বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

নাবিলা (শায়লা গল্পের দ্বিতীয় খন্ড) ৩য় পর্ব

"ভৌতিক গল্প " বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান Sayemus Suhan (০ পয়েন্ট)

X প্রচন্ড ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে ঘুম ভাংল আমার। বিকেলবেলাটা পুকুরপাড়ে বসেছিলাম। কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানিনা।আজকাল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বেশ তটস্ত হয়ে থাকি। ওই সময়টা উনি বাসায় থাকেন। গতকাল ছবি আঁকা শেষ হয়েছে। উনাকে খুব তৃপ্ত মনে হল। আমার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল ছবিটা দেখতে,কিন্তু সাহসে কুলাচ্ছিল না। ঘরে যেতে হবে। মাঘ মাসের শীত, বড় কঠিন। ঘাট থেকে উঠে পেছনে ফিরতেই চমকে উঠলাম। উনি দাঁড়িয়ে আছেন আমার পেছনে। তাড়াতাড়ি ঘোমটাটা মাথায় তুলে দেই। একটু অবাক লাগছে। উনি এই সন্ধ্যায় বাড়ীতে কি করছেন। জিজ্ঞাসা করার সাহস হয় না ।মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকি। “এখানে কি করছ? ঠান্ডা লাগবে তো, ভেতরে এসো” উনার গলায় কি যেন ছিল, আমার হৃদয় নেচে উঠল। এত নরম গলায় কখনো তো তিনি আমার সাথে কথা বলেন নি!! তবে কি…!! কিছুটা শংকা আর কিছুটা আশা বুকে নিয়ে উনার পেছন পেছন বৈঠকখানায় ঢুকি। শঙ্কার পরিমাণটাই বেশী, সারাগায়ের ব্যাথা এখনো যায়নি আমার…আমাকে বসতে বলেন উনি…বেতের বেশ কিছু চেয়ার সাজানো ছিল সে ঘরে। জড়সড় হয়ে তারই একটাতে বসি। মাথার উপর ঝাড়বাতিটা জ্বলছে। সারা ঘরে এক মোহনীয় আলো। দেয়ালের সবগুলো ছবির সামনে আজ একটা করে মোমবাতি জ্বলছে। উনি এগিয়ে আসেন আমার সামনে। সম্ভাবনায় বুকটা আমার কাঁপছে। আমাকে ধরে দাঁড় করান উনি। ভয়টা আস্তে আস্তে সরে যাচ্ছে। হঠাৎ কোথা থেকে যেন একরাশ লজ্জা এসে চেপে ধরল। আমার মুখটা দুহাতের মাঝে নিয়ে উনি আমার দিকে তাঁকিয়ে থাকেন…আমার চোখ বন্ধ হয়ে আসে আবেশে… অনেকক্ষণ পর আমি চোখ খুলি।সেই একই ভাবে দাড়িয়ে আছি আমরা । আমার দিকে উনি তাকিয়ে আছেন অপলক চোখে…তার চোখে মুগ্ধতা… “তুমি ওদের সবার চেয়ে অনেক বেশী সুন্দর…”ওনি বলেন মায়ামাখা কন্ঠে। মনটা খুশীতে ভরে ওঠে…সেই সাথে বিভ্রান্তি…”ওদের চেয়ে???” “তুমি আমাকে ভালবাস নূরজাহান?” আকস্মিক এ প্রশ্নে থমকে যাই…সত্য কথাটা মুখে সরে না…আমি কি ভালবাসি