বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
মাথা নিচু করে আমি আর তুহিনের বাবা দাড়িয়ে আছি মেয়ে পক্ষের সামনে। কারন রাস্তায় এমন একটা কাজ হয়ে যাবে, যা আমাদের সবার কল্পনার বাইরে। এখন আমরা কি করে এই সমস্যা টা শেষ করবো বুঝতে পারছি না।
আজ আমার বন্ধু তুহিনের বিয়ে। প্রায় একটা সপ্তাহ হতেই এই বিয়ে নিয়ে তুহিন খুব উৎসুক হয়ে আছে কারন এটা তো লাভ ম্যারেজ হতে যাচ্ছে। আসলে তুহিনের বাড়ির কেউ জানে তুহিন আর অন্তরা তাদের বিয়ের আগে থেকেই প্রেম করে। আমরা সকল বন্ধুরা মিলে এই বিয়েটা ঘটক দিয়ে নানা রকম বুদ্ধি খাটিয়ে বিয়েটা দিতে যাচ্ছিলাম কিন্তু মাঝ রাস্তায় সব শেষ হয়ে গেল। আসলে আমি গত সপ্তাহে বিদেশ থেকে দেশে ফিরে। বলতে গেলে আমি একজন প্রবাসী তবে তুহিন সপ্তাহে দুইদিন আমায় ফোন দিতো। আর অন্তরার কথা বলে রাত পার করে দিতো। ওর বিয়ে উপলক্ষ্যের কারনের আমার দেশে ফিরে আসা। আমার বাবা নেই তবে ঘরে শুধু মা আছে। আমি প্রতিমাসে টাকা পাঠিয়ে দেই আর ওনার সাথে সব সময় আমার যোগাযোগ আছে। আমি ভেবে ছিলাম হয়ত আর ৩ বছর থাকার পরে দেশে ফিরে আসবো কিন্তু বন্ধুর বিয়েতে আসতে হলো। যাই হোক, সেই বিয়ের রাতটা হয়ত তুহিনের জীবনে সুখের হলো না......
.
আমরা সবাই একে একে গাড়িতে উঠতেছি। সবার সামনের গাড়িটা ছিল বরের গাড়ি। আমিও তুহিনের সাথে বসবো। কিন্তু হঠাৎ আমার একটা ফোনটা চলে আসে। যার কারনে.....
.
-- কিরে রাজ তুই যাবি না আর সাথে?
-- তুহিন তুই চলে যা আমি একটু ভিসা অফিস হয়ে চলে যাবো। আর হা আমি না আসা পর্যন্ত যাতে বিয়ে না হয়।
-- ওকে কিন্তু তারাতারি। জানিস তো তোরে ছাড়া যে এই তুহিন অন্ধকার।
.
শেষবারের মত ওর সাথে বুক মিলিয়ে ওরে গাড়িতে তুলে দেই। আর সবাই পিছনের গাড়িতে করে যাচ্ছে। আমি এলাকার মোড়ে এসে একটা অটু ধরে ভিসা অফিসে চলে যাই। সেখানে প্রায় ১ ঘন্টা একটু কাজ শেষ করে আমি তুহিনের বিয়ের আসরে চলে যাই। কিন্তু বাড়ির কাছে যেতেই দেখি সাড়া বাড়ি চুপ হয়ে আছে। একবার মনে হলো আমি কি ভুল বাড়িতে চলে আসলাম। তাই তুহিনকে ফোন দিলাম কিন্তু ওর নাম্বার তো বন্ধু। তাই আর কিছু না ভেবে বাড়িতে প্রবেশ করলাম। বাড়িতে যেতে দেখি তুহিনের বাবা চুপ করে দাড়িয়ে আছে আর কাদছেঁ। আরে এখানে কাদার কি হলো। ছেলের বিয়ে কোথায় মজা করবে তা না শুধু কেদেঁই চলেছে। আমি সরাসরি ওনার সামনে গেলাম আর ওনার হাতটা ধরলাম। ওনি আমার দিকে মুখটা তুলেই আমায় বুকে জড়িয়ে অনেক জুড়ে কাদঁতে শুরএ করলো......
