বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকের নাম- মাজহারুল মোর্শেদ
কুলসুমের পেটের টিউমার অপারেশনের সময় আব্দুল্লাহ বাড়ির ভিটেটুকু বন্ধক রেখে তিনকুড়ি মহাজনের কাছে পাঁচ হাজার টাকা কর্যকরে, অনেক কষ্ট করে বছরান্তে এক-দুই হাজার টাকা জমা করে সেটাই তিনকুড়ি মহাজনকে দিয়ে আসে ঋণ পরিশোধের জন্য। কিন্তু তিনকুড়ির ভাষায় এ টাকা মহাসমুদ্রে যেন একফোটা জলের মতো। আব্দুল্লাহ কিছুতেই তার পুরো ঋণ পরিশোধ করতে পাচ্ছে না। আর শোধ করবেই বা কি দিয়ে? কি আছে তার? সম্পদ বলতে বাড়ির ভিটেটুকু আর ছোট্ট দু’টো খড়ের ঘর, কয়েকটা হাড়ি পাতিল এই যা।
তিনকুড়ি মহাজন মাঝে মাঝে আব্দুল্লাহর বাড়ি আসত হাতে একটা লম্বা ফিরিস্তি নিয়ে সুদে আসলে তার কতটাকা হয়েছে সেটা জানিয়ে দিয়ে যেতো। তার আসল উদ্দেশ্য অবশ্য টাকার হিসেব জানিয়ে দেয়া নয়, আব্দুল্লার বড় মেয়ে আবিয়া বেশ ডাগর হয়েছে, দেখতে শুনতেও মাশাল্লাহ। যেমনি উঁচা লম্বা তেমনি দুধের রঙে ফর্সা, পাঁকা আঙ্গুর ফলের মতো টসটসে দেহের গড়ণ, মাথার চুল কোমরের নিচে এসে যেন শ্রাবণের মেঘ হয়ে বাতাসে উড়ায় সবমিলিয়ে অপূর্ব সুন্দরি যাকে বলে। সেই আবিয়াকে একনজর দেখতে যাওয়া। তাকে প্রথম দেখার পর তিনকুড়ি মহাজনের রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়। তাই ছলে-বলে নানান অযুহাতে সে আব্দুল্লার বাড়িতে আসতে শুরু করে আর আবিয়াকে পাওয়ার জন্য ফাঁদ হিসেবে ব্যবহার করে ঋণের ফিরিস্তিকে।
এদিকে কর্যের ভারে দিশেহারা আব্দুল্লাহ টাকা জোগার করতে এদিক সেদিক ছুটো-ছুটি করে কিন্তু কোথাও একটি টাকাও মেলে না। আর কে বা টাকা দেবে তাকে? তার তো পরিশোধ করার কোন উপায় নাই। এক রাতে তিনকুড়ি মহাজন তার খাস চামচা ছলিমুদ্দিনকে আব্দুল্লাহর বাড়িতে পাঠায়। তাকে জানিয়ে দেয়া হয় যে-আগামী কালের মধ্যেই মহাজনের সবটাকা বুঝে দিতে হবে, নইলে মহাজন এসে বাড়ি ঘর সব বেদখল দেবে। সমাধান হিসেবে ছলিমুদ্দিন আব্দুল্লাহর কানে কানে এটাও বলে যায় যে, মহাজনের সাথে যদি আবিয়া সাদি-মোবারক কবুল করে তাহলে ঋণ পরিশোধ করা লাগবে না।
তিনকুড়ি মহাজনের প্রস্তাব শোনার পর আব্দুল্লাহর পায়ের নিচের মাটি যেন একটু একটু করে সরে যেতে থাকে, পুরো আসমান ভেঙ্গে তার মাথার উপর পড়ে। দু’চোখ ক্রমে ঝাপসা হয়ে আসে, মাথা চক্কর দিয়ে ওঠে সে মাটিতে পড়ে যায়। কুলসুম আর আবিয়া তার মাথায় পানি ঢালতে থাকে। কিছুক্ষণ পর আব্দুল্লাহ একটু সুস্থ হলে কুলসুম তাকে জিজ্ঞাসা করে-
আবিয়ার বাপ, কি হইচে তোমার? মাথা ঘুরি পড়ি গেইলেন যে, মুইতো খুব ভয় পায়া গেছিনু।
আবিয়ার মাও হামার কপাল পুড়ছে। আল্লায় বুঝি হামাক আর এই দুনিয়াত বাঁচি থাকির দিবে না। তাই দিনের পর দিন শুধু শাস্তি দিয়া যাবার নাকছে। ঘরে খাবার নাই, মানুষের বাড়িতে কাম নাই, হাট-বাজার যাওয়ার উপায় নাই, চারিদিকে অবরোধ তার উপর গরিবের কোন বিচার নাই।
ক্যান? কি হইচে আবিয়ার বাপ, খুলে না কইলে মুই বুঝোঁ কেমন করি?
