বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

অবরুদ্ধ জীবনের গল্প -১৫

"জীবনের গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মাজহারুল মোর্শেদ (০ পয়েন্ট)

X লেখকের নাম- মাজহারুল মোর্শেদ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প -১৫ ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতায় প্রশাসনের কোন বালাই নেই। কোউ কোন দিন দেখতেও আসেনা সেখানে কি হচ্ছে। দরিদ্র ও অশিক্ষিত মানুষগুলো নিজেদের মতো করে তাদের সন্তানদের বড় করে তোলে। এখানে না আছে কোন স্কুল-কলেজ, না আছে ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এ জন্য তারা মনে করে স্কুলে গিয়ে কি হবে? পড়া লেখা করে কতো ছেলে বেকার হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে তার চেয়ে বাপ-দাদার দেয়া সেই কৃষিকাজ শিখতে পারলে অন্তত নিজের জীবনটাকে চালিয়ে নিতে পারবে। মেয়েরা ঋতুবতি হলেই সমাজ মনে করে সে অনেক বড় হয়ে গেছে, বিয়ের উপযুক্ত হয়ে গেছে তার বিয়ে দেয়াটাই যেন মা-বাবার প্রথম কাজ। মেয়ে হয়ে জন্মেছে তারা মোটা ভাত-কাপড়ে জীবন যাপন করতে পারলেই হলো এরচেয়ে আর কি বেশী দরকার, আর কিই বা আশা করতে পারে তারা। তার বিপদ এখন চারিদিকে, এমনকি তার নিজের ঘরে থাকাটাও নিরাপদ নয়। সেখানেও সমাজপতি লম্পটদের চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ভাঙ্গা বেড়ার ফাঁক দিয়ে ভেতরে চলে যায়। গরীব ঘরের মেয়েরা জন্ম থেকেই কাজের মেয়ে। ছোট বেলা থেকেই ঘর-দোর ঝাড়া মোছা, কাপড় কাচা, রান্না-বান্না করা, এমন কোন কাজ নেই যে সে করেনা। আর খাবার বেলায় হাড়ির তলা ছেঁচে মুছে যা পাওয়া যায় তাদিয়েই গড়ে ওঠে তাদের দেহ মন। লোকের ভয়ে, সমাজের ভয়ে নিজেকে ঢেকে আড়াল করে পালিয়ে বেড়ানই তার প্রথম কাজ। তাতেও নিস্তার মেলে না অনেক সময়, হতে হয় বলির বধ্যপশু। এভাবে যে কতো মেয়ের কপাল পুড়েছে- তার কি কোন হিসেব আছে? তের চৌদ্দ বছরের কঁচি মেয়ে বিয়ে হচ্ছে দোজবরে পঞ্চাশের বুড়োর সঙ্গে। সেখানে আইনের কোন বালাই নেই। কারণ সমাজতো নিয়ন্ত্রণ করে তারাই যাদের তিন-চারটা বিয়ে করার সামর্থ আছে এ গ্রামের অধিকাংশ মেয়ের বিয়ে হয় আঠার বছরের নিচে অর্থাত বাল্য বিবাহ। বিয়ের মাহফিলে থাকেন অনেক নামি দামি মানুষ, সমাজপতি এমন কি জনপ্রতিনিধিরাও। সবাই মহা আনন্দে উল্লাসে যতো দ্রæত সম্ভব শুভ কাজটি সেরে ফেলেন। বাল্য বিবাহ হিসেবে কারও কোন মাথা ব্যথা নেই। বরং মেয়েটার বিয়ে হয়ে গেলেই পরিবারটি নরক থেকে উদ্ধার পায় এই তাদের ধারণা। মেয়েটার জীবন নিয়ে তাদের কোন চিন্তা নেই। ছোট মেয়েটি পুতুল খেলার বয়স পার না হতেই পৌছে যায় এক নরকীয় অগ্নি কুন্ডে, দেহের গঠনে পরিপক্কতা না আসতেই তাকে স্বামী নামক দেবতার যৌনতৃপ্তি, দৈহিক ও মানসিক প্রশান্তি, শ্বশুর শাশুড়ি সহ পরিবারের সবার সন্তুষ্টি অর্জন করতে হয়। তানাহলে শারিরীক, মানসিক আরও কতো প্রকার নির্যাতন যে তার কপালে লেখা থাকে সেটা একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন। অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে হওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি কাজ, কিন্তু কে শোনে কার কথা, যারা আইন তৈরি করে তারা তো আর আব্দুল্লাহর মতো গরির নয়, আইন তৈরি হয় শুধু আব্দুল্লাহদের