বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

মৌন সত্যঃ- সুদেব ভট্টাচার্য

"ছোট গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান Sayemus Suhan (০ পয়েন্ট)

X অনেকদিন পরে গেলাম ঋতু কাকিমাদের বাড়ি। কাকু মানে ঋতু কাকিমার স্বামী আমাদের পুরোনো বাড়িওয়ালা। এ পাড়ায় তেমন তো আর আসাই হয় না এখন। অথচ আমার গোটা শৈশবটাই পড়ে আছে এই বাড়ির কোনায় কোনায়। একটানা দশ বছর ভাড়া ছিলাম আমরা। তাই বাড়িওলা- ভাড়াটে সম্পর্ক ঘুচিয়ে কবেই যেন অজান্তে আমরা আত্মীয় হয়ে গিয়েছিলাম। এখন আমরা এখান থেকে মিনিট কুড়ি দূরে থাকি নিজেদের বাড়িতে। তবু এই বাড়িটাকেও কেন জানিনা কখনো পরের ভাবতেই পারি না। এটাও তো আমার বাড়ি। নাই থাকুক আইনী দাবী, নাছোড়বান্দা স্মৃতিমেদুর দিনগুলির দাবীকে কি অস্বীকার করা যায়? কাকিমা তো বেজায় খুশি আমাকে দেখে। পারলে এখনো ছোট্ট তাতাস ভেবে গালে চুমু খেয়ে বসেন। কাকু অবশ্য বাড়ি ছিলেন না তখন। কিন্তু কাকিমাদের বাড়িতে বেশ লোক সমাগম হয়েছে দেখে খানিক অবাক হলাম। ঢোকার সময় দরজার কাছে দেখলাম অনেকগুলি চটি রাখা আছে। আমি জিজ্ঞেস করতে কাকিমা বললেন ওনার গুরুদেব যোগী প্রেমানন্দ এই বাড়িতে তার পদধূলি দিয়েছেন বছর তিরিশ বাদে।তাই কিছু ভক্ত সমাগম হয়েছে। এতদিন তিনি হিমালয়ের কোলে তপস্যা করেছেন। গতমাসে তিনি সমতলে নেমে এসছেন ভক্তদের দর্শন দেবেন বলে। আবার কদিন বাদেই ফিরে যাবেন হিমালয়ের পাহাড়ে। কাকিমা আমাকেও খুব করে বললেন তার গুরুদেবের সঙ্গে একবার দেখা করতে। ওনার স্থির বিশ্বাস সাধুজীর আশীর্বাদ পেলে আমার মায়ের বাতের ব্যাথাটা পুরো সেরে যাবেই। প্রথমে আমি একটু এড়িয়েই যাচ্ছিলাম এই সব দর্শন-প্রণাম। আমি নাস্তিক বলে কলেজে বেশ বদনামও কুড়িয়েছি। তাই সাধারণত এই ধারটা ঠিক মাড়াই না। কিন্তু শেষমেশ কাকিমার পীড়াপীড়িতে গেলাম ওনার গুরুজীর ঘরে। এতক্ষনে ভক্ত সংখ্যা প্রায় কমে এসেছে। আমাকে কাকিমা নিয়ে গেলেন বাবাজীর কাছে। দেখলাম প্রকাণ্ড গোফ দাড়ির আড়ালে বৃদ্ধ মানুষটার মুখের অর্ধেকই প্রায় ঢাকা। আমি কাকিমার ইশারা সত্ত্বেও কিছুতেই পায়ে হাত দিয়ে প্রনাম করতে পারলাম না। মন সায় দিল না। শুধু হাতজোড় করে নমস্কার বিনিময়টাই করলাম। সাধুজীর তাতে তেমন অসন্তুষ্টি বোঝা গেল না, তবে কাকিমা হয়ত একটু রাগই করলেন। আমাকে দেখে সাধুজী হাতের বিশেষ একটি মুদ্রা করে কিছু বলতে চাইলেন। কিন্তু তার মুখ থেকে কোনো কথা বেরলো না। আমি বুঝতে না পেরে কাকিমার দিকে চাইলাম। কাকিমা বললেন ওনার গুরুদেব ত্রিশ বছর ধরে মৌনী নিয়েছেন। উনি কথা বলেন না। আমি তো শুনে হা! নিজের চোখকেই বিশ্বাস হচ্ছিল না। আমার সামনে একজন মৌন সন্ন্যাসী বসে আছেন? মনে মনে