বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
# নীলজ্যোৎস্নার পরী
অনেক অনেক দূরে, মানুষের চোখের আড়ালে, সাতটি নীল পাহাড় আর সাদা মেঘের সমুদ্র পেরিয়ে ছিল এক আশ্চর্য রাজ্য। সেই রাজ্যের নাম **নীলজ্যোৎস্নার রাজ্য**। পৃথিবীর কোথাও এমন রাজ্য ছিল না। সেখানে দিনের আলো ছিল কোমল, কিন্তু রাতের সৌন্দর্য ছিল অপার্থিব। পূর্ণিমা উঠলেই চাঁদের সাদা আলো ধীরে ধীরে নীল হয়ে যেত। সেই নীল জ্যোৎস্নায় নদীর জল নীল কাঁচের মতো ঝিকমিক করত, গাছের পাতায় রূপালি শিশির জমত, আর ফুলগুলো যেন আকাশের তারার মতো জ্বলে উঠত।
সেই রাজ্যের রাজা ছিলেন পরীরাজ অরুণেশ, আর রানি চন্দ্রলেখা। তাঁদের একমাত্র কন্যা ছিল **নীলজ্যোৎস্না পরী**।
নীলজ্যোৎস্নার ডানা ছিল নীল কাঁচের মতো স্বচ্ছ। তার চুল ছিল রাতের আকাশের মতো কালো, আর চোখ দুটি ছিল গভীর হ্রদের মতো শান্ত। সে যখন হাসত, তখন চারপাশে ছোট ছোট নীল প্রজাপতি উড়ে বেড়াত। আর সে যখন গান গাইত, তখন ঘুমিয়ে থাকা ফুলও ফুটে উঠত।
প্রতিদিন ভোরে সে রাজ্যের প্রতিটি বাগানে উড়ে যেত। শুকিয়ে যাওয়া ফুলে হাত ছোঁয়াতেই আবার রঙ ফিরে আসত। অসুস্থ পাখিরা তার ছোঁয়ায় সুস্থ হয়ে যেত। তাই রাজ্যের সবাই তাকে শুধু রাজকন্যা নয়, আশার আলো বলে ডাকত।
কিন্তু সুখের রাজ্যেরও শত্রু থাকে।
নীল পাহাড়ের ওপারে ছিল এক অন্ধকার বন। সেই বনের গভীরে বাস করত এক ভয়ংকর ডাইনি—**কালরাত্রি**। বহু বছর আগে সে নীলজ্যোৎস্নার রাজ্য দখল করতে চেয়েছিল। কিন্তু পরীদের জাদু আর চাঁদের শক্তির কাছে সে পরাজিত হয়। সেই অপমানের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য সে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে লাগল।
এক অমাবস্যার গভীর রাতে কালরাত্রি তার কালো কাকের ঝাঁক নিয়ে রাজ্যের ওপর নেমে এল। সবাই ঘুমিয়ে ছিল। সে রাজপ্রাসাদের নিচে লুকিয়ে রাখা **চাঁদপাথর** চুরি করে নিয়ে গেল।
চাঁদপাথরই ছিল পুরো রাজ্যের জাদুর উৎস।
চাঁদপাথর হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিপদ শুরু হলো। ফুল শুকিয়ে যেতে লাগল, নদীর জল মলিন হয়ে গেল, আর প্রতি রাতে নীল জ্যোৎস্নার আলো একটু একটু করে কমে যেতে লাগল।
রাজ্যের প্রাচীন জাদুকর বললেন,
"আগামী পূর্ণিমার আগেই যদি চাঁদপাথর ফিরে না আসে, তাহলে এই রাজ্য চিরদিনের জন্য অন্ধকারে ডুবে যাবে।"
নীলজ্যোৎস্না পরীর চোখে জল চলে এল। সে নিজের রাজ্যকে বাঁচাতে চাইল, কিন্তু কেউ জানত না চাঁদপাথর কোথায় লুকিয়ে রাখা হয়েছে।
ঠিক সেই সময়, বহু দূরের **সূর্যপুর রাজ্যে** বাস করতেন সাহসী রাজপুত্র **আরিয়ান**। ছোটবেলা থেকেই তিনি তলোয়ার চালনায় পারদর্শী ছিলেন। কিন্তু যুদ্ধের চেয়ে তিনি মানুষকে সাহায্য করতে বেশি ভালোবাসতেন।
এক রাতে তিনি স্বপ্ন দেখলেন—নীল ডানার এক পরী কাঁদছে। তার চারপাশে অন্ধকার ছড়িয়ে পড়ছে।
পরদিন রাজপ্রাসাদে এলেন এক বৃদ্ধ সাধু। তিনি রাজপুত্রকে বললেন,
"স্বপ্নে যাকে দেখেছ, সে সত্যিই আছে। তার ভাগ্যের সঙ্গে তোমার ভাগ্য জড়িয়ে আছে। যদি তাকে বাঁচাতে পারো, তবে শুধু একটি রাজ্য নয়, বহু পৃথিবী আলো ফিরে পাবে।"
এক মুহূর্ত দেরি না করে রাজপুত্র যাত্রা শুরু করলেন।
ঘন জঙ্গল, তুষার ঢাকা পাহাড়, উত্তাল নদী আর মরুভূমি পেরিয়ে বহুদিন পরে তিনি পৌঁছালেন নীলজ্যোৎস্নার রাজ্যে।
সেই রাতে প্রথমবার তাঁর দেখা হলো নীলজ্যোৎস্না পরীর সঙ্গে।
চাঁদের নীল আলোয় দাঁড়িয়ে ছিল পরীটি। মনে হচ্ছিল, যেন আকাশের একটা তারা পৃথিবীতে নেমে এসেছে।
রাজপুত্র কিছুক্ষণ শুধু তাকিয়েই রইলেন।
পরী মৃদু হেসে বলল,
"আপনি কে?"
