বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

মণিকার ভূত

"ভৌতিক গল্প " বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান Md Tuhin (গ্যাংস্টার) (০ পয়েন্ট)

X দিনে প্রচণ্ড গরম পড়েছিল্ ভাদ্র মাসে এমনিতেই গরম পড়ে খুব বেশি। কিন্তু সেদিনের গরম যেন তাল পাকা রোদের গরম। বিকেলের দিকে যদিও একপশলা বৃষ্টি হয়েছিল তারপরেও প্রচণ্ড গরম। এর সঙ্গে রয়েছে লোডশেডিং। একেবারে রুটিন করে। গরমের দিনে বিদ্যুৎকর্মীদেরও মনে হয় মাথা গরম থাকে তাই নিয়মিত শর্টসার্কিট হয়। এটা অবশ্য রইস আলীর কথা। সে ফাতেমাকে বলছে এই কারেন্টআলা এরার মাথার ঠিক নাই। জিগাইলাম কারেন্ট কোন সময় আইবো। তারা কয় কারেন্টরে জিগাও। আমরা কিতা জানি। সবগুলা ফাজিল | ফাতেমা হচ্ছে রইছ আলীর স্ত্রী | তারা ময়মনসিংহের লোক | ভাগ্য বদলানোর আশায় সিলেটে চলে আসে | তারপর বিয়ানীবাজার স্থায়ী হয়ে যায় | রইছ আলী সরওয়ার সাহেবের বাড়ির কেয়ারটেকার | দীর্ঘদিন এই অঞ্চলে থাকতে থাকতে সিলেটী ভাষাও মোটামুটি শিখে ফেলেছে | রইছ আলী মাঝবয়সী লোক | বিশ্বস্ত প্রকৃতির | সে সরওয়ার সাহেবদের বাড়িতে আছে দীর্ঘদিন | এবার সরওয়ার সাহেব সম্পর্কে একটু বলে নিই। সরওয়ার সাহেব থাকেন লন্ডনে। চাকরিসূত্রে সপরিবারে | সিলেটের বিয়ানীবাজার পৌরসভার দশগ্রাম অঞ্চলে তাঁদের পৈতৃক বাড়ি। সামার ভ্যাকেশনে দেশে এসেছেন পুরো পরিবার নিয়ে ছুটি কাটাতে | সরওয়ার হোসাইনের স্ত্রী রাবেয়া খাতুন | দুই মেয়ে অরুন্ধতী ও আরা | ভরা পূর্ণিমা চলছে এখন | পাকা করা উঠোনে খালি গায়ে বসে আছেন সরওয়ার সাহেব | হাত পাখা মাঝে মাঝে নাড়ছেন | তাকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি খুব এনজয় করছেন | সরওয়ার সাহেব একটু জোরে বললেন, রইছ আলী চা আনতে অত সময় লাগে কিতা | কোন সময় কইলাম। —ভাইজান আনরাম অখন উ। রইছ আলী উত্তর দিল। চা নিয়ে এল রইছ আলী। চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছে | সঙ্গে মুড়ি কাঁচামরিচ আর পেঁয়াজ দিয়ে মাখা | —তোমার ভাবি কই | কিতা কররা...। —ভাবি ফাতেমার লগে রান্না ঘরে আছইন | দেখাইয়া দিরা কিতা রান্না হইতো। —এখন একটু বাবুর বাজার যাও | গিয়া দেখ ভালা মাছ পাওয়া যায়নি | তাজা বড় বোয়াল খাইবার ইচ্ছা করের। বাবুর বাজার বিয়ানীবাজার মূল বাজার থেকে ২ মাইল দূরে | ভালো মাছ পাওয়া যায় | তবে যেতে হয় একটু দেরি করে রাতে | রাত ৯টা-১০টার দিকে | স্থানীয় জেলেরা রাঙাউটিতে থাকে | তারা বিকেলের দিকে মাছ ধরতে বিলে যায় আর সেই মাছ নিয়ে আসে বাজারে রাত ৯টার দিকে | রইছ আলী বাজারের ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে | সরোয়ার সাহেব বললেন, রইছ আলী অরুন্ধতী আর আরা কিতা করের। —ভাইজান অরুন্ধতী এয়ার ফোন কানো লাগাইয়া ড্রয়িংরুমে আছৈন আর আরা রান্নাঘরোত ভাবির লগে। অরুন্ধতী সরওয়ার সাহেবের বড় মেয়ে | কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি থেকে পাস করে এখন একটা নামীদামি স্কুলে পড়ায়। গ্রামার স্কুল | সে গান শুনতে ভালোবাসে। ভালো বাংলা বলতে না পারলেও খুব ভালো বোঝে ও একজন ভালো শ্রোতা। রবীন্দ্রসংগীত তাঁর খুব পছন্দের গান। খুব সুন্দরী বলতে যা বোঝায়—অরুন্ধতী একেবারে চোখ ধাঁধানো | সে এই রকমই একজন | তাঁকে নিয়ে বিস্তারিত আরেক দিন বলব। তার আইফোনে জগতের সকল বিখ্যাত শিল্পীদের গান রেকর্ড করে রাখা। রবীন্দ্রনাথের গানের রয়েছে বিশাল ভান্ডার। সরওয়ার সাহেব উঠোন থেকে ডাক দিলেন—অরুন্ধতী মা তুমি কোথায়? এদিকে একটু আসোতো। সরওয়ার সাহেব ও তাঁর স্ত্রী দুই মেয়ের সঙ্গে শুদ্ধ বাংলায় কথা বলেন। যাতে করে তারা বাংলা শিখতে পারে শুদ্ধ করে। বিলেতে যেহেতু প্রধান ভাষা ইংলিশ তাই বেশির ভাগ ব্রিটিশ বাঙালি ছেলেমেয়েরা শুদ্ধ করে বাংলা বলতে পারে না। অরুন্ধতী সাধারণত ইংরেজিতেই কথা বলতে পছন্দ করে। অরুন্ধতী উত্তর দিল—ইয়েস ড্যাডি, আই অ্যাম কামিং। তারপর ধীর পায়ে ড্রয়িংরুম থেকে বেরিয়ে এল। —হোয়াট ক্যান আই ডু ফর ইউ ইউ? —অনেক কিছুই করতে পারিস আমার জন্য। বাট ফার্স্ট থিং ক্যান উই টক ইন বাংলা? যে কয়দিন দেশে থাকবি বাংলায় কথা বলবি। —ঠিক আছে বাবা, বলব। এখন বলো কেন ডেকেছ। —তোর ফোনে কি শ্রীকান্তের গাওয়া ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা’ গানটা আছে? —অবশ্যই বাবা। এটা আমার খুব পছন্দের একটা গান। সরওয়ার সাহেব গান শুনতে শুনতে অন্য ভুবনে চলে গেলেন। প্রতীকী ছবিরান্নাঘরে রাবেয়া খাতুনের কাজ প্রায় শেষ। রাতের খাবার রেডি। ইলিশ মাছের সর্ষে বাটা, ইলিশ মাছের ডিম ভাজি, তারকা ডাল আর আলু ভাজি আজকের রাতের মেনু। আরা চুপচাপ মার পাশে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিল। মোমবাতি আর পূর্ণিমার আলোয় যেন এক রহস্যময় আবহ চারদিকে। আরা মাকে জিজ্ঞেস করল মা কখন ডিমভাজি খাব। সে ইলিশ মাছের ডিম খাওয়ার ব্যাপারে খুবই আগ্রহী। রাবেয়া আরাকে বাবার পাশে গিয়ে বসতে বলে বাথরুমে ঢুকলেন। একটা কুইক শাওয়ার করবেন। শরীর ঘেমে একেবারে একাকার। কিরিন্ড দাদির বাড়ি দশগ্রামেই। সরওয়ার সাহেবের বাড়ি থেকে তিন বাড়ি পশ্চিমে। কিরিন্ড দাদির পুরো নাম রমাপদ কর্মকার। কিন্তু সবাই তাকে কিরিন্ড দাদি বলে ডাকে