বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
মহা তান্ত্রিক
....
আরমান হোসাইন
....
সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠতে একটু দেরি হলো আমার। ঘুমটা খুবই ভালই হয়েছিল। ঘুমটা হয়তো এত সহজে ভাঙ্গতো না যদি আমার বাড়ির কাজের ছেলে বিধু এসে ডাক না দিতো। আমি বিধুর ডাকে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লাম। ঘড়িতে তখন ৯টা পার হয়েছে। আমার অভ্যাস হলো সকালে ঘুম থেকে উঠেই আগে এক কাপ চা খাওয়া। সেই অনুযায়ি আমি আমার শোবার ঘরের জানালার পাশে রাখা চেয়ারে বসে পড়লাম। ঠিক তখনি বিধু আমার জন্য চা নিয়ে হাজির হলো। কাপ টা হাতে নিয়ে বিধুকে জিঞ্জেস করলাম যে আজ আমার জরুরি কোন কাজ আছে কিনা। আমি আবার কোন কিছু মনে রাখতে পারিনা। বিশেষ করে কোন গুরুত্বপূর্ন কাজ হলে সেটা আমি সবার আগেই ভূলে যাই। তাই আমি আমার সব গুরুত্বপূর্ন কাজের কথা বিধুকে বলে রাখি। সেই আমাকে সব মনে করিয়ে দেয়। আমার প্রশ্ন শুনে বিধু একটু মাথা চুলকালো, তারপর বললো, দাদাবাবু আজ বিশেষ কোন কাজ আপনার নেই। শুধু বিকেলের দিকে একজন সাংবাদিক আসবেন। তিনি তার পত্রিকার জন্য আপনার ইন্টারভিউ নিতে আসবে।।
আমি মনে মনে একটু বিরক্ত হলাম। সংবাদপত্রের সাংবাদিকদের আর কোন কাজ নেই নাকি? আমার মত অতি তুচ্ছ একজন লেখকের ইন্টারভিউ নিয়ে তারা কি করবেন তাই বুঝলাম না। তিনমাস আগে একটা রহস্য উপন্যাস লিখেছিলাম। সেটা এবারের বইমেলায় বাজারে এসেছিল। তারপর থেকে সবাই একেবার আমার পেছনে লেগেছে। হয়েছে না হয় আমার বইটা মেলায় ভাল বিক্রি, তাই বলে ইন্টারভিউ নিতে হবে। উক্ত সাংবাদিক অনেকদিন হলো আমাকে তেল মর্দন করছিলেন আমার ইন্টারভিউর জন্য। আমি শুরু থেকেই না করে আসছিলাম। কিন্তু তিনি আমার পিছু ছাড়লেন না। প্রায় প্রতিদিন আমার কাছে এসে ধর্না দিতে লাগলেন। শেষমেশ তার জ্বালায় একরকম অতিষ্ট হয়েই রাজি হলাম। একটা ইন্টারভিউই তো। কোন মতে দিয়ে দিলেই হবে। অন্তত এই সাংবাদিকের হাত থেকে তো নিস্তার পাওয়া যাবে। সেই সাংবাদিক আজ বিকেলে আসবেন। আমি বিধুকে বলে দিলাম মেহমানের জন্য ভাল কিছু নাস্তার আয়োজন করতে। বিধু মাথা নাড়লো। তারপর খালি কাপ নিয়ে চলে গেল।
