বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

অবরুদ্ধ জীবনের গল্প -১৪

"জীবনের গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মাজহারুল মোর্শেদ (০ পয়েন্ট)

X লেখকের নাম- মাজহারুল মোর্শেদ যখন আমেনার কথা মনে পড়ে, মরুভুমির উত্তপ্ত বালুতে হঠাত এক পশলা বৃষ্টি যেমন সবকিছুকে শীতল করে দেয়, তেমনি তিনকুড়ির বুকেও একটা শীতল আবেশ অনুভব হয়। তাহের আর হাবাকে সে পাঠিয়ে দেয় আমিনার বাড়ি। তাহের এসে সেই তালাকনামা আমিনার হাতে দেয়। তালাকনামা দেখে আমেনা বলে- কিশের জন্য সে আমাকে তালাক দেবে, বিয়ের পর থেকে এ পর্যন্ত তার সাথে আমার কোন দিন ঝগড়া হয় নাই। সে কোন দিন আমাকে একটা খারাপ কথাও বলে নাই, কোনদিন গাল-মন্দ করে নাই। তাছাড়া বউ তালাক দেয়ার মতো মানুষ সে না। এটা লুচ্চা, বদমাশ, চরিত্রহীন তিনকুড়ির ষড়যন্ত্র। এই বলে সে তালাকনামা তাদের মুখের সামনে ছিড়ে ফেলে। আমেনা কোন ভাবেই তা মানল না। কিন্তু না মানলে কি হবে, হাতের নাটাই তো তিনকুড়ির হাতে। আমেনার বাড়াবাড়িতে তিনকুড়ির জেদ আরও বেড়ে গেল, শ্রবণেন্দ্রিয় আরো সচকিত আরো তীক্ষ্ণ হয়ে উঠলো, তার দাহ্য অনুভুতিতে আরও বেশী তাপ লাগল, মাংসের স্বাদ পাওয়া শিকারি বাঘের মতো ্আরো হিংস্র হয়ে উঠল। তিনকুড়ির আমেনাকে সংবাদ পাঠাল এই বলে যে ধলা বয়াতিকে সে বেঁধে রেখেছে, আমেনা যদি তাকে বিয়ে না করে তাহলে আজ রাতেই ধলাকে মেরে ফেলা হবে। আমেনা তিনকুড়ির ক্ষমতা ও টাকার জোর যে কতোটা ভয়ানক তা সে জানে, তার হাত এতোটাই লম্বা যে, তার সাথে যে ব্যক্তি টক্কর দেবে সে ইণ্ডিয়া কেন চাঁদের দেশে থাকলেও তাকে ধরে এনে টুকরো-টুকরো করে কেটে তিস্তা নদীতে ভাসিয়ে দেবে। কাজেই ধলা বয়াতিকে সে যে ধরে নিয়ে গেছে এটা তার অবিম্বাসের মধ্যে একবারেও পড়ে নাই। সহজ সরল মনে সে স্বামীর জীবন বাঁচানোর জন্য সে তিনকুড়ির প্রস্তবে রাজি হয়া যায়। তিনকুড়ির বাড়ি এসে আমেনা জানতে পারে যে, সেটা ছিল তিনকুড়ির একটা বানানো চাল। পরের দিন সুযোগ বুঝে আমেনা তিনকুড়ির বাড়ি থাকি পালিয়ে বাপের বাড়ি চলে যায় আর কোন দিনও সে ফিরে আসে নাই। তিনকুড়ি মহাজন কতোবার তার লোকজনকে পাঠিয়েছে, কতোবার সম্পত্তির লোভ দেখিয়েছে, কতোবার তাকে মেওে ফেলার হুমকি দিয়েছে কিন্তু আমেনা কোন দিনই তার দিকে ফিরেও তাকায় নাই। বউয়ের শোকে মনের দুঃখে ধলা বয়াতী সেই যে বাড়ি ছেড়ে চলে যায় আর কোর দিনও বাড়ি আসা তোদূরের কথা এই গ্রামে পা দেয় নাই। বেচারা ধলা মিয়া বৈষ্ণব সেজে আজ এ আশ্রমে তো কাল ও আশ্রমে দল বেধে গান গেয়ে বেড়ায় আর মানুষ দক্ষিণা হিসেবে যা দেয় তাই খায়। গাছের তলে, খোলা আকাশের নিচে নরম ঘাসের ওপর শুয়ে রাত কাটায়। হুক্কায় তামাক ভরে টানতে টানতে বেহুশ হয়ে পড়ে থাকে। পৃথিবীর ওপর তার কোন মায়া নই।