বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

ম্রিয়মাণ বৈশাখে

"ছোট গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X ম্রিয়মাণ বৈশাখে - সাবিহা বিনতে রইস বাসায় যখন পৌছালাম, তখন আমাদের মফঃস্বলের কানা গলিতে সন্ধ্যের আনাগোনা। দূরে কোন মসজিদ থেকে ভেসে আসছে আজানের ধ্বনি। আজ আট মাস পর বাসায় ফিরছি। চাকরির প্রথম দিকে প্রতি মাসেই বাসায় আসতাম। গত বছর থেকে আর সেটা হচ্ছে না। অফিসের কাজের পাশাপাশি বিসিএসের জন্য পড়াশুনাও বেশ জোরেশোরে চালানো হচ্ছে। প্রাইভেট চাকরির উপর আমার কখনই খুব বেশি ভরসা নেই। ঘরের চৌকাঠে পা দিতেই শাঁখের আওয়াজ শুনলাম। অর্থাৎ মা তুলসি তলায় সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বালাতে ব্যস্ত। পা টিপে বাসায় ঢুকে দেখি,আমার ধারনাই ঠিক। মা প্রদীপ জ্বালিয়ে ঠাকুর স্মরণে মগ্ন। আমি পেছন থেকে জাপটে ধরতেই মা চমকে উঠলো।তারপর একটু ধাতস্থ হয়েই বললো, " তা এতক্ষনে মেয়ের আসার সময় হল? কই দেখি, মুখখানা দেখি একবার।" আমি তখনও মাকে জড়িয়ে ধরে মায়ের ঘ্রাণ নিচ্ছি। আহ! মায়ের গায়ের এই গন্ধ গত আট মাস ধরে পাইনি। অথচ একসময় মাকে ছাড়া ঘুমই হত না আমার। - এত দেরী হল কেন শুনি? - বললাম না ফোনে ট্রেন লেট ছিল। মায়ের ঘাড়ে মুখ বুজেই কথাটা বললাম আমি। - কই? মুখটা তোল? মায়ের জোরাজুরিতে মুখ তুলে চাইলাম। সাথে সাথে তার প্রশ্নের বাণ আমাকে জর্জরিত করতে থাকলো। চোখের নিচে কালী কেন? স্বাস্থ্য খারাপ হলো কেন? ঠিক মত ঘুমাই না, খাই না আরো কত কি! - মা চুপ করো তো! ভাল্লাগেনা আমার - হুম, তা তো লাগবেই না জানি, তুমি কি আর ভাল কথা শোনার মেয়ে? মায়ের কথা গুলো পাশ কাটিয়ে সিড়ি বেয়ে উপরে উঠলাম। নিজের ঘরে ঢুকে অনেক দিন পর প্রাণ খুলে নিশ্বাস নিলাম। এই ঘরটিই একসময় ছিল আমার পৃথিবী। আমার স্বপ্নের দেশ। অজস্র স্মৃতি বাক্স বন্দির মত বন্দি এই ঘরের কোনে। তারপর হুট করেই একদিন ঘর থেকে বাইরের পৃথিবী তে যাতায়াত শুরু করলাম। কমতে শুরু করলো আমার ঘরের সাথে সখ্যতা। --------------------------------------------------------------- চৈত্র্যের শেষ সন্ধ্যা নেমেছে পৃথিবীর বুকে। অবশ্য তার ঢেড় আগে থেকেই গ্রীষ্ম জানান দিচ্ছে আমাদের। ঘরের গুমোট পরিবেশ আর অসহ্য গরমে প্রাণ বের হওয়ার জোগাড়। তাই ঘর থেকে বেরিয়ে ছাদের দিকে ছুটলাম। অবশ্য মা জানলে আজ নিস্তার নেই। ভর সন্ধ্যেবেলা তার ছাদে যেতে দিতে ভীষণ আপত্তি। কিন্তু আমি ওইসব কানে তোলার মেয়ে নই। ছাদে এসেই ঠান্ডা হাওয়ায় প্রান টা জুড়িয়ে গেল। সারা ছাদ জুড়ে বাড়ির সমস্ত কাপড়চোপড় টাঙানো। মনে পড়লো আজ চৈত্র সংক্রান্তি। এই দিনে যাবতীয় ঘরের কাজকর্ম শেষ করে মা নতুন করে বাড়ি কে সাজিয়ে তোলে। তারপর উঠান জুড়ে আলপনা দেয়। নববর্ষের শুরুটা