বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

ওগো বধু সুন্দরী

"ছোট গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়াদুল ইসলাম রূপচাঁন (০ পয়েন্ট)

X দিনটা ১৯৮৯ সালের ২৯ শে এপ্রিল | বৈশাখ মাসের ভ্যাপসা গরমে অর্নক আর তিতলির জীবনে বসন্ত এসেছে | ওদের আজ বিয়ে | না , এই বিয়ের আগে ওদের জীবনে প্রেম এর 'প' ও পা দেয়নি ! অর্নক স্বভাবে বেশ লাজুক , তাই কলেজ ইউনিভারসিটিতে সুন্দরী মেয়েদের দিকে আড় চোখে শুধু তাকিয়েই গেছে | লাইন মারা, প্রেম করা আর হয়নি ! আর তিতলির ব্যাপারটা উল্টো , ওর আজ অব্দি কাউকে বিশেষ পছন্দই হয়নি ! আর হবেই বা কি করে, গার্লস স্কুল , তারপর গার্লস কলেজ , তার ওপরে ওর বাবা ! না তিতলির বাবা অন্য বাবাদের মতন একটুও রাগী না, একেবারে বন্ধুর মতন | তাই বন্ধু হিসেবেই স্কুলে , পড়ার ব্যাচ এ , গানের ক্লাস এ দিয়ে আসতো আবার নিয়েও আসতো | পারার ফাংসন থেকে পুজোয় ঠাকুর দেখা কোথাওই মেয়েকে একা ছাড়ার কোনো প্রশ্নই নেই | তাই সুন্দরী তিতলি ছেলেদের ঝারি অনেক খেলেও , প্রেম পত্র সমেত প্রেমিক কোনদিনও খুঁজে পায়নি | তাই অবশেষে দুজনেই মা কাকিমাদের স্মরনাপন্ন হয়ে , মিষ্টি আর রসগোল্লার প্লেট হাতে বিয়ে করতে রাজি হয়ে যায় | তবে অর্নক এর আরো একটা কারণ ছিল , 'চিংড়ির মালাইকারী'| যেদিন তিতলিকে দেখতে গিয়েছিল ওদের বাড়িতে প্রথম , সেইদিন মিষ্টি, রসগোল্লা , সিঙ্গারার পর দুপুরে খাবার পাতে বাঁশকাঠি চালের সরু নরম ভাত, মাছের মাথা দিয়ে সোনামুগের ডাল , বেগুনি , এচড় আলুর দম , চিংড়ির মালাইকারী , আমের চাটনি, পাপর, সন্দেশ , আর মিষ্টি দই খাইয়েছিল | সবই পাত্রী নিজের হাতে তৈরী করেছে | এখনো অর্নকের যেন রান্নাগুলো মুখে লেগে আছে , বিশেষ করে সেই চিংড়ির মালাইকারী | যেটা খেয়েই অর্নক মনঃস্থির করে নিয়েছিল , যে বিয়ে যদি করে তাহলে এই চিংড়ির মালাইকারীকে ই করবে , সরি , মানে ইয়ে , ওই তিতলিকেই করবে | বৌভাতের দিন যদিও সেই পচা গরমটা ছিল না জলপাইগুড়িতে | কালবৈশাখীর ঝড় আর বৃষ্টি শহরটা কে ভিজিয়ে দিয়েছে | আজ বেশ ভালো ঘুম হবে , এই ভেবেই অর্নক ঘরে ঢুকলো | এখন ঘরে শুধু ও আর তিতলি , আর একটা নিঃস্তন্ধতা ! তবে, ঘরে ঢোকার আগে একটু যে নার্ভাস হচ্ছিল না অর্নক , সেটা বললে ভুল বলা হবে | আসলে বিয়ে ঠিক হয়েছে ফেব্রুয়ারী মাসে, তারপর তিতলির সাথে দেখা