বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
.
প্রায় দশ বছর পর আবার স্কুলে এসেছি। স্কুলটা কত বদলে গেছে এই দশ বছরে! স্কুলের ভিতরে ছোট মাঠটায় যেখানে আগে আমাদের পিটি হত ওখানে এখন বাগান করা হয়েছে। আমাদের সময় যে বাস্কেটবল কোর্ট করা হয়েছিল ঐ কোর্টের বাস্কেট এখন আর নাই। ওখানে এখন ছেলেরা ক্রিকেট খেলছে। স্কুলের মসজিদ টাইলস করা হয়েছে। নতুন একটা তিনতলা বিল্ডিং হয়েছে। প্রধান শিক্ষকের অফিসের সামনের বাগানটা এখন আগের চেয়ে অনেক সুন্দর। বিভিন্ন ধরণের ফুলের গাছে বাগানটা চমৎকারভাবে সাজানো। আমি এসেছি স্কুলের পুনর্মিলনীর রেজিস্ট্রেশন করতে। রেজিস্ট্রেশনের আগে আমি ঘুরেঘুরে স্কুল দেখছি। হঠাৎ করে দেশে এসেছি। তাই এ পুনর্মিলনীতে অংশগ্রহন করতে পারছি। হাটতে হাটতে শিক্ষকদের কমনরুমের সামনে চলে এসেছি। ভিতরে উঁকি দিলাম। কয়েকজন বসে আছেন। তাদের কাউকে আমি চিনি না। এরা সম্ভবত নতুন শিক্ষক। আমি স্কুল থেকে চলে যাওয়ার পর এসেছেন। -আপনি কি কাউকে খুঁজছেন? আমি পিছনে আমার প্রশ্নকর্তার দিকে তাকালাম। একজন ভদ্রলোক আমার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। লোকটার মুখে কাঁচাপাকা দাঁড়ি, চোখে চশমা। বয়স পঞ্চাশ ষাটের মাঝামাঝি। আমার চেহারাটা পরিচিত পরিচিত লাগছে। আমি লোকটার দিকে ভাল করে তাকালাম। -কি হল, কথা বলছেন না যে! আপনি কি কাউকে খুঁজতে এসেছেন? আমার মুখে হাসি ফুটল। রাশেদ স্যার আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। আমাদের প্রিয় রাশেদ স্যার। আমাদের কোন প্রশ্ন করে উত্তর না পেলে স্যার বলতেন- “কি হল, কথা বলছিস না যে”। এই “না যে” শব্দ দুটার মধ্যে নাকি সুরে অতিরিক্ত টান দিতেন। স্যারের এই নাকি সুরের “না যে” শুনেই স্যারকে চিনতে পারলাম। -স্যার, আমাকে চিনতে পারছেন? আমি শাহেদ। স্যার চশমা নাড়িয়ে আমার দিকে ভাল করে তাকালেন।- কোন শাহেদ? -আমি সাব্বিরদের ব্যাচে ছিলাম। ২০০০ সালের ব্যাচ। ডি সেকশনে ছিলাম। রাশেদ স্যার কয়েকবার বিড়বিড় করলেন- সাব্বির, সাব্বির……………….; তারপর মনে পড়ে যাওয়ার মত করে বললেন- ঐ যে গুগলে চাকরি করে, ঐ সাব্বির? সাইন্সফেয়ার করত যে ছেলেটা? আমি হাসিমুখে বললাম- এইতো স্যার চিনেছেন। আমি ওদের সাথে পড়তাম, শাহেদ। স্যার কপাল কুঁচকে মনে করার চেষ্টা করছেন। তবে স্যার মনে করতে পারছেন না। আমি স্যারকে সাহায্য করার জন্য বললাম- স্যার একবার স্কুল পালাতে গিয়ে আপনার কাছে ধরা খেয়েছিলাম। আপনি আমাকে নিয়ে সোজা আমার বাসায় চলে গিয়েছিলেন, মনে আছে? রাশেদ স্যার এবার হাসলেন। মাথা নেড়ে বললেন- এবার মনে পড়েছে। তোমার বাবা তোমাকে কি মারটাই না দিলেন। আমিও ছাড়াতে পারলাম না তোমাকে। তোমাকে এমন মার খেতে