বিকালে আমার অভ্যাসমত আমি বাড়ির সামনের উঠানে চেয়ার পেতে বসলাম। তখন আন্দাজ চার'টা বাজে। বিধু এসে চা দিয়ে গেল। আমার আবার চা খেয়ে সিগারেট ধরানোর বদঅভ্যাস আছে। তাই চা'টা শেষ করে একটা সিগারেট ধরালাম। জীবনটা ভালই কাটছে, ব্যাংকে কিছু জমানো টাকা আছে। তা থেকে প্রতিমাসে যে লাভ আসে তা দিয়ে আরামেই দিন কাটাচ্ছি। এবার একটা বিয়ে করা দরকার। কিন্তু মেয়ে পাবো কোথায়? কলেজে পড়ার সময় একটা মেয়ের প্রেমে পড়েছিলাম। তাকে আমার মনের কথা বলার আগেই শুনলাম মেয়েটার বিয়ে হয়ে গেছে। এই ঘটনার পর আর বিয়ে বা মেয়ে নিয়ে মাথা ঘামাইনি। কিন্তু এখন ঘামানোর প্রয়োজন বোধ করছি। পাড়ার তারানাথ ঘটককে বললে তিনি হয়তো একটা ব্যবস্থা করে দিতে পারে। এসব কথাই ভাবছিলাম। হঠাৎ দেখলাম সেই সাংবাদিক ধীরে ধীরে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। লোকটাকে আগে যেমন দেখেছি আজ কিন্তু তার থেকে একটু ব্যাতিক্রম দেখাচ্ছে। লোকটা এসেই বললো, নমস্কার অজিত সাহেব। কেমন আছেন? আমিও উত্তর দিলাম, হ্যা ভাল আছি, আপনি? ''আমিও ভাল আছি" বললো লোকটা। আমি হাঁক দিয়ে বিধুকে জলখাবার আনতে বললাম। লোকটা বললো সে নাকি জলখাবার খেয়েই বের হয়েছে। তারপরও আমি জোর করলাম। শত হলেও আমার অতিথি।
জলখাবার শেষ হলে লোকটাকে তার নাম জিঞ্জেস করলাম। তার নাম উসমান খাজা,মুসলমান। তার সাথে এতক্ষন কথা বলে বুঝলাম লোকটা ভালই। তার সাথে কথা বলে আরাম পাওয়া যায়। একটু পরেই সে তার পকেট থেকে টেপ রেকর্ডার বের করে সামনে রাখলো, তারপর একটা হাসি দিয়ে বললো, তাহলে অজিত সাহেব ইন্টারভিউ শুরু করি? আমিও মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম। প্রশ্নোত্তর পর্ব শুরু হলো।
সাংবাদিক: প্রথমেই আপনার পুরো নাম জানতে চাই।
আমি: অজিত কুমার গুপ্ত।
সাংবাদিক: আপনার লেখালেখিতে হাতে খড়ি হয় কবে?
আমি: লেখালেখিতে হাতে খড়ি হয় অনেক ছোটবেলায়। তখন বোধহয় ক্লাশ ৩ এ পড়তাম। বার্ষিক অনুষ্ঠানে একটি ছড়া লিখেছিলাম।
সাংবাদিক: ওহ তাহলে ছোটবেলা থেকেই লেখক। আপনার লেখা ' মহা তান্ত্রিক' বইটি বইমেলায় ভাল বিক্রি হয়েছে। আপনার অনুভূতি?
আমি: দেখুন আমি আশাই করিনি যে আমার লেখা বই পাঠকরা এতো পছন্দ করবে। আসলে প্রথম বই, তাও হিট। বুঝতেই পারছেন।
সাংবাদিক: আপনার এই মহা তান্ত্রিক বই লেখার পেছনে কোন কারন আছে কি? মানে কিভাবে এই গল্পের আইডিয়া এল আপনার মাথায়?
আমি: এই গল্পটা সত্য ঘটনা অবলম্বনে লেখা।
সাংবাদিক: সত্য ঘটনা অবলম্বনে? এই ঘটনা কোথায় ঘটেছিল একটু বলবেন কি?
আমি: আমার সাথেই ঘটেছিল। সে এক বিশাল ঘটনা। যার কিছুটা মাত্র এই বইয়ে লিখেছি। বাকিটা নিজের কল্পনা।
সাংবাদিক: সেই ঘটনাটা কি বলবেন আমাদের? মানে পাঠকদের?
আমি: বলতে বারন নেই, কিন্তু আমার এই গল্প পড়ার সময় কি পাঠকদের হাতে থাকবে?
