বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
পক্ষ ১
আমি রনক। আজকাল ভোর রাতে আমার ঘুম ভেঙ্গে যাচ্ছে। একজন সুখী মানুষ হিসাবে এটা হবার কথা নয়। যদিও আজকের ব্যাপারটা ভিন্ন। আজ আমার অফিসে যাওয়া লাগবে না। সুতরাং আমি ইচ্ছা করলেই বেলা দুপুর পর্যন্ত ঘুমাতে পারি। কিন্তু আজ তাও পারবো না। ঘুমাতে না পারার কারন আর অফিসে না যাবার কারন একই। আজ আমার পিংকি মামনির জন্মদিন। মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে আছে পিংকি।
বেড রুমের ডিম লাইটের আলোতে এই দৃশ্য প্রায়ই দেখা গেলেও দিনের আলোতে তা দুর্লভ। কারন ঈশিকা খুবই বিজি মানুষ! পিংকি বা আমাকে দেবার মতো টাইম ওর খুব কমই আছে। তারপরও পিংকি কেন যেন মাকেই বেশি ভালবাসে। মাঝে মাঝে যখন মায়ের মনযোগ আকর্ষণ করতে না পেরে বা থাপ্পড় খেয়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলে 'মাম্মিটা খুব পচা' তখন আমার বেশ ভাল লাগে। জীবনের কোন চাওয়া পাওয়া অপূর্ণ না থাকার কারনেই মনে হয় ঈশিকার এই অমনযোগী স্বভাব আমার সহ্য করা কঠিন হয়ে পড়ে।
একটু পরই ঘুম থেকে উঠবে পিংকি। চিৎকার চেচামেচি করে পুরো ফ্ল্যাটটা মাথায় তুলবে। শেফালিকে ছুটি দিয়েছি। আজ সারা দিন আমিই থাকব পিংকির সাথে। এখন শুধু সকালের অপেক্ষা...
পক্ষ ২
'ইশ! কেমন আঠার মতো জড়িয়ে ধরে আছে পিংকিটা!' ঘুম থেকে উঠে আড়মোড়া ভাংতে ভাংতে বলল ঈশিকা।
-পিংকি, এই পিংকি...ওঠো মাম্মি...এই পিংকি...আজ না তোমার বার্থডে! আজ আমরা কেক কাটব না? ওঠো আমার লক্ষি সোনাটা...
-না মাম্মি, আমলা পলে কেক কাতবো। এখন ঘুমাই?
-না লক্ষি, মাম্মিকে তো এখনই সব রেডি করা লাগবে! ওঠো...
-না মাম্মি, তাহলে কেক কাতা লাগবে না। আসো আমলা ঘুমাই।
-আচ্ছা ঘুমাও তুমি! আমাকে তো ছাড়ো!
শোয়া থেকে উঠে বসে চুল বাধতে বাধতে একটা হাই তুলল ঈশিকা।
-এত্ত দুষ্টু হয়েছে না পিংকিটা!
এই রনক, ওঠো! কটা বাজে খেয়াল আছে?
আজ বাসায় কত গেস্ট আসবে! পুরো বাসা গোছাতে হবে...
পক্ষ ১
পিংকিটা সারাক্ষন কথা বলে আর গুটি গুটি পায়ে হেটে বেড়ায়। আমার কেমন যেন বিশ্বাস হয় না। এইতো সেদিন ও জন্ম নিলো! আর আজ কিনা চার বছর পূর্ণ হয়ে গেল! আজও পিংকি ওর মায়ের পিছপিছ ঘুরছে। আমি অপেক্ষায় আছি। কখন ঈশিকার সহ্য ক্ষমতা শেষ হয়। আজ সকাল সকাল গোসল সেরে মেকাপ নিতে বসেছে ঈশিকা। পিংকি ওর পাশে বসে মেকাপের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি হাতে নিয়ে গবেষণা করছে। সেই সাথে হাজারটা প্রশ্ন তো আছেই! একটু পর পর ওর হাত থেকে সেগুলো কেড়ে নিচ্ছে ঈশিকা। লাল লিপিস্টিকটা মনে হয় খুব পছন্দ হয়েছে পিংকির। মাকে সারা মুখে মেকাপ মাখাতে দেখে নিজের সারা মুখে লিপিস্টিক মাখাতে ব্যাস্ত সে। আমার খুব হাসি পাচ্ছে। হটাৎ করেই ওর মা খেয়াল করল বিষয়টা।
-ইশশ পিংকি, তুমি দিন দিন এত নোংরা হচ্ছ কেন বলত? মাত্র তোমাকে গোসল করিয়ে আনলাম! দাও লিপিস্টিক...
-মাম্মি, লিপিত্তিকতা অনেক সুন্দর। আমি এইতা দিয়ে সাজবো।
-না, দাও বলছি লিপিস্টিক!
