বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

নেকড়ে পাহাড় ২(ক)

"রহস্য" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ মাজেদ (০ পয়েন্ট)

X WOLF MOUNTAIN লেখক : জে. আর. পিন্টো ভাষান্তরে : সুপ্রিয়া বন্দ্যোপাধ্যায় পর্ব ২ ( ক) ।। ভূমিকম্পবিধ্বস্ত হাইতি।। পরদিন সকালে যখন আশার গ্রীনের যখন ঘুম ভাঙল, তখন বেডসাইড টেবিলে ঘড়ির কাঁটা সাতটার ঘর পেরিয়ে গিয়েছে। বিছানায় বসেই আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে লম্বা করে একটা হাই তুলল গ্রীন। তারপর রাতের পোশাকেই বেরিয়ে এলো ব্যালকনিতে। চমৎকার রোদ উঠেছে বাইরে। কে বলবে রাতে অমন দূর্যোগ হয়েছিল। গতরাতের ঝড়বাদলের কোনো আঁচই কোথাও পড়েনি। ব্যালকনির রেলিংয়ের ওপর ভর দিয়ে গ্রীন বাইরের সকালের প্রাকৃতিক শোভা দেখতে লাগল। সুন্দর একটা ক্যারিবিয়ান সকাল! নিজের মনেই বলে উঠল গ্রীন। আকাশের বিরাট নীলাভ দেহটার ওপর দিয়ে খন্ড খন্ড সাদা মেঘের ভেলা ভেসে যাচ্ছে। নিচের হোটেলের সুন্দর সুছাঁদ বাগানের গাছগুলো নানারকম ফুলের মিষ্টি সুবাস ভোরের মিঠে বাতাসে ভেসে এসে তার নাকে লাগছে। গোলাপ, জুঁই, বোগেনভেলিয়ার গন্ধে ম ম করছে পরিবেশটা। গাছের ডালে ডালে পাখিরা শুরু করেছে ভোরের প্রভাতী সঙ্গীত। বিছানা ছেড়ে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াবার মিনিট তিনেকের মধ্যেই গ্রীনের মনটা একেবারে ফ্রেশ হয়ে গেল। এতদিনের বাঁধাধরা জীবনটাকে যেন মনে হতে লাগল, সে যেন এতদিন খাঁচাবন্দি পাখির মতো জীবন কাটাচ্ছিল। এখানে সে মুক্ত...সম্পূর্ণ মুক্ত এক বিহঙ্গ। মুক্ত মন নিয়ে সে উপভোগ করছিল আশেপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। ওর মনে হলো, পৃথিবীতে স্বর্গ যদি কোথাও থাকে, তাহলে তা এখানেই আছে। কিন্তু বেশীক্ষণ তার এই অবস্থা চলল না। পরিচ্ছন্ন এক টুকরো কাপড়ের ওপর হঠাৎ এক দোয়াত কালি পড়ে ছড়িয়ে যাবার মতোই তার মনটাও ক্রমশ বিষিয়ে উঠতে লাগল একটা ঘটনার কথা মনে পড়ে যাওয়ায়। গতবছরে এখানেই হয়েছিল সেই বিধ্বংসী ভূমিকম্প! হ্যাঁ, এখানেই...এই স্বর্গেই। মারা পড়েছিল এখানকার শ'য়ে শ'য়ে মানুষ। সারা দুনিয়ার কাগজে ফলাও করে সেই ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের খবর ফলাও করে ছাপা হয়েছিল। কথাটা মনে পড়তেই আবার যেন বাস্তবের দুনিয়ায় ফিরে এলো গ্রীন। ভূমিকম্পের ধ্বংসলীলার দৃশ্যটা তাকে এক লহমায় যেন স্বপ্নের জগৎ থেকে বাস্তবের কঠিন মাটিতে এনে ফেলল। দূরের দিকে চোখ পড়তেই গ্রীনের দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো এক জায়গায়। ওই তো দেখা যাচ্ছে দূরে পোর্ট অফ প্রিন্সের জাহাজ বন্দরটা। ভারী সুন্দর লাগছে এত উঁচু থেকে বন্দরটাকে দেখতে। গ্রীন জানে, বন্দরটা এখান থেকে অনেক দূরে, যেতে হলে অনেক কসরত করতে হবে কিন্তু এখান থেকে দূরে পোতাশ্রয়ের দৃশ্যটা সত্যিই মুগ্ধ করার মতো। তিনটে জাহাজ যেন দাঁড়িয়ে আছে বন্দরে - প্রথম দুটো'কে দেখে মনে হচ্ছে যেন সাধারণ মালবাহী জাহাজ, আর...আর... তৃতীয়টা যেন আমেরিকান নেভি ভেসেল। হয়তো এমনও হতে পারে ওটা ভূমিকম্পপীড়িতদের জন্য মেডিকেল সাহায্য নিয়ে এসেছে। ডাক্তার, ওষুধ, স্বাস্থ্যকর্মীরা এসেছে প্রাকৃতিক রোষের শিকার হয়ে সর্বস্ব খোয়ানো মানুষগুলোর মধ্যে যাতে মহামারী না লাগে, তার জন্য আগাম প্রস্তুতি নিয়ে। এইসময় এখানে ডেঙ্গু মহামারী আকারে দেখা দিতে পারে, তার জন্যই হয়তো আগাম মেডিকেল সাহায্য নিয়ে এসেছে জাহাজটা। বারান্দা থেকে ঘরে ফিরে এলো আশার গ্রীন। রুম সার্ভিসে ফোন করে প্রাতঃরাশের অর্ডার দিল। তারপর বাথরুমে গিয়ে মুখ-হাত ধুয়ে, শেভ করে, স্নান সেরে নিল। একটু পরে ঘিয়ে রঙা সূতীর শার্ট আর কার্গো শটস পরে সে বেরিয়ে এলো বাথরুম থেকে। আয়য়নার সামনে দাঁড়িয়ে গায়ে-মুখে মশা তাড়ানো ক্রিম মেখে নিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওর ঘরে প্রাতঃরাশ নিয়ে হাজির হলো হোটেলেরই এক কর্মী। সুপ্রশস্ত ব্যালকনিতে বেতের চেয়ার-টেবিল সাজানো ছিল। প্রাতরাশের ট্রে-টা নিয়ে গ্রীন সোজা ব্যালকনিতে চলে এলো। ওখানেই টেবিলের ওপর রাখা ওর নিত্যসঙ্গী ল্যাপটপ'টা। খেতে খেতে ল্যাপটপে ই-মেল চেক করতে লাগল, ওর অফিস থেকে নতুন কোনো মেল এসেছে কিনা। ...এরই মাঝে ওর ঘরে ফোনটা বেজে উঠল। উঠে গিয়ে ফোন রিসিভ করল আশার গ্রীন। ওপ্রান্ত থেকে ম্যাগডা'র সুরেলা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো - "মঁসিয়ে গ্রীন?" "...বলছি"। "....আপনার গাইড এসে গিয়েছে"। "....ধন্যবাদ "। রিসিভার নামিয়ে রেখে চটজলদি প্রাতরাশ সেরে নিল আশার গ্রীন। বাইরে যাবার পোশাকে প্রস্তুত হয়েই ছিল। পকেটে নিয়ে নিলো ক্যামেরা, একটা ডিজিটাল রেকর্ডার, স্মার্টফোন, নিজে যে সংবাদসংস্থায় কাজ করে, তার অফিসিয়ালি আইডেন্টিটি কার্ড এবং পার্স সহ যাবতীয় অত্যাবশ্যক জিনিস। পুরো প্রস্তুতি নিয়ে যখন সে সুইটের দরজায় লক করে নিচে রিসেপশনে নেমে এলো, তখন দেখল, একজন ফিটফাট চেহারার সুবেশা যুবতী ভিজিটার্স এরিয়ায় বসে আছে। মেয়েটিকে একনজরে দেখেই গ্রীনের মনে হলো, মেয়েটি স্থানীয় অর্থাৎ এই হাইতিরই বাসিন্দা। বয়স অল্প, কিন্তু বেশ চনমনে। গ্রীনকে দেখেই সে উঠে দাঁড়িয়ে তাকে অভিবাদন করে বলল, "মিঃ গ্রীন?" "...জ্বি", ওর অভিবাদনের প্রত্যুত্তরে সৌজন্যতাবশত সামান্য হেসে মাথা নেড়ে বলল গ্রীন। মেয়েটি খুশি হয়ে তার দিকে এগিয়ে এসে ওর দিকে করমর্দনের জন্য হাত এগিয়ে দিয়ে বলল, "আমি কোকো বার্নার্ড। " কোকো বার্নার্ডের পরনে নীল রঙের একটা জিনস আর ঢলঢলে ফুলস্লিভ একটা দুধসাদা শার্ট। কনুই পর্যন্ত শার্টের হাতা গোটানো। গ্রীন ওর সাথে করমর্দন করতে করতে বলল, "নাইস টু মিট ইউ, মিস বার্নার্ড!" কোকো সৌজন্যতার হাসি হেসে বলল, "আমি আপনার গাইড এবং গাড়ির ড্রাইভার - দুই'ই হবো। " "...ওঃ .."! খানিকটা বিব্রত ভাব ফুটে উঠল গ্রীনের মুখেচোখে। খানিকটা যেন অপ্রস্তুতে পড়ে গিয়েছে সে। মেয়েটি অর্থাৎ কোকো সেটা লক্ষ্য করে বলল, "আশা করি, আমি আপনার চাহিদা পূরণ করতে পেরেছি?" গ্রীন যেন একটু অস্বস্তিতে পড়ল। বলল, "আসলে আমি এক্সপেক্ট করেছিলাম, এরা ( হোটেলের কর্মীদের দিকে ইশারা করে) আমার জন্য একজন পুরুষ গাইডের ব্যবস্থা করে রাখবে। কিন্তু আপনি তো...." একটু এদিকওদিক তাকাতে তাকাতে দোনামোনা করতে করতে গ্রীন বলল," এটা আমার কাছে একেবারেই আনএক্সপেক্টেড ছিল যে একজন মহিলাকে ওরা আমার গাইড হিসেবে পাঠাবে!" "....আমিও কোনো পুরুষের চেয়ে কিছু কম কাজের নই!" একটুও বিচলিত না হয়ে বলল কোকো। তারপর এক মূহুর্ত কিছু যেন ভেবে নিয়ে বলল,"আপনার জন্য পুরুষ গাইড আসত। সেক্ষেত্রে ববি আপনার ভালো গাইড হতে পারত। এখানকারই ছেলে ও। কিন্তু বেচারাকে ক'দিন আগে কে বা কারা যেন কিডন্যাপ করে নিয়ে গেছে! " এমন সহজ এবং ঠাণ্ডা গলায় কথাগুলো বলল কোকো যে গ্রীন বিস্মিত না হয়ে পারল না। "....কিডন্যাপ করেছে! কেন? কারা করল?" "...কে জানে!" কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল কোকো, "কিন্তু এরকমটাই ঘটেছে!" গ্রীনের মুখেচোখে একটা গভীর সন্দেহের ভাব ফুটে উঠল। যেন এতক্ষণে ভীষণ একটা রহস্যের গন্ধ পেয়েছে। কোকো'র দিকে তির্যক দৃষ্টি হেনে বলল, "তো...ওর ফ্যামিলি পুলিশে খবর দেয়নি? ওরা কোনো স্টেপ নিচ্ছে না?" "....যতটুকু শুনেছি, ওর ফ্যামিলির কাছে নাকি মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করা হয়েছে...সেটা মিটিয়ে দিলেই ওরা ওকে ছেড়ে দেবে....আমি যা শুনেয়,সেটাই বললাম", তারপরেই প্রসঙ্গটাকে দূরে ঠেলে দিতে গিয়ে কোকো সামান্য অধৈর্য স্বরেই জিজ্ঞেস করল, "আমরা কি রওনা হতে পারি, স্যার?" "...হ্যাঁ, হ্যাঁ, চলুন..