বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
আজিজ সুপার মার্কেটের পেছনের গলিটায় রাত নামলে এক অদ্ভুত ভ্যাপসা গন্ধ জমে থাকে। পুরানো ড্রেন, কাঁচা ড্রামের ডালপুরির তেল আর বর্ষার ভেজা দেওয়ালের গন্ধ মিলেমিশে একাকার। তার ওপর গত এক ঘণ্টা ধরে লোডশেডিং।
অর্ক ঘরের একমাত্র কাঠের জানালার পাল্লা দুটো পুরো খুলে দিয়ে মেঝেতে বসে ছিল। চিলেকোঠার এই স্যাঁতসেঁতে ছোট ঘরটায় বাতাসের কোনো নামগন্ধ নেই। টেবিলের ওপর রাখা পুরনো ডেল ল্যাপটপের ব্যাটারি প্রায় শেষের দিকে, লাল বাতিটা টিমটিম করে জ্বলছে। চার্জ চলে যাওয়ার আগেই তাকে একটি লোকাল এজেন্সির ফেসবুক পেইজের দশটা কন্টেন্ট আর দুটো ইউটিউব ভিডিওর স্ক্রিপ্ট মেইল করতে হবে। রাত বারোটার আগে ফাইল না পাঠালে এজেন্সির ছোট ভাইটি নির্দ্বিধায় মেসেঞ্জারে লিখে দেবে
“ভাইয়া, লেইট ডেলিভারির জন্য পেমেন্ট হোল্ড করা হইছে।”
অর্ক কপালে জমে থাকা ঘামটা টি-শার্টের হাতা দিয়ে মুছে দ্রুত আঙুল চালাল কি-বোর্ডে। পেটে সকাল থেকে শুধু নীলক্ষেতের মোড়ের একটা শুকনা বনরুটি আর টঙের এক কাপ রঙ চা পড়েছে। ক্ষুধা এখন আর শরীরকে নাড়া দেয় না, মাথাটা শুধু কেমন যেন হালকা হয়ে ঝিম ধরে থাকে।
লেখালিখি করে মানুষ ভাত পায় না এই কথাটা বাড়ি ছাড়ার দিন বাবা একপ্রকার চিৎকার করেই বলেছিলেন। কথাটা যে কতটা নির্মম সত্যি, তা গত দুটো বছর ধরে ঢাকার এই মেসবাড়ির চার দেওয়ালে অর্ক হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। নিজের শখের ক্যানন ক্যামেরাটা বিক্রি হয়েছে চার মাস আগে, গত সপ্তাহে বিক্রি করতে হলো ইন্টারমিডিয়েটে পাওয়া একমাত্র দামি উপহার স্যামসাংয়ের ফোনটা। এখন হাতে আছে বাটনওয়ালা একটা সস্তা সেট।
সিঁড়িতে চটি জুতো টেনে হাঁটার চেনা শব্দ হলো। কিছুক্ষণ পর ঘরের কাঠের দরজায় টোকা না দিয়েই ভেতরে ঢুকল রাশেদ।
রাশেদ ফার্মগেটের এক ট্রাভেল এজেন্সিতে বিশ হাজার টাকার টিকিটিংয়ের চাকরি করে। মাসের বিশ তারিখ যেতে না যেতেই তার পকেট গড়ের মাঠ হয়ে যায়। অথচ এই মানুষটাই প্রতি রাতে মেসের ঘরে ফেরার আগে অর্কর খোঁজ নেয়।
রাশেদের এক হাতে পলিথিনে মোড়ানো দুটো গরম পরোটা আর ডালভাজি, অন্য হাতে ডিসপোজেবল কাপে টঙের গাঢ় দুধ চা।
"কী রে, অন্ধকারে ভূত হয়ে বসে আছিস?"
রাশেদ পলিথিনটা খাটের ওপর রেখে সুইচবোর্ডে চার্জার গোঁজার চেষ্টা করল।
"কারেন্ট নাই নাকি আবার? ধুর বাল, এই গরমে মানুষ থাকে!"
অর্ক ল্যাপটপটা বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
"স্ক্রিপ্টটা পাঠিয়ে দিলাম রে। আজকে সাতশো টাকা বিকাশ করার কথা। করলে মেসেঞ্জার বিলটা দিয়ে দিব।"
রাশেদ কোনো কথা না বলে পরোটার প্যাকেটটা খুলে অর্কর সামনে এগিয়ে দিল।
"আগে খা। তোর চেহারা দেখে মনে হচ্ছে এখনই বেহুশ হয়ে পড়বি। সকাল থেকে কিছু খাস নাই, তাই না?"
"ক্ষুধা ছিল না আসলে..."
অর্ক চোখ ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল।
"নাটক করবি না আমার সামনে,"
রাশেদ পকেট থেকে ভাঁজ করা একটা এক হাজার টাকার নোট বের করে অর্কর ডায়রির নিচে গুঁজে দিল।
অর্ক চমকে উঠে নোটটা সরাতে গেল,
"না রাশেদ, একদম না! তুই গত সপ্তাহেও মেসের বিল দিলি। তোর নিজেরই তো রুমমেটের কাছে ধারের টাকা বাকি"
রাশেদ হাত উঁচিয়ে তাকে থামিয়ে দিল। তার মুখটা খুব গম্ভীর দেখাল,
"অর্ক, তুই যখন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে আজিজ আর বাংলাবাজারের প্রকাশকদের কাছে পান্ডুলিপি নিয়ে গেছিস, আমি দূর থেকে দেখছি তারা কীভাবে তোকে ফিরিয়ে দিছে। আমি জানি তুই কী লিখতে পারিস। এই এক হাজার টাকায় তোর বাপের ঋণ শোধ হবে না, কিন্তু তুই না খেয়ে থাকলে উপন্যাসটা কোনোদিন শেষ হবে না। যেদিন বইমেলায় তোর নামের বইয়ের স্টলের সামনে লাইন লাগবে, সেদিন সব হিসাব কাচ্চি খাইয়ে মেটায় দিস। এখন চুপচাপ খা।"
রাশেদ চায়ের কাপটা অর্কর হাতে ধরিয়ে দিয়ে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। পকেট থেকে গোল্ডলিফ সিগারেট বের করে ধরাল সে। দেশলাইয়ের আলোয় তার ক্লান্ত, ঘর্মাক্ত মুখটা এক মুহূর্তের জন্য স্পষ্ট হয়ে আবার অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
বাইরে তখন ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হয়েছে। টিনের চালে বৃষ্টির টুপটুপ শব্দ আর দূর থেকে ভেসে আসা সিএনজি অটোরিকশার ইঞ্জিনের আওয়াজ। ঢাকার এই রাতগুলো অসম্ভব নিষ্ঠুর, এখানে হাজার হাজার ছেলেমেয়ে প্রতিদিন স্বপ্ন নিয়ে আসে আর জীবিকার চাপে পিষ্ট হয়ে নিঃশব্দে হারিয়ে যায়।
অর্ক চায়ের কাপে চুমুক দিল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল মেসের ডায়েরির পাতাগুলো। সেখানে জমে আছে একটা গোটা জীবনের গল্প, একটা বড় উপন্যাস যেটা লিখতে গিয়ে সে নিজেকে প্রায় নিঃস্ব করে ফেলেছে।
পরদিন দুপুরের রোদটা যেন চামড়া পুড়িয়ে দিচ্ছিল।
ফার্মগেট মোড়ে দাঁড়ানো মানেই একরাশ ধোঁয়া, ধুলো আর বাসের তীব্র হর্নের মধ্যে দমবন্ধ হয়ে আসা। সকাল থেকে আকাশ পরিষ্কার, ভ্যাপসা গরমে পিচগলা গন্ধ বাতাসে ভাসছে। অর্ক দাঁড়িয়ে ছিল ওভারব্রিজের নিচে। তার পরনের নীল রঙের সুতির শার্টটার পিঠ ঘেমে ভিজে উঠেছে অনেকক্ষণ আগেই। পকেটে হাত দিয়ে দেখল, মাত্র সত্তর টাকা খুচরা আছে। একটা সিএনজি বা রিকশা নেওয়ার বিলাসিতা তার নেই।
দশ মিনিট হুড়োহুড়ি করে কোনোমতে একটা লোকাল বাসে ঝুলে পড়ল সে। বাসের ভেতর গাদাগাদি ভিড়, এক ফোঁটা বাতাস নেই। বাসের হ্যান্ডেল ধরে ঝুলতে ঝুলতে অর্ক তার কাঁধের পুরনো কাপড়ের ব্যাগটা সাবধানে বুকের কাছে চেপে রাখল। ব্যাগের ভেতর দুটো ফাইল একটা ক্লায়েন্টের চাকুরিজীবী জীবনের ওপর বানানো দশ মিনিটের শর্টফিল্মের চূড়ান্ত স্ক্রিপ্ট, আর অন্যটা তার নিজের সেই দীর্ঘদিনের অসমাপ্ত উপন্যাসের খসড়া।
অফিসটা নিকেতনের এক গলির ভেতরে। বাইরে কোনো বড় সাইনবোর্ড নেই, দোতলার একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে তৈরি হয়েছে
"ক্রিয়েটিভ ওয়েভ ডিজিটাল"
কাঁচের ভারী দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই এসি-র ঠাণ্ডা হাওয়া অর্কর ঘামে ভেজা শরীরে কাঁপুনি ধরিয়ে দিল। ভেতরে নরম আলো, দামি সোফা আর কফি মেশিনের মৃদু আওয়াজ। কাঁচের ওপাশে বসে আছেন কামরুল ভাই। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি, পরনে ফিটিংস শার্ট, মুখে ট্রিম করা দাড়ি। সারাক্ষণ আইফোনে আঙুল চালাতে অভ্যস্ত এই মানুষটাই ঢাকার ছোটখাটো নাট্য প্রযোজক আর ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতাদের কাছে
"বড় ভাই"
"আরে অর্ক, আসো আসো,"
কামরুল চোখ না তুলেই ইশারা করলেন সামনের চেয়ারে বসতে।
অর্ক সাবধানে বসল। ব্যাগ থেকে প্রিন্ট করা স্ক্রিপ্টটা বের করে টেবিলের ওপর রাখল।
"ভাইয়া, এই যে ফাইনাল ড্রাফটটা। আপনি যেভাবে বলেছিলেন, ক্লাইম্যাক্সে সাসপেন্সটা বাড়িয়ে দিয়েছি আর ডায়লগগুলো একটু শহুরে ধাঁচে করেছি।"
কামরুল আইফোনটা টেবিলের ওপর উল্টো করে রাখলেন। তারপর খুব অনীহা নিয়ে পাতাগুলো ওল্টাতে লাগলেন। প্রতিটা পাতা ওল্টানোর সাথে সাথে তার কপালের ভাঁজ গভীর হচ্ছিল। অর্কর বুকের ভেতরটা ঢিপঢিপ করতে লাগল। এই বিশ পাতার স্ক্রিপ্টটা লিখতে গিয়ে তার টানা তিন রাত ঘুম হয়নি।
"হুম..."
কামরুল পাতাগুলো একপাশে ঠেলে দিলেন। একটা সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে বললেন,
"অর্ক, ডায়লগগুলো একটু বেশি ভারী হয়ে গেল না? আজকাল ফেসবুকে মানুষ এত ফিলোসফি দেখতে চায় না ভাই। একটু ফানি পাঞ্চ দরকার ছিল।"
অর্কর গলার ভেতরটা শুকিয়ে গেল। সে শান্ত গলায় বলল,
"ভাইয়া, আপনি নিজেই তো বলেছিলেন গল্পটা ইমোশনাল হতে হবে। একটা মধ্যবিত্ত ছেলের হাহাকার তো ফেসবুকের সস্তা কমেডি দিয়ে ফুটিয়ে তোলা যাবে না।"
কামরুল মৃদু হাসলেন। সেই হাসিতে একধরনের করুণা আর তাচ্ছিল্য মিশে ছিল।
"তোমাদের এই এক দোষ, নিজেদের আর্ট ছাড়া আর কিছু বোঝো না। বাজার না বুঝলে লেখালেখি করে ভাত জুটবে না অর্ক।"
অর্ক চুপ করে রইল। তার আত্মসম্মানবোধ চিৎকার করে বলছিল এই মুহূর্তে কাগজগুলো তুলে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে। কিন্তু মেসের বুয়ার বকেয়া টাকা আর ল্যাপটপের কিস্তির চিন্তা তার মুখ বন্ধ করে রাখল।
"যাই হোক,"
কামরুল টেবিলের ড্রয়ার টানলেন।
"ডিরেক্টর কিছুটা ঠিকঠাক করে শুট করে নেবে। এই নাও।"
তিনি টেবিলের ওপর একটা এক হাজার টাকার নোট রাখলেন।
অর্ক নোটটার দিকে তাকাল। তার চোখের দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল।
"ভাইয়া, কথা ছিল পনেরোশো টাকা। আগের ড্রাফটের সময়ও আপনি বলেছিলেন ফাইনাল দেওয়ার পর পুরো পনেরোশো ক্লিয়ার করবেন।"
কামরুল ভ্রু কুঁচকালেন। তার গলার স্বর হঠাৎ করেই শক্ত হয়ে উঠল,
"স্ক্রিপ্ট তো পারফেক্ট হয় নাই অর্ক। আমাদের ডিরেক্টরকে আবার বসতে হবে এটা নিয়ে। তাছাড়া এজেন্সির ক্লায়েন্ট এখনো বাজেট পুরো পাস করে নাই। তুমি তো অপরিচিত ছেলে না, এই বাজারে একটা দশ মিনিটের স্ক্রিপ্টের জন্য হাজার টাকাও কেউ দেয় না।"
"কিন্তু ভাইয়া, আমি তিন দিন রাত জেগে কাজটা করেছি। আপনি তো জানেন কাগজের প্রিন্ট খরচটাও আমার নিজের পকেট থেকে গেছে।"
অর্কর কণ্ঠ কাঁপছিল, রাগে নাকি অপমানে সে নিজেই বুঝতে পারল না।
"দেখো অর্ক, কাজ ভালো লাগলে করবে, না লাগলে করবে না,"
কামরুল আইফোনটা হাতে তুলে নিলেন, যা স্পষ্ট বুঝিয়ে দিচ্ছিল যে আলোচনা এখানেই শেষ।
"অন্য কোথাও গেলে এই ড্রাফটের জন্য পাঁচশো টাকাও দিত না। নিতে পারলে নাও, নয়তো রেখে যাও।"
ঘরের এসি-র তাপমাত্রা তখন অর্কর কাছে অসহ্য মনে হচ্ছিল। সে ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে এক হাজার টাকার নোটটা তুলে নিল। কামরুল আর তার দিকে তাকালেনও না, আবার ফোনে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
কাঁচের দরজাটা ঠেলে বাইরে বের হতেই দুপুরের তীব্র রোদটা আবার এসে মুখে লাগল। নিকেতনের শান্ত রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে অর্ক হাতের নোটটার দিকে তাকাল। ঘামে ভেজা আঙুলের ছাপে নোটটা একটু কুঁচকে গেছে।
তার চোখের কোণটা জ্বালা করছিল। সে রাস্তার পাশের একটা ছোট টঙের দোকানে গিয়ে বসল।
"মামা, এক কাপ লাল চা দেন। কড়া লিকার।"
চায়ের কাপ হাতে নিয়ে সে বেঞ্চে বসল। চায়ে চুমুক দিতে গিয়ে মনে হলো, বুকের ভেতর কোথাও একটা অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি হয়েছে। মেধার দাম এই শহরে এক প্যাকেট বিরিয়ানির চেয়েও সস্তা।
বিকেলের আলো যখন মরে আসছিল, তখন ঢাকার আকাশে কালচে মেঘের আস্তরণ জমে উঠেছে। ফার্মগেটের মোড় থেকে হেঁটে মেসের গলিতে ঢুকতেই বাতাসের আর্দ্রতা আরো ভারী হয়ে উঠল।
পুরনো চারতলা বাড়িটার নিচতলায় স্যাঁতসেঁতে অন্ধকারের ভেতর দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে তিনতলায় উঠল অর্ক। শরীরে এক ফোঁটাও শক্তি অবশিষ্ট নেই। দুপুর থেকে পেটে কিছু পড়েনি, কেবল টঙের সেই কড়া লিকারের চা ছাড়া।
তিনতলার করিডোরে পা রাখতেই কাঠের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখে অর্কর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
মোতালেব ভাই। মেসের ম্যানেজার। মুখে আধপাকা চাপদাড়ি, গায়ে চেক লুঙ্গি আর ফতুয়া। হাতে মেসের খরচের লম্বা খাতা আর বলপেন। মেসের প্রতিটা সদস্যের চাল-ডালের হিসেব আর সিট ভাড়ার কড়া তাগাদা দিতে দিতে তার গলার স্বর এমনিতেই একটু কর্কশ।
অর্ককে দেখেই মোতালেব ভাই খাতাটা বন্ধ করে এক পা এগিয়ে এলেন। মুখের ভাব এক নিমেষে শক্ত হয়ে গেল।
"কী অর্ক সাহেব? দেখা পাওয়া তো ভার! তিন দিন ধইরা আপনার রুমের দরজায় নক কইরা মানুষ পাই না।"
করিডোরে তখন পাশের রুমের ছেলেরা উঁকিঝুঁকি মারছিল। অর্ক মাথা নিচু করে শান্ত গলায় বলল,
"কাজের জন্য একটু বের হতে হয়েছিল মোতালেব ভাই। এই তো আমি আপনার কাছেই আসছিলাম।"
"আমার কাছে আসছিলেন না ছাই আসছিলেন!"
মোতালেব ভাইয়ের গলার আওয়াজ পুরো করিডোরে প্রতিধ্বনিত হলো।
"আজ মাসের বারো তারিখ। বাড়িওয়ালা কালকে আইসা খাড়ায়া থাকবে ভাড়ার লেইগা। এই মেসে কি আপনি একলা থাকেন? বাকিরা সবাই তো পাঁচ তারিখের মধ্যে ক্লিয়ার করছে।"
অর্ক প্যান্টের পকেট থেকে সাবধানে টাকাগুলো বের করল। কাল রাতে রাশেদের দেওয়া ভাঁজ করা এক হাজার টাকার নোট আর আজ দুপুরে নিকেতনের সেই অফিস থেকে পাওয়া এক হাজার টাকার নোটটা। দুটো নোট একসাথে করে সে মোতালেব ভাইয়ের দিকে বাড়িয়ে দিল।
"ভাইয়া, এই যে দুই হাজার টাকা। আপাতত এটা রাখুন..."
মোতালেব ভাই টাকাটা হাত দিয়ে টান মেরে নিলেন। কিন্তু নোট দুটো গুনেই তার চোখমুখ লাল হয়ে উঠল। টাকাটা খাতার ওপর আছড়ে ফেলে একপ্রকার চিৎকার করে উঠলেন তিনি,
"দুই হাজার মানে কী? আপনার টোটাল বাকি পয়তাল্লিশশো টাকা! সিট ভাড়া পঁচিশশো, বাকি দুই হাজার আপনার মিলের খরচ আর খালা-বিল। আপনি দিলেন দুই হাজার?"
"ভাইয়া, বাকি পঁচিশশো টাকা আমি আগামী পরশুদিন দিয়ে দেব, একটা পেমেন্ট আটকে আছে "
অর্ক মিনতি করার চেষ্টা করল।
"পরশুদিন মানে? এই মেস কি আপনার বাপের সম্পত্তি?"
মোতালেব ভাইয়ের রূঢ় কথাগুলো অর্কর কানে তপ্ত তীরের মতো বিঁধল। পাশের রুম থেকে দুজন ইন্টার্ন ডাক্তার ছেলে মুখ বের করে দেখছিল।
"মেসের ভাত খাইতে তো লজ্জা লাগে না! সকাল-বিকাল ডাল-ভাত ঠিকই উদরস্থ করা হয়, আর বিল দেওয়ার বেলায় নবাবজাদার পরশুদিন! এই টাকায় বাড়িওয়ালারে কী দিব আমি? আপনের লাইগা আমি নিজের পকেট থিকা টাকা ঢালুম?"
অর্ক আর কোনো কথা বলতে পারল না। তার সমস্ত শরীর অপমানে অসাড় হয়ে আসছিল। চোখের সামনে নিকেতনের এসি রুম, সেই কামরুল ভাইয়ের তাচ্ছিল্যের হাসি আর এখন মেসের এই অন্ধকার করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার খিস্তিখেউড় সব যেন মিলেমিশে এক অসহ্য ঘূর্ণি তৈরি করেছে। সে দেওয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রইল, দৃষ্টি মেঝের শ্যাওলা পড়া কোণে নিবদ্ধ। নিজের দারিদ্র্য মানুষের সামনে এতটা নগ্ন হয়ে ধরা পড়লে আত্মসম্মান ছাড়া আর কিছুই খোয়া যায় না।
"এই মোতালেব ভাই! এত চিল্লাচিল্লি কিসের?"
সিঁড়ির দিক থেকে একটা শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠ ভেসে এলো।
অর্ক চমকে মুখ তুলে দেখল রাশেদ সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে। তার চোখেমুখে অফিস ফেরত ক্লান্তি, শার্টের হাতা গুটানো।
মোতালেব ভাই ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন,
"চিল্লামু না? পয়তাল্লিশশো টাকার জায়গায় দুই হাজার টাকা ধরায়া দেয়। আমারে কি মগের মুল্লুক পাইছে?"
রাশেদ কোনো কথা না বাড়িয়ে প্যান্টের পেছনের পকেট থেকে মানিব্যাগটা বের করল। চামড়া ওঠা পুরনো মানিব্যাগটা খুলতেই দেখা গেল ভেতরে মাত্র কয়েকটা পঞ্চাশ আর একশো টাকার নোট, আর তার মাঝে আলদা করে গুঁজে রাখা পাঁচশত টাকার কিছু নোট। রাশেদ এক মুহূর্তও দ্বিধা করল না। পাঁচশত টাকার পাঁচটা নোট টেনে বের করে সোজা মোতালেব ভাইয়ের হাতে গুঁজে দিল।
"এই নেন আপনার পঁচিশশো টাকা। হইছে তো? এখন খাতায় লাল দাগ কাটেন আর চিল্লাচিল্লি বন্ধ করেন। মেসের মানুষ কি ঘুমাবে না?"
মোতালেব ভাই টাকাটা হাতে নিয়ে একটু থতমত খেয়ে গেলেন। তারপর খাতার পাতায় কলম দিয়ে কিছু একটা ঘষে ঘষে লিখে গজগজ করতে করতে বললেন,
"আগামী মাসে পাঁচ তারিখের একদিন পার হইলে রুমের তালা ঝুলাইয়া দিমু, বইলা রাখলাম।"
মোতালেব ভাই ভারী পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে যেতেই করিডোরে আবার এক অস্বস্তিকর নিস্তব্ধতা নেমে এলো। পাশের রুমের ছেলেগুলোও ধীরে ধীরে দরজা টেনে দিল।
করিডোরের আবছা আলোয় শুধু দুজন মানুষ দাঁড়িয়ে রইল।
অর্ক রাশেদের চোখের দিকে তাকাতে পারছিল না। তার চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা নোনা পানি গড়িয়ে পড়ল।
রাশেদ এগিয়ে এসে অর্কর কাঁধে একটা হাত রাখল। কোনো সান্ত্বনার বাণী দিল না, কোনো উপদেশ দিল না। কেবল খুব ধীরে বলল,
"দরজা খোল। রুমের ভেতর যাই।"
ঘরের ছিটকিনিটা তুলে দিতেই বাইরের করিডোরের শব্দগুলো পুরোপুরি থেমে গেল। কিন্তু সেই নিস্তব্ধতার চেয়ে ঘরের ভেতরের ভারী গুমোট বাতাসটা যেন আরও বেশি দমবন্ধ লাগছিল।
অর্ক মেঝের এক কোণে পা ঝুলিয়ে বিছানায় বসে পড়ল। তার দুই হাত হাঁটুর ওপর জড়ো করা, মাথাটা বুকের কাছে নুয়ে আছে। ঘরের একমাত্র টিউবলাইটের সাদা আলোয় তার রোগা শরীরটা আর চোখের নিচের কালচে দাগগুলো আরও স্পষ্ট দেখাচ্ছিল।
রাশেদ ফ্যানটা অন করল। তারপর টেবিলের ওপর থেকে পানির বোতলটা নিয়ে এক ঢোক পানি খেয়ে খাটের অন্য পাশে বসল। সে কোনো তাড়া দিল না, অর্ক নিজে থেকেই কথা বলা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে লাগল।
কিছুক্ষণ পর অর্ক মুখ তুলে তাকাল। তার চোখ দুটো রক্তবর্ণ হয়ে উঠেছে, চোখের কোণায় পানি চিকচিক করছে।
"রাশেদ..."
অর্কর গলার স্বর কাঁপছিল।
"আমি আর পারছি না রে।"
রাশেদ স্থির দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
"আমি আর পারছি না,"
অর্ক আবার বলল, এবার তার গলা দিয়ে তীব্র একটা অসহায়ত্ব বেরিয়ে এলো।
"লেখালেখি ছাড়া আমি আর কিছু জানি না, কিছু পারি না। কোনো কাজে আমার মন বসে না। এই ঢাকা শহরে বুয়েট, চুয়েট থেকে পাশ করা পোলাপানই আজ টিউশনি পায় না, টিউশনির জন্য মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে... আর আমি তো একটা ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির আন্ডারে সাধারণ কলেজ থেকে ইংলিশে অনার্স পাশ করা ছেলে! আমাকে কে টিউশনি দেবে বল? কার কাছে যাব?"
সে দুই হাতে নিজের চুল খামচে ধরল। একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
"সস্তা স্ক্রিপ্ট আর ফেসবুকের কনটেন্ট লিখে আর কতদিন টানব? মাসে হাজার-বারোশো টাকার জন্য মানুষের পায়ের তলায় পড়ে থাকতে হয়। আজ নিকেতনের অফিসে গিয়ে আমার মনে হচ্ছিল, আমি আসলে একটা ভিখারি। আমার নিজের কোনো অস্তিত্ব নাই। রিয়েলিটি এত নিষ্ঠুর কেন রে রাশেদ? স্বপ্ন দেখা কি এত বড় অপরাধ?"
রাশেদ চুপচাপ শুনছিল। সে জানে এই মুহূর্তে কোনো যুক্তিতর্ক বা বড় বড় উপদেশ অর্কর ক্ষতটাতে মলম লাগাতে পারবে না।
অর্ক রাশেদের হাতটা চেপে ধরল। তার চোখের পানি তখন গাল বেয়ে নামছে।
"আমাকে একটা কাজ খুঁজে দে, প্লিজ। যেকোনো কাজ। অফিসে পিয়নের কাজ হলেও আমি করবো। আমি আর এই লেখালেখির নাটক চালাতে পারছি না। আমার মেসের ভাড়া দিতে হবে, ঘরে দুবেলা ভাত খাইতে হবে। প্লিজ রাশেদ, আমাকে একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দে।"
রাশেদ কিছুক্ষণ অর্কর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর নিজের হাতটা বাড়িয়ে অর্কর কাঁধে শক্ত করে চেপে ধরল।
"হয়ে গেছে তোর কান্না?"
রাশেদের গলার স্বর শান্ত কিন্তু ভীষণ ভারী।
"নিজেকে আর কত ছোট করবি তুই?"
অর্ক ভেজা চোখে তাকিয়ে রইল।
"অর্ক, শোন,"
রাশেদ খুব নিচু কিন্তু গভীর গলায় বলল।
"তোর সার্টিফিকেটে কোন কলেজের নাম লেখা আছে সেটা দিয়ে এই শহর তোকে মাপতে পারে, কিন্তু আমি তোকে চিনি। যে ছেলেটা পকেটে এক কাপ চায়ের টাকা না থাকা সত্ত্বেও রাত জেগে গল্প লিখতে পারে, সে আর যাই হোক হার মানার জন্য জন্মায় নাই।"
রাশেদ একটু থেমে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
"আমি তোকে লেখা ছাড়তে বলব না। গিভ আপ করা এত সহজ না। তবে তুই যে বাস্তবতার কথা বলছিস, সেটা সত্যি। পেটে ভাত না থাকলে মাথায় গল্প আসে না।"
রাশেদ পকেট থেকে রুমাল বের করে অর্কর দিকে বাড়িয়ে দিল।
"আমাদের অফিসের এক কলিগের পরিচিত একটা বড় সুপার শপ আছে, গ্রিন রোডের দিকে। ওখানে সেলস আর বিলিংয়ের জন্য লোক লাগবে শুনছিলাম। আমি কাল সকালেই কথা বলব। নাইট শিফটে কাজ পাবি। সন্ধ্যা থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত কাজ করবি, মেসের খরচ আর নিজের ডাল-ভাতের টাকা উঠে যাবে। আর বাকি সময়টা তুই শুধু লিখবি। এক ফোঁটাও অন্য কোনো চিন্তা করবি না।"
অর্ক স্তব্ধ হয়ে বসে রইল।
"কথা দে আমাকে,"
রাশেদ অর্কর চোখের দিকে চোখ রেখে বলল,
"চাকরি তুই করবি, মেসের ভাড়াও তুই দিবি। কিন্তু ডায়েরির পাতায় লেখা বন্ধ করবি না। তোকে দিয়ে হবে অর্ক। এই শহরের কেউ বিশ্বাস না করলেও, আমি বিশ্বাস করি।"
অর্ক চোখ মুছে জানালার ওপাশে তাকিয়ে থাকা আঁধার ঢাকা শহরটার দিকে তাকাল। অর্ক এবার রাশেদের দিকে তাকিয়ে বলল
"আমি পারবো রাশেদ আমি পারবো"
পরদিন সকালের ঢাকা শহরটা ছিল অন্যরকম।
রাতের বৃষ্টির রেশ পুরোপুরি কাটেনি। গ্রিন রোডের পিচঢালা রাস্তায় কাদাপানির ছিটকে ওঠা দাগ, ফুটপাতে চায়ের দোকানে কেটলির তীব্র শিস আর রিকশার টুংটাং শব্দে চারপাশ মুখর। সকাল আটটার মধ্যে রাশেদ তার ট্রাভেল এজেন্সির জামাকাপড় পরেই মেসের দরজায় এসে তাড়া দিল।
গ্রিন রোডের মূল সড়কের একটু ভেতরের দিকে দোতলা বিশাল সুপার শপ
"ডেইলি বাজার" বড় বড় কাঁচের দেওয়াল, ভেতরে ঝকঝকে সাদা এলইডি আলোর রোশনাই। বাইরে থেকেই দেখা যাচ্ছে সারিবদ্ধ র্যাক, রঙবেরঙের পণ্যের সারি আর কর্মীদের ব্যস্ত ছোটাছুটি।
রাশেদ অর্ককে নিয়ে পেছনের স্টাফ এন্ট্রি দিয়ে দোতলার ম্যানেজারের কেবিনে নিয়ে গেল। কেবিনের দরজায় প্লাস্টিকের নেমপ্লেটে লেখা—
"মো. আকতার হোসেন, ব্রাঞ্চ ম্যানেজার"
ভেতরে ঢুকতেই দেখা গেল কাঁচাপাকা চুলের এক ভদ্রলোক চশমার ওপর দিয়ে কম্পিউটারের মনিটরে কী যেন দেখছেন। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি, বেশ রাশভারী চেহারা। টেবিলের ওপর একগাদা ইনভয়েস আর স্টকের ফাইল ছড়ানো।
"আসসালামু আলাইকুম, আকতার ভাই,"
রাশেদ একটু বিনীত ভঙ্গিতে ঢুকল।
আকতার সাহেব চশমাটা নাকের ওপর নামিয়ে তাকালেন।
"আরে রাশেদ! আসো। তোমার কথাই ভাবছিলাম। এই ছেলেটাই?"
"জি ভাইয়া, অর্ক। আমার ছোটবেলার বন্ধু। খুব সৎ আর কাজের ছেলে,"
রাশেদ আশ্বস্ত করার গলায় বলল।
আকতার সাহেব অর্কর দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকালেন। অর্কর গায়ে একটা পরিষ্কার কিন্তু পুরানো হয়ে যাওয়া সুতির শার্ট, পায়ে সাধারণ বাটার স্যান্ডেল। কিন্তু তার চোখেমুখে কোনো চাতুরী নেই, আছে একধরনের নীরব ভদ্রতা।
"অনার্স পাশ করছ শুনলাম, ইংলিশে?"
আকতার সাহেব ফাইল থেকে মুখ তুলে জিজ্ঞেস করলেন।
"জি স্যার,"
অর্ক শান্ত গলায় উত্তর দিল।
"এখানে স্যারের কোনো কাম নাই, ভাই বলবা,"
আকতার সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হেলান দিয়ে বসলেন।
"শোন অর্ক, কাজ খুব কঠিন কিছু না, কিন্তু দায়িত্বের। সকালে যে মালগুলো লোড-আনলোড হয়, সেগুলোর ইনভেন্টরি চেক করতে হবে। কোন র্যাকে কোন আইটেম শর্ট পড়ছে সেটা রেজিস্টারে তুলবা, আর দিন শেষে ক্যাশ বক্সে বিক্রির সাথে সফটওয়্যারের হিসাব মেলায়ে আপডেট দিবা। এক টাকার গরমিল হইলেও কিন্তু জবাবদিহি তোমার।"
অর্ক মাথা নাড়ল।
"জি ভাইয়া, আমি খুব সাবধানে করবো।"
"বেতন শুরুতে আট হাজার টাকা,"
আকতার সাহেব স্পষ্ট করে বললেন।
"তিন মাস পর কাজ ভালো দেখলে কিছু বাড়তে পারে। আমাদের শিফট দুইটা। একটা সকাল ছয়টা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা, বারো ঘণ্টার ফুল ডে শিফট। আরেকটা সন্ধ্যা ছয়টা থেকে রাত বারোটা, ক্লোজিং শিফট। কোনটা নিবা?"
রাশেদ অর্কর দিকে তাকাল। রাশেদের চোখে স্পষ্ট ছিল যে সে হয়তো ছোট শিফটটাই পছন্দ করবে যাতে শরীরটা বাঁচে। কিন্তু অর্কর মাথায় তখন অন্য হিসেব চলছিল।
সন্ধ্যা ছয়টা থেকে রাত বারোটার শিফট নিলে দিনের আলোতে সে হয়তো ঘুমাবে, কিন্তু রাতটা নষ্ট হয়ে যাবে। রাতের যে নিস্তব্ধতা লেখার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সেই সময়টায় সে মেসের টেবিলে বসতে পারবে না। কিন্তু সকাল ছয়টায় ঢুকলে সারাদিন কাজ শেষ করে সন্ধ্যা ছয়টায় সে একদম মুক্ত। পুরো সন্ধ্যা আর সারাটা রাত তার নিজের, তার উপন্যাসের সাদা পাতাগুলোর।
"ভাইয়া, আমি সকালের শিফটটা নেব,"
অর্ক দ্বিধাহীন কণ্ঠে বলল।
"সকাল ছয়টা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা।"
আকতার সাহেব একটু অবাক হলেন, তবে মুখে কিছু বললেন না। ড্রয়ার থেকে একটা নীল রঙের অ্যাপ্রন আর একটা আইডিকার্ডের ফিতা বের করে টেবিলের ওপর রাখলেন।
"ঠিক আছে। কাল সকাল পৌনে ছয়টায় ইন করবা। এক মিনিটও যেন লেট না হয়।"
কেবিন থেকে বের হয়ে সুপার শপের কাঁচের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল দুজন।
রাশেদ অর্কর কাঁধে একটা চাপ দিল। তার মুখে এক স্বস্তির হাসি।
"আট হাজার টাকা খুব বেশি না রে অর্ক, কিন্তু মেসের ভাড়া আর বুয়ার বিল দিয়েও তোর হাতে কিছু থাকবে। কারোর কাছে আর হাত পাতা লাগবে না।"
অর্ক অ্যাপ্রনটা হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে রাখল। কাপড়ের নতুন গন্ধটা তার নাকে লাগছিল।
"ধন্যবাদ রে রাশেদ,"
অর্কর কণ্ঠটা সামান্য কেঁপে উঠল।
"ধন্যবাদ দিয়ে পর করিস না,"
রাশেদ ঘড়ি দেখল।
"আমার অফিসে দেরি হয়ে যাচ্ছে, আমি ধানমন্ডির দিকে গেলাম। তুই সাবধানে মেসে যা, কাল সকাল থেকে নতুন যুদ্ধ শুরু।"
রাশেদ ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে গেল।
অর্ক দাঁড়িয়ে রইল সুপার শপের সামনে। কাঁচের ওপাশে বড় বড় ঝকঝকে আলোর নিচে কর্মীরা ব্যস্ত হয়ে কাজ করছে। কাল ভোর থেকে সেও এই বিশাল চাকার একটা ছোট অংশ হয়ে যাবে।
অ্যাপ্রনটা ব্যাগে ভরে সে মেসের ফিরতি পথে পা বাড়াল।
ভোর সাড়ে পাঁচটার ঢাকা শহরটা একেবারেই অন্যরকম।
রাস্তায় গাড়ির কোনো হর্ন নেই, বাতাসে রাতের ঠাণ্ডা ভাবটা এখনো লেগে আছে। গ্রিন রোডের মোড়ে কয়েকটা চায়ের দোকানে সবেমাত্র গ্যাসের চুলা জ্বালানো হয়েছে। কুয়াশা আর ধোঁয়ার মিশ্রণে নিঝুম রাস্তায় দ্রুত পায়ে হেঁটে সুপার শপের পেছনের গেটে পৌঁছাল অর্ক। সময় তখন ঠিক পাঁচটা বেজে পঞ্চাশ মিনিট।
ভেতরে ঢুকতেই দেখা গেল সকালের শিফটের কর্মীরা একে একে জড়ো হচ্ছে। সবার বয়সই কাছাকাছি বাইশ থেকে সাতাশের মধ্যে। কেউ কলেজের ছাত্র, কেউ অন্য কোনো প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে পড়ছে। পড়াশোনার ফাঁকে নিজের খরচ টানার জন্যই বেশিরভাগ ছেলেমেয়ে এখানে কাজ করে। নীল রঙের টি-শার্ট আর অ্যাপ্রন পরা ছেলেমেয়েগুলোর মুখে সকালের ঘুমের রেশ, কিন্তু নিজেদের মধ্যে টুকটাক হাসাহাসি আর আড্ডা চলছে।
ফ্লোর সুপারভাইজার তানভীর নামের সাতাশ বছরের এক চটপটে ছেলে অর্কর হাতে একটা ক্লিপবোর্ড আর কলম ধরিয়ে দিল।
"অর্ক ভাই, নতুন আসছেন তাই না? আসেন আমার সাথে। আগে দুধ আর বিস্কুটের সেকশনের স্টকটা গুনে ফেলি। কোনো কার্টনের সিল কাটা থাকলে সরাসরি নোট রাখবেন।"
সকাল আটটা পর্যন্ত একটানা চলল ইনভেন্টরির কাজ। ধুলোমাখা কার্টনের সংখ্যা মেলানো, এক্সপায়ারি ডেট চেক করা আর রেজিস্টার খাতায় এন্ট্রি নেওয়া। কাজটা খুব ভারী না হলেও একটানা দাঁড়িয়ে থাকতে গিয়ে পায়ের গোড়ালিতে হালকা ব্যথা শুরু হয়ে গেল অর্কর।
সকাল নয়টায় সুপার শপের মূল কাঁচের দরজা খুলে দেওয়া হলো সাধারণ ক্রেতাদের জন্য। ভেতরে ভেসে এলো হালকা ইনস্ট্রুমেন্টাল মিউজিক।
আকতার সাহেব কেবিন থেকে বেরিয়ে অর্ককে ডেকে বললেন,
"অর্ক, ইনভেন্টরি তো বুঝলা। এবার দুই নম্বর ক্যাশ কাউন্টারে বসো। বিলিং সফটওয়্যারটা খুব সিম্পল, বারকোড স্ক্যান করবা আর ক্যাশ নিলে চেঞ্জ অ্যামাউন্টটা সফটওয়্যারে দেখে কাস্টমারকে বুঝায়া দিবা।"
অর্ক কাউন্টারে গিয়ে বসল। কাঠের ছোট্ট চেয়ার, সামনে কম্পিউটার স্ক্রিন আর প্রিন্টার মেশিন।
তার ঠিক পাশের তিন নম্বর কাউন্টারে বসে কাজ গুছিয়ে নিচ্ছিল একটি মেয়ে।
মেয়েটির অ্যাপ্রনের ওপর ছোট ব্যাজে কালো হরফে লেখা
"অর্পিতা"
চোখে পাতলা ফ্রেমের চশমা, চুলগুলো খুব সাধারণভাবে পেছনে একটা সাধারণ ক্লিপ দিয়ে আটকানো। কোনো বাড়তি সাজগোজ নেই, তবে চোখের চাহনিতে একটা অদ্ভুত শান্ত এবং গোছানো ভাব আছে। বয়স অর্কর মতোই চব্বিশ-পঁচিশের বেশি হবে না।
শুরুর দিকে ক্রেতাদের চাপ কম থাকলেও সাড়ে দশটার দিকে বেশ কয়েকজন ক্রেতা লাইনে দাঁড়াল। অর্ক সাবধানে স্ক্যানার দিয়ে পণ্যের গায়ে বারকোড ধরতে লাগল। কিন্তু হঠাৎ করেই একটা গুঁড়োদুধের প্যাকেটের বারকোড রিড করতে গিয়ে বিপত্তি বাঁধল। স্ক্যানার থেকে কোনো
"বিপ"
শব্দ আসছে না, স্ক্রিনেও দাম উঠছে না। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মধ্যবয়সী ভদ্রলোক বিরক্তির সুরে বলে উঠলেন,
"কী ভাই, এত দেরি হচ্ছে কেন? অফিস ধরতে হবে তো!"
অর্ক অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। কী-বোর্ডে ম্যানুয়ালি কোড খুঁজতে গিয়ে আঙুল কাঁপছিল তার।
ঠিক তখনই পাশের কাউন্টার থেকে একটা শান্ত, নিচু কণ্ঠ শোনা গেল।
"ভুল কোড এন্টার করছেন। এফ-টু চাপেন, তারপর আইটেমের শর্ট কোডটা দিন।"
অর্ক মুখ তুলে তাকাল। অর্পিতা নিজের কাউন্টারে একটা চালের ব্যাগের বারকোড স্ক্যান করতে করতেই খুব স্বাভাবিকভাবে কথাটা বলল।
অর্ক দ্রুত কি-বোর্ডে
"F2"
চাপতেই মনিটরে সাথে সাথে পপ-আপ মেনু খুলে গেল। কোড বসালেই সেকেন্ডের মধ্যে রসিদ প্রিন্ট হয়ে বেরিয়ে এলো। ভদ্রলোক টাকা মিটিয়ে চলে যেতেই অর্ক একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল।
সে পাশের কাউন্টারের দিকে তাকিয়ে একটু ইতস্তত করে বলল,
"থ্যাংক ইউ।"
অর্পিতা চশমার ফাঁক দিয়ে তাকাল। তার মুখে কোনো বড়সড় ভাবান্তর নেই, তবে ঠোঁটের কোণে খুব হালকা, পেশাদার একটা হাসি ফুটে উঠল।
"সমস্যা নেই। নতুন জয়েন করলে সফটওয়্যারের শর্টকাটগুলো একটু ঝামেলা করে। দুই-তিন দিন কাজ করলেই হাত চলে আসবে।"
"আসলে এই সফটওয়্যারটা আগে কখনো ব্যবহার করিনি তো, তাই একটু..."
অর্ক টেবিল গোছাতে গোছাতে বলল।
"প্রথম প্রথম সবারই এমন হয়,"
অর্পিতা নিজের ড্রয়ারের ক্যাশ গোছাতে গোছাতে বলল।
"আমি যখন প্রথম এসেছিলাম, প্রথম দিনেই তিনশো টাকার একটা হিসাবে গরমিল করে আকতার ভাইয়ের বকা খেয়েছিলাম।"
কথাটা শুনে অর্কর ঠোঁটেও মৃদু হাসি চলে এলো।
"আপনি কি ফুল টাইম?"
অর্পিতা স্ক্যানারটা যথাস্থানে রাখতে রাখতে জিজ্ঞেস করল।
"হুম, সকালের শিফট। ছয়টা থেকে ছয়টা।"
"দিনের পুরোটা সময় এখানেই চলে যাবে। কঠিন হবে। পড়াশোনা শেষ?"
"হ্যাঁ, অনার্স শেষ হয়েছে । আপনি?"
"আমার মাস্টার্স ফাইনাল চলছে,"
অর্পিতা ক্যাশ কাউন্টারের লাল বাতিটা অন করে পরবর্তী কাস্টমারের বাস্কেটের দিকে হাত বাড়াল।
"বাসা কোথায় আপনার?"