.
-- কি হয়েছে আঙ্কেল এতো কান্নার কি হলো? সব কিছু ঠিক আছে তো?
-- ( ওনি কাদছেই তবে আমার মনে একটা ভয় চলে গেল)
-- আঙ্কেল তুহিন কই আর আপনি এতো কাদছেন কেন?
-- বাবা তুহিন আর নেই ওরে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ওদের গাড়ি রাস্তায় এক্সিডেন্ট করে। ওরে বাড়িতে রেখে আমি আসি অন্তরার বাবাকে সব বুঝাতে তবে ওরা সেটা বুঝতে চাইছে না। ওরা এখন ওদের মেয়েদের নিয়ে আমাকে যা না তাই বলে অপমান করেছে।
--( আমি চুপ করে আছি কারন যখন বলেছে তুহিন আর নেই, সেই কথাটাই আমার মাথায় ঘুরছে।)
আমাকে আর কথা না বলতে আঙ্কেল আবার বলল..
-- বাবা রাজ তুমি আমায় এই অপমানের হাত থেকে বাচাও। তুমিও তো আমার ছেলের মত, তুমি অন্তরাকে বিয়ে করে নাও।
-- আঙ্কেল এটা হতে পারে না। তুহিন অন্তরাকে ভালবাসতো আর অন্তরাও।
-- কিন্তু বাবা তুহিন তো আর নেই। আর এখানে তুমি যদি আমায় না বাচাও তাহলে হয়ত আমার আর মুখ থাকবে না তাদের কাছে।
-- কিন্তু আমি আমার মায়ের অনুমতি ছাড়া কি করে করবো?
-- তোমার মাকে আমি বুঝাবো, দরকার হলে আমি ওনার পায়ে ধরবো। তবু তুমি এই বিয়েটা করো।
.
এরপর আমিও এমন চাপে পরলাম যে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছি। আমি জানি অন্তরা যখন শুনেছে তুহিন মারা গেছে তখন ও না পারবে চিৎকার করে কাদতে না পারবে কাউকে কিছু বলতে। মেয়েটা একরকম পাথর হয়ে যাবে।
যাই হোক, তারপর আমার সাথে অন্তরার বিয়েটা হয়ে যায়। অন্তরা সাথে নিয়ে আমি আর আঙ্কেল আমাদের বাড়ির উদ্দেশ্যে চলে যাই কারন আমার মাকে তো বুঝাতে হবে আর অন্তরাকে আমাদের বাড়িতে রেখে তুহিনের শেষ কাজও তো করতে হবে। আমি এখনো ভাবতে পারছি না এইসব কি হচ্ছে আমার সাথে। জীবনের মাঝে এমন একটা মোড় আসবে ভাবতেও পারি নি। আমার কথা না হয় বাদ দেওয়া যাক কিন্তু আঙ্কেল এমন ভাবে নিজেকে শক্ত করে রেখেছেন যা দেখে আমি বার বার কেদেঁ দিছি। আর অন্তরাতো একটা পাথরের পুতুলের মত আমার পাশে বসে আছে। ওকে যা করতে বলা হচ্ছে তা করছে।
.
আমাদের বাড়িতে এতে কলিং বেল চাপতেই মা এসে দরজা খুলল আর আমার সাথে নতুন বউ দেখে তিনি খুব অবাক হয়ে যান। তখন আঙ্কেল মাকে সব বুঝিয়ে বলেন আর মাও এটা খুব সাধারন ভাবে মেনে নেয় কারন তুহিন আমার মায়ের কাছে শুধু আমার বন্ধু ছিল না বরং আমার একটা ভাইয়ের মত ছিল।
.
