বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

অন্ধকারের গ্রহ পার্ট---4

"সাইন্স ফিকশন" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান Takiyan (০ পয়েন্ট)

X By জাফর ইকবাল কী করতে এসেছ? আমি মহাকাশযানের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে মহাকাশকে দেখব। আমি শুনেছি এটা নিকষ কালো-তার মাঝে শুধু নক্ষত্রগুলো জ্বলজ্বল করে, দূরে কোনো একটা গ্যালাক্সিকে স্পষ্ট দেখা যায়। হিসান মাথা নাড়ল। বলল, হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছ। মহাকাশযানে মহাকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা একটা অভূতপূর্ব দৃশ্য। যারা প্রথমবার দেখে তারা হতবাক হয়ে যায়। য়ুহা বলল, আমার মনে হয় আমি যত দিন এই মহাকাশযানে থাকব তত দিন এই জানালার পাশে বসে বাইরে তাকিয়ে থাকব। ব্যাপারটা চিন্তা করেই আমার এক ধরনের শিহরণ হচ্ছে। আমার গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যাচ্ছে! হিসান বলল, তুমি যখন নিজের চোখে দেখবে তখন গায়ের লোম শুধু দাঁড়িয়ে যাবে না–দাঁড়িয়ে নাচানাচি করতে থাকবে! নিয়ন্ত্রণকক্ষে ঢুকে সত্যি সত্যি য়ুহার গায়ের লোম দাঁড়িয়ে গেল। সামনে বিশাল একটা স্বচ্ছ জানালায় মহাকাশকে দেখা যাচ্ছে–নিকষ কাল অন্ধকার মহাকাশে অসংখ্য নক্ষত্র জ্বলছে। দুরে একটি গ্যালাক্সি আরো দূরে আরো কয়েকটি গ্যালাক্সি। মাঝামাঝি একটা অংশে ধোয়াটে কিছু অংশ, তার মাঝামাঝি একটা অংশ গাঢ় অন্ধকারে ড়ুবে আছে। দেখে মনে হয় পুরো মহাকাশ বুঝি জীবন্ত কোনো প্রাণী তার সহস্র চোখ নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। য়ুহা বুকের ভেতর আটকে থাকা একটা নিঃশ্বাস বের করে দিয়ে বলল, কী অসাধারণ! কী অপূর্ব! হিসান য়ুহার উচ্ছ্বাসে যোগ দিল না। সে অসংখ্যবার মহাকাশ অভিযানে যোগ দিয়েছে, এই দৃশ্য তার কাছে খুব পরিচিত একটা দৃশ্য। য়ুহা বলল, আমার ধারণা ছিল নক্ষত্রগুলো বুঝি মিটিমিটি করবে– হিসান মাথা নাড়ল, বলল, ভুল ধারণ! মিটিমিটি করে না। স্থির হয়ে জ্বলে। যদি বায়ুমণ্ডলের ভেতর দিয়ে দেখতে হয় তাহলে এ রকম মনে হতে পারে। এত বিচিত্র রং আছে সেটাও আমি জানতাম! হ্যাঁ। নক্ষত্রের তাপমাত্রার ওপর তার রংটা নির্ভর করে। কোনো কোনোটা উজ্জ্বল কোনো কোনোটা এত নিষ্প্রভ যে দেখাই যায় না। হিসান বলল, সেগুলো এত লক্ষ কোটি আলোকবর্ষ দূরে যে তুমি সেটা কল্পনাও করতে পারবে না। আমি একজন কবি। য়ুহা নিজের বুকে হাত দিয়ে বলল, আমি সব কল্পনা করতে পারি। ঠিক এ রকম সময়ে ক্যাপ্টেন ক্ৰব ঘরটিতে এসে ঢুকল, য়ুহার কথা শুনে হাসতে হাসতে বলল, তুমি সব কল্পনা করতে পার? হ্যাঁ। পারি। দেখা যাক তোমার কথা সত্যি কি না। ক্যাপ্টেন ক্ৰব জানালার মাঝামাঝি একটা অংশের দিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল, তুমি এই দিকে তাকিয়ে থাক। তাকিয়ে থাকলে কী হবে? আমি এর ঔজ্জ্বল্যতাটুকু বাড়িয়ে দিই–তুমি তখন একটা অংশ দেখবে যার কাছাকাছি একটা ব্ল্যাক হোল আছে। ব্ল্যাক হোলের আকর্ষণে