"ফার্মগেটের দিকে, একটা মেসে থাকি।"
অর্পিতা আর কোনো প্রশ্ন করল না। নতুন একজন কাস্টমার ততক্ষণে তার কাউন্টারের সামনে ট্রলি নিয়ে দাঁড়িয়েছে। সে আবার নিজের কাজে ডুবে গেল। পণ্যের গায়ে বারকোড ধরা আর স্ক্যানারের সেই চেনা
"বিপ"
শব্দে ভরে উঠল কাউন্টার।
দেখতে দেখতে একটা মাস কেটে গেল এক অদ্ভুত নিয়মানুবর্তিতার মধ্য দিয়ে।
প্রতিদিন ভোর পাঁচটায় অ্যালার্মের শব্দে ঘুম ভাঙা, মেসের এক চিলতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে চোখেমুখে ঠাণ্ডা পানির ঝাপটা দেওয়া, তারপর কুয়াশা আর ধোঁয়ায় মোড়া গ্রিন রোডের দিকে হাঁটা সবকিছু যেন একটা অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেল।
সুপার শপের বারো ঘণ্টার ডিউটি সহজ ছিল না। সারাদিন ক্যাশ কাউন্টারে বসে হাজারটা ক্রেতার মুখ দেখা, বারকোডের অবিরাম
"বিপ বিপ"
শব্দ আর টাকার লেনদেনের হিসেব রাখা। শুরুর দিকে সন্ধ্যায় মেসে ফিরে শরীর এমনভাবে ভেঙে আসত যে বিছানায় গা এলিয়ে দিলেই চোখ বুজে আসত। কিন্তু অর্ক নিজেকে ঘুমিয়ে পড়তে দেয়নি।
মেসে ফিরে এক মগ কড়া লাল চা আর এক বালতি ঠাণ্ডা পানিতে গোসল সেরে সে ঠিক সাড়ে সাতটায় পড়ার টেবিলে বসত। টেবিলের হলুদ বাতিটার নিচে শুরু হতো তার আসল জীবন। সারাদিনের যান্ত্রিক ক্লান্তি ধুয়েমুছে গিয়ে তার কলমের ডগায় প্রাণ পেত ডায়েরির চরিত্রগুলো। মাঝে মাঝে ছোটখাটো দু-একটা ফেসবুক কনটেন্ট বা ইউটিউবের নাটকের সিনারিও লেখার কাজ এলে সেটাও সে রাতের ফাঁকে সেরে নিত। মাসের মাঝামাঝি সময়ে এভাবে টুকটাক কিছু বাড়তি টাকাও বিকাশে জমা হলো।
মাসের এক তারিখে আকতার সাহেব ডেকে অর্কর হাতে একটা খাকি রঙের খাম ধরিয়ে দিলেন। খামের ভেতর নতুন কড়কড়ে আটটি এক হাজার টাকার নোট।
টাকাগুলো হাতে নিয়ে অর্কর আঙুলগুলো এক মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠেছিল। জীবনে এই প্রথম সে কোনো ভিক্ষা বা তাচ্ছিল্যের বিনিময়ে নয়, নিজের সৎ ঘামের বিনিময়ে নিশ্চিত একটা পারিশ্রমিক পেল।
পরদিন সকালেই সে মেসের মোতালেব ভাইয়ের রুমে গিয়ে খাতা খোলার আগেই পয়তাল্লিশশো টাকা টেবিলের ওপর রাখল।
মোতালেব ভাই চশমাটা নাকের ওপর নামিয়ে অবাক চোখে তাকালেন। মাসের দুই তারিখেই পুরো ভাড়া আর মিলের টাকা পরিশোধ এমন ঘটনা এই মেসে খুব কমই ঘটে। তিনি গম্ভীর মুখে টাকাটা গুনে খাতার পাতায় কলম দিয়ে সই করলেন, তবে আজ তার মুখে কোনো কর্কশ ভাব ছিল না। টাকাটা ড্রয়ারে রেখে একটা মিষ্টি পানের খিল মুখে দিয়ে বললেন,
"এই তো অর্ক সাহেব, নিয়মমতো চললে কি আর কারো সাথে ক্যাঁচাল হয়? ভালো।"
সেই রাতেই মেসের নিচে টঙের দোকানে বসে রাশেদের হাতে পঁচিশশো টাকা তুলে দিল অর্ক।
রাশেদ চায়ের কাপ নামিয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
"এটা কী?"
"তোর ধারের টাকা,"
অর্ক শান্ত গলায় বলল।
"সবটা একবারে দিতে পারছি না রে, বাকিটাও আস্তে আস্তে দিয়ে দেব।"
রাশেদ টাকাগুলোর দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর অর্কর মুখের দিকে তাকিয়ে এক চওড়া হাসি হাসল। সে টাকাটা পকেটে ঢোকাল না, অর্কর কাঁধে একটা হালকা চাপ দিয়ে বলল,
"তুই যে মানুষ হয়ে উঠছিস অর্ক, এটাই দেখতে চেয়েছিলাম। টাকা নিয়ে ভাবিস না, আগে নিজের থাকা-খাওয়া ঠিক রাখ।"
জীবনটা যেন হঠাৎ করেই একটু থিতু হতে শুরু করেছে। পেটের ক্ষুধা আর বাড়িভাড়ার তাগাদা যখন কমে এলো, তখন অর্কর উপন্যাসের পাতাগুলোও দ্রুত গতিতে ভরতে লাগল।
সুপার শপেও পরিবেশটা সহজ হয়ে আসছিল। পাশের তিন নম্বর কাউন্টারে অর্পিতার সাথে এখন প্রতিদিন দেখা হয়। সকালে কাজে ঢোকার সময় মৃদু
"শুভ সকাল"
দুপুরের খাবারের বিরতিতে একসাথে এক কাপ চা খাওয়া কিংবা কোনো খিটখিটে কাস্টমার চলে যাওয়ার পর নিজেদের মধ্যে চোখাচোখি করে চেপে রাখা হাসি সবকিছু মিলিয়ে কাজের জায়গাটা আর আগের মতো অচেনা বা নিষ্ঠুর মনে হতো না।
রাত তখন একটা। মেসের জানালার ওপাশে পুরো শহর ঘুমে নিস্তব্ধ।
অর্ক ডায়েরির শেষ পৃষ্ঠায় একটা বড় দাড়ি টেনে কলমটা রাখল। উপন্যাসের প্রথম খণ্ডটা প্রায় গুছিয়ে এসেছে।
দুপুর আড়াইটার দিকে সুপার শপের স্টাফ ক্যাফেটেরিয়াটা বেশ নির্জন হয়ে পড়ে।
দোতলার পেছনের কোণের এই ছোট ঘরটায় কয়েকটা প্লাস্টিকের চেয়ার আর একটা লম্বা অ্যালুমিনিয়ামের টেবিল পাতা। দুপুরের মূল ভিড়টা সামলে কর্মীরা যার যার মতো খাবার খেয়ে আবার নিচে নেমে গেছে।
অর্ক টেবিলের এক কোণে বসে ছিল। তার সামনে প্লাস্টিকের টিফিন বক্সে মেসের বুয়ার দেওয়া ভাত আর আলুভর্তা অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। এখন তার সামনে খোলা একটা মোটা কালো রঙের হার্ডবাউন্ড খাতা। অর্ক একহাতে চিবুক ঠেকিয়ে অন্য হাতে একটানা লিখে চলেছে। তার মনোযোগ এত তীব্র ছিল যে চারপাশের কোনো আওয়াজই যেন তার কান পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছিল না।
খাতার ওপরের পাতায় গাঢ় কালিতে শিরোনাম লেখা—
"শেষ মানুষটির ডায়েরি"
একটি সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার ও ডিস্টোপিয়ান রূপকথা
দরজার পর্দা ঠেলে ভেতরে ঢুকল অর্পিতা। হাতে একটা কাঁচের পানির বোতল। সে নিজের কাউন্টারের ক্যাশ মেলাতে গিয়ে লাঞ্চে আসতে একটু দেরি করে ফেলেছে।
টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াতেই অর্পিতার চোখ গেল খাতার পাতাগুলোর দিকে। অর্ক তখনো লিখছে, ক্ষিপ্র গতিতে কলম চলছে লাইনের পর লাইন।
"কী লিখছেন এত মনোযোগ দিয়ে?"
অর্ক চমকে মুখ তুলল। অপ্রস্তুত হয়ে তড়িঘড়ি করে খাতাটা বন্ধ করতে গেল সে। মুখে একটু লজ্জা আর সংকোচের ছোঁয়া।
"না... মানে, কিছু না। এমনি একটু টুকটাক..."
অর্পিতা টেবিলের উল্টো দিকের চেয়ারটা টেনে বসল। তার মুখে একটা মৃদু কৌতূহলের হাসি।
"লুকাচ্ছেন কেন? এতক্ষণ ধরে এমনভাবে লিখছিলেন যেন আশেপাশে বোমা ফাটলেও আপনি টের পাবেন না। দেখি কী লিখেছেন?"
অর্ক একটু দ্বিধায় পড়ল। মেসের রাশেদ ছাড়া তার লেখার খসড়া এই শহরে আর কেউ কোনোদিন ছুঁয়েও দেখেনি। নিকেতনের কামরুল ভাইদের মতো মানুষের তাচ্ছিল্য দেখতে দেখতে তার নিজের সৃষ্টির প্রতিও একধরনের সংকোচ জন্মে গেছে।
তবুও সে ধীরে ধীরে খাতাটা অর্পিতার দিকে বাড়িয়ে দিল।
অর্পিতা চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে খাতার পাতা উল্টাল। প্রথম পাতাতেই চোখ আটকে গেল তার। গল্পটার প্রেক্ষাপট এক ধ্বংসস্তূপে রূপ নেওয়া পৃথিবীর, যেখানে শেষ জীবিত মানুষটির মনের সাইকোলজিক্যাল টানাপোড়েন, এক অচেনা রহস্য আর হারিয়ে যাওয়া এক ভালোবাসার স্মৃতি মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। প্রতিটি লাইনে শব্দের এমন এক নিখুঁত গাঁথুনি আর অনুভূতির গভীরতা যে অর্পিতা টানা তিনটি পাতা এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলল।
ক্যাফেটেরিয়ায় তখন শুধু ছাদের ফ্যানের ভনভন শব্দ।
পাতা ওল্টানো থামিয়ে অর্পিতা মুখ তুলে তাকাল। তার চোখের দৃষ্টিতে স্পষ্ট বিস্ময় আর গভীর মুগ্ধতা।
"আপনি তো দারুণ লেখেন, অর্ক!"
অর্পিতার কণ্ঠে কোনো বানানো প্রশংসা ছিল না
"সাইকোলজিক্যাল থ্রিলারের সাথে রোমান্সের এমন ব্লেন্ডিং আমি খুব কম বাংলা উপন্যাসে দেখেছি। বিশেষ করে ডায়লগগুলো... ভেতরটা কেমন যেন নাড়া দিয়ে ওঠে।"
অর্কর বুকের ভেতরটা এক মুহূর্তের জন্য যেন কেঁপে উঠল। কতদিন পর কেউ তার লেখার দিকে তাকিয়ে এমন নির্ভেজাল শ্রদ্ধার চোখে কথা বলল!
সে একটা ম্লান হাসি দিল।
"ধন্যবাদ। তবে এই লেখার কোনো মূল্য এই শহরে নেই। কত প্রকাশকের দুয়ারে যে ফিরেছি, তার কোনো হিসেব নেই।"
অর্পিতা খাতাটা আলতো করে বন্ধ করে অর্কর সামনে রাখল।
"মূল্য নেই কে বলল? ভালো জিনিস কখনোই হারিয়ে যায় না। কিন্তু আপনি তো ইংলিশে অনার্স করেছেন, লেখালেখি নিয়ে এত পাগল কেন?"
"পাগলামি ছাড়া আর কী-ই বা বলব,"
অর্ক খুব নিচু গলায় বলতে শুরু করল।
"ক্লাস সিক্সে যখন পড়তাম, তখন মা মারা যান। মা চলে যাওয়ার পর বাড়িতে এক অদ্ভুত একাকীত্ব আমাকে ঘিরে ধরেছিল। কথা বলার কেউ ছিল না, তাই কাগজ-কলমই আমার বন্ধু হয়ে যায়। কিন্তু বাবা কোনোদিন এটা মানতে পারেননি। তিনি চাইতেন আমি কোনো ব্যাংকে বা সরকারি চাকুরির পেছনে ছুটি। লেখালেখি নিয়ে ঘরে এত অশান্তি হতো যে একপর্যায়ে টিকতে পারিনি। একদিন শুধু একটা কাঁধের ব্যাগ আর এই খাতাগুলো নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে সোজা ঢাকায় চলে আসি। প্রথম দিকে বাবার সাথে কথা হলেও আজ তিন বছর হলো বাবার সাথে কোনো যোগাযোগ নেই।"
অর্পিতা কোনো কথা বলল না। তার চোখের পাতাগুলো স্থির হয়ে আছে অর্কর মুখের ওপর। সেই চোখে গভীর এক সহমর্মিতা।
অর্ক লজ্জা পেয়ে একটু হাসল।
"নিজের দুঃখের কথা বলে আপনাকে বোর করলাম, সরি।"
"না, একদম না, বরং মনে হচ্ছে আমার মতো আরেকজন লড়াই করা মানুষের সাথে কথা বলছি।"
অর্ক একটু অবাক হয়ে তাকাল।
"আপনার কথা তো কখনো শুনিনি।"
অর্পিতা নিজের হাত দুটো টেবিলের ওপর জড়ো করল।
"আমার বাবা-মা দুজনের কেউই বেঁচে নেই,"
অর্পিতা খুব শান্ত গলায় বলল,
"এক রোড এক্সিডেন্টে দুজন একসাথে চলে যান। আমার ছোট একটা বোন আছে, এবার এসএসসি দেবে। আমরা থাকি আমার খালার বাসায়।"
সে একটু থামল। একটা মৃদু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
"আত্মীয়ের বাসায় থাকা যে কতটা যন্ত্রণার, তা যার হয়েছে সেই বোঝে। প্রতিটা লোকমা মুখে তোলার আগে খোঁটা শুনতে হয়। বোনটার পড়ার খরচ, নিজের মাস্টার্সের বেতন আর বেঁচে থাকার জন্য এই সুপার শপের বারো ঘণ্টার চাকরিটাই আমার শেষ ভরসা। রাতে বাসায় ফিরে যখন দেখি বোনটা পড়ার টেবিলে একা বসে কাঁদছে, তখন মনে হয় ক্লান্তি জিনিসটা আমার মতো মানুষের জন্য বিলাসিতা।"
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি নামার প্রস্তুতি চলছে। বাতাসে কাঁচের জানালায় মৃদু কাঁপুনি।
এই বিশাল, ব্যস্ত, অনুভূতিহীন ঢাকা শহরে দুটো মানুষ বসে আছে একটা কাঠের টেবিলের দুপাশে। একজন নিজের অস্তিত্বের সবটুকু ঢেলে একখানা ডায়েরির পাতায় জীবনের অর্থ খুঁজছে, আর অন্যজন নিজের সবটুকু সুখ বিসর্জন দিয়ে একটা ছোট বোনকে আগলে বাঁচার লড়াই করছে।
তাদের পথ আলাদা, কিন্তু লড়াইয়ের ভাষাটা অদ্ভুতভাবে এক।
অর্পিতা ঘড়ির দিকে তাকাল। তিনটা বাজতে দশ মিনিট বাকি। সে উঠে দাঁড়িয়ে অ্যাপ্রনটা ঠিক করল।
যাওয়ার আগে অর্কর চোখের দিকে তাকিয়ে খুব আন্তরিক গলায় বলল,
"উপন্যাসটা শেষ করবেন কিন্তু। মাঝপথে থামবেন না। আমি পুরোটা পড়তে চাই।"
অর্পিতা দরজা ঠেলে বাইরে চলে গেল।
ছয়টি মাস কীভাবে যে ডানা মেলে উড়ে গেল, ঢাকা শহরের চেনা ব্যস্ততায় তা টেরই পাওয়া গেল না।
জীবনের চাকাটা এবার একটু একটু করে স্বাভাবিক ছন্দে ঘুরতে শুরু করেছে। সুপার শপে সততা আর নিয়মানুবর্তিতার কারণে মাস তিনেক আগেই আকতার সাহেব খুশি হয়ে অর্কর বেতন বাড়িয়ে এগারো হাজার টাকা করে দিয়েছেন। মেসের ভাড়ার টানাপোড়েন এখন আর আগের মতো শ্বাসরুদ্ধকর নয়। মোতালেব ভাইও এখন করিডোরে দেখা হলে মুখে একটু মৃদু হেসে কুশল জিজ্ঞেস করেন।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছিল অর্কর ভেতরের সৃষ্টিশীল জগতে। রাতের পর রাত মেসের নিস্তব্ধ ঘরে টেবিল ল্যাম্পের নিচে জেগে থাকার ফল মিলতে শুরু করেছে। লিটল ম্যাগাজিন আর দুটি জাতীয় দৈনিকের সাপ্তাহিক সাহিত্য পাতায় তার তিন-চারটি ছোটগল্প ও কবিতা ছাপা হয়েছে। কোনো পারিশ্রমিক না পেলেও ছাপার অক্ষরে নিজের নাম দেখার সেই তীব্র আনন্দ অর্কর ভেতরের আত্মবিশ্বাসকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।
এর মধ্যেই অর্পিতার মাস্টার্স ফাইনালের রেজাল্ট বের হলো। প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হওয়ার পরপরই সে তেজগাঁওয়ের একটি বড় কার ডিলারশিপের অফিস ম্যানেজারের চাকরি পেয়ে যায়। সুপার শপের বারো ঘণ্টার সেই হাড়ভাঙা খাটুনি আর ছিল না, খালার বাসার পরিবেশেও সামান্য হলেও একটু স্বস্তি ফিরেছিল তার নিজের উপার্জনের জোর বাড়ায়।
কাজের জায়গা বদলে গেলেও দুজনের যোগাযোগে কোনো ছেদ পড়েনি। বরং ব্যস্ত শহরের দুই প্রান্তে সারাদিনের ক্লান্তির পর সন্ধ্যার কিছু সময় একে অপরের সাথে কাটানোটা তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। ধানমন্ডি লেকের পাড়, টিএসসির চায়ের দোকান কিংবা শাহবাগের ফুটপাত ধরে নিঃশব্দে হেঁটে যাওয়া এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোতেই দুজনের মনের দেয়ালগুলো কখন যেন ভেঙে গিয়ে এক গভীর, অদৃশ্য বন্ধনে রূপ নিয়েছিল।
আজ ছিল এক স্নিগ্ধ শুক্রবারের বিকেল।
রমনা পার্কের প্রাচীন মেহগনি আর বটগাছের পাতার ফাঁক দিয়ে নরম রোদ এসে ঘাসের ওপর পড়েছে। ছুটির দিনের বিকেলেও ভেতরের এই দিকটা বেশ শান্ত। দূরে লেকের জলে রোদের ঝিলিক আর বাতাসে ভেজা মাটির একটা মৃদু গন্ধ।
একটি কাঠের বেঞ্চে পাশাপাশি বসে ছিল অর্ক আর অর্পিতা।
অর্পিতার পরনে হালকা নীল রঙের একটি থ্রীপিস, চোখে সেই পরিচিত পাতলা ফ্রেমের চশমা। সে তার কাঁধের চামড়ার ব্যাগ থেকে সাবধানে ভাঁজ করা একটি জাতীয় দৈনিকের সাহিত্য পাতার পাতা বের করল। তার চোখের কোণে এক অদ্ভুত আনন্দ আর গর্ব খেলা করছিল।
"এটা দেখেছ?"
অর্পিতা খবরের কাগজটা অর্কর হাঁটুর ওপর মেলে ধরল।
পাতার একেবারে মাঝখানে, একটি স্কেচের ঠিক নিচে স্পষ্ট কালো হরফে ছাপা হয়েছে একটি কবিতা—
"অপেক্ষার মানচিত্র"
— অর্ক
অর্ক স্তব্ধ হয়ে নিজের নামের দিকে তাকিয়ে রইল।
"সকালে অফিসের জন্য বের হওয়ার সময় মোড়ের হকার থেকে কিনেছিলাম,"
অর্পিতা মৃদু হাসল।
"আমি কিন্তু পুরো কবিতাটা তিনবার পড়েছি। শেষের চারটে লাইন অসাধারণ হয়েছে অর্ক।"
অর্ক চোখ তুলে অর্পিতার মুখের দিকে তাকাল। বাতাসে অর্পিতার কপালের ওপর কয়েকটি চুল এসে পড়েছে। সে কোনো কথা না বলে শুধু চেয়ে রইল।
"কী দেখছ এভাবে?"
অর্পিতা একটু লজ্জা পেয়ে চশমাটা ঠিক করল।
"তোমাকে দেখছি,"
অর্ক খুব ধীর, গভীর গলায় বলল।
"যেদিন প্রথম দেখেছিলাম সুপার শপের কাউন্টারে, সেদিনও বুঝতে পারিনি আমার জীবনের এই অন্ধকার সময়টাতে কেউ একজন এত বড় আলো হয়ে পাশে এসে দাঁড়াবে।"
অর্পিতার ঠোঁটের কোণের হাসিটা আরও গভীর হলো। সে আলতো করে নিজের হাতটা বাড়িয়ে অর্কর হাতের ওপর রাখল।
"আলো আমি নই অর্ক, আলো তোমার ভেতরের ওই জেদটা।"
অর্ক একটা দীর্ঘশ্বাস নিল। তারপর কাঁধের কাপড়ের ব্যাগ থেকে একটা বেশ ভারী, বাঁধানো মোটা খাতা বের করল। খাতার মলাটটা নতুন আর্ট পেপার দিয়ে মোড়ানো।
খাতাটা অর্পিতার কোলে রেখে অর্ক শান্ত গলায় বলল,
"গতকাল রাত তিনটায় শেষ করেছি।"
অর্পিতা চমকে উঠে খাতার ওপর হাত রাখল।
"শেষ মানুষটির ডায়েরি?"
"হ্যাঁ,"
অর্ক মাথা নাড়ল।
"উপন্যাসটা শেষ হলো অর্পিতা। পুরো বারশো পাতা। গত কয়েক বছরের সমস্ত রক্ত, ঘাম আর না-বলা কথাগুলো আমি এই কাগজের ভেতর বন্দি করে ফেলেছি।"
অর্পিতার বুকটা যেন একমুহূর্তের জন্য ভারী হয়ে এলো। সে গভীর শ্রদ্ধায় খাতার মসৃণ মলাটটায় হাত বোলাল।
"এবার?"
অর্পিতা মুখ তুলে তাকাল।
"এখন এটা প্রকাশকের কাছে নিয়ে যেতে হবে। বাংলাবাজার আর আজিজের প্রকাশকদের কথা তো জানোই,"
অর্ক একটু ম্লান হাসল।
"নতুন লেখকদের পাণ্ডুলিপির দিকে কেউ ফিরেও তাকায় না।"
"এবার তাকাবে,"
অর্পিতা অর্কর হাতটা আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরে বলল,
"আমি তোমার সাথে যাব। একজন না নিলে দশজনের কাছে যাব। কিন্তু এই উপন্যাস মানুষের সামনে আসবেই, অর্ক। এটা শুধু তোমার স্বপ্ন নয়, এটা এখন আমারও স্বপ্ন।"
বিকেলের রোদ তখন রমনা পার্কের পথ ধরে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছিল। চারপাশের ছায়াগুলোও লম্বা হয়ে আসছিল। পাখির ডাকে মুখর সেই গাছটার নিচে বসে দুটো হাত শক্ত করে একে অপরকে ধরে ছিল। সামনে কী অপেক্ষা করছে, তারা জানত না। শুধু জানত একটা নতুন যুদ্ধ শুরু হতে চলেছে, আর সেই যুদ্ধে তারা একসঙ্গেই থাকবে।
বারোশত পাতার পাণ্ডুলিপির ওজন যে কতটা নির্মম হতে পারে, তা গত সাত দিনে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে অর্ক আর অর্পিতা।
দুটো মোটা খণ্ডে বাঁধাই করা এই বিশাল পাণ্ডুলিপিটা কাপড়ের বড় ব্যাগে নিয়ে তারা চষে ফেলেছে বাংলাবাজার থেকে শুরু করে আজিজ সুপার মার্কেট, কাঁটাবন আর পুরানা পল্টনের অলিগলি। অফিস শেষ করে কিংবা অর্পিতার ছুটির দিনে দুজনের একটাই গন্তব্য ছিল একটার পর একটা প্রকাশনীর দরজায় কড়া নাড়া।
কিন্তু ঢাকার প্রকাশনা জগতের বাস্তবতা ছিল বড় বেশি হিসেবি আর ভাবলেশহীন।
বাংলাবাজারের এক নামকরা প্রকাশকের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কাঁচের ঘরে বসে ছিল তারা। ভদ্রলোক চুরুটে টান দিয়ে পাণ্ডুলিপির পৃষ্ঠা সংখ্যা দেখে এমনভাবে হাসলেন যেন কোনো নির্বোধের কাণ্ড দেখছেন।
"বারোশত পাতা?"
তিনি ফাইলটা টেবিলের কোণে ঠেলে দিলেন।
"অর্ক সাহেব, আপনি কি এই যুগে বাস করেন না? মানুষ এখন তিরিশ সেকেন্ডের রিলস দেখে, দশ লাইনের ফেসবুক পোস্ট পড়তে গিয়ে ধৈর্য হারায়। এই ব্যস্ত শহরে ১২০০ পাতার বই কোন পাগলে কিনে পড়বে? তার ওপর আপনি একেবারেই আননোন ফেস।"
অর্ক শান্ত গলায় অনুনয় করল,
"ভাইয়া, এটা একটা সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার আর ডিস্টোপিয়ান ড্রামা। আপনি যদি অন্তত প্রথম দুই-তিনটা চ্যাপ্টার একটু চোখ বুলিয়ে দেখতেন"
"পড়ার টাইম কার আছে ভাই?"
প্রকাশক সোজাসাপটা বলে দিলেন।
"ব্যবসায় আমরা আর্ট খুঁজি না, সেল খুঁজি। আর যদি শখ মেটাতেই চান, তবে এক লাখ আশি হাজার টাকা দেন। কাগজের দাম এখন আকাশছোঁয়া। প্লেট খরচ, বাঁধাই আর প্রিন্টিং বাবদ যা লাগবে পুরোটা ক্যাশ দেবেন, বইমেলায় স্টলের এক কোণে তুলে রাখব। বিক্রি হলে আপনার, না হলে কেজি দরে বেচে দেবেন।"
আরেক প্রকাশনীতে তো ঢুকতেই দেওয়া হলো না।
প্রকাশক তো পাণ্ডুলিপিটা হাতে নিয়ে উল্টেও দেখলেন না। সরাসরি বললেন,
"নতুন লেখকের এত বড় ভলিউমের বই ছাপা মানে নিজের পায়ে কুড়াল মারা। ছোটখাটো সাইজের কোনো প্রেমের উপন্যাস আনলে ভেবে দেখতাম।"
একের পর এক প্রকাশনী কোথাও স্পষ্ট তাচ্ছিল্য, কোথাও মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দেওয়া, আবার কোথাও লাখ টাকার বিনিময়ে বই ছাপানোর নির্লজ্জ প্রস্তাব।
দিনের আলো নিভে গিয়ে যখন রাত নেমে এলো, তখন বাংলাবাজারের জনস্রোত প্রায় ফাঁকা হয়ে এসেছে। রাস্তার এক কোণে পার্কের রেলিংয়ের পাশে এসে দাঁড়াল দুজন।
অর্ক দাঁড়িয়ে ছিল বোবার মতো। তার চোখ দুটো লাল হয়ে উঠেছে, কাঁধের কাপড়ের ব্যাগটা যেন টন খানেক ভারী হয়ে চেপে বসেছে তার অস্তিত্বের ওপর। যে বারোশত পাতার পেছনে সে নিজের জীবনের এত বছর ঢেলে দিয়েছে, যে পাতাগুলোতে মিশে আছে তার মায়ের স্মৃতি, না-খাওয়া রাতগুলোর কান্না আর তীব্র একাকীত্ব সেই সৃষ্টি আজ এই শহরের কাছে স্রেফ কাগজের ওজন ছাড়া আর কিছুই নয়।
অর্পিতা তার দিকে তাকাল। অর্কর ভেঙে পড়া মুখটা দেখে অর্পিতার বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল।
অর্পিতা নিজের কাঁধের ব্যাগটা খুলল। সেখান থেকে একটা ছোট ব্যাংকের চেকবই আর এটিএম কার্ড বের করে অর্কর হাতের তালুতে চেপে ধরল।
"এটা নাও,"
অর্পিতার কণ্ঠ কাঁপছিল ।
অর্ক চমকে উঠে তাকাল।
"এটা কী অর্পিতা?"
"আমার জমানো কিছু টাকা,"
অর্পিতা দ্রুত বলতে লাগল।
"প্রতি মাসে বোনটার পড়াশোনার খরচ বাঁচিয়ে যা জমিয়েছি, এখানে প্রায় এক লাখ বিশ হাজার টাকার মতো আছে। বাকি পঞ্চাশ হাজার আমি আগামী মাসের বেতন থেকে আর অফিস থেকে লোন নিয়ে ম্যানেজ করব। কাল সকালেই আমরা ওই প্রকাশকের কাছে যাব। আমি নিজের টাকায় তোমার বই ছাপাব।"
অর্ক স্তব্ধ হয়ে গেল। এক মুহূর্তের জন্য যেন তার চারপাশের পুরো শহরটা থমকে দাঁড়িয়েছে।
পরক্ষণেই অর্ক তীব্র শক্তিতে অর্পিতার হাতটা ফিরিয়ে দিল। তার গলার স্বর রাগে নয়, এক গভীর বেদনায় ভারী হয়ে এলো।
"পাগল হয়ে গেছ তুমি অর্পিতা?"
অর্ক অর্পিতার চোখের দিকে তাকাল।
"তোমার এই টাকাটা কিসের, আমি জানি না? তোমার ছোট বোনের এসএসসির পর কলেজে ভর্তির টাকা, তোমাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ! তুমি ভাবলে কী করে আমি তোমার এই রক্তপানি করা জমানো টাকা দিয়ে আমার বই ছাপাব?"
"কিন্তু অর্ক, তোমার এত বছরের স্বপ্ন—"
অর্পিতার চোখের কোণ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
"স্বপ্ন ভিক্ষা করে কেনা যায় না অর্পিতা,"
অর্ক অর্পিতার দুটো হাত নিজের মুঠোয় শক্ত করে ধরে ফেলল।
"আমার বাবার সাথে লড়াই করে ঘর ছেড়েছিলাম এই বিশ্বাসে যে আমার লেখা একদিন নিজের পায়ে দাঁড়াবে। যদি এই বারোশত পাতা নিজের যোগ্যতায় কোনো প্রকাশকের মন গলাতে না পারে, যদি এটার ভেতরে সেই আগুন না থাকে যা মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করবে, তবে এই পাণ্ডুলিপি আমার মেসের ড্রয়ারেই পচে নষ্ট হবে। কিন্তু আমি কোনোদিন তোমার জমানো টাকায় নিজের নামের বই বের করে লেখক সাজব না। কোনোদিন না।"
অর্পিতা আর কিছু বলতে পারল না। সে অর্কর বুকের কাছে মাথা রেখে নিঃশব্দে কাঁদতে লাগল।
পার্কের পুরানো গাছগুলোর পাতা ছুঁয়ে রাতের বাতাস বয়ে যাচ্ছিল। রাস্তার নিভু নিভু সোডিয়াম বাতির নিচে দাঁড়িয়ে থাকা দুটো ছেলেমেয়ে তখন বুঝতে পারছিল তাদের এই লড়াইটা কোনো সাধারণ বই প্রকাশের লড়াই নয়।
অর্ক পাণ্ডুলিপির ব্যাগটা বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল।
পার্কের মোড় থেকে একটা রিকশায় অর্পিতাকে তুলে দিল অর্ক। রিকশাটা গলির মোড় পেরিয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে যাওয়া পর্যন্ত সে ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইল। ফার্মগেটের বাসে যখন উঠল, তখন রাত দশটা পার হয়ে গেছে। পুরোটা পথ সে জানালার রড ধরে দাঁড়িয়ে রইল। বাইরের আলোর ঝলকানি, জ্যামে আটকে থাকা গাড়ির দীর্ঘ সারি আর মানুষের ব্যস্ততার কোলাহল কোনো কিছুই তার মস্তিষ্কে পৌঁছাচ্ছিল না।
মেসের ঘরে যখন সে ফিরল, চারপাশ তখন একদম নিস্তব্ধ। পাশের রুমের ছেলেরা হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে নয়তো টিউশনি আর চাকরির ক্লান্তি নিয়ে শুয়ে আছে।
দরজার ছিটকিনি তুলে দিয়ে অর্ক ফ্যানের সুইচ দিল।
বুকের ভেতর হঠাৎ একটা তীব্র ক্ষোভ আর অপমানের জ্বালা দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। প্রকাশকদের সেই বাঁকা হাসি, তাচ্ছিল্যের দৃষ্টি আর টাকা চাওয়ার নির্লজ্জ ভঙ্গিগুলো চোখের সামনে একের পর এক ভেসে উঠছে। তার ইচ্ছে করছিল খাতাগুলোকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে মেসের জানালা দিয়ে রাস্তায় ছুড়ে ফেলে দিতে। তার হাত দুটো কাঁপতে লাগল।
সে জোরে জোরে কয়েকটা শ্বাস নিল। টেবিলের নিচে রাখা ছোট ইলেকট্রিক হিটারটা বের করে তাতে অ্যালুমিনিয়ামের মগে পানি বসিয়ে দিল। এক চিমটি চা পাতা আর আধা চামচ চিনি। পানির ফুটন্ত টগবগ শব্দে ঘরের জমাট নিস্তব্ধতা একটু হলেও কাটল।
ঠিক তখনই কাঠের দরজায় চেনা ধাক্কা।
রাশেদ ভেতরে ঢুকল। কাঁধের ব্যাগটা সোজা খাটের ওপর ফেলে দিয়ে টাইয়ের নটটা আলগা করল সে। অতিরিক্ত খাটুনির পর তার চোখেমুখে ক্লান্তির স্পষ্ট ছাপ।
হিটারের দিকে তাকিয়ে রাশেদ একটু ভ্রু কুঁচকাল।
"কী রে, এত রাতে চা বানাচ্ছিস? মেজাজ গরম নাকি?"
অর্ক মুখ না তুলে চায়ের চামচটা নাড়তে লাগল।
"না, এমনি।"
"তোর মুখ দেখলেই বোঝা যায় কী হইছে,"
রাশেদ জুতো খুলে ফ্যানের নিচে বসল।
"যা-ই হোক, আমার জন্যও এক কাপ বানা। সারাটা দিন এয়ারপোর্টের টিকিটিংয়ের ক্যাঁচাল সামলাতে সামলাতে জান শেষ।"
অর্ক ড্রয়ার থেকে আরেকটি কাঁচের কাপ বের করল। গাঢ় লাল রঙের ধোঁয়া ওঠা কড়া লিকারের চা ঢালল দুটো কাপে। একটা কাপ রাশেদের হাতে দিয়ে সে অন্যটা নিয়ে টেবিলের এক কোণে বসল।
রাশেদ চায়ের কাপে একটা বড় চুমুক দিয়ে টেবিলের ওপর রাখা সেই ভারী পাণ্ডুলিপির দিকে তাকাল।
"কী বলল পাবলিশাররা?"
রাশেদ শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল।
অর্ক চায়ের কাপের দিকে তাকিয়ে রইল। তার কণ্ঠস্বর ছিল অদ্ভুত রকম নির্লিপ্ত, কিন্তু ভেতরের যন্ত্রণাটা লুকানো গেল না।
"কেউ পাতাও খুলে দেখল না রে রাশেদ,"
অর্ক বলল।
"বলল বারোশত পাতার বই এই যুগে কেউ পড়বে না। সবাই টাকা চায়। পৌনে দুই লাখ টাকা দিলে নাকি বইমেলায় ছাপিয়ে এক কোণে ফেলে রাখবে।"
সে একটু থামল। তারপর একটা ম্লান হাসি দিয়ে বলল,
"আজ অর্পিতা ওর চাকরির সব জমানো টাকা দিতে চেয়েছিল। ওর বোনের পড়ার জন্য রাখা এক লাখ বিশ হাজার টাকা আমার হাতে জোর করে গুঁজে দিতে চাইল।"
রাশেদ চায়ের কাপটা নামিয়ে সোজা হয়ে বসল।
"তুই নিস নাই তো?"
"না,"
অর্ক মাথা নাড়ল।
"কীভাবে নেব বল? যে মেয়েটা নিজের পরিবারের সব বোঝা কাঁধে নিয়ে লড়াই করছে, তার সেই শেষ সম্বলটুকু কেড়ে নিয়ে আমি লেখক সাজব? এই বই যদি নিজের যোগ্যতায় আলো না দেখে, তবে এটা এই ঘরেই পুড়ে ছাই হবে।"
রাশেদ কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে অর্কর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর এগিয়ে এসে শক্ত করে অর্কর কাঁধটা চেপে ধরল।
"একদম ঠিক কাজ করছিস,"
রাশেদের কণ্ঠটা ভারী কিন্তু গর্বে ভরা শোনাল।
"অর্পিতা মেয়েটা খাঁটি, কিন্তু ওর টাকায় বই বের করলে হয়তো তোর নাম ছাপা হতো, কিন্তু তুই কোনোদিন আয়নায় নিজের চোখের দিকে তাকাতে পারতিস না।"
রাশেদ আরেক চুমুক চা খেয়ে বলল,
"বাংলাবাজার আর আজিজের এই গুটিকয়েক ব্যবসায়ীই পুরো সাহিত্য জগৎ না রে অর্ক। ঢাকার বাইরে, বড় বড় লিটলম্যাগ কিংবা এমন অনেক প্রকৃত সাহিত্যপ্রেমী প্রকাশক আছে যারা ব্যবসার চেয়ে লেখাকে বেশি ভালোবাসে। একটু সময় লাগতে পারে, হয়তো আরও দশটা দরজায় ধাক্কা খাবি। কিন্তু আমি তোকে বলি যেদিন সঠিক মানুষটার হাতে এই বারোশত পাতা পড়বে, সেদিন তোকে আর পেছনে তাকাতে হবে না।"
অর্ক কোনো কথা বলল না। কিন্তু রাশেদের এই কয়েকটা সাধারণ কথা যেন তার ভেতরের ভেঙে যাওয়া মেরুদণ্ডটাকে আবার টানটান করে দিল। ক্ষোভ আর অপমান ধুয়ে গিয়ে সেখানে আবার ফিরে এলো এক শান্ত এবং গভীর এক আশা।
পরের তিনটে দিন কেটে গেল এক অবিরাম ক্লান্তির ভেতর দিয়ে।
প্রতিদিন অফিস শেষ করে অর্পিতা ছুটে আসত গ্রিন রোডে। সেখান থেকে দুজন মিলে কাঁটাবন, নীলক্ষেত আর পল্টনের আরও কিছু ছোট-বড় প্রকাশনীর দরজায় ঘুরেছে। কিন্তু ফল শূন্য। বারোশত পাতার পাণ্ডুলিপির কথা শুনলেই প্রকাশকদের মুখ শুকিয়ে যায়, নয়তো সেই একই হিসেবি দরদাম আর মুখের ওপর প্রত্যাখ্যান। ব্যর্থতার এই ধকল শরীর আর মনের ওপর এমনভাবে চেপে বসছিল যে দুজনের মুখেই কথা কমে আসছিল। কেবল এক অদৃশ্য মায়া আর ভরসা তাদের এই ক্লান্ত পদযাত্রা থামতে দেয়নি।
চতুর্থ দিন সকালে সুপার শপের ক্যাশ কাউন্টারে মন দিয়ে কাজ করছিল অর্ক। দুপুরের দিকে হঠাৎ ইন্টারকম বেজে উঠল।
দোতলার কেবিন থেকে আকতার সাহেব ডাকছেন।
অর্ক কাউন্টার তানভীরের হাতে বুঝিয়ে দিয়ে দোতলার কাঁচের কেবিনে ঢুকল। আকতার সাহেব তার চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে ছিলেন। টেবিলের ওপর তার ব্যক্তিগত কিছু কাগজপত্র আর ফাইলের গোছানো স্তূপ।
"বস অর্ক,"
আকতার সাহেব খুব নরম গলায় বললেন। তার মুখের রাশভারী ভাবটা আজ অনেকটাই উধাও।
অর্ক বসল।
"কিছু বলবেন ভাইয়া?"
আকতার সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রেখে বললেন,
"আমি এই মাসেই চাকরিটা ছেড়ে দিচ্ছি অর্ক। গ্রামে আমার বয়স্ক মা একা থাকেন, বাড়িতে একটা ছোটখাটো ব্যবসা শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।"
অর্ক চমকে উঠল।
"আপনি চলে যাচ্ছেন ভাইয়া?"
"হ্যাঁ,"
আকতার সাহেব হাসলেন।
"মালিকপক্ষ আমাকে বলেছিল নতুন কাউকে সাজেস্ট করতে, যার ওপর এই পুরো আউটলেটটা চোখ বন্ধ করে ছেড়ে দেওয়া যায়। আমি মালিককে তোমার নাম বলেছি।"
অর্ক যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। সে স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইল।
"গত সাত মাসে আমি দেখেছি তুই কীভাবে কাজ করিস,"
আকতার সাহেব এবার
"তুমি" থেকে "তুই" এ নেমে এলেন, গলার স্বরটা বাবার মতো শোনাল।
"ইনভেন্টরির একটা সুতাও গরমিল হতে দিস নাই। প্রতিদিন সবার আগে আসিস, সবার শেষে বের হস। এই যুগে এত সততা আর দায়িত্বশীলতা খুব কম মানুষের মধ্যে থাকে। মালিক তোর আগের সব রিপোর্ট দেখেছে। কাল সকাল থেকে তুই এই ব্রাঞ্চের ম্যানেজার।"
আকতার সাহেব ড্রয়ার থেকে ম্যানেজারের অফিশিয়াল স্ট্যাম্প আর চাবির তোড়াটা বের করে অর্কর সামনে রাখলেন।
"তোর বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে পঁচিশ হাজার টাকা। কাল থেকে তুই আর কাউন্টারে বসবি না। পুরো আউটলেটের দেখভাল তোর হাতে। আমি জানি তুই এটা নিখুঁতভাবে করতে পারবি।"
পঁচিশ হাজার টাকা!
অর্কর চোখের সামনে এক নিমেষে ভেসে উঠল মেসের সেই অন্ধকার করিডোর, মোতালেব ভাইয়ের সেই টাকার জন্য অপমানজনক চিৎকার, আর পকেটে এক কাপ চায়ের টাকা না থাকার সেই দিনগুলো। তার গলার কাছে কী যেন একটা দলা পাকিয়ে এলো। চোখের পাতা ভিজে ওঠার উপক্রম হতেই সে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিল।
সে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে আকতার সাহেবকে জড়িয়ে ধরল।
"ভাইয়া... আমি জানি না কীভাবে আপনাকে ধন্যবাদ দেব..."
"ধন্যবাদ দিতে হবে না,"
আকতার অর্কর পিঠে হাত রাখলেন।
"নিজের সততাটা ধরে রাখবি। আর ম্যানেজার হলেও লেখা যেন বন্ধ না হয়।"
বিকেল পাঁচটায় ডিউটি শেষ করেই অর্ক প্রায় দৌড়ে ছুটে গেল তেজগাঁওয়ের দিকে। অর্পিতার অফিস ছুটির সময় হয়ে এসেছে।
অফিসের সামনের ফুটপাতে গাছের ছায়ায় এসে দাঁড়াল অর্ক। একটু পরেই কাঁচের দরজা ঠেলে বাইরে বের হলো অর্পিতা। চোখেমুখে সারাদিনের ফাইলিং আর হিসাবের ক্লান্তি, কাঁধে সেই পরিচিত চামড়ার ব্যাগ।
অর্ককে দেখেই অর্পিতা একটু অবাক হয়ে দ্রুত পায়ে এগিয়ে এলো।
"কী ব্যাপার অর্ক? তুমি এখানে কি করো ? কোনো সমস্যা হয়েছে?"
অর্ক কোনো কথা বলল না। সে শুধু অপলক দৃষ্টিতে অর্পিতার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তার বুকটা তখন আনন্দের তীব্র চাপে ওঠানামা করছে।
"কী হয়েছে বলবে তো? ভয় দেখাচ্ছ কেন?"
অর্পিতা চিন্তিত গলায় জিজ্ঞেস করল।
অর্ক আলতো করে অর্পিতাকে জড়িয়ে ধরল , ভিড়ে ঠাসা ফুটপাতে দাঁড়িয়ে খুব শান্ত অথচ কাঁপাকাঁপা গলায় বলল,
"আকতার ভাই চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন অর্পিতা। কাল থেকে আমি ব্রাঞ্চ ম্যানেজার। আমার বেতন পঁচিশ হাজার টাকা।"
অর্পিতা এক মুহূর্তের জন্য যেন পাথর হয়ে গেল। তার চোখের পলক পড়া বন্ধ হয়ে গেল। সে অর্ককে ছেড়ে তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল, যেন বোঝার চেষ্টা করছিল কথাটা সত্যি নাকি কোনো স্বপ্ন।
"কী বললে?"
