বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
সবাই সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তকোচ্ছে মিতার দিকে। রশীদ চেয়ারম্যান বলেই ফেললেন, ‘মেয়েটাকে অন্য কোথাও পাঠিয়ে দিন, আহাদ সাহেব। এখানে থাকাটা ওর নিজের জন্যেই খারাপ হবে।'
মাজেদা বেগম এই প্রথম মারলেন মেয়েকে। চড় খেয়ে কোনও কথা বলল না মিতা। কাঁদল না পর্যন্ত। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। চুপচাপ নিজের ঘরে এল সে। সেই কপুঁরের গন্ধটা নাকে এল ৷ হিসহিস করে উঠল পরিচিত কণ্ঠ।
"আমি ছাড়া আর কেউ তোমার বন্ধু নয়। শত বছর ধরে তোমার অপেক্ষায় ছিলাম আমি। 'তুমিও আমার বন্ধু নও। তুমি আমার ক্ষতি করতে চাও।'
ক্ষুব্ধ স্বরে বলল মিতা। “না না।' আর্তনাদ করে উঠল কণ্ঠটা ৷ 'তােমার চোখেই আমি দেখছি সব ৷ কাউকে আমি ছাড়ব না।'
‘কী চাও তুমি'? কান্না কান্না সুরে বলল মিতা ৷
"আমার মায়ের কী হয়েছিল দেখতে চাই। দেখাও আমাকে।"
“কী দেখাব?'
'উঠানে চলো… ওঠাে।' দরোজার খিল খুলে বাইরে বেরিয়ে এল মিতা। খালি পায়ে নিঃশব্দে হাটছে। বুকে শক্ত করে ধরে রেখেছে জুলেখাকে। উঠানে নেমে স্টোররুমের কাছে এল ও।
'ভেতরে ঢোকাে৷'
“কী করে ঢুকব্? তালা দেযা যে ৷' অসহায় শোনাল ওর গলা।
"ভাঙো তালা৷"
ভাঙো’ কর্কশ শোনাচ্ছে কন্ঠ। ছোট্ট টিপ তালাটায় প্রচণ্ড জোরে চাপ দিল মিতা। কখন যে কেটে গেছে নরম হাত বুঝতেও পারল না। কিন্তু খুলে গেল তালা। উজ্জ্বল চাঁদের আলোয় পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে সব৷ কাঁচের জানালা দিয়ে চুইয়ে পড়ছে আলো ৷ অদ্ভুত আলো আঁধারির খেলা ঘরটাতে। এক কােনায় কিছু জিনিসপত্র স্তুপ করা। 'দেখো কী হচ্ছে এখানে। দেখো ৷ বলো আমাকে।'
প্রাচীন খসখেসে গলায় বলল সে। এতক্ষণে কালো ফ্রক পরা মেয়েটাকে দেখতে পেল মিতা। দাঁড়িয়ে আছে ওর পাশেই। কড়া গন্ধে ভরে গেল ঘরটা। মিতার চোখের সামনে ধোয়াটে আবছায়া ৷ মনে হচ্ছে কোনও এক অজানা পরিবেশে দাঁড়িয়ে আছে সে। কয়েকবার কেঁপে উঠল ওর সামনের কুয়শার চাদর। স্পষ্ট দেখতে পেল সে খুব সন্দর চেহারার একটা মেয়ে শুয়ে আছে দামী চাদরে ঢাকা বিছানায়। অদ্ভুত মায়াবী হাসি ওর মুখে। সামনেই বসে আছে লম্বা একহারা একটা লোক। পুরু গোঁফ আর ঝাকড়া চুল লোকটার ৷ সালােয়ার কামিজ পরা মেয়েটার মাথা হাতের ওপর নিয়ে বসে আছে সে। মাথাটা ঝুঁকিয়ে কিছু একটা বলছে ৷
"বলো কী দেখছ। বলো আমাকে।"