ওনাকে? হয়ত…এতদিনের ভয়ের অনুভূতিটাকে ছাপিয়ে আজ যে নতুন অনুভূতিটা টের পাচ্ছি…এর নামই কি ভালবাসা? মাথা নাড়ি আমি… “তাহলে তুমি কি আমার জন্য একটা কাজ করে দিতে পারবে?” আবার ঘাড় নাড়াই আমি। মনের কোণে কোথায় যেন শংকা উঁকি দেয়। আমাকে ছেড়ে দেন উনি…হাত ছড়িয়ে দেন দেয়ালে ঝোলানো ছবিগুলোর দিকে… “এই যে এই বাড়িতে যে ছবিগুলো দেখছ…যে মূর্তিগুলো দেখছ, সব আমার নিজ হাতে আঁকা…নিজের হাতে বানানো…কিন্তু আমি্ যে একা একা পারি না…।আমাকে সাহায্য করবে তুমি? করবে?” মনটা আবারো বিভ্রান্ত হয়, আমি? আমি কি করব? কোনদিন…বাড়ির কাজ ছাড়া কিছুই করিনি আমি। ওগুলো সব পারব, কিন্তু ছবি আঁকা!! মৃদুস্বরে ওটাই জানাতে চেষ্টা করি আমি। হেসে ওঠেন উনি…”হাসালে নূরজাহান” কাছে এসে আবার মুখটা উনার হাতের দু আঙ্গুল দিয়ে স্পর্শ করেন…এত আস্তে;যেন জোরে ছুঁয়ে দিলে আমি ভেঙ্গে যাব…”তুমি কি জান বিধাতা তোমাকে নিজ হাতে তিল তিল করে গড়ে তুলেছেন? তোমার সৌন্দর্য যেন বিধাতার নিজ হাতের সৃষ্টি…আমাকে তার কিছুটা ধার দেবে নূরজাহান? মনের বিভ্রান্তিটা কাটে না। সৌন্দর্য কিভাবে দেয় মানুষ? তবুও মাথা ঝাঁকালাম। দেব আমি, আমার স্বামী উনি…আমার সবকিছু তো ঊনারই সম্পত্তি… দীর্ঘশ্বাস ফেলেন উনি আবার…হাত সরিয়ে নেন হঠৎ…”ওরা সবাই তাই বলেছিল…কিন্তু নিজে থেকে কেউ দেয়নি…কেউ না…”আমার হাত ধরে উনি দেয়ালের পাশে নিয়ে যান…মোমের আলোয় তার চোখের বিষাদটা আরো স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়ে… খানসামা কে ডাক দেন উনি। হাতে কি যেন নিয়ে অন্ধকার থেকে উদয় হয় খানসামা । বালতি? হ্যা, বালতিই বোধহয় তার হাতে। ধোঁয়া উঠছে কি ওখান থেকে? “আমাদের দেহ বড় নশ্বর নূরজাহান। মানুষ বুড়িয়ে যায়, মুটিয়ে যায়…তুমি এখন যেমন আছ তেমনি সুন্দর…আমি তোমার সৌন্দর্য কে সৃষ্টির শেষ সময় পর্যন্ত ধরে রাখতে চাই…” হাত দুটো আমার গালে আলতো করে ছোয়ান তিনি…তার চোখে পূজারীর ভক্তি…যেন কোন দেবীর সামনে দাঁড়িয়ে স্তুতি করতে ব্যাস্ত… হঠাৎ একরাশ হাওয়া এসে ঝাড়বাতিটা নিভিয়ে দেয়…কিন্তু ছবিগুলোর মাঝে আলো জ্বলতে থাকে…ছবির সবগুলো মেয়ে যেন আমার দিকে চেয়ে থাকে…আলো আঁধারির খেলা? হবে হয়ত…আমার মনে তখন অনেক গুলো অনুভূতির সমাহার। উনার কথাগুলো বুঝতে পারি না আমি, কিন্তু অনেক ভাল লাগে…আবার অনেক ভয় লাগে…উনার আঙ্গুলগুলো আমার মুখমণ্ডলে খেলা করে…আলতো