আব্দুল্লাহ বলে-তিনকুড়ি মহাজন তার লোক পাঠাইছে, কাইলে তার তামান টাকা বুঝি দিবার নাকবে, তানাহলে নাকি হামার বাড়ি দখল দেবে। শয়তানটা আরও কি কইছে জানিস? তার সাথে আবিয়ার বিয়া দিলে কোন টাকা পয়সা দিবার নাগবে না।
আবিয়ার বাপ, তোমা মোক কন নাই ক্যান, গোলামের বেটাক মুই ঝাড়– দিয়া পিটি একেবারে লম্বা বানে দিনু হয়।
না আবিয়ার মাও, এখন হামার কাউকে কিছু কওয়া যাবে না। বিষয়টা নিয়া মুই আগোত মেম্বরের সাথে পরামর্শ করো। তারপর না হয় ভাবা যাইবে- কি করা যায়।
মেম্বরের কাছোত য্যায়া কোন লাভ নাই আবিয়ার বাপ। ওমরাগুলা সবাই একই গোয়াইলের গরু। তিনকুড়ি মহাজন আর মেম্বরের মধ্যে কোন ফারাক নাই। মেম্বর এ্যাকনা শিক্ষিত আর তিনকুড়ি মহাজন হইল মুর্খ, পার্থক্য এইটাই।
মহাজনের সাথে আবিয়ার বিয়া না দিলে তায় যদি বাড়ি দখল দেয় তখন কি হবে? তখন এইলা ছওয়া পওয়াক ধরি হামরা কোনটে যামো?
আচ্ছা আবিয়ার বাপ, তোমা একবার বেলাল ও জালালকে খবর দিয়া দ্যাখোতো, বাড়ি আসির পায় না কি? অনেকদিন ধরি দুই ভাইয়ের কাঁও বাড়ি আইসেনা।
ঠিক আছে, কাইল মুই ছাবেদ আলির বাড়ি যাইম, দ্যাখো জালালের কোন খবর পাওয়া যায় কি না। ছাবেদ আলির ভাই নসীব আলি ও জালাল ভারতের ওদোলাবাড়িত এক সাথে চা বাগানোত কাজ করে। তায় ছুটি নিয়া বাড়িত আইচ্চে। তার দ্বারা খবর দিলে জালালও হয়তো ছুটি নিয়া আসির পাবে।
তিনকুড়ি মহাজনের চোখ বড় ভয়ানক, তার চোখে চৌদ্দ কিংবা চল্লিশ-নারীর কোন পার্থক্য নাই। তার লোলুপ দৃষ্টিতে নারী মানে ব্যবহার যেগ্য ভোগ্য পণ্যের একটা শরীর এর চেয়ে বেশী কিছু না। আব্দুল্লাহর মেয়ে আবিয়ার বয়স যখন সবেমাত্র চৌদ্দতে পা দিয়েছে তার লোলুপ দৃষ্টি গিয়ে থমকে দাঁড়ায় তার ভাঙ্গা ঘরে। পাওনা টাকা কোন বিষয় নয়, সে অকারণে আব্দুল্লাহর বাড়ি আসে আবিয়াকে দেখার জন্য। আবিয়ও সেটা টের পেয়ে লুকিয়ে পড়ে পাশের বাড়িতে। আবিয়া যখন নিজে ধরা দেয় না তিনকুড়ি মহাজনের রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়। তাই ছলে-বলে নানান কৌষল খুঁজতে থাকে।
তিনকুড়ি মহাজনের আর এক চামচা নাড্ডা তাহেরের বোউ আফিয়া আবিয়ার খুব কাছের বান্ধবী। দিনের বেশিভাগ সময়ে তারা একই সাথে থাকে। আফিয়ার কপাল ভালো যে সে দেখতে যেমনি কালো, তেমনি খাট। গোটা শরীরে পাঁচকেজি গোস্ত নাই। হয়তো সে কারণে আফিয়া তিনকুড়ির রুচির বাইরে পড়ে যায়।
তিনকুড়ি তাহেরকে বলে- তোর বোউ যেন আবিয়াকে এ্যাকনা ভালো করি বুঝি-সুঝি কয় যে, তিনকুড়ি মহাজন যেইটা কয়, সেইটাই হয়। এই গ্রামোত যায় তার কথা শোনে না তার দুনিয়ার ভাত ফুরি যায়। তার জায়গা হয় তিস্তা নদীত।
আব্দুল্লাহ ও কুলসুম কাজে গেলে নাফিজা এসে আবিয়ার পাশে বসে। তারপর এটা সেটা গল্প করার পরে বলে- শোন আবিয়া, তোর মতো একটা সুন্দরী হুর-পরী গরীবের ঘরে অনাহারে অনাদরে ময়লা ছেড়া কাপড়ে সারা জীবন পড়ে থাকাটা কি শোভা পায় বল?