দেখে আমার নিজেরও পরে অনেক খারাপ লেগেছিল। -স্যার, ঐ মারটা দরকার ছিল। নাহলে জীবনে কিছুই মনে হয় করতে পারতাম না। -কি করছ এখন? -আমি অস্ট্রেলিয়া থাকি। ওখানে পিএইচডি করছি। হঠাৎ করেই দেশে আসলাম। তাই স্কুলের পুনর্মিলনীতে অংশগ্রহণ করব বলে স্কুলে আসা। -গুড গুড, ভেরি গুড। তোমাদের মত স্টুডেন্টদের দেখলে গর্ব হয়। মনে হয় আমি শিক্ষক হিসেবে কিছুটা সার্থক। আমি হাসলাম।- স্যার, এখন স্কুলের অবস্থা কি রকম? রাশেদ স্যার একটু হতাশায় মাথা নাড়ল।- স্কুলের অবস্থা এখন ভাল না। ঠিকমত ক্লাস হয় না। রেগুলার ক্লাস করে না কেউ। সবাই শুধু প্রাইভেট পড়তে যায়। প্রাইভেট পড়াই সব। স্কুলে ক্লাস করার দরকার হয় না। -আমিও সেরকম শুনেছি। আজকালকার বাবা-মারাও ছেলেমেয়েকে প্রাইভেটে দেওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পরে। -তোমাদের ব্যাচটাই ব্যতিক্রম ছিল। তোমরা রেগুলার ক্লাস করতে। প্রি-টেস্ট পরীক্ষার পরও তোমারা ক্লাস করেছ রেগুলার। অথচ এখন প্রি-টেস্ট পরীক্ষার পর গড়ে ১০-১২ স্টুডেন্ট আসে। -স্যার এটাতো খুব খারাপ কথা। ছাত্ররা স্কুলে আসবেনা কেন? আপনারা গার্জিয়ানদের ডেকে কিছু বলেননি? রাশেদ স্যার হাসলেন। দুঃখের হাসি।- কোন লাভ নাই। কিছুই হবে না। -কেন স্যার? কিছু হবে না কেন? -আগে আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দাও তুমি। আজকাল কারা শিক্ষকতা পেশায় আসে? আমি একটু অবাক হলাম প্রশ্নটা শুনে।- কারা আসে মানে? -এখন তারাই শিক্ষক হয় যারা অন্যকিছু করতে পারছে না। তুমি যদি আজকাল কোনো ছেলেকে প্রশ্ন কর, বড় হয়ে তুমি কি হবে? জীবনেও কেউ বলবে না আমি শিক্ষক হব। কেন শিক্ষক হতে চাইবে? এখানে টাকা-পয়সা নেই। একটা শিক্ষক কত টাকা পায় বেতন? আমি চুপ করে আছি। কোন কথাই মুখে আসছে না। -আমি শিক্ষকদের দোষ দেই কিভাবে! তারাতো পেটের দায়েই টিউশনি করে। একজন টিচার যে টাকা বেতন পায়, একজন রিকশাওয়ালার কামাইও তার চেয়ে বেশি। এরা করবে কি? এদের কোন সামাজিক স্ট্যাটাস নেই। বউ-বাচ্চা নিয়ে একটু ভালমত বাঁচার জন্য এদের এই টিউশনি করাতে হয়। ঘন্টা পড়ল। টিফিন শেষ। ছাত্ররা সব ক্লাসে ঢুকছে। রাশেদ স্যার আমাকে নিয়ে শিক্ষকদের কমনরুমে ঢুকলেন। অন্যান্য স্যাররা ক্লাসে চলে যাচ্ছেন। কিছুক্ষণের মাঝেই কমনরুম ফাঁকা হয়ে গেল। শুধু আমি আর রাশেদ স্যার বসে আছি। -স্যার, আপনার ক্লাস নেই? -এই পিরিয়ডে নেই। পরের পিরিয়ডে ক্লাস আছে। -স্যার, আপনিতো মনে হয় টিউশনি করান না? -না, করাই না। আমার পারিবারিক কিছু বিজনেস আছে। তাই আমাকে টিউশনি করাতে হয় না। কিন্তু সবারতো তা নেই। -তা সত্যি। -এখনতো আবার ব্যাঙের ছাতার মত স্কুল কলেজ খুলা শুরু হয়েছে। কোন মাঠ নাই, ৫-৬ তালা বিল্ডিঙের উপর একটা স্কুল খুলে বসে আছে। জায়গায় জায়গায় স্কুল খুলছে। আসলে এগুলা স্কুল না। এগুলা হচ্ছে বিজনেস সেন্টার। আমি মাথা নাড়লাম।