জন্য। বড়লোকদের বেলায় কোন আইন নেই। তারা নিজেরাই আইন বানিয়ে সমাজকে শাসন করে, অন্যের ঘারে আইনের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে তাদেরকে দাবিয়ে রাখে যেন কেউ মাথা চারা দিয়ে দাঁড়াতে না পারে। যদিও বা দু’একজন মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দু’চার ক্লাস পর্যন্ত পড়ে এসকল অন্যায় ও অনাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে, রুখে দাঁড়াতে চায়, তখন ছলেবলে কৌশলে মিথ্যে অপবাদ দিয়ে তাদেরকে গ্রাম ছাড়া করা হয়। সমাজপতিদের চোখ বড় ভয়ানক, পথে বেরুলেই সে হোক না যৌবনবতী কিংবা বয়স চল্লিশ তাদের লোলুপদৃষ্টি এড়ানোর উপায় নেই। নারী মানে তাদের কাছে ব্যবহারযেগ্য ভোগ্য পণ্য একটা শরীর তাদের তাদের কাছে এর চেয়ে বেশীকিছু না। মূলত এ কারণেই মা-বাবা কোন ঝুট ঝামেলায় যেতে চান না। মেয়ে তার ঋতুবতি হলেই বর খোঁজার জন্য উঠে পড়ে লেগে যান, হোকনা সে জোয়ান মরদ কিংবা বুড়ো। মেয়েদেরকে এমন একটা জায়গায় গিয়ে বসতে হয়, যেখানে যা কিছুই ঘটুকনা কেন এর দায়ভার একমাত্র তারই। চারিদিক থেকে নানা রকম জল্পনা কল্পনা, ভৎসনার গ্লানী তাকে মুখ বুঁজে সহ্য করতে হয়। এসব অমানবিক অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে ক্ষোভের জ্বালায় জীবন কাহিনী যেন শেষ পরিচ্ছেদের শেষ পৃষ্ঠায় এসে পৌছে যায়। তখন তারা হয় গলায় দড়ি দেয়, নয়তো নদীতে ঝাঁপ দেয়। দেশভাগের পরবর্তী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বাস্তবতায় অনেক মানুষ ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতায় পালিয়ে এসে বসতি স্থাপন করে। সীমান্ত অতিক্রম করা এই মানুষগুলো শুধুমাত্র জীবন নিয়ে বেঁচে থাকা জন্য নিজের জমিজমা ও বসতভিটা ছেড়ে এসে এখানে মানুষের বাড়িতে দিনমজুর হিসেবে কাজ করে জীবন যাপন করছে। বিগত অর্ধশত বছরে ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতাবাসীর অনেকেই অভাবে পড়ে নামমাত্র মূল্যে মৌখিকভাবে সাদা কাগজে টিপসই দিয়ে তাদের জমিজমা বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছে। প্রভাবশালী ব্যক্তিরা অনেকের জমি জবরদখল করেছে অথবা ভয়ভীতি প্রদর্শন করে বা তীব্র অভাব ও নানাবিধ বিপদাপদের সুযোগ নিয়ে নামমাত্র মূল্যে তাদের জমি ক্রয় করেছেন। এক দাগের জমি বিক্রি করেছে একবিঘা কিন্তু বেদখল হয়ে গেছে পুরোটাই। ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতায় এমন একজন প্রভাবশালী ভ’মিদস্যু তিনকুড়ি খাঁ। তিনকুড়ি খাঁ ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতায় কবে এসেছে, কিভাবে এসেছে তার হুদিশ নেই। লোকমুখে শোনা যায় যে, তিনকুড়ি খাঁ এক নামকরা ডাকাত ছিল। হয়তো কাউকে খুন করে জেল থেকে পালিয়ে এসেছে এখানে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য। তিনকুড়ি খাঁ তার জীবন ও যৌবনের অধিকাংশ সময় ব্যয় করেছেন অর্থের পিছনে ছুটে। ন্যায়-অন্যায়, ভালো-মন্দ কোন কিছুরই বাদবিচা করার অবকাশ তার ছিল না। জীবনে কোন দিন কোন কিছুতেই তিনি পরাজিত হন নাই। তিনি যা কামনা করতেন যেকোন কিছুর বিনিময়ে সেটা তার হাতে আসা চাই। এজন্য যদি কাউকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে হয় তিনি তাতেও বিন্দু মাত্র দ্বিধা করতেন না। অর্থের জোর আর ক্ষমতার