বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
"মোতিয়া"
স্মরণজিত চক্রবর্তী
------------------
(২য় ও শেষ পর্ব)
(৩)
ঝটপট করে পায়রারা উড়ে গেল আর মাদ্রী সেই দিকে তাকিয়ে বলল, ‘‘ওরা আসে রোজ। কয়েকশো বছর ধরে ওরা আসে এখানে, এই সময়।’’
টাপু চমকে গেল সামান্য। কী বলছে মেয়েটা! কয়েকশো বছর মানে? ও তাকাল মাদ্রীর দিকে।
মাদ্রী! নামটা কী অদ্ভুত! মেয়েটাও কি অদ্ভুত নয়! এমন ঢেউ খেলানো চুল! নীল চোখ! এমন চন্দনের গন্ধ! এইরকম একটা মেয়ে এখানে থাকে! কী করে থাকে এমন আধা জঙ্গলের মধ্যে! এমন একটা প্রায় গুঁড়ো হয়ে যাওয়া প্রাসাদে!
টাপু জিজ্ঞেস করল, ‘‘আপনি তো বললেন না, এখানে পার্মানেন্টলি থাকেন না ঘুরতে আসেন!’’
মাদ্রী হাসল, ‘‘হামারে পুরখো কে হাভেলি হ্যায়! আমি হাভেলি ছেড়ে যাব কী করে বলুন?’’
‘‘সে কী! এখানে থাকেন!’’ টাপু অবাক হল।
মাদ্রী হেসে টাপুর হাতে ধরা ক্যামেরাটা দেখিয়ে বলল, ‘‘অনেকগুলো ছবি তো নিলেন! কাজে লাগবে কি কিছু?’’
টাপু তাকাল মাদ্রীর দিকে! নীল চোখদুটোর থেকে কিছুতেই চোখ সরছে না! বা চোখ জোর করে সরালেও মন সরছে না!
ও হাসল শুধু একটু। তারপর বলল, ‘‘বেশ কিছু ছবি নিলাম। তারপর দেখি কেমন দাঁড়ায়!’’
ওরা এসে দাঁড়িয়েছে প্রাসাদের একটা দিকের ছাদের উপর। জায়গায়-জায়গায় ভেঙে পড়েছে ছাদটা, কিন্তু আশপাশটা এত সুন্দর যে সামান্য ঝুঁকি নিয়েও মাদ্রীর পিছন-পিছন এগোচ্ছে টাপু!
মেয়েটা ইতিমধ্যে ওকে অনেকটাই ঘুরিয়ে দেখিয়েছে। এই প্রাসাদটা ছিল এক মুঘল সেনাপতির। সেখান থেকে হাতবদল হয়ে পরে মাদ্রীদের পূর্বপুরুষদের হাতে আসে।
নীচে একটা বড় জায়গা দেখাতে-দেখাতে মাদ্রী বলেছিল, ‘‘এইখানে একবার জাহাঙ্গির এসেছিলেন। তবে তখনও তিনি সেলিম! বড়-বড় খুঁটি ছিল আগে। হাতি বেঁধে রাখা হত এখানে।’’
আর-একটা জায়গায় নিয়ে গিয়ে একটা কুয়ো দেখিয়ে বলেছিল, ‘‘আর এইখানে ছিল ফাঁসি-দেওয়া। এই কুয়োর উপর ফাঁসিতে লোক ঝোলানো হত!’’
এমন নির্জন দুপুর! নিস্তব্ধ চরাচর। তার মধ্যে ওই কুয়োটা দেখে একটু শ্বাস ঘন হয়েছিল টাপুর। ও নিজের অজান্তেই সতর্ক হয়ে উঠেছিল। এক মুহূর্তের জন্য ওর মনে হয়েছিল ওই অতল কুয়ো থেকে উঠে আসছে কয়েক শতাব্দীর হাওয়া! আর সেই হাওয়ায় যেন ফিরে আসছে মৃত মানুষদের ফিসফিস! দীর্ঘশ্বাস!
মাদ্রী বলল, ‘‘আপকো ক্যায়সে পতাহ কে আজ খাস দিন হ্যায়!’’
‘‘খাস দিন?’’ টাপু অবাক হল।
মাদ্রী বলল, ‘‘আসুন এদিকে। ছাদের ওই পাশ থেকে সরু সুতোর মতো করে যে পথটা গেছে সামনে, ওইদিকে চলুন। একটা জিনিস দেখাই।’’
‘‘কী জিনিস?’’ টাপু জিজ্ঞেস করল।
মাদ্রী ঘুরে বলল, ‘‘আজ রৌনকের মৃত্যুদিন!’’