ভাবে…আবেশে আমার চোখ আবার বুঁজে আসে। উনার হাতদুটো আস্তে আস্তে আমার গলার উপর আসে…শিরাগুলো দপদপ করে লাফিয়ে উঠছে আমার। উনি আলতো করে ছুয়ে যান ওগুলো…হাত দুটো আরও নিচে নিয়ে যাবার অপেক্ষায় থাকি…এ অপেক্ষা অনেকদিনের…আজ আমার স্বপ্ন তবে… আস্তে আস্তে হাতদুটো গলার উপর চেপে আসে যেন। চোখ বন্ধ আমার তখনো। ভাল লাগাটা আস্তে আস্তে ভয়ে রূপ নেয়…উনার হাতের চাপ কি বাড়ছে?…হ্যা আরো বাড়ছে…চোখ খুলি আমি…বিভ্রান্ত চোখ উনার চোখের গভীরে আঁতিপাতি করে ভাল্বাসা খুজে পাবার শেষ চেষ্টা করে…পায়না কিছুই…সে দৃষ্টিতে কেবল লোভ আর নতুন কিছু পাবার উত্তেজনা…ছোটবেলায় মেলায় গিয়ে নতুন নতুন খেলার পুতুল দেখে লতার চোখে এরকম দৃষ্টি খেলা করত… আমার হাতদুটো ঊনার হাতের উপর চলে আসে হঠাৎ…প্রথম স্পর্শ…কিন্তু সে স্পর্শে ভালবাসা নেই…আছে আতঙ্ক…হাত দুটো ছাড়াতে চেষ্টা করি…পারি না…ছটফট করতে থাকি…শ্বাস নিতে পারছি না…ওনার চোখ আমার চোখ থেকে সরে না…উনি ফিসফিস করে কি যেন বলতে থাকেন আমার কানে কানে…আমার চিৎকারে সেটা চাপা পড়ে যায়…থুতু দেই আমি উনার মুখে,হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ঘুরে পালাতে চেষ্টা করি…পারি না…আমার চুল খামচে ধরেন উনি। দেয়ালে চেপে ধরেন আমায়। ঠিক দেয়ালে নয়…দেয়ালের ছবিটাতে। চিৎকার করতে থাকি অনবরত আমি, ছটফটাতে থাকি…ওনার গায়ে যেন অসুরের শক্তি…প্রচন্ড রেগে গেছেন এখন…উনার বিড়বিড় এখন বিজাতীয় ভাষার কোন চিৎকারে পরিণত হয়েছে…একচুল নড়তে পারি না…ছবিটা খামচে ধরি একহাতে…আরেক হাত মুচড়ে পেছনে নিয়ে গেছেন উনি…আমার চুল ধরে পেছনে টানেন উনি.. আবার মাথাটা ঠুকে দেবার জন্য ছবির সাথে…প্রচন্ড বেগে ছবিটা কাছে আসার সময় হঠাৎ ছবিটা দেখতে পাই…ছবিটা…ছবিটা… ওই শোবার ঘরের মেয়েটা…হঠাৎ সময় যেন থেমে যায় আমার চারপাশে…..মেয়েটা ছবির একেবারে সামনে চলে আসে…যেন বেরুতে চাইছে…হাত বাড়িয়ে দেয় আমার দিকে…আস্তে আস্তে খোলা হাতটা চলে যায় মেয়েটার দিকে…ছুয়ে ফেলি… তারপর যেন কি হয়…হঠাৎ করেই আমার সব কষ্ট চলে যায়…আমি কি মারা গেছি? না তো…এখনো সব একই আছে…কেবল আমি আমাকে দেখতে পাই…কষ্টগুলো চলে গেছে…আমার দেহটা কেমন যেন নিথর…ছবির সামনে রাখা মোম বাতিটা থেকে আমার শাড়িতে আগুন ধরে যায়…আমি চিৎকার করে সাবধান করি…কিন্তু উনি শুনতে পাচ্ছেন বলে মনে হয়না…আমি যেমন শুনতে পাচ্ছি না উনার ক্ষুব্ধ চিৎকার…চোখের কোন দিয়ে দেখি খানসামা দৌড়ে আসছে…উনাকে শান্ত করার পর আমার নিথর দেহটাকে টেনে নিয়ে যেতে দেখি…ওই তো ওইখানে বালতিটা আছে…ওখানে… আমি কোথায়?