেভারের দরকার আছে ।
চাচু ? আই মিস লিকশা । তুমি যখন আমেরিকা আসবে তখন আমার জন্য একটা লিকশা আনবে ওকে ? ড্রাইভারও আনবে ওকে ।
আনব মা , রিকশা ড্রাইভার সব আনব ।
ওকে চাচু বাই । আই মিস ইউ ।
বাই ।
চায়ের দোকানী ছগীর মিয়া রফিককে চিন্তিত দেখে প্রশ্ন করলো
রফিক ভাইজান কি ভাবেন ? চা দিমু এক কাপ ? ঠান্ডার মইধ্যে এক কাপ গরম চা খান শইলে আরাম পাইবেন । চিনি দিমু কয় চামুচ ? নাকি মাল খাওনের পর চা খাইবেন ? রফিক এ লোকটিকে বেশি পাত্তা দেয় না । তাঁর প্রশ্ন করার মুদ্রাদোষ আছে । একই প্রশ্ন দুই তিনবার করে ।
রফিক বলল ছগীর মিয়া তোমাকে একটা কথা বলি আমার কথা না জ্ঞানী জনের কথা ।
ছগীর বলল অবশ্যই বলবেন । একটা কেন পাঁচটা বলবেন । আপনেরা জ্ঞানীগুনি মানুষ।
রফিক আহত চোখে তাকাল । শোন তাহলে । কথাটা এইরকম “এই পৃথিবীতে কম বোঝা এবং বেশি কাজ করা ভালো । তোমার সমস্যা তুমি একটু বেশি বোঝ আর কথা বল বেশি ! আমি চা যখন চাইবো তখনি দিবে বুঝতে পারছ ?
জী বুঝলাম ।
রফিক জানে এ লোককে এসব কথা বলা অর্থহীন ! তাছাড়া ছগীর মিয়া বেশিক্ষণ কথা না বলে থাকতে পারে না । পাঁচ মিনিট পর আবার কথা বলতে শুরু করবে ।
সে আবার ঘড়ির দিকে তাকাল আলম এখনো আসছে না কেন ? ডাইল খাবার সময় পেরিয়ে যাচ্ছে । জগতের সবকিছুই নিয়মে বাধা আমরা কখনো ভোর আটটায় মাছের তরকারী দিয়ে ভাত খাই না ঠিক তেমনি ডাইলের বেলায়ও ডাইল খোররা কিছু জটিল নিয়ম কানুন মেনে চলে। ডাইল খেতে হবে ভর সন্ধ্যায় , মদ ,গাঁজা খেতে হয় গভীর রাতে।
রফিক নিজের আনমনে হাসল ঘটনাটা কি আজকে মাথার মধ্যে এতো দার্শনিক চিন্তা ভাবনা আসছে কেন ? দর্শন শাস্ত্রে অনার্স করাটাই কি এর কারণ ?
আজকে আলমের ডাইল আনার কথা । সপ্তাহে প্রতিদিনই আলম ডাইল কেনে কিন্তু টাকা দেয় সে । দুজনে এক বোতল ভাগাভাগি করে খায়। রণ পল্যঙ্ক কোম্পানির এ কাশির সিরাপটি তাদের অতি প্রিয় ! বাংলাদেশের নেশাখোরদের কাছে ভারতীও এ পণ্যটি খুব দ্রুত প্রসার পেয়েছে । জিনিসটা আসলে মন্দ না । মদ ফদ খেলে মুখে থাকে বিশ্রী স্পিরিটের গন্ধ কিন্তু ডাইলে এসব ঝামেলা নেই । একে বলা যেতে পারে ভদ্র নেশা ।খাবার কিছুক্ষণ পরই মাথার এক ধরনের ঝিম ঝিম ভাব হয় । এ ভাব ধরে রাখার জন্য কিছু নিয়ম কানুন ডাইল খোররা মেনে চলে যার একটি হচ্ছে ক্রমাগত অতি মিষ্টি চা খাওয়া সাথে সিগারেট । সিগারেট টানার সময় মুখের ভেতর থাকতে হবে নাবিস্কো চকলেট । ডাইলের নেশার আফটার ইফেক্ট বেশ মজার কোন এক বিচিত্র কারণে আশেপাশের সবকিছুই আনন্দময় মনে হয় । পৃথিবীটাকেও মনে হয় অতি সুন্দর ! অতি কুৎসিত ধরনের কথাবার্তাও বিচিত্র কারণে মধুর শোনায় । আবার না খেলেও নানান যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়।