দম্ভ তাকে এতটাই নিচে নেমে দিয়েছিল যে, কোন খারাপ কাজই তার কাছে অন্যায় মনে হতো না। গ্রামের সবাই তাকে ভয়ে সমীহ করত আর সেটাকে সে সম্মান মনে করতো। মাত্রকয়েক বছরের মধ্যে তিনকুড়ি খাঁ ছোটখাট জমিদার হয়ে যায়। নিজের জমিজায়গা হারিয়ে অনেকে তার জমি বর্গাচাষ করে। যারা বর্গাচাষি তাদেরকে তিনকুড়ি খাঁ নিজের প্রজা মনে করে। আর সেই প্রজাদের কারো ঘরে সুন্দরী বোউ থাকলেও সেটা যেন তার অধিকারে চলে আসে। রাত-বিরাতে স্বামীকে বিভিন্ন কাজে দূরে কোথাও পাঠিয়ে দিয়ে সে তার বোউয়ের সাথে রাত কাটায়। অসহায় স্ত্রী প্রাণের ভয়ে তিনকুড়ি খাঁর সাথে রাত কাটাতে বাধ্য হয়। আয়নাল হক তিনকুড়ি মহাজনের জমি চাষ করে কোন রকমে সংসার চালায়। তার বাড়ির ভিটেটুকুও নেই। এই কাশ খড়ের বেড়া দিয়ে ঘেরা দু’খানা ঘর। রাজ্যের যতো আবর্জনা ভরা এক চিলতে উঠোন। বাড়ির চারপাশে কাশ আ্র নলখাগড়ার ঝোপ। সন্ধ্যা হলেই বনবিড়াল আর শিয়ালদের দৌড় প্রতিযোগিতা শুরু হয়। মাঝে মাঝে পথ ভুলে শিয়ালেরা ঢুকে পড়ে আয়নাল হকের বাড়িতে। বছর তিনেক আগে আয়নাল হকের বিধমা মা তাকে বিয়ে দেয় এবং কিছুদিনের মাথায় সে মারা যায়। সংসারে দুটি মাত্র প্রাণি আয়নাল ও তার বোউ। আয়নালের মা মারা গেলে তিনকুড়ি মনে মনে বেশ খুশি হয় এই ভেবে যে, এবার তার পথের কাঁটা চিরদিনের জন্য দূর হয়ে যায়। একেতো অভাব অনাটনের সংসার এ বেলার খাবার ওবেলা খায়, কখনো কখনো না খেয়েই সারাদিন চলে যায়। এভাবে অনাহারে, অর্ধাহারে রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে সারাদিন ক্ষেতে কাজ-কর্ম করতে গিয়ে আয়নালের মেজাজটা কেমন খিটখিটে হয়ে যায়। আর এ অবস্থায় বাড়িতে এসে যদি খাবারটুকুও না থাকে তাহলে কার মেজাজই বা ঠিক থাকে। তাই মাঝে মধ্যেই বাড়িতে কুরুক্ষেত্র বাধে। কাশ খড়ের বেড়ার ফাঁক দিয়ে ভেসে আসে আছিয়ার নারীকণ্ঠের ভয়ার্ত চিৎকার ছাড়! ছাড় ! ঘাটের মরা মোক ছাড়ি দে। ডেকুয়া মরা, কামাই করির পাইস না আর বাড়িত কি তোর মাও আসি খাবার দিয়া যায়? তোর সংসারোত তিন লাথ্থি, এলায় মুই বাপের বাড়ি চলি যাইম। আয়নাল বলে-শালির বেটি, মোর মরা বাপ-মাক গালি দেইস আইজ তোক মজা দেখাছো থাকিস। সারাদিন বাড়িত বসি থাকি থাকি তোর গায়োত ত্যাল জমিচে আর মোকে মেজাজ দেখাইস। হাতের কাছে যায় পায় অমনি তা দিয়েই ধুপ-ধাপ করে দু’চারটা বসিয়ে দেয় আছিয়ার পিঠে। মারের চোটে আছিয়া চিৎকার করে- বাঁচাও ! বাঁচাও! কায় কোন্টে আছেন মোক মারি ফেলাইল। মোক বাঁচাও ! নিজেকে বাঁচার জন্য আছিয়া দৌড়ে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিয়ে উচ্চস্বরে কাঁদে আর কেন বিনা কারণে তাকে আয়নাল মেরেছে সে ঘটনার ধারাবাহিক বর্ণনা করতে থাকে। তার বিবরণী শোনার জন্য উঠোনে পাড়ার জরো হওয়া লোকেরা ভিড় করে। অনেক মুরুব্বি গোছের দু’একজন লোক আয়নালকে বকাবকি করে চলে যায়। কেউ কেউ বলে-এভাবে একদিন আছিয়া আয়নালের হাতোত মার খ্যায়া মরিবে। আবার কেউ কেউ দুঃখ করে বলে-বেচারা আয়নালেরই বা কি দোষ? খ্যায়া না খ্যায়া যে একনা আবাদ-সুবাদ করে তাতো মহাজনক দিতেই চলি যায়। আর সারা বছরটা সে কি খ্যায়া বাঁচবে? প্যাটে ক্ষুধা থাকলে কি আর মনোত শান্তি থাকে, মন ভালো থাকে? ব্যাস, আজকের মতো খেল খতম! লড়াই যখন থেমে গেছে এখানে আর মিছেমিছি দাঁড়িয়ে থেকে লাভ কি? সবাই এক এক