“এহ জগত তাকে অনেক ঠকিয়েছে সে আর ঠকতে চায় না। এখন পরজগতের মায়ায় ব্যাকুল হয়ে বাকি জীবনটা কাটাতে চায়”। মহাজনি কারবারে মানুষ বিপদে-আপদে সোনা-রুপোর গহনা, কাঁসা-পেতলের ঘটিবাটি এমনকি সাইকেল, ঘড়িও তার তার কাছে বন্ধক রেখে চড়া সুদে টাকা ধার নিত। আর যারা বেশী টাকা নিয়েছে নির্দিষ্ট সময় পর খুব কম সংখ্যক লোকই বন্ধকি জিনিস ফেরত পেয়েছে। নিঃসন্তান করিমন বেওয়া স্বামীর চিকিৎসার জন্য জীবনের শেষ সম্বল মায়ের দেওয়া স্বর্ণের বালা জোড়া তিনকুড়ি মহাজনের কাছে বন্ধক রেখে টাকা নিয়ে যায়। অন্ধের যষ্ঠির মতো স্বামী তার, কপাল দোষে একদিন সেও চলে গেল না ফেরার দেশে। এর ওর বাড়িতে কাজ র্কম করে খেয়ে না খেয়ে জমাতে জমাতে একদিন সে টাকা জোগার হলে তিনকুড়ির কাছে যেয়ে তার বালা জোড়া ফেরত চায়। অনেক গুলো জিনিসের মধ্যে তার বালা জোড়া কোথায় আছে সেটা খুঁজে পেতে সময় লাগবে বলে তাকে সন্ধ্যার পর আসতে বলেন তিনকুড়ি মহাজন। কথামত সন্ধ্যার পর করিমন বেওয়া চলে আসলে তাকে কাচারি ঘরে বসে রেখে তিনকুড়ি মিছেমিছি এটা সেটা খুঁজে আর একটু রাত হওয়ার জন্য অপেক্ষা করে। অবশেষে মহেন্দ্রক্ষণ এসে পড়লে তিনকুড়ি তার চেলা-চামচা হারু আর হাবাকে ইশারা দেয়। হারু করিমনকে বলে-ভাবী, মহাজন তোমার বালাজোরা যে কোন্টেকেনা থুছে তা খুঁজি পাইতেছে না । মহাজন তোমাক চা খাবার কইল, খুঁজি পাইলে ডাকে দিবে। করিমন ভিতরে প্রবেশ করা মাত্র হারু সামনের দরজা আটকে দেয়, পিছনের দরজা দিয়ে তিনকুড়ি ঘরে ঢুকে বলে-এত যাই যাই করিস ক্যান করিমন? বাড়িত তো তোর কাঁও নাই। বাড়িত থাকা আর এ্যাটেকোনা থাকাতো একে কথাা। তার চাইতে এ্যাটেকোনা একনা বইসেক গরম গরম জিলাপি খাই আর সুখ-দুঃখের কথা কই। তিনকুড়ির এমন শয়তানি কথা শুনে করিমন বেওয়া তেলে বেগুণে জ্বলে ওঠে সাপের মতো ফ্যানা তুলে বলে-মোর বাড়িত যাওয়া-না যাওয়া নিয়া তোমার এতো ক্যানে মাথাত বিষ মহাজন? তোমা টাকা নিয়া মোর বালাজোড়া ফেরত দিবেন, তারপর মুই বাড়িত যাঁও না-দোযখে যাঁও সেটা মোর ব্যাপার। তিনকুড়ি মহাজনের সামনে আজ পর্যন্ত চোখ তুলে কথা বলার সাহস কারও হয়নি, করিমনের এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ তিনকুড়িকে ধৈর্য্যের সর্বোচ্চ সীমা পর্যন্ত পৌছে দেয়। তিনকুড়ি মুখে কিছু লালা জমিয়ে একটা ঢোক গিলে শুকনো গলা সাময়িক কালের জন্য ভিজিয়ে নিয়ে নিজেকে সংবরণ করে নিয়ে বলে- ক্যান করিমন, আজ তুই এমন ফটর ফটর করিবার নাগছিস? এ্যাটেকোনা এ্যাকনা বোইসেকতো, গরম গরম জিলাপি খ্যায়া মাথাটা ঠাণ্ডা কর। তিনকুড়ি বারবার হারুর দিকে তাকায় কারণ সব ঠিকঠাক আছে কি না সে সংকেতের অপেক্ষায়। তার কাছ থেকে সবুজ সংকেত এলে- দীর্ঘ দিনের অনাহারি ক্ষুধার্ত সিংহ যেমন প্রথম দর্শনে লাফিয়ে পড়ে শিকারের উপর, ঠিক তেমনি