-না মাম্মি, এইতা আমার!
-দিবি না তুই? দাড়া!
এই বলে ছোট হাতে মুঠি করে ধরে রাখা লিপিস্টিকটা খপ করে কেড়ে নিল ঈশিকা। ঘটনার আকস্মিকতায় থমকে গেল পিংকি। এক মুহূর্ত চুপ থেকে বললঃ
-ছয়তান!
-কি!!! কি বললে তুমি পিংকি???
-কুত্তা!
এরপর আমি ঠাস করে একটা শব্দ শুনলাম আর সবকিছু নিশ্চুপ! প্রায় মিনিট খানেক দম ধরে থেকে সর্বোচ্চ শব্দে ফুপিয়ে কেদে উঠলো পিংকি। সেই সাথে ওর মাও শুরু করল।
-কে শিখিয়েছে তোমাকে এইগুলা? শেফালি তাই না? এই, রনক কাল শেফালি আসলে ওকে তুমি ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবে।
আমি শুধু শুনলাম, কিছু বললাম না।
-কি হল, কথা বলছ না কেন? কালকেই তুমি ওকে বিদায় করে দেবে। ঠিক আছে??
-সরি, আমি পারবো না।
-কিইই! মানে??? ও এভাবে মেয়েকে নষ্ট করবে আর তুমি কিচ্ছু করবে না?
-না।
-কেন?
-ও তো সারা দিন শেফালির কাছেই থাকে। শেফালিই ওকে লালন পালন করে। যেটা করার কথা ছিলো তোমার। শেফালি পিংকিকে তার মতো করে লালন করে। এখানে দোষের কিছু দেখছি না!
ঈশিকা হতভম্ব হয়ে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে বলল
-ঠিক আছে, এ বিষয়ে তোমার সাথে পরে কথা হবে। একটু পরেই গেস্ট আসা শুরু করবে, দুপুরেই কেক কাটা হবে। রেডি হয়ে নাও...
এর মধ্যেই কখন যেন পিংকি আমার বুকে জায়গা করে নিয়েছে।
পক্ষ ২
বেশ অনেক গেস্ট এসেছে। দুই-একজন আসা বাকি আছে। এমন সময় আররেকজন আসলো।
-হেই!
-হোয়াট হ্যাপেন্ড মিতু? এত্ত দেরি করলি কেন? সব্বাই চলে এসেছে!
-সরি বেইবি...
-আয়, আয় কেক কাটা হবে!
-হুম, পিংকি কোথায়?
-আছে কোথাও...দাড়া ডাকছি...
ড্রয়িং রুম থেকে পিংকির ডাক পড়ল...
পক্ষ ১
কেক কাটা হয়ে গেছে। ঈশিকার অনেক বন্ধু বান্ধবীরা এসেছে। তাদের নিয়ে ঈশিকা খুব ব্যস্ত! এখন খাওয়া দাওয়া চলছে। পিংকি একটু আগের কাহিনী সব ভুলে গেছে। কেকের একটা বিরাট অংশ হাতে নিয়ে সে মায়ের পিছ পিছ ঘুরছে। তার হাতে থাকা কেকের অংশের চারপাশে কয়েকটা চকলেট ফুল, আর মাঝখানে লেখা 'Happy Birthday To Pinki' এখন পর্যন্ত সে হ্যাপি বার্থডে খেয়ে শেষ করেছে। এবার মনযোগ ফুল গুলোর দিকে। আলাদা আলাদা করে ফুল গুলো কেটে খেতে হবে তার। মায়ের কাছে ঘ্যান ঘ্যান করে পাত্তা না পেয়ে আমাকে বললঃ
-আব্বু একতা ফুল কেতে দাওনা!
পিংকি কোন কাজে তার আম্মুর কাছে পাত্তা না পেলে পরম নির্ভরতায় আমার কাছে আসে। আমিও চেস্টা করি ওর সব আবদার পুরন করতে। তাতে যদি ও আমার একটু বাধ্য হয়! অবশ্য আমি কিছু বললে পিংকি তা কখনো উপেক্ষা করে না, কিন্তু আম্মুকে নিয়ে কিচ্ছু বলা যাবে না তাকে! আর সেটাই আমি বেশি করি! আজকেও তাকে তার আম্মুর ব্যাপারে একটা অনুরোধ করেছিলাম।
আমি ডায়নিং এ থাকা ছুরিটা এনে তাকে একটা ফুল কেটে দিলাম। ডায়নিং এ গিয়ে ওর কিছু বন্ধু বান্ধবের সাথে দেখা হল। কয়েকজন হাই হ্যালো দিল। এখন সেখান থেকে হো হো হা হা আওয়াজ আসছে। বড়লোকের ঘরের ছোটলোকদের এইসব ন্যাকামি মার্কা কথা শুনতে আমার একদমই ভাল লাগে না! তাই ওদের জয়েন করিনি। ঈশিকাও কিছু বলেনি। কারন সেও জানে, তাদের সাথে মেশার মতো 'স্মার্ট' আমি না। কেন যে এই বড়লোকের মেয়েটাকে বিয়ে করতে গেছিলাম!