যে গ্যাস– দাঁড়াও-দাঁড়াও-তুমি কী বলছ আমি বুঝতে পারছি না। তুমি এর ঔজ্জ্বল্যতাটুকু কেমন করে বাড়াবে? আমরা জানালা দিয়ে বাইরে মহাকাশের দিকে তাকিয়ে আছি। মহাকাশের ঔজ্জ্বল্যতা তুমি কেমন কয়ে বাড়াবে? এই যে। ক্যাপ্টেন ক্রব হলোগ্রাফিক একটা প্যানেল বের করে তার একটা জায়গায় স্পর্শ করে বলল, এর পুরো নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে। এই স্ক্রিনে যা আছে তার সবকিছু আমি ইচ্ছে করলে আরো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে পারি। স্ক্রিন? য়ুহা চোখ বড় বড় করে বলল, এটা তাহলে একটা স্ক্রিন? এটা জানালা না? হ্যাঁ এটা একটা স্ক্রিন। মহাকাশযানের বাইরে যে ক্যামেরা আছে সেগুলো থেকে মহাকাশযানের যে ছবি দেখা যাচ্ছে সেগুলো এই স্ক্রিনে দেখাচ্ছে। তার মানে এটা আসল মহাকাশ না? এটা মহাকাশের ছবি? ক্যাপ্টেন ত্রুব বলল, তুমি ঠিক কী বলতে চাইছ আমি জানি না। আমাদের সামনে একটা খোলা জানালা থাকলে আমরা যা দেখতাম এখানে হুঁবহুঁ তা-ই দেখা যাচ্ছে। হুবহুঁ একরকম। কিন্তু আসল দৃশ্য নয়? ক্যাপ্টেন ত্রুব বলল, তুমি যদি সেভাবে বলতে চাও বলতে পার। য়ুহার মুখে আশাভঙ্গের একটা ছাপ পড়ল। সে নিচু গলায় বলল, আমি আসলে নিজের চোখে সত্যিকার মহাকাশ দেখতে চেয়েছিলাম। এটা সত্যিকার মহাকাশ, তুমি নিজের চোখে দেখছ। এটা সত্যিকার মহাকাশ না। এটা সত্যিকার মহাকাশের ছবি! ক্যাপ্টেন ত্রুব হিসানের দিকে তাকিয়ে হাল ছেড়ে দেয়ার ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকালো। হিসান বলল, য়ুহা তুমি বিশ্বাস কর। সত্যিকার মহাকাশ ঠিক এ রকম। হুঁবহুঁ এ রকম। য়ুহা বলল, আমি তোমার কথা বিশ্বাস করছি। কিন্তু তবুও সত্যিকার মহাকাশ দেখতে চাইছিলাম। সত্যিকার মহাকাশ দেখার উপায় থাকে না। তার প্রয়োজন নেই, তুমি যেহেতু অনেক ভালোভাবে দেখতে পাচ্ছ কেন তার জন্যে কষ্ট করবে। য়ুহা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, তোমরা বুঝতে পারছ না। আমি ব্যাপারটা অনুভব করতে চাই। অনুভব। ভুল জিনিস দিয়ে কোনো কিছু অনুভব করা যায় না। সত্যি আর তার ছবি এক নয়। ক্যাপ্টেন জব বাধা দিয়ে বলল, ঠিক আছে, ঠিক আছে। আমি বুঝতে পারছি তোমার কৌতূহলটা যৌক্তিক কৌতূহল নয়, এটা হচ্ছে এক ধরনের আবেগতাড়িত কৌতূহল! য়ুহা মাথা নাড়ল, বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ, তুমি ঠিকই ধরতে পেরেছ। আমার ভেতরে যুক্তি খুব বেশি নেই। যা আছে তার পুরোটাই আবেগ! এবং— এবং? সে জন্যে আমার কোনো লজ্জা নেই। কোনো হীনম্মন্যতা নেই। ক্যাপ্টেন ক্ৰব মাথা নেড়ে বলল, ঠিক আছে, আমি বুঝিতে পারছি। আমি তোমাকে সত্যিকার জানালা দিয়ে বাইরে তাকানোর ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। তারপর হিসানের দিকে তাকিয়ে বলল, ট্রান্সপোর্ট ঘরের পাশে সিকিউরিটি চ্যানেলের যে কোয়ার্টও জানা আছে য়ুহাকে সেখানে নিয়ে যাও। কিন্তু সেটা এত ছোট! হ্যাঁ। অনেক ছোট। কিন্তু কিছু করার নেই। য়ুহা আগ্রহ নিয়ে বলল, ছোট হোক আমার আপত্তি নেই! সত্যিকার