বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
অচেনা।
মেয়েটার কথা_
মেয়েটা প্রতিদিনই বিকেলের সময়টা থেকে বাসায় থাকে। তার বন্ধুবান্ধব নেই খুব বেশি,তাই পড়াশোনা বাদে ব্যস্ততাও নেই কোনো।বিকেলের সময়টা তার কাটে দোতলা বাসার বারান্দাতেই। বারান্দার একটা পাশ সে ভর্তি করে ফেলেছে একেকটা ফুলগাছ,আর গ্রিল বেয়ে লতানো গাছে। অন্যপাশটায় রাখা একটা বেতের চেয়ার,যেখানে বসাটা তার প্রতিবিকেলের রুটিন। বারান্দা থেকে সামনের খোলা মাঠটা দেখা যায়। মেয়েটা এর আগে কখনো মাঠটার দিকে আলাদাভাবে খেয়াল করেনি।
বছর দেড়েক আগেকার কথা... মেয়েটা সেদিনও বেতের চেয়ারটাতে বসে ছিলো।মাঠে সেদিন একদল ছেলে ক্রিকেট খেলছিলো। হঠাৎ ব্যাটের বাড়ি খেয়ে বলটা ধাঁ করে এসে পড়লো মেয়েটার কোলের ওপর,আরেকটু হলেই মাথায় পড়তো। প্রচন্ড রেগে গিয়ে মেয়েটা উঠে দাঁড়াতেই দেখে,ব্যাট হাতে ছেলেটা শান্তচোখে তার দিকে তাকিয়ে।চোখাচোখি হতেই ছেলেটা কান ধরে নিজের দোষটা স্বীকার করে নিয়েছিলো সেদিন। রাগতে গিয়েও আর রাগতে পারেনি মেয়েটা। ব্যাপারটা যেন এমন ছিলো,যুদ্ধ শুরুর আগেই ছেলেটা আত্মসমর্পণ করে নিয়েছিলো!....অনেকক্ষন বাদে যখন মেয়েটা অন্যমনস্কতা থেকে বাস্তবে ফিরে বলটা ফেরত দিতে যাবে,তখন দেখলো ছেলেরা অন্য একটা বল দিয়ে খেলতে শুরু করেছে। কোলের ওপর রাখা বলটা রেখে দিলো মেয়েটা,নিজের পড়ার টেবিলের ড্রয়ারে। কেন রাখলো? কে জানে!
সেদিনের এইটুকু কথা পরে মেয়েটা এতোবার ভেবেছে,এতো এতোবার ভেবেছে,যে একেকবার নিজের ওপরই রাগ হয়েছে তার। এতোদিন তো কোনো ছেলে কখনো তার চিন্তায় জায়গা পায়নি...তাহলে এবারে কি হলো?কি ছিলো সেই চোখাচোখিতে? জানেনা সে। শুধু জানে,এরপরের প্রতিটা বিকেল এসেছে একরাশ অপেক্ষা নিয়ে। প্রতি বিকেলেই বারান্দায় বসতে গিয়ে অচেনা লাগতো নিজেকে। কয়েকদিন পর আবিষ্কার করলো,ছেলেটা প্রতিদিন খেলতে আসেনা। আসে কেবল সপ্তাহে নির্দিষ্ট দুটো দিন।তারপরও...প্রতি বিকেলে মেয়েটা বসে থাকে,যদি সে চলে আসে বাড়তি আরেকটা বিকেলে খেলতে!
এভাবেই দেড়বছর পেরিয়েছে। ছেলেটা মেয়েটার চেয়ে বয়সে দু-তিন বছরের বড়ই হবে বোধহয়। এরপরও কয়েকবার চোখাচোখি হয়েছে,কখনো কথা হয়নি,হবার সম্ভাবনাও নেই। কিন্তু কল্পনা তো থামানো যায়না! ছেলেটার ব্যাপারে মেয়ে কিছুই জানেনা,অথচ কল্পনার রাজ্যে এই ছেলেরই অবাধ বিচরন! নিজের ওপর বিরক্ত হয় মেয়ে,অথচ কল্পনাগুলো থামাতে পারেনা...।
আজ ক্লাস শেষে ক্লাস নাইনের ছাত্রীটাকে পড়িয়ে বাসায় ফিরছিলো মেয়েটা। যদিও এখান থেকে তার বাসা কাছেই,তারপরও রিকশা নিলো। কেননা আকাশ দেখে মনে হচ্ছে বৃষ্টি হবে। অদ্ভুত ব্যাপারটা হলো,রিকশাতে উঠতেই বৃষ্টি নেমে গেলো রিকশা একটু আগাতেই দেখে,একটু সামনেই একটা ছেলে ইতস্ততঃ দাঁড়িয়ে। বোধহয় ভিজতে চাইছেনা,আবার আশেপাশে কোনো ছাউনিও নেই যে সেখানে দাঁড়াবে।একটু খেয়াল করতেই মেয়েটা বুঝতে পারলো,এটা সেই ছেলেটা,যে সারাদিনরাত তার কল্পনাতে ঘুরপাক খায়!
