বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
নীল চুড়ি অথবা কোন বিকেলের গল্প
.
ছোটবেলা থেকে যে শব্দটা সবচেয়ে বেশি আমাকে শুনতে হয়েছে ,তা হচ্ছে "ল্যাংড়া"। জন্মগত ভাবেই আমার একটা পা একটু ছোট অন্যটার চেয়ে। সুতরাং আর দশটা বাচ্চার মত আমি স্বাভাবিক সময়ে দাঁড়াতে কিংবা হাঁটতে শিখিনি। বেশ দেরিতেই হাঁটতে শিখেছিলাম আমি। নিশ্চই খুব দুশ্চিন্তা হচ্ছিল আমার বাবা-মার। হাঁটতে শেখার পর সবাই আবিস্কার করল এই মেয়েটা অন্যদের মত হাঁটে না, একটু টেনে টেনে হাঁটে। বাবার চাকুরীর সুবাদে সরকারি কোয়ার্টারে থাকা হত। বিকেল বেলা সব বাসার পিচ্চি গুলো বের হয়ে যখন অনেক জোরে ছোটাছুটি করে বেড়াত আমি তখন খুব শান্ত হয়ে আমাদের কোয়ার্টারের সামনের এক চিলতে জায়গাটাতে রান্না বাটি খেলতাম। আমার সাথে খেলার আগ্রহ নিয়ে কেউ খুব একটা এগিয়ে আসত না। তবে ব্যতিক্রম ছিল আমাদের কাজের বুয়ার মেয়ে। আমার চেয়ে বছর দুয়েকের বড় হবে হয়ত। সে আর আমি মিলে খেলতাম। কোনদিন সন্ধ্যায় দেখতাম , আশেপাশের বাসার কোন চাচী হয়ত বেড়াতে এসেছেন। মায়ের পাশে বসে হা করে তাদের গল্প শুনতে শুনতে, অবধারিত ভাবেই এক সময় কানে আসত " আপনার এই মেয়ের যে কি হবে ভাবী। একে বিয়ে দেবেন কিভাবে?", আমার তখন বিয়ে শব্দটা শুনলেই মনে পড়ত দিন কয়েক আগেই হয়ে যাওয়া চাচাত বোনের বিয়ের কথা। ইশ , বিয়ে জিনিসটা কত মজার! কত লোক, কত শব্দ, যেদিকে ইচ্ছে সেদিকে যাওয়া, মায়ের শাসন নেই! আমি আগ্রহ নিয়ে মায়ের দিকে তাকাতাম। আমার কবে বিয়ে হবে? কিছুক্ষন পরেই একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়া আর কিছু শুনতে পেতাম না। ক্লাশ সিক্সের শুরুতে বৃত্তি পরীক্ষার রেজাল্ট দিয়েছিল। স্যার পুরো ক্লাসের সামনে এসে জোরে জোরে বললেন, "আমাদের থানায় ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছে এবং প্রথম হয়েছে নীহার আফসানা"। আমি বুঝতে পারছিলাম না এখন আমাকে কি করতে হবে! তবে হঠাৎ কানে এলো কথাটা, " ল্যংড়া দেখি বৃত্তি পাইছে"। ততদিনে আমি বুঝতে শিখে গিয়েছিলাম এই শব্দটা আমার জন্য নিয়তি। ক্লাশের কেউ আমার বন্ধু হবে না, স্যারেরা করুনা মেশানো এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে আমাকে দেখবেন। রাস্তায় যাওয়ার পথেও নিতান্ত অপরিচিত কেউ ঘুরে চোখ বাঁকা করে আমার দিকে তাকাবে। তবুও সেদিন কথাটা শোনার পর খুব কান্না পেয়েছিল আমা্র! বোকার মত ক্লাশেই কেঁদে ফেলেছিলাম। ইশ, কি বোকাই না ছিলাম।
.
