বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

নেকড়ে পাহাড় ২(খ)

"ভৌতিক গল্প " বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ মাজেদ (০ পয়েন্ট)

X WOLF MOUNTAIN লেখক : জে. আর. পিন্টো ভাষান্তরে : সুপ্রিয়া বন্দ্যোপাধ্যায় পর্ব ২ ( খ) পরদিন সকালবেলা। আশার গ্রীন সবে ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে ঘরে এসে ঢুকেছে, ঠিক এইসময় ওর ঘরে ফোন বেজে উঠল। রিসিভার তুলে 'হ্যালো' বলতেই ওপ্রান্ত থেকে ভেসে এলো কোকো'র উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বর : "...আশার! আমি কোকো বলছি! গতরাতে সাঙ্ঘাতিক কান্ড ঘটে গেছে 'টেন্ট সিটি'তে !" "...কি?" সঙ্গে সঙ্গে সবকটি ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে উঠল আশারের,"কি ঘটেছে?" "....এইমাত্র খবর এসেছে, গতরাতে ওখানে আবার ব্রুটাল মার্ডার হয়েছে!" কোকো রীতিমতো হাঁফাচ্ছে। "...নিশ্চয়ই আবার সেই জে-রাউজে'র কান্ড?" "....ওরা তো তাই-ই বলছে", বলল কোকো, "কিন্তু ঘটনাটা খুবই মর্মান্তিক, খুবই মারাত্মক... একটা বারো-তেরো বছর বয়সের বাচ্চা ছেলে, তার মা এবং ছেলেটির দুটো ছোট ছোট ভাই-বোন! আর কোথায় হয়েছে জানো? যেখানে আমরা গতকাল গিয়েছিলাম...পাহাড়ের ধারে!" "...তার মানে..." কথাটা বলতে গিয়েও মুখে আটকে গেল গ্রীনের, দ্রুত একটা চিন্তা খেলে গেল ওর মাথায়। "....তুমি এখন কোথায়?" ওপ্রান্ত থেকে প্রশ্ন করল কোকো। "...আমি ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ", বলল গ্রীন, "জামাকাপড় পরে তৈরি হয়েই আছি। তুমি গাড়ি নিয়ে এলেই আমি বেরিয়ে পড়ব"। "....বেশ, আমি ঘন্টাখানেকের মধ্যেই আসছি"। ওপ্রান্তে ফোন কেটে গেল। ......গাড়িতে যেতে যেতে দুজনের মধ্যে কথা খুব কমই হলো। গতকালের মতো কথাবার্তা তেমন জমল না। আসলে দুজনের মনই খুব উতলা হয়ে রয়েছে। যখন 'টেন্ট সিটি'তে পৌঁছল, তখন বেলা আরেকটু গড়িয়েছে। লোকজনের ভিড় তখনো সরেনি, সবার চোখেমুখে সুস্পষ্ট আতঙ্কের ছাপ। গতরাতে ভয়ঙ্কর হাউলিং আর মানুষের আর্তনাদ টেন্ট সিটি'র সবাই শুনেছে। কিন্তু আতঙ্কে এমন সিঁটিয়ে গিয়েছিল সবাই যে কেউ সাহস করে তাঁবুর বাইরে বেরিয়ে ব্যাপারটা দেখবে, এমন সাহসও কারোর ছিল না। সকালে বেরিয়ে সবাই সেই মর্মান্তিক দৃশ্যটা প্রত্যক্ষ করে। গ্রীন এবং কোকো যখন ক্যারিফোরের সেই পাহাড়-ঘেরা ছোট্ট শহরটায় এসে পৌঁছল, তখন সেখানে ইতিমধ্যে পুলিশের দু-দুটো জিপ এসে দাঁড়িয়েছিল। যেখানে গতরাতে খুন'টা হয়েছে, সেটা পাহাড়ের দিকে যাবার পথের ধারে। কোকো এবং গ্রীন লোকজনের ভিড় ঠেলতে ঠেলতে সেদিকে এগোতে লাগল। মনে মনে একটা গভীর আশঙ্কা অনুভব করছে গ্রীন। কে খুন হয়েছে কাল? ওর মন কেবলই বলছে, খুন হওয়া ছেলেটি থমাস নয় তো? ঈশ্বর করুন যেন সে থমাস না হয়! আশঙ্কায় উদ্বেগের দোলায় দুলতে দুলতে গ্রীন এসে পৌঁছল অকুস্থলে। দেখল, পথের ধারে একটা তাঁবু ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে আছে, মনে হচ্ছে, তাঁবুটার ওপর যেন বুলডোজার চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। দুজন পুলিশ স্থানীয় মানুষের ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে তাদের স্টেটমেন্ট নিচ্ছে। খানিক দূরেই চার-চারটে ছোটবড় লাশ'কে পলিথিনের শিট দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। গ্রীনের দিকে এতক্ষণ কেউ নজর দেবার সুযোগ পায়নি। ওরা আরেকটু এগোতে এবার পুলিশের নজর পড়ল ওদের ওপর। সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে একবার ওর দিকে তাকিয়ে অফিসার হঠাৎ বলে উঠল, "এক্সকিউজ মী, আপনারা কে? কোথা থেকে আসছেন?" স্পষ্ট ইংরেজিতে প্রশ্ন করলেন অফিসার। হয়তো শ্বেতাঙ্গ মানুষ দেখেই তিনি স্থানীয় ভাষায় প্রশ্ন না করে সরাসরি ইংরেজিতে প্রশ্ন করলেন। "....আমি আশার গ্রীন", বিন্দুমাত্র না ঘাবড়ে বলল গ্রীন, "আমেরিকার প্রেস থেকে আসছি। আপনি কি আমার আইডেন্টিটি কার্ড দেখতে চান?" অফিসার একবার চোখ সরু করে গ্রীনকে আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে নিলো, তারপর মাথা নাড়ল। গ্রীন তার গেঞ্জির পকেট থেকে, সে যে সংবাদসংস্থায় কাজ করে, সেই সংস্থার আইডেন্টিটি কার্ড বের করে সগৌরবে মেলে ধরল অফিসারের সামনে। বেশ কিছুক্ষণ তার আইডেন্টিটি কার্ড'টিকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন অফিসার, তারপর তার হাতে দিয়ে দিলেন। "....কে খুন হয়েছে এখানে?" সমবেত জনতাকে প্রশ্নটা করতে গিয়েও গলার স্বর কেঁপে গেল গ্রীনের। কারণ তখনো সে না দেখলেও আন্দাজে বুঝতে পারছে, কে খুন হতে পারে। "...থমাস..." ভিড়ের ভেতর থেকে গুঞ্জন এলো, "থমাস, ওর মা আর ভাই-বোনেরা"। ভেতরে ভেতরে মুষড়ে পড়ল গ্রীন। কয়েক মূহুর্ত কোনও কথা বলতে পারল না। আসলে কি বলবে, মুখে ভাষাই জোগাচ্ছিল না। মাত্র গতকালই যার সাথে কথা বলেছে, আজ সে নিষ্পন্দ হয়ে পলিথিনের শিটের তলায় শুয়ে আছে। হায়, কি বিচিত্র এই পৃথিবী! "....চিনতেন নাকি ছেলেটাকে?" গ্রীনের মুখের ভাব তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লক্ষ্য করতে করতে হঠাৎ প্রশ্ন করলেন পুলিশ অফিসার। "....চিনি মানে....মাত্র গতকালই আমি এখানে এসে ওর একটা ইন্টার্ভিউ নিয়েছিলাম। কয়েক হপ্তা আগে এখানে যে দু'দুটো ব্রুটাল মার্ডার হয়েছিল আর একজন লোককে ওই কিসব ওয়্যারউলফ...টোয়ারউলফ সন্দেহ করে মেরে ফেলা হয়েছিল...সেই ব্যাপারেই থমাসের সঙ্গে কথা বলেছিলাম গতকাল।" একটু থেমে গ্রীন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পলিথিন ঢাকা লাশগুলোকে লক্ষ্য করতে করতে বলল, "আমার সন্দেহ হচ্ছে, ও গতকাল আমায় ওর নিজের অভিজ্ঞতার অনেক কিছু বলে দিয়েছিল বলেই গতরাতে ওকেই বিশেষভাবে টার্গেট করা হয়েছিল। ওর ওপর প্রতিশোধ নিয়েছে কেউ"। গ্রীনের কথায় মাথা নাড়লেন অফিসার। বললেন, "না, এই ভিক্টিমদের কোনও মানুষ হত্যা করেনি....!" "....মানে?" চমকে অফিসারের মুখের দিকে তাকাল গ্রীন, "কি বলতে চান আপনি?" "....আপনি যে বলছেন, আপনাকে ছেলেটি গতকাল অনেক কথা বলে দিয়েছিল বলে কেউ ওর ওপর প্রতিশোধ নিয়েছে...