ক্যান কি কবার চাস তুই? খুলি কতো?
তোর জীবনে নতুন ভাগীদার জুটেছেরে -নতুন ভাগীদার?
তায় ফির আরো কোন হতোভাগা-রে? যে মোর জীবনোত আসি মরির চায়।
সত্যি আবিয়া, তায় কোন হতোভাগা নয়, তায় টাকা দিয়া গোটা দুনিয়াটাক কিনি নিবার পায়। লোকটা একখান চিজ-রে, বড় চিজ। তায় এলায় চায়, তোর দেহ, রূপ-যৌবন। তার টানটা কিন্তু দুনিয়ার সব কিছুর চাইতে তোর দিকে বেশী।
আবিয়ার লাবণ্যমযী মুখ, কাজল কালো চোখ, যৌবনে পুষ্পিত তনুকান্তি, জীর্ণ মলিন বাসে সবটুকু সতৃষ্ণ লুব্ধ দুষ্টিতে খানিক্ষণ আকাশের দিকে চেয়ে থেকে একটা চাপা নিঃশ্বাস ফেলে। এক অজানা আসঙ্কায় বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। তার চঞ্চল আঁখিদুটিতে একটা চাপা ব্যথার আভাস জেগে ওঠে। তিনকুড়ি মহাজন যে ভালো জাতের মানুষ নয় সেটা তার হাড়ে হাড়ে জানা।
হ্যারে নাফিজা? ঐ কুত্তা মহাজনটা সবসময় মাছির মতো ভনভন করি বেড়ায় ক্যান রে? তার কি কোন কাম নাই?
জানিস আবিয়া, তোর উপর লোভ পড়েছে তার অনেক দিন আগে। তোকে পাওয়ার জন্য সে পাগল, এ্যালা এইটায় তার বড় কাম।
নাফিজা, সেটা তুই জানলু ক্যামন করি?
কাইল রাইতোত তোর দুলাভাই মোক কইচে। আরো কি কইছে জানিস? তায় কইছে-‘তিনকুড়ি মহাজন যেইটা কয়, সেইটাই হয়। এই গ্রামোত যায় তার কথা শোনে না তার দুনিয়ার ভাত ফুরি যায়’। তার জায়গা হয় তিস্তা নদীর পানির তলোত।
আকস্মাৎ আবিয়ার ঠোঁটের হাসি কোথায় যেন মিলিয়ে গেলো। প্রচÐ রাগে ক্ষোপে তার আঙ্গুর ফলের মতো রসালো মুখখানা রক্তলাল হয়ে গেলো। সেই রাগ প্রসমিত হলে তার টানা টানা কালো ভ্রæ দু’টি কুঞ্চিত হয়ে উঠলো। তিনকুড়ি মহাজনের সে ঘৃণিত প্রস্তাব তার কোমল কচি হৃদয়ের একটা সত্যিকার আঘাত লাগে। তার বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করে ওঠে। এই দরিদ্র সংসারে দুঃখ দৈন্য অভাবের শত তাড়না সয়ে, নিজেকে গুটিয়ে রাখে। দিনশেষে মা-বাবার মুখ দেখলে তাকে এ মাটির পৃথিবীর অনেক উর্দ্ধে, স্বর্গের কাছাকাছি পৌছে দেয়। আর সে কি না এক লম্পটের লালসা নিবৃতির জন্য--না-- না, ভাবতে তার গা কাঁটা দিয়ে ওঠে। আবিয়ার মুখে অনেক্ষণ ধরে কোন কথা নেই, সে নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। তার ক্লান্ত ক্লিষ্ট মলিন মুখের দিকে আড়ে আড়ে তাকিয়ে নাফিজা বলে- সেই কুত্তাটা আরও কি কইছে জানিস আবিয়া? তায় নাকি আরও মাস খানেক দেখবে, তারপর----
তারপর কি করবে শুনি ? কি আছে হামার, আর কিই বা নিগাবে?