যাওয়া যাক", এবার ব্যস্ত হয়ে বলে উঠল গ্রীন নিজেও, "দেরী করে লাভ নেই"। কোকো বার্নার্ড এবং আশার গ্রীন যখন হোটেলের বাইরে পা রাখল, তখন সময় সকাল ন'টা। বেলা যত বাড়ছে দিনটাও ততই উষ্ণ হচ্ছে। হোটেলের ড্রাইভওয়েতেই দাঁড়িয়ে ছিল কোকো'র ঘন নীল রঙের ফোর্ড এফ-150। গাড়িটার গায়ে বেশ ধুলো লেগে রয়েছে। বেশ পুরনো,দেখেই বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু তা হলেও কোকো'র চটপটে ভাব দেখে ওর ভালো লাগল। ড্রাইভিং সিটের দরজা খুলতে খুলতে গ্রীনকে উদ্দেশ্য করে সে জিজ্ঞেস করল, "এখন প্রথমে কোথায় যেতে চান?" "....প্রথমে ওই হোটেলে যাব, যেখানে Duvalier কে রাখা হয়েছে।" Duvalier, হাইতির প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট, যাঁকে গত কাল বিকেলেই পোর্ট অফ প্রিন্স বিমানবন্দর থেকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে। কোকো এক মূহুর্ত কি যেন ভেবে নিয়ে বলল, "হুমম...ওঁকে 'দ্য ক্যারিব' হোটেলে রাখা হয়েছে এখন। আপাতত দু-একদিন এটাই ওঁর ঠিকানা। বেশ, চলুন তবে"। ওদের গাড়িটা অলোফসন হোটেলের ড্রাইভওয়ে ছেড়ে ধীরেধীরে বেরিয়ে গেল। ফটকের পাশে বন্দুক কাঁধে দাঁড়ানো গতকালের সেই গার্ডদুজন হাসিমুখে ওদের অভিবাদন করে ফটকের দুই দিকের পাল্লা খুলে একপাশে সরে দাঁড়াল। ওদের গাড়িটা খোলা ফটক দিয়ে বেরিয়ে গেল। হোটেল ছেড়ে যত ওদের গাড়ি এগোতে লাগল, গ্রীন লক্ষ্য করল আশেপাশের পরিবেশ কেমন যেন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। যেন স্বর্গ ছেড়ে মাটির পৃথিবীর দিকে পা বাড়িয়েছে ওরা। যে রাস্তাটা ধরে, অবশ্য আদৌ যদি সেটাকে রাস্তা বলা যায়, ওদের গাড়িটা এগোচ্ছিল, একেবারে হতশ্রী অবস্থা রাস্তাটার। জায়গায় জায়গায় ভাঙাচোরা, এবড়োখেবড়ো অবস্থা। এদেশের প্রশাসন যেন পুরোপুরি বিপর্যস্ত, ব্যর্থ। পেছনে, সামনে যেদিকে চোখ যায় শুধুই পাহাড়। ওদের অলোফসন হোটেলটা ওই পাহাড়েরই গায়ে। এ'দেশে এই পাহাড়'টিকে বলা হয় 'মাউন্টেন' অর্থাৎ পর্বত, যদিও একে ভৌগোলিক দৃষ্টিকোণ থেকে মোটেও পর্বত বলা ঠিক হবে না। আসলে এটা হলো 'হিল'( Hill) বা পাহাড়। অন্যান্য দেশেও হাইতির এই পাহাড়কে 'পাহাড়'ই বলা হয় কিন্তু হাইতিতে এর পরিচয় 'পর্বত'। এবড়োখেবড়ো রাস্তা ধরে ওদের গাড়িটা অনেকটা সময় চলার পর কোকো হঠাৎ ডানদিকে মোড় নিয়ে নিল। এদিকের পথটা বিধ্বস্ত লোকালয়ের পথ ছেড়ে ক্রমশ উঠে গিয়েছে পাহাড়ের ওপর দিকে। লোকালয় বলতে ছোট বড় সাইজের ত্রিপলের তাঁবু। গাড়ি যত ওপরের দিকে উঠছে, আশেপাশের দৃশ্যগুলোরও বদল হচ্ছে। বাতাসের বেগও ক্রমশ বাড়ছে। "....তাহলে...আপনি শুধু ফ্রেঞ্চ ভাষাতেই কথা বলেন?" এতক্ষণে মুখ খুলল গ্রীন। সামনের উইন্ডস্ক্রিনের দিকে চোখ রেখে ড্রাইভ করছিল কোকো। পাশে বসা গ্রীনের কণ্ঠস্বর কানে আসতে সে চকিতে একবার গ্রীনের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, "ক্রিওল ভাষাও বলতে পারি। স্প্যানিশ আর ইংলিশও মোটামুটি জানি"। "...আপনার উচ্চারণ কিন্তু সেরকম নয়", গাড়ির জানলা দিয়ে বাইরের দিকে চোখ রেখে কেটে কেটে বলল গ্রীন। "...জানি", জবাবে বলল কোকো, "ওই যে বললাম মোটামুটি জানি। আমি বেড়ে উঠেছি এখানে এবং ফ্লোরিডা - দু জায়গাতেই। এখানে ভূমিকম্পটা হওয়ার আগে পর্যন্ত জীবনের বেশীরভাগ সময় অরল্যান্ডো'তে ছিলাম"। "...তাই?" এবার একটু আগ্রহ দেখা দিল গ্রীনের মধ্যে, "আপনার মাতৃভাষা কোনটা?" "...ক্রিওল...আমি তা-ই মনে করি" এক মূহুর্ত ভেবে নিয়ে বলল কোকো, "কারণ যেহেতু আমার জন্ম এখানেই। ইংলিশ আর ক্রিওলের তুলনায় ফ্রেঞ্চ খুব কমই বলতে পারি। এখানকার অফিসিয়াল ল্যাঙ্গোয়েজ হলো ফ্রেঞ্চ। আমি ফ্রেঞ্চ ভাষায় কথা বলতে শিখেছিলাম কলেজে পড়তে"। "...কোন কলেজ থেকে গ্রাজুয়েশন করেছিলেন?" "...আমার স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর পড়াশোনা সবই সেন্ট্রাল ফ্লোরিডায়", বলল কোকো, "এখনও পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছি। ওখানকার ইউনিভার্সিটি থেকেই বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে মাস্টার্স কমপ্লিট করেছি"। "...ফ্লোরিডা থেকে এখানে দেশে কবে ফিরেছিলেন?" কাঁধ ঝাঁকাল কোকো। বলল, "ভূমিকম্পে এখানে যখন সবকিছু তছনছ হয়ে গেল, আমার বোন মারা গেল এই ভূমিকম্পেই, আমি তখনই ছুটে আসে। আমার মা-বাবাকে এখানে দেখবার মতো কেউ ছিল না। " "...ওঃ গড!" সমবেদনা ফুটে উঠল গ্রীনের কন্ঠস্বরে, "আই অ্যাম সরি। ধন্যবাদ!" বলে প্রসঙ্গে ইতি টানল সে। গাড়ির উইন্ডস্ক্রিনের ওপর ঝুঁকে পড়ে এমনভাবে মনোযোগ সেদিকে নিবদ্ধ করল কোকো যেন এইসব ব্যাপারে সে আর কথা বলতে আগ্রহী নয়। গাড়ি ছুটে চলল রুক্ষ চড়াই বেয়ে। আশেপাশে এখন একটিও বাড়িঘর নেই, শুধুই ধূ ধূ রুক্ষ প্রান্তর। ওদের গাড়িটা একসময় 'দ্য ক্যারিব' হোটেলের পথ ধরল। 'দি ক্যারিব' হোটেলের ফটকের সামনে বেশ কয়েকজন সশস্ত্র প্রহরারত পুলিশ কনস্টেবলকে ঘুরে বেড়াতে দেখা গেল। জানা গেল, Baby Doc Duvalier, আর্থিক দূর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হাইতির প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট, যিনি গতকালই দেশে ফিরেছেন, তাঁকে আপাতত এই হোটেলেই একপ্রকার নজরবন্দি করে রাখা হয়েছে। সুপ্রিমো থেকে অর্ডার পেলেই তাঁকে গারদে নিয়ে যাওয়া হবে। তাঁর গ্রেপ্তারির খবর ইতিমধ্যে গোটা বিশ্বে চাউর হয়ে যাওয়ায় দেশ বিদেশ থেকে সাংবাদিকদের ভিড় উপচে পড়ছে হোটেলের সামনে; মাঝেমাঝেই পুলিশকে সেই ভিড় সামাল দিতে হচ্ছে। কিছুক্ষণ ওখানে দাঁড়িয়ে থেকে গোটা পরিস্থিতিটা আঁচ করে নিল আশার গ্রীন। তারপর কোকো বার্নার্ডের দিকে ঘুরে বলল, "চলুন, এখান থেকে এবার যাওয়া যাক"। বার্নার্ড যেন পরম আশ্চর্য হয়ে বলল, "সে কি! এত তাড়াতাড়ি! " "....হ্যাঁ", বলল গ্রীন, "আজকে মনে হয় বিশেষ কিছু হবে। যতদূর মনে হচ্ছে আজ ওরা Baby Doc Duvalier কে এখানেই বন্দি করে রেখে ইন্টারোগেশনের কাজ করবে। যা কিছু হবে, আগামীকাল হবে। সো, লেটস গো!" "...এবার কোথায় যাবেন?" "....ক্যারিফোরের 'টেন্ট সিটি'তে", কেটে কেটে বলল গ্রীন। দুজনে ফের গিয়ে উঠে বসল গাড়িতে। এবারের গন্তব্য ক্যারিফোর, যেখানে হপ্তা দুই আগে দুটি কিশোরের নৃশংস হত্যাকান্ডের পর ওই এলাকারই এক ব্যক্তিকে ওয়্যারউলফ সন্দেহে নির্মমভাবে হত্যা করে স্থানীয় লোকজন। ফের ছুটে চলল ওদের গাড়ি। এবার আগের চেয়েও ফুল স্পিডে। জানলার ধারের সিটে গা এলিয়ে দিয়ে দূরের দিকে চেয়ে গ্রীন মনে মনে কোকো'র ড্রাইভিংয়ের প্রশংসা করতে লাগল। মেয়েটার বয়স অল্প হলে কি হবে, এই বয়সেই পাকা ড্রাইভার! গাড়িটা মনে হচ্ছে না রাস্তা দিয়ে ছুটছে, মনে হচ্ছে যেন উড়ে যাচ্ছে। কোনো পুরুষ ড্রাইভারও এত দক্ষতার সঙ্গে ড্রাইভিং করতে পারে কিনা সন্দেহ। শুধু ফুলস্পিডে গাড়ি চালানোই নয়, আশপাশের গাড়িগুলোকেও অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে এবং নির্ভুলভাবে পাস দিচ্ছে। "...এক্সকিউজ মী", গ্রীনের ভাবনার মাঝেই হঠাৎ বলে উঠল কোকো, "আপনি তো গতকাল সবেমাত্র এসেছেন....Baby Doc Duvalier যে দেশে ফিরেছেন, এ খবর কি আপনার আগে থেকেই জানা ছিল?" এক মূহুর্ত চুপ করে থেকে গ্রীন বলল, "উনি যে দেশে ফিরছেন, সে ব্যাপারে আমার বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না। আগাম কোনো ইনফর্মেশন আমার কাছে ছিল না। এমনকি এ'ও শুনেছি, খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা'ও জানতেন না যে Baby Doc Duvalier গত দু'দশকের স্বেচ্ছা নির্বাসন ভঙ্গ করে হঠাৎ আজ হাইতি ফিরবেন। কিন্তু ব্যাপারটা আসলে হয়েছিল...আমার প্লেন সবেমাত্র যখন ল্যান্ড করেছে, ঠিক সেইসময় উনিও এসে পৌঁছেছেন...ফলে বিমানবন্দরেই ওঁর দেখা পেয়ে গিয়েছিলাম...বলত ে পারেন ব্যাপারটা একেবারেই কাকতালীয়। জাস্ট আমার 'লাক' আমাকে ওই যুতসই সময়ে ওখানে হাজির করেছিল, যার জোরে আমি ওঁর একটা ছোট ইন্টারভিউও নিয়ে নিতে পেরেছি"। "...তো...আপনি হঠাৎ এই পোর্ট অফ প্রিন্সে এলেন'ই বা কেন? কোনো বিশেষ কারণ?" গাড়ির সিটে হেলান দিয়ে আরাম করে এবার বসল গ্রীন। বলল, "টেন্ট সিটি'তে ক'দিন আগে বেশ কয়েকটা খুন হয়েছে বলে খবর কানে এসেছে আমার। সেই ব্যাপারেই ইনভেস্টিগেশন করতে যাচ্ছি।" "....