এটা আমি মানতে পারলাম না, কারণ আপনি যদি এই ভিক্টিমদের লাশগুলোকে দেখেন, তাহলেই বুঝতে পারবেন, এ কাজ কোনো মানুষের নয়!" বলতে বলতে অফিসার ইশারায় এক কনস্টেবলকে নির্দেশ দিলেন, থমাস নামের ভিক্টিমের লাশের ওপর থেকে পলিথিন শিট'টা ওঠাতে। কনস্টেবলটি নির্দেশ পেয়ে এগিয়ে গেল। গ্রীনের মাথায় সম্ভাব্য অসম্ভাব্য সবরকম চিন্তা ঘুরতে লাগল। কি অবস্থা হতে পারে লাশটার? এদের সন্দেহ, এটা কোনো মানুষের কাজ নয়। যদি এমনও হয় যে সত্যি সত্যিই ছেলেটিকে কোনো মানুষ হত্যা করেনি, কোনো বুনো পশু হত্যা করেছে, তো সেটাও স্বাভাবিকভাবেই মেনে নেওয়া যায়, কারণ এসব পাহাড়ি জায়গায় অজস্র বুনো জন্তু জানোয়ার থাকতেই পারে। ভূমিকম্পে অনেক পশুই আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে, ফলে লোকালয়ের দিকে অনেকসময় নেমে আসতেই পারে ওরা। থমাসকে সম্ভবত কোনো বুনো কুকুর বা ওইজাতীয় কিছু হত্যা করেছে। কনস্টেবলটি হাতের বেঁটে লাঠিটা দিয়ে লাশের ওপর থেকে চাদরের একটা প্রান্ত সরিয়ে দিলো। গ্রীনকে ইশারায় এদিকে আসতে বলল। কোকো এতক্ষণ নিঃশব্দে কাঁদছিল, কিন্তু এবার গ্রীনকে থমাসের লাশটার দিকে এগিয়ে যেতে দেখে ও কান্না বন্ধ করে কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে গ্রীনকে নিরীক্ষণ করতে লাগল। ওর চোখেমুখে একটা উদ্বিগ্ন ভাব ফুটে উঠেছে। গ্রীন ততক্ষণে লাশের কাছে গিয়ে ঝুঁকে পড়েছে এবং যা দেখল, বোধহয় তা না দেখলেই ভালো ছিল। থমাসের দেহটাকে কেউ যেন সযতনে ছিন্নভিন্ন করেছে, ওর ছোট্ট শরীরটাকে ভয়ানক শক্তিশালী কোনো পশু যেন দু'ভাগে চিরে কামড়ে কামড়ে খেয়েছে। চেনাই যাচ্ছে না ওটা কোনো মানুষের শরীর। মূহুর্তের জন্য চোখ বন্ধ করে ফেলেছিল আশার গ্রীন। থমাসের পাশে শুয়ে ওর মায়ের দেহ। তারও একই অবস্থা। মহিলার বুক পর্যন্ত এমনভাবে দু'ভাগে ফালা ফালা করে চেরা হয়েছে যে ভেতরের পাঁজর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। স্তনদুটি ছিঁড়ে বেরিয়ে এসে খুব সামান্য অংশই দেহের সাথে লেগে রয়েছে। পুলিশ কনস্টেবলটি এবার পাশে থমাসের ভাই-বোনের লাশদুটোর ওপর থেকেও পলিথিন শিট আলগাভাবে সরিয়ে দিল। সে দুটোর অবস্থাও একই। আর সহ্য করতে পারল না। ওর মনে হতে লাগল ও যেন এখুনি বমি করে ফেলবে। পেট উগরে পাকস্থলী ঠেলে বমি আসছে। সাংবাদিক হিসেবে জীবনে চোখের সামনে ঢের খুন-জখমের লাশ দেখেছে সে, কিন্তু এরকম ভয়াবহ দৃশ্য কখনো দেখেনি। মুখে হাতচাপা দিয়ে লাফিয়ে উঠে ছিটকে কয়েক পা সরে গেল আশার গ্রীন। "....দেখলেন তো?" বললেন অফিসার। কয়েক মূহুর্ত চুপ করে থেকে দম নিতে চেষ্টা করল গ্রীন, তারপর গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "আমি আপনাদের সঙ্গে হেডকোয়ার্টারে যেতে চাই। একটা লিখিত স্টেটমেন্ট দেবার দরকার আছে"। "...অবশ্যই আসতে পারেন, যদি চান"। বেলা এখন দুপুর গড়িয়ে গিয়েছে। "....খুব খারাপ লাগছে আমার", পথে যেতে যেতে বলল কোকো, "ছেলেটার আর ওর পরিবারের ওই পরিণতির জন্য নিজেকেই দোষী মনে হচ্ছে"। "....কিন্তু আমি তোমায় এর জন্য দোষী মনে করি না", শান্ত গলায় বলল গ্রীন। "....কিন্তু আমি নিজেকে সম্পূর্ণ দোষমুক্ত ভাবতে পারছি না। এবং আমি এও মনে করি, তুমি মুখে যা-ই বলো না কেন, তুমিও আমায় দোষী ভাবছ!" "...দোহাই লাগে তোমার, চুপ করো!" অধৈর্য হয়ে বলে উঠল গ্রীন, "এসব কোনো জঘন্য ক্রিমিনালের কাজ।" ".....ক্রিমিনাল নয়, আশার", বিস্ময় আর কিঞ্চিৎ রাগ মেশানো চোখে ওর দিকে তাকিয়ে বলে উঠল কোকো, "এসব কোনো ভয়ঙ্কর পিশাচের কাজ"। "....ওহহো, এসব বুলশিট বন্ধ করো, কোকো!" রীতিমতো উত্তেজিত দেখাল এবার গ্রীনকে, "তুমি কি মনে করছ, থমাস আমাদের কি বলেছে না বলেছে, তা একটা ওয়্যারউলফ জাদুমন্ত্রে জেনে ফেলল আর ছেলেটার ওপর ওইভাবে প্রতিশোধ নিলো! যে যা-ই বলুক, এসবের পেছনে যে কোনো মানুষেরই হাত আছে, তা পরিষ্কার!" "....কিন্তু তুমি তো ভিক্টিমদের বডি'গুলো দেখলে! কি শোচনীয় অবস্থা করেছে ওদের!" গ্রীন এবার ব্যাপারটা বোঝাতে গিয়ে বলল, "দ্যাখো, একটা মানুষ যখন হিংস্রতার সব সীমা লঙ্ঘন করে যায় তখন সে সবকিছুই করতে পারে। মানুষের পক্ষে অসাধ্য কিছুই নেই"। একটু থেমে সে ফের বলল, "আসলে গোটা'টাই কোনো বদ লোকেরই চক্রান্ত। নিরীহ মানুষগুলোকে এইভাবে মারছে কারণ যাতে সবাই ভাবে, এই কান্ডগুলোর পেছনে কোনো ওয়্যারউলফের হাত আছে এবং এইভেবে যাতে তারা আর কোনো মানুষকে সন্দেহ না করে আর সে-ও নির্দ্বিধায় এইসব দুষ্কর্মগুলো চালিয়ে যেতে পারে"। "....কিন্তু তা-ই যদি হয়, তাহলে কোনো মানুষ এসব করবেই বা কেন? খুনের পেছনে তো একটা মোটিভ থাকে। কেউ কাউকে বিনা মোটিভে কেন খুন করবে?" একটু থেমে কোকো ফের বলল, "কিছুদিন আগে সিডাউ মার্চ্যান্ড নামে যাকে হত্যা করা হলো, সে বেচারা যে নির্দোষ ছিল, গতকালের ঘটনা তারই জলজ্যান্ত প্রমাণ। আর যদি এটা কোনো মানুষ করেও থাকে, তাহলে সে পূর্ণিমার রাতটাকেই বার বার বেছে নিচ্ছে কেন? সবাইকে এটাই বোঝাতে যে এই খুনগুলো কোনও মানুষের দ্বারা হচ্ছে না?" শেষের কথাটা বলার সময় কেমন যেন বিহ্বল দেখাল কোকো'কে। "....সেটাই", দৃঢ় স্বরে বলল গ্রীন, "তুমি যা ভাবছ, সেটাই"। সামনের পথের দিকে চেয়ে কাঁধ ঝাঁকাল কোকো। বলল, "সিডাউ মার্চ্যান্ড ওয়্যারউলফ ছিল কি ছিল না, জানি না, তবে এটা তো ঠিক, সে এখন আর জীবিত নেই।" "...থমাস, ওর মা আর ভাইবোনেরাও কেউ আর এখন জীবিত নেই। ওহ ভগবান!" বলতে বলতে দু'পাশে মাথা নাড়তে লাগল গ্রীন, "কোনো মানুষ এতটা নৃশংস কিভাবে হয়? আমাকে...আমাকে ওই 'অসুস্থ' মানুষটাকেই খুঁজে বের করতে হবে। ওকে উপযুক্ত শাস্তি না দেওয়া পর্যন্ত কিছুতেই আমি শান্তিতে ঘুমোতে পারব না"। হাইতির ধ্বংসপ্রাপ্ত ন্যাশনাল প্যালেসের কাছেই পুলিশ হেডকোয়ার্টার। হাইতি'তে আসার পর এই সাদা রঙের বিখ্যাত বিল্ডিংটাকে এই প্রথম দেখল গ্রীন। গত বছরের ভূমিকম্প এর সব সৌন্দর্য কেড়ে নিয়েছে। ভেঙে পড়েছে এর চার দিকের চারটে মিনার। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা তিনতলা'টার। অন্য ফ্লোরগুলোর অবস্থাও করুণ। দুপুরের রোদে বিল্ডিংটাকে আরও করুণ, আরও বিষন্ন দেখাচ্ছে। এখানেও একটা 'টেন্ট সিটি' আছে। প্যালেসের সামনের মাঠজুড়ে অসংখ্য তাঁবু খাটিয়ে কোনওরকমে দিন গুজরান করছে ভূমিকম্পে সর্বস্ব খোয়ানো অসংখ্য গৃহহীন। চারপাশটা দেখতে দেখতে দুজনে পুলিশ হেডকোয়ার্টারের ভেতরে এসে ঢুকল। এক নজরে বিল্ডিংটাকে দেখেই বেশ পুরনো মনে হলো, যেন বিগত পঞ্চাশ বছরেও এর কোনো মেইন্টেনান্স হয়েছে বলে মনে হলো না। জায়গায় জায়গায় লিনোলিয়াম টাইলস উঠে এসেছে, বেরিয়ে পড়েছে এবড়োখেবড়ো পাথর। ডেস্ক-চেয়ার এবং অন্যান্য আসবাবগুলো সেই কোন মান্ধাতা আমলের। পুরনো বিকটদর্শন টেলিফোনের পাশে একগাদা ফাইল স্তুপীকৃত অবস্থায় পড়ে আছে। গ্রীন এবং কোকো'কে বসার জন্য দুটো চেয়ার এগিয়ে দেওয়া হলো। প্রায় একঘণ্টা বসে থাকার পর একজন ইন্সপেক্টর গোছের লোক ওদের সঙ্গে কথা বলতে এগিয়ে এল। "...আপনি মঁসিয়ে গ্রীন, তাই না?" ওদের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বলল লোকটি। "...জ্বি", গ্রীন চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে ইন্সপেক্টরের দিকে করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে দিল। "...আমি ইন্সপেক্টর চৌভেট। আপনারা আমার অফিসঘরে আসুন। আলোচনাটা ওখানে হলেই ভালো হয়"। ইন্সপেক্টর চৌভেটকে অনুসরণ করে ওরা একটা ছোট অফিসঘরে গিয়ে ঢুকল। "....বলুন, আমি আপনাদের কিভাবে সাহায্য করতে পারি?" চেয়ারে বসতে বসতে সাগ্রহে জিজ্ঞেস করে বসল গ্রীন। "...ঘটনাটা তো নিজের চোখে দেখেছেন", বলল ইন্সপেক্টর চৌভেট, "খুবই ট্রাজিক ঘটনা। আমার এতকাল ডিউটি লাইফে এরকম ভয়াবহ মার্ডার কখনো দেখিনি"। "....এখন তাহলে কি করতে চান, আপনারা?" "....আপাতত আমরা আপনার একটা স্টেটমেন্ট নেব"। একটু থেমে সে ফের বলল, "এবং কেসটা নিয়ে আমাদের তদন্ত এগোতে থাকলে সময়ে সময়ে আমরা আপনাদের 'নোটিফাই' করতে থাকব।" "....