বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

নদী

"ছোট গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X ==== নদী ==== (১) বক্কার আমাকে বললো, ভাইজান একটা চেয়ার আইন্যা দিই। এইহানে বসেন কিছুক্ষণ। আমি বললাম, না থাক, নদীর পারে হাঁটতেই ভালো লাগছে। নদীর বাতাসে 'গা জুড়ানো' ব্যাপারটা আছে। বাতাস অতটা মিষ্টি না হতে পারে। কিন্তু এই বাতাসে একটা নেশা আছে। যেখানে দাঁড়িয়ে এসব ভাবছি জায়গাটার নাম অন্তরমোড়। কী ভাবে নামটা এসেছে জানিনা। দর্শনটা কিন্তু সুন্দর। অন্তরের মোড়, মনের মোড় বা বাঁক। দুটো পাশাপাশি ইউনিয়ন ছোটভাকলা আর বরাট, কিংবা আরো বড় করে বলতে গেলে দুটো পাশাপাশি উপজেলা রাজবাড়ী সদর আর গোয়ালন্দের ভৌগলিক সীমানার কাছে কাছাকাছি একটা এলাকায় নদী ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছি। আশে পাশে ছোট ছোট কিছু ঘর। ঘরগুলোর বাইরে কয়েকজন ষোড়শীকে দেখা যাচ্ছে। তারা আমাদের দেখেছে। হাসাহাসি করছে। নদীর পাড়ে দু'জন বৃদ্ধকে দেখতে পাচ্ছি। বৃদ্ধ বয়সে সময় কাটানোর জন্য তারা কী নদীকে বেছে নিয়েছে? অবশ্য নদী বিধৌত এই বদ্বীপে নদীকে বন্ধু বানানোটা মোটেই বোকামী নয়। সময় কাটানোর জন্য নদীর স্রোতের থেকে স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ সারথী কমই আছে। এই তল্লাটে চিকিৎসক তো দূরে থাক, কখনো দপ্তরের কোন বড় বাবুরও পায়ের ছাপ পড়েনি। আমাকে দেখে আশে পাশে মানুষের কৌতুহলের কারন হয়তো সেটাই। আমি অবশ্য এসেছি শুধু নদী দেখতে। বক্কার আমার পরিচিত। গ্রামে এলে আমার সাথেই থাকে। বক্কার কোথায় যেন গেলো। আমি দেখতে পাচ্ছি, ষোড়শীর দল আড্ডা ভেঙ্গে নদীর দিকে এগিয়ে আসছে। এই বয়সে মনে ভয় থাকে কম। নায়িকা নায়িকা সত্তা জন্ম নেয়। অকারনে হাসার কারনও বোধহয় তাই। ওরা নদীর খুব কাছাকাছি গিয়ে আমার মতোই দাঁড়িয়ে রইলো। এদের মধ্যে একজন একটু লম্বা, তার চুলটাও ছাড়া। চুল বাতাসে উড়ছে। আমি চোখ ফেরালাম। বাতাসটা শরীর জুড়িয়ে যাচ্ছে আমার। নদীর বাতাসের এই ঐশ্বরিক গুণটা আছে। অথচ নদী তীরের মানুষেরা স্বভাবজঃ কারনে জীঘাংসা মনোবৃত্তির হয়। পলি মাটি আর শরীর জুড়ানো বাতাসের দেশের মানুষেরা এরকম কেন হয়, আমি ভেবে মেলাতে পারি না। বক্কার ফিরে এলো। পলাশ নামের একজন ওর সাথে এলেন। তিনি এসে নিজের পরিচয় দিলেন। আমাকে পাশেই তার বাড়িতে যাবার অনুরোধ করলেন। আমি রাজী হলাম না। বক্কার বললো, ভাইজান আরেটা কাম আছে। পলাশ মিয়ার বউ এট্টু ওসুস্ত। আপনে গিয়া এট্টু দেইখা দিলে ওনার উপকার হয়। আমারে কইছিলো আগেই। রোগীর কথা বলায় আমি রাজি হলাম। বেশ গোছানো