বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

নজরের পচন

"শিক্ষণীয় গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান আব্দুল্লাহ বিন মালিক (০ পয়েন্ট)

X শহরের এক প্রান্তে একজন মানুষ বাস করত। তার নাম কেউ মনে রাখেনি। মানুষ তাকে চিনত তার অভ্যাস দিয়ে। সবাই বলত, "ওই যে লোকটা—যে সব সময় সেরাটাই কিনে।" ভোরের বাজারে তার আগমন যেন এক নিঃশব্দ উৎসব। মাছওয়ালা দূর থেকে ডাক দিত, ফলওয়ালা সবচেয়ে চকচকে আপেলটা সামনে এনে রাখত, ফুলওয়ালা সবচেয়ে সতেজ গোলাপটি আলাদা করে রাখত। কারণ তারা জানত, লোকটির চোখ অসাধারণ। শত ফলের ভিড়েও সে মুহূর্তেই চিনে নিতে পারত কোনটি সবচেয়ে মিষ্টি হবে। শত ফুলের মধ্যে সে বুঝে যেত কোনটির গন্ধ সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী। তার চোখে ভুল ছিল না। কিন্তু তার হৃদয়ে ছিল এক অদৃশ্য শূন্যতা। সে জিনিস বাছাই করতে জানত, কিন্তু সেই জিনিসের মর্যাদা দিতে জানত না। বাজার থেকে ফিরে সে ফলগুলো টেবিলে রেখে দিত। প্রথম দিন যত্ন করত, দ্বিতীয় দিন ভুলে যেত, তৃতীয় দিন আর তাকিয়েও দেখত না। ফলগুলো ধীরে ধীরে রঙ হারাত, তারপর গন্ধ, তারপর অস্তিত্ব। একদিন যে গোলাপটিকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ফুল মনে হয়েছিল, কয়েক দিন পর সেটিই শুকিয়ে পড়ে থাকত ঘরের এক কোণে। সে নতুন গোলাপ কিনে আনত, কিন্তু পুরোনো গোলাপটির দিকে একবারও ফিরে তাকাত না। তার কাছে নতুনের মোহ ছিল পাহাড়ের মতো উঁচু, আর প্রাপ্তির মূল্য ছিল ধুলোর মতো তুচ্ছ। দিন কেটে গেল। মাস পেরিয়ে বছর এল। অভ্যাস মানুষকে বদলে দেয়। কখনও ধীরে, কখনও নিঃশব্দে। লোকটিও বদলাতে লাগল। তবে সে বুঝতে পারল না—তার বদলটা বাইরে নয়, ভেতরে ঘটছে। একদিন বাজারে গিয়ে সে দেখল, আগের মতো ভালো জিনিস আর চোখে পড়ছে না। সে বিস্মিত হলো। "আজ বাজারে এত খারাপ জিনিস কেন?" কিন্তু বাজার তো আগের মতোই ছিল। একই বাগানের ফল, একই নদীর মাছ, একই মানুষের যত্ন। বদলেছিল শুধু তার দৃষ্টি। যে চোখ একসময় সৌন্দর্য চিনত, সেই চোখ এখন অবহেলার ধুলোয় ঢেকে গেছে। সেদিন এক বৃদ্ধ ফল বিক্রেতা তাকে একটি উজ্জ্বল, সুগন্ধি আম বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, "এটা নিয়ে যান। আজকের বাজারের সেরা ফল।" লোকটি আমটির দিকে তাকাল। তার চোখে কোনো উজ্জ্বলতা জাগল না। পাশেই একটি দাগ ধরা, অর্ধেক পচে যাওয়া আম পড়ে ছিল। অদ্ভুতভাবে তার চোখ সেদিকেই আটকে গেল। সে সেটিই হাতে তুলে নিল। বৃদ্ধ অবাক হয়ে বললেন, "ওটা কেন নিচ্ছেন? ওটা তো নষ্ট হয়ে গেছে।" লোকটি নির্বিকার কণ্ঠে বলল, "আমার কাছে তো এটাকেই ভালো