‘‘রৌনক! সে কে?’’
মাদ্রী ধীরে-ধীরে এগিয়ে গেল সেতুটার কাছে। টাপু দেখল চার ফুটের মতো চওড়া সেতুটা সোজা চলে গিয়েছে সামনে, খাদের দিকে। এই প্রাসাদটা উপত্যকার এমন একটা জায়গায় যে এর পাশেই গভীর খাদ! ও মাদ্রীর পিছু-পিছু এগোল।
মাদ্রী বলল, ‘‘আড়াইশো বছর আগে এই হাভেলির মালিক লালিপ্রসাদের মেয়ের সঙ্গে প্রেম হয়েছিল রৌনকের। রৌনক ছিল একজন চিত্রকর। লালিপ্রসাদের দ্বিতীয় স্ত্রী ঝিলমের ছবি আঁকতে ওকে নিয়ে আসা হয়। কিন্তু রৌনক এসে প্রেমে পড়ে লালিপ্রসাদের বড় মেয়ে মোতিয়ার!
‘‘সে ছিল এক দামাল প্রেম! সব রসম-রিওয়াজের বাইরে গিয়ে তারা ভালবেসেছিল দু’জন-দু’জনকে। এমনকী লুকিয়ে শাদি করার কথাও ভেবেছিল তারা। কিন্তু ঝিলম এসে পড়ে মাঝে। ঝিলমেরও ভাল লেগেছিল রৌনককে। কিন্তু মোতিয়ার প্রেমে পাগল রৌনক ফিরিয়ে দেয় ঝিলমকে। রাগে, হিংসায়, অপমানে ঝিলম পাগল হয়ে গিয়েছিল। রৌনক ওকে ফিরিয়ে দিল! এর শাস্তি তো পেতেই হবে রৌনককে! আড়াইশো বছর আগে এই আজকের দিনেই ঝিলম ফিকির করে ডেকে আনে রৌনককে। আগে থাকতেই লালিপ্রসাদকে বলে রেখেছিল ঝিলম যে রৌনক ওর উপর খারাপ নজর দিচ্ছে। ব্যস, এমন নির্জন দুপুরে ঝিলমের ঘরে রৌনককে দেখে রাগে উন্মাদ হয়ে যায় লালিপ্রসাদ! সঙ্গে-সঙ্গে আটক করা হয় রৌনককে আর তারপর রক্ষী দিয়ে ওকে ছুড়ে ফেলা হয় ওই নীচে!’’
মাদ্রী হাত দিয়ে দেখাল খাদের দিকটায়। টাপু ক্যামেরাটা হাতে নিয়ে এগিয়ে গেল। মাদ্রী সরে গেল টাপুর পিছনে। সেতুটার একদম শেষ প্রান্তে গিয়ে নীচের দিকে ঝুঁকল টাপু। আর সঙ্গে-সঙ্গে মাথা ঘুরে গেল! অত নীচে!
‘‘বাবুজি!’’
আচমকা ডাকে আর-একবার টাল সামলাল টাপু। তারপর দ্রুত পিছনে ফিরল! দেখল বংশীকাকা! কিন্তু মাদ্রী! সে কোথায়! এই তো ছিল মাদ্রী! কথা বলছিল তো দাঁড়িয়ে। তা হলে! থতমত খেয়ে তাকাল টাপু! বংশীকাকা এগিয়ে এল, ‘‘আপ ইহাঁ কেয়া কর রহে হো বাবুজি?’’
‘‘আমি… মানে মাদ্রী নিয়ে এল তো! রৌনককে কোথা থেকে ফেলে দেওয়া হয়েছিল… মানে… ওই মেয়েটা! নীল চোখ! গলায় লালচে পাথরের মালা…’’ টাপুর গুলিয়ে গেল কথা!
বংশীকাকা ম্লান মুখে তাকাল দুপুরের রোদের দিকে। হালকা হাওয়া পাক খাচ্ছে! বাতাসে জড়িয়ে আছে চন্দনের গন্ধ! আর আবার সেই পাখিটা ডাকছে খা খা করে! থমথমে দুপুর যেন ক্রমশ গিলে নিচ্ছে সমস্ত চরাচর! আর হঠাৎ সর সর শব্দ হল একটা। টাপু চমকে উঠল! দেখল সেতুর উপর দিয়ে একপাশ থেকে অন্য পাশে চলে গেল একটা গিরগিটি। সেই গিরগিটি?
টাপু দেখল সেই প্রাণীটি দূরে একটা পাথরের উপর দাঁড়িয়ে লাল চোখ নিয়ে তাকিয়ে রয়েছে ওর দিকে!
