বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

অবরুদ্ধ জীবনের গল্প-পর্ব-৫

"জীবনের গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মাজহারুল মোর্শেদ (০ পয়েন্ট)

X লেখকের নাম- মাজহারুল মোর্শেদ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প-পর্ব-৫ সকালবেলা মঈন উদ্দিন মেম্বার, তফিজুল মেম্বার, সাবুবর প্রামাণিক, রেজানুন প্রধান, মজিবর রহমান, নজরুল ইসলাম সরকার, আব্দুল কাদেরসহ বেশকয়েকজন মাণ্যগণ্য ব্যক্তি যেয়ে উপস্থিত হয় ওমর আলি প্রধানের বাড়িতে। বসার ঘরে ওমর আলি প্রধান, শামসুল মাস্টার আর মুনাজাত উদ্দিন সাংবাদিক চা খেতে খেতে বিভিন্ন রকম গল্পগুজব করছেন। গ্রামের চিন্তাশীল মানুষগুলোকে একসাথে দেখে ওমর আলি প্রধানের বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। তাই আর এক মুহুর্ত দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করে বসে, কি বাহে মঈন উদ্দিন? কোথাও কোন সমস্যা হয়েছে না কি? না চাচা তেমন কোন কিছু হয় নি, এমনিতেই আমরা আসলাম সাংবাদিক ভাইও আছেন আমরা সবাই মিলে একটু গল্পগুজব করি। খুব ভালো করেছেন বাবা, তবে তোমাদের সবাইকে একসাথে দেখে আমি একটু ভয়ে পেয়ে গেছিলাম যে না জানি আরো কোথাও কোন দুর্ঘটনা ঘটল কি না। তফিজুল মেম্বার বলেন- হ্যাঁ চাচা সেটা অস্বাভাবিক কিছু না, বর্তানে গ্রামের যে অবস্থা তাতে সেটা আসাই স্বাভাবিক। মজিবর রহমান বলেন যে, দাদু গতকাল সন্ধ্যায় মোনাজাত উদ্দিন ভাইকে পাঠিয়ে দিয়ে আমরা কোন ভাবেই স্বস্তি পাচ্ছিলাম না। তাই ভোরের দিকে রেজা চাচা সহ আমরা বেশ কয়েকজন চলে আসলাম। মোনাজাত উদ্দিন সাংবাদিক বলেন- ভাই আমি আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি আপনাদেরকে দেখে। আপনারা এ গ্রামটাকে নিয়ে যেভাবে ভাবেন, এ দেশের শতকরা দশজন মানুষও যদি দেশটাকে নিয়ে এভাবে ভাবতেন তাহলে আমাদের দেশটা সত্যি সোনার বাংলায় পরিনত হয়ে যেতো। আসলে আমি মর্মাহত। এখানকার সহজ সরল ও সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষগুলো কি অসহায়-মানবেতর জীবন যাপন করছে, সেটা আমরা কেউ জানি না। রেজানুর রহমান প্রধান বলেন- মুনাজাত ভাই, সত্যিই-পরিচয়ে আমরা বাংলাদেশী অথচ আমাদের থাকতে হয় ভারতের ভেতরে। আমাদের চারিদিকে ভারত, বেরুবার কোন পথ নেই। বাস্তবে আমাদের কিছু নেই, আমরা দেশহীন, নাগরিকত্বহীন। আমাদের প্রতি কোন দেশেরই দায়-দায়িত্ব নেই, কর্তব্য নেই। এখানে বেঁচে থাকতে হলে ভারতের মর্জি অনুযায়ী থাকতে হয়। কারণ ভারতের হাট বাজারে গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগী সহ উৎপাদিত পণ্যদ্রব্য বিক্রয় করতে হয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যদ্রব্য যেমন লবণ, কেরসিন, চাউল-ডাল, ঔষধ-পথ্য সব ভারত থেকেই আনতে হয়। ওসুখ-বিসুখে জীবন বাঁচাতে ভারতের হাসপাতালে যেতে হয়। এখানকার নব্বই শতাংশের বেশী মানুষ অক্ষর জ্ঞান শূন্য। কারণ এখানে কোন স্কুল, কলেজ নেই, সরকারি খাতায় কলমে যদিও দু’একটা প্রাইমারি