অর্পিতার কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে এলো।
"আমি সত্যি বলছি অর্পিতা, আমার আর প্রতি মাসের ভাড়ার জন্য মানুষের গালাগালি শুনতে হবে না। কারো কাছে হাতপাতা লাগবে না"
অর্পিতার চশমার কাঁচের ওপাশে চোখ দুটো নিমেষেই জলে ভেসে গেল। সে নিজের এক হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরল। আনন্দের এমন তীব্র আঘাত মানুষ কীভাবে সামলায়! কতগুলো মাস ধরে সে এই ছেলেটার নিঃশব্দ কান্না, অপমান আর আত্মসম্মানের লড়াই খুব কাছ থেকে দেখেছে।
সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। রাস্তার মানুষের কোলাহল আর ব্যস্ততাকে উপেক্ষা করে সে অর্করকে আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরে কেঁদে ফেলল।
"আমি জানতাম...আমি জানতাম তোমার কষ্টগুলো কোনোদিন বৃথা যাবে না। আল্লাহ সবকিছু দেখছেন অর্ক, সবকিছু।"
তেজগাঁওয়ের সেই পিচঢালা রাস্তার ওপর তখন সন্ধ্যার মৃদু অন্ধকার নেমে এসেছে।
অফিসফেরত শত শত মানুষ দ্রুতপায়ে হেঁটে যাচ্ছে বাসের খোঁজে। তীব্র হর্ন বাজিয়ে ছুটে চলা সিএনজি আর প্রাইভেট কারের হেডলাইটের হলুদ আলো এসে পড়ছিল ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকা দুটো মানুষের ওপর। পুরো ঢাকা শহর যখন বাড়ি ফেরার ব্যস্ততায় অস্থির, তখন সেই গাছের তলায় যেন সময়ের গতি হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়েছিল।
অর্পিতা ওড়নার খুঁট দিয়ে চোখের পানি মুছে একটু শান্ত হওয়ার চেষ্টা করছিল। তার মুখে তখনো সেই অশ্রুভেজা স্বস্তির হাসি।
অর্ক এক মুহূর্তের জন্য চারপাশের সমস্ত কোলাহল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। তার চোখের সামনে শুধু ভেসে রইল চশমার কাঁচের ওপাশে তাকিয়ে থাকা এই নিষ্পাপ, ক্লান্ত দুটো চোখ। এই সেই মানুষ, যে তার পকেটে বিশটা টাকা না থাকার দিনেও তার অসমাপ্ত ডায়েরির পাতার ওপর বিশ্বাস রেখেছিল যে মানুষটা আত্মীয়ের বাসার অপমান আর সমাজের চোখরাঙানি সহ্য করেও কোনোদিন তার হাত ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবেনি।
অর্ক এক পা এগিয়ে এলো।
সে অর্পিতার অন্য হাতটাও নিজের মুঠোয় তুলে নিল। দুটো হাত তখন আবেগের তীব্রতায় সামান্য কাঁপছে। অর্পিতা একটু অবাক হয়ে মুখ তুলে তাকাল।
অর্কর চোখের দৃষ্টি এতটাই গভীর আর স্থির ছিল যে অর্পিতার বুকের ভেতরটা এক অচেনা স্পন্দনে দুলে উঠল।
"অর্পিতা,"
অর্কর কণ্ঠস্বর ছিল খুব নিচু
"হুম?"
"আমার এখনো কোনো রাজপ্রাসাদ নেই,আমি এখনো এই শহরের এক অচেনা সাধারণ ছেলে, যার কোনো বড় বংশপরিচয় নেই কিন্তু আজ আমি বুক ফুলিয়ে বলতে পারি, আমি আর তোমাকে খালার বাসার ওই অপমানের ছায়ায় থাকতে দেব না।"
সে অর্পিতার হাত দুটো বুকের কাছে টেনে নিল।
"একটা ছোট দুই রুমের বাসা নেব আমরা। এক রুমে তোমার বোন নিশ্চিন্তে বসে পড়বে, কোনো খোঁটা ছাড়া। অন্য রুমে আমি আমার ডায়েরির পাতাগুলো সাজাব। আর সারাদিনের সমস্ত যুদ্ধ শেষে দিনশেষে আমি তোমার ওই শান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে ক্লান্তি ভুলব।"
অর্ক এক মুহূর্ত থামল। তার চোখ দিয়ে তখন আবার পানি গড়িয়ে পড়ল।
"আমাকে কি তুমি বিয়ে করবে, অর্পিতা?"
রাস্তার তীব্র শব্দের ভিড়ে এই একটা বাক্য যেন এক অচেনা নিস্তব্ধতার জন্ম দিল।
অর্পিতা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার হাত দুটো অর্কর হাতের ভেতর জমে আছে। চোখের পাতাগুলো বারবার কেঁপে উঠছে। সে যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। জীবনের এতগুলো বছরের অবহেলা, বাবা-মাকে হারানোর শূন্যতা আর একাকীত্বের সমস্ত হাহাকার যেন এই একটা প্রশ্নের সামনে এসে এক নিমেষে ধুয়েমুছে গেল।
"অর্ক..."
অর্পিতার গলা দিয়ে কোনো পূর্ণ শব্দ বের হতে চাইল না।
"বলো,"
অর্ক তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।
"আমায় নিজের করে নেবে?"
অর্পিতা আর চোখের পানি আটকাতে পারল না। সে এক হাত ছাড়িয়ে নিয়ে নিজের চশমাটা একপাশে সরিয়ে চোখের নোনা পানি টা মুছে নিল। তারপর কান্নাভেজা গলায় এক চিলতে হাসি দিয়ে মাথা নাড়ল।
"হ্যাঁ অর্ক...হাজার বার হ্যাঁ। যে মানুষটার জন্য আমি পুরো পৃথিবীর সাথে লড়াই করতে পারি, তাকে ফিরিয়ে দেওয়ার সাধ্য আমার এই জীবনে নেই।"
গাছের পাতা ছুঁয়ে একটা হিমেল বাতাস বয়ে গেল। মাথার ওপর সোডিয়াম বাতিটা হঠাৎ জ্বলে উঠে তাদের শরীর জুড়ে এক মায়াবী আলো ছড়িয়ে দিল।
শুক্রবার বিকেলে মিরপুরের আকাশটা বেশ পরিষ্কার ছিল।
দশ নম্বরের একটি পাঁচতলা ভবনের তিনতলার ফ্ল্যাটের দরজায় যখন কলিংবেল বাপানি , ঘড়িতে তখন কাঁটায় কাঁটায় বিকেল পাঁচটা।
দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল অর্ক আর রাশেদ। অর্কর গায়ে পরিপাটি ইস্ত্রি করা হালকা আকাশি রঙের সুতির শার্ট, পায়ে সাধারণ কিন্তু পরিষ্কার জুতো। পাশে দাঁড়ানো রাশেদের পরনে খয়েরি রঙের পাঞ্জাবি, আর হাতে লাল ফিতা দিয়ে বাঁধা দুই কেজির মিষ্টির প্যাকেট। অর্পিতা দুদিন আগেই তার খালা আর খালুকে জানিয়ে রেখেছিল যে আজ তারা আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ের কথা বলতে আসবে।
কলিংবেলের শব্দ হতেই দরজা খুলে দিলেন অর্পিতার খালা। তাঁর পরনে সুতির ছাপা শাড়ি, চোখে চশমা।
"আসসালামু আলাইকুম, খালাম্মা,"
রাশেদ বিনীতভাবে হেসে সালাম দিল।
"আমি রাশেদ, আর ও অর্ক।"
খালা একটু থমকে তাকালেন। তারপর মুখে সামান্য সৌজন্যের ভাব এনে বললেন,
"ওয়ালাইকুম আসসালাম। ভেতরে আসো।"
ড্রয়িংরুমের পরিবেশটা ছিল বেশ শান্ত। সোফায় হেলান দিয়ে খবরের কাগজ পড়ছিলেন খালু। আধা-পাকা চুল, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। অর্ক আর রাশেদ সোফার উল্টো পাশের নিচু কাঠের চেয়ার দুটোতে বসল। রাশেদ টেবিলের ওপর খুব যত্ন করে মিষ্টির প্যাকেটটা রাখল।
ডাইনিং স্পেসের কোণে দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছিল অর্পিতার ছোট বোন অর্পা। পরনে সাধারণ একটা জামা, দুই হাতে ওড়নার কোণাটা শক্ত করে পেঁচিয়ে সে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে। অর্পা চোখ তুলে এক পলক অর্কর দিকে তাকাল, তারপর আবার মেঝেতে চোখ নামিয়ে নিল। তার মুখের ভাবটা অদ্ভুত রকমের থমথমে।
খালু খবরের কাগজটা ভাঁজ করে টেবিলের ওপর রাখলেন। চশমাটা নাকের ওপর একটু ঠেলে দিয়ে খুব স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
"তা অর্ক... কী করা হয় তোমার?"
অর্ক সোজা হয়ে বসল। খুব মার্জিত গলায় বলল,
"আঙ্কেল, আমি গ্রিন রোডের একটি সুপার শপের ব্রাঞ্চ ম্যানেজার হিসেবে আছি"
খালু এক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন। তারপর সোফায় একটু নড়েচড়ে বসে ভ্রু জোড়া সামান্য কুঁচকালেন।
"সুপার শপ? মানে ওই গ্রোসারি আইটেম বিক্রির দোকান?"
"জি আঙ্কেল, এটা একটা বড় চেইন সুপার শপ।"
খালা এতক্ষণ সোফার এক কোণে বসে শুনছিলেন। তিনি হঠাৎ একটা ছোট নিঃশ্বাস ফেলে জিজ্ঞেস করলেন,
"বেতন কত দেয় তোমাকে?"
"শুরুতে পঁচিশ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে খালাম্মা,"
অর্ক বিনীতভাবেই জানাল।
কথাটা শেষ হতেই ড্রয়িংরুমের শান্ত আবহাওয়াটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল। খালু চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রাখলেন। তাঁর মুখে তখন আর কোনো সৌজন্যের ছিটেফোঁটাও নেই। তিনি খালার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ শব্দ করে হেসে উঠলেন।
"শুনলে তো?"
খালু হাসতে হাসতে বললেন।
"পঁচিশ হাজার টাকা! এই বাজারে পঁচিশ হাজার টাকায় তো একটা মেসে চারবেলা পেট ভরে খাওয়ার খরচও ঠিকমতো মেটানো যায় না!"
খালাও ঠোঁট বাঁকালেন। তাঁর গলার স্বর এক নিমেষে বদলে কর্কশ রূপ নিল,
"দোকানের ক্যাশিয়ারগিরিকে এখন ম্যানেজার বলে চালায় পোলাপান! তা তোমার বাবা কী করেন অর্ক সাহেব? ঢাকায় কোথায় বাড়ি তোমাদের?"
অর্ক মাথা নিচু করে বলল,
"বাবার সাথে আমার যোগাযোগ নেই খালাম্মা। আমি ফার্মগেটের একটা মেসে থাকি।"
"মেসে থাকো!"
খালুর গলার স্বর এবার পুরো ড্রয়িংরুমে চড়ে গেল।
"বাপের বাড়ি নাই, নিজের থাকার জায়গা নাই, একটা মুদির দোকানে পঁচিশ হাজার টাকার চাকরি করো আর মিষ্টির প্যাকেট হাতে নিয়ে চলে আসছ অর্পিতার মতো মেয়ের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে?"
খালা তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে হাত নেড়ে বললেন,
"সাহস তো কম না তোমাদের! ভেবেছ বাবা-মা মরা এতিম মেয়ে, যা তা করে পার পেয়ে যাবা? অর্পিতা দেখতে কেমন, ও মাস্টার্স পাশ তা জানো? মিরপুরের এক বড় রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীর ছেলের সাথে ওর বিয়ের কথা পাকা করে রেখেছি আমরা। ওদের গাড়ি-বাড়ি, কোটি টাকার কারবার। আর তুমি এসেছ দোকানের চাকরি নিয়ে মেসের চিলেকোঠায় আমাদের মেয়েকে তোলার স্বপ্ন দেখাতে? শুনলাম আবার নাকি বইটই লিখে বেড়াও? কাগজের পাতা ঘষে সংসার চালাবা?"
ডাইনিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অর্পার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছিল। সে নিজের মুখটা ওড়না দিয়ে চেপে ধরে নিঃশব্দে কাঁপতে লাগল।
অপমানের চাবুকে অর্কর সমস্ত শরীর অসাড় হয়ে আসছিল। তার কান-মাথা গরম হয়ে উঠেছে, হাত দুটো হাঁটুর ওপর শক্ত মুঠো হয়ে আছে। রাশেদ মুখ খুলতে গেল কিছু একটা বলার জন্য, কিন্তু অর্ক তাকে থামিয়ে দিল।
ঠিক তখনই পাশের বেডরুমের কাঠের দরজাটা বিকট শব্দে খুলে গেল।
ভেতর থেকে প্রায় ঝড়ের বেগে বেরিয়ে এলো অর্পিতা।
তার চুলগুলো কিছুটা এলোমেলো, চোখ দুটো কান্নায় আর তীব্র রাগে রক্তবর্ণ হয়ে উঠেছে। ভেতরের ঘরে বসে সে এতক্ষণ প্রতিটা কথা, প্রতিটা উপহাসের প্রতিটি শব্দ শুনেছে।
"অনেক হয়েছে! আর একটা কথাও না!"
অর্পিতার চিৎকারটা পুরো ড্রয়িংরুমে যেন একটা বোমার মতো ফাটল।
খালা আর খালু হতভম্ব হয়ে সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালেন।
"অর্পিতা! বড়দের সামনে এভাবে কথা বলছিস?"
খালা চোখ বড় বড় করে চেঁচিয়ে উঠলেন।
"আপনারা বড়দের মতো আচরণ করেছেন?"
অর্পিতা সোফার ঠিক সামনে এসে দাঁড়াল। তার বুকটা ক্ষোভে ওঠানামা করছিল।
"যেদিন থেকে আমার বাবা-মা মারা গেছে, সেদিন থেকে এই বাড়ির প্রতিটা ফ্লোর ঝাড়ু দেওয়া থেকে শুরু করে রান্নাঘরের কাজ করেছি আমরা দুই বোন! নিজের চাকরির বেশীরভাগ টাকা আপনাদের হাতে তুলে দিয়েছি। বিনিময়ে আপনারা আমাদের প্রতিটা লোকমায় খোঁটা দিয়েছেন!"
অর্পিতা তার খালুর দিকে ফিরে তাকাল।
"আর আজ যখন এমন একজন সৎ মানুষ সম্মান নিয়ে আপনাদের কাছে বিয়ের কথা বলতে এসেছে, আপনারা তাকে ভিখারির মতো অপমান করছেন? ওই ব্যবসায়ীর কাছে আমাকে বেচে দিয়ে নিজেদের ব্যাংক ব্যালেন্স বাড়াতে চান, তাই না?"
"অর্পিতা! নিজের সীমা ভুলে যাস না!"
খালু রাগে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে হাত তুললেন।
"এই বাসায় থাকতে হলে আমাদের কথায় চলতে হবে!"
"আপনাদের এই বাসায় আমার আর এক সেকেন্ডও থাকার কোনো প্রয়োজন নেই,"
অর্পিতার কণ্ঠ হঠাৎ একদম স্থির আর পাথরের মতো ঠান্ডা হয়ে গেল।
সে ড্রয়িংরুমের মাঝখানে অর্কর সামনে এসে দাঁড়াল।
তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে খালা আর খালুর মুখের দিকে তাকিয়ে শান্ত অথচ তীব্র স্পষ্টতায় বলল—
"আপনাদের আমার আর লাগবে না! আমি অর্কর সাথেই থাকব। চেয়েছিলাম বাবা-মা নেই, আপনারা আমার আপনজন... আপনাদের সম্মতি আর দোয়া নিয়ে বিয়ে করবো। কিন্তু আজ বুঝলাম, আমি বড় ভুল করেছিলাম! আপনাদের মনে কোনো মায়া নেই, আছে শুধু লোভ আর নোংরা অহংকার। আপনাদের মতো মানুষের আশীর্বাদ আমার দরকার নেই!"
কথাটা শেষ করেই অর্পিতা এক সেকেন্ডও আর দ্বিধা করল না।
সে সোজা হাত বাড়িয়ে অর্কর ডান হাতটা নিজের মুঠোয় শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। তারপর এক টানে অর্ককে সোফা থেকে তুলে নিয়ে সদর দরজার দিকে পা বাড়াল।
রাশেদও এক মুহূর্ত দেরি না করে টেবিলের মিষ্টির প্যাকেটটা নিয়ে তাদের সাথে ছুটল।
অর্পিতা এক হাতে অর্ককে টানতে টানতে ফ্ল্যাটের ভারী কাঠের দরজাটা খুলে সোজা সিঁড়ির দিকে বেরিয়ে এলো।
পেছনে ড্রয়িংরুমে খালা আর খালু তখনও স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন, আর তাদের মুখের ওপর দিয়ে সিঁড়ির দরজাটা বিকট শব্দে বন্ধ হয়ে গেল।
মিরপুরের সেই গলিটা পেরিয়ে যখন তারা মূল সড়কে এসে পৌঁছাল, তখন চারপাশের গাড়ির হর্ন আর মানুষের কোলাহল যেন তাদের অন্য এক বাস্তবতায় ফিরিয়ে আনল।
অর্পিতা ওড়নার খুঁট দিয়ে চোখ মুছল। তার হাতটা তখনো শক্ত করে জড়িয়ে ধরা ছিল অর্কর হাতের সাথে। রাশেদ মিষ্টির প্যাকেটটা খুলে এক টুকরো মিষ্টি নিজে মুখে দিল, তারপর বাকি প্যাকেটটা রাস্তার পাশে বসা এক পথশিশুর হাতে তুলে দিয়ে হাসল।
"ওদের অহংকারের মুখে মিষ্টি দিয়ে লাভ নেই,"
রাশেদ পকেট থেকে রুমাল বের করে হাত মুছল।
"অর্ক, এখন কী করবি বল?"
অর্ক অর্পিতার দিকে তাকাল। তার চোখে তখনো অপরাধবোধ আর অনিশ্চয়তার ছাপ।
"অর্পিতা, তুমি হুট করে এত বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলে... খালার বাসায় অর্পা একা আছে। জিনিসপত্র, পড়াশোনা"
"আমি কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিইনি অর্ক,"
অর্পিতা দাঁড়িয়ে পড়ে অর্কর চোখের দিকে তাকাল।
"আমার অফিসে সেলসের ইনসেনটিভসহ বেতন এখন তিরিশ হাজার টাকা। তোমার সুপার শপের পঁচিশ হাজার। দুইজনের মিলে পঞ্চান্ন হাজার টাকা! এই ঢাকা শহরে পঞ্চান্ন হাজার টাকায় একটা ছোট পরিবার সম্মানের সাথে বেঁচে থাকতে পারে। আমরা এখনই বাসা খুঁজব। কোনো মেসে বা ওই বিষাক্ত খালার বাসায় আমাদের আর ফিরে যেতে হবে না।"
রাশেদ বলল,
"একদম খাঁটি কথা! আমার অফিসের এক বড় ভাই ফার্মগেটের ইন্দিরা রোডে থাকে। ওখানের গলিগুলোতে ব্যাচেলর বা ছোট ফ্যামিলির জন্য ভালো ফ্ল্যাট পাওয়া যায়। চল, আজকেই বাসা ফাইনাল করবো।"
তিনজনে মিলে একটা সিএনজি নিয়ে সোজা চলে এলো ইন্দিরা রোডের দিকে।
শুরু হলো বাসা খোঁজার এক দীর্ঘ অভিযান।
ঢাকার গলিতে গলিতে বাড়িগুলোর গেটে ঝুলানো ছোট ছোট
"টু-লেট"
সাইনবোর্ড দেখে দেখে তারা একটার পর একটা ভবনে ঢুকতে লাগল। দারোয়ানকে ডেকে চাবি নেওয়া, সিঁড়ি বেয়ে তিনতলা-চারতলা ওঠা, রুমের ভেন্টিলেশন দেখা একের পর এক ফ্ল্যাট দেখা চলল।
কোথাও দুই রুমের ফ্ল্যাটের ভাড়া অনেক বেশি, কোথাও আবার তিন মাসের অগ্রিম ভাড়ার এমন অদ্ভুত দাবি কোনো কোনো বাড়ির ফ্ল্যাটগুলো এত অন্ধকার আর স্যাঁতসেঁতে যে অর্ক নিজেই মাথা নাড়ল।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেল। হাঁটতে হাঁটতে তিনজনের শরীর ঘেমে একাকার। রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে এক কাপ করে রঙ চা আর বিস্কুট খেয়ে তারা আবার হাঁটা শুরু করল।
অবশেষে বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে, একটা নিরিবিলি গলির ভেতরে পাঁচতলা এক ভবনের চারতলায় তারা মনের মতো একটা ফ্ল্যাটের সন্ধান পেল।
দুটো মাঝারি সাইজের শোবার ঘর, একটা ছোট ডাইনিং স্পেস, রান্নাঘর আর একটুকরো দক্ষিণের বারান্দা। বারান্দার দরজা খুলতেই একঝাঁক ঠান্ডা বাতাস এসে চোখেমুখে লাগল। কোনো জাঁকজমক নেই, কিন্তু ঘরগুলোতে আলো-বাতাসের কোনো অভাব নেই।
বাড়ির কেয়ারটেকার জানাল, ভাড়া পনেরো হাজার টাকা আর এক মাসের অ্যাডভান্স দিতে হবে।
অর্পিতা নিজের পার্স খুলল, অর্কও তার পকেট থেকে টাকা বের করল। দুজনের কাছে থাকা টাকা থেকে গুনে গুনে কেয়ারটেকারের হাতে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে তারা বুকিংটা করে ফেলল। বাকি টাকা আগামী রবিবার চাবি নেওয়ার সময় বুঝিয়ে দেওয়ার কথা হলো।
কেয়ারটেকার চলে যাওয়ার পর তারা তিনজন গিয়ে দাঁড়াল সেই খালি ফ্ল্যাটের ছোট বারান্দাটায়।
বিকেলের সূর্য তখন পশ্চিমের আকাশে হেলে পড়েছে। বাড়িগুলোর ছাদে একে একে বাতি জ্বলতে শুরু করেছে।
অর্পিতা বারান্দার গ্রিলে দুই হাত রেখে বুকভরে একটা দীর্ঘ শ্বাস নিল।
সে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অর্কর দিকে ফিরে তাকাল। মুখে এক পরম শান্তির হাসি।
"দেখেছ অর্ক?"
অর্পিতার কণ্ঠটা মায়ায় ভরে এলো।
"এটা আমাদের বাড়ি। এখানে কেউ কোনোদিন আমাদের খোঁটা দেবে না। কেউ আমাদের ছোট করবে না।"
বারান্দার শীতল বাতাসে অর্পিতার চুলগুলো উড়ছিল।
সে হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে অর্কর মুখের দিকে তাকাল। তার চোখের দৃষ্টিতে ছিল এক অদ্ভুত, অবিচল সংকল্প।
"অর্ক, আমরা বিয়ে করবো। আজকেই করবো।"
অর্ক এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সে হতভম্ব হয়ে চেয়ে রইল অর্পিতার দিকে।
"আজকে? এখনই? এত তাড়াতাড়ি?"
"একদিন তো করতেই হতো অর্ক,আত্মীয়স্বজন তো আজ নিজের চোখেই চিনে এলে। যাদের সম্মতি পাওয়ার জন্য এতদিন অপেক্ষা করেছিলাম, তারা তো আমাদের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করেছে। তবে আর কার জন্য অপেক্ষা করবো? আজ রাতে আমরা বিয়ে করবো। কাল সকালে আমি খালার বাসা থেকে আমার আর অর্পার সমস্ত জামাকাপড়, বইপত্র নিয়ে সরাসরি এই বাসায় চলে আসব। কাল থেকেই আমাদের নিজেদের সংসার শুরু হবে।"
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রাশেদ একগাল হেসে বলল
"একদম খাঁটি কথা!"
রাশেদ পকেট থেকে ফোন বের করল।
"দেরি করে কোনো লাভ নেই। আমার পরিচিত এক বড় ভাই ফার্মগেট কাজী অফিসের দায়িত্বে আছেন। আর কাজীর জন্য সাক্ষী লাগবে তো? আমি তানভীর আর শুভকে ফোন দিচ্ছি, আধঘণ্টার মধ্যে কাজী অফিসে চলে আসবে।"
অর্ক অবাক হয়ে রাশেদের দিকে তাকিয়ে একটু হেসেই ফেলল।
"তোর সব জায়গাতেই পরিচিত বড় ভাই থাকে নাকি রে?"
রাশেদ ফোন কানে তুলতে তুলতে হাসল,
"থাকবে না কেন? এই ঢাকা শহরে টিকে থাকতে হলে ভাই-ব্রাদার ছাড়া গতি আছে? তুই চুপচাপ দাঁড়া, আমি সব ব্যবস্থা করতেছি।"
ঘড়িতে তখন সন্ধ্যা সাতটা।
ফার্মগেটের মোড়ের ট্রাফিক পেরিয়ে তারা একটা সিএনজি নিয়ে চলে এলো কাজী অফিসে। পুরনো এক ভবনের দোতলায় ছোট একটা অফিস ঘর। স্টিলের আলমারি, টেবিলে একগাদা মোটা রেজিস্ট্রি খাতা আর লাল কালির সিলপ্যাড।
অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানে হাজির হলো তানভীর আর শুভ। ঘটনা শুনে তারা একবাক্যে অভিনন্দন জানিয়ে সাক্ষী হতে রাজি হয়ে গেল।
শুভ আসার পথে ফার্মগেটের ওভারব্রিজের নিচ থেকে দুইটা বেলি ফুলের মালা আর এক প্যাকেট মিষ্টি কিনে এনেছিল।
কাজী সাহেব চশমাটা নাকের ওপর নামিয়ে খাতার পাতায় কলম ছুঁইয়ে বললেন,
"দেনমোহর কত লিখব?"
অর্ক মুখ খোলার আগেই অর্পিতা শান্ত অথচ স্পষ্ট গলায় বলল,
"এক টাকা।"
কাজী সাহেব কলম থামিয়ে চশমার ওপর দিয়ে অবাক হয়ে তাকালেন। ঘরে উপস্থিত বাকি সবাইও এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল।
অর্পিতা অর্কর চোখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
"যে মানুষটা আমাকে সম্মান আর নিজের সমস্তটা দিয়ে ভালোবাসতে পারে, তার কাছে আমার ভালোবাসার কোনো আর্থিক মূল্য হতে পারে না। কাজী সাহেব, আপনি কাবিনে এক টাকাই লিখবেন।"
কাজী সাহেব আর কোনো কথা বাড়ালেন না। তিনি মুচকি হেসে খাতায় লিখে নিলেন।
অফিসের সাদা টিউবলাইটের নিচে কোনো জাঁকজমক ছিল না, ছিল না কোনো দামি সানাইয়ের সুর কিংবা কোনো আলোকসজ্জা। কিন্তু সেই সাধারণ চার দেওয়ালের মাঝে ছিল এক পবিত্রতা।
"অর্ক আহমেদ, আপনি কি অর্পিতা কবিরকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে রাজি আছেন?"
অর্কর বুকের ভেতর এক অদ্ভুত প্রশান্তি নেমে এলো। সে অর্পিতার চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে তখন অশ্রু আর ভালোবাসা।
"কবুল।"
অর্কর কণ্ঠস্বর বিন্দুমাত্র কাঁপল না।
একইভাবে অর্পিতা যখন শান্ত, সুস্পষ্ট গলায় তিনবার
"কবুল"
বলল, তখন শুভ আর তানভীর মিষ্টির প্যাকেটটা খুলে সবার মুখে তুলে দিল। অর্পিতা অর্কর গলায় বেলি ফুলের মালাটা পরিয়ে দিল, অর্কও পরম যত্নে অর্পিতার গলায় মালাটা পরিয়ে দিয়ে আলতো করে তার মাথায় হাত রাখল।
রেজিস্ট্রি খাতার পাতার নিচে অর্ক আর অর্পিতা নিজেদের সই করল।
কাজী অফিস থেকে যখন তারা সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলো, তখন রাতের ঢাকা শহরটা আলোয় ঝলমল করছে। রাস্তার সোডিয়াম বাতিগুলোর আলো এসে পড়ছিল বেলি ফুলের মালার সাদা পাপড়িগুলোর ওপর। অর্কর হাতটা তখন শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছিল অর্পিতা। বাতাসে বেলি ফুলের মিষ্টি ঘ্রাণ ভেসে বেড়াচ্ছিল।
কাজী অফিসের সামনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে একটা সবুজ রঙের সিএনজি ডেকে তুলল অর্ক।
অর্পিতার গলায় তখনো বেলি ফুলের সেই শুভ্র মালাটা মৃদু বাতাসে দুলছে। গাড়িতে ওঠার আগে অর্পিতা জানালার গ্রিল ধরে অর্কর মুখের দিকে তাকাল।
অর্ক আলতো করে তার হাতটা ছুঁয়ে বলল,
"বাসায় গিয়ে সাবধানে থাকবে। কোনো ঝামেলা হলে আমাকে সরাসরি ফোন দেবে। অর্পাকে সব বুঝিয়ে বলো আর তোমাদের প্রয়োজনীয় জামাকাপড়, বইপত্র গুছিয়ে রেখো। কাল সকাল আটটায় আমরা পিকআপ নিয়ে চলে আসব।"
অর্পিতা মিষ্টি করে হাসল।
"তুমি একদম চিন্তা কোরো না।"
সিএনজিটা ফার্মগেটের জ্যাম পেরিয়ে রাতের আঁধারে মিলিয়ে গেল।
অর্ক আর রাশেদ দ্রুত পায়ে মেসের দিকে হাঁটা দিল। মেসের দোতলার করিডোরে উঠতেই দেখা গেল ম্যানেজার মোতালেব ভাই কাঠের টুলে বসে পানের পিক ফেলছেন আর হিসেবের খাতায় চোখ বোলাচ্ছেন।
অর্ক এগিয়ে গিয়ে মিষ্টির প্যাকেট থেকে বড় একটা রসগোল্লা বের করে মোতালেব ভাইয়ের মুখের সামনে ধরল।
"কী ব্যাপার অর্ক সাহেব? এত রাতে মিষ্টির কীসের?"
মোতালেব ভাই অবাক হয়ে চশমার ওপর দিয়ে তাকালেন।
"মোতালেব ভাই, আমি আজ বিয়ে করেছি,"
অর্ক শান্ত গলায় বলল।
"কাল সকালে আমি মেস ছেড়ে দিচ্ছি। নতুন বাসা নিয়েছি ইন্দিরা রোডে।"
মোতালেব ভাইয়ের হাত থেকে খাতার পাতা ওল্টানো বন্ধ হয়ে গেল। তিনি কয়েক মুহূর্ত বিস্ময়ে হা করে তাকিয়ে রইলেন। যে ছেলেটা কদিন আগেও টাকার জন্য এই করিডোরে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েছিল, আজ তার গলায় অন্যরকম এক আত্মবিশ্বাস।
মোতালেব ভাই মিষ্টিটা মুখে নিয়ে একটা তৃপ্তির হাসি দিলেন। তাঁর খিটখিটে চেহারার পেছনে লুকিয়ে থাকা মধ্যবিত্ত মনটা যেন হঠাৎ নরম হয়ে উঠল।
"মাশাআল্লাহ, খুব ভালো খবর দিলেন অর্ক সাহেব,"
মোতালেব ভাই খাতার পাতায় দাগ কেটে বললেন,
"আপনার আগের সব ক্লিয়ার আছে। কাল সকালে চাবি বুঝায়া দিয়া যাইয়েন। দোয়া করি নতুন সংসার ভালো কাটুক।"
মেসের চিলেকোঠার ছোট ঘরটায় ঢুকে ছিটকিনিটা তুলে দিতেই যেন সারা দিনের ক্লান্তিটা এক নিমেষে দুজনের ওপর ভর করল। কিন্তু ঘুমানোর কোনো উপায় নেই, কাল সকালেই সব মালপত্র নিয়ে নতুন ঠিকানায় পাড়ি জমাতে হবে।
শুরু হলো মেসের এই চার দেওয়ালে জমে থাকা এতো বছরের জীবন গুটিয়ে নেওয়ার পালা।
এক কোণে রাখা এক বান্ডিল অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি-পাতিল, কয়েকটা মেলামাইনের প্লেট আর সেই ছোট সিঙ্গেল বার্নারের গ্যাসের চুলাটা প্লাস্টিকের বস্তায় ঢোকাল অর্ক। নীলক্ষেতের ফুটপাত থেকে কেনা পুরনো কম্বল আর তোশকটা দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাঁধল রাশেদ। মেসের কাঠের সাধারণ চৌকিটার পায়ার স্ক্রুগুলো হাতুড়ি আর রেঞ্জ দিয়ে একটা একটা করে খুলতে লাগল তারা।
সবশেষে বাকি রইল ঘরের কোণে রাখা সেই পুরনো, রঙচটা কাঠের পড়ার টেবিলটা।
এই টেবিলটার দিকে তাকিয়ে অর্কর হাত হঠাৎ থেমে গেল। টেবিলটার একটা পায়া সামান্য ভাঙা ছিল বলে নিচে একটা ইটের টুকরো দিয়ে সমান করে রাখা। টেবিলের কাঠের ওপর অজস্র বলপেনের কালির দাগ, শুকিয়ে যাওয়া কড়া চায়ের গোল গোল রিং, আর কোণায় ব্লেড দিয়ে খোদাই করে লেখা—
"আমাকে পারতেই হবে"
এই সেই টেবিল, যার ওপর মাথা রেখে অর্ক না-খেয়ে কাটানো রাতের ঘুম ঘুম চোখে হাজারটা স্বপ্নের জাল বুনেছিল। যার ওপর কাঁপাকাঁপা হাতে লেখা হয়েছিল সেই বারোশত পাতার বাঁধাই করা মহাকাব্য—
"শেষ মানুষটির ডায়েরি"
অর্ক পরম মমতায় হাতের তালু দিয়ে টেবিলের মসৃণ হয়ে যাওয়া কাঠের ওপর হাত বোলাল। তারপর অত্যন্ত সাবধানে কাপড় দিয়ে পাণ্ডুলিপির ধুলো মুছে সেটা কার্টনের ভেতর সবার ওপরে রাখল।
রাশেদ চৌকির পায়াগুলো দড়ি দিয়ে বাঁধতে বাঁধতে হঠাৎ থেমে গেল। সে ঘরের চারপাশের স্যাঁতসেঁতে দেওয়ালগুলোর দিকে তাকিয়ে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
"কী রে, থামলি কেন?"
অর্ক টেবিলের ড্রয়ার থেকে পুরনো ডায়েরিগুলো তুলতে তুলতে জিজ্ঞেস করল।
রাশেদ এসে মেঝের ওপর অর্কর পাশে বসে পড়ল। তার চোখে এক অদ্ভুত শূন্যতা আর মায়ার ছায়া।
"ভাবছি রে অর্ক..."
রাশেদের গলার স্বর ভারী হয়ে এলো।
"এই মেসের ঘরে কত রাত আমরা দুজন এক কাপ চা ভাগ করে খেয়ে কাটিয়েছি। বাইরে যখন ঝুম বৃষ্টি হতো, টিনের চাল চুইয়ে পানি পড়ত, তুই ওই টেবিলটায় মাথা গুঁজে একটানা লিখে যেতিস আর আমি তোকে চা বানিয়ে দিতাম। আজ তুই সত্যি সত্যি এই মেস ছেড়ে চলে যাচ্ছিস।"
অর্ক ড্রয়ারের কাগজগুলো গোছানো থামিয়ে রাশেদের দিকে তাকাল।
রাশেদ তার চোখের কোণটা হাত দিয়ে আড়াল করে একটু হাসার চেষ্টা করল।
"তোর জন্য আমার চেয়ে বেশি খুশি কেউ হয় নাই রে। অর্পিতা একটা রত্ন। কিন্তু... কাল থেকে অফিস শেষে ফিরে এই রুমে এসে যখন দেখব তোর খটখট টাইপিংয়ের শব্দ নাই, রুমের কোণে খাতার স্তূপ নাই... ঘরটা খুব খালি লাগবে রে ভাই।"
অর্কর বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল। সে কোনো কথা বলতে পারল না। তার চোখের পাতা ভিজে এক ফোঁটা পানি কার্টনের ওপর টুপ করে খসে পড়ল।
সে এগিয়ে গিয়ে রাশেদকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
"রাশেদ...এই বিশাল ঢাকা শহরে আমার নিজের বলতে কোনো রক্ত ছিল না রে। আমার বাবা আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল, এই শহর আমাকে প্রতিটা পদে লাথি মেরেছে। তুই যদি সেদিন আমার পাশে না দাঁড়াতিস, তোর ওই পকেটের শেষ পাঁচশো টাকা দিয়ে যদি আমাকে আগলে না রাখতিস—আমি অনেক আগেই কোনো ফুটপাতে হারিয়ে যেতাম।"
অর্ক রাশেদের পিঠে হাত রেখে বলল,
"আমার এই নতুন সংসার, আমার এই বেঁচে থাকা সবকিছুর অর্ধেক ভাগ তোর। আমি বাসা পাল্টাচ্ছি রাশেদ, কিন্তু তোর এই ভাইয়ের অস্তিত্ব থেকে তোকে কোনোদিন আলাদা করার সাধ্য কারো নেই।"
রাশেদও নিজের চোখ মুছে শক্ত করে অর্কর পিঠ চাপড়ে দিল।
"ধুর পাগল! বড় বড় ডায়লগ মারিস না তো। এমনিতেই আবেগ ধরে রাখা যায় না। চল, টেবিলটা সাবধানে কার্টনের পাশে রাখি, কাল পিকআপে এটা সবার আগে তুলতে হবে।"
দুজনেই ভেজা চোখে হেসে ফেলল।
পরদিন সকাল আটটায় একটি নীল রঙের পিকআপ ভ্যান নিয়ে মিরপুরের সেই পাঁচতলা ভবনের সামনে গিয়ে থামল অর্ক আর রাশেদ। সাথে ছিল দুজন শক্তপোক্ত লেবার।
নিচে নামতেই দেখা গেল ভবনের গ্যারেজের একপাশে সারিবদ্ধভাবে রাখা একগাদা ভারী আসবাবপত্র। একটা বড় পুরনো সেগুন কাঠের আলমারি, কারুকাজ করা বিশাল একটি খাট, চার সিটের একটি সোফা আর বেশ কিছু কাঠের চেয়ার-টেবিল।
আসবাবের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল অর্পিতা আর অর্পা। অর্পিতার মাথায় ওড়না টানা, মুখে ক্লান্তির ছাপ
অর্ককে দেখেই অর্পা এক পা এগিয়ে এলো। এই পনেরো ষোলো বছরের কিশোরী মেয়েটার মুখে আজ আর সেই ভয়ার্ত ভাবটা নেই। সে খুব ভক্তিসহকারে নিচু হয়ে অর্কর পায়ে হাত দিয়ে সালাম করল।
"আসসালামু আলাইকুম, দুলাভাই।"
অর্কর বুকের ভেতর এক অজানা মায়ায় ভরে উঠল। সে পরম স্নেহে অর্পার মাথায় হাত রাখল।
"দোয়া করি অনেক বড় হও অর্পা।"
অর্ক অবাক হয়ে এতগুলো দামি আসবাবের দিকে তাকিয়ে অর্পিতাকে জিজ্ঞেস করল,
"অর্পিতা, এত ভারী জিনিসপত্র..."
অর্পিতা আলতো করে আলমারির খোদাই করা কাঠের ওপর হাত বোলাল। তার চোখের কোণটা ভিজে এলো।
"এগুলো আমার বাবা-মা বেঁচে থাকতে নিজেদের শখ করে বানিয়েছিলেন অর্ক। বাবা মারা যাওয়ার পর এই আসবাবগুলোর ওপর ভর করেই খালা-খালুর এত বড় ড্রয়িংরুম সাজানো ছিল। আরও অনেক দামি জিনিস ছিল বাবার, যা বছর কয়েক আগেই খালা গোপনে বিক্রি করে দিয়েছিলেন। এই কটা জিনিস আমি কোনোমতে আগলে রেখেছিলাম। ওদের এই রক্তচোষা ঘরে আমার বাবা-মায়ের শেষ স্মৃতিগুলোর একটা পেরেকও আমি ফেলে যাব না।"
রাশেদ এগিয়ে এসে আলমারিতে একটা চাপড় দিল।
"একদম ঠিক করেছ ভাবি! বাপের হক কাউকে ছাড়তে নেই। ওস্তাদ, ধরো তো খাটের পায়াটা!"
শুরু হলো মালপত্র ওঠানোর তোড়জোড়। রাশেদ আর অর্ক নিজেরাও লেবারদের সাথে হাত লাগাল। ভারী খাট, আলমারি আর তোশকগুলো দড়ি দিয়ে পিকআপে শক্ত করে বাঁধা হলো। সেখান থেকে পিকআপটা সোজা চলে গেল ফার্মগেটের মেসে। মেস থেকে অর্কর সেই সিঙ্গেল বার্নারের চুলা, হাঁড়ি-পাতিল, তোশক আর সেই কাঠের পড়ার টেবিলটা সাবধানে সবার ওপরে তুলে তারা রওনা দিল ইন্দিরা রোডের নতুন ঠিকানায়।
নতুন চারতলার ফ্ল্যাটে যখন সব মালপত্র তোলা শেষ হলো, তখন ঘড়িতে রাত প্রায় সাড়ে দশটা।
সিঁড়ি দিয়ে এতগুলো ভারী জিনিস তুলতে গিয়ে অর্ক আর রাশেদের শার্ট ঘামে ভিজে জবজবে হয়ে গেছে। হাত-পায়ে প্রচণ্ড ব্যথা, কিন্তু ঘরের ভেতরে পা রাখতেই সেই সমস্ত ক্লান্তি এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল।
পুরো ফ্ল্যাটটা যেন চোখের পলকে একটা জীবন্ত সংসারে রূপ নিয়েছে।
দক্ষিণের বড় ঘরটায় পাতা হয়েছে অর্পিতার বাবা-মায়ের সেই সেগুন কাঠের খাট। অন্য রুমটায় অর্পার জন্য পাতা হয়েছে একটা ছোট বিছানা আর পড়ার টেবিল, যেখানে তার পাঠ্যবইগুলো সুন্দর করে সাজানো। আর ডাইনিং স্পেসের লাগোয়া বারান্দার ঠিক মুখের মিষ্টি বাতাস আসার জায়গাটাতে বসানো হয়েছে অর্কর সেই বহু লড়াইয়ের সাক্ষী কালির দাগে ভরা পুরনো কাঠের পড়ার টেবিলটা।
রান্নাঘরের নতুন কেনা গ্যাস সিলিন্ডারে পানি ফুটিয়ে অর্পিতা চারটি কাঁচের কাপে গরম লাল চা আর বিস্কুট নিয়ে ডাইনিংয়ের মেঝেতে পাতা মাদুরে এসে বসল।
চারজন একসাথে গোল হয়ে বসে সেই চায়ে চুমুক দিল। চার জোড়া ক্লান্ত চোখের মাঝে ছিল এক অনাবিল, স্বর্গীয় প্রশান্তি।
রাত এগারোটা বাজতেই রাশেদ উঠে দাঁড়াল। তার গায়ে তখনো সেই ঘামে ভেজা পাঞ্জাবি।
"এবার আমার ওঠার পালা রে অর্ক,"
রাশেদ একটু ম্লান হাসল।
"মেসের গেট বন্ধ হয়ে যাবে।"
অর্পিতা তড়িঘড়ি করে উঠে এসে রাশেদের সামনে দাঁড়াল। তার চোখে তখন পানি উপচে পড়ছে।
"ভাইয়া, আপনি আমাদের জন্য যা করলেন... নিজের আপন ভাইও এত কিছু করে না। এই বাসায় অর্ক আর আমার যতখানি অধিকার, আপনার অধিকার তার চেয়ে একবিন্দুও কম নয়। যখনই সময় পাবেন, সোজা এখানে চলে আসবেন। আপনার জন্য এই ঘরের দরজা সবসময় খোলা।"
রাশেদের চোখের কোণটাও চিকচিক করে উঠল। সে বলল,
"আমার এই পাগল ভাইটাকে একটু দেখে রেখো ভাবি। ও বড্ড বেশি আবেগি।"
অর্ক রাশেদকে এগিয়ে দিতে নিচে নেমে এলো।
রাতের ইন্দিরা রোডের গলিটা তখন শান্ত, নিঝুম। রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটা রিকশা ডেকে দিল অর্ক।
রিকশায় ওঠার আগে রাশেদ ঘুরে দাঁড়িয়ে অর্কর দিকে তাকাল। দুই বন্ধুর চোখাচোখি হতেই এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো।
রাশেদ এক পা এগিয়ে এসে অর্ককে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরল।
"আজ তোর একটা ঘর হলো রে অর্ক,"
রাশেদের কণ্ঠ আবেগে কাঁপছিল।
"মেসের সেই ভাঙা খাটে শুয়ে তুই যে সংসারের স্বপ্ন দেখতিস, আজ সেটা সত্যি হলো। এখন শুধু ওই বারোশত পাতার বইটা ছাপা হওয়া বাকি।"
অর্ক রাশেদের পিঠে হাত রেখে নিজের চোখের পানি টা চেপে রাখল।
"তুই ছাড়া এটা কোনোদিন সম্ভব হতো না রে রাশেদ। কোনোদিন না।"
"ধুর, আবার আদিখ্যেতা শুরু করলি!"