হয় বাড়িতে নারায়নের পূজো দিয়ে। এ আমাদের বাড়ির বহু পুরানো ঐতিহ্য। - এই নীলান্তি,তুই এখন ছাদে এসেছিস কেন? কত বার না বারণ করেছি ভর সন্ধ্যে বেলায় ছাদে আসবি না? - তুমি তো এসেছো! আর আমি আসলেই যত দোষ! - মুখে মুখে তর্ক করবি না। আট মাস পর বাসায় এলি,কোথায় মায়ের সাথে একটু গল্প করবি,তা না করে.... আমি মায়ের মুখে হাত রেখে থামিয়ে দিলাম। তারপর রেলিং ধরে দাড়ালাম ছাদের কিনারায়। ঠিক তখনই চোখে পড়লো ব্যাপার টা।আমাদের বাসার ৩টি বাড়ি পরে, অরুণদাদের বাসাটি অজস্র মরিচ বাতিতে আলোকিত। কান পাতলে শাঁখ, আর উলু ধ্বনির আওয়াজও কানে স্পষ্ট হয়ে ওঠছে। হঠাত্‍ করে বুকের ভেতর দ্রিমদ্রিম আওয়াজে হাতুড়ি পেটানো শুরু হল।অজানা আশঙ্কায় কেপে উঠলো বুকের ভেতর। - মা,অরুনদা দের বাসায় কোন অনুষ্ঠান নাকি? - ওহ,হ্যা! তোকে বলতে ভুলেই গেছি,অরুনের ছোট ভাইটা, ওই যে অনিকেত,তার আজ বিয়ে। কথাটা বুঝতে কিছুক্ষন সময় নিলাম।মুহুর্তের জন্য বোধহয় একটা হার্টবিট মিস করে গেল। তরতর করে নেমে এলাম সিড়ি দিয়ে। তারপর দড়াম করে দরজা টা লাগিয়ে নিজেকে আছড়ে ফেললাম বিছানায়। হুট করে শরীরে কাঁপুনি এল। তারপর ঝড়ের বেগে সমস্ত শিরা উপশিরা নিংড়ে দলা পাকানো কান্না ছুটে এলো চোখে। তীব্র গ্রীষ্মের জীর্ণতাকে ছাপিয়ে বান নামলো আমার গাল বেয়ে। ---------------------------------------------------------------- সময়টা শীতকাল। আমি তখন ক্লাস টেনে পড়ি। অনিকেতদা দের বাসার পাশে এক চিলতে মাঠ ছিল। প্রতিদিন বিকেলেই আমরা সেই মাঠে হৈচৈ করে ব্যাডমিন্টন খেলতাম। অনিকেতদা তখন সবে মাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। পাড়ার সুদর্শন তরুণ হিসেবে উঠতি তরুণীদের কাছে বড্ড পরিচিত সে। কিন্তু তার সেদিকে কোন মন নেই। প্রায়ই এলাকার উচ্চ মাধ্যমিক পড়া দিদিদের কাছে শুনতাম, "অনিকেত কে দেখেছিস!বাব্বাহ,কি ভাব! হেঁটে যেতে গিয়ে যদি ধাক্কা লেগেও যায়,তবুও পাত্তা দেয়না " আমার কাছে অবশ্য অনিকেতদা তেমন ছিল না। স্বাভাবিক সৌজন্যতা,কথা বার্তা সবই হত তার সাথে আমার। মাধ্যমিক পরীক্ষার বেশ কিছুদিন আগে টিউশনি থেকে আসার পথে হঠাত্‍ অনিকেতদার সাথে দেখা। পড়া নিয়ে তুমুল ব্যস্ত থাকায় আমি তখন বাসা থেকে বের হওয়ায় প্রায় বন্ধ করে দিয়েছি। অনিকেতদা আমাকে দেখতে পেয়ে ডাকলেন। - কিছু বলবেন অনিকেত দা? - হু,নীলান্তি শোনো,এইটা তোমার জন্য । তাড়াহুড়োর কোন দরকার নেই। তোমার মাধ্যমিক পরীক্ষার শেষে আমাকে জানিও। আসছি হ্যা? অনিকেতদা হনহন করে হেটে চলে গেলেন। আমার হাতে তখন তার দেওয়া নীলরঙা খাম। আমি অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বেশ কিছুক্ষন দাড়িয়ে থাকলাম। রাতে পড়া শেষে ধীরে ধীরে থাম টা খুললাম। বুকের ঢিপঢিপানি ক্রমাগত বাড়ছে। দেখলাম