বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।
রবিবার সকাল। রাজধানীর আকাশটা অদ্ভুত ধূসর। রোদের তীব্রতা নেই, কিন্তু বাতাসে একটা অস্থির গন্ধ। সাংবাদিকরা ক্যামেরা গুছিয়ে নিচ্ছে, পুলিশ ব্যারিকেড দিচ্ছে, আর প্রেস ক্লাবের সামনে জড়ো হতে শুরু করেছে মানুষ— সাধারণ মানুষ নয়, শিক্ষক।
বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ট্রেনে, বাসে, লঞ্চে চড়ে আসা এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা আজ আবার পথে নেমেছেন।
তাদের মুখে কোনো স্লোগান নেই শুরুতে, আছে ক্লান্তি আর চেপে রাখা ক্ষোভ।
মিরপুরের রফিক স্যার হাতের মাইক্রোফোন ঠিক করতে করতে বললেন,
— “আজ আমরা শত্রুর সঙ্গে লড়ছি না, আমাদেরই লোকেদের প্রতারণার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছি।”
পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন কুমিল্লার আনিস মিয়া, চোখে ধুলাবালি জমেছে, কিন্তু দৃষ্টি তীক্ষ্ণ।
— “দুই মাস আগে আমরা এখানে এসেছিলাম। তখন শিক্ষা উপদেষ্টা আমাদের ডেকে নিয়ে বলেছিলেন— ৪৫% নয়, ২০% বাড়াবো। সরকারের সক্ষমতা এইটুকুই। আমরা রাজি হয়েছিলাম, কারণ আমরা ভেবেছিলাম কথা রাখবে।”
রত্না আপা— নওগাঁর এক স্কুলের বিজ্ঞানের শিক্ষিকা— ব্যাগ থেকে পানি বের করে বললেন,
— “সরকারের সক্ষমতা যখন ৫০০ টাকায় সীমাবদ্ধ হয়, তখন লজ্জা লাগে শিক্ষক হয়ে।”
সামনে জনতা বাড়ছে, ব্যানার উড়ছে— “২০ নয়, ৪৫ চাই”, “শিক্ষকের সম্মান রাষ্ট্রের সম্মান।”
কেউ কেউ ঢাকায় প্রথম এসেছেন, কেউ আবার তৃতীয় বা চতুর্থবার। কিন্তু সবার মুখে একটাই ভাষা— “প্রতারণা আর সহ্য হবে না।”
মাইকে বক্তৃতা শুরু হলো।
মোশাররফ স্যার, যিনি সারাজীবন একটি উপজেলা স্কুলে হেডমাস্টার ছিলেন, চোখ মুছলেন ঘামে ভেজা রুমাল দিয়ে। তাঁর কণ্ঠ ভারী কিন্তু দৃঢ়—
— “আমরা দান চাই না, অধিকার চাই। শিক্ষার নামে যারা আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করছে, তারা কেবল আমাদের নয়, জাতিকেও ধ্বংস করছে।”
হঠাৎই এক শিক্ষক দলের কেউ চিৎকার করে বলল, “দেখেন, প্রঙ্গাপন আসছে!”
সবাই হুড়োহুড়ি করে ফোনে খবর খুঁজতে লাগল।
পাঁচ মিনিট পর রত্না আপা সেই খবরটা পড়ে শুনালেন— “সরকার ৫০০ টাকা বাড়ি ভাতা বৃদ্ধির প্রঙ্গাপন জারি করেছে।”
কিছুক্ষণের জন্য নিস্তব্ধতা। তারপর হাসির শব্দ উঠল, কিন্তু সেটা আনন্দের নয়— তিক্ত ব্যঙ্গের।
আনিস মিয়া বিড়বিড় করে বললেন, “৫০০ টাকা! ঢাকায় তো এখন এক কাপ কফি দেড়শো টাকা। তার মানে তিন কাপ কফি আর একটা বিস্কুটের দাম।”
রত্না আপা তীব্র গলায় বললেন,
— “এটা ভাতা না, অপমান। আমাদের ঘাম, আমাদের পরিশ্রম, সব কিছুর মূল্য তারা ৫০০ টাকা ধরেছে।”
চারদিক থেকে মানুষ স্লোগান দিতে শুরু করল—
— “৫০০ টাকায় মিথ্যা মর্যাদা নয়!”
— “প্রতারণার প্রঙ্গাপন বাতিল কর!”