না আবিয়া না, সে কথা জোর করি কওয়া যায় না। কারণ জলে বাস করি কুমিরের সাথে লড়াই করা যায় না। মহাজনের মতো বিবেকহীন, নিকৃষ্ট, মানুষ করির পায় না এমন কোন কাজ নাই। সত্যি মোর খুব ভয় হয় আবিয়া, যে রকম তার আক্রোশ, যদি তায় তোর বাবাক মারি ফেলায়?
আবিয়া চমকে ওঠে। তার সমস্ত গা ছম ছম করে, লোম গুলো খাড়া হয়ে যায়। তার এ জীবনে মা বাবাকে ছাড়া সে কিছুই ভাবতে পারে না। তার ঠোঁট দুটো এমনিতেই কাঁপছিল, চোখ জলে ভরে গেলো। আবিয়ার ক্লান্তি মাখা মলিন মুখ, উসকো খুসকো চুল যেন বলে দেয় -হায় আল্লাহ তোর পৃথিবীতে কতো রকমের মানুষ আছে। কেউ বেহেস্তের ফেরেস্তা আবার কেই দোজকের শয়তান। একটা তপ্ত নিঃশ্বাস ছেড়ে সে নাফিজার হাতটা ধরে বলে- নাফিজা তুই মোক ক্ষমা করি দিস এই সুন্দর পৃথিবীতে মোর মতো ভাগ্যহতদের কোন জায়গা নেই-রে। মোর জন্য উত্তম জায়গা হইলো ওই তিস্তা নদী।
আবিয়ার এ অবস্থা দেখে- নাফিজা হাউ-মাউ করে কেঁদে ফেলে। হাজার হলেও সে তার বান্ধবী। ছোট বেলা থেকেই তারা একই সাথে পড়েছে, খেলেছে, একই সাথে বড় হয়েছে। আজ তার বিপদের দিনে সে কিভাবে মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারে?
গভীর রাতে সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে দু’তিনটা গরুর গাড়িতে লাঠি-সোঁটা, ছুড়ি-বল্লমসহ বেশ কয়েকজন জোয়ান ছেলে, বিয়ে পড়ানোর জন্য নূরল মুন্সি এবং আবিয়ার জন্য বিয়ের শাড়ি নিয়ে আব্দুল্লাহর বাড়িতে এসে হাজির হয় তিনকুড়ি মহাজন। আবিয়া যেন বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে না পারে সে জন্য বাড়ির চারপাশে তার অনুগত গুÐাদেরকে পাহারায় রাখে।
তিনকুড়ি মহাজন আব্দুল্লাহর ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কোন প্রকার শব্দ না করে আস্তে আস্তে ডাকে বাহে আব্দুল্লাহ, বাড়িত আছিস না কি বাহে?
