বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
মেয়ের গােঙানির শব্দে ঘুম ভাঙল মাজেদা বেগমের। ঘুম প্রায় আজকাল হয়ই না তার। এখন সাত মাস চলছে৷ শুয়ে বসে কোনভাবেই স্বস্তি পান না।
তাড়াতাড়ি উঠে আলো জ্বাললেন। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন ৷ হালকা নীল আলোর চুপচাপ শুয়ে আছে মিতা। মশারীর ফাঁক দিয়ে সুন্দর মায়া ভরা মুখটকু দেখা যাচ্ছে। 'এই মিতা।‘ ঝাঁকানি দিলেন মেয়েকে মৃদুভাবে। 'স্বপ্ন দেখছিলি ?'
চোখ চাইল মিতা। কয়েকমুহূর্ত তাকিয়ে রইল ফ্যালফ্যাল করে। তারপর স্বাভাবিক হয়ে এল। “হ্যা। এখন না। সকালে বলব।'
“ওই ঘরে শুবি? ভয় লাগছে?"
ঘাড় নাড়ল মিতা ৷ কী যে হয়েছে মেয়ের-সাত আট মাস হয়ে গেল সব সময় আলাদা বিছানায় ঘুমাবে ৷ মেঝেতে অঘোরে ঘুমুচ্ছে হাবুর মা। বুকটা সামান্য ওঠানামা করছে। তাতেই বোঝা যাচ্ছে বেচে আছে ৷
শুয়ে শুয়ে মিতা স্বপ্নটার কথা ভাবছে। বড় অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখেছে সে।
অন্ধ একটা মেয়ে হেটে যাচ্ছে সমুদ্রের ধারের রাস্তা দিয়ে। কয়েকটা ছেলেমেয়ে পিছু নিয়েছে তার। ক্ষ্যাপাচ্ছে ৷
'সামনে একটা পাথর আছে। ঘুরে যাও।’
'এদিকে গেলে সোজা পানিতে পড়বি ৷'
চুপচাপ হাঁটছে মেয়েটা। দশ এগারো বছর বয়স। দৃষ্টিহীনের আড়ষ্ট, সাবধানী হাঁটা। দুই হাত শূন্যে ভাসছে। বোঝার চেষ্টা করছে কোনও বাধা আছে কি না।
হাসছে দুষ্টু ছেলেগুলো। খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল চুপচাপ মেয়েটা। সন্দেহ দেখা দিল মনে। এই পথ তার মুখস্থ ৷ বহুবার গেছে এখান দিয়ে। তবু কোনও ভুল হচ্ছে না তো?
কী করবে যে এখন। মনকে শান্ত করল অনেক চেষ্টা করে। ছেলেদেরকে পাত্তা না দেওয়াই ভাল। পাজী ছেলেমেয়ে সব।
‘তাের মা নাগর নিয়ে বসে আছে। জলদি বাড়ি যা।'
'তাের বাবাই নাকি ভাড়া খাটায়। আব্বার কাছে শুনেছি।’
কান ঝাঁ ঝাঁ করছে মেয়েটার ৷ মাথা ঠাণ্ডা রাখতে চেষ্টা করল তা সত্বেও ৷
সামান্য ভুল হলেই বিপদ হতে পারে। কয়েকবার এদিক ওদিক পা বাড়িয়ে পরখ করল সে। কয়েকটা নুড়ি ঠেকল পায়ে। এই পথে তো নুড়ি নেই। তা হলে ? সমুদ্রের আওয়াজ শুনে দিক খোঁজার চেষ্টা করল মেয়েটা। জোরে বাতাস বইছে আজ। চারদিক থেকেই ভেসে আসছে জলরাশির গর্জন। ভয় পেল সে এবার।
হাততালি দিয়ে হাসছে ছেলেমেয়েগুলাে ৷ মনে হচ্ছে চারদিক ঘিরে রেখেছে ওরা। বায়ে একটু ঘুরল মেয়েটা। সম্ভবত এটাই।
পাঁচ সাত হাত এগিয়ে গেল সামনে। হঠাৎ একটা বড় পাথরে ঠেকল হাত। ক্ষুদ্র বুকটা কেঁপে উঠল অজানা আশঙ্কায়।
ঠিকই আছে ৷ যাও না, বিকৃত স্বরে বলল একজন।
কয়েক পা পিছিয়ে এল সে এবার। সমুদ্রের গর্জনের শব্দ হঠাৎ বেড়ে গেল। একটা গাংচিলের কর্কশ ডাক শোনা গেল কাছেই।
সোজা সামনে হাটবার চেষ্টা করল মেয়েটা। অসহায় বোধ করল ভীষণ ভাবে। আর কত দূরে ?
