বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

মধ্যবিত্তের_গল্প

"ছোট গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোঃ ছহিনুর রহমান বিন মনির (০ পয়েন্ট)

X . আমি বিলাসী নই। বিলাসিতা আমার চরিত্রে নেই। বিলাসের সাথে ছোট থেকেই পরিচিত হয়ে উঠার সুযোগ মাত্র হয়নি। না হওয়াই যুক্তিসংগত। কারণ, আমি জন্মের পরপরই আমার স্বাচ্ছন্দ্যকে মেরে ফেলেছি। তখন থেকেই আমি খুনী। প্রতি পদক্ষেপেই আমাকে খুন করতে হয় আমার স্বপ্নকে; আমার বিলাসিতাকে; আমার স্বাচ্ছন্দ্যকে; আমার স্বাধীন চলাফেরাকে। খুনী বলে কখনো অনুতপ্ত হইনি। কারণ জানি এটা অপরাধ নয়; অপরাধবোধেই অনুতপ্ততা আসে। . সেই জন্ম থেকেই মৃত্যের দিকে ছুটে চলতে চলতে আমি খুনী হয়েছি, মিথ্যবাদী হয়েছি; এখনো কৃপন বা হার-কিপটে উপাধীও পেয়েছি। এর জন্য আমার কখনো মন খারাপ হয়নি। প্রথম প্রথম হতো; ছোট বেলায়----- যখন দেখতাম আমার স্কুলের সব বন্ধুরা খুব সুন্দর সাদা শার্ট আর নিল হাফ প্যান্ট আর সাদা জুতো পরে স্কুল যেতো তখন আমি কম দামী শার্ট আর আর হালকা নীল কালারের কম দামী প্যান্ট পরে যেতাম। সবার প্যান্টের সাথে আমার প্যান্ট ম্যাচিং করতো না। সবাই পড়তো নেবি-ব্লু আর আমি পরতাম জলসানো পলেস্টারের নীল হাফ প্যান্ট। মা বলতো স্কুলের টেইলার্স থেকে প্যান্ট বানাতে টাকা বোশি লাগবে তাই সামান্য ৮০ টাকা দিয়ে বাহির থেকে এই কালারের প্যান্ট কিনে দিসে। জুতোজোড়াও স্কুলের কারো সাথে ম্যাচিং করতো না। সবাই যেমন কেডস পড়তো আমি তেমনন কেডস পড়তে পারিনি। কমদামী কেডস ১ মাস না যেতেই মাঝ থাক থেকে ফেঁটে ছিড়ে উপরের চামড়া উঠা শুরু করে। খুব কষ্ট লাগতো। প্রতিদিন স্কুল গিয়ে দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখতাম তাদের চাকচিক্য পোষাক তারপর আবার আমার পোষাকের দিকে তাকিয়েই মনটা ম্লান হয়ে যেত। আম্মুকে কেঁদে কেঁদে কতই বলতাম--- "আম্মু আমারও ওঁদের মতো স্কুলের ড্রেস চাই। ওঁরা আমার ড্রেস নিয়ে হাসে। বলে যে, কি প্যান্ট কিনসিস রে হাসিব! তোর জুতাও তো ছিড়া।" আম্মু একটাই কথা বলে মুখ ঘুরিয়ে নিতো-- " বাবা এই কয়েকদিন পর-ই নতুন আবার কিনে দিবো।" মুখ ঘুরানো আম্মুর চেহারা সামনে থেকে গিয়ে দেখি চোখ ভিজে গেছে। তারপর থেকে আম্মুর চোখের পানি দেখার ভয়ে কোনদিন আর বলিনি -- আম্মু এটা লাগবে, ওটা লাগবে। আর বাবা! বাবাতো সারাদিন দোকান থেকে ফিরে এসে খেতে বসতো। কোনদিন বাবা আমাকে ডাক দিয়ে বলেনি, খেয়েছো বাবা। তিনি সবসময় চিন্তিত থাকেন। তার চেহারা দেখলেই ভয় লাগতো। সবসময় গম্ভীর মুখ করে রাখতো। মনে হয় কোনদিন তিনি হাসেননি। তার চুলগুলোও এলোমেলো থাকতো। মনে হয় তিনি অভাবের চিন্তায় নিজের খাওয়া-দাওয়াই ভুলে গেছে আর ছেলেমেয়েদের খেয়াল রাখা দ্বিতীয় কথা। আমার ছোট বোনটারও তখন ৩ বছর। বাবা! বাবা! বলে যখন দৌড়ে এসে বাবার চুল ধরে টানতো তখন তিনি মেয়ের