লোকটার ওপর বিরক্ত হলাম। ভন্ডামির আর জায়গা পায় না এরা? ত্রিশ বছর মুখে খিল দিয়ে বসে আছে? ধুস! যতসব! তবে ততক্ষনাত আমার মাথায় একটা আইডিয়া খেলে গেল। সাধুসন্তদের যাচাই করার সুযোগ পেলে আর কে ছাড়ে? আমি কাকিমাকে বললাম যে আমার কিছু ব্যাক্তিগত সমস্যার কথা আছে যা আমি বাবাজীকে আলাদাভাবে বলতে চাই। কাকিমা তো আমার ভক্তি দেখে উৎফুল্ল। বাবাজী আমার বাসনায় সম্মতি জানানোয় সবাই ছেড়ে বেরিয়ে গেল। আমি বাবাজীকে বললাম, " শুনুন, আমার নাম মহেন্দ্র এবং আমি একজন বিজ্ঞানের শিক্ষক । এসব বুজরুকি, সাধনা, ঠাকুর দেবতায় অত ভক্তি টক্তি নেই। তাই পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম-ট্রনাম আমার আসে না। তাই আমার মতে আপনি ভেক ধরে ঋতু কাকিমার মত ভালোমানুষের বিশ্বাসের সুযোগ নিচ্ছেন।" দেখলাম সাধুবাবা আমার দিকে তাকিয়েই আছে। তার মুখের শিশুসুলভ হাসিটি মেলায়নি এতটুকু। এরকম নীরবতা আমার সহ্য হয় না। আমি আবার বললাম," দেখুন, আমি জানি আপনি কথা বলতে পারেন এবং বলেনও। আমি যা বলছি তাও ভালোমতই বুঝছেন। সুতরাং আমার সামনে ভেক ধরে লাভ বিশেষ হবে না। আপনিআমার সঙ্গে কথা বলতে পারেন। তবে আমি প্রতিজ্ঞা করছি আপনার কোন কথা আমি বাইরে জানাব না। এই ঘরে আপনি আর আমি ছাড়া কেউ নেই। বাইরে বললেও আমার কথায় কেউ আমল দেবে না। আপনি আবার বোবার অভিনয় করে সবাইকে সম্মোহিত করে নেবেন।" বাবাজী তাও হাসেন। কিছুই বলেন না। এবার আমার বেশ বিরক্ত লাগল। আমি বললাম "আপনি যদি ভালো কথায় উত্তর না দেন তাহলে আমি কিন্তু একটু কঠোর হব। আগাম ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি তার জন্য।" আমি সামনে রাখা জ্বলন্ত মোমবাতিটা নিয়ে বললাম, "ছ্যাকা খেলে নিশ্চই মুখ থেকে শব্দ বেরোবে!" উনি তাও নির্বিকার। আমি মোমবাতিটা ক্রমশ ওনার হাতের কাছে নিয়ে যেতে লাগলাম। আরএকটু হলেই তো বেশ ভালো তাপ লাগার কথা। কিন্তু এখনো তো টু শব্দটি করল না দেখছি। অবশেষে আমিই হার মানলাম। এসব ছোটখাট চুটকিতে কাজ হবার নয়। বুঝলাম, বাবাজী ভালো মত ট্রেনিংপ্রাপ্ত। তখনও আমার দিকে উনি তাকিয়ে হাসছেন। অগত্যা আমি উঠে চলেই আসছিলাম । তারপর কি মনে হতে ঘুরে দাড়িয়ে বললাম, "দেখুন, আপনি নাটক করছেন তা বুঝতেই পারছি। কিন্তু যদি কোনো কারনে আপনি সত্যিই অনেকদিন কথা বন্ধ করে দিয়ে থাকেন তাহলে কিন্তু ভারী মুশকিল। কারণ আপনার জিভ এতদিনে আড়ষ্ট হয়ে যাবার কথা। আপনি আর চাইলেও কথা বলতে পারবেন না সেক্ষেত্রে। আজ রাতে নিজে চেষ্টা করে দেখতে পারেন একবার আমি মিথ্যা বলছি কি না। আজ আসি।" দেখলাম সাধুজী এখন বেশ গম্ভীর হয়ে গেছেন। কিন্তু সেই মুখে কুলুপ আটাই রয়েছে। আমার ধৈর্যের বাধ ভেঙেছে।