এবং চেনে। বাপ-দাদার ব্যবসা ছিল কামারি ব্যবসা। কিন্তু কিরিন্ড কেন চুল কাটার ব্যবসা শুরু করল সেটা কারও জানা নেই। বাজারে তাদের এয়ার কন্ডিশন সেলুন। নাম মডার্ন হেয়ার স্টাইল। চালায় ছোট ছেলে কার্তিক। বড় ছেলে রানা দুবাইতে থাকে সপরিবারে। কিরিন্ড দিনে এখন বাড়িতেই থাকে। বাড়িতে টুকটাক সবজি চাষ, চারিদিক পয়পরিষ্কার রাখা, এইগুলো নিয়েই ব্যস্ত থাকে। দুপুরে খেয়েদেয়ে একটু ঘুম। ৫টার দিকে ঘুম থেকে উঠে প্রথমে চা এবং পরে কিছুক্ষণ হুক্কা টানে। তারপর বাজারে যায়। সন্ধ্যায় সেলুনে গিয়ে বসে কিছুক্ষণ। ৮টার দিকে ক্যাশবাক্স থেকে টাকা নিয়ে দৈনন্দিন বাজার করতে যায়। এটাই হচ্ছে তার রুটিন। মাঝে মধ্যে বকুলের স্টলে চা খেতে যায়। আজও চা খেতে গেল সেলুন থেকে বের হয়ে। চা স্টলে ঢুকতেই রইছ আলী ডাক দিল কিরিন্ড দাদিকে। —কিরিন্ড দাদি ওবায় আইও। —রইছ আলী নি, দেখলাম না কয়দিন। বকুলের স্টলের কাঠের বেঞ্চিতে বসতে বসতে কিরিন্ড রইছকে জিজ্ঞেস করে। —সরওয়ার ভাইজান আইছন তো লন্ডন থাকি। একটু বেস্ততার মাঝে যার কয়দিন থাকি। —সরওয়ার বাড়িতে আইছননি। জানতাম না তো। কাইল আইমুনে দেখা করাত। কিরিন্ড বলল। চা খাওয়া হয়ে গেলে দুজনে মাছ কিনতে বাবুর বাজারের দিকে রওনা হলো। রাবেয়া খাতুন রইছ আলীকে ১০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। ৭-৮ হাজার টাকার মধ্যে ভালো বোয়াল কেনার জন্য। বাকি টাকা দিয়ে পাবদা আর মলা মাছ কেনার জন্য বলেছিলেন। সঙ্গে কিনতে হবে আমড়ার বৌল। মলা মাছ আর আমড়ার বৌল দিয়ে কড়ুয়া সরওয়ার সাহেবের ভীষণ প্রিয়। রাবেয়া খাতুন নিজেও খাওয়ার মেন্যুতে একটা টক ডিশ পছন্দ করেন। সরয়ার সাহেবের চোখ বন্ধ দেখে রাবেয়া খাতুন বললেন, তুমি কি বসে বসে ঘুমিয়ে পড়লে নাকি? —আরে না, গান শুনছি চোখ বন্ধ করে। এই পূর্ণিমা, মৃদু মন্দ বাতাস, এইগুলো তুমি আর কোথায় পাবে। Essex-এ এই পরিবেশ কোনো দিনও পাবে না। —তা ঠিক বলেছ। দেশের আনন্দই আলাদা। যদিও অসহ্য গরম, মশার জ্বালাতন আর লোডশেডিং। তারপরেও দেশে আসলে অন্য রকম ভালো লাগে। রাবেয়া বললেন। —আরা তোর কি ভালো লাগছে মামনি? —ইয়েস ড্যাডি আমার সবকিছু খুব ভালো লাগছে। অরুন্ধতী বলল, বাবা তুমি কেন বাংলাদেশ ছেড়ে ইংল্যান্ড চলে এলে। আমার তো মনে হয় তুমি বাংলাদেশই বেশি পছন্দ করো। অফকোর্স ইয়ং লেডি। আমার চোখে আমার দেশ হচ্ছে সবচেয়ে সুন্দর। দ্য বেষ্ট প্লেস ইন দ্য ওয়ার্ল্ড। কিন্তু রিয়ালিটি রে মা, হায়ার স্টাডিজের জন্য বিলেতে গেলাম আর ফেরা হলো না। চাকরি পেয়ে গেলাম পড়াশোনা শেষ হতেই। বাবা-মা দুজনেই চাইছিলেন আমি দেশে