বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
নামের আগে নীরবতা
মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।
গ্রামের নাম শান্তিপুর—নামটা শুনলে মনে হয় যেন বাতাসে ধূপের গন্ধ, মানুষের মুখে প্রশান্তির হাসি, উঠোনে বিকেলের আলো। কিন্তু বাস্তবে শান্তিপুরও আর দশটা গ্রামের মতোই—এখানে হাসি আছে, কান্না আছে, আর আছে মানুষের মুখে মুখে ঘুরে বেড়ানো কথার স্রোত। সেই স্রোতের অনেকটাই ছিল পরনিন্দার জল, কারো সংসার ভাঙার গল্প, কারো চাকরি হারানোর গুজব, কারো চরিত্র নিয়ে ফিসফাস। এসব কথা বলার সময় মানুষ বুঝতেই পারত না, তারা ধীরে ধীরে নিজেদের অন্তরকে ভারী করে তুলছে।
গ্রামের স্কুলশিক্ষক ইমতিয়াজ স্যার প্রতিদিন বিকেলে বাজারের চায়ের দোকানে বসতেন। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি, মুখে ছোট দাড়ি, চোখে গভীর শান্ত ভাব। একদিন তিনি দোকানে বসতেই দেখলেন—চার-পাঁচজন লোক গোল হয়ে বসে কথা বলছে। কথার কেন্দ্রে গ্রামের তরুণ রিকশাচালক রহিম। কেউ বলছে সে নাকি যাত্রীদের কাছ থেকে বেশি টাকা নেয়, কেউ বলছে সে চোরাই মাল বহন করে। ইমতিয়াজ স্যার চুপচাপ চা হাতে নিয়ে শুনলেন। কিছুক্ষণ পর ধীরে গলা পরিষ্কার করে বললেন, “ভাইরা, এসব কথা কি নিশ্চিত? নিজের চোখে দেখেছেন?”
লোকজন থমকে গেল। কেউ বলল, “না মানে… শুনেছি।” ইমতিয়াজ স্যার মৃদু হাসলেন, “শোনা কথা ছড়াতে ছড়াতে একসময় পাহাড় হয়ে যায়। অথচ হয়তো সত্যটা পাহাড় নয়, ধুলোর ঢেলা।” তারপর আর কিছু না বলে উঠে গেলেন। তার এই নীরব প্রতিবাদ যেন বাতাসে হালকা ধাক্কার মতো লাগল।
রহিম অবশ্য এসব জানত না। সে দিনভর খাটে, রাতে ক্লান্ত শরীরে ঘরে ফেরে। কিন্তু কিছুদিন পর সে লক্ষ্য করল—অনেকে আগের মতো ডাকছে না, কেউ কেউ চোখ এড়িয়ে চলে। দোকানে ঢুকলে কথাবার্তা হঠাৎ থেমে যায়। রহিমের বুকের ভেতর অজানা কাঁপুনি উঠল। সে বুঝতে পারছিল না, তার অপরাধ কী।
এক সন্ধ্যায় সে সাহস করে ইমতিয়াজ স্যারের কাছে গেল। বলল, “স্যার, মানুষজন আমাকে আলাদা চোখে দেখছে কেন বুঝতে পারছি না।” ইমতিয়াজ স্যার তাকে বসালেন। শান্ত গলায় বললেন, “তোমার বিরুদ্ধে কিছু কথা ছড়িয়েছে। তবে আমি বিশ্বাস করি, কথা মানেই সত্য নয়।” রহিমের চোখ ভিজে উঠল। “আমি তো কোনো অন্যায় করিনি, স্যার।” শিক্ষক মাথা নেড়ে বললেন, “জানি। আর তাই তো বলছি—তুমি নিজের কাজ ঠিক রাখো। বাকিটা আল্লাহ দেখবেন।”
কিন্তু ইমতিয়াজ স্যারের নিজের মনও ভারী হয়ে উঠেছিল। তিনি বুঝতেন, গ্রামের মানুষ পরনিন্দার অভ্যাসে এতটাই ডুবে গেছে যে কেউ টেরই পাচ্ছে না এটা কত বড় ক্ষতি করছে। পরের শুক্রবার জুমার নামাজের পর তিনি ইমাম সাহেবের সঙ্গে কথা বললেন। অনুরোধ করলেন, খুতবায় যেন গিবত থেকে বাঁচার কথা তোলা হয়। ইমাম সম্মত হলেন।
শুক্রবারের খুতবায় ইমাম সাহেব বললেন, “ভাই ও বোনেরা, অন্যের অগোচরে তার দোষ বলা এমন অপরাধ যার তুলনা করা হয়েছে মৃত ভাইয়ের মাংস খাওয়ার সঙ্গে। ভাবুন তো—কেউ কি তা করতে পারে? অথচ আমরা মুখে মুখে ঠিকই করে ফেলছি।” মসজিদ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। অনেকের চোখ নিচু হয়ে এল।