বাড়ি পলাশের। টিনের চৌচালা ঘর। নীল আর সবুজ রঙ্গের টিন। বারান্দায় চেয়ার আছে। দুটো টব আছে সেখানে। ফুলের গাছ লাগানো। ফুল ফোটে নি। বারান্দায় বসে এক কোনা দিকে নদী দেখা যায়। আমাদেরকে একটু শরবত দেওয়া হলো। বেশ ভালোই লাগলো। নদীর পারের মানুষের আহার্য্য জিনিসগুলোর মধ্যেও শরীর জুড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টি থাকে হয়তো। "স্রাবু, ও স্রাবু, বাইরে আসো" - পলাশ ডাকলো ওর বউকে। স্রাবু যার নাম, সে আসার আগেই পলাশ বলতে শুরু করলো, ভাইজান আমার বউ মেট্টিক পাশ। রাইতের বেলা দুই-চাইরটা পোলাপাইন পড়ায়। রানতে পারে ভালোই। ওর হাতের ডাইল চচ্চরী দিয়া ভাত খাইলে মনে করবেন বেহেশতী খানা। কিছু বলা উচিৎ আমার। কী বলা উচিৎ ভেবে না পেয়ে চুপ থাকলাম। পলাশ বললো, বেহেশতে কী ডাইল চচ্চরী পাওয়া যায় ভাইজান? না পাওয়া গেলে সমস্যা নাই। মরলে আমার বউ বেহেশতেই যাইবো। আমি লক্ষ্য করলাম পলাশের গলা ভারী হয়ে যাচ্ছে। জিজ্ঞাসা করলাম, উনি অসুস্থ শুনলাম। কী হয়েছে ওনার? - বলতে পারি না ভাইজান। দুই মাস ধরে জ্বর আসে। ডাক্তার দেখাইছিলাম প্রথম প্রথম। চিকিৎসা চলতেছে। আপ্নে একটু দেখেন। স্রাবু বারান্দায় এলো। যেখানে আমরা বসে ছিলাম। ভদ্রমহিলা নিঃশব্দে সালাম দিলেন আমাকে। মহিলা না বলে মেয়ে বলাই ভালো। বয়স ১৮/১৯ এর বেশী না। ছিমছাম গড়নের মেয়ে। শাড়ি পড়েছে। কপালে টিপ। এক পাশে সিথী করা। চুল খোপা করে বাঁধা। এক হাতে মেহেদির রঙ দেখা যাচ্ছে। শিক্ষিত মানুষের চোখে চাহনি কিছুটা অন্যরকম হয়। এই মেয়ের সেই চাহনিটা আছে। ওর সালামে আমিও মৌন উত্তর দিলাম। বললাম, - কেমন আছেন? - জ্বী ভালো। আপনার কথা বক্কার ভাই এর কাছে শুনেছি। - তাই? কী নাম আপনার? - শ্রাবন্তী... সবাই স্রাবু বলে ডাকে। - সুন্দর নাম। আপনার অসুস্থতার জন্য কী কী ওষুধ খাচ্ছেন? শ্রাবন্তী কথা বলা শুরু করলো। প্রথম দিকে দু'একজন ডাক্তার দেখানো হয়েছে। এখন কবিরাজী চিকিৎসা চলছে। কবিরাজী চিকিৎসার এখন তৃতীয় পর্যায়ে আছে। এই পর্যায়ের চিকিৎসা বড় কঠিন চিকিৎসা। ভোর বেলা নদীতে নামতে হবে। গোসল করতে হবে। এরপর ডুব দিয়ে উঠে প্রথম যে কচুরীপানা দেখা যাবে সেটা তুলে নিয়ে আসতে হবে বাড়িতে। ওটার অর্ধেক কাঁচা খেতে হবে। আর অর্ধেকটা ভাতের সাথে সিদ্ধ করে। গত তিন ধরে এভাবেই চিকিৎসা চলছে। আজ শ্রাবন্তী এখনো খায় নি। কারন আজ গোসলের পরে কোন কচুরীপানা পায়নি ও। কচুরীপানা না পাওয়া গেলে রোজা থাকতে হবে ঐদিন। কবিরাজ সাহেবের এমনটাই বিধান। - আপনি একজন শিক্ষিত মেয়ে হয়ে এসব করছেন। অবাক হয়ে যাচ্ছি। আমি বললাম। একটা চোখাচোখি পর্ব হলো