লাগছে।" বৃদ্ধ কিছুক্ষণ নীরবে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর খুব ধীরে বললেন, "বাবা, জিনিসটা পচেনি—তোমার চোখের ভেতরের মানদণ্ডটাই পচে গেছে।" লোকটি কথাটার অর্থ বুঝল না। হালকা হেসে বাজার ছেড়ে চলে গেল। বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তিনি জানতেন, পৃথিবীতে ফলের পচন যতটা ভয়ংকর নয়, মানুষের দৃষ্টির পচন তার চেয়েও অনেক বেশি ভয়ংকর। কারণ ফল পচলে একটি ঝুড়ি নষ্ট হয়, কিন্তু নজর পচলে একটি জীবন নষ্ট হয়ে যায়... বৃদ্ধের কথাগুলো লোকটির কানে পৌঁছেছিল, কিন্তু হৃদয়ে পৌঁছায়নি। মানুষের একটি অদ্ভুত স্বভাব আছে—যে সত্য তাকে বদলে দিতে পারে, সেই সত্যই সে সবচেয়ে কম শুনতে চায়। পরদিনও সে বাজারে গেল। আবারও আগের মতো ঘুরল। দোকান থেকে দোকানে, ঝুড়ি থেকে ঝুড়িতে। কিন্তু আজও তার চোখ সেই পচা ফলগুলোর দিকেই বারবার ফিরে গেল। যে ফলগুলো একসময় সে ছুঁয়েও দেখত না, আজ সেগুলোই তার কাছে স্বাভাবিক লাগছে। একসময় বাজারের লোকেরা লক্ষ্য করল, মানুষটি আর আগের সেই মানুষ নেই। যে মানুষ একদিন সেরাটুকুর জন্য অপেক্ষা করত, আজ সে অবহেলিত জিনিসগুলোকেই নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে। একদিন এক তরুণ দোকানি সাহস করে জিজ্ঞেস করল, — "চাচা, আপনি কি সত্যিই বুঝতে পারছেন না কোনটা ভালো আর কোনটা নষ্ট?" লোকটি একটু হেসে বলল, — "ভালো-মন্দ বলে কিছু নেই। সবই তো এক।" তরুণটি আর কিছু বলল না। কারণ সে বুঝে গিয়েছিল—এ উত্তর চোখের নয়, অভ্যাসের। মানুষটির বাড়ির পেছনে একটি ছোট্ট বাগান ছিল। সেখানে একসময় সে নিজের হাতে একটি আমগাছ লাগিয়েছিল। প্রথম দিকে প্রতিদিন গাছে পানি দিত। আগাছা পরিষ্কার করত। পাতায় পোকা ধরেছে কি না, তা দেখত। কিন্তু কিছুদিন পর তার আগ্রহ কমে গেল। সে ভাবল, "কাল দেব।" সেই কাল আর এল না। গাছটি শুকাতে শুরু করল। পাতাগুলো হলুদ হয়ে ঝরে পড়ল। ডালপালা শুকিয়ে গেল। তবুও তার কোনো আক্ষেপ হলো না। কয়েক মাস পরে সে বাজার থেকে আরেকটি চারা কিনে আনল। আবারও যত্ন শুরু করল। আবারও কয়েকদিন পর ভুলে গেল। এভাবেই তার উঠোনে শুকিয়ে যাওয়া গাছের সংখ্যা বাড়তে লাগল। প্রতিটি গাছ যেন নীরবে বলছিল— "আমাদের মৃত্যু খরার কারণে নয়, অবহেলার কারণে।" একদিন সন্ধ্যায় সেই বৃদ্ধ ফল বিক্রেতা তার বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালেন। চারদিকে শুকিয়ে যাওয়া গাছ দেখে তিনি দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, "জানো, গাছ আর সম্পর্কের মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য নেই।" লোকটি বিস্মিত হয়ে তাকাল। বৃদ্ধ বললেন, "গাছকে