বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

মেধাপু

"রোম্যান্টিক" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X "মেধাপু" লিখেছেন- আলেক্সান্ডার আবির 'এত রাতে এখানে কি?' -সার্জেন্টের কথা আমার কানে আসলো না। পিঠ চাপড়ে জিগেস করলো এবার, 'এই ছোকরা,কথা কানে যায় না?' বড় বড় অগোছালো চুল নিয়ে তার দিকে তাকালাম। হয়তোবা আমাকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে গেছে সে। বাংলামোটর মোড়ে দাড়িয়ে আছি। ঠিক রাত দুইটা বেজে কয়েক সেকেন্ড হবে। প্রায় আট বছর আমি এ কাজটা করছি। কেন করছি শুধু আমিই জানি। আমার বাসায় হয়তো আজ আমাকে খুজবে না। কারণ তারা জানে আজ আমি কোথায়? আজ আমি কি খুঁজতে এসেছি এখানে। সার্জেন্ট আমাকে তার হাতের লাঠি দিয়ে প্রায় মারতে আসছিল। দুটো হাত তার দিকে বাড়িয়ে দিলাম। 'হুশশশশ' আওয়াজ করলাম সেই সাথে ঠোটে একটা আঙ্গুল রেখে তাকে চুপ করতে বললাম। সার্জেন্ট প্রায় ভয় পেলো। আমার মুখ দিয়ে একটা শব্দ বেরুচ্ছিল। 'মেধাপু,ও মেধাপু....কোথায় তুই? বল না কোথায় তুই?' কিন্তু আওয়াজ হচ্ছিল না। ভেতর থেকে ডুকরাচ্ছিল। হৃদপিন্ড টা বুকের হাড় ভেঙ্গে বের হয়ে যাচ্ছে প্রায়।সার্জেন্ট মনে হয় আমার কথা শুনতে পেয়েছে।কিন্তু ভূল বুঝেছে। আমার কলার চেপে ধরে বলে,'এই তুই গাজাটাজা খাসনি তো?' আমি কিচ্ছু বলিনি। শুধু মুখ দিয়ে বেরুচ্ছিল, 'মেধাপু,ও বুবুন, ও দিদি, ও আপ্পি আয় না প্লিজ... তোকে আর মারবো না..' এবার সার্জেন্ট বুঝতে পেরেছে। বললো,'তুই কি কাউকে খুঁজছিস? ' আমি মাথা নাড়লাম। বললাম,'হ্যা'। -কাকে? -আমার বোন। -এই ব্যাটা তুই নেশা করছিস। এত রাতে এখানে তোর বোন কোথায় পাবি? আমি পিচ ঢালা রাস্তার একটা অংশ দেখিয়ে বললাম,'ওই যে এখানে,আমার আপু আছে। ' সার্জেন্ট ক্ষীণ চোখে আমার দিকে তাকালো। আমার ভেতর থেকে ঘামের গন্ধ পাচ্ছে আমি নিশ্চিত সেই সাথে হয়তো রহস্যের গন্ধও পাচ্ছে। শহরের হেডলাইটগুলো তখন জ্বলছিল। বাংলামোটরের এ অংশে সোডিয়াম লাইটই জ্বলে। সোডিয়াম লাইটের আলোতে আমি আমার মেধাপু দেখছি কল্পনায় । আমার বোনটা ঠিক আমার মায়ের মতো। আমার মা কে কখনো আমি দেখিনি। ছবিতে দেখেছি। আমার বাবাকেও কখনো দেখিনি আমি। শুনেছি আমার বাবা নাকি আমার নতুন মাকে নিয়ে মগবাজার থাকে। সেদিন ঠিক এ সময় আমার বাবার কাছে যাচ্ছিল আমার মেধাপু। আমি আর আমার মেধাপু ইস্কাটনের ছয় নাম্বার বাসাটার ছাদের কোণে ছোট্ট দুটো রূম নিয়ে থাকতাম। আমার আপু কাওরান বাজার একটা পত্রিকা অফিসে স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে ছিল। আমি তখন কলেজ শেষ করি।কম্পিউটার সাইন্স নিয়ে পড়ার তীব্র শখ ছিল আমার। কিন্তু আমি কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাইনি। আমার খুব শখ ছিল আমি বুয়েটে পড়ি। কলেজে থাকতে প্রায়ই আমি বুয়েট ক্যাম্পাসে পলাশীর বাজার গিয়ে চা খেতাম। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস আমি বুয়েটের ফরমই তুলতে পারিনি। আমি বাসায় এসে চুপ করে বসে আছি। আমার চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে আমার আপু বললো, -কত্ত ভালো ভালো প্রাইভেট ভার্সিটি আছে,তোকে আমি ওখানে পড়াবো। -কিন্তু আপু, এত টাকা কোথায় পাবো? -কেন? বাবার কাছে চাইবো। -আমার জন্য বাবা টাকা দিবেনা। বাবা আমাকে ঘৃণা করে। কারণ আমি জন্মানোর পর মা মারা গেছে। -তোর এত চিন্তা করতে হবে না। আমি ব্যাবস্থা করবো। আমার কপালে আপু একটা চুমু দিয়েছিল।আমাকে নিজ হাতে খাইয়ে দিয়েছিল। এরপরই বললো,'আজ সে মগবাজার যাবে, বাবার কাছে। ' আমি কিছু বলিনি আপু প্রায়ই যায় ওখানে। এটুকু জানি আজ সে বাবার বাসায় যাবে টাকা আনতে। হয়তোবা আমার নতুন মার অজান্তে । আপুকে বাবা ভালোবাসতো।