মা অন্তরাকে নিজের রুমে নিয়ে যায় আর আমি আর আঙ্কেল তুহিনের শেষ কাজের জন্য রওনা হই। তুহিনের বাড়িতে যেতেই কান্নার শব্দ হাহাকার করতে লাগলো। আমিও নিজেকে সামলানে না পেরে কেদে দিলাম। শুধু একটা কথাই আমার কানে বাজছে " রাজ তুই ছাড়া এই তুহিন অন্ধকার "। ওরে কখনো বন্ধু ভাবি নি তবে ভাই ভেবে আসছি সবসময়।
.
ওর শেষ কাজ সম্পূর্ণ করতে করতে রাত প্রায় শেষ হয়ে ভোর হতে চলল। আস্তে আস্তে তুহিনের বাড়ি থেকে মানুষ যেতে লাগলো আর আমরা কিছু বন্ধু বসে ছিলাম। পরে আঙ্কেলের থেকে বিদায় নিয়ে আমরাও চলে আসি।
বাড়িতে আসতেই দেখি দরজা খুলা। এতো সকালে কে দরজা খুলে রাখবে। আমি দরজায় ঢুকতেই দেখি অন্তরা সোফায় চুপ করে বসে আছে। আমি ওর পাশের সোফায় গিয়ে বসলাম। ওরে কি বলবো বুঝতে পারছি না।
-- আসলে মাত্র তুহিনের শেষ কাজ সম্পূর্ণ হলো। আপনি এখন রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে যান।
ও আমার দিকে কেমন করে যেন তাকালো। আর সাথে সাথে আমায় জড়িয়ে ধরে নিজের লুকিয়ে রাখা কান্না গুলো বের করে দিলো। খুব জুড়ে কাদতেঁ লাগলো। হা মেয়েটা একটু কাদুক। আর কত লুকিয়ে রাখবে নিজের মনের কষ্ট গুলো। যদি বাড়িতে এটা শুনার পরে কাদতোঁ তাহলে সবাই বলতো মেয়েটার চরিত্র খারাপ। বিয়ের আগে অন্য ছেলের সাথে সম্পর্ক রাখে। এখন যেহেতু একটু কাদতে পারতেছে তাহলে তাকে কাঁদতে দেওয়াই ভালো। হয়ত এতে ওর মনটা হালকা হবে।
.
কাঁদতে কাঁদতে এক পর্যায় ও আমায় ছেড়ে দিয়ে আমার রুমে গিয়েই কান্না শুরু করে। আমিও রুমে যাই কিন্তু ওর কিছু না বলে ফ্রেশ হতে বাথরুমে চলে যাই। ফ্রেশ হয়ে এসে ওর আর দেখি না। পরে মাকে ডাক দিতে গিয়ে দেখি অন্তরা মায়ের সাথে রান্না ঘরে ঢুকেছে। হায়রে মেয়ে জাতি তোমরা হাসতেও পারো, কাদতেও আবার রাগও করতে পারো তবে সেটা হঠাৎ করে। এটা হয়ত যে কোন ছেলের পক্ষে সম্ভব হয়ত না।
.
সকালে নাস্তার করলাম আমি, মা আর অন্তরা একসাথে বসে। আমি অন্তরাকে লক্ষ্য করলাম ও খাচ্ছে না। আমি কোন মতে খাওয়া শেষ করে রুমে চলে আসি। জানি অন্তরা আমায় কখনো হয়ত মানতে পারবে না তবে আমাকে তো কর্তব্য পালন করে যেতেই হবে। একটু পরে অন্তরাও রুমে আসলো। আসলে আমাদের কেউই রাতে ঘুমাই নি আর এখনো চোখে ঘুম নেই। ও রুমে এসে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে আর আমি চুপ করে ঘরে বসে আছি। কিন্তু মেয়েটাকে তো এভাবে কষ্ট রাখলে পরে হয়ত খুব ক্ষতি হয়ে যাবে।
-- অন্তরা একটা শুনবে?
