বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
ডিসেম্বরের আকাশ সেদিন অস্বাভাবিক রকমের ভারী ছিল। সূর্য উঠেছিল ঠিকই, কিন্তু তার আলো যেন শহরের গলিপথে পৌঁছাতে সাহস পাচ্ছিল না। ঢাকার বাতাসে তখনো বারুদের গন্ধ, কান্নার শব্দ আর অদৃশ্য আতঙ্ক মিশে আছে। যুদ্ধ শেষের পথে—এই কথাটা সবাই জানত, কিন্তু কেউই নিশ্চিত ছিল না শেষটা কেমন হবে। মানুষ বিজয়ের স্বপ্ন দেখছিল, অথচ অজানা এক অন্ধকার ধীরে ধীরে ঘনিয়ে আসছিল বুদ্ধির আলো জ্বালিয়ে রাখা মানুষগুলোর চারপাশে।
আনিসুর রহমান প্রতিদিনের মতোই সকালে বইয়ের তাক গোছাচ্ছিলেন। ইতিহাসের অধ্যাপক হিসেবে তিনি জানতেন, ইতিহাস শুধু বইয়ে লেখা হয় না—ইতিহাস লেখা হয় রক্ত দিয়ে, আত্মত্যাগ দিয়ে। তাঁর স্ত্রী রওশন আরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে দূরের আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। ছেলেটা তখনো ঘুমাচ্ছিল। আনিস জানতেন, এই শহরে এখন সবচেয়ে বিপজ্জনক কাজ হলো চিন্তা করা, লেখা, শেখানো। তবু তিনি থামতে পারেননি। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন—একটি জাতিকে মেরে ফেলা যায় না, যতক্ষণ তার চিন্তা বেঁচে থাকে।
শহরের অন্য প্রান্তে সাংবাদিক কাশেম সাহেব শেষবারের মতো নোটখাতা খুলেছিলেন। কালি শুকিয়ে যাচ্ছিল, তবু কলম থামছিল না। তিনি লিখছিলেন স্বাধীনতার পরের দিনের কথা—কেমন হবে একটি মুক্ত দেশের সকাল, যেখানে সংবাদপত্রে ভয় নয়, সত্য ছাপা হবে। তাঁর মনে হয়েছিল, এই লেখা হয়তো কখনো ছাপা হবে না। তবু তিনি লিখেছিলেন, কারণ লিখে না গেলে তাঁর অস্তিত্বটাই যেন মিথ্যা হয়ে যেত।
চিকিৎসক নীলা বসু সেদিন হাসপাতালে যেতে পারেননি। চারদিকে কারফিউ, গুলির শব্দ। তিনি জানতেন, আহত মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই চিকিৎসা না পেয়ে মারা যাচ্ছে। তাঁর বুকের ভেতর অপরাধবোধ জমছিল। তিনি বারবার নিজের সাদা কোটটা ছুঁয়ে দেখছিলেন, যেন সেটাই তাঁর পরিচয়, সেটাই তাঁর অপরাধ। তিনি বুঝতেন, এই কোটই তাঁকে তালিকার শীর্ষে এনে দিয়েছে।
১৪ ডিসেম্বরের সন্ধ্যা নামার আগেই শহরের অলি-গলিতে অদ্ভুত এক নীরবতা নেমে আসে। যেন ঢাকাই শহর শ্বাস আটকে আছে। হঠাৎ হঠাৎ মিলিটারি জিপের শব্দ ভেসে আসে, থামে কোনো কোনো বাড়ির সামনে। কালো কাপড় বাঁধা কিছু লোক দরজায় কড়া নাড়ে না—সরাসরি ভেঙে ফেলে। চোখ বাঁধা হয়, হাত পেছনে মোচড়ানো হয়। কোনো প্রশ্ন নেই, কোনো অভিযোগ নেই। শুধু তালিকা আছে।
আনিসুর রহমানকে যখন নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তাঁর ছেলে ঘুম ভেঙে দরজার ফাঁক দিয়ে তাকিয়েছিল। ছেলেটা বুঝতে পারেনি কেন বাবার মুখে ভয় নেই, কেন তিনি শুধু একবার তাকিয়ে হালকা হাসলেন। রওশন আরা চিৎকার করতে চেয়েছিলেন, পারেননি। তাঁর গলা যেন কেউ চেপে ধরেছিল। তিনি জানতেন, এই রাতে চিৎকার করাই সবচেয়ে বিপজ্জনক।
কাশেম সাহেবের নোটখাতা মেঝেতে পড়ে ছিল। আধা লেখা একটি বাক্য—“স্বাধীনতা মানে শুধু পতাকা নয়, স্বাধীনতা মানে চিন্তার মুক্তি”—সেখানেই থেমে যায়। কালো কাপড়ের লোকেরা তাঁকে টেনে নিয়ে যায় অন্ধকারে। তাঁর চোখে তখনো অদ্ভুত এক শান্তি, যেন তিনি জানতেন ইতিহাস তাঁর কলম থামাতে পারবে না।
