বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

মোহনের সাথে

"রোম্যান্টিক" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X মোহনের সাথে আমার পরিচয়ের গল্পটা মোটেও গৌরবের কিছু নয়। না ওর সাথে আমার যোগাযোগ রক্ষা করাটা বিন্দুমাত্র সম্মানের বিষয়। বরং ওর সঙ্গদোষে আমার প্রতিনিয়ত দূর্নাম রটে আর মোহন জনতার হাতে বেধড়ক পিটুনি খায়। অথচ তবু কোন এক অদৃশ্য মোহটানে মোহন প্রায় প্রতিদিন আমাদের বাড়ির আসেপাশে ঘুরঘুর করে। রাত বাড়লেই চুপিচুপি এসে আমার রুমের কোনায় চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকে কাকতাড়ুয়ার মত। আমি টের পাই ওর উপস্থিতি কিন্তু পরিবারের ভয়ে সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারি না, পারি না জানালালা খুলে একনজর দেখতে সেই হতভাগা ছেলেটাকে। তবু আমি অনেক রাত পর্যন্ত পড়াশোনার অজুহাতে জেগে থাকি আর অপেক্ষা করি সবার ঘুমিয়ে যাবার। রাত গভীর হলে চুপিচুপি প্রায় নিঃশব্দে জানালা খুলি, আমাকে দেখে মোহনের মুখ আকর্ণবিস্তৃত হাসিতে ভরে ওঠে। জানালার পাশে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটাকে দেখে বড্ড মায়া হয় আমার। সেই সাথে রাগ ও, কড়া কন্ঠে জানতে চাই, কেন এসেছিস এখানে? মোহন হাসে। উত্তর দেয় না.... আমি ততোধিক রেগে বলি, যা এখান থেকে, যা ভাগ! মোহন বিনা বাক্যব্যিয়ে ধিরে ধিরে চলে যেতে থাকে, ওর ছায়াটা অন্ধকারে মিলিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমি দাঁড়িয়ে থাকি জানালার পাশে। তারপর একসময় মনের অজান্তে একটা দীর্ঘসশ্বাস ফেলে বিছানায় এসে শুয়ে পড়ি। আমার শোয়া দেখে অয়ন নড়েচড়ে পাশ ঘুরে শোয়, আমি বুঝতে পারি অয়ন জেগে আছে, সব ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে সে। এ নিয়ে আমার ভাবনা হয় না আর, আমি মনেমনে প্রস্তুত থাকি অয়নের বিদ্রূপাত্মক প্রশ্নের কড়া জবাব দেয়ার জন্য, কিন্তু অয়ন কোণ প্রতিক্রিয়া না দেখিয়েই ঘুমিয়ে পরে। আমি শুয়ে শুয়ে এপাশ ওপাশ করি, কিছুতেই আমার চোখে ঘুম আসে না। বারবার মোহনকে মনে পড়ে। কোথায় এখন সে, কোথায় পড়ে আছে এই পৌষের হিমঝরা রাতে? . আমি নয়ন। এবার ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিলাম। আর অয়ন আমার মেঝোভাই, যদিও দুবছরের সিনিয়র কিন্তু আমি ওকে নাম ধরেই ডাকি, ভুলেও হয়তো কখনো ওকে ভাই বলি নাই। অয়নের হাতে স্মার্ট ফোন ছিল, সেই ফোন দিয়ে ও আমায় দেখিয়ে দেখিয়ে ফেসবুক চালাতো, গেম খেলতো। বছর খানিক আগের কথা, বহু প্রাণান্তকর চেষ্টা, মান_অভিমান, কান্না করে বড় ভাইয়ার কাছ থেকে আমিও একটা ফোন আদায় করে নিলাম। কিন্তু ভাগ্য খারাপ হলে যা হয় ফোনটা