রাশেদ হেসে উঠে চোখ মুছল।
"যা, ওপরে যা। ভাবি আর অর্পা একা আছে। কাল থেকে নতুন উদ্যমে কাজে লাগবি।"
রাশেদ রিকশায় উঠে বসল। রিকশার টুংটাং শব্দটা ধীরে ধীরে নিঝুম রাতের গলিতে মিলিয়ে গেল।
দেখতে দেখতে আরও দুটি মাস কেটে গেল ।
ইন্দিরা রোডের চারতলার সেই ছোট্ট ফ্ল্যাটটা এখন আর কেবল কংক্রিটের চার দেয়াল নয়, একটা জীবন্ত আশ্রয়ে রূপ নিয়েছে। বারান্দার গ্রিলে অর্পিতার শখের কয়েকটা মাটির টবে হাসনাহেনা আর মানিপ্ল্যান্টের লতা লতিয়ে উঠেছে। সন্ধ্যার বাতাসে ঘরে ঢুকলেই হাসনাহেনার মিষ্টি ঘ্রাণ মন জুড়িয়ে দেয়। ঘরের জন্য কিস্তিতে একটা ছোট ফ্রিজও কেনা হয়েছে।
সংসারের চাকাটাও আগের চেয়ে অনেক বেশি মজবুত হয়েছে। ডেইলি বাজারের আউটলেটের বিক্রি বাড়ানো আর নিখুঁত ইনভেন্টরি ম্যানেজমেন্টের জন্য মালিকপক্ষ অর্কর সততার পুরস্কার হিসেবে তার পদ পুরোপুরি স্থায়ী করে বেতন বাড়িয়ে পুরো তিরিশ হাজার টাকা করে দিয়েছেন। অর্পিতার ডিলারশিপের চাকরিটাও চলছিল সমান তালে। দুজনের উপার্জনে মেসের সেই টানাটানির দিনগুলো এখন এক দুঃস্বপ্নের মতো মনে হয়।
শুক্রবার এলেই ঘরে একটা উৎসবের আমেজ লেগে যায়। রাশেদ ঠিক সন্ধ্যাবেলা মেস থেকে চলে আসে। অর্পিতা নিজের হাতে রাঁধে পাতলা ভুনা খিচুড়ি আর মুরগির মাংস। ডাইনিংয়ের মেঝেতে মাদুর পেতে চারজন মিলে খাওয়া-দাওয়া আর মধ্যরাত পর্যন্ত টিনের কেটলিতে চা বানিয়ে আড্ডা দেওয়া এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলো তাদের জীবনের সমস্ত পুরনো ক্ষতকে একটু একটু করে ভুলিয়ে দিচ্ছিল।
সবচেয়ে বড় স্বস্তিটা এসেছিল অর্কর লেখালিখির জীবনে।
সংসারের আর্থিক সচ্ছলতা আসায় সে ফেসবুকের সস্তা কন্টেন্ট বা নাটকের স্ক্রিপ্ট লেখার কাজগুলো পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। এখন আর পেটের দায়ে নিজের কলমকে বিক্রি করতে হয় না। সারাদিনের অফিস শেষ করে সে রাতের পুরো সময়টা নিজের সৃষ্টিশীল কাজে ঢেলে দিতে পারে। দেশের বড় জাতীয় দৈনিকের সাপ্তাহিক সাহিত্য সাময়িকীতে তার ছোটগল্প ও কবিতা নিয়মিত ছাপা হতে লাগল।
একদিন রাতে পড়ার টেবিলে চা দিতে এসে অর্পিতা বলল,
"অর্ক, তুমি একটা ফেসবুক পেজ খুলছ না কেন?"
অর্ক ল্যাপটপ থেকে মুখ তুলল।
"ফেসবুক পেজ? কী লাভ?"
"লাভ আছে,"
অর্পিতা তার পাশে দাঁড়িয়ে চশমাটা ঠিক করে বলল।
"আজকাল মানুষ ডিজিটাল মাধ্যমেই লেখা পড়ে বেশি। তুমি তোমার ছোট গল্পগুলো, উপন্যাসের কিছু টুকরো এই পেজে পোস্ট করো। দেখবে সরাসরি পাঠকদের সাথে একটা যোগাযোগ তৈরি হবে।"
অর্পিতার কথা মেনেই সে নিজের নামে একটি পেজ খুলল।
শুরুর দিকে খুব বেশি পাঠক না থাকলেও, মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অর্কর লেখার তীব্র মানবিক টান আর গভীর ভাষা পাঠকদের নজর কাড়তে শুরু করল। তার একটা ছোট গল্পের পোস্ট হাজার হাজার মানুষ শেয়ার করল। কমেন্ট বক্সে শত শত অপরিচিত মানুষ এসে লিখতে লাগল—
“আপনার লেখা পড়লে বুকের ভেতরটা কেমন যেন ভারী হয়ে ওঠে”
,
“অনেকদিন পর এমন মৌলিক আর জীবন্ত বাংলা গল্প পড়লাম”
,
“আপনার কোনো বই কি বাজারে পাওয়া যায়?”
পাঠকদের এই ভালোবাসা সত্ত্বেও বাংলাবাজার মূলধারার প্রকাশকরা তখনো বারোশত পাতার সেই সুবিশাল উপন্যাস প্রকাশের ঝুঁকি নিতে নারাজ। তারা ফেসবুকের লেখার প্রশংসা করলেও, এত বড় ভলিউমের বই নতুন লেখকের নামে ছাপানোর জন্য লাখ টাকার সিকিউরিটি ডিপোজিট ছাড়া কথা বলতে রাজি নয়।
মাঝে মাঝে অর্ক বারান্দার রেলিংয়ে হাত রেখে মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে থাকত।
ঠিক তখনই অর্পিতা পেছন থেকে এসে তার কাঁধে হাত রাখত। এক কাপ গরম চা এগিয়ে দিয়ে খুব শান্ত, গভীর চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলত,
"মন খারাপ করছ কেন অর্ক? এই যে মানুষগুলো প্রতিদিন তোমার পেজে এসে নতুন লেখার জন্য অপেক্ষা করে, এদের ভালোবাসাই তোমার আসল শক্তি। একজন প্রকাশক আজ না বুঝুক, কাল ঠিকই বুঝতে বাধ্য হবে। তুমি শুধু লিখে যাও। আমি তো তোমার পাশে আছি।"
এরই মাঝে এলো বহুল প্রতীক্ষিত সেই দিনটি অর্পার এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট।
রেজাল্টের দিন সকালে ডাইনিং টেবিলে বসে রোল আর রেজিস্ট্রেশন নম্বর দিয়ে এন্টার চাপতেই স্ক্রিনে ভেসে উঠল কাঙ্ক্ষিত সেই ফল—GPA 5.00 ।
"আপু! জিপিএ ফাইভ!"
অর্পা চিৎকার দিয়ে কেঁদে ফেলে অর্পিতাকে জড়িয়ে ধরল।
অর্পিতার চোখ দিয়েও তখন আনন্দের নোনা পানি বাধভাঙা নদীর মতো গড়িয়ে পড়ছিল। অর্ক তখন ডেইলি বাজার থেকে একটা বড় মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে ঘরে ঢুকছিল। অর্পা ছুটে এসে পরম শ্রদ্ধায় তার দুলাভাইয়ের পায়ে হাত দিয়ে সালাম করল।
অর্ক পরম স্নেহে অর্পার মাথায় হাত রেখে মিষ্টির প্যাকেট থেকে বড় একটা চমচম তুলে তার মুখে গুঁজে দিল।
"আমি জানতাম তুই পারবি রে অর্পা।"
অর্পা চোখ মুছে মুখ তুলে তাকাল। তার চোখে তখন এক নতুন স্বপ্ন ঝিলমিল করছে।
"দুলাভাই, আমি সায়েন্স নিয়ে পড়ব। আমি বড় হয়ে একজন ভালো ডাক্তার হতে চাই।"
"অবশ্যই হবি,"
অর্ক অর্পার মাথায় হাত বুলিয়ে ভরসা দিয়ে বলল।
"তোর পড়াশোনার সব দায়িত্ব আমার। তুই শুধু মন দিয়ে পড়বি।"
কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অর্পা ঢাকার নামকরা একটি কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তির সুযোগ পেয়ে গেল। ভর্তির দিন কোনো ধারদেনা বা কারও কাছে হাত না পেতে, নিজের উপার্জনের টাকায় গর্বের সাথে অর্পার সব ফি পরিশোধ করল অর্ক।
বাংলাবাজারের গলির মুখটায় তখন বিকেলের আলো নিভে আসছিল।
আরেকটি নামকরা প্রকাশনীর সুদৃশ্য কাঁচের চেম্বার থেকে বের হয়ে ধীরপায়ে হেঁটে আসছিল অর্ক। এবারও সেই একই দৃশ্য পাণ্ডুলিপির বারোশত পাতার সংখ্যা দেখেই প্রকাশকের মুখ ফিরিয়ে নেওয়া আর লাখ টাকার সিকিউরিটি চাওয়ার নির্লজ্জ শর্ত। কাঁধের কাপড়ের ব্যাগটা যেন আজ আরও বেশি ভারী মনে হচ্ছিল।
মনমরা হয়ে সরু গলির ভিড় ঠেলে দ্রুত পায়ে বড় রাস্তার দিকে এগোচ্ছিল অর্ক। মাথার ভেতর হাজারটা চিন্তার জটলা। ঠিক তখনই উল্টো দিক থেকে একরাশ পুরনো ফাইল আর বই বুকে জড়িয়ে আসা এক ভদ্রলোকের সাথে অসাবধানতাবশত তার সজোরে ধাক্কা লাগল।
"আরে আরে!"
ভদ্রলোকের বুকপকেটে আটকানো পুরনো দিনের একটি ফাউন্টেন পেন ছিটকে গিয়ে সোজা পড়ল অর্কর গায়ের সাদা টি-শার্টের ওপর। নিমিষেই নীলচে কালো কালির একটা গাঢ় দাগ অর্কর বুকের সাদা কাপড়ে ছড়িয়ে পড়ল।
অর্ক হকচকিয়ে নিজের বুকের দিকে তাকাল।
পঞ্চাশোর্ধ্ব সেই ভদ্রলোক যার পরনে সাধারণ সুতির ঢোলা পাঞ্জাবি আর চোখে ভারী ফ্রেমের চশমা, তিনি অত্যন্ত অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। তিনি দ্রুত হাত বাড়িয়ে অর্কর টি-শার্টের দাগটা মোছার ব্যর্থ চেষ্টা করতে করতে একরাশ অনুশোচনায় বলে উঠলেন,
"ইশ রে বাবা! বড় অন্যায় হয়ে গেল! একদম খেয়াল করিনি। তোমার সুন্দর জামাটা পুরো নষ্ট করে দিলাম!"
অর্ক নিজেকে সামলে নিয়ে বিনীত গলায় বলল,
"না না আঙ্কেল, সমস্যা নেই। ভিড়ের মধ্যে এমন হতেই পারে। আপনি ব্যস্ত হবেন না।"
"কী বলো তুমি! এমন কালির দাগ কি সহজে ওঠে?"
ভদ্রলোক কোনোভাবেই ছাড়তে চাইলেন না। তিনি অর্কর হাতটা পরম স্নেহে ধরে বললেন,
"আমার অফিস এই গলির ঠিক ওপরেই। চলো বাবা, একটু হাত-মুখ ধুয়ে অন্তত এক কাপ চা খেয়ে যাও। নইলে আমার নিজের কাছে খুব খারাপ লাগবে।"
ভদ্রলোকের অমায়িক ব্যবহারে না করার কোনো উপায় রইল না। অর্ক তাঁর সাথে পা বাড়াল।
পাটুয়াটুলীর এক পুরনো তিনতলা ভবনের সরু কাঠের সিঁড়ি বেয়ে তারা দোতলার শেষ মাথায় গিয়ে দাঁড়াল। দরজার ওপর কাঠের ক্ষয়ে যাওয়া সাইনবোর্ডে পেতলের হরফে আবছা লেখা—
"বন্ধু প্রকাশন"
প্রতিষ্ঠিত: ১৯৬২
ভেতরে ঢুকতেই নাকে এলো পুরনো কাগজের এক প্রাচীন, নস্টালজিক সুবাস।
ঘরটার ছাদ বেশ উঁচু। দেওয়াল জুড়ে রাখা বিশাল বিশাল সেগুন কাঠের বুকশেলফ, সেখানে সাজানো আছে ষাট আর সত্তরের দশকের দুর্লভ সব সাহিত্যের বই। এক কোণে একটা পুরনো কাঠের টেবিল আর ফ্যানের ধীর ঘূর্ণি। আলো-আঁধারিতে ঘেরা এই অফিসটায় পা রাখতেই মনে হয় যেন সময় এখানে কয়েক দশক আগে থমকে গেছে।
ভদ্রলোক ড্রয়ার থেকে একটা পরিষ্কার গামছা বের করে অর্ককে দিলেন হাত-মুখ ধোয়ার জন্য। তারপর দরজায় মুখ বাড়িয়ে নিচের চায়ের ছেলেকে হাঁক দিলেন,
"মন্টু, ভালো দেইখা দুই কাপ স্পেশাল লাল চা দিয়া যা তো!"
টেবিলের উল্টো পাশের কাঠের চেয়ারে বসল অর্ক। ভদ্রলোক নিজের চশমাটা টেবিলের ওপর রেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
"আমার নাম রফিকুল ইসলাম,"
ভদ্রলোক মৃদু হাসলেন।
"এই ভগ্নপ্রায় বন্ধু প্রকাশনের বর্তমান কর্ণধার।"
অর্ক অবাক হয়ে চারপাশের পুরনো বইগুলোর দিকে তাকাল।
"আপনার প্রকাশনীটা তো অনেক পুরনো মনে হচ্ছে আঙ্কেল।"
"হ্যাঁ বাবা,"
রফিক সাহেবের চোখের দৃষ্টিতে একরাশ স্মৃতি খেলা করে গেল।
"পাকিস্তান আমলে, ১৯৬২ সালে আমার দাদা এই প্রকাশনী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেই যুগে ঢাকার বড় বড় কবি, কথাসাহিত্যিক আর প্রগতিশীল লেখকরা এই ঘরে বসে আড্ডা দিতেন। কিন্তু দিন বদলেছে। আমার বাবার পর যখন আমি দায়িত্ব নিলাম, ততদিনে বাজার দখল করেছে সস্তা পপ ফিকশন আর বাণিজ্যিক বই। সস্তা প্রেমের বই না ছাপলে নাকি ব্যবসা বাঁচে না! কিন্তু দাদা আর বাবার তৈরি এই প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা আমি কোনোদিন সস্তা বাণিজ্যের কাছে বিক্রি করতে পারিনি।"
তিনি একটু থামলেন।
"আদর্শ ধরে রেখে পেট চালানো যায় না বাবা। প্রেসের দেনা আর কাগজের আকাশছোঁয়া দামে আজ এই প্রতিষ্ঠান অচল হয়ে পড়েছে।"
কথা বলতে বলতে রফিক সাহেবের চোখ গেল টেবিলের ওপর রাখা অর্কর সেই কাপড়ের ব্যাগটার দিকে। ব্যাগের খোলা মুখ দিয়ে উঁকি মারছিল মোটা আর্ট পেপারে বাঁধাই করা পাণ্ডুলিপিটা।
"তুমি কিছু লেখো নাকি?"
রফিক সাহেব কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
অর্ক একটু ইতস্তত করে পাণ্ডুলিপিটা বের করে টেবিলের ওপর রাখল।
"জি আঙ্কেল, একটা উপন্যাস লিখেছিলাম। কিন্তু কোনো প্রকাশক ছাপাতে রাজি হচ্ছে না।"
রফিক সাহেব পাণ্ডুলিপির প্রথম পাতাটা খুললেন। টাইটেল পেজে বড় করে লেখা—
"শেষ মানুষটির ডায়েরি"
তিনি চশমাটা চোখে লাগিয়ে খুব নিবিষ্ট মনে পাতা ওল্টাতে লাগলেন।
চা দিয়ে গেল ছেলেটি। চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উড়তে উড়তে একসময় জুড়িয়ে ঠাণ্ডা হয়ে গেল, কিন্তু রফিক সাহেবের চোখ খাতার পাতা থেকে সরছিল না। তিনি একটানা দশটি পাতা পড়ে ফেললেন। তাঁর কপালের ভাঁজগুলো গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছিল, চোখের পাতায় ফুটে উঠছিল এক অভাবনীয় বিস্ময় আর তীব্র মুগ্ধতা।
প্রায় আধঘণ্টা পর রফিক সাহেব পাণ্ডুলিপিটা আলতো করে বন্ধ করলেন। তিনি অর্কর মুখের দিকে তাকালেন। তাঁর চোখে তখন পানি আর এক অদ্ভুত শ্রদ্ধা চিকচিক করছিল।
"কত বছর পর এমন একটা লেখা পড়লাম! এটা শুধু উপন্যাস নয় বাবা, এটা খাঁটি সাহিত্য।"
কিন্তু পরক্ষণেই রফিক সাহেব একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে পাণ্ডুলিপির ওপর হাত রেখে মাথা নিচু করলেন। তাঁর কণ্ঠ বেদনায় ভারী হয়ে এলো।
"কিন্তু আমার কোনো সামর্থ্য নেই অর্ক,"
রফিক সাহেব খুব অসহায় গলায় বললেন।
"এই বারোশত পাতার একটা বিশাল মহাকাব্যিক বই ছাপাতে যে পরিমাণ কাগজের রিম আর বাইন্ডিংয়ের টাকা দরকার, তা জোগাড় করার মতো ক্ষমতা আমার এই দেউলিয়া প্রকাশনীর আর নেই। আমার যদি সেই সামর্থ্য থাকত, আমি নিজের বাড়ি বিক্রি করে হলেও তোমার এই বই আলোতে আনতাম।"
তিনি অর্কর চোখের দিকে তাকালেন। সেই চোখে পরাজয়ের এক চরম হাহাকার।
"এইবারের অমর একুশে বইমেলাতেই বন্ধু প্রকাশনের শেষ স্টল বসবে বাবা। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের এক কোণে একটা ছোট্ট স্টল নেব। মেলা শেষ হলেই আমি দাদার এই ষাট বছরের স্মৃতিতে চিরতরে তালা ঝুলিয়ে দেব।."
পুরনো অফিস ঘরটায় তখন ফ্যানের একটানা ক্যাঁচক্যাঁচ আওয়াজ ছাড়া আর কোনো শব্দ ছিল না।
অর্ক তাকিয়ে রইল রফিক সাহেবের সেই চোখের জলের দিকে। এত বড় শহরে কত প্রকাশকের কাছে সে টাকার লোভ আর তাচ্ছিল্য দেখেছে, কিন্তু এই এক ভগ্নপ্রায় প্রকাশকের নিঃস্ব চোখের জলে সে আজ দেখতে পেল সাহিত্যের প্রতি এক পবিত্র, অকৃত্রিম ভালোবাসা।
পাণ্ডুলিপিটা পরম যত্নে কাপড়ের ব্যাগে ঢুকিয়ে নিল অর্ক।
চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে সে রফিক সাহেবের সামনে মাথা ঝুঁকিয়ে শ্রদ্ধা জানাল।
"আপনার এই কথাগুলোই আমার জন্য অনেক বড় পাওয়া, আঙ্কেল। আজ কোনো আক্ষেপ নিয়ে ফিরছি না। অন্তত একজন মানুষ এই বারোশত পাতার মর্ম বুঝেছে, এটাই আমার শান্তি।"
অর্ক দরজার দিকে পা বাড়াল। পুরনো কাঠের মেঝেতে তার জুতোর মচমচ শব্দ ছাড়া চারপাশ তখন নিঝুম। সে যখন সিঁড়ির প্রথম ধাপে পা দিতে যাবে, ঠিক তখনই পেছন থেকে এক ব্যাকুল আহ্বান ভেসে এলো—
"অর্ক! বাবা, একটু দাঁড়াও!"
অর্ক চমকে ফিরে তাকাল।
রফিক সাহেব নিজের টেবিল ছেড়ে দ্রুতপায়ে দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন।
"আমি জীবনে শেষ একটা ঝুঁকি নিতে চাই, অর্ক,"
রফিক সাহেবের গলার স্বর কাঁপছিল তীব্র উত্তেজনায়।
"আমার দাদার ভিটেমাটিতে, বিক্রমপুরে আমার শেষ সম্বল এক বিঘা জমি আছে। আমি ওই জমিটুকু বন্ধক রাখব। কাল সকালেই ব্যাংকে যাব। সেই টাকা দিয়ে বন্ধু প্রকাশন তোমার এই বারোশত পাতার মহাকাব্য বইমেলায় নিয়ে আসবে!"
অর্কর পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল। সে স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইল।
"না আঙ্কেল! এটা আপনি কী বলছেন? আপনি কি পাগল হয়ে গেছেন? আপনার শেষ সম্বল ভিটেমাটি বন্ধক রাখবেন আমার জন্য? আমি এই শহরে একজন অপরিচিত, আননোন ছেলে! যদি বই একটাও বিক্রি না হয়? যদি সব টাকা লোকসান যায়? আপনার এই সর্বনাশের বোঝা আমি সারাজীবন মাথায় নিয়ে বাঁচব কীভাবে?"
"ব্যর্থতার ভয় তো ব্যবসায়ীরা করে অর্ক, যারা সাহিত্যকে ভালোবেসেছে তারা কোনোদিন হিসাব মেলাতে বসে না!"
রফিক সাহেব অর্কর দুই কাঁধ শক্ত করে চেপে ধরলেন।
"আমি জানি এই বই ইতিহাস তৈরি করবে। আর যদি ব্যর্থও হয়, যদি মেলা শেষে আমার এই প্রকাশনী দেউলিয়া হয়ে চিরতরে বন্ধ হয়ে যায় তবুও ইতিহাসের পাতায় সোনালী অক্ষরে লেখা থাকবে যে, ষাট বছরের প্রাচীন বন্ধু প্রকাশন এর শেষ নিঃশ্বাসটা কোনো সস্তা বই দিয়ে শেষ হয়নি”“
অর্ক কোনো কথা বলতে পারছিল না।
"আমি কোনো দান করছি না বাবা,"
রফিক সাহেব অর্ককে টেবিলের দিকে টেনে এনে একটা নতুন চুক্তিনামা বের করলেন।
"এটা আমাদের যৌথ লড়াই। বইয়ের বিক্রি থেকে যা লাভ হবে, তার ষাট ভাগ রয়্যালটি সরাসরি তোমার, বাকি চল্লিশ ভাগ আমার প্রেসের খরচে যাবে। বলো, তুমি রাজি আছো?"
অর্কর হাত কাঁপছিল। এক অদ্ভুত আনন্দ, আর একই সাথে এক বৃদ্ধ মানুষের ভিটেমাটির দায়িত্ব কাঁধে নেওয়ার তীব্র ভীতি তার ভেতরটা তোলপাড় করে দিচ্ছিল।অর্ক আর না করতে পারল না। সে ধীরহাতে কলম তুলে নিয়ে চুক্তির কাগজের নিচে নিজের সইটা এঁকে দিল। রফিক সাহেব অর্ককে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।
সিঁড়ি দিয়ে যখন অর্ক নিচে নেমে এলো, তখন সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নেমেছে বাংলাবাজারের রাস্তায়। বুকপকেটের কালির দাগটা তার টি-শার্টে তখনো স্পষ্ট। কিন্তু কাঁধের ব্যাগটা এখন আর নিছক কাগজের বোঝা ছিল না; সেখানে এখন রাখা ছিল এক বৃদ্ধের বিশ্বাস, তাঁর শেষ ভিটেমাটি আর এক ঐতিহাসিক স্বপ্ন।
বাসায় যখন অর্ক ফিরল, রাত তখন সাড়ে আটটা বেজে গেছে।
দরজা খুলে ঘরে ঢোকার পর থেকেই অর্কর আচরণে এক অদ্ভুত স্তব্ধতা। মানুষের জীবনে যখন কোনো অপ্রত্যাশিত বিশাল ঘটনা ঘটে যায়, মস্তিষ্ক যখন তার পুরো অভিঘাতটা একসাথে নিতে পারে না, তখন একধরনের ঘোরের জন্ম হয়। অর্ক ঠিক তেমনই এক ঘোরের মধ্যে ছিল। সে কোনো কথা না বলে সোফার এক কোণে গিয়ে বসল। গায়ের সাদা টি-শার্টে সেই কালির দাগটা এখনো জ্বলজ্বল করছে।
অর্পিতাও মিনিট দশেক আগে অফিস থেকে ফিরেছে। পরনের অফিস ড্রেসটা বদলে একটা আরামদায়ক সুতির জামা পরে সে সোফায় বসে এক হাতে ফোনে কী যেন স্ক্রল করছিল। চোখেমুখে সারাদিনের ফাইলিং আর ক্লায়েন্ট ডিলিংয়ের ক্লান্তি।
রান্নাঘর থেকে অর্পা খুব যত্ন করে ট্রেতে করে দুই কাপ ধোঁয়া ওঠা গরম আদা-চা নিয়ে এলো।
"দুলাভাই, এই নাও তোমার স্পেশাল চা,"
অর্পা হাসিমুখে কাপটা অর্কর সামনের টেবিলে নামিয়ে রাখল। অর্পিতাকেও একটা কাপ বাড়িয়ে দিয়ে সে পাশের চেয়ারে বসল।
চায়ে একটা আলতো চুমুক দিল অর্ক। তার দৃষ্টি সোজা দেওয়ালের এক কোণে স্থির হয়ে আছে।
পুরো ঘর যখন একদম শান্ত, ঠিক তখনই অর্ক চায়ের কাপটা হাতে ধরে অসম্ভব ঠান্ডা গলায় বলল—
"হয়ে গেছে, অর্পিতা।"
অর্পিতা ফোনের স্ক্রিন থেকে চোখ না তুলেই আনমনা ভঙ্গিতে বলল,
"কী হয়ে গেছে বলো তো? সুপার শপের কোনো স্টক নাকি?"
অর্ক চায়ের কাপটা খুব সাবধানে টি-টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখল। তারপর ধীরস্থির গলায় বলল,
"বই ছাপা হচ্ছে। বারোশত পাতার পুরোটা।"
অর্পিতার হাতের আঙুলগুলো ফোনের স্ক্রিনের ওপর হঠাৎ জমে গেল।
সে চশমার ওপর দিয়ে মুখ তুলে অর্কর মুখের দিকে তাকাল। অর্কর চোখেমুখে কোনো উত্তেজনার লাফালাফি নেই, নেই কোনো হাসির উচ্ছ্বাস। এমন পাথুরে শান্ত ভাব দেখে অর্পিতা একটু ভ্রু কুঁচকে হাসার চেষ্টা করল,
"ঠাট্টা করছ কেন অর্ক? মেজাজ এমনিতেই ভালো নেই, অফিস থেকে অনেক প্যারা খেয়ে এসেছি।"
অর্ক কোনো কথা বাড়াল না। সে নিজের পকেট থেকে ভাঁজ করা সেই অফিশিয়াল স্ট্যাম্পযুক্ত সাদা কাগজের চুক্তিপত্রটা বের করে অর্পিতার কোলের ওপর রাখল।
"বন্ধু প্রকাশনী বইটা ছাপছে,"
অর্ক এক নিঃশ্বাসে বলে গেল, প্রতিটি শব্দ যেন ঘরের বাতাসে কাচের মতো বাপানি ।
"প্রকাশক রফিক সাহেব। তিনি নিজে পুরো পাণ্ডুলিপি পড়েছেন। বই ছাপানোর পুরো খরচ জোগাড় করতে তিনি গ্রামে নিজের শেষ সম্বল পৈতৃক এক বিঘা জমি বন্ধক রাখছেন। বইমেলায় স্টলে আসবে আমাদের বারোশত পাতা। আর রয়্যালটি ষাট পার্সেন্ট।"
ঘরের ভেতর যেন এক নিমেষে বজ্রপাত হলো।
অর্পিতার হাতের ফোনটা আলগা হয়ে সোফার গদির ওপর খসে পড়ল।
"জ... জমি বন্ধক?"
"তুমি সত্যি বলছ অর্ক? তুমি কোনো বানিয়ে কথা বলছ না তো?"
পাশের চেয়ারে বসে থাকা অর্পাও হা করে তাকিয়ে ছিল।
অর্ক এবার আর নিজের ভেতরের সেই পাথুরে বাঁধ ধরে রাখতে পারল না। তার চোখের কোণ দিয়ে দুটো নোনা জলের ধারা নেমে এলো। সে অর্পিতার হাত দুটো নিজের মুঠোয় চেপে ধরে ফুঁপিয়ে উঠল,
"আমি সত্যি বলছি অর্পিতা! আমাদের বইমেলায় বই আসছে! কেউ আমাদের আটকাতে পারেনি!"
মুহূর্তের মধ্যে পুরো ঘরের সেই থমথমে নিস্তব্ধতা ভেঙে এক বাঁধভাঙা আনন্দের বিস্ফোরণ ঘটল।
অর্পিতা দুই হাত দিয়ে নিজের মুখ চেপে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল। সে সোফা থেকে উঠে এসে অর্ককে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। কতগুলো মাসের কান্না, কতগুলো নির্ঘুম রাতের প্রার্থনা, আর মানুষের দেওয়া অজস্র অপমানের বিষ যেন এই এক মুহূর্তে ধুয়েমুছে ভেসে গেল।
"আমি বলেছিলাম না!"
অর্পিতা অর্কর বুকের কাছে মুখ রেখে কান্নার মাঝেও চিৎকার করে হাসল।
"আমি বলেছিলাম না তোমার আগুন কোনোদিন নিভে যাবে না! দেখেছ? আল্লাহ ঠিকই একজন মানুষকে পাঠিয়ে দিয়েছেন!"
অর্পা চেয়ার ছেড়ে এক লাফে এসে দুজনের হাত জড়িয়ে ধরে আনন্দে নাচতে শুরু করল।
"আপু! দুলাভাইয়ের বইমেলায় বই আসবে! আমি সবাইকে নিয়ে যাব! সব বান্ধবীদের বলব!"
ছোট্ট ফ্ল্যাটটার ড্রয়িংরুম তখন এক স্বর্গীয় আনন্দে ভরে উঠেছে। টেবিলে রাখা চায়ের কাপ থেকে তখনো ধোঁয়া উড়ছে, আর সেই ধোঁয়ার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা তিনটে জীবন যেন জীবনের সব দুঃখ পেছনে ফেলে এক নতুন বিজয় উজ্জাপন করছিল।
পরের বছরের জানুয়ারি মাস যখন ঢাকায় নামল, তখন শহরের বাতাসে হালকা শীতের শিরশিরে আমেজ।
কুয়াশাচ্ছন্ন সকালগুলোতে এখন চারতলার বারান্দায় দাঁড়ালে মনটা এক অদ্ভুত ভালোলাগায় ভরে ওঠে। গত কয়েক মাসে তাদের এই ছোট্ট সংসারটার রূপ অনেকটাই বদলে গেছে। ড্রয়িংরুমে একটা নতুন এলইডি টিভি বসেছে, সন্ধ্যার পর সেখানে অর্পিতা আর অর্পা বসে টুকটাক খবর বা নাটক দেখে। সায়েন্সে পড়া অর্পার প্র্যাকটিক্যাল আর পড়াশোনার সুবিধার জন্য কিস্তিতে কেনা হয়েছে একটা নতুন ব্র্যান্ডের কম্পিউটার। অর্পা এখন গভীর আগ্রহে সেই কম্পিউটারে বায়োলজি আর ফিজিক্সের লেকচার দেখে নোট নেয়।
ডেইলি বাজারের ব্রাঞ্চ ম্যানেজার হিসেবে অর্কর সুনাম তখন পুরো চেইনে ছড়িয়ে পড়েছে। আর সেই সাথে সমান তালেই চলছিল তার কলমের সাধনা। বিভিন্ন প্রথম সারির জাতীয় দৈনিকের সাহিত্য পাতায় তার কলাম আর ছোটগল্প নিয়মিত জায়গা করে নিচ্ছিল।
তার ফেসবুক পেজের ফলোয়ার সংখ্যা এখন তেরো হাজারে গিয়ে ঠেকেছে। সংখ্যাটা হয়তো সোশ্যাল মিডিয়ার সস্তা ইনফ্লুয়েন্সারদের তুলনায় খুব বড় নয়, কিন্তু এই তেরো হাজার মানুষ ছিল খাঁটি সাহিত্যের একনিষ্ঠ অনুরাগী। অর্ক কোনো লেখা পোস্ট করা মাত্রই সেখানে শত শত চিন্তাশীল মন্তব্য জমা হতো। পাঠকদের মধ্যে ইতিমধ্যে এক তীব্র আলোচনা শুরু হয়ে গিয়েছিল যে, এই তরুণের কোনো বড় বই কবে বাজারে আসবে।
জানুয়ারির বিশ তারিখের এক কনকনে শীতের সন্ধ্যায় অর্ক ঘরে ফিরল একটা খাকি রঙের শক্ত কার্টন বুকে জড়িয়ে।
অর্পিতা রান্নাঘরে রাতের জন্য রুটি বানাচ্ছিল। হাতে আটার গুঁড়ো মেখেই সে আঁচলে হাত মুছতে মুছতে ড্রয়িংরুমে ছুটে এলো। ডাইনিং রুম থেকে কম্পিউটার ছেড়ে দৌড়ে এলো অর্পাও।
অর্ক নিঃশব্দে টেবিলের ওপর কার্টনটা রাখল। তারপর অত্যন্ত সতর্কভাবে ব্লেড দিয়ে টেপ কেটে ভেতর থেকে বের করে আনল প্রথম বইটি।
"শেষ মানুষটির ডায়েরি"
লেখক: অর্ক আহমেদ
প্রকাশক: বন্ধু প্রকাশন
দুটো সুদৃশ্য খণ্ডে, কালো আর গাঢ় লাল রঙের ম্যাট ফিনিশের হার্ডবাউন্ড মলাট। কভারের ওপর ধ্বংসস্তূপের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা একাকী মানুষের আবছায়া প্রতিকৃতি। বারোশত পাতার এই বিশাল ভলিউমটা হাতে নিলে এক নিমেষে এর আভিজাত্য আর ওজনের গভীরতা টের পাওয়া যায়।
অর্ক বইটির প্রথম কপিটি পরম শ্রদ্ধায় দুই হাতে তুলে ধরে অর্পিতার সামনে বাড়িয়ে দিল।
"তোমার বই, অর্পিতা,"
অর্পিতা কাঁপাকাঁপা হাতে সেই ভারী বইটি নিজের কোলে তুলে নিল। বইয়ের মসৃণ মলাটে হাত বোলাতেই তার চোখের পানি টুপ করে খসে পড়ল কালো মলাটের ওপর। এই সেই বারোশত পাতা, যার জন্য কত রাত এই ছেলেটা না খেয়ে মেসের টেবিলে ঘাম ঝরিয়েছে, কত প্রকাশকের কাছে হাতজোড় করে অপমানিত হয়েছে। আজ সেই শব্দগুলো অক্ষরের রাজকীয় পোশাকে তার হাতের তালুতে জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
অর্পিতা কাঁপতে থাকা আঙুলে বইয়ের প্রথম পাতাটা খুলল।
টাইটেল পেজ উল্টাতেই উৎসর্গ পাতার সাদা জমিনে বড় বড় হরফে লেখা কয়েকটি লাইন তার চোখে পড়ল—
"যে মানুষটি আমার ভাঙাচোরা অন্ধকারকে ভালোবেসে আলো এনে দিয়েছিল,
আমার নিঃস্ব ডায়েরির প্রতিটি অক্ষরের একমাত্র মালিক আমার অর্পিতাকে।"
অর্পিতা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে বইটি বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরে অর্কর বুকে মাথা রেখে ডুকরে কেঁদে উঠল। অর্পাও পাশে দাঁড়িয়ে দুই হাত দিয়ে দুজনকে জড়িয়ে ধরল।
সাতাশে জানুয়ারির দুপুর।
পাটুয়াটুলী গলিতে
বন্ধু প্রকাশন এর পুরনো সেই কাঠের ঘরের মেঝেতে সারি দিয়ে সাজিয়ে রাখা হয়েছে শক্ত খাকি রঙের কার্টনের স্তূপ। মোট এক হাজার কপি। বারোশত পাতার সুবিশাল দুই খণ্ডের এই এক হাজার বইয়ের বাঁধাই আর প্রিন্টিংয়ের পেছনে জমা হয়ে আছে রফিক সাহেবের পৈতৃক জমির প্রতিটি ইঞ্চির মূল্য।
রফিক সাহেব একটা খোলা বইয়ের ওপর হাত রেখে চেয়ারে বসে ছিলেন। তাঁর মুখে এক অদ্ভুত উত্তেজনা আর উদ্বেগের ছায়া।
"এক হাজার কপি বাবা..."
রফিক সাহেব অর্কর দিকে তাকিয়ে একটা ম্লান হাসি দিলেন।
"এটা একটা বিরাট ঝুঁকি, একদম সরাসরি একটা জুয়া। পুরো টাকাটা বাজি রেখেছি। যদি পাঠক এই বই গ্রহণ করে তবে তো কথাই নেই, আর যদি নাও করে আমার কোনো অনুশোচনা থাকবে না বাবা। শেষ মুহূর্তে প্রেসের সমস্ত দেনা আর বাইন্ডিংয়ের ঝামেলা মিটে গেছে। এখন তুমি তৈরি থেকো, পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্টলে তোমাকে বসতে হবে।"
অর্কর বুকের ভেতরটা তখন ধুকপুক করছিল। সে রফিক সাহেবের ত্যাগটাকে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিল।
মেলায় পুরো ফেব্রুয়ারি মাস স্টলে থাকা তার নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু তার বাস্তব জীবনের শেকলটাও যে বড্ড শক্ত! সে একটু ইতস্তত করে পকেট থেকে ফোন বের করল।
"আঙ্কেল, আমি একটু কথা বলে আসছি,"
বলে অর্ক করিডোরের কাঠের বারান্দায় এসে দাঁড়াল।
সে ডেইলি বাজার সুপার শপ চেইনের ম্যানেজিং ডিরেক্টর আশরাফ সাহেবের নম্বরে ডায়াল করল।
ওপাশ থেকে ফোন রিসিভ হতেই অর্ক একটু গলা খাঁকারি দিয়ে অত্যন্ত বিনীত গলায় বলল,
"আসসালামু আলাইকুম স্যার। আমি গ্রিন রোড ব্রাঞ্চের ম্যানেজার অর্ক বলছি।"
"হ্যাঁ অর্ক, বলো। কোনো সমস্যা?"
"না স্যার... আসলে একটা বিশেষ দরকারে ফোন দিয়েছিলাম। আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে বইমেলায় আমার একটা বই বের হচ্ছে। স্যার, আমার কি পুরো ফেব্রুয়ারি মাসটা একটু ছুটি পাওয়া সম্ভব? আমার এক মাসের বেতনের টাকা আপনি পুরোটা কেটে রাখলেও—"
কথাটা শেষ করার আগেই ওপাশ থেকে এক তাচ্ছিল্যভরা অট্টহাসি শোনা গেল।
"এক মাসের ছুটি? আপনি কি কোনো প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক নাকি অর্ক সাহেব?"
এমডি সাহেবের গলার স্বর মুহূর্তেই কঠোর হয়ে উঠল।
"একটা ব্যস্ত আউটলেটের ব্রাঞ্চ ম্যানেজার পুরো এক মাস হাওয়া হয়ে থাকবে? আপনি কি ভেবেছেন আপনার শখের বইমেলার জন্য আমি লাখ টাকার ব্যবসার আউটলেটে তালা ঝুলিয়ে রাখব? ইমপসিবল!"
অর্কর মুখের রক্ত যেন এক নিমেষে শুকিয়ে গেল। তার গলার কাছে একরাশ হতাশা দলা পাকিয়ে উঠল।
"শুনুন, আপনি ভালো কাজ করেন বলেই ছাড় দিচ্ছি। পুরো দিনের ছুটি কোনোভাবেই সম্ভব না। তবে যদি মেলায় বসতেই চান, আপনাকে একটা এডজাস্টমেন্ট করতে হবে। প্রতিদিন ভোর ছয়টায় ঢুকবেন, সকালের সব স্টকের ইনভেন্টরি, ডেলিভারি আর ক্যাশের অডিট দুপুর দুইটার মধ্যে শেষ করে অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজারের কাছে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে আপনি মেলায় যাবেন। এর বাইরে এক মিনিটও আগে বের হওয়া যাবে না। রাজি থাকলে থাকেন, না হলে রিজাইন দেন।"
অর্ক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। চাকরি ছাড়ার কোনো উপায় তার নেই।
"ঠিক আছে স্যার, আমি দুপুর দুইটা পর্যন্তই স্টোরে থাকব। ধন্যবাদ আপনাকে।"
ফোনটা কেটে অর্ক ঘরের ভেতরে ফিরে এলো।
রফিক সাহেব চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
"কী হলো বাবা? কোনো সমস্যা?"
"আঙ্কেল, পুরো দিন মেলায় থাকতে পারব না। সকাল থেকে দুপুর দুইটা পর্যন্ত আমাকে সুপার শপের ডিউটি করতে হবে। আড়াইটা বা তিনটার মধ্যে আমি সোজা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্টলে চলে আসব। আগে আমার চাকরিটা বাঁচানো দরকার আঙ্কেল। আমার ওপর দুটো মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।"
রফিক সাহেব কোনো রাগ বা বিরক্তি প্রকাশ করলেন না।
"একদম ঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছ বাবা,"
রফিক সাহেব হাসলেন।
"সংসার আর দায়িত্বই মানুষের প্রথম ধর্ম। আর তাছাড়া বইমেলার আসল ভিড় তো শুরু হয় বিকেল চারটার পর থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত! তুমি সকালের কাজ শেষ করে নিশ্চিন্তে মেলায় আসবে। বাকি সময়টুকু আমি আর মন্টু সামলে নেব।"
অর্কর বুকের ওপর থেকে যেন এক বিশাল পাথর নেমে গেল।
একত্রিশে জানুয়ারির রাতটা যেন অন্য সব রাতের চেয়ে অনেক বেশি দীর্ঘ ছিল।
বিছানায় শুয়ে অর্ক সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে ছিল একদৃষ্টিতে। তার চোখের পাতায় ঘুমের কোনো লেশমাত্র নেই। ভেতরে এক তীব্র তোলপাড়, একরাশ চাপা উদ্বেগ আর ভয় তাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে।
পাশে শুয়ে থাকা অর্পিতা তার গালে আলতো করে হাত
"ঘুম আসছে না?"
অর্পিতা খুব নরম গলায় ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।
অর্ক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে একপাশে ফিরে অর্পিতার চোখের দিকে তাকাল।
"ভয় করছে অর্পিতা,"
অর্ক খুব নিচু গলায় বলল।
"যে রফিক আঙ্কেল কোনোদিন আমাকে চিনতেন না, তিনি আমার লেখার ওপর ভরসা করে নিজের শেষ সম্বল ভিটেমাটির জমিটুকু বন্ধক রেখে দিলেন। আর আমি... এতগুলো বছর কত অপমান, কত ক্ষুধা, কত নির্ঘুম রাত পার করে এই বারোশত পাতা দাঁড় করিয়েছি। যদি হেরে যাই?"
"তুমি একা নও অর্ক,"
"যে গল্প তুমি লিখেছ, তা কখনোই ব্যর্থ হতে পারে না। আর তুমি সোশ্যাল মিডিয়ার পাঠকদের কথা ভুলে যাচ্ছ কেন? তোমার পেজের মানুষগুলো কতদিন ধরে তোমার বইয়ের জন্য অপেক্ষা করছে!"
অর্পিতা একটু উঠে বসে বলল,
"তুমি তো এখনো ফেসবুক পেজে কোনো অফিশিয়াল পোস্ট দাওনি। এখনই একটা পোস্ট লেখো। স্টল নম্বর কত, বই কোথায় পাওয়া যাবে আর তুমি কখন মেলায় থাকবে সব পরিষ্কার করে জানিয়ে দাও।"
অর্কর মনে হলো কথাটা ঠিক। সে বালিশের পাশ থেকে ফোনটা হাতে নিল।
বিছানায় শুয়ে শুয়েই সে নিজের পেজটাতে ঢুকল। অর্ক স্ক্রিনের ওপর আঙুল ছুঁইয়ে খুব সহজ, আন্তরিক কয়েকটা লাইন লিখল—
"অমর একুশে বইমেলা
সোহরাওয়ার্দী উদ্যান।
আমার প্রথম উপন্যাস
“শেষ মানুষটির ডায়েরি”
(দুই খণ্ডে সমাপ্ত, ১২০০ পৃষ্ঠা) পাওয়া যাবে ষাট বছরের ঐতিহ্যবাহী
“বন্ধু প্রকাশন”এর স্টলে (স্টল নং ৩৫২)।
চাকরির দায়িত্ব শেষ করে আমি প্রতিদিন দুপুর তিনটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত স্টলেই থাকব। যাদের ভালোবাসায় আমার এই নিঃস্ব পথচলা পূর্ণতা পেয়েছে, মেলায় আপনাদের অপেক্ষায় রইলাম।"
পোস্টের নিচে বইয়ের প্রচ্ছদের একটা ছবি জুড়ে দিয়ে অর্ক
"পাবলিশ"
বাটনে চাপ দিল।
পোস্টটা যাওয়ার সাথে সাথেই নোটিফিকেশনের টুংটুং শব্দ শুরু হয়ে গেল। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে সেখানে শুভকামনা আর ভালোবাসার শত শত কমেন্ট জমা হতে লাগল—
“অবশেষে কাঙ্ক্ষিত বইটা আসছে!”