হয়েছে হাতে গুণে পাঁচবার | ত়া ও মা কাকিমা, মাসিমা , পিসিমা সমেত | কথা হয়েছে , "কি কেমন আছ?" , "হ্যা ,আমি ভালো আছি " ,শুধু ওই অব্দিই | আর ফোন করারও উপায় নেই, তিতলিদের বাড়িতে তখনও অব্দি ল্যান্ড ফোনের কনেক্সন নেয়া হয়নি | আর বুথ এ দাঁড়িয়ে পা ব্যথা করে বকবক করার মতন কোনো ইচ্ছাই তিতলি নিজে থেকে দেখায়নি | যাই হোক, এত কিছু ভেবে এখন আর কি হবে ! বিয়ে করেছে তো একসাথে একই ঘরে থাকার জন্যই | আর তিন দিন ধরে এই বিয়ের ধকল এর পর বিছানা যেন ওকে ডাকছে ! সেই সব ভেবেই ঘরের দরজাটা বন্ধ করলো | তারপর আস্তে আস্তে বিছানার দিকে এগিয়ে এলো | তিতলি লাল বেনারসী পরে কনের সাজে বসে আছে | বাহ, বেশ সুন্দর দেখতে লাগছে তো ! সন্ধ্যে থেকে আত্মীয় সজন, পারা পরশী , বন্ধু বান্ধবের ভীরে নিজের বউ কে মন দিয়ে দেখার সময়ই পায়নি অর্নক | কিন্তু অর্নক বিছানায় এসে বসতেই হঠাত একটা উল্টো ঘটনা ঘটল ! তিতলি হাপুস নয়নে কাঁদতে শুরু করলো ! অর্নক তো অবাক ! কি হলো ! কি করলো ও ! এই ভাবে কাঁদছে কেন রে বাবা ! ... আমতা আমতা করে কিছু কথা সাজিয়ে অর্নক ভয়ে ভয়ে জিগেশ করলো , "তিতলি কি হয়েছে ? কাঁদছ কেন ? আমি তো কিছুই করিনি !" .... তিতলি কেঁদে কেঁদে উত্তর দিল , "প্লিস কিছু করবেন না ! প্লিস আমাকে ছেড়ে দিন | আমি বাবার কাছে যাব | এই রকম সারা রাত একটা অজানা অচেনা ছেলের সঙ্গে একই ঘরে থাকব ! আমার ভয় করছে |" ... অর্নক কথা শুনে আকাশ থেকে পড়ল , " কি বলছ ? অজানা অচেনা ? কিন্তু আমি তো তোমার বর |" ...... তিতলি চোখের জল মুছতে মুছতেই উত্তর দিল, " সে তো আজ হলেন ! এতদিন থরী ই না চিনতাম ! আগে এত ভয় লাগেনি | শাড়ি, গয়না , এত গিফটস এই সবের কথা ভাবতে ভাবতেই দিন কেটে গেছে ! কিন্তু আজ সত্যি খুব ভয় করছে | " ............. এর কি উত্তর দেবে অর্নক ! সত্যিই তো | অজানা অচেনাই বটে | তারপর তিতলিকে শান্তনা দিয়ে বলল , " প্লিস কেঁদো না তিতলি | তুমি আর একটু ভলিউম বাড়ালেই ঘরের বাইরে লোক জড়ো হয়ে যাবে ! কে বলতে পারে, ফুলসজ্জার রাতেই আমি বধু নির্যাতনের কেস এ ফেঁসে শ্রীঘরে চলে গেলাম | না বাবা, তার থেকে আমি সোফায় যাচ্ছি | তুমি আরাম করে হাত পা ছড়িয়ে খাটে ঘুমাও , নো প্রবলেম |"..... কথাটা বলে কোনো ভাবে মেক আপ দিয়ে তিতলির কান্না থামিয়ে সেই রাতে অর্নক সোফার ওপরই নিজের শরীরটা এলিয়ে দিল | ঘুমনোর