তিনকুড়িও লাফিয়ে পড়ে করিমনের উপর। অমনি সে মাটিতে পড়ে যায় তার আঁচল খসে পড়ে মুঠো থেকে। এলোখোঁপা খুলে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে রাশি রাশি মেঘবরণ কালো চুল। আর সেই চুলের গন্ধে যেন হারিয়ে যায় তিনকুড়ি। তার দু’হাতের আঙুল শিকারি সিংহের চেয়েও বেশি হিংস্র হয়ে ওঠে, টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে খেতে চায় করিমনের প্রতিটি অঙ্গ প্রতঙ্গ। মাটিতে পড়ে করিমনের অনুভব হয়-হঠাত একটা ঘুর্ণিঝড় এসে যেন তাকে উড়ে নিয়ে যাচ্ছে। আর সে ঘুর্ণিঝড়ের তাণ্ডবে কেবল ঘুরছে, প্রতিটি মুহুর্তে ঘুরছে, চোখের পলক ফেরার চেয়েও বেশি দ্রুত গতিতে ঘুরছে। বাতাসের ধাক্কায় তার হাড়-গোড় সব ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে। মস্তবড় একটা বিষধর অজগর সাপ শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে তাকে প্যাঁচিয়ে আঁকড়ে ধরে আছে। তার নড়া-চড়া করার মতো কোন শক্তি নেই। চোখ তার ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসছে। সমস্ত শরীর যেন অবশ হয়ে গেছে। এখন তার কোন চঞ্চলতা নেই, নিজেকে রক্ষা করা কোন চেষ্টাও নেই। প্রচণ্ড ঝড়ের তাণ্ডবে বিদ্ধস্ত হয়ে যাওয়া দেহ মন যেন নিঃশ্বেষ হয়ে গেছে। সে শুধু চোখ বন্ধকরে আকশ্মাৎ ঘটে যাওয়া স্মৃতির মন্থনে ঘোর পাক খাচ্ছে। তিনকুড়ি মহাজন তার মহাযজ্ঞ শেষ করে বীরদর্পে ফিরে এসে গদিতে বালিশে হেলান দিয়ে আধ-শোয়া হয়ে বলে-হারু হুক্কাটা দে’। হারু হুক্কায় নতুন তামাক সাজিয়ে তাতে আগুন দেয়, তারপর মহাজনের হাতে হুক্কার নলটি দিয়ে বলে-মহাজন মুই চাউলের বস্তাগুলা উপরোত তুলি থঁও। কোনকিছু নাগলে মোক ডাকান। আচ্ছা তুই যা-কাজ কর। আর শোন, এ্যাকনা পর য্যায়া দেখিসতো- ঐ বালটা বাঁচি আছে না মরি গেইছে। আচ্ছা মহাজন, কাজটা শ্যাষ করি মুই যাইম এলা। চালের বস্তা সরানো নয় হারুর আসল উদ্দেশ্য হলো কাজের ওসিলায় মহাজনের চোখের আড়াল হয়ে করিমনের কাছে আসা। আসলে করিমন বেঁচে আছে না কি মহাজন তাকে মেরে ফেলেছে, সেটা দেখা। মহাজনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে হারু খুব দ্রুত চলে আসে তিনকুড়ির খাস কামরায়। এখানে এসে দেখে বস্ত্রহীন করিমন সটাং হয়ে মাটিতে পড়ে আছে। তার চোখ বন্ধ, কোন নড়াচড়া নেই। বেঁচে আছে না কি মরে গেছে সেটাও জানার উপায় নাই। কৌতুহল বসত হারু তার নাকের কাছে হাত দিয়ে দেখে শ্বাস-প্রশ্বাস চলছে। করিমনের নগ্নদেহ দেখে তার যৌবিক অনুভুতি জাগ্রত হয়ে সমস্ত শরীরে শিহরণ জেগে ওঠে। পরক্ষণে তিনকুড়ির ভয়ে আবার তা শীতল হয়ে যায়। মাথা নিচু কওে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। করিমন এভাবে কতক্ষণ পড়ে থাকে তা সে নিজেও জানে না। চারিদিকে নিস্তব্ধ প্রকৃতি কোথাও কোন শব্দ নেই অতি কষ্টে হাঁপাতে হাঁপাতে সে উঠে বসল, কিন্তু তার দেহে চলার শক্তি নাই। তবুও তাকে উঠতে হবে, বের হয়ে যেতে হবে এখান থেকে, দ্রæত পালাতে হবে। নইলে খানিক পরে ‘কালের পাঁঠা’ আবারও এসে ঝাপিয়ে পড়বে তার শরীরের ওপর। করিমন তিনকুড়ির খাস কামরা থেকে বের হয়ে কাচারি ঘরের দিকে যেতে দেখে হারু চিত হয়ে হাত পা ছড়িয়ে মহা আয়েশে ঘুমাচ্ছে। হারুকে দেখে করিমনের নিস্তেজ শরীরের সমস্ত রক্ত টগবগ করে উঠে, প্রতিটি শিরা-উপশিরা ফুলে রক্তগুলো মাথায় উঠে যায়। কোথা থেকে যেন এক ঐশ্বরীয় শক্তি এসে ভর করে তার শরীরের উপর। সে এক লাফদিয়ে হারুর বুকের উপর উঠে বসে। দু’পা দিয়ে হারুর হাতদু’টো আটকে রাখে। তার মাথার বালিশ নিয়ে দু’হাত দিয়ে শরীরের যতোটকু শক্তি আছে তার সবটুকু দিয়ে হারুর মুখের উপর চেঁপে ধরে। ঘুমন্ত অবস্থায় শুধু পা গুলো ধড়ফড়-ধড়ফড় করে এক সময় তার নিশ্বাস বেরিয়ে যায়। হারু মরে গেছে নিশ্চিত হওয়ার পর সে কাচারি ঘরের এখানে সেখানে সব জায়গায় তন্ন তন্ন করে তিনকুড়িকে খুঁজে বেড়ায়, কিন্তু না, তাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া গেলো না। সম্ভবত সে বাড়ি যেয়ে বোউয়ের পাশে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। করিমন মনে মনে ভাবে তিনকুড়ির অনেক ক্ষমতা, টাকার জোরে সে মুহূর্তের মধ্যে দুনিয়াটাকে উলট-পালট করে দিতে পারে, যখন-তখন নাই করে দিতে পারে। হারুকে খুন করার অপরাধে তার নিস্তার নাই। মাটির তলেও লোক পাঠিয়ে সে তাকে খুঁজবে। তাকে ধরতে পারলে কেটে টুকরো টুকরো করে নদীতে ভাসিয়ে দেবে। তার চেয়ে ভালো এই গ্রাম ছেড়ে রাতের অন্ধকারেই ইণ্ডিয়া পালিয়ে যাওয়া। প্রাণের ভয়ে করিমন মোটা-সরু আলপথ ধরে সে হাঁটতে থাকে বড় রাস্তায় উঠার জন্য। মাথার উপর ভেঁজা চাঁদ রাত আর কতটা বাকি তা ঠিক ঠাহর করতে পাচ্ছে না। রাত ভোর হলেই গাঁয়ের লোকেরা রাস্তায় বেরিয়ে আসবে। তার আগেই বড় রাস্তা ধরে এ গ্রাম পার হয়ে ভারতে যেতে হবে। সকাল হলেই গোটা গ্রাম রৈ-রৈ পড়ে যায় তিনকুড়ি মহাজনের কাচারিতে তার খাস চামচা হারু খুন হয়েছে। হাবা কাচারিঘর থেকে দৌড়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে তিনকুড়ি মহাজনকে বলে- মহাজন, হারু মরি গেইছে, তায় আর নাই। তিনকুড়ি বুঝতে পারে করিমনই এই কাম করছে। কিন্তু ‘করিমনের গায়োত তো এতো জোর নাই যে হারুর মতো একটা জুয়ান লোককে সে মারি ফ্যালের পারে। তাহলে তার গায়োত এতো জোর আসিল কোনটে থাকি। নাকি তার সাথে আরও কাঁও ছিলো। এই গ্রামে এত্তো বড়ো কলিজা কার আছে, কার মাথায় এতোটা লম্বা শিং গজাইল্ যে, স্বয়ং তিনকুড়ির মহাজনের লোকের গায়োত হাত দেয়। হারু মরুক তাতে মোর ক্ষতি নাই কিন্তু কার মাথার শিং এত্তোবড়ো লম্বা, তাকেই তো আগে খুঁজি বাইর করির নাগবে। নইলে