কিন্তু শিগগীরই যে একটা কিছু পদক্ষেপ না করলেই নয়, স্যার!" টেবিলের ওপর প্রায় ঝুঁকে পড়ে বলল গ্রীন, "আচ্ছা, ক্যারিফোরের পথেঘাটে এবার থেকে পাহারাদার নিযুক্ত করা দরকার অবিলম্বে...যাতে..." গ্রীনের কথা শেষ হলো না, হো হো করে হেসে উঠল ইন্সপেক্টর চৌভেট। বলল, "এত বড় কলোনি পাহারা দেবার জন্য উপযুক্ত ম্যানপাওয়ার যে আমাদের নেই, মঁসিয়ে গ্রীন...!" মূহুর্তে ফুটো বেলুনের মতো চুপসে গেল গ্রীন। বলল, "তাহলে তো এরকম খুন-খারাপি চলতেই থাকবে!" এবার নিজের চেয়ারে সোজা হয়ে বসল ইন্সপেক্টর চৌভেট। বলল, "ভূমিকম্পটা হবার আগেও এখানে...ওই যে পেছনে শহরটা দেখছেন, সেখানে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা একটা খুব কঠিন কাজ ছিল। আর এখন? এখন তো কার্যত অসম্ভব, বলতে পারেন। ভূমিকম্পে আমাদের জেলখানাটা পুরো একপ্রকার ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। ফলে জেলবন্দি কয়েদীরা পালিয়ে গিয়েছে এদিকওদিক। খুব অল্পসংখ্যক আসামীকে পরে ধরতে পেরেছিলাম কিন্তু বেশীরভাগ কয়েদীই পালিয়ে গিয়েছে। আর এখন তো.....আমাদের হাতে ম্যানপাওয়ার'ও বেশী নেই"। ".....কিন্তু....যা চলছে, যা দেখছি, আপনাদের এই শহরটা তো ভীষণ এক বিপদের মধ্যে রয়েছে"। উদ্বিগ্ন দেখাল গ্রীনের চোখমুখ। "....বুঝতে পারছি", শান্ত গলায় বলল ইন্সপেক্টর, "কিন্তু ওদের জীবন এখন ওদেরই হাতে।" "...আপনি যদি নিজে ওই তাঁবুতে থাকতেন, তাহলে বুঝতে পারতেন, কতটা বিপদ মাথায় নিয়ে জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে ওরা!" এবার হেসে ফেলল ইন্সপেক্টর চৌভেট। ম্লান হাসি। কেটে কেটে বলল, "আমিও তো ওই তাঁবুগুলোর একটাতেই থাকি। কারণ, আমারও যে ঘরবাড়ি সব তছনছ হয়ে গিয়েছে! " শেষের কথাটা বলার সময় কিরকম যেন গাঢ় শোনাল ইন্সপেক্টরের গলা।   এরপর ওদের কথা আর বেশীদূর এগোল না। গাড়ির কাছে ফিরে এসে কোকো বলল, "পুলিশকে কখনো চ্যালেঞ্জ জানিও না, ওরা তোমাকে কিভাবে ফাঁসিয়ে জেলে পুরে দিতে পারে, তা তোমার ধারণাতেও নেই!" "...আমি তো ওঁকে শুধু একটা সাজেশন দিতে চেয়েছিলাম", বলল গ্রীন, "যা ঘটছে এখানে, রাতে পাহারা না রাখলেই নয়। এরপর আরও যে খুন হবে না, তা কে বলতে পারে!" গাড়িতে উঠে বসল দুজনে। স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে কোকো জানতে চাইল, "এখন কোথায় যাবে?" "....কন্টেনার পোর্ট", জবাবে বলল গ্রীন, "যেখানে সিডাউ মার্চ্যান্ড কাজ করত। ওকে তো ভুল সন্দেহের বশে মেরে ফেলা হলো, আমি ওর ব্যাপারে আরও খোঁজখবর করতে চাই। অতএব এখন ও যেখানে কাজ করত, সেখানে চলো!" দ্বিরুক্তি না করে গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে দিল কোকো। শহরটার মতোই জরাজীর্ণ অবস্থা কন্টেনার পোর্ট'টিরও। চারদিকে শুধু কংক্রিটের জঞ্জাল আর ধুলো। কোনওকিছুই এখনও এখানে নতুন করে গড়ে উঠতে পারেনি। গড়বেই বা কে, প্রশাসন বলে কিছু নেই এখানে। কে নেবে দায়িত্ব? কাছেই একটা ওপেন মার্কেট, যেখানে চলছে তখন নিত্যপ্রয়োজন জিনিসের কেনাবেচা। বাজারের কাছে গাড়িটা দাঁড় করিয়ে দিল কোকো। বলল, "এখান থেকে আমাদের হাঁটা পথ ধরতে হবে"। গাড়ি থেকে নেমে দুজনে বাজারের ভিড় ঠেলতে ঠেলতে এগোতে লাগল বন্দরের দিকে। "....এখানে দেখছি রীতিমতো জমিয়ে হাট বসেছে"। "....সবাই বলে এখন দেশে বেকারত্ব চূড়ান্ত পর্যায়ে", বলল কোকো, "কিন্তু তবু সবাই কোনো না কোনো কাজে ব্যস্ত। আসলে এরা সবাই আরও উন্নতমানের কাজ চাইছে"। গ্রীন বলল, "এখানে এসে আমার মনে হচ্ছে, আমি যেন নিউ জার্সিতে ফিরে এসেছি। টার্নপাইকে বসে নিওয়ার্ক পোর্টের 'ভিউ'টা যেমন লাগে, ঠিক সেইরকম লাগছে এই কন্টেনার পোর্ট'টাকেও। কথায় কথায় ওরা পৌঁছে গেল কন্টেনার পোর্টে। সমুদ্রের দিকে চেয়ে গ্রীন দেখল, তিনটে ট্যাঙ্কার পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। বন্দরটার অবস্থাও বেশ শোচনীয়। চারদিকে একটা বিশৃঙ্খল ভাব। এক বছর আগের ভূমিকম্পের ছাপ এখনও দগদগে ঘা-এর মতো অবস্থান করছে চারদিকে। একটা গুদামঘর দেখতে পেলো, বোধহয় তার বাইরের দেয়ালের রঙ কোনও একসময় সাদা ছিল, কিন্তু এখন শোচনীয় অবস্থায়। দেয়ালের গায়ে বড় বড় ফাটল। ছাদ থেকে ভিত পর্যন্ত নেমে আসা আঁকাবাঁকা হয়ে নেমে আসা গভীর ফাটলটা দেখলেই বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। কয়েকজন কর্মীকে দেখা গেল ইতিউতি ঘুরছে। আঞ্চলিক ভভাষা জানে কোকো, তাই ওর সাহায্যেই বন্দরের ম্যানেজারের দেখা পাওয়া গেল। গ্রীনের পরিচয় পেয়েই ম্যানেজার তার আইডেন্টিটি কার্ড দেখতে চাইলেন। কার্ড গ্রীনের পকেটে সবসময়েই মজুত থাকে, যাতে প্রয়োজনে বের করে দেখাতে পারে। ম্যানেজারের সাথে বিশেষ কিছু কথা হলো না গ্রীনের, শুধু দরকারি কয়েকটা প্রশ্ন ছাড়া। সবই সিডাউ মার্চ্যান্ডের ব্যাপারে। বন্দরের কয়েকজন কর্মীকেও তাদের মৃত সহকর্মীর ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করল গ্রীন। লোকটার ব্যাপারে বেশ কিছু তথ্য হাতে এলো গ্রীনের। নিহত সিডাউ মার্চ্যান্ড খুব একটা পপুলার ছিল না। স্ত্রী এবং বাচ্চাকাচ্চাদের অন্য কোথাও ফেলে এসে সে এসেছিল এই দেশে জীবিকার খোঁজে। আত্মীয় বলতে সেই অর্থে এখন তেমন কেউ নেই, প্রথম যৌবনে ওর নিজের আত্মীয়স্বজনরাই ওর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল, ওকে ঠকিয়েছিল, তারপর আত্মীয় স্বজনদের সঙ্গে আর কোনো সম্পর্ক রাখত না সিডাউ মার্চ্যান্ড। এমনকি কর্মক্ষেত্রেও বিশেষ কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধুবান্ধব ছিল না। শহরেও সে যে তাঁবুতে বাস করত সেটাও ছিল অন্যান্য তাঁবুর থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র অবস্থানে। কারোর সাথে বিশেষ মেলামেশা ছিল না বলে ওর সহকর্মীরা ওর সন্মন্ধে নানারকম বিরুদ্ধ মত পোষণ করত। অনেকে ভাবত, ও বুঝি কোনো ক্রিমিনাল, কোথাও কোনো সাঙ্ঘাতিক অপরাধ ঘটিয়ে এসে এদেশে পালিয়ে এসেছে। নিজের কথাবার্তায়, আচার-আচরণে সবসময় এমন ভাব দেখাত যেন সে-ই সবার হর্তাকর্তা বিধাতা। তাই স্বাভাবিকভাবেই কেউ ওকে সহ্য করতে পারত না। নিহত সিডাউ মার্চ্যান্ডের ব্যাপারে জেনে বেশ অবাক হলো গ্রীন। জিজ্ঞাসাবাদের পর্ব মিটে গেলে সে এবং কোকো দুজনে বন্দরের ভেতরেই একটা ছোট 'মীট কিয়স্ক' থেকে কিছু মাংস এবং চীজ কিনল। উপসাগর লাগোয়া একটা ডকের ওপর বসে ওখানেই সম্পন্ন করতে লাগল দুপুরের আহার। "....কি ভাবছ?" চীজে একটা কামড় দিয়ে জানতে চাইল কোকো। "....কোন ব্যাপারে?" বলল গ্রীন, "সিডাউ মার্চ্যান্ডের ব্যাপারে?" একটু থেমে ফের নিজেই বলতে লাগল, "কি আর ভাবব? বেচারা নির্দোষ ছিল। ছেলেদুটো যেখানে খুন হয়েছে, সেখান থেকে ওর তাঁবুও বেশীদূর ছিল না। তাই লোকের সন্দেহ ওর ওপরেই পড়েছিল। আগুপিছু বিচার না করে একটা নির্দোষ লোককে ওরা মেরে ফেলল...."। কিছুক্ষণ কেটে গেল নীরবতার মধ্য দিয়ে। শুধু সামনে সমুদ্রের ঢেউ ভাঙার শব্দ ছাড়া আর কোথাও কোনো শব্দ নেই। গ্রীন উদাসভাবে তাকিয়ে ছিল সামনের আদিগন্ত বিস্তৃত নীল জলরাশির দিকে। দূরে মাঝখানে একটা ছোট্ট দ্বীপের মতো কিছু যেন দেখা যাচ্ছে। সেদিকে চেয়ে থাকতে থাকতে গ্রীন হঠাৎ কোকো'কে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করল, "আচ্ছা, ওই আইল্যান্ড'টার নাম কি?" "...