বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
"মেঘের অনেক রঙ"
- রেজওয়ানা দোলন
এক.
রহমান সাহেব খুব খুশি আজকে। এদিক ওদিক দৌড়ে বেড়াচ্ছেন। অথচ, কাল অব্দি একটু জোরে হাঁটলেও ভয় পেতেন তিনি। আবার না হার্ট এট্যাক হয়ে যায়। আজ তাকে দেখে কেউ বলবে না, তার তিনবার হার্ট এট্যাক হয়েছিলো। একে ওকে তদারকি করে করে বিরক্ত করে ফেলছেন। শহরের একটু দূরে তার দোতলা সাদা বাড়িটায় আজ আলোর কোনো অভাব নেই। রমরমা পরিবেশ। খুশিতে বাড়িটা গমগম করছে। করবে নাইবা কেনো! মা মরা মেয়েটার বিয়ে আজ। ছোট মেয়ে দুলু দৌড়ে এলো,
"কি গো বাবা! এখনো তো বর এলো না! আমি তো সেই কখন থেকে দাঁড়িয়ে আছি। আমাকে কিন্তু এক হাজার টাকা দিতে হবে। তা না হলে বরকে আমি ঢুকতে দেবো না। বিয়ে ভেঙ্গে দেবো বলে দিলাম!"
"এমন করে বলতে নেই মা। বর ঢুকতে না দিলে তোমার বুবুকে বিয়ে করবে কে। তাহলে তো রাজপুত্র পঙ্খীরাজে নিয়ে যাবে না।"
"তাই বাবা? তাহলে তো বুবু খুব কষ্ট পাবে। আচ্ছা, আমি আর বলবো না।"
দুলু যেভাবে দৌড়ে এসেছিলো, তার চেয়েও অত্যাধিক উত্তেজনায় আবার দৌড়ে সদর দরজার সামনে চলে গেলো। দুলু জন্ম নেবার সময় রহমান সাহেব তার স্ত্রী এবং নিলু-দুলু তাদের মা কে হারায়। তখন নিলুর বয়স পনেরো। মাকে এভাবে হারিয়ে ফেলবে কল্পনাও করেনি ও। কত কষ্ট করে দুলু কে নিজের হাতের পিঠে বড় করেছে। মাঝে মাঝে কৌটার দুধ ফুরিয়ে যেতো। দোকান থেকে কিনে নিয়ে আসতে একটু দেরি হওয়াতে সে কি কান্না মেয়ের। তখন বুদ্ধি করে হাতের ছোট আঙ্গুল দুলুর মুখে পুরে দিয়ে কান্না থামাতো। অনেকেই রহমান সাহেবকে বিয়ে করতে বলেছিলো। কিন্তু, তিনি কিছুতেই রাজি হন নি। মেয়ে দুটোর মুখের দিকে তাকিয়ে অক্লান্ত পরিশ্রম করে গিয়েছিলেন। তাছাড়া নিলুতো কত ছোট বয়সেই কেমন গুছিয়ে সংসারের দায়িত্ব নিয়ে ফেলেছিলো। সেই ছোট্ট নিলুর আজ বিয়ে।
.
দুই.
এখন পার্লারের চল এসেছে। বিউটিশিয়ানদের মোটা অংকের টাকা দেবে বলে নিয়ে এসেছেন রহমান সাহেব। আদরের বড় মেয়ের বিয়ে বলে কথা! কিন্তু, নিলু বলে দিয়েছে কিছুতেই সাজবে না তাদের কাছে।
"শুনুন, আমি একাই খুব সাজতে পারি। আমাকে সাজাতে হবে না। তাছাড়া আমার পার্লারের ওরকম সাজ একদম পছন্দ না!"
"তা কি করে হয়! আমরা এতো দূর থেকে এলাম।"
"আপনাদের পারিশ্রমিক দিয়ে দিচ্ছি। নিয়ে যান।"
"না, তারপরেও। কিছু একটা তো....!"