ফিরে আসি। আজ উনারা কেউই নাই। কিরিন্ড দাদিকে বিয়ানীবাজার রেখে রইছ আলী চলে যায় বাবুর বাজারের দিকে। আশা যদি ভালো বোয়াল মাছ পাওয়া যায়। ইদানীং বাজারে খুব ভালো সাইজের মাছ সচরাচর দেখা যায় না। ভালো মাছ পেতে হলে বাবুর বাজারই বেষ্ট। আজ মাছের জোগান বেশ ভালো। অনেকগুলো বড় মাছ উঠছে বাজারে। ময়না মিয়ার কাছে একটা বড় বোয়াল দেখা গেল। ময়না মিয়া পুরোনো মাছের ব্যাপারী। বোয়ালটা এখনো লড়ছে। রইছ আলী ময়না মিয়াকে জিজ্ঞেস করল, বোয়াল ইগু কত? —১২ হাজার। ইতা হকলে কিনার মাছ নায়। এক্কেবারে তাজা। এব লড়ের। ময়না বলল। রইছ আলী বলল, ৬ হাজারে দিতায়নি। দেওতে দিলাও। ময়না মিয়া যেন একটু রেগে গেল। খাইছলায়নি মাছ কুনোদিন। না খাইতায়। ৬ হাজার টেকার মাছতো ইগুর পেট হামাইজাইবো। রইছ আলী দেখল মাছওয়ালা তার দামকে পাত্তাই দিচ্ছে না। যা হোক শেষপর্যন্ত ৮ হাজার টাকায় দফারফা করে মাছটা ঝুলিয়ে হাতে নিল। অন্য বাজার শেষ করে বাড়ির দিকে রওনা দিল। রইছ আলী খালি রিকশা দেখে উঠল। বলল দশগ্রাম যাও। হাজির বাড়ির সামনে এসে রইছ আলী রিকশা থেকে নেমে গেল। সামনে খোলা মাঠ। মাঠের ভেতরের রাস্তা ভাঙা। হেঁটে যাওয়াই শ্রেয়। বিস্তৃত মাঠ। মাঠ পেরোলেই দশগ্রাম। পাশেই লোলা নদী। একটা ভটভটি নাও শব্দ করতে করতে চলে গেল। তারপর আবার সবকিছু সুনসান। মাঠের মাঝখানে একটা বিশাল কদম্ব ফুলের গাছ। শনি মঙ্গলবারে অনেকেই নাকি ওই গাছে ভূত দেখেছে। রইছ আলী একটু শিউরে উঠল। হাতে মাছ। ভূত প্রেত নাকি মাছের গন্ধ পেলে উতলা হয়ে উঠে। রইছ আলী ভাবল আজকে কি বার। আজকে তো সোমবার। একটু নিশ্চিন্ত হয়েই সে হাঁটা ধরল আবার। নিজেকে সাহস দিতেই একটু জোরে একটা গান ধরল— ‘রুপালি নদীরে রূপ দেইখ্যা তোর হইয়াছি পাগল।’ রইছ আলী হঠাৎ করে থমকে দাঁড়াল। ও আল্লাহ, বাং পাশের ঝুপের আড়ালে ওটা কি। জ্যোৎস্নার আলোয় পুরো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। ওটা এদিকে আসছে। রইছ আলীর বুক ধড়ফড় করতে লাগল। সে কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল—কে? অন কে? —আমি কিরিন্ড। রইছ যেন দম ফিরে পেল। —কিরিন্ড দাদি ই ঝুপরার আড়াল কিতা করো। —পেট আখতা করি এমন বেদনায় ধরছিল। পেট পাতলা করাত ওউ ঝুপ হামাই গেছলাম। রইছ আলী দেখল কিরিন্ড দাদির পা একটু তাল-বেতাল। গাঁজা টানছে মনে হয়। —মাছটা তো ভালা অইছে। কত নিল? —১০ হাজার টেকা। একটু বাড়াইয়া বলল রইছ আলী। কিরিন্ড বলল বেশি নিছে। তবে মাছটা তাজা আছে। —জেলান ঝুলাইয়া নিরায়, তারা কেউরে ডাকিয়া না আনলেউ অয়। কদম গাছ সামনে। বহুতেও তারারে দেখছইন। কিরিন্ড দাদির