কয়েক মাসের ব্যবধানে হারিয়ে আমি তো পাগল প্রায়, গেম ফেসবুকের নেশা তখন আমার চরমে পৌছে গেছে কিন্তু বড়ভাই আমাকে আর ফোন কিনে দিচ্ছিল না। ওদিকে বদের হাড্ডি অয়ন বড় ভাইয়াকে বুঝাচ্ছিল, নয়নকে আর ফোন কিনে দিয়ো না ভাইয়া! সামনে ওর এস এস সি পরীক্ষা, ফোন হারিয়েছে না বেশ হয়েছে! রাগে দুঃখে কেঁদে ফেলতাম, ভাবতাম আল্লাহ কেন আমায় জন্মের আগেই আমার জন্য পৃথিবীতে অয়নের মত একটা মায়ের পেটের শত্রু বানিয়ে পাঠিয়েছে! তেমনি একদিন আমি ফোনের শোকে মনমরা হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম, কেঁদেকেটে মায়ের কাছ থেকে পাঁচশত টাকা আদায় করেছি কিন্তু একটা নরমাল ফোনের দাম ও তার থেকে অনেক অনেক গুণ বেশি। ভাবছিলাম সেকেন্ড হ্যাণ্ড কিছু পাওয়া যায় কিনা, কিন্তু সেকেন্ড হ্যান্ড ফোন ও যখন আমার সাধ্যের বাইরে তখন আমি প্রায় মুষড়ে পড়লাম, রাগে জেদে ভাবতে লাগলাম আমি প্রতিশোধ নেবো, পরীক্ষায় প্রত্যেকটা সাবজেক্টে ফেল পরে অয়ন আর বড়ভাইয়াকে বুঝিয়ে দেবো শুধু হাতে ফোন থাকলেই রেজাল্ট খারাপ হয়না, না থাকলেও হয়। বিকেলের দিকে ফেরি ঘাটের দিকে গিয়েছি, তখন-ই একটু দূরে একটা জটলা দেখে কৌতুহলী হয়ে এগিয়ে গেলাম। জীর্ণ পোষাক আর অতোধিক জীর্ণশীর্ণ চেহারার একটা ছেলে বয়স মনে হয় বাইশ তেইশ হবে, আমার চেয়ে ছয় সাত বছরের বড় তো হবেই। তার গায়ের রং যথেষ্ট ময়লা তবে সে যে দেখতে ফর্সা ছিল একসময় তা ভালোই বোঝা যাচ্ছে। ছেলেটার হাতে বেশ দামি একটা ফোন, আর আশেপাশের সবাই তার দাম হাকছে। ছেলেটা ফোনটার দাম চেয়েছে এক হাজার টাকা আর অন্যরা কিনতে চাইছে দুইশত টাকায়। আমি তো পুরো হতভম্ব হয়ে গেছি। চোখের সামনে চকচকে সুন্দর একটা ফোন!! আমার বুকপকেটে তখন পাঁচশত টাকার একটা কড়কড়ে নোট! এ সুযোগ হাতছাড়া করে পরে আপসোস করার ছেলে আমি নয়! হঠাৎ আমি ভীর ঠেলে এগিয়ে গিয়ে বেশ তাড়াহুড়ো করে বলে উঠলাম, আমি পাঁচশত টাকা দিবো!! প্লীজ ফোনটা আমাকে দাও!! উপস্থিত সবাই প্রায় ভড়কে গেল! ফোন বিক্রেতা ছেলেটা আমার দিকে তাকিয়ে হাসল, অসাধারণ সেই হাসি! আমি ততক্ষণে ফোনটা নিয়ে নিয়েছি! আমি যেন পৃথিবীর সব পেয়ে গেছি! এত্ত সুন্দর ফোন! আমি কল্পনায় দেখতে পাচ্ছি আমার ফোনের তুলনায় অয়নের হাতের ফোনটা তো নেহায়েত খেলনা! ও আমার ফোন দেখে কি জেলাস ই না হবে!! এসব ভাবনায় ছেদ পড়ল ছেলেটার ডাকে! কিরে জলদি টাকা দে! খুব নেশা লাগছে রে! জলদি দে! আমার আশেপাশের অন্যরা ততোক্ষণে আমার উপর ভারি ক্ষেপেছে! তাদের হাতের মুঠোয় চলে আসা ফোনটা আমি ছোঁ মেরে নিয়ে নিলাম বলে! তারচেয়ে নাকি বড় কথা ফোনটা তারা দুইশত টাকা দিয়েই নিতে পারতো! মোহন হিরোনচি'র এখন নেশা লাগছে সে পঞ্চাশ টাকাতেও