নীল কাগজে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা রয়েছে,, " ধরো রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি দুজনে,মাথার উপর তপ্ত রোদ,বাহন পাওয়া যাচ্ছেনা এমন সময় হঠাত দাঁড়িয়ে পথ রোধ করে যদি বলি-ভালবাস? তুমি কি হাত সরিয়ে দেবে? নাকি রাস্তার সবার দিকে তাকিয়ে কাঁধে হাত দিয়ে বলবে ভালবাসি, ভালবাসি " পরদিন থেকেই আমার সবকিছু কেমন যেন গোলমেলে হয়ে গেল।অনিকেতদা কে খুব বেশি লক্ষ্য করা শুরু করলাম। তার বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার সময়টা জানালার পাশে ঠাঁই বসে থাকতাম একবার তাকে দেখার জন্য। কিংবা বিকেলে পনিটেইল করে চুল বেধে ব্যাডমিন্টন খেলতে যেতাম। ছুটোছুটিও কম করতাম না। প্রকৃতিতে তখন বসন্ত এসেছে,এসেছে আমার মনেও। অনিকেতদা কে চুপিচুপি আমারও ভাল লাগত। তবে তার প্রশ্রয়ে সেই ভাললাগা ডালপালা মেললো কদিনেই।স্বপ্নের মত দিনগুলো কেটে যেতে লাগলো। কোন কথা ছাড়ায় শুধু চোখাচোখি, কিংবা এক টুকরো হাসি আমাদের মনে পৌছে দিত প্রণয়ের বার্তা। ইতমধ্যে মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হলো। সময় আসলো উত্তর জানানোর।তারপর এক বৈশাখের সূচনায় দেখা হলো অনিকেতদার সাথে।কোলাহলহীন গলিপথ দিয়ে হেটে যাচ্ছিলাম দুজন। অনিকেতদা মাথা নামিয়ে প্রায় ফিসফিস করে বললো, - তা,কি ভাবলে? আমি মাথা নিচু করে হাঁটতে থাকলাম। তারপর খুব ধীরে কনিষ্ঠা আঙ্গুল টা ছোঁয়ালাম তার আঙ্গুলে। অনিকেতদা সাথে সাথেই শক্ত করে হাত টা ধরে বললো, - আর কখনও কিন্তু ছাড়ছি না এই হাত,মনে রেখো! --------------------------------------------------------------- সকালে ঘুম ভেঙে উঠে উঠানে পা দিয়েই দেখি পুরোহিত মশাই পূজো শুরু করেছেন। আশেপাশে বাড়ির বেশকিছু প্রতিবেশি মাসিমা রা এসে পড়েছেন। তাদের সাথে পাড়ার বাচ্চাকাচ্চাদের দলও রয়েছে। আমি আবার ঘরে ফিরে এলাম। পহেলা বৈশাখের সাজ সাজ রব বাড়ির আঁনাচে কাঁনাচে। অবশ্য এর পুরোটাই মায়ের কৃতিত্ব। আমি বারান্দায় গিয়ে দাড়ালাম। আজ বেশ বেলা করে ঘুম থেকে উঠেছি। গরম বাতাসের অনুভূতি সেকথায় জানান দিচ্ছে। কোথাও থেকে হৈচৈ এর শব্দে নিচে তাকালাম। দেখলাম অনিকেতদার সুসজ্জিত বিয়ের গাড়ী গলিতে ঢুকছে। মাথা টা মুহূর্তেই টলে উঠলো। প্রায় দৌড়ে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করলাম। সেই বন্ধ দরজার ফাঁক-ফোঁকর গলে শঁঙ্খ,উলু ধ্বনি আর বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজ মষ্তিষ্কে সজোরে আঘাত করতে লাগলো,বাঁধ না মানা কান্নায় আরেকবার সিক্ত হলো আমার আমিত্ব। --------------------------------------------------------------- অনিকেতদার সাথে দেখা করে ফুরফুরে মন নিয়ে বাসায় ঢুকেই দেখি,ড্রয়ং রুম জুড়ে অচেনা অবয়বের