ইলে ডিলা গোনাভ", সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল কোকো। "....লোক বাস করে ওই দ্বীপে, নাকি পরিত্যক্ত? " "....হ্যাঁ, ওই দ্বীপটা", উত্তেজনায় উদ্দীপনায় চকচক করে উঠল কোকোর চোখদুটো, "বিশাল বড় দ্বীপ। এখান থেকে ফেরি যাওয়াআসা করে। তবে দ্বীপটায় এখনো ডেভেলপমেন্ট তেমন কিছু হয়নি। অন্যান্য ক্যারিবিয়ান দ্বীপের তুলনায় ওই দ্বীপটা একটু বেশীই বড় এবং এখনও অব্যবহৃত অবস্থায় আছে। তবে শুনছি, খুব শিগগীরই কয়েকজন entrepreneur ওখানে গিয়ে রিসর্ট-টিসর্ট তৈরি করবেন"। "...তার মানে, ওই দ্বীপটা এখনও লোকবসতিহীন?" প্রশ্ন করল গ্রীন, "কেউ থাকে না ওখানে? অত সুন্দর দ্বীপটা ওভাবে পড়ে পড়ে নষ্ট হচ্ছে? শেম!" "....না...মানে....লোক থাকে", একটু আমতা আমতা করে বলল কোকো, "তবে খুব বেশী জনবসতি নেই ওখানে। কিংবদন্তি আছে, ওই দ্বীপটায় একদা জলদস্যুদের বাস ছিল। তর্তুগা নামে এক দূর্ধর্ষ জলদস্যু ওই দ্বীপটায় একদা বাস করত। সে ছিল উত্তর সাগরের আতঙ্ক। ওই দ্বীপটাকে নিয়ে অনেক মজাদার মজাদার কাহিনীও চালু আছে এখানকার লোকদের মধ্যে। যেমন, অনেক অনেক আগে কোনও একসময় রাজা ফস্টিন ছিল হাইতির রাজা। এরপর তার বহু বছর পর যখন আমেরিকার কব্জায় চলে এসেছিল এই হাইতি, তখন ওই দ্বীপটার শাসনভার দেওয়া হয়েছিল এক আর্মি অফিসারের হাতে, যার নাম ছিল ফস্টিন ওয়ার্কাস। গোনাভা দ্বীপের লোক মনে করতে থাকে, এই ফস্টিন ওয়ার্কাস'ই অতীতের সেই রাজা ফস্টিনের reincarnation.. ..মানে রাজা ফস্টিনই যেন পুনর্জন্ম নিয়ে ফিরে এসেছেন। তাই তারা ফস্টিন ওয়ার্কাস'কে শর্তহীন আনুগত্য প্রদর্শন করতে থাকে। ওই দ্বীপের বাসিন্দাদের আচরণ সেই আমেরিকান আর্মি অফিসার ফস্টিন ওয়ার্কাসকে এতটাই ইমপ্রেস করেছিল যে দেশে ফিরে গিয়েও তিনি ওই দ্বীপটার ওপর একটা বই লিখেছিলেন"। কোকো'র মুখে ফস্টিনের কাহিনী শুনে নিজেও চমৎকৃত হলো গ্রীন। সমুদ্রের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ বলে বসল, "ফস্টিন ওয়ার্কাস ওই দ্বীপে পাকাপাকিভাবে থেকে গেলেই পারতেন"। ........এক ঘন্টা পর কোকো এবং আশার গ্রীন দুজনেই ফের ফিরে এলো ক্যারিফোরের টেন্ট সিটি'তে, যেখানে গত দু'দুটো পূর্ণিমায় বড় রহস্যময় এবং নৃশংসভাবে মারা পড়েছে কয়েকজন মানুষ। গ্রীনের দিকে চেয়ে কোকো খানিক চাপা স্বরে বলল, "এখানে কিন্তু বেশীক্ষণ থাকা চলবে না আমাদের। অন্ধকার নামতে আর বেশী দেরী নেই"। গাড়ির দরজা খুলে নেমে এলো গ্রীন। আশেপাশের ভূমিকম্পপীড়িতদের অন্ধকার বিষন্ন মলিন তাঁবুগুলোর ওপর দৃষ্টি বোলাতে বোলাতে বলল, "তাহলে ভালো হয়, তুমি এখন বাড়ি ফিরে যাও, আগামীকাল সকালে এসে আমাকে এখান থেকে পিক আপ কোরো"। কতকটা চমকে ওর মুখের দিকে চাইল কোকো। যেন গ্রীনের মুখ থেকে এরকম একটা কথা শুনবে, এটা তার কাছে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ছিল। দু সেকেন্ড ওর দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে বলল, "পাগল হয়েছ নাকি? তুমি কি এখানে রাত কাটানোর কথা ভাবছ? দোহাই লাগে গ্রীন, এখানে রাত কাটানোর কথা স্বপ্নেও ভেবো না"। "....কেন?" বলল গ্রীন, "এখানে শ'য়ে শ'য়ে শিশু সম্পূর্ণ অরক্ষিতভাবে একটা ত্রিপলের তাঁবু আশ্রয় করে রাত কাটাচ্ছে, তাহলে আমি কেন পারব না?" "...গ্রীন, তুমি বুঝতে পারছ না, এ জায়গাটা এখন কি ভয়ঙ্কররকম বিপজ্জনক!" এবার ওর দিকে চেয়ে স্মিত হাসল গ্রীন। বলল, "যদি তোমার এবং অন্যান্যদের কথাই মেনে নিই যে এখানে ওয়্যারউলফ আছে, তাহলে ওয়্যারউলফকে নিশ্চয়ই দিনের বেলা পাওয়া যাবে না, তাই না?" চুপ করে রইল কোকো। গ্রীন বলল, "তুমি কিচ্ছু চিন্তা কোরো না, আমি ঠিকই থাকব"। কোকো বুঝল, গ্রীনকে কোনওভাবেই নিরস্ত করা যাবে না। তাই সে'ও আর তাকে কোনো বাধা দেবার চেষ্টা করল না। শুধু বলল, "ওয়েট গ্রীন, যখন রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েই নিয়েছ, তাহলে দয়া করে এই জিনিসটা সঙ্গে রাখো", বলতে বলতে গাড়ির ভেতরের একটা ছোট্ট কম্পার্টমেন্ট থেকে বের করে আনল একটা হ্যান্ডগান। ওটা গ্রীনের দিকে এগিয়ে দিতে দিতে বলল, "এটা সঙ্গে রেখে দাও"। গ্রীন ওর হাতে ধরা হ্যান্ডগান'টার দিকে চেয়ে রইল। জিনিসটা আসলে একটা রিভলভার - স্মিথ & ওয়েসন কোম্পানির,. ৩৮ স্পেশাল ব্ল্যাক...হ্যান্ডগান'টার হাতলটা আবার কাঠের তৈরি। "...না, এসব আমি সঙ্গে রাখতে পারব না", কিছুটা দ্বিধাগ্রস্তভাবে বলল গ্রীন, "ঝামেলা হতে পারে"। "....কিন্তু এটা সঙ্গে না রাখলে যে বিপদকেই আহ্বান করা হবে", বলল কোকো, "পাগলামি না করে এটা সঙ্গে রাখো"। দ্বিধাজড়িত হাতে হ্যান্ডগান'টা কোকোর হাত থেকে নিয়ে নিলো গ্রীন। সেটাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে দেখতে বলল, "এটা কি লোডেড?" "....লোডেড না হলে দিচ্ছি কেন?" পালটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল কোকো। "....সিলভার বুলেট আছে নাকি ভেতরে?" ঠোঁটের কোণায় ব্যঙ্গের হাসি ফুটিয়ে বলল গ্রীন, "ওয়্যারউলফ'কে মারার?" "....গাধামি কোরো না", কতকটা ধমকে উঠে বলল কোকো, "ওটা সঙ্গে রাখো। আপাতত ওটাই তোমার আত্মরক্ষার অস্ত্র। আগামীকাল সকালে আমি আসব, তোমায় পিক আপ করতে,অবশ্য তুমি আদৌ যদি জীবিত থাকো"। বলেই গাড়ির এঞ্জিন স্টার্ট করল কোকো। তারপর ধুলোর একটা বৃত্ত তৈরি করে, চাকায় কর্কশ শব্দ তুলে সাঁ করে বেরিয়ে গেল। ওর গাড়িটা যতদূর দেখা যায়, পেছন থেকে চেয়ে রইল গ্রীন। "...কি আজব মেয়ে রে বাবা!" নিজের মনেই কথাটা বলে দু'দিকে মাথা নেড়ে টেন্ট সিটির দিকে হাঁটা লাগাল সে। তাঁবুর সারির মাঝখানের পথ ধরে সে চতুর্দিকে অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি বোলাতে বোলাতে এগোতে লাগল পাহাড়ের দিকে। এইদিকে....এইদিকেই তো মিস্টিরিয়াস ব্রুটাল মার্ডারগুলো হয়েছিল। পাহাড়ের ওপর দিকে তাকাল গ্রীন। নিচ থেকেই দেখা গেল, পাহাড়ের মাথার ওপর ঘন বন। উঁচু উঁচু গাছগুলো আসন্ন সন্ধ্যার বাতাসে দোল খাচ্ছে। ওই জায়গাতেই দু-দুটো স্থানীয় ছেলেকে হত্যা করেছে রহস্যময় কেউ বা 'কিছু' একটা। অজান্তেই গা-টা শিরশির করে উঠল গ্রীনের। চোখের সামনে ভেসে উঠল আজ সকালে দেখা থমাস আর ওর পরিবারের ছিন্নভিন্ন লাশ! মূহুর্তের জন্য চোখ বন্ধ করে ফেলেছিল গ্রীন। অজান্তেই হাত চলে গিয়েছিল পকেটে রাখা হ্যান্ডগান'টার ওপর। নিশ্চিন্ত হলো, ওটা ঠিকঠাক আছে। পাহাড়ের দিকে এগোতে এগোতে একবার কাঁধের ওপর দিয়ে পেছন ফিরে অদূরে সার সার তাঁবুগুলোর ওপর চোখ বুলিয়ে নিল গ্রীন। দূরে, বেশ অনেকটা দূরে দেখা যাচ্ছে কতগুলো কাচ্চাবাচ্চা মহানন্দে ছোটাছুটি করে খেলছে নিজেদের মধ্যে। ওদের দেখতে দেখতে গ্রীনের মধ্যে কিরকম একটা ভাবান্তর এলো। সে ভাবতে লাগল, ওই বাচ্চাগুলো জানে না, কি ভীষণ দারিদ্রের মধ্যে ওরা জন্মগ্রহণ করেছে। ওরা শুধু নিজেদের মতো করে জীবনে চলছে। খিদে পেলে যা মুখের সামনে আসছে, তা-ই খাচ্ছে, ঘুম পেলে ঘুমোচ্ছে, খেলার