আমি দরজা খুলে গটগট করে বেরিয়ে এলাম ঘর থেকে। তারপর কাকিমার হাতের পায়েস খেয়ে বাড়ি ফিরে এলাম। কদিন পরে ঋতু কাকিমার ফোন এল বাড়িতে। আমাকে শিগগির যেতে বলেছেন উনি। কোন বড়সড় বিপদ আপদ ভেবে পড়ি কি মরি করে ছুটে গেলাম। এদিকে গিয়ে শুনলাম অন্য কথা। গতকাল যাবার আগে কাকিমার গুরুদেব আমার জন্য একটি চিঠি ছেড়ে গেছেন এবং তা শুধু আমাকেই দিতে বলেছেন। আমার জন্য বাবাজীর চিঠি? এ তো স্বপ্নেও ভাবা অসম্ভব! যাই হোক আমি খুলে পড়তে লাগলাম। তাতে লেখা ছিল - "বাবা মহেন্দ্র, তুমি ঠিকই বলিয়াছিলে । সেই দিন তুমি চলিয়া যাইবার পর আমি রাত্রে একা একা শুইয়া ভাবিয়াছি যে এতদিনের চর্চার অভাবে সত্যই কি আমার বাকশক্তি চলিয়া গিয়াছে? আমি সেইদিন বহু চেষ্টা করিয়াছিলাম। কিন্তু দু একটি গোঙানির শব্দ ব্যাতীত একটিও কথা আমার মুখ হইতে বেরোয়নাই । আমার আলজিভ সম্পূর্ণ অসাড় হইয়া গিয়াছে। সারারাত্রি আমি নিশ্চুপে চোখের জল ফেলিয়াছি। তবে এই কথা সত্য যে আমি ত্রিশবছর একটিও কথা কই নাই এবং চেষ্টাও করি নাই গোপনে। সেইদিন তোমার কথা শুনিয়া আমি প্রথমবার চেষ্টা করিয়াছিলাম এবং পরে বুঝিয়াছিলাম আমি মায়া হইতে মুক্ত হইতে পারি নাই। তাই অবোলা শিশুর মত কাঁদিয়াছিলাম নিজের শোকে। তুমি আমারে দর্পন দেখাইয়াছ বাবা। তাই আমি আবার সাধনা করতে লাগিব। ঈশ্বর আমাকে ক্ষমা করুন। ইতি - বাবাজী " লেখাটা পড়ে আমি কাগজটা তাড়াতাড়ি পকেটে চালান করলাম। কাকিমা জানতে চাইলে বললাম গুরুদেব এক গুপ্তমন্ত্র আমাকে দান করেছেন। এর বেশি কিছু বলা যাবে না। এই বলেই সেদিন বাড়ি ফিরে এলাম। কিন্তু সেদিন রাতে আমার কিছুতেই ঘুম এল না। এরই সঙ্গে বাবাজীর প্রতি আমার দুর্ব্যবহারের কথা বারবার মনে পড়ে গেল। কষ্ট হল এই ভেবে যে লোকটা আর যাই হন না কেন নিসন্দেহে সৎ একজন মানুষ। তার বিশ্বাস যাই হোক না কেন, ত্রিশ বছর ছলচাতুরী ছাড়াই তিনি সাধনা করেছেন মৌনব্রত নিয়ে - এতে কোনো সন্দেহ নেই। আর আজ তিনি বোবা হয়ে গেছেন সম্পূর্ণ। জানি, ওনার বিশ্বাসের আসনে আমার সন্দেহের ত্রিশুল পৌছবে না কোনদিনই। মানুষটার জন্য কেমন করে উঠল মনটা। আর আমি কি না তাকে ছ্যাকা দিতে...... ছি ছি! বড় ভুল হয়ে গেছে... এরপর কখনো দেখা হলে ক্ষমা চেয়ে নেব অবশ্যই। তবে সাধুজী হয়ত নিজেও জানলেন না যে তার অলক্ষেই তিনি এক গুপ্ত মন্ত্র আমাকে সত্যিই দিয়ে গেলেন - সততার মন্ত্র। এই ভাওতাবাজির যুগে নিজের কাছে সৎ থাকার মন্ত্র। আর শুধুমাত্র এটুকুর জন্যেই তাকে শতবার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করা যায়।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১৩৪১ জন


এ জাতীয় গল্প

→ মৌন সত্যঃ- সুদেব ভট্টাচার্য

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now