জানালা হতেই হবে। আমি ছোট একটা জানালা দিয়েই বাইরে তাকাতে পারব। হিসনি ইতস্তত করে বলল, জায়গাটাতে অক্সিজেন সরবরাহ আর তাপমাত্রার খানিকটা সমস্যা আছে। য়ুহা ব্যস্ত হয়ে বলল, থাকুক! আমার আপত্তি নেই। কোয়ার্টজের একটা জানালা, অতিবেগুনি রশ্মিা পুরোটুকু কাটা যায়। রেডিয়েশনের সমস্যাও আছে। ক্যাপ্টেন ক্রব বলল, রেডিয়েশন মনিটর দেখে যেও। আমার মনে হয় সিকিউরিটি স্যুট পরে গেলে কোনো সমস্যা হবে না। কাজেই কিছুক্ষণ পর দেখা গেল ট্রান্সপোর্ট ঘরের পাশে সিকিউরিটি চ্যানেলের কাছে একটা সিকিউরিটি স্যুট পরে য়ুহা কোয়ার্টজের জানালা দিয়ে বাইরে নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে আছে। হিসান জিজ্ঞেস করল, তুমি যেটা দেখতে চেয়েছ সেটা দেখছ? য়ুহা বুকের ভেতর আটকে থাকা একটা নিঃশ্বাস বের করে দিয়ে বলল, হ্যাঁ, দেখছি। আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না আমি নিজের চোখে মহাকাশকে দেখছি। কেমন দেখছ? অপূর্ব! গ্যালাক্সিটা দেখেছ? হ্যাঁ, এন্ড্রোমিডা। আমাদের সবচাইতে কাছের গ্যালাক্সি। আমার চোখের পাতি ফেলতেও ভয় করছে। মনে হচ্ছে চোখের পাতি ফেললে যদি চলে যায়? হিসান শব্দ করে হাসল, বলল, না যাবে না। এই গ্যালাক্সিটা ঠিক এখানেই থাকবে! আমাদের মহাকাশযানটা তার গতিপথ এতটুকু পরিবর্তন না করে এগিয়ে যাবে। তাই এন্ড্রোমিডাটাকে থেখানে দেখছ সেখানেই দেখবে, আগামী এক মাস এটা এখান থেকে এক চুলও নড়বে না। য়ুহা আবার কোয়ার্টজের জানালায় মুখ লাগিয়ে বলল, আমি এটাকে আরো কিছুক্ষণ দেখি? দেখ। তোমার যতক্ষণ ইচ্ছে দেখ। য়ুহা কোয়ার্টজের জানালায় মুখ লাগিয়ে মহাকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। তার এখনো নিজের চোখকে বিশ্বাস হচ্ছে না যে সত্যি সত্যি মহাকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। ঘুমানোর আগে য়ুহা অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। বিছানায় তার মাথার কাছে টেবিলের ঠিক মাঝখানে স্বচ্ছ কোয়ার্টজের গোলকটা যেখানে রেখে গিয়েছিল সেটা ঠিক সেখানেই আছে–তার জায়গা থেকে সেটা এক চুল নড়েনি। ক্যাপ্টেন ক্রব ঠিকই বলেছিল, কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক সত্যিই অসাধারণ। এত বড় একটা মহাকাশযানকে অচিন্ত্যনীয় বেগে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে, শুধু যে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে তা-ই নয়, প্রতি মুহূর্তে তার গতিবেগ বাড়িয়ে যাচ্ছে কিন্তু সেটা বোঝার কোনো উপায় নেই। মনে হয় তারা সবাই মিলে বুঝি মহাকাশযানে নিঃসঙ্গ পরিবেশে কোথাও স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঘুমানোর আগে য়ুহা যোগাযোগ মডিউলটা চালু করে শীতলঘরে ক্রায়োজেনিক তাপমাত্রায় শীতল করে রাখা এগারোজন মানুষকে একবার দেখে। রায়ীনার ছবিটা ভেসে আসার পর সে একদৃষ্টে অনেকক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকে, মেয়েটার চেহারায় এক ধরনের স্বতঃস্ফূর্ত প্রাণবন্ত