দিকে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করেও হাসতে পারেনি। মেয়েটার খেলনা নেই; একটা ঝুনঝুনিও কিনে দিতে পারেনা। বার বার কিঁনবে কিঁনবে করেও কিঁনতে পারেনি। আম্মুকে ১০ টাকা দিয়েছিলো বোনকে একটা ঝুনঝুনি কিঁনে দেয়ার জন্য। কিন্তু মাও আর কিঁনে দিতে পারেনি। বাজারের টাকা ১০ টাকা কম পরেছিলো সেই টাকা তিনি খরচ করে ফেলে। স্কুলে সবাই তখন টিফিন টাইমে পাশের ক্যান্টিন থেকে ৫ টাকার হালুয়া কিনে রুটি দিয়ে খেতো। আমার হালুয়া অনেক প্রিয় ছিলো। তারা যখন খেতো আমি চেয়ে শুধু দেখতাম তারা কতটা তৃপ্তি করে খায়। আমারও খাওয়ার খুব শখ ছিলো। স্কুলে আসতে প্রতিদিন ২ টাকা করে দিতো। আমি তিনদিন ২ টাকা করে জমিয়ে ৬ টাকা হলে হালুয়া কিনে রুটি দিয়ে তৃপ্তি করে খেতাম। কিন্তু দুই সপ্তাহে ৪ দিন খাওয়ার পর ৫ম দিনে আর হালুয়া রুটি তৃপ্তি করে খেতে পারিনি। আমায় মেরে আমার ক্লাসের চঞ্চল ছেলেগুলো খেয়ে নিতো। তারপর থেকে আর হালুয়া রুটি খাওয়া হতো না। এভাবেই আমার জীবনের বিলাসিতা কেটে গেলো। আমার চাহিদা স্বাচ্ছন্দ্য নষ্ট হয়ে গেলো। শার্টের পকেটা পোলাপান টান দিয়ে ছিড়ে ফেলেছিলো। কলম দিয়ে গুতিয়ে আমার শার্ট ফুটা করে দিতো কোনদিন কিছু বলিনি। শুধু কাঁদতাম। আম্মুর কাছেও নালিশ করিনি; করিনি ক্লাসের ম্যাডামের কাছেও। আমি ক্লাসের সবচেয়ে বোকা বলেই আমাকে সবাই "বন্দা" ডাকতো। কাউকে কিছু বলে মুখ দিয়েও কিঞ্চিত প্রতিবাদ করিনি। প্রতিবাদ করলেই আমার গায়ে কলমের নিব ফুটিয়ে দিতো। কিন্তু আমি ক্লাসের প্রথম ছাত্র ছিলাম বিধায় শুধু টিচাররাই আমায় ভালবাাতো। . আমার স্বাচ্ছন্দ্য, স্বপ্ন ধীরে ধীরে শেষ হতে শুরু করে তখন থেকেই। বাবার গম্ভীর মুখ দেখে বাবার কাছে কখনো কিছু চাইনি--- বাবা আমার এটা লাগবে, বাবা আমার ওটা লাগবে। আর চাইলেও একটাই কথা প্রত্যুত্তরে শুনতাম-- আমার কাছে টাকা নাই। পরে দিবো। এই পরের সময়টা কখনো অনেক পরে এসেছে কখনো বা আসেওনি। কারণ যখন দেখতাম বাবার কাছে কিছু চাইলে তার মুখখানা আরো গম্ভীর হয়ে যেতো, তখন ওই চেহারা দেখে আমারও মন খারাপ হয়ে যেতো। তাই বাবা যখন যা দিতো তাই নিতাম, এর বাইরে না। বছরের এক ঈদে জামাকাপড় পেতাম বাবার পক্ষ থেকে তাও ফুটপাতের নিষ্ঠা। আর বাকি সময় আম্মুই দিতো। আম্মু তার বাবার থেকে টাকা নিয়ে একটা সেলাই মেশিন কিনেছিলো। সেই মেশিনে কাপড় সেলাই করে যা অর্জন হতো তা দিয়েই তিনি পরিবারের টুকিটাকি খরচ করে শেষ করে দিতো। ৯ম শ্রেনীতে সাইন্সে ভর্তি হই। কিন্তু বেশিদিন পড়তে পারিনি পরে কমার্সে ট্রান্সফার হই। বাবা খরচ চালাতে পারবে না অথচ আমায় ভর্তি করিয়ে রেখেছিলো ঢাকার সুনামধন্য "মতিঝিল হাই স্কুল এন্ড কলেজ" প্রতিষ্ঠানে। কারণটা আমার মেধার জন্যই। মৃত স্বপ্নের প্রতি মায়া হতো ; কিন্তু কিছু করার ছিলো না। আমি নবশ-দশম শ্রেণীতে দুই জায়গায় কোচিং করতাম। স্যারের বাসায় ব্যাচ করে যেতাম সেখানে প্রতি বিষয় ৫০০ টাকা