করে যে যার মতো বাড়ি চলে যায়। এমনি হর হামেশাই মারপিটের পালা চলে। পাড়া-পড়শিরাও তাদের এমন কুরুক্ষেত্র কাণ্ড দেখে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। প্রতিবারই মার খেয়ে পরনের কাপড়টা পোটলা করে হাতে নিয়ে আছিয়া বাপের বাড়ি চলে যায়। কয়েকদিন পর রাগ থেমে গেলে আয়নাল আবার তাকে নিয়ে আসে। কিন্তু এবার আছিয়া আর বাড়ি যাচ্ছে না। তাহলে কি সে নদীতে ঝাপ দেবে? নাকি নিত্য নৈমিত্তিক মার খার খাওয়াটাকে তার ভাগ্যের লিখন বলে মেনে নেবে। দরজা খুলে আছিয়া বাইরে এসে দাঁড়িয়ে ঘণ ঘণ শ্বাস নিচ্ছে। তার পরনের শাড়ি ছিঁড়ে গেছে, মাথার চুলগুলো কাকের বাসার মতো উস্কো-খুস্কো হয়ে আছে। ঘামে ভেজা সারা মুখে আঁচড়ের দাগ, প্রচণ্ড রাগে অভিমানে চোখদু’টো টলমল করছে। ক্রুদ্ধ ভঙ্গিতে হাফাতে হাফাতে এসে উঠেনের এক কোণে পোঁয়াল খড়ের স্তুপে ঠেস দিয়ে বসে অপলক দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। বেলাশেষে সূর্য ডুবে যাবার পর উঠোন জুড়ে ছেয়ে পড়ে গোধুলির ¤øান আলো। সেই আলোয় যেন বুকের ভেতর একরাশ ক্লান্তির অবসাদ। রাত্রির অন্ধকার এখনো গাঢ় হয়ে হয়নি, এমতবস্থায় রাস্তায় হেঁটে গেলে অনেকে তাকে দেখে হাসা হাসি করবে। তাই আছিয়া ঘরে গিয়ে বালিশে মুখ গুঁজে উপুর হয়ে শুয়ে আছে। আয়নালের ঘরে আসার শব্দ পেয়ে তার প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টির জন্য, তার মনে করুণা জন্মানোর জন্য নিজে নিজে সাপের মতো ফোঁস-ফাঁস করে কান্নার ভান করে। আয়নালও জানে তার বোউটার কোন দোস নেই। ঘরে খাবার নেই বলেই তো সে তাকে খেতে দেয় নাই, এতে তারই বা দোষ কি? অকারণে সে বোউটার ওপর অকথ্য নির্যাতন চালায়। মার খেতে খেতে যখন আর সহ্য করতে পারে না তখন সে চিল্লা-চিল্লি করে মানুষকে ডাকে। অসম্ভব সহ্যশক্তি তার, এতকিছুর পরেও সে তাকে খুব ভালোবাসে। কিন্তু কি থেকে যে কি হয়ে যায় পেটের ক্ষুধায় তার হিতাহিত কোন জ্ঞান থাকে না। ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় বোধের গভীরে চÐালের মতো প্রচণ্ড একটা ক্রোধ যেন তার দৃষ্টি শক্তিকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। আয়নাল মৃদু পায়ে কোন প্রকার শব্দ না করে আছিয়ার কছে যায়, সেই নিটোল নিস্তব্ধতার মধ্যে শোনা যায় তার বুকের অতল গভীর থেকে বেরিয়ে একটা তপ্ত দীর্ঘশ্বাসের শব্দ। আয়নাল মাথা নিচু করে যতোটা সম্ভব কণ্ঠস্বরে দরদ ফুটিয়ে তার মাথার চুলে আঙ্গুল দিয়ে আঁচড় কাটতে কাঁটতে বলে- বোউরে ক্যান যে মিছি-মিছি এমন করে মোর সাথে খারাপ ব্যবহার করিস? কি লাভ হয় তোর ক’তো? নিজেও কষ্ট পাইস আর মোকও কষ্ট দিস। বোউ? ও বোউ? এ্যাকনা শুনেক ক্যানে? আছিয়া রাগে, অভিমানে অগ্নিশর্মা হয়ে আবারও দূরে সরে যায়। আয়নাল জানে পুরুষেরা ক্ষুধার কথা বললে কোন নারী চুপ থাকতে পারে না, নিজে না খেয়ে সে খাবার এনে দেয় ক্ষুর্ধাত পুরুষটিকে। আছিয়ার যখন কোনভাবেই অভিমান ভাঙছে না সে তার চিরচেনা অস্ত্রটিকে কাজে লাগাতে গেল। আয়নাল বলল-বোউ মোর কথা যেন না শুনিস এবার কিন্তু সত্যি সত্যি মুই প্যাটের ভোগে মরি যাইম। তখন তোর দুনিয়া শান্তি হবে। তারপর তোর একটা ভাল্ স্বামী হবে, ক্যানে আরো মুই তোক কথায় কথায় মারো। তায় এলা তোক সারাদিন আদর-সোহাগ করি বেড়াবে। এবার আছিয়া আর বিছানায় শুয়ে থাকতে পারল