গত সপ্তাহে হঠাৎ করে পুরো ঢাকা শহর ডাইল শূন্য হয়ে পড়ল । কোথাও মাল খোঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। রফিক আর আলম ঝাড়া তিন ঘণ্টা পুরো ঢাকা শহর তন্ন তন্ন করে খুঁজল কমলাপুর , মগবাজার ,তাল পট্টি ,শাঁখারী বাজার, ঠাঠারী বাজার কোথাও মাল নেই । মাল বিক্রেতা ভাগ্নেদের জিগ্যেস করলেই বলে মামা বড় চালান ধরা পরছে আইজকা মাল নাই । বাইত যান । সে রাতে রফিকের শরীর বেশ খারাপ করল ডায়রিয়ার মতন হয়ে গেল প্রায় সারারাত তাকে বদনা হাতে বাথরুমে দৌড়াতে হয়েছে । ছগীর মিয়া আবার কথা বলতে শুরু করেছে ভাইজান , সিঙ্গারা দিমু ? এইমাত্র ভাজছি গরমাগরম ! খাইয়া দেখেন । আপনে আমার দোকানে চা ছাড়া কিছু খান না সাথে তেঁতুলের ছাটনি দিতেছি যদি খাইতে খারাপ হয় তয় থুক কইরা ফলাইয়া দিবেন । ওই পিচ্ছি ভাইরে দুইটা সিঙ্গারা দে । বুঝলেন রফিক ভাই এই তেঁতুলের ছাটনির পেছনে আছে বিরাট হিস্টুরি ! তখন আমার মাত্র শাদী হয়েছে বউরে নিয়া শ্বশুর বাড়ি যাইতাছি ………...।
রফিক বলল , এই হিস্টোরি আরেকদিন শুনবো দেন খেয়ে দেখি আপনার সিঙ্গারা ।
ঠিক তখনি আলম এলো আলমের অবস্থা রফিকের ঠিক উল্টো অভাব অনটনের সংসার চারটি টিউশনি করে তার দিন যাচ্ছে । ভাগ্যিস তার বাবা মারা যাবার সময় দোতলা একটি বাড়ি রেখে গিয়েছিলেন । সেখান থেকে কিছু ভাড়া পায় তা না হলে এতদিনে রাস্তায় নেমে পরতে হত । মা , ছোটবোন তানিয়া কে নিয়ে তাদের তিনজনের ছোট্ট সংসার । সবকিছু মোটামুটি ভালোই চলছিল বাঁধ সাধল তাঁর ছোট বোন । সে কিছুদিন আগে পাড়ার এক মাস্তানের সাথে পালিয়ে গেছে । সে রাতে আলম বাসায় ফিরেছে গেটের কাছে আসতেই চোখে পড়ল তার মা কলা-পসিবলের ওপাশে দাঁড়িয়ে আছেন হাতে তসবি উৎকণ্ঠিত চেহারা । আলম বলল , কি হয়েছে আম্মা এখানে দাঁড়িয়ে আছ কেন ? উনি তার হাতে ছোট্ট একটি চিরকুট ধরিয়ে দেন যাতে লিখা
" মা আমি চলে গেলাম ! কার সাথে যাচ্ছি তা তুমি জান । আমাকে খোঁজার চেষ্টা করবে না ।
" আলম সে রাতে বৃথা চেষ্টা করে সময় নষ্ট করেনি । কিছুদিন আগে খবর পেয়েছে তার বোন তার মাস্তান জামাইকে নিয়ে সিঙ্গাপুর গেছে বেড়াতে । মনে হচ্ছে তারা সুখেই আছে ।
আলম রফিককে বলল , আমার সাথে আয়
তারা চা দোকানের পেছনটায় চলে এলো । জনসম্মুখে ডাইল খাওয়াটা উচিত হবে না । কে না কে দেখে ফেলে ।
দোকানের পেছনে আসার পর রফিক বলল কীরে ! এতো লেইট ? আমার হাতে একশ এক কাজ । আলম বলল আরে বলিস না ট্রাফিক জ্যাম । ঢাকা শহর এখন জ্যামের শহর । একসময় দেখবি লোকজন অফিসের অর্ধেক কাজ ট্রাফিক জ্যামে বসেই করবে যখন অফিসে পৌঁছবে তখন দিন শেষ হা হা । আলম ফেন্সিডিলের বোতল পকেট থেকে বের করে রফিকের হাতে দিল । এই নে গলায় ঢেলে দে এক নাম্বারই জিনিস “ মন্দির” আমি আমার হাফ খেয়ে ফলেছি । ডাইল খাওয়া শেষ হয়েছে তারা ফিরে এসে বেঞ্চে বসেছে আলম ছগীর মিয়াকে বলল ওই ছগীর ভাই দুইটা চা দেন আর দুটা বাংলা ফাইভ দেন আচ্ছা , গুড়ের চা আছে না ? কালকে যে খেলাম ঐটা ?