যদি প্রতিদিন পানি না দাও, সে শুকিয়ে যায়। সম্পর্ককে যদি প্রতিদিন মূল্য না দাও, সেও একদিন মরে যায়।" "তুমি সারাজীবন নতুন গাছ কিনেছ, কিন্তু কোনো গাছকে বড় হতে দাওনি। নতুন ফল কিনেছ, কিন্তু তার স্বাদ শেষ হওয়ার আগেই তাকে ভুলে গেছ। নতুন মানুষকে আপন করেছ, কিন্তু তাদের হৃদয়ের মূল্য বোঝোনি।" "তুমি ভাবছ পৃথিবীতে ভালো জিনিস কমে গেছে। অথচ কমে যায়নি পৃথিবীর ভালো; কমে গেছে তোমার ভালোকে ধরে রাখার ক্ষমতা।" লোকটি প্রথমবারের মতো নীরব হয়ে গেল। সে নিজের উঠোনের দিকে তাকাল। একটি... দুটি... তিনটি নয়— ডজন ডজন শুকিয়ে যাওয়া চারা। হঠাৎ তার মনে হলো, এগুলো শুধু গাছ নয়। প্রতিটি গাছ যেন একটি করে বন্ধুত্ব। একটি করে ভালোবাসা। একটি করে বিশ্বাস। একটি করে সুযোগ। যেগুলোকে সে নিজ হাতে পেয়েছিল, কিন্তু নিজের অবহেলায় হারিয়েছে। তার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত শূন্যতা জন্ম নিল। সে প্রথমবারের মতো উপলব্ধি করল— পচা জিনিস বেছে নেওয়ার আগেই তার ভেতরে কিছু একটা পচতে শুরু করেছিল। সেটি ছিল তার কৃতজ্ঞতা। আর যে মানুষের কৃতজ্ঞতা মরে যায়, তার চোখও একদিন সত্যকে চিনতে ভুলে যায়। সেদিন সন্ধ্যার আকাশে সূর্য ডুবছিল। লোকটি অনুভব করল—সূর্য প্রতিদিন অস্ত যায় ঠিকই, কিন্তু পরদিন আবার ওঠে। কিন্তু মানুষের বিবেক যদি একদিন অস্ত যায়, সে আর সবসময় ফিরে আসে না... রাতটি ছিল অদ্ভুত নীরব। বহু বছর পর লোকটি নিজের ঘরে বসে চারদিকে তাকাল। ঘর ভরা ছিল জিনিসে, কিন্তু শূন্য ছিল জীবনে। তাকের ওপর শুকিয়ে যাওয়া ফুল, এক কোণে পচে যাওয়া ফল, ধুলো জমা পুরোনো বই, অযত্নে নষ্ট হয়ে যাওয়া আসবাব—সবকিছু যেন তার দিকে তাকিয়ে নীরবে সাক্ষ্য দিচ্ছিল। এসব জিনিস একদিন সে নিজেই বেছে এনেছিল। অথচ আজ সেগুলোর একটিরও কোনো মূল্য তার কাছে নেই। হঠাৎ তার মনে হলো—সে কি সত্যিই জিনিসগুলোকে হারিয়েছে, নাকি নিজেকেই? পরদিন ভোরে সে আবার বাজারে গেল। বৃদ্ধ ফল বিক্রেতা আগের মতোই বসে আছেন। সামনে দুই ঝুড়ি ফল। এক ঝুড়িতে টাটকা, সুগন্ধি, রোদে পাকা ফল। আরেক ঝুড়িতে পচে যাওয়া, দাগ ধরা ফল। লোকটি কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ দুটো বারবার দুই ঝুড়ির মাঝে ঘুরে বেড়াচ্ছে। হঠাৎ সে বুঝতে পারল— সমস্যা কখনো বাজারে ছিল না। সমস্যা ছিল তার ভেতরে। যে মানুষ প্রতিদিন ভালোকে অবহেলা করে, তার চোখ একদিন ভালোকে আর ভালো বলে মানতেই চায় না। অবহেলা একসময় অভ্যাস হয়, অভ্যাস চরিত্র হয়, আর চরিত্রই মানুষের দৃষ্টিকে গড়ে তোলে। সে কাঁপা হাতে একটি টাটকা ফল তুলে নিল। বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন, — "আজ কি আবার ভালো জিনিস চিনতে পারলে?" লোকটি ধীরে মাথা নাড়ল। তারপর খুব নিচু স্বরে বলল, — "না... ফলটাকে নয়। আজ আমি আমার ভুলটাকে চিনতে পেরেছি।" বৃদ্ধের চোখে শান্তির আলো ফুটে উঠল। তিনি বললেন, "মনে রেখো, পৃথিবীতে পচা জিনিসের জন্ম হয় না; জন্ম হয় অবহেলার। ফল অবহেলায় পচে, লোহা অবহেলায় মরিচা ধরে, আর মানুষের হৃদয় অবহেলায় অন্ধ হয়ে যায়।" লোকটি সেদিন আর কোনো উত্তর দিল না। বাজার থেকে ফিরে সে প্রথমবারের মতো নিজের শুকিয়ে যাওয়া বাগানের সামনে দাঁড়াল। যে গাছগুলোর আর প্রাণ ফেরানো সম্ভব নয়, সেগুলোকে সে সযত্নে মাটি থেকে তুলে ফেলল। তারপর একটি নতুন চারা রোপণ করল। কিন্তু এবার শুধু চারা লাগিয়ে ঘরে ফিরে গেল না। সে প্রতিদিন পানি দিল। আগাছা পরিষ্কার করল। রোদ-বৃষ্টি থেকে যত্নে রক্ষা করল। কারণ সে বুঝে গেছে— কোনো কিছুকে পাওয়া বড় কথা নয়; তাকে ধরে রাখার যোগ্যতা অর্জন করাই বড় কথা। মাস কেটে গেল। চারাটি ধীরে ধীরে বড় হতে লাগল। একদিন সেখানে প্রথম ফুল ফুটল। ফুলটির দিকে তাকিয়ে লোকটির চোখ ভিজে উঠল। এতদিন সে ভাবত, পৃথিবীতে ভালো জিনিস কমে গেছে। আজ বুঝল— ভালো জিনিস কখনো কমে না। কমে যায় মানুষের কৃতজ্ঞতা। কমে যায় মানুষের যত্ন। কমে যায় মানুষের মূল্য দেওয়ার ক্ষমতা। আর তখনই চোখ ভালোকে দেখা বন্ধ করে দেয়। সেদিন বাজারের বৃদ্ধ অনেক দূর থেকে লোকটিকে দেখছিলেন। তার মুখে একটি তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। কারণ তিনি জানতেন— যে মানুষ নিজের চোখের পচন বুঝতে পারে, সে আবার নতুন করে দেখতে শেখে। কিন্তু যে মানুষ সারাজীবন দোষ খুঁজে বেড়ায় শুধু পৃথিবীর মধ্যে, নিজের ভেতরে নয়— তার কাছে গোলাপও একদিন আগাছা হয়ে যায়। হীরা হয়ে যায় পাথর। বিশ্বস্ত মানুষ হয়ে যায় বিরক্তির কারণ। আর পচা জিনিসই হয়ে ওঠে তার সবচেয়ে প্রিয় নির্বাচন। লেখকের শেষ কথা মানুষের পতন শুরু হয় না ভুল সিদ্ধান্ত দিয়ে; শুরু হয় ভালো জিনিসের প্রতি অবহেলা দিয়ে। যে মানুষ প্রতিদিন পাওয়া আশীর্বাদ, সম্পর্ক, বিশ্বাস, সুযোগ কিংবা ভালোবাসার মূল্য দেয় না, সে ধীরে ধীরে এমন এক অন্ধকারে প্রবেশ করে, যেখানে সত্য আর মিথ্যার পার্থক্যও অস্পষ্ট হয়ে যায়। তখন সে মনে করে পৃথিবী বদলে গেছে। অথচ বদলে যায় শুধু তার দৃষ্টিভঙ্গি। জীবনের সবচেয়ে বড় পচন ফলের নয়, দৃষ্টির। আর সবচেয়ে বড় অন্ধত্ব চোখের নয়, বিবেকের। — লেখক: আব্দুল্লাহ বিন মালিক


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৬ জন


এ জাতীয় গল্প

→ নজরের পচন
→ নজরের পচন

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now