না। মনে মনে ভাবল যথেষ্ট শাস্তি হয়েছে লোকটার। সারাদিন না খেয়ে ক্ষেতে কাজ-কাম করেছে মানুষটা সত্যি যদি মরে যায়? সে ধড়ফড় উঠে শিকায় তোলা হাড়ি থেকে দু’মুঠো চাল বের করে তাড়াতাড়ি চুলা জ্বালিয়ে চাল ভেজে একজগ পানি সহ খেতে দেয় আয়নালকে। আয়নালও জানে তার বোউটার পেটেও সারাদিন কিছু পড়ে নাই, তাই সে বোউটার হাত ধরে টেনে এনে দু’জনে মিলে একসাথে চালভাজা খায় আর একে অপরের দিকে তাকাতে হঠাত দু’জনার চোখাচুখি হয়ে যায। আবেগে উদ্বেলিত হয়ে নিজেকে সামলাতে না পেরে আছিয়া আয়নালকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করে। আয়নালও চোখের জলকে সামলে রাখতে পারে না। অভাব অনটনের সংসারে শত দুঃখ কষ্টের মাঝেও হঠাত করে যেন স্বর্গের দুয়ার খুলে যায়। তাদের ভাঙ্গা ঘরে সুখ উছলে পড়ে। তিনকুড়ি মহাজন আড়তে বসে পান চিবাচ্ছে, এমন সময় তাহের এসে সংবাদ দেয় যে, ঘরে খাবার না থাকায় আয়নাল তার বোউকে আজ খুব মেরেছে। মারের চোটে বোউটা মাটিতে পড়ে গড়াগড়ি দিচ্ছিল। আয়নালের বোউ মাটিতে পড়ে গড়াগড়ি দিচ্ছিল এ সংবাদ শোনার পর তিনকুড়ি মহাজনের কলিজাটা কেমন মোচড় দিয়ে ওঠে। আয়নালের আবাদি সব ধান সে বস্তায় ভরে নিয়ে এসেছে কারণ তার ঘরে খাবার থাকলে সে তিনকুড়িকে মানবে না, তার মাথায় শিং গজাবে। তাই নয়-ছয় একটা হিসাব দার করে তার ধানের চেয়ে তিনকুড়ি বেশি টাকা পায়। তাহেরকে একবস্তা চাল আয়নালের বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে বলে, সে সোজা চলে আসে তার বাড়ি। তিনকুড়ি মহাজন আয়নাল ও তার বউকে ডেকে বলে- তোমা ক্যানে যে মিছিমিছি এমন ঝগড়া বিবাদ আর মারপিঠ করেন, কায় জানে। কি লাভ হয় তোমার কও তো? আরে অভাব অনটনের সংসারে দুঃখ কষ্টে জীবন যাবে সেই জন্য কি বোউকে ধরি মারা নাগবে আয়নাল? তোর বাড়িত খাবার নাই, তুইকি মোক একবারো কথাটা কইছিলু? কি চুপকরি আছিস ক্যানে? কথার উত্তর দে? আয়নাল মাথা নিচু করে বলে-না মহাজন, আর কতো ঋণ কঁরো তোমার কাছোত। এমনিতে তো মুই ঋণোত একেবারে ডুবি আঁছো। সেটা তোক ভাববার নাগবে না, মুই বুঝিম। আর কোন দিন যেন মোর কানোত না আইসে যে তুই বোউকে মার-ধর করিস। আচ্ছা মহাজন। সেটা আছিয়াক ভাল করি কন, ওয় ক্যান যেলায়-সেলায় মোর বাপ-মাওক নিয়া গালি গালাজ করে। মুই যেটা সহ্য করির পাও না। আয়নালকে থামিয়ে দিয়ে আছিয়া ঝাঁঝিয়ে ওঠে-আসলে তোমা কি কবার চান, কওতো শুনি? মহাজনের কাছোত মোর নামে নালিশ দিয়া তোমা ভাল্ মানুষ সাজিবার নাগচেন? এবার তিনকুড়ি একটু ঘাবড়ে যায়-উঃ কি সাঙ্ঘাতিক মহিলারে বাবা! মেজাজ তো নয় যেন খাপ-খোলা ছুরি। একনা হাত ফসকি এদিক-সেদিক গেলেই সবকিছুই কাটি একেবারে টুকরা টুকরা করি ফেলাবে। তিনকুড়ি বলে-আচ্ছা ঠিক আছে তোমা এবার দু’জনে থামো, মোর একনা কথা শোন, এক বস্তা চাউল আসিবার নাগছে তোমার আর ঝগড়াঝাটি করার দরকার নাই, মিলেমিশে থাকো। আরে আয়নাল মুইতো এলাও মরি যাঁও নাই, আর তোমা মোরে মাটিত বাড়ি করি থাকি দিন-রাইত দাঙ্গা-মারি করবেন, কাজিয়া ফ্যাঁসাত করি পাড়ার মানসিক জরো করবেন তাহলে কি মোর মান সম্মান থাকবে? এরই মধ্যে আয়নাল ছাগলগুলো আনার জন্য বাহিরে যায়। এবার তিনকুড়ির নজর গিয়ে পড়ে আছিয়ার উপর। আছিয়া তখনো ছেঁড়া কাপড়খানা বদলায় নাই। ছিঁড়ে যাওয়া কাপড়ের ভেতর দিয়ে তার দেহের লোভনীয় অংশের বেশীভাগটাই তিনকুড়ির