শ্রাবন্তীর সাথে পলাশের। জানা গেলো, শ্রাবন্তীর শাশুড়ি ঐ কবিরাজকে খুব মান্য করেন। তাই কবিরাজের আদেশের বাইরে ও যেতে পারবে না। আমি একটা সাদা কাগজে কিছু ওষুধ আর পরীক্ষা নিরীক্ষা লিখে দিলাম। আমি জানি না এই সাদা কাগজ আদৌ কোন কাজে আসবে কী না। বেরিয়ে যাবার সময় শ্রাবন্তী এসে সালাম করলো। লক্ষ্য করলাম ওর চোখমুখে অ্যানিমিয়ার ছাপ স্পষ্ট। আমরা বেরিয়ে এলাম। নদীর হাওয়াটা আরো বেড়েছে মনে হচ্ছে। বক্কারের বাইকে উঠবো। শ্রাবন্তী এগিয়ে এলো। ঐ ষোড়শী মেয়ের দল বাইকের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। - আবার আসবেন। মরে না গেলে দেখা হবে। বাইক চলতে শুরু করেছে। এক অচীন দেশ থেকে বিদায় নিচ্ছি আমি। শিক্ষার আলো এখানে পৌছেছে, কিন্তু আঁধার ঘুচাতে পারেনি। একবার পেছনে ফিরে তাকালাম। মনে হলো শ্রাবন্তী আর ঐ মেয়েগুলো প্রায় অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। নদীর শরীর জুড়ানো বাতাসে ওরা মিশে যাচ্ছে। আকাশে মেঘ কালো হতে শুরু করেছে। অজস্য বাতাস দিয়েও সে মেঘ সরানো যাবে না। নদীর বাতাসের সাথে অচিন দেশের অচিন শ্রাবন্তীরা হারিয়ে যাচ্ছে। বাইকে একটা ঝাঁকি লাগলো। (২) ঝাঁকিতে ঘুম ভেঙ্গে গেলো। কীভাবে ঝাকি খেলাম জানি না। অ্যালার্ম বাজছে। ৮ ট বাজে। উঠে গেলাম বিছানা থেকে। সাড়ে ১০টায় ডিজি হেলথ এর এমআইএস-এ একটা মিটিং আছে। একটা সফটওয়ার ট্যুল এর কাজ চলছে। মেয়েদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় একটা অ্যাপসের ডিজাইন করেছে একটি সংস্থা। তারা চাইছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এটাকে প্রমোট করুক। এই মুহুর্তে শ্রাবন্তীকে খুব মনে পড়ছে। শ্রাবন্তীরা নদীর ধুলো-বাতাসে হারিয়ে গেছে কী না, আমার জানা দরকার। ভীষণ দরকার। নাহলে যতোবার আমি নদী তীরে যাবো, ওরা আমার দিকে তাকাবে। আমাকে দেখে হাসবে। তারপর নদীর বাতাসে মিলিয়ে যাবে। === ডা. রাজীব দে সরকার চিকিৎসা কর্মকর্তা, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ঢাকা


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৭৭ জন


এ জাতীয় গল্প

→ নদীর বুকে সংসার
→ নদীর পাড়ের কন্যা
→ নদীর পাড়ে ছেলেটি
→ পদ্মা নদীর মাঝি (১৭)(শেষ পর্ব)
→ পদ্মা নদীর মাঝি (১৬)
→ পদ্মা নদীর মাঝি (১৫)
→ পদ্মা নদীর মাঝি (১৪)
→ পদ্মা নদীর মাঝি (১৩)
→ পদ্মা নদীর মাঝি (১২)
→ পদ্মা নদীর মাঝি (১১)
→ পদ্মা নদীর মাঝি (১০)
→ পদ্মা নদীর মাঝি (৯)
→ পদ্মা নদীর মাঝি (৮)
→ পদ্মা নদীর মাঝি (৭)
→ পদ্মা নদীর মাঝি (৬)

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now