পক্ষ---
-ফুল খাবো, ফুল...মাম্মি একটা ফুল কেতে দাওনা! এই মাম্মি...
-উহহু, পিংকি বিরক্ত করো নাতো, যাও এখান থেকে!
-মাম্মি একতা ফুল কেতে দাও...
-বললাম না যাও এখান থেকে...
পিংকি মাথা নিচু করে চলে এল। আবার মন খারাপ হচ্ছে। এখন ফুল খাবে কি করে? পিংকি বুদ্ধি বের করলো তার ছোট্ট মাথা থেকে। আব্বুর মতো করেই তো খাওয়া যায়! টি টেবিলে আব্বুর রেখে যাওয়া ছুরিটা নিয়ে ফুল কাটার চেষ্টা শুরু হল। কিন্তু ছোট্ট কাপাকাপা হাতে ফুল কাটতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত ফুলটা নষ্টই হয়ে গেল! ধ্যাত! মনটা আরও খারাপ হয়ে গেল পিংকির। রীতিমত কান্না পাচ্ছে তার। অবশ্য আরও কয়েকটা ফুল আছে এখনো, কিন্তু এগুলোকে তো নষ্ট করা যাবে না! তাই রিস্ক নিল না পিংকি। ফিরে গেল ডায়নিং এ...
-মাম্মি, মাম্মি, একতা ফুল কেতে দাও!
আচল টানতে টানতে বলল পিংকি। কিন্তু মাম্মি তখন গল্পে মশগুল। হাল ছাড়ল না পিংকি। বলতেই থাকলঃ
-মাম্মি আমি ছুলি নিয়ে আসছি। তুমি সুদু কেতে দাও। মাম্মি! এই মাম্মি!
এদিকে মাম্মির কোন সাড়া নেই। মাঝে মাঝে শুধু আচল টেনে ঠিক করে নিচ্ছে। এবার একটু জোরে জোরেই টান দিল পিংকি। এতক্ষনে তার দিকে নজর পড়লো ঈশিকার।
-অহ...ড্যাম শিট! তুমি আমার শাড়িতে কেক মাখিয়ে দিয়েছ!!!!! বেয়াদব! যাও বলছি এখান থেকে! আর যদি একবার এখানে আসতে দেখেছি না তোমাকে, থাপড়িয়ে দাত ফেলে দেব...!
বলতে বলতে পিংকির চোয়াল ধরে একটা ঝাকি দিলো ঈশিকা। হাত থেকে কেক পড়ে গেল পিংকির। ঠোট মুখ ফুলিয়ে মাম্মির দিকে তাকিয়ে থাকলো সে। চোখের কোনে এক ফোটা জল উকি দিচ্ছে। সালাদের বাটি চেয়ে নিরবতা ভাঙল ঈশিকার বান্ধবি। ঈশিকা আবার ব্যাস্ত হয়ে পড়ল।
খচ করে একটা শব্দ হল।
হটাৎ করেই যেন পৃথিবীটা ঘুরে উঠল ঈশিকার। পেটে চেপে ধরা রক্তভেজা হাতদুটোর দিকে তাকিয়ে নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছে না তার। অর্ধেক পরিমান ঢুকে থাকা ছুরিটা টেনে বের করতে গিয়েও পারল না সে। কেন যেন হাতে কোন শক্তি পাওয়া যাচ্ছে না। আস্তে আস্তে পুরো শরীরটাই নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যাচ্ছে...!
এতক্ষণে সফল হল পিংকি। মিসেস ঈশিকার মনোযোগ এখন পিংকির দিকে। পূর্ণ মনোযোগ...
পক্ষ ১
বুঝতে পারছিনা! অর্ধেকটা ছুরি ঢোকানোর মতো এত শক্তি পিংকি পেল কোথায়! রাগ বা ক্রোধ মনে হয় শরীরে বাড়তি শক্তি যোগান দেয়। এইসব শক্তি যোগান-ফোগান পরে চিন্তা করার সময় এখন নয়। এই গবেষণা পরেও করা যাবে। আমিতো ভাবতেই পারছি না পিংকি এভাবে আমার অনুরোধ রাখবে! আজ আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ। আজ আমি পিংকিকে অনেক কেক আর কেকের ফুল খাওয়াবো। চিন্তা একটাই, পিংকি মা সারাজীবন এভাবে আমার অনুরোধ গুলো রাখলেই হয়...
(সমাপ্ত)
---------
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now