- সব জায়গায় আজ বিজনেস ঢুকে গেছে স্যার। যে বাচ্চারা এসব স্কুলে পড়ে, তারা খেলে কিভাবে? একটু দৌড়াদৌড়িতো করা লাগে। তার জন্য একটা মাঠ দরকার। ঢাকা শহরে এমনি খেলার জায়গার অভাব। স্কুলে এসে বাচ্চারা একটু খেলবে, সে উপায়ও এখন নেই। এসব স্কুলের অনুমোদন দেয় কিভাবে? একটা বাচ্চার মানসিক বিকাশের জন্য খেলাধুলা করা খুব দরকার। রাশেদ স্যার দীর্ঘঃশাস ফেললেন। -এটা আমি তুমি বুঝি। কিন্তু এদেশের নীতি নির্ধারকেরা বুঝে না। আসলে বুঝে না বলা যাবে না। বুঝতে চায় না। কারণ বেশি বুঝলে তাদের আয়-রোজগার কমে যাবে। একটা দেশের শিক্ষার মূলভিত্তি হল প্রাথমিক শিক্ষা। অথচ আমাদের দেশে প্রাথমিক শিক্ষকরাই সবচেয়ে অবহেলিত। আমরা হাইস্কুলের টিচাররা তাদের চেয়ে কিছুটা ভাল আছি। -স্যার কিছুদিন আগে নাকি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের টিচারদের দাবিদাওয়া নিয়ে কি ঝামেলা হয়েছিল? আমি আমার পিএইচডির কাজে একটু বিজি ছিলাম তখন। তাই খবরটা পড়া হয়নি। স্যার জানেন কিছু? -দুঃখের কথা আর কি বলব শাহেদ! বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাদের চাকরি জাতীয়করণ নিয়ে প্রধাণমন্ত্রীর অফিসে স্মারকলিপি নিয়ে যাচ্ছিল। পুলিশ তাদের উপর জলকামান নিক্ষেপ করে। আমি খুবই অবাক হলাম। -বলেন কি স্যার! ওনারা কি কোন ভাংচুর-টাংচুর করছিল? স্যার মাথা নাড়লেন। -ওনারা কিছুই করেননি। শান্তিপূর্ণভাবে ওনারা যাচ্ছিলেন। পুলিশ হঠাৎ কেন ওনাদের উপর জলকামান মারল তা আমার মাথায় ঢুকে না। -আমারও মাথায় ঢুকছে না স্যার। এতো অবিশ্বাস্য ঘটনা। -একটা দেশের প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তিটা যদি শক্ত করা যায় দেশ এমনি এগিয়ে যাবে। এক্ষেত্রে বিনিয়োগ করলে একটা সুন্দর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দেশ উপহার পাবে। কিন্তু এ কথাটা বুঝার মানুষ এদেশে নাই। আমি গাজিপুরের একটা স্কুলের কথা শুনেছি। তুমি ঐ স্কুলের একটা ঘটনা শুনলে অবাক হবে। স্কুলের নামটা মনে পড়ছে না। ঐ স্কুলের একটা দোকান আছে। ঐ দোকানে কলম, পেন্সিল, খাতা ইত্যাদি পাওয়া যায়। কিন্তু দোকানে কোন দোকানদার নেই। -দোকানদার নেই মানে? -দোকানদার নেই মানে দোকানদার নেই। ছেলেরা সবাই যার যা প্রয়োজন তা দোকান থেকে নেয়, আর যাবার সময় যত টাকা দাম হয়েছে তা একটা বাক্সে রেখে দেয়। কেউ ওদের মনিটর করে না। অথচ আজ পর্যন্ত ঐ দোকানের এক টাকাও চুরি হয়নি। আমি প্রচন্ড বিস্মিত হলাম। -বলেন কি স্যার! এটা সম্ভব! -হ্যাঁ, এটা সম্ভব হয়েছে। চিন্তা