মানুষের চিহ্ন ছিল। এখন সেখানে কিছু নেই, শক্ত পাথরের মতো দেহটি নিশ্চল হয়ে আছে, দেখে মনে হয় না এটি আসলে কোনো মানুষের দেহ। মনে হয় এটা বুঝি পাথরের তৈরি একটা ভাস্কর্য। য়ুহা রায়ীনার দেহটির দিকে তাকিয়ে নিজের বুকের ভেতরে এক ধরনের বেদনা অনুভব করে, ঠিক কী কারণে জানা নেই তার ভেতরে এক ধরনের গভীর অপরাধবোধের জন্ম নেয়। ঘুম থেকে ওঠার পর য়ুহার এক সেকেণ্ড সময় লাগে বোঝার জন্যে সে কোথায় আছে। মাথার কাছে বড় একটা টেবিল, সেই টেবিলের ঠিক মাঝখানে স্বাচ্ছ কোয়ার্টজের একটা গোলক, সেটা দেখে হঠাৎ করে য়ুহার মনে পড়ে সে একটা মহাকাশযানে করে যাচ্ছে। য়ুহা তখন তার আরামদায়ক বিছানায় উঠে বসে বেশ কিছুক্ষণ স্বচ্ছ কোয়ার্টজের গোলকটির দিকে তাকিয়ে থাকে, তারপর বিছানা থেকে নেমে আসে। য়ুহা যখন খাবার টেবিলে গিয়েছে তখন সেখানে শুধু মিটিয়া নামের মেয়েটি বসে কোনো একটা পানীয়তে চুমুক দিচ্ছে। য়ুহাকে দেখে মুখে হাসি টেনে বলল, ঘুম ভাঙল? হ্যাঁ। ভেঙেছে। তোমাকে দেখে আমার রীতিমতো হিংসে হয়। হিংসে হয়? আমাকে? মিটিয়া মাথা নাড়ল, বলল, হ্যাঁ। কেন? তুমি যখন ইচ্ছে ঘুমাতে যেতে পার, যখন ইচ্ছে ঘুম থেকে উঠতে পার। য়ুহা টেবিলের নিচে সুইচটাতে চাপ দিতেই একটা অংশ খুলে ধূমায়িত একটা ট্রে বের হয়ে আসে। তার মাঝে কয়েক ধরনের কৃত্রিম শর্করা এবং প্রোটিন। য়ুহা পানীয়ের মগটা টেনে নিয়ে এক চুমুক খেয়ে বলল, এই মহাকাশযানের সবকিছুই তো নিয়ন্ত্রণ করছে কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক। তোমাদের কমান্ডের কারো তো কোনো কাজ নেই–তোমরা সবাই আমার মতো যখন ইচ্ছে ঘুমাও না কেন? যখন ইচ্ছে জেগে ওঠো না কেন? মিটিয়া শব্দ করে হেসে উঠে বলল, আমরা একটা কমান্ডের অধীনে কাজ করি। আমাদের সব সময় এমনভাবে প্রস্তুত থাকতে হয় যেন পরের মুহূর্তে একটা অঘটন ঘটবে! কিন্তু কোনো অঘটন তো ঘটছে না। না ঘটছে না। কিন্তু আমাদের প্রস্তুত থাকতে হয়, সে জন্যে আমরা আছি। এই মুহূর্তে যদি কিছু একটা অঘটন ঘটে তাহলে তোমরা তার জন্যে প্রস্তুত? হ্যাঁ। মিটিয়া হেসে বলল, আমার কথা বিশ্বাস না করলে বিপদ সংকেতের এলার্মটা বাজিয়ে দেখ। মুহূর্তের মাঝে পুরো কমান্ড তাদের দায়িত্ব নিয়ে চলে আসবে। য়ুহা মাথা নেড়ে বলল, যদি দেখি আমার মহাকাশ ভ্রমণ আস্তে আস্তে একঘেয়ে হয়ে যাচ্ছে তাহলে একদিন আমি বিপদ সংকেতের এলার্মটা বাজিয়ে দেব। নিজের দায়িত্বে বাজিয়ে! যদি দেখা যায় শুধু মজা করার জন্যে বাজিয়েছ তাহলে বাকি সময়টা ক্যাপ্টেন ক্রব তোমাকে তোমার ঘরে তালা মেরে আটকে রাখতে পারে! আমাদের সামরিক নিয়মকানুন তা-ই বলে! য়ুহা খাবারের ট্রে থেকে একটা কৃত্রিম ফল হাতে নিয়ে সেটাতে একটা কামড় দিয়ে বলল, তোমরা সবাই কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক খুব বিশ্বাস কর? হ্যাঁ। করি। মিটিয়া তার পানীয়তে শেষ চুমুক দিয়ে মগটা টেবিলের নিচে ঢুকিয়ে বলল, তুমি কর না? আমি কোনো যন্ত্রকে কখনো বিশ্বাস করি না। মিটিয়া হাসি হাসি মুখ করে বলল, কিন্তু তুমি নিজে কি