,
“ভাইয়া, কাল প্রথম দিনেই আমি আপনার স্টলে আসছি”
,
“বন্ধু প্রকাশনের স্টল খুঁজে নেব ইনশাআল্লাহ।”
অর্পিতা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে এক চিলতে তৃপ্তির হাসি দিল। সে অর্কর হাত থেকে ফোনটা নিয়ে সাইড টেবিলে রেখে দিল।
"দেখেছ? মানুষ তোমার জন্য অপেক্ষা করছে,"
অর্পিতা অর্কর বুকের কাছে মাথা রাখল।
"এবার চোখ বন্ধ করো। কাল ভোর ছটায় তোমাকে সুপার শপে ঢুকতে হবে। ঘুম না হলে শরীর টিকবে না।"
অর্ক অর্পিতার মাথায় হাত রেখে চোখ বুপানি ।
পহেলা ফেব্রুয়ারির কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে ঠিক পৌনে ছয়টায় গ্রিন রোডের সুপার শপের মূল গেটে পা রাখল অর্ক।
ব্রাঞ্চ ম্যানেজার হিসেবে সকালের এই সময়টা তার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কেবিনে ঢুকেই সে কম্পিউটারে সেন্ট্রাল ইআরপি সফটওয়্যার ওপেন করে রাতের ক্লোজিং ব্যালেন্স আর সকালের ফ্লোর সুপারভাইজারদের ডিউটি রোস্টার যাচাই করল। সকাল সাতটার মধ্যে বিভিন্ন মালবাহী গাড়ি থেকে নামানো পণ্যের ইনভয়েস, পারচেজ অর্ডার , আর কোল্ড স্টোরেজের তাপমাত্রা লগ রিপোর্টগুলোতে স্বাক্ষর করতে হলো তাকে।
সকাল দশটায় ফ্লোর অডিটে বের হলো অর্ক। প্রতিটি র্যাকের ডিজিটাল প্রাইস ট্যাগ ঠিক আছে কি না, কোনো পণ্যের বিএসটিআই সিল বা এক্সপায়ারি ডেটে গরমিল আছে কি না সবকিছু নিজে খতিয়ে দেখে অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার তানভীরের হাতে বিস্তারিত কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট তুলে দিল। দুপুর একটা পর্যন্ত চলল সাপ্লায়ারদের পেমেন্ট ভাউচার ক্লিয়ারেন্স আর ক্যাশ ভল্টের সকালের লেনদেনের হিসাব মেলানো।
অর্কর চোখের সামনে সকাল থেকেই ভাসছিল অমর একুশে বইমেলার ছবি। মনের ভেতরের একমাত্র তাড়া ছিল ঠিক দুপুর দুইটায় তাকে বাংলা একাডেমির সেই ধুলোমাখা বইয়ের শহরে পৌঁছাতে হবে।
ঘড়ির কাঁটা যখন দুপুর একটা পঞ্চান্ন, তখন সমস্ত ব্রাঞ্চ ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ব তানভীরের কাছে লিখিতভাবে হ্যান্ডওভার করল অর্ক।
কেবিনের সংলগ্ন ওয়াশরুমে গিয়ে চোখেমুখে ঠাণ্ডা পানির ঝাপটা দিয়ে নিজের পরিপাটি ইস্ত্রি করা শার্টটা পরে নিল সে। কাঁধের কাপড়ের ব্যাগটা তুলে নিয়ে কাঁচের কেবিনের দরজার নব ঘোরাতে যাবে, ঠিক তখনই টেবিলের ওপর রাখা অফিশিয়াল ফোনটা তীব্র শব্দে বেজে উঠল।
স্ক্রিনে নাম ভাসছে—
"আশরাফ সাহেব (এমডি)"
অর্ক তড়িঘড়ি করে ফোনটা রিসিভ করল,
"আসসালামু আলাইকুম স্যার। মর্নিং শিফটের সব রিপোর্ট আর ক্যাশ তানভীরকে হ্যান্ডওভার করেছি—"
"কোথাও যাওয়া হচ্ছে না অর্ক সাহেব!"
ওপাশ থেকে কোনো ভূমিকা ছাড়াই এমডি সাহেবের কর্কশ ও রুক্ষ কণ্ঠ ভেসে এলো।
"হেড অফিস থেকে মাত্র খবর পেলাম, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর আর জেলা প্রশাসনের স্পেশাল মোবাইল কোর্টের টিম ধানমন্ডি আর গ্রিন রোড জোনে বড় ধরনের অভিযানে নেমেছে। যেকোনো মুহূর্তে আমাদের আউটলেটে ম্যাজিস্ট্রেট ঢুকবে। আপনি ব্রাঞ্চ ম্যানেজার, স্টোরের লাইসেন্স, ভ্যাট চালান আর বিএসটিআই সার্টিফিকেশন দেখানোর জন্য আপনার সেখানে থাকা বাধ্যতামূলক। এক সেকেন্ডের জন্যও আপনি স্টোর ছাড়তে পারবেন না।"
অর্কর বুকের ভেতর যেন এক নিমেষে জমাট বরফ হয়ে গেল। তার গলার স্বর শুকিয়ে কাঠ।
"স্যার... কিন্তু আজ আমার জীবনের প্রথম বইমেলার উদ্বোধনী দিন,"
অর্ক প্রায় অনুনয় করে উঠল।
"আপনি তো নিজেই কথা দিয়েছিলেন দুপুর দুইটার পর তানভীর সামলাবে—"
"চুপ করুন!"
এমডি সাহেব এক ধমকে তার কথা থামিয়ে দিয়ে গর্জে উঠলেন।
"আপনার ওই ফালতু বইমেলা কি আমার কোটি টাকার ব্যবসার চেয়ে বড়? ম্যাজিস্ট্রেট এসে সিলগালা করে দিলে কিংবা পঞ্চাশ লাখ টাকা জরিমানা ঠুকে দিলে দায় কি আপনার ওই বই নেবে? শুনুন অর্ক সাহেব, এক পা যদি আপনি স্টোরের বাইরে দেন, কাল থেকে এই চেইনের কোনো আউটলেটে আপনার জায়গা হবে না। সোজা টার্মিনেশন লেটার পাঠাব!"
ক্লিক। ওপাশ থেকে লাইনটা কেটে গেল।
ফোনটা হাতে নিয়ে অর্ক পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। পুরো ঘরটা এক অসহ্য নিস্তব্ধতায় ডুবে গেল।
কেবিনের এসির বাতাসটা তখন আর শরীরকে জুড়াচ্ছিল না, বরং পুরো চেম্বারটা যেন তাকে একটা দমবন্ধ করা খাঁচায় বন্দি করে ফেলেছে। স্বপ্নটা এত কাছে এসেও এক লহমায় ধুলোয় মিশে গেল।
অর্ক ধীরপায়ে ফিরে এসে ম্যানেজারের চেয়ারটায় বসে পড়ল। তার আঙুলগুলো থরথর করে কাঁপছিল।
সে কোনোমতে ফোনটা বের করে মেসেঞ্জারে অর্পিতাকে একটি ছোট বার্তা পাঠাল—
"ভোক্তা অধিকারের মোবাইল কোর্টের রেইড চলছে আমাদের আউটলেটে। এমডি কোনোভাবেই বের হতে দিল না। আজ প্রথম দিনে আমি মেলায় যেতে পারলাম না, অর্পিতা।"
এরপর সে কাঁপাকাঁপা হাতে রফিক সাহেবের নম্বরে ডায়াল করল।
ফোন রিসিভ হতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো বইমেলার সেই চেনা উৎসবের আওয়াজ মাইকে ভেসে আসা কবিদের কণ্ঠ, মানুষের কোলাহল আর ধুলোমাখা একুশের আমেজ। সেই প্রতিটি আওয়াজ অর্কর বুকে যেন তীব্র যন্ত্রণার মতো বিঁধছিল।
"হ্যাঁ বাবা অর্ক! কতদূর তুমি? আমাদের ৩৫২ নম্বর স্টলে বই কিন্তু সাজিয়ে ফেলেছি!"
রফিক সাহেবের আনন্দঘন কণ্ঠ ভেসে এলো।
অর্কর গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বের হতে চাইল না। সে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে ভাঙা গলায় বলল,
"আঙ্কেল... দোকানে ম্যাজিস্ট্রেটের রেইড পড়েছে। এমডি কড়া হুমকি দিয়েছে, এক পা নড়লে চাকরি চলে যাবে। আজ প্রথম দিনে আমি আসতে পারছি না আঙ্কেল..."
ওপাশে কয়েক সেকেন্ডের এক গভীর নিস্তব্ধতা নেমে এলো।
তারপর রফিক সাহেব একটুও রাগ বা হতাশা প্রকাশ করলেন না। বরং এক অপার বাবার মতো মায়ায় ভরা কণ্ঠে বললেন,
"কোনো চিন্তা কোরো না বাবা। সংসার আর দায়িত্বের লড়াইটাই তো আসল। আজ প্রথম দিন তো কেবল উদ্বোধন আর নিয়ম রক্ষার দিন, আসল মেলা তো কাল থেকে জমবে। তুমি চাকরিটা সামলাও, আমি আর মন্টু স্টলে আছি। তোমার মনে যেন কোনো কষ্ট না থাকে।"
ফোনটা কেটে গেল।
অর্ক চেয়ারে হেলান দিয়ে মাথাটা পেছনের দিকে এলিয়ে দিল। তার দৃষ্টি গিয়ে আটকে রইল ছাদের সিলিং ফ্যানটার দিকে।
বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে সুপার শপের সামনে এসে থামল দুটি সরকারি গাড়ি।
জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক এবং জেলা প্রশাসনের একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি দল আউটলেটে প্রবেশ করল। সাথে একদল পুলিশ। মুহূর্তের মধ্যে পুরো সুপার শপের সাধারণ ক্রেতা ও কর্মচারীদের মধ্যে একটা চাপা আতঙ্কের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল।
অর্ক তার কেবিন থেকে বের হয়ে মুখে কোনো নার্ভাসনেস না রেখে সোজা এগিয়ে গিয়ে সালাম দিল।
"আসসালামু আলাইকুম স্যার। আমি এই ব্রাঞ্চের ম্যানেজার অর্ক।"
ম্যাজিস্ট্রেট একজন তরুণ কর্মকর্তা। তিনি গম্ভীর গলায় বললেন,
"আমরা চাল, ডাল, বোতলজাত তেল আর প্যাকেটজাত গুঁড়োদুধের এমআরপি এবং এক্সপায়ারি ডেট চেক করবো। সাথে ভ্যাট চালান আর বিএসটিআইয়ের ক্লিয়ারেন্স ফাইল দেখান।"
অর্ক এক মুহূর্তও কালক্ষেপণ না করে ফাইলগুলো প্রস্তুত করে ধরল। ফ্লোরের প্রতিটি র্যাকে গিয়ে ম্যাজিস্ট্রেট নিজে পণ্যের গায়ে লাগানো ডিজিটাল বারকোড এবং মেমো মিলিয়ে দেখলেন।
"আপনার স্টকে কি কোনো রি-লেবেল করা বা মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য আছে?"
ম্যাজিস্ট্রেট পণ্যের গায়ে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করলেন।
"না স্যার,"
অর্ক শান্ত গলায় বলল।
"প্রতিদিন ভোরে আমরা ড্যামেজ অ্যান্ড এক্সপায়ারি লগে প্রতিটি শর্ট-ডেট আইটেম আলাদা করে সেন্ট্রাল ডিপোতে রিটার্ন পাঠিয়ে দিই। এই যে সকালের অডিট শিট আর বিএসটিআই সার্টিফিকেশন।"
ম্যাজিস্ট্রেট ফাইলগুলো পাতা ওল্টালেন। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে চলল চুলচেরা বিশ্লেষণ ওজন মাপার ডিজিটাল স্কেল থেকে শুরু করে কোল্ড স্টোরেজের তাপমাত্রা পর্যন্ত। কিন্তু অর্কর নিখুঁত ব্যবস্থাপনায় কোনো প্রকার ত্রুটি বা গরমিল পাওয়া গেল না।
ম্যাজিস্ট্রেট ফাইলটি বন্ধ করে অর্কর দিকে তাকিয়ে মুখে মৃদু প্রশংসার হাসি টেনে বললেন,
"গুড জব ম্যানেজার সাহেব। ধানমন্ডি এলাকার অনেক বড় বড় আউটলেটে অনিয়ম পেয়ে জরিমানা করতে হয়েছে, কিন্তু আপনার ব্রাঞ্চের কমপ্লায়েন্স আর পেপারওয়ার্ক একদম ট্রান্সপারেন্ট। এভাবেই সততার সাথে কাজ চালিয়ে যাবেন।"
কোনো জরিমানা বা নোটিশ ছাড়াই মোবাইল কোর্টের দল যখন বেরিয়ে গেল, তখন ফ্লোরের অন্যান্য স্টাফ আর তানভীরের মুখে স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল।
কিন্তু অর্কর মাথায় তখন এসবের কোনো কিছুই ছিল না।
কেবিনে ফিরে এসে সে ঘড়ির দিকে তাকাল। ঘড়ির কাঁটায় তখন সন্ধ্যা ঠিক ছয়টা।
হাত-পা ধোয়ার সময়ও সে নিল না। কাঁপাকাঁপা হাতে পকেট থেকে ফোনটা বের করে সরাসরি রফিক সাহেবের নম্বরে ডায়াল করল। প্রতিটি রিং হওয়ার সাথে সাথে তার বুকের ভেতরের হৃৎস্পন্দন যেন কানে এসে বাজছিল।
তৃতীয় রিংয়ে ফোনটা রিসিভ হলো।
"হ্যালো, আঙ্কেল?"
অর্কর গলার স্বর রুদ্ধ হয়ে এলো।
"বইমেলার কী অবস্থা? বই কি... একটাও বিক্রি হয়েছে আঙ্কেল?"
ওপাশ থেকে ভেসে আসছিল মেলা প্রাঙ্গণের কোলাহল, তবে রফিক সাহেবের গলার স্বরে কোনো উচ্ছ্বাস ছিল না। এক গভীর নীরবতা আর তীব্র আক্ষেপ চেপে রাখা কণ্ঠে রফিক সাহেব খুব ধীরে বললেন—
"না বাবা... একটাও না।"
অর্কর মাথার ওপর যেন আস্ত একটা আকাশ ভেঙে পড়ল।
"আমাদের বন্ধু প্রকাশনের পুরনো কিছু কবিতার বই চার-পাঁচটা কপি বিক্রি হয়েছে, তোমার বইটার সামনে অনেকেই এসে দাঁড়িয়েছিল বাবা। অনেকে এত বড় সাইজের বই দেখে হাত দিয়ে উল্টেপাল্টেও দেখেছে। কিন্তু নতুন লেখকের বারোশত পাতার বই দেখে দাম আর অপরিচিত নামের কারণে কেউ শেষ পর্যন্ত কিনে নেয়নি। তবে তুমি একদম আশা হারিও না বাবা, আজ তো মাত্র প্রথম দিন—"
অর্ক আর কথা বাড়াতে পারল না।
"আচ্ছা আঙ্কেল, কাল দুপুরে দেখা হবে,"
বলে সে নিজেই ফোনটা কেটে দিল।
কেবিনের ঠাণ্ডা এসির নিচে বসে অর্ক পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে রইল। তার মাথার ভেতর একটা প্রশ্নই বারবার হাতুড়ির মতো আঘাত করতে লাগল ফেসবুকের সেই তেরো হাজার সাহিত্যপ্রেমী মানুষের মধ্য থেকেও কি একজন মানুষ এলো না? যে পোস্টটাতে হাজার হাজার মানুষ ভালোবাসা প্রকাশ করেছিল, বাস্তবে বইয়ের সেই ভারী মলাটটা ছোঁয়ার জন্য কেউ স্টলের সামনে এসে দাঁড়াল না?
ভার্চুয়াল দুনিয়ার ভালোবাসা আর মাটির পৃথিবীর বাস্তবতার এই বিশাল ফারাকটা তার বুকের ভেতর একটা তীব্র ক্ষত তৈরি করে দিল।
সে ধীরহাতে অর্পিতার ইনবক্সে একটা মেসেজ পাঠাল—
"আমার বাসায় ফিরতে আজ একটু দেরি হবে অর্পিতা। তুমি আর অর্পা সময়মতো খেয়ে নিও।"
তারপর সে কোনো দ্বিধা না করে সরাসরি রাশেদের নম্বরে ডায়াল করল।
ওপাশ থেকে রাশেদ ফোন তুলতেই অর্ক বলল—
"রাশেদ, হাতিরঝিলে আয়। রামপুরা ব্রিজের কোনায়... এখনই।”
রামপুরা ব্রিজের লাগোয়া নিরিবিলি ওয়াকওয়ের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ছিল অর্ক। নিচের কালো জলে ওপারের উঁচু ভবনের লাল-নীল নিয়নবাতির প্রতিচ্ছবি কাঁপছিল। লেকের ওপার থেকে ছুটে আসা হিমেল বাতাস অর্কর বুক চিরে বেরিয়ে যাওয়া দীর্ঘশ্বাসগুলোকে আরও ভারী করে তুলছিল।
মিনিট দশেকের মধ্যে ভিড় ঠেলে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো রাশেদ। তার গায়ে অফিসের খয়েরি রঙের জ্যাকেটটা আধখোলা, কপালে হালকা ঘাম।
"অর্ক! কী হয়েছে রে?"
রাশেদ হাঁপাতে হাঁপাতে এসে অর্কর কাঁধে হাত রাখল।
"ফোনে তোর এমন গলা শুনে অফিস থেকে এক দৌড়ে আসলাম। কোনো সমস্যা হয়েছে?"
অর্ক রেলিং থেকে মুখ তুলে তাকাল। তার চোখের দৃষ্টিতে ছিল এক সীমাহীন শূন্যতা।
"রাশেদ..."
অর্কর কণ্ঠ এমনভাবে ভেঙে এলো যেন তার ভেতরের সমস্ত শক্তি এক নিমেষে নিভে গেছে।
"কী হয়েছে বলবি তো?"
রাশেদ চিন্তিত মুখে এগিয়ে এলো।
অর্ক আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।
সে দুই হাতে মুখ ঢেকে ঠিক ছোট বাচ্চাদের মতো ডুকরে কেঁদে উঠল। তার পুরো শরীরটা কান্নার তীব্রতায় থরথর করে কাঁপছিল। রেলিং আঁকড়ে ধরে সে যেন এক নিঃস্ব ভিখারির মতো কাঁদছিল।
রাশেদ চমকে উঠে অর্ককে শক্ত করে ধরল।
"অর্ক! কী করছিস? কাঁদছিস কেন রে ভাই?"
"একটা বইও বিক্রি হয়নি রে রাশেদ... একটাও না!"
অর্ক রাশেদের জ্যাকেট খামচে ধরে ফুঁপিয়ে উঠল।
"রফিক আঙ্কেল ফোন দিয়ে বলল, সারাদিনে একটা মানুষও বইটা কিনে নেয়নি। আমার ওই ফেসবুকের তেরো হাজার ফলোয়ার, ওই হাজার হাজার লাইক আর কমেন্ট সব মিথ্যা! সব মরীচিকা! কেউ এক পা হেঁটে স্টলে এসে আমার বারোশত পাতার বই ছুঁয়েও দেখল না!"
"যে বৃদ্ধ মানুষটা আমার লেখার ওপর বিশ্বাস করে গ্রামে নিজের শেষ সম্বল ভিটেমাটিটুকু বন্ধক রেখে দিল... আমি কীভাবে তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়াব রে? কাল সকালে আমি কোন মুখে তাঁর চোখের দিকে তাকাব? আমার এই অহংকার আর স্বপ্নের জন্য আমি একটা মানুষকে নিঃস্ব করে পথে বসিয়ে দিলাম!"
রাশেদ কোনো কথা বলল না। সে শুধু অর্ককে বুকের সাথে আরও শক্ত করে চেপে ধরে দাঁড়িয়ে রইল।
কিছুক্ষণ পর কান্নার বেগ একটু কমে এলে রাশেদ তাকে ধরে ওয়াকওয়ের একটা সিমেন্টের বেঞ্চে এনে বসাল।
রাস্তার পাশের ভ্রাম্যমাণ চা-ওয়ালার কাছ থেকে দুটো প্লাস্টিকের কাপে ধোঁয়া ওঠা গরম আদা-চা এনে একটা অর্কর কাঁপতে থাকা হাতের তালুতে গুঁজে দিল।
"কেঁদে নিয়েছিস?"
রাশেদের কণ্ঠ শান্ত কিন্তু অসম্ভব গভীর শোনাল।
"ভেতরের বিষটা নেমেছে?"
অর্ক মাথা নিচু করে চায়ের কাপের দিকে চেয়ে রইল।
"অর্ক, শোন,"
রাশেদ চায়ের কাপে একটা চুমুক দিয়ে বলল।
"বইমেলা আটাশ দিনের একটা দীর্ঘ পথ। আজকের দিনটা ছিল উদ্বোধনের দিন। প্রধানমন্ত্রী, ভিআইপি আর ক্যামেরার ভিড় ছাড়া প্রথম দিন বইমেলায় আসল পাঠকরা ঢুকতেই পারে না। একুশে বইমেলার আসল গতি শুরু হয় প্রথম শুক্রবারের পর থেকে।"
রাশেদ অর্কর চোখের দিকে চোখ রাখল।
"আর তুই ফেসবুকের লাইক কমেন্টের কথা বলছিস? সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষ একটা আঙুলের স্পর্শে ভালোবাসা জানায়, কিন্তু সেই ভালোবাসাকে পকেটের টাকায় রূপান্তর করে মেলায় নিয়ে আসা সহজ কথা নয়। তোর বইটা ১২০০ পাতার এক গম্ভীর মহাকাব্য, এটা কোনো প্রেমের সস্তা উপন্যাস নয় যে প্রথম দিনেই হুড়মুড় করে লাইন লাগবে। আসল সাহিত্য মাটির ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে শিকড় ছড়ায় অর্ক। একজন প্রকৃত পাঠক যখন এই বইটা পড়বে, সে গিয়ে আরও দশজনকে বলবে। এই মুখে মুখের প্রচারই তোর বইকে বাঁচিয়ে রাখবে।"
অর্ক চোখ তুলে রাশেদের মুখের দিকে তাকাল।
"তোর মনে আছে?"
রাশেদ একটু হাসল,
"যেদিন মোতালেব ভাই মেসের করিডোরে তোকে ভিখারির মতো অপমান করছিল, সেদিন তুই কি ভেবেছিলি আজ তুই ত্রিশ হাজার টাকার ম্যানেজার হবি? অর্পিতার মতো মেয়ে তোর ঘরে আসবে? যে ছেলেটা শূন্য থেকে এতদূর লড়াই করে আসতে পারে, সে মেলা শুরুর প্রথম দিনেই হেরে যাওয়ার নাটক করতে পারে না।"
রাশেদ অর্কর কাঁধে একটা জোরদার চাপ দিল।
"কাল দুপুর দুইটায় তুই স্টলে যাবি। বুক ফুলিয়ে রফিক আঙ্কেলের পাশে গিয়ে দাঁড়াবি। আমি আর অর্পিতা তোর পাশে আছি। যতদিন এই বইয়ের শেষ পাতাটা একজন মানুষও পড়বে, ততদিন তুই পরাজিত নোস অর্ক।"
হাতিরঝিলের ওপর দিয়ে ঠান্ডা বাতাস বয়ে গেল। লেকের জলে আলোছায়ার খেলা তখন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।
অর্ক চায়ের শেষ চুমুকটা দিয়ে চোখ মুছল। রাশেদের এই কয়েকটা সাধারণ কথা যেন তার রক্তে আবার সেই পুরনো জেদটাকে ফিরিয়ে এনে দিল।
রাত তখন ঠিক নয়টা।
চারতলার ফ্ল্যাটের দরজায় যখন অর্কর হাত পড়ল, তখন তার পুরো শরীর যেন ক্লান্তির ভারে নুয়ে পড়েছে।
দরজাটা খুলতেই সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল অর্পিতাকে। তার হাতে ধরা ফোন, চোখেমুখে স্পষ্ট উদ্বেগ আর চাপা ক্ষোভ।
"কোথায় ছিলে তুমি এতক্ষণ?"
অর্পিতা দরজার সামনে দাঁড়িয়েই একটু উঁচু গলায় বকুনি দিয়ে উঠল।
"সেই দুপুর থেকে ফোন দিচ্ছি, একবারের জন্যও ফোন ধরলে না কেন? তুমি তো টেক্সট দিয়েছিলে সুপার শপ থেকে বের হতে পারছ না, মেলাতেও গেলে না... তাহলে এই রাত নয়টা পর্যন্ত কোথায় ছিলে?"
অর্ক দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু ক্লান্ত চোখে অর্পিতার দিকে তাকিয়ে রইল।
ড্রয়িংরুমের উজ্জ্বল সাদা টিউবলাইটের আলো এসে পড়ল অর্কর মুখের ওপর।
অর্পিতার কথাগুলো মুহূর্তের মধ্যে মাঝপথেই থেমে গেল। সে স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইল অর্কর মুখের দিকে।
অর্কর চোখের পাতাগুলো ফুলে লাল হয়ে উঠেছে, চোখের নিচে কালচে ছোপ আর সারা মুখে এক গভীর ক্লান্তির ছাপ। এই মানুষটা যে কিছুক্ষণ আগেই কোনো এক নির্জন জায়গায় বসে অঝোরে কেঁদে নিজের সমস্ত অশ্রু নিঃশেষ করে এসেছে, তা বুঝতে অর্পিতার এক সেকেন্ডও সময় লাগল না।
অর্পিতার ক্ষোভ আর রাগ এক লহমায় উবে গিয়ে এক অদ্ভুত হাহাকারে রূপ নিল।
তার গলার স্বর হঠাৎ একদম নরম হয়ে এলো।
"অর্ক? কী হয়েছে তোমার?"
অর্ক কোনো কথা বলল না।
সে এক পা এগিয়ে এসে অর্পিতাকে আলতো করে জড়িয়ে ধরল। নিজের মুখটা গুঁজে দিল অর্পিতার কাঁধের কাছে।
তার চোখ দিয়ে এখন আর পানি এলো না। কান্না আসছিল ঠিকই, কিন্তু চোখের নোনা পানি হয়তো কিছুক্ষণ আগেই হাতিরঝিলের হিমেল বাতাসে রাশেদের বুকে সবটুকু ঢেলে শেষ হয়ে গেছে। এখন ভেতরে শুধু পড়ে আছে এক শুষ্ক, অসাড় যন্ত্রণা।
অর্ক খুব নিচু, কাঁপাকাঁপা এক শুকনো ফিসফিসানিতে বলল—
"বই একটাও বিক্রি হয়নি, অর্পিতা..."
ঘরের ভেতর যেন এক মুহূর্তের জন্য পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল থেমে গেল।
অর্পিতা কোনো প্রশ্ন করল না, কোনো সান্ত্বনার বড় বড় বুলি আওড়াল না। সে শুধু দুই হাতে অর্কর পিঠটা পরম মমতায় জড়িয়ে ধরল।
সে ধীরে ধীরে অর্কর পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল, যেন কোনো ছোট্ট আহত শিশুকে পরম যত্নে আগলে রাখছে । অর্পিতার নিজের চোখের কোণেও এক ফোঁটা পানি চিকচিক করে উঠল, কিন্তু সে নিজেকে একদম শান্ত রাখল।
সে অর্কর কাঁধ থেকে আলতো করে মুখ তুলে তার নোনা পানি শুকিয়ে যাওয়া গালের ওপর পরম ভালোবাসায় একটা চুমু এঁকে দিল।
"সব ঠিক হয়ে যাবে অর্ক,"
অর্পিতা তার কানের কাছে খুব শান্ত সুরে বলল।
"এটা তো কেবল শুরু। মাত্র একটা দিন গেল। আমি তো ওই বারোশত পাতা পড়েছি অর্ক, আমি জানি তুমি কী লিখেছ। পৃথিবী আজ না বুঝুক, কাল ঠিকই বুঝবে। এই পুরো শহর যদি মুখ ফিরিয়েও নেয়, আমি তো তোমার পাশে আছি। সারাজীবন থাকব।"
দোসরা ফেব্রুয়ারির দুপুর আড়াইটায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বইমেলা প্রাঙ্গণে পা রাখল অর্ক।
গ্রিন রোডের সুপার শপের সকালের সব শিফটের কাজ নিখুঁতভাবে শেষ করে, দুপুরের চড়া রোদ আর ফার্মগেটের জ্যাম পেরিয়ে সে যখন মেলায় ঢুকল, তখন মেলা প্রাঙ্গণে সবেমাত্র মানুষের পদচারণা শুরু হয়েছে। বাতাসে নতুন বইয়ের কালির গন্ধ আর মেলার ভেজা ধুলোর চেনা সুবাস।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের এক কোণে, মেহগনি গাছের ছায়ায় ৩৫২ নম্বর স্টল—
"বন্ধু প্রকাশন"
স্টলের সামনে দাঁড়াতেই দেখা গেল রফিক সাহেব পরম মমতায় বুকশেলফে নতুন বইগুলো সাজাচ্ছেন। অর্ককে দেখেই তিনি চওড়া একটা হাসি দিলেন, কালকের শূন্য বিক্রির কোনো হতাশার ছিটেফোঁটাও তাঁর মুখে নেই।
"এসো বাবা,"
রফিক সাহেব নিজের পাশের কাঠের টুলটা এগিয়ে দিলেন।
"তোমার জন্য মন্টুকে দিয়ে এখনই গরম চা আনিয়েছি।"
অর্ক স্টলের কাউন্টারের পেছনে গিয়ে বসল।
সামনে রাখা দুটি কালো আর গাঢ় লাল রঙের চকচকে ভলিউম—
"শেষ মানুষটির ডায়েরি"
বিকেল তিনটার পর থেকে মেলায় মানুষের আনাগোনা বাড়তে লাগল। কেউ কেউ হাঁটতে হাঁটতে বন্ধু প্রকাশনের সাধারণ স্টলটার সামনে এসে দাঁড়াচ্ছিল। অর্ক অত্যন্ত বিনয়ের সাথে তাদের দিকে চেয়ে নিজের বইটি মেলে ধরছিল।
"বারোশত পাতার সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার... দুই খণ্ডে সমাপ্ত।"
পাঠকরা কৌতূহল নিয়ে বইটি হাতে তুলে নিচ্ছিল। মলাটের নিখুঁত ফিনিশিং আর লেখার প্রথম কয়েকটা প্যারাগ্রাফে চোখ বুলিয়ে অনেকেই বলছিল,
"বাহ, কভার আর বাঁধাই তো খুব চমৎকার!"
কিন্তু যখনই লেখকের নামের জায়গায়
"অর্ক আহমেদ"
আর বারোশত পাতার সুবিশাল আকার দেখত, তখনই একটা দ্বিধা এসে তাদের চোখেমুখে ভর করত। নতুন লেখকের ওপর এত বড় ঝুঁকি নেওয়ার সাহস এই শহরের পাঠকদের খুব কম। নিঃশব্দে বইটি টেবিলের ওপর নামিয়ে রেখে তারা অন্য স্টলের দিকে পা বাড়াচ্ছিল।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে গেল, কিন্তু একটা কপিও বিক্রি হলো না।
মন্টু প্লাস্টিকের কাপে লাল চা এনে দিল। অর্ক কোনো কথা না বলে চায়ের কাপে চুমুক দিল। বুকের ভেতর একটা চাপা চিনচিনে ব্যথা হচ্ছিল, কিন্তু সে মুখে কোনো হতাশার ছাপ পড়তে দিল না।
বিকেল সাড়ে চারটার দিকে হঠাৎ পুরো মেলা প্রাঙ্গণে এক অদ্ভুত শোরগোল আর চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ল।
বন্ধু প্রকাশনের ঠিক উল্টো পাশের চত্বরে দাঁড়িয়ে থাকা এক বিশাল, জমকালো প্যাভিলিয়নের সামনে শত শত মানুষের ভিড় জমতে শুরু করেছে। তরুণ-তরুণী, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের হাতে বইয়ের স্তূপ। ক্যামেরা আর মোবাইলের ফ্ল্যাশ লাইটের আলোয় চারপাশ ঝলমল করে উঠল।
বিখ্যাত লেখক ইশরাক আহমেদ তাঁর প্রকাশনীর স্টলে এসে উপস্থিত হয়েছেন।
অর্ক নিজের স্টলের কাঠের টুলে বসে অপলক দৃষ্টিতে সেই দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে রইল। শত শত ভক্ত তাঁকে ঘিরে ধরে অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য আকুল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ মোবাইল উঁচিয়ে সেলফি তুলছে, কেউ পরম শ্রদ্ধায় হাত মেলাচ্ছে। পুরো স্টলটার চারপাশ ঘিরে তৈরি হয়েছে এক উৎসবমুখর আমেজ।
ইশরাক আহমেদের লেখার সাথে অর্কর পরিচয় অনেক পুরনো। মেসের সেই ছোট চিলেকোঠার নির্ঘুম রাতে, যখন তার নিজের জীবনে শুধুই অন্ধকার ছিল, তখন সে নীলক্ষেতের ফুটপাত থেকে পুরনো বই কিনে এনে ইশরাক আহমেদের গল্পগুলো পড়ত। মানুষের গভীর মনস্তত্ত্ব, আবেগের সূক্ষ্ম প্রকাশ আর সমাজের মাটির গল্পগুলো যেভাবে তিনি ফুটিয়ে তোলেন, তা অর্কর মনে গভীর শ্রদ্ধার জন্ম দিয়েছিল।
অর্কর বুকের ভেতর থেকে একটা মৃদু ইচ্ছা উঁকি দিল একবার গিয়ে তাঁর সাথে দেখা করবে নাকি? নিজের এই বারোশত পাতার বইটা একবার তাঁর হাতে তুলে দিয়ে বলবে,
“স্যার, আমিও লেখার চেষ্টা করেছি...”
কিন্তু অর্ক পারল না।
সামনের সেই উপচে পড়া ভিড়, দামি ক্যামেরার ঝলকানি আর নিজের এই শূন্য খাতার ব্যর্থতার মাঝে দাঁড়িয়ে তার পা দুটো যেন মাটিতে জমে গেল। একজন প্রতিষ্ঠিত, খ্যাতিমান লেখকের সেই আলোর বৃত্তের সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর মতো সাহস এই নিঃস্ব মুহূর্তে তার ভেতর থেকে এলো না।
মেলার আকাশ জুড়ে তখন সন্ধ্যার মায়াবী অন্ধকার নামতে শুরু করেছে। স্টলের হলুদ বাতিগুলো একে একে জ্বলে উঠছিল।
ওপাশের আলো ঝলমলে প্যাভিলিয়নের দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে অর্ক চায়ের শেষ চুমুকটা দিল।
মিনিট ত্রিশেক পরের কথা।
মেলা প্রাঙ্গণে তখন সন্ধ্যার হিমেল হাওয়া বইতে শুরু করেছে। ভোর পাঁচটায় ঘুম থেকে ওঠা, সারাদিন সুপার শপের হাড়ভাঙা দায়িত্ব আর সেই সাথে মনের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ক্রমাগত মানসিক ধকল সব মিলিয়ে অর্কর শরীর ভেঙে আসছিল। ক্লান্তিতে তার চোখের পাতা ভারী হয়ে এলো। সে কাঠের টেবিলের ওপর দুই হাত বিছিয়ে তার ওপর মাথা রেখে একটু চোখ বুপানি ।
হঠাৎ তার কাঁধের ওপর একটা নরম, হাতের আলতো স্পর্শ পড়ল।
অর্ক চমকে চোখ মেলে মুখ তুলল।
সামনে দাঁড়িয়ে অর্পিতা। পরনে তার হালকা ছাই রঙের একটা সুতির শাড়ি, গায়ে চাদর জড়ানো, চোখে সেই চেনা চশমাটা। অর্কর পাশে এসে দাঁড়ানোর জন্যই সে আজ তেজগাঁওয়ের অফিস থেকে হাফ-ডে ছুটি নিয়েছিল। দুপুরে বাসায় ফিরে নিজের হাতে রান্না করে গরম গরম খাবার টিফিনে ভরে সে সোজা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে চলে এসেছে। মুখে একটু ক্লান্তির ছাপ থাকলেও অর্কর দিকে তাকিয়ে তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক অপূর্ব হাসি।
"ক্লান্ত হয়ে পড়েছ?"
অর্পিতা খুব নরম গলায় জিজ্ঞেস করল।
অর্ক যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। সে একটু অপ্রস্তুত হয়ে সোজা হয়ে বসল।
"তুমি এখানে? অফিস তো ছুটি হওয়ার কথা সন্ধ্যায়!"
"তোমার জন্য আজ হাফ-ডে ছুটি নিলাম,"
অর্পিতা স্টলের পেছনের ছোট কাঠের দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। অর্কর পাশের কাঠের টুলটা টেনে বসে সে কাঁধ থেকে কাপড়ের বড় ব্যাগটা নামিয়ে রাখল।
"জানি তো তুমি না খেয়ে মেলায় এসে বসে থাকবে। তাই বাসায় গিয়ে একটু ভাত-তরকারি রান্না করে নিয়ে এলাম।"
ব্যাগ থেকে বের হলো একটি তিন বাটির স্টিলের টিফিন ক্যারিয়ার আর পানির বোতল। ঢাকনা খুলতেই ধোঁয়া ওঠা গরম ভাতের সুবাস আর সরিষার তেলে ভাজা ডিম-ভুনার এক চেনা ঘরোয়া ঘ্রাণ স্টলের ছোট চারকোণা জায়গাটায় ছড়িয়ে পড়ল।
"দুপুর থেকে কিছু খাওনি, আমি জানি,"
অর্পিতা হাত বাড়িয়ে ভাত আর ডিম মাখতে মাখতে বলল।
"শরীর খারাপ করলে চলবে কীভাবে?"
অর্ক হাত বাড়াতে গেল, কিন্তু অর্পিতা তাকে আলতো করে থামিয়ে দিল। সে নিজের হাতে এক লোকমা ভাত মেখে পরম যত্নে অর্কর মুখের সামনে তুলে ধরল।
"রফিক আঙ্কেল আর মন্টু কোথায়?"
অর্পিতা পানির বোতলটা এগিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করল।
অর্ক এক ঢোক পানি খেয়ে সামনের আলো ঝলমলে প্যাভিলিয়নটার দিকে ইশারা করল।
"ওপাশে গেছে।"
অর্পিতা চোখ তুলে তাকাল। ওপাশের বিশাল স্টলটাকে ঘিরে তখনো শত শত তরুণ-তরুণীর উপচে পড়া ভিড়, ক্যামেরার ঝলকানি আর ভক্তদের উল্লাস।
"ওখানে এত ভিড় কিসের ?"
অর্পিতা একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
"বিখ্যাত লেখক ইশরাক আহমেদ,"
অর্ক শান্ত গলায় ব্যাখ্যা করল।
"উনার লেখার জন্য পাঠকরা এভাবে পাগল হয়ে থাকে। আর রফিক আঙ্কেলের বন্ধু প্রকাশন যখন অনেক বছর আগে ভালো অবস্থায় ছিল, তখন উনার শুরুর দিকের একটা গল্পের বই নাকি এই প্রকাশনী থেকেও বের হয়েছিল। অনেক পুরনো স্মৃতি আঙ্কেলের, তাই দেখা করতে গেছেন।"
অর্পিতা ওপাশের সেই বিপুল আলোর বৃত্তটার দিকে কিছুক্ষণ অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
"একদিন তোমার স্টলের সামনেও এমন ভিড় হবে অর্ক,আজ হয়তো কেউ দেখছে না, কিন্তু যেদিন দেখবে, সেদিন এই মেলা তোমার আলোতেই ভরে উঠবে।"
খাওয়া শেষ হতেই পানির বোতল থেকে পানি ঢেলে অর্পিতা নিজের হাত ধুয়ে নিল। তারপর আঁচল দিয়ে হাত মুছে পরম মায়ায় একটি নরম রুমাল ভিজিয়ে আলতো করে মুছে দিল অর্কর মুখ আর চোখের নিচের ঘাম।
টিফিন ক্যারিয়ারের বাটিগুলো ব্যাগে ভরতে ভরতে দেখা গেল ভিড় ঠেলে স্টলে ফিরে আসছেন রফিক সাহেব আর মন্টু। রফিক সাহেবের মুখে তখন একরাশ ক্লান্তি আর স্পষ্ট হতাশার ছায়া।
"দেখা হলো না বাবা,"
রফিক সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্টলের ভেতরে এসে টুলে বসলেন।
"যে পরিমাণ ভিড় আর বডিগার্ডের কড়াকড়ি, সামনে যাওয়ার কোনো উপায়ই ছিল না। কত বছর আগের পরিচয়... উনি হয়তো আর মনেও রাখেননি।"
অর্ক সান্ত্বনা দেওয়ার সুরে কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তখনই বাইরের মূল রাস্তায় এক অদ্ভুত হইচই আর শোরগোল পড়ে গেল।
প্যাভিলিয়নের দিক থেকে ভিড়টা ধীরে ধীরে প্রধান গেটের দিকে এগোচ্ছে। বডিগার্ডদের কড়া বেষ্টনীর মাঝে হেঁটে আসছেন লেখক ইশরাক আহমেদ। মেলা প্রাঙ্গণ ছাড়ার জন্য তিনি ভিআইপি গেটের দিকে যাচ্ছেন। তাঁর চারপাশে ভক্তদের ক্যামেরার অবিরাম ফ্ল্যাশ আর শত শত মানুষের কোলাহল।
জনস্রোতটা যখন ঠিক ৩৫২ নম্বর স্টলের সামনের সরু রাস্তাটা পার হচ্ছিল, তখনই হঠাৎ এক অভাবনীয় ঘটনা ঘটল।
ইশরাক আহমেদ হঠাৎ চলার গতি থামিয়ে দিলেন।
কী মনে করে যেন তাঁর চোখ গেল এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা এই ছোট, জীর্ণ স্টলটার পেতলের পুরনো সাইনবোর্ডটার দিকে—
"বন্ধু প্রকাশন"
তিনি কয়েক সেকেন্ড স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বডিগার্ডদের একপাশে সরে যাওয়ার ইশারা করে, নিজের স্বতঃস্ফূর্ত পায়ে ভিড় ঠেলে সরাসরি এগিয়ে এলেন বন্ধু প্রকাশনের কাউন্টারের সামনে।
রফিক সাহেব নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তিনি স্তম্ভিত হয়ে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন।
ইশরাক আহমেদ কোনো দূরত্ব না রেখে কাঠের কাউন্টার ডিঙিয়ে রফিক সাহেবকে জড়িয়ে ধরলেন। তাঁর মুখে এক অনাবিল, পুরনো দিনের আন্তরিক হাসি।
"রফিক ভাই! কেমন আছেন আপনি?"
ইশরাক আহমেদের কণ্ঠটা ছিল অদ্ভুত রকম বিনয়ী আর উষ্ণ।
"কত বছর পর আপনার সাথে দেখা! সেই বাংলাবাজারের দিনগুলোর কথা আমার আজও মনে পড়ে।"
রফিক সাহেবের চোখের কোণায় মুহূর্তের মধ্যে পানি চিকচিক করে উঠল।
"আমি ভালো আছি ইশরাক... তুমি অনেক বড় হয়েছ বাবা। অনেক দোয়া তোমার জন্য।"
কথা বলতে বলতেই হঠাৎ ইশরাক আহমেদের তীক্ষ্ণ সাহিত্যিক চোখ গিয়ে পড়ল কাউন্টারের ওপর সাজিয়ে রাখা কালো আর গাঢ় লাল রঙের সেই সুবিশাল দুই খণ্ডের বইটির ওপর।
"শেষ মানুষটির ডায়েরি"
বারোশত পাতার এমন আভিজাত্যপূর্ণ আর ভারী ভলিউম দেখে তিনি কৌতূহল সংবরণ করতে পারলেন না। তিনি হাত বাড়িয়ে বইটি নিজের হাতে তুলে নিলেন।
চারপাশের মেলার সমস্ত কোলাহল, বডিগার্ডদের ব্যস্ততা আর ক্যামেরার ফ্ল্যাশ যেন এক নিমেষে ইশরাক আহমেদের কাছে মিলিয়ে গেল।
তিনি বইটির প্রথম খণ্ডটা খুলে প্রথম পাতার পাতায় চোখ রাখলেন।
এক পাতা... দুই পাতা... তিন পাতা।
ইশরাক আহমেদের কপালের রেখাগুলো ধীরে ধীরে গভীর হতে লাগল। চোখের পাতায় ফুটে উঠল এক তীব্র বিস্ময়, এক অভাবনীয় মুগ্ধতা। তিনি পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে যেন ডুবে গেলেন সেই ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে থাকা জগতের ভেতরে।
মিনিট পাঁচেক পর তিনি খুব সাবধানে, গভীর এক শ্রদ্ধায় বইটি আলতো করে বন্ধ করলেন।
তিনি রফিক সাহেবের চোখের দিকে তাকালেন। তাঁর কণ্ঠে তখন এক অদ্ভুত বিস্ময় আর রুদ্ধশ্বাস জিজ্ঞাসা—
"রফিক ভাই... এই অসাধারণ মহাকাব্য কে লিখেছে?"