চোখে জ্বল-জ্বল করে ওঠে। আছিয়াকে ভালো করে দেখার উপায় হিসেবে তিনকুড়ি বলে- আছিয়া, এ্যাকনা পানি খাওয়াতো। তোমারগুলার সাথে ফ্যাদলা পাড়তে পাড়তে মোর গলাটায় শুকি গেইল। আছিয়া এক গøাস পানি এনে তিনকুড়িকে দেওয়ার জন্য হাত বাড়িয়ে দেয় কিন্তু তিনকুড়ি মহাজন পানির গøাসের চেয়ে আছিয়ার দেহের দিকে বেশি মনোযোগী হয় ফলে তার হাত পানির গøাসে স্পর্শ না হয়ে আছিয়ার হাতের বেশিভাগটাই স্পর্শ করে। মারের ব্যথায় তিনকুড়ির হাতের স্পর্শ আছিয়ার ভেতর তেমন প্রভাব ফেলতে না পারলেও তিনকুড়ির দেহে বিদ্যুৎ চমকে য়ায়। ঠিক সেই মুহুর্তে আয়নাল ঘরে এসে উপস্থিত না হলে হয়তো ঘটনাটা অন্য দিকে মোড় নিতে পারতো। এবার তিনকুড়ির যতো রাগ এসে পড়লো আয়নালের উপর। ব্যাটা-শালা আর সময়ে পেলো না? তাকে সেই মুহুর্তে ঘরে আসতে হবে কেন? ব্যাটা জানে না যেন মহাজন ঘরোত আছে। চালের বস্তাটা আয়নালের উঠানে রেখে তাহের আর হাবা বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে বিড়ি টানছে। হাবা বলে- তাহের ভাই আয়নাল যেলায়-সেলায় আছিয়াক ধরি মারে, মোর তো মনে হয় কোন দিন যেন একটা অঘটন ঘটি যায়। আছিয়া কিন্তু সহজ বেটিছওয়া নয়, ভয়ানক বেটিছওয়া। মুই অক ছোট থাকি চেন, মোর মামার বাড়ির পাশোত ওমার বাড়ি। ওমার পাড়ার একটা চ্যাংরা একদিন কি যেন একটা খারাপ কথা কয়া গালি দেয় তাক, আছিয়া সবার সামনে সেই চ্যাংরাক কান ধরি টানি আনে। সেইদিন থাকি চ্যাংরাটা ওই কান দিয়া কিছুই শুনিবার পায় না। সেই দিন থাকি পাড়ার কোন চ্যাংরা তার বগোল দিয়া হাঁটে না, তাক খুব ভয় পায়। তিনকুড়ি সুযোগ খুঁজতে থাকে কিভাবে আয়নালকে কয়েকদিনের জন্য দুরে কোথাও পাঠানো যায়। শিকারকে বাঁকে আনার জন্য শিকারি যেমন লোভনীয় বস্তু তার সামনে রেখে দেয় তিনকুড়িও আয়নালকে কাছে টানার জন্য তার মহাজনি কারবারের কাজে লাগায়। মানুষ বিপদে-আপদে প্রযোজনীয় জিনিস বন্ধক রেখে সুদের বিনিময়ে টাকা ধার নিতো। সময় পার হয়ে গেলে সুদে-আসলে যে টাকা হয়েছে বন্ধকি জিনিসের দামের চেয়ে অনেক বেশী। কাজেই সেটা ফেরত না দিয়ে তিনকুড়ি জিনিসগুলো অনেক বেশী দামে বিক্রি করে দিতো। আর এ জিনিস বিক্রির কাজে লাগিয়ে দেয় আয়নাল হককে। একদিন তিনকুড়ি মহাজন অনেকগুলো গহনা নিয়ে ভারতের শিলিগুড়িতে মহাজনের কাছে আয়নালকে পাঠিয়ে দেয়। আয়নালের বোউ তার বাপের বাড়ি যেতে চাইলে তিনকুড়ি বলে- ‘দরকার নাই আয়নালতো কাইলে আসির নাগছে। রাইতোরত তোর সাথে এ্যালায় মিনুর মাও আসি থাকিবে।’ মহাজনের কথা বিশ্বাস করে সহজ সরল আয়নাল চলে যায় শিলিগুড়ি। সেই সুযোগে তিনকুড়ি রাতে আয়নালের বাড়ি যায়। আয়নালের বোউকে তার কথায় রাজি না হলে মেরে ফেলার হুমকি দেখেয়ে তার সাথে রাত কাটায়। এর পর থেকে তিনকুড়ি খাঁ দু’চারদিন পরপর আয়নালকে এখানে সেখানে পাঠিয়ে দিয়ে দিয়ে তার বোউয়ের সাথে রাত কাটায়। কথায় বলে-“পাপের কথা না থাকে ছাপি” একদিন না একদিন সেটা প্রকাশ হয়ে যায়। আয়নালের ক্ষেত্রেও তাই হলো- তিনকুড়ি খাঁ একদিন রাতের বেলায় আয়নালকে পাঠিয়ে দেয় মেখলীগঞ্জের মহাজন পল্টু বাবুর কাছে। তাকে বলা হয় যে, দিন কাল খুব খারাপ টাকা পয়সা নিয়ে রাতে আসার দরকার নাই, কাল দিনের বেলা আসলেও হবে। কিন্ত আয়নাল মেখলীগঞ্জে যেয়ে দেখে মহাজন কোলকাতা চলে গেছে। তাই সে দেরি না করে