একটা বায়ো মেডিকেল যন্ত্র না? য়ুহাকে একটু বিপন্ন দেখায়, সে ইতস্তত করে বলল, আমি, মানে আমি- হ্যাঁ তুমিও একটা যন্ত্র। কোনো কোনো যন্ত্র জৈবিক উপায়ে তৈরি হয়, কোনো কোনোটা আমরা তৈরি করি। এই হচ্ছে পার্থক্য! য়ুহা ভুরু কুঁচকে বলল, তুমি বলতে চাইছ, কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক জৈবিক যন্ত্রের মতো কিছু একটা? হ্যাঁ। কোনো কোনো দিকে তার থেকে বেশি। তার মানে আমি যদি একটা কবিতার লাইন বলি তোমাদের কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক তার পরের লাইনটা বলতে পারবে? মিটিয়া খিলখিল করে হাসতে হাসতে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, তুমি নিজেই চেষ্টা করে দেখ! আমার মনে হয় পারবে। পারবে? হ্যাঁ। আমি কেমন করে জিজ্ঞেস করব? কোয়ান্টাম নেটওয়ার্কের একটা কণ্ঠ ইন্টারফেস আছে। সেটা ব্যবহার করা হয় না। ক্যাপ্টেন ক্রবকে বললে সে তোমার জন্যে এটা চালু করে দিতে পারবে। তুমি তখন তার সাথে খোশগল্প করতে পারবে! সত্যি? হ্যাঁ সত্যি! বাহ। খুব মজা তো। আমি ক্যাপ্টেন ত্রুবকে এখনই ধরছি। কিছুক্ষণের মাঝেই দেখা গেল য়ুহা একটা গোপন পাসওয়ার্ড ঢুকিয়ে কোয়ান্টাম নেটওয়ার্কের সাথে কথা বলতে শুরু করেছে। প্রথমে সে খানিকটা অনিশ্চিতের মতো বলল, আমি য়ুহা, কোয়ান্টাম নেটওয়ার্কের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। তুমি যদি আমার কথা বুঝে থাক তাহলে আমার প্রশ্নের উত্তর দাও। কাছাকাছি একটা ভয়েস সিনথেসাইজার শুষ্ক এবং যান্ত্রিক গলায় বলল, উত্তর হ্যাঁ-সূচক। তুমি কি কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক কথা বলছ? উত্তর পুনরায় হ্যাঁ-সূচক। তুমি কি আমাকে চেনো? আমার নাম- উত্তর হ্যাঁ-সূচক। তথ্যকেন্দ্রে তথ্য সংরক্ষিত। মুহ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, আমাকে সবাই বলেছে কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক অত্যন্ত বুদ্ধিমান। আমার ধারণা ছিল তুমি সত্যিকার মানুষের মতো কথা বলতে পারবে। কিন্তু তুমি একটা খেলনা যন্ত্রের মতো শব্দ করছ। মানব প্রজাতির মতো কথা বলতে সক্ষম। তাহলে বলছ না কেন? আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা প্রয়োজন। ঠিক আছে। ঠিক আছে। আমি আনুষ্ঠানিকভাবে তোমাকে বলছি—একজন মানুষ আরেকজন মানুষের সাথে যেভাবে কথা বলে, তুমি সেভাবে আমার সাথে কথা বল। বয়স? আমার বয়সী? পুরুষ অথবা রমণী? য়ুহা এক মুহূর্ত চিন্তা করে বলল, পুরুষ। কোয়ান্টাম কম্পিউটার তার যান্ত্রিক গলায় বলল, ঠিক আছে। য়ুহা জিজ্ঞেস করল, তুমি কি এখন সত্যিকার মানুষের মতো কথা বলবে? ভয়েস সিনথেসাইজার থেকে সুন্দর পুরুষের মতো গলার কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক বলল, বলব। অন্তত বলার চেষ্টা করব! চমৎকার! য়ুহা একটু এগিয়ে এসে বলল, কথা বলার সাথে সাথে যদি তোমাকে দেখতে পেতাম সেটা আরো মজা হতো! এগুলো আসলে ছেলেমানুষী কাজকর্ম। মানুষ যখন প্রথম শুরু করেছে তখন এর মাঝে সময় দিয়েছে। সময় নষ্ট