স্কুল ছিল কিন্তু বাস্তবে সেগুলোর কোন অস্তিত্ব নেই। স্কুল আছে তো ঘর নেই, ঘর আছে তার খুঁটি নেই এমন অবস্থা। স্কুলগামি ছেলে-মেয়েরা হয় মা-বাবার সাথে কাজ করে, নয়তোবা সারাদিন দলবেঁধে খেলা করে। এসব ছেলে-মেয়েদের কোন ভবিষ্যত নেই। একের পর এক সরকার আসে, সরকার যায় কিন্তু আমাদের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয় না। আমরা নিজেই নিজের ভাগ্যের রেখাকে খুব কাছ থেকে স্পষ্ট দেখতে পাই, আমাদের যাপিত জীবনের সুখ-দুঃখ, আনন্দ ও বেদনা সন্ধ্যাকাশের তারার মতো জ্বলে আর নেভে। দিনের পর দিন এভাবে ভাগ্যের সাথে লুকোচুরি খেলতে খেলতে জীবনে বেঁচে থাকার ইচ্ছেগুলো আমাদের ¤øান হয়ে যায়। শুধু ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা ভেবে আমাদের বেঁচে থাকতে হয়। একটা শিশু জন্মের পর যখন বুঝতে শিখে, অক্ষর জ্ঞানের জন্য তাকে “মোহন মদন তর্কালঙ্কার” শিশু শিক্ষা বই পড়তে হয়, একটু বড় হয়ে যদি তার পড়া-শোনা করার ইচ্ছে থাকে তাহলে পাশ্ববর্তী ভারতের ধাপড়ার হাট কিংবা মেখলীগঞ্জের স্কুলে তাকে যেতে হয়। স্বাভাবিক কারণে সে তার নিজ দেশের নাম ভারতই জানবে। তারপর হয়তো একনি বড় হয়ে যে সে জানতে পারে যে, না-তার দেশের নাম ভারত নয়, বাংলাদেশ। হঠাৎ তার চোখের সামনে, বুকের ভেতর এতোদিনের লালন করা মানচিত্রটি বদলে যায়। ওমর আলি প্রধানকে উদ্দেশ্য করে সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিন বলেন- চাচা অনেকদিন ধরে এই ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতার কথা শুনে আসছি কিন্তু বাস্তবে দেখা হয় নাই। আপনাদেরকে পেয়ে আমার ধারণাটাই বদলে গেলো। উনিশ শ’সাতচল্লিশ সালে অখÐ ভারত বিভাজনের ফলে ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতার উৎপত্তি হয় অথচ এতদিনও সেটার কোন সুরাহা হচ্ছে না আমি যা জানি তাতে ভারত সরকারের অবহেলাই এর জন্য দায়ি। ওমর আলি প্রধান বলেন- আপনাার ধারণা অনেকটাই ঠিক, এটার পিছনে আরোও অনেক জটিলতা আছে যা বলতে গেলে অনেক সময় লাগবে। অখÐ ভারত বিভাজনের পর ছিটমহগুলোর উৎপত্তি অনেকটা বিচিত্রভাবে। উনিশ শ’সাতচল্লিশ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে “ইণ্ডিয়ান ইনডিপেডেন্ট এ্যাক্ট-উনিশ’শ সাতচল্লিশ” পাস হলে ভারত ও পাকিস্তান নামে যে পৃথক দু’টি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। নব গঠিত স্বাধীন রাষ্ট্রে দু’টির কেহই জানতো না তাদের সীমানা কোথায়? এ সমস্য দূরিকরণের জন্য তৎকালিন-অখণ্ড ভারত বর্ষের গভর্নরের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন লর্ড-লুই মাউণ্ট ব্যাটেন। তিনি গ্রেট বৃটেনের বিশিষ্ট আইনজীবী স্যার সিরিল জন রেডক্লিফ’কে সভাপতি করে “উনিশ’শ সাতচল্লিশ সালের তিন জুন” “পাঞ্জাব বাউণ্ডারি কমিশন” ও “বেঙ্গল বাউণ্ডারি কমিশন” গঠন করেন। এ কমিশনের অন্যান্য সদস্যরা হলেন- বিচারপতি বিজান কুমার মুখার্জী --ইণ্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস। বিচারপতি চারু চন্দ্র