এতো রাইতোত কায় ডাকায়? কারো কোন বিপদ হইলো না কি? আব্দুল্লাহ ধড়ফড় করে বিছানা থেকে উঠে পরনের লুঙ্গিটা গিঠ দিতে দিতে ঘরের দরজা খুলে বাহিরে এসে দেখে তিনকুড়ি মহাজন আর নূরুল মুন্সি আঙ্গিনায় দাড়িয়ে আছে।
আব্দুল্লাহ মহাজনকে সালাম দিয়ে বলে, এতো রাইতোত মোর বাড়িত ক্যানে মহাজন? খবর দিলে না মুই গেনু হয়।
তিনকুড়ি মহাজন বলে- সেটাতো মুইও জানো বাহে, খবর দিলে তুই গেলু হয়। কিন্তু এটা মুই ভালোভাবে বুঝির পাইচু যে তুই বাঁচি থাকতে তোর বেটিক মহাজনের সাথে বিয়া দিবু না। তাই মোক বাধ্য হয়া এতো রাইতোত তোর বাড়ি আসির নাগিল বাহে। শোন বাহে আব্দুল্লাহ, এই ট্রাংকের ভিতর কাপড় চোপড় আছে তোর বেটিকে তাড়াতাড়ি এ্যাকনা পরে দিবার ক’। এ্যালায় বিয়া পড়ানো হবে। আর দেরি করলে মুই সব কয়টাকে কাটি টকুরা টুকরা করি নদীত ভাসে দিয়া যাইম। এমন সময় দু’তিনজন অপরিচিত যুবক ছুরি-বল্লম হাতে নিয়ে তার সামনে এসে দাঁড়ায়-এই বুড়া, এলাও বসি আছিস, মহাজনের কথা তোর কানে যায় নাই? দিম না কি একটা বসে। আর একজন বলে-থাক বুড়া মানুষ এতোকিছুর দরকার নাই।
আব্দুল্লাহর আঙ্গিনায় তিনকুড়ি মহাজন তার চেলা-চামুÐাসহ দাঁড়িয়ে আছে। আব্দুল্লাহ ঘরে যেয়ে কুলসুমকে ডাকে। এমন সময় কাপড় চোপড় নিয়ে দুই-তিনজন যুবক ঘরে ঢুকে বলে- ‘এই বুড়ি? তাড়াতাড়ি তোর বেটিক শাড়ি পিন্দি দে’ নইলে দেখচিসতো? এই ছুড়ি তোর প্যাটোত ঢুকি যাবে কিন্তু’।
কুলসুম আব্দুল্লাহর দিকে তাকিয়ে আছে চোখের পানিতে তার বুক ভিজে যাচ্ছে। আব্দুল্লাহ মুখে কিছু বলতে না পেরে চোখ দিয়ে ইশারা করে শাড়ি পরাতে বলে।
দাঁতে দাঁত চেপে দমবন্ধ করে চোখ দু’টো বুঁজে এক মুহুর্তের জন্য স্থির হয়ে থাকে আব্দুল্লাহ। বিবেকের সামনে শক্ত করে তুলে ধরল দাঁড়ি পাল্লা- এক দিকে রাখল সম্ভাব্য বাস্তবতা, পিতৃত্বের দায়িত্ব, কর্তব্য, অধীকার, জীবনের মূল্যবোধ, লোক লজ্জা, ঘৃণা, অপমান। আর অন্যদিকে- আবেগ, উৎকণ্ঠা, উত্তেজনা, হতাশা, দীর্ঘশ্বাস, অশ্রæ। ঠোঁটে ঠোঁট কামড়ে ধরে একদৃষ্টে চেয়ে রইল বিশাল আকাশের দিকে-‘হে আল্লাহ এতো দুঃখ-কষ্টই যদি দিবু তাহলে মোক দুনিয়াতে পাঠানোর কি দরকার ছিলো তোর’? অবশেষে নিরুপায় হয়ে, অশ্রæসিক্ত চোখে, বেদনা ব্যাকুল কণ্ঠে কুলসুমকে ডেকে বলে- আবিয়ার মাও, তার কপালোত যেইটা লেখা আছে সেইটাই হবে। এই গরিবের ঘরে কায় ওক জন্মাইতে কইছিল? আর চিল্লা-হাল্লা করিস না ছাবিহা টের পাবে।
আবিয়াকে শাড়ি পরানোর সময় আর এক হৃদয়বিদারক ঘটনার সূত্রপাত হয়। কুলসুম আবিয়াকে ঘুম থেকে ডেকে চুপিচুপি বলে- মা আবিয়া গরিব হয়া জন্ম নিলে জীবনে ভালো-মন্দের হিসাব করা যাবে না মা। কপালতো তোর সেদিনেই পুড়ি গেইচে যে দিন মোর প্যাটোত তোর জন্ম হইচে। এটা নিয়া চিন্তা করি কোন লাভ হবে না মা।