…আমি বোধহয় ছবির ভেতরে… পুরাতন বাড়িটার সামনে দাড়িয়ে আছে নাবিলা…শরীরটা অসম্ভব দূর্বল…প্লেনের বাকি রাস্তাটা বমি করতে করতে গেছে ওর। প্লেনের ডাক্তার ওকে ঘুমের ওষুধ দিতে চাইলে চিৎকার করে না করে…ওকে নিয়ে রীতিমত হৈ চৈ…ট্রানজিট ছিল বাহরাইনে। কয়েক কাপ কফি খেতেই অনেকটা ভাল লাগতে থাকে নাবিলার। তারপর থেকে টানা ২ দিন না ঘুমিয়ে, ঢাকায় নেমে সোজা বিমানে করে সৈয়দপুর…তারপর বাসে করে ঠাকুরগাঁও…রেন্ট-এ-কার এখানে নেই মনে হল… জায়গাটা খুজে পেতে বেশ বেগ পেতে হয়ছে…ভাল কাপড় চোপড় পরা বাংলা ভাল না বলতে পারা বাঙ্গালী এখনো এখানে বেশ দর্শনীয় বস্তু…তার উপর আবার অসুস্থ …নাবিলার কৌতূহল এর চেয়ে হুজুগে বাঙ্গালীর কৌতূহল বরাবরই বেশী হবার কথা…সেটা তো আর নাবিলার জানা নেই…বিরক্তির চূড়ান্ত পর্যায়ে তখন ও। বাড়িটাতে ঢোকার আগে আরেকবার চিন্তা করে নেয় নাবিলা । সাহসে কুলাচ্ছে না…কেন এখানে এল তার কারণ টা এখনো ষ্পষ্ট নয় ওর কাছে। যত কারনই থাকুক…যতই অতীতের রহস্য ভেদ করার আর এই ঘটনার শেষ দেখার ইচ্ছে থাকুক না কেন, কেন যেন কোন কারণকেই অতটা বাস্তব সম্মত মনে হচ্ছে না এখন ওর। এখানে আসার কোন কারণই নেই…কি করবে ও?কি ই বা করতে পারে?এ বাড়িটা ঘিরে যে রহস্য জড়িয়ে আছে তার সমাধান কি ও করতে পারবে? কিভাবে পারবে?যেন এক অদৃশ্য টানে এখানে ছুটে এসেছে ও। চিন্তাটা ওর মেরুদন্ড দিয়ে একটা শীতল পরশ বুলিয়ে গেল। এখন কি ফিরে যাবে? এতদূর এসে ফিরে যাবে? এখানে এক হোটেলে উঠেছে নাবিলা। বিকেল হয়ে আসছে…এখন ঢুকবে? নাকি কাল সকালে?বাড়িটার শরীরে বয়সের ছাপ স্পষ্ট। দেয়াল বেয়ে নাম না জান লতা পাতা বাসা বেঁধেছে,একটা অশ্বথ গাছও উঁকি দিচ্ছে ওপাশের দেয়ালে।ছাদ ধসে পড়েনি এখনো এই বিশাল বাড়ীটার, ধসে পড়তে বেশী বাকী নেই এটাও বোঝা যাচ্ছে। অনেক বছর ধরে কেউ যত্ন নেবার নেই। আর কত? এলাকার মানুষ এ বাড়িকে নিশ্চয়ই যমের মতন ভয় পায়। পাবারই কথা। পাশের সেই পুকুরটা এখন ডোবায় পরিণত হয়েছে,কিছুদিন আগে হয়ত পাট পচানো হয়েছে, জীবিকা তো আর ভুতের ভয় মানে না… “তুমি এসেছ?” রিনরিনে এক কণ্ঠ শুনে চমকে ওঠে নাবিলা। কণ্ঠের মালিক কে দেখার জন্য ঘুরে দাঁড়ায়। কাউকে দেখে না… “আমি