বিশ্বাস- ইণ্ডিয়ান-ন্যাশনাল কংগ্রেস। বিচারপতি আবু সালেহ মোহাম্মদ আকরাম- মুসলিমলীগ। বিচারপতি শেখ আব্দুর রহমান --- মুসলিমলীগ। স্যার সিরিল জন রেডক্লিফ ছিলেন গ্রেট বৃটেনের একজন আইনজীবী। তিনি আট জুলাই, উনিশ’শ সাতচল্লিশ প্রথম ভারত বর্ষে আসেন। এরপর এ গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করার জন্য তিনি সময় পান মাত্র পাঁচ সপ্তাহ। এতো অল্প সময়ে ভারত বর্ষেও মতো একটি বিশাল দেশকে সরজমিনে না দেখে কিভাবে ভাগ করা সম্ভব? হাজারও অনিচ্ছা সত্বেও তাকে কাজটি করতে হয়। প্রখমত দেশের সীমানা নির্ধারণের মতো কাজে তার কোন জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা ছিল না। আর যে দেশটির সীমানা নির্ধারণের দায়িত্ব তার উপর ন্যান্ত হয়, সে দেশটি সম্পর্কে তার কোন ধারণা ছিলো না। দ্বিতীয়ত পদেপদে ইণ্ডিয়ান কংগ্রেস ও মুসলিমলীগের মতানৈক্য এবং নেহেরু ঘেঁসা লর্ড-লুই মাউণ্ট ব্যাটেন এর অনৈতিক হস্তক্ষেপে তিনি স্বাধীনভাবে কাজও করতে পাচ্ছিলেন না। তাই দায়সারা ভাবে সরজমিনে না দেখে দ্বিজাতি ত্বত্বের ভিত্তিতে (হিন্দু-মুসলিম অঞ্চল ভেদে) নিজের খেয়াল খুশিমত তিনি মাত্র ‘চুয়াত্তর’ দিনে (বারো আগষ্ট, উনিশ’শ সাতচল্লিশ) ভারতবর্ষের মত একটি বিশাল দেশকে দ্বিখণ্ডিত করে ফেলেন। দ্বিজাতি ত্বত্বের ভিত্তিতে ভারত-পাকিস্তান ভাগের সময় সমস্যা বাঁধে জম্বু ও কাশমির এবং কুচবিহারকে ঘিরে। কুচবিহারের রাজা জগদ্দীপেন্দ্র নারায়ণের কিছু জমিদারি স্বত্বছিলো বৃহত্তর রংপুর ও দিনাজপুর জেলার আওতাধীন রাজ্যের বাইরে বিভিন্ন থানা পঞ্চাগড়, ডিমলা, দেবীগঞ্জ, পাটগ্রাম, হাতিবান্ধা, লালমনিরহাট, ফুলবাড়ি ও ভূরুঙ্গামারিতে অবস্থিত। অপর দিকে রংপুর ও দিনাজপুরের জমিদারদের অনেক তালুক ও জোত ছিলো কুচবিহার সীমানার মধ্যে। ভারত ভাগের পর ঐ আটটি থানা পূর্বপাকিস্তানের অন্তর্ভূক্ত হয়, আর কোচবিহার যুক্ত হয় ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাথে। ফলে উভয় দেশের রাজাদের এ তালুক ও জোতগুলো অমিমাংসিতই থেকে যায় এবং ছিটমহলে পরিণত হয়। ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের উৎপত্তির সময় থেকেই সেগুলোর বর্তমান অবস্থা সৃষ্টি হয়। লাখ লাখ মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িত সীমানাভাগের মতো এতো স্পর্শকাতর ও জটিল কাজটি করা হয়েছিল সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা ছাড়াই। সীমানা নির্ধারণ-সংক্রান্ত কোনো অভিজ্ঞতাও কাজে লাগানো হয়নি। সীমানা কমিশনের ‘টার্মস অব রেফারেন্স’-এ স্যার রেডক্লিফকে ‘সংলগ্ন সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকার ওপর ভিত্তি করে সীমানা আকার নির্দেশনা দেওয়া হয়; আবার ‘অন্যান্য বিষয়’ ও বিবেচনা করতে বলা হয়, যা প্রকৃত প্রস্তাবে সীমানা নির্ধারণের কাজকে দুরূহ করেছিল। কারণ, এই পদগুলো ছিল অসংজ্ঞায়িত এবং যেহেতু কমিশনের হিন্দু ও মুসলমান সদস্যদের মধ্যে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানোর মতো কোনো পরিবেশ ছিল না, সেহেতু স্যার রেডক্লিফ একক সিদ্ধান্তে যা করেছেন, তারই ফলাফল হল ছিটমহলসহ ভারত-বাংলাদেশ ও ভারত-পাকিস্তানের মাঝে বিদ্যমান বহুবিধ সীমান্ত সমস্যা। বাস্তবতাবিবর্জিত স্যার রেডক্লিফকে ‘ডক্লিফ সীমানারেখা’ সীমান্ত অঞ্চলের জনজীবনকে সবদিক থেকেই চরমভাবে ব্যাহত করে। কৃষক ও কৃষি শ্রমিকের অর্থনৈতিক জীবনে নেমে আসে এক মহাবিপর্যয়। অনেকের বসতভিটা পড়ে এক দেশে আর চাষের জমি বা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান পড়ে আরেক দেশে। ফলে দেশভাগ-পরবর্তী সামপ্রদায়িক দাঙ্গার বাস্তবতায় সেই মানুষগুলো বসতভিটা আগলে রাখবে না চাষের জমি বা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান আগলে রাখবে, তা নিয়ে ভয়ঙ্কর এক উভয় সংকটের মুখোমুখি হয়। তাদের এ-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে রাতের আঁধারে। কারণ, তখন দাঙ্গার হাত থেকে জীবন বাঁচানোই ছিল কঠিন। তা ছাড়া নিকটতম প্রতিবেশীরা, যারা যৌথ পেশায় নিয়োজিত ছিল অথবা জীবিকার জন্য একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল ছিল, তারা রাষ্ট্রীয় সীমানারেখা দ্বারা রাতারাতি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, বিপর্যয় নেমে আসে ছিটমহলের মানুষদের জীবনে। ছিটমহলগুলোকে রাষ্ট্রীয় সীমানার বাইরে রাখার ফলে ছিটমহলের বাসিন্দারা এক দেশের নাগরিক হয়েও আবদ্ধ হয়ে পড়ে অন্য দেশে। সীমানারেখা চাপিয়ে দিয়ে যে মানুষগুলোকে রাতারাতি ভাগ করে ফেলা হয়েছিল, বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল স্থাবর সম্পত্তি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, কর্মসংস্থান এবং পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে, জীবনের প্রয়োজনেই তাদের সীমানার এপার-ওপার যাওয়া আসা অব্যাহত ছিল দেশভাগের পরেও। কিন্তু পরস্পর বৈরী রাষ্ট্র দুটির কর্ণধারেরা সাধারণ মানুষের জীবনের প্রয়োজনে সে যাওয়া-আসা মেনে নেয়নি। ফলে সীমান্তে শুরু হয় ভারতের বি.এস.এফ ও পাকিস্তানের রেঞ্জার্সের সশস্ত্র পাহারা। জীবনের তাগিদে এপার-ওপার করা মানুষের ওপর শুরু হয় সশস্ত্র সীমান্তরক্ষী বাহিনীর নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। এভাবেই উভয় রাষ্ট্রের সীমান্ত অঞ্চলে অবস্থিত ছিটমহলগুলো নিজ নিজ রাষ্ট্র থেকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশদের দু’শত বছরের দখলবাজি এবং রাজনৈতিক ভূগোলের যথেচ্ছ পরিবর্তন-প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই কার্যত বর্তমান বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহলের উদ্ভব। কিন্তু যেহেতু সে সময়ে এই অঞ্চলে জাতিরাষ্ট্র এবং জাতিরাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমানায় বসবাসকারী মানুষের নাগরিক পরিচয়-সংক্রান্ত কোনো ধারণা ছিল না; এবং যেহেতু প্রাসনের সঙ্গে সমাজ জীবনের এবং সমাজ জীবনের সঙ্গে নাগরিক পরিচয়ের সম্পর্ক ছিল খুবই শিথিল, তাই বর্তমান সময়ের ছিটমহলজাত নাগরিক ও রাজনৈতিক সমস্যার মতো জটিল কোনো সমস্যা সে সময়ে দেখা যায়নি। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় পরিচয়কে অখÐ ভূখÐের মধ্যে সমন্বিত করার ফলে রাষ্ট্রের নির্দিষ্ট সীমানা এবং সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী মানুষের নাগরিক পরিচয় অত্যাবশ্যক হয়ে পড়ে। অথচ ভারত-পাকিস্তান সীমানা নির্ধারণের সময়ে অযৌক্তিকভাবে উভয় দেশের মালিকানাধীন ছিটমহলগুলোকে রাষ্ট্রের সার্বভৌম সীমানার বাইরে রাখা হয়। “উনিশ শত সাতচল্লিশ” সালে ভারত ও পাকিস্তানের জন্মই হয়েছিল পরস্পরের সঙ্গে দ্ব›দ্ব ও সাম্প্রদায়িক সংঘাতের মধ্য দিয়ে। দেশভাগ-পরবর্তী রক্তক্ষয়ী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বাস্তবতায় দক্ষিণ বেরুবাড়ি ও ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতার মালিকানা নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানে তীব্র উত্তেজনা শুরু হয়। শুরু থেকেই পাকিস্তান সরকার স্যার রেডক্লিফ রোয়েদাদ অনুযায়ী ভারত অধিকৃত দক্ষিণ বেরুবাড়ির মালিকানা দাবি করে ভারতের ওপর ক্রমাগত চাপ প্রয়োগ করছিল। বিষয়টি আন্তর্জাতিক আদালতে নিয়ে যাওয়ার হুমকিও পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে ছিলো। দেশভাগ-পরবর্তী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বাস্তবতায় দক্ষিণ বেরুবাড়ি ও ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতার মালিকানা নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানে তীব্র উত্তেজনা শুরু হয়। এ শুরু থেকেই পাকিস্তান সরকার ‘রেডক্লিফ রোয়েদাদ’ অনুযায়ী ভারত অধিকৃত দক্ষিণ বেরুবাড়ির মালিকানা দাবি করে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দক্ষিণ বেরুবাড়ি ও ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতার সংঘটিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-পরিস্থিতির অবনতি হলে ছিটমহল ইস্যুটি উভয় দেশের রাজনৈতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পরিস্থিতি সামাল দিতে “উনিশ শত আটান্ন্” সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ও পাকিস্তানের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী ফিরোজ খান নুনের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় যা সংক্ষেপে “নেহরু-নুন” চুক্তি হিসেবে পরিচিত। এই চুক্তির “দশ নম্বর” সিদ্ধান্তে ছিটমহল বিনিময় সম্পর্কে বলা হয় যে, “১২ নং বেরুবাড়ি ইউনিয়নটি এমনভাবে বিভক্ত হবে যার অর্ধেক পাবে পাকিস্তান আর ইÐিয়ার সীমান্তবর্তী বাকি অর্ধেক থাকবে ইÐিয়ার দখলে। ১২ নং বেরুবাড়ি ইউনিয়নটি ভাগ হবে হরিজেন্টালি তথা অনুভ’মিকভাবে, যা শুরু হবে দেবীগঞ্জ থানার উত্তরপূর্ব কর্ণার থেকে। পূর্বপাকিস্তানের পঞ্চগড় থানা এবং পশ্চিম বাংলার জলপাইগুড়ি থানার ১২ নং বেরুবাড়ি ইউনিয়নের মধ্যে অবস্থিত কুচবিহারের ছিটমহলগুলো যেভাবে বর্তমানে ইণ্ডিয়ার