বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

নীরব হাহাকার

"ছোট গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X "নীরব হাহাকার" লেখকঃ শফিক এহসান। ================= ঘুম থেকে বেশ তাড়াতাড়িই উঠলো ফারুক। নিত্য ব্যবহৃত নিমের ডালটা নিয়ে বের হয়ে গেল ঘর থেকে। তারপর দাঁতে ঘষতে ঘষতে চলে এলো বস্তির একমাত্র টিউবয়েলটির কাছে। এই ভোর বেলাতেও চার-পাঁচজন বস্তিবাসির ছোট একটা জটলা তৈরী হয়েছে টিউবয়েল ঘিরে। সবার হাতেই কলসি কিংবা বালতি। ফারুকের পরপরই কলসি হাতে একটা মেয়ে এসে দাঁড়ালো তার পাশে। ফারুক মেয়েটিকে বলল: কিরে, আইজ এতো তাড়াতাড়িই পানি নিতে আইলি যে- জুলি? জুলি জবাবে বলল: হঅ; আমি যে বাসায় কাম করি হেই বাড়ির মেডাম আইজ সকাল সকাল যাইবার কইছে। সংক্ষেপে কথা সেরে কলসিতে পানি নিয়ে চলে যায় সে। ফারুকও হাত মুখ ধোয়ার জন্য কলের দিকে এগোয়। টিউবয়েলের একটা বিশেষ অংশ নজর কারে তার। সেটি হলো কলের মুখ; সেখানে লাল রং করা হয়েছে, যা গতকাল সকালেও ছিলো না। ফারুক নিজের মনকে প্রশ্ন করে- এইহানে আবার রং লাগাইছে কেন? নিজের মন থেকেই কয়েকটা উত্তর পায় সে। হয়তো মরিচা ধইর‌্যা গেছিলো, তাই রং করছে। অথবা দূর থিক্যা দেইখাই যেন বুঝা যায় ঐটা টিউবয়েল। কিংবা এমনও হইতে পারে- কারও রিক্সায় লাগানোর জন্যে আনছিলো; বেশি হইছে তাই লাগাইয়্যা থুইছে। সে যে কারণেই লাগাক না কেন, ফারুকের তাতে কিছু আসে যায় না। মোটের ওপর টিউবয়েলটা যে আগের থেকে সুন্দর লাগছে সেটাই আসল কথা। হাত মুখ ধুয়ে ঘরে ফিরে গেল সে। তারপর গেরেজ থেকে রিক্সা নিয়ে বেরিয়ে পড়লো বাইরে। কপাল ভালই বলতে হবে; বড় রাস্তায় ওঠা মাত্র পেছন থেকে ডাক এলো- এই খালি, যাবে? ঘুরে তাকিয়ে দেখলো এক ভদ্রলোক হাত তুলে ইশারা করে ডাকছে তাকে। : কই যাইবেন ছার? : উত্তরা, ভাড়া কত? : পনের ট্যাকা দিয়েন। দর কষাকষি না করে উঠে পড়লো লোকটি। ফারুকও চলতে লাগলো। উত্তরা এসে একটা বড় মার্কেটের সামনে নেমে লোকটি বলল: তুমি এখানে দাঁড়াও আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যেই আসছি। ভদ্রলোক চলে গেলে ফারুকও রিক্সায় বসে বিশ্রাম নিতে থাকে। অনেক্ষণ হয়ে যায়, কিন্তু লোকটি আসে না। এভাবে প্রায় আধা ঘণ্টা হয়ে যায়, কিন্তু লোকটির পাঁচ মিনিট আর শেষ হয় না। দেরিতে হলেও ফারুক যখন বুঝতে পারে লোকটি আর আসবে না, তখন মনটা খারাপ হয়ে যায় তার। লোকটাকে উদ্দেশ্য করে মনে মনে কয়েকটা বিশ্রি গালি দিতে দিতে চলে আসে সেখান থেকে। বস্তির সামনের চায়ের দোকানটির সামনে এসে রিক্সা থেকে নামে সে। দোকানের বেঞ্চে বসে দোকানিকে বলে: ইব্রাহিম ভাই, একটা রুটি, কলা আর চা দেও। দোকানি