এই কথায় রইছ আলীর ভয় যেন দ্বিগুণ হয়ে গেল। যদিও ভরা পূর্ণিমা। তবুও চারপাশে রহস্যময় গা ছমছমে ভাব। কিরিন্ড আপন মনে বিড়বিড় করে হাঁটছে। রইছ আলীর চোখ কদম গাছের দিকে। একটা প্যাঁচা গা ছমছমে শব্দ করে কোথায় যেন ডেকে উঠল। রইছ আলী কদমের ডালে কীসের একটা নড়াচড়া দেখতে পেল। সে কিরিন্ড যে জিজ্ঞেস করল কিছু, কিছু দেখরায়নি তুমি, কদম গছৰ ডাল। —না আমিত কুন্তা দেখিয়ার না। কিরিন্ড না তাকিয়েই বলল। রইছ আলী দেখল একটা বিশাল আকৃতির লম্বা কি যেন গাছ থেকে নেমে আসছে। সাদা আলখাল্লা পরা। —আল্লাহ রে আমারে বাঁচাও আমারে বাঁচাও। গগনবিদারী চিৎকার দিয়ে মাছ আর হাতের ব্যাগ ফেলে দিয়ে রইছ আলী পাগলের মতো দৌড় দিল। কিতা হইল কিতা হইল, এই বলে কিরিন্ড রইছ আলীর ফেলে দেওয়া মাছ আর ব্যাগ হাতে নিয়ে পেছন পেছন দৌড়াতে লাগল। ভয় তার মধ্যেও দ্রুত সংক্রামিত হয়। কিরিন্ডও প্রচণ্ড ভয় পেয়েছে। রইছ আলী আমারে বাঁচাও আমারে বাঁচাও বলতে বলতে ফুরকান মাওলানার বাড়িতে গিয়ে উঠল। মাটিতে আছাড় খেয়ে পড়ল আর বলতে লাগল—আমারে বাঁচাও আমারে বাঁচাও। চিৎকার শুনে ফুরকান মাওলানা বেরিয়ে এলেন। হাতে টর্চ। কাছে গিয়ে দেখলেন রইছ আলী বিড়বিড় করছে। —রইছ আলী ও রইছ আলী, কিতা বিড়বিড় করো? ফুরকান রইছকে ঝাঁকুনি দিলেন। —কিতা অইছে। ফুরকান মাওলানা দেখলেন রইছ আলীর মুখ দিয়ে ফেনা বের হচ্ছে আর বিড়বিড় করছে। তবে হুঁশ আছে। শরীর কাঁপছে। —নূরী একগ্লাস পানি লইয়া সকাল আও। এ আল্লাহ! এরে তো ভূতে ধরছে। কিরিন্ড দাদি রইছের পেছন পেছন দৌড়ে ফুরকান মাওলানার বাড়িতে ঢুকল। হাতে তার বিশাল বোয়াল মাছ আর বাজারের থলে। সে ফুরকান মাওলানাকে বলল, রইছ ভূত দেখিয়া ডরাই গেছে। আমরা একলগে বাজার থাকি আইয়ার। আখতা হে পাগলের মতো দৌড় দিল। ফুরকান বললেন, এরে ভূতে ধরছে। শলতা পোড়া দিতে হইবো। রইছ ও রইছ বলে রইছকে ঝাঁকুনি দিলেন ফুরকান। মুখে পানির ঝাপটা দিলেন। রইছ ফুরকান মাওলানার মুখ চিনতে পেরে যেন একটু আশ্বস্ত হলো। —আমারে বাঁচাও চাচা আমারে বাঁচাও। কদম গাছ থাকি লম্বা কিতা লামিয়া আর আমারে বাঁচাও...। ফুরকান আর কিরিন্ড রইছের মাথায় পানি দিলেন অনেকক্ষণ। তারপর ধরাধরি করে বাড়িতে নিয়ে গেলেন। লেখকসরওয়ার সাহেব বারান্দায় পায়চারি করছেন। এখনো লোডশেডিং চলেছে। কারা যেন বাড়িতে আসছে। কাছে আসতেই দেখলেন ফুরকান মাওলানা আর কিরিন্ড দাদি রইছ আলীকে ধরাধরি করে নিয়ে আসছে। ফুরকান সরওয়ার সাহেবকে বললেন, এরে ভূতে ধরছে। ডরাইছে খুব বেশি। মুখ দিয়া ফেনা বারর। শৈলতা পড়া দেওয়া লাগব। সরওয়ার সাহেব বললেন, আগে ভালো করি দেখি কিতা