মায়ের হাতে লাল শাড়ি দেখে আবিয়ার নাফিজার কথা মনে পরে যায়। সে যদি তিনকুড়ি মহাজনকে বিয়া না করে তাহলে তার মা-বাবাকে মেরে ফেলবে। তাই সে মাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে কেঁদে অজ্ঞান হয়ে যায়।
নূরল মুন্সি বিয়ার আগে তওবা, কলেমা পড়ানোর জন্য পাত্রির নিকট এসে দেখে, পাত্রি অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। কুলসুম জোর করে আবিয়াকে কাপড় পরাতে যেয়ে বøাউজের কোন বোতাম যে কোথায় লাগিয়ে দিয়েছে তার খেয়াল করেনি। লালশাড়িটা বুকের কাছ থেকে একটু সরে গিয়ে নিচে পড়ে আছে কেরসিনের নিভু নিভু কুপির ¤øান আলোয় আবিয়ার শরীরে যেন বেহেস্তের হুর এসে ভর করেছে, নইলে এতাটা রূপ কোন নারীর হয় না, নূরল মুন্সি আবিয়ার রূপ আর বøাইজের বোতাম খুলে যাওয়া অংশের তিলমাত্র দেখে বেহুশ হয়ে পড়ে। মনে মনে আস্তাক ফিরুল্লাহ বলে- ঘাড়ের উপর বসে থাকা শয়তানকে তাড়ানোর জন্য নিজের মাথাটা প্রচÐভাবে একটা ঝাকি দেয়, সেই ঝাকুনিতে মাথার টুপিটা খুলে আবিয়ার কাছে যেয়ে পড়ে। কেউ যেন দেখে না ফেলে-তাই সে মাথা নিচু করে এপাশ-ওপাশ তাকিয়ে দেখে তাড়াতাড়ি টুপিটা তুলে নিয়ে আবার মাথায় দেয়। তারপর চোখ বন্ধ করে মনে মনে কয়েকবার আস্তাক ফিরুল্লাহ পাঠ করে।
মোদ্দাকথা হলো, নূরল মুন্সি কলেমা পড়াবে কাকে? যাকে কলেমা পড়ানোর জন্য সে বসে আছে, সে তো অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে? এদিকে বিয়ে যে তাকে পড়াতেই হবে অন্যথায় তিনকুড়ি মহাজন তাকে আস্ত রাখবে না। নিরুপায় হয়ে নূরোল মুনসি নিজে নিজে তওবা, এস্তেকফার পড়ে আব্দুল্লাহর কাছে অনুমতি নিয়ে দোয়া দরুদ পড়ে খুব দ্রæত বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করলো। তারপর তিনকুড়ি খাঁর কাছে গিয়ে কানে কানে বললো-মহাজন বিয়ের কাজতো শেষ এবার চলেন, বেশি দেরি করলে বিপদ হতে পারে, পাড়া পরশি জেগে উঠলে একটা কেলেঙ্কারী বেঁধে যাবে। তার আগে যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব মানে মানে কেটে পড়া ভালো।
তিনকুড়ি খাঁ, আব্দুল্লাহ ও কুলসুমকে একসঙ্গে ডেকে বলে- শোন আব্দুল্লাহ, যদিও মোর সংসারে আরোও দু’জন বিবি আছে কিন্তু ওমারগুলারও কোন ছওয়া-সন্তান নাই, মোর ভবিষ্যত বংশের বাতি জ্বালাবার কাঁও নাই। আবিয়াকে বিবাহ করার উদ্দেশ্য হইল যদি তার সন্তান হয় তাহলে মোর বংশ ক’ল রক্ষা পাবে। আর মুই মরি গেইলে মোর এই বিশাল সয়-সম্পত্তির মালিক তো একদিন তারই হবে। তোমারগুলাক আবিয়ার জন্য কোন চিন্তা করির নাগবে না। আল্লায় দিলে তার কোন কিছুরই অভাব হবে না। মোর ঘরোত আবিয়া রাজরানি হয়া থাকিবে। তোমা দু’জন শুধু তাক দোয়া করি দেও আল্লায় যেন তাকে একটা সন্তান দেয়। দেনমোহর বাবদ মুই আবিয়ার নামে দশ বিঘা জমি লেখি দিম। অয় চাইলে তামান বিষয় সম্পত্তি তার নামে লেখি দিতে মোর কোন আপত্তি নাই। মোর অবর্তমানে তাকে যেন কোন রকম সমস্যায় পড়ির না নাগে সেটা মোর মাথায় আছে।