এরপর তিনি বললেন, “কথা বলার আগে ভাবুন—এটা কি দরকারি? এতে কি কারো উপকার হবে? না কি শুধু মনোরঞ্জন?” কেউ কেউ অস্বস্তিতে নড়েচড়ে বসল। যেন নিজের মুখের কথাগুলোই কানে বাজতে লাগল।
পরদিন বাজারের চায়ের দোকানে আবার লোক জড়ো হলো। আগের মতোই গল্প শুরু হচ্ছিল, কিন্তু এবার সুরটা একটু বদলে গেছে। একজন বলল, “আচ্ছা, এসব কথা আমরা না বললেই হয় না?” আরেকজন যোগ করল, “কাল খুতবায় যা শুনলাম, ভাবাচ্ছে।” কেউ কেউ চুপ করে গেল। ইমতিয়াজ স্যার দূর থেকে দৃশ্যটা দেখে মনে মনে দোয়া করলেন।
তবে সবাই যে বদলে যাবে, তা নয়। গ্রামের এক মহিলা—রওশন আরা—ছিলেন গিবতের রানি বলা যায়। কার সংসারে ঝগড়া, কার ছেলে প্রেম করছে, কার মেয়ে দেরিতে বাড়ি ফিরেছে—সব খবর যেন তার ঝুলিতে। একদিন তিনি প্রতিবেশী সেলিনার উঠোনে বসে আরেকজনের চরিত্র নিয়ে কথা বলছিলেন। সেলিনা অস্বস্তিতে বলল, “আপা, এসব না বলাই ভালো। আমরা তো জানি না আসলটা কী।” রওশন আরা অবাক হয়ে তাকালেন, “তুমি কবে থেকে এত ধার্মিক হলে?” সেলিনা শান্ত গলায় বলল, “ধার্মিক না, শান্ত থাকতে চাই।”
এই কথাটা রওশন আরার মাথায় লেগে রইল। রাতে ঘুমোতে গিয়ে তিনি ভাবলেন—সত্যিই তো, এসব কথা বলার পর কেন জানি মনটা অশান্ত হয়ে থাকে। যেন বুকের ভেতর ধুলো জমে। পরদিন তিনি যখন আবার গল্প শুরু করতে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ থেমে গেলেন। জিহ্বা যেন নিজেই আটকে গেল। মনে পড়ল—কথা বলার আগে ভাবতে হবে।
অন্যদিকে রহিম ধীরে ধীরে আবার আগের অবস্থায় ফিরছিল। ইমতিয়াজ স্যার ও কয়েকজন সচেতন মানুষ তার পক্ষে কথা বলেছিলেন। কেউ বলেছিল, “লোকটা পরিশ্রমী।” কেউ বলেছিল, “আমরা তো কোনো অন্যায় দেখিনি।” গুজবের আগুনে পানি পড়তে শুরু করল।
একদিন রহিম নিজেই বাজারের চায়ের দোকানে এসে বলল, “ভাইরা, যদি আমার কোনো ভুল থাকে, আমাকে বলবেন। পেছনে কথা বললে আমি শোধরাতে পারব না।” তার সরল কথায় অনেকের মাথা নিচু হয়ে গেল। কেউ কেউ ক্ষমাও চাইল।
ইমতিয়াজ স্যার সেদিন বুঝলেন—গিবত থেকে বাঁচার লড়াইটা আসলে নিজের ভেতরেই। জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ করা, নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকা, পরিবেশ বদলানো, পরিণতি ভাবা—এসব শুধু উপদেশের কথা নয়, চর্চার বিষয়। তিনি দেখলেন, যারা অন্যের দোষ খুঁজতে সময় দিত, তারা নিজের কাজ, সন্তানদের পড়াশোনা, ঘরের শান্তি নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে। ফলে কথার টেবিলে কটু গল্পের বদলে চাষাবাদের আলোচনা, স্কুলের ফলাফল, গ্রামের উন্নয়নের পরিকল্পনা আসতে লাগল।
এক বিকেলে তিনি একা বসে নদীর পাড়ে সূর্যাস্ত দেখছিলেন। মনে হচ্ছিল, গ্রামের আকাশটাও যেন একটু হালকা হয়েছে। তিনি ফিসফিস করে বললেন, “হে আল্লাহ, আমাদের জিহ্বাকে সংযত করো, হৃদয়কে পরিষ্কার করো।”
শান্তিপুর তখনও নিখুঁত হয়ে ওঠেনি, কিন্তু বদলের পথে হাঁটা শুরু করেছে। আর সেই পথের প্রথম ধাপ ছিল—নামের আগে নীরবতা, অন্যের কথা বলার আগে নিজের দিকে তাকানো, আর অশান্তির বদলে প্রশান্তিকে বেছে নেওয়া।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now