রাজপুত্র মাথা নত করে বললেন,
"আমি আরিয়ান। আপনাকে সাহায্য করতেই এসেছি।"
সেই এক মুহূর্তেই দুজনের মনে এক অদ্ভুত বিশ্বাস জন্ম নিল।
এরপর তারা একসঙ্গে চাঁদপাথরের খোঁজে বেরিয়ে পড়ল।
পথে তারা কথা বলল, হাসল, একে অপরকে সাহস দিল। ধীরে ধীরে বন্ধুত্বের জায়গায় জন্ম নিল গভীর ভালোবাসা।
কিন্তু ডাইনি কালরাত্রি সবকিছু জাদুর আয়নায় দেখছিল।
সে বুঝল, এদের ভালোবাসাই তার সবচেয়ে বড় শত্রু।
তাই সে নানা ফাঁদ পেতে দিল।
কখনও রাজপুত্রকে মায়ার বন দেখাল, যেখানে হাজারটা পথ, কিন্তু কোনো পথের শেষ নেই।
কখনও নীলজ্যোৎস্নাকে দেখাল, রাজপুত্র নাকি তাকে ফেলে চলে গেছে।
কিন্তু তারা কেউই একে অপরের ওপর বিশ্বাস হারাল না।
অনেক খোঁজাখুঁজির পরে তারা জানতে পারল, চাঁদপাথর লুকিয়ে রাখা হয়েছে **চাঁদের নদীর** তলায়।
সেই নদী বছরে মাত্র একবার, পূর্ণিমার রাতে, নিজের বুক চিরে গোপন পথ খুলে দেয়।
পূর্ণিমার রাতে তারা নদীর জলে নামল।
হঠাৎ নদীর জল দুই পাশে সরে গেল।
নিচে দেখা গেল সাদা পাথরের তৈরি এক বিশাল দরজা।
দরজা খুলতেই তারা পৌঁছে গেল **মৃত্যুপুরীতে**।
চারদিকে নিস্তব্ধতা।
ভাঙা প্রাসাদ।
কালো কুয়াশা।
অদ্ভুত সব ছায়া।
ঠিক তখনই বিশাল বিশাল পাথরের দানব তাদের আক্রমণ করল।
রাজপুত্র তলোয়ার হাতে যুদ্ধ শুরু করলেন।
নীলজ্যোৎস্না তার শেষ জাদুশক্তি দিয়ে রাজপুত্রকে রক্ষা করল।
অবশেষে তারা পৌঁছে গেল কালরাত্রির সামনে।
ডাইনি অট্টহাসি দিয়ে বলল,
"তোমরা কখনোই আমাকে হারাতে পারবে না।"
নীলজ্যোৎস্না শান্ত গলায় বলল,
"অন্ধকার কখনো আলোকে হারাতে পারে না।"
তারপর শুরু হলো ভয়ংকর যুদ্ধ।
কালো আগুন আর নীল জ্যোৎস্নার আলো একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে আকাশ কাঁপিয়ে তুলল।
ঠিক সেই সময় রাজপুত্র ডাইনির জাদুর আয়নায় তলোয়ারের আঘাত করলেন।
আয়নাটা ভেঙে হাজার টুকরো হয়ে গেল।
সঙ্গে সঙ্গে ডাইনির সব শক্তি হারিয়ে গেল।
চাঁদপাথর আবার নীল আলো ছড়াতে শুরু করল।
মুহূর্তের মধ্যেই মৃত্যুপুরী কেঁপে উঠল।
ফুল ফুটল।
নদীর জল পরিষ্কার হয়ে গেল।
পরীদের রাজ্যে আবার নীল জ্যোৎস্না ফিরে এল।
সবাই আনন্দে কেঁদে ফেলল।
কয়েকদিন পর এলো পূর্ণিমার রাত।
সেদিন পুরো রাজ্য সাজানো হলো নীল গোলাপ, রূপালি প্রদীপ আর হাজারো জোনাকির আলো দিয়ে।
পরীরাজা নিজ হাতে রাজপুত্র আরিয়ানের হাতে নীলজ্যোৎস্না পরীর হাত তুলে দিলেন।
চাঁদ যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে হাসল।
পরীরা নাচতে লাগল।
পাখিরা গান গাইল।
জোনাকিরা আকাশে আলোর মালা গেঁথে দিল।
আর রাজপুত্র আর নীলজ্যোৎস্না প্রতিজ্ঞা করলেন—যতদিন চাঁদ আকাশে আলো ছড়াবে, ততদিন তারা তাদের রাজ্যকে ভালোবাসা, সাহস আর আলো দিয়ে রক্ষা করবেন।
লোকমুখে আজও শোনা যায়, পূর্ণিমার রাতে যদি কোথাও নীলাভ জ্যোৎস্না দেখা যায়, তবে বুঝতে হবে নীলজ্যোৎস্না পরী আর তার রাজপুত্র এখনও আকাশের ওপার থেকে পৃথিবীর মানুষের জন্য আশীর্বাদ ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now