বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।
রাতের বৃষ্টি থেমে গেলেও শহরের বাতাসে ভেজা কংক্রিটের গন্ধ তখনো ঝুলে আছে। রাশেদ অফিস থেকে ফিরছিল ধীর পায়ে। বাসের ভেতর ঠাসাঠাসি ভিড়, কারও কনুই কারও পিঠে গেঁথে আছে, জানালার কাঁচে জমে থাকা শিশিরে আলোগুলো ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। সারাদিনের ক্লান্তি তার কাঁধে পাথরের মতো চেপে বসেছে। দুপুরে বসের সঙ্গে কথাকাটাকাটি, বিকেলে রিপোর্টে ভুল ধরা, আর এখন বাসের হর্ন—সব মিলিয়ে মাথার ভেতর যেন একটানা শব্দ বাজছে। হঠাৎ সামনে দাঁড়ানো এক যুবক পেছনে সরে এসে তার পায়ে জোরে ধাক্কা দিল। রাশেদের বুকের ভেতর আগুনের মতো কিছু একটা জ্বলে উঠল। মুখ খুলে কড়া কথা বলতেই যাচ্ছিল, ঠিক তখনই নিজের ভেতরের সেই অদ্ভুত টানটান অনুভূতিটা সে প্রথম টের পেল—হৃদস্পন্দন দ্রুত, ঘাড় শক্ত, চোয়াল চেপে ধরা।
সে চুপ করে রইল। আশ্চর্য লাগল নিজের কাছেই। সাধারণত এমন হলে সে রেগে যেত। আজ কেন যেন সে বুঝতে পারল, রাগটা আসলে ওই ছেলেটার ওপর নয়—রাগ জমে আছে দিনের পর দিন, চাপের স্তূপে। বাস থেকে নামার পর সে হাঁটতে হাঁটতে নিজের শ্বাসের শব্দ শুনল। লম্বা শ্বাস নিল, আবার ছাড়ল। বুকের ভেতরের চাপটা সামান্য ঢিলে হলো। মনে হলো, যেন কেউ ভেতরে হাত দিয়ে শক্ত করে ধরা দড়িটা একটু আলগা করে দিল।
রাশেদ একজন হিসাবরক্ষক। সংখ্যার সঙ্গে তার দিন কাটে, কিন্তু নিজের অনুভূতির হিসাব সে কখনো রাখেনি। ছোটবেলা থেকেই শিখেছে—পুরুষ মানুষ কাঁদে না, দুর্বলতা দেখায় না। তাই দুঃখ, ভয়, লজ্জা—সব গিলতে গিলতে সে অভ্যস্ত। আজ প্রথমবার বুঝল, এই গিলতে থাকা জিনিসগুলোই হয়তো ভেতরে জমে বিস্ফোরণ ঘটাতে চায়।
বাড়ি পৌঁছে সে চুপচাপ বারান্দায় দাঁড়াল। নিচে রাস্তার ধারে এক মহিলা ছাতা মাথায় হাঁটছেন, পানি জমে থাকা গর্তে গাড়ির চাকা পড়তেই ছিটকে উঠল কাদা। রাশেদের মাথার ভেতর আবার অফিসের দৃশ্য ফিরে এল—বসের তীক্ষ্ণ কণ্ঠ, সহকর্মীদের তাকানো চোখ। বুকটা আবার ভারী হলো। সে চোখ বন্ধ করল। আগে হলে সে ভাবতে শুরু করত—কেন বস এমন বলল, আমি কি সত্যিই অযোগ্য, সবাই কি আমাকে ছোট মনে করছে। আজ সে নিজেকে থামাল। চিন্তা নয়, শুধু অনুভূতি। বুকের মাঝখানে চাপ, কাঁধে শক্ত ভাব, পেটে হালকা মোচড়। সে ধীরে ধীরে শ্বাস নিল, গুনে গুনে ছাড়ল। কয়েকবার এমন করতেই শরীরের ভেতর যেন ঢেউ থিতিয়ে এল।
পরদিন অফিসে আবার চাপ। রিপোর্ট জমা দেওয়ার শেষ দিন, বসের চোখে বিরক্তির ছাপ। এক সহকর্মী এসে বলল, “এই অংশটা ভুল হয়েছে।” কথাটা শুনেই রাশেদের মাথার ভেতর যেন সাইরেন বাজল। সে টের পেল—রাগ উঠছে। হাতের তালু ঘেমে যাচ্ছে, কপালে ভাঁজ পড়ছে। সে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই গত রাতের বারান্দার কথা মনে পড়ল। সে বসে পড়ল। টেবিলের নিচে পা দুটো মাটিতে চেপে ধরল, যেন নিজেকে ধরে রাখছে। গভীর শ্বাস। আবার ছাড়ল। সহকর্মীর দিকে তাকিয়ে বলল, “দেখি তো কোথায় ভুলটা।”