এক পা সামনে এগোতেই বুঝতে পারল ভুল হয়ে গেছে ৷ পিছিয়ে আসার চেষ্টা করল তাড়াতাড়ি ৷ কিন্তু দেরি হয়ে গেছে ৷
শরীরের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেল। বাতাসে কয়েকবার দ্রুত পাক খেল ছোট দুটো হাত। টের পেল শূন্যে ভাসছে তার শরীর।
চারপাশ থেকে ঠাণ্ডা পানি এসে যখন তাকে ঘিরে ধরল তখন কোনও কষ্ট অনুভব করল না মেয়েটা।
তার সমস্ত মন জুড়ে তখন ভর করেছে ভীষণ ক্রোধ। কেন, কেন সে দেখতে পায় না? কেন তাকে এভাবে অসহায় অবস্থায় পড়তে হলো?
ঘৃণা আর রাগে তখন চারপাশের পরিস্থিতি বেমালুম ভুলে গেছে মেয়েটা। ভয়ে দম বন্ধ হয়ে আসছে আর তখনই মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙল মিতার ৷ বুঝতে পারল ঘেমে গেছে সারা শরীর৷ স্বপ্নের মেয়েটার কথা মনে পড়ল। খুব মায়া হলো তার জন্যে ৷ কেমন যেন চেনা চেনা লাগল ওকে। কোথায় দেখেছে আগে?
নতুন স্কুলে আজই প্রথম গেল মিতা। চট্টগ্রাম শহরের স্কুলের সাথে কোনও তুলনাই চলে না এর। সব কিছু ছোট ছোট। শেলী আর চম্পাকে খুব ভাল লাগল ওর। প্রথম দিনই ওকে বেঞ্চে বসার জায়গা করে দিয়েছে ওরা।
কিন্তু শিউলিকে পছন্দ হয়নি। কেমন যেন হিংসুটে চেহারা মেয়েটার। মিতা স্কুলে ফার্স্ট হত শুনে চেহারা শুকনো হয়ে গেছে ওর। এ পর্যন্ত শিউলিই ছিল ফার্স্ট গার্ল। শেলীই সাবধান করে দিল ওকে।
‘শিউলিটা খুব হিংসুটে আর খুব ডাট। ওর বাবা তো সওদাগর। খুব বড়লােক। কাউকে পাত্তাই দেয় না। '
মিতার মন খারাপ হয়ে গেল। নতুন জায়গায় এসেই কারও সাথে মন কষাকষি করতে চায়নি ও। কিন্তু কপাল খারাপ। আমি ওর সাথে ঠিকই খাতির জমাতে পারব দেখো। আমার নামই তো মিতা।'
‘চেষ্টা করেই দেখো না।'
ঘণ্টা বাজার পর এগিয়ে গেল মিতাই ৷
‘তোমার নাম শিউলি?'
'হ্যা। তোমার?
‘তোমরা ওই পুরনো জমিদার বাড়িটা কিনেছ?’
‘হ্যাঁ। খুব সুন্দর না বাড়িটা?'
'সুন্দর না ছাই। ক'দিন গেলেই বুঝতে পারবে।‘
খেঁকিয়ে বলব শিউলি। মুখ কালো করে চলে এল মিতা৷ মেয়েটা আসলেই হিংসুটে। ওরা জমিদারবাড়ি কিনেছে বলে হিংসা কাছে ৷ মনে মনে রাগ হলো তার।
'তােমরা আমাদের বাসাতে খেলতে এসো, কেমন?' চম্পা, শেলীদেরকে বলল মিতা
মুখ চাওয়াচাওয়ি করল ওরা।
“না, ভাই। অতদূরে মা যেতে দেবে না। তারচে' তুমিই বরং এসো আমাদের বাসায়।‘
“বারে,আমার বুঝি দূর হবে না?'
তা হলে সাগরের ধারে আম বাগানে খেলব আমরা, কেমন?'