বিকেল নামছে। সূর্যের আলো ম্লান হয়ে আসছে, কিন্তু শিক্ষকদের মুখে জ্বলে উঠছে নতুন আলো— প্রতিবাদের আলো।
একটি সিদ্ধান্ত হলো, সবাই শহীদ মিনারে যাবে।
মিছিলের প্রথম সারিতে রফিক স্যার, হাতে জাতীয় পতাকা। তাঁর মুখে ধীর কণ্ঠে কবিতার মতো উচ্চারণ,
— “যে শিক্ষক রাস্তায় নামতে জানে না, সে কখনো আলোকিত সমাজ গড়তে পারে না।”
শহীদ মিনারের দিকে যেতে যেতে দেখা গেল, পুলিশ এখন দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করছে। কেউ বাধা দিচ্ছে না, হয়তো ভয় পাচ্ছে— শিক্ষকদের চোখের আগুন দেখেছে তারা।
শহীদ মিনারের পাদদেশে বসে পড়ল হাজারো শিক্ষক। রত্না আপা ব্যাগ থেকে কয়েকটা মোমবাতি বের করলেন, সবাই মিলে জ্বালাতে লাগলেন।
আনিস মিয়া ফিসফিস করে বললেন,
— “আমাদের এই মোমগুলো শুধু আলোর নয়, অপমানের প্রতিশোধ।”
এক বৃদ্ধ শিক্ষক পাশে বসে ছিলেন, হয়তো অবসরপ্রাপ্ত। তিনি নিঃশব্দে বললেন,
— “বাবারা, আমি ষাটের দশকে আন্দোলন দেখেছি, মুক্তিযুদ্ধ দেখেছি। আজকের এই আন্দোলনেও সেই গন্ধ আছে— আত্মমর্যাদার গন্ধ।”
হঠাৎ এক ছোট্ট ছেলেকে দেখা গেল দাদুর হাত ধরে শহীদ মিনারের পাশে দাঁড়িয়ে। ছেলেটি কৌতূহলভরে জিজ্ঞেস করল,
— “দাদু, এত মানুষ কেন এখানে?”
বৃদ্ধ হেসে বললেন,
— “কারণ, যারা শেখায়, তাদেরই শেখাতে হচ্ছে কীভাবে অন্যায় চিনতে হয়।”
চারদিকে তখন মোমবাতির আলো। শিক্ষকরা গলা মিলিয়ে গাইতে লাগলেন—
“তুমি আলোর পথ দেখাও, অন্ধকারে পথ খুঁজে পাই…”
সেলিম নামে এক তরুণ শিক্ষক চুপচাপ নিজের খাতায় লিখতে লাগল—
“আজ আমাদের ঘাম, রোদ, অপমান— সব কিছুই ইতিহাসের অংশ হলো। আমরা হয়তো কাল জিতব না, কিন্তু আজ যে আলো জ্বেলেছি, তা কেউ নিভাতে পারবে না।”
রাত বাড়তে লাগল। শহীদ মিনারের চারপাশে পুলিশও নীরব হয়ে দাঁড়িয়ে। মনে হচ্ছিল, এই নীরবতা ভেতরে লুকানো শ্রদ্ধা।
আকাশে হালকা বৃষ্টি শুরু হলো। কয়েকটা মোমবাতি নিভে গেল, কিন্তু বেশিরভাগ এখনও জ্বলছে।
রত্না আপা আনিস মিয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— “বৃষ্টি পড়ছে, ঘরে ফিরবেন?”
আনিস হেসে বললেন,
— “আমাদের ঘর এখন এখানে, মিনারের পাদদেশে। যতক্ষণ না এই বৃষ্টি অন্যায়ের ধুলা ধুয়ে নেয়।”
দূরে কোথাও থেকে ভেসে আসছে আজানের ধ্বনি। যেন এই রাতের আন্দোলনেও এক ধরণের পবিত্রতা যোগ হলো।
পরদিন সকালে যখন পত্রিকাগুলো বের হলো, শিরোনামগুলো নানা রকম। কেউ লিখেছে— “শিক্ষকদের ন্যায্য দাবি নিয়ে উত্তাল শহীদ মিনার।”
আবার সরকারি বিবৃতিতে বলা হলো— “কিছু শিক্ষক বিভ্রান্তির কারণে আন্দোলন করছেন।”
শিক্ষকরা হাসলেন। কারণ তাঁরা জানতেন, এই হাসির মধ্যেই আছে তাদের জয়ের শুরু।
কারণ যে শিক্ষক অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলে, সে একদিন ছাত্রদের শেখাবে কিভাবে মাথা উঁচু করে বাঁচতে হয়।
শহীদ মিনারের পাশে পড়ে থাকা গলে যাওয়া মোমের গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে আছে।
আনিস মিয়া ধীরে ধীরে বললেন,
— “আমাদের দাবিটা হয়তো আজও মিটলো না, কিন্তু আজ আমরা প্রমাণ করলাম— শিক্ষক মানে কেবল পাঠদাতা নয়, তিনি এই জাতির বিবেক।”
সেই রাতের মোমবাতিগুলো নিভে গেল ঠিকই, কিন্তু তাদের আলো থেকে জন্ম নিল এক নতুন ভোর—
যেখানে শিক্ষক আর রাষ্ট্রের সম্পর্ক হবে সম্মানের, প্রতারণার নয়।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now