ফোন দিয়ে দিতো! আমি ছেলেটাকে (যার নাম এইমাত্র জানলাম, মোহন হিরোনচি) পকেট থেকে টাকাটা বের করে দিলাম। মোহন ছোঁ মেরে টাকাটা নিয়ে ভীরের মধ্যে থেকে উধাও হয়ে গেল! ততক্ষণে ফোনপ্রাপ্তির আনন্দ টা আমার স্বাভাবিক মাত্রায় নেমে এসেছে। আমি অন্যদের কাছে জানতে চাইলাম, ও এত কম দামে ফোন বেঁচল কেন? আর এত দ্রুত যাচ্ছেই বা কোথায়? সবাই আমার বোকামি দেখে হাসল, বলল, আরে বাদ দে হিরোনচি'র কথা, ব্যাটা ছিচকা চোর আর নেশাখোর। তোর হাতের ফোনটা হয়তো মাত্র-ই কারো পকেট মেরেছে! জলদি বাড়ি যা, এক্ষণি খোঁজা খুঁজি শুরু হতে পারে! ছ্যাঁত করে উঠল আমার বুকের ভেতর! না! ফোন আমি কাউকে দেবো না! তারপর প্রায় ঝড়ের গতিতে দৌড়ে সেদিন বাড়ি চলে এলাম! ভয় আর আনন্দের সে এক মিশ্র অনুভূতি! . বিষয়টা এখানেই শেষ হতে পারতো, কিন্তু অয়ন আমায় অতিষ্ঠ করে তুলল ফের। এবার আর রাগ ঝাড়ি নয়, প্রবল ভালোবাসায় সে আমাকে ভাইরে আমার সোনা ভাই, লক্ষী ছেলে এই কথা দিচ্ছি আর তোকে জ্বালাবো না বলে পটাতে শুরু করল, কাহিনী একটাই, অল্প টাকাতে অয়নেরও আমার মতই সুন্দর একটা ফোন চাই! আমিও যথেষ্ট ভাব নিয়ে ওকে ব্যস্তসমস্ত করে তুলছি, কিন্তু মনে মনে অনেকটাই গলে গেছি, হাজার হোক ভাই তো নাকি! ( অয়নের তেল দেয়ার ক্ষমতা অসাধারণ!) চেষ্টা করেই দেখি পাওয়া যায় কিনা! তাছাড়া অয়নের কাছ থেকে কিছু টাকাও মেরে দেয়া যাবে! আগের বার পাঁচশ দিয়ে ভুল করেছি! এবার ও তাই দেব নাকি! পাগল! কিন্তু অয়ন তো আমাকে গুণে সাতশো দেবে বলেছে! আহা! কতগুলো টাকা বেচে যাবে! পরদিন টাকাগুলো নিয়ে আমি ফের ঘাটে এলাম, এদিক সেদিক তাকিয়ে মোহনকে খুঁজছি, কাকে জিজ্ঞেস করি? কে খুঁজে দেয়? অবশ্য মোহন হিরোনচি বললে নাকি সবাই ওকে এক নামে চেনে। কিন্তু গ্রামের সম্মানিত ভদ্র ঘরের ছেলে হয়ে একটা হিরোইনখোর ছিচকে চোরকে খোঁজা যে চরম লজ্জার। সে আমি কিছুতেই পারবো না, ঠিক তখনি একটা হইচই শোনা গেল, এবং মুহুর্তে দেখলাম মোহন ঘাটের দিক থেকে রুদ্ধশ্বাসে দৌড়াচ্ছে, পেছনে ধর ধর রব। ভয়ে চমকে গেলাম ভীষণ। বাড়ি ফিরে এলাম তক্ষণী। কিন্তু অয়নের চাপে বিকেলে ফের আসতে হলো, আসলে ফোন কেনার মাঝে যে লাভ টা আমার হবে তা হাতছাড়া করতে মন সায় দিচ্ছিল না! বিকেলে সহজেই দেখা হয়ে গেল মোহনের সাথে। আমাকে দেখে তার বিখ্যাত হাসি মুখে পরিচিত মানুষের মত এগিয়ে এলো সে। ওর হাসিটা প্রথম দিন-ই খেয়াল করেছিলাম, আজ আরো সুন্দর লাগল চোখে। মোহন আন্তরিক ভঙ্গিতে বলল, সকালে দেখলাম তোমায়, কিন্তু..... আমি অবাক হয়ে ভাবলাম সেই দৌড়ানির মাঝেও সে আমায় খেয়াল করেছিল নাকি! আশ্চর্য তো! আমি বোকার মত জানতে চাইলাম, তখন ওভাবে দৌড়াচ্ছিলে কেন? মোহন হাসল, আমি ফের মুগ্ধ হলাম। বলল, ইশ! দারুণ একটা ফোন মেরে দিয়েছিলাম এক সাহেবের কাছ থেকে! আমি আগ্রহভরে বললাম, ফোনটা কই দেখি! আমার লাগবে! মোহন ফের হাসল, বলল, নাই রে ভাই, মেরে ধরে কেড়ে নিয়েছে। এতক্ষণ পরে খেয়াল হলো আমার, মোহনের ডান গালে ঘুসির চিহ্নটা মারাত্মক হয়ে ফুটে আছে। অথচ তবু ছেলেটা কি অমায়িক হাসছে! মোহন তখনো বলে চলছে, সালার জীবনের ঝুকি নিয়ে চুরি করি আমি আর আমার কাছ থেকে ডাকাতি করে নিয়ে যায় এলাকার ভদ্র চোরেরা। বুঝতে না পেরে বললাম কি বললে? মোহন বলল, ও তুমি বুঝবে না। ফোন চাইতো তোমার? কাল বিকেলে এসো.... বলেই মোহন হনহন করে ছুটে চলে গেল। আমি অবাক দাঁড়িয়ে মোহনের শেষ কথার মানে খুঁজছিলাম, পরে একজনের কাছে শুনলাম মোহন যে ফোন চুরি করেছিল সকালে এলাকার ছেলেরা সেটা কেড়ে নিয়েছে। প্রায়ই নেয়। শুনে ভীষণ মন খারাপ হলো আমার। কেন যেন খুব মায়া হলো মোহনের জন্য, খুব। মায়াটা এমন স্থায়ী হয়ে যাবে ভাবিনি। মোহনের সাহায্যে অয়নকে ফোন কিনে দিয়েছি। তবু মাঝে মাঝে এসে আমি মোহনকে খুঁজি। মোহন নিজেও মনে হয় কয়েকদিন আমায় না দেখলে অস্থির হয়ে ওঠে। আমরা মাঝে মাঝে লোকচক্ষুর আড়ালে গিয়ে নদীর পারে বসে থাকি। মোহন নেশাখোর, কিন্তু সিগারেট খায়না ভেবে অবাক হই, তারচেয়েও অবাক হই এই ভেবে যে এতগুলো দিনে মোহন এক বারের জন্যেও আমায় নেশা করতে প্রলুব্ধ করেনি। তবে সে আমাকে বেশ ভাঙাতে শুরু করে, বলে ভাই দুইশত টাকা দিবি খুব নেশা পেয়েছে! দে না ভাই, দে না প্লীজ! আমি অস্বীকার করলে সে উঠে পরে, বলে যাই, একটু ধান্ধা করে আসি। শুনে ছ্যাঁত করে ওঠে আমার বুকের ভেতর। মনে হয়, এই বুঝি মোহন ধরা পরে যাবে, এই বুঝি তাকে ভীষণ মারবে সবাই। আমি যথাসাধ্য টাকা দিয়ে ওর নেশার খরচ যোগাই, তবে নিজেও তো মামুলি ছাত্র, খুব দ্রুত-ই পরিবারের কাছে ধরা পরে যাই আমি, আমার হঠাৎ এত টাকার চাহিদা আর রহস্যজনক ঘোরাফেরা সবার সন্দেহের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তারপর অয়নের গোয়েন্দাগিরিতে যখন আমার আর মোহনের বন্ধুত্বের কথা পরিবারে ফাস হয়ে যায় তখন মা আর বড়ভাই ভাবি ভীষণ চিন্তিত হয়ে ওঠে। মা তো নাওয়া খাওয়া-ই ছেড়ে দেয় প্রায়। আর বড় ভাইয়া স্বয়ং নিজে গিয়ে মোহনকে কড়া শাসন করে আসে। . কদিন নিশ্চুপ। তারপর ফের আমি লুকিয়ে মোহনকে দেখি, সে নিজেও খুঁজে নিয়েছে আমার বাড়ি, প্রায়শ-ই এসে ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে থাকে। ভাইয়া এসব দেখে দুদিন এলাকার ছেলেদের দিয়ে খুব পেটায় ওকে। সেদিন ও কাঁদেনি মোহন, করেনি কোন কষ্টের হা হুতাশ... মাঝে মাঝে আমি বলি, মোহন, তুই এত সহ্যশক্তি কোথায় পাস? এসব ছাইপাঁশ খাওয়া ছেড়ে দে তুই, পায়ে পড়ি ভাই।