চায়ে চিনি দিতে দিতে বলে: কি মিয়া, অমন মুখ কালা কইর‌্যা রাখছ কেন? মন খারাপ? আক্ষেপের সুরে ফারুক জবাব দেয়: আর কয়েন না ভাই, ভদ্রলোকের বেশ ধরা কয়ডা লোক আছে যারা খালি মাইনষ্যারে ঠকায়। হেই রকমই এক জনের খপ্পরে পড়ছিলাম। আইচ্ছা, গরিব মানুষেরে এমন কইর‌্যা ঠকাইয়্যা কি লাভ তাগো কও দিহি? : তোমারে আর কি জবাব দিমু? আমার দোকানেই কত সময় আসে। চা খায়, তারপর টেকা না দিয়া চইল্যা যায়। : আমার কি মনে অয় জানো ইব্রাহিম ভাই? মনে অয় কোন দিন যদি একটা ফেরেস্তা আইস্যা আমারে কইতো- আমি তোমার তিনটা ইচ্ছা পূরণ করতে চাই, তুমি তোমার তিনটা ইচ্ছার কথা কও। আমি তহন কইতাম; এক নাম্বার- এই রিক্সাডা যেন আমার অইয়া যায়। এই ভাড়ার রিক্সা চালাইয়্যা রোজগার বেশি অয় না। দুই নাম্বার- যারা ভাড়া না দিয়া যায়, তাগো জানি আল্লায় রিক্সা আলা বানাইয়্যা দেয়। তাইলে হেরা বুঝবো, ভাড়া না দিয়া গেলে আমাগো কেমন লাগে। আর তিন নাম্বারটা এহনও ভাবি নাই পরে ভাবমু। কথা গুলো বলতে বলতে ফারুক স্বপ্ন বিভোর হয়ে যায়। তার চোখ দেখে মনে হয় যেন এক্ষুণি তার সামনে এসে হাজির হচ্ছে সেই ‘ইচ্ছা পুরণকারী’ ফেরেস্তা। পানি ভর্তি কেটলি স্টভে রাখতে রাখতে ইব্রাহিম মিয়া বলল: তুমি তো কল্পনার কথা কইলা। কিন্তু কল্পনা আর বাস্তব এক না। আমি বিশ্বাস করি বাস্তবে। স্বপ্ন দেইখ্যা লাভ কি, যদি স্বপ্ন সত্যি না অয়? তয় এইডা ঠিক, পরিশ্রম করলে সফলতা আইবই। ফারুক আর কিছু না বলে চুপচাপ নাস্তা সারে। তারপর বাকির খাতায় নাম লিখিয়ে রিক্সা নিয়ে চলে আসে সেখান থেকে। পরদিন সকালে জুলির সাথে টিউবয়েলের কাছে দেখা হয় ফারুকের। কি একটা বিষয় নিয়ে কয়েকজন বস্তিবাসীর সাথে জরুরি মিটিং করছিলো জুলি। ফারুক তাদের আলোচনার দু’একটা টুকরো টুকরো কথা শুনতে পায়। কিসব যেন পানি- বিষ; এইসব নিয়ে আলোচনা করছে তারা। ভাল করে শোনার জন্য জুলির কাছে এসে দাঁড়ায়। জুলি ফারুককে উদ্দেশ্য করে বলে: শুনছেন, এই কলের পানি খাওন যাইব না। : কেন, খাওন যাইব না কেন? আর সবার মত ফারুকও অবাক হয়। জুলি বিজ্ঞের মত মাথা নাড়িয়ে বলল: কারণ এই পানিতে বিষ আছে। আমি যে বাড়িতে কাম করি হেই বাড়ির টিবিতে কাইল দেখছি। কি জানি বিষটার নাম? আছে- আছে-; ও মনে পড়ছে আর্সেনিক। : হুহ্! কইলেই অইল? কই কাল রাইত্রেই তো এই কলের পানি খাইলাম; বিষ থাকলে মইর‌্যা গেলাম না কে? অবজ্ঞার সাথে কথাগুলো বলে একটা বীরত্বের হাসি হাসে সে। যেন জুলির কথার বিরুদ্ধে কি যুতসই যুক্তিটাই না দাঁড় করিয়ে ফেলেছে। জুলি একটু বিরক্ত হয়ে বলল: যে-এ-না; এই পানি খাওয়ার সাথে সাথেই মানুষ মরে না। এইডা অন্য রকম বিষ। অনেকদিন ধইর‌্যা খাইলে তারপর