যেখানে এখন আপনি যাচ্ছেন, সেখানে তো এখন পাকা ঘরবাড়ি বলে কিছু নেই। শুধুই ত্রিপলের তাঁবু। পাবলিকেরও মন-মাথার ঠিক নেই। ওখানে খুন-জখম হরদম হয়ে থাকে। কেউই এখন ওখানে আর সুরক্ষিত নেই", সামনের উইন্ডস্ক্রিনের দিক থেকে চোখ না সরিয়েই বলল কোকো বার্নার্ড। "....জানি", অন্যমনস্কভাবে জবাব দিল গ্রীন, "কিন্তু ইদানীং যে হত্যাকান্ডগুলো ঘটেছে, সেগুলো অন্যরকম কেস। প্রথমে দুজন কিশোর...যাকে বলে ব্রুটালি মার্ডার করা হয়েছে ওদের। তারপর স্থানীয় একটি লোক'কে ওখানকার জনতা পিটিয়ে, গলায় ফাঁস লাগিয়ে মেরেই ফেলল। ওদের সন্দেহ, ওই লোকটাই নাকি ছেলেদুটোকে খুন করেছে"। এদিকে না তাকিয়েও আড়চোখে তাকিয়ে গ্রীন বুঝল, ওর কথায় কাঁধ ঝাঁকাল কোকো। বলল, "তাই আপনি যাচ্ছেন, ওখানে ব্যাপারটার কিনারা করতে?" তারপর এক মূহুর্ত চুপ করে থেকে বলল, "আপনি হয়তো শোনেননি, যেখানে এখন যাচ্ছেন, ওখানে পুলিশ ফোর্স প্রায় নেই বললেই চলে। ওখানে জনগন তাই প্রায়ই খেপে গিয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নেয়। কখনো সখনো পঞ্চায়েত বিচারের ভার নেয়। আইনের শাসনের অনেকটাই বাইরে ওরা। এটা শুধু এখন বলে নয়, ভূমিকম্পের আগেও ওখানে এরকম ব্যবস্থাই প্রচলিত ছিল"। "...কেন? এরকম অবস্থা কেন?" কৌতূহলী হয়ে উঠল গ্রীন। ফের কাঁধ ঝাঁকাল কোকো। বলল, "ওরা বরাবরই এরকম ছন্নছাড়া, বেপরোয়া জীবনযাপন করে। ওদের সরকার বা প্রশাসন বলে কোনওদিনই কিছু ছিল না। ওদের সমাজটা হলো অনেকটা প্রাচীন গ্রীসের সমাজব্যবস্থার মতো - অনেকগুলো ছোট-বড় স্বাধীন সম্প্রদায় একজায়গায় বসবাস করে এবং একটা কমন ল্যাঙ্গোয়েজে কথা বলে। কোনো অপরাধ সঙ্ঘটিত হলে জনতাই বিচার করে, জনতাই শাস্তি দেয়। আশা করি, আমি ব্যাপারটা আপনাকে বোঝাতে পারছি"। কোকো'র কথায় নিঃশব্দে মুচকে হাসল গ্রীন। বলল, "আপনি তো দেখছি, ইতিহাসের ব্যাপারেও অনেক জ্ঞান রাখেন"। কোকো'ও প্রত্যুত্তরে ওকে একইরকম নিঃশব্দ হাসি ফিরিয়ে দিয়ে বলল, " সবই আমার বাবার ইচ্ছায়। উনি চাইতেন, আমি আমার পড়াশোনার সাবজেক্টের বাইরেও অন্যান্য বিষয়ের ওপরেও খবরাখবর রাখি। কিন্তু একটা কথা জেনে রাখবেন, হাইতি এখনও একটা খুবই গরীব দেশ, বলতে পারেন একটা দূর্দশাগ্রস্ত দেশ। পশ্চিমী বিত্তশালী দেশগুলোর পাশে আমাদের এই হাইতির অবস্থা সত্যিই খুব করুণ। আপনাদের মতো ধনবান দেশের লোকেদের কাছে আমাদের দেশ একটা হাসির খোরাক ছাড়া আর কিছুই নয়"। কোকের শেষের কথাটায় তীব্র শ্লেষ আর অভিমান ঝরে পড়ল। গ্রীন অবশ্য একটুও বিচলিত হলো না। শান্ত স্বরেই বলল, "আমি বুঝছি আপনার কথাটা। এনিওয়ে, যা বলছিলাম...শুধু ওখানকার হত্যাকান্ডগুলোর খবর আমাকে এখানে টেনে আনে নি, যে কেসটা সবচেয়ে আমাকে অবাক করেছিল তা হলো, যে লোকটাকে ওরা পিটিয়ে, ফাঁস দিয়ে গাছে ঝুলিয়ে হত্যা করল, সেই লোকটা নাকি একটা ওয়্যারউলফ ছিল - মানে, স্থানীয় বাসিন্দাদের এমনটাই সন্দেহ। আর ওই ওয়্যারউলফ লোকটাই নাকি ওই ছেলেদুটোকে ওইভাবে মেরে খেয়েছিল"। স্টিয়ারিংয়ে হাত থাকলেও কোকো চকিতে একবার তাকাল পাশে বসা গ্রীনের দিকে। ওর দুচোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। বলল, "বুঝেছি। দ্য-রাউজের কথা বলতে চাইছেন তো? ওখানকার লোকরা ওয়্যারউলফকে এই নামেই ডাকে!" "....আপনিও তাহলে ঘটনাটা শুনেছেন?" গ্রীনের দু'চোখে বিস্ময় খেলা করতে লাগল। "...অবশ্যই...সে তো অবশ্যই শুনেছি", অদ্ভুত ঠাণ্ডা গলায় বলল কোকো। ওর দৃষ্টি এখন সামনের রাস্তার দিকে। দূরত্বকে গ্রাস করতে করতে তখন পূর্ণ গতিতে ছুটে চলেছে ওদের গাড়ি। "....কি মনে হয় আপনার কাছে ঘটনাটা?" ইচ্ছে করেই জানতে চাইল গ্রীন। "...গুজব....স্রেফ গুজব ছাড়া আর কিছুই নয়", গম্ভীর স্বরে বলল কোকো। "....তাহলে আপনি কি মনে করেন, আমার ওখানে ব্যাপারটার ইনভেস্টিগেট করতে যাওয়াটা খামোখা সময় নষ্ট হবে?" চকিতে ফের একবার গ্রীনের দিকে তাকিয়ে সামনের রাস্তার দিকে চেয়ে কোকো বলল, "অবশ্যই...অবশ্যই আমি মনে করি, ওখানে যাওয়া মানে সময় নষ্ট করা"। বাস্তবিকই গ্রীনের নিজেরও এতটুকু ইচ্ছে নেই, এইসব বুলশিট ব্যাপার নিয়ে খামোখা নিজেকে জড়িয়ে ফেলার। তবু বলল, "কেন বলুন তো, আপনি চাইছেন, আমার ওখানে না যাওয়াটাই বেটার হবে? আপনি কি ভয় পাচ্ছেন নাকি যে ওখানে আমি গেলে আমাকে ওয়্যারউলফ খেয়ে নেবে?" শেষের প্রশ্নটা হাসতে হাসতে মজার ছলে জিজ্ঞেস করল গ্রীন। "....মমমম...ঠিক সেই কারণে নয়", ওর দিকে একবার ঠাণ্ডা দৃষ্টিতে চেয়ে বলে উঠল কোক, "ওখানে ওয়্যারউলফকে দ্য-রাউজ নামে ডাকা হয়। এটা স্থানীয় ক্রিওল ভাষা। এর অর্থ 'লাল চোখ'। ফ্রেঞ্চ ভাষায় ওয়্যারউলফকে বলা হয় 'লুপ - গ্যারোইস'। আপনিও এই ফ্রেঞ্চ ওয়ার্ড'টাই ব্যবহার করতে পারেন"। "....কিন্তু আমি ওখানে যাই, ব্যাপারটার তদন্ত করি - সেটা কেন আপনার মনঃপূত নয়, সেটা তো বললেন না?" "....জানি না", কতকটা অধৈর্য হয়ে দায়সারাভাবে এড়িয়ে যেতে চাইল কোক, তারপরেই বলল, "হয়তো এই কারণে চাই না যে বাইরে থেকে একজন সাদা চামড়ার আমেরিকান এসে আমরা যে কতটা কুসংস্কারাচ্ছন্ন, সেটা জেনে যাক এবং বিশ্ববাসীকে বলে বেড়াক"। গ্রীন বলল, "এবার কিন্তু আপনি আমায় ভুল বুঝছেন, মিস বার্নার্ড"। "....আপনি কি জানেন যে, আমেরিকা বিগত বিশ বছর ধরে হাইতিকে নিজেদের কব্জায় রেখেছিল?" বলে উঠল কোকো। "...হ্যাঁ, জানি", কণ্ঠস্বর যতটা সম্ভব সংযত রেখে বলল গ্রীন। কোকো বলল, "খুব অপমানজনক অবস্থার মধ্য দিয়ে এই দেশটাকে চলতে হয়েছিল। এ'ও শুনেছিলাম, আমেরিকান সৈন্যরা এখান থেকে ফিরে যাবার পর নিজেদের দেশে গিয়ে আমাদের নিয়ে অদ্ভুত হাস্যকর সব কথা লিখে বই পাবলিশ করেছিল। লিখেছিল, আমরা নাকি ভুডু অর্থাৎ কালাযাদুবিদ্যা চর্চা করি"। এ কথায় কিছুক্ষণ চুপ করে রইল গ্রীন। তারপর বলল, "বেশ, এই প্রসঙ্গটা আপাতত বাদ দিন। তবে আমি আপনাকে কথা দিলাম, যদি আমি এদেশ নিয়ে কোনো নিউজ বা আর্টিকেল লিখিও, আপনাকে পড়ে শোনাব। আর যদি আপনার না-পসন্দ হয়, তাহলে সেই আর্টিকেল আমি পাবলিশই করব না"। গ্রীনের কথায় চোখ গোল গোল করে ওর দিকে তাকাল কোক। বলল, "আপনি কথা দিচ্ছেন?" কন্ঠস্বরে দৃঢ়তা ফুটিয়ে গ্রীন বলল, "জার্নালিজমে আমরা যা বলি, সিরিয়াসলি বলি"। "....আপনি আমাকে আর্টিকেল পড়ে শোনাবেন! পাবলিশ করার আগে!" যেন কল্পনা করতে পারছে না, এমন ভাব করে বলল কোকো। "...জ্বি..."। "...এ তো দারুণ অফার, মিঃ গ্রীন!" "....মিঃ গ্রীন নয়....বলুন, আশার...! আর আপনি নয়, এখন থেকে 'তুমি-তুমি' করে সম্বোধন করবে!" "...এ তো দারুণ অফার, আশার!" "...থ্যাঙ্কস", খুশি হয়ে উঠল আশার গ্রীন, বলল, "গতকাল এসে পৌঁছনো থেকে এখনও পর্যন্ত মোটামুটি একটা আর্টিকেল লেখার মতো রসদ পেয়ে গিয়েছি"। "....সেটা জানতে পারি?" সকৌতুকে বলে উঠল কোকো, "খুব কিউরিসিটি হচ্ছে "। "...বলছি, তবে প্রমিস, বাইরের কাউকে বলবে না?" "...প্রমিস, কাউকে বলব না!" ওর দিকে ডান হাত এগিয়ে দিল গ্রীন। কোকো'ও নিজের হাতখানি বাড়িয়ে দিল। ছোট্ট একটা করমর্দন সেরে নিলো নিজেদের মধ্যে। ইতিমধ্যে ওদের গাড়িটা পোর্ট অফ প্রিন্সের একেবারে কাছাকাছি চলে এলো আর তখনিই ভরপুর দিনের আলোয় জায়গাটাকে একেবারে স্পষ্ট, খুব কাছ থেকে দেখতে পেলো গ্রীন। আপনা থেকেই ওর মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো - "মাই গড! এ তো একেবারে একটা ধ্বংসস্তূপ! মনে হচ্ছে যেন মাত্র গতকালই হয়েছে ভূমিকম্পটা!" "....এখন তো একটু ভালো অবস্থায় দেখছ", বলল কোকো, "আগে তো আরও ভয়াবহ অবস্থায় ছিল। এখানে ধ্বংসস্তূপ ছাড়া আর কিছুই ছিল না। এখন আগের তুলনায় অনেকটা প্রগ্রেস হয়েছে এখানে"। "...এই-ই বুঝি তোমাদের গভর্নমেন্টের প্রগ্রেস?" ব্যঙ্গ ঝরে পড়ল গ্রীনের কন্ঠস্বরে, "একেই প্রগ্রেস বলে বুঝি?" "...তুমি তো জানো না, ভূমিকম্পের ফলে এই রাস্তাঘাট দশ ফুট মাটির তলায় বসে গিয়েছিল। গাড়ি চলাচলের যোগ্যই ছিল না এইসব রাস্তাঘাট"। "...