বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।
রাফি ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ছাত্র হিসেবে পরিচিত ছিল। গ্রামের স্কুলে পড়লেও তার ফলাফল সবসময় সবার নজর কাড়ত। পঞ্চম শ্রেণি থেকে শুরু করে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রতিটি পরীক্ষায় সে প্রথম বা দ্বিতীয় হয়েছে। স্কুলের শিক্ষকরা তাকে উদাহরণ হিসেবে দেখাতেন—“দেখো, রাফির মতো পড়লে তুমরাও ভালো ফল করতে পারবে।” প্রথমদিকে এই প্রশংসা রাফির কাছে আনন্দের ছিল, কিন্তু ধীরে ধীরে সেই প্রশংসাই যেন অদৃশ্য এক ভার হয়ে তার কাঁধে চেপে বসতে শুরু করল।
রাফির বাবা একজন সাধারণ চাকরিজীবী। তিনি ছেলের সাফল্যে গর্ব করতেন এবং প্রায়ই আত্মীয়স্বজনের কাছে বলতেন, “আমার ছেলে একদিন বড় ডাক্তার হবে।” মা-ও ছেলের জন্য অনেক স্বপ্ন বুনতেন। তারা কখনো সরাসরি চাপ না দিলেও তাদের প্রত্যাশার ভার রাফি স্পষ্টভাবে অনুভব করত। যখনই কোনো পরীক্ষা আসত, রাফির মনে হতো—এবার যদি সে প্রথম না হয়, তবে সবাই হতাশ হবে। সেই ভাবনা ধীরে ধীরে তার মনে এক অদৃশ্য ভয় তৈরি করল।
নবম শ্রেণিতে ওঠার পর প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়ে উঠল। নতুন কিছু ছাত্র অন্য স্কুল থেকে এসে ভর্তি হলো, যাদের ফলাফলও ছিল অত্যন্ত ভালো। রাফি বুঝতে পারল, মেধা তালিকার শীর্ষে থাকা এখন আর সহজ নয়। তবুও সে চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগল। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বইয়ের সঙ্গে লড়াই চলতে থাকল তার। বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে খেলতে যাওয়া, গল্প করা—এসব ধীরে ধীরে তার জীবন থেকে হারিয়ে গেল।
প্রথম সাময়িক পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন স্কুলে এক অদ্ভুত উত্তেজনা ছিল। সবাই নোটিশ বোর্ডের সামনে ভিড় করেছিল। রাফিও ভিড় ঠেলে সামনে গেল। তালিকায় নিজের নাম খুঁজে পেল ঠিকই, কিন্তু এবার সে প্রথম নয়—তৃতীয়। অন্য কেউ হয়তো তৃতীয় হয়ে খুশি হতো, কিন্তু রাফির বুকের ভেতর যেন হঠাৎ শূন্যতা তৈরি হলো। মনে হলো, সে যেন বড় কোনো যুদ্ধে হেরে গেছে।
সেদিন বাড়ি ফিরে রাফি খুব বেশি কথা বলেনি। মা জিজ্ঞেস করলেন, “কি হয়েছে বাবা? শরীর খারাপ লাগছে?” রাফি শুধু মাথা নাড়ল। সে বলতে পারল না, তার ভিতরে কী ঝড় বয়ে যাচ্ছে। রাতে পড়তে বসে তার চোখের সামনে বারবার সেই তালিকাটা ভেসে উঠছিল। মনে হচ্ছিল, সবাই হয়তো ভাবছে—রাফির মেধা কমে গেছে।
দিন যেতে লাগল, কিন্তু রাফির ভেতরের অস্থিরতা কমল না। বরং পড়াশোনার চাপ আরও বেড়ে গেল। সে প্রতিদিন নিজেকে প্রমাণ করার চেষ্টা করত। কিন্তু যত বেশি চেষ্টা করত, তত বেশি দুশ্চিন্তা বাড়ত। মাঝেমধ্যে পড়তে বসে মাথার চারপাশে অদ্ভুত এক চাপ অনুভব করত। মনে হতো যেন মাথা শক্ত করে কেউ চেপে ধরেছে। রাতে ঘুমও ঠিকমতো হতো না।
একদিন ক্লাসে বসে থাকতে থাকতে হঠাৎ তার বুক ধড়ফড় করতে লাগল। মনে হলো শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। শিক্ষক বিষয়টি লক্ষ্য করে তাকে স্টাফরুমে নিয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার পর একটু স্বাভাবিক হলো রাফি। পরে স্কুলের একজন শিক্ষক তাকে আলাদা করে ডেকে বললেন, “তুমি কি খুব বেশি চাপ নিচ্ছ?”
রাফি প্রথমে কিছু বলতে চাইছিল না। কিন্তু শিক্ষকের কোমল কণ্ঠ শুনে হঠাৎ তার চোখে পানি চলে এল। সে ধীরে ধীরে সব কথা খুলে বলল—মেধা তালিকায় থাকার ভয়, সবার প্রত্যাশা, নিজের অস্থিরতা।
শিক্ষক মনোযোগ দিয়ে সব শুনলেন। তারপর মৃদু হেসে বললেন, “মেধা তালিকা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো তোমার সুস্থ থাকা। মনে রেখো, একজন মানুষের মূল্য শুধু একটি তালিকায় নির্ধারিত হয় না।”
সেই কথাগুলো রাফির মনে গভীরভাবে দাগ কাটল। শিক্ষক তাকে কিছু পরামর্শ দিলেন—পড়াশোনার ফাঁকে একটু হাঁটাহাঁটি করা, বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলা, নিয়মিত ঘুমানো। তিনি আরও বললেন, “প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু জীবন শুধু প্রতিযোগিতা নয়।”
পরবর্তী দিনগুলোতে রাফি ধীরে ধীরে নিজের জীবনযাত্রা বদলাতে শুরু করল। বিকেলে কিছু সময় মাঠে হাঁটত, মাঝে মাঝে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করত। পড়াশোনাও চালিয়ে যেত, কিন্তু আগের মতো অস্থির হয়ে নয়। সে বুঝতে শিখল—নিজেকে প্রমাণ করার জন্য নিজের শান্তি হারানো ঠিক নয়।
বার্ষিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন আবারও স্কুলে ভিড় জমল। এবারও রাফি তালিকার দিকে তাকাল। সে দ্বিতীয় হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয়, এবার তার বুকের ভেতর আগের মতো ভারী অনুভূতি হলো না। বরং এক ধরনের স্বস্তি অনুভব করল।
বাড়ি ফিরে সে ফলাফল মাকে জানাল। মা হাসিমুখে বললেন, “তুমি ভালো আছো, সেটাই আমাদের সবচেয়ে বড় আনন্দ।” বাবাও বললেন, “জীবনে শুধু প্রথম হওয়াই সব নয়, মানুষ হওয়াটাই বড় কথা।”
সেদিন রাতে রাফি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। মনে হচ্ছিল, অনেকদিন পর সে স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে পারছে। সে বুঝতে পেরেছে—মেধা তালিকায় নাম থাকা ভালো, কিন্তু তার চেয়েও বড় হলো নিজের ভেতরের শান্তি আর জীবনের ভারসাম্য।
সেই উপলব্ধিই তাকে নতুন করে পথ দেখাল। কারণ রাফি অবশেষে বুঝেছে—মেধা তালিকার চেয়েও মূল্যবান হলো মানুষের সুস্থ মন এবং স্বাভাবিক জীবন।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now