তবে সেটা মেয়ে হিসেবে নয়। একটা অনাথ, অসহায়, অনাশ্রিতা, সংগ্রামী নারী হিসেবে। এরকম আপুকে অনেকেই ভালোবাসে। -আপু প্রায় তো রাত এগারোটা। যাবি না? -বাবা বলেছে বাবা রাত দুইটায় বাংলামোটর এসে টাকা দিয়ে যাবে। -রাত দুইটায় কেন? -বাবার নাকি কোথায় পার্টি আছে। -নিশ্চিত মদ গিলবে -বাদ দে, আমাদের সাহায্য করলেই হলো। -আমিও যাবো তোর সাথে। -কিন্তু বাবা.... -সমস্যা নাই, আমি আড়ালে থাকবো। রাত একটা বেজে পঞ্চান্ন। আমি বাংলামোটর মোড়ের ওপাশে দাড়িয়ে আছি।আমার আপুকে কিছুটা বিচলিত মনে হলো। আমি বুকের ভেতর হাত গুজে বসে আছি। হটাৎ করে একটা গাড়ির ব্রেক করার সাউন্ড হলো। 'এটা কি? গাড়িটা ব্রেক কষেই দ্রুত গতীতে পালালো!!' আমি ভূল দেখছি নাতো? আমার মেধাপু রাস্তায় গড়াগড়ি খাচ্ছে কেন? আমি দৌড় দিয়ে গেলাম। মেধাপু গোঙ্গাচ্ছে। গোঙ্গাতে গোঙ্গাতে একটা কথাই বললো,'গাড়িটা বাবার ছিল, তুই ঠিকই বলেছিস বাবা আজো ড্রিংকস করে এসেছে। ভাই আমি পারলাম না তোকে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার বানাতে। ' আমি মেধাপুর পালস চেক করি। পালস কাজ করছে না। সারাদিন এই রাস্তাটা রোদে পুড়েছে। ছ্যাত ছ্যাত করে রাস্তা আপুর রক্ত খাচ্ছে। আমি চিৎকার করি। কেউ শোনেনা আমার সে চিৎকার। কেউ শুনতে চেষ্টাও করেনা। কেউ আসে না। আমার চিৎকার বন্ধ হয়ে যায়। একটা চিন্তা আমাকে ঘিরে ধরে। আমার বোনকে আমি কোথায় কবর দিবো? আমাদের যে সাড়ে তিন হাত জায়গাও নেই। পাজাকোলা করে আমার বোনের নিথর দেহটাকে আমি অজানা ঠিকানায় নিই। প্রায় আড়াই ঘন্টা তার দেহটা আমি কোলে নিয়ে হাটার পর আজিমপুর এসে দাড়াই আমি। তখন ফজরের আজান দিচ্ছিল। একটা মসজিদের পাশে দাড়িয়ে আমি সবাইকে বলি। আমাকে দুই চার পাচ টাকা ভিক্ষা দিয়ে আমার মেধাপুর জন্য সাড়ে তিন হাত জায়গার ব্যাবস্থা করে দেন তারা। আমি টানা তিন দিন তার কবরের পাশে পড়েছিলাম। আমি এমনই এক হতভাগা ভাই সারাজীবন বোনের খেয়ে গেলাম,শেষ পর্যন্ত তাকেও খেয়ে ফেললাম। আমি এত ক্ষুধার্ত!! আমি হতভাগা যে তার চল্লিশাও দিতে পারবো না আমি। কিন্তু আমি পেরেছি তার স্বপ্ন পূরণ করতে। পরের বার আমি একটা পাবলিক ভার্সিটিতে কম্পিউটার সাইন্স পাই। পাচ বছরের মধ্যে আমি বের হই পাশ করে। এখন আমি আশি হাজার টাকা বেতনের চাকরী করি। ক্লাসমেট এক মেয়েকে বিয়েও করেছি। মোটামুটি সুখেই আছি। সার্জেন্ট চলে গেছে।হয়তোবা এতক্ষণ একটানা আমাকে দেখে পাগল ভেবেছে। আর নয়তো সেও আমার বুবুন কে দেখেছে। নিষ্পাপ মানুষরা পৃথিবীতে বেচে থাকে। ওইতো আমার দিদিকেও দেখছি। সোডিয়াম লাইটের আলোতে আমার দিদিকে মায়াবতী লাগছে। আমার দিদি বলেছিল আমি যখন দেশের সেরা কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার হলে সে তার পত্রিকায় আমাকে নিয়ে বিশাল আর্টিকেল লিখবে। 'ও আপু লিখবি না? ' আমি স্পষ্ট বাংলায় বলার পরও সে শোনেনি। কিন্তু কে যেন আমার চুলে হাত বুলিয়ে দিলো। আমি বুঝতে পেরেছি ও আমার দিদি। একবছরের জন্য অদৃশ্য হয়ে গেলো আমার আপুনিটা। সোডিয়াম লাইট গুলো অস্পষ্ট হচ্ছে। সুবহে সাদীকের প্রভা দেখা যাচ্ছে পূবাকাশে। কাছের মসজিদ থেকে মধুর স্বরে শোনা যাচ্ছে,'আসসালাতু খইরু মিনান্নাউম....' আমি চিৎকার করে বলছি,'আল্লাহ!! আমি তো জেগেই আছি। আমার দিদিকে জাগিয়ে দাও....' ধীরে ধীরে আলো বাড়ছে। সবাই ঘুম থেকে উঠে পড়েছে। শহরের সবাই আছে। শুধু নেই আমার বোনটা। শুধু নেই আমার দিদিটা। আমার শোলক বলা কাজলা দিদিটা.......


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৯২ জন


এ জাতীয় গল্প

→ মেধাপু

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now