যে সামনে বিপদ আরও বাড়ি যাবে। তিনকুড়ি খাঁ হাবাকে ডাকে-হাবা, এই কুত্তার বাচ্চা সারাদিন কোন্টে থাকিস? হাবা ভয়ে ভয়ে তিনকুড়ি খাঁর পাশে এসে দাঁড়ালে সে হাবার গালে ঠাস করে একটা চর মেরে বলে- এতো মার খাইস তবু তোর আক্কেল হইল্ না। এবার ভাল করি শোন-কাইল রাইতের ঘটনাটা মরি গেইলেও কাকো কবু না। আর একদৌড় দিয়া কাল্লুচোরের বাড়িত যা, তাক মোর কথা কইস যে, মহাজন তোমাক এ্যালায় ডাকাইল। তাক সাথে ধরি আসিবু, জলদি যা। তিনকুড়ির খাস লোকদের মধ্যে কাল্লু ও কান্দু চোর অন্যতম। যতবার তারা জেলে গেছে একপালা টাকা খরচ করে তিনকুড়ি তাদেরকে জেল থেকে ছাড়িয়ে এনেছে। কাল্লু চোরের একমাত্র যোগ্য শিষ্য হলো কান্দু। অভাবের তাড়ণায় একটু বয়স করে এ জগতে আসলেও তার শ্রম, মেধা ও সাহসিকতার কারণে খুব তাড়াতাড়ি অনেকদুর এগিয়ে যায়। এজন্য কাল্লু চোর তাকে যোগ্য উত্তরসুরি হিসেবে আখ্যা দেয়। তিনকুড়ির মার খেয়ে হাবা এক রকম দৌড় দিয়েই কাল্লুর চোরের বাড়ি গিয়ে তাকে বলে- কাল্লু ভাই, মহাজন রাগে ফায়ার হয়া আছে, তোমাক এ্যালায় ডাকাইল, খুব না কি দরকার আছে তোমার সাথে। তোর মহাজন তো হামারগুলাক ভুলিই গেইছেরে। হঠাৎ কি দরকার পড়িল তার? এমন জরুরি তলব? মহাজনের কাছোত গেইলে বুঝিবার পাবেন ক্যানে তোমাক ডাকেবার নাগচে। কাল্লু বলে-আচ্ছা কান্দু চল, দেখিত্াে মহাজন ক্যানে ডাকেবার নাকছে। কাল্লুচোর আর কান্দুচোর এসে ছালাম দিয়ে বলে- মহাজন হঠাৎ ক্যনেভালা জরুরী তলব দিয়া ডাকে পাঠাইচেন। তিনকুড়ি বলে-কাল্লুরে তোমাগুলা অনেকদিন বাঁচিবেন, মুই মনে মনে তোমাল্লার কথাই ভাবির নাকচু। কাল্লুচোর মহাজনের পাশে বসে বলে- হ্যাঁ মহাজন এ্যালা কওঁতো কি ঘটনা। শোন কাল্লু, গ্যালো রাইতোত মোর কাচারি ঘরোত হারু খুন হইছে, মুই যতোটুকু জানিবার পাইছু- তাতে করিমন বেওয়া পাড়ার চ্যাংরা ট্যাংরা ধরি আসি হারুকে মারি ফেলাইছে। মোর মাথাটাতো চিন্তায় চিন্তায় খারাপ হয়া যাবার নাগছে। তুই ক’তো কাল্লু? এই গ্রামোত কার এতো বড় বুকের পাটা আছে যে, মোর লোকের গায়োত হাত দেয়, মোর সাথে টক্কর দেয়। হ্যাঁ মহাজন হারুর কথা শুনিয়াতো মোরও মাথাটা ঘুরির নাগচে। এটা মোক তোমা কি শুনালেন মহাজন! থাক ওগুলা কথা এবার আসল কথা কঁও শোন, তোমারগুলার প্রথম কাজ হবে- যেইটে কোনা পান, করিমন ব্যাওয়াক ধরি আনবেন। তায় যদি মাটির তলোতও য্যায়া লুকি থাকে তোমা স্যাটে থাকি তাক্ ধরি আনবেন। তারপর কায় কায় তার সাথে আছিলো সেটা জানা যাবে। আপাতত হাজার পাঁচেক টাকা এ্যাটেকোনা আছে সেটা নিয়া কাজ শুরু করি দ্যাও। তাড়াতাড়ি যাও আইজ রাইতোতে সেটা করির নাগবে কথাটা মনোত থন। ঠিক আছে মহাজন আগোত খালি বেলাটা ডুবির দেও, তারপর দ্যাখেন এ্যালায় গোটা গ্রামোত একেবারে কেয়ামত নাগে দেমো। অস্থিরতা আর অশান্তির এক উত্তাল সমুদ্রে