সে নিজেই অবাক হলো নিজের কণ্ঠে—নরম, স্থির। সহকর্মীও একটু অবাক হয়ে গেল। দুজনে মিলে ভুলটা ঠিক করল। কাজ শেষে রাশেদের মনে হলো, আজ সে কোনো যুদ্ধ করেনি, কিন্তু জিতেছে কিছু একটা—নিজের ওপর।
তবে পরিবর্তন এক দিনে আসে না। সপ্তাহখানেক পর এক সন্ধ্যায় বাসায় ফেরার সময় বিদ্যুৎ চলে গেল। অন্ধকার সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে সে হোঁচট খেল। দরজায় ঢুকেই দেখে রান্না হয়নি, ফোনে মায়ের কল—গ্রামে টাকার দরকার। মাথার ভেতর আবার গুলমাল শুরু হলো। “সব আমার ওপরই কেন?”—চিন্তাটা আসতেই সে বুঝল, আবার বিশ্লেষণের ফাঁদে পড়ছে। সে রান্নাঘরের চেয়ারে বসে পড়ল। চোখ বন্ধ করল। এবার শুধু শ্বাস নয়, শরীরের ভেতরের অনুভূতিগুলোকে চলতে দিল। বুকের ভেতর ভারী ঢেউ উঠল, গলা শুকিয়ে এল, চোখের কোণে জল জমল। সে বাধা দিল না। জল গড়িয়ে পড়ল। কয়েক মিনিট পরে মনে হলো, ভেতরের গিঁটটা ঢিলে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ এলে সে চা বানাল। ফোন করে মাকে শান্তভাবে কথা বলল। টাকার ব্যবস্থা কীভাবে করা যায়, সেটাও ভাবল—কিন্তু এবার আতঙ্ক থেকে নয়, স্থির মাথায়।
কয়েক মাসের মধ্যে রাশেদের ভেতরে একটা বদল স্পষ্ট হলো। সে এখনো রাগে, দুঃখে, ভয় পায়—মানুষ বলেই তো। কিন্তু সে আর সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া দেয় না। আগে থামে। শরীরের সংকেত শোনে। শ্বাস নেয়। অনুভূতিকে জায়গা দেয়। সহকর্মীরা বলল, সে নাকি আগের চেয়ে অনেক শান্ত। একদিন বসও বললেন, “তুমি এখন চাপ সামলাতে পারছ ভালো।”
রাশেদ জানে, এটা কোনো জাদু নয়। এটা প্রতিদিনের ছোট ছোট চর্চা—বাসে দাঁড়িয়ে, বারান্দায়, অফিসের ডেস্কে, অন্ধকার সিঁড়িতে। নিঃশ্বাসের মাঝখানে সে নিজের জন্য একটু জায়গা তৈরি করেছে।
এক বিকেলে সে পার্কে বসে ছিল। সামনে একটা ছোট ছেলে বেলুন নিয়ে খেলছে, হঠাৎ বেলুন ফেটে যেতেই ছেলেটা কেঁদে উঠল। মা তাকে কোলে তুলে শান্ত করছে। রাশেদ ভাবল, মানুষ বড় হলেও ভেতরে ওই শিশুটাই থাকে—হঠাৎ কিছু ভাঙলে, হারালে, ভয় পেলে কেঁদে ওঠে। পার্থক্য শুধু, বড়রা কান্নার বদলে রাগ, চুপ করে থাকা, বা পালিয়ে যাওয়াকে বেছে নেয়।
সে হালকা হাসল। আকাশে সূর্য ঢলছে, আলো গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে মাটিতে পড়ছে। সে একটা গভীর শ্বাস নিল। ছাড়ল। বুকটা হালকা লাগল। মনে হলো, বেঁচে থাকা মানে শুধু দৌড়ানো নয়—কখনো কখনো থামা, নিজের ভেতরের ঢেউগুলোকে দেখা, আর নিঃশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে তাদের শান্ত হতে দেওয়া।
রাশেদ উঠে দাঁড়াল। সামনে হয়তো আবার চাপ আসবে, ঝগড়া, ভুল, ভয়। কিন্তু এখন সে জানে—প্রতিক্রিয়ার আগের ওই ক্ষুদ্র মুহূর্তটুকুই তার সবচেয়ে বড় শক্তি। নিঃশ্বাসের মাঝখানে সে নিজেকে খুঁজে পায়।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now