সময় খেলছে। দৈনন্দিন ন্যুনতম চাহিদাটুকু মিটে গেলেই, ব্যস। এই বাঁধা ছকের বাইরে ওরা আর কিছু চিন্তা করতে পারে না। বাচ্চাগুলোর পরনে জামাকাপড়ের তেমন কোনোও বালাই নেই। যেটুকু যা আছে, তা বাইরে থেকে পাঠানো ত্রাণ হিসেবে পাওয়া। ওদের নিজেদের বলতে এখন কিছুই নেই। দলের মধ্যে পাঁচ বছর বয়সের নিচে বাচ্চাগুলোর পরনে কাপড়টুকুও নেই, রয়েছে রয়েছে শুধু পায়ে জুতো। শরীর অনাবৃত অথচ পায়ে জুতো। অদ্ভুত দৃশ্য! চেহারায়, চোখেমুখে ওদের অপুষ্টির ছাপ। চুলগুলো রুক্ষ, শুষ্ক, তেল পড়েনি যেন কতকাল। কাঠির মতো রোগা রোগা শরীর যেন দীর্ঘদিন অনাহারে রয়েছে। আসলে-ই তাই। এরা এখন সম্পূর্ণরূপে বহির্দেশগুলোর সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল। যখন ত্রাণ আসে, তখন এরাই ক্ষুধার্তের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে, যার ভাগ্যে যা পড়ে, তাই দিয়েই সংসার চলে ওদের। এইসব নিরীহ, বিপন্ন শিশুদেরও হত্যা করা হচ্ছে এখানে! এদের করুণ মুখগুলো দেখেও যার মায়া হয় না, নৃশংসভাবে হত্যা করে, সে নিশ্চয়ই মানুষ নয়। অবশ্যই, অবশ্যই সে কোনো পিশাচ, কোনও অপার্থিব জীব। ঘৃণায় বিকৃত হয়ে উঠল গ্রীনের মুখচোখ। আজ রাতেই সেই নরকের পিশাচটিকে খুঁজে বের করতে চায় ও। মনে মনে সেই 'অসুস্থ' লোকটির চেহারা কল্পনা করে নিতে চেষ্টা করল গ্রীন। যদি সত্যিই সে ওয়্যারউলফ হয়, তাহলে কেমন হতে পারে তার চেহারা? ওয়্যারউলফ নিয়ে সে এ যাবৎ যত নভেল পড়েছে, সবগুলিতেই পড়েছে, ওয়্যারউলফ হলো এমন একজন 'অসুস্থ' মানুষ, যে প্রতি পূর্ণিমায় হিংস্র নেকড়েতে পরিণত হয়ে যায়। তার দেহটা আকারে-আয়তনে বাড়তে থাকে, দাঁতগুলি মুখের বাইরে বেরিয়ে আসে হিংস্র শ্বাপদের মতো, সারা গায়ে গজিয়ে ওঠে অসংখ্য লোম, হাত ও পায়ের ডগার নখ বাঁকা হয়ে ঝুলে পড়ে, মানুষের কণ্ঠস্বর পরিণত হয় হিংস্র গর্জনে। এই হলো ওয়্যারউলফ! এখানে এই অঞ্চলে এমন কে থাকতে পারে, যার মধ্যে এই বৈশিষ্ট্যগুলো আছে? .....ভাবতে ভাবতে পাহাড়ে পথের একেবারে মাঝামাঝি চলে এসেছে গ্রীন। পাহাড়ের এই অঞ্চলটাকে বলা হয় 'ডেঞ্জার জোন'। ইদানীং যত খুনখারাপি হয়েছে, সব এইদিকেই হয়েছে। তাই এই এলাকাটা বিশেষভাবে বিপজ্জনক। পাহাড়ের দিকে উঠতে উঠতে আবার একবার পেছন ফিরে তাকাল গ্রীন। সান্টা মনিকা মাউন্টেনের নিচে শোভা পাচ্ছে ত্রিপলের অসংখ্য ছোট-বড় তাঁবু। দূরে দৃষ্টি গেলে নজরে পড়ে ক্যারিবিয়ান সাগরের বুকে হোলির লাল রঙ ছড়িয়ে পাটে বসছেন সূর্যদেব। আপাত দৃষ্টিতে সুন্দর দৃশ্য! কে বলবে, রাত নামলে এই অঞ্চলেই নেমে আসে মৃত্যুর শীতলতা! আজ রাতে...আজ রাতে ও সারারাত জেগে থেকে সবকিছু লক্ষ্য করতে চায়। ভাবনার মাঝেই হঠাৎ একদল প্রায়-উলঙ্গ হাইতিয়ান ছেলে ওকে ঘিরে ফেলল। ইংরেজিতে 'দুটো টাকা ভিক্ষা দাও' 'দুটো টাকা ভিক্ষা দাও' বলে মহা শোরগোল ফেলে দিল। কোকোর সতর্কবাণী মনে পড়ল গ্রীনের। সে বলেছিল, খবর্দার, এই হাইতিয়ান'রা ভিক্ষা চাইতে এলে এক ন'পয়সাও দিও না। ওদের এক পয়সা দিলেও ওরা আরও আরও অনেক কিছু চেয়ে বসবে তোমার কাছে'। কিন্তু ছেলেগুলোকে দেখে মায়া হতে লাগল গ্রীনের। কোকোর নিষেধাজ্ঞা অগ্রাহ্য করে সে পকেট থেকে কয়েকটা পেনি বের করে ওদের প্রত্যেকের হাতে ধরিয়ে দিতেই ওদের আনন্দ দেখে কে! খুব খুশি হলো ওরা। গ্রীন আজ পাহাড়ের ধারে রাত কাটাবে শুনে ছেলেগুলোর মধ্যেকার একজন দৌড়ে গিয়ে নিজেদের তাঁবুর ভেতর থেকে কম্বল এনে দিল। আজ রাতে প্রচণ্ড শীত পড়বে। এই কনকনে ঠান্ডায় বাইরে রাত কাটানো! তা-ও গরম পোশাক ছাড়া! মোটা একটা পশমি কম্বল ওরা গ্রীনকে এনে দিল। কম্বলে নিজেকে আপাদমস্তক জড়িয়ে গ্রীন সামনেই একটা বড় গাছের মোটা গুঁড়ির গায়ে হেলান দিয়ে বসল। হাতটা রইল বন্দুকের বাঁটের ওপর। ট্রিগারে আঙুল ছুঁইয়ে সতর্ক হয়ে, সবকটি ইন্দ্রিয় সজাগ রেখে বসে রইল সে। সামনে এখন ওর লম্বা একটা রাত। .....এদিকে, এইদিন দুপুরেই ইউনাইটেড স্টেটসের নৌ-বাহিনীর কর্পোরাল টিমোথি স্কিনার তার সঙ্গিনী অ্যাঞ্জেলিক ভ্যানেলের সাথে নিজেদের মধ্যে প্রেমালাপে মগ্ন। পোর্ট অফ প্রিন্সের দক্ষিণ পূর্ব দিকে একটি নির্জন পথের ওপর ওদের গাড়িটা দাঁড় করানো। তারা দুজনে ঘন্টাখানেকের জন্য বেরিয়েছিল নিজেদের মধ্যে একান্তে প্রেমের অনুভূতি শেয়ার করতে। কিছুক্ষণ আগেই পেশনভিলে'তে একটি বারে দুজনের দেখা হয়েছিল। কর্পোরাল টিমোথি স্কিনার, জাতে আফ্রিকান-আমেরিকান, তার মা-বাবা এই হাইতিরই বাসিন্দা ছিল, পরে দেশত্যাগ করেছিল। টিমোথি হাইতিতে আমেরিকান সেনা-জওয়ানদের সাথে এসেছিল, ভূমিকম্পবিধ্বস্ত হাইতিতে শান্তি-শৃঙখলা বজায় রাখতে। এখানেই একটি বারে তার দেখা হয়ে যায় অ্যাঞ্জেলিক ভ্যানেলের সাথে। কয়েক মিনিটের আলাপের পরই অস্থিরচিত্ত টিমোথি একটি অন্যায় আবদার করে বসে অ্যাঞ্জেলিকের কাছে, যদিও অ্যাঞ্জেলিকের মতো মেয়েদের কাছে এটা অন্যায় কিছু নয়। ঘন্টাখানেকের জন্য বাইরে থেকে ঘুরে আসার প্রস্তাব শুনেই অ্যাঞ্জেলিক বলল, "সেটা এখানে হবে না। তোমাকে আমার সঙ্গে একটা অন্য জায়গায় যেতে হবে"। নেশার এবং দৈহিক চাহিদা মেটানোর তাড়নায় টিমোথি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে যায়। বলে, "কোথায় যেতে হবে, বলো? তুমি যেখানে নিয়ে যাবে, আমি সেখানেই যেতে রাজি"। অ্যাঞ্জেলিক ওর হাত ধরে বারের বাইরে নিয়ে এসেছিল। ওকে নিজের গাড়িতে উঠিয়ে একটা লং ড্রাইভে বেরিয়ে পড়ল। কতক্ষণ ড্রাইভিং করেছিল সে, টিমোথির কাছে সময়ের কোনও হিসেব রইল না। সে তখন অজানা এক সুখস্বপ্নে বিভোর। অ্যাঞ্জেলিক তাকে কোথায় নিয়ে চলেছে, তা-ও সে জানে না। শুধু বলেছে, তাকে সে একটা দারুণ সারপ্রাইজ দিতে চায়। অল্প সময়ের মধ্যেই ওদের গাড়িটা শহরের বাইরে বেরিয়ে এসেছিল। টিমোথি তখন মদের নেশায় একেবারে আউট। কিছুক্ষণের মধ্যেই অ্যাঞ্জেলিকের গাড়িটা একটা ধুলোভরা পথের ওপর এসে পড়ল। এখানে জঙ্গল, গাছপালা একটু বেশীরকম নিবিড়। আশেপাশে চোখে পড়ছে না কোনও লোকালয়ও। পথটা ধরে আরও কিছুটা এগোবার পর জঙ্গল আরও নিবিড় হয়ে এলো। একসময় অ্যাঞ্জেলিক ওর গাড়িটা এক জায়গায় পার্ক করল। "...ডার্লিং, এ কোথায় নিয়ে এলে আমায়?" নেশা জড়ানো গলায় বলল টিমোথি। "...তবে কি আমরা লোকের সামনে সবকিছু করব?" পালটা একটা কটু রসিক মন্তব্য ছুঁড়ে দিল অ্যাঞ্জেলিক। "...তাহলে কি এখানেই..." নেশাগ্রস্ত লাল চোখদুটো মেলে আশপাশটা দেখতে দেখতে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল টিমোথি, অ্যাঞ্জেলিক ওকে থামিয়ে দিতে বলল, "উঁহু, এখানেও নয়....!" "...তবে আবার কোথায়?" অধৈর্য হয়ে প্রশ্নটা করলেও নেশার ঝোঁকে টিমোথির কণ্ঠস্বর তেমন চড়ল না। "....দেখাচ্ছি তোমায় জায়গাটা", বলেই গাড়ির দরজা খুলে দৌড়তে শুরু করল অ্যাঞ্জেলিক। সঙ্গে সঙ্গে সজাগ হয়ে উঠল টিমোথি। সে-ও গাড়ি থেকে নেমে অ্যাঞ্জেলিক'কে অনুসরণ করে ছুটতে লাগল। "....কোথায় চলেছ, সোনা ?" অস্ফুট চিৎকার করে বলল টিমোথি। অ্যাঞ্জেলিক তখন পাইন আর কলাগাছের বনের ভেতর ঢুকে পড়েছে। "....