তীব্র কঠিন কণ্ঠে বলল কালো ফ্রক পরা মেয়েটা। হুবহু বর্ণনা করল মিতা যা দেখছে তাই। এবার হাসছে ওরা ৷ পকেট থেকে দামী একটা নেকলেস বের করল লোকটা। খুব যত্ন করে পরিয়ে দিল মেয়েটার গলায়৷ চোখে চোখে তাকিয়ে হাসল ওরা ৷
এই পর্যন্ত শুনেই করুণ তীক্ষ্ণ স্বরে বলল কালো ফ্রক পরা মেয়েটা, “হায় হায় আমাকে যারা খেপাচ্ছিল… ওরা তা হলে মিথ্যে বলেনি ! '
হিংস্র দেখাচ্ছে কালো ফ্রক্ পরা মেয়েটাকে। ঘৃণায়, কষ্টে বিকৃত হয়ে গেছে ওর মুখ। হঠাৎ চমকে উঠল গোঁফঅলা লোকটা।
দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়েছে আরেকজন লোক। জমিদারী কেতায় শেরওয়ানী পরে আছে। দু চোখ ঠিকরে আগুন রেরােচ্ছে ওর। দাঁতে দাঁত চাপছে রাগে।
আচমকা বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠে এক প্রচণ্ড ধাক্কায় শেরওয়ানী পরা লোকটাকে ঘরের কোনায় পাঠিয়ে দিল গোঁফঅলা ৷ তারপর এক দৌড়ে বাইরে চলে গেল। সেদিকে ফিরেও তাকাল না নতুন লোকটা। তার হাতে ততক্ষণে চলে এসেছে লম্বা একটা ছুরি। দুপা সামনে এগিয়ে এল সে।
ভয়ে, আতঙ্কে বিছানার সাথে কুঁকড়ে গেছে মেয়েটা। করুণ সুরে মিনতি করছে ৷ ' ম্লান আলোয় ভরে গেছে ঘর। নির্মমভাবে পুরো ছুরিটা খ্যাচ করে মেয়েটার বুকে বসিয়ে দিল লােকটা। রক্ত পানি করা স্বরে আর্তনাদ করে উঠল মেয়েটা। আর্তনাদ করে উঠল মিতাও ৷ রক্তে ভেসে যাচ্ছে বিছানা, মেঝে। দুহাতে চোখ ঢাকল সাথে সাথে। মিলিয়ে যাবার আগে কঠোর কণ্ঠে বলল কালো ফ্রক পরা মেয়েটা, 'উচিত শিক্ষা হয়েছে তোমার গুল বাহার বেগম।‘
ঘোর কেটে গেল মিতার। নিজেকে আবিষ্কার করল সে উঠােনের ছোট ঘরের ভেতর একা। সারা শরীর কাঁপছে উত্তেজনায় ৷
একটা আর্তচিত্কার শুনে ঘুম ভেঙে গেল মাজেদা বেগমের। কী ব্যাপার? চোর ডাকাত? নাকি অন্য কিছু? স্বামীকে ডেকে তুললেন তিনি। দরজা খুলে ৰারান্দায় এসে দাড়ালেন কী ব্যাপার জানতে। উঠানের দিক থেকেই এসেছে চিতকারটা।
এদিক ওদিক কিছুক্ষণ তাকিয়েই ছোট্ট ঘরটার দিকে দৃষ্টি গেল মাজেদা বেগমের ৷ দরজা খোলা কেন? ‘এই দেখছ ওই ঘরের দরজা খোলা কেন ?'
‘চাের নাকি?’ ফিসফিস করে বললেন আহাদ সাহেব।
হঠাৎ একটা হার্টবিট মিস হয়ে গেল তাঁর ৷ মাজেদা বেগমেরও রক্ত হিম হয়ে গেল ভয়ে।
খোলা ঘরের ভেতর থেকে জুলেখাকে কোলে নিয়ে সন্তর্পণে হেঁটে বেরিয়ে আসছে মিতা।
কিংকর্ভা1বিমূঢ় হয়ে পড়লেন আহাদ সাহেব। হাতের টর্চটার কথা মনে পড়ল তাঁর। সরাসরি মেয়ের মুখের উপর ফেললেন আলো ৷
'ওখানে কী করছ, মা এত রাতে?'