রফিক সাহেবের বুকটা যেন এক মুহূর্তে গর্বে ফুলে উঠল। তিনি মুখে কোনো কথা বললেন না।
তিনি শুধু তাঁর ডান হাতটা তুলে কাউন্টারের এক কোণে অর্পিতার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অর্কর দিকে ইশারা করলেন।
রফিক সাহেবের আঙুলের ইশারা অনুসরণ করে ইশরাক আহমেদ চোখ ফেরালেন।
কাউন্টারের এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল অর্ক। পরনে সাধারণ নীল শার্ট, গায়ে মেলার ধুলোমাখা ক্লান্তি, কিন্তু চোখের ভেতর এক অদ্ভুত গভীরতা আর বিনম্র সম্ভ্রম।
ইশরাক আহমেদ এক পা এগিয়ে এলেন। তিনি অর্কর চোখের দিকে তাকিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলেন। তাঁর মুখে ফুটে উঠল এক অকৃত্রিম শ্রদ্ধা।
"আপনি লিখেছেন এটা?"
ইশরাক আহমেদের কণ্ঠটা ছিল আশ্চর্যরকম আন্তরিক।
অর্ক কাঁপাকাঁপা হাতে সেই বিখ্যাত লেখকের হাতটা স্পর্শ করল।
"জি স্যার... আমি অর্ক আহমেদ।"
"অসাধারণ!"
ইশরাক আহমেদ এক মুহূর্তের জন্যও হাত ছাড়লেন না।
"শুরুর ওই তিনটে পাতার টানাপোড়েন আর বাক্যগঠন পড়তে পড়তে আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল। এত বড় পরিসরে মানুষের ভেতরের হাহাকার আর দর্শনকে ফুটিয়ে তোলার সাহস এই সময়ে খুব কম লেখকের থাকে। আপনার লেখার মধ্যে এক অদ্ভুত নিজস্ব স্বর আছে, অর্ক।"
অর্কর বুকের ভেতরটা তখন আবেগের তীব্রতায় তোলপাড় করছিল। এত বড় একজন কথাসাহিত্যিকের মুখ থেকে এমন নির্ভেজাল প্রশংসা শুনে তার চোখ দুটো জলে ভিজে এলো।
ইশরাক আহমেদের নজর এবার গেল অর্কর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অর্পিতার দিকে। অর্পিতার চশমার কাঁচের ওপাশে চোখ দুটো তখন গর্ব আর আনন্দের অশ্রুতে চিকচিক করছিল।
ইশরাক আহমেদ মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করলেন,
"আর আপনি?"
অর্পিতা একটু সামনে এসে আঁচলটা ঠিক করে বিনীত গলায় বলল,
"আমি অর্পিতা... অর্কর স্ত্রী।"
অর্ক সঙ্গে সঙ্গে যোগ করল,
"স্যার, আমার এই বারোশত পাতার প্রতিটি শব্দের পেছনে উনার রক্ত আর বিশ্বাস জড়িয়ে আছে। উনি পাশে না থাকলে এই বই কোনোদিন আলোর মুখ দেখত না।"
ইশরাক আহমেদ মুগ্ধ হয়ে দুজনের দিকে তাকালেন।
"তাহলে তো এই মহাকাব্যের আসল রূপকার আপনিই, অর্পিতা!"
তিনি নিচু গলায় আবার বললেন,
"রফিক ভাই, কত কপি বিক্রি হয়েছে ?”
রফিক সাহেব নিচু গলায় বললেন
“এক কপিও না বাবা”
তিনি আর এক সেকেন্ডও দেরি করলেন না। পকেট থেকে চামড়ার মানিব্যাগ বের করে বইয়ের নির্ধারিত মূল্যের চেয়েও বেশি কয়েকটি চকচকে নোট রফিক সাহেবের হাতে তুলে দিলেন।
"রফিক ভাই, এই বইয়ের প্রথম কপিটা আমি নিজে কিনলাম,"
ইশরাক আহমেদ বইয়ের প্রথম ভলিউমটা অর্কর দিকে বাড়িয়ে দিলেন।
"প্রথম পাতায় আপনার একটা অটোগ্রাফ দিন তো অর্ক।"
অর্কর হাত কাঁপছিল। সে ড্রয়ার থেকে একটা বলপেন নিয়ে কাঁপাকাঁপা হরফে প্রথম পাতায় লিখে দিল—
"শ্রদ্ধেয় ইশরাক আহমেদ স্যার এর হাতে, আমার প্রথম সৃষ্টির প্রথম স্পন্দন।"
ততক্ষণে বাইরে এক অভাবনীয় দৃশ্য তৈরি হয়ে গেছে।
ইশরাক আহমেদকে একটি ছোট সাধারণ স্টলে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চারপাশের জাতীয় দৈনিক আর টেলিভিশন চ্যানেলের সাংবাদিক, সাহিত্য পাতার রিপোর্টার আর শত শত উৎসুক পাঠক ভিড় জমিয়ে ফেলেছে। ক্যামেরার একটানা ক্লিক আর ফ্ল্যাশ লাইটের তীব্র আলোয় ৩৫২ নম্বর স্টলটা এক লহমায় আলোকিত হয়ে উঠল।
ইশরাক আহমেদ বইটি দুই হাতে বুকের সামনে তুলে ধরে অর্ক, অর্পিতা আর রফিক সাহেবকে নিয়ে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালেন।
সাংবাদিকদের বুম আর মাইক্রোফোনগুলো যখন তাঁর মুখের সামনে এগিয়ে এলো, তখন ইশরাক আহমেদ খুব স্পষ্ট, গম্ভীর কণ্ঠে বললেন—
"এইবারের বইমেলায় হাজার হাজার বইয়ের ভিড়ে যদি আপনারা সত্যিকারের শক্তিশালী সাহিত্যের খোঁজ করতে চান, তবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ৩৫২ নম্বর "বন্ধু প্রকাশন"-এর এই "শেষ মানুষটির ডায়েরি"
আপনাদের পড়তেই হবে। একজন তরুণ লেখক এত গভীর দর্শন আর শিল্প নিয়ে লিখতে পারেন, তা এই বারোশত পাতা না পড়লে বিশ্বাস করা যায় না। আমি সকল প্রকৃত সাহিত্যপ্রেমীকে অনুরোধ করবো, এই স্টলে আসুন এবং অর্ক আহমেদের এই অসাধারণ সৃষ্টিকে ধারণ করুন।"
পুরো চত্বর জুড়ে উপস্থিত পাঠকদের মধ্যে এক তীব্র গুঞ্জন আর করতালি ছড়িয়ে পড়ল।
রফিক সাহেব তখন আর নিজের চোখের পানি ধরে রাখতে পারছিলেন না। তিনি হাতজোড় করে কাঁপতে কাঁপতে বললেন,
"ইশরাক... তুমি আমাদের যে উপকার করলে, এই ঋণ আমি সারাজীবনেও শোধ করতে পারব না বাবা!"
ইশরাক আহমেদ দ্রুত এগিয়ে এসে রফিক সাহেবের হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় চেপে ধরলেন।
"এমন কথা বলে আমাকে ছোট করবেন না রফিক ভাই,"
ইশরাক আহমেদ মায়াবী গলায় বললেন।
"লেখাটা আসলেই অসাধারণ, এখানে আমার কোনো দয়া নেই। আর আপনার সাথে আমার সম্পর্ক তো আজকের নয়। আমার প্রথম দিকের লড়াইয়ের দিনে এই বন্ধু প্রকাশন আমাকে যে ছায়া দিয়েছিল, সেই ঋণ আমি কোনোদিন ভুলিনি।"
ইশরাক আহমেদ নিজের পকেট থেকে একটি সাদা ভিজিটিং কার্ড বের করে রফিক সাহেবের পাঞ্জাবির পকেটে গুঁজে দিলেন।
"এটা আমার ব্যক্তিগত নম্বর রফিক ভাই। নিজের কাছে রাখবেন। যেকোনো সময়, যেকোনো প্রয়োজনে সরাসরি আমাকে ফোন দেবেন।"
ইশরাক আহমেদ অর্কর কাঁধে আরও একবার পরম স্নেহের চাপ দিয়ে হাসলেন। তারপর সাংবাদিকদের ভিড় আর দেহরক্ষীদের নিয়ে ধীরপায়ে মেলা প্রাঙ্গণের বাইরে চলে গেলেন।
রাত তখন ঠিক নয়টা।
বাংলা একাডেমির তথ্যকেন্দ্রের মাইক থেকে ভেসে এলো আজকের মতো বইমেলার সমাপ্তির চেনা ঘোষণা। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কোলাহল ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসছে, স্টলগুলোতে কর্মীরা নীল রঙের ত্রিপল টেনে বইয়ের তাকগুলো ঢেকে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
বন্ধু প্রকাশন এর ছোট কাঠের স্টলটার ভেতর তখনো একটা নরম হলুদ বাতি জ্বলছিল।
ইশরাক আহমেদের সেই অভাবনীয় প্রশংসার পর পুরো সন্ধ্যাটা কেটেছিল এক অবিশ্বাস্য ঘোরের মধ্যে। একের পর এক কৌতূহলী পাঠক এসে দাঁড়িয়েছে স্টলের সামনে। কেউ সাংবাদিকের রিপোর্ট দেখে ছুটে এসেছে, কেউ সরাসরি ইশরাক আহমেদের ফেসবুক পোস্ট দেখে এসেছে। বারোশত পাতার সেই ভারী বইয়ের পাতা উল্টে মুগ্ধ হয়ে একে একে পাঠকরা বই কিনে নিয়ে গেছে।
রফিক সাহেব কাঠের ক্যাশ ড্রয়ার থেকে নোটের বান্ডিলগুলো বের করে টেবিলের ওপর রাখলেন। তিনি কাঁপাকাঁপা আঙুলে খাতার পাতায় আজকের বিক্রির হিসেব মেলাচ্ছিলেন। তাঁর মুখের বলিরেখাগুলোতে তখন এক স্বর্গীয় আলোর ঝিলিক।
"অর্ক, বাবা..."
রফিক সাহেব মুখ তুলে তাকালেন। তাঁর চোখের কোণায় স্পষ্ট আনন্দাশ্রু।
"আজকে শুধু তোমার এই "শেষ মানুষটির ডায়েরি"
বিক্রি হয়েছে মোট তেতাল্লিশ কপি!"
অর্ক আর অর্পিতা স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইল।
"পনেরোশত টাকা করে দুই খণ্ডের সেট,"
রফিক সাহেব হিসেব বুঝিয়ে বলতে লাগলেন,
"তেতাল্লিশ কপির দাম আসে চৌষট্টি হাজার পাঁচশত টাকা। আর সাথে ইশরাক নিজে এক কপি কিনে আরও অতিরিক্ত পনেরোশত টাকা রেখে গেছে। মোট ছেষট্টি হাজার টাকা ক্যাশ জমা হয়েছে আজ এই ড্রয়ারে! আমার এই ষাট বছরের প্রকাশনীতে এক সন্ধ্যায় এত টাকার বই বিক্রি আমি গত বিশ বছরেও দেখিনি বাবা!"
রফিক সাহেব নোটের বড় বান্ডিলটা থেকে গুনে গুনে আটত্রিশ হাজার সাতশত টাকা আলাদা করলেন। তারপর সেই কড়কড়ে টাকার তোড়াটা অর্কর সামনে বাড়িয়ে দিলেন।
"এই নাও বাবা, এটা তোমার চুক্তির ষাট পার্সেন্ট রয়্যালটি। আটত্রিশ হাজার সাতশত টাকা।"
অর্ক চমকে উঠে এক পা পিছিয়ে গেল। সে হাতজোড় করে বলল,
"না আঙ্কেল, এটা কী করছেন! রয়্যালটির টাকা তো মেলা শেষ হওয়ার পর সব হিসেব মিলিয়ে নেওয়ার কথা। এখন তো প্রেসের বাকি দেনা আর আপনার খরচ রয়েছে—"
"কোনো কথা শুনব না আমি,"
রফিক সাহেব একপ্রকার জোর করেই অর্কর হাতের তালুতে টাকাগুলো গুঁজে দিলেন। তাঁর কণ্ঠটা ছিল স্নেহময় পিতার মতো গভীর।
"বাকি দেনা মেটানোর জন্য প্রকাশনীর অংশ এখনো ড্রয়ারে জমা আছে। কিন্তু আজকের এই প্রথম দিনের বরকতময় উপার্জনটা তোমার ঘরে যাওয়া উচিত। এটা তোমার সৎ ঘামের টাকা বাবা। তোমার জীবনের এক নতুন শুভযাত্রা আজ থেকে শুরু হলো।"
টাকার সেই মোটা বান্ডিলটা হাতের মুঠোয় ধরে অর্কর আঙুলগুলো থরথর করে কাঁপতে লাগল।
আটত্রিশ হাজার সাতশত টাকা!
সুপার শপে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে পুরো মাস শেষে সে যেখানে পেত তিরিশ হাজার টাকা, সেখানে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তার নিজের কলমের যোগ্যতায় সে অর্জন করল তার পুরো এক মাসের উপার্জনের চেয়েও বেশি! জীবনের এতগুলো বছরের ক্ষুধা, মেসের অন্ধকার আর মানুষের অপমান যেন এই এক মুহূর্তে বাতাসে কর্পূরের মতো মিলিয়ে গেল।
অর্ক পাশে দাঁড়ানো অর্পিতার দিকে তাকাল।
অর্পিতার চশমার কাঁচের ওপাশে চোখ দুটো তখন আনন্দ আর গর্বের নোনা জলে টলমল করছে। তার ঠোঁট দুটো মৃদু কাঁপছিল, কিন্তু মুখে ছিল এক অপার্থিব তৃপ্তি।
অর্ক এক মুহূর্তও নিজের কাছে রাখল না। সে এগিয়ে গিয়ে সেই আটত্রিশ হাজার সাতশত টাকার পুরো বান্ডিলটা পরম শ্রদ্ধায় আর ভালোবাসায় অর্পিতার দুই হাতের তালুতে তুলে দিল।
"এটা তোমার অর্পিতা,"
অর্কর কণ্ঠ আবেগে রুদ্ধ হয়ে এলো।
"যেদিন পকেটে এক কাপ চায়ের টাকা ছিল না, সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত তুমি যে বিশ্বাস নিয়ে আমার পাশে দাঁড়িয়েছিলে তার সামনে এই টাকা কিছুই নয়। এটা আমাদের প্রথম লড়াইয়ের জয়।"
অর্পিতা টাকাটা বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরে অর্কর হাতটা ধরল। তার চোখের পানি টুপ করে খসে পড়ল সেই টাকার নোটগুলোর ওপর।
মেলার ধুলোমাখা পথ বেয়ে তারা যখন দোয়েল চত্বরের দিকে পা বাড়াল, তখন রাতের হিমেল বাতাস তাদের ছুঁয়ে যাচ্ছিল। রাতের ঢাকা তখন অনেকটাই শান্ত। মেলার ধুলোমাখা ক্লান্তি মেখে দুজনের হাত শক্ত করে জড়ানো ছিল একে অপরের সাথে। হিমেল বাতাসে অর্পিতার শাড়ির আঁচল উড়ছিল, আর তার অন্য হাতটা অর্কর জ্যাকেটের পকেটে গুঁজে দেওয়া আটত্রিশ হাজার টাকার খামটাকে পরম মমতায় আগলে রেখেছিল।
ঘড়িতে তখন রাত সাড়ে নয়টা।
শাহবাগ মোড় পেরিয়ে একটু এগোতেই রাস্তার একপাশে কাঁচের দেয়ালঘেরা এক নামকরা সুন্দর কফি শপ চোখে পড়ল। ভেতর থেকে ভেসে আসছিল হালকা ইনস্ট্রুমেন্টাল মিউজিকের সুর।
অর্ক হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ থেমে গেল। সে অর্পিতার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
"বাসায় অর্পা একা আছে... ও কি রাতে কিছু খেয়েছে?"
"হ্যাঁ, মেলা থেকে বের হওয়ার সময়ই আমি ওকে ফোন করেছিলাম। ও ফ্রিজে রাখা খাবার গরম করে খেয়ে নিয়েছে, এখন ড্রয়িংরুমে বসে টিভিতে নাটক দেখছে।"
"তাহলে চলো,"
অর্ক অর্পিতার হাত ধরে সোজা কফি শপের কাঁচের দরজার দিকে পা বাড়াল।
অর্পিতা একটু থমকে দাঁড়িয়ে অর্কর হাত টেনে ধরল।
"অর্ক! পাগল হয়েছ তুমি? এত দামি জায়গায় ঢোকার কী দরকার? আমরা সোজা বাসায় যাই, আমি নিজের হাতে তোমাকে স্পেশাল আদা-চা বানিয়ে দিচ্ছি।"
অর্ক এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল। সে অর্পিতার মুখের দিকে তাকাল।
অর্ক খুব ধীর, কিন্তু গভীর আবেগে ভরা গলায় বলল—
"সারাজীবন শুধু হিসেবেই করে গেলাম অর্পিতা। এমন সময়ও গেছে যখন দুপুরের এক প্লেট ভাতের টাকা পকেটে ছিল না। আমাদের দুজনের উপার্জনে সংসারটা তো কেবল টেনেটুনে চলছে। এই গত এক বছরে কত দিন চেয়েছি তোমাকে একটু ভালো কোনো জায়গায় নিয়ে এসে পাশে বসাই, কিন্তু পকেটের বাস্তবতায় পারিনি। আজ আমার জীবনের প্রথম সৃষ্টির উপার্জন এসেছে ঘরে। আজকের এই রাতটা, এই সময়টা শুধু আমাদের দুজনের। ভেতরে চলো, মেনু দেখে তোমার যা খুশি অর্ডার দাও।"
অর্কর কথাগুলোর ভেতর এমন এক নিখাদ ভালোবাসার গভীরতা ছিল যে অর্পিতার চোখের কোণটা হঠাৎ ভিজে এলো। সে আর কোনো আপত্তি করল না।
কাঁচের ভারী দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই নাকে এলো রোস্টেড কফি বিন আর গরম চকলেটের এক মাতাল করা মিষ্টি ঘ্রাণ। এসির মৃদু ঠান্ডার মাঝেও ভেতরটা ছিল অদ্ভুত আরামদায়ক।
তারা কোণার দিকের একটি ছোট কাঠের গোল টেবিলে গিয়ে বসল।
ওয়েটার এসে মেনু কার্ড দিয়ে গেল। অর্পিতা মেনুর পাতায় চোখ বুলিয়ে একটু লাজুক হেসে বলল,
"দুটো গরম ক্যাপুচিনো আর সাথে এই চকোলেট পেস্ট্রিটা দিয়েন।"
কিছুক্ষণের মধ্যেই টেবিলে এলো ধোঁয়া ওঠা দুটি বড় সিরামিকের মগে কফি আর প্লেটে সাজানো নরম, গাঢ় চকোলেটের পেস্ট্রি।
অর্পিতা ছোট চামচ দিয়ে পেস্ট্রির এক টুকরো কেটে অর্কর মুখের সামনে তুলে ধরল। অর্ক হাসিমুখে সেটা মুখে নিয়ে অর্পিতার মুখেও এক টুকরো তুলে দিল। কফির উষ্ণ ধোঁয়া তাদের মুখের মাঝে উড়ছিল।
গত কয়েক বছরের সমস্ত না পাওয়া, মেসের স্যাঁতসেঁতে ঘরের যন্ত্রণা আর প্রকাশকদের মুখের ওপর দরজায় আঘাত খাওয়ার স্মৃতিগুলো যেন কফির এই মিষ্টি স্বাদে এক অনাবিল তৃপ্তিতে রূপ নিল। তারা বসে বসে কথা বলতে লাগল কীভাবে মেলাটা তাদের জীবন বদলে দিল, রফিক আঙ্কেলের সেই বিস্ময়কর মুখ আর সামনে আসার দিনগুলোর স্বপ্নের কথা।
রাত যখন দশটা পার হলো, তখন তারা বিল মিটিয়ে উঠে দাঁড়াল।
বের হওয়ার আগে অর্ক কাউন্টার থেকে সুন্দর একটা ছোট কার্টনের বক্সে অর্পার জন্য এক পিস ব্ল্যাক ফরেস্ট কেক প্যাক করিয়ে নিল।
কফি শপ থেকে বের হয়ে তারা একটা রিকশায় উঠল।
রাতের শীতল হাওয়া তাদের শরীর ছুঁয়ে যাচ্ছিল। রিকশার বসে অর্পিতা অর্কর কাঁধে আলতো করে মাথা রাখল, আর তার এক হাতে ধরা ছিল অর্পার জন্য নেওয়া কেকের প্যাকেটটা।
পরের একটা সপ্তাহ কেটে গেল যেন কোনো দ্রুতগামী স্বপ্নের মতো।
টেলিভিশনের একাধিক চ্যানেলের বইমেলা ভিত্তিক বিশেষ অনুষ্ঠানে লেখক ইশরাক আহমেদের সেই বক্তব্যের ফুটেজ দেখানো হলো। ৩৫২ নম্বর স্টলের সামনে ইশরাক আহমেদের পাশে বিনীতভাবে দাঁড়িয়ে থাকা তরুণ লেখক অর্ক আহমেদের চেহারা এখন ঢাকা শহরের সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে বেশ পরিচিত।
তবে বই বিক্রির এই জোয়ার শুধু কোনো তারকার প্রচারের ওপর ভর করে ছিল না। যে পাঠকেরা বারোশত পাতার শেষ মানুষটির ডায়েরি কিনে নিয়ে গিয়েছিল, তারা ফেসবুকের বিভিন্ন সাহিত্য বিষয়ক বড় বড় গ্রুপে দীর্ঘ রিভিউ লিখতে শুরু করল। গল্পের অসাধারণ সাইকোলজিক্যালটান, গভীর দর্শন আর শেষ মুহূর্তের সাসপেন্স পাঠকদের স্তম্ভিত করে দিয়েছিল। বইয়ের গুণগত মানই হয়ে উঠল তার সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন।
অর্কর ফেসবুক পেজের ফলোয়ার সংখ্যা হুহু করে বেড়ে সাতাশ হাজারে গিয়ে ঠেকেছে। এর মধ্যে পেজটি ফেসবুক থেকে অফিশিয়ালি মনেটাইজড হয়ে গেছে, যার ফলে সেখানে নিয়মিত ছোট গল্প ও লেখা পোস্ট করার বিনিময়েও টুকটাক ডলার জমা হতে শুরু করেছে।
সপ্তাহ শেষে মেলার হিসেব মেলাতে গিয়ে দেখা গেল প্রথম দিনের সেই তেতাল্লিশ কপির পর গত সাত দিনে বিক্রি হয়েছে আরও একশত উনষাট কপি! অর্থাৎ মেলার প্রথম আট দিনেই দুইশত দুই কপি বই পাঠকের ঘরে পৌঁছে গেছে। মেলার তখনও প্রায় কুড়ি দিন বাকি।
বুধবারের এক সন্ধ্যায় মিষ্টির প্যাকেট হাতে সোজা ইন্দিরা রোডের বাসায় হাজির হলেন রফিক সাহেব।
অর্পিতা তাঁকে ড্রয়িংরুমে বসিয়ে এক কাপ স্পেশাল দুধ চা আর নাস্তা এগিয়ে দিল। রফিক সাহেবের মুখে তখন এক অদ্ভুত উদ্যম আর আনন্দের ঝিলিক।
"অর্ক, বাবা,"
রফিক সাহেব চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে টেবিলের ওপর ঝুঁকে বসলেন।
"আমাদের সামনে এখন মস্ত বড় সুযোগ। তোমার এই যে জনপ্রিয়তা আর সুনাম তৈরি হয়েছে, এটাকে এখনই কাজে লাগাতে হবে। মেলায় এখনো বিশ দিন বাকি। শুধু একটা বারোশত পাতার বড় বই দিয়ে সব পাঠক ধরা যাবে না। তোমার আগে থেকে লেখা কোনো গল্প-উপন্যাস আছে না? ড্রয়ারে ফেলে রেখে কী লাভ? এখনই আরও দুই-একটা বই বের করে ফেলা উচিত!"
অর্কর চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে এক মুহূর্তও দেরি না করে শোবার ঘর থেকে তার পুরনো সেই কাপড়ের ফাইল আর ড্রয়ারে জমানো পাণ্ডুলিপির স্তূপ এনে টেবিলের ওপর রাখল। কত নির্ঘুম রাতে মেসের টেবিলে বসে লেখা সেই অপ্রকাশিত সৃষ্টিগুলো!
রফিক সাহেব চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে খুব মন দিয়ে ফাইলগুলো ওল্টাতে লাগলেন।
চারটি পূর্ণাঙ্গ ছোট উপন্যাস, অজস্র ভূতের গল্প আর কবিতার স্তূপের ভেতর থেকে রফিক সাহেব অভিজ্ঞ চোখে বাছাই করতে শুরু করলেন—
"এই যে দেখো,"
রফিক সাহেব আলাদা করে বারোটি অলৌকিক ও ভয়ের গল্প একপাশে রাখলেন।
"এই বারোটা গল্প দিয়ে একটা নিখুঁত "ভূত সমগ্র" বানিয়ে ফেলব। মানুষের মনের ভয়ের ওপর এমন গল্প মেলায় খুব চলবে।"
এরপর তিনি পাণ্ডুলিপির স্তূপ থেকে দুটি চমৎকার উপন্যাস তুলে নিলেন। একটির নাম—
"বানুরিয়া" বাংলার এক প্রত্যন্ত শান্ত গ্রামের মানুষের টানাপোড়েন আর মাটির গন্ধমাখা জীবনগাথা। অন্যটির নাম— "দশ দিন" এক জটিল উপন্যাস, যেখানে একজন মানুষের জীবনের শেষ দশটি দিনের গভীর উপলব্ধি আর বেঁচে থাকার আকুতি ফুটে উঠেছে।
"আর এই যে তোমার ত্রিশটি প্রেমের আর অনুভূতির কবিতা,"
রফিক সাহেব ফাইলটা আলাদা করে হাসলেন,
"এটার নাম দেব "বৃষ্টি ভেজা" চমৎকার সব ছন্দ। আর মেলায় তো বাচ্চাদের বইয়ের দারুণ চাহিদা থাকে, এই ছোটদের গল্পটা নেব "প্রিয় হাতি"।"
অর্ক অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
"কিন্তু আঙ্কেল, এতগুলো বই মেলা চলাকালীন সময়ে বের করা কি সম্ভব?"
"সম্ভব মানে? একশো বার সম্ভব!"
রফিক সাহেব টেবিল চাপড়ে এক গাল হাসলেন।
"এগুলো তো ছোট ছোট সাইজের বই। আমি প্রেসের মালিকের সাথে কথা বলে এসেছি। আগামী তিন দিনের মধ্যে দিন-রাত জরুরি ভিত্তিতে প্রেসের মেশিন চালিয়ে প্রতিটা বইয়ের দুইশত কপি করে প্রিন্ট আর বাইন্ডিং করিয়ে মেলার স্টলে তুলে দেব!"
অর্পিতা ড্রয়িংরুমের দরজায় দাঁড়িয়ে হাসছিল। অর্পার মুখেও একরাশ বিস্ময়।
রফিক সাহেব পাণ্ডুলিপির বান্ডিলগুলো পরম স্নেহে ব্যাগে ভরলেন। রফিক সাহেব যখন পাণ্ডুলিপির বান্ডিলগুলো গুছিয়ে ব্যাগে ভরছিলেন, তখন অর্কর কপালের ভাঁজগুলো গভীর হয়ে এলো।
তার মনের ভেতরের চিরন্তন মধ্যবিত্ত দ্বিধাবোধটা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। যে মানুষটা তার জন্য নিজের ভিটেমাটি বন্ধক রেখে দিয়েছেন, তাঁর ওপর নতুন করে আর কোনো বোঝার বোঝা চাপাতে অর্কর মন সায় দিচ্ছিল না।
অর্ক একটু ইতস্তত করে বলল,
"আঙ্কেল... হুট করে একসাথে এতগুলো বই বের করা কি অতিরিক্ত বড় ঝুঁকি হয়ে যাচ্ছে না?"
অর্পিতাও চায়ের কাপটা টেবিল থেকে তুলতে তুলতে চিন্তিত গলায় সায় দিল,
"অর্ক একদম ঠিক কথাই বলছে আঙ্কেল। শেষ মানুষটির ডায়েরি তো সবেমাত্র চলতে শুরু করেছে। এই মুহূর্তে তাড়াহুড়ো করে একসাথে আরও পাঁচটা বই প্রেসে দেওয়া কি ঠিক হবে? যদি মেলায় এগুলো না চলে? আপনার তো এমনিতেই প্রেসের বড় দায় আর জমি বন্ধকের চাপ রয়েছে।"
রফিক সাহেব ব্যাগটা টেবিলে রেখে চেয়ারে একটু হেলান দিয়ে বসলেন। তাঁর মুখে কোনো বিরক্তি বা তাড়াহুড়ো দেখা গেল না, বরং ফুটে উঠল চার দশকের এক অভিজ্ঞ প্রকাশকের প্রশান্ত হাসি।
"তোমাদের দুজনকে আমি খুব ভালো করে বুঝতে পারছি,"
রফিক সাহেব খুব শান্ত গলায় বোঝাতে লাগলেন।
"তোমাদের এই ভয়টা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু প্রকাশনা ব্যবসার একটা নিজস্ব মনস্তত্ত্ব আছে, যা বাইরে থেকে বোঝা যায় না।"
তিনি অর্কর দিকে তাকিয়ে বললেন,
"অর্ক, তোমার শেষ মানুষটির ডায়েরি একটা ক্লাসিক সৃষ্টি, কিন্তু পনেরোশত টাকার এই বারোশত পাতার বই কেনা সবার পক্ষে সম্ভব নয়। মেলায় এমন হাজার হাজার তরুণ-তরুণী, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী আর মধ্যবিত্ত পাঠক আসে যাদের বাজেট থাকে সীমিত—দেড়শো বা আড়াইশো টাকা। তারা তোমার নাম শুনে স্টলে আসবে ঠিকই, কিন্তু দাম আর বড় সাইজের কারণে বড় বইটা কিনতে না পেরে খালি হাতে ফিরে যাবে।"
রফিক সাহেব একটা একটা করে বইয়ের নাম ধরে বলতে লাগলেন,
"এই যে বারোটি ভূতের গল্পের বই, এটা স্কুল-কলেজের কিশোর আর তরুণরা এক দেখাতেই লুফে নেবে। যারা সিরিয়াস ড্রামা ভালোবাসে তারা নেবে বানুরিয়া সাইকোলজিক্যাল গল্পের পাঠকরা পড়বে দশ দিন মেলায় আসা প্রেমিক-প্রেমিকাদের হাতে উঠবে বৃষ্টি ভেজার কবিতা, আর মায়েরা তাদের সন্তানদের জন্য নিয়ে যাবে প্রিয় হাতি।"
তিনি একটু হেসে অর্পিতার দিকে তাকালেন,
"আর ঝুঁকির কথা বলছ মা? প্রতিটা বইয়ের মাত্র দুইশত কপি করে ছাপছি আমরা। ছোট বইয়ের প্রিন্টিং খরচ খুব সামান্য। মেলার সামনের শুক্রবার আর শনিবারের ছুটির দিনে যে উপচে পড়া ভিড় হবে, আমি বাজি ধরে বলতে পারি এই দুইশো কপির স্টক মাত্র তিন দিনে শেষ হয়ে যাবে! এতে যে নগদ টাকাটা দ্রুত ড্রয়ারে আসবে, তা দিয়ে প্রেসের বাকি খুচরা দেনা এক লহমায় চুকে যাবে।"
রফিক সাহেবের যুক্তির গভীরতা আর আত্মবিশ্বাস অর্ক আর অর্পিতার ভেতরের সমস্ত দ্বিধাদ্বন্দ্ব এক নিমেষে দূর করে দিল। একজন দক্ষ পথপ্রদর্শকের মতো তিনি যেন পুরো মেলার বাণিজ্যিক ছকটা তাদের চোখের সামনে পরিষ্কার করে তুলে ধরেছেন।
অর্ক মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল সেই বৃদ্ধ প্রকাশকের চোখের দিকে।
"তাহলে আর কোনো দ্বিধা নেই আঙ্কেল,"
অর্ক মৃদু হেসে বলল।
"আপনার অভিজ্ঞতার ওপর আমার পূর্ণ বিশ্বাস আছে।"
রফিক সাহেব উঠে দাঁড়িয়ে অর্কর কাঁধে একটা জোরদার চাপ দিলেন।
"তুমি শুধু মেলায় ঠিক সময়ে এসে হাজির থেকো। কাল সকাল থেকেই প্রেসের রোলার ঘুরবে। তিন দিন পর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আমাদের ৩৫২ নম্বর স্টলে শুধু একটা বই নয়, সাজানো থাকবে অর্ক আহমেদের এক আস্ত সাহিত্যের মেলা!"
চার দিন পরের এক সোনালী বিকেলে অমর একুশে বইমেলার ৩৫২ নম্বর
বন্ধু প্রকাশন এর স্টলের রূপটাই পুরোপুরি বদলে গেল।
প্রেস থেকে আসা নতুন বাঁধানো বইয়ের প্যাকেটগুলো যখন স্টলের কাঠের তাকে একে একে সাজানো হলো, তখন স্টলটাকে ঘিরে যেন এক নতুন প্রাণের সঞ্চার হলো। বইমেলায় এখন সাজানো রয়েছে অর্ক আহমেদের ছয়টি ভিন্ন স্বাদের বই—
১. শেষ মানুষটির ডায়েরি বারোশত পাতার সেই সুবিশাল মহাকাব্যিক সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার।
২. ভূত সমগ্র মানুষের অবচেতন মনের ভয় আর অলৌকিক অনুভূতির বারোটি সেরা গল্পের সংকলন।
৩. বানুরিয়া বাংলার এক নিভৃত শান্ত গ্রামের মানুষের আবেগ ও মাটির গন্ধমাখা জীবনগাথা।
৪. দশ দিন এক নিঃসঙ্গ মানুষের জীবনের শেষ দশটি দিনের গভীর সাইকোলজিক্যাল উপন্যাস।
৫. বৃষ্টি ভেজা ত্রিশটি প্রেম ও বিরহের স্নিগ্ধ কবিতার সংকলন।
৬. প্রিয় হাতি ছোটদের জন্য রঙিন চিত্রসহ এক মায়াবী রূপকথা।
রফিক সাহেবের দূরদর্শিতা যে কতটা নিখুঁত ছিল, তা মেলার প্রাঙ্গণে প্রথম দিনেই প্রমাণ হয়ে গেল।
ছোট আকারের এবং সাশ্রয়ী মূল্যের বইগুলো আসতেই তরুণ-তরুণী আর শিক্ষার্থীদের উপচে পড়া ভিড় শুরু হয়ে গেল স্টলের সামনে। কেউ কিশোর বয়সের ভাইবোনদের জন্য ভূত সমগ্র আর প্রিয় হাতি কিনে নিচ্ছে, কেউ আবার প্রিয়জনের জন্য তুলে নিচ্ছে বৃষ্টি ভেজার কবিতার বই। আর সিরিয়াস সাহিত্যপ্রেমীরা তো বানুরিয়া আর দশ দিন নিয়ে দীর্ঘ আলোচনায় মেতে উঠছে।
স্টলের সামনে তখন এক বিশাল জটলা। অর্ক অবিরাম কলম চালিয়ে বইয়ের প্রথম পাতায় অটোগ্রাফ দিয়ে চলেছে—
“ভালোবাসা সহ, অর্ক আহমেদ”
পাঠক-পাঠিকারা বই বুকে জড়িয়ে মোবাইলে সেলফি তুলছে, কেউ কেউ ইউটিউবের ব্লগের জন্য ছোট ছোট ইন্টারভিউ নিচ্ছে। অর্কর জীবন তখন এক অবিরাম ঝড়ের গতিতে ছুটছিল।
প্রতিদিন ভোর ছয়টায় ঘুম থেকে উঠে গ্রিন রোডের সুপার শপের দায়িত্ব সামলানো। এমনকি সুপার শপেও এখন অদ্ভুত এক দৃশ্য দেখা যায়! অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী আর নিয়মিত ক্রেতা কেনাকাটা করতে এসে ম্যানেজারের কেবিনের কাঁচের দরজায় নক করে দাঁড়িয়ে থাকে শুধু অর্কর সাথে এক পলক দেখা করতে, হাত মেলাতে কিংবা কেনা বইয়ে একটা সই নিতে।
তারপর দুপুর দুইটা বাজতেই এক ছুটে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। সেখানে রাত নয়টা পর্যন্ত হাজারো মানুষের ভালোবাসা আর প্রশংসার মাঝে ডুবে থাকা।
শরীর যে কখন ক্লান্তির শেষ সীমায় পৌঁছে যেত, তা অর্ক দিনের আলোতে টেরই পেত না।
রাত পৌনে এগারোটায় যখন সে বাসায় ফিরল, তখন তার কাঁধ আর মেরুদণ্ডের প্রতিটি হাড় ব্যথায় অবশ হয়ে আসছিল। ড্রয়িংরুমের সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে সে চোখ বুজে রইল।
হঠাৎ এক জোড়া স্নিগ্ধ, নরম হাতের স্পর্শ এসে পড়ল তার ঘাড় আর কাঁধের শক্ত হয়ে যাওয়া পেশির ওপর।
অর্পিতা নিজের আঁচলটা কোমরে গুঁজে সোফার পেছনে দাঁড়িয়ে পরম যত্নে অর্কর কাঁধ টিপে দিতে লাগল। তার হাতের প্রতিটি আঙুলের চাপে যেন এক অদ্ভুত আরাম আর স্বস্তির জাদু ছিল।
অর্ক চোখ খুলে ফিরে তাকাল।
অর্পিতার মুখে সারাদিনের ডিলারশিপ অফিসের ক্লান্তির স্পষ্ট ছাপ, চোখের নিচে হালকা ছায়া। অথচ সেই মুখের ভেতরে একবিন্দু বিরক্তি নেই, আছে কেবল এক স্বর্গীয় মমতা।
অর্ক আলতো করে নিজের হাতটা বাড়িয়ে অর্পিতার একটি হাত ধরে ফেলল।
"অর্পিতা...তুমি নিজে সারাদিন অফিসে এত হাড়ভাঙা খাটুনি খাটো। তারপর বাসায় ফিরে রান্নাবান্না, অর্পার দেখাশোনা, আবার এই মাঝরাতে আমার এই সেবা... এত কষ্ট তুমি কীভাবে সহ্য করো বলো তো? তোমার কি একটুও ক্লান্তি লাগে না?"
অর্পিতা একটু হাসল। সে অর্কর কপালে এসে পড়া চুলগুলো আলতো করে সরিয়ে দিয়ে পাশে এসে বসল।
"ক্লান্তি তাদের লাগে অর্ক, যাদের জীবনে কোনো আশা থাকে না,"
অর্পিতা খুব নরম, মিষ্টি গলায় বলল।
"যে মানুষটার এক কাপ চায়ের জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকার দিনগুলো আমি দেখেছি, আজ যখন পুরো শহর তাকে হাততালি দিয়ে বরণ করে নিচ্ছে সেই দৃশ্য দেখার পর আমার শরীরের সব ক্লান্তি এমনিতেই ধুয়েমুছে যায়। তোমার সেবা করতে পারাটা আমার কোনো কষ্ট নয় অর্ক, এটা আমার সবচেয়ে বড় শান্তি।"
অর্ক কোনো কথা বলতে পারল না। সে অর্পিতার সেই ক্লান্ত অথচ দীপ্তিময় হাত দুটো নিজের চোখের ওপর চেপে ধরল।
বইমেলা শেষ হওয়ার তিন দিন পরের এক মিষ্টি সন্ধ্যার কথা।
ড্রয়িংরুমের বারান্দা দিয়ে ফাল্গুনের দক্ষিণা বাতাস ঢুকছিল, টবের হাসনাহেনা গাছটায় তখন নতুন কুঁড়ি এসেছে।
কলিংবেল বাজতেই দরজা খুলল অর্পিতা। বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন রফিক সাহেব। তাঁর গায়ে পরিপাটি ইস্ত্রি করা পাঞ্জাবি, হাতে মিষ্টির একটা বড় প্যাকেট আর বগলে শক্ত চামড়ার একটা ফাইল।
"আসসালামু আলাইকুম আঙ্কেল! ভেতরে আসুন,"
অর্পিতা হাসিমুখে তাঁকে স্বাগত জানিয়ে ড্রয়িংরুমে নিয়ে এলো।
ডাইনিং টেবিলে ল্যাপটপ নিয়ে বসে কাজ করছিল অর্ক। রফিক সাহেবকে দেখেই সে তাড়াতাড়ি উঠে এসে পরম শ্রদ্ধায় সালাম করল। অর্পা রান্নাঘরে ছুটল স্পেশাল দুধ চা আর নাস্তা তৈরি করতে।
সোফায় বসে রফিক সাহেব মিষ্টির প্যাকেটটা টেবিলের ওপর রাখলেন। তারপর নিজের চামড়ার ফাইলটা খুলে একটা সাদা হিসাবের বিবরণী কাগজ অর্কর সামনে মেলে ধরলেন।
রফিক সাহেব চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে খুব তৃপ্তির সাথে বলতে লাগলেন,
"মেলার পুরো আটাশ দিনের শেষ হিসাব আর ইনভেন্টরি মিলিয়ে শেষ করলাম। তোমার ছোট পাঁচটি বই প্রতিটার দুইশো কপি করে মোট এক হাজার কপির পুরো স্টকটাই মেলার শেষ তিন দিন আগেই সম্পূর্ণ বিক্রি হয়ে গেছে! আর সেই শেষ মানুষটির ডায়েরির এক হাজার কপির মধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে আটশত পঁচাত্তর কপি! মেলা শেষে মাত্র একশত পঁচিশটি বই অবশিষ্ট আছে।"
রফিক সাহেব একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে হাসলেন।
"মেলার পুরো সময়ে মোট বই বিক্রি হয়েছে পনেরো লাখ ছয় হাজার পাঁচশত টাকা! এই টাকা দিয়ে গতকালই আমি ব্যাংকের সমস্ত দেনা মিটিয়ে বিক্রমপুরে আমার দাদার শেষ সম্বল ভিটেমাটির জমিটুকু সম্পূর্ণ মুক্ত করে এনেছি বাবা! প্রেসের প্রতিটি পাইপয়সা দেনা শোধ হয়ে গেছে, আর আমার প্রকাশনীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টেও রয়ে গেছে এক বিরাট অঙ্কের পুঁজি।বন্ধ হতে যাওয়া বন্ধু প্রকাশন আজ তোমার হাত ধরে নতুন করে জীবন ফিরে পেল!"
রফিক সাহেব নিজের ফোন বের করে অর্কর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে তাদের চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত ষাট শতাংশ রয়্যালটির পুরো টাকাটা ট্রান্সফার করে দিলেন।
মুহূর্তের মধ্যেই অর্কর মোবাইলে ব্যাংক থেকে ডিপোজিটের একটা এসএমএস বেজে উঠল—
ক্রেডিট: ৯,০৩,৯০০/- টাকা (নয় লাখ তিন হাজার নয়শত টাকা)।
স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে অর্কর চোখ যেন থমকে গেল।
নয় লাখ তিন হাজার নয়শত টাকা!
যে ছেলেটা একদিন মাত্র পাঁচ হাজার টাকা মেসের ভাড়ার জন্য করিডোরে অপমানের শিকার হয়েছিল, সেই ছেলেটার অ্যাকাউন্টে আজ প্রায় দশ লাখ টাকা জমা শুধুমাত্র তার নিজের কলমের জোরে!
রফিক সাহেব কিন্তু এখানেই থামলেন না। তিনি চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে আরও বেশি উৎসাহ নিয়ে অর্কর দিকে ঝুঁকে বসলেন।
"আর ওই যে বারোশত পাতার বাকি সোয়া একশত কপি বই আমার গুদামে পড়ে আছে, ওগুলো অনলাইন প্ল্যাটফর্মে দেওয়ার সাথে সাথেই শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু আসল কথা তো এখনো বলাই হয়নি বাবা!"