বংশীকাকা ভয়ার্ত গলায় বলল, ‘‘উও ফির আয়ি থি!’’
(৪)
দোতলার নড়বড়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে একটা বড় ঘরের দরজার সামনে দাঁড়াল টাপু। এখনও সারা শরীর কাঁপছে ওর! কী হল ওর সঙ্গে এতক্ষণ! কে এসেছিল ওর কাছে? আর অমন খাদের ধারে কী করছিল ও!
বংশীকাকা সেই একটা বাক্যের পর আর কিছু বলেনি। বরং হাত ধরে টেনে এনেছে প্রাসাদের দোতলায় এই ঘরটার সামনে।
বংশীকাকা বিশাল দরজার তালা খুলে সেটা ঠেলল। ক্যাঁচ শব্দ করে ধীরে-ধীরে খুলে গেল বৃদ্ধ দরজাটি। বংশীকাকার চোখের ইশারায় ঘরে ঢুকল টাপু।
আর ঢুকেই থমকে গেল। ঘরের একটা দিকে কোনও দেওয়াল নেই। আর সেখান দিয়ে দেখা যাচ্ছে অতল খাদ! সেই অতল খাদের পাশেই এক ঘর! তাও এর দরজা বন্ধ! কেন?
বংশীকাকা মন্থর গলায় বলল, ‘‘আপ উসে জাগায়া কিউঁ! মানা কিয়া থা না! এটা ওর ঘর ছিল।’’
‘‘কার?’’ টাপু অবাক হল।
বংশীকাকা বলল, ‘‘ওই যাকে দেখলে! মোতিয়া!’’
‘‘কী!’’ টাপু ছিটকে উঠল, ‘‘মানে? ও তো মাদ্রী!’’
বংশীকাকা ধীরে-ধীরে এগিয়ে গেল সামনে দেওয়ালের দিকে। এই দেওয়ালটাই যা অক্ষত রয়েছে। তাও চারিদিকে শ্যাওলা আর গাছপালা ভর্তি!
বংশীকাকা ঘড়ঘড়ে গলায় বলল, ‘‘নানা নামে ও সামনে আসে বাবু। রৌনকের মৃত্যুর পর মোতিয়াকে আটকে রাখা হয় এই ঘরটায়!’’
‘‘পাগল হয়ে গিয়েছিল মোতিয়া! কারও সঙ্গে কথা বলত না! কেউ আসতও না ওর ঘরে। শুধু এই ঘরের ভিতর ওর নূপুরের শব্দ পাওয়া যেত। তারপর একদিন থেমে গেল সেই শব্দ। লোকজন দরজা ধাক্কাল। কেউ খুলল না।
শেষে ভাঙা হল দরজা। আর দেখা গেল, উপরের ঝাড়বাতি থেকে উড়নি বেঁধে তাতে ঝুলছে মোতিয়া!
‘‘তারপর কী যে অভিশাপ লাগল প্রাসাদে! ধীরে-ধীরে মারা যে়তে লাগল সবাই। আর ভাঙন ধরল এই বংশে। ক্রমে পরিত্যক্ত হয়ে গেল এই প্রাসাদ! শুধু আমি রয়ে গেলাম। এই ঘরটা আর খুলতাম না। খোলা বারণ ছিল! কেবল মাঝে-মাঝে কেউ যদি পথ ভুলে বা ঘুরতে এখানে আসত, তারা দেখতে পেত মোতিয়াকে! যেমন আপনি দেখলেন বাবু! আর…’’ বংশীকাকা হঠাৎ চুপ করে গেল।
টাপু তাকিয়ে রইল বংশীকাকার দিকে। লোকটা সত্যি বলছে!
হাওয়া আসছে খাদের দিকে ভাঙা দেওয়াল থেকে। আচমকা শীত করল টাপুর। দুপুরটা যেন আরও নির্জন লাগছে। এমন ভেঙে পড়া বাড়ি, বৃদ্ধ মানুষ আর মোতিয়া! সে এসেছিল! সত্যি!
বংশীকাকা তাকাল টাপুর দিকে, তারপর বলল, ‘‘বিসওয়াস নেহি হোতা আপকো! ঠিক হ্যায় বাবু, ইয়ে দেখিয়ে!’’