বাড়ির ভেতরে, ওদের নিয়ে ভেতরে এস” হঠাৎ ওর আফসোস হতে থাকে কেন রায়ান আর রিমনকে নিয়ে এলনা ও। জানেনা কেন কিন্তু নাবিলা ইচ্ছে হয় ফিরে গিয়ে ওদের নিয়ে আসতে… তখনো কাউকে খুঁজে পায়নি নাবিলা। কণ্ঠটার মাঝে এক মায়াময় আহবান,সে আহবান ঝেড়ে ফেলতে সহসা ইচ্ছা করবেনা কারও। ওরও করে না। ওর দেহ আর মন যেন ভিন্ন ভিন্ন দুটো সত্ত্বা । ওর সমস্ত অস্তিত্ব ওকে চিৎকার করে বলছে ওখানে না প্রবেশ করতে। প্রচন্ড অশুভ একটা ব্যাপার আছে সে আহবানে…কিন্তু এড়াতে পারেনা নাবিলা…পাথরের মত ভারী পা দুটো টেনে টেনে আস্তে আস্তে মন্ত্রমুগ্ধের দরজার দিকে এগিয়ে যায় নাবিলা। মেহগনি কাঠের দরজা ,ঘুনে ধরে না। তাই বলে অক্ষত নেই মোটেও। বয়সের ছাপ পড়েছে এখানে ওখানে । সানসেটের মত কিছু একটা ছিল দরজার উপরে, সেটা ভেঙ্গে দরজার সামনে। তাই বৃষ্টির পানিতে ভিজে ভিজে দরজায় পচন ধরেছে। সামান্য ঠেলা দেবারই কেবল অপেক্ষা ছিল। প্রচন্ড শব্দে ভেঙ্গে পড়ল। ভেতরটা বসার ঘর, মানে বৈঠক খানা। নূরজাহানের স্মৃতি, আর নাবিলার ছেলেবেলার স্মৃতি দুটো একসাথে জট পাকিয়ে সামনে এসে হাজির হয়। ঝাড়বাতিটা নেই, নেই সেই টান পাখাও। নাহ আছে, টানপাখাটা মেঝেতে পড়ে আছে।ছেলেবেলার স্মৃতিতে এত ছবি ছিল না, ছিল না কোন মূর্তিও। এখনও নেই। জীর্ণ শীর্ণ আসবাব আর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ময়লা আবর্জনা এড়িয়ে ঘরের মাঝখানে চলে যায় নাবিলা। সিঁড়ির নিচে কোন ছবি নেই,থাকার কথা ছিল না? কাঠের সিঁড়িটাতেও বয়সের ছাপ পড়েছে। পা দিতে তীব্র প্রতিবাদ করে উঠল। তার সাথে সাথে খিলখিল হাসির শব্দে ভরে গেল…কি ভরে গেল? ঘর? না তো…শব্দের উৎসটা তো দূরের কথা শব্দটা বাজছে কোথায় সেটাই তো বুঝতে পারছে না নাবিলা। শব্দটা কি তবে নাবিলার মাথার ভেতর? এত চিন্তা করার মত শক্তি বা মানসিক অবস্থা কোনটাই নেই এই মূহুর্তে ওর। কেমন যেন ঘোরের মধ্যে চলে গেছে । কেবল বারবার মনে হতে থাকে রায়ান আর রিমনের কথা…কেন যেন মনে হতে থাকে ওদের না নিয়ে এসে খুব ভুল করেছে ও। ধীরে ধীরে সিড়ি ভেঙ্গে উপরে উঠতে থাকে নাবিলা…পচা কাঠে পা দিয়ে সিড়ি ভেঙ্গে যেতে থাকে, নিজেকে সামলে নেয় কোনমতে । আস্তে আস্তে দোতলায় উঠে আসে। সেই গোল করিডোর…পাশে সারি সারি দরজা । সারি সারি দরজা পার হয়ে আস্তে আস্তে একটা ঘরের সামনে এসে দাঁড়ায়। নাবিলা নূরজাহান কে যেন অনুভব করতে পারছে তার