তা না হয় হলো। তাই বলে আমাদের বাসাতে আসবে না কেন?'
চোরা চােরা মুখে হাসল শেলী ৷ কোনও উত্তর দিল না।
ক্লাশে প্রথম দিনটা ভালই কাটল মিতার ৷ বাসার ফিরতেই মা জিজ্ঞেস করলেন, 'কীরে, কেমন লাগল স্কুলে।'
“খুব ভাল। জানাে, আম্মু, এখানে আপা, স্যাররা না খুব ভাল ৷ একদম বকে না। শেলী, চম্পা, চিত্রা এরাও খুব ভাল ৷'
'এরি মধ্যে এত বন্ধু জুটে গেছে?'
“হ্যা ৷' হঠাৎ কী মনে পড়ল, বলল, কালকে জুলেখাকে স্কুলে নিয়ে যার, আম্মু ৷ আজকে মনেই ছিল না।’
“কথা শোনো ধাড়ি মেয়ের। ক্লাস ফাইভের মেয়ে পুতুল নিয়ে স্কুলে গেলে হাসাহাসি করবে না সবাই?’
‘করলে করবে। আমি ওদের ধার ধারি নাকি?'
হাত মুখ ধুতে বাথরুমে গিয়ে ঢুকল মিতা। মাজেদা বেগম্ খুশি হয়েছেন যে মিতার স্কুল ভাল লেগেছে। চট্টগ্রাম শহরের স্কুলের কথা মনে পড়ল তার। মেয়ে, ‘পালিতা মেয়ে' বলে খুঁচিয়ে প্রায় পাগল বানিয়ে দিয়েছিল মিতাকে।
সেই ভয় এখনও কাটেনি তাঁর৷ এখানে কেউ যদি আবার জেনে ফেলে তা হলে? মেয়ের মায়াভরা মুখটা মনে হতেই বুকটা খাঁ খাঁ করে উঠল। বারো বছর পর তার নিজের সন্তান আসছে।
সহ্য করতে পারবে তো মিতা? নাকি নিজেকে অবহেলিত মনে করবে? মনস্তাত্তিক সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে না তো? অজানা আশঙ্কায় মুখটা মলিন হয়ে গেল।
হাজার হোক মিতাই তাদের প্রথম সন্তান।
বিকেলবেলা হাটতে বেরুল মিতা। উত্তর দিকে চট্টগ্রামের রাস্তা ৷ সেদিকে গেল না সে ৷ পুব দিকে সাগর৷ ওদের বাসা থেকে প্রায় চারশো গজ দূরে হবে।
সরু পায়ে চলা পথ। কিছুদূর হাঁটতেই গোরস্তানটা চোখে পড়ল মিতার। অনেক পুরনো লাল ইটের নিচু দেয়াল। পলেস্তরাে খসে পড়েছে ৷ ঝোপঝাড় লজ্জাবতী লতায় ভর্তি। সিমেণ্ট আর মার্বেল পাথরে ঘেরা কবরগুলাে প্রায় দেখাই যাচ্ছে না। কয়েকটা হেডস্টোন খুব উঁচু। ত্রিশ চল্লিশটার মত কবর। ঠায় দাঁড়িয়ে থাকল মিতা।
ভেতরে ঢোকবার ইচ্ছা হলো। কিন্তু একটু ভয় ভয়ও লাগছে। আম বাগানটা নজরে পড়ল ওর৷ কবরস্তানের পাশেই ৷
দোলনায় দুলছে একটা ছোট ছেলে। আরেকটা মেয়ে ধাক্কা দিচ্ছে পাশে দাঁড়িয়ে। মিতার চেয়ে ছোটই হবে মেয়েটা ৷ ছেলেটা আরও ছোট।
ওদের দিকে এগিয়ে গেল মিতা। দাঁড়িয়ে রইল দোলনার পাশে।
‘তুমি দোলনায় ঝুলবে?’ ছোট্ট ছেলেটা বলল। খুব মিষ্টি চেহারা ছেলেটার।
ইস্ ৷ এ রকম একটা ভাই থাকত আমার। ভাবল মিতা ৷ মনটা খারাপ হয়ে গেল হঠাৎ। নিজের বাবা মারই খবর নেই। আবার ভাই।
দোলনা থেকে নেমে এসে হাত ধরে ওকে টানছে ছেলেটা৷ “তুমি খেলবে? তা হলে এসো।‘
"তোমার নাম কি?"