তবুও একবছর কেটে যাবার পরেও এই অবস্থায় থাকা উচিত নয়, এতদিনে আরও আরও ডেভেলপ করার কথা ছিল!" গাড়িতে বসে গ্রীন তাকিয়েছিল জানলার বাইরের দিকে। সত্যিই, কে বলবে এটা একদিন আধুনিক একটা শহর ছিল! এখন বলতে গেলে ধ্বংসস্তূপ। না আছে একটাও আস্ত বাড়িঘর, না আছে নিকাশি নালা। নোংরা জল রাস্তায় বইছে। আসলে নিকাশি নালা বলেই কিছু নেই এখন। যে ক'টা বাড়ির ইমারত চোখে পড়ল ওর, সবগুলোর গায়েই ভূমিকম্পের নিষ্ঠুর আঘাতের ছাপ। ছাদ থেকে বাড়ির ভিত পর্যন্ত পুরো দেওয়াল জুড়ে নেমে গিয়েছে বড় বড় সুগভীর ফাটল। কোনওটার ছাদ ধ্বসে পড়েছে তো কোনওটার বারান্দা বলে কিছু নেই। কোনওটার আবার একপাশের দেওয়াল সম্পূর্ণ ধ্বসে গিয়ে ভেতরের বিম দেখা যাচ্ছে। বহুদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বাড়িগুলোর বাইরের দেয়ালের রঙ বলেও আর কিছু নেই। বৃষ্টি, রোদ আর তুষারপাত কেড়ে নিয়েছে ওদের যাবতীয় সৌন্দর্য। গোটা এলাকাটা জুড়ে শুধু ভয়াবহ ধ্বংসলীলার ছবি। আশ্চর্য হয়ে গেল গ্রীন। প্রাকৃতিক বিপর্যয় কেটে যাবার এক বছর কেটে গিয়েছে। দেশ-বিদেশ থেকে সাহায্যও কম আসেনি, তবু হাইতি এখনও ঠিকঠাকভাবে উঠেই দাঁড়াতে পারল না! যা অবস্থা, এ দেশ কবে জাগবে, তার কোনও ঠিক নেই। এক জায়গায় কতগুলো বাস আর ট্রাক'কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতে পেলো গ্রীন। গায়ে ওগুলোর লেখা 'নিউ জার্সি'। আরও একবার বিস্মিত হলো গ্রীন। নিউ জার্সির গাড়ি এখানে! তারপরেই বুঝতে পারল ব্যাপারটা। আমেরিকা ত্রাণসামগ্রী পাঠিয়েছে, এই গাড়িগুলো সেখান থেকেই এসেছে। জলপাই রঙের সামরিক পোশাক পরা বেশ কয়েকজন সেনা জওয়ানকেও দেখতে পেলো সে। সংখ্যায় ওরা মোট ছ'জন। ওদের কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ বা বসে। প্রত্যেকেই সশস্ত্র। পুরো শহরটাকে বেষ্টন করে আছে আদিম অরণ্যে ঢাকা উঁচু উঁচু পাহাড়। শহরের বাইরে যেদিকেই তাকাও, শুধুই পাহাড় আর পাহাড়। ওদের গাড়িটা ক্রমে সামনে উপত্যকার পথ ধরল। ক্যারিফোরের দিকে দ্রুত এগিয়ে চলল ওরা। এখানকার পথঘাটের পাশেও শুধুই ধ্বংসস্তূপ। কিন্তু তার মধ্যেও ত্রিপলের তাঁবু খাটিয়ে চলছে স্থানীয় লোকজনের দৈনন্দিন সাংসারিক কাজ। অভিভূত হয়ে গেল আশার গ্রীন। হাজারো ঝড়ঝাপটা সামলে চলছে মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই। কোথাও কোথাও পথের ধারে অস্থায়ী হাট বসেছে। সেখানে চলছে বিক্রিবাটার কাজ। এখানকার মানুষ সাধারণত ব্যাটারি, টিস্যুপেপার, মদ জাতীয় জিনিসই বেশী বিক্রি করে। পথে ওদের গাড়িটা ট্রাফিক সিগন্যালে থেমেছিল। এইসময় ইয়া ভারিক্কী চেহারার এক বয়স্কা মহিলা গ্রীনের জানলার পাশে এসে দাঁড়াল। গ্রীনের সঙ্গে ওর চোখাচোখি হতেই সেই মহিলা ফোকলা দাঁতগুলো বের করে বলল, "আম নেবেন, বাবু?" গ্রীন দেখল, মহিলাটির হাতে সত্যি সত্যিই এক ঝুড়ি আম। মহিলাকে।দেখে মায়া হলো গ্রীনের। ভূমিকম্পবিধ্বস্ত এলাকার গরীব মানুষ, একে সাহায্য করা দরকার। বলল, "দুটো আম দাও, দেখি"। কোকো বাধা দিল। বলল, "এখন কেনাকাটার সময় নয় একটু পরেই সিগন্যাল উঠে যাবে"। গ্রীন শুনল না। তড়িঘড়ি দুটো আম নিয়ে মহিলাকে দাম চুকিয়ে দিল নিমেষে। সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য বিক্রেতারাও তাদের বিভিন্ন পসরা নিয়ে ছুটে আসতে লাগল ওদের গাড়ির দিকে। তাড়াতাড়ি কাঁচ তুলে দিল গ্রীন। সিগন্যাল উঠে যেতেই গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে দিল কোকো। ক্রমে হাটের কোলাহল ছেড়ে ওদের গাড়িটা পাহাড়ের ওপর দিকে উঠতে লাগল। কোকো বলল, "এখানকার মানুষগুলো এখন বড্ড গরীব হয়ে পড়েছে। বিক্রিবাটা, ব্যবসা-বানিজ্য সবেতেই দৈন্যদশা চলছে। কে কিনবে এদের কাছ থেকে? ট্যুরিস্ট'ই আসে না,স্থানীয়রাও বেঁচে আছে বাইরে থেকে আসা ত্রানের ওপর। তাই আজ তোমাকে দেখে ওরা সবাই ছুটে এসেছে"। আশপাশের তাঁবু এবং গাছপালার সারি দ্রুত অপসৃত হচ্ছে পেছনের দিকে। পাহাডের কাছে গিয়ে রাস্তাটা দু'ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছে। বামদিকের গাছপালার সারির ফাঁক দিয়ে দূরে তাকালে চোখে পড়ে অনন্ত নীল জলরাশি। উদ্দাম হাওয়ায় চুল উড়ছে গ্রীনের। ভারী ভালো লাগছে সমুদ্রের লবণাক্ত বাতাসটা। তাঁবুর সারি, গাছপালা, সমুদ্র, পাহাড় দেখতে দেখতে একসময় গ্রীন দেখল, ওদের গাড়িটা এসে থেমেছে একটা ছোটখাটো জনপদের ভেতর। এখানেও সার সার তাঁবু। ভূমিকম্পপীড়িতদে র তাঁবু। "...এসো", গাড়ির এঞ্জিন বন্ধ করে চাবি পকেটে ভরতে ভরতে বলল কোকো, "এসে গিয়েছি আমরা"। গাড়ি থেকে ধুলোমাখা এবড়োখেবড়ো রাস্তায় নেমে এলো গ্রীন। ক্যামেরাটা বের করে পটাপট কয়েকটা ছবি তুলে নিল। পুরো এলাকাটাকে দেখে মনে হচ্ছে না, আগে এটা কোনো শহর ছিল। মনে হচ্ছে, এটা যেন কোনো উদ্বাস্তুদের জগতে চলে এসেছে ওরা। "....লেটস গো", ক্যামেরাটা পকেটে ঢোকাতে ঢোকাতে বলল গ্রীন, "এখানে এমন একজনকে খুঁজে বের করতে হবে, যে ওই ঘটনাটার ব্যাপারে পুরো ডিটেইলস বলতে পারবে"। "....বেশ, চলো আরও ভেতরে", বলল কোকো। ওরা এগোতে লাগল সার সার দাঁড়িয়ে থাকা তাঁবুগুলোর দিকে। গ্রীন দেখল, মোটেও ভুল কিছু বলেনি কোক। এই জনবসতির লোকজনের মধ্যে আইনশৃঙ্খলার অভাব আছে। ত্রিপল খাটিয়ে তাঁবু নির্মান করে যে অস্থায়ী সংসার পেতেছে, তাতেও যথেষ্ট ছন্নছাড়া ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যেন এরা শৃঙ্খলা কাকে বলে, জানেই না। হাইতির অধিবাসীদের ছন্নছাড়া জীবন দেখতে দেখতে গ্রীনের নিজের জীবনের একটা অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ে গেল। সাল তখন ১৯৯৪, সে তখন গ্রাজুয়েশন পড়ছে। সেইসময় কলেজের দুজন বন্ধুর সাথে সে নিউ ইয়র্কের উডস্টক নামে একটা পাহাড় ঘেরা অরণ্যে গিয়েছিল ক্যাম্পিং করতে। সেখানেও এরকমভাবেই তাঁবু খাটিয়ে ওরা দিনের পর দিন কাটাচ্ছিল। সাতদিন কাটিয়েছিল ওরা বনের মধ্যে, আর সেই সাতদিন ধরে সে কি নিদারুণ ঝড়বৃষ্টি। বলতে গেলে, ওরা সেইসময় বাস করছিল জল-কাদার মধ্যে। স্নান করার বা স্বাস্থ্যসম্মতভাবে প্রাকৃতিক কাজ সারার কোনো ব্যবস্থা ছিল না কোথাও। সে যেন এক নরকতুল্য অবস্থা চারদিকে। একটানা প্রাকৃতিক দূর্যোগের কারণে তাঁবু থেকে ওরা বের হতে পারেনি বেশ কয়েকদিন। এখানেও ঠিক একইরকম অবস্থা। কোথাও কোনো ছিরিছাঁদ নেই। যেমনি আগোছালো, তেমনি নোংরা। দূর্বিষহ জীবনযাত্রা এদের। কারোর কারোর ভাগ্যে আবার ত্রিপলটুকুও জোটেনি, বিছানার চাদর আর দড়িদড়া দিয়েই তাঁবু বানিয়েছে। আবার কেউ কেউ নিজেদের ট্রাক বা ছোট চারচাকার বাহনের ওপরেই সংসার পেতেছে। গাড়ির সিটগুলোকে ব্যবহার করছে শোয়া-বসার জন্য। পচা মাছ আর সব্জির পূতিগন্ধ ছড়াচ্ছে। সেইসঙ্গে আশপাশের নর্দমা থেকে মানুষের মলমূত্রের গন্ধ ভেসে আসছে। গ্রীন ঘুরে ঘুরে দেখছিল। "....অসহ্য দূর্গন্ধ!" কতকটা স্বগতোক্তি করার মতো করে বলল গ্রীন, "টয়লেট করার জন্য এরা বেছে নিয়েছে নর্দমাগুলোকে। আর সেই নর্দমাগুলোতেও জলের কোনো প্রবাহ নেই। অসহ্য, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ"। "....এরা খাবার এবং গৃহস্থালির কাজের জন্য জল কোথা থেকে পায়?" প্রশ্ন করল গ্রীন। "....