মাথার ভেতর। নূরজাহান যেন অনেক আনন্দিত এখন । বার বার ঐ ঘরটাতে ঢুকতে বলে নাবিলা কে, আর কাকে যেন খুঁজতে থাকে নাবিলা বুঝতে পারে না। নাবিলার আর কোন প্রতিরোধের শক্তি অবশিষ্ট নেই তখন। অনিচ্ছুক হাত চলে যায় পুরনো দরজার হাতলে। দরজা খোলাই ছিল। ঘরের ভেতর ঘুটঘুটে অন্ধকার। দেখা যায় না কিছুই। সন্ধ্যা হয়ে আসছে…বাইরেও অন্ধকার প্রায়। কিছুক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে নাবিলা । ঘরের এক কোণে কোথায় যেন ধীরে ধীরে আলো জ্বলে ওঠে…আলোর উৎসের দিকে চোখ যায় নাবিলার। ওখানে একটা ছবির ফ্রেম। তার মাঝে আলো জ্বলছে…একটা মোম…মোমটা একটা মেয়ের হাতে, ছবির ভেতরেই। মোমটায় এক ধরনের অপার্থিব আলো। তেল রঙে আঁকা মোমবাতি থেকে বের হওয়া আলো, অদ্ভুত মায়ামাখা,স্নিগ্ধ। সে আলোয় ঘরের কিছুই আলোকিত হয় না। ধীরে ধীরে ঘরের সবগুলো দেয়ালে এক এক করে আলো জ্বলে উঠতে থাকে। প্রতিটি দেয়ালে অনেকগুলো করে ছবি,প্রতিটি ছবিতে একটা করে মোম হাতে নেয়া মেয়ে। আস্তে আস্তে পুরো ঘরটা আলোকিত হয়ে যায়। ঘরের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে নাবিলা। ওর চারপাশে ৩০-৪০টা ছবি । সবগুলো ছবিই মেয়েদের। কেউ কিশোরী,কেউ যুবতী,তবে সবারই বয়স ২৫ এর নিচে হবে। সবাই এই ছবি জগতের বাসিন্দা। কেউ জলরঙে আঁকা, কেউবা তেল রঙে। আর ঘরের মাঝে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অনেকগুলো মূর্তি, নারীমূর্তি । কোনটা দাঁড়িয়ে আছে…কোনটা আবার মাটিতে অবিন্যাস্ত অবস্থায় পড়ে আছে…পাথরের মনে হল দেখে…না, পাথর নয়…ওগুলো কি? ভাল করে দেখে নাবিলা। প্লাস্টার অব প্যারিস ! সবগুলো মূর্তিই কি তবে প্লাস্টার অব প্যরিস দিয়ে বানানো? নূরজাহানের ছবিটা ছিল ঘরের ঠিক মাঝখানের দেয়ালে…সেই বিয়ের শাড়ি…গত কয়েকদিন আয়নায় দেখে আসা সেই মুখ…সেই স্নিগ্ধ হাসি…ওকে দেখতে পেয়েই নাবিলার মনের সব অনুভুতি যেন একটা স্নিগ্ধ আবেশে ছেয়ে যেতে থাকল…নূরজাহান হাত নেড়ে ডাকে ওকে নিজের দিকে…নাবিলা এগিয়ে যায়। হাত বাড়িয়ে দেয় ওর দিকে নূরজাহান…ঠিক আগের মত…নাবিলা নিজেকে আটকাতে পারে না…ও হাত বাড়িয়ে দেয়। (আগামী খণ্ডে সমাপ্ত)


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৪০ জন


এ জাতীয় গল্প

→ নাবিলা (শায়লা গল্পের দ্বিতীয় খন্ড) ৩য় পর্ব

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now