করে দুই বিষয় পড়তাম ১০০০ টাকা। টাকাটা পেতে আমার তেমন কষ্ট হতো না। দুই বিষয় পড়ে বাকি বিষয় বাসায় পড়ার চেষ্টা করতাম; হতো না। তারপর থেকে পড়ালেখার আগ্রহ হারিয়ে যায়। এভাবে করেই অভাব আর অনটনে বড় হই তবে এই অনটন বাহিরের কেউ দেখতে পায়নি। কারণ আমরা মধ্যবিত্ত। কলেজে আর কি হয়েছে বলবো না তবে কিছু কষ্টের কথা বলি অবশ্য আমার কাছে এগুলো নিয়ম এবং স্বাভাবিকই মনে হয়েছে; কষ্ট লাগেনি মোটেও। লাগলেও লাগতে পারে অবচেতন মনের, চেতন মনের হয়তো লাগেনি। কলেজ যেতে কষ্ট হতো। ৫০ টাকা নিয়ে কলেজ যেতে যেতে পকেট খালি। বন্ধুদের বাসের ভাড়াটাও মানবতা দেখাতে গিয়ে আমার দিতে হতো। বাসায় আসার সময় মাইল পথ হেঁটে আসতে হতো। কানে হেডফোন লাগিয়ে রোদের নিষ্ঠুরতা উপেক্ষা করে হেঁটেই চলে আসতাম। বাসার আসার পর আম্মু বলতো, খেয়েছিলি বাবা? বলতাম, হুঁ খেয়েছি। ২০ টাকায় খাওয়া হয়ে গেছে। ১০ টাকার ডাল আর ২ টা পরোটা ১০ টাকা করে আর ভাড়া আসতে যেতে ৩০ টাকা। কিন্তু সেই ক্ষুধার্থ পেটই জানতো আমার মিথ্য গল্পের কথা। সাইকেল চেয়েছিলাম বাবার কাছে। তিনি বললো, জায়গাজমি এবার নিয়েই ছাড়বো। এখন ১০০০ টাকা আমার কাছে অনেককিছু। জায়গাজমি নেওয়ার পর তোরে টাকা থাকলে কিনে দিবো। সারাজীবনের সঞ্চয় আর ধারের টাকা দিয়ে বাবা ঢাকার কেরানিগঞ্চে ৩ কাঠা জায়গা কিনলো। এই জায়গাই মধ্যবিত্তের বাবার সম্ভল। এখন যা আছে তার সারাজীবনের সঞ্চয়ে রক্ত মাংসে, গায়ের ঘামে গড়া। . লেখাগুলো পড়ে অনেকেই ভাবছেন আমি কেমন অভয়ে লেখাগুলো লিখে গেলাম অনেকটা নির্লজ্জের মতো। সত্য প্রকাশে কোন ভয় নেই লজ্জা নেই। তবে এও সত্য লেখাগুলো লিখার সময় আমার চোখ দিয়ে অজান্তেই বিন্ধু বিন্ধু করে কত ফোটা অশ্রু বেয়ে পরেছে সেখনে খেয়াল ছিলো না, ছিলো মধ্যবিত্তের গল্পটি লিখার প্রতি। আমি অভয়ে লজ্জা ভীতি ছেড়ে লিখেছি শুধু সত্য প্রকাশ করে পাঠকদের প্রেরণা দেয়ার জন্য। . আমি হয়তো অপরাধী-- মিথ্যা বলার দ্বায়ে; হয়তো অপরাধী ভাল থাকার অভিনয়ের দ্বায়ে; হয়তো অপরাধী-- কৃপণতা করার দ্বায়ে; হয়তো অপরাধী--২ টাকা বাঁচানোর জন্য যুদ্ধ পর্যন্ত করার জন্য; হয়তো অপরাধী-- স্বপ্ন খুনের দ্বায়ে; হয়তো অপরাধী-- সাচ্ছন্দ্য, বিলাসিতাকে গ্রহণ করিনি বলে। তবে বিশ্বাস করুন আমি নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য এসব করেছি। নিজের জীবনের চেয়ে বড় মূল্যবান আর কিছু নেই। যদি জীবন বাঁচাতে হলে ডাকাতি করে পেট চালাতে হয়, হয়তো আমরা মধ্যবিত্তরা তা পারবো না। তবে লোকের আড়ালে অনেক অপরাধ করেই উদর বাঁচিয়ে, সম্মান বাঁচিয়ে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করবো। কারণ আমরা মধ্যবিত্ত; এক ভিন্ন শ্রেণীর মানুষ।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৭৮ জন


এ জাতীয় গল্প

→ মধ্যবিত্তের_গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now