আগে শুধু একটা কথাই মনে হলো , বাবার একমাত্র মেয়েকে বিয়ে করা সত্যিই চাপের | তিতলির বয়স চব্বিশ হলেও চিন্তাধারা চোদ্দ বছরের ! কি লজিক ! গিফট আর গয়নার কথা ভাবতে ভাবতেই দিন কেটেছে, ফুল সজ্জার কথা তাই মনেই হয়নি ! যাই হোক, কি আর করা যাবে | এই ভাবেই মানিয়ে গুছিয়ে দিন কাটাতে হবে | একমাত্র বউ বলে কথা | কিন্তু ফুলসজ্জার তিনদিন পর অর্নক আর মানাতে পারল না সোফায় | রাত সারে বারোটায় তিতলিকে ঘুম থেকে তুলে রিকুয়েস্ট টা করেই ফেলল , "তিতলি প্লিস, আমি খাটে শুই | তোমার কোনো চিন্তা নেই , আমি এক কোণে ঘুমোবো | মাঝখানে দু দুটো পায়ের বালিশ থাকবে | আসলে এই তিনদিন সোফায় শুয়ে শুয়ে কোমরে ভীষণ ব্যথা ! আর নেয়া যাচ্ছে না |".... ভেবেছিল তিতলি কথাটা শুনে আবার না সেইদিনের মতন কেঁদে ফেলে ! কিন্তু এবার ব্যাপারটা উল্টো হলো , তিতলি সমবেদনার দৃষ্টি দিয়ে অর্নকের দিকে তাকালো , .... "ইশ , আই এম রিয়ালি সরি | তুমি আগে বলনি কেন তোমার কোমরে ব্যথা ! আর আমিও কি ! ওই টুকু একটা সোফায় কেউ ঠিকভাবে শুতে পারে ! সরি , আমার জন্য তোমাকে এই ভাবে কষ্ট করতে হলো | তুমি প্লিস খাটে ঘুমও | আমার কোনো প্রবলেম নেই |".......... কথাটা শুনে অর্নকের মুখে হাঁসি | যাক, বাঁচা গেল | আসলে তিতলি এই তিন দিনে এই অচেনা ছেলেটাকে একটু হলেও চিনেছে ! একে ভালবাসা যায় কি না ,এখনো অব্দি ওর জানা নেই ! তবে ভয় পাওয়ার মতন এই ছেলের মধ্যে একটা লক্ষণ ও নেই | এই সবের দু সপ্তাহ কেটে গেছে | আজ ওরা কলকাতার ফ্ল্যাট এ এসেছে | অর্নক কলকাতা আশুতোষ কলেজ এর প্রফেসর | তাই জলপাইগুড়ি তে আসল বাড়ি হলেও , পেটের দ্বায়ে কলকাতানিবাসী | তিতলিও এর আগে অনেকবারই কলকাতা এসেছে | আত্মীয় , সজনদের বাড়িতে | কিন্তু আজকের আসাটা একটু অন্য | আজ ও এসেছে সংসার করবে বলে | সেইদিন ফ্ল্যাটের দরজা খুলল যখন , ঘড়িতে বাজে দুপুর একটা | অর্নক পাশের হোটেল থেকেই খাবারটা নিয়ে এলো | তিতলি স্রান সেরে খাবার খেয়ে দারুন একটা ঘুম দিয়েছে | সন্ধ্যের পর বারান্দায় এসে রাতের কলকাতার দিকে তাকিয়েছিল ও , হঠাত অর্নকের কথায় সম্ভিত ফিরল , " বল , তাহলে রাতে কি খাবে ? আমি বলি সিম্পেল এর মধ্যে রাখো | চিকেন কারী আর ভাত , শেষ পাতে বাড়ি থেকে আনা লাড্ডু তো আছেই, মিষ্টি মুখের জন্য |" .. বেশ হেঁসেই বলল | তিতলি ঘর দুলিয়ে সম্মতি দিল, "হ্যা, তাই ভালো | চিকেন কারী আর ভাত |"....... কথাটা বলেই আবার আনমনে রাতের কলকাতার দিকে মন দিল | গুনগুন করে গানও শুরু করলো, "ঘরে তে ভ্রমর এলো গুনগুনিয়ে |"....... কিছুক্ষণ বাদে দরজায় বেল বাজলো | দরজা খুলতেই অর্নক হাজির | হাতে এক থলি বাজার , আর একটা প্ল্যাস্টিক এর ভেতর কাঁচা মুরগির মাংস | তিতলি চোখ বড় বড় করে বলল, "এগুলো কি ? এগুলো দিয়ে কি হবে ?"...... অর্নক এক গাল হেঁসেই উত্তর দিল, "আরে বাড়িতে তো আলু ,পিয়াঁজ কিছুই ছিল না ! চিকেন টা রান্না হবে কি দিয়ে ! আমি সঙ্গে আদা রসুন টমেটো ও নিয়ে এসেছি | যাই হোক, নাও এগুলো ধর | বেশ জমিয়ে রান্না কর , হ্যা |" ........... তিতলি শুকনো মুখে উত্তর দিল, " কিন্তু , মানে , আমি তো রান্না পারি না | আমি ভেবেছিলাম তুমি সামনের হোটেল থেকে সকালের মতন চিকেন কারী নিয়ে আসবে |" .... অর্নকের যেন ধাক্কা লাগলো , " কি ! রান্না পারো না মানে ! সেইদিন যখন দেখতে গেলাম, কত কি করেছিলে তো | এচড় আলুর দম, চিংড়ির মালাইকারী | এত তারাতারি সব ভুলে গেলে না কি ?"..... তিতলি নির্বিকার গলায় সত্যবাদী যুধিষ্টির মতন উত্তর দিল , "সেইদিন তো সব রান্না মিনতিমাসী, মানে আমাদের বাড়ির কাজের মাসি করেছিল | আমি তো সারাদিন বসে বসে শুধু সেজেছিলাম , ছেলে দেখতে আসছে বলে কথা |"... অর্নকের তো কথাটা শুনে চোখ কপালে !, " মানে ? সেইদিন যে তোমার মা বাবা বলল সব রান্না পাত্রী করেছে | আমি তো সেই চিংড়ির মালাইকারী খেয়েই হ্যা বললাম |"...... তিতলি মিনমিন করে উত্তর দিল , "সেই জন্যই তো বলেছিল, মিথ্যে কথা | পাত্রী রান্না করতে জানে না শুনলে তো সুপাত্র পটবে না | তাই |" ... না, আর কোনো কথা আসছে না ! অর্নক চুপচাপ গিয়ে সোফায় বসলো | মুখটা এখন থমথমে | এই সব আগে জানলে মিনতিমাসিকেই বিয়ে করত ! কিন্তু এখন তো আর সেটাও সম্ভব না | তাই এই ভুমিকম্পের আফটার শক কাটিয়ে অর্নক রান্না ঘরে গিয়ে গ্যাস জ্বালালো | কলেজ লাইফ থেকে একা থাকার অভ্যেস | তাই রান্নাটাও পারে , চালিয়ে নেয়ার মতন | শুধু এটা ভাবেনি যে বিয়ের পরেও 'চালিয়ে নেয়ার মতন' নিজের হাতের রান্না খেয়েই দিন কাটাতে হবে ! তবে তিতলি সেদিন বলেছে, অর্নকের হাতের চিকেন কারীর না কি দারুন টেস্ট | দিন কাটছে নিজের তালে | অর্নক আর তিতলি কলকাতায় এসেছে দশ দিন হয়ে গেছে | সেইদিন ছিল রবিবার | অর্নক হেলে দুলে ঘুম থেকে উঠে