বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
গল্প - " নিয়তি "
.
রহিম সাহেবের আজ মন ব্যাপক ভাল। কারণ আজ তিনি দাদা হয়েছেন। গত কিছু মাস ধরেই তিনি তার নাতির জন্য নাম খুঁজে বেড়াচ্ছেন। অনেককেই জিজ্ঞাসা করেছেন, নামের বই ঘেঁটেছেন। শেষমেশ নাম ঠিক করেছেন সোলায়মান। তার বউমার নামের সাথে দারুণ মানিয়েছে। সিনথিয়ার সাথে সোলায়মান। আবার নামটি এক নবীজির নাম। রহিম সাহেব গত দু'সপ্তাহে পিচ্চি বাবুর জন্য অনেক কেনাকাটা করে ফেলেছেন। জামা, জুতো, সাবান, খেলনা, লোশন, পেম্পাস, ম্যাজিক মশারি, কোনকিছুই বাদ যায়নি।
.
রহিম সাহেবের ছেলে রাজ্জাক সন্তানকে নিয়ে এসে বাবার সামনে রেখেই নাম দিতে বলেছিলো। রহিম সাহেব নির্দ্বিধায় সোলায়মান নামটি রেখে দেয়। রাজ্জাক খুশি মনে নামটি গ্রহণ করে। কিন্তু রাজ্জাকের স্ত্রী সিনথিয়া নামটি পছন্দ করেনি। এমনকি এই নামে একবারও ডাকেনি। তার নিজের দেয়া নাম সিয়াম নামেই ডেকে যাচ্ছে। এইজন্য রহিম সাহেবের মন কিছুটা খারাপ হয়েছে।
.
(দুই)
.
এই ছোট্ট ফ্যামিলিতে ছোট্ট একটি দ্বন্দ্ব বিদ্দমান রয়েছে। দ্বন্দটা রহিম সাহেব আর সিনথিয়ার মধ্যে। অবশ্য রহিম সাহেবের দোষটাও কোন অংশে কম না। এই যেমন, গত এক সপ্তাহ ধরে রহিম সাহেবের কাশির শব্দে ছোট্ট বাবু সিয়াম ঘুমাতে পারছে না। রহিম সাহেব নিজেও ব্যাপারটা নিয়ে চিন্তিত। সারাদিন কাশি হয়না, শুধু রাতের বেলাতেই কাশি শুরু হয়। তুমুল আওয়াজের কাশি, মিনিটে মিনিটে কাশি আসে।
.
কাশি বন্ধের জন্য রহিম সাহেব একটা সিরাপও কিনে এনেছিলেন। কিন্তু খাওয়ামাত্রই রহিম সাহেবের এক চোট বমি হয়ে গেছে। নিজেই সব ময়লা সাফ করেছেন। কারণ সিনথিয়া সারাদিনে একবারের জন্যেও তার ঘরে আসে না। আজ আবার সিরাপটা খাবে কিনা বুঝতে পারছে না। তার কাশির শব্দে সিয়াম উঠে কান্না শুরু করেছে। সিনথিয়ার গলা শোনা যাচ্ছে, সম্ভবত রহিম সাহেবকে গালমন্দ করছে।
.
রহিম সাহেব ব্যাপক চটে গেলেন। এই মেয়েটা তাকে একদমই সহ্য করতে পারেনা। কিন্তু মেয়েটাকে বলা উচিত যে, রাজ্জাক যখন ছোট ছিলো তখনো রহিম সাহেবকে রাতের পর রাত ঘুমুতে দিতো না। চাইলেই কথাগুলো রহিম সাহেব বলতে পারেন, কিন্তু বলবেন না শুধু ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে। তার ছেলেটা ভাল, বেশ ভাল। কেন বেশ ভাল তার জন্য একটা ঘটনা উল্লেখ করলেই বোধগম্য হবে।
.
(তিন)
.