মরে; তাই আর খাইয়েন না। ফারুক তবুও অবজ্ঞার সুরে বলে: তাইলে কি পানি না খাইয়ে থাকুম? তাইলে তো আইজই মইরে যামু। জুলি বলল: এতোক্ষণে লাইনে আইছেন। পাশের বস্তির কলের পানিতে এই বিষ নাই। তাই এখন থিকা আমরা ঐ পানি খামু। ফারুক ওর কথা শুনে শূন্য দৃষ্টিতে তাকায় টিউবয়েলটির দিকে। মুহুর্তের মধ্যে যেন কলটা তার কাছে মূল্যহীন বোঝা হয়ে গেছে। তার মনে হতে লাগলো- এই হানে আবার এই অকর্মা কলটারে গারছে কেন? শুধু শুধু জায়গা আটকাইয়্যা রাখছে! ওর মনের ভাব বুঝতে পেরেই যেন জুলি বলল: শুধু খাওয়া আর রান্না- বান্না ছাড়া আর সব কাম এই পানি দিয়াই করা যাইবো। গুছল করা, হাড়ি- পাতিল ধোয়া, এইসব করলে কিছু অইব না। ওর কথা শুনে খুশি হয় ফারুক: তাইলে তো ভালই- শুধু খামুনা, আর সব কাম এই কল থিকাই করুম। আইচ্ছা জুলি, তুই কেমনে জানলি আমাগো কলে বিষ আছে, টিবিতে কি আমাগো কলডাই দেখাইছিলো? ফারুকের কথায় জুলি না হেসে পারে না: আরে না, টিবিতে আমাগো কল দেখাইব কেন? টিবিতে কইছে- যে কলে এই বিষ আছে সেই কলের মুখে লাল রং কইর‌্যা দেওয়া হইব? আর যে কলে নাই, সেই কলে সবুজ রং। ফারুকের কাছে এবার কলে রং করার ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গেল। খুশি খুশি গলায় বলল: আইজ কামে যাবি না- জুলি? : না; আব্বার হাপানিডা আবার বাড়ছে। তাই আইজ আর কামে যামু না। ফারুক আর কিছু না বলে হাত মুখ ধোয়ার জন্য টিউবয়েলটির দিকে এগোয়। তারপর কি যেন ভেবে একটু থমকে দাঁড়ায়: হাত- মুখ ধুইলে কিছু হইব না তো, জুলি? জুলি অবাক হয়ে বলে: তা তো জানি না; টিবিতে তো হাত- মুখ ধোয়ার কথা কিছু কয় নাই! তয় গুছল যহন করা যাইব তহন হাত- মুখ ধুইলেও মনেহয় কিছু অইবো না। বলে জুলি পানি চেপে দেয়। ফারুক খুশি মনে মুখে পানি দিতে থাকে আনিস সাহেব নাস্তার টেবিলে তার স্ত্রী রিমাকে জিজ্ঞেস করেন: কি ব্যাপার; তোমার কাজের মেয়ের খবর কি? কি যেন নাম? জুলি না ফুলি? কাল এলো না; আজও এতো বেলা হয়ে গেল! রিমা বলল: কি জানি; এসব কাজের মেয়েদের বিশ্বাস করা যায় না। কখন কাজ করে কখন করে না, কোন ঠিক- ঠিকানা নেই। : দেখ; আবার কোন কিছু চুরি- টুরি করে পালালো কিনা! : মনে হয় না এরকম কিছু করবে। সামনের বাসার ভাবি ওদের বস্তিটা চেনে। এক কাজ কর; মেয়েটার নাম ঠিকানা যে কাগজে লেখা আছে সেটা নিয়ে আসি। আজ তো ছুটির দিন; তুমি গিয়ে একটু খোজ খবর নিয়ে এসো। বলে আর বলে আর দেরী করলো না- উঠে চলে গেল সে। দুই মিনিট পর এক টুকরো কাগজ এনে দিলো স্বামীর হাতে। কিছুক্ষণ পর একটা রিক্সা নিয়ে বস্তিতে চলে এলেন আনিস সাহেব। বস্তিতে এসেই ইব্রাহিম মিয়ার চায়ের দোকানটি চোখে পড়ে তার। রিক্সা থেকে না নেমেই ইব্রাহিমকে