পাহাড়ের ওইদিকে একটা ঝরনা আছে, সেখান থেকেই বয়ে নিয়ে আসে", বলল কোকো। একজন স্থানীয় মহিলাকে দেখা গেল দুটো ছোট ছোট ছেলে নিয়ে ইতিউতি ঘুরছে। গ্রীন তার নোটবুকে নোট করতে লাগল। মহিলাটির পরনে পোশাকের বালাই নেই। একটা গোলাপি লম্বাটে টপ আর কালো প্যান্ট। ত্রাণ হিসেবে পাওয়া পোশাক। কোকো এগিয়ে গিয়ে মহিলাটির সঙ্গে ক্রিওল ভাষায় কিছু কথা বলার চেষ্টা করতে লাগল। গ্রীনের মনে হলো, মহিলাটি যেন ওদের এড়িয়ে যাচ্ছে। একটা কথাই শুধু শোনা গেল - "জে-রাউজ"। সঙ্গে সঙ্গে কান খাড়া হয়ে উঠল গ্রীনের। গাড়িতে আসতে আসতে কোকো'র কাছ থেকে জেনেছে এই শব্দের অর্থ কি। ও দেখল, মহিলাটি অনবরত মাথা নাড়ছে আর মাঝেমাঝে দূর পাহাড়ের দিকে আঙুল দেখিয়ে কি যেন বোঝাতে চাইছে। গ্রীনের মনে কৌতূহল জমে উঠল। মহিলাটিকে অনুসরণ করে ওরা ওর তাঁবু পর্যন্ত এগিয়ে এলো। তাঁবু বলতে বেডশীট, কয়েকটা দড়ি আর কঞ্চির সাহায্যে খাটানো তাঁবু। আশেপাশে আরও কয়েকটা তাঁবু রয়েছে, দেখা গেল। যে বাচ্চা ছেলেদুটি মহিলাটির সঙ্গে সঙ্গে আসছিল, তারা কিরকম অদ্ভুত দৃষ্টিতে গ্রীনকে লক্ষ্য করতে লাগল। যেন এর আগে এরা বাইরের লোক দেখেনি। ওদের চোখেমুখে একটা অস্বস্তির ভাব ফুটে উঠেছিল। মহিলাটি তাঁবুর ভেতরে এসে ঢুকল। ধপ করে বসে পড়ল মাটির ওপর। যেন জীবনের সঙ্গে অনেক সংগ্রাম করে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে এখন সে। আশার গ্রীনের চোখে চোখ রেখে সে পরিষ্কার ইংরেজিতে বলল, "তুমি তো দেখছ, আমি কিভাবে বেঁচে আছি, তবে কেন এসেছ? " খারাপ লাগল গ্রীনের। বলল, "আমি...সরি..."। আস্তে আস্তে মহিলার ঘর থেকে বেরিয়ে এলো গ্রীন এবং কোকো - দুজনেই। বাইরে এসে কোকো বলল, "এরা সবাই সবকিছু জানে কিন্তু কেউ এখন এই ব্যাপারটা নিয়ে মুখ খুলতে রাজি নয়। যে ছেলেদুটোকে এখানে ব্রুটালি মার্ডার করা হয়েছিল, তাদের একজনের নাম ছিল ডেসপ্ল্যাট....পিয়ের ডেসপ্ল্যাট", বলেই একটা দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে সে বলল, "ওইখানে....ওইখানে থাকত ছেলেটা"। ওরা পাহাড়ে পথ ধরে ওপরের দিকে উঠতে লাগল। আকাশ নির্মেঘ থাকায় রোদের তেজটা বেশ বেড়েছে। ঘাম দেখা দিয়েছে গ্রীনের কপালে। ওরা যখন তাঁবুর সারিগুলোকে পেছনে ফেলে ওপরের দিকে উঠছিল, পেছন থেকে হঠাৎ সমবেত জনতার কণ্ঠস্বর শোনা গেল। কৌতূহলী গ্রীন ঘুরে তাকিয়ে দেখল, ওর দিকে আঙুল দেখিয়ে ওরা কি যেন বলছে নিজেদের মধ্যে। একটা শব্দ কানে এলো - "ব্ল্যাঙ্ক! ব্ল্যাঙ্ক!".. ক্রিওল ভাষা। "....ওরা কি বলছে? আমায় দেখিয়ে 'ব্ল্যাঙ্ক..ব্ল্যাঙ্ক' বলে কি বলতে চাইছে ওরা?" কোকো'কে জিজ্ঞেস করল সে। কোকো গ্রীনের আগে আগে চলেছিল। ওকে এখন অনেকটা যেন রিল্যাক্সড লাগছে। বলল, "ক্রিওল ভাষায় 'ব্ল্যাংক' কথাটার মানে 'সাদা চামড়া'। তোমাকে ওরা বলছে 'বহিরাগত শ্বেতাঙ্গ'। বিস্মিত গ্রীন আরও একবার ঘুরে তাকাল পেছনের 'ব্ল্যাংক... ব্ল্যাংক' বলে ডাকতে থাকা লোকগুলোর দিকে। অনেক তাঁবুর বাইরে রান্না চাপানো হয়েছে। কুণ্ডলী পাকিয়ে পাকিয়ে উঠছে ধোঁয়া। দেখতে দেখতে একসময় ওরা শহরের বাইরের দিকে চলে এলো। পাহাড় আর জনপদের মধ্যে কোনো সীমারেখা নেই। জনপদ যেখানে শেষ হয়েছে, তার পরেই শুরু হয়েছে অরণ্য। শুধু গাছ আর গাছ। গাছের সারি ধীরেধীরে উঠে গিয়েছে পাহাড়ের দিকে। চলার পথে কোকো সামনে যাকেই পাচ্ছিল, সবাইকে পিয়েরের ঘটনাটা নিয়ে জিজ্ঞেস করছিল কিন্তু গ্রীন লক্ষ্য করল, সবাই ওকে এড়িয়ে যাচ্ছে। পিয়েরের নাম শুনেই সবাই কিরকম যেন আঁতকে উঠে সরে যাচ্ছে। গ্রীন খেয়াল করেনি, একটি বারো-তেরো বছরের কিশোর ছেলে তখন থেকে ওদের লক্ষ্য করছে। সবচেয়ে আগে ছেলেটিকে লক্ষ্য করল কোকো। তারপর ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে গ্রীন। ছেলেটি গ্রীন'কে এতক্ষণ পায়ে পায়ে অনুসরণ করছিল। লোকজনের ভিড়ে গ্রীন সেটা টের পায়নি। কোকো'র চোখের ইশারায় গ্রীন ঘুরে তাকিয়েছিল পেছনে। "....হ্যালো!" ছেলেটির দিকে ঘুরে বলল গ্রীন। প্রত্যুত্তরে ছেলেটি ক্রিওল ভাষায় কি যেন বলল ওকে। বুঝতে না পেরে গ্রীন ঘুরে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলে তাকাল কোকো'র দিকে। কোকো তাকে ছেলেটির কথাগুলো ইংরেজিতে অনুবাদ করে দিতে গিয়ে বলল, "ও বলছে, ওর নাম টমাস। পিয়ের ডেসপ্ল্যাট - যে হপ্তা দুই আগে ব্রুটালি মার্ডার হয়েছিল এই পাহাড়ে, সেই পিয়ের ওর বন্ধু ছিল। টমাস বলছে, ও নাকি পিয়েরকে খুন হতে নিজের চক্ষে দেখেছে"। "....তাই নাকি?" কৌতূহলের পারদ দুশো ডিগ্রি ছাড়িয়ে গেল গ্রীনের। ছেলেটা বলে কি! ও স্বচক্ষে পিয়েরের খুন হওয়াটা দেখেছে! মুখে এবার তাই বলল, " তাহলে ও কি দেখেছিল যে ওই সিডাউ মার্চ্যান্ড পিয়ের'কে ওইভাবে সত্যি সত্যিই ব্রুটালি মার্ডার করছে?" বলতে বলতে ভিডিও ক্যামেরাটা অন করে দিল গ্রীন। রেকর্ডিং চলতে লাগল কোকো এবং থমাস নামক ছেলেটির কথোপকথনের। থমাসের কথাগুলো কোকো মাঝেমাঝে ইংরেজিতে অনুবাদ করে বলে দিতে লাগল আর গ্রীন তা রেকর্ড করতে লাগল। কোকো বলল, "থমাস বলছে, পিয়েরের হত্যাকান্ড সে নিজের চোখে দেখেছিল ঠিকই, কিন্তু এ'ও দেখেছে যে পিয়েরকে কোনো মানুষ খুন করেনি। অর্থাৎ খুনী কোনো মানুষ নয়"। "....আই সী" বলল গ্রীন, "এবার ওকে জিজ্ঞেস করো, ও একজ্যাক্ট কি কি দেখেছিল সেদিন?" থমাস তখন তার পুরো কাহিনীটা ক্রিওল ভাষায় বলতে লাগল আর কোকো তা ইংরেজিতে অনুবাদ করে গ্রীনকে শোনাতে লাগল। কাহিনীটা বলার শেষ হলে দেখা গেল, থমাস নামের ছেলেটার দু'চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। কোকো'র কাছ থেকে তার বলা কাহিনীর ইংরেজি ভার্সন থেকে যা জানা গেল, তা হলো - সেদিন পূর্ণিমার ভরা সন্ধ্যায় সে তাঁবুর বাইরে বেরিয়ে এদিকওদিক ঘুরছিল। নিছকই বেড়াচ্ছিল। সে জানত, রাতবিরেতে পথে বেরোনোটা তার পক্ষে বিপজ্জনক হতে পারে, তার মা জানতে পারলে খুবই বকাবকি করবে কিন্তু ঘরে থাকতে ওইদিন তার কিছুতেই ভালো লাগছিল না। বাইরে উজ্জ্বল চাঁদের আলোর বন্যায় কার আর ঘরের অন্ধকারে থাকতে ভালো লাগে! ঘুরতে ঘুরতে নিজের তাঁবু থেকে যখন অনেকটা দূরে চলে এসেছিল সে, তখনিই শুনতে পেলো একটা ভয়াবহ হাউলিং। চমকে উঠেছিল প্রথমটায় থমাস কিন্তু তখনো বুঝতে পারেনি ওটা কিসের গর্জন ছিল। আসলে এরকম গর্জন সে আগে কখনো শোনেইনি। অজানা একটা পশুর হাড়হিম করা গর্জন শুনে সে রীতিমতো ভয় পেয়ে গিয়েছিল। আর একলা বাইরে থাকতে সাহসে কুলোয়নি ওর। দৌড় লাগিয়েছিল নিজের তাঁবুর দিকে কিন্তু তখনিই ওর কানে এসেছিল একটি কিশোর কন্ঠের কাতর মরণ আর্তনাদ। কি করছে তা না বুঝেই নিছক কৌতূহলবশে পেছন ফিরে তাকিয়েছিল সে আর তখনিই দেখল, কয়েক দূরে পাহাড়ের ওপরে বনের ভেতর থেকে ভয়ার্ত গলায় চিৎকার করতে করতে বেরিয়ে আসছে পিয়ের। আর ওর পেছনে তাড়া করে বেরিয়ে এসেছে প্রকাণ্ড একটা চারপেয়ে জন্তু। সেদিনটা পূর্ণিমা থাকায় সবকিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। চারপেয়ে অতিকায় জন্তুটা আকারে আয়তনে একটা পাহাড়ের মতোই বিশাল। ছুটছিলও অস্বাভাবিক দ্রুততায়। দূর থেকে হলেও থমাস দেখতে পেয়েছিল, জন্তুটার সর্বাঙ্গ ধূসর আর সাদা লোমে ঢাকা। যেটা বুকের ভেতরে রীতিমতো আতঙ্ক সৃষ্টি করে, তা ছিল ওটার চোখদুটো। টকটকে লাল আগুনের মতো চোখ ওটার। যেন বয়লারের লাল গনগনে আগুনের দুটো স্ফুলিঙ্গ। দূর থেকেই ওই চোখদুটো থেকেই থমাসের নাড়ি ছেড়ে গিয়েছিল। তারপর ওর হতভম্ব চোখের সামনেই অজানা জন্তুটা তার সেই পাহাড়ের মতো বিশাল দেহটা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল পিয়েরের ওপর। শোনা গেল, ওর বন্ধুর গলায় মরণ আর্তনাদ। দূর থেকে থমাসের শুধু কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে দেখা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। ওর চোখের সামনেই জন্তুটা ওর বন্ধুকে খেতে লাগল। কতক্ষণ যে স্থবিরের মতো দাঁড়িয়ে ওই ভয়াবহ দৃশ্য প্রত্যক্ষ করছিল, থমাস নিজেও জানে না। একসময় সম্বিৎ ফিরতে চোঁচা ছুট লাগিয়েছিল নিজের ক্যাম্পের দিকে। ....এক নিশ্বাসে থমাসের কাহিনীটা ইংরেজিতে তর্জমা করে শোনাল কোকো। থমাসকে দেখা গেল সে দু হাতে মাথা চেপে ধরে মাটিতে বসে পড়েছে যেন ওই ভয়াবহ দৃশ্যটা এখনো ও নিজের চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে। কোকো এগিয়ে গেল ছেলেটার কাছে, নিচু হয়ে ওর কানে কানে কিছু একটা যেন বলতে লাগল। বোধহয় ওকে সমবেদনা জানাতে লাগল। গ্রীন এতক্ষণ পুরো কাহিনীটা ভিডিও রেকর্ডিং করছিল। এবার ক্যামেরাটা অফ করে পকেট থেকে কড়কড়ে পাঁচ ডলার বের করে ধরিয়ে দিল ছেলেটার হাতে। ছেলেটার মনের যন্ত্রণা ওকেও স্পর্শ করেছে কিন্তু সমবেদনা জানানোর ভাষা ওর কাছে নেই। থমাস কাঁপা কাঁপা হাতে গ্রীনের হাত থেকে টাকাটা নিলো, নিচু গলায় ওকে একটা শুকনো ধন্যবাদ জানিয়ে চোখের নিমেষে ছুটে কোথায় চলে গেল। লোকজনের ভিড়ে মিশে গেল। "....