এগারটার পর রান্না চাপিয়েছে | আজকের মেনু রুই মাছের কালিয়া আর ভাত | তবে ব্যাস, ওই রান্না টুকুই ওর দ্বায়িত্ব | কাপড় জামা কাচা তিতলিই করবে | আর বাসন মাজাটা মিউচুয়াল কন্ট্রাক্ট , সেটা দুজনে হাত লাগিয়ে দুটো থালা দিয়ে নেয় | ঠিক ই আছে ! বিয়ে মানে তো 50 /50 | সব সময় একটা মেয়েকেই রান্না করতে হবে কেন ! আফটার অল দেশ স্বাধীন , নারীরা স্বাধীন ! এই সব মহান চিন্তা করতে করতেই অর্নক রান্না শেষ করে বারান্দায় এসে দাঁড়ালো | আর হঠাত বারান্দায় শুকুর দেয়া ওর শার্ট ,আর পাঞ্জাবিটার দিকে চোখ পরে গেল | তিতলি তো সকাল বেলা ওর সাদা শার্ট, পাঞ্জাবি কাচতে নিয়ে গিয়েছিল ! এই সাদা শার্ট , ঘিয়ে রঙের পাঞ্জাবি এই রকম ডিপ নীল রঙের কি করে হলো ? কথাটা ভেবেই অর্নক জোরে জোরে তিতলিকে ডাকলো | তিতলি সাবানের ফ্যানা কপালে হাতে মেখে হাজির | দেখে মনে হচ্ছে যেন বাথরুমে কাপড় জামা কাচ্ছিল না , যুদ্ধ করছিল কারোর সাথে | অর্নক বেশ গম্ভীর ভাবে বলল , " তিতলি ? এটা কি ? এই শার্ট , পাঞ্জাবি এই রকম কি করে হয়ে গেল ?" .. তিতলি বেশ প্রাউডলি উত্তর দিল , " কেন ! বুঝতে পারছ না ? উজালা দিয়ে ধুয়েছি তো | মিনতিমাসিকে তো দেখতাম, কাপড় জামা ডিটারজেন্ট এ দেয়ার পর উজালার জলে ডোবাত | কিন্তু মিনতিমাসী খুব কিপ্টে জানো, কয়েক ফোঁটা উজালা দিত ! তাতে কি হয় বল ! আমি তো আজ হাফ সিসি ঢেলে দিয়েছি | কি ভালো পরিস্কার হয়েছে না ! দেখো |"... কথাটা শুনে অর্নকের যেন কান্নাই পেয়ে গেল | আস্তে গলায় বলল , " সেই , এত ভালো পরিস্কার হয়েছে যে জামার রংটাই বদলে গেল ! তিতলি, প্লিস , বিয়ের পর এটা আমার সেকেন্ড রিকুয়েস্ট , আমার জামা কাপড় দারুন ভাবে পরিস্কার করার দরকার নেই | একটু ডিটারজেন্ট এর জলে ধুয়ে দিও , তাহলেই হবে | আর সেটাও যদি না পারো, তাহলেই ইট'স ওকে , একটু জল ধোয়া করে দিলেও হবে |"....তিতলি কথাটার মাথা মুন্ডু কিছুই বুঝলো না, মুখ বেঁকিয়ে বলল, "তোমার না, কিছুই পছন্দ হয় না | যত সব |"... সময়ের কাঁটা এইভাবেই আস্তে আস্তে এগিয়ে যাচ্ছে | আজ অর্নক আর তিতলির বিয়ের এক মাস পূর্ণ হয়েছে | তিতলি আজ সন্ধ্যেবেলা বেশ সেজেছে | অর্নক অফিস থেকে ফিরে অবাক , তিতলি না কি আজ নিজের হাতে রান্না করেছে ! ডাইনিং টেবিল এ বেশ হাঁসি মুখেই বসলো ও , কে জানে আজ কি আছে মেনু তে ! তিতলি প্রথম রান্না করেছে বলে কথা | একটু ভয় ও লাগছিল, নুন ,ঝাল , মিষ্টি যেন ঠিকঠাক প্রপর্সনে হয় ! নইলে যে খাবে তার রিস্ক | এই সব ভাবতে ভাবতেই তিতলি হাজির, হাতে একটা বাটি | কি রান্না আছে ওই বাটিতে ? অর্নক বেশ আগ্রহ সহকারে বাটির ঢাকনা টা সরালো | আর যেটা পেল সেটা দেখে ও বাকরুদ্ধ | বাটিতে আলু সিদ্ধ মাখা | তিতলি এক গাল হেঁসে বলল, "আজকের মেনু, আলু সিদ্ধ আর ভাত | আজ আমি প্রথম নিজের হাতে আলুর খোসা ছাড়িয়েছি, সেটাকে সিদ্ধ করেছি, তারপর তেল, পেয়াজ কাঁচালংকা দিয়ে জমিয়ে মেখেছি | আর সরি , ভাত টা একটু গলে গেছে ! আসলে প্রেসারে চারটে সিটি বেশি পরে গেছে | যাই হোক, আজ তো সবে শুরু, এরপর আস্তে আস্তে দারুন রান্না শিখে যাবো আমি , সিওর |"... সত্যি এবার তিতলিকে রান্নাটা শেখাতেই হবে | আলু সিদ্ধ আর গলা ভাত খেতে খেতে অর্নক এটাই ভাবছিল | তবে মনে মনে , মুখে কিন্তু আলু সিদ্ধর সুনামে পঞ্চমুখ | তারপর থেকে শনি রবিবার গুলো দুজনের রান্না ঘরেই কাটত | তিতলিকে ধীরে ধীরে আলু ভাজা, ডাল , তরকারী সবই রান্না করতে শিখিয়ে দিয়েছে অর্নক| এখন ৬ মাস কেটে গেছে ওদের বিয়ের | এর মাঝে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল থেকে ইডেন গার্ডেন , এমনকি দীঘা ও দু দিনের জন্য ঘুরে এসেছে ওরা | ফিলিপ্স এর ক্যামেরার দু দুটো রিল শেষ, দীঘাতে ফটো তুলে | উফ,তিতলির কি সাজের বাহার সেখানে, টপ নাট , লিপস্টিক , ববি প্রিন্ট এর শাড়ি | সত্যি কথা বলতে কি , অর্নকের এই রকম সুন্দরী বউকে নিয়ে ঘুরে বেড়াতে লাগে দারুন | বেশ একটা গর্ব হয় নিজের ওপর | ক্যামেরাতে হাত টা বার বার আপনাআপনিই চলে যায় ওর | কেমন যেন মনে হয় আজকাল , মুহূর্ত গুলোকে ধরে রাখতে , একদম নিজের করে রাখতে | এর মধ্যে দূর্গা পুজোর সপ্তমীর দিন তিতলি হঠাত সকালে উঠে অর্নকের হাতে একটা কচি কলা পাতা রঙের শার্ট ধরিয়ে দিল | নিউ মার্কেট ঘুরে ঘুরে না কি কিনেছে ও এই শার্টটা ,অর্নকের জন্য | আজ ওদের অর্নকের মেজ মাসির বাড়ি নেমন্তন্ন , তিতলির আবদার এই শার্টটা পরেই অর্নককে নেমন্তন্ন রক্ষা করতে যেতে হবে | অর্নকও কথাটা শুনে হাঁসি মুখে সম্মতি জানালো | কিন্তু মাসির বাড়ি গিয়ে আরেক কেস, মাসি তো অবাক ! দরজা খুলেই প্রথম কথা, ---- "কিরে অর্নক ? এই কচিকলা পাতা রঙের জামা পরেছিস যে ? মনে আছে দু বছর আগে পুজোতে তোকে এই কলর এর একটা শার্ট এর পিস গিফ্ট করেছিলাম, আর তুই কেমন ফেরত দিয়েছিলিস | তোর না কি এই রং একদম চলে না | আজ নিশ্চই বউ গিফ্ট করেছে | তাই চুপচাপ পরে ঘুরতে বেরিয়েছিস , কিরে তাই না ?"