"টুনু। ওর নাম বিলু।" মেয়েটাকে দেখাল টুনু।
খুশীভরা চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে মেয়েটা। কিন্তু কিছু বলছে না ৷ আবার কথা বলল টুনু। "বিলু কথা বলতে পারে না।’
'তোমার বোন না?'
'হ্যাঁ।'
দােলনায় দুলতে গিয়ে হাত থেকে ফসকে নীচে পড়ে পেল মিতার পুতুলটা ৷
চম্পাকে দেখতে পেল সে। আম বাগানে এসে দাড়িয়েছে। ‘কী, তোমার পুতুল। খুব সুন্দর তাে।
চম্পার কাছ থেকে নিয়ে নিল পুতুলটা মিতা। 'এইটা আমার বন্ধু ৷’
‘কোথেকে কিনেছ?’
'পেয়েছি। আমাদের নতুন বাসার দােতলায়,’ খুশীভরা কণ্ঠ মিতার।
সন্দেহভরা চোখে চাইল চম্পা। আগে থেকেই ছিল ওটা?’
'হ্যাঁ।'
'পুতুলটা ফিরোজার ছিল। আমি দেখেছি ওর কাছে
এটা ফেলে দিও। ভাল না।,’ বিরল চোখে বলল চম্পা ৷
'এত্তবড় পুতুল ফেলে দেব, না?
'নইলে ফিরােজার মত তুমিও মরবে ৷'
চম্পার উপর রাগ হলো মিতার ৷ এসব কথার মানে কী? ‘মরব মানে?’
‘তােমাদের বাসায় আগে থাকত ফিরোজা। দুদিন পুতুলটা দেখেছিলাম ওর কাছে ৷ তারপরই তো ছাদ থেকে পড়ে মারা গেল ও ৷ হাতে তখন এটা ছিল।'
'ধ্যাৎ ৷ '
“চলো ওই দিক থেকে ঘুরে আসি।শেলীদের বাসা না ওটা?’
'চলো।’
টুনুদের রেখে হাঁটতে লাগল ওরা ৷ শেলীকে দেখা গেল ওদের বাসার বারান্দায় ৷ মিতাদের সাথে যোগ দিল সেও।
'এখানে এসে অনেক বন্ধু হলো আমার। সবচেয়ে আগে বন্ধু হয়েছে জুলেখা।’ বুকে চেপে ধরল মিতা জুলেখাকে।
'কে?’ অবাক হলো শেলী ৷
পুতুলটাকে দেখাল মিতা।
বিস্মিত চোখে চম্পার দিকে চাইল শেলী।
'এই নামটা তুমি কোথায় পেলে?'
“মনে হলো তাই দিলাম ৷ একটু পুরনো ধরনের পুতুল তো।'
'কেউ বলেনি তােমাকে?’ চোখ আরও বড় হলো।
'নাহ। '
মিতাকে এড়িয়ে আবার মুখ চাওয়া চাওয়ি করল ওরা। কিছু একটা কথা বিনিময় করল চোখে চোখে।
'এসো আমার সঙ্গে ৷’
মিতাকে টানতে টানতে কবরস্তানের দিকে নিয়ে গেল শেলী। ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ, বুঝতে পারছে মিতা। সেও কোনও কথা না বলে ওদের সাথে ঢুকল গোরস্থানে।
একটা অনেক পুরনো কবরস্তানের কাছে এল শেলী। ঝুঁকে দেখল কিছু একটা। তারপর ঘাস লতাপাতা হাত দিয়ে সরিয়ে একটা হেডস্টোন বের করল। খোদাই করা সিমেন্টে ছোট্ট করে লেখা, 'জুলেখা।'
আর কিছুই লেখা নেই। কবে জন্ম... কবে মৃত্যু, বাবা মার নাম, নেই।
মিতা কিছু বুঝতে পারল না। শেলী আর চম্পা বিচিত্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। কিন্তু ঘাবড়াল না মিতা।
‘চলো আম বাগানে গিয়ে খেলি ৷' কিন্তু শেলী আর চম্পার মধ্যে খেলার কোনও আগ্রহ দেখা গেল না।
বেশ কয়েকবার মিতাকে আড়চোখে তাকিয়ে দেখল ওরা।
(ক্রমশ)
--------
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now