কাম অন", বলল গ্রীন, "এখান থেকে এবার চলো"। ওরা আবার হাঁটা লাগাল। সেই তাঁবুর সারিগুলোর মাঝখান দিয়ে ওরা ধীরেসুস্থে এগোতে লাগল কোকো'র গাড়ির দিকে। আসবার সময় চড়াই বেয়ে হাঁটতে যেরকম বেগ পেতে হচ্ছিল, ফেরার সময় উতরাই বেয়ে নামার সময় ঠিক ততখানিই আয়েশি লাগছিল। তাঁবুর লোকগুলো তখনও সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়েছিল গ্রীনের দিকে। কোকো আগে আগে এগিয়ে যাচ্ছিল, গ্রীন ওর পেছনে। হাঁটতে হাঁটতে কোকো হঠাৎ কাঁধের ওপর দিয়ে পেছনে ওর দিকে চেয়ে বলল, "কি মনে হচ্ছে তোমার, সব দেখেশুনে? " "....কোন ব্যাপারটার কথা বলতে চাইছ ? ওই ছেলেটা যা বলল, সেই ব্যাপারে?" কাঁধ ঝাঁকাল কোকো। গ্রীন বলল, "ভাবছি, যদি ও মিথ্যে কথা বলে থাকে, যদি ওর পুরো কাহিনীটা একটা বানাওট কাহিনী হয়, তাহলে মানতেই হবে, এই বয়সেই ছেলেটা বিশ্বের বিখ্যাত চাইল্ড-অ্যাক্টর"। "....তাহলে কি তুমি ওর কথা বিশ্বাস করলে?" মাটির দিকে চেয়ে এক মূহুর্ত চুপ করে রইল গ্রীন। তারপর বলল, "এখনই বিশ্বাস অবিশ্বাসের প্রশ্ন আসছে না। আমি এখন ওর surrounding টা নিয়ে ভাবছি। মনে করো, তুমি একটা ছোট্ট ছেলে। বরাতজোরে প্রকৃতির রোষ থেকে কোনও গতিকে বেঁচে গিয়েছ। তোমার বাড়ি-ঘর সবকিছু ধ্বংস হয়ে গিয়েছে এবং তোমার পরিচিত প্রচুর লোক মারা গিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই, তোমার মনের ওপর একটা চাপ এসে পড়বে। একটা বিরূপ প্রভাব পড়বে তোমার মনের ওপর। এই অবস্থায়, এক রাতে তোমার চোখের সামনে একটা ভয়াবহ ঘটনা ঘটতে দেখলে। দেখলে, এক বুড়ো বদ্ধ উন্মাদ টাইপের লোক তোমার প্রিয় বন্ধুকে মেরে ফেলল। নৃশংসভাবে। তাতে তোমার মনের মধ্যে আরও চাপ পড়ল। এছাড়া, তুমি বড় হয়েছ এমন একটা সমাজে, যেখানে প্রায় প্রতিটি লোক ওয়্যারউলফের অস্তিত্বে বিশ্বাস করে। তোমার চোখের সামনে এরপর তারা সেই বদ্ধোন্মাদ লোকটিকে 'ওয়্যারউলফ' সাব্যস্ত করে পিটিয়ে, গলায় ফাঁস দিয়ে মেরে ফেলল। তোমার সামনে, পেছনে, আশেপাশে সবাই বলাবলি করতে লাগল যে লোকটি একটি ওয়্যারউলফ ছিল। তুমি শুনলে, তোমার বন্ধুকে কোনো মানুষ হত্যা করেনি, হত্যা করেছে একটি ওয়্যারউলফ। স্বাভাবিকভাবেই, তুমিও সেটাই বিশ্বাস করে নেবে। তুমি যুক্তি দিয়ে কোনওকিছু বিচার করতে পারবে না। তোমার চোখের সামনে, তোমার মনের মধ্যে অবচেতনভাবে ওটাই ঘুরতে থাকবে যে একটি ওয়্যারউলফ তোমার বন্ধুকে হত্যা করছে। এদিকে হয়তো আদৌ তুমি চোখের সামনে কোনো ওয়্যারউলফ দেখোইনি। এই হচ্ছে ঘটনাটা"। "....আমি জানতে চাইছি, তুমি কি ভাবছ?" জিজ্ঞেস করল কোকো, "মানে সব দেখেশুনে তোমার মত কি?" "....এই যে...যা বললাম। এখানে ওয়্যারউলফের আতঙ্ক সৃষ্টি হবার পেছনে, ওয়্যারউলফ কর্তৃক নরহত্যা সঙ্ঘটিত হবার কাহিনী গড়ে ওঠার পেছনে অবচেতনভাবে এখানকার লোকের একটা অন্ধবিশ্বাস কাজ করছে। থমাস ছেলেটিও একই পরিস্থিতির শিকার"। কোকো ফের একবার বিশেষ গভীর দৃষ্টিতে সরাসরি তাকাল গ্রীনের দিকে। মনে মনে কি ভাবল, তা ও-ই জানে। তারপর শুধু বলল, "বেশ"। গাড়ির কাছে ফিরে এলো দুজনে। "...যাক, গাড়িটা ঠিক জায়গাতেই আছে দেখছি", বলল গ্রীন। "....তা থাকবে না কেন?" পকেট থেকে চাবি বের করে গাড়ির দরজা খুলতে খুলতে গম্ভীরমুখে বলল কোকো, "তুমি কি মনে করো, এখানকার সব লোক গুন্ডা-বদমাশ?" "...ইয়ে...মানে...আমি ঠিক তা বলতে চাইনি...." আমতা আমতা করে সাফাই গাইবার সুরে বলতে চেষ্টা করল গ্রীন। "...এনিওয়ে", বলল কোকো, "তুমি এখানকার আরও কিছু জায়গা ঘুরে দেখতে চাও?" "....অবশ্যই চাই", প্যাসেঞ্জার সিটের দরজা খুলে ততক্ষণে গাড়িতে উঠে বসেছে গ্রীন। ও উঠে বসামাত্র গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে দিল কোকো। ফের বিধ্বস্ত শহরটার এবড়োখেবড়ো বুকের ওপর দিয়ে ছুটতে লাগল ওদের গাড়ি। এবার ওদের গাড়িটা এসে থামল বিশাল একটা ফুটবল মাঠের সামনে। কোকোর কাছে গ্রীন শুনল, আগে এই মাঠে রোজ বিকেলে খেলাধুলোর আসর বসত। বাতাসটা এখানে বড্ড বেশী ঠাণ্ডা আর জোরালো। সময়টা এখন বিকেল। তাই দুপুরের সেই গরম ভাবটা এখন আর নেই। নীল আকাশের দিগন্তে অস্ত যাচ্ছে সারাদিনের কর্মক্লান্ত সূর্যটা। নিচে দূরে মাঠের মাঝখানে নীল-লাল জার্সি গায়ে কয়েকজন যুবক ছেলে ফুটবল খেলায় মত্ত। গ্রীন বা কোকোর দিকে ওদের দৃকপাত নেই। গাড়ি থেকে নেমে ওরা পায়ে পায়ে এগোতে লাগল মাঠের দিকে। ছেলেগুলোর দিকে যত এগোতে লাগল, একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করে গ্রীনের বিস্ময়ের সীমা রইল না। দেখল, ছেলেগুলোর সবার একটা করে পা অদৃশ্য। অর্থাৎ, কারোরই স্বাভাবিক মানুষের মতো দুটো পা নেই। কারোর ডান পা নেই তো কারোর বাম পা নেই। কারোর কারোর আবার ডান বা বাম হাতের মধ্যে যে কোনও একটা হাত নেই। মোট কথা, শারীরিক দিক থেকে প্রত্যেকেই বিকলাঙ্গ। তবু ক্রাচে ভর দিয়ে এক হাতে এবং এক পায়ে ফুটবল খেলছে ওরা। মোট বিস্ময়ে সেদিকে চেয়ে রইল গ্রীন। "....এটাই রিয়েল হাইতি!" একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল কোকো, "এরা সবাই একদিন মেসি-মারাদোনার মতো পেশাদার ফুটবল খেলে বিশ্বকে চমকে দেবার স্বপ্ন দেখত। কিন্তু এদের স্বপ্ন স্বপ্ন হয়েই থেকে গেছে। প্রাকৃতিক দূর্যোগ এদের প্রাণ কেড়ে নিতে পারেনি ঠিকই কিন্তু এদের সারাজীবনের মতো অঙ্গহানি করে গেছে। কিন্তু তবুও এরা ভেঙে পড়েনি। এদের ঘরবাড়ি বলে আর কিচ্ছু নেই, তবু দাঁতে দাঁত চেপে জীবনসংগ্রামে টিকে আছে। এই-ই হলো আমাদের হাইতিয়ান'দের বৈশিষ্ট্য। আমরা হাজারো দূর্যোগেও মাথা নত করি না। যতক্ষণ প্রাণ আছে, মাথা উঁচু করে বাঁচব - এটাই আমাদের জীবনের মূলমন্ত্র। তাই আমরা মনে করি, আমরাই বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষ"। "....সত্যিই!" আপনা থেকেই গ্রীনের মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো কথাটা, "সত্যিই আমি মুগ্ধ!" শুধু তরুণরাই নয়, মাঠের অন্যদিকে দেখা গেল একদল কচিকাঁচাও মহানন্দে ফুটবল খেলতে ব্যস্ত। ওদের প্রত্যেকেরই বয়স আট থেকে দশের মধ্যে। ওদের থেকে আরও কিছুটা দূরে কয়েকজন দম্পতি বসে নিজেদের মধ্যে গল্পগুজব করছে। তাঁরা বোধহয় ওই কচিকাঁচাদেরই গার্জেন। ওরা লক্ষ্য রাখছে ছেলেমেয়েদের ওপর, পাছে কেউ খেলতে গিয়ে আহত হয়। মোটামুটি একটা ছন্দে চলছে জীবনযাত্রা। "...চলো, এবার কোনো রেস্তোরাঁয় গিয়ে কিছু খেয়ে নেওয়া যাক", প্রস্তাব দিল কোকো। "...এখানে রেস্তোরাঁ কোথায়?" "....আছে আমার চেনা একটা ভালো জায়গা আছে। অনেকটা দূর এখান থেকে। যাবে তো উঠে পড়ো গাড়িতে"। "....বেশ, চলো"। দুজনে ফের গিয়ে উঠে বসল গাড়িতে। পোর্ট অফ প্রিন্সের দিকে ফুল স্পিডে গাড়ি ছুটিয়ে দিল কোকো। হাইতি সত্যিই এখন একটা ধ্বংসপ্রাপ্ত শহর। জায়গায় জায়গায় কংক্রিটের স্তুপ শহরটাকে একটা কুৎসিত চেহারায় এনে ফেলেছে। এগুলোর কোনটা যে বাড়ি ছিল, কোনটা যে অফিস ছিল আর কোনটা যে রেস্তোরাঁ ছিল, তা আজ আর বোঝার উপায় নেই। তবু তারই মাঝেমাঝে অস্থায়ী কিয়স্ক বানিয়ে চলছে কেনাকাটার কাজ। মানুষের দৈনন্দিন জীবনধারণ চলছে যথা নিয়মমাফিক। যতক্ষণ মানুষ জীবিত আছে, তার অভাববোধ থাকবে। হাজারো দূর্দশার মধ্যেও সে খুঁজে নেবে একটু আমোদ তাই দেখা যাচ্ছে বেশ কিছু জায়গায় গোল হয়ে দাঁড়িয়ে স্থানীয় লোকজন 'রুলেট' ( এক ধরনের জুয়া) খেলছে। কোকো'র গাড়ি দ্রুত শহরটাকে পেছনে ফেলে বেরিয়ে এলো বাইরে, তারপর অন্যদিকের পাহাড়ে পথ ধরে উঠতে লাগল ওপরের দিকে। গ্রীন দেখল, এদিকের পথঘাট বেশ দৃষ্টিনন্দন। গাড়ির চাকার এগিয়ে চলার সঙ্গে সঙ্গে দু'পাশ দিয়ে তালগাছের সারি দ্রুত অপসৃত হচ্ছে পেছন দিকে। কিছুদূর যাওয়ার পরই রেস্তোরাঁ, নাইটক্লাব এবং আর্ট গ্যালারির মতো শৌখিন ঠিকানার দেখা মিলল। "...