বংশীকাকা এগিয়ে গিয়ে অক্ষত দেওয়ালে টাঙানো শতচ্ছিন্ন একটা কাপড় ধরে টান মারল। আর অসংখ্য ধুলো ছড়িয়ে পড়ল চারিদিকে।
বংশীকাকা ফিরে এল টাপুর কাছে। হাত তুলে বলল, ‘‘দেখিয়ে।’’
আর টাপু দেখল, দেওয়ালে ঝোলানো একটা বহু পুরনো, আবছা ছবি! একটা মেয়ে। পরনে ঘাঘরা। কোঁকড়া, খোলা চুল। গলায় লালচে পাথরের হার! আর চোখদুটো কী উজ্জ্বল নীল!
টাপু ভয়ে পিছিয়ে গেল ছবিটা দেখে। এত পুরনো আর আবছা ছবি, কিন্তু চোখদুটো! চোখ দুটো অমন উজ্জ্বল নীল কী করে থাকে! আর তাতে কি পলক পড়ল!
টাপু কিছু বলার আগেই আচমকা নিস্তব্ধ দুপুর খানখান করে বিকট শব্দে বন্ধ হয়ে গেল দরজাটা!
শব্দের আকস্মিকতা আর ভয়ে আরও পিছিয়ে গেল টাপু। ও খেয়াল করল না পিছনে ঘরের মেঝে শেষ! খেয়াল করল না ঘরটা অর্ধেক নেই! ভাঙা আর নড়ব়ড়ে ইটে পা পড়ল টাপুর। এবার আর টাল সামলাতে পারল না! পিছনদিকে হেলে গেল। আর ঠিক তখনই বংশীকাকার হাত এসে ধরল টাপুর হাতের ক্যামেরার স্ট্র্যাপটা!
টাপু শূন্যে ঝুলছে যেন! পিছনে অতল খাদ! সামনে ক্যামেরার স্ট্র্যাপ ধরে থাকা বংশীকাকা! খাদ থেকে উঠে আসা হাওয়া ফিসফিস করছে!
বংশীকাকা বলল, ‘‘আপকো আনা নেহি চাহিয়ে থা!’’
‘‘প্লিজ়… প্লিজ়…’’ টাপুর গলা বুজে এল।
‘‘বোলা থা আপকো! বিটিয়া কো জাগানা নেহি চাহিয়ে থা! বিটিয়া এমন দিনে খালি হাতে যায় না!’’
‘‘খালি হাতে? মানে…’’ টাপুর গলা বন্ধ হয়ে এসেছে ভয়ে। সারা বাড়িটা হেলে আছে সামনে! পাখিটা চিৎকার করছে- খা খা!
‘‘ভেবেছিলাম করব না! কিন্তু বিটিয়া যখন চাইছে…’’
কথা শেষ হওয়ার আগেই বংশীকাকার হাতের টানে স্ট্র্যাপটা ছিড়ে গেল হঠাৎ! শূন্যের ভিতর নীচের পাথুরে খাদে পড়ে যেতে-যেতে টাপু দেখল ওর দিকে তাকিয়ে থাকা বংশীকাকার হিংস্র চোখদুটো টকটকে লাল!
আর অতল খাদের পাথরে ছিটকে পড়তে-পড়তে চিৎকার করে বিছানায় উঠে বসল টাপু!
(৫)
মাথাটা দপদপ করছে! চোখ দুটো ব্যথা! ঘামে ভিজে গিয়েছে পিঠ। টাপু বিছানাটা দেখল। ওটাও ভিজে গিয়েছে! ও ঘুমিয়ে পড়েছিল! কতক্ষণ ঘুমিয়েছে ও!
পাখি কি আছে এখনও না বেরিয়েছে? ক’টা বাজে এখন!
টাপু ঘড়ির দিকে তাকাল। ঘরটা আবছা অন্ধকার। পাখি জ্বালিয়ে দিয়ে গিয়েছে নরম আলোটা। সাড়ে ছ’টা বাজে। মানে সন্ধে হয়ে গিয়েছে। টাপু চোখ বন্ধ করল একবার। আর সঙ্গে-সঙ্গে সামনে ভেসে উঠল সেই লাল রংয়ের চোখ!
আঃ! চোখ খুলে মাথা নাড়াল টাপু!
দরজা খুলে বেরল ঘরের বাইরে! কোথায় একটা মোবাইল বাজছে। পরিচিত টোন! আরে, পাখির ফোন! তবে কি পাখি ফিরে এল!
করিডোরটা আবছা। দূরে রান্নাঘরের আলো এসে পড়েছে একটু। বাঁদিকে বসার ঘর। নরম আলো জ্বলছে সেখানে!
করিডোরের পাশে একটা ব্যাগ। বেশ বড়। তাতে প্লেনের লাগেজের ট্যাগ ঝুলছে। লাবণ্য বলে মেয়েটি কি এসে গেল?