-- ( ও আমার ডাকে আমার সামনে এসে দাড়ালো)
-- অন্তরা থেমে থাকার নাম জীবন না। আমি তোমার আর তুহিনের বেপারটা জানতাম। জানি এখন তুমি আমায় স্বামী হিসেবে মানবে না আর আমিও চাইবো না তুমি আমাকে তুহিনের জায়গা দাও। কারন কারো জায়গা কেউ নিতে পারে না। আমি চাইবো আমি সবসময় তোমার কর্তব্য পালন করে যাবো আর তুমিও আমার মাকে দেখে রাখবে। হয়ত দুই মাস পরে আমি আবার আমাকে আগের জায়গাতে চলে যেতে হবে। কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাবো কিন্তু তুমি প্লিজ আর পিছু টান নিয়ে থেকো ন।।
-- আপনাকে আমায় নিয়ে ভাবতে হবে না। আমি নিজেকে সামলে নিতে পারবো।
.
ও কথাটা বলে একটা দীর্ঘ শ্বাস ত্যাগ করলো। হঠাৎ বাড়িতে কিছু মানুষ আসার আওয়াজ পেলাম। বাইরে বের হয়ে দেখি আমাদের আত্মীয়পরিজনরা আসছে।
-- কিরে রাজ তুই বিয়ে করে ফেললি আর বললিও না।
-- আসলে আন্টি....
-- চুপ কর আমরা সব জানি। বউমা কোথায় ওরে দেখতে দিবি না।
.
আমাকে কথা বলতে না দিয়ে সবাই অন্তরার সাথে কথা বলতে চলে গেল।তারপর মায়ের কাছে গেলাম আর মা বললো, ওরা নাকি জানি আমি মেয়ে পালিয়ে নিয়ে বিয়ে করছি। তাছাড়া ভালই হলো নয়ত মানুষের যেই মুখ। হয়ত আমাকে কথা শুনাতেও ছাড়বে না। তারপর সাড়াটা দিন নানারকম কাজ আর ব্যস্ততার মাঝে দিয়ে কেটে গেল।
রাতে আমি আর অন্তরা বসে আছি। আমি শুধু ভাবি মেয়েরা এতো অল্পতে নিজেকে মানিয়ে নেয় কি করে? ওকে চুপ থাকতে দেখে আমিই বললাম.....
-- অন্তরা তুমি খাটে শুয়ে পরো আমি সোফায় ঘুমিয়ে যাবো। তাছাড়া কাল সাড়াটা কারো চোখে ঘুম ছিল না। আর আজ সকাল থেকে নানা রকম কাজের মধ্যে দিয়ে ব্যস্ত ছিলাম দুইজনেই।তাই তুমি ঘুমিয়ে পরো।
.
ও আমার কথার জবাব দিলো না শুধু মাথা নেড়ে সায় দিলো। হয়ত ওর নানা রকম স্বপ্ন ছিল বিয়ের দিনটা নিয়ে যা এইভাবে শেষ হতে দেখে ও মানতে পারছে না। তবুও আমি চেষ্টা করবো যেন ও জীবনে কিছুটা হলেও সুখ পায়। তুহিনের জায়গা তো কখনো আমার পক্ষে নেওয়া সম্ভব না তবে ওর মত করে চেষ্টা করতে তো দোষ নেই।
এভাবে দিন গুলো পার হতে লাগলো। কথায় তো আছে সময় কারো জন্য থেমে থাকে না আর সব থেকে বড় কথা হলো কেউ মরে যাওয়ার সাথে সাথে তার নাম হয়ে যায় লাশ। কারো মৃত্যুর পরে তিন দিন যেতে না যেতেই সবাই মানুষটাকে ভুলতে শুরু করবে। আমি নিজের দিকে না তাকিয়ে চেষ্টা করছি যেন অন্তরা হাসি খুশি থাকে কিন্তু ওরে আজও আমার পক্ষে হাসানো সম্ভব হয়ে উঠলো না।
প্রায় ১ মাস পার হয়ে গেল। হঠাৎ একদিন আমি রুমে বসে পেপার পড়ছি তখন অন্তরা আমার জন্য চা নিয়ে আসলো...
-- আপনার চা?
-- হুমম তোমার চা কোথায়?
-- আমি তেমন একটা চা খাই না।
-- আচ্ছা অন্তরা বিয়ের তো ১ মাসের মত হয়ে গেল তুমি তোমার বাবার বাড়ি যাবে না।
-- না।
-- কিন্তু কেন?
-- ওই খানে গেলে আমাদের বাড়ি বেলকনি থেকে রাস্তার দিকে আমি তাকাতে পারবো ন।। কারন তুহিন সব সময় সেইখানে দাড়িয়ে থাকতো।
-- ও আচ্ছা বাদ দাও। তাহলে চলো আমরা বাইরে থেকে কোথায় একটু ঘুরে আসি।
-- ( ও চুপ হয়ে গেল)
-- বেশি কিছু না হলেও আইসক্রিম ঠিকই খাওয়াবো।
.
কথাটা শুনা মাত্র ও আমার দিকে তাকালো কারন অন্তরা যখন রাগ করতো বা কোথাও যেতে না চাইতো তখন তুহিন এটাই বলতো। অন্তরা তখন কি বলবে ভাবছে। হয়ত ও জানতে চাইবে আমি এইসব জানি কি করে, আসলে তুহিন আমায় সব বলতো। অন্তরা কিছু করলে আমায় বলতো জানিস অন্তরা না আজ এটা বলল রে।
.
অন্তরাকে নিয়ে নদীর পাড়ে ঘুরতে আসলাম। যদিও এখানে একটু বেশি মানুষ। কারন মানুষের মাঝে থাকলেই মনটা ভাল হয়ে যাবে। দুইজন পাশাপাশি চুপচাপ হাটছি। আমি যদিও মাঝে মাঝে কিছু কথা বলছি তবুও ও চুপ হয়ে আছে।
-- আরে মেডাম অন্তরা আমি কখন থেকে বকবক করছি, একটু তো কথা বলুনন।
-- কি বলবো?
-- আপনার যা মনে চায়।
-- কথা গুলো তো সেই এক মাস আগেই কবর দিয়ে দিয়েছি।
-- একটু কি কবর থেকে তুল আনা যায় না। আমি তো আর ১ মাস পরে চলেই যাবো আবার প্রবাসী জীবনে। না হয় একটু কথা বলে নেন।
.
আমার কথা শেষ না হতেই ও আমার দিকে কেমন করে যেন তাকালো। আমি তো চাই মেয়েটা আগের জীবন থেকে বেড়িয়ে আসুক। আর কতদিন এমন করে মন মরা হয়ে থাকবে।
-- অন্তরা চলো আইসক্রিম নিয়ে আসি।
-- চলেন। না থাক লাগবে না।
-- কেন?
-- ইচ্ছা করছে না প্লিজ।
-- অন্তত একটা খাও আমার জন্য। আর না খেলে ভাববো আজও তুমি আমায় তোমার বন্ধু ভাবো না। বরং তুমি আমায় এখনো অপরিচিত মানুষই মনে করো।
-- ওকে এতো কথা না বলে চলেন খাই। বাব্বা সামন্য বেপারে এতো বেশি ভাবনা আপনার ঠিক না।
-- আমি এমনই।
.
এরপর একসাথে বসে আইসক্রিম খেলাম। তারপর বেধেঁ রাখা একটা নৌকায় কিছুখন বসে থাকলাম। বাতাসটা খুব মনে হচ্ছে তাই ভালও লাগছে। আমি অন্তরাকে বিয়ের আগে কখনো দেখি নি। দেশে ফিরার পরও তুহিন বলছিল ওর সাথে দেখা করতে কিন্তু আমি বলছিলাম বিয়ের পরই দেখা করবো। তখন হঠাৎ অন্তরা বলে উঠলে....