দেখতেই পাবে", ছুটতে ছুটতে ঘাড়ের ওপর দিয়ে পেছন ফিরে তাকিয়ে বলল অ্যাঞ্জেলিক। পথটা ক্রমশ ঢালু হয়ে পাহাড়ের ওপরের দিকে উঠে গিয়েছে। অ্যাঞ্জেলিকও সেই ঢালু পথটা ধরে ক্রমশ উঠছে ওপরের দিকে আর ওকে পেছন থেকে অনুসরণ করে ছুটে আসছে নেশাগ্রস্থ টিমোথি। "...ওহ!" হাঁফাতে হাঁফাতে নিজের মনেই স্বগতোক্তি করল টিমোথি, "মেয়েটা দেখছি হেভি সেয়ানা! এ তো মহা ঝামেলায় পড়া গেল!" কিন্তু টিমোথি হার মানার পাত্র নয়। সে-ও থামল না। ছুটতে লাগল। একসময় ওরা এসে পড়ল একটা অদ্ভুত সুন্দর জায়গায়। জায়গাটা দেখে মূহুর্তে টিমোথির নেশা ছুটে গেল। মুগ্ধ চোখে চেয়ে রইল সে সামনের দিকে। দেখল, ঢালু জায়গাটার অনেকটা নিচে দেখা যাচ্ছে সী-বিচ। কালো কালো বিশাল পাথরখন্ডগুলোর ওপর আছড়ে পড়ছে সমুদ্রের বিরামহীন ঢেউ। পাথরখন্ডগুলোর পাশেই সমুদ্রের বিষন্ন সুন্দর বেলাভূমি, যেখানে তীরের ছোট ছোট নুড়িপাথর আর বালু নিয়ে যেন আপনমনে খেলা করে চলেছে সমুদ্রের ছোট ছোট ঢেউশিশুরা। পড়ন্ত বিকেলের আলোয় তীরের বালুকে মনে হচ্ছে যেন হাজারো সোনার কণা। দূরে সমুদ্রের বুক লাল হয়ে উঠেছে অস্তমিত সূর্যের আলোয়। সে কি অপূর্ব দৃশ্য! যেন মনে হচ্ছে কোনো দক্ষ শিল্পীর হাতে আঁকা একটা বিশাল তৈলচিত্র ওর সামনে। "....কেমন দেখছ?" মাদকতা মেশানো গলায় জিজ্ঞেস করল অ্যাঞ্জেলিক। "....কি বলব!" উদভ্রান্ত দৃষ্টিতে প্রকৃতির ওপর চোখ বোলাতে বোলাতে বলল টিমোথি, "বলার মতো কোনও ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। বুঝতে পারছি না, কিসের সাথে এর উপমা টানব"। অ্যাঞ্জেলিক'কে নিজের বাহুমধ্যে নিবিড়ভাবে টেনে নিয়ে ওর কপালে চুম্বন করল টিমোথি, "এটাই বুঝি সেই জায়গা? এখানেই আমায় নিয়ে আসতে চেয়েছিলে?" আবেগভরা গলায় জিজ্ঞেস করল সে। নীরবে মাথা নাড়ল অ্যাঞ্জেলিক। টিমোথির থেকে কয়েক হাত দূরে সরে গেল। তারপর ওপরে অস্তগামী সূর্যের ম্লান ছটায় আলোকিত আকাশের দিকে তাকিয়ে ধীরেধীরে একে একে শার্টের বোতাম খুলতে লাগল সে। একসময় পুরো নগ্ন হয়ে গেল সে। তারপর টিমোথির অস্থির চোখদুটোর সামনেই সোনালি বালুতট ধরে ছুটতে লাগল সমুদ্রের দিকে। নেমে পড়ল জলে। ওখান থেকেই হাতের ইশারায় ডাকতে লাগল তার দোসরকে। এতক্ষণে যেন নিজেকে ফিরে পেলো টিমোথি। সে-ও তাড়াতাড়ি পরিধেয় খুলে নগ্ন হয়ে গেল। প্যান্টের পকেট থেকে কিছু একটা বের করে আনল, তারপর সে-ও ছুটতে লাগল নীল অনন্ত জলরাশির দিকে, যেখানে তখন জলকেলি করছে তার নগ্নিকা সঙ্গিনী। একের পর এক ঢেউ এড়িয়ে বুক সমান জলে পৌঁছে গেল ওরা। অ্যাঞ্জেলিক ওর দুই নগ্ন পা দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল টিমোথির সুপ্রশস্ত কোমর, দুই বাহু দিয়ে ওকে পুরো বেষ্টন করে ফেলল নিজের মধ্যে। "....দেখো আমি কি এনেছি!" হাতে থাকা ছোট একটা সিলভারের প্যাকেট জিনিসটা অ্যাঞ্জেলিকের দিকে বাগিয়ে ধরে বলল টিমোথি, "কন্ডোম! " হাসি ফুটে উঠল অ্যাঞ্জেলিকের গলায়। সমুদ্রের বুকেই চলল দুজনের উদ্দাম লীলা! একসময় সমুদ্রের বুক থেকে উঠে এসে বেলাভূমির বালুর ওপর চিত হয়ে শুয়ে পড়ল অ্যাঞ্জেলিক। ওর সিক্ত, সম্পূর্ণ অনাবৃত দেহটা টিমোথিকে যেন চুম্বকের মতো আকর্ষণ করতে লাগল। পাহাড়ের চেয়েও খাড়া স্তনদুটি মূহুর্তে ওকে যেন পাগল করে দিল। আর দেরী না করে টিমোথি ঝাঁপিয়ে পড়ল অ্যাঞ্জেলিকের শরীরটার ওপর। অনেকক্ষণ পর - কতক্ষণ পর খেলা সাঙ্গ হলো দুজনের। বালুর ওপর দুজনেই চিত হয়ে শুয়ে তখন হাঁফাচ্ছে। জোরে জোরে নিশ্বাস পড়ছে দুজনের। আজও আকাশে চাঁদ উঠেছে। গতকাল সবে পূর্ণিমা গিয়েছে, আজও আকাশে যথারীতি চাঁদের উদয় হয়েছে। তার মায়াবী আলোয় ভরে উঠেছে সমুদ্র, ভরে উঠেছে পৃথিবী। বালুর ওপর চিত হয়ে শুয়ে দুজনেই লক্ষ্য করছে ওপরের পূর্ণ চন্দ্রটাকে। ওদের আজকের অভিসারের নীরব সাক্ষী একমাত্র ওই চাঁদ। তবে, চারপাশে অঢেল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মধ্যেও কোথাও যেন একটা ছন্দপতন হচ্ছে বলে মনে হতে লাগল টিমোথির। কি হচ্ছে, ব্যাপারটা অনুমান করার চেষ্টা করতে না করতেই হঠাৎ চারপাশের নিস্তব্ধতাকে বিদীর্ণ করে কোত্থেকে ভেসে এলো একটা ভয়াবহ জান্তব গর্জন। ভীষণ চমকে উঠে অ্যাঞ্জেলিক লাফিয়ে উঠে বসে পড়ল। ওর উদ্ধত খাড়া স্তন বেয়ে ঝরে পড়ল কিছুটা সামুদ্রিক বালি। "...ও কি?" ভয়ার্ত স্বরে বলে উঠল অ্যাঞ্জেলিক, "ও কিসের গর্জন?" টিমোথিও ওদিকে ধড়মড় করে উঠে বসে পড়েছে। সত্যিই তো, এ কিসের গর্জন কানে এলো ওদের! এই ডাক কিসের? জন্মে থেকে এই ডাক তো কখনো শোনেনি। কোন পশু ডাকছে পাহাড়ের অরণ্যের বুকের ভেতর থেকে? "...টিমোথি!" এবার কাতর কান্না ঝরে পড়ল অ্যাঞ্জেলিকের গলায়, "আমাকে তুমি এক্ষুণি এখান থেকে নিয়ে চলো! আমার খুব ভয় করছে!" অ্যাঞ্জেলিকের কথা শেষ হতে না হতেই ফের ভেসে এলো সেই গর্জন! বুকের রক্ত যেন নিমেষে জল হয়ে আসে সেই ভয়াল শব্দে! নিস্তব্ধ সন্ধে যেন কেঁপে কেঁপে উঠছে সেই শব্দে! পাহাড়ের গায়ে গায়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে সেই শব্দ। চিন্তায় পড়ল টিমোথি। কি হবে এখন? সঙ্গে বন্দুক আনেনি, এখন যদি সত্যিই কোনো হিংস্র জানোয়ারের পাল্লায় পড়ে ওরা, কি ভাবে বাঁচাবে নিজেদের? "....ও কি? ওটা কি?" টিমোথির ভাবনার মাঝেই বালুতটের ওপর রাখা নিজের স্তুপীকৃত জামাকাপড়গুলো দিয়ে যতটা সম্ভব নিজের দেহটাকে আড়াল করতে করতে ভয়ার্ত কন্ঠে বলে উঠল অ্যাঞ্জেলিক। আতঙ্কে ওর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখা সচকিত হয়ে টিমোথি ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে চেয়ে দেখে, দূরে পাহাড়ের গায়ে তালগাছের সারির ভেতর কিছু একটা যেন নড়ছে, মনে হচ্ছে। মাঝখানে শুধুই বালিয়াড়ি আর বালিয়াড়ি। চাঁদের আলোয় ধূ ধূ করছে। সেই শুভ্র বালুর ওপর কোথা থেকে যেন বিষাক্ত একটা জীবের ঘোর কৃষ্ণবর্ণ, কুৎসিত একটা ছায়া পড়ল। দ্রুত এগিয়ে আসতে লাগল ওটা এদিকে, চলমান বিভীষিকার মতো। "....একটা...একটা বিশাল দৈত্যাকৃতি জন্তু যেন!" বিড়বিড় করে প্রলাপ বকার মতো করে বলতে লাগল অ্যাঞ্জেলিক, "কি কালো! কি বিশাল!" হঠাৎ আতঙ্ক যেন প্যানিকে পরিণত হলো অ্যাঞ্জেলিকের। সে হঠাৎ বালিয়াড়ি ভেঙে উন্মাদিনীর মতো দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে ছুটতে শুরু করল। কিন্তু আতঙ্কে ওর কোনো জ্ঞান ছিল না, তাই ছূটতে লাগল এলোমেলোভাবে। কোথায় যাচ্ছে, কোনদিকে যাচ্ছে, ও নিজেও বুঝতে পারছে না। ওদিকে, প্রাথমিক বিহ্বলতা কাটিয়ে টিমোথিও ছুটতে শুরু করেছে ; কিন্তু দৌড়বে কোন দিকে? ওদের পেছনে যে তখন বিশাল এঞ্জিনের মতো ফোঁসফোঁস করে নিশ্বাস ফেলতে ফেলতে ছুটে আসছে সেই ভয়াবহ অপার্থিব জন্তুটা! একবার ঘাড় ফিরিয়ে পেছনে দেখতে যেতেই হৃদপিন্ডটা যেন মূহুর্তে তুহিন শীতল হয়ে গেল টিমোথির। দেখল, চাঁদের আলোকে আড়াল করে সেই ভয়াবহ কুৎসিত, ঘোর কৃষ্ণবর্ণ জন্তুটা একেবারে ওর ঘাড়ের কাছে এসে পড়েছে! ওটার লাল বুভুক্ষু দুটো চক্ষু ওর ওপরেই নিবদ্ধ। আর দৌড়ে পেরে উঠবে না বুঝে মূহুর্তে একটা অন্য উপায় বাতলে ফেলল টিমোথি। সে তখন তালগাছের বনের কাছাকাছি চলে এসেছে। মাটিতে