করেছে। এখন এর মাঝে কোনো নতুনত্ব নেই, তাই কেউ চেষ্টা করে না! তুমি প্রথমবার এসেছ বলে করছ। কয়দিন পর তুমিও আর করবে না। কিন্তু এখন আমার কাছে এর অনেক নতুনত্ব আছে। থাকুক। আমার কথা বিশ্বাস কর। একটা কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ককে মানুষের চেহারায় দেখে মানুষের কণ্ঠে কথা বলিয়ে কোনো লাভ নেই। কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক মানুষ না। তার অনুভূতি মানুষের অনুভূতির নয়। তার ইন্দ্রিয় মানুষের ইন্দ্রিয় নয়। য়ুহা বলল, কিন্তু আমি তোমার সাথে মানুষের ভাষায় কথা বাজে চাই। কেন? আমি তোমার বুদ্ধির একটা পরিমাপ করতে চাই। কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক একটা হাসির মতো শব্দ করল, বলল, আমার জানামতে সে রকম কোনো গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি নেই। আমার কোনো গ্রহণযোগ্য পদ্ধতির প্রয়োজন নেই। আমি আমার নিজের পদ্ধতি ব্যবহার করব। তোমার নিজের পদ্ধতি কী? একটা প্রাণীর বুদ্ধিমত্তা যখন খুব উপরে উঠে যায় তখন সে যুক্তির বাইরের কাজ করতে পারে। সেটা কী? যেমন, মনে করো সে কবিতা লিখতে পারে। কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক কোনো কথা না বলে চুপ করে রইল। য়ুহা বলল, আমি তোমাকে কবিতার একটা লাইন বলব। তুমি। তার পরের লাইনটা বলবে। ঠিক আছে? ঠিক নেই। য়ুহা অবাক হয়ে বলল, ঠিক নেই? না। ঠিক নেই। আসলে আমি তোমার সাথে এই প্রতিযোগিতায় যেতে চাই না। এটা প্রতিযোগিতা না। এটা একটা পরীক্ষা। আমি এই পরীক্ষা দিতে চাই না। চেষ্টা কর। দেখি তুমি কতটুকু পার। আমি একটুও পারব না। আমি আসলে এ ধরনের কাজের জন্যে তৈরি হইনি। আমি এই মহাকাশযানটাকে নিখুঁতভাবে মহাকাশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে নিয়ে যেতে পারব কিন্তু কবিতার একটা লাইনের পিঠাপিঠি আরেকটা লাইন বসাতে পারব না। য়ুহা মাথা নেড়ে বলল, তুমি চেষ্টা করে দেখ। তুমি যদি জোর কর, তাহলে চেষ্টা করব। হ্যাঁ। আমি জোর করছি। বেশ। য়ুহা বলল, আকাশের পথে দেখ নক্ষত্রের ঘর– আকাশের পথে? কিন্তু আকাশ ব্যাপারটা তো একটা কাল্পনিক ধারণা। আকাশ বলে তো কিছু নেই। সেই আকাশের পথ– য়ুহা বলল, আমি তোমার সাথে এটা নিয়ে তর্ক করতে চাই না। আমি একটা কবিতার লাইন বলেছি, তুমি এর পরের লাইন বল। কিন্তু সে জন্যে এটা তো একটু বিশ্লেষণ করতে হবে। নক্ষত্র হচ্ছে মহাজাগতিক বিষয়। কিন্তু ঘর শব্দটি অত্যন্ত জাগতিক। মহাজাগতিক নক্ষত্রকে তুমি একটা জাগতিক শব্দ দিয়ে প্রদর্শন করছ য়ুহা বলল, থাক। আমার মনে হয় তোমার বলার ইচ্ছে নেই। ইচ্ছের ব্যাপার নয়—এটা হচ্ছে— থাক তোমার আর চেষ্টা করতে হবে না। তুমি তুমি কী আমার ওপর ক্রুদ্ধ হয়েছ? না। হা মাথা নাড়ল, মানুষ কখনো যন্ত্রের ওপর ক্রুদ্ধ হয় না। শুনে একটু স্বস্তি পেলাম।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১০৪ জন


এ জাতীয় গল্প

→ অন্ধকারের গ্রহ পার্ট---4

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now