ছগীর মিয়া বলল আছে ভাইজান থাকব না কেন ? শিঙ্গাড়া দিমু ভাইজান ?
আলম বলল ছগীর মিয়া চা দিতে বলছি চা দেন । শিঙ্গাড়া ফিঙারা কিচ্ছু না ।
দুজন চা নিয়ে বসেছে হাতে সিগারেট আলম একগাল ধোঁয়া ছেড়ে বলল সিলেট যাবি ?
রফিক বলল সিলেটে কি ?
আলম রফিকের হাতে একটি চিঠি ধরিয়ে দিল এই নে পড় ।
রফিক চিঠি হাতে নিলো পরিচিত হাতের লিখা তাদের বন্ধু জহিরের । তিন বন্ধু একসাথে মেট্রিক ,ইন্টার ,অনার্স এমএ একসাথে শেষ করেছে। তিনজনের মধ্যে জহির এমএ তে ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছিল সে আর আলম টেনেটুনে থার্ড ক্লাস। জহির মাস তিনেক আগে সিলেটের এক চা বাগানে অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার হিসেবে জয়েন করেছে। আলম আছে বিদেশ যাবার ধান্দায় । ইউরোপ আমেরিকার নানান ইউনিভার্সিটি তে আপ্লাই করেছে লাভের লাভ কিছুই হয়নি কেউই তাকে
ভিসা দিচ্ছে না । রফিক চিঠি পড়ায় মন দিলো ।
প্রিয় আলম ও রফিক, ৭/১২/১৯৯০
শুভেচ্ছা নিস। কেমন আছিস তোরা ? দিনকাল কেমন যাচ্ছে ? যে কারণে চিঠি লিখছি সেটা ভণিতা না করেই বলি আমার জীবনে অতি অদ্ভুত এক ঘটনা ঘটেছে । এর ব্যাখ্যা আমি অনেক ভেবেও দাঁড় করাতে পারিনি । তোদের সাথে ঘটনাটা শেয়ার কারা উচিত । আমি চিঠির সাথে আন্ত : নগর পারাবত এক্সপ্রেসের দুটো প্রথম শ্রেণীর টিকেট পাঠালাম । আমি কোন কথা শুনতে চাই না । ১৩ তারিখ দুপুরবেলা শ্রীমঙ্গল ট্রেন স্টেশনে আমি অপেক্ষায় থাকব যথাসময় যেন তোদের দুটাকে ট্রেন থেকে নামতে দেখি । আরেকটা লোভনীয় প্রস্তাব উল্লেখ না করে পারছি না আমার বাংলো বিয়ার আর মদে ভর্তি ইচ্ছেমত খেতে পারবি। চলে আয় ।
জহির
আলম বলল কিরে , যাবি নাকি ?
রফিক বলল, যাওয়া যায় । অনেকদিন কোথাও যাই না তাছাড়া কখনও চা বাগানে থাকা হয়নি । আচ্ছা কি এমন ঘটনা ঘটেছে যে আমাদেরকে শ্রীমঙ্গল গিয়ে তা শুনতে হবে ?
আলম বলল, ঘটনা ফটনা কিছু না । আমরা যাতে তার কথায় গুরুত্ব দেই এর জন্য এসব লিখেছে । বাগানে একা একা থেকে মনে হয় পাগল হতে আর বেশী বাকী নেই অথচ প্রথমে কি লম্বা লম্বা কথাবার্তা বাগানে বাগানে নিঃসঙ্গ জীবন কাটাবো , আমি প্রকৃতি প্রেমিক , আত্মকেন্দ্রিক লেখক , লেখকরা নিঃসঙ্গতা পছন্দ করেন বাল ছাল কতকিছু বলল ।
NOW সোনার চান্দু বুঝতে পারছে কত ধানে কত চাল How many paddy how many rice ? হা হা হা
রফিক বলল , যাবি নাকি ?
আলম বলল চল যাই । দেখে আসি । শালার জন্য মন টানছে !