রফিক সাহেবের চোখের দৃষ্টিতে তখন এক দূরদর্শী প্রকাশকের আত্মবিশ্বাস চকচক করছিল।
"চারিদিক থেকে পাঠকদের এত চাপ আর ডিমান্ড আসছে যে আমাদের এখনই সব কটা বইয়ের নতুন করে কয়েক হাজার কপি রিপ্রিন্ট করতে হবে। আর সবচেয়ে বড় সুখবর জানো? বাংলাবাজারের বড় বড় ছাপাখানাগুলো এখন আমাদের বই ছাপার জন্য অগ্রিম এক টাকাও চাইছে না! তারা নিজেরাই এসে বলছে, রফিক ভাই, অর্ক আহমেদের বই আপনি যত কপি চান ছাপান, টাকা পরে দিলেও চলবে।"
রফিক সাহেব সোফা থেকে উঠে এসে পরম স্নেহে অর্কর মাথায় হাত রাখলেন।
"এখন তোমার আসল ক্যারিয়ার শুরু হলো বাবা! সুপার শপের ওই চাকরিটা এবার সম্মানের সাথে ছেড়ে দাও। তুমি শুধু মন দিয়ে ঘরে বসে নতুন নতুন উপন্যাস আর গল্প লেখায় ডুবে থাকো। তোমার লেখা প্রতিটি হরফ পুরো দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্ব এই রফিকের। বন্ধু প্রকাশন এখন থেকে তোমার সব সৃষ্টির স্থায়ী ঠিকানা।"
রফিক সাহেবকে বিদায় জানিয়ে যখন অর্ক বারান্দায় এসে দাঁড়াল, তখন ফাল্গুনের মিষ্টি হাওয়া তার বুক জুড়িয়ে দিচ্ছিল। বারান্দার রেলিং ধরে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিল অর্ক আর অর্পিতা। ঢাকার দূরবর্তী রাস্তাগুলোর সোডিয়াম আলোর আভা এসে পড়ছিল তাদের মুখের ওপর। অর্ক পরম ভালোবাসায় নিজের এক হাত দিয়ে অর্পিতাকে বুকের কাছে জড়িয়ে রাখল।
অর্ক আকাশের দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত অথচ গভীর এক অনুভূতি নিয়ে বলতে লাগল,
"অবশেষে আল্লাহর রহমতে আমাদের সুদিন শুরু হলো। তোমাকে আর ওই তেজগাঁওয়ের অফিসে গিয়ে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে হবে না। তুমি কালই অফিসে গিয়ে রিজাইন লেটার দিয়ে আসবে। এখন থেকে তুমি শুধু ঘরে থাকবে, নিজের যত্ন নেবে আর তোমার ওই সুন্দর মুখে একটু নিশ্চিন্তের হাসি ফুটিয়ে রাখবে।"
অর্ক তার মাথায় আলতো করে হাত রেখে বলল,
"অর্পার পড়াশোনা আর ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে আর এক মুহূর্তের জন্যও কারও কাছে হাত পাততে হবে না। আমরা এর চেয়েও বড়, খোলামেলা একটা সুন্দর ফ্ল্যাট নেব। অর্পার একটা আলাদা স্টাডি রুম থাকবে, যেখানে ও নির্বিঘ্নে মেডিক্যালের পড়াশোনা করবে।"
অর্ক একটু থামল। অতীত স্মৃতির চাবুক যেন তার চোখের সামনে ভেসে উঠল।
"যেদিন এই পুরো শহর আমাকে তাচ্ছিল্য করে ফিরিয়ে দিয়েছিল, সেদিন তুমি যেভাবে নিজের শেষ সম্বল জমানো টাকাগুলো আমার হাতে তুলে দিতে চেয়েছিলে... আর রাশেদ, যে মানুষটা মেসের সেই অন্ধকারে নিজের পকেটের শেষ টাকা দিয়ে আমার বেঁচে থাকার একমাত্র স্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়েছিল... এই ঋণ আমি কোনোদিন শোধ করতে পারব না অর্পিতা।"
অর্পিতা অর্কর হাতটা আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরে বলল,
"ভালোবাসা আর বন্ধুত্বে কোনো ঋণ থাকে না অর্ক। ওগুলো আশীর্বাদ।"
"আচ্ছা শোনো,"
অর্ক অর্পিতার দিকে ফিরে বলল,
"কাল তো শুক্রবার! কাল দুপুরেই রাশেদকে আমাদের বাসায় খাওয়ার দাওয়াত দিই। অফিস আর এয়ারপোর্টের কাজের চাপে ও তো মেলার শেষ কয়েকটা দিনে আসতেই পারেনি, এখনো জানেই না আজ সন্ধ্যায় কী ইতিহাস তৈরি হয়েছে!"
অর্পিতার মুখেও এক চিলতে কৌতূহলের হাসি ফুটে উঠল।
"কী করতে চাইছ তুমি?"
"তুমি কাল নিজের হাতে ওর পছন্দের খাসির মাংস আর ভুনা খিচুড়ি স্পেশাল করে রান্না করবে,"
অর্ক চোখ টিপে হাসল।
"আর এই নয় লাখ টাকার রয়্যালটি আর পনেরো লাখ টাকার বিক্রির খবরটা ওকে সহজে দেব না। প্রথমে ঘরে ঢুকলে একটু মুখ ভার করে বসে থাকব, ওকে একটু ভয় পাইয়ে দেব যে বইমেলায় কিছুই হয়নি! তারপর হঠাৎ করে ব্যাংকের মেসেজটা ওর মুখের সামনে তুলে ধরব। মেলার শেষ দিনে না আসার এটাই হবে ওর শাস্তি!"
অর্পিতা অর্কর পরিকল্পনা শুনে খিলখিল করে হেসে ফেলল। কতদিন পর এই মানুষটার মুখে এমন নির্ভার, প্রাণখোলা হাসি দেখল সে!
অর্পিতা হাসতে হাসতে নিজের মাথাটা গুঁজে দিল অর্কর বুকের ভেতর।
শুক্রবার সকালের মিষ্টি রোদে ফ্ল্যাটটায় যেন এক নতুন জীবনের ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেল।
ছুটির দিন হলেও সকাল দশটায় তেজগাঁওয়ের ডিলারশিপের ম্যানেজিং ডিরেক্টরকে ফোন দিল অর্পিতা। অত্যন্ত মার্জিত ও বিনীত ভাষায় সে জানিয়ে দিল যে পারিবারিক কারণে সে আর চাকরিটা চালিয়ে যেতে পারছে না, আজ থেকেই মৌখিক পদত্যাগ জমা দিচ্ছে এবং আগামী রবিবার এসে সব অফিশিয়াল হ্যান্ডওভার ও ক্লিয়ারেন্স সম্পন্ন করবে।
একই সময়ে নিজের সুপার শপের এমডি আশরাফ সাহেবকে ফোন করল অর্ক। পদত্যাগের কথা শুনতেই এমডি সাহেব ওপাশ থেকে গম্ভীর গলায় বললেন,
"ফোনে এসব হবে না অর্ক সাহেব। আপনি কাল শনিবার সকালে ধানমন্ডির হেড অফিসে এসে আমার সাথে দেখা করবেন। তারপর সিদ্ধান্ত হবে।"
অর্ক শান্ত গলায় বলল,
"ঠিক আছে স্যার, আমি কাল সকালেই আসব।"
এদিকে রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছিল এলাচ, দারুচিনি আর খাঁটি সরিষার তেলে কষানো খাসির মাংসের মাতাল করা সুবাস। সাথে অর্পিতার হাতের স্পেশাল জাফরানি পোলাও আর ফিরনি। অর্পা ড্রয়িংরুমের টেবিলে সুন্দর করে কাঁচের প্লেট আর গ্লাস সাজিয়ে রাখছিল।
ঠিক দুপুর একটায় সদর দরজায় কড়া নাড়ার চেনা শব্দ হলো।
দরজা খুলতেই রাশেদ একগাল হেসে ভেতরে ঢুকল। পরনে তার হালকা নীল রঙের সুতির পাঞ্জাবি, মুখভর্তি এক অনাবিল সতেজতা।
"কী ব্যাপার ভাবি? সিঁড়িতে উঠতেই এমন খাসির মাংসের সুবাস যে পুরো বিল্ডিংয়ের মানুষ পাগল হয়ে যাবে!"
রাশেদ জুতো খুলে সোফায় গা এলিয়ে দিল।
জুম্মার নামাজের পর চারজন মিলে বসল খাওয়ার টেবিলে।
অর্পিতার হাতের অতুলনীয় পোলাও আর নরম খাসির মাংসের ঝোল মুখে দিয়ে রাশেদ যেন তৃপ্তিতে চোখ বুজে ফেলল। মেসের সেই পাতলা ডাল আর তেলচিটে ভাতের দিনের পর এই পারিবারিক পরিবেশের চেয়ে বড় সুখ আর কী হতে পারে! ফিরনির বাটিটা হাতে নিয়ে রাশেদ হঠাৎ একটা বড় হাসি দিল।
"তোমাদের একটা দারুণ খবর দেওয়ার আছে,"
রাশেদ বেশ গর্বের সাথে বলল।
"আমাদের ট্রাভেল এজেন্সিতে আজ সকালে আমাকে সিনিয়র টিকেটিং অফিসার হিসেবে প্রমোশন দেওয়া হয়েছে! সাথে বেতন বেড়ে হয়েছে পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা।"
"মাশাআল্লাহ!"
অর্পিতা হাততালি দিয়ে উঠল।
"অনেক বড় সুখবর ভাইয়া! এবার তাহলে আর দেরি না করে একটা ভালো লক্ষ্মী মেয়ে দেখে নিজের সংসারটা সাজিয়ে ফেলুন!"
রাশেদ লজ্জা পেয়ে একটু হাসল।
"আরে না ভাবি, আমি একা মানুষ, এখনো অনেক পথ বাকি"
ঠিক তখনই ডাইনিং টেবিলের ওপর রাখা রাশেদের স্মার্টফোনটা উজ্জ্বল আলোয় কেঁপে উঠল।
টুং।
ব্যাংক থেকে আসা একটি অফিশিয়াল ট্রানজেকশন অ্যালার্টের শব্দ।
রাশেদ আনমনাভাবে ফোনটা হাতে নিয়ে স্ক্রিন আনলক করল। কিন্তু মেসেজটা পড়ার সাথে সাথেই তার মুখের হাসির রেখা মুছে গিয়ে এক তীব্র বিস্ময় ভর করল।
স্ক্রিনে স্পষ্ট বড় বড় অক্ষরে লেখা—
আপনার অ্যাকাউন্টে ১,০০,০০০/- (এক লাখ টাকা) জমা হয়েছে। প্রেরক: অর্ক আহমেদ।
রাশেদ চোখ বড় বড় করে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর সে ফোনটা নামিয়ে ভ্রু কুঁচকে অর্কর দিকে তাকাল। তার গলার স্বর হঠাৎ করেই একটু চড়ে গেল, চেহারায় ক্ষোভ আর আত্মসম্মানের সংমিশ্রণ।
"অর্ক! এটা কী তামাশা? তুই আমার অ্যাকাউন্টে এক লাখ টাকা পাঠালি কেন রে? তুই কি আমার সাথে টাকার হিসাব মেলাচ্ছিস?"
অর্ক কোনো কথা না বলে নিজের ফোনটা বের করে আনলক করল। সে স্ক্রিনটা সোজা রাশেদের চোখের সামনে ধরল।
স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে ব্যাংক ব্যালেন্স আর রফিক সাহেবের পাঠানো মেলার চূড়ান্ত হিসাবের স্টেটমেন্ট—
মেলায় মোট বই বিক্রি: ১৫,০৬,৫০০/- টাকা।
অর্কর অ্যাকাউন্টে রয়্যালটি জমা: ৯,০৩,৯০০/- টাকা (নয় লাখ তিন হাজার নয়শত টাকা)।
রাশেদের চোখের পলক পড়া বন্ধ হয়ে গেল। সে রুদ্ধশ্বাসে স্ক্রিনের সেই সংখ্যাগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল।
"এই দেখ রাশেদ,"
অর্ক খুব শান্ত অথচ গভীর আবেগে ভরা গলায় বলতে শুরু করল।
"মেলায় আমাদের সব বই বিক্রি হয়ে পনেরো লাখ টাকার ব্যবসা হয়েছে। কাল সন্ধ্যায় রফিক আঙ্কেল নিজে এসে আমার অ্যাকাউন্টে নয় লাখ চার হাজার টাকা ঢুকিয়ে দিয়ে গেছেন। এই পুরো টাকাটা আমার লেখার "
অর্ক চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে পরম মমতায় রাশেদের দুই কাঁধের ওপর হাত রাখল।
"মেসের সেই কয় বছরে তুই আমাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য হয়তো সব মিলিয়ে বিশ-তিরিশ হাজার টাকা খরচ করেছিলি। কিন্তু সেই ভালোবাসার মূল্য কি কোনো টাকা দিয়ে শোধ করা যায়? এই এক লাখ টাকা কোনো ঋণ শোধের জন্য দিইনি রে ভাই, তোকে ছোট করার জন্য তো নয়ই। তোর অর্ক আজ লেখক হিসেবে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে, এটা তারই একটা ছোট্ট প্রমাণ। আজ তোর প্রমোশন হয়েছে, সামনে তোর নিজের একটা সুন্দর সংসার হবে, তোর বিয়েতে কত হাজারটা খরচের ব্যাপার থাকবে! তুই এটাকে তোর বিয়ের জন্য তোর এই ভাইয়ের একটা অ্যাডভান্স গিফট হিসেবে মেনে নে।"
অর্কর চোখের দৃষ্টি আর কথাগুলোর ভেতরের গভীরতা এক মুহূর্তে রাশেদের সমস্ত রাগ আর দ্বিধাকে ধুয়েমুছে দিল। রাশেদ আর নিজের ভেতরের আবেগকে ধরে রাখতে পারল না। তার চোখের পাতা ভিজে পানি গড়িয়ে পড়ল গালের ওপর।
সে কোনো কথা না বলে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে অর্ককে দুই হাতে শক্ত করে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল।
শনিবার সকাল সাড়ে দশটা।
ধানমন্ডির সাত নম্বর রোডের একটি আধুনিক বহুতল ভবনের ছয়তলায়
ডেইলি বাজার সুপার শপ এর প্রধান কার্যালয়।
কাঁচের ঝকঝকে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই নাকে এলো সেন্ট্রাল এসির ঠান্ডা বাতাস আর দামি রুম ফ্রেশনারের সুবাস। করিডোর পেরিয়ে অর্ক যখন ম্যানেজিং ডিরেক্টর আশরাফ সাহেবের বিশাল কেবিনে ঢুকল, তখন আশরাফ সাহেব চামড়ার রিভলভিং চেয়ারে বসে একটা ফাইলের ওপর সাইন করছিলেন।
"আসসালামু আলাইকুম, স্যার।"
আশরাফ সাহেব কলমটা নামিয়ে চশমার ওপর দিয়ে তাকালেন। মুখে এক অদ্ভুত বাঁকা হাসি।
"আসুন অর্ক সাহেব, বসুন,"
আশরাফ সাহেব সামনের দামি চামড়ার সোফাটায় বসতে ইশারা করলেন।
অর্ক গিয়ে বসল। তার কাঁধে কোনো পুরনো কাপড়ের ব্যাগ নেই, পরনে মার্জিত হালকা বাদামি রঙের শার্ট।
আশরাফ সাহেব হেলান দিয়ে বসে একটা সিগারেট ধরালেন। ধোঁয়া ছেড়ে একটু তাচ্ছিল্যের সুরে শুরু করলেন,
"তা... শুনলাম বইমেলায় তো বিরাট সেলিব্রিটি হয়ে গেছেন! টিভিতে দেখলাম বড় বড় লেখকদের সাথে আপনার ছবি। অভিনন্দন।"
"ধন্যবাদ স্যার,"
অর্ক বিনীত গলায় বলল।
"কিন্তু অর্ক সাহেব, আপনি তো শিক্ষিত ছেলে,"
আশরাফ সাহেব টেবিলের ওপর ঝুঁকে এলেন, তাঁর গলার স্বরে এবার স্পষ্ট খোঁচা,
"একটু মেলায় নামডাক হয়েছে বলেই চাকরি ছেড়ে দেওয়ার এই হুজুগটা কি একটু বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে গেল না? এই ঢাকা শহরে সাহিত্য দিয়ে কয়টা মানুষ পেট চালাতে পারে বলুন তো? বইমেলার এই উন্মাদনা বড়জোর এক মাস থাকে, তারপর কিন্তু সেই বাস্তবতার মাটিতেই আছড়ে পড়তে হয়।"
তিনি ড্রয়ার থেকে একটা নতুন ফাইল বের করে বললেন,
"আমি আপনার কাজের ওপর সন্তুষ্ট ছিলাম। আপনি চাইলে আমি আপনাকে হেড অফিসের সেন্ট্রাল অপারেশন্সে সিনিয়র অডিটর হিসেবে নিয়ে আসতে পারি। বেতন বাড়িয়ে চল্লিশ হাজার টাকা করে দেব। চাকরিটা ছাড়লে কিন্তু পরে আফসোস করতে হবে।"
অর্ক শান্ত দৃষ্টিতে আশরাফ সাহেবের চোখের দিকে তাকাল। তার ভেতরে কোনো দ্বিধা বা প্রলোভন ছিল না। সে পকেট থেকে সাদা খামে ভরা একটি পদত্যাগপত্র বের করে টেবিলের ওপর রাখল।
"আপনার প্রস্তাবের জন্য ধন্যবাদ স্যার,"
অর্ক খুব দৃঢ় অথচ বিনীত কণ্ঠে বলল।
"কিন্তু আমি যখন পকেটে বিশটা টাকা না থাকা অবস্থায় মেসের ভাঙা টেবিলে বসে লিখেছিলাম, তখনও আমি জানতাম আমার গন্তব্য কোথায়। যে সাহিত্য আমাকে শূন্য থেকে এই সম্মানের জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে, তার ওপর আমার পূর্ণ আস্থা আছে।"
আশরাফ সাহেবের কপালের রগ ফুলে উঠল। একজন সাধারণ ব্রাঞ্চ ম্যানেজার তাঁর এত বড় কর্পোরেট অফার এভাবে মুখের ওপর ফিরিয়ে দিচ্ছে এটা তাঁর অহংকারে আঘাত করল।
"আস্থা আর অহংকার এক জিনিস নয় অর্ক সাহেব!"
আশরাফ সাহেবের গলার স্বর কিছুটা চড়ে গেল।
"ভুলে যাবেন না, এই চাকরিটাই আপনার অন্ন জুগিয়েছিল যখন কেউ আপনাকে ফিরেও দেখত না। বড় লেখক হওয়ার স্বপ্ন দেখতে গিয়ে যেন আবার সেই পুরনো রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াতে না হয়!"
অর্ক সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার মুখে কোনো রাগ ছিল না, ছিল এক পরম আত্মমর্যাদার প্রশান্তি।
"চাকরিটা আমাকে অন্ন দিয়েছিল স্যার, আমি তার প্রতি আজীবন কৃতজ্ঞ,"
অর্ক সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল।
"কিন্তু আমার মেধা বিক্রি করে আমি প্রতিটা পয়সার মূল্য এই প্রতিষ্ঠানে ঘাম দিয়ে শোধ করেছি। আমি কোনো অনুদান নিয়ে বাঁচিনি। আমার পদত্যাগপত্রটা গ্রহণ করলে বাধিত হব।"
আশরাফ সাহেব কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইলেন। তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পদত্যাগপত্রের ওপর কড়া হাতে নিজের ইনিশিয়াল সই করে দিলেন।
অর্ক তার ব্রাঞ্চের অফিশিয়াল আইডি কার্ড আর কেবিনের চাবির তোড়াটা টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখল। তারপর খুব মার্জিতভাবে হ্যান্ডশেক করে বলল,
"ভালো থাকবেন স্যার।"
হেড অফিসের ভারী কাঁচের দরজাটা ঠেলে যখন অর্ক বাইরে ফুটপাতে পা রাখল, তখন সকালের উজ্জ্বল রোদ এসে পড়ল তার মুখের ওপর।
ধানমন্ডি লেকের ওপার থেকে একঝাঁক ঠান্ডা বাতাস এসে তার বুক জুড়িয়ে দিল। অর্ক চোখ বন্ধ করে একটা বুকভরা দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিল। আজ কোনো তাড়া নেই, কোনো ইনভেন্টরির হিসেবের চাপ নেই, নেই কোনো বসের ধমক শোনার ভয়।
দেখতে দেখতে একটি পুরো বছর পার হয়ে গেল যেন রূপকথার কোনো উজ্জ্বল পাতার মতো।
ইন্দিরা রোডের সেই ছোট্ট চারতলার ফ্ল্যাট ছেড়ে অর্কোরা এখন চলে এসেছে উত্তরার সাত নম্বর সেক্টরের এক নিরিবিলি, ছায়াঘেরা আবাসিক এলাকায়। পাঁচতলার এই নতুন ফ্ল্যাটটা যেমন বিশাল, তেমনই আলো-বাতাসে ভরা।
দক্ষিণের বড় বারান্দাটায় অর্পিতা নিজের মনের মতো করে এক টুকরো বাগান সাজিয়েছে—হাসনাহেনা, বেলী, রজনীগন্ধা আর অজস্র পাতাবাহার। ফ্ল্যাটের একটি সম্পূর্ণ আলাদা ঘর বরাদ্দ হয়েছে অর্কোর নিজস্ব স্টাডি রুম হিসেবে। মেসের সেই পুরনো, কালির দাগে ভরা ঐতিহাসিক কাঠের পড়ার টেবিলটা এখনো সেই ঘরের কেন্দ্রবিন্দুতে সযত্নে রাখা, আর দেওয়াল জুড়ে বড় বড় সেগুন কাঠের বুকশেলফে হাজার হাজার দেশি-বিদেশি বই। অর্পার জন্যও হয়েছে এক মনোরম পড়ার ঘর।
গত এক বছরে অর্কোর কলম যেন এক অগ্নিকুণ্ডে রূপ নিয়েছিল। একের পর এক প্রকাশিত হয়েছে তার চারটি নতুন উপন্যাস—
১."নীল জোছনার বিষাদ" মানুষের অবচেতন মনের গভীর সাইকোলজিক্যালম টানাপোড়েন নিয়ে লেখা।
২. "মায়ানগর" ঢাকা শহরের নিষ্ঠুর বাস্তবতায় একদল স্বপ্নবাজ তরুণের বেঁচে থাকার গল্প।
৩ "ছায়া শিকারী" রহস্য, বিজ্ঞান আর দর্শনের এক অপূর্ব মেলবন্ধন।
৪. "ধূসর ক্যানভাস" প্রেম আর নিঃসঙ্গতার একটি উপন্যাস।
এই বছরের অমর একুশে বইমেলায় বন্ধু প্রকাশন এর প্যাভিলিয়নটি ছিল মেলার প্রধান আকর্ষণগুলোর অন্যতম। অর্কোর বই নেওয়ার জন্য তরুণ পাঠকদের দীর্ঘ লাইন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মূল পথ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। বন্ধু প্রকাশন এর রূপও এখন পুরোপুরি বদলে গেছে। পাটুয়াটুলীর সেই জীর্ণ অফিস ছেড়ে পল্টনে বিশাল কাঁচঘেরা আধুনিক কার্যালয় খুলেছেন রফিক সাহেব। দেশের প্রথম সারির প্রবীণ সাহিত্যিক থেকে শুরু করে সম্ভাবনাময় তরুণ লেখকরা এখন নিজেদের বই প্রকাশের জন্য বন্ধু প্রকাশনের দরজায় ভিড় জমাচ্ছেন।
অর্কো আহমেদ এখন আর শুধুই একজন লেখক নন, তিনি হয়ে উঠেছেন এদেশের তরুণ প্রজন্মের এক আত্মবিশ্বাসী অনুপ্রেরণা। শুধু বইমেলা নয় অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে বছরজুড়েই তার বইগুলো বেস্টসেলার এর শীর্ষে স্থান করে নিয়েছে। দেশের বড় বড় নামকরা স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে অর্কোর উপন্যাসগুলো সগৌরবে স্থান পেয়েছে। বিভিন্ন জেলা ও বিভাগীয় বইমেলাতেও তার বইয়ের জন্য পাঠকদের উপচে পড়া আগ্রহ এখন এক নিয়মিত চিত্র।
জনপ্রিয় বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম আর পডকাস্টগুলোতে নিয়মিত অতিথি হিসেবে ডাক পড়ছিল অর্কোর।
স্টুডিওর মৃদু আলো আর প্রফেশনাল মাইক্রোফোনের সামনে বসে অর্কো যখন তার জীবনের ফেলে আসা অন্ধকার দিনগুলোর গল্প শোনাত মেসের সেই স্যাঁতসেঁতে চিলেকোঠার রাত, এক কাপ চায়ের ভাগাভাগি, আত্মসম্মানের লড়াই আর অর্পিতার সেই নিঃস্বার্থ ভালোবাসার ত্যাগ তখন ইউটিউব আর ফেসবুকের লাখ লাখ তরুণ-তরুণীর চোখে পানি নেমে আসত। তার প্রতিটি কথা হাজার হাজার হতাশ যুবকের বুকে নতুন করে বাঁচার আর লড়াই করার সাহস জুগিয়ে দিত।
আরও পাঁচটি মাস কীভাবে যে কেটে গেল, উত্তরার ছায়াঘেরা দিনগুলোতে তা টেরই পাওয়া গেল না।
আজ ছিল এক স্নিগ্ধ, বাতাসভরা শ্রাবণের সন্ধ্যা। আজকের দিনটা অর্কোর জন্য ভীষণ বিশেষ আজ সে একত্রিশ বছরে পা দিল।
উত্তরার এই পাঁচতলা ভবনের বিশাল ছাদটার ওপর এক অপূর্ব ঘরোয়া উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। বাড়ির বাড়িওয়ালা পরিবারসহ বহু বছর ধরে আমেরিকায় থাকেন। অর্কো যখন হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করে ছাদটা ব্যবহারের অনুমতি চেয়েছিল, বাড়িওয়ালা হাসিমুখে এক কথায় রাজি হয়ে গিয়ে বলেছিলেন,
"অর্কো সাহেব, আপনার মতো একজন গুণী লেখকের জন্মদিন আমাদের বাড়ির ছাদে হবে এর চেয়ে গর্বের আর কী হতে পারে! আপনি যত খুশি আনন্দ করুন।"
ছাদের সমস্ত ডেকোরেশন আর আলোকসজ্জার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল একটি পেশাদার ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট টিমকে। তারা পুরো ছাদ জুড়ে হালকা হলুদ রঙের ফেয়ারি লাইট, সুন্দর কাঠের গোল টেবিল আর বাগানজুড়ে নান্দনিক সিটিং অ্যারেঞ্জমেন্ট সাজিয়ে এক স্বর্গীয় রূপকথার আবহ তৈরি করেছিল।
কিন্তু অর্কো বারবার ক্যাটারিং সার্ভিস থেকে খাবার অর্ডার দেওয়ার জন্য জোরাজুরি করলেও অর্পিতা কিছুতেই রাজি হয়নি। সে একরোখা জেদ ধরে বলল,
"আজ তোমার জন্মদিন অর্কো, তাছাড়া এত বড় বড় মেহমানরা আমাদের ঘরে আসবেন। বাইরে থেকে কেনা বাসি খাবার খাইয়ে আমি কারও সামনে মুখ দেখাতে পারব না। আমি নিজের হাতে সব রান্না করব।"
সারাটা দিন অর্পিতা রান্নাঘরে এক চুলও বিশ্রাম নেয়নি। নিজের হাতে রেঁধেছে গরুর শাহী রেজালা, জাফরানি মোরগ পোলাও, জালি কাবাব আর পেস্তা বাদাম দেওয়া জাফরানি ফিরনি। সাথে ওভেনে বেক করা তিন পাউন্ডের স্পেশাল বার্থডে কেক।
সন্ধ্যার পরেই একে একে এসে পৌঁছালেন বিশেষ অতিথিরা।
সবার আগে একগাল হাসি আর দুই কার্টন রাজকীয় রসমালাই নিয়ে হাজির হলো রাশেদ। এসেই সে অর্কোকে এক ঝাপটায় জড়িয়ে ধরে বলল,
"একত্রিশ বছর হয়ে গেল বুড়ো! এখনো তোকে দেখলে সেই যুবকই মনে হয় রে ভাই!"
অর্কো হেসে রাশেদের পিঠে হাত রাখল।
খানিক পরেই এলেন বন্ধু প্রকাশনের রফিক সাহেব। ধবধবে সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি পরা রফিক সাহেবের হাতে ছিল সদ্য বাঁধাই করা কিছু দুর্লভ বইয়ের উপহার।
আর ঠিক রাত আটটায় যখন অর্কোর অনেকদিনের বিনীত অনুরোধ আর ভালোবাসার নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে সিঁড়ি বেয়ে ছাদে এসে পা রাখলেন লেখক ইশরাক আহমেদ এবং তাঁর স্ত্রী মহিমা আহমেদ।
মহিমা আহমেদ অসম্ভব মার্জিত ও অমায়িক এক নারী। পরনে গাঢ় নীল রঙের জামদানি শাড়ি, মুখে এক শান্ত মাতৃত্বের আভা। এসেই তিনি অর্পিতা আর অর্পাকে পরম স্নেহে জড়িয়ে ধরলেন।
"অর্পিতা, তোমার কথা এত শুনেছি!"
অর্পিতা একটু লজ্জা পেয়ে চশমাটা ঠিক করে বলল,
"ভাবি, আপনারা যে আমাদের এই সামান্য ছাদটায় পা রেখেছেন, এটাই আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।"
ছাদের বাতাসে তখন পোলাও আর ফুলের সুবাস। ইভেন্ট টিমের সাজানো মৃদু আলোর নিচে টেবিলের চারপায়ে সবাই এসে দাঁড়াল।
কেকের ওপর জ্বলতে থাকা একত্রিশের মোমবাতিগুলোতে এক ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে ফেলল অর্কো। চারপাশ থেকে করতালি আর শুভেচ্ছার আনন্দধ্বনি উঠল—
"হ্যাপি বার্থডে অর্কো!"
অর্কো কেক কেটে প্রথম টুকরোটা তুলে দিল অর্পিতার মুখে। অর্পিতা ভেজা চোখে হাসল। এরপর রফিক সাহেব, রাশেদ, অর্পা আর মহিমা কে কেক খাওয়ানোর পর অর্কো পরম শ্রদ্ধায় এক টুকরো কেক তুলে ধরল ইশরাক সামনে।
ইশরাক কেক মুখে দিয়ে অর্কোর কাঁধে একটা শক্ত, গভীর স্নেহের হাত রাখলেন।
খানিক বাদে অর্পিতার হাতের রান্না করা রাজকীয় খাবার খেয়ে সবাই যখন প্রশংসায় পঞ্চমুখ, তখন ইশরাক আর অর্কো একটু আলাদা হয়ে ছাদের পশ্চিম কোণের রেলিংয়ের কাছে এসে দাঁড়ালেন। ওপাশে তখন রাতের ঢাকা শহরের দূরবর্তী বাতিগুলো তারার মতো জ্বলছে, বাতাসে শ্রাবণের ঠান্ডা আর্দ্রতা।
ইশরাক কফির মগে একটা চুমুক দিয়ে দূর দিগন্তের দিকে তাকালেন।
"অর্কো,গত কয়েক মাসে তোমার নীল জোছনার বিষাদ আর মায়ানগর আমি খুব খুঁটিয়ে পড়েছি।"
অর্কো একটু নার্ভাস হয়ে মুখ তুলে তাকাল।
"কেমন লেগেছে স্যার?"
ইশরাক মৃদু হাসলেন।
"স্যার বোলো না, ভাই বলো। তোমার লেখা পড়তে গিয়ে আমি একটা জিনিস খুব স্পষ্ট বুঝতে পেরেছি খ্যাতি বা টাকার স্রোত তোমার ভেতরের সততাকে বিন্দুমাত্র দূষিত করতে পারেনি। আজকাল অনেক তরুণ লেখক একটা বই হিট করলেই সস্তা বাণিজ্যের পেছনে ছোটে, গভীরতা হারিয়ে ফেলে।"
ইশরাক অর্কোর চোখের দিকে তাকালেন।
"সাহিত্য হলো একটা সাধনা অর্কো। এখানে নিজেকে উজাড় করে দিতে হয়। তুমি সেই সাধনায় খাঁটি। আমি বিশ্বাস করি, বাংলা সাহিত্যের সীমানা ছাড়িয়ে তুমি একদিন আন্তর্জাতিক পরিসরে দেশের নাম উজ্জ্বল করবে।"
অর্কোর গলার ভেতরটা আবেগে ভারী হয়ে এলো। সে মাথা নিচু করে বলল,
"ইশরাক ভাই... সেদিন বইমেলায় আপনি যদি আমার সেই সাধারণ বইটা হাতে তুলে না নিতেন, তবে আজ আমি কোথায় থাকতাম জানি না। আপনার ওই কয়েকটা কথাই আমার জীবনের বন্ধ দরজাগুলো এক নিমেষে খুলে দিয়েছিল।"
"আমি তো শুধু উছিলা ছিলাম অর্কো,"
ইশরাক তার পিঠে হাত রাখলেন।
"আসল আগুনটা তো তোমার বুকের ভেতরই জ্বলছিল। আমি শুধু বাতাস দিয়েছিলাম।"
ছাদের অন্য প্রান্তে তখন হাসির রোল। রাশেদ অর্পাকে মেসের পুরনো দিনের মজার গল্প শুনিয়ে হাসিয়ে মারছে, আর মহিমা মুগ্ধ হয়ে অর্পিতার বাগান করা আর রান্নার গল্প শুনছেন।
নতুন বছরের জানুয়ারি মাস যখন নামল, তখন উত্তরার শীতের সকালগুলো কুয়াশায় ঢাকা পড়ে থাকত।
বাসার ভেতরে তখন তুমুল ব্যস্ততা। অর্পার এইচএসসি পরীক্ষা ঘনিয়ে এসেছে। তার পড়ার টেবিলটা এখন ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি আর বায়োলজির মোটা মোটা গাইডে ঠাসা। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য সে এখন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পড়াশোনায় মগ্ন। অর্ক আর অর্পিতা কোনোভাবেই তার পড়ার পরিবেশ নষ্ট হতে দেয় না। প্রতিদিন সময়মতো গরম দুধ আর বাদাম দিয়ে অর্পাকে পড়তে বসিয়ে দেয় অর্পিতা।
এদিকে ফেব্রুয়ারি মাসের অমর একুশে বইমেলার প্রস্তুতি নিয়ে অর্কোর ব্যস্ততার কোনো শেষ ছিল না। রফিক সাহেব পল্টনের অফিস থেকে প্রায় প্রতিদিনই ফোন করে ড্রাফটের খোঁজ নিচ্ছেন। এই বছর বইমেলার জন্য অর্কো এমন একটি উপন্যাস লিখেছে, যা তার নিজের হৃদয়ের সবচেয়ে গভীর রক্তক্ষরণের গল্প। বইটির নাম সে দিয়েছে অস্তিত্বের মানচিত্র উপন্যাসটি আপাতদৃষ্টিতে একটি কাল্পনিক চরিত্র সাবিত এর গল্প হলেও, তার পরতে পরতে লুকিয়ে ছিল অর্কোর নিজের ফেলে আসা এতো বছরের হাড়ভাঙা সংগ্রাম। মেসের সেই স্যাঁতসেঁতে চিলেকোঠার রাত, এক হাজার টাকার জন্য কামরুল ভাইদের কাছে পাওয়া অপমান, পকেটে বিশ টাকা না থাকার তীব্র লজ্জা, আর সেই অন্ধকারের মাঝে অর্পিতার মতো এক নিঃস্বার্থ দেবীর আলো হয়ে পাশে এসে দাঁড়ানো সবকিছু সে সাহিত্যের ভাষায় বন্দি করে ফেলেছে। কল্পনার মোড়কে এই বই ছিল তার নিজেরই জীবনের এক জীবন্ত দলিল।
এক বিকেলে স্টাডি রুমে বসে উপন্যাসের চূড়ান্ত প্রুফ দেখছিল অর্কো, ঠিক তখনই তার মোবাইলটা তীব্র শব্দে বেজে উঠল।
স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে—
"রাশেদ" অর্কো হাসিমুখে ফোনটা রিসিভ করল,
"কী রে ব্যস্ত মানুষ! কয়দিন পর মনে পড়ল?"
ওপাশ থেকে রাশেদ কোনো ভূমিকা না করেই এক অদ্ভুত চাপা উত্তেজনায় বলে উঠল,
"দোস্ত, আমি তো বিয়ে করতেছি রে!"
অর্কোর হাত থেকে কলমটা খসে টেবিলের ওপর পড়ল। সে হতভম্ব হয়ে সোজা হয়ে বসল।
"কী বললি তুই? বিয়ে করছিস?"
"হ্যাঁ রে ভাই!"
রাশেদের গলার স্বরে তখন লজ্জামিশ্রিত আনন্দ উপচে পড়ছে।
"বাবা-মা গ্রামে এক অসম্ভব ভালো মেয়ের সন্ধান পেয়েছে। মা এক দেখাতেই পছন্দ করে ফেলেছে। কথা একদম পাকা। তুই, ভাবি আর অর্পা কিন্তু অবশ্যই ময়মনসিংহ আসবি! তোদের ছাড়া আমার বিয়ের আসরে কেউ থাকবে না।"
অর্কোর মুখে এক আকাশ সমান আনন্দ ছড়িয়ে পড়ল। সে হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করল,
"অবশ্যই যাব রে পাগল! কেন যাব না? কবে বিয়ে বল?"
"আগামী শুক্রবার!"
রাশেদ এক নিঃশ্বাসে বলল।
"কী!"
অর্কো চমকে উঠে চিৎকার করে ফেলল।
"আগামী শুক্রবার মানে? মাত্র চার দিন বাকি! এত তাড়াতাড়ি বিয়ে কেন রে?"
"আরে আর বলিস না!"
রাশেদ ওপাশ থেকে একটু বিরক্ত হয়ে হাসল।
"গ্রামের মুরব্বিদের হিসাব তো জানিসই। মেয়ের বাবা হজ্বে যাবেন সামনের মাসে, তাই মুরুব্বিরা শুভ দিন পেয়ে এক সপ্তাহের মধ্যে দিন ফেলে দিয়েছে। কোনো কথা শুনব না, তোরা কিন্তু বৃহস্পতিবার বিকেলেই গ্রামে চলে আসবি!"
ফোনটা কেটে দিয়ে অর্কো দ্রুত ড্রয়িংরুমে ছুটে গেল।
অর্পিতা তখন অর্পাকে ফল কেটে দিচ্ছিল। অর্কো এক নিঃশ্বাসে বলল,
"অর্পিতা, বিরাট খবর আছে! রাশেদ বিয়ে করছে। আগামী শুক্রবার ওদের গ্রামে!"
অর্পিতা ফল কাটার ছুরিটা রেখে চোখ বড় বড় করে তাকাল।
"এত তাড়াতাড়ি? মাশাআল্লাহ! কী যে ভালো লাগছে শুনে!"
অর্কো হাসল,
"ওদের গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহে। বৃহস্পতিবার বিকেলেই আমাদের সবাইকে চলে যেতে বলেছে।"
অর্পিতা এক মুহূর্তও চিন্তা না করে বলল,
"হ্যাঁ, আমরা অবশ্যই যাব! অর্পার তো শুক্র-শনি কোচিং বন্ধ থাকে। রাশেদ ভাইয়ার বিয়েতে আমরা না গেলে কে যাবে? আমি আজকেই ভাইয়ার বউয়ের জন্য সুন্দর গিফট কিনে রাখব।"
বৃহস্পতিবার বিকেলে একটি রিজার্ভ করা সাদা মাইক্রোবাসে করে অর্কো, অর্পিতা আর অর্পা এসে পৌঁছাল ময়মনসিংহের এক শান্ত গ্রামে।
রাস্তার দুপাশে সবুজ ধানের খেত, বাঁশঝাড়ের ছায়া আর মেঠোপথের স্নিগ্ধ শান্ত রূপ যেন শহরের সমস্ত ক্লান্তি এক লহমায় ধুয়ে দিল। রাশেদের পৈতৃক টিনশেডের বাড়িটার উঠোনে তখন লাল-নীল শামিয়ানা খাটানো হয়েছে, সাউন্ডবক্সে বাজছিল বিয়ের সানাইয়ের মিষ্টি সুর। রাশেদের বাবা-মা অর্কো আর অর্পিতাকে এমনভাবে জড়িয়ে ধরলেন যেন বহু বছর পর নিজেদের কোনো আপন সন্তান ঘরে ফিরেছে।
শুক্রবার সকাল থেকেই শুরু হলো বিয়ের মূল আনুষ্ঠানিকতা।
নতুন বউয়ের নাম মরিয়ম গ্রামের এক শান্ত, মিষ্টি চেহারার মেয়ে। অর্পিতা আর অর্পা হাসিমুখে ঘরে ঢুকে বউকে দেখে জড়িয়ে ধরল, অর্কো নিজের তরফ থেকে নতুন ভাবির হাতে তুলে দিল একটি সুন্দর স্বর্ণের চেইন।
দুপুরের দিকে কাজী এসে বিয়ের রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করলেন। উঠোনে ধোঁয়া ওঠা সুগন্ধি পোলাও, খাসির রেজালা আর টিকিয়া কাবাবের রাজকীয় ভোজ চলল। গ্রামের শত শত মানুষের ভিড় আর কোলাহলে বাড়িটা তখন এক উৎসবমুখর আমেজে ভাসছিল।
বিকেল চারটার দিকে যখন চারপাশের মানুষ বরযাত্রীর বিদায় আর গল্পগুজবে ব্যস্ত, তখন অর্কো একটু নিরিবিলির খোঁজে পেছনের সুপারি বাগানের ধারের এক কাঠের মাচায় গিয়ে বসল।
মাটি থেকে ভেসে আসছিল ভেজা ঘাসের গন্ধ। পকেট থেকে স্মার্টফোনটা বের করে অর্কো নোটস অ্যাপে লিখতে শুরু করল কিছু ভাবনার টুকরো।
তার মনের ভেতর এবার এক নতুন চিন্তা ডানা মেলছিল। সে এবার সম্পূর্ণ ইংরেজিতে একটি নতুন আন্তর্জাতিক মানের উপন্যাস লেখার পরিকল্পনা করছে যা বিশ্ব সাহিত্যের দরবারে বাংলাদেশের মানুষের আত্মত্যাগ গভীরতাকে তুলে ধরবে। সেই গল্পের প্লট, দর্শন আর চরিত্রগুলো নিয়ে সে একদৃষ্টিতে ফোনে নোট করছিল।
ঠিক তখনই তার ফোনের স্ক্রিনজুড়ে ভেসে উঠল একটি অপরিচিত ল্যান্ডলাইন নম্বর।
রিং... রিং...
লেখার মনঃসংযোগে ব্যাঘাত ঘটায় অর্কো কোনো আগ্রহ না পেয়ে কলটা কেটে দিয়ে আবার লিখতে বসল। কিন্তু সেকেন্ড দশেকের মধ্যেই একই নম্বর থেকে আবার তীব্র বেগে ফোন বেজে উঠল। অর্কো দ্বিতীয়বারও কলটা কেটে দিল।
কিন্তু নম্বরটি থামল না। তৃতীয়বারের মতো ফোনটি বাজতেই অর্কো একটু বিরক্ত হয়ে কলটা রিসিভ করে কানে তুলল।
"হ্যালো? কে বলছেন?"
অর্কোর কণ্ঠে স্পষ্ট বিরক্তির সুর।
ওপাশ থেকে অত্যন্ত মার্জিত ও গম্ভীর এক কণ্ঠ ভেসে এলো,
"আসসালামু আলাইকুম। আমি কি কথাসাহিত্যিক অর্কো আহমেদের সাথে কথা বলছি?"
"জি, আমি অর্কো আহমেদ। বলুন, কী বিষয়?"
"আমি বাংলা একাডেমি থেকে মহাপরিচালকের ব্যক্তিগত সচিব বলছি,"
ওপাশ থেকে ভদ্রলোক বললেন।
"আগামী একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের জাতীয় পদক ও বিশেষ সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে আপনাকে উপস্থিত থাকতে হবে।"
অর্কো ভাবল হয়তো একুশে ফেব্রুয়ারির কোনো সাধারণ সাহিত্য সেমিনার বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে দর্শক হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। সে কাজের ব্যস্ততার কথা ভেবে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,
"আচ্ছা... ধন্যবাদ আমন্ত্রণের জন্য। আমি যদি ঢাকায় থাকি আর সময় পাই, তবে আসব ইনশাআল্লাহ।"
ওপাশের ভদ্রলোক একটু জোর দিয়ে বললেন,
"না স্যার, সময় পেলে নয়। আপনাকে আগামী একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমির মূল মিলনায়তনে সশরীরে উপস্থিত থাকতেই হবে!"
এবার অর্কো সত্যিই কিছুটা বিরক্ত হয়ে উঠল। তার গলার স্বর শক্ত হয়ে গেল,
"দেখুন ভাইয়া, আমি এই মুহূর্তে একটা জরুরি পারিবারিক অনুষ্ঠানে ঢাকার বাইরে আছি। তাছাড়া আমার নতুন বইয়ের খসড়ার কাজ চলছে, পরিবার আছে। আমি কোনো গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারছি না যে সময় বের করে যেতে পারব কি না—"
অর্কর কথা শেষ হওয়ার আগেই ওপাশ থেকে ভদ্রলোক খুব বিনম্র কিন্তু স্পষ্ট গম্ভীর কণ্ঠে বললেন—
"মিস্টার অর্কো আহমেদ... আপনাকে কোনো সাধারণ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে না।"
ভদ্রলোক এক মুহূর্ত থামলেন। তারপর প্রতিটি শব্দ যেন স্পষ্ট উচ্চারণে বলে উঠলেন—
"কথাসাহিত্যে আপনার অসামান্য ও যুগান্তকারী অবদানের জন্য এ বছর আপনাকে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার এ ভূষিত করা হয়েছে। আগামী একুশে ফেব্রুয়ারির মূল রাষ্ট্রীয় সম্মাননা অনুষ্ঠানে আপনার হাতে এই জাতীয় পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে।"
অর্কর হাত থেকে ফোনটা যেন প্রায় আলগা হয়ে খসে পড়ছিল।
সুপারি বাগানের বাতাসে দোলা পাতাগুলোর শব্দ, দূরের সানাইয়ের সুর আর পুরো পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল যেন এক নিমেষে নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
অর্কো স্তব্ধ হয়ে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ দুটো স্থির হয়ে গেছে, বুকের ভেতর হৃৎস্পন্দন বন্ধ হওয়ার উপক্রম।
ফোনের ওপাশের স্তব্ধতা ভেঙে অর্কোর মুখ দিয়ে কোনোমতে কাঁপাকাঁপা গলায় একটি বাক্যই বের হলো—
"ম... মজা করছেন না তো আমার সাথে ভাইয়া?"
ওপাশ থেকে ভদ্রলোক মৃদু হেসে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে বললেন,
"জাতীয় পুরস্কার নিয়ে কেউ কোনোদিন রসিকতা করে না, স্যার। বাংলা একাডেমির জুরি বোর্ড সর্বসম্মতিক্রমে আপনার নাম চূড়ান্ত করেছে। আপনাকে অগ্রিম অভিনন্দন, অর্কো আহমেদ স্যার।"
ফোনটা কেটে যেতেই কয়েক সেকেন্ড যেন পুরো পৃথিবীর সমস্ত শব্দ নিথর হয়ে গেল। অর্কো নিজের হাতের স্মার্টফোনটার দিকে তাকিয়ে রইল, হাত দুটো থরথর করে কাঁপছে।
পরক্ষণেই যেন তার ভেতরের সমস্ত শক্তি এক বিস্ফোরণের মতো বাঁধ ভেঙে দিল!
সুপারি বাগানের মাচা ছেড়ে সে উঠোন দিয়ে এক দৌড়ে ছুটে গেল পেছনের টিনশেডের পাকা ঘরটার দিকে। উঠোনের ঘাসের ওপর তার জুতো ছিটকে গেল, কিন্তু সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই।
ঘরের কাঠের দরজাটা এক ধাক্কায় ঠেলে ভেতরে ঢুকল সে।
ভেতরে খাটের ওপর অর্পিতা আর অর্পা বসে নতুন শাড়ির ভাঁজ খুলছিল। হঠাৎ অর্কোকে এভাবে খালি পায়ে, হাঁপাতে হাঁপাতে ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকতে দেখে অর্পিতা চমকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল।
"অর্কো! কী হয়েছে? এমন করছ কেন?"
অর্কো কোনো কথা বলতে পারল না। তার বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছিল। সে এক পা এগিয়ে অর্পার সামনেই কোনো সংকোচ না রেখে অর্পিতাকে দুই হাতে জড়িয়ে শূন্যে তুলে ফেলল!
"অর্পিতা! আমি পুরস্কার পাচ্ছি অর্পিতা!"
অর্কোর সেই চিৎকারে পুরো টিনের চালটা যেন কেঁপে উঠল।
"বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার! আমি এ বছরের জাতীয় পুরস্কার পাচ্ছি!"
অর্পিতা স্তব্ধ হয়ে গেল। তার চশমার কাঁচের ওপাশে চোখ দুটো বিস্ময়ে স্থির হয়ে রইল।
"বাংলা একাডেমি? তুমি সত্যি বলছ অর্কো?"
"হ্যাঁ! একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমির মূল মঞ্চে আমাকে পুরস্কার দেওয়া হবে!"
অর্কোর চোখ দিয়ে তখন বাধভাঙা অশ্রু নামছিল।
অর্পা এক লাফে খাট থেকে নেমে এসে আনন্দে চিৎকার করে হাততালি দিয়ে উঠল,
"আপু! দুলাভাই ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পাচ্ছে!"
ঘরের সেই তীব্র চিৎকার আর কান্নার শব্দ বাইরে উঠোন পর্যন্ত পৌঁছে গেল। বাইরে বরযাত্রীদের সাথে কথা বলছিল রাশেদ। চিৎকার শুনে সে ভাবল কোনো অঘটন ঘটেছে, তাই শেরওয়ানির কোণা ধরে এক দৌড়ে ঘরে ঢুকে পড়ল।
"কী হয়েছে? চেঁচামেচি কিসের?"
রাশেদ হাঁপাতে হাঁপাতে ঢুকল।
অর্পা এক ছুটে গিয়ে বলল,
"ভাইয়া! দুলাভাই দেশের সবচেয়ে বড় সাহিত্য পুরস্কার বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাচ্ছে!"
রাশেদের মুখের সমস্ত পেশি যেন এক সেকেন্ডের জন্য জমে গেল।
পরক্ষণেই সে উল্লাসে লাফিয়ে উঠে অর্কোকে জাপটে ধরে জড়িয়ে ফেলল।
"অর্কো! কী বলিস তুই শালা! সত্যি? সত্যি ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড?"
"হ্যাঁ রে রাশেদ!"
অর্কো রাশেদের পিঠ খামচে ধরে হাসতে হাসতে কেঁদে ফেলল।
রাশেদ দরজায় গিয়ে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে ডাকতে লাগল,
"মা! বাবা! মরিয়ম! সবাই এদিকে আসো! জলদি আসো!"
মুহূর্তের মধ্যে নতুন বউ মরিয়ম আর রাশেদের বাবা-মা ছুটে এলেন ঘরে। খবরটা শোনামাত্রই রাশেদের মা দুই হাত তুলে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করলেন।
রাশেদ আর তর সইতে পারল না। সে সোজা রান্নাঘরের দিকে ছুটে গিয়ে বিয়ের জন্য বানানো বিশাল অ্যালুমিনিয়ামের ট্রের ওপর থেকে গরম, রসালো মচমচে জিলাপির স্তূপ নিয়ে ঘরে ফিরে এলো।
"আজকের দিনটা ইতিহাস!"
রাশেদ এক টুকরো বড় জিলাপি ভেঙে অর্কোর মুখে পুরে দিল।
অর্কো সেই মিষ্টি জিলাপি মুখে নিয়ে অর্পিতার মুখে এক টুকরো তুলে দিল, তারপর মরিয়ম, অর্পা আর বাবা-মাকে নিজের হাতে মিষ্টিমুখ করাল।
টিনশেডের সেই ছোট ঘরটায় তখন বিয়ের সানাইয়ের সুরকে ছাপিয়ে বইছিল এক রাজকীয় গৌরবের হাওয়া।
একুশে ফেব্রুয়ারির সকালটা ছিল স্নিগ্ধ এবং ভাবগম্ভীর।
ভাষা শহীদদের স্মরণে পুরো ঢাকা শহর তখন সাদা আর কালোর এক অদ্ভুত শ্রদ্ধাময় আবহে মোড়া। বাংলা একাডেমির মূল মিলনায়তনের চারপাশ জাতীয় পতাকা, ফুল আর একুশের ব্যানারে সাজানো হয়েছে। মিলনায়তনের ভেতরে তখন দেশের শীর্ষস্থানীয় সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক আর রাষ্ট্রীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপচে পড়া ভিড়।
ভিআইপি সারির একেবারে সামনের দিকে বসে ছিল অর্পিতা আর অর্পা।
অর্পিতার পরনে একুশের ঐতিহ্যবাহী সাদা-কালো জামদানি শাড়ি, চোখে সেই পরিচিত চশমা। পাশে বসা অর্পার চোখেমুখে তখন অপার্থিব রোমাঞ্চ। অর্পিতার বুকের ভেতরটা এক অজানা আনন্দে ড্রামের মতো লাফাচ্ছিল।
ঘড়ির কাঁটায় তখন ঠিক এগারোটা।
মঞ্চের উপস্থাপক গম্ভীর ও স্পষ্ট কণ্ঠে মাইকে ঘোষণা করলেন—
"বাংলা সাহিত্যের কথাসাহিত্যে অনন্য, যুগান্তকারী এবং মানবিক অবদানের জন্য এ বছর বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার এ ভূষিত হয়েছেন তরুণ কথাসাহিত্যিক অর্ক আহমেদ।"
মুহূর্তের মধ্যে পুরো মিলনায়তন জুড়ে হাজারো মানুষের তুমুল করতালি আর ক্যামেরার অবিরাম ফ্ল্যাশ লাইটের আলোয় চারপাশ ঝলমল করে উঠল।
কালো রঙের পাঞ্জাবির ওপর গাঢ় ছাই রঙের কোট পরা অর্কো আহমেদ ধীর, আত্মবিশ্বাসী পদক্ষেপে সিঁড়ি বেয়ে মঞ্চে উঠে এলো।
মঞ্চের কেন্দ্রস্থলে দাঁড়িয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত আন্তরিক হাসিতে অর্কোর দুই হাতে তুলে দিলেন কাঙ্ক্ষিত সেই ভারী ব্রোঞ্জের স্মারক ক্রেস্ট, সম্মাননাপত্র এবং আর্থিক পুরস্কারের চেক। করতালি তখন যেন থামতেই চাইছিল না।
পুরস্কার গ্রহণ শেষে উপস্থাপক অর্কোকে ডায়াসের সামনে এসে কিছু বলার আহ্বান জানালেন।
অর্কো মাইক্রোফোনের সামনে এসে দাঁড়াল। পুরো মিলনায়তন এক নিমেষে পিনপতন নিস্তব্ধতায় ডুবে গেল। টেলিভিশনের ডজনখানেক ক্যামেরা তখন সরাসরি তার দিকে তাক করা।
অর্কো এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করল। তারপর সামনের সারিতে বসে থাকা অর্পিতার দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত, গভীর অথচ স্পষ্ট কণ্ঠে বলতে শুরু করল—
"শুভ সকাল।
আজকের এই ঐতিহাসিক দিনে দাঁড়িয়ে আমি কোনো বড় বড় তত্ত্বের কথা বলব না। আমি শুধু স্মরণ করতে চাই এই ঢাকা শহরের সেই সব অন্ধকার মেসের রাতগুলোকে, যেখানে হাজার হাজার তরুণ পেটে ক্ষুধা আর চোখে এক বুক স্বপ্ন নিয়ে ছটফট করে। আমি স্মরণ করতে চাই সেই দিনগুলোকে, যখন এই শহরের প্রতিটি দরজায় আমার শব্দের কোনো মূল্য ছিল না।
সাহিত্য কোনো ড্রয়িংরুমের সাজানো ফুলদানি নয়। সাহিত্য জন্ম নেয় মাটির মানুষের দীর্ঘশ্বাস, ক্ষুধা, অপমান আর বেঁচে থাকার চরম লড়াইয়ের গর্ভ থেকে। আমি সেই সাধারণ লড়াইয়ের একজন সামান্য কলম মাত্র।
এই জাতীয় সম্মাননা আমি উৎসর্গ করছি বাংলাদেশের সেই সমস্ত তরুণদের, যারা শূন্য পকেটেও স্বপ্ন দেখার সাহস হারায় না। আর..."
অর্কোর গলার স্বর সামান্য কেঁপে উঠল। সে সরাসরি অর্পিতার চোখের দিকে চোখ রাখল।
"...আর এই পুরস্কার সেই মানুষটির, যে আমার জীবনের সবচেয়ে ঘোরতর অন্ধকারে একমুঠো আলো হয়ে পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। যে না থাকলে এই অর্কো আহমেদ বহু আগেই এই শহরের ধুলোয় হারিয়ে যেত। ধন্যবাদ সবাইকে।"
বক্তব্য শেষ হতেই পুরো মিলনায়তনের সমস্ত মানুষ একযোগে আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাততালির ঝড় তুলল
মঞ্চ থেকে নামার প্রতিটি ধাপে ক্যামেরার ফ্ল্যাশ লাইট তখন অর্কোকে অনুসরণ করছিল। কিন্তু অর্কো কোনো সাংবাদিক বা আলোকচিত্রীর দিকে তাকাল না।
সে সোজা হেঁটে চলে এলো সামনের সারির দিকে।
সামনে এসে দাঁড়াতেই দেখল অর্পিতা তখন দুই চোখ বেয়ে অঝোরে পানি ঝরিয়ে হাসছে।
অর্কো কোনো কথা না বলে নিজের দুই হাত বাড়িয়ে সেই ভারী ব্রোঞ্জের স্মারক ক্রেস্ট এবং সম্মাননাপত্রটি পরম শ্রদ্ধায় তুলে দিল অর্পিতার কাঁপতে থাকা হাতের তালুতে।
অর্পিতা দুই হাতে পুরস্কারটি বুকে জড়িয়ে ধরল।
হাজার হাজার মানুষের উল্লাস আর ক্যামেরার ঝলকানির মাঝে দাঁড়িয়ে অর্কো আর অর্পিতা একে অপরের চোখের দিকে চেয়ে রইল।
বাইশে ফেব্রুয়ারির মিষ্টি সকালে উত্তরার বারান্দায় রোদ এসে উপচে পড়ছিল।
গাছের টবগুলোতে তখন পানি দেওয়া শেষ করে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা হাতে নিয়ে ডাইনিং টেবিলের চেয়ারে বসল অর্পিতা। ঠিক তখনই স্টাডি রুম থেকে হাসতে হাসতে ফোন হাতে ছুটে এলো অর্কো।
"অর্পিতা! এই দেখ কাণ্ড!"
অর্কো এসে সোফায় বসে নিজের ফোনটা অর্পিতার চোখের সামনে ধরল।
ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম থেকে শুরু করে দেশের বড় বড় সব নিউজ পোর্টালের টাইমলাইনে তখন একটাই ছবি এক নম্বর ট্রেন্ডিংয়ে ভাসছে।
কালকের সেই পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানের মুহূর্ত মঞ্চ থেকে নেমে এসে ভিআইপি সারিতে দাঁড়ানো অর্পিতার অশ্রুসিক্ত চোখের সামনে অর্কোর সেই পুরস্কার তুলে দেওয়ার এবং অর্পিতার বুকভরা গভীর আলিঙ্গনের একটি হাই-রেজোলিউশন ক্যান্ডিড শট। দেশের এক নামকরা সংবাদপত্রের ফটোসাংবাদিকের লেন্সে নিখুঁতভাবে বন্দি হয়েছে সেই ফ্রেম।
ছবিটি ইতিমধ্যে কয়েক লাখ মানুষ শেয়ার করে ফেলেছে। কমেন্ট বক্সে শত শত পরিচিত-অপরিচিত মানুষ, বড় বড় তারকারা ভালোবাসার কথা লিখে ভরিয়ে দিচ্ছে। প্রতিটি পোস্টে একটাই আলোচনা—
“একজন পুরুষকে শূন্য থেকে শীর্ষে নিয়ে যেতে একজন নারীর নিঃস্বার্থ বিশ্বাসের শক্তি কতখানি হতে পারে, তা এই ছবি না দেখলে বোঝা যায় না”
“ভালোবাসা যদি খাঁটি হয়, তবে এই পৃথিবীও মাথা নত করতে বাধ্য।”
অর্পিতা নিজের চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে স্ক্রিনের লেখাগুলোর দিকে তাকিয়ে একটু লজ্জা পেয়ে গেল। তার কান দুটো লাল হয়ে উঠল।
কিন্তু অর্কোর দৃষ্টি তখন অন্য জায়গায়। সে ছবিটা জুম করতে করতে শব্দ করে হেসে উঠল।
"আরে আরে, এই দিকটা দেখ!"
অর্কো অর্পিতার মুখের সামনে স্ক্রিনটা আরও এগিয়ে দিয়ে খিলখিল করে হাসতে লাগল,
"সবাই ফেসবুকজুড়ে তোমার এত রূপ আর গুণের স্তুতি গাইছে, কিন্তু কেউ কি খেয়াল করেছে অতিরিক্ত কান্নার চোটে তোমার চোখের আইলাইনার গলে গাল বেয়ে কালো দাগ হয়ে নেমে যাচ্ছিল? হা হা হা! এই ঐতিহাসিক ছবিতেও তোমার মেকআপ গলে একাকার!"
অর্পিতা এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর লজ্জায় আর হাসিতে লাল হয়ে এক ঝটকায় অর্কোর কাঁধে একটা আলতো চাপড় বসিয়ে দিল।
"থামো তো তুমি! সারাক্ষণ শুধু দুষ্টুমি!"
অর্পিতা মুখ ফিরিয়ে হাসতে হাসতে ওড়না দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলল।
"কালকের ওই মুহূর্তে কি কারও চোখের কাপানি বা আইলাইনারের কথা মনে থাকে নাকি? তুমি না একদম একটা আস্ত পাগল!"
রাত তখন গভীর। উত্তরার আকাশ জুড়ে এক নিস্তব্ধ অন্ধকার নেমে এসেছে।
স্টাডি রুমের মাঝখানে রাখা সেই মেসের পুরনো, কালির দাগে ভরা ঐতিহাসিক কাঠের পড়ার টেবিলটার ওপর ঝুঁকে বসে ছিল অর্কো। টেবিল ল্যাম্পের সাদা আলো এসে পড়েছে ল্যাপটপের উজ্জ্বল পর্দার ওপর। স্ক্রিনের ওপর একটা ব্ল্যাঙ্ক ডকুমেন্টে কার্সরটা একটানা জ্বলছে আর নিভছে।
অর্কোর মাথার ভেতর তখন তীব্র এক সাইকোলজিক্যাল ঝড় বইছিল। দুই হাতে নিজের চুল খামচে ধরে সে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিল।
পরবর্তী উপন্যাসটি সে ইংরেজিতে লিখতে চায় এমন এক গল্প যা বিশ্ব সাহিত্যের দরবারে মানুষের অস্তিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। কিন্তু গত তিন দিন ধরে শত চেষ্টা করেও সে কোনো উপযুক্ত প্লট বা দর্শনের কূল-কিনারা করতে পারছিল না। তার চেয়েও বড় ভয়, নিজের ভেতরের এক অদ্ভুত আত্মসংশয় তাকে প্রতিনিয়ত কুরে কুরে খাচ্ছিল।
"আমি কি সত্যিই পারব? ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির আন্ডারে সাধারণ এক কলেজ থেকে ইংলিশে অনার্স করেছি ঠিকই, কিন্তু আন্তর্জাতিক স্তরের গভীর সাহিত্যিক ইংরেজি কি আমার কলমে আসবে? যদি ভাষা দুর্বল হয়ে যায়? যদি আমার দর্শনটা বিশ্বপাঠকের কাছে হাস্যকর শোনায়?"
অস্থিরতায় তার কপাল বেয়ে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছিল।
ঠিক তখনই স্টাডি রুমের কাঠের দরজাটা নিঃশব্দে খুলে গেল।
হাতে ধোঁয়া ওঠা এক কাপ স্পেশাল আদা-চা নিয়ে ঘরে ঢুকল অর্পিতা। পরনে তার সাধারণ একটা হালকা নীল রঙের সুতির থ্রি-পিস। অর্কোর এই বিধ্বস্ত চেহারা দেখে অর্পিতার চোখ দুটো মায়ায় ভরে উঠল। সে চায়ের কাপটা খুব সাবধানে টেবিলের একপাশে রাখল।
তারপর অর্কোর ঠিক পাশে এসে দাঁড়িয়ে নিজের গায়ে পরা থ্রি-পিসের সুতির নরম ওড়নার খুঁটটা দিয়ে খুব আলতো করে মুছে দিল অর্কোর কপালের সমস্ত ঘাম।
"এত প্রেশার নিলে কি শরীর বাঁচে অর্কো?"
অর্পিতা পরম যত্নে অর্কোর কপালে নিজের নরম হাতটা রেখে বলল।
"দুই দিন ধরে দেখছি তুমি ঠিকমতো ঘুমাচ্ছ না, খাওয়া-দাওয়ার কোনো ঠিক নেই। একটু রিল্যাক্স করো, চোখ বন্ধ করে একটু রেস্ট নাও। তারপর মন শান্ত করে আবার শুরু করো।"
অর্কো অর্পিতার হাতটা নিজের কপাল থেকে নামিয়ে দুই হাতের মুঠোয় চেপে ধরল। তার চোখের দৃষ্টিতে ছিল এক গভীর অসহায়ত্ব।
"আমি কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছি না অর্পিতা,"
অর্কো খুব নিচু, কাঁপাকাঁপা গলায় বলতে শুরু করল।
"একটা ভালো বিষয় পাচ্ছি না। যা ভাবছি, সবই কেমন যেন সস্তা বা চর্বিতচর্বণ মনে হচ্ছে। তার ওপর নিজের ভাষার ওপরও কেমন যেন একটা ভয় কাজ করছে। ইংলিশে অনার্স করেছি সত্যি, কিন্তু দীর্ঘ চার বছর তো বাংলায় লিখেছি। আন্তর্জাতিক সাহিত্যের ওই নিখুঁত, ধারালো শব্দবিন্যাস কি আমি ফুটিয়ে তুলতে পারব?"
অর্পিতা একটু হাসল। সে টেবিলের পাশের কাঠের চেয়ারটা টেনে অর্কোর মুখোমুখি বসল।
"ভয় মানুষের মেধার সবচেয়ে বড় শত্রু অর্কো,"
অর্পিতা শান্ত অথচ প্রত্যয়ী চোখে তার দিকে তাকাল।
"ভাষা তো কেবল একটা মাধ্যম, আসল হলো তোমার অনুভূতির সত্যতা। যে মানুষটা মেসের এক চিলতে ঘরে বসে বারোশত পাতার বাংলা মহাকাব্য লিখে লক্ষ মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে ফেলতে পারে, সে যদি নিজের সৎ অনুভূতি দিয়ে ইংরেজিতে লেখে—তা বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের মানুষের বুকেও ঠিক একইভাবে তীরের মতো বিঁধবে।"
অর্পিতা একটু ঝুঁকে এসে বলল,
"তুমি কী নিয়ে লিখতে চাইছ আসলে? তোমার মনের ভেতর ঠিক কী ভাবনা ঘুরপাক খাচ্ছে?"
অর্কো চায়ের কাপে একটা ছোট চুমুক দিল। আদা-চায়ের উষ্ণতা তার গলার শুকিয়ে যাওয়া ভাবটা একটু দূর করল।
"আমি কোনো সস্তা গল্প লিখতে চাই না অর্পিতা,"
অর্কো বলতে লাগল।
"আজকাল প্রযুক্তির যে জয়জয়কার... মানুষ ভাবছে এআই আর টেকনোলজিই বোধহয় আমাদের সব সমস্যার সমাধান করে দেবে। কিন্তু আমি ঠিক কোনো পিওর সায়েন্স-ফিকশন স্পেসশিপের গল্প লিখতে চাই না। আমি লিখতে চাই খাঁটি সাইকোলজিক্যাল ও অস্তিত্ববাদী এক লিটারেরি উপন্যাস।"
অর্পিতা গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছিল।
"যেমন?"
অর্কোর চোখ দুটো হঠাৎ কেমন যেন উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে টেবিলের ওপর হাত রেখে দ্রুত বলে যেতে লাগল—
"ধরো ভবিষ্যতের এমন এক পৃথিবী, যেখানে উন্নত প্রযুক্তি মানুষের প্রায় সব জাগতিক সমস্যার চূড়ান্ত সমাধান করে ফেলেছে। পৃথিবীতে কোনো ক্ষুধা নেই, কোনো মরণব্যাধি নেই, কোনো যুদ্ধ নেই। এমনকি মানুষ যাতে কখনো একাকীত্বে না ভোগে, সেজন্যও নিখুঁত অ্যালগরিদম তৈরি হয়েছে। কোনো শারীরিক বা মানসিক কষ্ট বলতে সেই সমাজে কিছু নেই।"
অর্পিতা চোখ বড় বড় করে তাকাল,
"বাইরে থেকে দেখতে তো মনে হবে এক স্বর্গীয় পৃথিবী!"
"ঠিক সেখানেই আমার প্রশ্ন!"
অর্কো চেয়ার ছেড়ে একপ্রকার উত্তেজনায় সোজা হয়ে দাঁড়াল।
"সব পেয়ে গেলে মানুষের মানুষ হওয়ার অর্থটা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়? গল্পের মূল চরিত্র কোনো সুপারহিরো হবে না। সে ওই নিখুঁত, যন্ত্রণাহীন সমাজের এক অতি সাধারণ মানুষ। কিন্তু সে ধীরে ধীরে এক ভয়ংকর সত্য আবিষ্কার করবে যে সমাজে কোনো দুঃখ নেই, কোনো হারানোর বেদনা নেই, কোনো ব্যর্থতা বা মেমোরির ক্ষত নেই সেই সমাজে আসলে সত্যিকারের ভালোবাসারও কোনো অস্তিত্ব থাকতে পারে না!"
অর্পিতার নিঃশ্বাস যেন এক মুহূর্তের জন্য বন্ধ হয়ে গেল। সে স্তব্ধ হয়ে শুনছিল।
অর্কোর গলার স্বর এবার এক গভীর দার্শনিক মাত্রায় পৌঁছে গেল—
"মানুষের আসল পরিচয়ই তো তার অপূর্ণতা, তার ভুল, তার চোখের পানি আর বুকভাঙা যন্ত্রণার মধ্যে। যখন তুমি কোনো কিছু হারিয়ে ফেলার তীব্র ভয় অনুভব করবে, তখনই তো তুমি তাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতে পারবে। গল্পটার মূল সংঘাতটা হবে চরম আত্মিক Would you choose a painless life without genuine love, or a painful life where love actually means something? তুমি কি এমন এক যন্ত্রণাহীন কৃত্রিম অমরত্ব বেছে নেবে যেখানে ভালোবাসার কোনো গভীরতা নেই, নাকি এমন এক নশ্বর, দুঃখভরা জীবন বেছে নেবে যেখানে প্রতিটা চোখের জলের বিনিময়ে ভালোবাসার আসল অর্থটা উপলব্ধি করা যায়?"
পুরো স্টাডি রুমের ভেতর এক অবিশ্বাস্য নিস্তব্ধতা নেমে এলো।
টেবিল ল্যাম্পের আবছা আলোয় অর্পিতা অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল অর্কোর মুখের দিকে। তার চশমার কাঁচের ওপাশে চোখ দুটো তখন এক গভীর বিস্ময় আর শ্রদ্ধায় জ্বলজ্বল করছে।
অর্পিতার গলার স্বর আবেগে কেঁপে উঠল। সে অর্কোর হাতটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে বলল,
"তুমি পেয়ে গেছ। এটাই তোমার গল্প। এটা শুধু কোনো উপন্যাস নয়, এটা আধুনিক মানবজাতির হারিয়ে যাওয়া আত্মার খোঁজে এক কালজয়ী চিঠি হতে চলেছে। তুমি শুরু করো অর্কো। এক সেকেন্ডও আর দ্বিধা কোরো না।"
অর্কোর চোখের সামনে থেকে সমস্ত কুয়াশা এক নিমেষে কেটে গেল। তার রক্তের প্রতিটি কণিকায় আবার সেই চেনা সৃষ্টিশীল আগুনটা দাউদাউ করে জ্বলে উঠল।
সে আর এক মুহূর্তও নষ্ট করল না।
চায়ের কাপের শেষ চুমুকটা দিয়ে সে সোজা গিয়ে বসল সেই ঐতিহাসিক পড়ার টেবিলটার সামনে। ল্যাপটপের সাদা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে সে কি-বোর্ডে নিজের দীর্ঘদিনের তৃষ্ণার্ত আঙুলগুলো রাখল।
টেবিল ল্যাম্পের নরম আলোর নিচে, উত্তরার নিঝুম রাতের বুকে জন্ম নিতে শুরু করল এক নতুন বৈশ্বিক উপন্যাসের প্রথম ইংরেজি বাক্যটি।
পরের কয়েকটা দিন অর্কোর জন্য ছিল তীব্র মানসিক এক লড়াইয়ের মতো।
স্টাডি রুমের মেঝের এক কোণে কাগজের দলা জমে উঠেছিল। ল্যাপটপের কি-বোর্ডে আঙুল চলত ঠিকই, কিন্তু গোটা দুয়েক প্যারাগ্রাফ লেখার পরই অর্কো আবার ব্যাকস্পেস চেপে সব মুছে ফেলত।
বাংলায় লেখার সময় শব্দগুলো তার মন থেকে নদীর মতো আপনাআপনি বেরিয়ে আসত। সেখানে কোনো আড়ষ্টতা থাকত না, মনের প্রতিটা সূক্ষ্ম অনুভূতি খুব সহজে বাক্যে রূপ পেত। কিন্তু ইংরেজিতে লিখতে গিয়েই সে এক অদৃশ্য দেয়ালে ধাক্কা খাচ্ছিল। শব্দগুলো খুব যান্ত্রিক লাগছিল, বাক্যগুলোর ভেতর যেন কোনো প্রাণ পাওয়া যাচ্ছিল না।
রাত তখন একটা বেজে গেছে। ল্যাপটপের স্ক্রিনটা বন্ধ করে দিয়ে অর্কো দুই হাতে মুখ ঢেকে বসে রইল।
দরজা খুলে ঘরে ঢুকল অর্পিতা। হাতে এক গ্লাস পানি। অর্কোকে এমন বিধ্বস্তভাবে বসে থাকতে দেখে সে টেবিলের পাশে এসে দাঁড়াল এবং গ্লাসটা অর্কোর সামনে নামিয়ে রাখল।
“কী অর্কো? এখনো কিছু হয়নি?”
অর্কো একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চেয়ারে হেলান দিল। মুখ তুলে অসহায় ভঙ্গিতে বলল,
“ধুর , একদম হচ্ছে না। মাথা পুরা জ্যাম হয়ে আছে।”
“কী হচ্ছে বলো তো? আইডিয়া তো আগেই ঠিক করে ফেলেছিলে।”
“আইডিয়া তো মাথায় ঘুরতেছে,”
অর্কো হাত নেড়ে বিরক্তি প্রকাশ করল।
“কিন্তু লিখতে গেলেই সমস্যা হচ্ছে। বাংলায় যখন লিখি, মনের ভেতর একটা আলাদা ফিল কাজ করে। কিন্তু ইংরেজিতে যেই লিখতে যাই, মনে হয় যেন বসে বসে অনুবাদ করতেছি। কথাগুলো একদম কাঠের মতো শক্ত লাগতেছে, কোনো ইমোশনই আসতেছে না। এভাবে চললে এই বই আমি কোনোদিন শেষ করতে পারব না।”
“আরে বোকা, তুমি এত অস্থির হচ্ছ কেন?”
অর্পিতা শান্তভাবে বলল।
“তুমি তো জন্ম থেকে বাংলায় চিন্তা করছ, বাংলায় এতগুলো বই লিখছ। হুট করে অন্য একটা ভাষায় পুরো একটা আস্ত উপন্যাস লিখতে গেলে প্রথম প্রথম তো একটু আটকাবেই। এটা তো খুব স্বাভাবিক ব্যাপার।”
“কিন্তু দিন তো চলে যাচ্ছে,”
অর্কো কপালে হাত দিয়ে বলল।
“এত দারুণ একটা গল্প ভেতরে চেপে রাখতে রাখতে আমার দমবন্ধ লাগতেছে।”
“তাতে কী হইছে? দুই দিন সময় বেশি লাগলে কি দুনিয়া উল্টে যাবে? তুমি শুরুতেই পারফেক্ট করার চক্করে বেশি প্রেসার নিচ্ছ। আমার কথা শোনো—এখন অত সুন্দর ইংরেজি আর ভারী ভারী শব্দের চিন্তা বাদ দাও। মাথায় যেভাবে কথাগুলো আসতেছে, ভুলভাল হোক, গ্রামার এলোমেলো হোক, তুমি আগে জাস্ট লিখে যাও। মনের ভাবটা স্ক্রিনে নামাও। পরে তো ড্রাফট ঘষেমেজে ঠিক করাই যাবে।”
সে এক ঢোক পানি খেয়ে চোখ বন্ধ করে একটা গভীর নিঃশ্বাস নিল। আসলেই তো! প্রথম ড্রাফটেই কেন নিখুঁত হতে হবে? অর্কো মুখ তুলে অর্পিতার দিকে তাকিয়ে একটু হাসল।
“তুমি পাশে না থাকলে আমার যে কী হতো!”
“কী আর হতো, সারারাত বসে বসে নিজের চুল ছিঁড়তে!”
অর্পিতা হেসে উঠে দাঁড়াল।
“এবার চুপচাপ বসো আর লিখতে থাকো। আমি গেলাম, অর্পার পড়া শেষ হলে ওকে খাইয়ে ঘুম পাড়াব।”
অর্পিতা দরজা টেনে চলে যেতেই ঘরের পরিবেশটা আবার শান্ত হয়ে এলো।
অর্কো ল্যাপটপ আবার খুলল। ব্যাকস্পেসের ভয় কাটিয়ে এবার সে কোনো জটিল ব্যাকরণের হিসেব না করে নিজের মনের কথাগুলো একের পর এক ইংরেজিতে টাইপ করতে শুরু করল।
রাস্তাগুলো তখন একেবারে নিঝুম। অর্কো ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে একটানা টাইপ করে যাচ্ছিল। অর্পিতার দেওয়া সাহসটা কাজে লেগেছে—শব্দগুলো এখন আর আগের মতো আটকে থাকছে না, তবে নিজের মনের মতো পুরোপুরি হচ্ছিল না। কিছু কিছু জায়গায় মনে হচ্ছিল আরও কাজ করা দরকার। কপালে হাত দিয়ে সে ড্রাফটের একটা চ্যাপ্টার রিভিশন দিচ্ছিল।
ঠিক তখনই টেবিলের ওপর রাখা মোবাইলটা হঠাৎ তীব্র শব্দে কেঁপে উঠল।
রিং... রিং...
অর্কো চমকে উঠে ঘড়ির দিকে তাকাল। রাত সোয়া দুইটায় কে ফোন দিল? কোনো দুর্ঘটনা ঘটল নাকি রাশেদদের কোনো সমস্যা হলো? একরাশ আশঙ্কা নিয়ে সে ফোনটা হাতে নিল।
স্ক্রিনে একটি অপরিচিত নম্বর জ্বলজ্বল করছে।
অর্কো কলটা রিসিভ করে কানে ধরল।
“হ্যালো, আসসালামু আলাইকুম। কে বলছেন?”
ওপাশ থেকে এক নারীর কণ্ঠ ভেসে এলো—
“হ্যালো, আসসালামু আলাইকুম। অর্কো আহমেদ বলছেন তো? আমি নিশি কবির বলছি।”
অর্কো এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। রাত দুইটার ঘুম ঘুম চোখে মাথায় কোনো নামই চট করে আসছিল না। সে একটু ইতস্তত করে বলল,
“জি, আমি অর্কো... বাট স্যরি, ঠিক চিনতে পারলাম না। কে বলছেন?”
ওপাশ থেকে ভদ্রমহিলা একটু শব্দ করে হেসে উঠলেন।
“আরেহ, ফিল্ম ডিরেক্টর নিশি কবির! চিনতে পারেননি? লাস্ট ইয়ার যে আমার শ্যাডো অব সাইলেন্স মুভিটা ফেস্টিভ্যালে গেল? মনে পড়ছে এবার?”
মুহূর্তের মধ্যে যেন অর্কোর মাথার সমস্ত ঘুম ছুটে গেল! সে সোজা হয়ে চেয়ারে বসে পড়ল।
নিশি কবির!
এবার পুরো ব্যাপারটা পরিষ্কার মনে পড়ল অর্কোর। নিশি কবিরকে এই দেশের সিনেমা জগতের মানুষের না চেনার কথা নয়। তিনি দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ও ব্যতিক্রমী এক নারী চলচ্চিত্র নির্মাতা। তবে তাঁর সিনেমার দর্শক এখনো খুব সীমিত। সাধারণ দর্শকরা তাঁর সিনেমা খুব একটা দেখতে যায় না, কারণ তিনি যে কাজগুলো বানান তা বড্ড বেশি ডার্ক, সাইকোলজিক্যাল আর একটু বেশি ডিপ। এদেশের সাধারণ দর্শকরা যেখানে সিনেমা হলে যায় অ্যাকশন আর সাউথ ইন্ডিয়ান তামিল সিনেমার কপি করা কমার্শিয়াল মসলা খুঁজতে, সেখানে নিশি কবিরের সিনেমা দেখে শুধু গুটিকয়েক রুচিশীল ও সিনেমা-বোঝা ক্লাসি মানুষ। বক্স অফিসে হয়তো তাঁর ছবি কোটি কোটি টাকার ঝড় তোলে না, কিন্তু ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল আর আন্তর্জাতিক মহলে তাঁর কাজের যে আলাদা একটা ব্র্যান্ড ভ্যালু আছে, তা দেশের আর কোনো পরিচালকের নেই।
অর্কো অপ্রস্তুত হয়ে তড়িঘড়ি করে বলল,
“আরেহ ম্যাডাম! এক্সট্রিমলি স্যরি! আসলে এত রাতে হুট করে অচেনা নম্বর থেকে কল আসায় মাথায় আসছিল না। কেমন আছেন ম্যাডাম?”
“ইটস টোটালি ফাইন, অর্কো,” নিশি কবির খুব ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে বললেন।
“আসলে এত লেইট নাইটে কল দেওয়ার জন্য আমারই সরি বলা উচিত। বাট অনেস্টলি, আই জাস্ট ফিনিশড রিডিং ইয়োর বুক শেষ মানুষটির ডায়েরি । আর গত তিন দিন ধরে আপনার দশ দিন এবং ভূত সমগ্র পড়ে আই ওয়াজ জাস্ট ব্লোন অ্যাওয়ে! ইয়োর ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্ট, দ্য ডার্ক সাইকোলজিক্যাল লেয়ার্স... অনেস্টলি, ইট ওয়াজ ব্রিলিয়ান্ট!”
“থ্যাংক ইউ সো মাচ ম্যাডাম। আপনার মতো একজন ডিরেক্টর এটা বলছেন, এটা আসলেই অনেক বড় একটা কমপ্লিমেন্ট,” অর্কো বলল।
“লুক অর্কো, আই বিলিভ ইন বিয়িং স্ট্রেইটফরোয়ার্ড,”
নিশি কবির সরাসরি কাজের কথায় চলে এলেন।
“আমার নেক্সট ফিচার ফিল্মের জন্য আই ওয়াজ সার্চিং ফর আ পাওয়ারফুল, ডিপলি সাইকোলজিক্যাল স্টোরি। অ্যান্ড আই থিঙ্ক ইউ আর দ্য পারফেক্ট ওয়ান ফর দিস। আপনার লেখার ভিজ্যুয়াল পাওয়ারটা মারাত্মক। আই ওয়ান্ট ইউ টু ওয়ার্ক উইথ মি অন দ্য স্টোরি অ্যান্ড স্ক্রিনপ্লে ফর দিস মুভি।”
অর্কো একটু হকচকিয়ে গেল।
“ম্যাডাম, বাট মুভি স্ক্রিপ্টের ব্যাপারে তো আমার কোনো এক্সপেরিয়েন্সই নেই। কোনোদিন মুভির জন্য লিখিওনি। আমি তো জাস্ট বইয়ের পাতায় ফিকশন লিখি...”
নিশি কবির ওপাশ থেকে আবার একটু হাসলেন।
“ওহ, প্লিজ! ডোন্ট ওয়ারি অ্যাবাউট দ্য টেকনিক্যাল ফরম্যাট অ্যাট অল! টেকনিক্যাল পার্ট হ্যান্ডেল করার জন্য আই হ্যাভ মাই এন্টায়ার টিম,” নিশি কবির খুব কনফিডেন্টলি বললেন।
“আমার মেইনলি দরকার আপনার মাথার ভেতর ঘুরতে থাকা এই ইউনিক, ডার্ক থট প্রসেসটা। দ্য রেস্ট, উই উইল ফিগার আউট টুগেদার। ফোনে তো আর সব ডিটেইলস ডিসকাস করা পসিবল না। সো, লেটস মিট টুমরো। উই ক্যান হ্যাভ কফি অ্যান্ড টক অ্যাবাউট দ্য প্রজেক্ট। আপনিই বলুন, কোথায় বসলে আপনার কমফোর্টেবল হবে, মিস্টার অর্কো আহমেদ?”
অর্কো এক মুহূর্ত ভাবল। তার মনের ভেতর এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ আর কৌতূহল কাজ করছিল।
“ম্যাডাম, আপনি ধানমন্ডি বা গুলশানের যেকোনো কফি শপে বললে আমি চলে আসতে পারব।”
“গ্রেট! টুমরো অ্যাট থ্রি পিএম, ধানমন্ডি আট নম্বরের ক্যাফেতে বসি। সি ইউ দেন, অর্কো। টেক কেয়ার।”
ক্লিক। ফোনটা কেটে গেল।
অর্কো স্তব্ধ হয়ে ফোনটা টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখল। ফোনটা রেখে স্টাডি রুমের দরজা খুলে করিডোরে বেরিয়ে এলো অর্কো।
পুরো ফ্ল্যাট তখন গভীর ঘুমে নিস্তব্ধ। করিডোরের আবছা আলোয় পা বাড়াতেই সে লক্ষ্য করল, অর্পার রুমের দরজার তলা দিয়ে এখনো উজ্জ্বল সাদা আলো চুইয়ে পড়ছে।
অর্কো একটু অবাক হয়ে নিঃশব্দে এগিয়ে গিয়ে দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিল।
টেবিল ল্যাম্পের নিচে কম্পিউটারের বড় মনিটরে তখন পজ করা রয়েছে একটি অর্গানিক কেমিস্ট্রির ভিডিও লেকচার। অর্পা চশমা চোখে নিবিষ্ট মনে খাতায় জটিল সব কেমিক্যাল স্ট্রাকচার আর নোটস লিখে চলেছে। আগামী সপ্তাহ থেকেই তার এইচএসসি পরীক্ষা শুরু, তাই পড়া নিয়ে তার কোনো ক্লান্তি নেই।
অর্কো দরজায় হালকা করে দুটি টোকা দিল।
অর্পা চমকে মুখ তুলে তাকাল। অর্কোকে দেখে একটু অপ্রস্তুত হয়ে চশমাটা ঠিক করল সে।
“অর্পা, এখনও ঘুমাওনি? রাত আড়াইটা বেজে গেছে। আগামী সপ্তাহ থেকেই পরীক্ষা, এত রাত জাগলে শরীর খারাপ করবে তো। এগুলো কাল সকালে রিভিশন দিয়ো, এখন একদম শুয়ে পড়ো।”
অর্পা ল্যাপটপের স্ক্রিনটা বন্ধ করে বলল,
“হ্যাঁ দুলাভাই, এই অ্যালডিহাইডের রিঅ্যাকশনটা একটু ঝামেলা করছিল, তাই শেষ করছিলাম। এই তো এখনই লাইট অফ করে শুয়ে পড়ছি।”
“গুড নাইট। সকাল আটটায় কিন্তু ডাকব,”
অর্কো হাসিমুখে ওর দরজার পাল্লাটা টেনে দিল।
এরপর অর্কো পা বাড়াল নিজেদের শোবার ঘরের দিকে।
দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই দেখল হালকা নীল রঙের ডিম লাইটের নিচে বিছানায় হেলান দিয়ে বসে আছে অর্পিতা। হাতে মোবাইল, কিছু একটা স্ক্রোল করছে।
অর্কো বিছানার পাশে এসে বসল। অর্পিতার হাত থেকে আলতো করে ফোনটা নিয়ে সাইড টেবিলে রেখে দিয়ে বলল,
“তুমি এখনও ঘুমাওনি? কত রাত হয়েছে দেখেছ?”
অর্পিতা একটু হেসে অর্কোর একটা হাত নিজের হাতের ভেতর টেনে নিল।
“তোমার তো কোনো খেয়াল থাকে না। স্টাডি রুমে বসে আছ সেই কখন থেকে! তুমি পাশে এসে না শুলে আমার কি ঘুম আসে?”
“শোনো, একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে,” অর্কো বলল।
অর্পিতা কৌতূহল নিয়ে তাকাল,
“কী ঘটনা?”
“একটু আগে রাত সোয়া দুইটায় একটা কল আসছিল, ফিল্ম ডিরেক্টর নিশি কবির। চিনতে পারছ?”
অর্পিতার চোখ বড় বড় হয়ে গেল।
“নিশি কবির? ওই যে ডার্ক আর সাইকোলজিক্যাল মুভি বানায়?”
“হ্যাঁ, উনিই, উনি নাকি আমার শেষ মানুষটির ডায়েরি আর দশ দিন পড়েছেন। ওনার নেক্সট ফিচার ফিল্মের জন্য উনি একটা পাওয়ারফুল স্টোরি খুