বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।
নদীর বুক ভেসে চলা একখানা নৌকা। নৌকার গায়ে পুরনো টিনের চাল, মাঝখানে ছোট্ট একচিলতে চৌকি আর কোণায় অগ্নিকুণ্ড। এটাই শাহনেওয়াজের সংসার। বেদে জাতের এই মানুষ জন্ম থেকেই নদীকে দেখেছে, নদীকেই আঁকড়ে বেঁচে আছে। তার স্ত্রী জয়গুন আর সাত বছরের মেয়ে রূপা—তাদের পৃথিবী এই নৌকাতেই গড়ে উঠেছে।
ভোর হলে শাহনেওয়াজ নৌকার দরজার কাঠ খুলে বাইরে দাঁড়ায়। নদীর জলে তখনো কুয়াশার ঘন পরত। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকটি মাছ ধরার নৌকার ভেতর থেকে আগুনের আভা দেখা যায়। রূপা তখনও মায়ের কোলে আধো ঘুমে। জয়গুন কড়াইতে ভাত চাপায়। নোনা বাতাসে ধোঁয়া উড়ে গিয়ে নদীর ওপর ভেসে বেড়ায়।
শাহনেওয়াজের পেশা বংশ পরম্পরায় বয়ে চলা। সে সাপ খেলে দেখায়। একসময় পদ্মার ঘাটে, গঞ্জের হাটে, গ্রামে গ্রামে লোক জড়ো হয়ে তার বাঁশির সুর শুনত। কুঁচকানো ঝুড়ি থেকে যখন সে বিষধর গোখরা বের করত, তখন মানুষের ভিড় জমে যেত চারপাশে। শিশুরা ভয় মিশ্রিত কৌতূহলে তাকিয়ে থাকত, আর বড়রা বিস্ময়ে হাততালি দিত। সেই ভিড় থেকে যে কয়টি টাকা উঠত, তাই দিয়েই সংসার চলত।
কিন্তু সময় বদলেছে। মানুষ এখন আর আগের মতো সাপের খেলা দেখে না। মোবাইল ফোনে সিনেমা দেখে, টেলিভিশনে জাদু দেখে। সাপের বাঁশির সুরে তাদের মন ভরে না। ফলে আয়ও কমে গেছে।
একদিন বিকেলে হাট থেকে ফিরে এসে শাহনেওয়াজ হুঁশিয়ার স্বরে বলে উঠল—
—“জয়গুন, এই পেশায় আর টিকব না। মানুষ এখন আর খেলা দেখতে আসে না। কষ্টে সংসার চলে।”
জয়গুন হাঁ করে স্বামীর মুখের দিকে তাকায়। নদীর মতো বিস্তৃত দৃষ্টি, কিন্তু ক্লান্তির রেখা স্পষ্ট। সে চুপচাপ শুধু বলে—
—“তাহলে? নদী ছেড়ে যাবা নাকি?”
নদী ছেড়ে যাওয়া মানেই তো শেকড় উপড়ে ফেলা। শাহনেওয়াজ দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। নদী তার রক্তে, তার শ্বাসে। কিভাবে ফেলে যাবে!
রূপা তখন পাশেই দাঁড়িয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে আছে। সে কিছুই বোঝে না, শুধু জানে নদীর বুকই তার খেলার মাঠ। জলে হাত ডুবিয়ে ছোট মাছ ধরা, নৌকা থেকে দড়ি ঝুলিয়ে দোল খাওয়া, এগুলোই তার আনন্দ। কিন্তু বাবা-মায়ের চোখে যে দুঃখের ছায়া, তা শিশুমনেও টের পায়।
বর্ষা এলে দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। নদী তখন ফুলে ওঠে। নৌকার ভেতর জল ঢুকে পড়ে। কাপড়চোপড়, চাল-ডাল ভিজে যায়। রূপা মায়ের আঁচল আঁকড়ে ধরে বসে থাকে। বাইরে তখন ঝড়ের হাওয়া, ঢেউয়ে নৌকা কেঁপে ওঠে বারবার। রাত জেগে তারা ভয়ে কাটায়।
তবু জীবন থেমে থাকে না। একদিন এক মহল্লায় খেলা দেখাতে গিয়ে শাহনেওয়াজের সঙ্গে আলাপ হয় স্থানীয় এক দোকানদারের। তিনি বলেন—
—“এই কাজ ফেলে দাও। খেটে খাও, মজুরি দাও, তবু সংসার টিকবে।”
কথাগুলো মনে গেঁথে যায়। শাহনেওয়াজ ভাবতে থাকে, যদি নদী ছেড়ে শহরের বস্তিতে গিয়ে থাকে! অন্তত রোজগারের নিশ্চয়তা পাবে।
কিন্তু জয়গুন আপত্তি জানায়।
—“নদী ছেড়ে গেলে আমি বাঁচব না। এখানে আমাদের শেকড়। শহরে গেলে আমরা কার ঘরে থাকব? কার চোখে চোখ রেখে খাবার খাব?”
সেদিন রাতভর দুজনের মধ্যে টানাপোড়েন চলে। রূপা মাঝখানে শুয়ে থাকে, ঘুমের ভেতরেও বাবার হাত শক্ত করে ধরে রাখে। যেন বুঝিয়ে দিচ্ছে—“তুমি কোথাও যেয়ো না।”
কয়েকদিন পরই ঘটে আরেক বিপত্তি। বাঁশি বাজাতে গিয়ে হঠাৎ সাপটি ফণা তুলে ছোবল মারতে উদ্যত হয়। মুহূর্তেই দর্শকেরা চিৎকার করে ছুটে পালায়। শাহনেওয়াজের কপালে ঘাম ঝরে পড়ে। একটুর জন্য বেঁচে যায়। তখনই মনে হয়, এই খেলা আর নয়। প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে সংসার চালানো যায় না।
অবশেষে সে ঠিক করে, কিছু দিন শ্রমিকের কাজ করবে। নদীর পাড়ে যে গ্রিজ ফ্যাক্টরির ধ্বংসস্তূপ আছে, সেখানে নতুন ঘর তৈরি হচ্ছে। মজুরি কম, কিন্তু টিকে থাকার আশ্বাস আছে।
তবু সন্ধ্যায় নৌকায় ফিরে এলে শাহনেওয়াজ বাঁশি হাতে তুলে নেয়। নদীর বাতাসে ভেসে যায় তার সুর। তখন জয়গুন চুপচাপ বসে শোনে, আর রূপা নাচতে থাকে সুরের তালে। মনে হয়, নদীই যেন তার অদৃশ্য শ্রোতা, তারই বুকের ওপর খেলে যাচ্ছে জীবনের গান।
দিন যায়, বছর ঘুরে আসে। রূপা স্কুলে ভর্তি হয়। নদীর পাড়ের প্রাইমারি স্কুল। ছোট্ট মেয়েটি খাতা আর পেন্সিল বুকে চেপে নৌকা থেকে সাঁকো পেরিয়ে যায় প্রতিদিন। শাহনেওয়াজের বুক ভরে ওঠে গর্বে। সে ভাবে, নদীর বুকের এই নৌকায় হয়তো কোনোদিন আলো আসবে—রূপার পড়াশোনার আলো।
কখনও কখনও রাতে সে কল্পনা করে, মেয়ে একদিন ডাক্তার হবে, শিক্ষক হবে। তখন হয়তো আর কেউ বলবে না, “ওরা বেদে, নদীর ভাসমান মানুষ।”
তখন নদীও নিশ্চয়ই গর্ব করে বলবে—
“আমার বুক থেকে উঠে এসেছে আলো।”
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now