বাড়ি ফিরে আসে। তার বাড়ি ফিরে আসটাই জীবনের কাল হয়ে দাঁড়ায়। আয়নাল বাড়িতে এসে তিনকুড়ি খাঁর সাথে তার বোউকে অপ্রীতিকর অবস্থায় দেখে হতভম্ব হয়ে মনের অজান্তেই চিৎকার দিযে ওঠে। তার চিৎকার শুনে পাড়া প্রতিবেশীরা ছুটে আসলে তিনকুড়ি খাঁ দা দিয়ে এক কোপে তার মাথাটা দেহ থেকে আলাদা করে পালিয়ে যায়। সবাই জিজ্ঞাসা করলে আয়নালের বোউ জরিনা, প্রাণের ভয়ে তিনকুড়ির কথা চেঁপে যায়। কিছুক্ষণ পর তিনকুড়ি খাঁ তার লোকজন নিয়ে এসে সবাইকে বলে- আইজ বিকালে মুই আয়নালক মেখলীগঞ্জে পল্টু বাবুর কাছোত টাকা আনির জন্যে পাঠাইছিনু। মোর-তো মনে হয় এই টাকার জন্যে কাঁও ওর পাছে পাছে লাগিছিলো কিন্তু রাস্তায় লোকজন থাকায় হয়তো সে সুযোগ না পায়া তার বাড়ি পর্যন্ত চলি আইসে আর ওক মারি ফ্যালে মোর টাকা পাইসাগুলা তামান ধরি যায়। আহারে! মোর জন্যেই আইজ আয়নারটার জীবন গ্যালো। বেচারা এতিম মানুষ, জীবনে কোন দিন মোর অবাধ্য হয় নাই। যতো রাইতে হোক কোনটে পাঠে দিলে তায় কোনদিন মোক না কথা কয় নাই। তিনকুড়ি মহাজন ঘাড়ের গামছা দিয়ে মিছামিছি চোখ মুছে আর সবাইকে দেখায় যে আয়নাল হকের জন্য তার কতোটা কষ্ট হচ্ছে। চোখ মোছা শেষ হলে তিনকুড়ি মহাজন বলে- তোমা সবায় মিলি লাসটা দাফনের ব্যবস্থা কর। মুই কাপড় আনার জন্য তাহেরক ধাপড়ার হাটোত পাঠে দিবার নাগচু। পরের দিন সকালবেলা লাস দাফনের কাজ সম্পন্ন হয়ে গেলে তিনকুড়ি নিজে আয়নাল হকের বোউ আছিয়ার কাছে এসে গতরাতে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার জন্য ক্ষমা চায় এবং তাকে তার বাড়ি নিয়ে যায়। এরপর তিনকুড়ি খাঁ আছিয়াকেও বিয়ে করে। কিন্তু বেচারি আছিয়া নীরিহ স্বামীর অকাল মৃত্যুটা কোন ভাবে মেনে নিতে পারে নাই। তাই শোকে-দুঃখে কয়েক মাসের মাথায় সেও এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়। সবঘটনার মাঝেও তিনকুড়ি খাঁর আয়লাল হকের মেখলীগঞ্জ যাওয়ার রহস্যটা মাথা থেকে যাচ্ছে না। এরকম আর দশটা আয়নাল মরে গেলেও তার কিছু আসে যায় না কিন্তু তার মাথায় শুধু একটা বিষয় সবসময় ঘুরঘুর করতে থাকে যে, আয়নাল হক কি তার বোউয়ের ব্যাপারে কোন কিছু জানতে পেরেছিল? আর সে জন্যই কি সে মেখলীগঞ্জ না যেয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ি বাড়ি ফিরে আসে। নাকি বি.এস.এফ তাকে মেখলীগঞ্জ যেতে দেয় নি সে জন্য সে অর্ধেক রাস্তা থেকে ফিরে আসে। সব ঘটনার জট খোলার জন্য সে কাচারি ঘরে যায়। বিছানায় দু’টো বালিশ একসাথে উঁচু করে নিয়ে হেলান দিয়ে বসে হাবাকে তামাক সাজাতে বলে। হুক্কোর নলে পরপর কয়েকটা টান দিয়ে হাবাকে বলে- এই হাবা তাহের কোন্টেরে? আছে মহাজন, অয় চাউলের বস্তাগুলা উপরোত তুলি থুবার নাগচে। ওক তাড়াতাড়ি ডাকে আনেক কাজ আছে। তাহের ধড়ফর করে এসে হাফাতে হাফাতে একটু দুরে দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে বলে- মোক ডাকের নাগচেন মহাজন? হ্যাঁ- রে গাধা, মুই কি কঁও মন দিয়া শুন। কঁও মহাজন, মুই শুনির নাগচু। তুই এলায় সাইকেল ধরি মেখলীগঞ্জে মহাজনের কাছোত যাবু। তারপর মহাজনক কবু যে, আয়নালকে তায় কোন টাকা পাইসা দিচে কি না। এ্যাকনা কোন্টে দেরি করিবু না খালি যাবু আর আসিবু। যা তাড়াতাড়ি। বিকেলবেলা তিনকুড়ি আড়তে বসে ভাবছে তার জীবনে এমন ঘটনা আর কখনো ঘটে নাই। শুধু একটা নীরিহ ছেলেকে মেরে