হইছে। তারপর রইছ রইছ ডাকলেন। রইছ বলল, আমারে বাঁচাও আমারে বাঁচাও। রইছ আলীর স্ত্রী ফাতেমা কাঁদতে লাগল আর বলল, আল্লাহ রে এখন কি হইব, ও আল্লাহ। সরওয়ার সাহেব ফাতেমাকে ধমক দিলেন। —কান্দার কিচ্ছু নাই ফাতেমা। একটু ডরাইছে। আর কিচ্ছু না। ঘরে নিয়া রইছরে এক গ্লাস গরম দুধ দেও। সব ঠিক হই যাইব। ফুরকান বলল, দুধ খাওয়াইয়া লাভ নাই। এরে ভূতে ধরছে। ভূত ছাড়াইতে হইব। সরওয়ার সাহেব বিরক্ত হয়ে বললেন, তুমরা অখন বাড়িত যাও। কাইল দিনোত দেখা যাইব কিতা করা যায়। কিরিন্ড দাদি সরওয়ার সাহেবকে বললেন, সরওয়ার মাছ কিতা করতায়। ভূতোর নজর লাগছে। পালাই দিতায়নি? তার মনে হয়তো আশা এরা মাছ ফেলে দিলে সে নিয়ে নেবে। সরওয়ার বললেন, অত বড় মাছ পালাই দিতাম কেনে? যাওবা দাদি কিতা যে কও! কিরিন্ড আর ফুরকান বেরিয়ে পড়ল। সরওয়ার সাহেবের বাড়ি থেকে বেরিয়ে ফুরকান কিরিন্ডকে বলল, লন্ডন থাকিয়া মাথা এক্কেবারে গেচ্ছে। যে রুগোর যে চিকিৎসা। আমার কিতা। কিরিন্ড বলল, বিড়ি থাকলে একটা দেয় মাওলানা। বিড়ি টানি টানি বাড়িতে যাই। সরওয়ার সাহেব বারান্দায় হাঁটতে হাঁটতে ভাবছেন আসলেই কি ভূত। অতিপ্রাকৃত বা অশরীরী বলে কিছু আছে। লন্ডনে যদিও এগুলো তেমন শোনা যায় না। কিন্তু গ্রামেগঞ্জে মানুষ এখনো খুব জোরে শোরে ভূত বিশ্বাস করে। ভূত মানে কি। যা গত হয়ে গেছে। অর্থাৎ যা অতীতে ছিল। সাধারণ মানুষ ভাবে অতৃপ্ত আত্মা অর্থাৎ অর্থাৎ যে আত্মার সদগতি হয়নি সে অশরীরী ঘোরাফেরা করে। মাঝে মাঝে শরীর ধারণ করে। সরওয়ার ভাবছেন তিনি কি প্রভাবিত হচ্ছেন। আইনস্টাইনের থিওরি অব রিলেটিভিটির যুক্তি কি এখানে প্রয়োগ করা যায়। রইছ আলীর গোঙানির শব্দ শুনে সরওয়ার সাহেবের ঘুম ভাঙল। ভোর ৫টা তখন। সূর্যদেব আকাশে উদীয়মান। চারিদিক পরিষ্কার। রইছ আলী গুঙিয়ে গুঙিয়ে বলছে—সবটির মাথা মটকাইয়া খাইমু, আমার লগে ইয়ার্কি, মাথা না ভাঙছি তো আমার নাম মণিকা নায়। ফাতেমা চিল্লাইয়া উঠল—আল্লা রে কিতা হইল আবার। মণিকা কে ভাইজান দেখি যাউক্কা আইয়া। সরওয়ার সাহেব রইছ আলীর ঘরে গিয়া দেখলেন তার দৃষ্টি অস্থির। চোখ লাল। গোঙাচ্ছে আর বলছে আমি মণিকা, আমার লগে ইয়ার্কি। ফুরকান মাওলানাও আসছেন আবার। এসে দেখলেন রইছ গোঙাচ্ছে আর বলছে আমি মণিকা। ফুরকান বললেন, এরে মণিকার ভূতে ধরছে। খুব বজ্জাত ভূত। খুব জ্বালায়। চিৎকার চেঁচামেচি শুনে গ্রামশুদ্ধ লোক এসে জমা হয়েছে। কিরিন্ড দাদিও আছে এইখানে। সে সবাইকে বলছে কীভাবে ঘটনাটা ঘটল। বলা বাহুল্য যে গল্পের শাখা প্রশাখা কেবলই বাড়ছে। ফুরকান মাওলানা সরওয়ার সাহেবকে বললেন রইছ আলীর ভূত ছাড়ানোর জন্য