শহরের বাইরে অজানা কোনো স্থানে সেই রাতে জড়ো করা হয় দেশের শ্রেষ্ঠ মেধাগুলোকে। কেউ শিক্ষক, কেউ কবি, কেউ বিজ্ঞানী, কেউ চিকিৎসক। কেউ কেউ একে অপরকে চিনতেন, কেউ চিনতেন না। তবু তাদের চোখে ছিল একই প্রশ্ন—আমাদের অপরাধ কী? উত্তর কারো কাছে ছিল না। শুধু ছিল ঘৃণ্য নীরবতা।
গুলি চলেছিল খুব কাছ থেকে। শব্দগুলো শহরের কোলাহলে চাপা পড়ে যায়। ডিসেম্বরের ঠান্ডা মাটিতে একে একে লুটিয়ে পড়ে নক্ষত্রগুলো। আকাশে তখনো তারা জ্বলছিল, কিন্তু মাটির নক্ষত্র নিভে যাচ্ছিল। কেউ আর চিৎকার করেনি, কেউ কাঁদেনি। যেন সবাই বুঝে নিয়েছিল—এই মৃত্যু ব্যক্তিগত নয়, এই মৃত্যু একটি জাতির মস্তিষ্কে আঘাত।
১৬ ডিসেম্বর সকালে বিজয়ের পতাকা উড়ল। মানুষ রাস্তায় নেমে এল, হাসি আর কান্না একসাথে মিশে গেল। কিন্তু আনন্দের মাঝেই খবর এলো—রায়েরবাজার, মিরপুর, মোহাম্মদপুরে পড়ে আছে অগণিত লাশ। পরিচয় মিলছে একে একে। কেউ বাবাকে খুঁজছে, কেউ স্বামীকে, কেউ শিক্ষককে। রওশন আরা যখন আনিসুর রহমানের নিথর দেহ শনাক্ত করলেন, তিনি কাঁদেননি। তাঁর চোখ শুকিয়ে গিয়েছিল। শুধু ছেলেটার হাত শক্ত করে ধরে বলেছিলেন, “দেখিস, তোর বাবার চিন্তা তোকে বাঁচিয়ে রাখবে।”
কাশেম সাহেবের নোটখাতা পরে পাওয়া গিয়েছিল তাঁর ধ্বংসস্তূপের ঘর থেকে। সেই অসম্পূর্ণ বাক্যটি পরবর্তী প্রজন্মের সাংবাদিকদের কাছে এক অলিখিত শপথ হয়ে রইল। নীলা বসুর নাম খোদাই হলো শহীদ তালিকায়। তাঁর সাদা কোট রক্তে লাল হয়েছিল, কিন্তু সেই লালই হয়ে উঠল ভবিষ্যৎ চিকিৎসকদের নৈতিকতার রং।
বছর কেটে যায়। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সন্তানরা বড় হয়। কেউ শিক্ষক হয়, কেউ লেখক, কেউ চিকিৎসক। কেউ কেউ শুধু সাধারণ মানুষ হয়, কিন্তু বুকের ভেতর বহন করে এক বিশাল শূন্যতা আর গর্ব। প্রতি বছর ১৪ ডিসেম্বর আসে। শহীদ মিনারে ফুল পড়ে, মোমবাতি জ্বলে, ভাষণ হয়। কিন্তু সবচেয়ে গভীর স্মরণটা হয় নীরবতায়—যখন কেউ একজন বই খুলে পড়ে, সত্য লিখে, প্রশ্ন করে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়।
ডিসেম্বরের আকাশ এখনো ভারী হয়। তবে তারাদের দিকে তাকালে মনে হয়, কিছু নক্ষত্র মাটিতে নেমে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তারা নিভে যায়নি। তারা ছড়িয়ে আছে বইয়ের পাতায়, শ্রেণিকক্ষে, হাসপাতালের করিডোরে, সংবাদপত্রের শিরোনামে, মানুষের বিবেকের গভীরে। পাকিস্তানি হানাদাররা ভেবেছিল মেধা হত্যা করলে জাতি অন্ধ হয়ে যাবে। তারা জানত না, একটি জাতির চিন্তা হত্যা করা যায় না—কারণ চিন্তা রক্তের চেয়েও গভীর, স্মৃতির চেয়েও দীর্ঘ।
১৪ ডিসেম্বর তাই শুধু শোকের দিন নয়। এটি প্রতিজ্ঞার দিন। নক্ষত্রহীন সেই ডিসেম্বর আমাদের শিখিয়ে গেছে—যেখানে আলো নিভিয়ে দেওয়া হয়, সেখানেই নতুন আলো জ্বালানোর দায় জন্ম নেয়। আর সেই দায় বহন করেই একটি জাতি আজও হাঁটে, মাথা উঁচু করে, শহীদ বুদ্ধিজীবীদের অদৃশ্য হাত ধরে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now