বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
মেরুন রঙের অভিমান-০১
দীপকের শার্টের কলারে মেরুন রঙের লিপস্টিকের দাগ দেখে অর্চিতার বুকটা কেপে উঠলো।তাহলে কি
সেদিন দীপকের কলিক শুভঙ্করের কথাটা ঠাট্টাতামাসার থেকে বেশি কিছু ছিল?
দীপক কি তবে অন্য কোন মেয়ের প্রতি..?
না।অর্চিতা এরপর আর কিছু ভাবতে পারলোনা।মাথাটা ঝিমঝিম করছে।গা-পা টলমল করছে।মনে হচ্ছে এখনি পড়ে যাবে।কলের হাতলটা ধরে খুব সন্তর্পণে বসে পড়ল।চোখের কোণে জল টলমল করছে।বামহাতের ঠিক তিনটে আঙ্গুল দিয়ে ডানচোখের জল থামালো সে।কিন্তু বাম চোখে জল চলে এসেছে ততক্ষণে।এমন কেন হচ্ছে? সে তো কান্না থামাতে পারছেনা।তাড়াতাড়ি হাত-মুখ পরিষ্কার করে রুমে চলে গেল।আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে খুঁটিয়ে দেখলো।
সে কি আগের থেকে অনেক রোগা হয়ে গেছে নাকি বেশি বেঢপ হয়েছে?শরীরে মেলানিননের পরিমাণ কি বেড়ে গেল নাকি?নাকি দীপকের রুচি পরিবর্তন হয়েছে?
অর্চিতার হঠাৎ মনে পড়ল সেদিন দীপক একটা আর্টিকেল পড়ছিল 'ছেলেদের কেমন মেয়ে পছন্দ' এই শিরোনামে।তখন অর্চিতার মাথায় এসব চিন্তা ঘুণাক্ষরেও আসেনি।দীপক বইপড়ুয়া ছেলে। হাতের কাছে কাগজ পেলেই তাতে মুখ গুজে পড়তে শুরু করে দেয়।ওটাও নেহাত পেয়েছিল হাতের কাছে এই ভেবেছিল অর্চিতা।কিন্তু এখন যেন ভাবনাগুলো জট পাকিয়ে যাচ্ছে।
মাথাব্যথাকে বুড়োআঙুল দেখিয়ে একদৌড়ে ড্রয়িংরুমে চলে গেল সে।পুরোনো কাগজপত্র ঘাটতে লাগল।ওর জানতেই হবে কাগজে কি এমন লেখা ছিল!কলিংবেলের শব্দে কাজের ব্যাঘাত ঘটলো।গেটে উঁকি দিতেই দেখে দীপক বাজারের ব্যাগ হাতে দাঁড়ানো।তার মুখে কেমন সুখী মানুষের চিহ্ন।এর আগে কি অর্চিতা এমন দীপককে কখনো দেখেছে?নাকি তার মনের সন্দেহের জোরে মানুষটাকে এমন দেখাচ্ছে!
এসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতেই আরো একবার কলিংবেলের আওয়াজ আসলো।যতটা সম্ভব কম শব্দ করে দরজা খুলে দিল অর্চিতা।দু'জনের ন্যানোসেকেণ্ডের দৃষ্টিবিনিময় ও হলো।দীপক একটু হাসলো,অর্চিতার মুখ গম্ভীর।
"অর্চিতা,একটা দুঃসংবাদ আছে"
দীপকের কথা শুনে অর্চিতার বুকটা আবারো কেঁপে উঠলো।সে রাগ কনট্রোল করে জিজ্ঞেস করলো,
"আর কত বড় দুঃসংবাদ দিবে দাও।কিছু না বলেও অনেক দুঃসংবাদের বাহক তুমি"
"কি যা-তা বকতেছো! আগে শুনো তো!"
"আমি জানি তুমি কি বলবে! পেপারে সাইন কবে নাগাদ করতে হবে বলো"
"সিরিয়াসলি? তুমি রাজী? "
দীপকের এমন উচ্ছ্বাস দেখে আর অর্চিতা কান্না থামাতে পারলো না।ছ'বছরের বাচ্চার মতো কাঁদতে লাগলো।ইচ্ছা করছে একছুট দিয়ে বাবার বাসায় চলে যেতে।কিন্তু সে শক্তিটুকুও যেন তার নেই।পুরোনো কথা রোমন্থন করছে তার মন অনবরত। এই সেই দীপক!
এই কি সেই সাত বছরের প্রেমিক?
এই দীপকের হাত ধরেই কি সে বাবার বিরুদ্ধাচার করে পালিয়ে এসেছিল? নির্ভরতা খুঁজে পেয়েছিল এই দীপকের বুকে?
"আবার কী হলো? কান্না করতেছ কেন?"