বাঃ! " মনে মনে স্বগতোক্তি করল গ্রীন, "এখানে দেখছি অনেকটাই গুছিয়ে নিয়েছে এখানকার মানুষ! কে বলবে, এইমাত্র পেছনে একটা মৃতপ্রায় শহরকে ফেলে এসেছি!"। তারপর পাশে বসা কোকো'কে জিজ্ঞেস করল, "আচ্ছা, এটা কোন জায়গা?...আমরা এখন কোথায়?" "....পেশনভিলে", জবাবে বলল কোকো, "আর এদিকে যে পাহাড়টা দেখছেন, এই পাহাড়টা হলো হাইতির 'বেভারলি হিল'.."। "....ভারী সুন্দর!" বলল গ্রীন, "পর্যটকদের জন্য এটা একটা আদর্শ জায়গা বটে!" "....এই জায়গাটা বরাবরই পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয়য়", উইন্ডস্ক্রিনের দিক থেকে চোখ না সরিয়েই বলল কোকো, "ট্যুরিজমের সাথে এই জায়গাটার বরাবরই একটা ভালো সম্পর্ক আছে। আগে এই জায়গাটা আরও ঝাঁ চকচকে,বলতে পারো দারুণ একটা মনোলোভা জায়গা ছিল। তারপর ক্ষমতা দখলের জন্য দেশে একটা সামরিক অভ্যুত্থান হলো, আগের সরকার পড়ে গেল, ট্যুরিস্টদের কাছেও এই জায়গার আকর্ষণ ফুরিয়ে গেল। ওদিকে, অন্যান্য অনেক সুন্দর সুন্দর দ্বীপ গড়ে উঠল, লোকে আমাদের এই দ্বীপটার কথা ভুলেই গেল। আর তারপর গত বছর ওই ভূমিকম্প....." এই পর্যন্ত বলে থেমে গেল কোকো। বাকিটুকু ইশারায় বুঝিয়ে দিল। গ্রীন মনোযোগ দিয়ে শুনছিল মেয়েটার কথাগুলো। একটু চুপ করে থেকে কোকো ফের বলল, "এখানকার সমস্যা যেটা, তুমি যদি এখান থেকে সী-বিচে যেতে চাও, তোমাকে অনেক হয়রানি পোহাতে হবে। আবার সী-বিচ থেকে পেশনভিলে'তে ফেরার সময় একইরকম হয়রানির শিকার হতে হবে তোমায়। এটাই এই জায়গার প্রধান সমস্যা। এইজন্যই ট্যুরিস্টরা এদিকটা বড় একটা মাড়ায় না, অন্যান্য ক্যারিবিয়ান আইল্যান্ডগুলোতে যায়। তবু তুমি যদি সী-বিচটায় ঘুরতে আগ্রহী থাকো, তাহলে তোমাকে আমি আর্কেডিয়ান কোস্ট সহ সী-বিচ রিসর্টগুলো ঘুরিয়ে দেখাতে পারি।" "....ইচ্ছে আছে, অবশ্যই ইচ্ছে আছে আমার"। কথায় কথায় মাঝারি একটা দোতলা বাড়ির সামনে গাড়ি দাঁড় করিয়ে দিল কোকো। গ্রীনকে ইশারায় বলল, নেমে আসতে। গাড়ির এঞ্জিন বন্ধ করে নেমে এলো কোকো। ওকে অনুসরণ করে গ্রীন। বাড়ির ভেতর পা দিতেই গ্রীন বুঝল, এটা রেস্তোরাঁ নয়। এটা একটা বাড়ি। প্রথমেই একটা বৈঠকখানা আর সেই বৈঠকখানায় বসে টেলিভিশন দেখছে একজন বয়স্ক ভদ্রলোক। "...বাবা!" ভদ্রলোককে উদ্দেশ্য করে ডেকে উঠল কোকো, "দেখো, আমার বন্ধু, আশার গ্রীন। আমেরিকান জার্নালিস্ট"। বৃদ্ধ লোকটি উঠে দাঁড়িয়ে খুশি হয়ে গ্রীনকে সাদর আমন্ত্রণ জানালেন। তার সাথে করমর্দন করে বললেন, "তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে ভালো লাগল। আমি গ্যাস্টন বার্নার্ড। আমার বাড়িতে তোমায় স্বাগত"। অত:পর চলল বার্নার্ড দম্পতির সঙ্গে আশার গ্রীনের জমিয়ে সান্ধ্য আড্ডা। এরই ফাঁকে মিসেস বার্নার্ড, অর্থাৎ কোকো'র মা রাতের ডিনার পরিবেশন করলেন। খাসির রেজালা, বিশেষ এক ধরনের সিদ্ধ সুস্বাদু সব্জি আর ফ্রায়েড রাইস দিয়ে ডিনারটা দারুণ জমল গ্রীনের। ডিনার চলাকালীন কোকো'র বাবা মিঃ বার্নার্ড বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে লাগলেন। রাজনীতি থেকে শুরু করে ভূমিকম্প, হাইতির ইতিহাস - কোনওকিছুই বাদ গেল না। ডিনারের পর আর এক মূহুর্তও অপেক্ষা করল না গ্রীন। এমনিতেই অনেক রাত হয়ে গেছে, হোটেলে ফিরতে কত রাত হবে কোনও ঠিক নেই। সে ফেরার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ল। বার্নার্ড দম্পতি তাকে বারবার অনুরোধ করতে লাগলেন, আমেরিকা ফিরে যাবার আগে গ্রীন আরও একবার যেন এসে ওঁদের সাথে ডিনার খেয়ে যায়। গ্রীন ওঁদের নিরাশ করল না। সে কথা দিল, আমেরিকা ফেরার আগে সে অবশ্যই এ বাড়িতে আরও একবার পায়ের ধুলো দেবে। .....যখন নিজের হোটেলে ফিরে এলো গ্রীন, তখন রাত আরও বেড়েছে। কোকো ওকে ভাগ্যিস গাড়িতে পৌঁছে দিয়েছে, নইলে বিপর্যয় থেকে সবে উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করছে একটা যে শহর, সেখানে এত রাতে হোটেলে ফেরাটা বেশ ঝকমারি হয়ে যেত। হোটেলের ফটকের বাইরে যখন কোকোর গাড়িটা এসে থামল, অনেক দেখা গেল হাতে রীতিমতো 'আর্মস' নিয়ে টহল দিচ্ছে ফটকের রক্ষীদুজন। আশপাশের বাগানের ভেতর থেকে ভেসে আসছে ঝিঁঝিঁপোকা এবং অন্যান্য নিশাচর প্রাণীদের একটানা ডাক। নাকে আসছে গোলাপ আর জুঁইফুলের মনমাতানো সুগন্ধ। আজকের রাতটা পূর্ণিমা। আকাশে দেখা গেল গোল থালার মতো চাঁদ উঠেছে। কোকো'কে আজকের ট্রিপের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে ওকে গুডবাই জানাল গ্রীন। তারপর হাঁটা লাগাল হোটেলের দিকে। সারাটা দিন কোথা দিয়ে কেটে গেল তা নিজেও জানল না গ্রীন। যেন ঝড়ের মতো কেটে গেল দিনটা। চাঁদের আলোয় দুধে ধোয়া হোটেলের বারান্দায় বেতের চেয়ার পেতে অনেককেই বসে থাকতে দেখতে পেলো। ভেতরে বারে সম্ভবত মৃদু লয়ে মিউজিক বাজছে। নিজের ঘরের দিকে গেল না গ্রীন, গেল বারের দিকে। লবির কাঠের মেঝেয় ওর পায়ের ভারী এবং চাপা শব্দ উঠল। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল বাররুমের দিকে। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই কান ফাটানো মিউজিক ওর দু'কানের পর্দা যেন ফাটিয়ে দিল। বারের ভেতর এসে একটা সোফায় গা এলিয়ে দিল গ্রীন। মিনিট কয়েকের মধ্যেই গানের সুরে তন্ময় হয়ে গেল। জিমি বাফেট গান গাইছেন। জিমি বাফেট একজন বিখ্যাত পপতারকা এবং এই হোটেলে তিনি প্রায়ই সঙ্গীত পরিবেশন করেন। এখানে তাঁর নামে একটা সুইট পর্যন্ত আছে। ইতিমধ্যে বারের ওয়েটার এসে তার কাছে জানতে চাইল, কিছু ড্রিঙ্কস নেবে কিনা। এক গ্লাস রামে'র অর্ডার দিল গ্রীন। মাথা হেলিয়ে ওয়েটার চলে গেল। "...আপনি বুঝি NGO থেকে এসেছেন?" আচমকা পাশ থেকে একটা ভারিক্কী কণ্ঠস্বর কানে আসতে চমকে সেদিকে তাকিয়ে গ্রীন দেখল, হাওয়াই শার্ট পরা সাদা চুলের একজন লোক ওর পাশের সোফায় বসে আছে। লোকটির নজর এদিকেই। "...জ্বি না, আমি প্রেস থেকে এসেছি", মূহুর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল আশার গ্রীন। "....আমিও", জবাবে এবার বলল লোকটি। মূহুর্তে দুজনের মধ্যে পরিচয় জমে উঠল এবং দুজনেই যে এখানে ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হিসেবে এসেছে - এই তথ্যটাও দুজনের কাছে আর গোপন রইল না। লোকটির সাথে সৌজন্যমূলক কথাবার্তা সেরে গ্রীন রামে'র গ্লাস খালি করে হাঁটা দিল নিজের ঘরের দিকে। আর বেশী রাত পর্যন্ত জেগে থাকা ঠিক হবে না। এখুনি ঘরে গিয়ে তাকে আজকের ট্রিপ'টা নিয়ে বিস্তারিত একটা রিপোর্ট লিখে সেটা ই-মেলে অফিসের এডিটরকে পাঠাতে হবে। নিজের ঘরে গিয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় কাজ সেরে নিজের iPad টা নিয়ে বসল গ্রীন। iBooks এ গিয়ে ওয়্যারউলফ নিয়ে তথ্যানুসন্ধান করতে লাগল। মনে মনে একটা ব্যাপার তাকে বড়ই ভাবিয়ে তুলেছে। কেন হাইতিতে ওয়্যারউলফ নিয়ে মানুষের মনে এত বিশ্বাস আর এত ভয়? হাইতিতে যেখানে ওয়্যারউলফ কেন, সাধারণ নেকড়েরও দেখা মেলে না, সেখানে এখানকার লোকের মনে ওয়্যারউলফের অস্তিত্ব নিয়ে এত দৃঢ় বিশ্বাস কি করে হলো? এই দেশে কোনওদিন কোনওকালে একটা সাধারণ নেকড়েও দেখা যায়নি। আচ্ছা, ওয়্যারউলফ'টাই বা কি? ভ্যাম্পায়ার বা রক্তচোষা পিশাচের মতো এই ওয়্যারউলফ বা নর-বৃকের অস্তিত্ব নিয়ে ধারণাটিও মানুষের মনের অন্ধবিশ্বাস ছাড়া কিছুই নয়। সাবিনা বেয়ারিং গুড, যিনি একাধারে একজন anglican যাজক এবং সাহিত্যিক ছিলেন, তিনি তাঁর ওয়্যারউলফের ওপর লেখা একটা বইয়ে 'লাইক্যানথ্রপি' বা 'কালাবিদ্যা' নিয়ে অনেক চর্চা করেছেন। লাইক্যানথ্রপি হলো এমন এক ডাকিনী বিদ্যা, যার সাহায্যে মানুষ পশুতে রূপান্তরিত হয়ে যায়। মধ্যযুগে এই নেকড়ে-মানুষ নিয়ে মানুষের মনে আতঙ্ক এবং বিশ্বাস একটা 'প্যানিক' হিসেবে দেখা দিয়েছিল। শুধু তাই নয়, হাজার হাজার মানুষকে সেই যুগে নর-বৃক সন্দেহ করে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যাও করা হয়েছিল। দুঃখজনক ব্যাপার হলো, এখনও সেই অন্ধবিশ্বাস মানুষের মনে বিদ্যমান। সংখ্যাটা নেহাত অল্প হলেও তা বিদ্যমান। কিন্তু এই ওয়্যারউলফ বা নর-বৃক'র প্রকৃত সংজ্ঞাটা যে কি, এ সম্পর্কে কোথাও কোনো সুস্পষ্ট ধারণা নেই। আচ্ছা, এই ওয়্যারউলফ আসলে দেখতে কেমন হয়? পুরোপুরি একটা নেকড়ের মতো, নাকি মানুষের মতো নাকি উভয়ের সংমিশ্রণে উদ্ভূত একটা কিম্ভুত জন্তু'র মতো? ওয়্যারউলফ নিয়ে অনেকপ্রকার গল্প অবশ্য বাজারে চালু আছে। অনেক মুভিও তৈরি হয়েছে। কোথাও কোথাও বলা হয়েছে, এরা দেখতে নেকড়ে হলেও মানুষের মতো পেছনের দুই পায়ে ভর দিয়ে হাঁটে এবং চলাফেরা,জ্ঞানবুদ্ধি হুবহু মানুষের মতোই হয়। তবে সিনেমা এবং গল্প-উপন্যাস - দু জায়গাতেই অনেক ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, ডাকিনীবিদ্যা চর্চার মাধ্যমে মানুষ হিংস্র নেকড়েতে পরিণত হয়। নেকড়েতে পরিণত হয়ে তার সর্বাঙ্গে গজিয়ে ওঠে বড় বড় লোম, তখন তার একমাত্র খাদ্য মানুষ বা যে কোনো প্রাণীর মাংস। এই ওয়্যারউলফ বা নর-বৃক নিয়ে ধারণার সর্বপ্রথম উন্মেষ হয়েছিল ফ্রান্সে। ওঃ, কোথায় সেই সুদূর ফ্রান্স আর কোথায় এই হাইতি! সাত সমুদ্র তেরো নদীর পারের দেশের ভাবনা এই দেশেও শেষপর্যন্ত বিস্তারলাভ করল! ভাবনায় পড়ে গেল।