কি করবে তা বুঝতে পারছিলো না মেয়েটা।এসময় দেখে,পাশের ফুটপাত দিয়ে একটা পিচ্চিছেলে হেঁটে যাচ্ছে,গা উদোম। রিকশাটাকে দাঁড় করিয়ে পিচ্চিটাকে ডেকে তার হাতে একটা নোট গুঁজেদিয়ে মেয়েটা বললো,
-এই টাকাটা তুমি রাখো। আর এই ছাতাটা,ওই যে হাঁটছে,নীলশার্ট পরা ছেলেটাকে একটু দিয়ে দাও,কেমন?
পিচ্চি ছেলেটা ঘাড় নেড়ে সায় দিয়ে ছাতাটা নিয়ে দৌঁড় দিলো ছেলেটার দিকে।
মেয়েটা রিকশায় থেকে নিজেকে আড়াল করে দেখলো,ছেলেটা ছাতাটা হাতে নিয়েছে।...যাক,ও তাহলে ভিজে ঠান্ডা লাগাবেনা....শান্তি! নিজের অজান্তেই হেসে ফেললো মেয়ে!!
ছেলেটার কথা_
ছেলেটা ভীষন চঞ্চল। ক্লাস-আড্ডা-বাসা যেখানেই থাকুক না কেন,সবজায়গা সে একাই মাতিয়ে রাখে সবসময়। সে প্রেমে বিশ্বাসী না,তার বন্ধুরা প্রায় সবাই প্রেম করে,এবং সে দিনরাত তাদের ক্ষেপাতে থাকে। সপ্তাহে পাঁচদিন তার বিকেল পর্যন্ত ক্লাস থাকে ভার্সিটিতে,সুতরাং দুটো দিন সে বিকেলে খেলতে মাঠে যায়। সবকিছু ঠিকঠাকই ছিলো,বাঁধ সাধলো একটা বিকেলের ছোট্ট একটা ঘটনা। খেলতে গিয়ে বলটা কিভাবে সামনের দোতলার বারান্দায় পড়ে। ছেলেটা ভয়ে ভয়েই বারান্দার দিকে তাকিয়েছিলো,কে জানে কারো গায়ে পড়লো কিনা! এসময় বলটা নিয়ে একটা মেয়ে বারান্দার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো....কতোটা সময় গিয়েছে তারপর? জানেনা ছেলেটা। কিন্তু মেয়েটার ওই রাগী,গম্ভীর মুখটা দেখে কয়েকমুহূর্তের জন্য তার পৃথিবীটা থেমে গিয়েছিলো। শুধু সৌন্দর্য না,গাম্ভীর্য মেয়েটার চেহারায় এমন একটা অসাধারনত্ব এনে দিয়েছে,যেটা ছেলেটা অন্য কোনো মেয়ের মাঝে কখনো দেখেনি। কানধরে স্যরিটা সে বলেছিলো পুরোপুরি যেন ঘোরের মাঝে। সেদিন আর বাকি সময়টা সে খেলাতে মনোযোগ দিতে পারেনি। এরপর যখনই সে খেলতে গিয়েছে,মাঝেমাঝেই তাকিয়েছে বারান্দাটার দিকে। বই কোলে নিয়ে মেয়েটাকে দেখেছে প্রতিবারই। অদ্ভুত মেয়ে,একটাবার সোজাসুজি বাইরে তাকায়না কেন! ছেলেটা জানেনা এই অনুভূতিকে কি বলে। শুধু জানে,মেয়েটা অসাধারন।.... মেয়েটার চোখের চশমাটা সরিয়ে একটাবার তাকে কাছ থেকে দেখা যেতো যদি!!
আজ হঠাৎই বৃষ্টি নেমে গেলো। ছেলেটা ভিজতে চাইছিলোনা,তার ভীষন ঠান্ডার ধাত। এমনসময় একটা পিচ্চিছেলে দৌঁড়ে এসে একটা ছাতা তার হাতে দিয়ে বললো,
-ভাই,এইটা আপনারে দিসে
-কি বলো! কে দিলো?
-ওইযে রিকশায় বসা একটা আফা।
ছেলেটা যথেষ্টর বেশি অবাক হলো,তাকে আবার আড়াল থেকে কোন মেয়ে ছাতা দেবে....সেটা ভাবতে ভাবতেই ছাতাটা মাথায় নিয়ে বাড়ির দিকে ফিরতে থাকলো,কেননা বৃষ্টির বেগ বাড়ছে।
কয়েকদিন পরের কথা... মেয়েটা দ্রুতপায়ে ছাত্রীর বাসার সামনে এসে কলিংবেল টিপলো। আজ তার পৌঁছতে একটু দেরি হয়ে গিয়েছে। বাসার দরজাটা যে খুললো,তাকে দেখে মেয়েটা এতোটাই হতভম্ব হয়েছিলো যে হয়তো পড়েই যেতো! কোনোমতে মেয়েটা বললো,
-আপনি এখানে?