তিনকুড়ি নিজেই অজ্ঞান অবস্থায় আবিয়াকে পাঁজাকোলাকরে তুলে নিয়ে গাড়িতে উঠায়। কারসাথে কোন কথা না বলে সবাইকে ইশারা দিয়ে চলে আসতে বলে।
আবিয়াকে তার চোখের সামনে এভাবে নিয়ে যেতে দেখে কুলসুম সাথে সাথে অজ্ঞান হয়ে আঙ্গিনায় পড়ে যায়। দৌড়ে গিয়ে আব্দুল্লাহ তাকে ধরে ফেলে। আব্দুল্লাহর মুখ থেকে একটি কথাও বের হলো না। সে শুকনো কাঠের গুঁড়ির মতো নিষ্প্রাণ হয়ে কুলসুমের মাথাটা কোলে নিয়ে মাটিতেই বসে পড়ল।
আব্দুল্লাহ কুলসুমকে দেখে তার দাঁত লেগে চোঁয়াল শক্ত হয়ে গেছে। তবুও আব্দুল্লাহর সেদিকে কোন খেয়াল নেই, সেও আবিয়ার শোকে পাথর হয়ে গেছে। এভাবে কতোক্ষণ সময় কেটে যায় তারা কেউ জানে না। হঠাত অনেক দুর থেকে ভেসে আসে “আস্সাতু খাইরুম-মিনান-নাউম” সে বুঝতে পারে রাতের আঁধার কেটে সকাল হতে চলছে। তার কোল থেকে কুলসুমের মাথাটা সরিয়ে রেখে ক’য়ো থেকে একবালতি পানি এনে তার ছোখে মুখে ছিটিয়ে দিলে কুলসুম জেগে ওঠে। জ্ঞান ফিরে এলে সে আবার আবদুল্লাহকে জড়িয়ে ধরে কুলসুম কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। অনেকক্ষণ ধওে কাঁদার পর শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখের পানি মুছে ফেলে কুলসুম বলতে শুরু করলো-‘আবিয়ার বাপ, এই জন্যইতো মুই বেটি চাও নাই। বেটিছওয়া হয়া জন্মনিলে সারাজীবন তার কপালোত দুঃখ লেখা থাকে। জন্মের পর থেকে শুরু হয় আর কবরোত যাওয়া পর্যন্ত তার কপাল থাকি দুঃখ যায় না’। কথাগুলো বলতে বলতে কুলসুম রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে ওঠে আব্দুল্লাহকে উদ্দেশ্য করে বলে- তখন তোমার বেটির জন্য বুকখান খালি ফাটি যাবার নাগছে, এ্যালা কি হইল? হাতে ধরি মোর ছওয়াটাক একেবারে যে দোজখের আগুনোত ফ্যালে দিলেন। ওই বুড়া শয়তানটার ঘরোত য্যায়া দুই-দুইটা সতিনের সাথে মোর গাবুর ছওয়াটা সংসার করির পাবে? না পাবে স্বামীর আদর সোহাগ, না পাবে সংসারে সুখ। আর কি নিয়া মোর ছওয়াটা বাঁচি থাকিবে একবারো কি ভাবি দেখচেন তোমা? আবিয়ার বাপ মোর না বিষ খ্যায়া মরি যাবার ইচ্ছা করতেছে। দশ মাস প্যাটোত ধরি, নিজে খ্যায়া না খ্যায়া কতো কষ্ট করি ছওয়াক হামা মানুষ করিনো কি ওই বুড়া শয়তানটার জন্যে? আগোত যদি জানিবার পানু হয় যে, ওর কপালোত এমন দুঃখ আছে, তাহলে জন্মের পর আতুর ঘরতেই তার টুটি চিপি মারি ফেলানু হয়।