-- আচ্ছা রাজ সাহেব আপনি যে আমায় বিয়ে করলেন এতে হয়ত আমার গার্লফ্রেন্ড আপনার উপর খুব রাগ করে ছিল।
-- গার্লফ্রেন্ড??
-- কেন নেই বুঝি?
-- জ্বি না এইসব ফালতু সময় ব্যয় করার মত সময় আমার কাছে নাই। আর তাছাড়া গার্লফ্রেন্ড হচ্ছে এক ধরনের প্যারা। তিল থেকে তাল খসলেই তেরটা বাজিয়ে দিবে। আড যদি সাড়াদিনও একবার ও খবর না নেয় তাহলে তো হলোই। পুরু সুনামি শুরু হয়ে যাবে।
-- কি?? তার মানে আমি আপনার বন্ধুর প্যারা ছিলাম তাই না।
-- আরে না না তা কখন বললাম।
-- হুহহ আমি বুঝছি ওকে।
.
মেয়েটা রাগ দিকে অন্য দিকে তাকিয়ে বসলো। সত্যি মেয়েটা খুব মায়াবী। এতোদিন ঠিক করে তাকিয়ে দেখি নি কিন্তু আজ তো চোখ ফেরাতে পারছি না। হঠাৎ ওর এলোমেলো চুল গুলো ঠিক করে দিলাম। আর তখনই অন্তরা আমার দিকে তাকালো। আমি চুপ হয়ে গেলাম।
-- আসলে চুল গুলোর কারনে মুখটা বুঝা যাচ্ছিল না তাই ঠিক করে দিলাম। নয়ত আপনাকে স্পর্শ করার ইচ্ছা আমার নেই।
-- কী???
-- না কিছু না। চলেন সন্ধ্যা তো হয়ে আসলো এবার বাড়ি যাওয়া যাক।
-- যাবো তবে আমার একটা ইচ্ছা আছে। আপনি কি সেটা পুরন করবেন?
-- বলেন শুনি?
-- রেল লাইনে কারো হাত ধরে হাটা।
-- তুহিন কি কখনো তোমায় নিয়ে হাটে নি?
-- আসলে ও বলেছিল বিয়ে পর নিয়ে যাবে।
.
বলেই ও মাথা নিচু করে ফেলল। উপরের দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবলাম তারপর বললাম চলো।এর পর স্টেশনে আসতে আসতে প্রায় রাত ৮ টা বেজে গেল। আমি ওর দিকে আমার হাতটা বাড়িয়ে দিলাম। ও আমার হাতটা ধরে হাটতে লাগলো। আমিও ওর পাশের লাইনটায় ধরে হাটতে লাগলাম। খুব ভাল লাগছে যে ও আমায় অন্তত কাছের মানুষ ভাবছে নয়ত আমার হাতটা ধরতো না।
.
অনেকখন হাটার পর ওরে নিয়ে ডিনারে গেলাম আর বাড়িতে ফোন দিয়ে মাকে জানিয়ে দিলাম। কারন ওনার জন্যও হোটেল থেকে খাবার নিয়ে আসবো। তারপর দুইজনে খাওয়া দাওয়া শেষ করে বাড়িতে চলে আসলাম। খুব ভাল লাগছে আজ এতো দিন পর এই মেয়েটাকে খুশি দেখে।
.
সকালে ঘুম থেকে উঠলাম অন্তরার ডাকে। তবে ও কখনো আমায় ডাকে নি, আজ ডাকতে দেখে অবাক হলাম......
-- কি হলো?
-- ওই শুনেন তারাতারি খাটে যান তো।
-- কেন?
-- আরে বাবা এসেছে।
-- কি?
খাটে যাবো দূরের কথা আমি কোন মতে দাড়িয়ে গেলাম। তারপর ফ্রেশ হয়ে ওর বাবার কাছে গেলাম। গিয়ে দেখি মা আর ওর বাবা কথা বলছে
-- আরে জামাই বাবা যে কেমন আছো?