চমকে বারান্দার দিকে চাইল মিতা। ভিড়মি খাবার যােগাড় হলো আহাদ সাহেবের। সারামুখে রক্তের দাগ মিতার।
‘ও মাগাে।‘ বলেই জ্ঞান হারালেন মাজেদা বেগম। খপ করে পড়ন্ত শরীরটাকে ধরে ফেললেন আহাদ সাহেব ৷ আস্তে করে শুইয়ে দিলেন বারান্দার ওপর।
মিতা উঠে আসছে ওপরে ৷ সিঁড়িতে হালকা পায়ের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।
বাড়িটা ছেড়ে দেবার সিদ্ধান্ত নিলেন আহাদ সাহেব। এখানে থাকলে মাজেদা বেগম হয়তো পাগল হয়ে যাবেন। মিতাকেও হারাতে হতে পারে।
এরিমধ্যে সবার আতঙ্কের বস্তুতে পরিণত হয়েছে মেয়েটা। স্কুলে যাওয়া বন্ধ ৷ কেউ খেলতে চায় না ওর সাথে। মাথা খারাপ হতে দেরি নেই ওরও।
ওদিকে রশীদ গিন্নী বাড়ি বাড়ি বলে বেড়াচ্ছেন মিতা ইচ্ছা করেই বিলুকে মেরে ফেলেছে ৷ শিউলিকেও ওই ফেলে দিয়েছে ঢাল থেকে।
এখানে আর না। কেউ বাড়িটা না কিনলে এটাকে ফেলে রেখেই চলে যাবেন কুসুমপুর ছেড়ে ৷
মিতাকে আলাদা ঘরে শুতে দিলেন না মাজেদা বেগম। জুলেখাকেও আনতে দিলেন না এ ঘরে। বড় খাটের ওপর ঠাসাঠাসি করে শুয়ে রইলেন সবাই মিলে।
বেহুঁশ হয়ে ঘুমাচ্ছে মিতা। সুন্দর মুখটা ক্লান্ত লাগছে ৷ এই ক'মাসে অনেক শুকিয়ে গেছে মিতা। সত্যিই খুব কষ্ট পেয়েছে মেয়েটা।
আহাদ সাহেবের বুকে মমতা উথলে উঠল ৷ মিতার মুখটা একটু একটু নড়ছে। হঠাৎ চোখ খুলে চাইল সে। কিন্ত আহাদ সাহেবকে দেখতে পেল বলে মনে হলো না।
বিছানা থেকে আলতো ভাবে নেমে পড়ল মিতা ৷ কাঠ হয়ে শুয়ে রইলেন আহাদ সাহেব।
বিছানা থেকে আলভাে ভাবে নেমে পড়ল মিতা ৷ কাঠ হয়ে শুয়ে রইলেন আহাদ সাহেব ৷
কোথায় যাচ্ছে মেয়েটা? সতর্কভাবে রুমের বাইরে বেরিয়ে এল মিতা। চুপি চুপি হাটছে নিজের ঘরের দিকে৷
ঘরে ঢুকে জুলেখাকে হাতে নিল সে। কান খাড়া করে রইলেন আহাদ সাহেব ৷ নিজেও সন্তর্পণে উঠে এসেছেন৷ পষ্ট মিতার দুর্বল গলা শোনা পেল, ‘তুমি চলে যাও। তোমার জন্যে আমার খুব কষ্ট হচ্ছে।'
চমকে উঠলেন আহাদ সাহেব ৷ কী বলছে মেয়েটা? হঠাৎ দ্বিতীয় আরেকটা কণ্ঠ শুনে ঘাবড়ে গেলেন তিনি।
‘যাব না আমি। কিছুতেই না। সব কিছু দেখতে চাই আমি।'
"তুমি চলে যাও ৷ দোহাই তোমার। '
"কিচ্ছুতেই না। বেশি বাড়াবাড়ি করলে তােমাকেও ছাড়ব না।' হিংস্রভাবে হিসহিস করে উঠল মিহিকণ্ঠটা।
ধাক্কা দিয়ে দরেজ্যে খুলে মিতাৱ রুমে ঢুকে পড়লেন আহাদ সাহেব ৷
মেঝেতে জুলেখাকে রেখে তার সামনে স্থির বসে আছে মিতা পাতলা ঠোট দুটো রাগে হতাশায় মৃদু কাপছে।
ঘরে আর কেউ নেই।
‘কার সঙ্গে কথা বলছ?'