সাথে সংযুক্ত আছে সেগুলো ওভাবেই ইণ্ডিয়ার সাথে থাকবে। আর পূর্বপাকিস্তানের বোদা থানা এবং ১২ নং বেরুবাড়ি ইউনিয়নের নিচের দিকে অবস্থিত কোচবিহারের ছিটমহলগুলো অন্য ছিটমহলগুলোর সাথে বিনিময় হবে এবং সেগুলো পাবে পাকিস্তান। পাকিস্তানের অনুকুলে যাওয়া বাড়তি এলাকার জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি ব্যতিরেখে পাকিস্তানে অবস্থিত পুননো কোচবিহারের ছিটমহলগুলো এবং ইণ্ডিয়াতে অবস্থিত পাকিস্তানের ছিটমহলগুলো বিনিময়ের সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো”। ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে রাজনৈতিক টানাপোড়ন ও নানা ধরণের বৈরিতার কারণে “নেহরু-নুন” চুক্তিটি কখনোই আলোর মুখ দেখে নাই। ‘নুন-নেহেরু’ চুক্তিটি বাস্তবায়ন না হওয়ার ফলে উভয় দেশের মধ্যে কাশ্মীর নিয়ে ভিতরে ভিতরে একটা তীব্র ক্ষোভ তুষের আগুনের মতো আস্তে আস্তে জ্বলতে থাকে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ছিটমহল সমস্যা প্রকট হয়ে দাঁড়ায়। কেননা এক দেশের ভূখÐ রয়ে যায় অন্যদেশে। এক দেশের নাগরিক পরিচয়হীনভাবে বড় হয় অন্য দেশে। ফলে এর একটা চিরস্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে “ষোল মে, উনিশ শ’চুয়াত্তর” ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে একটি দ্বি-পক্ষীয় ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা “ইন্দিরা-মুজিব” চুক্তি নামে পরিচিত। চুক্তির শর্তানুসারে “হিন্দু অধ্যুষিত ১২ নং বেরুবাড়ির দক্ষিনাংশ পাবে ভারত এবং সংখ্যা গরিষ্ঠ মুসলিম অধ্যুষিত ডাহাগ্রাম-অঙ্গরপোতা পাবে বাংলাদেশ। এখানকার মানুষদের স্বাধীনভাবে চলাচলের জন্য তিনবিঘার উপর, তিনবিঘা প্যাসেজ ডোরের স্থায়ী কতৃত্বের অধিকারী হবে বাংলাদেশ। যা ঐ ছিটমহলের জনগণের যাতায়াত হবে অবাধ এবং স্বাধীন”। “ইন্দিরা-মুজিব” চুক্তিতে তিনবিঘা বাংলাদেশকে স্থায়ীভাবে বন্দোবস্ত দেওয়ার কথা থাকায় তা বাংলাদেশের ভ’খণ্ড হিসেবে স্বীকৃত হয়ে যায় বলে- জনৈক ভারতীয় নাগরিক ঐ চুক্তিকে ভারতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিরোধী আখ্যায়িত করে চুক্তিটি বাতিলের দাবী জানিয়ে কলকাতা হাইকোটে মামলা দায়ের করেন। সুদীর্ঘ দেড়যুগ ধরে মামলা শুনানির পর প্রথমে কলকাতা হাইকোট এবং পরে দিল্লি সুপ্রিমকোট মামলাটি খারিজ করে দেন। ডাহাগ্রাম অঙ্গারপোতার মানুষদের দুঃখ দুর্দশার অবসান হতে আরও ঠিক কতটা সময় লাগবে, তা সময়ই বলে দেবে। কারণ, আমি যতটুকু বুঝি, এ প্রক্রিয়ার আগামী পর্বগুলো সম্পন্ন হবে দুই দেশের আমলা ও কূটনীতিকদের হাত দিয়ে। আর এই দুই দেশের কূটনীতি ও আমলাতন্ত্রে কাঠিন্য ও কালক্ষেপণের যে সংস্কৃতি চালু আছে, তাতে যেকোনো পর্যায়ে বিলম্ব হতে পারে। তথ্যসূত্র- ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতা’র ইতিহাস ও-উইকিপিডিয়া ও ইন্টারনেট মেডিয়া। বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস -১৯৪৭-১৯৭১। একাত্তর করতলে