অর্চিতা চুপ করে থাকে।ওর খুব করে ইচ্ছে হয় কিছু কঠিন কথা শুনিয়ে এক কাপড়েই বাড়ি ছেড়ে বের হয়ে যেতে।কিন্তু কথাগুলো যে স্বরযন্ত্রে ঘাপটি মেরে বসে আছে।বের হয় না।
কিছুক্ষণ পর দীপক ওর পাশে এসে বসে।
"এই যে ম্যাডাম! কী হলো বলবেন নাকি এমন কান্না করবেন? আমি তো দারবিশ না যে আপনার মনের কথা পড়তে পারব।কিছু তো বলেন!"
দীপকের এমন আদিক্ষেতা অর্চিতার সহ্য হচ্ছে না।তবুও সে নীরব।তার মনের মধ্যে উত্থানপতন শুরু হয়েছে।ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে যেন সে কুঁকড়ে যাচ্ছে প্রতিসেকেন্ডে।তার কান্না থামাতে পারছে না কিছুতেই।দীপক ওর মাথায় হাত রাখতেই এক ঝাঁটকায় হাতটা সরিয়ে দিয়ে রুমে চলে গেল।দীপক দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে দরজায় খিল দেওয়ার শব্দ টের পেল।মনেমনে ভাবল ইশ! মেয়েটা এত্ত অভিমানী?
দীপক কয়েকবার দরজা নক করল।কিন্তু অর্চিতার কোন পরিবর্তন হলো না।রাতে খাবারটাও খেলো না।এদিকে টেনশনে দীপক ও খেতে পারলোনা।একমনে চিন্তা করলো কী এমন হইছে যার জন্য এত রাগ করতে হবে? ভাবতে-ভাবতে যে কখন ঘুম চলে এসছে দীপক টের পাইনি।সকালে উঠে ফ্রেশ হয়ে দেখে টেবিলে খাবার দেওয়া কিন্তু মহারাণীর কোন খবর নেই।তারমানে এখনো রাগ কমেনি।
আরো একবার কি দরজায় টোকা দেবে সে? ভাবতে ভাবতেই অফিসের ফোন আসলো।বস তাড়াতাড়ি অফিসে যাওয়ার জন্য তাড়া দিল।অর্চিতাকে আর ডাকা হলো না।দীপক চলে গেল।
দীপক অফিসে বসে ভাবছে সে কি রেস্টুরেন্টে কৃত ভুলের মতো আবার সেরকম কোনো ভুল করলো? একবার রেস্টুরেন্ট এ অর্চিতার সাথে ডিনারে গেছিলো।এদিকে অফিসের জরুরী একটা কাজ আছে।রাতের মধ্যেই কমপ্লিট করতে হবে।অর্চিতাকে খাবারের অর্ডার দিতে বলে ও একটু অন্যমনা হয়ে কাজ করছিল।ব্যাস! তাতেই অর্চিতা রেগেমেগে অস্থির।কি রাগ তার!
সেই রাগ ভাঙাতেই কি কষ্টটাই না হইছিল দীপকের!
দীপক বুদ্ধিমান ছেলে তারপরও এমন ছোটখাট ভুল করে ফেলে। সে ব্রেইনে প্রচুর চাপ দিয়ে পূর্বের কথাবার্তা সব মনে করার চেষ্টা করল।কিন্তু অর্চিতা রাগ করতে পারে এমন কিছুই মনে করতে পারলো না।তবে অবাক করার মতো একটা বিষয় মাথায় উঁকি দিয়ে গেল।অর্চিতা পেপারে সাইনের কথাটা জানলো কীভাবে? আর এ ব্যাপারে কিছু জানতে কেন চাইলোনা আর?
ওদের বিয়ের আগের কিছু সুখকর স্মৃতি রোমন্থন করতে লাগলো দীপক।কল্পনায়।খুব সঙ্গোপনে।
একবার অর্চিতা জিজ্ঞেস করলো,
"আচ্ছা, সুনীলের ভালবাসি কবিতাটা পড়েছো"
"পড়বনা আবার? যার হবুবউ দিনে সাতবার কানে হেডফোন লাগিয়ে কবিতাটা শুনে তার প্রেমিকের তো অন্তত কয়েকবার শোনা উচিত"
তারপর দু'জনের নীরবতা।নীরবতা। শুধুই নীরবতা।যেন এই নীরবতা সুনীলের ভালবাসি ভালবাসি কবিতার মতো মধুর।উপভোগ্য।যেন সবসময় একে অপরকে বলে যাচ্ছে ভালোবাসি তো! নীরবতা ভেঙে অর্চিতা এবার প্রশ্ন করল,
"এই যে এত ভালবাসাবাসি।ইংরেজিতে Love।এই পিচ্চি তবে কিউট শব্দটির উৎপত্তি কোথা থেকে জানো?"
"দীপক বুদ্ধিমান ছেলে।সে সব জানে"
অর্চিতা একটু দম্ভের সাথে বলল, "তাই নাকি?"