সেই আলো-বাতাস, সেই ঝড়-বৃষ্টি এমন কি সেই ঘর-বাড়ি এখনও সমস্ত ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছে। ক্রোধ-জ¦ালা, সুখ-দুঃখের অনুভূতি সারা শরীরে যে বিষের যন্ত্রণা ছড়িয়ে দিচ্ছে। এই পৃথিবীর মাঝে সংসার নামক এক বিশাল নাট্টগৃহে আমরা হাসি-কান্নার অভিনয় করে চলেছি। শত্রæ-মিত্র সেজে জয়-পরাজয়ের মরণ খেলা খেলছি। প্রেম-বিরহ ও কলহের রসপান করছিÑ মহা আনন্দে। আব্দুল্লাহর চোখের কোণে জমানো লোনা জল আসতে আসতে গড়িয়ে পড়ে। বুকের ভেতরে প্রচÐ ঝড় ওঠেÑ কালবৈশাখী ঝড়ের মতো, তোলপাড় করে দেয় তার জগত। সে আর চুপ থাকতে পারে না। হাউ মাউ করে কেঁদে ফেলে।
আব্দুল্লাহর এমনি এক হতভাগা মেয়ে আবিয়া, অভাবের সংসারে কত মায়া মমতা, কত আদর সোহাগে, নিজে না খেয়ে তাকে খাইয়ে, কত কষ্ট করে তিলে তিলে বড় করেছে। সেই মেয়েরে কপালে কেন যে আল্লায় এতো দুঃখ কষ্ট দিল। পাখির মতো চঞ্চল মেয়েটা কপালের দোষে একটা বুড়োর খাঁচায় বন্দি হয়ে পড়ল। মেয়েটার জীবনে সাদ-আল্লাদ বলতে আর কিছু থাকল না, কি পাবে ঐ বুড়ো শয়তানটার কাছ থেকে? টাকা পয়সা, সয়সম্পত্তি, শাড়ি গয়না থাকলেই কি মেয়ে মানুয়ের সুখ হয়? জীবনের আরও কতো কি চাওয়া-পাওয়া থাকে। এসব কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে বেলা বেড়ে যায় সে দিকে আব্দুল্লাহর কোন খেয়াল নেই।
কখনো কখনো এমন রাত আসে যখন স্মৃতির দংশন অসহ্য হয়ে ওঠে। তবুও নীরবে সহ্য করতে হয়, তাছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। মানসিক যন্ত্রণায় শরীর গেছে, মন গেছে, সব রকম উৎসাহ-আগ্রহ গেছে, মান অপমানের বোধ গেছে। তার দু’চোখ বেয়ে অঝোরে ঝরে পড়ে অশ্রæ। একসময় বেহুঁশ হয়ে সে মাটিতে গড়িয়ে পড়ে। সংসার জীবনের কথা গুলো ভীষণ ভাবে নাড়া দিচ্ছে মনে। দুদিনের দুনিয়ার মানুষ কিভাবে এতটা স্বার্থপর হয়, নিজের স্বার্থের জন্য তারা কাউকে খুণ করতেও দ্বিধা করে না। জীবনের পুরাতন হিসেব নিকাশগুলো ঢাকা পড়ে যায় স্বার্থের কবলে। পাহাড় সমান উঁচু নিচু পথ, চলতে গিয়ে পিচলে পড়ে দুমড়ে মুচড়ে যায় শরীরের অবয়ব। ভাগ্যহত জীবনে একি নিয়তির নির্মমতা!
গোয়াল ঘরে গরু-ছাগলগুলো খড়ের বেড়া ভেঙ্গে বাহিরে আসার জন্য করছে ডাকাডাকি শুরু করেছে। আব্দুল্লাহ গরু ছাগলগুলোকে বাহিরে এনে গাছের নিচে বেঁধে রাখে। তারপর তামাক সাজিয়ে হুক্কায় গুড়–ত গুড়–ত করে কয়েকটা টান দেয় আর ভাবে মেয়েটার মেয়েটার জীবনটাকে কি সে নিজ হাতে নষ্ট করে দিল? কিই বা করার ছিল তার? সে রাজি না হলে হয়তো কোন একটা অঘটন ঘটে যেতে পারতো। তারা যদি সবাইকে মেরে ফেলত? এ গ্রামে গরিবের কোন বিচার নাই। নির্মমভাবে প্রাণ দেয়ার চেয়ে জীবনটা নিয়েতো বেঁচে থাকতে পারবে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now