ফোনটা বেজেই চলেছে! কেউ ধরছে না? করিডোরটা কেমন যেন নির্জন! আচমকা সেই খা খা ডাকটা মনে পড়ল টাপুর! আচ্ছা, স্বপ্নের মধ্যে কেউ শব্দ শুনতে পারে!
‘‘পাখি, ফোনটা ধর,’’ হঠাৎ বসার ঘর থেকে একটা মেয়ের গলা শুনতে পেল টাপু।
লাবণ্য! এসে গেছে! পাখি ওকে ডাকেনি কেন? আসলে ও ঘুমোলে পাখি ওকে ডাকে না! কিন্তু আজ ডাকতে পারত!
করিডোরে দাঁড়িয়ে টাপু এবার দেখল পাখিকে! রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে কোনওদিকে না তাকিয়ে পাখি দ্রুত ঢুকে গেল বসার ঘরে!
টাপু হাসল মনে-মনে। স্বপ্নটা বড্ড নাড়িয়ে দিয়েছে ওকে!
ও এগিয়ে গেল বসার ঘরের দিকে। হাত দিয়ে জামাটা ঠিক করল। চুলটা পাট করল।
‘‘হ্যালো!’’ পাখির গলাটা শুনতে পেল টাপু!
‘‘কী!’’ আচমকা তীক্ষ্ণ গলায় চিৎকার করে উঠল পাখি।
চমকে উঠল টাপু। কী হল?"
‘‘কী বলছেন আপনি? কী বলছেন!’’ পাখির গলাটা কেমন যেন ভেঙেচুরে গেল!
‘‘পাখি! পাখি!’’ এবার লাবণ্যর গলা পেল টাপু।
ও দ্রুত পায়ে গিয়ে দাঁড়াল বসার ঘরের দরজায়! পাখির হাত থেকে ফোন পড়ে গিয়েছে! পাখিও পড়ে আছে সোফায়। চুলগুলো এলোমেলো। কাঁপছে! লাবণ্য জড়িয়ে ধরে আছে পাখিকে।
‘‘কী হয়েছে পাখি?’’
পাখির মুখটা লাবণ্যর বুকে গোঁজা। আর লাবণ্য দরজার দিকে পিঠ করে ধরে আছে পাখিকে। কারও মুখ দেখতে পাচ্ছে না টাপু।
ও আবার জিজ্ঞেস করল, ‘‘কী হয়েছে পাখি?’’
পাখি গোঙানির মতো শব্দ করল শুধু। তারপর ভেজা, ফোঁপানো আর জড়ানো গলায় বলল, ‘‘নেই… টাপু নেই লাবণ্য!’’
কী! ছিটকে উঠল টাপু! কী বলছে পাখি? ও নেই মানে!
পাখি ফোঁপানো গলায় বলল, ‘‘আমি কতবার যেতে না করলাম! কতবার বললাম… শুনল না! আর শেষে পুরনো একটা প্যালেসের ঘর থেকে পড়ে গিয়ে… খাদে পড়ে গিয়ে… মা গো…’’
কী বলছে পাখি! ও নেই! পড়ে গিয়ে… কিন্তু সেটা তো স্বপ্ন! সেটা তো সত্যি নয়। তা হলে? এটাও কি তবে স্বপ্ন!
টাপু এগিয়ে গেল ঘরের ভিতর, ‘‘পাখি! এই পাখি! এই তো আমি!’’
পাখি বলল, ‘‘ও… আজ দুপুরে নীলিঘাটিতে… মা গো, আমি ভাবতে পারছি না! কতবার বারণ করলাম! ভাঙা ঘর থেকে পড়ে… টাপু…’’
‘‘পাখি, এই তো আমি,’’ টাপু এবার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল।
‘‘চুপ,’’ মুখ তুলে ওর দিকে তাকাল লাবণ্য, ‘‘চুপ একদম। ওকে বিরক্ত কোরো না এখন। মৃত প্রেমিকের জন্য কাঁদতে দাও ওকে!’’
টাপু স্থির হয়ে গেল। নিমেষে ওর শরীর বেয়ে হেঁটে গেল বরফের গিরগিটি। ও দেখল লাবণ্যকে! কোঁকড়া চুল! হলুদ কুর্তি! গলায় লালচে পাথরের হার! পাখিকে বুকে জড়িয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছে লাবণ্য। বন্ধ ঘরের হাওয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে হালকা চন্দনের গন্ধ! টাপু দেখল, আবছা আলোয় লাবণ্যর নীল চোখ দুটো জ্বলছে!
(সমাপ্ত)
----------
।। একাকী কন্যা ।।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now