সাংবাদিক: অবশ্যই। যারা আপনার বইটা পড়ার জন্য সময় বের করতে পেরেছে তারা এই গল্পটার মূল ঘটনা পড়ার সময়ও বের করতে পারবে আশা করি।
আমি: ঠিক আছে আমি বলছি।
সাংবাদিক: হ্যা শুরু করে দিন।
আমি: ঘটনা ঘটেছিল আরো পনের বছর আগে। তখন আমি সবে কলেজ থেকে পাশ করে বেরিয়েছি। কোন কাজ করার ছিলনা কিন্তু হাতে ছিল অফুরন্ত সময়। তাই কি করবো তাই চিন্তা করছিলাম। হঠাৎ একদিন শুনলাম যদুপুর শশ্মানে নাকি এক তান্ত্রিক আস্তানা গেড়েছে। এতদিন বিকালে খেলতে খেলতে একেবারে বিরক্ত হয়ে গিয়েছিলাম। তাই ওইদিন আর খেলতে না গিয়ে শশ্মানে গেলাম সেই তান্ত্রিককে দেখতে।
সেখানে গিয়ে দেখলাম অনেক মানুষ তার আশেপাশে ভিড় জমিয়ে বসে আছে। আর তান্ত্রিকও তার কেরামতি দেখাচ্ছিল। আমি ভিড় ঠেলে ভিতরের দিকে ঢুকলাম। তান্ত্রিকের চেহারাও ছিল দশাসই। জটাধরা চুল, গোফ দাঁড়ি, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা আর জবা ফুলের মত লাল চোখ। মানুষের চোখ এত লাল হতে পারে তা জানতাম না। তান্ত্রিক মহাশয় তখন বিভিন্ন কেরামতি দেখাতে ব্যস্ত। তান্ত্রিক তার থলে থেকে একটা মৃত পাখি বের করে তার শরীর থেকে কয়েকটা পালক ছিড়ে তার হাতে রেখে হঠাৎ পাখিটাকে তার সামনে জ্বলতে থাকা আগুনে ফেলে দিল। চারদিকে পোড়া মাংসের গন্ধ ছড়িয়ে পড়লো। প্রায় সবাই নাকে হাত দিল। তখনই দেখলাম তান্ত্রিক সেই পালকগুলো হাতে দিয়ে কি যেন বিড়বিড় করে পড়তে লাগলো। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখি তান্ত্রিকর হাতে সেই পাখিটি বসে আছে, যেটাকে একটু আগেই আগুনে পোড়ানো হয়েছিল। আর পাখিটা ছিল মৃত আর এখন সেটা দেখলাম জীবিত। বুঝতে পারলাম তান্ত্রিক মহাশয় সোজা লোক নয়। এরপরও আরো কয়েকটা কেরামতি দেখালো। ধীরে ধীরে সন্ধ্যার আধার নেমে আসতে লাগলো। আর মানুষজনও শশ্মান ত্যাগ করতে লাগলো।
একসময় দেখতে দেখতে শশ্মান খালি হয়ে গেল, আমি ছাড়া আর কেউ বেই আশেপাশে। আমি যেন কেমন হয়ে গেলাম। আমি বসেই রইলাম তান্ত্রিকের সামনে। তান্ত্রিক তখন আমার দিকে কটমট করে তাকিয়ে তারপর থলে থেকে কল্কি বের করে গাঁজা ধরাল। এবার আমি বুঝতে পারলাম তার লাল চোখের রহস্য।
তান্ত্রিক তখন গাঁজা সেবনে ব্যস্ত আর আমি তখন তার গাঁজা সেবন করার পদ্ধতি দেখায় ব্যস্ত। একটা পিঁপড়ার কামড়ে আমার সম্বিৎ এল। আশেপাশে তাকিয়ে দেখি অন্ধকার ধীরে ধীরে তার রাজত্ব বিস্তারে ব্যস্ত। আমি আবার তান্ত্রিকের দিকে তাকালাম। তাকিয়েই বিষম খেলাম। তার চোখদুটো আগের চেয়ে আরো বেশি লাল। এই অন্ধকারেও তার চোখদুটো দেখা যাচ্ছে। আমি তখন ভয় পেয়ে যেই সেখান থেকে উঠতে যাবো তখনই তিনি কথা বলে উঠলেন " কিরে বৎস আমার চোখ দেখে ভয় পেলি বুঝি?" বাপরে কি বাজখাঁই গলা, একেবারে পিলে চমকে উঠলো। আমি তার কথা শুনে সেখানেই