ইতস্তত ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ভাঙা ডাল। বেশ শক্তপোক্ত। এগুলোর কোনও একটাকেই অস্ত্র হিসেবে দিব্যি ব্যবহার করা যায়। যেমন ভাবা, চোখের পলকে একটা ডাল তুলে নিয়ে বিদ্যুতের মতো পেছন ফিরল টিমোথি। জন্তুটা তখন ওকে অনুসরণ করে প্রায় ওর ঘাড়ের কাছাকাছি এসে পড়েছে। ওটার গরম নিশ্বাসের হালকা পিঠের ওপর স্পষ্ট অনুভব করছে সে। হাতে ধরা মোটা ডালটার সজোরে একটা বাড়ি বসিয়ে দিল ওটার মাথায়। বিস্ময়! বিস্ময়ের ওপর বিস্ময়! যত জোরে গাছের ডালটা দিয়ে জন্তুটার মাথায় আঘাত করেছিল টিমোথি, অন্য জন্তু হলে সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে পড়ে যেত, কিন্তু আশ্চর্য, এটার কিছুই হলো না! উলটে ডালটাই মট করে দু-টুকরো হয়ে ভেঙে গেল! একটা চাপা হিংস্র গর্জন বেরিয়ে এলো জন্তুটার মুখ দিয়ে। হতবাক,কিংকর্তব্যবিমূঢ় টিমোথি কিছু বুঝে ওঠার আগেই সেই অতিকায় জীবটা তার বিশাল শরীরটা নিয়ে পূর্ণ উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়ল টিমোথির ওপর। .....ওদিকে, অন্ধকার বনপথ ধরে দিশেহারার মতো ছুটছে অ্যাঞ্জেলিক। একটু আগেই শুনতে পেয়েছে, টিমোথির মরণ আর্তনাদ। টিমোথি গেছে, কিন্তু ওকে নিজেকে বাঁচতে হবে। তাই ছোটার গতি আরও বাড়িয়ে দিল অ্যাঞ্জেলিক। বন এখানে এতই ঘন যে চাঁদের আলোও এখানে সম্পূর্ণ প্রবেশ করতে পারছে না। গাছে গাছে ধাক্কা খেয়ে ছিটকে চলে যাচ্ছে বাইরে। ফলে জায়গায় জায়গায় রহস্যময় আলো আঁধারি ঘেরা এক পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে আর যেখানে যেখানেই আলো-আঁধারির পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, সেখানেই মনে হচ্ছে যেন অতিপ্রাকৃত কিছু সেই অন্ধকারে গা মিশিয়ে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে ওর প্রতীক্ষায় রয়েছে। ছুটতে ছুটতে একসময় হাঁফিয়ে পড়ল অ্যাঞ্জেলিক। একবার মাটি ফুঁড়ে বের হয়ে থাকা গাছের মোটা শিকড়ে হোঁচট খেয়ে পড়েও গেল, হাঁটু ফেটে রক্ত ঝরতে লাগল দরদর ধারায়। আর পারছে না, আর দৌড়তে পারছে না সে। কিন্তু পরক্ষণেই সে সচকিত হয়ে উঠল। না, তাকে থামলে চলবে না। তাকে ছুটতে হবে। তাকে বাঁচতে হবে। তাকে যেভাবে হোক গাড়ির কাছে পৌঁছতেই হবে। বনের ভেতর দিয়ে আরও কিছুক্ষণ ছোটার পর একসময় অদূরে নিজের গাড়িটাকে দেখে যেন কিছুটা ধড়ে প্রাণ ফিরে পেলো অ্যাঞ্জেলিক। ছোটার গতি আরেকটু বাড়িয়ে সে একসময় এসে পৌঁছল গাড়ির কাছে। তাড়াতাড়ি গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে বসল। লক করে দিল দরজা। এখুনি, এখুনি স্পিডে এখান থেকে বেরিয়ে যেতে হবে। বিশ্রাম নিলে চলবে না। চাবি? ইগনিশনের চাবিটা? চাবির খোঁজে পকেট হাতড়াতে যেতেই এতক্ষণে খেয়াল হলো অ্যাঞ্জেলিকের। আরে, সে যে একেবারেই নগ্ন! গায়ে একটা সুতোও নেই! মনে পড়ল বিচের ওপর টিমোথির সঙ্গে কাটানো সময়টার কথা! ওহ মাই গড! তারপর... তারপর এত দ্রুত সবকিছু ঘটে গেল যে কোনওকিছু ভাবার অবকাশ ছিল না ওর। গাড়ির চাবিটা রয়ে গিয়েছে ওই জামাকাপড়ের ভেতরেই, যেগুলো এখনও পড়ে আছে সমুদ্রের তীরে বালির ওপর। "....না!" একটা আর্তচিৎকার বেরিয়ে এলো অ্যাঞ্জেলিকের গলা দিয়ে। কিন্তু পরক্ষণেই একটা উপায় স্থির করে ফেলল সে। আচ্ছা, সে যদি এমনটা করে, ভোর পর্যন্ত এই গাড়ির ভেতরেই সিটের তলায় চিত হয়ে লুকিয়ে শুয়ে কাটিয়ে দিল? তাহলে? এইভাবে সে কি নিজেকে বাঁচাতে পারবে? হ্যাঁ, হয়তো পারবে। গাড়ির ভেতর বসে রীতিমতো তখনো হাঁফাচ্ছে অ্যাঞ্জেলিক। ওই অবস্থাতেও সে নিজেকে যতদূর সম্ভব সংযত করার চেষ্টা করছে। একবার গাড়ির বাইরে চোখ বুলিয়ে নিলো। গাড়ির হেডলাইটদুটো জ্বেলে দেখে নিল, সামনে,পেছনে,আশেপাশে কিছু নেই তো? না, দেখে নিশ্চিন্ত হলো সে। কিছু নেই ওর আশেপাশে। মূহুর্তের জন্য চোখ বুজে ফেলেছিল অ্যাঞ্জেলিক, চোখ খুলে ফের ওর ডানপাশের জানলার দিকে নজর পড়তেই ওর বুকের সব রক্ত যেন মূহুর্তে শুকিয়ে গেল। একটা বিশাল নেকড়ের মাথা ওর জানলার ঠিক বাইরে, যার লাল টকটকে চোখদুটো স্থির একেবারে ওর ওপরেই। নেকড়ের চোখ, অথচ দৃষ্টিটা কিরকম যেন মানুষের মতো! প্রথমটায় যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারল না অ্যাঞ্জেলিক। ও কি ঠিক দেখছে? আতঙ্ক আর বিস্ময় ওকে যেন পাথর করে দিল। জানলার বাইরে ওদিকে জন্তুটা বিশাল একটা হাঁ করল ওর দিকে চেয়ে। হিংস্র শ্বাপদের ক্যানাইন টিথ'গুলো অস্ফুট চাঁদের আলোয় ঝকঝক করে উঠল। শিউরে উঠল অ্যাঞ্জেলিক। জন্তুটার জিভ আর দাঁতগুলো রক্তে মাখামাখি হয়ে আছে! জীবন্ত একটা বিভীষিকা ওর সামনে দাঁড়িয়ে! কতক্ষণ স্থবিরের মতো ওটার দিকে চেয়ে ছিল সে, জানে না ও নিজেও। তারপরেই সম্বিৎ ফিরে পেয়ে তীব্র তীক্ষ্ণ আর্তনাদ করে উঠল অ্যাঞ্জেলিক; আর সঙ্গে সঙ্গে ঝনঝন শব্দে ভেঙে পড়ল গাড়ির জানলার কাঁচ। অ্যাঞ্জেলিকের নগ্ন দেহের ওপর কাঁচের ভাঙা টুকরোগুলো বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ল। একটা ভীষণ গর্জন, তারপরেই ওর ঘাড় কামড়ে ধরল গাড়ির জানলা গলিয়ে ভেতরে চলে আসা ভয়াল একটা নেকড়ের হিংস্র মুখ। ।। চাঁদের আলোয় হাইতিতে এ কোন বিভীষিকা!!!।। বিছানায় শুয়ে শুয়ে এপাশ ওপাশ করছিল কোকো। কিছুতেই ঘুম আসছে না ওর। কেবল একটার পর একটা চিন্তা এসে ওকে যেন অস্থির করে তুলছে। আজ রাতে ওর মনটা এত বিক্ষিপ্ত হয়ে ছিল যে অন্যদিনের মতো আজ ডিনারে মা-বাবার সঙ্গেও বিশেষ কথা বলল না। যখন তাঁরা গ্রীনের ব্যাপারে ওকে জিজ্ঞেস করলেন, ভেতরে ভেতরে কোকো যেন আরও উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল। ওকে আরও বিব্রত দেখাতে লাগল। ওর খালি মনে হতে লাগল, আজ রাতে ক্যারিফোরের টেন্ট সিটি'তে খোলা আকাশের নিচে রাত্রিযাপন করতে বড় ভয়ানক একটা ঝুঁকি নিয়ে ফেলেছে গ্রীন। কিন্তু ওর মনের এই আশঙ্কার কথা ও মুখ ফুটে নিজের মা-বাবাকেও বলতে পারল না। কিন্তু তা হলেও ওর ভেতরে ভেতরে যেন দুশ্চিন্তার ঝড় বইছিল। গ্রীন এতটা বোকামি কি করে করতে পারল? নিজের প্রাণের ওপর ওর কি একটুও মায়া নেই? ওই পাহাড় জঙ্গলের নিচে রাত কাটানো! মাগো! কল্পনা করলেও বুকের রক্ত হিম হয়ে আসে। নিজের ঘরে এসে কোকো জানলা দিয়ে বাইরের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। আজও আকাশে চাঁদ উঠেছে। গতরাতটা ছিল পূর্ণিমার, আজ চাঁদের আকার সাইজে একটু ছোট হলেও এখনো যেন একইরকম উজ্জ্বল। চাঁদের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে অনেক কথা, অনেক স্মৃতি মনে পড়তে লাগল কোকোর। গত বছরের সেই ভূমিকম্পের স্মৃতি, যে ভূমিকম্প কেড়ে নিয়েছিল ওর ছোট বোন'কে। ওর বোনের মৃত্যুর খবর পেয়ে এসেছিল এখানে। এখনও জানে না, কবে আবার ফ্লোরিডায় ফিরে যেতে পারবে। আসলে মা-বাবাকে এখানে একা রেখে ওর চলে যেতে মন সরছে না। .....