কর এই ছেলেরা যখন বড় হবে তখন তারা কি দুর্নীতি করতে পারবে? আমি মাথা নাড়লাম। এদের পক্ষে দুর্নীতি অসম্ভব। রাশেদ স্যারের চোখমুখ হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে যায়। -বাংলাদেশের সব বিদ্যালয়ে আমরা যদি ছাত্রছাত্রীদের এই শিক্ষাটা দিতে পারি তাহলে এদেশ থেকে দুর্নীতি একসময় চলে যাবে। কোন দুর্নীতিবাজ এদেশে থাকবে না। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হবে দুর্নীতিমুক্ত। কিন্তু এক্ষেত্রে তোমাদের সাহায্য বড় প্রয়োজন। আমি রাশেদ স্যারের দিকে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকালাম। -আমাদের সাহায্য মানে? -মানে তুমি, সব্বির তোমরা দেশে ফিরে আস। এদেশে থেকে কিছু কর। দেশের জন্য কিছু কর। বিদেশে পড়ালেখা করতে গেছ, ভালকথা। পড়া শেষ করে আবার এদেশে ফিরে আস। নিজের শ্রম মেধা গুগলের পিছনে খরচ করে কি লাভ! এদেশে এসে তোমরা নিজেরাই একটা গুগল খোল। মনে রেখ তোমরা যে আজ এই পর্যায়ে গিয়েছ, কার টাকায় গিয়েছ? কে তোমাদের পড়ালেখার খরচ দিয়েছে? সরকারী স্কুল কলেজে পড়েছ, পাবলিক ভার্সিটিতে পড়েছ, কয়টাকা লেগেছে? তোমাদের পড়ালেখা চালিয়েছে সরকার। সরকার চলেছে জনগণের টাকায়। তোমাদের উপর তাই এদেশের প্রতিটা মানুষের হক আছে। দেশের মানুষের কষ্টার্যিত ট্যাক্সের টাকায় তোমরা পড়েছ। তাই বিনিময়ে তোমাদের এদেশকে কিছু দেওয়া উচিৎ। তোমাদের কাছে আমার একটাই অনুরোধ তোমরা এদেশে ফিরে আস। আমি আর কতটুকু শিক্ষিত! তোমরা আমার চেয়ে অনেক বেশি শিক্ষিত। তোমরা টেকনোলজিক্যালি অনেক অ্যাডভান্স। তোমরাই পারবে এদেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে। নিজের মেধা শ্রম দিয়ে এ গরিব দেশটার একটু উন্নতি করতে চেষ্টা কর। সব মেধা শ্রম ঐ অস্ট্রেলিয়া আমেরিকায় বিক্রি করে দিয়ো না। ঘন্টা পড়ল। স্যার চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন। আমিও উঠে দাঁড়ালাম। স্যার এগিয়ে এসে আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন -আমার কথায় কিছু মনে কোর না শাহেদ। মনটা আসলে ভাল নেই। দেশের এত খারাপ অবস্থা যে কিছুই ভাল্লাগেনা। তোমাকে দেখে অনেকদিন পর খুব ভাল লাগল। নিজের মনের কষ্টগুলা তাই তোমার সাথে শেয়ার করলাম। এখন যাই। ক্লাস আছে। রাশেদ স্যার চলে গেলেন। আমিও কমনরুম থেকে বের হলাম। স্যারের বলা কথাগুলো আমার মনে এক অদ্ভুত অনুভূতির সৃষ্টি করেছে। এ অনুভূতির সাথে আমি পরিচিত নই। এ দেশকে নিয়ে ভাবার অনুভূতি, দেশকে ভালবাসার অনুভূতি, দেশের মানুষকে ভালবাসার অনুভূতি। স্যার, আমি আবার এদেশে ফিরে আসব। অবশ্যই ফিরে আসব। -মোঃ মুহিত আলম
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now