বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

মাসুদ রানা - আসছে সাইক্লোন (পার্ট ১)

"উপন্যাস" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X আসছে সাইক্লোন ১ মাসুল্ডানা আসছে সাইক্লে¬ান কাজী আনোয়ার হোসেন এক দিগন্ত বিস্তৃত ক্যারিবিয়ান সাগর। তার বুকে সুজলা-সুফলা গাঢ় সবুজ একটা দ্বীপ। মেইনল্যান্ড, অর্থাৎ বেলপ্যান-এর সবচেয়ে বড় দ্বীপ ওটা, স্যান পল কি। বৃত্তাকার বিশাল চাঁদ্মা বলে দিচ্ছে আজ পূর্ণিমা, কাজেই দ্বীপের একমাত্র হোটেল বোকা চিকা-র তরুণ অতিথিরা উৎসবে মেতে ওঠার একটা অজুহাত পেয়ে গেল। রাতের নীরবতাকে তছনছ করে দিয়ে বেজে উঠল জনপ্রিয় জ্যামাইকান মিউজিক। বাতাস থেমে গেছে, সেই সঙ্গে ক্যারিবিয়ান এলাকার অভিশাপ খুদে স্যান্ডফ্লাই-এর মেঘ পৌঁছে গেছে চারপাশে। মশারি দিয়ে এই উপদ্রব ঠেকাবার কোনও উপায় নেই। ঘুমানো সম্ভব নয়, হোটেল-কর্মচারীরা নারকেলের ছোবড়া জড়ো করে তাই আগুন জ্বালল সৈকতে, তারপর সেই আগুনের উপর ঝুলিয়ে দিল লোহার শিকে গাঁথা ছাল ছাড়ানো খাসি। গরম ছাই-এ ফেলে পোড়ানো হচ্ছে মস্ত আকারের গলদা চিংড়িও। অতিথি বলতে কয়েকজন মার্কিন বল্টসায়ী ছাড়া বেশিরভাগই সদ্য কলেজ থেকে বেরুনো জার্মান স্টুডেন্ট টুরিস্ট। বয়স্ক অতিথিরা সৈকতে রাত জাগতে রাজি নন, শক্তি-সামর্থঞ্জটুট রেখে সকালে বোট নিয়ে বেরুবেন তাঁরা বেলপ্যান-এর মূল আকর্ষণ, সুদীর্ঘ কোরাল রিফ দেখতে। ২ মাসুল্ডানা-৩৬৬ রিফ মানে পাথর, নুড়ির স্তূপ, জমে ওঠা প্রবাল ইত্যাদি দিয়ে তৈরি পাঁচিল; কোথাও সাগরের উপর সামান্য মাথা তুলে আছে, কোথাও বা লুকিয়ে আছে সারফেসের ঠিক নীচেই। বেলপ্যানের দুর্ভাগ্যই বলতে হবে, প্রায় ষ্ণেশো মাইল দীর্ঘ সৈকত থাকা সত্ত্বেও উপকূলের অদূরে গড়ে ওঠা এই রিফ-এর কারণে দেশটার তীরে বড় কোনও জাহাজ ভিড়তে পারে না, ফলে গড়ে ওঠেনি কোনও ব›ল্ড। এক ডলারে রাম-এর বোতল পাওয়া যাচ্ছে। আরও এক ডলার দিলে ওটার সঙ্গে মেশানো যাবে এক বোতল লেমন জুস। এই মিশ্রণটাই বেলপ্যানের ‘ন্যাশনাল ড্রিঙ্ক’। মেইনল্যান্ডের দক্ষিণ প্রান্তে অবাধে গাঁজার চাষ হয়, পলাতক ক্রীতদাসল্ডে উত্তরপুরুষরাই করে এটা, প্রায় রোজ রাতেই ক্যানু নিয়ে এই দ্বীপে চলে আসে তারা। শুধু যে গাঁজা বেচে তা নয়, নেচে- গেয়ে পরিবেশটাকে আনন্দঘন করে তোলে। আজও তারা জ্যামাইকার উদ্দাম মিউজিকের সঙ্গে নাচছে। আধ মাইল দূরে Ñ সৈকত থেকে বার্নিশ করা খোল দুটো কোনও রকমে দেখা যাচ্ছে Ñ ঢেউয়ের তালে তালে দুলছে সত্তর ফুটি একটা ক্যাটামার‌্যান। ওটার নাম গ্রাসিয়াস, মেক্সিকান-স্প্যানিশে যার অর্থ ধনল্টাদ, নোঙর ফেলেছে রিফ-এর আড়াল নিয়ে সাগরের এদিকটায়। নাইলনের মোটা রশি দিয়ে বাঁধা একটা যোডিয়াক ডিঙ্গি রয়েছে গ্রাসিয়াসের পিছনে, বিশ ফুট লম্বা। ক্যাটামার‌্যানের পিছনের ডেভিট- এ ঝুলছে মেরুন রঙের বিএমডবি−উ জিএস এনডিউরো মোটরসাইকেলটা। গ্রাসিয়াস ডিজাইন করা হয়েছে ওশেন-রেসিং মেশিন হিসাবে, ফলে বো দুটো খুবই হালকা করে তৈরি, দমকা বাতাসের ধাক্কা খেয়ে তেড়ে আসা ঢেউয়ের ভিতরে যাতে সেঁধিয়ে যেতে না পারে। আসছে সাইক্লোন ৩ ক্যাটামার‌্যানটায় ছোট-বড় বেশ কয়েক প্রস্থ পাল তোলার বল্টস্থা আছে, বাতাস পেলে গতি এত বাড়বে যে রিফ-এর উপর দিয়ে অনায়াসে তরতরিয়ে পার হয়ে যাবে Ñ বলা যায় প্রায় উড়ে। গ্রাসিয়াসের জোড়া খোলকে এক করে রাখা ব্রিজ-ডেক থেমেছে সেন্ট্রাল সেলুনের ঠিক তিনফুট সামনে। দুই খোলের মাঝখানে এই মুহূর্তে আরও ঝুলছে এক ইঞ্চি ডায়ামিটার ফাঁকযুক্ত নাইলনের একটা জাল। ওই জালে শুয়ে চোখে শক্তিশালী যেইস বিনকিউলার তুলে সৈকতে জমে ওঠা উৎসবটা খুঁটিয়ে দেখছে মেক্সিকান তরুণ দিয়েগো মারভেল। গাঢ় নীল সুতির পায়জামা ও একই রঙের টি-শার্ট পরেছে সে। চওড়া কারনিসসহ বিরাট একটা হ্যাট দিয়ে মাথাটা ঢাকা, তবে কাঁধ পর্যন্ত লম্বা ঘন কালো কোঁকড়া চুল তাতে ঢাকা পড়েনি। থুতনির কাছে সামান্য সৌদি দাড়ি। চোখ দুটো কালচে-নীল। শক্ত-সমর্থ কাঠামো, কোথাও এতটুকু চর্বি নেই, পেশিগুলো পাকানো রশির মত। তার নড়াচড়ায় ক্ষিপ্র একটা ভাব রয়েছে। রুচি একটু হয়তো স্থূল, গলায় লাল প্রবাল পুঁতির একটা মালা পরে আছে দিয়াগো মারভেল। অল্পদিন হলো এসেছে এখানে। এরই মধ্যে দ্বীপের সবাই জানে, এই তরুণ মেক্সিকান জাপাটিসটাস গেরিলা ছিল, মেক্সিকো সিটির উপকণ্ঠে সরকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে তিন বছর যুদ্ধ করেছে। হঠাৎ একদিন ভুল ভাঙে তার, সে উপলব্ধি করে গেরিলারা আসলে ক্ষমতালোভী একদল নেতার অনৈতিক স্বপ্নপূরণের হাতিয়ার মাত্র। তাই সরকারের ক্ষমা ঘোষণার সুযোগ নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে রাজধানী মেক্সিকো সিটিতে ফিরে আসে মারভেল। গান গেয়ে আর সু›ল্ডী মেয়েল্ডে সঙ্গে প্রেম করে দিন তার ভালই কাটছিল। কিন্তু নাতির এই জীবনযাপন সহ্য হলো না খিটখিটে দাদুর। মারভেল বেকার, এটা নাকি পরিবারের জন্য শুধু অত্যন্ত নয়, ভয়ানক ৪ মাসুল্ডানা-৩৬৬ অসম্মানজনক। কথা নেই বার্তা নেই এই ক্যাটামার‌্যানটা কিনে দিয়ে বুড়ো বলেছেন, কিছুদিনের মধ্যেই বেলপ্যানের রিফ দেখতে প্রচুর ট্যুরিস্ট আসতে শুরু করবে, যাও, ভাড়া খেটে কিছু কামিয়ে আনো গে। উপকূলে অঢেল গলদা চিংড়িও পাওয়া যায়, লেগে থাকলে হয়তো তোমার ভাগেশু চাকা ঘুরেও যেতে পারে। মাত্র কদিন হলো বেলপ্যানে এসেই সবার সঙ্গে ভাব জমিয়ে ফেলেছে মারভেল। স্যান পল কি-র নিকারা’স বার-এ যারা আসা- যাওয়া করে তারা সবাই তাকে পছন্দ করে। তাল্ডে অনেককেই গলদা চিংড়ি ধরার কলা-কৌশল শিখিয়ে দিয়েছে সে। তারা ক্যাটামার‌্যান রিফ পার হয়ে পাশের দেশের বন্দরে গিয়ে লবস্টার বেচতে পারবে শুনে উৎসাহে টগবগ করে ফুটছে কিছু বেলপ্যানিজ তরুণ। অনায়াসে রিফ পার হতে পারে এমন জলযানের অভাব ছিল বলেই টাকা রোজগারের এই বুদ্ধিটা এতদিন তাল্ডে মাথায় আসেনি। আকাশ থেকে নেমে আসা যান্ত্রিক গুঞ্জন ঢুকল মারভেলের কানে। দক্ষিণদিকে তাকাতেই দেখতে পেল খুব নিচু দিয়ে, উপকূল রেখা ধরে উড়ে আসছে পে−নটা। মাত্র সত্তর ফুট উপরে, ওটার ন্যাভিগেশন লাইট তার দেখতে পাওয়ার কথা। এরোপে−ন সম্পর্কে ভালই জানে সে। আসলে ঠেকে শেখা। ছোট্ট ঘাসজমির উপর অন্ধকারে শুয়ে কতবার অপেক্ষা করতে হয়েছে তাকে, কানে ইঞ্জিনের গর্জন নিয়ে বুঝতে হয়েছে শত্র“রা কেউ কাছে চলে আসছে কি না Ñ যুদ্ধক্ষেত্রে যেমনটি হয় আরকী। এই পে−নটার দুটো ইঞ্জিন। কল্পনার চোখে চার্টটা দেখল মারভেল। উপকূলে বেলপ্যান সিটি এয়ারপোর্ট ছাড়া আর মাত্র একটা স্ট্রিপ আছে, স্যান পল কি থেকে পাঁচ মাইল উত্তরে কি কানাকা-য়। ওটা তৈরি করেছেন মার্কিন কসমেটিক বিলিওনেয়ার উড্রো ফোরসাইথ। দ্বীপের যেদিকটা থেকে রিফ দেখতে পাওয়া যায় সেদিকের আসছে সাইক্লোন ৫ সৈকতে বিশাল একটা সাদা বাংলো আছে, বছরে দুই হপ্তা ওখানে ছুটি কাটিয়ে যান ভদ্রলোক। আর উল্টোদিকে আছে বেলপ্যান প্রেসিডেন্ট রোকো রামপাম-এর ছোট একটা কাঠের বাড়ি, মাঝে মধেদ্দখানে অবকাশ যাপন করেন তিনি। কি কানাকার এয়ারস্ট্রিপেই ল্যান্ড করতে যাচ্ছে পে−নটা । কপালে চিন্তার রেখা, সেদিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকল মারভেল। সাতদিন হলো বেলপ্যানে এসেছে, রহস্যময় দুটো পে−নের কথা প্রথম দিন থেকেই শুনছে সে। আজ থেকে তিন হপ্তা আগে বেলপ্যানের প্রায় নির্জন উত্তরে অসমাপ্ত রাস্তার উপর ল্যান্ড করবার সময় কালভার্টে ধাক্কা খেয়ে বিধ্বস্ত হয়েছে প্রথম পে−নটা। হঠাৎ কোত্থেকে কিছু পুলিশ এসে কার্গো হোল্ড থেকে বের করে এনেছে প্যাকেটে ভরা একশো কেজি কোকেন ও দশ বাক্স আর্মস Ñ পঞ্চাশটা অটোমেটিক রাইফেল, সঙ্গে প্রচুর গোলাবারুদ। তার মাত্র দু’দিন পরেই আরেকটা পে−ন নিরাপদে ল্যান্ড করে রাজধানী বেলপ্যান সিটির এয়ারপোর্টে। বেলপ্যানে বল্টসা করতে আগ্রহী হন্ডুরাসের একজন নামকরা বল্টসায়ীর প্রাইভেট পে−ন ছিল ওটা, এখানে বিনিয়োগের সম্ভাব্যতা যাচাই করবার জন্য তাঁর ম্যানেজারকে পাঠিয়েছিলেন ভদ্রলোক। বিশ্বস্ত সূত্রে খবর পেয়ে সতর্ক ছিল কাস্টমস অফিসাররা, তল−াশি চালিয়ে পে−নটা থেকে প্রচুর পরিমাণে কোকেন ও হেরোইন পেয়ে যায় তারা। বেলপ্যানের রাজনৈতিক মহলে বেশ ভালভাবেই ছড়িয়েছে গুজবটা Ñ দুটো তল−াসির পিছনেই নাকি প্রেসিডেন্ট রোকো রামপামের হাত ছিল। গোয়েন্দাল্ডে গোপন রিপোর্ট পেয়ে আগেই পুলিশ বাহিনীকে সাবধান করে দেন তিনি। রাত আরেকটু গভীর হতে ঝুলন্ত জাল থেকে নেমে পড়ল ৬ মাসুল্ডানা-৩৬৬ মারভেল। ককপিটে উঠে কন্ট্রোল প্যানেলের উপর একবার চোখ বুলাল। পানির উপর বা নীচ দিয়ে চুপিসারে কোনও বিপজ্ঝাসছে না, এলে খুল্ডোডার স্ক্রিনে ধরা পড়ত সেটা। ককপিট থেকে কম্প্যানিয়নওয়ে-তে বেরিয়ে এল মারভেল, অলস পায়ে বড়সড় সেলুনে ঢুকতে যাচ্ছে। চার্ট টেবিলটা কম্প্যানিয়নওয়ের পোর্ট সাইডে। সেলুনের সামনের অংশটা দখল করে রেখেছে ঘোড়ার নাল আকৃতির চকলেট রঙা সেটি ও অর্ধ-বৃত্তাকার ডাইনিং টেবিল। টেবিলটাকে ঠেক দিয়ে রেখেছে মাস্ট-স্টেপ Ñ ধাতব একটা কাঠামো, যেটায় মাস্তুল স্ফাড়িয়ে থাকে, ক্যাটামার‌্যানের তলা থেকে উঠে এসেছে। সেলুন থেকে দুই খোলে নেমে গেছে দুই প্রস্থ ধাপ। খোল দুটোর সামনে-পিছনে দুটো করে চারটে কেবিন; প্রতিটি কেবিনে চারটে করে বাঙ্ক, বেসিন ও প্রাইভেট টয়লেট। স্টারবোর্ড খোল-এর দিকে আরও দুটো কেবিন আছে, সে দুটোকে আলাদা করে রেখেছে সাজানো-গুছানো গ্যালি। পোর্টসাইডের ওই একই জায়গায় পাওয়া যাবে শাওয়ার, বড়সড় সিঙ্ক, ওঅর্কটপ ইত্যাদি। ওখান থেকে একটা ¯ি−পিং ব্যাগ নিয়ে ডেকে বেরিয়ে এল মারভেল। পঞ্চাশ ঘোড়ার আউটবোর্ড মোটরের গর্জনে ঘুম ভেঙে গেল মারভেলের। এগজস্ট থেকে বেরিয়ে আসা আওয়াজ শুনেই বুঝতে পারল ইয়ামাহা কোম্পানির মোটর ওটা। কে আসছে জানে সে। রোল্ডে আঁচ পেয়ে চোখ কুঁচকে তাকাল মারভেল। ইস্পাত-নীল ক্যারিবিয়ান সাগর থেকে উঠে আসা কুয়াশার ভিতর নিষ্প্রভ সূর্যটাকে দেখতে পেল সে। যেন সূর্যের ঠিক মাঝখান থেকে বেরিয়ে আসছে সাদা, বিশ ফুটি, চারদিক খোলা লবস্টার স্কিফটা। বোটম্যান হুইল ঘোরাল, মোটর বন্ধ করল, স্কিফটা এবার আসছে সাইক্লোন ৭ আড়াআড়িভাবে গ্রাসিয়াসের দিকে এগিয়ে এল। ওটার স্টার্ন থেকে তৈরি ঢেউ ক্যাটামার‌্যানের দুই খোলের মাঝখানে আটকা পড়ে লাফিয়ে উঠল, ভিজিয়ে দিল তার ¯ি−পিং ব্যাগটা। গ্রাসিয়াসের রেইল ধরল বোটম্যান, ক্যাটামার‌্যানের বার্নিশ করা গা থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে স্কিফটাকে। মারভেলের মতই বয়স হবে তার, ছাব্বিশ কি সাতাশ। গায়ের রঙ কালো। তার বুকটা ছত্রিশ ইঞ্চি চওড়া, শরীরের দিকে তাকালে পেশি ছাড়া আর কিছু দেখা যায় না। অক্সিজেন বটল ছাড়াই ডুব দিয়ে সাগরের তলা থেকে শামুক তোলা ছিল তার পেশা। মারভেলের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর থেকে গলদা চিংড়ি ধরার নেশাটা ভালমতই পেয়েছে তাকে। চোখ থেকে লোনা পানি মুছে মারভেল বলল, ‘পুয়েলো, এভাবে সূর্য থেকে বেরিয়ে এলে কোন্ দিন না আমি তোমার খুলি উড়িয়ে দিই।’ ‘ভাই মারভেল, চলো, আগে ব্রেকফাস্টের পয়সাটা তুলি,’ বলল পুয়েলো। ‘তারপর যত খুশি গাল-মন্দ কোরো আমাকে।’ সাগরের তলায় দুশো লবস্টার-পট ছড়িয়ে রাখা হয়েছিল, ফলে শুধু আজকের নয়, ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে পুরো বছরের নাস্তার পয়সা তুলে ফেলল পুয়েলো। এভাবে আয় হতে থাকলে খরচ করাটাই না সমস্যা হয়ে স্ফাড়ায়! গাড়ি কেনা হবে না তার, কারণ স্যান পল কি-তে কোনও রাস্তা নেই। রাস্তা থাকলেও কোনও লাভ হত না, কোথাও যাওয়ার মত জায়গা নেই। অক্সিজেন ছাড়াই সাগরে ডুব দিয়ে পটগুলো খালি করতে পুয়েলোকে সাহায্য করল মারভেল। ওগুলোকে সারফেসের উপর তুলে আনতে হলে দ্বিগুণ সময় লাগত। সকাল দশটার আগেই কাজটা শেষ করল ওরা। মারভেলের খুব ইচ্ছে দিনের বেলা কি কানাকা দ্বীপটা একবার ৮ মাসুল্ডানা-৩৬৬ ঘুরেফিরে দেখবে, তবে ক্যাটামার‌্যান গ্রাসিয়াসকে নিয়ে গিয়ে নিজের দিকে সবার দৃষ্টি কাড়তে চায় না সে। পুয়েলোকে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার স্কিফটা একবার দেবে? এদিক ওদিক ঢু মারার ইচ্ছে হচ্ছে। বিকেলের মধ্যে সমবায় সমিতির জেটিতে ফিরিয়ে দিয়ে যাব।’ ‘ঠিক আছে।’ হাসল পুয়েলো। সমবায় অফিসে গলদা চিংড়ি নামাচ্ছে সে, বোট থেকে নেমে নিকারা’স বার-এর দিকে এগোল মারভেল। স্যান পল দ্বীপের লোকজন ওখানে বসেই আড্ডা দেয়। একটু ঘুরে যেতে হলো তাকে, কারণ পথের মাঝখানে চারজন আমেরিকান বল্টসায়ী বসে আছে, ভাব দেখে মনে হলো আজ সারাটা দিন কী করবে তারা তা-ই নিয়ে আলাপ করছে। হার্নান্দো নিকারা দোআঁশলা, পূর্ব-পুরুষল্ডে কেউ একজন স্প্যানিয়ার্ড শ্বেতাঙ্গ ছিল, বিয়ে করেছিল কোনও নিগ্রো ক্রীতদাসীকে। বয়স তার পঞ্চান্ন কি ষাট, কাঠামোটা দুই পায়ে স্ফাড়ানো সার্কাসের হাতির মত। ‘শুনলাম আজও তোমরা খুব ভাল মাছ পেয়েছ,’ মারভেলকে বার-এ ঢুকতে দেখেই বলল নিকারা, চোখে-মুখে আগ্রহ উপচে পড়ছে। ‘সত্যি নাকি, বাপ?’ মৃদু হেসে মাথা ঝাঁকাল মারভেল। টুলে বসে ব্রেকফাস্টের অর্ডার দিল। নিকারা’স বার শুধু বার নয়, একই সঙ্গে রেস্তোরাঁ ও হোটেলও বটে। ‘তা কী মাছ ধরলে, বাপ?’ ‘গলদা চিংড়ি,’ বলল মারভেল। ইতস্তত করতে দেখা গেল নিকারাকে। ‘ইয়ে, মানে, আমার কিছুটা ল্ডকার ছিল...’ হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিল মারভেল। ‘পুয়েলোকে বলা আছে, পাঁচ কেজি দিয়ে যাবে আপনাকে।’ আসছে সাইক্লোন ৯ এখানে খাওয়াদাওয়ার যে বিল হয় চিংড়ির দামের সঙ্গে অ্যাডজাস্ট করা হয় সেটা। বাজারদরের চেয়ে অনেক কম দাম ধরে মারভেল, প্রায় অর্ধেক। সেজন্য তার প্রতি খুবই কৃতজ্ঞ বোধ করে বুড়ো নিকারা। ব্রেকফাস্ট প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, এই সময় চোখ-ইশারায় কাঠের একটা ডেক-এর দিকে মারভেলের দৃষ্টি আকর্ষণ করল নিকারা। ‘অনেকক্ষণ হলো আমাল্ডে প্রেসিডেন্ট,’ বলল সে, গলার আওয়াজ খাদে নামানো, ‘ওদিকে বোনফিশ ধরছেন। শালার বোটম্যান নিশ্চয়ই তাঁকে নিয়ে যেতে ভুলে গেছে।’ বিস্ময়টা কাটিয়ে উঠে মারভেল জানতে চাইল, ‘প্রেসিডেন্ট কি কানাকায় যাবেন?’ উত্তরে মাথা ঝাঁকাল নিকারা। ‘আমি তাঁকে পুয়েলোর স্কিফে করে পৌঁছে দিতে পারি,’ বলল মারভেল। টোব্যাকো পাউচে হাত ভরে আঙুল দিয়ে তামাকের গুঁড়ো নাড়াচাড়া করছে নিকারা, হঠাৎ কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছে। তারপর এমন ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল, যেন একটা মাছি খুব বিরক্ত করছে তাকে: ‘কী জানি, ঠিক বুঝতে পারছি না কাজটা উচিত হবে কিনা। দেখো না, বাপ, এখানে ইনি কী বলছেন... আমাল্ডে প্রেসিডেন্টকে নাকি যে-কোনও সময় মেরে ফেলা হতে পারে।’ ‘কী বলছেন!’ মারভেল বিমূঢ়। দেশের একমাত্র ইংরেজি দৈনিক দি বেলপ্যান নিউজ-এর একটা কপি মারভেলের দিকে ঠেলে দিল নিকারা। খবরটা পড়ল মারভেল। রিপোর্টে বলা হয়েছে কলম্বিয়া-র ড্রাগ বল্টসাতে মার্কিন মাফিয়া পুঁজি বিনিয়োগ শুরু করেছে। কলম্বিয়া থেকে মেক্সিকো হয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় কোকেন পাচার করার নিরাপল্ড“ট হিসাবে বেলপ্যানকে ১০ মাসুল্ডানা-৩৬৬ অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে তারা। কারণগুলো সবার কাছেই পরিষ্কার Ñ বেলপ্যানে ক্রাইম রেট প্রায় শূনেশু কোঠায়, ফলে পুলিশ বাহিনী আছে নামকাওয়াস্তে; দেশের আকার বাড়ানোর কোনও কুমতলব নেই তাল্ডে, তাই কোনও শত্র“ও নেই, ফলে সেনাবাহিনীও না থাকার মত। এরকম একটা আদর্শ ট্র্যানজিট রুট দেখতে পেয়ে মার্কিন ও মেক্সিকান মাফিয়া বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। কলম্বিয়ান ড্রাগ কার্টেল- এর মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট রোকো রামপাম-এর উপর চাপ সৃষ্টি করছে তারা। বলছে হয় তাল্ডেকে ড্রাগ পাচারের সুযোগ ত্থেয়া হোক, তা না হলে প্রেসিডেন্টকে খুন করে সরকার উৎখাত করা হবে। কাগজটা নামিয়ে রেখে নিকারার দিকে তাকাল মারভেল। ‘কখন কী বিপদ হয়, আমি চাই না বিদেশী হয়ে সেই বিপদে জড়িয়ে পড়ো তুমি,’ বলে কাঁধ ঝাঁকাল নিকারা। ‘তারপর তোমার ইচ্ছে, বাপ।’ ব্রেকফাস্ট শেষ করে বার থেকে বেরিয়ে এল মারভেল, অলস পায়ে ডক-এর দিকে যাচ্ছে। বেলপ্যানের প্রেসিডেন্ট যতটা না শ্বেতাঙ্গ তারচেয়ে বেশি কৃষ্ণাঙ্গ। ছয় ফুট দু’ইঞ্চি লম্বা, একহারা গড়ন, শরীরে এখনও কোনও চর্বি জমেনি, তবে মাথার ঠিক মাঝখানের পাকা সব চুলই পড়ে গেছে। বয়স বাষট্টি। সামান্য ঢোলা খাকি ট্রাউজার ও ম্যাচ করা শার্ট পরেছেন তিনি। চোখে স্টিলরিমের চশমা, পায়ে ব−ু ক্যানভাস পুল-অনস্। বোনফিশ ধরার আশায় অগভীর সাগরের স্থির পানিতে কারবন রড-এর সাহায্যে টোপ ফেলেছেন তিনি। খানিকটা দূর থেকে দেখে প্রেসিডেন্টকে চিন্তিত বলে মনে হলো মারভেলের। তবে সেটা মাছ পাচ্ছেন না বলে, নাকি বোটম্যান তাঁকে নিতে না আসবার কারণে, বলা কঠিন। সন্দেহ নেই, ভাবল সে, আসছে সাইক্লোন ১১ পৃথিবীতে বেলপ্যানই একমাত্র রাষ্ট্র যেখানে বোটম্যান তার প্রেসিডেন্টকে নিতে আসবার কথা ভুলে যেতে পারে। মারভেলের জানামতে বেলপ্যান আরও একটি ব্যাপারে একমাত্র রাষ্ট্র, যে রাষ্ট্্েরর প্রেসিডেন্ট পাবলিক ডকে স্ফাড়িয়ে মাছ ধরতে পারেন, কিংবা রাজধানীর অলিগলিতে ঢুকে বডিগার্ড ছাড়াই ঘণ্টার পর ঘণ্টা একা একা হেঁটে বেড়াতে পারেন। মিষ্টি চেহারার এক তরুণী, বয়স হবে পঁচিশ কি ছাব্বিশ, ডকে বসে প্রেসিডেন্টের মাছ ধরা দেখছে। শান্ত দীঘির মত চোখ দুটো তার এত বড়, একবার দেখলে সহজে কেউ ভুলতে পারবে না। গায়ের রঙ ফরসাই বলতে হবে, তবে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে চেহারার মিল আছে। ঘন কালো রাশি রাশি রেশমি চুল লাল ব্যান্ড্যানা দিয়ে বাঁধা। ছেঁড়া জিনসের প্যান্ট পরেছে, ব্যান্ড্যানার সঙ্গে মিল রেখে গায়ে চড়িয়েছে হল্টার-টপ। জিনস বা ব−াউজ তার উপচে পড়া যৌবন বেঁধে রাখতে পারেনি, কাপড় ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে যেন শরীরটা। প্রেসিডেন্টের দিকে এমন মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মেয়েটি, তিনি যেন সারা দুনিয়ার সবচেয়ে সু›ল্ড, সবচেয়ে আদর্শ পুরুষ, তাঁকে দেখে রাখাটা তার পবিত্র কর্তব্য। ডেক ধরে হেঁটে এসে মারভেল বলল, ‘গুড মর্নিং, মিস্টার প্রেসিডেন্ট।’ ভাষাটা ইংরেজি হলেও, তার বাচনভঙ্গিতে মেক্সিকান টান পরিষ্কার। অবাক হয়ে ঘাড় ফেরালেন বৃদ্ধ। একজন বিদেশী তাকে চিনতে পেরেছে, অবাক হওয়ার সেটাই বোধহয় কারণ। ‘আমি মারভেল, সিনর Ñ ফার্নান্দো মারভেল। বার থেকে নিকারা বলল, আপনাকে আমার কি কানাকায় পৌঁছে দেয়া উচিত।’ ‘আপনি মেক্সিকান...’ ‘ইয়েস, সিনর।’ ১২ মাসুল্ডানা-৩৬৬ বৃদ্ধ প্রেসিডেন্টের মুখে সদয়, আন্তরিক হাসি ফুটল। ‘বেলপ্যানে আপনাকে স্বাগতম, সিনর মারভেল,’ বললেন তিনি। ‘তবে আপনাকে দেখে কিন্তু ট্যুরিস্ট বলে মনে হচ্ছে না।’ আরও উদার ও উষ্ণ হলো হাসিটা। ‘না, সিনর,’ বলল মারভেল। ‘আমি এখানে কাজের খোঁজে এসেছি। এই চিংড়ি ধরব, ক্যাটামার‌্যান নিয়ে ট্যুরিস্টল্ডে রিফের ওপার থেকে ঘুরিয়ে আনব।’ ‘তার মানে আপনি আমাল্ডে অতিথি, সিনর মারভেল,’ বললেন প্রেসিডেন্ট রোকো রামপাম। মাথা ঝাঁকিয়ে মৃদু হাসল মারভেল। তরুণীর দিকে তাকালেন প্রেসিডেন্ট। ‘আমার নাতনি আবার আপনার দেশ মেক্সিকোর অতিথি, ওখানে পলিটিক্স ও ইকোনমিক্স নিয়ে পড়াশোনা করছে।’ ‘ও, আচ্ছা।’ ‘ওহ্!’ বাঁক ঘুরে ত্রিশ ফুটি একটা লঞ্চকে এগিয়ে আসতে দেখে খুশি হয়ে উঠলেন বৃদ্ধ। ‘দেরি হলেও, ভুলে যায়নি। সাহায্য করতে চাওয়ার জনেঞ্জাপনাকে অসংখব্ধনল্টাদ, সিনর।’ মারভেলের মনে হলো শুধু নতুন বোটম্যান নয়, বেলপ্যানিজ প্রেসিডেন্টের আরও অনেক ধরনের সহায়তা ল্ডকার। দুই কিছুক্ষণ পর বার-এ ঢুকতেই নিকারা বুড়ো বলল, ‘মারভেল, বাপ, কজন অচেনা ভদ্রলোক তোমার জনেঞ্জপেক্ষা করছেন।’ কাঁধের উপর দিয়ে আঙুল তাক করে পিছনদিকটা দেখাল সে। আসছে সাইক্লোন ১৩ প্রথমে কিচেনে ঢুকল মারভেল, ওটার উল্টোদিকের ল্ডজায় স্ফাড়াতে রেস্তোরাঁর ভিতরটা দেখতে পাওয়া গেল। চারজন তারা: একজন রোগা, একজন মোটা, বাকি দুজন না রোগা না মোটা। দেখেই বোঝা যায় ল্যাটিনো, অর্থাৎ এরা ল্যাটিন আমেরিকান হলেও, বাস করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। বয়স হবে ত্রিশ থেকে চলি−শের কোঠায়। পোশাক-পরিচ্ছদ দেখে মনে হলো বল্টসা- সফল আমেরিকান, যেন অফিস আওয়ারে বিশেষ কাজে বাইরে বেরিয়েছে Ñ স্পোর্টস শার্ট, সুতি ট্রাউজার, পায়ে মকাসিন। চোখে বাহুলদ্দ ভারী লাগছে অলঙ্কারগুলো। বিরাট আকৃতির আংটি, গোল্ডেন ব্যান্ডসহ ওমেগা হাতঘড়ি, গলায় মোটা সোনার চেইন। মোজাগুলো সিল্ক। যার যার চেয়ারের পিছনে কাশ্মীরি স্পোর্টস জ্যাকেট ঝুলছে, শীতাতপ-নিয়ন্ত্রিত কোথাও বসতে হলে কাজে লাগবে। টেবিলের পাশে একসারিতে রাখা হয়েছে উন্নতমানের চারটে হোল্ড-অল। পেশায়, ভাবল মারভেল, বল্টসায়ী। হয়তো বিনিয়োগের পরিবেশ দেখতে বেলপ্যানে এসেছে। ওল্ডে মানিব্যাগ নিশ্চয়ই কুমিরের চামড়া দিয়ে তৈরি, বাজি রেখে বলা যায়, ক্রেডিট কার্ডের সঙ্গে ছেলেমেয়েল্ডে ছবিও আছে। স্থানীয় বিয়ার নিয়ে বসেছে তারা, তবে গ−াস খালি করবার কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। কথা বলছে নিচু গলায়। ঠোঁটে কিউবান সিগার। লোকগুলো শ্বেতাঙ্গ মার্কিনি হলে নিজেল্ডে পৌরুষ দেখাবার জন্য চিৎকার করে কথা বলত, বিয়ারের বদলে ঢকঢক করে গিলত রাম। ওল্ডে মধ্যে রোগা লোকটাকে নেতা বলে মনে হচ্ছে। বেশ লম্বা সে, টিয়াপাখির মত বাঁকা নাক। ভারী পাতার পিছনে বেশিরভাগটাই আড়াল করা থাকলেও, মুখের তুলনায় বড় লাগছে চোখ দুটোকে। আধবোজা হয়ে আছে ওগুলো। ১৪ মাসুল্ডানা-৩৬৬ লোকটার বোধহয় ঠাণ্ডা লেগেছে, কিংবা অ্যালার্জি হয়েছে, ভাবল মারভেল। দ্বিতীয়বার তাকাতে চোখের পাতা অস্বাভাবিক ফোলা লাগল, নাক দিয়ে বেরিয়ে আসা নোনতা পানি আধ মিনিট পরপর রুমাল চেপে মুছছে সে। মোটা লোকটা শক্ত-সমর্থ, মুখটা চওড়া, তবে চর্বির নীচে অবসর নেওয়া অ্যাথলেটের লুকানো পেশির অস্তিত্ব আবছাভাবে টের পাওয়া যাচ্ছে, নিজেকে ফিট রাখতে নিশ্চয়ই হপ্তায় দু’বার হেলথ ক্লাবে যেতে হয় তাকে। শান্ত ও চুপচাপ সে, মারভেল তাকে এই ট্রিপের টেকনিকাল অ্যাডভাইজার বলে ধরে নিল। না-মোটা না-রোগা দুজন স্রেফ অবজারভার, ব্যাঙ্কিং সেক্টরের আমলা। ন’টা-পাঁচটা অফিস বোঝে, কাজে নিখুঁত হতে জানে, অস্বাভাবিক বিনয়ী, যে বেশি দাম দেবে তার কাছে বিক্রি হয়ে যেতে একপায়ে খাড়া। রেস্তোরাঁর কাউন্টারে নিকারার ছেলে বসে আছে, তার উদ্দেশে মাথা ঝাঁকিয়ে ভিতরে ঢুকল মারভেল, ল্যাটিনোল্ডে টেবিল লক্ষ্য করে এগোচ্ছে। ‘মারভেল, সিনিয়রস্,’ বলল সে। ‘শুনলাম আপনারা আমাকে খুঁজছেন।’ নেতা লোকটা একমুহূর্তের জন্য চোখ দুটো খুলল। কালো মণি, দৃষ্টিতে এতটুকু উষ্ণতা নেই, যেন আনুগত্য দেখতেই অভ্যস্ত। নিচু কণ্ঠ¯ল্ফ, তবে তীক্ষè ও দৃঢ়। ‘আমরা একবার রিফটা দেখতে চাই, সিনর।’ অপেক্ষা করছে মারভেল, কিন্তু দীর্ঘদেহী লোকটা আর কিছু বলছে না। খুঁটিনাটি সমস্ত বিষয় সম্ভবত মোটা লোকটা দেখবে। নিজের পরিচয় দিল সে: ‘রডরি, মিগু রডরি। আপনার একটা ক্যাটামার‌্যান আছে। ওটা নিয়ে ইচ্ছে করলে আপনি সৈকতের কাছাকাছি চলে যেতে পারেন, আবার প্রয়োজন হলে যেখান দিয়ে খুশি রিফও পার আসছে সাইক্লোন ১৫ হতে পারেন।’ মারভেল ভাবছে, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, নাকি সংগ্রহ করা তথ্য? ডান হাতের তর্জনীতে কড়া পড়ার ছোট একটা দাগ দেখা যাচ্ছে। কল্পনায় তাকে গলফ ক্লাব ধরে থাকতে দেখল মারভেল, কিন্তু দাগটা ওখানে খাপ খায় না। সে বলল, ‘বিপদ এড়াতে হলে খোলের নীচে দু’ফুট পানি থাকতে হবে।’ ‘আপনি ভাড়া যাবেন?’ জিজ্ঞেস করল রডরি। কাঁধ ঝাঁকাল মারভেল। ‘সিনর, ভাড়া যাব কি যাব না সেটা নির্ভর করবে পরিস্থিতির ওপর।’ ‘আর পরিস্থিতি নির্ভর করবে নগদ কী পাওয়া যাবে তার ওপর।’ মিটিমিটি হাসছে রডরি। ‘কী ধরনের বাধা-বিঘেœর সামনে পড়তে হবে তার ওপরও,’ বলল মারভেল, তাকিয়ে আছে রোগা লোকটার হাত দুটোর দিকে। কঙ্কালসার লম্বা আঙুলগুলো টেবিলের উপর সম্পূর্ণ স্থির হয়ে আছে, যেন জ্যান্ত হয়ে ওঠার নির্দেশ পাওয়ার অপেক্ষায়। এরকম হাত আছে এমন এক আইরিশকে চিনত সে। মানুষ আর তার হাত, দুটো সম্পূর্ণ আলাদা অস্তিত্ব, দুটোর কাজের ধারাও এক নয়। মালিকের হয়েই কাজ করে ওগুলো, অথচ দায়-দায়িত্ব থেকে নিজের বিবেককে মুক্ত রাখে। আইরিশ লোকটাকে পিস্তল বল্টহার করতে দেখেছিল মারভেল, তবে তার হাতে বলপয়েন্ট কলমও সমান বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারত। ‘আমি এখানে বিদেশী, সিনর,’ বলল মারভেল। ‘এখনও কাজ করার অনুমতি নেয়া হয়নি। কাজেই এদিকের পানিতে আমাকে থাকতে হলে কোনও অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া চলবে না।’ ‘বোটেই ঘুমাতে চাই আমরা, চাই রিফের কাছাকাছি থাকতে। অন্য কার বোট এই সুযোগ দেবে?’ জিজ্ঞেস করল মোটা লোকটা। ১৬ মাসুল্ডানা-৩৬৬ লোকটার কথায় কোন্ দেশের টান, ঠিক ধরতে পারছে না মারভেল। তার স্প্যানিশ কর্কশ, উচ্চারণে খানিকটা নাকি সুর। ‘নিরাপত্থ আরামদায়ক? কারও বোট নয়,’ বলল সে। ‘এক ঘণ্টা সময় দিন আমাকে।’ বার থেকে এক বোতল রাম, চারটে পেপার কাপ ও কয়েক টুকরো লেবু নিয়ে সমবায় অফিস বিল্ডিঙে চলে এল মারভেল। বারান্দায় ফেলা কয়েকটা বেঞ্চে বসে গল্পগুজব করছে বয়স্ক জেলেরা। পালা করে তাল্ডেকে রাম খাওয়াল সে। চার ল্যাটিনো সম্পর্কে এরইমধ্যে জেনেছে জেলেরা। ছোট একটা দ্বীপে আলোর চেয়েও দ্রুত খবর ছড়ায়। বারান্দার নীচে থুথু ফেলে সবচেয়ে বুড়ো জেলে বলল, ‘ওল্ডেকে তুমি নিয়ে যাও, বাপ। তবে টাকাটা নগদ চেয়ে নিতে ভুলো না।’ আরেক প্রৌঢ় বলল, ‘আর সাবধান, বাপ, জোসেফিন ছুঁড়িটা যেন তোমাকে না পায়!’ জোসেফিন ছুঁড়ি মানে দক্ষিণ ক্যারিবিয়ানের শেষপ্রান্তে চলে আসা সাইক্লোন। রেডিওতে বিপদসঙ্কেত প্রচার শুরু হওয়ার আগে থেকেই পাখিল্ডে আচরণ দেখে অভিজ্ঞ জেলেরা বলাবলি করছিল একটা সাইক্লোন আসছে। লেবুর রস মেশানো রামের কাপে চুমুক দিচ্ছে জেলেরা, আর যার যা মনে আসছে বুদ্ধি-পরামর্শ দিচ্ছে। এর মানে হলো, তাল্ডে জলসীমায় মারভেলকে তারা ক্যাটামার‌্যান নিয়ে কাজ করতে দিতে রাজি। তার প্রতি সবাই তারা সন্তুষ্ট, বিশেষ করে নিজের হাতে লেবুর রস দিয়ে রাম খাওয়ানোয়। সবাইকে ধনল্টাদ জানিয়ে আরেক প্রস্থ রাম পরিবেশন করল মারভেল, তারপর ওল্ডে কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিকারা’স বার-এ ফিরে এল সে, আড়াল করা টেরেস থেকে রডরির উদ্দেশে মাথা ঝাঁকাল। আসছে সাইক্লোন ১৭ টেরেসে বেরিয়ে এল রডরি, তাকে নিয়ে নীচে নামল মারভেল, পামগাছের ভিতর দিয়ে নিঃশব্দে সৈকত ও গ্রাসিয়াসের দিকে এগোচ্ছে। এই নীরবতার পিছনে তার একটা উদ্দেশঞ্জাছে, রডরিরও অপেক্ষা করতে আপত্তি নেই। মারভেল পরখ করতে চাইছে, একটা কুকুর যেমন আরেকটা কুকুরের গন্ধ শুঁকে পরখ করে। ছোট কুকুর চেঁচিয়ে পাড়া মাথায় তোলে, বড়টা নিজ বুদ্ধি নিজের মাথাতেই রাখে। ক্যাটামার‌্যানের কাছে পৌঁছে লোকটার দক্ষতা দেখার সুযোগ হলো মারভেলের, বুঝল চার্টার ফি হিসাবে খুব বেশি টাকা চাওয়া উচিত হবে না। পানির উপর দিয়ে হেঁটে বোটের কাছে চলে এল মারভেল, বো ধরে অপেক্ষা করছে। কিছু বলতে হয়নি, এরইমধ্যে জুতো-মোজা খুলে ফেলেছে রডরি, এই মুহূর্তে পরনের ট্রাউজার গুটিয়ে হাঁটুর কাছে তুলছে। ফোরমাস্ট-এর অবলম্বনটা যত উঁচুতে পারা যায় দু’হাতে শক্ত করে ধরল সে, তারপর ঠিক একটা ডলফিনের মত সাবলীল ভঙ্গিতে লাফ দিয়ে পানি থেকে ফরওয়ার্ড হাল বিম-এ তুলে নিল নিজেকে। বোটে বুড়ো এক লোককে পাহারায় রেখে গিয়েছিল মারভেল। ককপিটের ছায়ায় নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে সে। ধনল্টাত্থ একটা ডলার দিয়ে বিদায় করা হলো তাকে। তারপর একপাশে সরে স্ফাড়িয়ে রডরিকে সেলুনে ঢোকার সুযোগ করে দিল মারভেল: ‘মি কাসা এস্ সু কাসা, সিনর।’ অর্থাৎ: আমার বাড়ি আপনারও বাড়ি। রডরির মুখের ক্ষণস্থায়ী হাসি মারভেলকে মিথ্যুক বলল, তবে ঘৃণার সঙ্গে নয়। জবাবে নিজের ঠোঁটে নীরব হাসি ঝোলাল মারভেল। ‘সেজনেঞ্জবশ্যই আপনাকে কিছু পয়সা দিতে হবে, আর আয়োজনটা মাত্র দিন কয়েকের জন্যে, তাই না?’ মৃদু শব্দে হেসে উঠল রডরি। ‘সুযোগ-সুবিধে কী আছে আমাকে দেখতে হবে।’ ১৮ মাসুল্ডানা-৩৬৬ ‘উইথ পে−জার।’ প্রচুর সময় নিল মোটাসোটা লোকটা। মারভেল আশাও করছে তা-ই। ককপিটে অপেক্ষা করার সময় দুই জার্মান তরুণের সাঁতার প্রতিযোগিতা দেখছে সে, রিফ থেকে সেইলবোর্ড-এ পৌঁছাচ্ছে ওরা। আধ ঘণ্টা পর ফিরল রডরি, মেইন কম্প্যানিয়ানওয়ের পোর্টসাইডে ফেলা চার্ট টেবিলের খানিক উপরের একটা তাকে সাজিয়ে রাখা নেভিগেশন ইকুইপমেন্টগুলো চোখের ইঙ্গিতে দেখাল। ‘প্রচুর ইলেকট্রনিক্স, সিনর।’ ‘খেলনা,’ বলল মারভেল। ‘ক্রিস্টোফার কলম্বাস শুধু একটা সেক্সটান্ট ও লাইনের মাথায় আটকানো একটুকরো সীসার সাহাযেঞ্জামেরিকা আবিষ্কার করেছিলেন।’ ‘আমেরিকা মস্ত একটা টার্গেট ছিল।’ মারভেল বলল, ‘তা ঠিক।’ অপেক্ষা করছে। ‘আপনার খেলনা দিয়ে, ক্যাপিটানো মারভেল, টার্গেটের কত কাছে আপনি পৌঁছাতে পারবেন?’ ‘রাত হোক বা দিন, যে-কোনও টার্গেটের একশো ফুটের মধ্যে।’ ‘ভাল খেলনা।’ ‘দামটাও সেরকম।’ আবার সেই ক্ষণস্থায়ী হাসি। ‘তা হলে আসুন টাকা-পয়সার কথাটা সেরে ফেলি, ক্যাপিটানো।’ ব্যারোমিটারে টোকা দিল মারভেল। ২৯.৯-এ স্থির হয়ে থাকল কাঁটা, একহাজার চোদ্দ মিলিবার। ‘মার্কিন ডলার। প্রতিদিন ষ্ণে হাজার, সব টাকা নগজ্ঝেগ্রিম দিতে হবে,’ বলল সে। ‘কোনও রসিদ দেয়া যাবে না। যদি মাছ খেতে আপত্তি না থাকে, খানাপিনার সব খরচ আমার।’ কুমিরের চামড়া দিয়ে তৈরি মানিব্যাগ বের করল রডরি। হাসি পেলেও হাসল না মারভেল। তবে খেয়াল করল মানিব্যাগে ক্রেডিট আসছে সাইক্লোন ১৯ কার্ড নেই, ছেলেমেয়েল্ডে কোনও ফটোও দেখা যাচ্ছে না। পাঁচশো ডলারের নয়টা কড়কড়ে নোট বের করে তার দিকে বাড়িয়ে দিল রডরি। ‘গ্রাসিয়াস, সিনর,’ বলল মারভেল। নোটগুলো ভাঁজ করে পকেটে ঢোকাল সে। ‘আমরা কাল বোটে উঠব। বেলা দুটোয়।’ ডান হাতটা বাড়িয়ে দিল রডরি। ঘনঘন ঝাঁকি দিয়ে করমর্দন করল ওরা। মারভেল অবশ্য খুব একটা খুশি নয়। কোনও রকম ল্ডদাম না করে এভাবে কি কেউ বোট ভাড়া করে? ‘তবে একটা শর্ত,’ বলল সে। ‘দক্ষিণে একটা সাইক্লোন রয়েছে। ওয়েদার অফিস বলছে, এদিকে আসবে না, আমরা নিরাপদ। তবে ওটা যদি সামান্য উত্তরে ঘুরে যায়, সঙ্গে সঙ্গে আশ্রয়ের খোঁজে ছুটব আমরা।’ সাগরের সারফেসে উপুড় হয়ে শুয়ে একটা গ্রেট ব্যারাকুডাকে দেখছে মারভেল। গায়ে সুতি টি-শার্ট থাকলেও পিঠে রোল্ডে আঁচ পাচ্ছে সে। সেফটি অফ করা স্পিয়ার গানটা আলতো করে ধরে আছে, মাছটার দিকে মুখ করে থাকার জন্য ফ্লিপার পরা পা দুটো মাঝেমধ্যেই নাড়াতে হচ্ছে তাকে। মস্ত বড় একটা ব্যারাকুডা, লম্বায় ছয়ফুটের কম নয়, ওজন হবে ত্রিশ থেকে চলি−শ পাউন্ড। শরীরের দু’-পাশ গানমেটাল রঙের। বড় আকারের নিষ্পলক চোখ। গাঢ় চেরা দাগের মত মুখ। ধারালো স্ফাতগুলো সামানল্টাঁকা। একটা কিলিং মেশিন। মারভেলের ধারণা, হাঙরের চেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক মাছ এই ব্যারাকুডা। হাঙরগুলো রিফ-এর বাইরে থাকে, অথচ এরা অনায়াসে চলে আসে রিফের এপারেও। মারভেল জানে, পারস্য উপসাগরে প্রবাল পাহাড়ে স্ফাড়িয়ে মাছ ধরার সময় বেশ ক’জন আরব ২০ মাসুল্ডানা-৩৬৬ জেলের পায়ের গোছা কেটে নিয়ে গেছে ব্যারাকুডা Ñ পানি ছিল হাঁটুরও খানিক নীচে। চার্টার পার্টিকে নিয়ে মাছ ধরতে নেমেছিল ও সাগরে। হঠাৎ যমদূতের মত হিংস্র মাছটা কোত্থেকে এসে হাজির হতেই জলদি করে ক্যাটামার‌্যানে উঠে পড়তে বলেছে ওল্ডেকে মারভেল। লোকগুলো রওনা হয়ে যেতেই ব্যারাকুডা ও তাল্ডে মাঝখানে পজিশন নিয়েছে সে। তিনদিন ধরে লোকগুলোকে দেখছে, বুঝে নিয়েছে, অন্তত পানিতে কোনও রকম ঝুঁকি নেওয়ার ইচ্ছে নেই ওল্ডে কারও। সবচেয়ে ভাল সময় কাটে তাল্ডে ককপিটের সামনে, চাঁদোয়ার নীচে; ওখানে বসে বরফ ত্থেয়া বালতি থেকে তুলে বিয়ার ও প্রকৃতির সুধা পান করে। তবে চার্টার পার্টি হিসাবে মন্দ নয় চার ল্যাটিনো। সমবায়ীল্ডে জেটি থেকে গ্রাসিয়াসে চড়ার সময় জুতো খোলার কথা বলতে হয়নি তাল্ডেকে, তিনদিনে যতবার সৈকত থেকে বোটে ফিরেছে একবারও পায়ের বালি ধুতে ভুল করেনি কেউ। ধৈর্য ধরে লেকচার শুনেছে মারভেলের, শিখে নিয়েছে মেরিন টয়লেট কীভাবে বল্টহার করতে হয়। সবচেয়ে বড় কথা, ক্যাটামার‌্যানে ভ্রমণ করা তো দূরের কথা, এর আগে কেউ তারা কোনও বোটেই নাকি চড়েনি। তবে বেশিরভাগ মানুষের মত তাল্ডেও শেখার বিশেষ আগ্রহ নেই বললেই চলে। মারভেলও অবশ্য জরুরি বিষয় ছাড়া আর কোনও জ্ঞান èোর চেষ্টা করেনি। যেন মারভেল তাকিয়ে আছে বুঝতে পেরেই তাকে ঘিরে দু’বার চক্কর দিল গ্রেট ব্যারাকুডা। মাঝে-মধ্যে স্থির হয়ে পানিতে ঝুলে থাকছে, তখন এমনকী কোনও ফিনের ডগা পর্যন্ত নাড়ছে না। তবে ক্রমে মারভেলের কাছে সরে আসছে ওটা, প্রতিবার চক্কর ত্থেয়ার সময় একটু একটু করে। ব্যারাকুডার ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিছু বলা আসছে সাইক্লোন ২১ না গেলেও, এটা তার উপর হামলা করবে কি না সন্দেহ আছে মারভেলের। বড় আকৃতির ব্যারাকুডা জঙ্গলের হিংস্র বাঘের সমতুল্য। পানির নীচে কোনও শত্র“ বা প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় ওগুলোর ভয়-ডর বলে কিচ্ছু নেই। সে কি শিকার, না শিকারী? ভাবছে মারভেল, মাছটা হামলা করল, সে-ও ওটার গায়ে স্পিয়ার লাগাতে পারল না, এরকম পরিস্থিতিতে প্রাণ নিয়ে পানি থেকে ওঠার সম্ভাবনা শূন্য। এইট-ব্যান্ড স্পিয়ার গান লোড করতে একজন জেলের প্রচুর সময় লাগে, ফলে একটার বেশি ছোঁড়ার সুযোগ পাওয়া যায় না। আর মাছটা যদি পেট লক্ষ্য করে হামলা চালায়, ধরে নিতে হবে ভবলীলা এখানেই সাঙ্গ হতে যাচ্ছে। আরও কাছে চলে এল দ্য গ্রেট ব্যারাকুডা। মারভেল জানে, ফায়ার করা মাত্র সামনের দিকে ছুটে আসবে মাছটা, তাই চোয়ালের নীচের দিকটায় লক্ষ্যস্থির করল সে। তারপর চাপ দিল ট্রিগারে। স্পিয়ারগানটা জোরালো একটা ধাক্কা দিল তার বুকের ডান পাশে ও কাঁধে। প্রথম এক মুহূর্ত স্পিয়ারের ছেড়ে যাওয়া বুদ্বুল্ডে মিছিলের ভিতর দিয়ে কিছুই দেখতে পেল না ও। তারপর দেখল স্পিয়ারটা গেঁথেছে চোয়ালের শেষ প্রান্তে। লাফ দিয়ে অনেক উপরে উঠল মাছটা, চোয়াল খুলছে ও বন্ধ হচ্ছে, শরীর ধনুকের মত এত বেশি বেঁকে যাচ্ছে যে মারভেলের ভয় হলো ওটার শিরস্ফাড়া না মট করে ভেঙে যায়। মাছটা লাফ দিতে শুরু করায় টান অনুভব করল সে, পানি থেকে শূন্যে উঠে পড়ল বুক। স্পিয়ার ও মাছের গায়ে লেগে ঝিকিয়ে উঠল রোদ। চার-পাঁচটা লাফ দিয়েই মারা গেল ব্যারাকুডা। নিকারার স্ত্রী ব্যারাকুডা কারি খুব ভাল রাঁধে। আর কিছু না হোক, গলদা চিংড়ির বদলে নতুন কিছু ত্থেয়া যাবে মুখে। ২২ মাসুল্ডানা-৩৬৬ সাঁতরে ক্যাটামার‌্যানে ফিরছে মারভেল, টেনে আনছে মাছটাকে। গানটা পাবলো টিকালা-র হাতে ধরিয়ে দিল সে, ল্যাটিনোল্ডে মধ্যে সেই সবচেয়ে লম্বা, যাকে লিডার বলে মনে হয়েছিল তার। লাইন টেনে মাছটাকে বোটে তুলল টিকালা। ল্যাটিনোল্ডে আবার পানিতে ফিরে আসতে বলল মারভেল, কিন্তু তারা তেমন উৎসাহ দেখাল না। ‘সেক্ষেত্রে, আপনারা যদি কিছু মনে না করেন, ডিনারের জনঞ্জামি কয়েকটা মাছ ধরি।’ আরও প্রায় ঘণ্টাখানেক পানিতে থাকল মারভেল। রিফ যেখানে ভাঙা তার কিনারায় ডুব দিয়ে রেড স্ন্যাপার ধরছে। ফাঁকটা দিয়ে প্রচুর বড় মাছকে খোলা সাগরে বেরিয়ে যেতে দেখল সে। ডাইভ ত্থেয়ার ফাঁকে চার্টার পার্টিকে নিয়ে চিন্তা করছে মারভেল। পুরো তিনদিন রিফ এরিয়ার চারপাশে সময় কাটিয়েছে তারা, বসবাসযোগ্য প্রতিটি কি-র ফটো তুলেছে সম্ভাব্য সবগুলো কোণ থেকে, ব্যাঙ্কিং সেক্টরের আমলাল্ডে একজন খসখস করে কী সব লিখেছে একটা লইয়ার্স প্যাডে। দুটোর বেশি বিয়ার খায়নি তারা কেউ, ভুলেও গলা চড়ায়নি, প্রতি সন্ধ্যায় মারভেলের গ্রিল করা মাছ খাওয়ার সময় প্রশংসা করেছে অকুণ্ঠচিত্তে। আজ লাঞ্চের সময় তাকে জানানো হয়েছে, তাল্ডে রিসার্চ শেষ হয়েছে, তবে হাতে একটা দিন বেশি থাকায় সময়টা উপভোগ করছে তারা। তারপর পাঁচশো ডলারের আরও তিনটে কড়কড়ে নোট বের করে মারভেলের দিকে বাড়িয়ে দিয়েছে রডরি। নিতে রাজি হয়নি মারভেল, বলেছে বোটে আর কেউ থাকুক বা না থাকুক বিকেলটা রিফেই কাটাত Ñ তাল্ডে সঙ্গ পেয়ে খুশি সে। খুশি কি খুশি না, সেটা কোনও প্রসঙ্গ নয়। প্রসঙ্গ হলো, কাজ যদি সত্যি শেষ হয়ে গিয়ে থাকে, লোকগুলো এখনও তা হলে অপেক্ষা করছে কী কারণে? আসছে সাইক্লোন ২৩ মারভেলের ধারণা, চার্টার শুরু হওয়ার পর থেকেই অপেক্ষা করছে তারা। কীসের জন্য? দশ-বারোটা স্ন্যাপার ধরে নেটে ভরল মারভেল, ধীর ভঙ্গিতে সাঁতার কেটে গ্রাসিয়াসে ফিরে আসছে। সাগর এত শান্ত যে পালিশ করা চামড়ার মত চকচক করছে সারফেস। পোর্টসাইড রাডার-এ নেট বাঁধল মারভেল। স্পিয়ার গানটা নেওয়ার জন্য হাত বাড়াল মিগু রডরি। ওয়েটবেল্ট সহ সেটা তার হাতে ধরিয়ে দিল সে, ফ্লিপার আর মাস্ক খুলে ট্যাফরেইল-এর ওপারে ফেলল, তারপর উঠে পড়ল ককপিটে। মাথা ও গায়ের পানি মুছল মারভেল, আফটার লকারে ফিশিং গিয়ার রেখে আইসবক্স থেকে একটা ঠাণ্ডা বিয়ার নিল। পোর্ট ও স্টারবোর্ড ককপিট সিটে বসে আমলা দুজন চোখ বুজে ঝিমাচ্ছে। দুটো ডেক চেয়ারের একটায় আধ শোয়া ভঙ্গিতে কাত হয়ে আছে পাবলো টিকালা। কম্প্যানিয়নওয়ের দিকে পিঠ দিয়ে উল্টো করা একটা বালতিতে বসেছে রডরি। তার হাতে একটা পিস্তল বেরিয়ে এসেছে। একবার চোখ বুলিয়েই চিনতে পারল মারভেল, নাইনএমএম বেরেটা টেন-শট সেমি-অটোমেটিক। অস্ত্রটা তার দিকে তাক করা নয়। আসলে তাক করবার কোনও প্রয়োজনও নেই। মারভেল মনে মনে যেমন আন্দাজ করেছিল, রডরির তর্জনীর দাগ পিস্তলের ট্রিগার ও ট্রিগার গার্ড-এর কিনারার সঙ্গে হুবহু মিলে যাচ্ছে। ফায়ারিং রেঞ্জে ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্র্যাকটিস করার ফলে ওই দাগ তৈরি হয়েছে। এই মুহূর্তে তার ঠোঁটে ক্ষীণ একটু হাসি লেগে রয়েছে, যেন এ-ধরনের একটা দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে বলে খুবই বিব্রত বোধ করছে সে। ‘বিয়ার চলবে?’ একটা ঢোক গিলে জিজ্ঞেস করল মারভেল। ২৪ মাসুল্ডানা-৩৬৬ পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে ভয় পেয়েছে সে, অবাকও কম হয়নি। ‘ঠিক এখনই নয়,’ জবাব দিল রডরি Ñ কথা বলছে একজন প্রফেশনাল, এর মধেল্ট্যক্তিগত কোনও শত্র“তা নেই। ট্যাফরেইল-এ বসল মারভেল। হাতের বিয়ার ক্যানে চুমুক ত্থেয়ার আগে টিকালার উদ্দেশে সেটা একটু উঁচু করে বলল, ‘স্যালু।’ জোর করে একটু হাসল সে। ‘জানতে পারি কি ব্যাপার? হাতে অস্ত্র কেন?’ ‘প্রয়োজন হতে পারে,’ বলল রডরি। নার্ভাস হাসি দেখা গেল মারভেলের ঠোঁটে। ‘মানে?’ ও ভাবছে, বোট চালানোয় ওল্ডে যে অভিজ্ঞতা আমি গুলি খেলে বাকি জীবন কাউকে আর সাগর থেকে বাড়ি ফিরতে হবে না। সদা প্রস্তুত রুমালটা নাকে চেপে ধরল টিকালা। ‘আমরা আপনার কাছ থেকে কিছু সার্ভিস চাই।’ ‘তা হলে পিস্তলের বদলে ডলার তাক করুন,’ বলল মারভেল। ‘যত বেশি পরিমাণে তাক করবেন, ততই ভাল হবে আমার সার্ভিস।’ সকৌতুক হাসির আওয়াজ রুমালে চাপা দিয়ে টিকালা বলল, ‘পিস্তলটা শুধু আপনাকে বোঝাবার জন্যে যে আমরা সিরিয়াস।’ ‘মনে করুন আমি বুঝে গেছি,’ বলল মারভেল, দেখল এক ঝাঁক সি-গাল ডানা ঝাপটে মেইনল্যান্ডের দিকে উড়ে যাচ্ছে। মনে পড়ল, রিফ-এর ফাঁক গলে বড় আকৃতির মাছগুলোকে খোলা সাগরে বেরিয়ে যেতে দেখেছে খানিক আগে। জিভের ডগা বের করল, যেন ঠোঁট থেকে বিয়ার চাটছে, আসলে বাতাসের স্পর্শ নিতে চাইছে সে। কিন্তু প্রকৃতি যেন নিঃশ্বাস ফেলতেও ভুলে গেছে... ‘আমরা একটা জাহাজের সঙ্গে দেখা করতে চাই,’ বলল পাবলো টিকালা। ‘সেই রকমই একটা সন্দেহ উঁকি দিয়েছে আমার মনে। রডরি আসছে সাইক্লোন ২৫ যখন বোটে উঠে লোরান’স রেইডার নেভিগেশনাল ইকুইপমেন্ট কাজ করে কি না চেক করে দেখলেন, তখনই। আপনারা চলে যাচ্ছেন, নাকি জাহাজ থেকে কাউকে রিসিভ করবেন?’ নাক টানল টিকালা। ‘রিসিভ করব। বিশজন লোক।’ ষ্ণে টন। ‘লাগেজ খুব বেশি?’ ‘দু’হাজার একশো কিলো।’ মারভেল বলল, ‘বাতাস বাড়ছে, লোক এটাতেই নেয়া যাবে, কিন্তু কার্গো যোডিয়াকে তুলতে হবে।’ বিশ ফুটি ইনফ্লেইটেবল অনায়াসে ভারটা বইতে পারবে। রুমালটা সাবধানে চার ভাঁজ করে নিজের চেয়ারের পাশে ডেকের উপর রাখল টিকালা। হাত দুটোকে পরস্পরের সঙ্গে সমান্তরাল করে দুই হাঁটুর উপর ফিরিয়ে নিল, লালচে-বেগুনি চোখের পাতার ভিতর দিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে ওগুলোকে Ñ যেন নিঃসন্দেহ হতে চাইছে ওগুলো ঠিক নিজের কি না, ভাবল মারভেল। তার চোখের পাতা মুহূর্তের জন্য উঁচু হলো। মারভেল অনুভব করল, নিজের হাতের মত করেই তাকে পরীক্ষা করছে টিকালা Ñ লোকটার কাছে ও স্রেফ একটা হাতিয়ার, তার বেশি কিছু না, কিছুক্ষণের জন্য কাজ দেবে, কাজ হয়ে গেলে বিনা দ্বিধায় ফেলে দিতে হবে। এটা মৃত্যুদণ্ড, নিশ্চিতভাবে জানে মারভেল, দণ্ডটা এমন একজন দিচ্ছে যে বুদ্ধিমান, এবং মানসিক রোগী। একজন খুনি। খুনিটা এখন মারভেলের ব্যাখ্যা শোনার অপেক্ষায় আছে। ‘ক্যাটামার‌্যান তৈরি করা হয় মাল টানার জন্যে নয়, স্পিড পাবার জন্যে,’ বলল মারভেল। আসলেও এটা বোঝা বহনের উপযোগী নয়। দমকা হাওয়ার ধাক্কায় যে-কোনও সাধারণ ইয়ট কাত হয়ে যাবে, ফলে ওটার পাল থেকে বেরিয়ে যাবে অনেকটা বাতাস। ক্যাটামার‌্যানের বেলায় ২৬ মাসুল্ডানা-৩৬৬ ব্যাপারটা উল্টো, বাতাস পাওয়ামাত্র দে ছুট, সেই সঙ্গে দমকার তীব্রতাও কমে যাবে। ‘বেশি বোঝা তোলা হলে জোরালো বাতাসের প্রথম ধাক্কাটাই ভেঙে নিয়ে যাবে মাস্তুল,’ সাবধান করার ভঙ্গিতে বলল মারভেল। ‘আমরা যোডিয়াক টো করব, ম্যাচেটি হাতে রডরিকে বসিয়ে রাখব ট্যাফরেইল-এ। দমকা বাতাস লাগা মাত্র ঘ্যাচ করে টো-লাইন কেটে দেবে সে।’ কল্পনায় ছবিটা দেখতে পেয়ে হেসে উঠল রডরি। ‘কী হলো ব্যাপারটা?’ ঠাণ্ডা সুরে জিজ্ঞেস করল টিকালা। ‘আমরা কি আমাল্ডে কার্গো খোয়ালাম?’ মাথা নাড়ল মারভেল। বলল, ‘মারলিন রড-এর সঙ্গে এক হাজার মিটার নাইলন ফিশিং লাইন জড়ানো আছে, ব্রেকিং স্ট্রেইন তিনশো কিলো। ফিরে এসে যোডিয়াক নিয়ে যাব আবার।’ ‘এতই সহজ, ক্যাপিটানো?’ বিয়ার ক্যানটা উঁচু করল মারভেল। ‘শুধু সহজ নয়, এতে খরচও অনেক কম পড়বে আপনাল্ডে।’ তিন বাতাস নেই বললেই চলে। সাগরের সারফেস নড়ছে কি না বোঝা যাচ্ছে না। প্রায় ঘণ্টাখানেক হলো আকাশে কোনও পাখি দেখছে না মারভেল। ককপিটের পোর্টসাইডে বসে রসুন, আদা, ব−্যাক পেপারকর্ন, লবণ ও অলিভ অয়েল মিশিয়ে একটা সুস্বাদু পেস্ট তৈরি করছে সে। আসছে সাইক্লোন ২৭ ককপিটের পাশে একজায়গায় এরই মধেল্টারবিকিউ-এর আয়োজন সম্পন্ন করা হয়েছে। আমলাল্ডে একজন কেটে-বেছে-ধুয়ে পরিষ্কার করে রেখেছে মাছগুলো। মারভেলের ফিশিং নাইফ নিজের কাছে রেখে দিয়েছে রডরি। এই মুহূর্তে দুই আমলা আর টিকালা নীচে রয়েছে। সেলুনের মাথায় বসে মারভেলের উপর সতর্ক দৃষ্টি রাখছে রডরি। ব্যস্ত হওয়ার কিছু নেই। রিফ ছাড়িয়ে ছয় মাইল দূরে, রাত একটায় রন্দিভু। ধরা যাক ক্যাটামার‌্যানে মানুষ আর কার্গো তুলতে মিনিট বিশেক লাগবে, দুই ঘণ্টা লাগবে মেইনল্যান্ডে পৌঁছাতে, নদীর উজান ধরে এগিয়ে নামবার জায়গা পেতে লাগবে আরও আধ ঘণ্টা। কাজেই তাড়া নেই। কোন্ নদী তা এখনও ওর কাছে গোপন রাখা হলেও, মারভেল নিশ্চিত যে সেটা বেলপ্যান নদীর উত্তর শাখাটাই হবে, যেখানে বাঁকটা ওল্ডেকে রোড ব্রিজ থেকে আড়াল করে রাখবে। ওখানেই মালপত্র নামানো হবে। সন্দেহ নেই, প্রয়োজন ফুরিয়ে যাওয়ায় ওখানেই তার মাথার পিছনে গুলি করবে রডরি। আন›ত্থ পাবে না, আবার অপছ›ত্থ করবে না। এটা স্রেফ একটা কাজ, অফিসে যাওয়ার মত। মারভেল ভাবল, ব্যারোমিটারটা চেক করা ল্ডকার। কিন্তু তা করতে হলে প্রথমে রডরির অনুমতি নিতে হবে। আবার অনুমতি চাইতে গেলে ল্যাটিনো লোকটার মনে সন্দেহ জাগবে। তবে কী ধেয়ে আসছে জানে সে। গুরুত্বপূর্ণ হলো, কখন। তাকে যারা সাহায্য করতে চেয়েছে Ñ জুডিয়াপ্পা এসকুইটিলা বা একটা এজেন্সির লোকজন Ñ বন্ধু হিসাবে তাল্ডে চেয়ে অনেক বেশি দ্রুত নাগালের মধ্যে পাওয়া যাবে জোসেফিন ছুঁড়িটাকে। কয়েকটা স্ন্যাপারের ভিতরে-বাইরে আদা-রসুনের পেস্ট মাখিয়ে গ্রিলে ফেলল মারভেল, গলা চড়িয়ে বাকি ল্যাটিনোল্ডে ডেকে গ্যালি ২৮ মাসুল্ডানা-৩৬৬ থেকে পে−ট আর কাটলারি নিয়ে আসতে বলল। ডিনার খাওয়ার সময় টিকালাকে একটা স্ন্যাপারের মেরুদণ্ডে ছুরি চালাতে দেখল মারভেল Ñ ধৈর্য ধরে, গুছিয়ে, পরিচ্ছন্ন ও নিখুঁতভাবে কাঁটা থেকে আলাদা করছে মাংস। টিকালা এমন একজন মানুষ ভুল-ত্র“টি যার কাছে ক্ষমার অযোগ্য, তা সে নিজের হোক কিংবা আর কারও। হঠাৎ করেই মারভেল উপলব্ধি করল, অস্তিত্ব রক্ষার জন্য তার ভান করা ল্ডকার যে টিকালার ত্থেয়া মৃত্যুদণ্ড সম্পর্কে কিছুই জানে না সে। সন্দেহ নেই তার উপর নজর রাখা হচ্ছে, এখন সে যদি নিজেকে অজ্ঞ প্রমাণ করতে পারে তা হলে হয়তো ওল্ডে সতর্কতায় মাঝে-মধ্যে দু’এক মুহূর্তের জন্য হলেও ঢিল পড়বার সম্ভাবনা আছে। বিয়ার নেওয়ার জনঞ্জাইস বক্সের দিকে হাত বাড়াল মারভেল, স্বাভাবিক কৌতূহল নিয়ে জানতে চাইল, ‘ওল্ডেকে আপনারা পে−নে করে আনলেন না কেন?’ জবাবটা জানা আছে তার। পে−নে করে ড্রাগ পাঠিয়ে দেখেছে ল্যাটিনোরা, ঝুঁকির মাত্রা খুব বেশি হয়ে যায়। তা ছাড়া, ড্রাগ পাচার করার অপারেশন দ্রুত সেরে ফেলতে হয় Ñ ল্যান্ড করো, ফুয়েল ভরো, কেউ দেখে ফেলবার আগেই আবার ডানা মেলে ফিরে যাও। কিন্তু এবার পাঠানো হচ্ছে মানুষ, এরা এখানে দীর্ঘমেয়াজ্ঝিপারেশনে থাকবে, কাজেই নিñিদ্র গোপনীয়তা একান্ত প্রয়োজন। তার দিকে তাকাল টিকালা, লাল ও ফোলা চোখের পাতা মুহূর্তের জন্য উপরে উঠল। রুমালটা বেরিয়ে এল, ঘষা খেল নাকে। তারপর অতি সামান্য একটু নড়ে উঠল আঙুলগুলো। ‘আমরা সাগর পছন্দ করি, সিনর।’ কিন্তু সাগর সম্পর্কে কোনও অভিজ্ঞতা নেই, ভাবল মারভেল। এটা তাল্ডে একটা ভুল, অচেনা এলাকায় ঢুকে পড়া Ñ তার পরিচিত আসছে সাইক্লোন ২৯ এলাকায়। সেজন্যই প্রাণ বাঁচানোর সুযোগ পাওয়া যাবে বলে আশা করছে সে। আবার বাতাস বইতে শুরু করেছে। দক্ষিণ, অর্থাৎ ওল্ডে পিছনদিক থেকে আসছে। এখনও তত জোরালো নয়, তবে গতি একটু একটু করে বাড়ছে, নোঙর ফেলা গ্রাসিয়াসকে কিছ্টুা ভাসিয়ে নিয়ে গিয়ে নাকটাকে আরেকদিকে ঘুরিয়ে দিয়েছে। রিফ-এ আছড়ে পড়া ঢেউগুলোর আওয়াজও ধীরে ধীরে বদলে ক্রমশ কর্কশ ও গম্ভীর হয়ে উঠছে। মারভেল বলল, ‘পালগুলোকে এখনই আমার রেডি করে রাখা ল্ডকার।’ কালো আকাশে না আছে তারা, না আছে মেঘ। নীচে সাগরও একইরকম কালো। বাতাসের মতিগতি বোঝা ভার। প্রতি আট-দশ মিনিট পরপর অন্ধকার থেকে একটা করে বড় ঢেউ ছুটে আসছে। এই বড় ঢেউগুলো এলেই তেকোনা সিল্ক পাল থেকে মুহূর্তের জন্য উথলে উঠছে বাতাস, সেই সঙ্গে ঝট করে আবার ফুলে উঠছে ফোরসেইল। কম্পাসের দিকে মারভেল প্রায় তাকাচ্ছেই না। চার্ট চেক করারও কোনও প্রয়োজন বোধ করছে না সে। নোঙর তোলার আগে বোতাম টিপে লোরান’স কমপিউটারকে রন্দিভু জানিয়ে দিয়েছে, ফলে রেডিও নেভিগেশন সিস্টেম গ্রাসিয়াসকে যে পজিশন দিয়েছে সেটা ওই রন্দিভুর একশো মিটারের মধ্যে পড়বে। অস্বস্তিকর হলেও, সহজেই বোট চালাতে পারছে মারভেল। অস্বস্তির কারণ প্রকৃতি, অন্ধকার; সামনে কী আছে বোঝার কোনও উপায় নেই। তা ছাড়া, আবহাওয়ার রিপোর্ট যা-ই হোক, ব্যারোমিটারের কাঁটা সেই ২৯.৯-এ স্থির হয়ে আছে। ওরা রওনা হওয়ার আগে মারভেলের অস্বস্তি টের পেয়ে গিয়েছিল ৩০ মাসুল্ডানা-৩৬৬ মিগু রডরি। ‘ওটা আপনি অনুভব করতে পারছেন?’ ‘কোন্টা?’ জানতে চেয়েছে মারভেল, ভান করে সুবিধে পাওয়ার ইচ্ছে। ‘সাইক্লোন,’ বলল রডরি। ‘প্রায় চারঘণ্টা হলো একবারও ব্যারোমিটারের দিকে তাকাননি আপনি।’ কথা না বলে শ্রাগ করল মারভেল। সশস্ত্র লোকটা নিঃশব্দে হাসল, সেলুন কম্প্যানিয়নওয়ের আলো লেগে ঝিক করে উঠল তার সাদা স্ফাত। ‘আমি আপনাকে পছন্দ করি, সিনর মারভেল। যত্থি পরিস্থিতিটা তাতে বদলাচ্ছে না।’ ‘না, বদলাচ্ছে না,’ তার সঙ্গে একমত হলো মারভেল। মারভেলের হিসাব মত রন্দিভুতে পৌঁছাতে আর যখন আধ ঘণ্টা বাকি, ডেকে উঠে এসে পাবলো টিকালা জানতে চাইল, ‘সিনর ক্যাপিটানো, আপনার সঙ্গে হালকা রশি আছে?’ তার হাতে একটা পিস্তল বেরিয়ে এসেছে। ‘কতটা হালকা?’ ‘আপনাকে বাঁধার উপযোগী যথেষ্ট শক্ত, কিন্তু হালকা।’ পাপড়িসহ পাতা উঁচু হলো। হিমশীতল চোখ। ‘একবার ভেবে দেখুন তো আপনি সাগরে হারিয়ে গেলে আমাল্ডে জন্যে সেটা কীরকম দুঃখজনক হবে।’ চোখ-মুখ গরম করে মারভেল জানতে চাইল, ‘মানে?’ ‘মানে? এই সামান্য সাবধানতা অবলম্বন,’ বলল টিকালা। ‘আপনি তো আর আমাল্ডে ভাই-বেরাল্ড বা বন্ধু নন, সিনর ক্যাপিটানো, তাই আপনাকে ঠিক বিশ্বাস করতে পারছি না।’ পঞ্চাশ ফুট লম্বা এক প্রস্থ রশি আসলে আগেই পেয়েছে তারা। অস্ত্র তাক করে মারভেলকে পঙ্গু বানিয়ে রাখল টিকালা, রশি নিয়ে এগিয়ে এল রডরি। ‘কী পেয়েছেন আপনারা আমাকে?’ সতিদ্দকে বাঁধা হবে বুঝতে আসছে সাইক্লোন ৩১ পেরে রেগে উঠল মারভেল। ‘আমার সাহায্য ছাড়া আপনাল্ডে কাজ হবে?’ ‘কে বলল আপনার সাহায্য নেব না আমরা?’ হাসল টিকালা। ‘আপনিই তো আমাল্ডে একমাত্র ভরসা, সিনর ক্যাপিটানো।’ ‘আমাকে বাঁধা হলে আমি বোট চালাব কীভাবে?’ অসহায় আক্রোশে ফুঁসছে মারভেল। ‘আমরা তো আপনার হাত-পা বাঁধছি না, সিনর ক্যাপিটানো। শুধু গলায় রশি পেঁচাব।’ টিকালার হাতের উদ্যত পিস্তলের দিকে চোখ রেখে মারভেল বুঝল, কিছুই করবার নেই তার। পাঁচ মিনিট পর। পঞ্চাশ ফুট লম্বা রশিটা নিরস্ত্র মারভেল এখন তার গলায় পরে আছে। নিজের হাতে গিঁট দিয়েছে রডরি। তার মৃদু হাসি ও শ্রাগ মারভেলকে জানিয়ে দিয়েছে, এটাও ব্যক্তিগত কিছু নয়, স্রেফ কাজের একটা অংশ মাত্র... ‘তোমরা চারজন, আর আমি একা,’ ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলল মারভেল। ‘তারপরও এত ভয় পাচ্ছ আমাকে?’ ‘না,’ চোখের পাতা না তুলেই বলল পাবলো টিকালা, ‘দিয়েগো মারভেলকে হয়তো ভয় পাবার কোনও কারণ নেই। তবে আমাল্ডেকে বলে দেয়া হয়েছে, সিনর ক্যাপিটানো মাসুল্ডানাকে অবশ্যই ভয় পেতে হবে।’ বিস্ময়ের ধাক্কাটা ভিতর ভিতর চমকে দিল রানাকে। ৩২ মাসুল্ডানা-৩৬৬ চার বিসিআই হেডকোয়ার্টার, ঢাকা। ঠিক সকাল নটায় নিজের অফিসে ঢুকেই ডেস্কের উপর ইন- ট্রেতে রাখা এনভেলাপটা দেখল রানা। ভ্রু জোড়া কুঁচকে উঠল ওর, ভাবল, অনেকদিন পর কেউ ওকে চিঠি লিখেছে। চিঠি লেখার চল প্রায় উঠেই যাচ্ছে, এটা তো ই-মেইল ও এসএমএস-এর যুগ। নিজের চেয়ারে বসে পায়ের উপর পা তুলল রানা। এনভেলাপটা হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে, খুঁটিয়ে দেখছে। চিঠিটা পাঠানো হয়েছে বেলপ্যান-এর রাজধানী বেলপ্যান সিটি থেকে রানা এজেন্সির নিউ ইয়র্ক শাখায়। এনভেলাপে প্রেরকের নাম নেই। ঠিকানার জায়গায় লেখা হয়েছে, রানা এজেন্সির নিউ ইয়র্ক শাখার নাম। সেখান থেকে রিডাইরেক্ট করে পাঠানো হয়েছে এখানে, বিসিআই হেডকোয়ার্টার, ঢাকায়। কে লিখল? রাষ্ট্রপতি, নাকি তাঁর সু›ল্ডী নাতনি? বেলপ্যান সম্পর্কে কী জানে স্মরণ করছে রানা। ছোট একটা রাষ্ট্র, মেক্সিকো ও গুয়েতেমালার সঙ্গে সীমান্ত আছে। আয়তন বাইশ হাজার নয়শো পঁয়ষট্টি বর্গ কিলোমিটার। মোট জমিনের আশি ভাগই বনভূমি, লোকসংখ্যা মাত্র আড়াই লাখ। বেলপ্যানে নামেমাত্র সেনাবাহিনী আছে, সব মিলিয়ে একশো বিশজন। রাজধানীতে থাকে পঞ্চাশজন, বিদেশ থেকে রাষ্ট্রীয় অতিথি আসছে সাইক্লোন ৩৩ কেউ এলে গার্ড অভ অনার দেয়। দেশটায় ক্রাইম রেট খুব কম হওয়ায় পুলিশও না থাকারই মত। বেলপ্যানের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট রোকো রামপাম। একটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ে গেল রানার। ভয়ঙ্কর দৃশন্ধা চোখের সামনে ভেসে উঠতে কঠিন হয়ে উঠল চোখ-মুখ। ‘ম্যারিয়েটা,’ আপনমনে ফিসফিস করল রানা, ফিরে গেল দু’বছর আগে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। নিউ ইয়র্ক। ফাইভ স্টার হোটেল মিল্কিওয়ে। রাত দুপুরে নিজের স্যুইটে ফিরছে রানা। চারদিন হলো দেশ থেকে এসেছে ও। ওর এজেন্সির নিউ ইয়র্ক শাখায় বেশ কয়েকটা জটিল কেস জমে আছে, সেগুলোর বিহিত-বল্টস্থা করতে হবে, তারপর নিতে হবে বাৎসরিক আয়-ব্যয়ের হিসাব। এত বেশি কাজের চাপ যে রোজই রাত বারোটার পর ফিরতে হচ্ছে ওকে। এলিভেটর থেকে টপ ফ্লোর, অর্থাৎ আঠারো তলায় নামল রানা। সঙ্গে সঙ্গে খুবই হালকা একটা গন্ধ ঢুকল নাকে। কী হতে পারে বোঝার জনল্টড় করে শ্বাস নিল ও, কিন্তু মিলিয়ে গেছে গন্ধটা, আর পেল না। হলওয়ে-টা বেশি লম্বা নয়, একপাশে দুটো স্যুইট, আরেক পাশে কাঁচ দিয়ে ঘেরা ছোট্ট বাগান সহ দুটো ব্যালকনি। প্রথম ব্যালকনিতে একটা ছোট ডেস্ক আছে, হোটেল সিকিউরিটির একজন সদস্য পাহারায় বসে থাকে ওখানে। গত তিন রাত সশস্ত্র লোকটার স্যালুট পেতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে রানা, আজ না পাওয়ায় একটু সচেতন হয়ে উঠল। ব্যালকনির পাশে পৌঁছে দেখল ডেস্ক খালি, আশপাশেও কেউ নেই। তবে বিচলিত হওয়ার মত কোনও ব্যাপার নয়, ভাবল ও। এই পেন্টহাউস স্যুইটের ভাড়া শুনলে অনেকেরই চোখ কপালে ৩৪ মাসুল্ডানা-৩৬৬ উঠে যাবে; তবে শখ করে নয়, এখানে রানাকে থাকতে হয় নিরাপত্তার কারণে। ওর স্যুইটটা হলওয়ের শেষ প্রান্তে। প্রথম স্যুইটের ল্ডজাকে পাশ কাটাচ্ছে রানা। হঠাৎ অস্পষ্ট, অথচ ভরাট ও মার্জিত একটা কণ্ঠ¯ল্ফ ভেসে এল কোথাও থেকে। বিশুদ্ধ ইংরেজি। ‘নো, ইমপসিবল! আপনারা জোর করে আমাকে দিয়ে সই করাতে পারবেন না...’ কোত্থেকে কে কথা বলছে বুঝে উঠতে পারেনি রানা, তার আগেই ছোট একটা কুকুরের বাচ্চা কেঁউ করে উঠল। ডাক শুনেই বোঝা গেল কোন্ জাতের কুকুর Ñ পিকেনিজ। ভোঁতা শোনালেও এবার বুঝতে অসুবিধে হলো না যে ওর পাশের স্যুইট থেকে বেরিয়েছে ডাকটা। বন্ধ ল্ডজার উপর চোখ, স্ফাড়িয়ে পড়েছে রানা। ফাইভ স্টার হোটেল মিল্কিওয়েতে কুকুর আসে কীভাবে? তবে কুকুরের ডাক নয়, নয় ভরাট কণ্ঠের প্রতিবাদী সুর, এবার রানাকে চমকে দিল পিস্তলের আওয়াজ। পরমুহূর্তে বন্ধ স্যুইটের ভিতর থেকে সেই ভরাট কণ্ঠের অধিকারী ‘মাই লাইকা, ওহ্ গড!’ বলে গুঙিয়ে উঠল। সন্দেহ নেই কারও উপর জুলুম করা হচ্ছে। কিছু একটা করা উচিত। আগেই, গুলির আওয়াজ শোনা মাত্র, শোল্ডার হোলস্টার থেকে নিজের পিস্তলটা বের করেছে রানা। বন্ধ ল্ডজার ওপর নজর রেখে পিছু হটে হলওয়েটা আড়াআড়িভাবে পার হয়ে ব্যালকনিতে চলে এল। ডেস্কে টেলিফোন ছাড়া আর কিছু নেই। রিসিভার তুলে রিসেপশন-এর নম্বরে ডায়াল করল ও, সিকিউরিটিকে ডাকবে। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল রানার। রেকর্ড করা যান্ত্রিক কণ্ঠ¯ল্ফ ভেসে আসছে: ‘কারিগরি ত্র“টির কারণে এই মুহূর্তে সংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে আমরা দুঃখিত।’ এরপর সরাসরি অপারেটরকে ফোন করল রানা। সেই একই আসছে সাইক্লোন ৩৫ অবস্থা। সন্দেহ দানা বাঁধছে রানার মনে। কারও সাহায্য পাওয়া যাবে না, এই অজুহাতে ব্যাপারটা এড়িয়ে যাওয়া যায়, কিন্তু তারপর? ও কি সারারাত ঘুমাতে পারবে? ব্যালকনি থেকে বন্ধ স্যুইটের ল্ডজার পাশে চলে এল রানা। যা ভেবেছে, ভিতর থেকে ধমকের সুর ও ধস্তাধস্তির আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে স্পষ্ট। কী ঘটছে কিছুই জানা নেই, তবে ওর ভয় হলো যে- কোনও মুহূর্তে এখানে একটা খুন-খারাবি ঘটে যেতে পারে। হাতের পিস্তল পিছনে লুকানো, কবাটে নক করল ও। স্যুইটের ভিতরটা এক নিমেষে নীরব হয়ে গেল। আবার নক করল রানা। ‘ইয়েস, সিনর?’ ল্যাটিন উচ্চারণে প্রশ্ন করল কেউ, সম্ভবত কলম্বিয়ান কোনও লোক। ‘সিকিউরিটি অফিসার,’ বলল রানা। ‘ল্ডজাটা খুলুন, পি−জ।’ স্যুইটের ভিতর থেকে ফিসফাস আওয়াজ ভেসে আসছে। রানার সন্দেহ হলো, দুই-তিনজন লোক নিজেল্ডে মধ্যে পরামর্শ করছে। আছে হয়তো আরও বেশি। ল্ডজা খোলার আওয়াজ পেল রানা। কবাট সামান্য ফাঁক করে উঁকি দিল এক লোক। ল্ডজায় চেইন লাগানো আছে, সেটা না খুললে কবাট আরও ফাঁক করা যাবে না। প্রথমেই চোখে পড়ল পানামা হ্যাটটা। টিয়াপাখির মত বাঁকা নাক লোকটার। বেশ লম্বা সে, কমপক্ষে ওর সমান। মুখের তুলনায় বড় লাগছে চোখ দুটোকে, তবে আধবোজা হয়ে আছে ওগুলো। চকচকে সাদা কাপড়ের সুট পরা, কোটের বোতামগুলো লাগানো Ñ একটা পকেট ফুলে আছে দেখে রানা ধরে নিল ওখানে পিস্তল আছে। কলম্বিয়ান, কিংবা মেক্সিকান হবে। শ্বাপল্ডে শীতল দৃষ্টিতে খুঁটিয়ে দেখছে ওকে। লোকটার বোধহয় ঠাণ্ডা লেগেছে, কিংবা অ্যালার্জি হয়েছে। নাক ৩৬ মাসুল্ডানা-৩৬৬ দিয়ে বেরিয়ে আসা পানি রুমাল চেপে মুছছে সে। তার পিছনে সিটিংরুম দেখা যাচ্ছে। দু’একটা উল্টে পড়া চেয়ার, ফুলদানি, অ্যাশট্রে ইত্যাদি তুলে জায়গা মত রাখছে টেকো এক লোক। কামরায় আর কাউকে দেখা যাচ্ছে না। ‘হোটেল সিকিউরিটির অনেককেই চিনি আমরা,’ পানামা হ্যাটটা মাথায় ঠিক মত বসিয়ে নিয়ে বলল লোকটা। ‘আপনাকে আগে কখনও দেখেছি বলে তো মনে হচ্ছে না, সিনর।’ ‘কাকে চেনেন, দু’একজনের নাম বলুন,’ চ্যালেঞ্জ করল রানা। ‘আপনি আমার পরীক্ষা নিতে পারেন না,’ ঠাণ্ডা সুরে বলল লোকটা। চট করে হলওয়ের শেষ মাথাটা একবার দেখে নিল রানা, যেদিকে এলিভেটরটা রয়েছে। চোখ ফিরিয়ে নেওয়ার সময়, সরাসরি না তাকিয়েও, ফায়ার অ্যালার্ম সুইচ-এর অস্তিত্ব যতটা না দেখতে পেল তারচেয়ে বেশি অনুভব করল ও। আসলে জানা ছিল, ল্ডজার ঠিক পাশের দেয়ালে, ফুট সাতেক উপরে আছে ওটা, এই মুহূর্তে মনে পড়ে গেল। ‘পরীক্ষায় ফেল্ করেছেন,’ বলল রানা। ‘ঠিক আছে, চেইন খুলে দিয়ে ল্ডজা থেকে পিছিয়ে যান। আমি ভেতরে ঢুকছি।’ রানার হাতের পিস্তল ইতিমধ্যে সামনে চলে এসেছে। ‘এসবের কি সত্যিই কোনও প্রয়োজন আছে, সিনর?’ শান্ত কণ্ঠে বলল লোকটা, এতটুকু উদ্বিগ্ন নয়। ‘নেই? গুলি হলো কেন?’ ‘পি−জ, সিনর, সবই আমরা ব্যাখ্যা করতে পারব। ব্যাপারটা স্রেফ একটা অ্যাক্সিডেন্ট। তবে ঈশ্বরকে ধনল্টাদ যে মারাত্মক কোনও ক্ষতি হয়ে যায়নি। আমরা এখানে একটা বিজনেস ডিল নিয়ে আলোচনা করছিলাম...’ ‘পথ ছাড়–ন, কী অবস্থা দেখতে দিন আমাকে,’ বলে হাঁটু দিয়ে আসছে সাইক্লোন ৩৭ ল্ডজার গায়ে চাপ দিল রানা, খালি হাতটা সাপের মত দেয়াল বেয়ে উঠে যাচ্ছে অ্যালার্ম সুইচের দিকে। রানার ধারণা, টেলিফোন সুইচবোর্ড ও হোটেলের সিকিউরিটি সিস্টেম আংশিক হলেও অচল করা হয়েছে, কাজেই বাইরে থেকে দ্রুত সাহায্য পাওয়ার বল্টস্থা করতে হবে। এই ফায়ার অ্যালার্ম সুইচ অন করা মাত্র দুই জায়গায় ঘণ্টা বাজবে Ñ কাছাকাছি ফায়ার ব্রিগেড ও পুলিশ স্টেশনে। দুটো দলই সাত থেকে দশ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যাবে হোটেলে। হাল ছেড়ে ত্থেয়ার ভঙ্গিতে চেইনটা খুলে দিয়ে পিছিয়ে যাচ্ছে লোকটা, হাতে একটা সেল ফোন বেরিয়ে এসেছে। তার চোখে চোখ রেখে অপেক্ষা করছে রানা, ল্ডজার কবাট পুরোপুরি খুলছে না। হাল ছেড়ে দিতে যাচ্ছে, এই সময় সুইচটার নাগাল পেল ও Ñ তিন ইঞ্চি লম্বা একটা লিভার। ওটার গায়ে আঙুল পেঁচিয়ে টান দিল নীচের দিকে। ল্ডজা পুরোপুরি খুলে ভিতরে ঢুকল রানা। সেল ফোনে কার সঙ্গে যেন ফিসফিস করে কথা বলছে লোকটা, ফলে ল্ডজা খুলতে রানার সামান্য দেরি হওয়াটা খেয়াল করল না। কামরায় টেকো লোকটাকেও দেখা যাচ্ছে। সে-ও ল্যাটিন আমেরিকান। পিছনের সিটিংরুম থেকে চলে এসেছে এপাশে। নীচে ছড়িয়ে থাকা জিনিসগুলো তুলে জায়গামত রাখা হয়েছে, তবে সোনালি কার্পেটে লেগে থাকা রক্তটুকু মোছা সম্ভব হয়নি। রানা ভাবছে, যিনি ‘মাই লাইকা, ওহ্ গড!’ বলে চেঁচিয়ে উঠেছিলেন তিনি কোথায়? নিশ্চয়ই তাঁকে পাশের কামরায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ‘হ্যাঁ, ঠিক আছে, এখানে আমাল্ডে কাজ শেষ হয়েছে,’ পাশের কামরায় যাওয়ার ল্ডজাটা খোলা, সেদিকে মুখ করে বলল হ্যাট পরা লোকটা। হাতের সেল ফোন পকেটে রেখে দিয়ে রানার দিকে ফিরে ৩৮ মাসুল্ডানা-৩৬৬ হাসল সে। ‘আমরা কলম্বিয়ান, সিনর। এক্সপোর্টার।’ কী এক্সপোর্ট করে তা আর বলল না। বলবার বোধহয় ল্ডকারও নেই, কারণ সবাই জানে কলম্বিয়া কোকেন পাচারের জন্য সারা দুনিয়ায় কুখ্যাত। ‘মিস্টার রোকো রামপামের সঙ্গে একটা বিজনেস ডিল নিয়ে আলোচনা করতে এসেছিলাম,’ আবার বলল লম্বা লোকটা। ‘স্বীকার করছি, একটা ভুল বোঝাবুঝির ব্যাপার ঘটে গেছে, অসর্তকতার কারণে ভদ্রলোকের প্রিয় কুকুরটা মারা যাওয়ায় সতিঞ্জামরা দুঃখিত।’ ‘কী বলছেন, সিনর টিকালা, এখানে আমাল্ডে কাজ শেষ হয়েছে মানে?’ প্রতিবাল্ডে সুরে কথা বলতে বলতে পাশের কামরা থেকে বেরিয়ে এল শক্ত-সমর্থ ও কুচকুচে কালো এক লোক, তার পিছু নিয়ে এল আরও তিনজন। রানা দেখল চারজনই হিপ-হোলস্টার পরে আছে, বোতাম খোলা থাকায় দু’একজনের জ্যাকেটের ফাঁকে পিস্তলের বাঁট দেখা যাচ্ছে। আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল নিগ্রো লোকটা, রানাকে দেখতে পেয়ে চুপ হয়ে গেল। লম্বা লোকটা, যার নাম টিকালা, রুমাল দিয়ে নাকের গোড়া মুছে রানাকে বলল, ‘নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, আমাল্ডেকে আটকাবার চেষ্টা করলে নিজের মারাত্মক ক্ষতি করা হবে?’ রানাকে পাশ কাটিয়ে এগোল সে, তার পিছু নিয়ে বাকি চারজনও। ‘তবে অনুরোধ থাকল, পারলে মিস্টার রামপামের একটা উপকার করবেন। তাঁকে বলবেন, আজ শুধু হয়তো ইজ্জতের ওপর দিয়ে যাচ্ছে, পরের বার কিন্তু জানের ওপর দিয়ে যাবে। তবে আমাল্ডে সঙ্গে হাত মিলিয়ে বল্টসা করলে এই দুনিয়াতেই তাঁল্ডে তিনজনের জন্যে স্বর্গ বানিয়ে èে আমরা। গুড নাইট, সিনর।’ টিকালা কী বলল, কিছুই রানা বুঝল না। শুধু জানে লোকগুলো ক্রিমিনাল। চোখের সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছে দেখেও কিছু করবার আসছে সাইক্লোন ৩৯ নেই ওর। পাঁচজন সশস্ত্র লোকের সঙ্গে একা কারুরই কিছু করবার থাকে না। অ্যালার্ম সুইচ অন করার পর খুব বেশি হলে ষ্ণে মিনিট পার হয়েছে। পৌঁছাতে আরও অন্তত সাড়ে পাঁচ মিনিট লাগবে পুলিশের। ততক্ষণে লোকগুলোর গাড়ি কোন্ পথ ধরে কোথায় চলে যাবে কে জানে। সবার শেষে কামরা ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে টিকালা, তাল্ডেকে আটকাবার শেষ একটা চেষ্টা করে দেখল রানা। বলল, ‘আপনারা আমাকে যদি একটু সময় দিতেন, সিনর, আমি তা হলে চেষ্টা করে দেখতে পারতাম মিস্টার রোকো রামপামকে আপনাল্ডে সঙ্গে হাত মেলাতে রাজি করতে পারি কি না, পি−জ?’ রানার দিকে ঘুরল টিকালা, তবে থামল না, পিছু হটে স্যুইট ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় মৃদু হেসে মাথা নাড়ল। ‘ধনল্টাদ, সিনর। তাঁকে আপনি কথাটা বললেই হবে, আমরাই সময়মত আবার যোগাযোগ করব,’ বলে হলওয়েতে বেরিয়ে গেল সে। স্যুইটের ল্ডজা বন্ধ করে দ্রুত ঘুরল রানা, পাশের কামরার দিকে এগোচ্ছে, জানে না কী দেখতে পাবে। চৌকাঠে পা দিয়েই বুঝতে পারল রানা, এটা একটা লিভিং রুম। একটা ডিভানে হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে রয়েছেন বৃদ্ধ একজন মানুষ, মাথাটা একদিকে কাত করা। গায়ের রঙ শ্যামলা, চেহারায় আভিজাতেশু ছাপ। ভদ্রলোক মারা গেছেন, না ঘুমাচ্ছেন ঠিক বোঝা যাচ্ছে না, তবে কাঁধের কাছে খানিকটা তাজা রক্ত দেখা যাচ্ছে। ভদ্রলোকের দিকে এগোবার সময় পিস্তলটা বেল্টে গুঁজে রাখল রানা। এই সময় দেখতে পেল এক সেট সোফার পিছন থেকে বুট পরা একজোড়া পা বেরিয়ে রয়েছে। ডিভানটাকে ছাড়িয়ে এগোল রানা, সোফার পিছনে উঁকি দিল। যা সন্দেহ করেছে তাই, হোটেলের সিকিউরিটি গার্ড। ব্যালকনির ডেস্কে এই লোকটাই পাহারায় থাকে। আবার সেই মিষ্টি গন্ধটার আভাস ৪০ মাসুল্ডানা-৩৬৬ পেল ও। এবার চিনতে পারল, ক্লোরোফর্ম। গার্ডকে অজ্ঞান করবার জনল্টল্টহার করা হয়েছে। গার্ডের পিস্তল পাশেই পড়ে রয়েছে। চেক করল রানা, কোনও বুলেট নেই। লোকটার পালস পরীক্ষা করল। স্বাভাবিক। ডিভানের পাশে চলে এল রানা, কার্পেটে হাঁটু গেড়ে হাত বাড়াল বৃদ্ধ ভদ্রলোকের কবজি ধরবার জন্য, পালস দেখবে। হঠাৎ চমকে উঠে স্থির হয়ে গেল রানা। মনে হলো ঠিক যেন ওর কানের পাশে আশ্চর্য মিহি একটা নারীকণ্ঠ ফুঁপিয়ে কাঁদছে। রীতিমত ভৌতিক লাগল ব্যাপারটা। এত কাছে, অথচ একই সঙ্গে মনে হলো অনেক দূরে। তারপর ব্যাকুল সুরে মিনতি করল মেয়েটি, ‘গ্র্যান্ডপা, পি−জ, হেলপ!’ এই সময় পাশ ফিরলেন ভদ্রলোক। রানা দেখল, তাঁর শরীরের নীচে চাপা পড়ে আছে একটা সেল ফোন। নারীকণ্ঠের আকুতিটা ওই ফোন থেকেই বেরিয়ে আসছে। ‘কে আপনি?’ হঠাৎ জানতে চাইলেন বৃদ্ধ। ‘শয়তানগুলো চলে গেছে?’ ছোঁ দিয়ে সেল ফোনটা তুললেন। ‘হ্যালো? হ্যালো? ম্যারিয়েটা, আমি তোমার দাদু! হ্যালো...হ্যালো...’ ওয়ার্ড্রোব থেকে ধোয়া একটা সুতি শার্ট বের করে ছিঁড়ল রানা, ভদ্রলোকের মাথার ক্ষতটায় ব্যান্ডেজ বেঁধে দেবে। হাত ঝাপটা দিয়ে রানাকে বাধা দিলেন তিনি। ‘পি−জ, আমাকে নিয়ে ব্যস্ত হওয়ার ল্ডকার নেই। আপনি আমার নাতনিটাকে বাঁচান!’ ‘আপনি জানেন কোথায় আছেন তিনি?’ মাথা নাড়লেন বৃদ্ধ। ‘হোস্টেল থেকে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসছিল ম্যারিয়েটা। হোটেলের রিসেপশন থেকে আমাকে ফোন করে জানাল, পৌঁছে গেছে। খানিক পর নক হতে ল্ডজা খুলে দিই আমি। অমনি হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকে পড়ল পাঁচজন লোক...’ ‘তারপর?’ জানতে চাইল রানা। ও ভাবছে, রিসেপশন থেকে আসছে সাইক্লোন ৪১ ফোন করে পৌঁছাবার খবর দিয়ে থাকলে মেয়েটির তো তা হলে হোটেলেরই কোথাও থাকবার কথা। রাত যতই হোক, একটা ফাইভ স্টার হোটেলের রিসেপশন থেকে কাউকে কিডন্যাপ করে নিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব একটা ব্যাপার। ‘ওরা কলম্বিয়ান ড্রাগ স্মাগলার,’ বললেন বৃদ্ধ। ‘আমাকে দিয়ে জোর করে একগাদা চুক্তিতে সই করাতে চাইছিল Ñ আমার দেশ বেলপ্যান-এ পাঁচশো মিলিয়ন মার্কিন ডলারের অস্ত্র সাপ−াই দেবে ওরা, আমার নামে ব্যাঙ্কে জমা রাখবে দশ মিলিয়ন ডলার, এই রকম আরও কী সব...’ কে ইনি, ভাবল রানা। ‘আপনার পরিচয়টা, সিনর?’ জিজ্ঞেস করল ও। দম নেওয়ার জন্য থামলেন বৃদ্ধ। তাঁর চোখে-মুখে আবার দিশেহারা ফুটে উঠল, যেন রানার প্রশ্ন শুনতে পাননি। ‘সিনর, ওরা বলছিল দু’জন রেপিস্ট ম্যারিয়েটাকে আটকে রেখেছে। ওল্ডে কথায় আমি রাজি না হলে তাকে ওরা দু’জন...পি−জ, সার, একটা দেশের প্রেসিডেন্ট হয়ে আমি আপনার কাছে আমার নাতনির সম্ভ্রম ভিক্ষা চাইছি...’ নাতনির অমঙ্গল চিন্তায় ভদ্রলোক প্রলাপ বকছেন, ভাবল রানা। নাকি মদ খেয়েছেন? এরকম একটা বিপজ্জনক পরিস্থিতিতেও কৌতুক বোধ করল ও। একটা দেশের প্রেসিডেন্ট? এ যেন Ñ ঢাল নেই, তরোয়াল নেই, নিধিরাম সর্দার... আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গটা ফিরে এল রানার মনে। হোটেলেই যজ্ঝিাটকে রাখা হয় মেয়েটিকে, ঠিক কোথায় রাখা হতে পারে? কল্পনার চোখে রিসেপশন হলটা দেখতে পাচ্ছে রানা। কাউন্টারের সামনে স্ফাড়িয়ে দাদুকে ফোন করবার পর এলিভেটরের দিকে এগোচ্ছে মেয়েটি। এলিভেটর তাকে নিয়ে আঠার তলায় উঠছে। এলিভেটরে একাই থাকবে সে, এত রাতে অন্য কেউ থাকলে ৪২ মাসুল্ডানা-৩৬৬ তার না ওঠারই কথা। এলিভেটর আঠার তলায় পৌঁছাল। ল্ডজা খুলে গেল, হলওয়েতে পা দিল মেয়েটি। এই সময় দু’দিক থেকে তাকে জড়িয়ে ধরল দুজন লোক। শিরস্ফাড়া খাড়া হয়ে গেল রানার। ওর যদি ভুল না হয়, এই ফ্লোরেই আছে মেয়েটি! আচ্ছা, সেল ফোনে তো ন¤ল্ফ এসেছে, ডায়াল করে একবার দেখবে নাকি? ডিভান থেকে সেল ফোনটা নেওয়ার সময় হাতঘড়ি দেখল রানা। ফায়ার অ্যালার্ম-এর সুইচ অন করবার পর পাঁচ মিনিট পার হতে চলেছে। পুলিশের পৌঁছাতে আরও কিছুটা সময় লাগবে। সেল ফোন অন করে দেখছে রানা কোন্ ন¤ল্ফ থেকে ফোন করেছিল মেয়েটি। দেখল এটাও একটা মোবাইল ফোনের ন¤ল্ফ। ন¤ল্ফটার উপর চোখ বুলাচ্ছে, ধক্ করে উঠল বুকটা। ইয়াল−া! কী আশ্চর্য! এটা তো ওরই মোবাইল ফোন নাম্বার! ফোনটা আজ ভুল করে সঙ্গে নিয়ে বেরোয়নি রানা। নিজের বেডরুমে, সাইড টেবিলে থাকার কথা ওটার। তার মানে মেয়েটিকে ওর স্যুইটে আটকে রাখা হয়েছে। ওর বেডরুমে। দ্রুত চিন্তা করছে রানা, সেই সঙ্গে অ্যাকশন নেওয়ার জনদ্দ তৈরি হচ্ছে। কামরা ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে ও, ভদ্রলোককে বলল, ‘আপনার নাতনি কোথায় আছে আমি জানি। কী করতে পারি দেখছি।’ ওর মনে পড়ল চলে যাওয়ার সময় টিকালা বলে গেছে Ñ ‘আজ হয়তো শুধু ইজ্জতের ওপর দিয়ে যাচ্ছে।’ তার এ-কথার অর্থ বুঝতে ওর যদি ভুল না হয়, এই মুহূর্তে মেয়েটিকে ধর্ষণ করার প্রস্তুতি চলছে। নিশ্চয়ই ধস্তাধস্তির সময় ওর মোবাইল ফোনটা দেখতে পেয়ে দাদুর নাম্বারে ডায়াল করেছে মেয়েটি... ‘স্যুইটের ল্ডজা বন্ধ করে দিন,’ ওর পিছু নিয়ে আসা ভদ্রলোককে আবার বলল রানা, স্যুইট থেকে বেরিয়ে এল নির্জন আসছে সাইক্লোন ৪৩ হলওয়েতে। ‘ভয় পাবার কিছু নেই, একটু পরেই পুলিশ চলে আসবে।’ ইতিমধেদ্দর হাতে পিস্তল ও এক গোছা চাবি বেরিয়ে এসেছে। পাশের স্যুইটের সামনে চলে এল রানা। প্রতিপক্ষ কোনও বিপজ্ঝাশঙ্কা করছে না, কাজেই চমকে ত্থেয়ার সুযোগ পাবে ও। কি- হোলে চাবি ঢুকিয়ে সাবধানে তালা খুলছে এক হাতে, অপর হাতে পিস্তল রেডি। কীভাবে কী হয়েছে আন্দাজ করতে পারছে রানা। মেয়েটিকে হলওয়েতে আটক করবার পর অজ্ঞান সিকিউরিটি গার্ডের পকেট থেকে চাবি নিয়ে ওর স্যুইটের ল্ডজা খুলে ভিতরে ঢুকেছে টিকালার ভাড়া করা গুণ্ডারা। নিঃশব্দে খুলে গেল ল্ডজা। সিটিং রুমে আলো জ্বলছে, তবে কেউ নেই। পাশের লিভিং রুমে যাওয়ার ল্ডজা খোলা, ভিতরে কেউ আছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না। ল্ডজা লক করে কার্পেটের উপর দিয়ে এগোচ্ছে রানা। সিটিং রুম পার হয়ে লিভিং রুমে ঢুকল। কাউকে দেখতে পাচ্ছে না, তবে দুজন লোকের সকৌতুক তর্ক শুনতে পেল। কণ্ঠ¯ল্ফই বলে দিচ্ছে মার্কিন নিগ্রো তারা, সুযোগটা কে আগে নেবে তা-ই নিয়ে আঞ্চলিক ইংরেজিতে কথা বলছে। হঠাৎ একজন প্রস্তাব দিল, ‘ঠিক আছে, তা হলে টস্ করি এসো!’ এই সময় একটা চাপা গোঙানির আওয়াজও শোনা গেল। সামনেই বেডরুমের ল্ডজা, ওটার পাশে এসে স্ফাড়াল রানা। সাবধানে উঁকি দিয়ে ভিতরে তাকাল। সবার জন্য নিষিদ্ধ একটা দৃশ্য, পরিস্থিতি ওকে বাধ্য করছে দেখতে। সম্পূর্ণ নগ্ন একটি মেয়ে। গায়ের দুধে-আলতা রঙ আর উপচে পড়া যৌবন মুহূর্তের জনদ্দর চোখ দুটোকে যেন ধাঁধিয়ে দিতে চাইল। ওর বিছানায় শোয়ানো হয়েছে তাকে, মুখ টেপ দিয়ে ৪৪ মাসুল্ডানা-৩৬৬ বন্ধ করা, খাটের স্ট্যান্ডের সঙ্গে নাইলন কর্ড দিয়ে হাত ও পা বাঁধা। মেয়েটির বিস্ফারিত দুই চোখ সরাসরি চেয়ে রয়েছে রানার চোখের দিকে। দৃশন্ধা মাত্র দু’সেকেন্ড দেখল রানা। তারপর আড়চোখে তাকাল কার্পেটে পড়ে থাকা ওর মোবাইল সেটটার দিকে। ‘টেইল!’ উল−াসে চেঁচিয়ে উঠল এক লোক, কার্পেট থেকে কয়েনটা তুলে সিধে হচ্ছে। উঠে যখন স্ফাড়াল, জিভ শুকিয়ে গেল রানার। মাথাটা প্রায় ছাদে গিয়ে ঠেকেছে। ‘আমি জিতেছি!’ দু’জন নিগ্রো ওর বেডরুমে টস্ করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কে আগে ভোগ করবে মেয়েটিকে। দুজনেই বিছানার কাছাকাছি স্ফাড়িয়ে আছে, তবে সরাসরি ল্ডজার দিকে মুখ করে নয়। ‘হ্যাঁ, কয়েনটা তোমার পক্ষে,’ দ্বিতীয়জন বলল। প্রথমজনের কাঁধ পর্যন্ত পৌঁছেনি এর মাথা। হাসছে না, কারণ চোখের কোণ দিয়ে বেডরুমের ল্ডজায় রানার ছায়া নড়তে দেখে ফেলেছে সে। ‘তবে ক্লিক,’ ডান হাতটাকে পিস্তল বানিয়ে সঙ্গীর বুকে গুলি চালাবার ভঙ্গি করল সে। ‘মানে, এক ক্লিকেই তোমার ভাগেশু চাকা ঘুরে যেতে পারে।’ ‘কী বলতে চাও, ওস্তাদ?’ খেপে উঠল প্রথম লোকটা, তবে তারও এটা ভান মাত্র, সঙ্গীর সংকেত বুঝতে পেরে আত্মরক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে সে-ও। ‘খবরদার! টসে আমি জিতেছি, কাজেই...’ নিজেল্ডে মধ্যে লেগে গেছে, এখন খুনোখুনি একটা কাণ্ড না বেধেই যায় না, এরকম ভাব তৈরি করে দুজন একযোগে অস্ত্র বের করতে যাচ্ছে। তবে তাল্ডে চালাকি ধরতে পেরে তার আগেই নির্দেশ দিল রানা, ‘হ্যান্ডস আপ!’ পিস্তল হাতে ল্ডজার চৌকাঠ পেরিয়ে ঢুকে পড়ল কামরার ভিতর। ‘নড়বে না, খবরদার!’ ওর নির্দেশ তারা গ্রাহ্য করছে না। একজনের হাতে বেরিয়ে আসছে সাইক্লোন ৪৫ এসেছে একটা হেভি ক্যালিবারের পিস্তল, আর দৈতন্ধা বের করেছে আধহাত লম্বা বে−ডের একটা হান্টিং নাইফ। রানার মনে হলো সময় যেন স্থির হয়ে গেছে। শান্ত চোখে তাকিয়ে রয়েছে রানা ওল্ডে দিকে। যখন বুঝল, নির্দেশ না মেনে আক্রমণ করতে যাচ্ছে ওরা, সঙ্গত কারণেই বেছে নিল পিস্তলধারী লোকটাকে। রানার জানা আছে, ওর উদ্যত পিস্তলটা ধর্তবেশু মধ্যেই আনবে না গুণ্ডারা; কারণ ভদ্রসমাজের লোকেরা পিস্তল সঙ্গে রাখে ভয় দেখাবার জন্য, গুলি করবার সময় হাজারো দ্বিধা এসে আড়ষ্ট করে দেয় তাল্ডে তর্জনী। হাসিমুখে পুরোপুরি ওর দিকে ঘুরে যাচ্ছে তারা। নিজের পিস্তলের ট্রিগারে চাপ দিতে রানা যেন এক যুগ সময় নিল। তারপর বাঁকা হতে শুরু করল ওর তর্জনী। বিস্ফারিত হয়ে উঠল লোক দুজনের চোখ, বুঝতে পেরেছে তাল্ডে কৌশল কাজে লাগেনি। এই লোকটা ঠিকই গুলি করবে। Ñ মৃতুঞ্জাসন্ন! রানার হাতে পরপর দুবার বিকট শব্দে গর্জে উঠল ওয়ালথারটা। এত কাছ থেকে মিস করার প্রশ্নই ওঠে না। পর পর দুটো ঝাঁকি খেল পিস্তলধারী, যেন চমকে গেছে বুকে ধাক্কা খেয়ে। পাশাপাশি দুটো ফুটো থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এসে কার্পেট ভেজাচ্ছে। তারপর চোখ উল্টে ঢলে পড়তে শুরু করল লোকটা। মেঝে স্পর্শ করবার আগেই লাশ হয়ে গেছে। এবার রানার চমকে ওঠার পালা। বিদ্যুদ্বেগে রিঅ্যাক্ট করেছে দৈত্য Ñ রানা তার দিকে ফিরেই দেখতে পেল ছোরার ঝিলিক। ছুঁড়ে দেয়া ছোরাটার পিছু নিয়ে সে-ও ঝাঁপ দিয়েছে এদিকে। রানার ডান বাহুতে ঘ্যাঁচ করে বিঁধল তীক্ষèধার ছোরা, হাতটা এ- ফোঁড় ও-ফোঁড় করে দিয়ে বাঁটে বাধা পেয়ে ওখানেই আটকে থাকল ওটা। রক্ত মাখা ফলার অর্ধেকটা বেরিয়ে এসেছে হাত ফুঁড়ে। ৪৬ মাসুল্ডানা-৩৬৬ ওয়ালথারটা হাত থেকে খসে ছিটকে গিয়ে বাড়ি খেল দেয়ালে, তারপর সেখান থেকে পড়ল পুরু কার্পেটের উপর। ব্যথায় চেঁচিয়ে উঠল রানা। কিন্তু জখমটাকে পাত্তা না দিয়ে একপাশে কাত হয়ে ছুটে আসা দৈতেশু তলপেটে লাথি মারল বাম পায়ে। যেন কিছুই হয়নি, এমনি ভঙ্গিতে সিধে হয়ে স্ফাড়িয়ে পড়ল দৈত্য, রানার অবস্থা দেখে হাসল ঝকঝকে সাদা স্ফাত বের করে। তারপর নিচু হলো মেঝে থেকে সঙ্গীর পিস্তলটা তুলে নেয়ার জন্য। বামহাতে ছোরার হাতল ধরে একটানে বের করে আনল রানা হান্টিং নাইফটা। দুই পা এগিয়ে সাঁই করে চালাল নিগ্রো দৈতেশু ঘাড় লক্ষ্য করে। ক্ষিপ্র বাঘের মত অবিশ্বাস্য গতিতে লাফিয়ে সরে গেল লোকটা। পিস্তল তুলছে রানার বুকের দিকে। বামহাতে ছুঁড়ল রানা ছোরাটা, লাফিয়ে সরে গেল দৈত্য। হাসছে। ঠিক এমনি সময় ল্ডজার তালা খুলে পুলিশ ঢুকল স্যুইটের ভিতরে। কড়-কড়াৎ! হাসি মুছে গেল মুখ থেকে। গুলি খাওয়া সিংহের মত বিকট শব্দ বের হলো লোকটার মুখ থেকে, তারপর গোটা দালানটা কাঁপিয়ে দিয়ে ধড়াস করে পড়ল মেঝের উপর। চোখদুটো স্থির হয়ে রয়েছে সিলিঙের দিকে চেয়ে। প্রথমেই মেয়েটির অবস্থার কথা ভাবল রানা। আগেই খেয়াল করেছে ওর স্কার্ট ও ব−াউজ কার্পেটের একধারে পড়ে আছে। তবে সেদিকে না গিয়ে বিছানার মাথার কাছ থেকে সাদা একটা চাল্ড নিয়ে নগ্ন শরীরটা ঢেকে দিল ও। তারপর খাটের স্ট্যান্ডে বাঁধা হাত দুটোর বাঁধন খুলে দিল। ওর বাহু থেকে টপ টপ করে রক্ত পড়ে লাল করে দিল চাদরের একটা অংশ। দেখল কৃতজ্ঞ দৃষ্টি মেলে ওকে দেখছে মেয়েটা। পরমুহূর্তে পুলিশ নিয়ে বেডরুমে ঢুকলেন পাশের স্যুইটের বৃদ্ধ ভদ্রলোক। মেয়েটিকে তৈরি হয়ে নেবার সুযোগ দিতে ঘটনার ব্যাখ্যা আসছে সাইক্লোন ৪৭ দেবে বলে সবাইকে নিয়ে লিভিংরুমে চলে গেল রানা। পরবর্তী কয়েক মিনিটের মধ্যে জানা গেল সব। কয়েকজন মার্কিন গুণ্ডাকে ভাড়া করেছিল কলম্বিয়ান ড্রাগ কার্টেল-এর প্রতিনিধি টিকালা। এই গুণ্ডারা হোটেলের টেলিফোন অপারেটর ও কয়েকজন সিকিউরিটি গার্ডকে ক্লোরোফর্ম দিয়ে অজ্ঞান করে রেখে কাজটা সারতে চেয়েছিল। আরও জানা গেল, নিধিরাম সর্দার নন, রোকো রামপাম সত্যি সত্যিই বেলপ্যান রাষ্ট্রের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। তবে প্রেসিডেন্ট মহোদয় কৃচ্ছ্রসাধনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন, ফলে ব্যক্তিগত সফরে আমেরিকায় আসার সময়ও সঙ্গে করে কোনও দেহরক্ষী, এইড, সচিব বা অন্য কাউকে আনেননি। চিকিৎসা, ভ্রমণ ইত্যাদি উপলক্ষে প্রায়ই তাঁকে আমেরিকায় আসতে হয়, প্রতিবার একাই আসেন। তবে এর আগে কখনও এ-ধরনের বিপদ দেখা দেয়নি। রানার নির্দেশে কাবার্ড থেকে ফার্স্ট-এইড বক্স বের করে একজন সার্জেন্ট রক্ত বন্ধ করার জনদ্দর হাতটায় প্রাথমিক ব্যানডেজ করতে যাচ্ছিল, বেডরুম থেকে জামা-কাপড় পরে বেরিয়ে এল সু›ল্ডী মেয়েটা। সার্জেন্টকে সরিয়ে দিয়ে নিজেই ক্ষতমুখে অ্যান্টিবায়োটিক পাউডার ছিটিয়ে নিপুণ হাতে বেঁধে দিল ব্যানডেজ। মাঝে মাঝে ফুঁপিয়ে শ্বাস নিচ্ছে এখনও। লাশ নিয়ে চলে গেল পুলিশ। হোটেলের লোক ব্যস্ত হয়ে পড়ল রক্তের দাগ পরিষ্কারের কাজে। হোটেলের ডাক্তার এসে মেয়েটির হাতের কাজের খুবই প্রশংসা করলেন, তারপর একটা ইঞ্জেকশন পুশ করে বিদায় নিলেন। নাতনির সম্ভ্রম রক্ষা পাওয়ায় রানার প্রতি প্রেসিডেন্ট রোকো রামপাম আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন। রানাকে তিনি বেলপ্যানে বেড়াতে যাওয়ার সনির্বন্ধ আমন্ত্রণ জানালেন। রানা বাংলাদেশী শুনে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন ভদ্রলোক, বললেন, ৪৮ মাসুল্ডানা-৩৬৬ বাংলাদেশে তাঁর খুবই ঘনিষ্ঠ এক অসমসাহসী বন্ধু আছেন, নাম রাহাত খান, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল, বিসিআই-এর চিফ। দুজন তাঁরা ইংল্যান্ডের একই কলেজে লেখাপড়া করেছেন, একই সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে। রানা নিশ্চয়ই তাঁকে চেনে না? জবাবে রানা বলল, ‘তিনি আমার বস্।’ এ-কথা শুনেই প্রেসিডেন্ট মহোদয় মুহূর্তে ওকে মুঠোর মধ্যে পুরে ফেললেন, আর তো রানাকে ছেড়ে দেয়া যায় না। তিনদিন পর দেশে ফেরার সময় জোর-জুলুম করে সঙ্গে নিয়ে গেলেন ওকেও। বিশেষ করে রানার যখন চিকিৎসা ল্ডকার, আর দক্ষ নার্স যখন তাঁরই নাতনি। ম্যারিয়েটাও রানার প্রতি কৃতজ্ঞ, সেটা প্রকাশও করতে চায়, তবে প্রসঙ্গটা তুলতে গেলেই লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে ওঠে সে। তার এই বিব্রত হওয়ার ব্যাপারটা বুঝতে পেরে একদিন মৃদু হেসে তাকে রানা বলল, ‘ব্যাপারটা ভুলে যেতে পারলেই ভাল হয়।’ চোখ নামিয়ে নিল ম্যারিয়েটা। ‘হ্যাঁ, ভুলে যাবার চেষ্টাই তো করছি,’ বলে মুখ তুলে রানার দিকে তাকাল। ‘শুধু আপনার ভূমিকাটুকু বাদে।’ ‘না, আমি আর কী করেছি...’ ওকে বাধা দিয়ে ম্যারিয়েটা বলল, ‘যতটা করেছেন, আপনার সঙ্গে তাতেই আমাল্ডে একটা নিবিড় বন্ধন তৈরি হয়েছে। নিশ্চিত থাকতে পারেন আমাল্ডে তরফ থেকে সেটা কখনও ছিঁড়বে না।’ দাদু ও নাতনি এভাবে ওকে আপন করে নেওয়ায় রানাও নিজের অন্তরে তাল্ডেকে জায়গা না দিয়ে পারেনি। বেলপ্যানে দিন কয়েক বেড়াবার সময়ই আশ্চর্য সরল এই দাদু ও তাঁর সু›ল্ডী নাতনির সঙ্গে গভীর বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল রানার। তখনই রানা জানতে পারে, ইউরোপে বেড়াতে গিয়ে ম্যারিয়েটার মা-বাবা পে−ন অ্যাক্সিডেন্টে মারা যান। অত্যন্ত মেধাবি ছাত্রী সে, নিউ ইয়র্ক আসছে সাইক্লোন ৪৯ ভার্সিটিতে রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে অনার্স করছে। প্রেসিডেন্ট রোকো রামপাম তাঁর পার্সোনাল সেক্রেটারি হিসাবে অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিয়েছিলেন ম্যারিয়েটাকে। ছোট হলে কী হবে, ছুটিতে বাড়ি এলে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে হতো তাকে। না, এরমধ্যে পক্ষপাতিত্ব বা স্বজনপ্রীতির কিছু ছিল না। বেলপ্যান এমন একটা বিচিত্র রাষ্ট্র, যেখানে প্রেসিডেন্ট ও মন্ত্রীরা দেহরক্ষী, প্রাইভেট সেক্রেটারি, মালী, চাকরবাকর ইত্যাদি কিছুই পান না। পান না মানে নেন না। এই ধারাই দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে এখানে। ব্যাপারটা নিয়ে রানা বিস্ময় প্রকাশ করায় প্রেসিডেন্ট রোকো রামপাম ব্যাখ্যা করে ওকে বোঝাবার চেষ্টা করেছিলেন, কতভাবে যে কৃচ্ছ্রসাধন করা যায়, এ হলো তারই একটা অনুকরণীয় উদাহরণ। এরকম আরও অনেক উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যাবে বেলপ্যানে। ম্যারিয়েটার পদটি ছিল অবৈতনিক। ক’টা দিন দাদু-নাতনির ঘরোয়া পরিমণ্ডলে খুবই আল্ড-যতেœ কেটেছে রানার। নানান কিছু রেঁধে খাইয়েছে নাতনি, দাদু নিয়ে গেছেন ওকে জঙ্গলে হরিণ আর সাগরে মার্লিন শিকার করতে Ñ সেইসঙ্গে শুনিয়েছেন তাঁর প্রিয় বন্ধু সম্পর্কে অনেক-অনেক অজানা কথা, অবিশ্বাস্য সব কাহিনী। বেলপ্যান ছেড়ে যেদিন চলে আসবে রানা, প্রেসিডেন্ট রামপাম নিজে ওকে পৌঁছে দিয়েছিলেন এয়ারপোর্টে; তাঁর নাতনিকে ডেকে ওর ঠিকানাটা লিখে নিতে বলেছিলেন। ম্যারিয়েটা ওকে নিয়ে এক পাশে সরে গিয়ে ঠিকানা লিখে নেবার পর জানতে চেয়েছিল, ‘কোনও ব্যাপারে আপনি সত্যিই চিন্তিত, নাকি আমার বুঝতে ভুল হচ্ছে?’ ‘না, তোমার বুঝতে ভুল হচ্ছে না, ম্যারিয়েটা,’ বলেছিল রানা, হাসতে পারেনি। ‘সত্যিই আমি চিন্তিত।’ চিন্তার কারণটাও ব্যাখ্যা করেছিল রানা। যে-কোনও অরক্ষিত ৫০ মাসুল্ডানা-৩৬৬ দেশ নানান দুর্জনের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়, অন্তত অতীত ইতিহাস তা-ই বলে। খরচ না বাড়ানোর অজুহাতে সেনা ও পুলিশ বাহিনী ছোট করে রাখাটা ভবিষ্যতে হিতে-বিপরীত হয়ে দেখা দিতে পারে। আরেকটা শঙ্কার কথাও জানিয়েছিল ও Ñ কলম্বিয়ান ড্রাগ স্মাগলাররা অবশ্যই ওল্ডেকে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করবে আবারও, কারণ ড্রাগ পাচারের জনন্ধ্র্যানজিট রুট হিসাবে বেলপ্যান তাল্ডে খুবই ল্ডকার। ম্যারিয়েটা কথা দিয়েছিল, এই ব্যাপারে দাদুকে সাবধান করে দেবে সে। এনভেলাপের মাথাটা ছুরি দিয়ে কাটার সময় রানা ভাবল, দুই বছর আগের কথা, ম্যারিয়েটা এখন কেমন আছে কে জানে। এনভেলাপের ভিতর থেকে বেরুল সাড়ে তিন পৃষ্ঠার দীর্ঘ এক চিঠি। ভাঁজ খুলে পড়তে শুরু করল রানা: প্রিয় মাসুদ ভাই, আশা করি আপনি আমাল্ডেকে ভুলে যাননি। তবে মাঝে- মধ্যে ভাবি ভুলে যদি না-ই যাবেন তা হলে গত দু’বছরে একবারও যোগাযোগ করলেন না কেন। তারপর নিজেকে এই বলে সান্ত্বনা দিই, আপনি অত্যন্ত ব্যস্ত মানুষ, তাই যোগাযোগ রাখার ইচ্ছে থাকলেও হয়তো সময়ের অভাবে পেরে ওঠেননি। যাই হোক, কৃতজ্ঞ ম্যারিয়েটা কিন্তু তার আপন ভাইয়ের কথা একটুও ভোলেনি। মনে রেখেছে, আপনাকে নিয়ে বেলপ্যানের পথে-প্রান্তরে হাওয়ায় ভেসে পনেরোটা দিন উড়ে বেড়ানোর মধুর সেই স্মৃতিও। তবে নাহ্, এ-সব কথা এখন থাক। আজ একটা গুরুতর বিষয় আপনাকে জানাব বলে এই চিঠি লিখতে বসেছি। প্রিয় মাসুদ ভাই, এবার সিরিয়াস আলাপ। আমাল্ডে খুব বিপদ। দু’বছর আগে আপনি যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, বোধহয় ঠিক তা-ই আসছে সাইক্লোন ৫১ ঘটতে যাচ্ছে Ñ বেলপ্যান অরক্ষিত, এবং তার সুযোগ নিয়ে একদল লোক ভয়ানক কোনও ষড়যন্ত্র পাকাচ্ছে। কোনও সন্দেহ নেই এরা আমাল্ডে সেই আগের শত্র“রাই, কলম্বিয়ান ড্রাগ কার্টেল-এর লোকজন। কিন্তু মুশকিল কি জানেন? বিপল্ডে গুরুত্বটা দেশের প্রেসিডেন্ট, অর্থাৎ আমার দাদুকে আমি শত চেষ্টা করেও বোঝাতে পারছি না। তাঁর ধারণা, মন্দ লোক মিছিমিছি গুজব ছড়াচ্ছে। এই ষড়যন্ত্রের ব্যাপারটা কীভাবে আমি জানলাম খুলে বলি, তা হলে আপনিও বুঝতে পারবেন ব্যাপারটা কতখানি সিরিয়াস। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে ডিনার পার্টি ছিল, দাদুর সঙ্গে আমিও গিয়েছিলাম। দূতাবাস ভবনের ভিতর একা ঘুরে বেড়াচ্ছি, এই সময় একটা আধ খোলা কামরা থেকে কয়েকজন লোকের চাপা কণ্ঠ¯ল্ফ ভেসে আসতে শুনি আমি। ‘বেলপ্যানের প্রেসিডেন্টই প্রধান বাধা, প্রথমে ওই ব্যাটাকে সরাতে হবে,’ এ-ধরনের একটা কথা কানে যেতে মাথাটা আমার ঘুরে উঠল। ইংরেজি ও স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলছিল তারা, ল্ডজার পাশে দাাঁড়িয়ে কান পাতলাম আমি। তাল্ডে আলোচনা থেকে বুঝলাম কলম্বিয়ান ড্রাগ লর্ডরা বিপুল টাকা ও অস্ত্রের সাহায্যে বেলপ্যানকে নিজেল্ডে মুঠোয় ভরে ফেলার প−্যান করছে। সরকার উৎখাত করে ক্ষমতায় বসাতে চায় কোন পুতুলকে। এরই মধ্যে কোকেন ও হেরোইন ভর্তি দুটো পে−ন পাঠিয়েছে তারা, তবে সেগুলো হয় ধরা পড়ে গেছে, নয়তো দুর্ঘটনায় পড়ে খোয়া গেছে। মাসুদ ভাই, দুঃখের বিষয় হলো, ওই কামরায় কারা ছিল তা আমার জানার সুযোগ হয়নি। তবে তাল্ডে কথা থেকে এটুকু পরিষ্কার বুঝেছি, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় কোকেন সহ অন্যান্য কলম্বিয়ান ড্রাগ পাচার করার জন্য বেলপ্যানকে তারা ৫২ মাসুল্ডানা-৩৬৬ ট্র্যানজিট পয়েন্ট হিসাবে বল্টহার করতে চায়। দুর্ভাগ্যই বলতে হবে যে আর কিছু শোনার আগেই দূতাবাসের একজন সিকিউরিটি গার্ড আমাকে দেখে চিনতে পারে, ধরে নেয় বিশাল দালানের ভিতর হারিয়ে গেছি আমি। সে ইনসিস্ট করায় তার সঙ্গে ওখান থেকে সরে আসতে বাধ্য হই আমি। কিন্তু যতটুকু শুনেছি তা কি সতর্ক হবার জন্য যথেষ্ট নয়? অগত্যা বাধ্য হয়ে আমি আমার সৎভাই মেজর পিকো রামপামের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করি। পিকো ভাইয়া নিকার‌্যাগুয়া-য় আছেন, বেলপ্যান দূতাবাসের মিলিটারি অ্যাটাশে-র পদে। আমার বক্তব্য পুরোপুরি বিশ্বাস করেছেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে দাদুকে টেলিফোনও করেছেন। কিন্তু ভাইয়ার কথাতেও কান দেননি দাদু। কথার মাঝখানে রিসিভার নামিয়ে রেখেছেন তিনি। পিকো ভাইয়া আর কী করবেন, যতটা সম্ভব সাবধানে থাকতে বলেছেন আমাকে, আর দাদুর ওপর নজর রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। দূতাবাস প্রধানের কাছে ছুটি চেয়ে আবেদন জানিয়েছেন, কিন্তু তাঁকে ছুটি দেয়া হবে না Ñ কারণ দাদু মানা করে দিয়েছেন। আমি জানি পিকো ভাইয়া দেশে ফিরতে পারলে ঠিকই কিছু একটা করতে পারতেন। আমাল্ডে ছোট্ট সেনাবাহিনীতে তাঁর খুব সুনাম, তাল্ডে সাহায্য নিয়ে বিদেশীল্ডে এই ষড়যন্ত্র তিনি নির্ঘাত ব্যর্থ করে দিতেন। দাদুকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, এরকম একটা নির্দেশ কেন আপনি দিলেন? তিনি কী জবাব দিয়েছেন শুনবেন? বলেছেন, তোমাল্ডে যখন ধারণা বিপদ একটা হবেই, সেক্ষেত্রে এখানে তাকে আসতে দিই কীভাবে, বলো! মাসুদ ভাই, নিশ্চয়ই আপনি বুঝতে পারছেন যে এরপর কতটুকু আসছে সাইক্লোন ৫৩ অসহায় হয়ে পড়ি আমি? এতকিছুর পরও দাদু যখন আমাল্ডে কথা সিরিয়াসলি নিলেন না তখন বাধ্য হয়ে কর্নেল জুডিয়াপ্পা-র সঙ্গে দেখা করে সব কথা তাঁকে খুলে বলি আমি। আমাল্ডে সেনাবাহিনীতে একটাই রেজিমেন্ট, প্রেসিডেনশিয়াল গার্ড রেজিমেন্ট। কর্নেল জুডিয়াপ্পা আংকেল ওটার প্রধান। আমাল্ডে একজন সেনাবাহিনী প্রধানও আছেন, জেনারেল কাসমেরো পালমো, কিন্তু তিনি গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় আজ তিনমাস হলো একটা প্রাইভেট ক্লিনিকে পড়ে রয়েছেন, অথচ নতুন একজন সেনাপ্রধান নিয়োগের গরজ নেই কারও। যাই হোক, কর্নেল জুডিয়াপ্পা আংকেল আমার কথা খুব মন দিয়ে শুনলেন। আমার কথা শেষ হতে গম্ভীর, থমথমে মুখে বললেন, তাঁর কাছেও বিদেশী ষড়যন্ত্র সম্পর্কে গোয়েন্দা রিপোর্ট আসছে। সেনাবাহিনীর অফিসারল্ডে সঙ্গে ব্যাপারটা নিয়ে মিটিংও করেছেন তিনি। সিদ্ধান্ত হয়েছে, আমাল্ডে যেহেতু সশস্ত্র ষড়যন্ত্র ও হামলা ঠেকাবার মত যথেষ্ট সামরিক ও পুলিশী শক্তি নেই, সেহেতু এই মুহূর্তের জরুরি কাজটা হলো প্রতিবেশী বন্ধু রাষ্ট্র মেক্সিকোর কাছ থেকে সামরিক সাহায্য চাওয়া। জেনারেল কাসমেরো পালমোর ও মেক্সিকান সেনাপ্রধানকে দিয়ে একটা করে চিঠি লিখিয়ে নিয়েছেন কর্নেল জুডিয়াপ্পা আংকেল। সেই চিঠি নিয়ে আজ এক হপ্তা হলো মেক্সিকোয় রয়েছেন তিনি, অথচ কাজ সেরে তিনদিনের মধ্যে তাঁর ফিরে আসার কথা। আমার আশঙ্কা হচ্ছে, কর্নেল আংকেলের আবার কোনও বিপদ হলো না তো! মাসুদ ভাই, দু’বছর আগে দাদুর মুখে আপনার সম্পর্কে যতটুকু শুনেছিলাম তাতে আমার ধারণা হয়েছিল, আপনি ৫৪ মাসুল্ডানা-৩৬৬ একজন দুর্ধর্ষ যোদ্ধা। আর এক সময় যে সেনাবাহিনীর মেজর ছিলেন, আপনি নিজেই তা আমাকে বলেছেন। আমি বলতে চাইছি, আমরা যে ধরনের বিপদে পড়তে যাচ্ছি সেটা বোঝা ও অবস্থা অনুযায়ী বল্টস্থা নেয়ার জন্যে সম্ভবত আপনার জানা আছে আমাল্ডে কী করা ল্ডকার। আমার চিঠি পড়ে আপনার যদি মনে হয় যে বিপদ সত্যি একটা আসছে তা হলে অনুরোধ করব Ñ পি−জ, একটু দেরি না করে যত দ্রুত পারেন বেলপ্যানে চলে আসুন। আরেকটা কথা, তাড়াতাড়ি রওনা হতে পারলে নিকার‌্যাগুয়া ও মেক্সিকো হয়ে আসতে পারেন। আমার পিকো ভাইয়া আর কর্নেল জুডিয়াপ্পা আংকেলের সঙ্গে দেখা করতে পারলে বেলপ্যানের সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে জানতে পারবেন। আর যদি মনে করেন আমি শুধু শুধু ভয় পাচ্ছি, সেক্ষেত্রে আমার কিছু বলার নেই। ভাল থাকুন এই কামনা করি। আমাল্ডে জন্যে প্রার্থনা করবেন। আপনার মঙ্গল হোক। ইতি, আপনার গুণমুগ্ধ ভক্ত, ছোটবোন ম্যারিয়েটা রামপাম। রিভলভিং চেয়ারে হেলান দিয়ে দুই মিনিট চুপচাপ বসে থাকল রানা, কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। ওর নতুন প্রাইভেট সেক্রেটারি ফাল্গুনী সামাদ একটা ট্রে হাতে ভিতরে ঢুকল, তাতে ধূমায়িত কফির কাপ রয়েছে। সে কিছু বলার আগেই ইঙ্গিতে ডেস্কটা দেখিয়ে দিল রানা। ফাল্গুনী তার ইমিডিয়েট বস্-এর মুড আন্দাজ করতে পেরে ট্র্টো নামিয়ে রেখে দ্রুত বিদায় নিল। তারপর আধ মিনিটও হয়নি, বিস্মিত হয়ে ফাল্গুনী দেখল নিজের অফিস থেকে করিডরে বেরিয়ে যাচ্ছে রানা। উঁকি দিয়ে ওর কামরার ভিতর তাকাল সে Ñ কফির কাপ যেমন ছিল তেমনি আছে, তাতে একটা চুমুকও দেয়নি মাসুল্ডানা। মেয়েটির চোখে কী যেন একটা আসছে সাইক্লোন ৫৫ নিভে গেল। রানা যাচ্ছে তার বস্, বিসিআই চিফ মেজর জেনারেল রাহাত খান-এর কাছে। রোকো রামপাম বিপদে পড়তে যাচ্ছেন, কাজেই কী করা ল্ডকার সেটা তাঁর কলেজ জীবনের বন্ধুই স্থির করবেন। জানা কথা বন্ধুর এরকম বিপদে চুপ করে থাকবেন না বস্। সিঁড়ি বেয়ে সাততলায় উঠে এল রানা, দীর্ঘ পদক্ষেপে লম্বা করিডর পার হয়ে ঢুকে পড়ল ইলোরার কামরায়, মনে মনে এরইমধ্যে বেলপ্যান-এ যাওয়ার জন্য নিজেকে তৈরি করে নিচ্ছে। ‘হাই, ইলোরা,’ বলল রানা, খেয়াল করল ছোট্ট একটা আয়নায় চোখ রেখে নিজের মেকআপ ঠিক আছে কি না দেখছে বসের প্রাইভেট সেক্রেটারি। ‘এত সকাল সকাল এখানে কী?’ আয়নাটা ভিতরে রেখে দিয়ে হাতব্যাগের চেইন টানল ইলোরা, তারপর মুখ তুলল। ‘আমরা তো কাউকে ডাকিনি।’ ‘তোমার বহুবচনের বল্টহার দেখে মনে হচ্ছে ইদানীং নিজেকে তুমি যেন বস্-এর পার্টনার বলে মনে করছ,’ বলল রানা। ‘ছি-ছি, আমরা এখানে এত জোয়ান মরদো থাকতে শেষ পর্যন্ত তুমি কি না ওই বুড়ো-হাবড়াটাকে...’ নিঃশব্দে ইন্টারকমের দিকে আঙুল তাক করল ইলোরা, চোখে- মুখে আতঙ্ক নিয়ে ফিসফিস করল, ‘লাইনটা খোলা!’ মুচকি হেসে রানা বলল, ‘ও-সব পুরানো কৌশল বাদ দাও, সু›ল্ডী। মুখ খোলার আগেই দেখে নিয়েছি, ওটা খোলা নয়। যাই হোক, তোমার ব্যক্তিগত পছন্দ যেমনই হোক না কেন, সভ্যসমাজের রীতি অনুসারে তোমাকে আমি অভিনন্দন না জানিয়ে পারছি না।’ হাতের এনভেলাপটা নাড়ল ও, চোখ-মুখ থেকে একপলকে অদৃশ্য হয়ে গেল সকৌতুক হাবভাব। ‘এটা দেখছ? বেলপ্যান থেকে এসেছে। রোকো রামপাম, ওখানকার প্রেসিডেন্ট, বসের বন্ধু। তাঁর ৫৬ মাসুল্ডানা-৩৬৬ খুব বিপদ। বসকে বলো ব্যাপারটা নিয়ে তাঁর সঙ্গে আমি আলাপ করতে চাই।’ ‘তোমার বেয়াদবির শাস্তি ভবিষ্যতের জন্যে তোলা রইল,’ বলে ইন্টারকমের বোতাম টিপল ইলোরা। ‘কিন্তু অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়া বস্ কি এখন কারও সঙ্গে দেখা করতে রাজি হবেন?’ চেহারায় কৃত্রিম অনিশ্চয়তা নিয়ে এক মিনিট কথা বলার পর রিসিভার নামিয়ে রেখে রানার দিকে তাকাল। ‘যাও, তবে বস বলেছেন বেশি সময় দিতে পারবেন না Ñ পাঁচ মিনিট।’ ‘দেখা যাক,’ বলে ঘুরে স্ফাড়াল রানা, এগিয়ে এসে রাহাত খানের চেম্বারের ল্ডজায় নক করল। ‘কাম ইন,’ সেই গুরুগম্ভীর কণ্ঠ¯ল্ফ ভেসে এল। ভিতরে ঢুকে নিজের পিছনে কবাটটা বন্ধ করল রানা। ইতিমধ্যে দেখে নিয়েছে একটা ফাইলে ডুবে আছেন বস্, ডান হাতের আঙুলের ফাঁকে ধরা চুরুট থেকে নীলচে ধোঁয়া উঠছে। ‘বসো,’ মুখ না তুলেই বললেন রাহাত খান। একটা চেয়ার টেনে সাবধানে বসল রানা। ‘কী ব্যাপার সংক্ষেপে বলো,’ নির্দেশ দিলেন বিসিআই চিফ। একটা ঢোক গিলে গলাটা পরিষ্কার করে নিল রানা, তারপর শুরু করল, ‘সার, প্রেসিডেন্ট রোকো রামপামের নাতনি আমাকে একটা চিঠি লিখেছে...’ ‘চিঠিটা আমি পড়েছি,’ রানাকে বাধা দিয়ে বললেন রাহাত খান। ‘তুমি কেন এসেছ তা-ই বলো।’ রানা বিস্মিত। এনভেলাপটা সম্পূর্ণ অক্ষত পেয়েছে ও, সেক্ষেত্রে কীভাবে... ‘অফিসে নতুন স্ক্যানিং মেশিন বসানো হয়েছে,’ রানাকে চুপ করে থাকতে দেখে বললেন বিসিআই চিফ। ‘স্ক্যান করে দেখার পর গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে কপি তৈরি করে আমার কাছে পাঠানো হচ্ছে।’ আসছে সাইক্লোন ৫৭ ‘চিঠিটাকে আমারও খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে, সার,’ বসের কথার খেই ধরে নতুন করে শুরু করল রানা। ‘আমি এসেছি আপনার পরামর্শের জন্যে, এ-ব্যাপারে কী...’ ‘আমার কোনও পরামর্শ নেই,’ বললেন রাহাত খান, এখনও খোলা ফাইলে চোখ। ‘তুমি কিছু করতে চাইলে জানাতে পারো, শুনলে বলতে পারব অফিসের অনুমতি আছে কি নেই।’ রানা ভাবল, তুমি শালা বুড়ো সব সময় প্যাঁচ মেরে কথা বলো! মুখে বলল, ‘চিঠি পড়ে মনে হচ্ছে বেলপ্যান সত্যিই কঠিন একটা বিপদে পড়তে যাচ্ছে, সার। এটা তো অফিশিয়াল কোনও কাজ হতে পারে না, তাই ভাবছি আপনি অনুমতি দিলে ছুটি নিয়ে আমি একবার বেলপ্যান থেকে ঘুরে আসতে পারি...’ ‘ওরা কোনও বিপদে পড়তে যাচ্ছে বলে বিশ্বাস করি না আমি। আমার ধারণা, গোটা ব্যাপারটা ওই ম্যারিয়েটা মেয়েটার চালাকি। তোমাকে তার ভাল লাগে, রোমান্টিক আবেগের বশে একটা গল্প ফেঁদে নিয়েছে, তুমি যাতে যেতে বাধ্য হও,’ বললেন বিসিআই চিফ, এতক্ষণে মুখ তুলে তাকালেন প্রিয় এজেন্টের দিকে। ‘আর বিপদে পড়লেই বা কী? রোকো রামপাম আমার বন্ধু, তা-তে কী? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে দুই-দুইবার ও আমার প্রাণ বাঁচিয়েছিল, তা-তেই বা কী?’ রানার চোখে চোখ রাখলেন বৃদ্ধ, ‘আমার হাত-পা বাঁধা, রানা। দুনিয়া জুড়ে এরকম আরও অনেক বন্ধু আছে আমার, তারা বিপদে পড়েছে শুনলেই আমাল্ডে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে ছুটতে হবে নাকি? তা হলে বাংলাদেশকে দেখবে কে?’ ‘কিন্তু, সার, একা শুধু ম্যারিয়েটা নয়, তার ভাই মেজর পিকো আর প্রেসিডেনশিয়াল রেজিমেন্টের কমান্ডার কর্নেল এসকুইটিলা জুডিয়াপ্পাও একটা ষড়যন্ত্রের কথা বলছেন...’ ‘দেখো গে, জিজ্ঞেস করলে বলবে, এ-ব্যাপারে কিছুই তারা জানে না। বললাম না, সব ওই মেয়েটার বানানো।’ আবার ফাইলে ৫৮ মাসুল্ডানা-৩৬৬ মুখ গুঁজলেন রাহাত খান। ‘তুমি যেতে পার, রানা।’ এটাকেই অনুমতি ধরে নিয়ে বসের কামরা থেকে বেরিয়ে ইলোরার চোখে চোখ রাখল রানা, ল্ডজার কবাট নিজের পিছনে সাবধানে বন্ধ করে দিচ্ছে। তারপর দৃঢ় পায়ে এগিয়ে এসে ডেস্কের সামনে স্ফাড়াল। ‘কলম্বিয়া-য় যাচ্ছি আমি,’ বলল ও। ‘সম্ভব হলে আজকের ফ্লাইটের টিকিট বুক করবে Ñ ইকোনমি ক্লাস।’ চোখ বড় বড় করল ইলোরা। ‘আমি কি কানে কম শুনছি? ফার্স্ট ক্লাস ছাড়া যে লোক পে−নেই চড়তে চায় না তার মুখে আজ...’ তার কথায় কান নেই রানার, ইলোরার একটা প্যাড টেনে নিয়ে খসখস করে ছুটির ল্ডখাস্ত লিখছে। ওর দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকল ইলোরা। ‘রিজাইন করছ নাকি?’ হাতের কাজ শেষ করে সিধে হলো রানা। ‘মাসুল্ডানা ছাড়া বিসিআই, কল্পনা করতে পারো? রিজাইন করলে অফিসের মেয়েরা তো সব বিধবা হয়ে যাবে!’ ছুটির আবেদনটা ইলোরার দিকে বাড়িয়ে দিল। ‘এটা রাখো। আমি আমার অফিসে আছি, ফ্লাইট কনফার্ম হলে আমাকে জানিয়ো।’ ঘুরে ল্ডজার দিকে এগোল। ‘রোমান্টিক আবেগের আহ্বানে সাড়া দিয়ে নিজ খরচে বেলপ্যানে যাচ্ছি, যতটা সম্ভব কমের মধ্যে সারতে চাই।’ আধঘণ্টা পর। রানার লেখা কাগজটায় চোখ বুলিয়ে বিসিআই চিফ রাহাত খান জানতে চাইলেন, ‘ওকে জিজ্ঞেস করোনি, ছুটিটা কেন ল্ডকার?’ ‘বলল বেলপ্যানে যাবে, সার,’ জবাব দিল ইলোরা। বসের ঠোঁটে মুচকি একটু হাসি দেখতে পেল সে। ‘ফ্লাইট কনফার্ম হয়েছে?’ ‘জী, সার।’ আসছে সাইক্লোন ৫৯ ‘ল্ডখাস্তটা তোমার ফাইলে রেখে দাও,’ নির্দেশ দিলেন রাহাত খান। ‘ও বেলপ্যান থেকে ফিরলে আমাকে দিয়ে সই করিয়ে নিয়ো।’ ‘ইয়েস, সার।’ কাগজটা নিয়ে বসের চেম্বার থেকে বেরিয়ে এল ইলোরা। নিউ ইয়র্ক হয়ে প্রথমে কলম্বিয়ায় চলে এল রানা। রানা এজেন্সির বোগোটো শাখাকে টেলিফোন করে আগেই নির্দেশ দিয়ে রেখেছিল, ফলে পৌঁছাবার সঙ্গে সঙ্গে কলম্বিয়ান রাজধানীর আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে সংগ্রহ করা বেশ কিছু রিপোর্টে চোখ বুলাবার সুযোগ হলো ওর। রিপোর্টগুলো পড়ে নিশ্চিত হলো রানা, ম্যারিয়েটার সন্দেহ মিথ্যে নয় Ñ কলম্বিয়ান ড্রাগ লর্ডরা, মেক্সিকান মাফিয়া ও মার্কিন মাফিয়ার সহায়তা নিয়ে, বেলপ্যানের ভিতর দিয়ে কোকেন ও হেরোইন পাচার করার পাকাপাকি একটা বল্টস্থা করতে চাইছে। এরইমধ্যে ড্রাগের দুটো চালান বেলপ্যানে পাঠিয়েছে তারা, কিন্তু দুটোই ধরা পড়ে গেছে। সর্বশেষ রিপোর্ট থেকে জানা গেল, এই পরিকল্পনার সঙ্গে যে-সব ড্রাগ লর্ডরা জড়িত তাল্ডে প্রতিনিধিরা বেলপ্যানে পাঠাবার জন্য কিছু মার্সেনারি ভাড়া করতে গত হপ্তায় নিকার‌্যাগুয়া গেছে। রানার মনে পড়ল, ম্যারিয়েটার সৎভাই মেজর পিকো রামপাম ওখানে আছে। সম্ভব হলে তার সঙ্গে ওকে দেখা করতে বলেছে ম্যারিয়েটা। পরদিন প্যান অ্যাম-এর একটা ফ্লাইট ধরে নিকার‌্যাগুয়াতে পৌঁছাল রানা। চব্বিশ ঘণ্টা আগে রানা এজেন্সির মানাগুয়া শাখাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে রেখেছিল, ফলে এখানেও পৌঁছাবার সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটা রিপোর্টে চোখ বুলাবার সুযোগ হলো ওর। একটা রিপোর্টে বলা হয়েছে, নিকার‌্যাগুয়ায় প্রচুর প্রবাসী বেলপ্যানিজ আছে। তাল্ডে বেশিরভাগই মার্সেনারি। যুগের পর যুগ লেগে থাকা এখানকার গেরিলাযুদ্ধে মোটা বেতনে ভাড়া খাটে তারা। ৬০ মাসুল্ডানা-৩৬৬ তারপর জানা গেল এই বেলপ্যানিজ মার্সেনারিল্ডেই ভাড়া করতে এসেছে কলম্বিয়ান ড্রাগ লর্ডল্ডে প্রতিনিধিরা, নিজেল্ডে কিছু লোকের সঙ্গে তাল্ডেকে বেলপ্যানে পাঠাবে। বেলপ্যানিজ মার্সেনারি ভাড়া করার কারণ হলো, স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে অনায়াসে মিশে যাবে তারা; পোশাক পরিয়ে দিলেই হয়ে যাবে বেলপ্যানিজ আর্মি। সর্বশেষ রিপোর্টে বলা হয়েছে, বড় একটা জাহাজ নিয়ে বেলপ্যান জলসীমার উদ্দেশে রওনা হতে যাচ্ছে কলম্বিয়ান ড্রাগ লর্ডল্ডে প্রতিনিধিরা। জাহাজে মার্সেনারি ছাড়াও থাকবে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ। রানার জানা আছে অসংখ্য রিফ ও স্যান্ডবার থাকায় বেলপ্যানে কোনও ব›ল্ড নেই, কারণ ওই রিফ ও স্যান্ডবার পেরিয়ে বড় কোনও জলযান তীরে ভিড়তে পারে না। ও ধারণা করল, তীরে পৌঁছাবার জনঞ্জন্য কোনও বল্টস্থা করতে হবে তাল্ডেকে। রানা সিদ্ধান্ত নিল, কোথাও থেকে একটা ক্যাটামার‌্যান ভাড়া করবে ও, বেলপ্যানে পৌঁছে তাল্ডে উপর নজর রাখার জন্য। ক্যাটামার‌্যান নিয়ে রিফ পার হয়ে চলাচল করা অন্য যে-কোনও বোটের চেয়ে সহজ। চাই কী ওকেও ভাড়া করতে পারে ড্রাগ লর্ডরা। পিকো রামপামের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে বেলপ্যান দূতাবাসে চলে এল রানা। ম্যারিয়েটার কাছ থেকে ওর সম্পর্কে আগেই ধারণা পেয়েছে মেজর পিকো, ওর আসার অপেক্ষায় ছিল সে। কুশল বিনিময়ের পর রানাকে সে বলল, ‘আপনার ওপর ভারি আস্থা ম্যারিয়েটার।’ ‘তার আস্থা আপনার ওপরও কম নয়।’ চেহারা ¤−ান হয়ে গেল মেজর পিকোর। ‘জানেন, প্রেসিডেন্ট আমার দেশে ফেরার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন! রোকো রামপাম, আমার নিজের দাদু, বিশ্বাস করা যায়?’ রানা চিন্তিত। ‘তাঁর এ-ধরনের কাজের পেছনে নিশ্চয়ই সঙ্গত আসছে সাইক্লোন ৬১ কোনও কারণ আছে,’ বলল ও। ‘এমন হতে পারে, আপনাকে বিপদ থেকে দূরে রাখতে চাইছেন তিনি।’ ‘আমরা তাঁর আপন লোক, আমাল্ডেকে এভাবে দূরে সরিয়ে রাখলে এই বিপদ থেকে বেলপ্যানকে তিনি রক্ষা করবেন কীভাবে?’ অসহায় ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকাল মেজর পিকো। ‘যাই হোক, তাঁর কথার অবাধ্য হবার দুঃসাহস আমার নেই। কী যে করি, বুঝতে পারছি না!’ রানা আর বলল না যে, নিজের দেশের বিপদ জেনেও গুরুজনের বাধ্য থাকা বা আদেশ মান্য করার অজুহাত দেখানোটা একজন দেশপ্রেমিক সামরিক অফিসারকে একেবারেই মানায় না। তুমি তোমার দাদুর অবাধ্য হতে পারছ না, অথচ বেলপ্যান আমার কী, ম্যারিয়েটা আমার কে Ñ তারপরেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে স্ফাড়াবার জনঞ্জামার তো সাহসের অভাব হয়নি। মার্সেনারি প্রসঙ্গটা তুলল রানা। এ-ব্যাপারে তার কিছু জানা আছে কি না। মাথা ঝাঁকাল মেজর পিকো। ‘অবসর সময়ে আমি একটা বই লিখছি, নাম Ñ নিকার‌্যাগুয়ার গেরিলাযুদ্ধ ও মধঞ্জামেরিকার মার্সেনারি তৎপরতা। সেই সূত্রে বেশ কিছু মার্সেনারির সঙ্গে পরিচয় হয়েছে আমার। তাল্ডে কথাবার্তা থেকে আমিও এরকম একটা আভাস পাচ্ছি বটে।’ রানা গম্ভীর। ‘হুম।’ ‘যা তখন বলছিলাম, এখন দেখতে পাচ্ছি, আপনিই আমাল্ডে একমাত্র ভরসা,’ বলল মেজর পিকো। ‘আমাল্ডে সাহায্যে এতদূর দেশ থেকে ছুটে এসেছেন বলে আমার অভিনন্দন গ্রহণ করুন, মিস্টার রানা। আচ্ছা, বলুন তো, প−্যানটা আসলে কী? কীভাবে শুরু করতে চান আপনারা? আপনার দলটা কত বড়? সব মিলিয়ে ক’জন?’ ‘দল?’ বিস্ময় চেপে রেখে মাথা নাড়ল রানা। ‘আপনার এরকম ৬২ মাসুল্ডানা-৩৬৬ ধারণা হলো কেন যে বেলপ্যানে আমি যুদ্ধ করতে যাচ্ছি?’ থতমত খেয়ে গেল মেজর পিকো, বোকার মত কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকল রানার দিকে। ‘হ্যাঁ, বুঝতে পারছি, আপনার ব্যাপারটা বুঝতে কোথাও ভুল হয়েছে আমার,’ অবশেষে ¤−ান সুরে বলল সে, রানার চেয়ে কম বিস্মিত নয়। ‘কিন্তু তাই বলে আপনি একা...’ কাঁধ ঝাঁকাল রানা। ‘আমার কথা ভেবে আপনার উদ্বিগ্ন হবার ল্ডকার নেই, মেজর,’ বলল ও। ‘না, তবু, আমি বলি কী...’ শুরু করেও কী ভেবে থেমে গেল মেজর পিকো রামপাম। অন্যমনস্ক দেখাচ্ছে তাকে। তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সেদিনই পে−ন ধরে মেক্সিকোয় চলে এল রানা। ওর এজেন্সির মেক্সিকো সিটি শাখার প্রধান প্রত্যয় জাহাঙ্গীরকে নির্দেশ ত্থেয়া ছিল, বেলপ্যান দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাল্ডে প্রেসিডেনশিয়াল রেজিমেন্টের কমান্ডার কর্নেল এসকুইটিলা জুডিয়াপ্পার সঙ্গে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে রেখেছে সে। প্রত্যয়কে নিয়েই ভদ্রলোকের হোটেলের উদ্দেশে রওনা হলো রানা। ম্যারিয়েটা চিঠিতে ঠিকই লিখেছে, কর্নেল জুডিয়াপ্পাও বিশ্বাস করেন বেলপ্যানের বিরুদ্ধে একদল বিদেশী ষড়যন্ত্র করছে। মেক্সিকো সেনাবাহিনীর সাহায্য নিয়ে বিপদ্মা কাটিয়ে উঠতে পারবেন, এই আশা নিয়ে মেক্সিকোয় এসেছিলেন তিনি। কিন্তু প্রায় দুই হপ্তা পার হওয়ার পর এখন তিনি হতাশ, আলোচনা অসম্ভব ধীরগতিতে এগোচ্ছে। কে জানে, শেষ পর্যন্ত তাঁকে না খালি হাতে ফিরতে হয়। পরিচয়-পর্বের পর দুই-চার মিনিটের আলাপেই রানার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠলেন কর্নেল ভদ্রলোক। সুগন্ধী চুরুট খুব ভালবাসেন তিনি, কথা বলবার সময়ও মুখ থেকে নামান না। বললেন, ‘মেজর আসছে সাইক্লোন ৬৩ পিকো রামপামের সঙ্গে টেলিফোনে কথা হয়েছে আমার। আপনি একা বেলপ্যানে যাচ্ছেন শুনে তাজ্জব হয়ে গেছেন তিনি। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, এরকম দুর্ধর্ষ একটা অপরাধীচক্রের বিরুদ্ধে একা একটা মানুষ কী করতে পারবেন, যেখানে ওল্ডে সঙ্গে বছরের পর বছর যুদ্ধ করে যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত জিততে পারেনি? উত্তরে আমি তাকে বললাম, এমনও দেখা গেছে যে একটা সেনাবাহিনী যেখানে যুদ্ধ করে কিছুই করতে পারেনি, নিঃসঙ্গ একজন দুঃসাহসী লোক মাত্র কয়েকদিনের চেষ্টায় তারচেয়ে অনেক বেশি কিছু অর্জন করেছে।’ ‘এখানকার কী অবস্থা?’ জানতে চাইল রানা। ‘যে-জন্যে মেক্সিকোয় এসেছেন আপনি? আপনাকে নিয়ে ম্যারিয়েটা খুব দুশ্চিন্তা করছে।’ ‘বোকা মেয়ে!’ সস্নেহে হেসে উঠলেন কর্নেল জুডিয়াপ্পা। ‘একটা কাজে এসেছি, সেটা শেষ না করে কি ফেরা যায়, বলুন?’ তারপর জানালেন, মেক্সিকো সরকার কী বলে সেটা শোনার জনঞ্জার কটা দিন অপেক্ষা করবেন তিনি, তারপর যুক্তরাষ্ট্র কিংবা প্রয়োজনে কানাডায় গিয়ে হাত পাতবেন। রানা জানতে চাইল, ‘কেন?’ কর্নেল বললেন, ‘যাল্ডে দেশে ড্রাগ পাচারের আয়োজন করা হচ্ছে সরাসরি তাল্ডে সাহায্য চাওয়াই উচিত নয়?’ মনে মনে স্বীকার করল রানা, কথাটায় যুক্তি আছে। তবে তারপরই ভাবল, এই যুক্তিটা ভদ্রলোকের মাথায় দ্ইু হপ্তা আগে কেন ঢোকেনি? প্রত্যয়কে দেখিয়ে তাঁকে রানা বলল, ‘আপনার মিশন সফল হলো কি না, কখন কোথায় থাকবেন, এই সব আপনি ওকে জানিয়ে দিলে আমিও জানতে পারব।’ ‘তার কোনও প্রয়োজন নেই,’ হেসে উঠে বললেন কর্নেল জুডিয়াপ্পা। ‘আপনি আমার সঙ্গে যখন খুশি দেখা করতে আসতে ৬৪ মাসুল্ডানা-৩৬৬ পারেন, ম্যারিয়েটার কাছ থেকে কথাটা শোনার পর আপনার জনেঞ্জামি একটা টু-ওয়ে রেডিও যোগাড় করে রেখেছি।’ একটা ল্ডোজ খুলে রেডিও-ট্র্যান্সমিটারটা বের করে রানার হাতে ধরিয়ে দিলেন তিনি। ‘বিপদ হোক বা অন্য কোনও প্রয়োজন, এটার সাহায্যে যখন খুশি সরাসরি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন আপনি, মিস্টার রানা।’ ‘ধনল্টাদ,’ বলে জিনিসটা নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখল রানা। ‘আমি বেলপ্যানে ফেরার আগেই যè্যািপারটা শুরু হয়ে যায়,’ বললেন কর্নেল জুডিয়াপ্পা, ‘তারপরও আমি আপনাকে সাহায্য করতে পারব। যেখানেই থাকি আমি, সেনাবাহিনীর সদস্যল্ডে নির্দেশ দিলে তারা আপনার সাহায্যে ছুটে যাবে। সংখ্যায় তারা হয়তো খুব বেশি হবে না, তবে...’ আরেকবার ধনল্টাদ দিয়ে কর্নেল জুডিয়াপ্পার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে গেল রানা। এজেন্সির শাখা অফিসে ফেরার সময় যেন কথার কথা বলছে, এমনি ভঙ্গিতে প্রত্যয় জাহাঙ্গিরকে নির্দেশ দিল ও, ‘চোখ-কান খোলা রেখো, বুঝলে?’ শিরস্ফাড়া খাড়া করে সঙ্গে সঙ্গে সাড়া দিল প্রত্যয়, ‘জী, মাসুদ ভাই।’ এক মুহূর্ত পর সবিনয়ে জানতে চাইল সে, ‘মাসুদ ভাই, আমি তো আপনার সঙ্গে বেলপ্যানে যেতে পারি?’ ‘তা হলে এখানকার কাজটা কে করবে?’ পাল্টা প্রশ্ন করল রানা। উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে আবার বলল, ‘তোমাকে হয়তো বেলপ্যানে ল্ডকার হবে আমার, তবে সেটা আরও বেশ অনেক পরে।’ এখানে প্রত্যয়ের কী কাজ তা ব্যাখ্যা করল না রানা। প্রত্যয়ও কিছু জানতে চাইল না। অনেকদিন একসঙ্গে কাজ করলে প্রায়ই এরকম হয় Ñ মুখ ফুটে আসছে সাইক্লোন ৬৫ কেউ কিছু না বললেও, একজন অপরজনের মনের কথা বুঝে নেয়। পাঁচ চার্টার পার্টির চার ল্যাটিনোর মধ্যে একা শুধু মিগু রডরির সঙ্গে সামান্য একটু সম্পর্ক তৈরি হয়েছে রানার। সশস্ত্র লোকটাকে ওর খারাপ লাগে না, যত্থি জানে সময় হলে ওকে খুন করার কাজটা সে-ই করবে। দুজনেই ওরা প্রফেশনাল, সেটাই বোধহয় কারণ। চট্ করে একবার লোরান ইন্ডিকেটর-এর দিকে তাকাল রানা। জোসেফিন আঘাত হানবে আর দু’ঘণ্টা পঞ্চাশ মিনিট পর। পূর্বাভাস বলছে, এখনও দক্ষিণমুখো হয়ে আছে সাইক্লোনটা, তবে সাইক্লোনের যে বৈশিষ্ট্য, হঠাৎ দিক পরিবর্তন করলে আশ্চর্য হওয়ার কিছুই নেই। ‘তুমি কি বিয়ে করেছ, রডরি?’ ‘করেছি, সিনর।’ তৃপ্তির হাসি হাসল গানম্যান লোকটা। ‘তিন ছেলে, তিন মেয়ে। এক ছেলে লইয়ার হবে, একজন হবে চার্টার অ্যাকাউন্ট্যান্ট, তৃতীয়জন হবে পুলিশ অফিসার...’ ‘সবদিক কাভার করেছ দেখছি।’ মৃদু শব্দ করে আবার হাসল রডরি। ‘কোথায়? ডাক্তারটা তো এখনও জন্মায়ইনি।’ ‘আর তোমার মেয়েল্ডে জন্যে স্বামী হিসেবে মনে মনে ঠিক করেছ অনুগত কোটিপতি?’ ‘তা আর বলতে...’ রডরির মুখে হাসি আছে, তবে সে হাসিতে কোনও শব্দ নেই। কোলের কাছে আলগা ভঙ্গিতে ধরে আছে সে পিস্তলটা। ৬৬ মাসুল্ডানা-৩৬৬ হঠাৎ সামনের অন্ধকার থেকে একজোড়া ভারী ইঞ্জিনের আওয়াজ ভেসে এল। জাহাজ হোক বা বোট, কোনও আলো জ্বালছে না। ক্যাটামার‌্যানের বো-র উপর স্ফাড়িয়ে আমলাল্ডে একজন একটা টর্চ জ্বেলে সংকেত দিল। পাঁচ সেকেন্ড পর আরেকবার। উত্তরে একইসঙ্গে দুটো আলো জ্বলে উঠল, সবুজ ও নীল। ‘হেলম্টা ধরে বোট সিধে রাখো তুমি,’ রডরিকে বলল রানা। ‘আমি সিল্কের পালটা নামাই।’ সাবধানে সামনের দিকে এগোল রানা, লক্ষ রাখছে গলায় প্যাঁচানো রশির বাকি অংশ কোথাও যাতে বেধে না যায়। হাত নেড়ে আমলা লোকটাকে সরিয়ে দিয়ে বিরাট আকারের ফোরসেইলটা নামিয়ে ভাঁজ করল ও, তারপর ভরে রাখল সেইলব্যাগে। ভেসেলটাকে এখন দেখা যাচ্ছে। ইটালির তৈরি ষ্ণেশো ফুটি একটা জাহাজ, দল বেঁধে প্রমোদভ্রমণের জন্য ইউরোপিয়ান ধণিক শ্রেণীর খুবই পছন্দ, তবে কলম্বিয়ান ড্রাগ লর্ডরা কোকেন পরিবহনের জনঞ্জনেকদিন থেকেই এগুলো বল্টহার করছে। প্রতিটি ইঞ্জিন দু’হাজার হর্সপাওয়ার, শান্ত পানিতে ঘণ্টায় ত্রিশ নট স্পিড। তবে অশান্ত সাগরে এই জাহাজ বিশেষ সুবিধে করতে পারে না। কার্গো নামিয়ে দিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কেটে পড়ার জন্য নিশ্চয়ই অস্থির হয়ে আছে স্কিপার। ফেরার সময় জোসেফিনের সঙ্গে দৌড়- প্রতিযোগিতায় নামতে হবে তাকে। ককপিটে ফিরে এসে শুধু মেইনসেইল-এর সাহায্যে ক্যাটামার‌্যান চালাচ্ছে রানা, ধবধবে সাদা প্রমোদতরীটাকে ঢেউয়ের সঙ্গে অলসভঙ্গিতে দুলতে দেখছে। ওটার আফটারডেকে এখন লোকজন দেখা যাচ্ছে। তাল্ডে মধ্যে দুজন লোক সাদা ইউনিফর্ম পরা। বাকি সবাই স্রেফ গাঢ় আকৃতি। সেলুন থেকে উপরে উঠে এসেছে পাবলো টিকালা। বাল্কহেডে আসছে সাইক্লোন ৬৭ হেলান দিয়ে স্ফাড়াল সে, হাত দুটো কেবিন টপ-এর উপর স্থির। চোখ ফিরিয়ে নিয়ে রডরির দিকে তাকাল রানা। ‘আমি চাই না তোমাল্ডে জাহাজ আমার ক্যাটামার‌্যানে চড়াও হোক,’ বলল ও। ‘ওল্ডে নিশ্চয়ই স্টার্ন ল্যাডার আছে। আমরা জাহাজের পেছনে চলে যাচ্ছি, দুটো ভেসেল পরস্পরের উল্টোদিকে মুখ করে থাকবে। তারপর একটা লাইন ছুঁড়ব আমরা। ওরা ওই মই-এর সাহায্যে কার্গো আনলোড করবে।’ সমস্ত প্রস্তুতি শেষ হওয়ার পর শুরু হলো কার্গো নামানোর কাজ। একজন নাবিকের পিছনে স্ফাড়িয়ে অপেক্ষা করছিল বিশ-বাইশজন মার্সেনারি। তাল্ডে পরনে জাঙ্গল ফেটিগ ও কালো বেরেট। বুটগুলো গলায় ঝুলছে। প্রত্যেকের হাতে কালাশনিকভ অটোমেটিক রাইফেল, হিপ- হোলস্টারে সেমি-অটোমেটিক পিস্তলও আছে, আর বেল্টে আটকানো পাউচে আছে গ্রেনেড। ‘প্রথমে আমরা দশজনকে নেব হ্যান্ডলার হিসেবে,’ বলল রানা। ‘তারা কার্গো তোলার পর বাকি লোক আসবে।’ সশস্ত্র লোকগুলো একটু বেঁটে, শক্ত-সমর্থ বেলপ্যানিজ মার্সেনারি। ভাড়াটে সৈনিক, কাজেই এল্ডে কাছ থেকে নীতি বা দেশপ্রেম আশা করা যায় না, ভাবল রানা। ভাড়াটে সৈনিক না বলে এল্ডেকে আসলে বলা উচিত ভাড়াটে খুনি। স্বঘোষিত কলম্বিয়ান রাজাল্ডে ছত্রছায়ায় থাকে তারা, কোকেন টেরোরিস্ট হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে, রাজাল্ডে নির্দেশে বাসস্টেশন, ট্রেন, সিনেমা হল, আদালত, জনসভায় বোমা মেরে নিরীহ লোকজনকে খুন করে, বাংলাদেশের জেএমবি-র মত, দেশে শুধু অরাজক একটা অবস্থা সৃষ্টি করবার জন্য। কার্গো স্থানান্তরের এক পর্যায়ে রানার পিছন থেকে ল্যাটিনোল্ডে লিডার টিকালা বলল, ‘আমি চাই, কিছু বাক্স আমাল্ডে সঙ্গে সেলুনে ৬৮ মাসুল্ডানা-৩৬৬ থাকবে।’ তার দিকে ফিরল রানা। ‘আমি আগেই সাবধান করেছিলাম। সব কার্গোই যোডিয়াকে তুলতে হবে, তা না হলে ক্যাটামার‌্যানের ওজন বেশি হয়ে যাবে।’ রানার সামনে স্ফাড়িয়ে আছে টিকালা, অথচ পুরোপুরি চোখ তুলে ওর দিকে তাকাচ্ছে না, তার দৃষ্টি খুব বেশি হলে রানার হাঁটু পর্যন্ত উঠছে। ‘বাক্সগুলো তিন সাইজের, সিনর ক্যাপিটানো,’ বলল সে। ‘ছোটগুলোর ছ’টা ও বড়গুলোর দুটো সেলুনে থাকবে।’ তার চেহারায় কোনও রকম ভাব নেই। ‘সত্যি যদি সমস্যা হয়, তিনজন লোক যোডিয়াকে থাকুক।’ অন্ধকার সাগরে অনভিজ্ঞ তিনজন লোক ঢেউ ভাঙা পানির ঝাপটায় কেমন ভুগবে কল্পনা করে গম্ভীর হয়ে উঠল রানা। তারপর রিফ-এ আছাড় খাওয়া সার্ফ থেকে যখন গগনবিদারী আওয়াজ বেরুবে, আতঙ্কে জ্ঞান হারালেও বিস্ময়ের কিছু নেই। তবে টিকালার কাছে প্রসঙ্গটা নেহাতই দুর্বোধ্য, আলোচনা করতে যাওয়াটা মারাত্মক বিপজ্জনকও বটে। ‘আমার কী, ওরা তোমার লোক,’ বলল রানা। ‘ওল্ডেকে একটা টর্চ দিচ্ছি আমি।’ চোখ জোড়ার পরদা সরাল টিকালা। বিষাক্ত সাপের ঠাণ্ডা দৃষ্টি। তার কণ্ঠ¯ল্ফও সাপের মত হিসহিসে। ‘ওল্ডে টর্চ ল্ডকার নেই, সিনর ক্যাপিটানো।’ আতঙ্কিত হয়ে আলোটা যদি দোলায়! ‘তুমি যা বলো,’ বলে ক্যাটামার‌্যানে কার্গো তোলার কাজ তদারক করতে ব্যস্ত হয়ে উঠল রানা। টিকালার দেখিয়ে ত্থেয়া বাক্সগুলোয় কালাশনিকভ ও বেরেটার অ্যামিউনিশন, প্রচুর গ্রেনেড, ছ’টা কনভেনশনাল রকেট লঞ্চার ও মিসাইল রয়েছে। এরপর এল মার্সেনারিল্ডে লিডার হোসে বেনিটো। কিছুটা বেঁটে আসছে সাইক্লোন ৬৯ ও রোগা; হাঁটা-চলার ভঙ্গিতে ছটফটে একটা ভাব। চোখ দুটো ছোট, মুখের বাম দিকে শুকনো একটা কাটা দাগ। টিকালার সঙ্গে সবিনয়ে কুশল বিনিময় করল বেনিটো। বাকি সব মার্সেনারির মত তার জাঙ্গল ফেটিগের কাঁধেও বেলপ্যান ডিফেন্স ফোর্স-এর প্রতীক চিহ্ন সেলাই করা রয়েছে। তার পিছু নিয়ে এল যারা, প্রত্যেকে তারা পেশাদার খুনি। কজন কোথায় থাকবে বলে দিল রানা। যোডিয়াকে তিনজন। চারজন সামনে, দুটো ফোরকেবিনে। চারজন করে আটজন দুটো স্টার্ন কেবিনে। পাঁচজন মেইন সেলুনে। তাল্ডে একজনকে বুট পরা পা নিয়ে ট্যাফরেইল টপকাতে দেখল রানা। ‘এই, থামো তুমি!’ চেঁচিয়ে উঠল ও। চোখে-মুখে কৃত্রিম দিশেহারা ভাব ফুটিয়ে তুলে নীচে তাকাল লোকটা। ‘আমাকে কেউ কিছু বলল নাকি?’ ‘হ্যাঁ, আমি বলছি। পা থেকে বুট জোড়া খোলো।’ খিকখিক করে হাসল লোকটা। ‘ওহে, শুনছ তোমরা, গলায় রশি বাঁধা একটা বিদেশী কুত্তা কথা বলছে। শেষ পর্যন্ত এ-ও কি আমাল্ডেকে বিশ্বাস করতে হবে, অ্যাঁ?’ সবাই চুপ করে আছে, যেন খারাপ কিছু ঘটবে বলে ধারণা করছে তারা। কিংবা উত্তেজক কিছু। সঙ্গীল্ডে দিকে ফিরে আরেকবার খিকখিক করে উঠল লোকটা। অপর পা-ও তুলল সে, রেইলে বসল, একদলা থুথু ফেলল রানার পায়ের কাছে। সবশেষে মাথাটা পিছনদিকে কাত করে কুকুরছানার ডাক নকল করল Ñ কেঁউ-কেঁউ, ঘেউ-ঘেউ। ‘শোন্, শালা নেড়ি, পেছনেও নজর রাখিস, ঠেকায় পড়লে কুকুরও ধরে খাই আমরা!’ লাফ দিয়ে নীচে নামল সে, ইচ্ছে করে বুটের কিনারা ঘষে নোংরা করছে ঝকঝকে তকতকে ডেক। ৭০ মাসুল্ডানা-৩৬৬ আবার রানার দিকে থুথু ছিটাল সে। বাকি সবার চেয়ে লম্বায় ছোট হলে কী হবে, চওড়ায় অনেক বেশি, স্বাস্থদ্দ খুব ভাল। ‘তুমি প্রভুভক্ত, বিদেশী কুত্তা? ভালডেজ লাফাজা আল্ড করলে লেজ নাড়বে?’ মেজাজ সপ্তমে চড়ে গেল রানার। লোকটাকে কিছুই টের পেতে দেয়নি, ধাম করে প্রচণ্ড ঘুসি মারল তার নাকে। ছিটকে পড়ে গেল লোকটা, পড়েই গড়িয়ে দিল শরীরটাকে, যেন জানে রানা তাকে ধরতে আসবে। লাফ দিয়ে সামনে বাড়ল রানা, প্রতিপক্ষ নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার আগেই কষে একটা লাথি মারল তার তলপেটের বেশ খানিকটা নীচে। যেন কিছুই হয়নি, ছোট্ট একটা লাফ দিয়ে সিধে হলো লাফাজা। ‘আমি বোকা অ্যারেনাস তোর পাশেই আছি, লাফাজা,’ তার সঙ্গীল্ডে একজন চেঁচিয়ে বলল। ‘সাহায্য লাগলে বলিস!’ দু’পা ফাঁক করে স্ফাড়াল লাফাজা, হাতে বেরিয়ে এসেছে লম্বা একটা ছুরি। লোকটার ঠোঁটের কোণে সামান্য ফেনা জমেছে। চোখ দুটোয় কেমন যেন ঘোর লাগা দৃষ্টি। সাধারণত খুনির চোখেই এরকম ঘোর লাগে। এটা আসলে রক্তের নেশা। কয়েক জোড়া হাত পিছন থেকে জড়িয়ে ধরল রানাকে। ওর দুই হাত শরীরের দু’পাশে চেপে ধরল। রানার পেট লক্ষ্য করে ছুরি চালাতে যাচ্ছে লোকটা, সবগুলো স্ফাত বের করে নিঃশব্দে হাসছে। ঠিক এমনি সময় মুখ খুলল টিকালা, কণ্ঠ¯ল্ফ বরফ। ‘ফেলো ওটা।’ অকস্মাৎ ধাক্কা খেল লাফাজা, যেন ইস্পাতের একটা ল্ডজা তার মুখের উপর বন্ধ করে দিয়েছে কেউ। আঙুলগুলো খুলে গেল, ডেকে পড়ে ড্রপ খেল ছুরিটা, কিনারা দিয়ে পড়ে গেল সাগরে। তবে তার চোখ স্থির হয়ে আছে রানার উপর, ঘৃণায় উন্মত্ত আসছে সাইক্লোন ৭১ দেখাচ্ছে। ‘আমার হাতে খুন হবি তুই, বিদেশী কুত্তার বাচ্চা!’ ফুঁ দিয়ে মুখের কোণ থেকে খানিকটা ফেনা ঝরাল সে। কিছুটা সামলে নিয়ে আবার বলল, ‘অপেক্ষা করো, বিদেশী মেজর, অপেক্ষা করো। আমার নাম ভালডেজ লাফাজা...’ শরীরটা ঝাঁকিয়ে নিজেকে মুক্ত করল রানা, তারপর লোকটার দিকে পিছন ফিরল। ‘শয়তানের বাচ্চাটাকে বুট খোলাও,’ টিকালাকে বলল ও। ‘তারপর নীচে নামতে বলো। তা না হলে তোমাল্ডেকে আমি সোজা নিয়ে গিয়ে রিফে তুলে èে।’ রুমাল দিয়ে নাকের ফুটো চেপে ধরল টিকালা। নিশ্চয়ই সুটকেস ভর্তি রুমাল আছে তার। ‘লাফাজা, বুট খোলো।’ নিঃশব্দে তার নির্দেশ পালন করল লাফাজা, ট্যাফরেইল টপকে চোখের আড়ালে চলে গেল। রানার দিকে ফিরল টিকালা। ‘গলায় রশি থাকায় মরতে আমাল্ডে চেয়ে বেশি সময় নেবে তুমি, সিনর ক্যাপিটানো।’ তার কথা শুনতে না পাওয়ার ভান করে তিন যোডিয়াক আরোহীর একজনকে রানা শেখাচ্ছে ক্যাটামার‌্যানের সঙ্গে বাঁধা ফিশিং লাইনটা কেটে গেলে বো কীভাবে বাতাসের দিকে ধরে রাখতে হবে। ওর পাশে এসে স্ফাড়াল টিকালা। ‘আমাল্ডেকে দেরি করিয়ে দেয়ার পরিণতি অত্যন্ত বিপজ্জনক হবে, সিনর ক্যাপিটানো।’ পোর্টসাইড ককপিট লকার থেকে লাইফজ্যাকেট বের করল রানা। আরোহীরা দ্রুত পরছে ওগুলো। ও বলল, ‘শান্ত থাকো, স্থির থাকো, কারও কোনও বিপদ হবে না।’ মার্সেনারিল্ডে লিডারের দিকে তাকাল ও। ‘ডেকে যত কম লোক থাকে ততই ভাল।’ যাত্রার প−্যান এরইমধেশুানার মাথার ভিতর তৈরি হয়ে গেছে। ‘রডরি আমার কাজে লাগবে, সামান্য হলেও শিখেছে ও। আরেকজনকে ল্ডকার মাস্তুলে। বেনিটো, রশি বল্টহার করার অভিজ্ঞতা, সেইসঙ্গে পায়েও জোর আছে, এমন একজন লোক ৭২ মাসুল্ডানা-৩৬৬ ল্ডকার আমার।’ যোডিয়াকে প্রচুর কার্গো থাকায় ক্যাটামার‌্যান গ্রাসিয়াসের স্পিড ঘণ্টায় পাঁচ নটের বেশি উঠল না। প্রায় আধ ঘণ্টা হলো গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির মধেঞ্জাকারে ক্রমশ বড় হচ্ছে ঢেউগুলো। ওল্ডে সামনে থেকে ভেসে আসছে রিফ-এর গায়ে সার্ফ-এর আছড়ে পড়ার গর্জন, ভয়ে কাঁপন ধরে যাচ্ছে শরীরে। রিফ-এর ডুবে থাকা বিস্তৃতিতে ধাক্কা খেয়ে ঢেউগুলো একের পর এক ভাঙে, বিস্ফোরিত বিপুল জলরাশি ফেনা ও বুদ্বুদে পরিণত হয়, তারপর আছাড় খায় পানির উপর খাড়া রিফ প্রাচীরের গায়ে। বাতাস এমনিতে শান্ত, তবে মাঝে মধ্যে দমকা বাতাস এসে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। রিফ-এর গ্যাপ-এ পৌঁছাতে আর দশ মিনিট। তারপর মেইনল্যান্ডের নাগাল পেতে আরও পঁয়তালি−শ মিনিট। নদীর উজান ধরে এগিয়ে তীরে ভেড়ার পয়েন্টে থামতে আরও বিশ মিনিট। রানার নির্দেশে হাতে ধারাল ছুরি নিয়ে স্টার্ন-এ, একটা গোঁজ- এর কাছে বসেছে রডরি। বিপজ্জনক, বেয়াড়া টাইপের জোরাল বাতাস শুরু হলেই ফিশিং লাইন কেটে দিয়ে যোডিয়াককে মুক্ত করে দেবে। তার নাগালের মধেঞ্জারও একটা রশি রয়েছে, রানার নির্দেশ পেলে সেটা কেটে তার দিকের একটা পাল তুলতে হবে তাকে। একের পর এক সিগারেট ফুঁকছে রডরি। প্রতি আধ মিনিট পরপর লোরান নেভিগেশন ইন্ডিকেটরের দিকে তাকাচ্ছে। ‘আসছে ওটা?’ জাহাজটাকে পিছনে ফেলে আসবার পর পাঁচবার জানতে চাইল সে। ‘এখনই নয়,’ বলল রানা। ‘হয়তো আরও দু’ঘণ্টা পর। কিংবা আরও দেরি করবে। প্রথমে জোরাল দমকা বাতাস শুরু হবে, ছোটখাট ঝড়ের মত।’ আর ঠিক তখনই অন্ধকার থেকে ধেয়ে এল প্রবল একটা আসছে সাইক্লোন ৭৩ বাতাস। ছোট্ট একটা ঝড়ের এমনই গর্জন, রিফ প্রাচীরে ঢেউ ভেঙে পড়বার আওয়াজও চাপা পড়ে গেল। কোনও নোটিশ ছাড়াই সাদা ফেনার রেখা ছুটে এল ওল্ডে দিকে। পালে বাতাস লাগতেই রানার চিৎকার শোনা গেল, ‘কাট্!’ অন্ধকারেও রডরির ছুরির ফলা ঝলসে উঠতে দেখতে পেল ও। সম্ভবত ভয় পেয়েই হঠাৎ স্ফাড়িয়ে পড়ল রডরি, ঠিক যখন লাফ দিয়ে সামনে বাড়তে শুরু করেছে ক্যাটামার‌্যান। তার পায়ে জড়িয়ে গেল যোডিয়াকের সঙ্গে বাঁধা ফিশিং লাইনটা। দু’হাত দু’দিকে মেলে দিয়ে তাল সামলাবার চেষ্টা করছে সে, পিছু হটল, ভারী যোডিয়াকের টানে ঝপাৎ করে পড়ে গেল হঠাৎ উত্তাল হয়ে ওঠা সাগরে। পানির স্পর্শ পেয়েই প্রাণভয়ে আর্তনাদ করে উঠল সে। মাস্তুলের দিকে ফিরে বোকা অ্যারেনাসকে নির্দেশ দিল রানা, ‘পাল নামাও!’ বনবন করে হেলম্ ঘুরিয়ে বাতাসের দিকে বোট ঘুরিয়ে নিল ও, নিজের দিকের ছোট ও লম্বাটে আরও দুটো পাল -এর রশিতে টান দিল, তারপর মুহূর্তমাত্র দেরি না করে ডাইভ দিল নিকষ-কালো সাগরে। গলায় বাঁধা রশিটার কথা ভুলে গিয়েছিল রানা। ঝাঁকিটা খাওয়ার পর মনে হলো কাঁধ থেকে মাথাটা বুঝি ছিঁড়ে গেল। দশবার পা ছুঁড়ে রডরির কাছে পৌঁছে গেল ও, ডুবে যাওয়ার আগেই খপ করে খামচে ধরল তার গায়ের শার্ট। ঢেউয়ের ঝাপটা নাকানিচোবানি খাওয়াচ্ছে ওল্ডেকে। খালি হাতটা দিয়ে গলায় বাঁধা রশিটা ধরেছে রানা, রডরিকে বলল, ‘ভয় পেয়ো না! মরবে না তুমি!’ একটা ঢেউ ওল্ডেকে মাথায় তুলে নিল, সেখান থেকে ককপিটের লোকজনকে দেখতে পেল রানা। ওর গলায় পরানো রশিতে ঢিল পড়ল এতক্ষণে। সুযোগ পেয়ে ডুব দিল রানা। রডরির পায়ে জড়িয়ে থাকা ৭৪ মাসুল্ডানা-৩৬৬ লাইনের প্যাঁচ খুলল। তারপর যোডিয়াক-এর সঙ্গে বাঁধা লাইনের আরেকদিক নিজের কবজির সঙ্গে জড়িয়ে নিয়ে উঠে এল সারফেসে। সঙ্গে সঙ্গে নতুন বিপদ দেখা দিল, ভয় পেয়ে রডরি ওর গলাটা জড়িয়ে ধরেছে, যেন দম বন্ধ করে দিয়ে মেরে ফেলবে। কোনও বিকল্প দেখতে না পেয়ে ভাঁজ করা হাঁটু দিয়ে রডরির তলপেটে গুঁতো মারল ও। বলল, ‘সরি।’ যত্থি মারটা খাওয়ার পর তার জ্ঞান আছে কি না সন্দেহ। সার্ফ-এর গর্জন কাছে চলে আসছে। ককপিট থেকে ছুঁড়ে ত্থেয়া লাইফজ্যাকেট ধরে রডরিকে নিয়ে ক্যাটামার‌্যানে উঠল রানা। বোকা অ্যারেনাস এখনও মাস্তুলের কাছে ডিউটি দিচ্ছে। ‘পালগুলো তোলো,’ তাকে নির্দেশ দিল রানা। রিফ আর মাত্র দুশো গজ দূরে হওয়ায় এখন আর দম ফেলবার সময় নেই ওর। ‘বড়গুলো প্রথমে।’ পালে বাতাস লাগল। বোট ঘুরিয়ে নিয়ে একটা বৃত্তাকার পথ ধরে যোডিয়াকের দিকে ফিরে চলল রানা। ‘কেউ একজন লাইনটা টানো,’ বলল ও। ‘জোরে নয়, ছিঁড়ে যেতে পারে। আমি শুধু দেখতে চাই কোন্দিকে গেছে ওটা।’ উর্দি পরা এক লোককে ডেকে রডরির পা থেকে ছাড়ানো লাইনটা রড-এর লাইনের সঙ্গে নতুন করে বাঁধতে বলল রানা। ‘বাকি তোমরা সবাই নীচে নেমে যাও।’ এতক্ষণে খেয়াল করল রানা, সেলুন বাল্কহেডে হেলান দিয়ে স্ফাড়িয়ে রয়েছে টিকালা। ল্যাটিনো লিডারের কথা ভুলে গিয়েছিল ও। চোখের পাতা সামান্য উঁচু করে তাকে লক্ষ করছে লোকটা। বেনিটোর লোকজন একজন দুজন করে ডেক থেকে নীচে নেমে গেল, শুধু রড নিয়ে ব্যস্ত এক লোক, ডেকে পড়ে থাকা রডরি ও মাস্তুলের পাশে বোকা অ্যারেনাস রয়ে গেল। ধীর, অলস পায়ে রডরির কাছে এসে থামল টিকালা। রানাকে আসছে সাইক্লোন ৭৫ বলল, ‘আমাল্ডে দেরি করিয়ে দিলে, সিনর ক্যাপিটানো।’ ‘আমি না গেলে তোমার একজন লোক মারা যেত। সেটা কিছুই না?’ জিজ্ঞেস করল রানা। রডরির পেটে কষে লাথি মারল টিকালা। হড়হড় করে বমি করল রডরি। ‘না, কিছুই না। সময় ওর চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, সিনর ক্যাপিটানো।’ ‘তুমি একটা সাইকোপ্যাথ,’ বলল রানা। ‘ভাবতে আশ্চর্য লাগছে এখনও কেউ তোমাকে পাগলাগারদে ভরেনি কেন।’ আবার বেরিয়ে এল সদাপ্রস্তুত সাদা রুমাল। সেটা শুঁকল টিকালা, আলতো করে নাকে চেপে। ‘গলায় যখন রশি বাঁধা থাকে, সিনর ক্যাপিটানো, সেটার অপরপ্রান্ত ধরে থাকা লোকটাকে অপমান করা মারাত্মক ভুল।’ গলা চড়াল সে, ‘লাফাজা, পি−জ, সিনর ক্যাপিটানোর সঙ্গে বসো তুমি...’ বাতাসের টানে যোডিয়াক কোথায় ছুটে যাচ্ছে কে জানে, রিফে পৌঁছানোর আগে সেটাকে আদৌ উদ্ধার করা সম্ভব কি না বুঝতে পারছে না রানা। অন্ধকারে লাইনটা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। ওল্ডে সামনে ক্ষুধার্ত সিংহের মত মুহুর্মুহু গর্জন ছাড়ছে রিফ। ক্যাটামার‌্যানের মাঝামাঝি জায়গায়, ডানপাশে বসা লোকটাকে রানা নির্দেশ দিল, ‘রড-রিল ছেড়ে হাত দিয়ে লাইন টানো।’ কন্ট্রোল কেবিনের ল্ডজার সামনে স্ফাড়িয়ে রয়েছে ও। লাইন দ্রুত টানতে না পারলে অন্ধকারে যোডিয়াকের উপর চড়াও হবে ক্যাটামার‌্যান। ‘বো-র কাছে চলে যাও, কিছু টের পেলেই গলা চড়িয়ে হাঁক ছাড়বে।’ তারপর দেখা গেল আর মাত্র একশো গজ দূরে রিফ। রানা ধরে নিল, যোডিয়াকটা হারিয়েছে তারা, তিনজন লোকসহ। এই সময় রড-ম্যান চেঁচিয়ে উঠল, লম্বা করা হাত সামনের সার্ফ- এর দিকে তাক করা। হেলম ঘুরিয়ে ক্যাটামার‌্যানের বো সরাসরি বাতাসের দিকে ৭৬ মাসুল্ডানা-৩৬৬ ফিরিয়ে আনল রানা, তারপর পিছনদিকে তাকাল। সাদা জলোচ্ছ্বাসের গায়ে আতঙ্কিত লোকজনের আকৃতি দেখা যাচ্ছে, উন্মত্তভঙ্গিতে হাত নাড়ছে তারা। যোডিয়াকের জন্য মাত্র পঞ্চাশ গজ দূরে ধ্বংসযজ্ঞ অপেক্ষা করছে। ওটার আরোহীল্ডে কাছ থেকে ক্যাটামার‌্যান গ্রাসিয়াস ত্রিশ গজ দূরে। ঝড় এখনও আসেনি, শুধু মাঝে মধ্যে এদিক-ওদিক থেকে দমকা বাতাস ঝাপটা মারছে। তেকোনা পালটা টেনে ধরে রেখেছে রানা। এখনও রিফের দিকে পিছন ফিরে আছে গ্রাসিয়াস। ওর পাশে এক লোক রয়েছে, রশি জড়ো করে রেডি রাখছে। দেখবার সময় নেই লোকটা কে। আর দশ গজ। ছুঁড়ে ত্থেয়া রশির প্রান্ত যোডিয়াকে পড়ল। সেটা ধরে টানতে শুরু করল এক লোক। ‘জলদ্মিানো!’ চেঁচিয়ে বলল রানা, তবে লোকটা শুনতে পেল বলে মনে হলো না। গলা আরও চড়াল ও। ‘বাঁধো!’ তেকোনা পালের রশি ছেড়ে দিল রানা, টান দিল মেইন সেইল- এর রশিতে। একক্ষণে গ্রাসিয়াস ঘুরতে শুরু করল, তবে প্রকাণ্ড একটা ঢেউ এসে বাধা দিল, ঠেলে পিছিয়ে দিল আগের জায়গায়। রিফ আর পঞ্চাশ গজ দূরেও নয়। মাস্তুলের মূল পাল ফুলে উঠল, এক নিমেষে বেড়ে গেল ক্যাটামার‌্যানের স্পিড। রিফ আর বিশ গজ। এই স্পিডে এখনও রানা নিশ্চিত নয় গ্রাসিয়াস নিরাপদে রিফ পার হতে পারবে কি না। দশ গজ... এখনই! ভাবল ও, সেই সঙ্গে হেলম্ ঘোরাল। স্রোতের ভিতর বো নাক গলিয়ে ত্থেয়ার সময় থরথর করে কেঁপে উঠল ক্যাট। সেই মুহূর্ত থেকে ওটাকে উপরে তুলতে শুরু করল ঢেউ। তুলছে তো তুলছেই, পালগুলো বিরতিহীন পতপত করছে। থামো, নিজেকে সতর্ক করল রানা। এক সেকেন্ড, দু’সেকেন্ড, তিন... গ্রাসিয়াসের প্রতিটি পাল বাতাসে ভরাট হয়ে উঠেছে। আসছে সাইক্লোন ৭৭ যোডিয়াককে নিয়ে এখন আর রানা মাথা ঘামাচ্ছে না। ওর কিছু করার নেই Ñ রক্ষা পেলে পাবে, নয়তো নয়। এই সময় টো রোপ-এ টান অনুভব করল ও। কাজেই ঘাড় ফিরিয়ে পিছন দিকে না তাকিয়ে পারল না। প্রথম একমুহূর্ত শুধু সফেদ সার্ফ-এর পাঁচিল দেখতে পেল রানা। তারপর ধবধবে ফেনার গায়ে গাঢ় একটা আকৃতি চেনা চেনা লাগল Ñ যোডিয়াক। টো-র কাজ ভালভাবেই চলছে, তবে যোডিয়াকের ওজন ক্যাট- এর স্পিড কমিয়ে দিয়েছে অনেক, সেই সঙ্গে ক্রমশ বাতাসের কাছ থেকে দূরে যাচ্ছে ওরা। ‘সবাই সাবধান!’ চিৎকার করে বলল রানা, জানে না কারও কানে পৌঁছাবে কি না। ‘রিফ পেরুচ্ছি আমরা।’ আবার হেলম ঘোরাল রানা। এবারও বো-কে ঠেকিয়ে দিতে চেষ্টা করল বড় একটা ঢেউ। চোখের কোণ দিয়ে রানা দেখল গাঢ় একটা মূর্তি তেকোনা পালের রশিটা ধরে হ্যাঁচকা টান দিল কয়েকটা, বাতাসের দিকে মুখ ঘোরাতে বাধ্য করল ওটাকে। স্রোতের বিরুদ্ধে বো ঝাঁকাল ক্যাটামার‌্যান, পরমুহূর্তে বাতাসের সঙ্গে একই দিকে ছুটল, সবগুলো পাল আবার ফুলে উঠেছে। তবে দশ গজ পিছিয়ে পড়েছে ওরা, ফলে যোডিয়াকটা আবার সার্ফ-এর কাছাকাছি ফিরে গেছে। চোখ ঘুরিয়ে লোরান ইন্ডিকেটর- এর দিকে তাকাল রানা। রিফ-এর গ্যাপটা পোর্ট বো সাইডের দুশো গজ সামনে। আরও ক্যানভাস ল্ডকার ওর, কিন্তু হেলম্ ছেড়ে নড়ার উপায় নেই। চট করে একবার রডরির দিকে তাকাল। হাত-পা ছড়িয়ে এখনও নিঃসাড় পড়ে আছে সে। তার কাছ থেকে কোনও সাহায্য পাওয়া যাবে না। ওর পাশে রয়েছে ছুরি হাতে ছোটখাট ভালডাজ লাফাজা, বার্থডে পার্টিতে অতি উত্তেজিত স্কুলছাত্রীর মত খিকখিক করে হাসছে ৭৮ মাসুল্ডানা-৩৬৬ সারাক্ষণ। রানা তাকে সাদা পাউডার ঢোকাতে দেখল নাকে। নাকের ফুটোর চারপাশে সাদা বৃত্ত তৈরি হলো। ‘এই যে, বিদেশী কুত্তা,’ রানার দিকে ফিরে আবার হাসল সে, চোখে কেমন পাগলাটে দৃশ্য। ‘তোমার ওই ছোট্ট সিল্ক পাল দিয়ে কোনও কাজ হবে না। আর সব পাল কোথায়, অ্যাঁ? লাফাজাকে বলো, সে তোমাকে সাহায্য করবে।’ হঠাৎ মনে পড়ল রানার, ঠিক প্রয়োজনের সময় রশি জড়ো করে রাখছিল একজন লোক Ñ লাফাজা? ‘পোর্টসাইড সেইল-লকার। কালো ব্যাগ, গায়ে সাদা বোট আঁকা আছে।’ একটা ঢেউ ক্যাটামার‌্যানকে আরও একটু এগিয়ে দিল রিফ-এর দিকে। গ্রাসিয়াস ঝাঁকি খাচ্ছে, গ্রাহ্য না করে ছুটল লাফাজা। পরবর্তী ঢেউ গ্রাসিয়াসকে উঁচু করল। ঢেউটার ঢাল বেয়ে নীচে নামার সময় কিছু বাড়তি গতি পাওয়া গেল। দ্রুত হেলম্ ঘুরিয়ে, তেকোনা সিল্ক পাল-এর রশি কষে টেনে রাখল রানা, যতক্ষণ না বাতাসের দিকে ঘুরল বো। তারপর দুটো পালেরই ক্যানভাস রিলিজ করে দিয়ে ঘাড় ফিরিয়ে পিছন দিকে তাকাল। দেখল একটা ঢেউয়ের চূড়া থেকে নামতে শুরু করেছে যোডিয়াক। ঝাঁকি খেয়ে টান টান হলো টো রোপ, ভাঙতে শুরু করা ঢেউ থেকে টেনে আনল ডিঙ্গিটাকে। সামনে অপেক্ষা করছে প্রবাল প্রাচীর। বো-র ওদিকে স্ফাড়িয়ে ব্যাগ থেকে আরেক প্রস্থ পাল বের করল লাফাজা। সাইড ডেকে বেরিয়ে এল সে, পোর্টসাইডের আলগা রোপটা টেনে আনছে শিট উইঞ্চ-এর দিকে। আপনমনে কথা বলছে লাফাজা, ‘ও হে, লাফাজা, তোমাকে দিয়েও তা হলে ভাল কাজ হয়, কি বলো, হ্যাঁ? হে-হে, মাইরি বলছি! আমার, শালা, নিজেরই পিঠ চাপড়াতে ইচ্ছে করছে!’ মুখের সামনে হাত তুলল সে, কুকুরের মত ঘেউ ঘেউ ডাক আসছে সাইক্লোন ৭৯ ছাড়ল কয়েকটা, হাত দুটো থেমে নেই। একটু পরেই স্টারবোর্ড শিট- এর জন্য সামনের দিকে ছুটল, লাফ দিয়ে ঢুকে পড়ল ককপিটে। রানাকে বলল, ‘এবার আমরা শালা বড় পালটা মাস্তুলে তুলব, খুদে কুত্তা। তুমি রেডি?’ লোকটাকে ঝেড়ে একটা লাথি মারার ইচ্ছেটাকে কোনও রকমে দমন করল রানা। উপকার করছে, দমন করতে পারার সেটাই প্রধান কারণ। কথা না বলে মাথা ঝাঁকাল রানা। হলুèড় পালটা তোলার পর ঢেউগুলোকে অগ্রাহ্য করে রীতিমত দৌড় ত্থেয়ার মত ছুটতে শুরু করল ক্যাটামার‌্যান। তরতর করে ওটার পিছু নিয়ে আসছে যোডিয়াকটা। রিফ বিরতি গাঢ় বিস্তৃতির মত লাগছে, পোর্ট কোয়ার্টার থেকে এখনও খানিকটা দূরে। চোখ থেকে বৃষ্টির পানি মুছল রানা, যোডিয়াকের পিছুটানের কথা মাথায় রেখে হিসাব করছে দূরত্বটুকু পেরুতে কী রকম সময় লাগবে। উইঞ্চে রোপ ঢুকিয়ে তৈরি হয়ে আছে লাফাজা, যখন খুশি যাতে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে বড় পালটাকে। ‘এবার রিফ পেরুতে যাচ্ছি,’ বলল রানা। রকেটের বেগে রিফ- এর ফাঁক গলে বেরিয়ে আসছে ওরা। কোনও সমস্যা হলো না, ঢেউ- এর মাথায় চড়ে সাবলীলভাবে পিছনে ফেলে এল বিপদ্মাকে। ‘তুমি বোট চালানো শিখলে কোথায়?’ পরম স্বস্তি বোধ করার পর জানতে চাইল রানা। ‘ওহ্, নেড়ি, সে কথা আর বলো না! মাস দুই এক মহিলা বস্-এর সঙ্গে সাগরে বেড়িয়েছিলাম, ঠেকায় পড়ে তখনই এক-আধটু শিখতে হয়েছে। তারপর ভালডেজ লাফাজাকে জেলে ভরে দিল সে। সময়টা খারাপ কাটল।’ গা জ্বালানো হাসিটা আবার ফিরে এল ওর মুখে। ‘তারপর?’ ৮০ মাসুল্ডানা-৩৬৬ ‘তারপর ল্যাটিনো জেন্টলম্যান পাবলো টিকালা লাফাজাকে একটা উপহার দিল। হ্যাঁ, নেড়ি কুত্তা, তুমিই আমার সেই উপহার।’ কাল্পনিক একটা ছুরি বের করে নিজের গলায় চালাবার ভঙ্গি করল সে। ‘আরেকটা বিদেশী কুত্তাকে...’ ছয় রানা ঠিকই আন্দাজ করেছিল, ওল্ডে গন্তব্য বেলপ্যান নদীর উত্তর শাখা। ম্যানগ্রোভ দিয়ে আড়াল করা মোহনায় পৌঁছে যোডিয়াক থেকে লোকগুলোকে ক্যাটামার‌্যানে তুলে নিল ও, নির্দেশ দিল গ্রাসিয়াসের সাইড ডেকে কার্গো সাজিয়ে রাখার পর তাল্ডেকে নীচে নেমে যেতে হবে। উজানের দিকে তরতরিয়ে এগোচ্ছে ক্যাটামার‌্যান। ঘন বনভূমিকে জায়গা ছেড়ে দিয়ে ক্রমশ অদৃশ্য হলো ম্যানগ্রোভ। গাছে গাছে হাজারও পাখি থাকার কথা, কিন্তু একটাও চোখে পড়ল না। নীরবতা এখানে অবিচ্ছিন্ন। তবে বৃষ্টিরও থামাথামি নেই। বেল্টের ভিতর দিকে গোঁজা ছুরি নিয়ে খর্বকায় লোকটা পাহারা দিচ্ছে রানাকে। কোনও সন্দেহ নেই, সময় হলে ওই ছুরি নিয়ে ওর উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে সে। বিনা কারণে খুনটা করে মজাও পাবে। আসছে সাইক্লোন ৮১ জ্ঞান ফেরার পর খানিকটা সুস্থ বোধ করছে রডরি। একসময় জানতে চাইল, ‘আমি কোনও কাজে লাগতে পারি?’ রানা কিছু বলল না। কী কাজে লাগবে সে? ওর একজন বস্ আছে, তার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলতে বাধ্য সে। বসের অবাধ্য হলে খুনও হয়ে যেতে পারে। কাজেই তার কাছ থেকে অনুকূল কিছু আশা করা যায় না। পাবলো টিকালার পিছনে নিশ্চয়ই অন্য কারও ব্রেন কাজ করছে। সন্দেহ নেই দেশী কেউ হবে সে Ñ বেলপ্যানিজ। সেলুন থেকে উঠে এল টিকালা। শয়তানের বাচ্চা, ভাবল রানা। রুমাল দিয়ে নাক মুছল লোকটা, বলল, ‘পরের বাঁকটা ঘোরার পর বাম দিকের তীরে ভিড়বে, সিনর ক্যাপিটানো।’ ‘খুশি হতাম কেউ যদি তোমাকে গুলি করে ফেলে দিত,’ বলল রানা। গায়ে মাখল না টিকালা। তবে খ্যাক্ খ্যাক্ করে হেসে উঠল লাফাজা। ‘ও হে, যাই বলো, তুমি কিন্তু খুব সাহসী কুত্তা!’ বাঁক ঘোরার পর বাম তীরে একটা ল্যান্ডিং স্টেজ দেখতে পেল রানা, সেটা থেকে চওড়া মেঠো পথ মেইন হাইওয়ে ও ব্রিজের দিকে চলে গেছে। ডকের পাশে বেলপ্যান ডিফেন্স ফোর্স-এর একজোড়া ল্যান্ড-রোভার ও আর্মি ট্রাক স্ফাড়িয়ে। আমি তা হলে ভুল সন্দেহ করিনি, ভাবল রানা। এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে দেশী সেনাবাহিনীর কিছু সদসঞ্জবশ্যই জড়িত, তাল্ডে ডাকেই সাহায্য করতে এসেছে বিদেশীরা। প্রশ্ন হলো, এই বিদ্রোহী বা বেঈমান সেনাল্ডে নেতৃত্ব দিচ্ছে কে? সেনাবাহিনী প্রধান কাসমেরো পালমো অসুস্থ হয়ে পড়ে আছেন প্রাইভেট ক্লিনিকে, তাঁকে সম্ভবত বাদ ত্থেয়া যায়। বাদ ত্থেয়া যায় প্রেসিডেনশিয়াল গার্ড রেজিমেন্ট-এর কমান্ডার জুডিয়াপ্পা এসকুইটিলাকেও, কারণ তিনি তো দেশেই নেই, এই বিপদ ৮২ মাসুল্ডানা-৩৬৬ ঠেকাবার জন্য সাহায্য চাওয়ার জন্য মেক্সিকোয় গেছেন। বেলপ্যান সেনাবাহিনী এত ছোট, ওল্ডে আর কোনও অফিসার আছে কি না জানা নেই রানার। যদি থাকেও, তাল্ডে কার কী ক্ষমতা, কতটা জনপ্রিয়তা ইত্যাদি কিছুই ওর জানা নেই। ড্রাইভাররা যার যার গাড়ি ঘুরিয়ে হাইওয়ের দিকে মুখ করে রেখেছে, আরোহী ও কার্গো তোলা শেষ হলেই যাতে রওনা হয়ে যেতে পারে। ল্যান্ডিং স্টেজে ভিড়ল ক্যাটামার‌্যান। বোকা অ্যারেনাস একটা লাইন ছুঁড়ল, অপেক্ষারত একজন ড্রাইভার ধরে ফেলল সেটা। ‘এক কাপ কফি হলে মন্দ হত না,’ রডরিকে বলল রানা। ডেকে টিকালা রয়েছে দেখে এক মুহূর্ত ইতস্তত করে কাঁধ ঝাঁকাল রডরি, তারপর বলল, ‘আমাকে ট্রাক লোড করতে যেতে হবে।’ সে থামতেই লাফাজা বলল, ‘কী? কফি খাবে, নেড়ি কুত্তা? আরে, লাফাজাও তো কফির জন্যে চাতকের মত হাঁ হয়ে আছে। চলো, খাওয়াচ্ছি তোমাকেও। প্রথমে আমরা তোমার হাত বেঁধে নেব, নেড়ি কুত্তা।’ রডরি তাকিয়ে আছে, রানার হাত দুটো সামনের দিকে এক করে বাঁধল লাফাজা, ও যাতে কফির মগ ধরতে পারে। ইউনিফর্ম পরা সর্বশেষ লোকটার পিছু নিয়ে ট্রাকে গিয়ে উঠল বেনিটো। আমলা দুজন ল্যান্ড-রোভারে বসেছে, টিকালা আর রডরির জনঞ্জপেক্ষা করছে তারা। টিকালা উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও, রানার দিকে ডান হাতটা বাড়িয়ে দিল রডরি, চোখে-মুখে কৃতজ্ঞ একটা ভাব এনে বলল, ‘আমি সাঁতার জানি না, সিনর। ধনল্টাদ।’ ‘আ পে−জার।’ বাঁধা হাত দিয়ে কোনও রকমে করমর্দন করল রানা। যেন প্রহসনধর্মী কোনও নাটকে অভিনয় করছে ওরা। হাসি আসছে সাইক্লোন ৮৩ পাচ্ছে ওর। ‘ব্যক্তিগত কিছু নয়,’ বলল ও। ‘সুযোগ পেলে গুলি করো ওকে,’ ইঙ্গিতে টিকালাকে দেখাল। ‘তা না হলে ও তোমাকে খুন করবে।’ টিকালার চোখ স্থির হয়ে যেতে দেখল রানা, অনুভব করল রডরির হাতের একটা নার্ভ কেঁপে উঠল। রানার হাত ছেড়ে দিয়ে রেইল টপকে ক্যাটামার‌্যান থেকে নেমে গেল রডরি, শিরস্ফাড়া যতটা সম্ভব খাড়া করে ল্যান্ড-রোভারের দিকে হেঁটে যাচ্ছে। রুমাল শুকল টিকালা। তার ঠাণ্ডা দৃষ্টি মুহূর্তের জন্য স্থির হলো রানার উপর। ‘সত্যি খুবই পারদর্শিতা দেখিয়েছ, সিনর ক্যাপিটানো।’ ঘাড় ফিরিয়ে লাফাজার দিকে তাকাল সে। ‘যাও, দুনিয়া থেকে বিদায় করে দাও ওকে।’ ‘ধনল্টাদ, সিনর, অসংখব্ধনল্টাদ!’ আন›েজ্ঝাত্মহারা হয়ে উঠল লাফাজা। ‘নেড়ি কুত্তাটাকে জঙ্গলে নিয়ে যাচ্ছি আমি।’ বিচ্ছিরি শব্দে খ্যাক খ্যাক করে হাসছে, বেল্ট থেকে টান দিয়ে ছুরিটা বের করে দূর থেকে রানার গলা কাটার ভঙ্গি করল। ‘শালার লাশটা আমি ফেলে আসব, জাগুয়াররা যাতে পেট ভরে খেতে পারে।’ হাতের রুমালটা সামান্য নেড়ে সম্মতি জানাল টিকালা। ‘কাজ শেষ হলে ব্রিজের ওপর, রোডব−কে চলে এসো।’ গাড়িগুলো চলে যাওয়ার পর কেবিনের মাথা থেকে নেমে এল লাফাজা। ‘শেষ এক কাপ কফি খেতে চাও, তাই না, নেড়ি?’ কথা না বলে শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রানা। কেবিনে ঢুকে টেবিলে বসল লাফাজা। সে তার লুকানো উৎস থেকে চৌকো দুটো রক কোকেন বের করে ছুরি দিয়ে কাটছে। ‘ও হে, তুমি কি জানো,’ রানার উপর চোখ রেখে জানতে চাইল সে, চুমুক দিল কফির কাপে, ‘এই বেলপ্যান দেশটায় স্রেফ একদল ৮৪ মাসুল্ডানা-৩৬৬ পাগল বাস করে? ইলেকশনের বছর, পলিটিশিয়ানরা চারদিকে সভা করছে, কিন্তু কারও কোনও বডিগার্ড নেই। শালা বোকাল্ডে নিয়ে কী করব আমরা, বলো তো? গাছ থেকে যেমন পাকা আম পেড়ে খায় মানুষ, আমরাও ঠিক সেভাবে...’ কথা শেষ না করে খাবার চিবানোর ভঙ্গি করল লাফাজা। ‘তারপর কী হবে? সিনর টিকালা অ্যান্ড গং দেশটার বারোটা বাজিয়ে ছাড়বে। লাফাজা যেখানে তোমাকে খুন করবে, ধরো সেখানে আমরা নতুন এয়ারপোর্ট বানাব।’ তার ঠোঁটের কোণ বেয়ে থুথু ও লালা গড়াচ্ছে। ‘সেই এয়ারপোর্টে কোকেন ও অস্ত্র ভর্তি কার্গো পে−ন নামবে...’ ‘একজন লোকের জনেঞ্জপারেশনটা বিরাট হয়ে যায় না?’ জানতে চাইল রানা। খিকখিক করে হাসল লাফাজা। ‘তোমার ধারণা সিনর টিকালাই শুধু বস্? নাহ্, তা কী করে হয়!’ নাকে খানিকটা কোকেন ঢোকাল সে। ‘তা হলে বলি শোনো। মরা লাশ কিছু রটায় না Ñ বলো, রটায়? আমাল্ডে কলম্বিয়ান বস্ আছে, নিকার‌্যাগুয়ান বস্ আছে। আর সবচেয়ে বড় বস্ যিনি, তাকে আমরা কেউ দেখিনি। তার মাথা আছে, নেড়ি...’ প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে রানার। এ কেমন দেশ, প্রেসিডেন্ট খালি পায়ে পাবলিক ডকে স্ফাড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রড দিয়ে মাছ ধরেন, সঙ্গে বডিগার্ড থাকে না! শুধু প্রেসিডেন্ট নয়, সারা দেশের নির্বাচনী এলাকায় ছড়িয়ে থাকা তাঁর মন্ত্রীরাও কেউ নিরাপদ নন। ‘তোমরা বিদেশি, এভাবে রক্তপাত ঘটিয়ে ক্ষমতা দখল করলে দুনিয়ার মানুষ তা মেনে নেবে? জাতিসংঘ কিছু বলবে না?’ ‘বিদেশি? নেড়ি কুত্তা, বিদেশি কোথায় দেখলে তুমি? আমরা তো সবাই বেলপ্যান আর্মির সদস্য, ইউনিফর্ম দেখেও চিনতে পারছ না? বেলপ্যানরা তাল্ডে নিজেল্ডে দেশে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটালে কোন্ আসছে সাইক্লোন ৮৫ শালার কী বলার আছে, হ্যাঁহ্? এদিক ওদিক থেকে কয়েকজন মিনিস্টারকে আটক করা হয়েছে, তাল্ডে সবাইকে ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে স্ফাড় করানো হবে। অপরাধ? দেশের কীসে ভাল তা বোঝে না! হ্যাঁ, এটাই মূল অভিযোগ। তো নেড়ি কুত্তা, পারলে ঠেকাও আমাল্ডে অভ্যুত্থান।’ ‘ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে স্ফাড় করানো হবে?’ রানা ভাব দেখাল ব্যাপারটা বিশ্বাস করতে পারছে না ও, লোকটা যাতে ওকে বিশ্বাস করানোর জন্য কিছু তথ্য দেয়। ‘কোথায়?’ ‘ল্যা পুনটা ডেল কর্নেল ইংলেস-এর নাম শুনেছ, নেড়ি?’ খিক খিক করে হেসে উঠে জিজ্ঞেস করল লাফাজা। ‘ওখানেই তো বসেল্ডে বস্রা হেডকোয়ার্টার বানাতে যাচ্ছে, হে হে! জানা কথা, ফায়ারিং স্কোয়াডও ওখানেই গঠন করা হবে।’ রানার মনটা মুহূর্তের জন্য খুঁতখুঁত করে উঠল। ও প্রশ্ন করায় তথন্ধা পাওয়া গেল, নাকি ওকে বোকা বানাবার জন্য ভুল তথ্য দিচ্ছে লাফাজা? কফি শেষ করে কাপটা টেবিলে নামিয়ে রাখল রানা। টেবিল ছেড়ে সিধে হলো ভালডেজ লাফাজা। ‘চলো, বিদেশী কুত্তা, জঙ্গল থেকে একটু বেড়িয়ে আসা যাক।’ হোলস্টার থেকে পিস্তলটা বের করে বেল্টে গুঁজল, হাতে রয়েছে ছুরি। বাঁচার কী বল্টস্থা করা যায় ভাবছে রানা। ‘বুঝতেই পারছ, এটা তোমার জনেদ্দয়ানওয়ে জার্নি, নেড়ি। তবে লাফাজাকে কোনও ঝামেলায় ফেলো না। তা হলে লাফাজা এমন সু›ল্ডভাবে তোমার গলাটা দু’ফাঁক করে দেবে যে, কীভাবে মারা গেছ টেরই পাবে না।’ রানাকে কম্প্যানিয়নওয়ে হ্যান্ডহোল্ড থেকে দূরে সরে স্ফাড়াতে বলল লাফাজা, রশি খোলার সময় কোনও ঝুঁকি নিতে চায় না। তারপর রানার পিছু নিয়ে রেইল টপকে ডকে নামল সে। ৮৬ মাসুল্ডানা-৩৬৬ ঢালু তীর থেকেই শুরু হয়েছে জঙ্গল। কোনও ধরনের পথ নেই, কাজেই গাছপালার পাঁচিল লক্ষ্য করে হাঁটা ধরল রানা। কয়েক সেকেন্ড পর পর ছুরির ডগা বিঁধছে ওর পিঠে, কাজেই জানে লাফাজা ঠিক ওর পিছনেই রয়েছে। যা করার মরিয়া হয়ে করতে হবে এখনই, ভাবল রানা। খানিক এগোতেই সামনেটা খুলে গেল, বেরিয়ে পড়ল ফাঁকা একটা জায়গা। একটা ঝোপ টপকে সেখানে ঢোকার সময় রানা শুনতে পেল শ্বাস টেনে নাকে কোকেন নিচ্ছে লাফাজা। অকস্মাৎ নিচু হয়েই বন করে ঘুরে গেল রানা, ডান পা ছুঁড়েছে। সরাসরি লাফাজার পেটে ডেবে গেল রানার পা। কুঁজো হয়ে গেল লাফাজা। মাটিতে পড়ছে রানা, বাম পা দিয়ে আঘাত করল, জুতোর ডগা প্রায় গেঁথে গেল লোকটার থুতনিতে। ভেজা মাটিতে হাঁটু দিয়ে পড়ল লাফাজা, তবে ছুরিটা এখনও ছাড়েনি। রানার গলার রশি ছেড়ে দিয়ে পিস্তল ধরার জন্য বেল্ট হাতড়াচ্ছে। গড়ান দিয়ে সিধে হলো রানা, ঝোপ-ঝাড় টপকে লাফাজার দিকে পিছন ফিরে প্রাণপণে দৌড়াচ্ছে, ডাল-পাতার ঝাপটা থেকে চোখ দুটোকে রক্ষা করার জন্য এক করে বাঁধা হাত দুটো উঁচু করে রেখেছে। কাঁটার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে হাত ও মুখ, লতানো গাছের শিকড় জড়িয়ে যাচ্ছে পায়ে। হোঁচট খেয়ে বড় একটা ঝোপের গায়ে পড়ল। ক্রল করে ঝোপটার তলা দিয়ে বেরিয়ে এল অপর পাশে। লাফাজার গালাগালি ও অভিশাপ শুনতে পাচ্ছে রানা। বেশ অনেকটা পিছনে ফেলে এসেছে তাকে ও। চোখে ঘাম নেমে আসায় সামনেটা ভালভাবে দেখা যাচ্ছে না। চোখ পিট পিট করে তাকিয়ে দেখল একটা নালার পানি ধীরগতিতে নদীর দিকে নামছে। আসছে সাইক্লোন ৮৭ পায়ে প্যাঁচ খেয়ে যাওয়া লতানো গাছের বাঁধন খুলে নালায় নেমে পড়ল রানা, গলায় বাঁধা রশিটা ভাল করে শ্বাস নিতে বা ফেলতে দিচ্ছে না ওকে। নালা বেয়ে কিছুদূর নামার পর সামনে একটা ডোবা দেখল রানা। ডোবাটায় যতটা না পানি তারচেয়ে বেশি কাদা। ডাইভ দিয়ে পড়ল তাতে। সঙ্গে সঙ্গে চারদিক থেকে তরল কাদা ওর মাথার উপর পুরু আবরণ তৈরি করল। পায়ের তলায় শক্ত কিছু পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠল রানা। নাকের ফুটোয় কাদা ঢুকছে, এই অনুভূতি আরও বাড়িয়ে তুলল আতঙ্ক। আতঙ্কই শত্র“। নিজেকে শান্ত হওয়ার নির্দেশ দিল রানা। তলায় পা ঠেকেছে, কাজেই এত ভয় পাওয়ার কিছু নেই। চোখ থেকে কাদা সরাবার জন্য হাত দুটোকে তৈরি রাখল, তারপর মাথা তুলল সারফেসের উপর। চোখ পরিষ্কার হতেই সাপটাকে দেখতে পেল রানা। তিন ফুট লম্বা ওটা, দেখতে খয়েরি-সবুজ ফিতের মত, গলায় হলুদ ডায়মন্ড আঁকা। ফার-দ্য-ল্যান্স, অত্যন্ত বিষাক্ত সাপ। রানার পিছনে, খুব কাছে চলে এসেছে লাফাজা, ডাকল, ‘ও হে, তুমি দেখছি সত্যিই পাজি একটা কুত্তা। লাফাজা তোমার ওপর ভয়ানক রেগে গেছে! তাকে সরল মানুষ পেয়েÑ’ শরীরটা ধীরে ধীরে ঘোরাচ্ছে রানা, হাত দুটো যাতে রশিটা ধরতে পারে। ওকে নড়তে দেখেই মাথা তুলল সাপ, ভয়ে হোক বা রাগে হিসহিস করছে, সরু জিভটা ঘন ঘন বার করছে আবার ভিতরে ঢোকাচ্ছে। ‘ও হে, নেড়ি কুত্তা, আমি তোমাকে দেখতে পাচ্ছি।’ খিকখিক করে হাসল লাফাজা, যেন কোনও শিশুর সঙ্গে লকোচুরি খেলছে সে। ‘টু...কি!’ ৮৮ মাসুল্ডানা-৩৬৬ এবার খুব জোরে হিসহিসিয়ে উঠল সাপটা। লাফাজার হাসিও চড়ল। ‘বিদেশী কুত্তা, মনে রেখো, লাফাজাকে ফাঁকি দেয়া এত সহজ নয়। সে তোমাকে ঠিকই খুঁজে বের করবে।’ রানার নাকে এসে বসল একটা মশা, কুঁজো হয়ে ঝুঁকল সামনের দিকে। ওর ঠোঁটে লেগে থাকা কাদা থেকে পচা পাতার দুর্গন্ধ বেরুচ্ছে। রশিটা এক ইঞ্চি এক ইঞ্চি করে টানছে ও। এমনি সময়ে ছোবল দিল সাপটা, বিষ ভরা স্ফাত সেঁধিয়ে গেল রশির ভিতর। পরমুহূর্তে পালিয়ে গেল সাপ, লেজটা ঝোপের ভিতর অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে Ñ ওই ঝোপ থেকেই বেরিয়েছিল। সাপ দেখে লাফাজার আঁতকে ওঠার আওয়াজ পেয়েছে রানা। এখন তাকে বলতে শুনল, ‘ও হে, নেড়ি, লাফাজার বোধহয় বাড়াবাড়ি করা উচিত হচ্ছে না। সে বরং এখানে ফেলে রেখে যাক তোমাকে, কাদার মধ্যে তুমি যাতে ধীরে ধীরে মরতে পারো।’ ঝোপ-ঝাড়ের ডাল ভাঙার আওয়াজ পেল রানা। তার নাক টানার শব্দও পাচ্ছে। ‘হ্যাঁ, বিদেশী নেড়ি, তা-ই করব আমি। লাফাজা ফিরে গিয়ে সিনর টিকালাকে বলবে তুমি শালা হারামি কুত্তা মরে ভূত হয়ে গেছ।’ ফাঁèলে সন্দেহ হচ্ছে রানার। ওর বাম দিকের ঝোপে আওয়াজ হতে বুঝল লাফাজা ওদিক দিয়ে ফিরে যাচ্ছে। কিংবা ফিরে যাওয়ার অভিনয় করছে। যদি ফেরে, কোথায় ফিরছে? গ্রাসিয়াসে নয়তো? নাকি পাবলো টিকালার নির্দেশ মত ব্রিজের উপর রোডব−কে? যে পরিমাণে কোকেন টানছে, বিচার-বুদ্ধির উপর তার প্রভাব না পড়েই পারে না। ফাঁদ যদি পাতেও, কোথাও নিশ্চয়ই ভুল করবে লাফাজা। কিন্তু পাবলো টিকালাকে মিথেল্টলবার ঝুঁকিটা কি নেবে সে? আসছে সাইক্লোন ৮৯ ডোবা থেকে উঠে যতটা পারা যায় সাবধানে নদীতে চলে এল রানা। হাইওয়ের উপর নজর রাখা হচ্ছে, কাজেই পালাতে হলে ক্যাটামার‌্যানে পৌঁছাতে হবে ওকে। কিন্তু নদীর ভাটিতে যেখানে বেরিয়ে এসেছে ও, সেখান থেকে উজানের দিকে বাঁকের আড়ালে থাকা গ্রাসিয়াসকে দেখা যাচ্ছে না। এল্ডে সঙ্গে লড়তে হলে অস্ত্র ল্ডকার ওর, ল্ডকার কর্নেল জুডিয়াপ্পার সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য রেডিওটা। সবই লুকানো আছে ক্যাটামার‌্যানে। গলার রশির বাড়তি অংশ কবজিতে জড়িয়ে নিয়েছে রানা। কুমিরের মত সারফেসের উপর শুধু নাকটা তুলে সাঁতরাচ্ছে ও। বাঁকের এদিকে তীরঘেষা নদীর পানি বেশ কিছুদূর যথেষ্ট অগভীর, ওর পা তলার নাগাল পাচ্ছে। কিন্তু তারপর গভীরতা বেড়ে গেল। গ্রাসিয়াস ফিরে পেলে কী করবে ভাবছে রানা। সোজা কি কানাকা-য় চলে যাবে ও, কারণ প্রথম কাজ দেশটার প্রেসিডেন্টকে রক্ষা করা। বাঁক ঘোরার পর নদীর মাঝখানে চলে আসতেই গ্রাসিয়াসকে দেখতে পেল রানা। যেমন রেখে গেছে তেমনই আছে। আরও কিছুক্ষণ সাঁতরানোর পর ব্রিজটা দেখতে পেল ও। টিকালার লোকজন ব্রিজের শেষ মাথায় রোডব−ক সেট করেছে। ঝম ঝম বৃষ্টির মধেল্ট্যারিয়ারের সামনে স্ফাড়িয়ে থাকা লোকগুলোকে ঝাপসা লাগছে, ফলে তাল্ডে মধ্যে লাফাজা আছে কি না বুঝতে পারল না রানা। সাবধানে তীরের দিকে এগোল রানা। যত এগোচ্ছে ততই অগভীর হচ্ছে নদী। ক্রমশ নিচু হতে হলো ওকে, একসময় হাঁটু দিয়ে হাঁটতে হলো। একটা টয়োটা ল্যান্ড-ক্রুজারের ড্রাইভার গিয়ার বদলে ব্রিজের উপর দিয়ে ধীরগতিতে এগোচ্ছে, থামল রোডব−কের সামনে। দুজন ৯০ মাসুল্ডানা-৩৬৬ লোক বাতাসের দিকে পিছন ফিরে ড্রাইভারের কাগজ-পত্র চেক করছে। সকাল সাতটা। রোববার... ঝড়টা এখন কোথায়, কী অবস্থায় আছে, কিছুই জানা নেই রানার। মাঝে মাঝে শুধু দমকা হাওয়ার ঝাপটা জানাচ্ছে ওটার উপস্থিতি। দিক বদলে না থাকলে বেলপ্যানকে ঠিকই ভেঙেচুরে একাকার করে রেখে যাবে। তিনটে মাত্র রাস্তা দিয়ে রাজধানী বেলপ্যান সিটিতে ঢোকা যায়, নিশ্চয় সবগুলোতেই রোডব−ক বসাবার বল্টস্থা করেছে টিকালা। অভ্যুত্থানের জন্য ছুটির দিনটা বেছে নিয়েছে তারা, তা না হলে হাইওয়েতে প্রচুর যানবাহন থাকত, সারা দেশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ত রোডব−কের কথা, ফলে হয়তো নির্বাচনী সফরে থাকা মন্ত্রীরা অশুভ কিছু আঁচ করতে পেরে গা ঢাকা দিতেন। প−্যানিংটা ভাল। নদী পেরোল রানা, অপর পারে এসে গ্রাসিয়াসকে পাশ কাটাল, ওটার উজানে এসে ঘাড় ফিরিয়ে পিছনদিকে তাকাল। তীরে কিংবা ক্যাটামার‌্যানে কিছ্ইু নড়ছে না। তবে লাফাজা যজ্ঝিপেক্ষায় থাকে, নিজেকে নিখুঁতভাবেই লুকিয়ে রাখবে সে। গাছের বড়সড় একটা গুঁড়ি দেখতে পেল রানা, স্রোতের টানে ওর দিকে এগিয়ে আসছে। ওটার আড়াল নিয়ে ব্রিজ ও ক্যাটামার‌্যানের দিকে যাওয়া যায়, ভাবল ও। হিসাব করল ও, দুশো গজ আসতে চার মিনিট লাগবে ওটার। একঘেয়েমির শিকার এক লোক গাছের সরু একটা ডাল নদীতে ফেলল, তারপর ব্রিজের আরেকদিকে চলে এসে দেখল স্প্যান-এর তলা দিয়ে কীভাবে সেটা ভেসে আসছে। তার পাশে আরেক লোক এসে স্ফাড়াল। নতুন ডাল সংগ্রহ করল তারা। দুটো করে ডাল পানিতে ফেলে দেখছে কোন্টা আগে যায়। আসছে সাইক্লোন ৯১ ৯২ মাসুল্ডানা-৩৬৬ নতুন ডাল খুঁজছে তারা, দলে আরেকজন যোগ দিল। ইতিমধ্যে ভাসমান গুঁড়িটার আড়ালে গা ঢাকা দিয়েছে রানা। গুঁড়ির নিজের গতি ও মতি আছে, বোঝা গেল নদী পার হয়ে ব্রিজ ও ক্যাটামার‌্যানের দিকে রওনা হওয়ায়। ওটার সঙ্গে ভেসে চলেছে রানা। পানির উপর মাথা আরেকটু উঁচু করতেই লোকগুলোকে আবার দেখতে পেল। কাছ থেকে দেখে বোঝা গেল তাল্ডে মধ্যে কেউ লাফাজা নয়। ব্রিজ এগিয়ে আসছে। ওটার তলা দিয়ে যেতে হবে রানাকে। পানির নীচে ডুব দিল ও। ডুব ত্থেয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে শুনতে পেল দুজন লোক চিৎকার করে কী যেন বলছে কাকে। এই সময় ব্রিজের একটা পিলারের গায়ে লেগে স্থির হয়ে গেল গাছের গুঁড়ি। ব্রিজের উপর থেকে ভেসে এল বুট জুতোর শব্দ। ডুব দিয়ে আছে রানা, মুখ থেকে খানিকটা বাতাস বেরিয়ে গেল। দম আটকে অপেক্ষা করছে। দশ সেকেন্ড, বিশ সেকেন্ড, ত্রিশ সেকেন্ড... গাছের গুঁড়ি পিছনে ফেলে ডুব সাঁতার দিতে শুরু করল রানা। পিলারের কাছ থেকে সরে আসছে, ব্রিজের তলা দিয়ে বেরিয়ে এসে তীরে কোথাও উঠতে চায়। কারও চোখে ধরা না পড়ে উঠল রানা তীরে, কিন্তু ওর সামনে আরও একটা কাদাভর্তি ডোবা পড়ল। ডোবাটাকে এড়িয়ে যেতে হলে উঁচু তীরে উঠতে হবে ওকে, আর অত উপরে উঠলে ব্রিজ থেকে ওকে দেখে ফেলবে মার্সেনারিরা। এই সময় নাক টানার পরিচিত আওয়াজ ভেসে এল। মুহূর্তমাত্র দেরি না করে ডোবায় নেমে কাদার মধ্যে ডুব দিল ও। তিন কি চার সেকেন্ড পর ফিসফিস করে উঠল কেউ। ‘ও হে, নেড়ি কুত্তা! আমার ধারণা তোমাকে আমি দেখতে পাচ্ছি।’ আসছে সাইক্লোন ৯৩ রানার দেখার সুযোগ নেই, লাফাজা অপেক্ষা করছে ব্রিজের নীচে, ঢালু ও পিচ্ছিল তীরে। তার এই গলা না চড়াবার কারণটাও পরিষ্কার। টিকালাকে রিপোর্ট করেছে রানাকে মেরে ফেলেছে সে। এখন যদি জানাজানি হয়ে যায় কথাটা সত্যি নয়, নিশ্চয়ই তার জান নিয়ে টানাটানি পড়ে যাবে। ঢাল বেয়ে পানির কিনারায় নেমে এল লাফাজা। ‘আসছি আমি...তোমার সঙ্গে গোপন কথা আছে, নেড়ি কুত্তা...’ এই সময় ব্রিজের উপর থেকে ভেসে এল বোকা অ্যারেনাসের কণ্ঠ¯ল্ফ। ‘অ্যাই ব্যাটা ভালডেজ, নদীর তীরে কাদার মধ্যে কী করছিস তুই? মাছ ধরছিস নাকি?’ জবাবে চিৎকার করে যা বলল লাফাজা, সেটা ভাষায় প্রকাশযোগ্য নয়। এরপর সে তার পিস্তলের বাঁটে ম্যাগাজিন ঢোকাল। আরও এক পা সামনে বাড়ল সে। তার জাঙ্গল বুট রানার মাথার কাছ থেকে মাত্র এক কি ষ্ণে গজ দূরে। হাতে বাগিয়ে ধরা পিস্তল, ঝোপের পাতা ফাঁক করল লাফাজা। রাস্তার উপর থেকে ঢাক-ঢোল বেজে ওঠার কান ঝালাপালা করা আওয়াজ ভেসে এল। ভারী শব্দে কয়েকটা ড্রামও বাজছে। খর্বকায় লাফাজা উপর দিকে তাকাল। ‘ও হে, অ্যারেনাস, কী ব্যাপার বলো তো?’ ‘দেখে মনে হচ্ছে মিছিল,’ ব্রিজ থেকে বলল অ্যারেনাস, হাতে একটা রাইফেল। ‘প্রকাণ্ড গোঁফওয়ালা এক লোকের পোস্টার দেখতে পাচ্ছি। নিশ্চয়ই নির্বাচনী মিছিল...’ ঝোপের ডাল ছেড়ে দিয়ে লাফাজা বলল, ‘ধ্যাত্তেরিকা! এখানে কিছু নেই। আমি আসছি।’ ‘হ্যাঁ, জলদি। দেখো, কাদার মধেঞ্জাবার ডুবে যেয়ো না।’ মেগাফোন থেকে সে−াগান ভেসে আসছে: ‘পর্যটন ও পরিবহন ৯৪ মাসুল্ডানা-৩৬৬ মন্ত্রী পেড্রো মেনডোজকে ভোট দিন!’ মিছিলটা রোডব−কে থামল। সব মিলিয়ে পাঁচটা গাড়ি। ষাট- সত্তরজন সমর্থক হেঁটে এসেছে। ডোবা থেকে বেরিয়ে আবার নদীতে নেমেছে রানা। সবার দৃষ্টি এখন মিছিল ও মন্ত্রীর উপর, এই সুযোগে ক্যাটামার‌্যানের দিকে এগোচ্ছে ও। পেড্রো মেনডোজ-এর প্রাণ বাঁচানো ওর পক্ষে সম্ভব নয়। তাঁর কথা মাথা থেকে বের করে দিয়ে রানা ভাবছে টিকালার আগে কি কানাকায় কীভাবে পৌঁছানো যায়। সাত ক্যাটামার‌্যানে চড়ল রানা। ককপিটে ঢুকে নেভিগেশনাল টেবিলের উপর রাখা রেডিওর সামনে থামল। ওটার সব তার ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। গ্যালিতে এসে একটা কার্ভিং নাইফ নিল, সাবধানে কেটে ফেলল গলার রশিটা। হাত দুটো মুক্ত করতে সময় একটু বেশি লাগল। রোডব−ক থেকে ক্যাটামার‌্যান বেশ খানিকটা দূরে, ওখান থেকে নোঙর তোলার আওয়াজ তাল্ডে শুনতে পাওয়ার কথা নয়। স্রোতের টানে বাতাস ঠেলে ভাটির দিকে অনেকটা পথ পাড়ি দিল গ্রাসিয়াস, তারপর আল−ার নাম নিয়ে ইঞ্জিন স্টার্ট দিল রানা। ইতোমধ্যে যোডিয়াককে ক্যাটামার‌্যানে তুলে নিয়েছে ও। আসছে সাইক্লোন ৯৫ নদী সোজা এগিয়েছে দেখে হেলম ছেড়ে সরে এল রানা, দ্রুত চোখ বুলাল ব্যারোমিটারে। প্রেশার নেমে স্ফাড়িয়েছে ২৯.৫, এক হাজার মিলিবার। লুকিয়ে রাখা টু-ওয়ে রেডিওটা বের করল রানা। কর্নেল জুডিয়াপ্পার সঙ্গে যোগাযোগ করা ল্ডকার। ভদ্রলোক দেশে ফিরেছেন কি না জানা ল্ডকার। রেডিওটা ত্থেয়ার সময় রানাকে তিনি জোরাল আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, যে-কোনও জরুরি পরিস্থিতিতে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা যাবে, তিনি বিদেশে থাকলেও সাহায্য করতে পারবেন। কিন্তু দশ মিনিট চেষ্টা করেও নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সিতে কারও সাড়া পেল না রানা। নদীর মুখ থেকে খোলা সাগরে বেরুবার সময় গম্ভীর হয়ে উঠল রানা। যা করবার একাই করতে হবে ওকে। পরবর্তী গন্তব্য কি কানাকা। প্রেসিডেন্টকে রক্ষা করতে পারলে দেশটাকেও বোধহয় এই ষড়যন্ত্র থেকে মুক্ত করা সম্ভব। কি কানাকায় পৌঁছাতে গ্রাসিয়াসকে ছ’মাইল পাড়ি দিতে হবে। প্রচণ্ড একটা ঝড় আসছে, একা কাজটা করা প্রায় অসম্ভব। ক্যাটামার‌্যান চলে নানা ধরনের ছোট-বড় পাল-এর সাহায্যে। আর পাল টাঙাতে হলে সহকারী ল্ডকার। রানা সিদ্ধান্ত নিল, বেশি পাল তোলার ঝামেলায় যাবেই না ও। গ্রাসিয়াসকে অটো-পাইলটের দায়িত্বে ছেড়ে দিয়ে পিছনের ডেকে বেরিয়ে এল রানা। বিএমডবি−উ মোটরসাইকেলটাকে ডেভিট থেকে নামিয়ে ককপিটের ভিতর দিয়ে সেলুনে নিয়ে এল, তারপর মাস্ট সাপোর্ট-এর সঙ্গে শক্ত করে বেঁধে রাখল। আবহাওয়া খারাপ হতে পারে, কাজেই সাবধানের মার নেই। এরপর স্ক্রুর প্যাঁচ ঘুরিয়ে সেলুন ডেকের ড্রেইনেজ পে−ট খুলল, ভিতরের প্যানেল সরিয়ে উন্মুক্ত করল গোপন কমপার্টমেন্ট। ৯৬ মাসুল্ডানা-৩৬৬ ওয়াটারপ্র“ফ মোড়কে মোড়া একজোড়া সিঙ্গেল ব্যারেল পাম্প- অ্যাকশন টুয়েলভ বোর শটগান বের করল ও, সঙ্গে রয়েছে একটা কার্টিজ বেল্ট ও দুটো ব্যান্ডালিয়ার। ককপিটে ফিরে এসে কোর্স চেক করল রানা। তারপর একটা শটগানের ম্যাগাজিনে কার্ট্রিজ ভরল। ব্রিচে একটা শট পাম্প করে পোর্টসাইড ককপিট সেটিতে রাখল অস্ত্রটা, তারপর নিজের একটা শার্ট চাপা দিল সেটার উপর। শার্টের উপর কেইবল-এর ছোট একটা কয়েল রাখল, বাতাস যাতে উড়িয়ে নিতে না পারে। চোখে বিনকিউলার তুলে সামনের সাগরটা একবার দেখে নিল রানা। পানি ও ঢেউ ছাড়া দেখবার কিছু নেই। দ্বিতীয় শটগানটাও লোড করল রানা। কি কানাকা কাছে চলে আসছে। প্রেসিডেন্ট রোকো রামপাম-এর বিচ হাউসটাকে পাশ কাটিয়ে এল রানার ক্যাটামার‌্যান। বিলিওনেয়ার-এর জেটিতে থামল না ও, কোথাও নোঙরও ফেলল না, সরাসরি উঠে এল সৈকতে। হাতে শটগান ও বো লাইন, এক কাঁধে ব্যান্ডালিয়ার, লাফ দিয়ে সৈকতে নামল রানা। বো লাইনটা পাম গাছের গায়ে বাঁধল, তারপর সরু রাস্তাটাকে এড়িয়ে গাছপালার ভিতর দিয়ে কাঠের তৈরি প্রেসিডেন্টের বিচ হাউসের দিকে এগোল সাবধানে, শটগানটা তৈরি আছে হাতে। তিনটে করে ধাপ টপকে টেরেসে উঠল। কেউ নেই টেরেসে, তবে ভিতরে ঢোকার ল্ডজাটা খোলা। ডাইভ দিয়ে লিভিং রুমে পড়ল রানা, শরীরটাকে গড়িয়ে দিল দু’বার। ওর ডানদিকে একটা মেয়ে চেঁচাচ্ছে। মুখে হাতচাপা দিয়ে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছে সে। কামরায় আর কাউকে দেখা যাচ্ছে না। মেয়েটিকে দেখে কিছুটা নিশ্চিন্ত হলো রানা। ম্যারিয়েটা আসছে সাইক্লোন ৯৭ রামপাম। এর আগে স্যান পল দ্বীপে রানাকে একবার দেখেছে সে। ওকে সে তখনও চিনতে পারেনি, এখনও পারছে না। কারণ ছদ্মবেশী রানাকে দেখছে সে Ñ কাঁধ পর্যন্ত লম্বা ঘন কালো চুল, কোঁকড়ানো ও চকচকে; থুতনির কাছে সামান্য দাড়ি; চোখ দুটো কালচে-নীল; গলায় লাল প্রবাল পুঁতির তৈরি চওড়া একটা মালা পরে আছে। হাতের শটগান খোলা দুটো ল্ডজা কাভার করছে, ওগুলো দিয়ে বাড়ির অ›ল্ডমহলে যাওয়া যায়। ‘তুমি একা?’ মাথা ঝাঁকাল ম্যারিয়েটা। কেমন সন্দেহ ও বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে রানার দিকে। ‘কে আপনি?’ ‘দেখো চিনতে পারো কি না,’ বলে ছোট একটা আয়নার সামনে স্ফাড়িয়ে প্রথমে চোখের কন্ট্যাক লেন্স, তারপর মাথার পরচুলা ও নকল দাড়ি খুলে ফেলল রানা। ‘ওহ্, গড! আপনি! ওহ্, মাই গড! মাসুদ ভাই, একটুও চিনতে পারিনি!’ হঠাৎ বিরাট স্বস্তি বোধ করায় হাঁপিয়ে উঠল ম্যারিয়েটা। ‘মাসুদ ভাই, কী ঘটছে কিছুই তো আমি বুঝতে পারছি না...’ ‘শান্ত হও,’ দৃঢ়কণ্ঠে বলল রানা। ‘বিপল্ডে সময় সেটাই সবচেয়ে আগে ল্ডকার।’ ম্যারিয়েটা একা আছে বললেও, নিজে একবার চেক করে দেখে নিল রানা। দুটো বেডরুম, বাথরুম, কিচেন Ñ সব খালি। নিষ্পলক চোখে রানাকে দেখছে ম্যারিয়েটা। তার লম্বা চুল লাল ব্যান্ড্যানা দিয়ে বাঁধা। কালো ¯ি−ভলেস টি-শার্ট পরেছে। কালো শর্টস। পায়ে স্যান্ডেল। ‘মিস্টার প্রেসিডেন্ট কোথায়?’ জানতে চাইল রানা। ‘দাদু নিরাপদেই আছেন,’ জবাব দিল ম্যারিয়েটা। ‘তবে এই দ্বীপে নেই তিনি।’ কিছু বলতে যাবে রানা, এই সময় সাগরের দিক থেকে ইঞ্জিনের ৯৮ মাসুল্ডানা-৩৬৬ আওয়াজ ভেসে এল। ‘এখানে থাকো তুমি,’ বলল ও। ‘আমি আসছি।’ এক ছুটে সৈকতে চলে এল রানা। দূর থেকেই চিনতে পারল বেলপ্যান কাস্টমস-এর একমাত্র পেট্রল বোটটাকে, ঢেউ ভেঙে কসমেটিক বল্টসায়ী বিলিওনেয়ার উড্রো ফোরসাইথের জেটি লক্ষ্য করে ছুটে আসছে। কল্পনার চোখে ছ’ফুট লম্বা কাস্টমস অফিসার কার্লোস বাগুইলাকে হেলম ধরে স্ফাড়িয়ে থাকতে দেখল ও, দু’সারি স্ফাতের ফাঁকে হাভানা চুরুট আটকানো। হার্নান্দো নিকারা তাঁর সঙ্গে ফার্নান্দো মারভেল ওরফে মাসুল্ডানার পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। হাসি-খুশি, অমায়িক ভদ্রলোক, ওকে আশ্বস্ত করে বলেছেন কাগজ-পত্র ঠিক থাকলে বেলপ্যান-এ ট্যুরিস্ট গাইড হিসাবে কাজ করতে দিতে তাঁল্ডে কোনও আপত্তি নেই। তবে একই সঙ্গে সাবধান করে দিতে ছাড়েননি Ñ মারভেলের বিরুদ্ধে যদি স্মাগলিং বা অন্য কোনও অপরাধের অভিযোগ পাওয়া যায়, সঙ্গে সঙ্গে অ্যাকশন নেবেন তিনি। দৌড় থামাল রানা, বালির উপর শটগান ও ব্যান্ডালিয়ার রেখে সৈকত ধরে ডক-এর দিকে হাঁটছে। দূর থেকে পেট্রল বোটের লোকজন ওকে চিনবে না, অস্ত্র নিয়ে এগোতে দেখলে ভুল বুঝে গুলি করে বসতে পারে। কার্লোস বাগুইলার সঙ্গে অভ্যুত্থান নিয়ে আলাপ করাটা জরুরি মনে করছে রানা, প্রেসিডেন্ট আর তাঁর নাতনির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে ভদ্রলোকের সাহায্য ল্ডকার হবে ওর। ডকটা এখনও বেশ দূরে, ওটার পাশে পেট্রল বোটটাকে ভিড়তে দেখল ও, সাইড ডেকে স্ফাড়িয়ে রয়েছে পাঁচ-সাতজন নাবিক। গ্যাঙওয়ে ফেলা হয়েছে, তার উপরও কয়েকজনকে দেখা গেল। ইউনিফর্ম পরা ... আসছে সাইক্লোন ৯৯ হঠাৎ থমকে স্ফাড়াল রানা। কাস্টমস-এর বোটে বেলপ্যান সেনাবাহিনীর সদসশুা কী করছে? এই সময় গুলি হলো। রাইফেল তুলে রানাকে টার্গেট করছে সৈনিকরা। কী ঘটছে বুঝতে আর বাকি থাকল না, বন করে ঘুরল রানা, তীরবেগে ছুটল আবার। ওর কথা শোনেনি, পিছু নিয়ে সৈকতে বেরিয়ে এসেছে ম্যারিয়েটা, স্ফাড়িয়ে আছে ওর শটগান ও ব্যান্ডালিয়ার-এর পাশে। ‘শুয়ে পড়ো!’ চেঁচিয়ে বলল রানা। তারপরও বোকার মত স্ফাড়িয়ে আছে ম্যারিয়েটা। হয়তো বৃষ্টি ও বাতাসের জন্য গুলির আওয়াজ শুনতে পায়নি সে। ছুটে এসে তাকে নিয়ে বালির উপর পড়ল রানা, বালিতে পড়ার আগেই টের পেল হিস্স্স্ শব্দ তুলে কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল একটা বুলেট। ‘তোমাকে না আমি ভেতরে থাকতে বললাম!’ হাঁপাচ্ছে রানা, গড়িয়ে ম্যারিয়েটার উপর থেকে বালিতে নামল। ‘কোথাও লাগেনি তো?’ মাথা নাড়ল ম্যারিয়েটা। ‘ওরা আমাকে গুলি করছে, তবে তোমাকে ধরে নিয়ে যাবে।’ কথা না বলে রানার দিকে তাকাল ম্যারিয়েটা। ‘তোমাকে ধরতে পারলে তোমার দাদুকেও ধরতে পারবে,’ ব্যাখ্যা করল রানা। ‘সবাই জানে তিনি তোমাকে ভালবাসেন।’ একটু থেমে আবার বলল, ‘সব কথা পরে শুনো, প্রথম কাজ তোমাকে এই দ্বীপ থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া।’ ইতস্তত করছে ম্যারিয়েটা। ‘কিন্তু, মাসুদ ভাই, দাদু আমাকে এখানে অপেক্ষা করতে বলে গেছেন।’ ‘তিনি তো আর জানতেন না ওরা তোমাকে ধরতে আসবে এখানে,’ বলল রানা। ও থামতেই আবার ইঞ্জিনের আওয়াজ ভেসে এল। পেট্রল বোটকে ধীরে ধীরে ওল্ডে দিকে ঘুরে যেতে দেখল ও। ১০০ মাসুল্ডানা-৩৬৬ ‘এখন বেঁচে থাকাটা সবচেয়ে জরুরি। দৌড়াতে হবে তোমাকে। ওঠো!’ রানার সঙ্গে ম্যারিয়েটাও লাফ দিয়ে সিধে হলো, তারপর ছুটল দুজন। এক-ষ্ণেশো গজ দৌড়ে ক্যাটামার‌্যানে পৌঁছে গেল ওরা। ম্যারিয়েটাকে ডেকে তুলে দিয়ে রশি খুলে নিয়ে গ্রাসিয়াসের বো দুটো সাগরের দিকে ঘোরাল রানা, তারপর নিজেও চড়ল। পাল তোলা মাত্র প্রবল বাতাস পেয়ে তীর ছেড়ে রওনা হয়ে গেল গ্রাসিয়াস। আরও দশ পয়েন্ট নেমে গিয়ে ব্যারোমিটার রিডিং স্ফাড়িয়েছে ২৮.৫। ‘জানোই তো বড় একটা সাইক্লোন আসছে,’ ককপিটে ঢুকে হেলম্ ধরে বলল রানা, অপর হাত দিয়ে পোর্ট লকার খুলে লাইফজ্যাকেট বের করল, একটা ছুঁড়ে দিল ম্যারিয়েটার দিকে। ‘এটা পরে নাও। ঝড় এসে যদি পানিতে ফেলে দেয়, সাঁতরাবার চেষ্টাই করবে না। স্রেফ হাত-পা শিথিল করে রাখবে। বাতাসই তোমাকে পৌঁছে দেবে তীরে। তারপর জঙ্গলে ঢুকে উঁচু জমিনের দিকে উঠে যাবে।’ এখনও রানা সিদ্ধান্ত নেয়নি কোথায় যাবে, শুধু জানে ওল্ডে একটা শেলটার ল্ডকার। রাজধানী বেলপ্যান সিটি নিশ্চয়ই বিদ্রোহী সেনাল্ডে দখলে চলে গেছে, কাজেই সেখানে যাওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। একই কারণে ঢোকা যাবে না বেলপ্যান নদীতেও। এরপর উত্তরে আছে মাকা নদী, মেইনল্যান্ডে ঢোকার আরেকটা পথ। ম্যারিয়েটা এখনও ওকে কিছু না জানালেও, ওর দাদু নিশ্চয়ই মেইনল্যান্ডে কোথাও গা ঢাকা দিয়ে আছেন। নিশ্চিত হওয়ার জন্য জিজ্ঞেস করা যেতে পারে। ‘প্রেসিডেন্ট কি মেইনল্যান্ডে?’ কথা না বলে ম্যারিয়েটা শুধু মাথা ঝাঁকাল। চার্টটা স্মরণ করল রানা। হিসাব কষে দেখল মাকা নদীর মুখ আসছে সাইক্লোন ১০১ এখান থেকে কমবেশি বারো মাইল। তবে ওখানে পৌঁছাতে চাইলে একজন প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারাতে হবে। তার নাম মিস জোসেফিন। পাঁচ ডিগ্রি কোর্স বদলে বাতাসের মতিগতি বোঝার জন্য চোখে বিনকিউলার তুলে পিছনদিকে তাকাল রানা। যেই চালাক পেট্রল বোট, সময় নষ্ট না করে ফুলস্পিড তুলে ছুটে আসছে সে। কম করেও ত্রিশ নট, আন্দাজ করল ও। দশ মিনিট পেরুলেই ওটার বো-ক্যানন গ্রাসিয়াসকে নাগালের মধ্যে পেয়ে যাবে। ‘ওরা গুলি করবে, তাই না, মাসুদ ভাই?’ জানতে চাইল ম্যারিয়েটা। গাল বেয়ে বৃষ্টির পানি গড়াচ্ছে, তাই বোঝা গেল না মেয়েটি কাঁদছে কি না। ‘ওরা তোমার কোনও ক্ষতি করবে না,’ বলল রানা। ‘তোমাকে ওরা জীবিত ধরতে চাইবে।’ ‘কিংবা হয়তো আপনার বোটে গুঁতো মারবে।’ ‘হয়তো। ওয়ার্নিং শটও ছুঁড়তে পারে।’ ‘ওল্ডে হাতে আমাকে তুলে দেবেন আপনি,’ বলল ম্যারিয়েটা, মুখ তুলে রানার চোখে তাকাল। ‘তা না হলে ওরা আপনাকে মেরে ফেলবে।’ ‘তা ঠিক, ধরতে পারলে ছাড়বে না,’ বলল রানা। ‘তবে তোমাকে কারও হাতে তুলে দেয়ার জন্যে বেলপ্যানে আসিনি আমি।’ ‘মাসুদ ভাই,’ বলল ম্যারিয়েটা, ‘সব কথা এবার বলুন আমাকে। নিকার‌্যাগুয়ায় পিকো ভাইয়ার সঙ্গে দেখা হবার পর থেকে শুরু করুন। ভাইয়ার সঙ্গে ফোনে আমার আলাপ হয়েছে, যত্থি তারপর থেকে নিখোঁজ তিনি।’ ‘বলো কী! কেন... মানে কীভাবে...’ ‘নিকার‌্যাগুয়ান পুলিশ সন্দেহ করছে ভাইয়াকে কলম্বিয়ান ড্রাগ স্মাগলারল্ডে একটা গ্যাং কিডন্যাপ করেছে।’ ‘সম্ভবত তাল্ডেই আরেকটা দল মার্সেনারিল্ডে নিয়ে ঢুকে পড়েছে


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৩৬ জন


এ জাতীয় গল্প

→ মাসুদ রানা - আসছে সাইক্লোন (পার্ট ২) শেষ পর্ব
→ মাসুদ রানা - আসছে সাইক্লোন (পার্ট ১)

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now