বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

নীল—পর্ব ২ (শেষ)

"সাইন্স ফিকশন" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X তিন. সালমান রাস্তায় নেমে দেখল, পুরো পৃথিবীর চেহারাই বদলে গেছে! কোথাও নীল-এর কোনো অস্তিত্ব নেই। যেন সমস্ত নীল রঙ মহাবিশ্ব থেকে চুরি হয়ে গেছে! পুরো আকাশ বেগুনি বর্ণ ধারণ করেছে। মনে হচ্ছে, বেগুনি রঙের কোনো শাড়ি পরে মেঘগুলো উড়ে বেড়াচ্ছে। চিরচেনা জগৎ দেখেই আজ হঠাৎ শিউরে উঠল সে! এখন সালমান যে জলাশয় বা লেক-এর পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, সেটির পানিও বেগুনি দেখাচ্ছে! এই লেকটিতে গতকাল বিকেলেও সে এসেছিল। প্রিয় একজন মানুষের সঙ্গে সালমান এই লেকে আসে রোজ বিকেলে। অতিচেনা এই লেক আজ অচেনা লাগছে! মজার ব্যাপার হলো, সালমানের প্রিয় মানুষটির নাম নীলা! নীল সবই হয়ে গেছে বেগুনি; নীলাকেও এখন যদি সে বেগুনি বলে ডাকে?! - কথাটি ভেবেই সালমান মনে মনে হাসল। প্রকৃতির কোমলতা মুছে গেছে। বেগুনি রঙের গাঢ়ত্ব চারপাশে পৌঢ়ত্বের ভাব নিয়ে এসেছে! সব মানুষের চোখে-মুখেই বিস্ময়ের ছাপ। মিডিয়াগুলোতে ব্রেকিং নিউজ এটি। পিডিয়াগুলোর (এনসাইক্লোপিডিয়া, উইকিপিডিয়া বা বাংলাপিডিয়া) ‘নীল’ শব্দটি হুমকির সম্মুখীন। প্রকৃতপক্ষে, পৃথিবীজুড়ে রয়ে যাওয়া নিযুত-কোটি ‘নীল’ শব্দই এখন মূল্যহীন। কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করলে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হয়। ‘নীল’ রঙ ‘বেগুনি’তে রূপান্তরিত হওয়ার কারণে মানবজাতিকে কতটা মূল্য দিতে হবে বা আদৌ মূল্য দিতে হবে কিনা, তা সালমানের জানা নেই। নীলার ফোন। মেয়েটি ঘুম থেকে উঠে প্রকৃতির এই অবস্থা দেখে হয়তো চমকে গেছে। ‘অ্যাই, এসব কী হচ্ছে বলো তো?!’ ‘নীল নিয়ে ষড়যন্ত্রের নীল-নকশা!’ ‘প্লিজ, ভাবের কথা বোলো না!’ ‘আসল কথাই বলছি, পৃথিবীর বুক থেকে নীল চুরি করে নিয়ে গেছে একদল দুর্বৃত্ত! ডাইনোসরের মতো নীল-এর বিলোপ ঘটেছে। অতিকায় নীল লোপ পাইয়াছে কিন্তু তেলাপোকার ন্যায় টিকিয়া আছে বেগুনি।’ ‘দেখো, সবসময় মশকরা ভালো লাগে না!’ ‘আমি মশকরা করছি না, আমার বেগুনি।’ ‘হোয়াট! আমার বেগুনি মানে? আমার নাম নীলা। নীল-এর সাথে দেখছি তোমার মাথার স্ক্রুও চুরি হয়ে গেছে!’ সালমান কথার মানুষ; কবি। কিন্তু কথায় কখনোই পেরে ওঠে না নীলার সঙ্গে। কথার যুদ্ধ হলে নীলা জিতবেই। এই একটি ক্ষেত্রে সালমান হেরে গিয়েই বেশি আনন্দ পায়! ‍ ‍ চার. সালমান দেওয়ানের রুমে ঢুকেই অবাক! রুম অন্ধকার। তবে জানালার অস্বচ্ছ পর্দার ছোট্ট একটি ফুটো দিয়ে সূর্যের আলো রুমে ঢুকছে। সেই আলো, সামনেই একটি টেবিলের ওপর রাখা কাচের প্রিজমের মধ্য দিয়ে গিয়ে আছড়ে পড়ছে উল্টোপাশের দেয়ালে। সূর্যের সাদা বা বহুবর্ণী আলোকরশ্মি বিশ্লিষ্ট হয়ে দেয়ালের ওপর তৈরি করেছে পাঁচ বর্ণবিশিষ্ট একটি পটি বা বর্ণালী! পটির একেবারে ওপরে লাল; তারপর যথাক্রমে কমলা, হলুদ, সবুজ, বেগুনি! বর্ণালীতে নীল ও আকাশি রঙ নেই! মূলত নীল, আকাশি, বেগুনি-এই তিন রঙের অংশ এখন শুধুই বেগুনি! সালমান বলল, ‘বাহ বন্ধু, রুমে ঢুকেই মনে হচ্ছে অন্য দুনিয়ায় চলে এসেছি!’ অন্ধকার রুমে দেওয়ান টেবিল ল্যাম্পের খানিক আলোয় মনোযোগ দিয়ে খাতায় কীসব হিসাবনিকাশ করছে। সালমানের দিকে না তাকিয়েই সে বলল, ‘আজকের পৃথিবীকে অন্য দুনিয়াও বলতে পারো! কারণ আমাদের চেনা দুনিয়ায় অনেক বড় পরিবর্তন ঘটে গেছে!’ ‘বদলে যাওয়া পৃথিবী দেখতে দেখতেই তো এখানে এলাম। গাঢ় বেগুনি রঙের কারণে মনে হচ্ছে, পৃথিবী হয়ে গেছে স্ট্রংগার ও শার্পার!’ দেওয়ান এবার সালমানের দিকে তাকাল। সে কৌতুক বোঝে না; সবসময় সিরিয়াস টাইপের। উল্টোপাশের দেয়ালে পড়া বর্ণালীর দিকে আঙ্গুল উঁচিয়ে বলল, ‘আলোর বর্ণালীর দিকে তাকিয়ে দেখো, বেগুনি রঙের ওপরে থাকার কথা নীল আর আসমানি রঙ। তারপর থাকার কথা সবুজ। কিন্তু বেগুনির পর নীল-আসমানি নেই! বর্ণালীর ওই অংশের আলোও এখন বেগুনি!’ ‘এটা কীভাবে হলো?!’ ‘সম্ভাব্য কারণ তো অনেক কিছুই হতে পারে।’ ‘কী কারণ?’ ‘হতে পারে, অন্য কোনো গ্রহের বুদ্ধিমান প্রাণীর কাজ এটি; যদিও এখন পর্যন্ত কোনো এলিয়েনের খোঁজ আমাদের জানা নেই! আমরা যেমন পারমাণবিক বোমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটাই, তারা হয়তো সূর্যের মধ্যে এমন কোনো পরীক্ষা করেছে যার ফলে বর্ণালীর ওই অংশেও বেগুনি রং দেখা যাচ্ছে! আর এটিই যদি আসল কারণ হয়, তাহলে আমাদের জন্য চরম দুর্দিন অপেক্ষা করছে!’ ‘চরম দুর্দিন অপেক্ষা করছে!?’ ‘হুম, চরম দুর্দিন! পারমাণবিক বোমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণসহ আমাদের বিভিন্ন পরীক্ষা-নীরিক্ষায় কত উদ্ভিদ-প্রাণীই তো ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে, পরিবেশ চরমভাবে দূষিত হচ্ছে, বাস্তুসংস্থান-খাদ্যচক্র এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে; আমরা কি সেসব নিয়ে আদৌ ভাবি?’ ‘না।’ ‘ঠিক তেমনি এলিয়েনরা যদি এমন পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করে এবং এ ধরনের ঘটনাগুলো ঘটাতেই থাকে, তাহলে আমরাও বিপদসঙ্কুল অবস্থায় পড়ে যাব! কিন্তু তারা হয়তো আমাদের বিপদের কথা চিন্তাও করবে না। তবে আগেই বলেছি, এটি সম্ভাব্য কারণ, সত্যি না-ও হতে পারে। সূর্যের অভ্যন্তরে স্বয়ংক্রিয়ভাবেও কোনো পরিবর্তন হতে পারে! সূর্যের ভেতরে তো সবসময় ফিশন-ফিউশন বিক্রিয়া চলতেই থাকে; এসব বিক্রিয়ার ধরণ ও মাত্রায় হয়তো এমন কোনো পরিবর্তন হয়েছে যার ফলে ওই ফ্রিকোয়েন্সি বা তরঙ্গদৈর্ঘ্যরে আলো বেগুনি হয়ে গেছে!’ ‘আর কোনো সম্ভাব্য কারণ কি মাথায় আসছে?’ ‘তৃতীয় একটি কারণও আমার মাথায় এসেছে।’ ‘তৃতীয় কারণটি কী?’ ‘প্রকৃতির অপারেটিং সিস্টেমে মৌলিক রঙ নীল-এর ক্ষেত্রে গুরুতর কমান্ড বাস্তবায়িত হয়েছে; আর তা হলো রঙটির বিলুপ্তি!’ ‘কী বলছো! এমন হলে তো সর্বনাশ!’ ‘এমন হলেই বরং দুশ্চিন্তার কিছু নেই। কারণ ন্যাচারাল যেকোনো পরিবর্তনের পেছনে শেষমেশ ভালো উদ্দেশ্যই থাকে।’ ‘তাহলে নীল রঙ কি আর কোনোদিনই দেখতে পাব না?’ ‘এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া অসম্ভব। নীল হঠাৎ উধাও হয়ে যাবে, এটা যেমন কেউই জানত না; তেমনি আবার কখনো ফিরে আসবে কিনা, তাও বলা সম্ভব না।’ ‘তার মানে, “নীল আকাশের নিচে আমি রাস্তা চলেছি একা”-এই সুন্দর গানের লিরিক পরিবর্তন করতে হবে?’ ‘হতে পারে!’ ‘নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নাহিরে-এই সুন্দর কবিতার পঙক্তি বদলে ফেলতে হবে?’ ‘দোস্ত, প্রবলেম কি তোমার? কী সব আজগুবি ব্যাপার নিয়ে বকবক করছ?’ ‘ওকে দোস্ত, নাউ আই অ্যাম সিরিয়াস! শুধু কি নীল রঙ-ই আক্রান্ত?’ ‘প্রাথমিকভাবে, তা-ই তো মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে, শুধুমাত্র নীল-আসমানির যে ফ্রিকোয়েন্সি ছিল, সেই ফ্রিকোয়েন্সির রঙ আমরা বেগুনি দেখছি! বাকি সব ঠিকই আছে। এমনকি মৌলিক নীল রঙ, অনেক যৌগিক রঙ তৈরিতে অংশ নেয়; সেসব যৌগিক রঙ তো ঠিকই আছে! সেসব রঙ থেকে নীল হারিয়ে গেলে তো তাদের রূপও পরিবর্তিত হতো। তার মানে, নীল পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। প্রচ্ছন্নভাবে নীল আছে; কিন্তু প্রকটভাবে নীল নেই। ‘কিন্তু আকাশ বেগুনি দেখাচ্ছে কেন?’ ‘কারণ, নীল-আসমানি হারিয়ে গেলেও তাদের তরঙ্গদৈর্ঘ্যরে বৈশিষ্ট্য অপরিবর্তিত আছে; শুধুমাত্র ধরা দিচ্ছে বেগুনি রঙ হিসেবে! আগের মতো এখনো সেই তরঙ্গদৈর্ঘ্যরে আলোর বিক্ষেপণ সবচেয়ে বেশি; তাই ওই তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বেগুনি আলো বিক্ষিপ্ত হচ্ছে সবচেয়ে বেশি; আর আকাশ দেখাচ্ছে বেগুনি!’ ‘এখান থেকে মুক্তির উপায় কী?’ ‘মুক্তির কোনো উপায় দরকার আছে বলে আমি মনে করি না। কারণ, প্রথমে যে কারণটি বললাম, সেই কারণে এটি ঘটে থাকলে আমাদের কিছু করার থাকবে না। প্রচণ্ড বুদ্ধিমত্তার প্রাণী ছাড়া এই ঘটনা ঘটানো সম্ভব নয়; আর অত বুদ্ধিমান প্রাণীদের সাথে পেরে ওঠা আমাদের পক্ষে অসম্ভব। অন্যদিকে, প্রাকৃতিকভাবে এটি হয়ে থাকলে আমাদের নাকে তেল দিয়ে ঘুমানো উচিত। কারণ প্রাকৃতিক যেকোনো পরিবর্তন সৃষ্টির মঙ্গলের জন্যই হয়ে থাকে; সেক্ষেত্রে হয়তো নীল-আসমানি রঙয়ের প্রয়োজনীয়তাই ফুরিয়ে গেছে!’ সালমান দেওয়ানের অনুমতি নিয়েই ঘরের জানালার পাল্লা খুলে দিল। জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকাল। কী রহস্যে ঘেরা এই জগৎ! বেদনার রঙ ‘নীল’ উধাওয়ের সঙ্গে সঙ্গে যদি পৃথিবী থেকে দুঃখ-কষ্ট-বেদনাও উধাও হয়ে যেত, তাহলে কত স্বপ্নীল হতো! সমাপ্ত


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১২৪ জন


এ জাতীয় গল্প

→ নীল—পর্ব ২ (শেষ)

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now