প্লীজ। মোহন হাসে। বলে নেশা রে, নেশা..... ছেড়ে দেয়া গেলে কি আর নিজের সমাজ সংসার এলাকা জেলা সব ছেড়ে এসে এখানে সেখানে পরে পরে মাইর খাই? উপায় নাইরে... উপায় নাই। মন ভালো থাকলে আমি মোহনের পারিবারিক প্রশ্ন তুলি, অধিকাংশ সময় সে এসব প্রশ্ন এড়িয়ে যায়। তবে মাঝে মাঝে বলে, অতিরিক্ত আদরেই শুধু লোকে বখে যায় নারে, অতিরিক্ত অনাদরেও যায়। ঘরে সৎ মায়ের চরম অবহেলা আর বাবার সেই অবহেলা ভোলাতে আমাকে অনেক টাকাকড়ি দেয়া, যখন যা চাই, অবশ্য চুপিচুপি মা যেন না জানে তাই পাই। আর কি, আমি কষ্ট ভুলে থাকতে নেশার জগতে ঢুকে পড়ি, একসময় মা জানতে পারে, বাবা আমাকে টাকা দেয়া বন্ধ করে দেয়, চেষ্টা করে নেশা ছাড়াবার, কিন্তু ততদিনে নেশার টাকা জোগাড়ে আমি চুরি ছিনতাই শুরু করে দিয়েছি। শেষমেশ এলাকায় টিকতে না পেরে দেশান্তরি হয়েছি। কত এলাকা থেকে বিতাড়িত হলাম তার ইয়াত্তা নাই। এখান থেকেও কখন কবে চলে যাই! শুনে ভয় আশঙ্কায় আমার মুখ পান্ডুরবর্ণ হয়ে যায়। মোহন নিজেও তা টের পায়, হেসে বলে, নারে, এখানে তোর নেশায় পড়েছি। মেরে ফেললেও এই এলাকা ছাড়া হবে না.... . এইভাবেই লুকিয়ে,বকা, পিটুনি খেয়েও মোহন আর আমার দেখা শাক্ষাৎ চলছিল হৃদয়ের টানেই, কিন্তু হঠাৎ একদিন আমাদের মধ্যে দূরত্বের বড় কারণ সৃষ্টি করল মোহন, একবিকালে দেখা করতে গেলাম ওর সাথে। বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতেই তাড়াহুড়ো করে বাড়ি ফিরে খেয়াল হলো, আমার পকেটে আমার সাধের মোবাইলটা নেই! তার বদলে সেখানে ছোট একটা চিরকুট "বড্ড নেশায় পেয়েছে রে..." রাগে দুঃখে অভিমানে আমি সারারাত কাঁদলাম সেদিন। আশা ছিল মোহন পরদিন-ই হয়তো আমার ফোন ফিরিয়ে দেবে কিন্তু দুতিনদিন আর তার দেখা নেই। আমি বাইরে রাগ দেখালেও ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে উঠলাম, মোহনের কিছু হলো না তো? মোহন এলো চারদিন পর। হাতে এত্ত সুন্দর একটা ফোন! যার দাম সম্পর্কে আমার কোন ধারণা-ই নাই। মূহুর্তে সব রাগ অভিমান মাটি হয়ে গেল আমার! কিন্তু এই দামি ফোনটা যে আমার জীবনে মূর্তিমান অভিশাপ বয়ে আনবে কল্পনাতেও ভাবতে পারিনি সেদিন.... তিনদিনের মাথায় হঠাৎ আমাদের বাড়িতে পুলিশ সহ কোট প্যান্ট পড়া সাহেব গোছের লোকের আবির্ভাব, রাতের খাওয়া শেষ করে মাত্র-ই পড়তে বসেছিলাম তখন। আমার মায়ের পুলিশের নাম শুনলেই কাঁপুনি উঠতো, মা ভয়ে ভাবনায় হতভম্ব হয়ে আমার রুমে এসে আহাজারি করে পড়লো, ওরে ব্যাটা কি করছিস তুই! আমি নিজেও কম ভয় পাইনি সেদিন যখন পুলিশ এসে হাতে কাতকড়া পড়িয়ে নিয়ে যেতে ধরল, আমি হাউমাউ করে মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করেছি তখন। সারা গ্রামের