জিজ্ঞেস করে: এই যে, এখানে জুলি কোথায় থাকে বলতে পার? ইব্রাহিম জবাব দেয়: জুলিগো ঘর খুঁজেন? এই সমনে গিয়া বায়ে যাইবেন। বায়ের চাইর নাম্বার ঘরটাই জুলিগো। উত্তর পেয়ে আনিস সাহেব যখন রিক্সা ওয়ালাকে সামনে যেতে বলবেন তখন খেয়াল করলেন দোকানি ছাড়াও আরও একজোড়া চোখ তাকিয়ে আছে তার দিকে। দোকানের বেঞ্চে বসে ফারুক তিক্ষè চোখে দেখছিলো তাকে। দু’জনের চোখাচোখি হতেই চিনতে পারলো একে অপরকে। এই সেই ভদ্রলোক যে কিনা সেদিন ফারুককে ভাড়া না দিয়েই চলে গিয়েছিলেন। আনিস সাহেব তাড়াতাড়ি রিক্সা ওয়ালাকে সামনে যেতে বললেন। ফারুক চেয়ে রইলো তার চলে যাওয়া পথের দিকে। সেই সাথে ভদ্রলোককে উদ্দেশ্য করে নিচু স্বরে কয়েকটা গালিও দিলো। গালিগুলো কাকে উদ্দেশ্য করে দেয়া তা বুঝতে না পেরে ইব্রাহিম বলল: কারে গাইল দিতাছাও? বলতে বলতে ফারুকের হাতের কাপে বসে থাকা দু’টি মাছির ওপর নজর পড়ে তার। তাই আবার বলে: মাছিরে গাইল দেও বুঝি? ফারুক মুখ তুলে তাকায় ইব্রাহিমের দিকে: এ্যাঁ? না, মাছিরে না; গাইল দিতাছিলাম ঐ লোকটারে। এই ব্যাটাই হেদিন আমারে ভাড়া না দিয়া গেছিলো। ওর কথায় ইব্রাহিম বিষ্মিত হয়। রাস্তার দিকে তাকিয়ে বলে: দেখতে তো ভদ্রলোকের মতনই দেখুন যায়। মনের ভিতরে এমন একটা জালিম আছে বুঝনই যায় না! তুমারে বোকা পাইয়্যা ঠকাইয়্যা দিছে! তুমি একটা কাম কর। রিক্সা চালান বাদ দিয়া দেও। : কও কি! রিক্সা না চালাইলে খামু কি? : কেন? দুনিয়াতে কি রিক্সা চালান ছাড়া আর কোন কাম নাই? শোন মিয়া; আমি গত দুই মাস ধইর‌্যা একটা মুরগির ফারাম করার প্রশিক্ষণ নিছি। আমাগো বস্তির পুর্ব পাশে যে ডোবাটা আছে, সেইটার উপরে একটা ফারাম করুম। : কও কি? পানির উপরে ফারাম করবা ক্যামনে? মুরগি কি সাঁতার জানে? সারাদিন পানিতে সাঁতার কাটবো? : আরে ধুরো মিয়া; মুরগি পানিতে সাঁতরাইব কে কইল? পুকুরের উপরে মুরগির ঘর থাকব! ফারুক বিড়বিড় করে বলল: মেলা মাটি লাগবো। : কি কইলা? : কইতেছি, অত বড় পুকুর ভরতে মেলা মাটি লাগবো। : আন্তাজে কথা বইলো না। পুকুর ভরুম কইছে কেরা? পুকুরে তো মাছ চাষ করুম। আর তার উপরে বাঁশের খুটির উপরে থাকবো মুরগির ঘর; বুঝছ? : ওঁ; বুঝলাম। কিন্তু মুরগির ‘ই’ পানিতে পরলে? : ‘ই’ আবার কি? : ‘ই’ মানে হইল গু। : ও; হঅ, পড়বো। তাতে অসুবিধা কি? মাছের খাওন হইব! : কি! ঐ মুরগির ‘ই’ মাছে খাইব? : হঅ, তাতে অসুবিধা কি? উল্টা আরো মাছের খওন খরচ কইমে যাইব। : কি কও এইসব! ছি ছি ছি; ওয়াক থু। : অতো থু থু কইর না। বাজারে যে মাছ কিন্যা খাও সেগুলাও কিন্তু চাষের মাছ; এমন কইরেই সেগুলারে চাষ করা হয়। বাজে কথা বাদ দেও; এখন কও তুমি আমার ফারামে কাম করবা নাকি? : আমি একলা এতো কাজ ক্যামনে করুম? আর তাছাড়া আমি ঐ ‘ই’ আলা পানিতে নামতে পারুম না। : তোমার বেশি কতা কওয়ার অভ্যাস গেল না। তুমি একলা কাজ করবা কে কইল? আরো লোক কাজ করব! আর পানিতে নামতে না চাইলে নাইমো না। তুমি শুধু মুরগির ফারামে কাজ করবা। আর বেতনের কথাও তোমারে ভাবতে হইব না। ফারামের ব্যবসায় ভালই লাভ হয়। দেশে ট্যাকার জন্যে খবর পাঠাইছি। দুই চাইর দিনের মধ্যেই ট্যাকা আইস্যা পরবো। পরথম বারে পঞ্চাশটা মুরগি কিনুম। ফারুক এবার খুশির সাথেই রাজি হয়ে গেল। কিছুদিন পরের কথা। ফারুক এখন আর রিক্সা চালায় না। ইব্রাহিমের ফ্রামের মুরগির খাবার দেয়া আর ডিম সংগ্রহ করা তার কাজ। বেশ আনন্দের সাথেই কাজটা করে সে। অবশ্য প্রথম প্রথম দুর্গন্ধে কাজ করতে কষ্ট হতো; তবে এখন নাক সওয়া হয়ে গেছে। সপ্তাহ খানেক আগে বিয়ে করেছে জুলিকে। মনে এখন কোন আক্ষেপ নেই তার। ব্যবসা ভালই চলছিলো ইব্রাহিমের। কিন্তু হঠাৎ করেই কোথা থেকে আমদানি হলো ‘বার্ড ফ্লু’ রোগের। রোগের আতঙ্কে মুরগীর দাম গেল কমে। ক্ষতিটা পোষাতে হলো মাছ আর ডিম বিক্রি করে। তবে ফারুকের মধ্যে কোন প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। কারণ সে তার বেতন ঠিকই পাচ্ছে। তাছাড়া আর কেউ না জানুক সে তো জানে তাদের ফ্রামের মুরগীগুলোর কোন রোগ নেই। উপরন্তু মাঝে মধ্যে ফ্রি মুরগী নিয়ে যেতো বাসায়। জুলি আবার এই জিনিষটা ভাল রান্না করে! এক কথায় সুখেই কেটে যাচ্ছিলো দিনগুলো। কিন্তু সুখ দীর্ঘস্থায়ি হলো না কারওই। সেদিন সকাল বেলা ফারুকের ঘুম ভাঙলো মানুষ জনের ছুটাছুটি আর চিৎকার চেচামেচির শব্দে। ঘর থেকে বেরিয়ে দেখলো সিটি কর্পোরেশনের বড় বড় ডোজার দিয়ে ভেঙ্গে দেয়া হচ্ছে তাদের মাথা গোজার ঠাইটুকু। সরকার তাদের মত গরীবদের আশ্রয় দিতে না পারলেও বড়লোকের দামি গাড়ি চলার পথে বাধা সৃষ্টিকারী অবৈধ বস্তি ভেঙ্গে দিতে খুবই সোচ্চার! তাইতো বিনা নোটিসে ভেঙ্গে চুরমার করে দেয় হলো তাদের খোয়াড় সদৃশ্য ঘর, নোংরা চায়ের দোকান, ইব্রাহিমের মুরগীর খামার সহ সবকিছু! বস্তিবাসীদের জীবনে সুখ নামের মরিচিকা কখনোই ধরা দেয় না। ফারুকের মত বস্তিবাসীদের কাছে কোনদিন আসে না ইচ্ছা পুরণকারী ফেরেস্তা। আর ইব্রাহিমের মত বাস্তববাদী লোকের পক্ষেও সম্ভব হয় না দারিদ্রতার সাথে সংগ্রাম করে সুখ ছিনিয়ে আনতে। তাই সুখের স্বপ্ন দেখা এখন বড়লোকের ব্যাপার। আর অসহায় বস্তিবাসীদের জন্য স্বপ্ন দেখার পরিনাম হলো হাহাকার। হৃদয়ের বা পাশের গভীর থেকে বের হয়ে আসা এক নিরব হাহাকার।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮৭ জন


এ জাতীয় গল্প

→ নীরব হাহাকার

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now