বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

মাটির শরীরে সোনার ক্ষত

"গ্রাম্য লোককথা" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ শাহজামান শুভ (০ পয়েন্ট)

X মোহাম্মদ শাহজামান শুভ তিতাস নদীর ধারে ছোট্ট গ্রাম চরশাহাবৃদ্ধি। এই গ্রামের মাটি কালচে, পানিতে পলির ঘ্রাণ, আর বাতাসে কাঁচা পাটের এক অদ্ভুত সোঁদা গন্ধ। এই গন্ধে বড় হয়েছেন রমজান আলী। তাঁর বাবা, তার বাবার বাবা—সবাই পাটচাষি। রমজান আলীর শৈশবের স্মৃতিতে পাট মানে শুধু ফসল নয়, পাট মানে উৎসব, পাট মানে সংসারের হাসি। আষাঢ়-শ্রাবণে ক্ষেত জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা সবুজ পাট যখন বাতাসে ঢেউ খেলাত, তখন তার মনে হতো যেন মাঠজুড়ে সোনার তরঙ্গ। তখন গ্রামের মানুষ সত্যিই বিশ্বাস করত—পাট সোনালী আঁশ, যার ছোঁয়ায় ভাগ্য বদলায়। রমজানের বাবা হাফিজ উদ্দিন প্রায়ই সন্ধ্যায় হুঁকো টানতে টানতে বলতেন, একসময় পাটের দাম ছিল স্বপ্নের মতো। কলকাতার বড় বড় সাহেবরা নাকি বাংলার পাট ছাড়া একদিনও চলতে পারত না। যুদ্ধের সময়, দুর্ভিক্ষের সময়, সব সময় পাট ছিল দরকারি। হাফিজ উদ্দিনের কণ্ঠে সেই গল্পগুলো শোনার সময় রমজান ভাবত, সে বড় হলে আরও বেশি পাট ফলাবে, আরও ভালো দাম পাবে, তার ছেলেমেয়েরা অভাবে থাকবে না। গ্রামে তখন পাট কাটার সময় মানেই ছিল ব্যস্ততা, হাসি, দল বেঁধে নদীতে জাগ দেওয়া, আর সন্ধ্যায় চায়ের আড্ডায় পাটের দরদাম নিয়ে তর্ক। কিন্তু সময় থেমে থাকেনি। রমজান বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাটের মাঠে সোনালি রোদ থাকলেও মানুষের চোখে সেই উজ্জ্বলতা কমতে শুরু করে। বাজারে গিয়ে সে দেখে পাটের দাম পড়ে গেছে। আড়তদাররা মুখ বাঁকিয়ে বলে, “পাটে আর লাভ নাই।” শহর থেকে খবর আসে—প্লাস্টিক এসেছে, সস্তা, টেকসই, সহজ। প্রথম প্রথম গ্রামবাসীরা এসব কথায় কান দেয়নি। তাদের বিশ্বাস ছিল, পাটের মতো প্রাকৃতিক জিনিসকে কিছু হারাতে পারবে না। কিন্তু বছর পেরোতে না পেরোতেই বাস্তবতা এসে দাঁড়াল দরজায়। রমজানের বন্ধু কাদের শহরে গিয়ে গার্মেন্টসে চাকরি নিল। আরেক বন্ধু আজিজ গেল মালয়েশিয়ায়। গ্রামে পাটের জমি ধীরে ধীরে ধানে, সবজিতে ভাগ হতে লাগল। রমজান আঁকড়ে ধরে রইল পাটকে। সে মনে করত, বাবার স্বপ্ন, দাদার ঘাম, এই আঁশের ভেতর মিশে আছে। একবার পাটের ভালো দাম পেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে—এই আশাতেই সে প্রতিবছর পাট বুনত। একসময় রমজান পাট বিক্রি করতে গেল কাছের পাটকলে। সেই পাটকল ছিল একসময় এলাকার গর্ব। বিশাল লাল ইটের দালান, ভেতরে মেশিনের শব্দে কাঁপত বাতাস। ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে সে এখানে এসেছিল, শ্রমিকদের হাসি আর গর্জন শুনে তার বুক ভরে উঠেছিল। কিন্তু আজ সেই পাটকলের ফটকে তালা। দেয়ালে ধুলা, ভেতরে নীরবতা। সরকার নাকি কল বন্ধ করে দিয়েছে। লোকসান, দুর্নীতি, পুরনো মেশিন—কত কী যে কারণ। রমজান ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। তার মনে হলো, যেন এই তালার ভেতর বন্দি হয়ে আছে তার শৈশব, তার স্বপ্ন। পাটকল বন্ধ হওয়ায় গ্রামের অনেক মানুষ কাজ হারাল। কেউ রিকশা চালাতে গেল, কেউ শহরের বস্তিতে ঠাঁই নিল। রমজানের বড় ছেলে জসিম একদিন বলল, “আব্বা, আমি আর পাট করতে চাই না। পড়াশোনা শেষ করে ঢাকায় যাব।” কথাটা শুনে রমজানের বুকের ভেতর কেমন একটা শূন্যতা তৈরি হলো। সে রাগ করল না, নিষেধও করল না। শুধু মনে মনে ভাবল, এই প্রজন্মের কাছে পাট আর স্বপ্ন নয়, পাট এখন বোঝা। তবু প্রকৃতি যেন হাল ছাড়েনি। এক বছর হঠাৎ খবর এলো—বিদেশে নাকি পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। প্লাস্টিক নিষিদ্ধ হচ্ছে, মানুষ আবার পাটের দিকে তাকাচ্ছে। রমজানের মনে আবার একটু আলো জ্বলে উঠল। সে ভাবল, হয়তো সোনালী আঁশ আবার মাথা তুলে দাঁড়াবে। সে নতুন করে চেষ্টা করল, ভালো বীজ জোগাড় করল, ক্ষেত পরিচর্যায় মন দিল। কিন্তু বাজারে গিয়ে আবারও হতাশ হলো। মধ্যস্বত্বভোগীরা দাম কমায়, সরকারি সহায়তা পৌঁছায় না, আর উন্নত প্রযুক্তির অভাবে পাটের মান ঠিক থাকে না। রমজানের স্ত্রী আয়েশা একদিন বলল, “সবকিছুর ভার একা টানতে হবে না। সময় বদলেছে।” কথাটা সহজ, কিন্তু রমজানের কাছে কঠিন। তার মনে হয়, সে যদি পাট ছেড়ে দেয়, তবে তার অস্তিত্বের একটা বড় অংশ হারাবে। এই আঁশের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার পরিচয়, তার ইতিহাস। সে জানে, শুধু আবেগ দিয়ে সংসার চলে না, কিন্তু আবেগ ছাড়া মানুষও বাঁচে না। এক সন্ধ্যায় নদীর পাড়ে বসে রমজান জাগ দেওয়া পাটের দিকে তাকিয়ে থাকে। পানিতে ভেজা পাটের গন্ধে তার শৈশব ফিরে আসে। বাবার কণ্ঠ, গ্রামের কোলাহল, পাটকলে যাওয়ার উত্তেজনা—সব মিলেমিশে যায়। সে ভাবে, পাটের ভবিষ্যৎ দিশাহীন হলেও, এর অতীত তাকে পথ দেখায়। হয়তো পাট আর আগের মতো সোনালী হবে না, কিন্তু এই আঁশের শিক্ষা আছে—সময় বদলায়, মানুষ বদলায়, তবু মাটির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা যায় না। পরদিন সকালে রমজান ছেলেকে ডেকে বলল, “তুমি তোমার পথে যাও। আমি আমারটা করব।” তার কণ্ঠে দুঃখ নেই, আছে এক ধরনের শান্তি। সে বুঝে গেছে, পাট শুধু অর্থনীতির গল্প নয়, পাট এক জীবনের গল্প। সোনালী অতীত আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এই মানুষগুলোই পাটের আসল ইতিহাস। চরশাহাবৃদ্ধির মাঠে তখনো পাট দুলছে। হয়তো আগের মতো সোনার দাম নেই, হয়তো ভবিষ্যৎ ঝাপসা, তবু বাতাসে সেই সোঁদা গন্ধ এখনো বলে যায়—এই মাটিতে একসময় সোনা ফলত, আর সেই স্মৃতি কেউ কেড়ে নিতে পারে না।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৮৭ জন


এ জাতীয় গল্প

→ মাটির শরীরে সোনার ক্ষত

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now