চমকে উঠল মিতা। বাপের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘জুলেখার সঙ্গে।'
মেয়েকে আদর করে বুকে টেনে নিলেন আহাদ সাহেব। হয়তো ভুল শুনেছেন ৷ ‘জুলেখা একটা পুতুল মা। এত রাতে ওর সাথে কথা না বললেও ও ,রাগ করবে না।’
মিতা কোনও করা বলল না। শুধু বাপের বুকে মুথ ঘষতে লাগল ৷
সকালবেলা মিতার চেহারায় এ প্রসন্নতা লক্ষ করলেন আহাদ সাহেব।
"দেখেছ মিতাকে একটু খুশি খুশি লাগছে আজ।'
‘হ্যাঁ। সায় দিলেন মাজেদা বেগম৷ 'মনমরা ভাবটা কেটে গেছে। ‘
হাসি হাসি মুখে এগিয়ে এল মিতা। ‘এই পুতুলটা ভাল না, আব্বু। আমার সাথে শুধু ঝগড়া করে ৷'
'তাই নাকি ? খুব পাজী তো ৷’
"পুড়িয়ে ফেলো ওটাকে।‘ পুতুলটাকে শেষ করে দেবার সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইলেন না মাজেদা বেগম।
তাই করব।" বলেই হন হন করে রান্নাঘরের দিকে হাটতে লাগল মিতা।
স্বামীর দিকে চেয়ে মুচকি হাসলেন মাজেদা বেগম। কোলে হাত পা নাড়ছে অবােধ রীতা ৷
'আপদ বিদেয় করাই ভাল।‘
হাবুর মা নাস্তা বানাচ্ছিল রান্নাঘরে ৷ মিতাকে ঢুকতে দেখে অবাক হয়ে গেল।
‘এইহানে কী আপামণি?’
'জুলেখাকে পুড়িয়ে ফেলব।,' গম্ভীরভাবে বলল মিতা ৷
'হেইডাই ভালো। খুব খারাপ জিনিস এইডা।'
গনগনে আগুন বেরুচ্ছে বড় চুলার মুখ থেকে। একটু ইতস্তত করল মিতা। "তারপর জুলেখার মাথাটা ঢুকিয়ে দিল চুলার ভিতরে।
প্রচণ্ড উত্তাপে কুঁকড়ে ছোট হয়ে গেল মাথাটা। মিতার মনে হলো ব্যথায় আর্তনাদ করছে জুলেখা। একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল সে গলে যাওয়া পুতুলটার দিকে ৷ খেয়াল করল না কখন একফাকে আগুনের একটা হালকা শিখা আলতাে ভাবে ছুয়ে পেল তার জর্জেটের জামাটাকে।
প্রথমে হাবুর মার চােখে পড়ল জামার ঝুলের কোনার ছোট্ট আগুনটা ৷
'আগুন। ইয়া আল্লা। আগুন। আপা।’
লাফিয়ে এল বুড়ি মিতার দিকে ৷ কিন্তু অনেক দেরি হয়ে গেছে। চমৎকার ডিজাইন করা জর্জেটের জামাটাকে মুহূর্তেয মধ্যে গ্রাস করল লেলিহান শিখা। ভয়ে আতঙ্কে মরণ চিৎকার জুড়ে দিল হাবুর মা।
(সমাপ্ত)
---------
।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now