ফেলতে হলো। আছিয়া মুখ খুললে ঘটনাটা অন্যদিকেও মোড় নিতে পারতো। সে তার মান সম্মান বাঁচিয়েছে এ জন্য তার উপর সে কৃতজ্ঞ। এমন সময় তাহের মেখলীগঞ্জ থেকে ফিরে এসে জানায় যে, পলটু মহাজন কোলকাতা চলে যাওয়ায় আয়নাল তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আসে। এতোক্ষণে তাহেরের কাছে আসল সংবাটা পাওয়ায় তিনকুড়ি খাঁ হাফ ছেড়ে বাঁচে। আয়নাল মরি গেইছে যাউক, মোর টাকা পাইসারতো কোন ক্ষতি হয় নাই। হাবা এসে বলে- মহাজন, সৈয়দ পাড়ার তোফা পাগলা তোমার সাথে এ্যাকনা দেখা করিবার চায়, তার নাকি জরুরি কাম আছে। ডাকাইম এ্যাটেকোনা? আচ্ছা আসির ক’। শালার ঘর মোক শান্তিতে থাকির দিবে না। তোফা পাগলা এসে মাথা নিচু করে তিনকুড়ির পাশে দাঁড়ায়। তিনকুড়ি মহাজন তোফাকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত ভালো করে দেখে মনে মনে বলে-‘আহারে তোফা মিয়া, একদিন তোর বাপ গরু চুরির অপরাধে মারতে মারতে মোর পিঠির চামড়া তুলি দিছিল আর আইজ কিনা তার বেটা টাকার জন্যে মোর সামনোত মাথা তলোত করি খাড়া হয়া আছে’। মোর মনটা কয়- আইজ শালাক কব্বোর থাকি তুলি আনি দেখাও যে, শালা দ্যাখ তোর বেটা আইজ মাথা নিচু করি আছে। এই হাবা? চেয়ারখান এদিকোনা আগেদেতো তোফা মিয়া এ্যাকনা ভাল্ করি বসুক। হাজারো হলেও ওয় খান্দানী বংশের ছওয়া। তিনকুড়ি মহাজন হুক্কায় একটা টান দিয়ে বলে- কি তোফা মিয়া, কি মনে করি আইজ এত্তিকোনা আসিলেন। মহাজন, মুই একটা বিপদে পড়ি তোমার কাছোত আসিনু। আরে মিয়া, মোর কাছোত তো সবাই বিপদে পড়িই আইসে, আর বিপদ কাটি গেইলে যা-তা করি গালি দেয়। হাবা বলে- হ্যাঁ মহাজন, মোকও আরো ট্যারে ট্যারে দেখি গাইলায়। তোফা মিয়া, এ্যালা কঁও দেখি তোমা কিসের জন্য আইচ্চেন? মহাজন মোর চোট বেটিটার বিয়া ঠিক হইচে, সেই জন্য হাজার পাঁচেক টাকার দরকার। ম্ইু জমির দলিল সাথে ধরি আচ্চু, দলিলখান নিয়া মোক পাঁচ হাজার টাকা দেও। আর আমন খন্দে মুই তোমাক টাকা বুঝি দিয়া দলিল নিয়া যাইম। তাতো বুঝনু মিয়া, কিন্তু তোর বাড়ি তো ম্যালা দূরোত, ওত্তিকোনা টাকা আনির যাবে কায়? সেটা তোমাক চিন্তা করির নাগবে না মহাজন। টাকা ধরি মুই নিজে চলি আসিম। সেই কথা যেন মনে থাকে মিয়া। সবাই টাকা নেওয়ার সময় একই কথা কথা কয় কিন্ত টাকা দেওয়ার সময় সেটা কারও মনে থাকে না। তিনকুড়ি খাঁ কেরানি ছলিমুদ্দিনকে ডেকে বলে- তোফা পাগলার কাছোত দলিলে সই সম্পাত নিয়া তাক পাঁচ হাজার টাকা দে’। ছলিমুদ্দিন তোফা পাগলার দিকে বাঁকা চোখে দেখে আর মনে মনে হাসে। তার কোলে বসানো কাঠের বাক্সে থেকে একটা মোটা খসখসে কাগজ বের করে-তাতে দুই এক ছত্র লিখে বলে- পাগলা দে’-দেখি তোর বাম হাতটা। বুড়ো আঙ্গুলে খুব যত্ন করে কালি মাখিয়ে একটা টিপসই নিয়ে কাগজটা বাক্সেও ভিতর রেখে দিয়ে তাকে পাঁচ হাজার টাকা গুনে দেয়। কোন প্রকার চাটুকারিতায় অভ্যস্ত নয় বলে তোফা পাগলা কিছুই বুঝতে পারল না সেখানে আসলে কি ঘটল। শুধু তোফা পাগলা কেন, তিনকুড়ির চাটুকারিতা কেহই ধরতে পারেনা। যে একবার তার ফাঁদে পড়েছে তার আর রক্ষে নেই, আজ না হোক কাল সে সর্বশান্ত হবেই।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১১৬ জন


এ জাতীয় গল্প

→ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প -১৫

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now