এস এস সি পরীক্ষার ঠিক আগে আগে আমার খুব কাছের বন্ধু হয়ে গিয়েছিল তূর্না। আরেক স্কুল থেকে টেস্ট পরীক্ষার কয়েকদিন আগে ও এসেছিল আমাদের স্কুলে। ওর বাবার চাকরীর কারনে। কিভাবে যে এই মেয়েটা আমার এত কাছের হয়ে গিয়েছিল আমি টের পাইনি। হয়ত আমার সীমাবদ্ধতা নিয়ে কখনো ওর চোখে কোন প্রশ্ন অথবা বিস্ময় মেশানো করুনা দেখিনি বলেই আমার মত মেয়ের বন্ধু হয়ে গিয়েছিল ও। একদিন সন্ধ্যার একটু পর ওদের বাসায় গেলাম। ওহ, আমি আবার তখন সন্ধ্যার আগে খুব একটা প্রয়োজন না হলে বাসা থেকে বের হতাম না। বিকেলবেলা বের হলে প্রতিদি্ন দেখা হওয়া মানুষগুলো ও এমন অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে থাকত আমার ডান পা টার দিকে, আমি প্রচন্ড অসহায় বোধ করতাম। তাই সন্ধ্যার পরই যেতাম, যদি কখনো তূর্নার বাসায় যেতে হত। কড়া নাড়তেই তূর্নার বড় ভাই দরজা খুলে দিল। "কি খবর তোমার? কেমন আছো?।" আমি একটু জড়সড় হয়েই বললাম , " ভালো আছি ভাইয়া। তূর্না বাসায় নেই?" "ও আর আম্মা খালার বাসায় গিয়েছে। এখুনি আসবে। তুমি বসো"। "থাক, পরে আসব তাহলে"। "আরে , বসো। তোমার সাথে গল্প করি। আমার ও একা একা বিরক্ত লাগছে"। এই বলেই কেমন যেন অপ্রস্তুত হয়ে হাসলেন তিনি। চলে এসেছিলাম সেদিন। পরদিন বাধ্য হয়েই খাতাটা আনতে আবার ওদের বাসায় গিয়েছিলাম। দরজা খোলাই ছিল আজ। বাইরে দাঁড়িয়েই শুনতে পেলাম তূর্নার মায়ের গলা। "তোকে না বলেছি ওই ল্যাংড়ার সাথে এত না মিশতে। কাল আমরা বাসায় ছিলাম না, তারপর ও , ওই মেয়ে এসেছিল। ও নিশ্চই জানত রাকিব বাসায় একা আছে। ওকে আমার ভালো লাগে না। এসব খোড়া-কানার সাথে এত মেলামেশার কি দরকার?", সেইদিন ও আমি কেঁদেছিলাম। কাঁদতে কাঁদতেই বাসায় ফিরে এসেছিলাম। ইশ কি বোকাই না ছিলাম তখন ও।
.
হলে উঠেছি দিন দুয়েক হলো। কাল থেকে ক্লাশ শুরু। আজ বিছানায় শুয়ে কেন জানি বহুদিন আগের কিন্তু প্রতিদিনের সঙ্গী স্মৃতি গুলো মনে পড়ে গেল। এর মধ্যেই রুমমেট থেকে শুর করে অনেককেই বলতে হয়েছে , "কেন আমি খোড়া হলাম!" এখন আর কষ্ট লাগে না। কেমন যেন ভোঁতা হয়ে গিয়েছে অনুভুতিগুলো। প্রথম সপ্তাহের ক্লাশ শেষেই অনেককেই পড়শোনার চাপ নিয়ে খুব চিন্তিত মনে হলেও, আমি কিন্তু খুশিই হলাম। যাক, এসব নিয়ে ব্যস্ততার মাঝে ডুবে থাকা যাবে। আমি নিজের কাছ থেকে নিজে পালিয়ে বেড়াই সব সময়। সুতরাং ব্যস্ততাই আমার একমাত্র বন্ধু। ক্যাফতে বসে চা খাচ্ছিলাম। "বসতে পারি?", প্রশ্নটা শুনে চোখ তুলে তাকাতে হলো। "টেবিল ফাঁকা নেই। আর তুমি তো আমাদের ক্লাশেরই। বসলে নিশ্চই আপত্তি নেই?"। আমি ঠিক কি জবাব দেব বুঝতে পারছিলাম না। মাথা ভর্তি এলোমেলো চুলের শ্যামলা ছেলেটাকে ক্লাশে দেখেছিলাম। তবে ক্লাশের কারো সাথেই আমার এখনো তেমন পরিচয় হয়নি। যারা কথা বলতে এসেছিল নিজ থেকে , তাদের সবার চোখেই সেই বিস্ময় মাখানো করুনাভরা দৃষ্টিটা দেখে আর ইচ্ছে হয়নি কথা বলতে। ছেলেটা এখনো তাকিয়ে আছে আমার দিকে। চোখের ভেতর হাসি। যেন আমাকে অস্বস্তিতে ফেলে দিয়ে খুব মজা পেয়েছে। "বসো", খুব ছোট করে বললাম আমি। টেবিলে বসেই রীতিমত গব গব করে পরোটা-ভাজি খাওয়া শুরু করল ছেলেটা। আমি একটু অবাক হয়েই তাকালাম। "এভাবে তাকিয়ো না। কাল রাতে ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম। খাওয়া হয়নি, এখন খুব খিদে লেগেছে। " কথাটা শুনে লজ্জা পেলাম। ধুর, এভাবে কেউ তাকায় নাকি। আমার কি এখন উঠে যাওয়া উচিত? নাকি উচিত না? ভালো ঝামেলায় পড়লাম তো। "তুমি কোন হলে থাকো?", প্রশ্নটা করে নিজেই জোরে হেসে উঠল ছেলেটা। "আরে আমাদের তো একটাই ছাত্রী হল! আমি একটা গাধা!"। ওর কথা বলার ধরন দেখে আমিও হাসতে বাধ্য হলাম!