-- জ্বী ভালো, আপনি কেমন আছেন?
-- আমি আজ অন্তরাকে নিতে আসছি। মেয়েটা বিয়ের পর তো আজও কেন যে আমাদের বাড়িতে গেল না বুঝলাম না। তাই আমি ওরে নিতে আসছি যদি তোমার কোন আপত্তি না থাকে।
-- না বাবা আপনি ওকে নিয়ে যান।
.
এরপর একসাথে সবাই মিলে সকালে নাস্তা করলাম। এরপর অন্তরাকে সাথে নিয়ে ওর বাবা চলে গেল। কিন্তু অন্তরা যাওয়ার আগে আমার দিকে কেমন ভাবে যেন তাকিয়ে ছিল। আমিও চুপচাপ ওরে বিদায় দিয়ে দেই।
দুপুরে রুমে শুয়ে আছি কিন্তু কিছুই ভাল লাগছে না বরং অন্তরার কথা মনে পরছে। মেয়েটা একটু একটু করে আমার মনে জায়গা করে নিয়েছে। হয়ত আমি ওরে ভালবাসতেও শুরু করেছি। যার কারনে ঘরে আর মনটা বসাতে পারলাম না তাই মাকে বলে অন্তরার বাড়ির উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে গেলাম। ওর বাড়ি যেতে যে আমার প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এলো। আমি ওর বাড়িতে গেলাম না বরং ওর বাড়ির সামনে দাড়িয়ে রইলাম। কারন আমি জানি অন্তরা ওর বাড়ির বেলকনি দিয়ে আমার দিকে তাকাবেই।
.
প্রায় এক ঘন্টা দাড়িয়ে থাকার পরও ও আসলো না। হঠাৎ খেয়াল করলাম কে যেন বেলনিতে দাড়িয়ে আছে। খেয়াল করতেই দেখি অন্তরা দাড়িয়ে আছে। আমি নিচে দাড়িয়ে হাত নাড়ালাম। ও কি যেন ভেবে রুমে চলে গেল। তাই আমি দৌড়ে ওর বাড়ির সামনে গিয়ে কলিং বেল চাপ দিতেই দরজা খুলল অন্তরার মা..
-- আরে বাবা তুমি এখানে?
-- জ্বী অন্তরা কোথায়?
-- ও তো ওর রুমেই আছে। যাও উপরে চলে যাও।
আমি আর লেট না করে দৌড়ে ওর রুমে গেলাম। গিয়ে দেখি ও চুপ করে বসে আছে।
-- রুমে আসার অনুমতিটা কি পেতে পারি?
অন্তরা আমার কথা শুনে উঠে দাড়ালো আর বলল.......
-- আপনি ওইখানে দাড়িয়ে ছিলেন কেন?
-- কোন নিয়ম আছে যে দাড়ানো যাবে না।
-- হুমম আমার অনুমতি ছাড়া ওইখানে দাড়ানো যাবে না।
-- তাহলে দাও অনুমতি।
-- মানে?
-- না কিছু না। আসলে এমনি বললাম।
-- আপনি এখানে আসছেন কেন??
-- কাউকে মিস করতে ছিলাম আর তাছাড়া এটা আমার শশুর বাড়ি তাই আসতেই পারি।
-- কাকে মিস করছিলেন?
-- কাউকে না।
এরপর অন্তরার মা রুমে চলে আসলো। আর এসে ওনি অন্তরাকে বলল...
-- ওরে নিয়ে এতে কিছু খেতে দে। আর তুইও কিছু খেয়ে নে।
এরপর আমি আর অন্তরা খেতে চলে গেলাম। তারপর রাতে বসে আছি হঠাৎ অন্তরা এসে বলল...
-- চলেন ছাদে যাই।
-- চলেন।
এরপর ওর পাশে ছাদে গিয়ে বসলাম। খুব ভালই লাগছিল কারন অন্তরাকে আজ কেন জানি খুব আপন লাগছে.....