হাবু ডুবু খাচ্ছে তিনকুড়ি খাঁ। এ ঘটনাটা চারিদিকে জানাজানি হয়ে গেলে, লোকমুখে ছড়িয়ে গেলে একটা মস্তবড়ো দুর্ণাম হয়ে যাবে তার। করিমন যে হারুকে খুন করে এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু কোন ভাবে যদি ধর্ষনের বিষয়ে করিমন মেম্বার চেয়ারম্যানকে বলে দেয় তাহলে তো বিষয়টা অনেক দুর গড়াবে। যেভাবেই হোক মেম্বার চেয়ারম্যানকে বলে দেওয়ার আগেই তাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে। কাল্লু আর চান্দু যে কি করছে, কে জানে তাদের তো হুদিস নাই। এক দিকে হারু খুন হওয়া ভালোই হয়েছে, তাতে করিমন নিজের ফাঁদে নিজেই পড়ে আছে, ভয়ে সে কারো কাছে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। সে জানে যে, মহাজনের লোকেরা তাকে ছাড়বে না। কাল্লু আর কান্দু দু’জনে মিলে সারাদিন গোটা গ্রামে তন্ন-তন্ন করে খুঁজে কোথাও করিমনের কোন সংবাদ পেলো না। গ্রামের কোন লোক তাকে দেখেনি। অবশেষে তারা করিমনের দূরসম্পর্কের এক বোনের বাড়িতে যায়, সেখানে খোঁজ নিয়ে জানতে পারে যে, করিমন না কি দু’দিন আগে সেখানে গিয়েছিল এবং শুধু একটা পান মুখে দিয়েই চলে আসে। তারপর আর সে ঐ বাড়িতে যায় নি। কান্দু বলে-ওস্তাদ? তায় আবার ইণ্ডিয়া চলি যায় নাই তো? মোর ক্যানে জানি মনটা কয়ছে ওস্তাদ, ওয় ইণ্ডিয়া পালে গেইছে। তুই কথাটা একেবারে মন্দ কইস নাই কান্দু, হবারো পায়। কারণ করিমন জানে যে মহাজন তাক ছাড়বে না। যেমন করি হউক মহাজন তার চুল ধরি টানি আনবেই। আচ্ছা কান্দু, তুই একটা কাজ কর। ধাপড়ার হাটোত দেবেন চোর আছে না? কোন দেবেন,- ওস্তাত। আরে দীঘির পাড়োত একটা বাড়িত সিঁধ কাটি ঘরোত ঢুকির য্যায়া সিঁধের ভেতর তুই আটকি গেইছিলু মনে নাই? দেবেন আরো তোর ঠ্যাং ধরি টানি বের করি আনিল? হ্যাঁ ওস্তাদ এবার মোর মনে পড়ছে। আচ্ছা এ্যালা মন দিয়া শোন, তুই আগোত দেবেনের বাড়ি যাবু। তারপর দেবেনক ধরি কুচলিবাড়ির ঘণোটারী আছে না, স্যাটেকোনা করিমনের বোনের বাড়ি, মোর তো মনে হয় করিমন ওটেকোনায় আছে। আর ভালোকরি শোন, যদি তোমা করিমনের দেখা পান তাহলে মাথা গরম করিবেন না, রাইত পর্যন্ত স্যাটেকোনা অপেক্ষা করিবেন। তায়তো আর জানে না যে, তোমা তাক খুঁজি ব্যাড়েবার নাগছেন। তায় নিশ্চিন্ত মনে এটারী-ওটারী ঘুরি বেড়াবে। আর তোমা তার দেখা পাওয়া মাত্র মুখ চিপি ধরি একেবারে সিনা বরাবর ছুড়ি বসে দিবেন যেন বাপরে-মাওরে করিবার টাইমও না পায়। ঠিক আছে, মোর কথাগুলা মনে থাকবে তো? হ্যাঁ ওস্তাদ, শালির দেখাটা আগোত পাঁও তারপর হয় ওর একদিন না হয় মোর একদিন।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৪৬ জন


এ জাতীয় গল্প

→ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প -১৪

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now