.
"কেমন আছো?", আচমকা কানের পাশ থেকে প্রশ্নটা শুনে ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেলাম আমি। "আমাকে চিনেছো তো?"। "চিনবো না কেন! তুমি তো আমদের ক্লাশেই! ",রীতিমত অবাক হয়েই জিজ্ঞাসা করলাম সেদিনের ছেলেটাকে। " তুমি তো কারো সাথেই তেমন মেশো না। তাই ভাবলাম......."। উত্তরে ছোট করে হাসলাম আমি। "চলো পলাশী থেকে চা খেয়ে আসি"। হলে ফিরে যেতে আমারো ভালো লাগছিল না। সেই রুম, সেই কম্পিউটার। "চলো", কিছুক্ষন চুপ করে থেকে বললাম। হলে এসে নিজের উপর নিজেই বিরক্ত হলাম। একটা ছেলে আমাকে বলল, চা খেতে , আর আমি চলে গেলাম? কিন্তু পরদিন যে আবার বিকেলবেলা ক্লাশ শেষে হাসান যখন বলল, "চলো চা খেতে যাই", তখন ও না করতে পারলাম না। আমি বুঝতে পারছি না কি হচ্ছে।
"আকাশি রঙ এর শাড়ির সাথে হাতে নীল চুড়ি, এটা আমার খুব ভালো লাগে। আর বিশেষ কেউ যদি এই সাজে আমার সামনে আসে তাহলে আমি নিশ্চই আনন্দে পাগল হয়ে যাব! ", সন্ধ্যার ঠিক আগে আগে ক্যাফেতে বসে কথাগুলো আমাকে বলছিল হাসান। "এর মানে কি?", আমি অবাক হয়েই জানতে চাইলাম। "কোন মানে নাই। আমি একটা পাগল। এটাই হচ্ছে এর মানে"। বলেই আবার ওর স্বভাব মত হাসতে শুরু করল।
.
আজ আমাদের ডিপার্টমেন্টের কালচারাল নাইট। হাসান ফোন দিয়ে বলেছিল ওর জন্য অপেক্ষা করতে। একসাথে নাকি যাবে সে। অনুষ্ঠান এতক্ষনে শুরু হয়ে গিয়েছে। আমি অডিটোরিয়ামের বাইরে এক কোণায় দাঁড়িয়ে আছি। হাসানকে ফোন দিলাম। ফোন বন্ধ। বহুদিন পর কান্না পেল আমার। হাতের নীল চুড়ি গুলো ছুঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে। ইশ, এখনো সেই বোকাই রয়ে গেলাম আমি। কেন আমি আকাশি রঙ এর শাড়ি পরবো? কেন আমি হাতে নীল চুড়ি পরবো? আমি কেন এত বোকা?। আস্তে আস্তে হেঁটে আসলাম মেইন গেটের কাছে। ঠিক যেভাবে হাঁটি আমি, এক পা টেনে। হঠাৎ কে যেন ছুটে এলো রাস্তার ওপাশ থেকে। "রাস্তায় কি জ্যাম। শাহবাগ থেকে রিকশা পেলাম না। দৌঁড়ে এসেছি। মোবাইলেও চার্জ নেই", একটানা কথাগুলো বলে হাঁপাতে লাগল হাসান। "সর্বনাশ্ তোমাকে তো পরীর মত লাগছে! বিশেষ একজন তাহলে আমার জন্য এভাবে সেজেছে! ", হাঁপানোর মধ্যেও কথাগুলো বলে হাসতে লাগল ও। আমার আবার কেন জানি কান্না পাচ্ছে। ইশ , কি বোকা আমি!
.
নাহিয়ান বিন হোসেন
.
০৭ ই নভেম্বর, ২০১২ রাত ৯:১৫ মিনিটে সামুতে লেখাটি প্রথম পোস্ট করেছিলাম
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now