থমকে দাঁড়ালাম। গলাটা শুকিয়ে একেবারে তক্তা হয়ে গেল। আমি ভাবছি যে এখনি দৌড়ে পালাবো তখনই তিনি আবারো বলে উঠলেন" কিরে অজিত দৌড়ে পালানোর চিন্তা করছিস নাকি? আমি কি বাঘ না ভাল্লুক যে পালাতে চাস? আয় এই আগুনের সামনে বসে পড়। তোর সাথে একটু গল্প করি।" আমি তখন আবারো বিষম খেলাম। আমার নাম যে অজিত আর আমি যে দৌড়ে পালাতে চাই তা এই তান্ত্রিক জানলো কিভাবে? নিশ্চই তিনি মনের সব কথাই বুঝতে পারেন। আমি আর কোন দিরুক্তি না করে জ্বলতে থাকা আগুনের সামনে বসে পড়লাম। " তোর তো অনেক তেষ্টা পেয়েছে, ঠান্ডা জল খাবি নাকি?" আগুনে একটা শুকনো গাছের ডাল দিতে দিতে এই কথাগুলো বললেন তিনি। আমার আর সন্দেহ রইলো না যে এই তান্ত্রিক অন্তর্যামি। আমি তখন মাথা নেড়ে সায় দিলাম। সে তখন তার থলে থেকে এক বোতল পানি আর একটা ডালিম বের করে আমার হাতে দিলেন। " তুই তো ডালিম খুব পছন্দ করিস। এই নে এটা খা" পানি আর ডালিম হাতে দিতে দিতে বললেন। আমি বললাম " আচ্ছা আপনি আমার মনের সব কথা জানেন কিভাবে?"
তিনি কোন কথা না বলে মুচকি হাসলেন। কিছুক্ষন কেউ কোন কথা বললাম না। তারপর তিনি বললেন " তুই জানিস তোর দুইপাশে দুইটা ভূত বসে আছে?" আমি আঁতকে উঠে আমার দুইপাশে তাকালাম। কিন্তু কিছুই দেখলাম না। আমি মনে করলাম তান্ত্রিক মনে হয় আমার সাথে মজা করছে। তখনই তান্ত্রিক বলে উঠলো " নারে অজিত আমি মজা করিনি। সত্যিই তোর দুইপাশে দুইটা ভূত বসে আছে। এদুটো আমার পোষা ভূত। একটার নাম জগাই আরেকটার নাম মাধাই। আমি বললাম " কিন্তু আমি তো দেখতে পাচ্ছি না।" তখন তান্ত্রিক বললো " আহা ভূত দেখার তোর এত শখ কেন রে? বলি ভূত দেখে পরে মুর্ছা গেলে কে তোকে বাড়ি দিয়ে আসবে তাই বল?" আমি মনেমনে ভাবলাম তান্ত্রিক কথাটা কিন্তু খারাপ বলেনি। ভুত কি কোন দেখার জিনিস নাকি? এসব ভাবতে ভাবতে উঠে দাঁড়ালাম। তান্ত্রিকের বাড়ি দিয়ে আসার কথা শুনেই মমনে হলো আমাকে বাড়ি যেতে হবে, নয়তো মা বকবেন। তারপর চারদিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম রাত মোটামুটি খারাপ হয়নি। আমি তান্ত্রিকের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সেদিনের মতো বাড়ি চলে এলাম। কিন্তু মন আমার পড়েছিল সেই তান্ত্রিকের কাছে।
সকালে ঘুম থেকে উঠে কোন রকমে সকালের নাস্তাটা করেই ছুট লাগালাম তান্ত্রিকের কাছে। গিয়ে দেখি তান্ত্রিক সেই জায়গায় চোখ বন্ধ করে বসে আছে। আজ তার আশেপাশে কোন মানুষজন ছিলনা। আমি মনে মনে খুশি হলাম। আমি গিয়ে আস্তে করে তার সামনে বসে পড়লাম একটুও শব্দ না করে। আমি বসতেই তান্ত্রিক চোখ বন্ধ রেখেই বলে উঠলেন, " কিরে অজিত ঠিকমত সকালের নাস্তা না করেই এখানে চলে এলি বুঝি?" আমি এবার অবাক হলাম না। আমি বললাম, " হ্যা এই আরকি আসলাম। আপনাকে দেখতে ইচ্ছে