একবার রহিম সাহেবের দারুণ জ্বর এলো। বিছানা থেকেই উঠার উপায় নেই। তখন তার ছেলে রাজ্জাক অফিস থেকে ছুটি নিলো। রহিম সাহেব বিছানা থেকে নামতেই পারতো না। বিছানাতেই প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দিতে হতো। আর ছেলে রাজ্জাক সেগুলো সাফ করতো। রহিম সাহেবের লজ্জায় মাথাকাটা গিয়েছিলো। এইজন্যই রহিম সাহেব ছেলেটাকে বেশ ভাল বলেন, এই যুগে এমন ছেলে পাওয়াই যায় না।
.
একদিকে যতটুকু ভাল আরেকদিকে ততটুকুই খারাপ। এদিকে খারাপ হচ্ছে সিনথিয়া। যে রহিম সাহেবকে একদমই দেখতে পারে না।
অনেকক্ষণ যাবত আর বাবু সিয়ামের কান্নার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু রহিম সাহেবের আবার কাশির বেগ উঠলো। তিনি লেপের তলে ঢুকে পড়লেন। কিন্তু মনে হচ্ছে আওয়াজ আরো বেশি জোরে হচ্ছে! বাবু সিয়াম আবারো উঠে গেছে। কাঁদছে, কাঁদছে, ব্যাপক আওয়াজে!
.
(চার)
.
আজ বাড়িতে সিনথিয়ার বাবা এসেছেন। এইজন্য বাসায় আয়োজনের শেষ নাই। সিনথিয়া ছোটাছুটি করছে অনেক। দেখে ভাল লাগছে রহিম সাহেবের কাছে। এই মেয়েটা বাবাকে ভীষণ পছন্দ করে কিন্তু শ্বশুরকে মানে তাকে একদমই দেখতে পারে না। রহিম সাহেব আশা করছিলেন দুপুরে সিনথিয়ার বাবা করিম সাহেব তাকে সঙ্গে নিয়ে খেতে বসবেন। কিন্তু রহিম সাহেবের ডাক পড়লো না। তিনি অবশ্য তেমন অবাক হননি। মেয়ে যখন তাকে এত অপছন্দ করেন তখন মেয়ের বাবা তার সাথে কখনোই আলগা খাতির দেখাবেন না।
.
বিকেলের দিকে করিম সাহেব দেখা করতে আসলেন। রহিম সাহেবের টেবিলে দাবা খেলার সরঞ্জামাদি রয়েছে। করিম সাহেব সেদিকে ইঙ্গিত করে বললেন,
.
- বেয়াই সাহেব, দাবা খেলা যায়। কি বলেন?
রহিম সাহেব সম্মতি দিলেন।
.
খেলা শুরুর ৫ মিনিটের মাথায় করিম সাহেবের মন্ত্রী খোয়া গেল। করিম সাহেব হেসে বললেন,
.
- আপনি দেখি হারিয়ে দিচ্ছেন আমাকে??
-- আমি দাবা বেশ ভাল খেলি।
- যাক ভাল। আপনার বিশেষ গুণ। আজ আপনাকে একটা কথা বলবো, যদি অনুমতি দিন।
-- জ্বী বলুন।
.
- এই ফ্যামিলির অশান্তির মূলে যে আপনি তা কি আপনি জানেন??
-- বুঝলাম না কথাটা!
- আপনি শুধু শুধু এই ফ্যামিলিতে পড়ে আছেন কেন?? ওদের স্বামী স্ত্রীর মধ্যে সমস্ত ঝগড়ার মূলে হচ্ছেন আপনি। আপনার ছেলেটা ভাল মানুষ। কিন্তু আপনার ব্যাপারে কোন ছাড় সে দিবেনা। আপনি যে এই ফ্যামিলিতে কাটা হয়ে আছেন তা কি বুঝতে পারছেন না??
-- হু!
.
- আপনি কি চান না যে এই ফ্যামিলিটা সুখী হোক??
-- অবশ্যই চাই।
- তাহলে আপনি শুধু শুধু ঝামেলা বাড়াচ্ছেন কেন? আমার পরিচিত এক বৃদ্ধাশ্রম আছে। সেখানের কার্ড দিচ্ছি আপনাকে। আমার পরিচিত আছে।
-- ও আচ্ছা।
.