লোক জড়ো হয়ে গেছে, কি ব্যাপার জানার জন্য উদগ্রীব সকলে.... পুলিশ যা জানালো তা ছিল এই, আমার হাতে মোহনের দেয়া যে ফোন এটা ভীষণ দামি এবং তারচেয়ে বড় কথা এটা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাসম্পন্ন নেতাগোছের কারো ফোন। দুদিন আগে ফোনটা এই অঞ্চল থেকেই চুরি হয় আর ফোন ট্রাকিং এর মাধ্যমে জানা যায় সেটি এই এলাকাতেই আছে তারপর তারা এই বাড়ি ঘেরাও করে হাতে নাতে ফোনসহ চোর ধরেছে.... আমার মা ইতিমধ্যে বেশ কবার জ্ঞান হারিয়েছে, কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে অয়ন আর ভাই ভাবি। আমি প্রচণ্ড ভয়ে আশঙ্কায় চিৎকার করে কাঁদছি.... এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এসে আমার পক্ষ নেয়ার চেষ্টা করছেন, আমার বয়স, চেহারা, পড়াশোনা, ফ্যামিলি স্টাটাস কোনকিছুই যে চোর ছিনতাইকারীর নয় সেটা ওনাদের বোঝাতে প্রাণান্তকর চেষ্টা করে যাচ্ছে আমার পরিবার ও প্রতিবেশীরা! কিন্তু হাতে নাতে ফোনসহ ধরা চোরকে ছেড়ে দিতে রাজি নয় পুলিশের বড়কর্তা। একসময় ফোনের মালিকের বুঝি দয়া হলো আমার ভীত সন্ত্রস্ত কান্না আর মায়ের সেন্সলেসভাব দেখে। মুখেও বললেন, না চুরিটা এই ছেলে করেনি, ও তো নেহায়েত বাচ্চা ছেলে। কিন্তু পুলিশ নাছোড়বান্দা, হতে পারে ও চুরি করেনি, কিন্তু ফোন কোথায় পেল? নিশ্চয় চোরের সাথে যোগাযোগ আছে, ওকে ধরলেই চোরকে পাওয়া যাবে। এ কথার প্রতিবাদ করার সাহস কারো হলো না সেদিন.... আমার আর মায়ের অনবরত কান্নার মুখে সেই রাতে জীবনের প্রথম হাজতবাসে এলাম সেদিন। মাইরের ভয়ে মোহনের নামটাও বলে দিয়েছি অবশ্য আমার বলার আগেই গ্রামের শতজন বলেছে এ নাম... বিশেষ অভিযান চালানো হলো সেই রাতে, এলাকার সমস্ত চোর, ছিনতাইকারী আর নেশাখোরদের ধরে ধরে লকাপে ভরছিল পুলিশ , আমি নেহাত কিশোর একটা ছেলে, তার উপর ভীষণ কাঁদছিলাম তাই পুলিশেরা দয়া করে গাঁয়ে হাত তোলেনি এখনো, আমি মনে মনে মোহনকে খুঁজছিলাম, ওর উপর আমার রাগ, জেদ অভিমান নাকি ওর জন্য ভয়, আশঙ্কা মায়া হচ্ছিল ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না আমি। ঠিক সেই মূহুর্তে পুলিশ মারতে মারতে যাকে লকাপে ঢোকাল সে আর কেউ নয়, মোহন..... আমাকে দেখে হাসার চেষ্টা করল সে, পরক্ষণে চোখ নামিয়ে নিলো আমার চোখ থেকে।পরদিন মুচলেকা দিয়ে আর যথেষ্ট টাকা পয়সা খরচ করে আমাকে থেকে ছাড়িয়ে আনা হলো, সেদিন- ই আমাকে মামাবাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হলো... . প্রায় নমাস পর গ্রামে এলাম পরীক্ষা দিতে, সব কিছু আগের মত-ই আছে.... কেউ হয়তো কিছু মনে রাখে নাই, মোহন? মোহন কি আমায় মনে রেখেছে? কোথায় আছে সে? আমার বোবাচোখ তন্নতন্ন করে খুঁজল