"ইয়েস ম্যাডাম"
"তাহলে আমাকেও জানিয়ে উদ্ধার করেন জনাব"
“Love শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘lubhyati’ (লুভায়াটি) থেকে। এর অর্থ হচ্ছে ইচ্ছা। এই শব্দটির ব্যবহার সব চাইতে বেশি মিউজিক জগতে"
"বাহ! আসলেই তুমি জিনিয়াস"
কথাগুলো ভাবতেই চোখ ভারী হয়ে আসে দীপকের।মেয়েটাকে সে কত্ত ভালোবাসে কিন্তু বোঝাতে পারে না।তবে কি সে ব্যর্থ প্রেমিক?
অপ্রেমিক সে?
দুপুরে বাসায় লান্স করলেও আজ সে অফিসের ক্যান্টিনে লান্সের পাঠ চুকিয়ে নিল।বাসায় ফিরেই তো সেই গুমোট ভাব।তার উপর অর্চিতা বলেছে সে তার মুখদর্শন করতেও চায় না।এই একটা কথা দীপককে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে।আর অফিসেও আজ একটা ইম্পরট্যান্ট মিটিং এটেন্ড করতে হবে।টরেন্টো থেকে ক্লায়েন্ট আসবে তাদের সাথে দীপককে থাকতে হবে।সবমিলিয়ে আর বাসায় যাওয়া হলো না।হলো না বলতে দীপক গেলো না।ইচ্ছা হলো না তার।
এদিকে অর্চিতা দুপুরেও কিছু মুখে দিলনা।কিন্তু অভ্যাসবশত দীপকের জন্য ডাইনিংয়ে খাবার পরিবেশন করল।বিয়ের পর এমন কোনদিন হয়নি যে দীপক লান্সে বাসায় আসেনি।যত ঝগড়াঝাঁটি হোক না কেন মানুষটা দুপুরে বাসায় খেতে আসবেই।কিন্তু আজ এলো না।অর্চিতার অনেকখানি মন খারাপ হলো।অনেকখানি মানে সে সারাদুপুর কাঁদলো।বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার নিয়নবাতি মিটিমিটি জ্বলছে।অর্চিতার পুরোনো কথা মনে পড়ে গেল এই বিষাদময় সন্ধায়।
"বলো দেখি একজন মানুষ কতবার প্রেমে পড়ে?"
অর্চিতার এমন প্রশ্নে দীপক খানিকটা থতমত খেয়ে বলল,
"এ আবার কেমন প্রশ্ন!"
"জানি না।তবে তোমাকে বলতে হবে"
"একটা জার্নালে পড়েছিলাম বিভিন্ন গবেষণা এবং পরিসংখ্যানে দেখা গিয়েছে যে, প্রত্যেক ছেলে মানুষ বিয়ের আগে অন্তত ৭ বার প্রেমে পড়েন এবং মেয়েরা..."
এ পর্যন্ত বলতেই দীপককে থামিয়ে দেয় অর্চিতা।ব্যাঙ্গ করে বলে,
"থাক হইছে।মেয়েদেরটা জেনে আমার কোন কাজ নেই।এবার বলো আমি কি তোমার সাত নম্বর প্রেমিকা? নাকি আমাদের বিয়ের আগে আরো কয়েকবার প্রেমে পড়ার চান্স আছে তোমার?"
অর্চিতার এমন কথায় দীপক যে কি হাসিটাই না হেসেছিল।বলেছিল,
"ধুর! এসব সত্যি নাকি তাই?তবে,শুনেছি বিয়ের পর নাকি অন্তত একবার অন্য রমনীর প্রেমে পড়ে ছেলেরা"
বলেই আবার অট্টহাসিতে গড়াগড়ি অবস্থা। অর্চিতাও মুখে খানিকটা মিথ্যা অভিমান নিয়ে উঠে চলে যাচ্ছিল।দীপক পিছন থেকে হাতটা খপ করে ধরেই যে কাজটা করেছিল তা শুধু অর্চিতার জীবনের শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত ছিলনা। প্রত্যেকটা মেয়েরই আকাঙ্ক্ষিত সুখকর স্মৃতি বা স্বপ্ন। এখনো সে সময়টার কথা ভাবলে আনন্দে চোখ চকচক করে উঠে তার।অতি সুখে নাকি মানুষ কেঁদে ফেলে।অর্চিতাও এর ব্যতিক্রম ছিলনা।ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না করে বেচারা দীপকের অলিভ কালারের শার্টের হাতা ভিজিয়ে ফেলেছিল।আর দীপক! সে অবাক হয়ে ভবিষ্যৎ জীবনসঙ্গিনীর কাণ্ডকারখানা দেখছিল।
কিন্তু কথায় আছে সুখকর স্মৃতি বেশিক্ষণ রোমন্থন করা যায় না।তাই হয়তো হঠাৎ টেলিফোনে অর্চিতা বাস্তবে ফিরে এলো।ফোন রিসিভ করতেই সেন্সলেস হয়ে পড়ে গেল।একা।একদম একা একটা মানুষ। কেউ পাশে নেই তার।ফোনের অপরপাশের মানুষটা কি কিছু টের পেলো??.....
(চলবে)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now