বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
নীল মলাটের ডায়েরী
---------------------------------
*** মোহাম্মদ আহাদ ***
রাতুলের বাসায় এসেছে আদিব । রাতুল ছেলেটা অদ্ভুত । প্রায় এক বছর হয়ে গেল ছেলেটা বাবা-মাকে হারিয়েছে...তবুও ছেলেটির কোন অনুভূতি নেই । একটি সড়ক দূর্ঘটনা একা করে দেওয়া রাতুলকে কেউ কখনো কাঁদতে দেখে নি । আদিবকে বসিয়ে রেখে কোথায় যেন গেছে রাতুল । এলোমেলো রাতুলের ঘরটায় হঠাতই আদিবের চোখ আটকে গেল একটা ডায়েরী এর উপর , নীল মলাটের ডায়েরী । ডায়েরীটা আদিবের পূর্বপরিচিত । রাতুলের কাছে ডায়েরীটা আগেও দেখেছে সে । কিন্তু কি লিখা আছে তা কখনোই জানা হয়নি তার । আসলে ডায়েরীটার প্রশ্নে একটু বেশিই স্পর্শকাতর রাতুল । কাউকে কখনো ডায়েরীটা ধরতে দেয় না সে । নিজেও কিছু লেখে না নতুন করে । তবে ডায়েরীটা প্রায়ই খুলে কি যেন দেখে । আসলে , নিজের চেয়েও বেশি আগলে রাখে ডায়েরীটাকে । বন্ধুর অনুপস্থিতিতে ডায়েরীটা খুলে পড়া শুরু করে আদিব ।
.
.
.
.
বেশ তো আছি । খাচ্ছি,দাচ্ছি,ঘুমাচ্ছি কখনও বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছি,কখনও বা ঘুরতে যাচ্ছি সবার সাথে । আসলেই মাঝে মাঝে নিজেকে অনেক বেশি সুখি মনে হয় । মনে পড়ে কোনো এক গল্পে পড়েছিলাম সুখি মানুষের কোনো জামা নেই ,কিন্তু আমারতো অনেক জামা আছে ..এর উপরে আবার প্রায়ই নতুন জামা কিনি । তাহলে কি আমি সুখী মানুষ নই ?? না,না, আমি অবশ্যই সুখী মানুষ । আমার জীবনে সুখের কোনো অভাব নেই । কিন্তু মাঝে মাঝে কেন যে নিজেকে এত অসুখী মনে হয় তার কোন উত্তর আমি আজ পর্যন্ত পাই নি ।
আমি রাতুল । ইট, কংক্রিটের এই শহরের একজন বাসিন্দা ; এক আজব বাসিন্দা । এই শহরে আমার কেউ নেই , শুধু এই শহরে কেন পুরো পৃথিবীতেই আমার কেউ নাই । সত্যিই কি আমার কেউ নেই ?? নাকি সবাই আছে ?? আসলেই আমার কেউ নেই , আমার বাবা-মা আর আমার কাছে নেই । আমাকে ছেড়ে চলে গেছে অনেক দূরে , চলে গেছে না ফেরার দেশে । চলে যাবার আগে আমার জন্য রেখে গেছে অঢেল টাকা আর বিশাল সম্পত্তি । আমাকে ছেড়ে তারা চলে গেছে খুব বেশিদিন হয় নি ; বছর খানেক হবে হয়্তো । নিজেকে এখন খুব বেশি স্বাধীন মনে হয় । এখন আর মা আমাকে পড়ার জন্য বকা দেয় না কিংবা বলে না নীল রঙে্র ভার্চুয়াল জগত থেকে দূরে সরে থাকতে । বাবাও আর আমার চিন্তায় রাত জাগে না কিংবা লোকদেখানো শাসন করে না । আমি এখন যা খুশি তা করতে পারি । যখন খুশি বাসায় ফিরতে পারি , যেখানে খুশি যেতে পারি , নিকোটিনের ধুম্রতায় নিজেকে আচ্ছন্ন করেও রাখতে পারি আর পারি চিন্তামুক্তভাবে বেচে থাকতে । আসলেই আমার কোন চিন্তা নেই । কারন পৃথিবীতে মানুষের মূলচিন্তা অর্থাত অর্থচিন্তা থেকে বাবা আমাকে মুক্তি দিয়ে গেছেন । বাবার তৈ্রী করা বাড়ি থেকে বেশকিছু টাকা বাড়িভাড়া পাই আমি । আর প্রতি মাসে ব্যাংক থেকে পাই একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা । বাড়িভাড়া আর ব্যাংক থেকে পাওয়া টাকা মিলে প্রায় বিশাল একটা টাকা পাই আমি প্রতিমাসে । সুতরাং টাকার জন্য কখনোই কোন চিন্তা করতে হয় না আমাকে । চাচা-চাচী , মামা-মামী কিংবা আত্নীয়রা আমাকে এখন মনে হয় একটু বেশিই আদর করে । বন্ধুরাও আমার প্রশ্নে একটু বেশিই সহনশীল । ওদের সবার ধারনা আমি খুব কষ্টে আছি কিংবা আমার মন খুব খারাপ । ওদেরকে এ চিন্তা করার খোরাকও অবশ্য আমিই দিয়েছি । যে রাতুল সবসময় চারদিক কোলাহলে মাতিয়ে রাখত সে এখন কোলাহলে ভয় পায় ; ভয় না পেলেও এড়িয়ে চলে । আসলে এটা ওদের ভুল ধারনা । আমি এখনো কানে হেডফোন লাগিয়ে কোলাহলপূর্ণ গান শুনি , যদিও এর জন্য আর মায়ের কাছে বকা শুনতে হয় না । আসলে আমি খুবই আনন্দে আছি । যে পৃথিবীতে সবাই টাকার পেছনে ছুটছে সেখানে আমি অর্থচিন্তার নিগড় থেকে মুক্ত । টাকা খরচ করার ব্যাপারে এখন আর আমাকে কারো কাছে জবাবদিহি করতে হয় না । এইতো সেদিন একটা গীটার কিনে আনলাম অনেকগুলো টাকা খরচ করে । যদিও আমি গীটার খুব বেশি ভাল বাজাতে পারি না তবুও কিনলাম । এখন প্রায় রাতেই আমি গীটারে সুর তুলি । শপিং এ যাওয়া এখন আমার অবসর উদযাপনের অন্যতম উপায় । বিশাল এপার্টমেন্টটাকে ভরে ফেলেছি শো-পিস সহ বিভিন্ন জিনিসপত্র দিয়ে , পুরো ঘরভর্তি শত শত গল্পের বই ।
সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত সময়্টা আমি কলেজেই থাকি । এই সময়্টা কিভাবে যেন কেটে যায় । কিন্তু বিকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সময়্টা এখন অনেক বেশি দীর্ঘ মনে হয় । অথচ কিছুদিন আগেও সময়্টাকে অনেক অল্প মনে হত । আগে চাইতাম সময়্টুকো একান্তই আমার থাক আর এখন চাই সময়্টুকো সবার সাথে কাটুক । কখনো আত্নীয়ের বাসায় বেড়াতে যাই , কখনো লেক এর পাড়ে আড্ডা দেই , যদিও আড্ডাগুলোতে আমি এখন নিরব শ্রোতা । যখন এর কোনটাই সম্ভব হয় না তখনই আমি শপিংএ যাই । ফিরে আসি সন্ধ্যার মধ্যেই ,এসে পড়তে বসি । আগে যদিও একদম পড়তাম না কিন্তু এখন প্রতিদিনই পড়া নিয়ে ব্যস্ত থাকি । কারন হয়্তো এখন একা থাকি , সময়্টুকো কাটানোর জন্য হলেও নিজেকে লেখাপড়ার মাঝে ব্যস্ত রাখতে হয় । অবশ্য একা থাকার মজাই অন্যরকম ; কোন ঝামেলা নেই । সকালে হোটেলের নাস্তা , দুপুরে ফাস্টফুড , রাত্রে কখনো বাইরে থেকে আনা খাবার খাওয়া আবার কখনোবা বুয়ার রান্না করা খাবার খাওয়া । অবশ্য মাঝে মাঝে আমি নিজেও রান্না করি । রাতটুকো ভালোই কেটে যায় । কখনো ফেসবুক চালিয়ে ; কখনো আবার মুভি দেখে । মাঝে মাঝে রাতগুলোকে অনেক বেশি লম্বা মনে হয় । তখন আমার সঙ্গী হয় বারান্দার ইজিচেয়ার আর বাক্সবন্দী নিকোটিন । সিগারেটের পর সিগারেট ধ্বংস করে নিঃসঙ্গ রাতকে উদযাপন করি আমি , হারিয়ে যেতে চাই নিকোটিনের ধুম্রতায় । আমার জীবনটা অনেক ছিমছাম , সুন্দর । কিন্তু একটা ভুল আমি প্রায়ই করি । প্রায়ই বাসায় ফিরে কলিংবেল চেপে অপেক্ষা করি কেউ দরজাটা খুলবে । কিন্তু আমি ভুলে যাই ভিতর থেকে দরজা খোলার জন্য এখন আর কেউ নেই । আমার উপর অভিমান করে তারা আমাকে একা রেখে চলে গেছে অনেক দূরে । ভুলে যাই আর কখনোই তারা আমাকে আদর করবে না , বকা দিবে না ; আর কখনো খুব পরিচিত মুখদুটি আমি সামনাসামনি দেখতে পারব না কিংবা তারা আর আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিবে না । এখনো মাঝে মাঝে অনেক রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করি কেউ রাতের খাবার খাওয়ার জন্য মমতামাখা কন্ঠে আমায় ডাকবে । নিজেকে বড় একা মনে হয় ; মনে হয় পৃথিবীটা বড় নিষ্ঠুর , অর্থহীন । মাঝে মাঝে অনেক চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছা করে ; ইচ্ছা করে পৃথিবীর সবাইকে আমার কস্টের কথা জানিয়ে দিতে ; চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা করে "আমি বড় একা " । জীবনে আগে কখনোই কোন কিছুর অভাববোধ করতাম না বা কোনকিছুকে মিস করতাম না ; কিন্তু এখন আমি মিস করতে শিখেছি । আমি মিস করি মায়ের মমতাকে , মিস করি মায়ের হাতের রান্নাকে ; মিস করি বাবার শাসনকে , তার স্নেহভরা বকাগুলোকে ; মিস করি তাদের সাথে কাটানো সময়্গুলোকে । সবচেয়ে বেশি মিস করি সেই দুইজন মানুষকে যারা আমাকে এই পৃথিবীর আলো দেখিয়ে নিজেরাই চলে গেছে ঘোর অন্ধকারে । এখন আমি প্রতিরাতে তাদের ঘরে যাই ; শূন্য ঘরটাতে বসে শূন্য খাটটার দিকে তাকিয়ে থাকি । আমার প্রচুর কাঁদতে ইচ্ছা করে কিন্তু আমি কাঁদি না , কারন সুখী মানুষের কাঁদতে নেই । তবে একটা সত্য আমি কখনোই অস্বীকার করব না , আর তা হল সুখী মানুষেরাও কাঁদে । তবে লোক দেখিয়ে কিংবা একা ঘরে নয় । তারা বৃষ্টিতে ভিজে আর কাঁদে । বৃষ্টির ধারাও তাদের কান্নার সাথে সুর মিলায় । আমিও প্রায়ই বৃষ্টিতে ভিজি আর কাঁদি । অনেকক্ষন অপেক্ষা করি আর ভাবি কেউ হয়্তো এসে বৃষ্টিতে ভিজার জন্য বকা দিবে কিংবা কেউ খিঁচুরি খাওয়ার জন্য ডাকবে ।কিন্তু আমি এক মুহুর্তের জন্য ভুলে যাই যে তারা বড়ই স্বার্থপর । এ বিশাল পৃথিবীতে আমাকে একা রেখে তারা চলে গেছে অনেক দূরে , আমার পৃথিবীটাকে ভরিয়ে দিয়ে গেছে সীমাহীন শুন্যতায় । তাদের রেখে যাওয়া স্মৃতিগুলো আজও আমায় তাড়িয়ে বেড়ায় । তাদের কাছ থেকে একটু আদর পাওয়ার জন্য আমি আজও অপেক্ষায় থাকি , রাতের আকাশে হাজার তারার মাঝে খুঁজে ফিরি তাদের অস্তিত্ব । সবাই অবশ্য বলে তারা আর ফিরে আসবে না কিন্তু তাতে আমার অপেক্ষার অবসান হয় না । কারন এ যে আমার বড় প্রিয় অপেক্ষা । আর হ্যাঁ , সুখী মানুষেরা কাঁদতে না পারলেও অপেক্ষা করতে পারে , অসমাপ্ত অপেক্ষা ।
.
.
.
.
.
.
ডায়েরীটা পড়ে শেষ করল আদিব , ডায়েরী এর শেষ পাতায় বাবা-মা সহ রাতুলের একটা ছবি দেখল সে । হঠাত আদিব খেয়াল করল রাতুল এখনো ফিরে নি সে আরো টের পেল প্রকৃতিতে বৃষ্টির অস্তিত্ব । দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়ে এক দৌড়ে ছাদে চলে গেল সে । সেখানে ঠিকই দুজন মানুষের জন্য বৃষ্টিস্নাত অন্তহীন অপেক্ষায় মগ্ন ছিল একজন সুখী মানুষ । আদিব আর রাতুলকে ডাক না দিয়েই ফিরে গেল । কারন সুখী মানুষেরা বৃষ্টিবিলাস আর দুঃখবিলাস একসাথে করে ; পাশাপাশি করে অন্তহীন অপেক্ষা !!!
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now