২
ভোর প্রায় পাঁচটা । আলম বিছানায় শুয়ে আছে । রাতে প্রচণ্ড শীত পড়েছিল ।ডাবল কম্বল মুড়ি দিয়েও সারারাত একফোঁটা ঘুম হয়নি অথচ তার মত নেশাখোরদের রাতে চমৎকার ঘুম হবার কথা ।
কিছুদিন হল সে প্রায় পুরো রাত জেগে কাটিয়ে দেয় । ঘুমানোর জন্য রফিক তাকে বলেছিল বুঝলি বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভেড়া গুনবি এক থেকে একহাজার । আলম ভেড়া ,ছাগল ,গরু , মহিষ সবই গুনেছে লাভের লাভ কিছু হয়নি । ঘুম বাবাজি চোখে ধরা দেননি । সে বিছানা ছাড়ল । কাপড় চোপড় গোছাতে হবে । সকাল আটটায় ট্রেন । সপ্তাহ খানেক শেভ করা হয়নি । তাকে দেখাচ্ছে ইমদাদুল হক মিলনের কোন উপন্যাসের ব্যর্থ প্রেমিকের মত । আয়নায় নিজেকে দেখে সে আঁতকে উঠলো তার অ-ঘুমা চোখ দুটো টকটকে লাল হয়ে আছে অথচ আরামে ঘুমানোর জন্য কি চমৎকার আবহাওয়া ছিল । পুরো বাংলাদেশের উপর শীত জেঁকে বসেছে । গত রাতের দশটার সংবাদে বলল সারা দেশ জুড়ে শৈত্য প্রবাহ চলছে দিনাজপুর , রংপুরে বেশ কিছু লোক প্রচণ্ড শিতে মারা গেছে । আলম মনে মনে বলল একদিকে ভালই হয়েছে । সারা দেশ গিজগিজ করছে মানুষে , কিছু কমা উচিত । রাতে তাঁর ঘুম না হবার আরেকটা কারণ তাঁর মায়ের কান্না । আলমের ছোট বোন তানিয়া ঐ মাস্তান ছেলের সাথে বাড়ি থেকে পালানোর পরপরই মা কেমন যেন হয়ে গেছেন । প্রায়ই উদাস চোখে তাকিয়ে থাকেন । সে চোখে শুধুই শূন্যতা । কান্নাকাটি করে সারারাত জায়নামাজেই কাটিয়ে দেন
শেষ রাতের দিকে অজ-পাড়া গায়ের মহিলাদের মত বিলাপ করে কাঁদতে থাকেন । তার মাঝে মধ্যে ইচ্ছে করে মাকে বোঝায় কিন্তু কি বুঝাবে ? বাসার বাইরে বের হলে পাড়ার লোকজন আড়চরচখ তাকায় ।
আলমরা এ পাড়ায় আছে প্রায় বছর বিশেক হল । তাদের বাড়িটি সবার কাছে কাস্টমস অফিসারের বাড়ি হিসেবে পরিচিত । তার বাবা সাদিকুর রহমান ছিলেন কাস্টমস সুপার । তার চাকরির শেষ কটি বছর কেটেছে জিয়া আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে । ভদ্রলোকের হাতে কত চোরা কারবারি ধরা পরেছে তার ইয়ত্তা নেই । তার কারণে অনেকে চাকরি পর্যন্ত খুইয়েছে । ঘুষ খেলে ভদ্রলোকের এরকম অন্তত দশটি বাড়ি থাকত । তিনি তার সারা জীবনের সঞ্চয় এ বাড়ির পেছনে ঢেলে দিয়েছেন । বছর দুয়েক আগে আগে এক দুপুরবেলা বাসার এলেন । তিনি সাধারণত সন্ধ্যে ছ,টার আগে আসেন না সেদিন এসে পড়লেন । তার অফিসের সাদা জিপ তাকে নামিয়ে দিয়ে তখন বাসার নিচে দাড়িয়ে আছে। আলম তখন ইউনিভার্সিটি থেকে বাসায় ফিরেছে জিপের ড্রাইভার আলমকে দেখে বলল ভাইজান সারের মনে হয় শইল খারাপ গাড়ির মইধ্যে সারাক্ষণ চোখ বন্ধ কি বইসা ছিলেন । স্যার কখনো এরকম করে না , কথাবার্তা কয় । আপনে উপরে গিয়া দেখেন স্যারের কি হইছে ? আমি এইখানেই আছি হাসপাতালে যাওন লাগলে আমারে ডাইকেন । আলম হন্তদন্ত হয়ে বাসায় ঢোকে বাবা বাসার মেঝেতে পড়ে আছেন কোন নড়াচড়া নেই । তার মা ফাতেহা বেগম সেদিন বাসায় ছিলেন না নিউ মার্কেটের কাঁচা বাজারে গিয়েছিলেন বাজার করতে । আলম আর ড্রাইভার দুজনে মিলে বাবাকে বাসার কাছের এ ক্লিনিকে নিয়ে গেল ততক্ষণে সব শেষ । কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে বললেন ভাই I am sorry উনি ঘণ্টা-খানেক আগে মারা গেছেন । ডাক্তারের মুখে সরি শব্দটা শুনে সেদিন মনে হয়েছিল তার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পরেছে ।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now