আশার গ্রীন। মধ্যযুগে ফ্রান্সে ওয়্যারউলফ নিয়ে বিস্তর উন্মাদনা ছিল। এখনো গ্রামাঞ্চলের দিকের মানুষ এইসব অন্ধবিশ্বাস চরম সত্য বলে বিশ্বাস করে। এই হাইতি...হ্যাঁ, এই হাইতি একদা ফ্রান্সের শাসনাধীনে ছিল। ফ্রান্সের শাসনাধীনে হাইতি এবং সেইন্ট ডোমিং বিশ্বের সবচেয়ে ধনী উপনিবেশগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল। কিন্তু ফ্রান্স এইসব উপনিবেশ শাসন করত খুব নিষ্ঠুরতার সঙ্গে। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এখানকার স্থানীয় শ্রমিকদের সঙ্গে ফ্রান্স ববর্বরোচিত আচরণ করত। তাদের অত্যাচারে দলে দলে শ্রমিক মারা পড়তে শুরু করেছিল। ফলে, শ্রমিকের অভাব দেখা দিলে ফ্রান্স সরকার পশ্চিম আফ্রিকা থেকে ক্রীতদাস আমদানি করতে থাকে....' এই পর্যন্ত লেখাপড়া করেই সজাগ হয়ে উঠল গ্রীন। পশ্চিম আফ্রিকা! হ্যাঁ, পশ্চিম আফ্রিকা। ওই দেশের জনগনও গভীরভাবে বিশ্বাস করে ওয়্যারউলফের অস্তিত্ব। ওয়্যারউলফ এবং ওয়্যার-হায়েনা এই দু'রকম অপার্থিব অস্তিত্বে বিশ্বাসী ওরা। হায়েনা এবং নেকড়ে - দুটোই একই গোত্রের প্রাণী এবং পশ্চিম আফ্রিকার ওয়্যার-হায়েনা'র ধারণাই ইউরোপের ওয়্যারউলফের ধারণার সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়। ওয়্যার-হায়েনা বা ওয়্যার-উলফ - উভয় ক্ষেত্রেই মানুষ কোনো এক ম্যাজিকে বা কোনো ওয়্যার-হায়েনা বা ওয়্যার-উলফের কামড়ে নিজেও সেইরকম অপার্থিব প্রাণীতে রূপান্তরিত হয়। ....iPad বন্ধ করে দিয়ে গভীরভাবে ভাবতে বসল আশার গ্রীন। আচ্ছা, এসবের মানে কি? একটা দেশে, যেখানে দু'রকম ভিন্ন সংস্কৃতির মেলবন্ধন হচ্ছে, দুই দেশের জনগনের মধ্যেই নিজ নিজ আলাদা বিশ্বাস আছে। শাসক এবং শাসিত - উভয়ের একটা নিজস্ব কালচার আছে, নিজস্ব বিশ্বাস, ধ্যানধারণা আছে। ফ্রান্স যখন এই অঞ্চল দখল করতে এসেছিল, তারা সঙ্গে নিয়ে এসেছিল ওয়্যারউলফ নিয়ে ওদের যত ধ্যান ধারণা। পশ্চিম আফ্রিকান ক্রীতদাসদের যখন আমদানি করা হতে লাগল, তারা নিয়ে এলো ওয়্যার-হায়না নিয়ে যতরকম গাঁজাখুরি বিশ্বাস এবং আজগুবি কল্পকাহিনী। আর এই দুই ভিন্ন ভিন্ন বিশ্বাসেরই মিশ্র ফল হিসেবে আবির্ভূত হলো - 'জে-রাউজ' বা 'লাল চোখ' নিয়ে একটা লোককথার। হাইতিতে এই 'জে-রাউজ' বা 'লাল চোখ' জাতীয় অপার্থিব প্রাণীর কাল্পনিক অস্তিত্বের অবতারণা করা হয়েছিল পশ্চিম আফ্রিকানকদের 'ওয়্যার-হায়েনা' এবং ফরাসীদের 'ওয়্যারউলফ' অস্তিত্বের ধারণার মেলবন্ধনে। এতক্ষণে হাসি পেলো গ্রীনের। সত্যিই, মানুষের মন, মানুষের বিশ্বাস বড় বিচিত্র। হরর মুভির জন্য সত্যিই দারুণ রসদ বটে এগুলো। ........ঠিক সেদিনই সন্ধেবেলায় ওদিকে থমাস নামের ছেলেটি তার তাঁবুর বাইরে বসেছিল। আগেই বলা হয়েছে, সেদিনটা ভরা পূর্ণিমা, চাঁদের উজ্জ্বল আলোয় দূরদূরান্ত দিয়ে সবকিছু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। বসে বসে ক্লান্ত বোধ করছিল থমাস কিন্তু এমন সুন্দর চাঁদের আলোয় ভরা পৃথিবীর রূপসুধা পান করার লোভ থেকেও বঞ্চিত হতে চাইছিল না সে। ধীরেধীরে রাত আরও একটু গভীর হলো। থমাস তখনো বসে বসে নিরীক্ষণ করছিল আশপাশের সমগ্র বন্য প্রকৃতিকে। তাঁবুর ভেতরে ওর মা এবং অন্যান্য ভাই-বোনেরা ঘুমোচ্ছে। সে বসে রয়েছে বাইরে একাকী। যখন এবার উঠে তাঁবুর ভেতরে ঢুকবে কিনা ভাবছে, ঠিক তখনিই ওর কানে এলো সেই ভয়াল গর্জন! হাউলিং! পলকে থমাসের চোখ থেকে ঘুম ছুটে গেল। শিরদাঁড়া সোজা হয়ে উঠল তার। সর্বাঙ্গ হয়ে উঠল রোমাঞ্চিত। ঝড়াক করে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল সে....আর তখনিই কানে এলো আবার সেই গর্জন! সর্বনাশ! আবার হাউলিং! আবার সেই হাউলিং! আর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না থমাস। গত পূর্ণিমার ভয়াবহ দৃশ্যটা তার এএখনো মনে আছে। আর কিছু চিন্তা করতে পারল না সে। চোঁচা দৌড় লাগাল তাঁবুর দিকে। কাঁপতে কাঁপতে ভেতরে ঢুকে কোনওমতে ত্রিপলটা ভালো করে টেনে দিল সে। ভেতরে অন্ধকারে ওর মা এবং ভাইবোনেরা ঘুমোচ্ছে। দুরুদুরু বুকে মায়ের পাশটিতে গিয়ে মাথা পর্যন্ত কম্বল ঢেকে শুয়ে পড়ল সে। কম্বল আপাদমস্তক ঢেকেও তার দেহের কাঁপুনি বন্ধ হলো না। ধূমজ্বরের রোগীর মতো ঠকঠক করে কাঁপছে সে। সর্বনাশ, তাহলে ওয়্যারউলফ কি এখনও রয়েছে! তাহলে গত পূর্ণিমায় কাকে হত্যা করল ওরা? ....থমাসের ভাবনার মাঝেই তাঁবুর বাইরে শোনা গেল একটা ক্রুদ্ধ অথচ ভারী ফোঁসফোঁস নিশ্বাসের শব্দ! যেন অতিকায় কোনো বুনো জন্তু ক্রুদ্ধ নিশ্বাস ফেলতে ফেলতে এগিয়ে আসছে এদিকে। সেইসঙ্গে শোনা গেল।বাইরে কার যেন ভারী পায়ের শব্দ। ধুপধুপ শব্দে কিছু একটা যেন পায়ে পায়ে ক্রমে এগিয়ে আসছে তাদেরই তাঁবুটার দিকে। ....অসহায়ভাবে বিছানায় শুয়ে রইল থমাস। অন্ধকারেই ঘুমন্ত মায়ের মুখটা একবার দেখার চেষ্টা করল কিন্তু পারল না। গাঢ় অন্ধকার, কে বলবে বাইরে চাঁদের আলোর দিওয়ালী চলছে! ওদিকে পায়ের শব্দটা ওদের তাঁবুর কাছে এসে থেমে গেল। আর কোনো শব্দ শোনা গেল না। বিছানায় শুয়েও নিজের বুকের দপদপানি কমাতে পারল না থমাস। অনেকক্ষণ পর যখন কতকটা ধাতস্থ হলো, বাইরে থেকেও আর কোনো শব্দ ওর কানে এলো না, তখন একটু একটু যেন সাহস ফিরে এলো ওর মনে। ওর মনে হলো, যে এসেছিল তাঁবুর বাইরে,সে কি চলে গিয়েছে? নিশ্চয়ই তাই, নইলে এতক্ষণ নিশ্চয়ই চুপ করে বসে থাকত না সে। একবার কি উঠে দেখবে? যেমন ভাবা, আস্তে আস্তে বিছানা ছেড়ে উঠল থমাস। একবার ঘুমন্ত মা আর ভাইবোনদের দিকে দেখল, যদিও অন্ধকারে ওদের দেখা গেল না। আস্তে আস্তে উঠে গেল তাঁবুর দরজার দিকে। দরজা বলতে কাপড়ের আড়াল। সন্তর্পণে ত্রিপলের একটা অংশ আস্তে আস্তে সরিয়ে বাইরেটা দেখার চেষ্টা করতে লাগল থমাস। প্রথমে কিছুই দেখা গেল না, শুধু চাঁদের আলো আর বন-পাহাড় ছাড়া কিন্তু তারপরেই দেখা গেল সেই বিশিষ্ট অতিথিটিকে। ওদের তাঁবুর ঠিক বাইরে, যেদিকে থমাস বসে কাপড়ের আড়াল সরিয়ে বাইরেটা দেখার চেষ্টা করছে, সেদিকে ধুলোপথের ওপর কিসের যেন একটা লম্বা ছায়া পড়ল। চারপেয়ে কোনো জন্তুর বিশাল ছায়া! থমাস কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুটো লাল আগুনের মতো চোখ আর একটা বিশালাকার বুনো জন্তুর লোমশ মুখ ধীরেধীরে নেমে এলো ওর হতভম্ব, ভয়ার্ত চোখের সামনে। আগুনের মতো লাল দুটো চোখ মূহুর্তে ওকে যেন সম্পূর্ণ চলচ্ছক্তিহীন করে ফেলল। একটা চাপা গর্জন...তারপরেই তাঁবুর ত্রিপলের ওপর এসে পড়ল একটা শক্তিশালী জন্তুর ভয়াবহ থাবা! ছুরির ফলার মতো নখের ঘায়ে ফালা ফালা হয়ে গেল ত্রিপলের কাপড়টা। আর কিছু ভাবার অবকাশই পেলো না থমাস। দুটো লাল চোখ - এই-ই ছিল ওর জীবনের শেষ দেখা। *Copy *


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১২১১ জন


এ জাতীয় গল্প

→ নেকড়ে পাহাড় ২(ক)

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now