মেলা। বেশ কিছুক্ষন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলাম। বাবা তাদের সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিলেন। ঘরে ঢুকে মাকে জিজ্ঞাসা করলাম,ওরা কারা? মা হেসে বললো,পাত্র পক্ষ ওরা। তোর বিয়ের জন্য এসেছে। ছেলে কানাডায় থাকে। মায়ের হাসিখুশি মুখটির দিকে হতবিহব্বল হয়ে তাকিয়ে থাকলাম আমি। পরের ঘটনা গুলো চোখের পলকে ঘটে গেল। আশীর্বাদ হয়ে গেল পাত্র পক্ষ দেখে যাওয়ার ২দিন পরই। সপ্তম দিনে এক গোধূলী লগ্নে কনের সাজে মন্ডপে বসলাম। পান পাতার ঝাঁজ,ঘি ঢালা আগুনের গন্ধ আমাকে স্তব্ধ করে দিল পুরোপুরি। এই সাতদিনে অনিকেতদার সাথে একবারো দেখা হয়নি,কথা হয়নি। চেষ্টা যে করিনি তা নয়,কিন্তু বিয়ের সম্বন্ধ হওয়া পাত্রীর চৌকাঠের বাইরে পা রাখার নিয়ম নেই,এ আমাদের বাড়ির প্রচলিত ঐতিহ্য। বাবা কে প্রচন্ড ভয় পেতাম আমি। তার সামনে দাড়িয়ে কথা বলার সাহস কখনই ছিলনা আমার। তাই চুপচাপ মন্ত্র উচ্চারণ করে,অগ্নিকে সাক্ষী রেখে সিঁথি রাঙালাম। তারপর কনকাঞ্জলি দিয়ে ছেড়ে আসলাম চিরচেনা স্থান। কিন্তু হৃদয় মনিকোঠায় অক্ষয় হয়ে থাকলো অনিকেত নামটি। --------------------------------------------------------------- নববর্ষের দিনটি কেটে গেল এলোমেলো ভাবে। বার বার মনে পড়তে লাগলো সেই দিনটির কথা, যেদিন প্রথম তার হাতে হাত রেখেছিলাম।সেটিও ছিল কোন এক বৈশাখের সূচনা সময়। সেই বৈশাখ এসেছিল আমার জীবনে এক দূর্ণিবার কালবৈশাখী নিয়ে। বিয়ের সাতদিন পরই অগ্নি সাক্ষী করা জীবন সঙ্গী দেশ ছেড়েছিল। কথা ছিল, তিনমাস পর আমাকেও তার সঙ্গী হতে হবে। কিন্তু আড়াই মাসের মাথায় এক দূর্ঘটনায় সে পৃথিবী ছাড়লো। আর আমি কূলটা,অপয়া নাম নিয়ে সাদা থান পড়ে আবার সেই চিরচেনা চৌকাঠ মাড়ালাম। আমার বন্ধু-বান্ধবী রা ততদিনে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হয়েছে। কিন্তু আমি তখন অন্ধকার ঘরের স্থায়ী বাসিন্দা। কৈশোর না পেরুনো মেয়ের এমন অবস্থা সহ্য করতে না পেরে হঠাত্‍ একদিন বাবাও স্বর্গের পথে যাত্রা করলেন। আমি বিকেলে কিংবা খুব ভোরে তখন জানালার পাশে বসতাম। চোখ ভর্তি কান্না নিয়ে এক চিলতে আকাশ দেখতাম,কান পেতে বন চড়ুইয়ের গান শুনতাম। অনিকেতদার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফেরার পথে প্রায়ই আমাদের চোখাচোখি হত। আমি দেখতাম,সাদা থান পড়া নীলান্তির দিকে তার দুচোখের নির্বাক দৃষ্টি। ----------------------------------------------------------------- - মা,,আমি আজ বিকেলের ট্রেনে চলে যাব। - চলে যাবি মানে!! সবে তো ২দিন হল এলি। তোর না বেশ কিছুদিন ছুটি ছিল? - ছিল,,কিন্তু কাজ পড়ে গেছে। যেতেই হবে। কথা টি বলেই সরে আসলাম মায়ের সামনে থেকে। মায়ের মূখটা দেখে বড্ড মায়া হল। কিন্তু