মোহনকে, কোথাও সে নেই। তার কথা যে কাউকে জিজ্ঞেস করব সেই সাহস বা মুখ আমার নেই। রাতে আমার সেই রুমে শুয়ে আছি, যে রুমের আশেপাশে মোহন দাঁড়িয়ে থাকতো এসে। যথারীতি অয়ন আজ আমার পাশেই শুয়ে আছে কিন্তু কোথাও মোহনের অস্তিত্ব নেই। অয়ন যেন বুঝতে পেরেছে আমার ভেতরটা, বেশ কমাস দূরে ছিলাম তাই ঝগড়াঝাটি রেষারেষি নেই আমাদের মাঝে। এই প্রথম হয়তো অয়ন আমাকে ছোটভাই আর আমি অয়নকে বড় ভাবছি। একসময় অয়ন বলতে লাগল, যেন বাতাসকে শুনিয়েই, পুলিশেরা মোহন কে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে পাঠিয়েছি, ছমাস পর মোহন সুস্থ হয়ে বাড়ি চলে গেছে। এই সংবাদে আমার চেয়ে খুশি আর কে হবে? আমি কেঁদে ফেললাম, সেটা কি শুধুই খুশিতে? নাকি মোহনকে হাঁড়িয়ে ফেলার কষ্টেও? পরীক্ষা শেষ, হাতে অখণ্ড অবসর। আমি এখানে সেখানে অনর্থক ঘুরে বেড়াই, ইদানীং অয়ন কেন জানি আমার সাথে খুব ভাব করতে চায়, একা ছাড়তে চায়না, কোথাও গেলে সাথে নিতে চায়। আমিও অয়নকে বন্ধু করে নিয়েছি। মাঝে মাঝে আমরা আমার সেই প্রিয় জায়গাতে বসে থাকি, যেখানে একদিন আমি আর মোহন বসতাম। রাতে মাঝে মাঝে আমার খুব কান্না পায়, মোহন তো এখন ভালো হয়ে গেছে, ফিরে এসেছে সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে, আমাকে কি ওর মনে পড়ে না? মোহন বলতো আমি নাকি ওর নেশা, তো এক নেশা ছেড়ে দেশে চলে গেছে, হয়তো কেটে গেছে তার আমার নেশাও.... অয়ন বলে, মোহন তোকে বড্ড ভালোবাসতো রে, সেদিন পুলিশের সাধ্য ছিল না তাকে ধরে, নিজেই সেদিন ধরা দিয়েছিল সে। আসলে মোহন নিজেও জানতো না ফোনটা নিয়ে এত ভোগান্তি হবে। দেখিস সে একদিন বউ নিয়ে ঠিক তোকে দেখতে আসবে.... আমি কথা বলি না, মনে মনে বলি, মোহন আসুক না আসুক তাতে আমার বয়েই গেছে.... তবু যেন মন কেমন করে, সে রাতে স্বপ্ন দেখি, খুব সুন্দর একটা বউ, কোলে ফুটফুটে একটা মেয়ে নিয়ে এক সৌম্যদর্শন যুবক আমাদের আঙ্গিনায় এসে দাঁড়িয়েছে, কেউ তাকে চিনি না আমরা, অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। দেখে সেই যুবক হেসে দিয়েছে! আমি মুহুর্তে চিনে গেছি তাকে! মোহন!! এতো মোহন!! অয়ন আমার গায়ে হাত রাখতেই ঘুম ভেঙে যায়, সে স্নিগ্ধ কন্ঠে জানতে চায়, স্বপ্ন দেখছিলি ভাই? মোহন মোহন করছিস যে! আমি উত্তর দেই না, প্রায় ভোর হয়ে এসেছে, আমি কোলবালিশে মুখ গুঁজে পড়ে থাকি সেই স্বপ্নের আবেশে....... "সমাপ্তি" লিখনির শেষে এসে, গল্পের নামঃ যে গল্প হৃদয়ের..... লিখেছেনঃ Esmot Ara Supty(ইরাবতী)..


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৭৫ জন


এ জাতীয় গল্প

→ মোহনের সাথে

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now