বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
গল্প - " অমানুষ "
.
প্রায় আধঘণ্টা ধরে সোফায় বসে আছে সোহান। কাজের বুয়া দরজা খুলে দিয়েই হাওয়া হয়ে গেছে। ভেতরে গিয়ে তার উপস্থিতির কথা জানিয়েছে কিনা কে জানে।
.
সোহান যেই বাড়িতে বসে আছে এটা তার এক স্টুডেন্ট এর বাড়ি। এক না বলে দুই বলা উচিত। কারণ এই বাড়ির দুই ভাই বোনকে পড়াতো সোহান।
.
বাড়ির কর্তা রফিক সাহেব ড্রয়িং রুমে প্রবেশ করলেন। তার ভাবখানা দেখে মনে হচ্ছে সোহানকে দেখে সে খুবই উচ্ছসিত। বললেন,
.
- আরে তুমি! কখন এসেছো??
.
বসা থেকে দাঁড়িয়ে পড়লো সোহান। প্রতুত্তরে বলল,
.
-- এইতো হলো কিছুক্ষণ।
- রাত তো হলো অনেক, আজ খেয়ে যাও।
-- না চাচা, আজ না।
- কিছু বলবে মনে হচ্ছে।
.
এই লোক সোহানের এক মাসের বেতন আটকে রেখেছে। সোহান ইদানীং খুবই টানাটানির মধ্যে আছে। তাই টাকাটা খুবই দরকার।
.
- চাচা, আমার কিছু টাকা পাওনা ছিলো...
-- ও আচ্ছা আচ্ছা। আমার মনে আছে। টাকা তুমি অবশ্যই পাবে। কিন্তু আজ না। আমিও কিছুটা টানাটানির মধ্যে আছি। তুমি বরং দুই সপ্তাহ পরে এসো।
.
(দুই)
.
সোহানের বাসাটা বেশ দূর। রিকশায় করে যাওয়া আবশ্যক। কিন্তু সোহান হেটেই রওনা দিলো। কারণ রিকশায় চড়ার মতো টাকা সোহানের পকেটে ছিলো না।
.
এই খারাপ অবস্থায় পড়া লাগবে তা সোহান কখনো কল্পনাই করেনি। আরও বছরখানেক আগে প্রেক্ষাপটটাই অন্যরকম ছিলো।
.
বছরখানেক আগে রফিক সাহেবের মেয়ে মিথিলাকে পড়ানো শুরু করেছিলো সোহান। মেয়েটা মেধাবী ছিলো। সোহানও আশাবাদী ছিলো যে মেয়েটা ইন্টারে ভাল রেজাল্ট করবে। টিচাররা ভাল পড়াচ্ছে নাকি খারাপ পড়াচ্ছে তা বাবা মাও টের পান।
.
সোহান শিক্ষক হিসেবে ভাল ছিলো। সেই সুবাদেই মিথিলার ভাই মামুনকেও পড়াতে হয় সোহানের। কিন্তু মামুনকে পড়ানো শুরু করতেই হতাশ হয়ে পড়ে সোহান। কারণ মামুন ছিলো দুই বারের ইন্টার ফেল।
.
তাদের বাবা রফিক সাহেব টাকাপয়সা ওয়ালা মানুষ ছিলেন। তিনি একদিন সোহানকে ডেকে বললেন,
.
" বাবা, আমার মেয়ে ভাল রেজাল্ট করবে আমি জানি। কিন্তু আমার ছেলেকেও পাশ করিয়ে দাও। নইলে আমার মান ইজ্জত যাবে। যদি মিথিলা A+ পায় আর মামুন পাস করে তাহলে তোমায় আমি একটি ল্যাপটপ গিফট দিবো কথা দিলাম। "
.
রফিক সাহেবের শপথটা অবিশ্বাস্য লেগেছিলো সোহানের কাছে। কিন্তু মাঝেমধ্যে চিন্তা করতেও ভাল লাগতো। একটা ল্যাপটপ পাওয়া গেলে মন্দ হতো না! রফিক সাহেব মাঝেমধ্যে নিজেই ল্যাপটপের কথা মনে করিয়ে দিতেন।
.
সোহান নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টাই করেছিলো। যথা সময়ে পরীক্ষা হয়েছিলো। রেজাল্টও আউট হলো। মিথিলা পেয়েছিলো A+ আর মামুন পেয়েছিলো A-.
.
রফিক সাহেব কথা রাখেননি। তিনি সোহানকে তার পাওনা ল্যাপটপ দেননি বরঞ্চ সোহানের এক মাসের বেতন আটকে দিয়েছেন।
.
(তিন)
.
রফিক সাহেব ঘুমানোর আয়োজন করছিলেন। তার স্ত্রী মায়মুনা বিছানায় শুয়ে ছিলেন। রফিক সাহবকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন,
.
- ইকটু আগে কি সোহান এসেছিলো?
-- হ্যাঁ।
- তার টাকাটা দিয়েছো??
-- না। দিয়ে দিবো।
.
- শুধু শুধু ঘুরাচ্ছো কেন ছেলে টাকে?