উপায় নেই। এইখানে এক মুহূর্ত থাকতে আমার দম বন্ধ লাগছে। দুপুর নাগাদ ব্যাগপত্র নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম। বাসা থেকে রেল স্টেশন রিক্সায় ঘন্টাখানেকের পথ। তারপর নক্ষত্র মেইল ধরে আবার সেই ব্যস্ত নগরে প্রবেশ। বাসা থেকে যতই দূরে চলে আসতে থাকলাম, ততই মনে দুঃখ,রাগ,ক্ষোভ টা বাড়তে থাকলো। বাবা মারা যাওয়ার পর অনিকেতদা একবার বাসায় এসেছিল। আমি তখন চার দেয়ালে ঘেরা খাঁচায় পালক কাটা এক বন্দি শালিক পাখি। অনিকেতদা জীবন টা নতুন ভাবে দেখাতে চেয়েছিল। হাতে হাত রেখে বলেছিল, - নীলান্তি,তোমাকে নীল ছাড়া এই মলিন সাদায় বড্ড বেমানান দেখায়। তার কথায় প্রচন্ড কান্নার দমকে কে কেঁপে উঠেছিলাম আমি।ভেবেছিলাম হয়ত সত্যিই এইবার জীবন টা রঙিন হতে চলেছে। কিন্তু সে সৌভাগ্য আর হলো না। অপয়া অপবাদকে মাথায় নিয়ে আমার, তার সংসারে প্রবেশের অনুমতি মিললো না। অনিকেতদা অবশ্য তা মানতে চায়নি। সবার সব কথা অগ্রাহ্য করেও সে আমাকে চেয়েছিল। কিন্তু শেষকালে আমিই সরে দাড়ালাম। শহরের কলেজে ভর্তি হয়ে অনেক দূরে চলে সরে গেলাম তার থেকে। পুরানো কথাগুলো মনে হতেই আবার চিত্‍কার দিয়ে কাঁদতে ইচ্ছে হলো।মনে হলো কেন আমার জীবনটা এত কঠিন?কেন আমি পেলাম না তাকে? ঠিক সাথে সাথেই মনের আরেকটি দিক সমস্ত রাগ কে আছড়ে ফেললো ওই অজানা অচেনা মেয়েটির উপর,যে কিনা আজ আনিকেতদার সাত জন্মের সঙ্গিনী হয়েছে। স্টেশনে পৌছে দেখলাম বেশ ভীড়। নক্ষত্র মেইল প্লাটফর্মে এসে ঢুকেছে। ভীড় ঠেলে এগিয়ে যেতেই এক ব্যক্তির সাথে ধাক্কা লাগলো। বেশ ভীড় বলে হুমড়ি খেয়ে পড়তে গিয়েও পাশের মেয়েটি খপ করে তার হাত ধরে ফেললো। আমায় তখন সেসব দেখার সময় নেই।ট্রেনের হুইসেল বাজতে শুরু করেছে। কোন রকমে ট্রেনে উঠেই ধপ করে বসে ফেললাম। তারপর জানালার বাইরে তাকাতেই চমকে উঠলাম।অনিকেতদার হাত ধরে এক মেয়ে দাড়িয়ে আছে। সিঁথিতে তার রক্তিম সিঁদুরের আভা। অদ্ভুত মায়াবী চোখে সে অনিকেতদার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলাম তাদের দিকে। সম্বিত্‍ ফিরলো ট্রেনের শব্দে। মৃদু ঝিকঝিক আওয়াজে ট্রেনটি চলতে শুরু করেছে। হঠাত্‍ পুরো শরীর কাঁপিয়ে কান্না পেল। শক্ত করে ঠোট চেপে তার গতিরোধ করলাম,সাথে সাথে খেয়াল হলো বুক টা বড্ড বেশি হালকা হয়ে গেছে। মন থেকে রাগ ক্ষোভ গুলো মুছে যেতে থাকলো। এই প্রথমবার মনে হলো ওই মায়াবী চোখের মেয়েটি অনিকেতদাকে খুব ভাল রাখবে। ট্রেন ছুটে চলছে ব্যস্ত নগরের ঠিকানায়। আমি কান্না মুছে জানালার বাইরে চোখ রাখলাম। সেখানে তখন খা খা রোদ্দুরের ম্রিয়মাণ বৈশাখ বিরাজমান...


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৭৯ জন


এ জাতীয় গল্প

→ ম্রিয়মাণ বৈশাখে

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now