হলো, তাই চলে এলাম।" " তোর ভাগ্য ভালো রে অজিত। কারন একমাত্র তুই আমাকে আজ দেখতে পাচ্ছিস। আর কেউ আমাকে দেখতে পাচ্ছে না রে।" তান্ত্রিক বললো। এবার আমি একটু অবাক হয়েই বললাম, " কেন কেউ আমাকে দেখতে পায় না আপনাকে? " " কারন আমি নিজেকে অদৃশ্য করে রেখেছি। যাতে কেউ জ্বালাতে না পারে। এখানের মানুষের জ্বালায় একেবারে পাগলা হয়ে গেলাম।" তান্ত্রিক বললো। আমি বললাম " তাহলে আমি কেন দেখতে পাচ্ছি আপনাকে?" " কারন তোর প্রতি আমার কেমন যেন মায়া পড়ে গেছে। তাই তোকে দেখা দিচ্ছি। জানিস আজ আমি এখান থেকে চলে যাবো" তান্ত্রিক বললো। আমি বললাম " চলে যাবেন কেন আপনি?" তান্ত্রিক কিছু বলতে গিয়েও চুপ করে গেল। কেউ যেন পেছন থেকে আসছে। আমি পায়ের শব্দ পেয়ে পেছনে তাকালাম। ওপাড়ার রামকুমার আসছে আমার দিকেই। একটু দূরে থাকতেই সে হাঁক দিলো " কিরে অজিত এখানে কি করিস রে? তা ওই তান্ত্রিকটা গেলো কোথায় রে? তাকে তো আজ দেখছি না এখানে।" আমিও বললাম " কুমারদা উনি তো কাল রাতেই মনে হয় কোথাও চলে গেছে।" তখন কুমারদা মুখে একরকম চুক চুক শব্দ করে যেদিক থেকে এসেছিল সেদিকেই চলে গেল। আমি আবার সামনে তাকালাম। কিন্তু একি? আমার সামনে যে কেউ নেই। কোথায় গেল সেই তান্ত্রিক? তিনি তো নেই আমার সামনে। শুধু পড়ে আছে তার সেই ধুনির ছাই আর কাঠ কয়লা। তাহলে কি উনি চলে গেলেন? আমি সেখানে আরো কিছুক্ষন সেখানে বসে থেকে বাড়ি ফিরে এলাম। মনটা খুবই খারাপ হয়েছিল। বারেবারে সেই তান্ত্রিকের কথা মনে হতে লাগলে। আর কখনো কি তার দেখা পাবো না?
এভাবেই দিন কেটে গেল। সেই ঘটনার একবছর পার হয়ে গেছে। এখনো মাঝে মাঝে সেই তান্ত্রিকের কথা মনে পড়তো। কিন্তু ততো জোরালো নয়। এভাবেই চলছিল। হঠাৎ আবারো সেই তান্ত্রিকের সাথে দেখা। কিন্তু এবার একটু অন্যভাবে। সেদিন ছিল হাটবার। বাবা সেদিন হাট থেকে বিশটা ইলিশ কিনে আনলেন। তারপর বাড়িতে এসে দশটা ইলিশ ব্যাগে ভরে আমার হাতে দিয়ে বললো " যা তো অজিত, এই মাছগুলো তোর মামা বাড়ি দিয়ে আয়। দেরি করিস না। এখনি রওনা দে।" মামা বাড়ির কথা শুনে আমি লাফিয়ে উঠলাম। অনেকদিন মামা বাড়ি যাই না। আর মামা বাড়ি বেশি দূরেও না। ঘন্টা দুয়েকের রাস্তা। তখনি আমি সাইকেলে চড়ে মাছ নিয়ে রওনা হলাম। সংগে একটা টর্চ নিলাম। কারন ফিরে আসতে অনেক রাত হতে পারে। তারপর যথারীতি মামার বাড়ি পৌছলাম। মামা আর মামী আমাকে দেখে ছাড়তেই চায় না। তারপর অনেক কষ্টে ছাড়া পেলাম। রাত তখন দশটার একটু বেশি। আমি এক হাতে টর্চ জ্বেলে সাইকেলে চড়ে রওনা দিলাম। মামা বলেছিল রাতটা থেকে যেতে। কিন্তু উপায় নেই আমার, সামনেই পরীক্ষা। তাই বাড়ী ফিরতেই হবে। খুব জোরেই সাইকেল চালাচ্ছিলাম। প্রায় অর্ধেক রাস্তা চলে এসেছি, হঠাৎ পাশের জঙ্গল থেকে চার পাঁচজন লোক লাফিয়ে আমার