...কথাটা শুনে অর্নক চুপ আর তিতলির মুখটা ফ্যাকাসে | সেই রাতে তিতলি ওকে জিজ্ঞাসা করেই ফেলল , "তোমার যখন এই রংটা পছন্দ ছিল না, তখন আমাকে বললে না কেন ? আমি চেঞ্জ করে আনতাম |"... অর্নক সেইদিন তিতলির চোখে চোখ রেখে বেশ দৃঢ় গলায় উত্তর দিয়েছিল, --- "আসলে সবাইকে না বলতে পারি , কিন্তু তোমাকে না বলাটা ঠিক আসে না | আর আজ থেকে কচিকলা পাতা রংটা আমার খুব পছন্দের |".... কথাটা শুনে তিতলি লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিয়েছিল | আর কোনো কথা খুঁজে পায়নি উত্তর দেয়ার মতন | এখন জ্যানুয়ারী মাস | ১৯৯০ সাল এসে দরজায় করা নেড়েছে | তিতলি কিছুদিনের জন্য জলপাইগুড়ি এসেছে বাপের বাড়িতে | যদিও মনটা কলকাতাতেই পরে আছে | এই দু দিনে একটা চিঠিও লিখে ফেলেছে , আজ যাবে পোস্ট অফিস, পোস্ট করতে | এইসবই ভাবছিল তখনই কলিং বেলটা বেজে উঠলো | এখন সকাল ৮ টা বাজে, এত সাত সকালে কে এলো আবার ! এই সব ভাবতে ভাবতেই মায়ের গলার আওয়াজটা কানে এলো | --- " আরে জামাই এসেছে রে , তিতলির বাবা, কি গো , তুমি কোথায় আছ ? দেখো কে এসেছে !"... তিতলি কথাটা শুনে লাফাতে লাফাতে ড্রইং রুমে গিয়ে পা টা থমকে গেল | সামনে কলকাতায় ফেলে আসা চেনা মুখটা হাজির | অর্নকও স্থির দৃষ্টি তে তিতলির দিকে তাকিয়ে , মুখে একটা লাজুক হাঁসি | এই দৃশ্য দেখে শাশুড়ি মা বলেই ফেলল , --- "বুঝতেই পারছি , জামাই তো বউকে ছাড়া দু দিন ও থাকতে পারে না | কি টান |" ... তিতলি সেদিন ছাদে দাঁড়িয়ে বলে উঠলো , " ইশ , মা বাবা কি ভাবলো বল তো ? আমি তো আজই চিঠি পোস্ট করতাম | আর তুমি যে এই ভাবে হঠাত চলে এলে , কলেজ এ ছুটি পেতে অসুবিধা হলো না ?".... অর্নক বেপরোয়া ভাবে তিতলির হাতটা শক্ত করে ধরে উত্তর দিল, " ধুর, যা ভাবে ভাবুক | আমার কি ! আমি তো আর অন্য কারোর বউ এর সাথে দেখা করতে আসিনি | আর ওই ফ্ল্যাট এ একা থাকার অভ্যাস আমার শেষ হয়ে গেছে | ভীষণ খালি খালি লাগে | তাই কলেজ এ এপ্লিকেসন দিয়ে চলে এলাম |" ...... আজ বছর পার হওয়ার দিন | ২৯ শে এপ্রিল | তিতলি আর অর্নকের বিবাহ বার্ষিকী | দুজনেই সকাল সকাল রেডি হয়ে নিয়েছে, বেশ সেজে গুজে | অর্নক তো বিয়ের সেই তসরের পাঞ্জাবিটা পরেছে | তিতলি সেজেছে লাল রঙের তাতের শাড়ীতে | দক্ষিনেশ্বর এর মন্দিরে পুজো দিতে যাবে | তারপর সিনেমা দেখে , হোটেল এ খেয়ে বাড়ি ফেরা , সারা দিনের প্ল্যান | সবই ঠিক চলছিল সকাল থেকে , কিন্তু হঠাত মাঝ রাস্তায় স্কুটারটা বিগড়ে গেল | আগের বছরই এই সেকেন্ড হ্যান্ড বাজাজ স্কুটারটা কিনেছিল অর্নক | এই বিবাহ বার্ষিকীর দিন যে এই ভাবে ভোগাবে এটা কে জানত ! কিছু দূর গিয়ে গ্যারেজ | তসরের পাঞ্জাবি ঘামে একেবারে ভিজে গেছে স্কুটার ঠেলতে ঠেলতে | আর সঙ্গে আবার সুন্দরী বউ | রাস্তার সব লোকেরা ওদের দিকে তাকিয়ে | এত লজ্জা লাগছিল অর্নকের | তার ওপরে রাস্তার কিছু দুষ্টু বাচ্চা অব্দি ওদের আওয়াজ দিল , " দাদার গাড়ি বিগড়ে গেছে, দাদার গাড়ি বিগড়ে গেছে |" ... উফ, সকালবেলা কার মুখ দেখে যে উঠেছিল ! যাইহোক গাড়ি ঠিক হওয়ার পর দক্ষিনেশ্বর এ পুজো দিয়ে গঙ্গার ধরে বসেছে ওরা | অর্নকের মুখ ভার | সকালের ঘটনাটা ভুলতেই পারছে না ! তিতলি আর চুপ করে না থেকে বলেই ফেলল, --- " কি হয়েছে তোমার ? এত দুঃখ কিসের ?"... অর্নক মুখ ভার করেই উত্তর দিল , --- " ধুর , আজ যা হলো সকালে ! আমার ওই স্কুটার এর জন্য তোমারও লজ্জা | সরি তিতলি, আর তিন মাস সময় দাও, এইবার পুজোতে একটা নতুন স্কুটার কিনবই |".... তিতলি কথাটা শুনে হেঁসে ফেলল ,-- " কে বলল তোমাকে আমার লজ্জা লেগেছে ! আর আমি তো নিজের জীবনে টাটা বিরলা আম্বানিকে চাইনি | আমি তো প্রথম থেকেই এই রকম স্কুটার অলা চশমা পরা একটা মিষ্টি বর চেয়েছিলাম | সেটা পেয়ে গিয়েছি , ব্যাস, যথেষ্ট | আর আমার নতুন স্কুটার চাই না |"... কথাটা বলেই অর্নকের কাঁধে নিজের মাথাটাকে এলিয়ে দিল | এক বছর আগের দুটো অজানা অচেনা মন , আজ ৩৬৫ দিনের ব্যবধানে , খুব চেনা , খুব কাছের | প্রেম ওদের জীবনে এসেছে, সাত পাকে বাঁধা হয়ে যাওয়ার পর , অন্য স্বাদে , অন্য রূপে | ওরা কিন্তু নিজেদের পঁচিশ বছরের বিবাহ বার্ষিকীতেও দক্ষিনেশ্বর এর মন্দিরে গিয়ে পুজো দিয়েছে | তবে সেবার শুধু দুজন না, তিন জন মিলে | অর্নক আর তিতলির একমাত্র মেয়ে তমালিকার সঙ্গে | তবে বয়স বাড়লেও, প্রেমটা কিন্তু এখনো ওদের জীবনে একেবারে নতুন | ঠিক ২৫ বছর আগের মতন |


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৫৯ জন


এ জাতীয় গল্প

→ ওগো বধু সুন্দরী

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now