শলতা চিকিৎসা দরকার। এই পদ্ধতিতে রোগীর নাক দিয়ে শলতার ধোঁয়া ঢোকানো হয় এবং এই ধোঁয়ার কারণে ভূত পালিয়ে যায়। এটাই সবাই বিশ্বাস করে। সরওয়ার সাহেব হ্যাঁ-না কিছু বললেন না। ফুরকান পাশের দুই যুবককে বললেন রইছ কে শক্ত করে ধরতে। রইছের স্ত্রী ফাতেমা একটা লেম আর শলতা নিয়ে এল। ফুরকান রইছ আলীর নাক দিয়ে ধোঁয়া ওঠা শলতা ঢোকাচ্ছে আর রইছ আলী প্রচণ্ড শক্তিতে হাত-পা ছোটাতে চাচ্ছে। একজন যুবক বলল, আল্লা এর গায়ে এত জুর (জ্বর) কি থাকি আইল। সামলানি জারনা। আরও দুজন রইছকে শক্ত করে ধরল। রইছ আলীর চোখ দুটি রক্তবর্ণ। সে গোঙাচ্ছে আর বলছে, ফুরকান তোর মুণ্ডু যদি আমি চিবাইয়া না খাইছি তাইলে আমি মণিকা নায়। রইছের হুংকার বাড়তেই আছে। ফুরকান দোয়া পড়ছেন আর বিড়বিড় করছেন। ফুরকান যেই আবার শলতা ঢোকাইতে গেছেন রইছ আলী হাত ছাড়াইয়া ফেলল। ঝাপটে সে ফুরকানের হাত ধরল আর কামড় দিল ফুরকানের হাতে। ফুরকান কোনো রকমে হাত ছাড়াইয়া বাপরে বাপ্ বলে দৌড় দিয়ে পালিয়ে গেল। রইছ আলীর চিৎকারে বাড়ি কাঁপছে। অনেকক্ষণ ধস্তাধস্তির ফলে রইছ আলীর শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেল। সে নেতিয়ে পড়ল ও ঘুমিয়ে গেল। রাবেয়া খাতুন সরওয়ার সাহেবকে বললেন, এই সব বুজরুঙ্গি (বুজরুগি) দিয়ে কাজ হবে না। তুমি ডাক্তার ডাক। ভূত-টুত ওগুলো কিছু না। কেউ একজন গিয়ে ডাক্তারকে নিয়ে এল। ডাক্তার পরীক্ষা করে বললেন ভয়ের কিছু নাই। হ্যালুসিনেশন থেকে ভয় পেয়েছে। হিস্টিরিয়ার মতো হয়েছে। ইনজেকশন দিচ্ছি। ঘুম আর বিশ্রাম হলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। ডাক্তার চলে গেলেন। রইছ আলী ঘুমাচ্ছে। বাড়িতে সুনসান নীরবতা। অরুন্ধতী এয়ার ফোন কানে লাগিয়ে গান শুনছে আর আরা আইপ্যাডে কি যেন দেখছে। রাবেয়া ভাবছেন বোয়াল মাছটা কি ফেলে দেবেন। আবার ভাবলেন, এ তিনি কি ভাবছেন। তিনিও কি ভূত প্রেত বিশ্বাস করা শুরু করলেন। সরওয়ার সাহেব বারান্দায় পায়চারি করছেন। কী রকম একটা অস্বস্তি পুরো বাড়ি জুড়ে। বাড়ির সামনে শিমুল গাছ থেকে অনেকগুলো কাক একসঙ্গে কা কা করে ডেকে উঠল। একটা বড় ডাল হঠাৎ করে ভেঙে পড়ল কোনো বাতাস ছাড়াই। এই সময় রইছ আলীর ঘরে কে যেন হাসে। একেবারে অট্টহাসি। কে হাসে। ফাতেমা না? ফাতেমাই তো। দুরে আকাশ কাল ধোঁয়ায় ছেয়ে গেছে। ফাতেমার অশরীরী হাসিতে বাড়ি কাঁপছে। একটা বিষণ্নতা যেন সরওয়ার সাহেবকে গ্রাস করল।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১২১৫ জন


এ জাতীয় গল্প

→ মণিকার ভূত

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now