সাইকেলের সামনে এসে পড়লো। আমি কিছুটা ভয় খেয়েই হয়তোবা ব্রেক কষতেই সাইকেল থেকে উল্টে পড়লাম। কনুই এর ছাল উঠে গেল। আমি তো ভয়েই শেষ। বুঝতে পারলাম ডাকাতের কবলে পড়েছি। লোকগুলোর মধ্যে একজন বলে উঠলো " হে হে চাঁদু আজ তোমাকে কে বাঁচাবে? অনেকদিন তক্কে তক্কে ছিলাম। আজ সুযোগ পেয়েছি। সেই কবে রায়বাবুর কাছ থেকে তোমাকে মারার জন্য টাকা নিয়েছি। কিন্তু তোমাকে কিছুতেই বাগে পাইনি। আজ পেলাম। ওরে বগলা, ব্যাটাকে জাপটে ধর। পালাতে না পারে যেন।" এ কথা বলতেই ষন্ডা মত একজন আমাকে জাপটে ধরলো। বুঝতে পারলাম বাবার চিরশত্রু রায় ঘোষাল আমাকে মারার জন্য লোক পাঠিয়েছে। ঘোষাল বাবাকে নাকি একদিন হুমকি দিয়েছিল যে সে নাকি আমাদের বংশের প্রদ্বীপ নিবিয়ে দিবে। আর আমিই আমার বাবা মার একমাত্র সন্তান। তাই বুঝে গেলাম আজ আমার শেষ দিন। আমি ছাড়া পাবার একটু চেষ্টা করলাম। কিন্তু লাভ হলো না। যাভাবে আমাকে পাকড়েছে তাতে আমার ধম বন্ধ হয়ে আসছিল। দলের থেকে একজন আমার মুখ চেপে ধরেছে যাতে চেঁচাতে না পারি। আরেকজন মনে হয় একটা ছুরি বের করলো কোমর থেকে। আমার সময় শেষ। আর হয়তো পৃথীবির আলো দেখতে পাবো না। ছোরা হাতে লোকটা আমার খুব কাছেই চলে এলো। হঠাৎ পাশের বাঁশ বাগান থেকে হুড়হুড় করে দশ থেকে বারোটা শিয়াল বেরিয়ে এসেই লোকগুলোর উপর লাফিয়ে পড়লো। লোকগুলো তখন বাবাগো, মা গো করে চেঁচাতে লাগলো। কিছুক্ষন এমন গোলমাল হলো। তারপর সব শান্ত। গুন্ডাগুলোর দেহ মাটিতে পড়ে আছে। আর শেয়ালগুলোও আমার দিকে এগুচ্ছে। এবার বুঝি শিয়ালগুলো আমার উপরই ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারপর কেমন করে যেন আমার চোখ গুলো একটু সামনের দিকে গেল। কারন সেখানে একটু আলোর মত কিছু একটা জ্বলছে। তাকাতেই দেখলাম সেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেই তান্ত্রিক মহাশয়। আর তার আশেপাশেই দাঁড়িয়ে আছে শেয়ালগুলো। আমার বুঝতে বাকি নেই যে এই মহা তান্ত্রিকের জন্য আজ আমি বেঁচে গেলাম। আমি প্রথমে একটু অবাক হলেও পরে আমি তাকে মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে প্রনাম করলাম। তারপর আমি কিছু একটা বলার আগেই তিনি বললেন " ভাবিস না, ওই রায় ঘোষালের ব্যাবস্থা হয়ে যাবে। তুই বাড়ি যা। আর এই ঘটনার কথা কাউকে বলিস না।" একথা বলেই তিনি চোখের সামনে থেকে উধাও হলেন। তখন আমি তাকে আরেকবার প্রনাম করে সাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফিরলাম।
সকালে ঘুম থেকে উঠেই খবর পেলাম সেই রায় ঘোষাল গলায় দড়ি দিয়েছেন। তারপর থেকে এখনো আমি বিপদে পড়লে উনি হাজির হন আমাকে রক্ষা করতে। উনি তান্ত্রিক নন, উনি মহাতান্ত্রিক।
.............
সমাপ্ত
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now