ওদিকে, ম্যাথিউ লন্ড্রি রু লাপোর্টের পরিত্যক্ত পথ ধরে হাঁটছিল। হাঁটছিল বলতে একরকম পথ হারিয়ে হাঁটছিল। এখানে পথের ধারে কোনো দিক নির্দেশক সাইনবোর্ড টাঙানো নেই। অনেককেই ইতিমধ্যে জিজ্ঞেস করেছে, পোর্ট অফ প্রিন্সে যাবার পথটা কোন দিকে কিন্তু কেউই ওকে সদর্থকভাবে দিক নির্দেশ করতে পারেনি। সামনে রাস্তার একটা চৌমাথা নজরে পড়ল। সেই চৌমাথার ওপর পোর্ট অফ প্রিন্সের পুলিশ ইন্সপেক্টর জীন প্রিডক্সের গাড়িটা নজরে পড়ল ওর। গাড়িটার খোলা জানলা দিয়ে ভেতরে ইন্সপেক্টর লোকটিকে বসে থাকতে দেখতে পেলো ম্যাথিউ লন্ড্রি। ইন্সপেক্টর জীন প্রিডক্স অবশ্য ম্যাথিউয়েরও আগে তাকে দেখে ফেলেছেন। এঁর সাথেই সাক্ষাৎ করার কথা ছিল ম্যাথিউয়ের। গাড়ির কাছে এসে ইন্সপেক্টরের সঙ্গে নিচু গলায় কিছু আলোচনার পর দেখা গেল, নোট জাতীয় কিছু'র আদানপ্রদান হলো ম্যাথিউ লন্ড্রি আর ইন্সপেক্টর প্রিডক্সের মধ্যে। তারপরেই ইন্সপেক্টরের গাড়িটা চলে গেল ভোঁ শব্দ করে। গাড়িটা দৃষ্টির আড়ালে চলে গেলে ফের নির্জন পথটা ধরে হাঁটতে শুরু করল ম্যাথিউ। এখানে জায়গাটা বড্ড নোংরা, বড্ড আগোছালো। এখনও বলতে গেলে প্রায় ধ্বংসস্তূপ। এদিককার রাস্তাঘাটে একটা স্ট্রিট ল্যাম্প পর্যন্ত নেই। তবু চাঁদের আলোর কল্যাণে সবকিছু স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। কোথাও কোনও অস্পষ্টতা নেই। আশেপাশে এমনকি কোনও শব্দ পর্যন্ত শোনা যাচ্ছে না। নির্জন পথের ওপর শোনা যাচ্ছে শুধু তার জুতোর শব্দ আর সঙ্গে কানে আসছে ঝিঁঝিঁপোকার শব্দ। ব্যস, এ ছাড়া বিশ্বসংসারে একটা টুঁ শব্দ পর্যন্ত নেই। আনমনে হাঁটছিল ম্যাথিউ গ্রীন। চলতে চলতে সহসা ওর খেয়াল হলো, হঠাৎ করেই যেন থেমে গিয়েছে ঝিঁঝিঁপোকার ডাক। এখন শব্দ বলতে শুধু তার জুতোর শব্দটুকু। ব্যস, এছাড়া আর কোথাও কোনও শব্দ নেই। অকাট্য নৈঃশব্দ্যের বুকে ওর জুতোর শব্দ একটা অদ্ভুত বৈপরীত্য সৃষ্টি করেছে। সবকটা ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে উঠল ম্যাথিউয়ের। এই নিস্তব্ধতা বড় ভয়ানক। অজান্তেই মনের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। কিন্তু হঠাৎ করে এই নিস্তব্ধতা কিসের লক্ষণ? কোনো বিপদের পূর্বলক্ষণ নয় তো? হাঁটা থামিয়ে সে একবার চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিল। না, কোথাও কোনও কিছুর আভাস দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু হঠাৎ করে পরিবেশের এই নিস্তব্ধতা বড়ই রহস্যময়! নিজের মনেই খুকখুক করে একটু কাশল ম্যাথিউ। না, দিব্যি শোনা যাচ্ছে। আশেপাশে আরও একবার চোখ বুলিয়ে নিল ম্যাথিউ। তারপর আবার হাঁটতে শুরু করল। নিস্তব্ধ পথের ওপর ফের জেগে উঠল ওর জুতোর শব্দ। প্রতিধ্বনি উঠল ওর পায়ের শব্দের আর সঙ্গে সঙ্গে ওর মনে হলো, না কানে এলো, ওর পেছনে যেন আরেকটা পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে। কেউ যেন ওকে অনুসরণ করছে। ভয়ঙ্কর অনুভূতিটা হতেই ফের হাঁটা থামিয়ে দিল ম্যাথিউ। তীক্ষ্ণ চোখদুটো বোলাতে লাগল আশেপাশে। শুধু ধ্বংসস্তূপ আর ধ্বংসস্তূপ। কিছুটা দূরে একটা স্কুলবাড়ির ধ্বংসাবশেষ, পায়ের শব্দটা যেন ওইদিক থেকেই আসছে মনে হলো। অজান্তেই কোমরে গোঁজা রিভলবারের ওপর হাত চলে এলো ম্যাথিউয়ের। এই রাতে এই পথে ওকে কে লুকিয়ে অনুসরণ করছে? হঠাৎ দারুণ ভয় পেয়ে গেল ম্যাথিউ। সে হঠাৎ জোরে জোরে হাঁটতে শুরু করল। চেষ্টা করতে লাগল কত দ্রুত সম্ভব লোকালয়ে পৌঁছতে পারবে সে। হঠাৎ পেছনে একটা কিসের জোরে শব্দ হলো। সেই শব্দে লাফিয়ে উঠল ম্যাথিউ। কোমরে গোঁজা রিভলভারটা টেনে বের করে ধাঁ করে একটা গুলি চালিয়ে দিল। উদ্দেশ্যহীনভাবে। গুলিটা কোথায় গিয়ে লাগল ও জানে না, কিন্তু চালাল। নির্জন পরিবেশে গুলির শব্দটা একটা বিকট প্রতিধ্বনি তুলল। কি ব্যাপার? মনে মনে অস্বস্তি বাড়তে লাগল ম্যাথিউয়ের। কেউ কি ওর সঙ্গে প্র্যাকটিক্যাল জোক করছে নাকি? কিন্তু কে করতে পারে? এখানে তো কোনও লোকবসতি নেই। একটা মানুষকেও চোখে পড়ছে না। তীব্র এক অস্বস্তি নিয়েই ম্যাথিউ ফের হাঁটা লাগাতে গেল সামনের দিকে আর তখনিই নিস্তব্ধ রাতের স্তব্ধতা খান খান হয়ে গেল একটা অজানা জন্তুর ভীষণ ক্রুদ্ধ গর্জনে। ভীষণ চমকে উঠে লাফিয়ে উঠল ম্যাথিউ। জায়গাতেই জমে গিয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল সে। ও কিসের আওয়াজ? কোথা থেকে এলো ওই শব্দ? আতঙ্কগ্রস্ত মনে আন্দাজ করতে লাগল, কোথা থেকে আসতে পারে শব্দটা। ডানদিক থেকে - ডানদিকে একটা ভাঙা বাড়ির তোরণ আর সেই তোরণপথের দিক থেকেই শব্দটা এলো। কিসের ডাক ছিল ওটা? মনে মনে নানারকম কল্পনা করতে শুরু করল ম্যাথিউ। কোনো কুকুরের ডাক কি? কিন্তু এখানে তো একটা কুকুরও চোখে পড়ছে না। ওর ভাবনার মাঝেই আবার ভেসে এলো সেই গর্জন! এবার আর থাকতে না পেরে ফের রিভলভার'টার ট্রিগার দিল টিপে! আগুনের একটা ঝলক তুলে গুলির শব্দ ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলো ওর কানে। গর্জনটা থেমে গেল। মনে মনে সামান্য হলেও আশ্বস্ত হলো ম্যাথিউ। যেটা ছিল ওই তোরণের আড়ালে, সেটা কি ওর গুলির আঘাতে মারা গেল? তবে তাই....ভাবতে না ভাবতেই ফের ভেসে এলো সেই হাড়হিম করা হিংস্র গর্জন। যেন কোনো ক্রুদ্ধ হিংস্র পশু ভীষণ ক্রোধে হুঙ্কার ছাড়ছে। গর্জনটা ভেসে আসতেই ফের লাফিয়ে উঠেছিল ম্যাথিউ। তোরণের দিকে, যেদিক থেকে শব্দটা আসছে, সেদিকে রিভলভার তাক করে ধরল ম্যাথিউ। চাঁদের আলো সেই তোরণপথে পৌঁছচ্ছে না। ফলে জায়গাটা চাপ চাপ অন্ধকারে ঢাকা আর সেই অন্ধকারের বুকের ভেতর থেকে ধীরেধীরে জেগে উঠল দুটো লাল দীপ্ত বুভুক্ষু চক্ষু। অন্ধকারের বুকে বুভুক্ষু হায়েনার মতো ওই চোখদুটো দেখেই ম্যাথিউ আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে সাহস পেলো না। দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে ছুটতে শুরু করল সে। কোথায় পড়ে, কোথায় মরে, হুঁশ রইল না। পায়ের জুতোর একপাটি খুলে কোথায় পড়ে রইল, রিভলবারটা ছিটকে পড়ে গেল কোথায়, ওর খেয়াল রইল না। সে তখন ছুটছে...ছুটছে। সাহায্যের জন্য চিৎকার করছে আর ছুটছে। পেছনে তাড়া করে আসতে লাগল সেই সাক্ষাৎ যমদূত। বেশীদূর আর ছুটতে হলো না। ভারী একটা থাবা এসে ওর ঘাড় খামচে ধরল পেছন থেকে। কানের কাছে একটা গরররর...গরররর.. .হিংস্র চাপা গর্জন। .....এদিকে, গ্রীন অন্ধকারে বসে রয়েছে একা। বহুক্ষণ কেটে গিয়েছে। রাত অনেকটা হয়েছে, পুরো টেন্ট সিটি'তে এখন এক অকাট্য নৈঃশব্দ্য নেমে এসেছে। আকাশে আজও চাঁদ উঠেছে, আলোয় আলোয় উদ্ভাসিত পৃথিবী। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নক্ষত্ররাজিতে শোভিত আকাশ। বড় মধুর, বড় রহস্যময় লাগছে এই নির্জন পাহাড়ি শহরটার প্রাকৃতিক দৃশ্য কিন্তু আশার জানে, ওকে সজাগ থাকতে হবে আজকের রাতটায়। যাতে এই শহরের আর কারোর প্রাণ না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। হঠাৎ অদূরে কোথা থেকে যেন একটা পশুর হিংস্র গর্জন কানে এলো ওর। সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে উঠে বসে সতর্ক দৃষ্টি সেদিকে নিক্ষেপ করল গ্রীন। বন্দুকের ট্রিগারের ওপর দ্বিগুণ জোরে চেপে বসল হাত। +Copy +


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১২০৫ জন


এ জাতীয় গল্প

→ নেকড়ে পাহাড় ২(খ)

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now