ছিন্নমাথা-হাসান আজিজুল হক। আমি বিজয় দেখেছি- এম আর আখতার মুকুল। আব্দুল কাদের বলেন- মোনাজাত ভাই, আমাদের দুঃখের ইতিহাস বর্ণনা করতে গেলে আরব্য রজনীর মতো সেই একহাজার রাতেও শেষ হবে না। এখানকার মানুষেরা মাঝে মধ্যে ভারতে যাতায়াত করার সুযোগ পেলেও ভারতের জনগণ অতিরক্ত ঝামেলা মনে করে। আমরা ভারতের হাট-বাজারে কখনো জোর গলায় কথা বলতে পারি না। পান থেকে চুন খসলেই আমাদেরকে চর-থাপ্পর মারাটা যেন তাদের মামুলি ব্যাপার। কোথাও কোন সমস্যা হলে কিংবা রাজনৈতিকভাবে তিনবিঘা করিডোর সম্পর্কীত কোন আলোচনা শুরু হলেই ‘তিনবিঘা সংগ্রাম কমিটি’ আমাদেরকে ভারতে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। চারিদিক থেকে অবরুদ্ধ করে ফেলে তারা। তাদের অবরোধ চলতে থাকে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস। গোটা গ্রামজুড়ে শুরু হয় হাহাকার খাদ্য, বস্ত্র, লবন, কেরসিন যেন পৃথিবীর সবচেয়ে দামি জিনিস। তার উপর চলে ‘তিনবিঘা সংগ্রাম কমিটি’ হুমকি-ধামকি। তবুও এখানকার মানুষকে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে প্রতিয়িতই অবৈধ’ অনুপ্রবেশ করতে হয় ভিন্ন একটি রাষ্ট্রে। ভিনদেশে ‘অবৈধ’ অনুপ্রবেশ আর ভিনদেশি মানুষের সঙ্গে ‘বেআইনি’ সামাজিক সম্পর্কই তাদের জীবনের একমাত্র অবলম্বন। করুণা আর অবজ্ঞা মাথায় নিয়ে নিরাপত্তাহীনভাবে শুধু পেটের তাগিদে এখানে বেঁচে থাকতে হয়। এখানকার অনেক মানুষ কাজ না পেয়ে পেটের জ্বালায় কাজের সন্ধানে ভারতের শিলিগুড়ি, ওদোলাবাড়ি সহ বিভিন্ন জায়গায় ছুটে গিয়েছে। কিন্তু সেখানে গিয়ে অনেকে ধরা পড়ে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে কয়েক বছর জেলেও খেটেছেন। তারা যে আশা নিয়ে শত কষ্টের মাঝেও বেঁচে আছেন, তাদের সেই আশা পূর্ণ হবে কি না সেটা আল্লাহই জানেন। ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতাবাসীর সব ধরনের প্রশাসনিক ও আইনি সুযোগ থেকে কয়েক দশক ধরে বঞ্চিত ছিল। কোনো বিষয়েই কোথাও কোনো অভিযোগ দাখিলের সুযোগ তাদের ছিল না। মানুষের জীবনে কিছু ঘটনা তার মনের ভিতর ভীষণ প্রভাব ফেলে, তাকে কষ্ট দেয়। যখন সে কোন ভাবেই ভুলতে পারে না তখন সে এটাকে দুর্ঘটনা বলে। সেই র্দুঘটনা, ভোগান্তি, দুঃখবোধ জীবনকে অতিষ্ট করে তোলে। উপস্থিত মানুষগুলো যে যার মতো করে তাদের সুখ-দুঃখের কথা বলছে। নজরুল ইসলাম সরকার বলেন-মোনাজাত ভাই, আমাদের সুখের স্মৃতির বিশলতা না যতটুকু আছে তার চেয়ে দুঃখের নদীটা অনেক বড়। এই দশ হাজার লোকের চোখের পানিতে মাঝে মধ্যেই নদীতে বান ডাকে। এর জন্য বর্ষা মৌসুমের দরকার হয় না। নদীতে বান এলে যেমন শেঁকড়হীন কুঁচরীপনা গুলো অসহায়ের মতো ভেসে যায় ঠিক তেমনিভাবে ভারত সরকারের খেয়াল-খুশি মতো অত্যাচার, নিপীড়ণ ও নির্য়াতনে ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতার মানুষগুলো তাদের রক্তের বানে ভেসে যায়।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১০৬ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now