- সব গোছগাছ করে ফেলুন। আমি দুইদিন পরে এসে আপনাকে নিয়ে যাবো। আপনার ছেলেকে কিছু জানানোর দরকার নেই। সে জানতে পেরে আমার মেয়েকে কিছু বললে সে এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে। আপনি কি সেটা চান??
-- জ্বী না। চাই না।
- অতএব কাউকে কিছু বলার দরকার নেই। সব গুছিয়ে রাখবেন। আমি এসে আপনাকে নিয়ে যাবো। এখন আসি ভাল থাকবেন।
.
করিম সাহেব চলে গেছে। রহিম সাহেব দাবার কোর্ট নিয়ে একা একাই বসে আছে। ঘোড়াটা আর এক দান চেলে দিলেই চেকমেট হয়ে যায়। কিন্তু হাত চালাতে আর ইচ্ছে করছে না রহিম সাহেবের।
.
আশ্চর্যজনক ভাবে সেই রাতে একবারের জন্যেও রহিম সাহেবের কাশি আসলো না।
.
(পাঁচ)
.
রহিম সাহেব ব্যাংক থেকে তার সঞ্চিত সকল টাকা তুলে আনলেন। মোট টাকার পরিমাণ ৫ লক্ষ ১১ হাজার টাকা। রহিম সাহেব ১ লক্ষ ১১ হাজার টাকা ব্যাগে ভরে নিলেন। বাকি ৪ লক্ষ টাকা একটা খামে ভরে সেই খামের উপরে লিখে দিলেন " এই টাকা সোলায়মান এর। "
.
বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগমুহূর্তে রহিম সাহেব কি মনে করে ছেলের ঘরে ঢুকে পড়লেন। সিনথিয়া রুমে নেই, সম্ভবত পাকঘরে। সোলায়মান জেগে ছিলো। রহিম সাহেবকে দেখে ফিক করে হেসে দিলো সোলায়মান। দেখে রহিম সাহেবের বুক ভরে গেল। এইটুকু ছেলে কি মনে করে হাসলো কে জানে! রহিম সাহেব তার গলায় থাকা সোনার চেইনটি খুলে সোলায়মানের গলায় পড়িয়ে দিলেন। তারপর নিজের পেনশনের টাকা দিয়ে গড়ে তোলা প্রিয় ঘরটি ছেড়ে বের হয়ে গেলেন।
.
সেই রাতে রাজ্জাক সারারাত বাবার ঘরে বসেছিলো। তার এক হাতে ছিলো সোলায়মানের জন্য কেনা জিনিসপাতি, আরেকহাতে ৪ লক্ষ টাকা। সিনথিয়া একবারের জন্যেও রাজ্জাককে ডাক দেয়ার সাহস করেনি। আশ্চর্যজনক ভাবে বাবু সোলায়মান সারারাত একাধারে কেঁদে গেছে।
.
(ছয়)
.
রহিম সাহেব একজন চা বিক্রেতা। তিনি এখন কুমিল্লার এক প্রত্যন্ত গ্রামে বাস করেন। সারাদিন ব্যস্ত থাকেন বলে কোনকিছুই তার মনে পড়ে না। কিন্তু রাতের বেলা তার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়! তার ছেলের জন্য, ছেলের সন্তানের জন্য!
অন্যদিকে, ছেলে রাজ্জাকও রাস্তা ঘাটে হাটার সময় আশেপাশে দেখতে দেখতে হাটে। কোনভাবে যদি তার বাবার দেখা পেয়ে যায়!
.
সবই নিয়তি। প্রতিরাতে স্নিগ্ধ চাঁদের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে যায় বাপ-বেটা। যাদের এক ছাদের নিচে থাকার কথা নিয়তি তাদের নিয়ে গেছে অনেক অনেক মাইল দূরে। চাঁদ কিন্তু একটাই কিন্তু লক্ষ লক্ষ মানুষের দীর্ঘশ্বাসের সাক্ষী!
.
|| সমাপ্ত ||
.
লেখক - মুনীর আহমদ।
.
(গল্পটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। বাস্তবে কারো জীবন কাহিনীর সাথে মিলে গেলে আমি আন্তরিক ভাবে দুঃখিত।)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now