দরজাটা যেই ছেলেটা খুলেছিলো সেও যথেষ্ট অবাক হয়েছিলো। সেও বললো,
-আপনি এখানে?
বলাবাহুল্য,দুজনে প্রশ্নটা একইসাথে করেছিলো।
-আসলে আমি...
এবারও একসাথে বলা হয়ে গিয়েছে! ছেলেটা থেমে গিয়ে মেয়েটাকে আগে বলতে বললো। তখন মেয়েটা বললো,
-আমি আসলে অরনীকে পড়াতে আসি। কিন্তু আপনি?
-আমি অরনীর বড়ভাই। ও তো বাসায় নেই...আম্মুর সাথে একটা দাওয়াতে গিয়েছে। আপনাকে বোধহয় কল দিয়েছিলো,কিন্তু আপনার ফোনটা সুইচঅফ ছিলো।
-ওহ! হ্যা...ফোনে চার্জ ফুরিয়ে সুইচঅফ হয়ে গিয়েছে।
-কিছু মনে করবেননা,একটা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে পারি?
-জ্বি বলুন?
-আমি দরজা খুলতেই আপনি এতোটা চমকে গিয়েছিলেন কেন? আপনাকে দেখে তখন মনে হচ্ছিলো আপনি আমাকে আগে থেকেই চিনতেন...
একটু চুপ করে থেকে মেয়েটা তখন বললো,
-একই প্রশ্ন তো আমিও আপনাকে করতে পারি!
-হুম...হা হা! আচ্ছা একটা অনুরোধ,আমরা কি এখন কোনো একটা কফিশপে বসতে পারি? আসলে বাসায় কেউ নেই তো...মানে আমি বুঝতে পারছি আপনি হুট করে অপরিচিত কারো সাথে কোথাও বসেননা,কিন্তু আমরা তো একে অন্যের মুখ চিনি....তো...প্লিজ?
মেয়েটা ঘাড় নেড়ে সায় দিলো। পুরোবিকেলটা সেদিন কেটেছিলো একসাথে। ফোন নাম্বারও দেয়ানেওয়া হয়েছিলো,যদিও কেউ কাউকে নিজ থেকে কল দেয়নি...হয়তো ইগো বাঁধা দিচ্ছিলো! সেদিনের মতো এতো অল্পসময়ে এতো কাছাকাছি বোধহয় দুজনের কেউই অন্য কারো সাথে হয়নি।
যোগাযোগ ছাড়া পার হয়েছে আরো কিছুদিন।১৩ফেব্রুয়ারী,পহেলা ফাল্গুনের সকালে মেয়েটার ফোনে একটা ক্ষুদেবার্তা এলো ছেলেটার লেখা।
"আজকের বিকেলটা আমায় দিতে পারবেন কি?সেদিনের জায়গাটায় অপেক্ষা করবো।"
কাঁপাকাঁপা পায়ে মেয়েটা কফিশপে ঢুকলো।... হ্যা,সেদিনের ওই টেবিলেই ছেলেটা বসে আছে।
কয়েকমুহূর্ত দুজনেই চুপ।
ছেলেটাই প্রথম কথা বললো,
-আমি আপনাকে প্রথম দেখেছিলাম বছর দুই আগে,সেদিন আমি ক্রিকেট খেলতে গিয়ে আপনার বারান্দায় বল ফেলেছিলাম। আপনার হয়তো মনে নেই...সেদিন থেকে আপনাকে চেয়েছি,কতোটা চেয়েছি তা বোঝাতে পারবোনা...
বলেই পাশে রাখা ব্যাগ থেকে একটা ছাতা বের করে ছেলেটা আবার বললো,
-বুঝতে পেরেছিলাম সেদিন এটা আপনিই আড়ালে থেকে দিয়েছিলেন...ছাতাটা ধরে আমার পাশে থাকবেন কি,সারাজীবনের জন্য?
মেয়েটা চুপ। একসময় বললো,
-আমি ছাতা নিয়ে থাকবো পাশে,কিন্তু আপনি কিন্তু ভুলেও আমার বারান্দায় বল মারবেননা। তাহলে ছাতা সরিয়ে আপনাকে নিয়ে বৃষ্টিতে ভিজবো,বলে দিলাম!
বলতে বলতে ছেলেটার হাতে একটা বল ধরিয়ে দিলো মেয়েটা।
...হ্যা,এই বলটাই দু'বছর আগে ছেলেটার ব্যাটে লেগে মেয়েটার কোলে পড়েছিলো!
[note: গল্পে ছেলেটা বা মেয়েটা কারোরই নাম দেয়া হয়নি,প্রয়োজনবোধে নাম দেয়া যেতে পারে। মেয়েটার নাম দ্বিতীয়া,ছেলেটার নাম তুর্য। ]
লেখা_shuchita moumi
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now