-- সমস্যায় আছি তাই দিতে পারছি না। দিয়ে দিবো।
- তুমি কিসের সমস্যায় আছো?? গত মাসেও তো মাজারে ২০ হাজার টাকা দিয়ে আসলে।
.
রফিক সাহেব চুপ করে রইলেন। মায়মুনা আবার বললেন,
.
- ছেলেটাকে ল্যাপটপ দেয়ার কথা ছিলো। সেটাও তো দাওনি!
-- দেইনি, কিন্তু দিবো।
- তুমি দিবে না, আমি জানি।
-- তুমি আমাকে কি ভাবো?? খুব খারাপ ভাবো, এটা ঠিক না।
.
- তুমি যেটা সেটাই ভাবি।
-- এই রাতের বেলা ঝগড়া করবে? ঘুমাবো, লাইট অফ করো।
.
রফিক সাহেব নিজের মনে ভাবছেন। একটা ল্যাপটপের দাম কমপক্ষে ৩০ হাজার টাকা। এতগুলো টাকা পানিতে ফেলে কোনই ফায়দা নেই।
.
তিনি ভাবতেও পারেননি যে তার ছেলে পাশ করবে। ভাবের ঠেলায় প্রতিজ্ঞা করে বসেছিলেন। তিনি জানেন তার ছেলে তার মতোই গবেট। রফিক সাহেব নিজেও ইন্টার পাস করতে পারেননি।
.
বাড়ির জায়গির মাস্টার গরুর মতো পিটিয়েও তাকে পাস করাতে পারেনি। কিন্তু সোহান কি জাদু করলো! কখনো বেত দিয়ে শাসন করেনি এমনকি কখনো ধমকও দিতে দেখেনি। আশ্চর্য কান্ড, মাথা আছে ছেলেটার। ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়লো রফিক সাহেব।
.
(চার)
.
সকালে ঘুম থেকে উঠেই সোহান বুঝতে পারলো যে তার প্রচন্ড ক্ষুধা লেগেছে। আজকাল ক্ষুধাও বেশি লাগে। আগে তেমন ক্ষুধা লাগতো না। দিনে দুইবেলা খাওয়ার অভ্যাস করেছে সোহান।
.
হিসেব করে দেখেছে যে, খাওয়ার খরচটাই খুব বেশি। খরচ যত কমানো যায় তত ভাল। খরচ কম হলে টাকা ইকটু বেশি বাচেঁ। আর বেশি টাকাও গ্রামে পাঠানো যায়। তার পাঠানো টাকার উপরেই তার মা আর বোনের ছোট্ট সংসার চলছে।
.
সোহানের খাবারের মেন্যু খুবই নগণ্য। সকালে বনরুটি আর দুটি কলা।
দুপুরে ভাত আর ডিমের চড়চড়ি। আর রাতে দুই মুঠ চানাচুর আর পানি।
সোহান পরীক্ষা করে দেখেছে ক্ষুধা নষ্ট করতে চানাচুর ওস্তাদ জিনিস। বাজারে বউ জামাই চানাচুর পাওয়া যায়, চল্লিশ টাকা প্যাকেট। এক প্যাকেটে সোহানের এক মাস চলে যায়।
.
নাস্তা শেষে সোহান তার বন্ধু রুমানকে ফোন দিলো।
.
- হ্যালো রুমান...
-- কিরে কি খবর, খোজই তো নেও না আজকাল!
- আছি ভাল। ব্যস্ত থাকি আজকাল। একটা দরকারে ফোন দিয়েছিলাম
-- বলো।
.
- একটা টিউশনি জোগাড় করে দাও।
-- আচ্ছা দিবো।
- আরেকটা কথা।
-- কি?
.
- দেখো, বড়লোক পরিবার যেনো না হয়!
-- কেন? বড়লোকে সমস্যা কি?
- তারা অমানুষ!
-- আচ্ছা ঠিক আছে। বড়লোক ছাড়াই দেখবো।
.
ফোনটা রাখার সাথে সাথেই আবার ফোন বেজে উঠলো। ফোন ধরতেই করিম সাহেবের ঝাঁঝালো গলা শোনা গেল,
.
- সোহান, তুমি এখন কোথায়?
-- বাসায়।
- কি! তোমার কি বিন্দুমাত্র কমনসেন্স নাই? টিউশনির সময় শুরু হতে আর মাত্র ৫ মিনিট আছে, এখনো তুমি বাসায়? ঠিক টাইমে কিভাবে আসবে? আমার ছেলেটার পরীক্ষা।
-- আমি বের হচ্ছি, চলে আসবো।
.
- তাড়াতাড়ি বের হয়ে রিকশা নাও। আজ আর হেটে আসার দরকার নেই। কুইক।
.
ফোন রাখতেই সোহান হুট করে বলে বসলো, " এই শালাও অমানুষ। "
.
সোহান গালাগাল দেয়ার মতো ছেলে না। কিন্তু একজন অমানুষকে শালা বলাটা ক্ষমার যোগ্য হতেই পারে।
.
লেখক - মুনীর আহমদ।
.
(সত্য ঘটনা অবলম্বনে।)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now