-- জানেন এখানে বসে বসে আমি তুহিনের সাথে কথা বলতাম।খুব দুষ্টামী করতাম আর ও মাঝে মাঝে আমার বাড়ির সামনেও আসতো।আজ যেমন করে আপনি আসলেন।
-- ও তার মানে তুহিনের কিছুটা অংশ হয়ত আমায়ও দিচ্ছো।
-- না কিছু না। আর কয়টা দিন পর তো আমার কাছে সব অতীতের পৃষ্টা হয়ে থাকবে।
-- কেন?
-- বলে ছিলাম দেশের বাইরে চলে যেতে হবে। আর তো মাত্র কয়টা দিন আছে।
-- না গেলে হয় না। দেশে থেকেই চাকরী করেন।
-- না চলেই যাই। থেকে আপনাকে বার বার তুহিনের কথা মনে করাতে চাই না।
.
এরপর আর কথা হয়। দুইদিন অন্তরারদের বাড়িতে থেকে অন্তরাকে নিয়ে চলে আসলাম। বাড়িতে এসে ব্যস্ত হয়ে গেলাম ভিসা, পার্সপোট এইসব নিয়ে। দেখতে দেখতে দিন গুলো ঠিকই চলে যাচ্ছে আর মনের কোন জায়গাটাতে যেন ব্যাথা জমতে লাগলো।
.
আজ বিকেল ৫টা বাজে আমার ফ্লাইট তাই ১০টা বাজে বাড়ি থেকে বার হয়ে যাবো। সবার থেকে বিদায় নিবো কিন্তু অন্তরাকে কোথাও পাচ্ছি না। তাই ছাদে গিয়ে দেখি অন্তরা বসে আছে আর কাদছেঁ.........
-- কি হলো আপনি এখানে কাদছেন কেন?
-- জানেন মিস্টার রাজ, কাউকে হারিয়ে নতুন করে বেচে থাকার জন্য একটা উৎস পেয়ে ছিলাম।যা আজ আবার আমায় একা করে চলে যাচ্ছে।
-- চলে যেতে কেন দিচ্ছো?
-- শাষন করতে পারো না। আর নিজের আমানত আগলে রাখতে একটু কঠোর হওয়া দরকার।
আমার কথা শেষ হতে অন্তরা আমার শার্টের কর্লার চেপে ধরলো।
-- নিজের আমানত আর কি করো আগলে রাখবো বলো। নিজের কষ্ট টা আর কি ভাবে বুঝাতে হবে। আমার হাতটা কি একটু ধরার সময় নেই তোমায়। তুহিন স্বপ্ন দেখিয়ে সে চলে গেল আর আপনিও বাচতে শিখিয়ে চলে যাচ্ছে।
তারপর ও কর্লারটা ছেড়ে দিলো। আমি ওর মুখের সামনে বসলাম। আর ওর চোখের জলটা মুছে দিলাম। তারপর ওর হাতে আমি পার্সপোট টা দিলাম। আর বললাম...
-- চলে যেতে তো চাই নি শুধু একটু অভিনয় করতে হলো। আর দেখতে চেয়ে ছিলাম তোমার মনে আমার জন্য একটুও জায়গা আছে কি না।
-- তাই না। (বলেই ও মারতে শুরু করলো)
-- আরে মারো কেন? আমার আমানত এখানে রেখে আমি কি কোথাও যেতে পারি।
-- আর কোথাও যাবে না।
-- না। যাবো না আমার এই মিষ্টি বউটাকে রেখে।
-- হুমম মনে থাকে যেন।
নিশ্চিন্তে ও আমার কাধেঁ মাথা রাখলো। আর আমাদের মাঝে তুহিনকে বাচিয়ে রেখেই আমাদের সামনের জীবনটা অগ্রসর হতে লাগলাম।
লেখকapon Das Raj(কলা গাছের বান্দর)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now