"পাশের রুমে আমার সুটকেস রাখা আছে। জিনিসপত্র এলোমেলো। গুছিয়ে দিন। যান।"
মুখ কালো করে চলে গেলো সাজাতে আসা মেয়েগুলো। ওরা চলে যাওয়ার পরেই খটাশ করে দরজা বন্ধ করে দেয় নিলু। বরের বাড়ি থেকে দেওয়া জিনিসপত্র, প্রসাধনী সামগ্রীগুলো পাশের ঘরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। আর, নিলুর ঘরের মাঝারী দেওয়াল আয়নার সামনের, তাকে রাখা লাল টিপের পাতা, আলতা, চুড়ি, রুপোর এক জোড়া ঝুমকো, এক জোড়া নুপুর আর একখানা লাল টূকটুকে ঢাকাই শাড়ি। এসব শহর কিনে এনে দিয়েছিলো পলাশ। নতুন চাকরি পেয়েই রুপোর গয়নাগুলো বানাতে দিয়েছিলো নিলুর জন্যে। প্রথম বেতনের টাকা দিয়ে সেসব এনে দিতে পেরে ভীষণ খুশি পলাশ। নিলুকে হাতে দিয়ে বলেছে, "নিলু তুমি সেজে থেকো। আমি আসবো তোমার বাবার সাথে কথা বলতে।" গত তিন মাসে পলাশ আর কোনো যোগাযোগ করেনি নিলুর সাথে। প্রতিদিন দুলুর কাছে জিজ্ঞেস করে, "দুলু, কেউ ফোন করেছিলো!" দুলুর না উত্তরে, চুপ করে শাড়ির আঁচল গুটিয়ে নিয়ে উঠে চলে যায় নিলু। প্রতিদিন বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে ও, পলাশ এসে যদি বাড়িতে ঢুকতে লজ্জা পায়! কিন্তু, আসে না কেউ। নিলু খোঁজ করতে গিয়েছিলো পলাশের ঠিকানায়। ওরা পলাশ নাম শুনে হাসলো। এ যাবতকালে নাকি পলাশ নামে সেখানে কেউ ছিলোই না।
.
তিন.
নিলু তৈরী। মনে মনে বলছে, পলাশের পছন্দ বেশ! শাড়িটাতে নিলুকে এতো মানিয়েছে যে নিজেকেই নিজে চিনতে পারছে না। হালকা সাজে ওকে একেবারে বিয়ের কনের মতোই দেখাচ্ছে। কোনো কারসাজি ছাড়া মুখে কেমন স্নিগ্ধ একটা ছায়া। দুলু এসে দরজা ধাক্কিয়ে গেলো, "বুবু তাড়াতাড়ি তৈরী হও। রাজপুত্র এসেছে। আমাকে দুই হাজার টাকা দিয়েছে।" উপর তলাটা এখন ভীষন চুপচাপ। কেউ নেই। সবাই বর দেখতে গেছে। নিলু উঠে দরজা-জানালা খুলে দিলো। আজকের চাঁদটা ভীষণ সুন্দর। পলাশ বলতো, "নীলু আমাদের মেয়ে হলে নাম রাখবো চন্দ্র। ছেলে হলে রাখবো সমুদ্র।" মেঝেতে বসে কতকিছু ভাবে নিলু। চাঁদের আলোয় মুখখানা আরো সুন্দর দেখাচ্ছে ওর। একটু পরেই দুলু ঘরে এলো। ঘরভরা ঘুটঘুটে অন্ধকার। হঠাত কিসে হোঁচট খেয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়লো দুলু। কেমন থকথকে পিচ্ছিল তরল লেগে গেছে বুবুর বিয়ে উপলক্ষে কেনা সাদা নতুন জামাতে। উঠে গিয়ে আলো জ্বালাতেই নিলু চিৎকার শুরু করলো, "বাবা গো দেখে যাও। বুবু কি করলো! আলতা দিয়ে আমার নতুন জামাটা নষ্ট করে দিলো। দেখে যাও বাবা।"
.
শেষ.
দুলু ডাক্তারি পড়া শেষ করে বাড়ি ফিরেছে কিছুদিন হলো। বৃদ্ধ বাবাকে নিজের কাছে রাখতে চায়। শহরে নিয়ে যাবে বলে এসেছে। বাবা সবসময় চুপচাপ থাকে, কারো সাথে কথা বলে না। তাই দুলুর মনে হয়, বাবাকে কাছে রাখলে হয়তো সবার সাথে একটু একটু কথা বলবে। সে ভালো থাকবে। কিন্তু, রহমান সাহেব এই বাড়ি ছেড়ে কোথাও যেতে চান না। তাই, ও কিছুদিন সময় নিচ্ছে। বাবা মন স্থির করুক। দুলু বাড়িতে এসে নিলুর ঘরটাতে উঠেছে। অনেকদিন বন্ধ পরে ছিলো। দুলু আসমা খালাকে পরিষ্কার করে দিতে বলে সেলফে রাখা পুরোনো বইগুলো পাতা উলটে দেখছে। বইয়ের মাঝখানে শক্ত কার্ডের মতো কিছু। একটা ছবি! ছবির পেছনে লেখা আমরা নতুন জীবন শুরু করতে যাচ্ছি। আমরা ভালোবেসে বিয়ে করেছি ৩১/০১/১৯৯৭। ছবিতে শেষ যে বার বুবুকে দেখেছিলো দুলু সেই শাড়িতে কনের সাজে বুবু। পাশে এক আগুন্তুক। সাথে আরেকটি কাগজ। বুবুর প্রেগন্যান্সি রিপোর্ট। দুলু আবার ভাজ করে ওভাবেই রেখে দিলো। হঠাৎ, আসমা এসে বললো, "আফা আপনে বাইরে গিয়া খাড়ান দেহি ইট্টু।" দুলু বারান্দায় আসে আকাশের চোখ পড়তেই দেখে কত রঙের মেঘ। দুলু মনে মনে বলে, "মেঘের অনেক রঙ"।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now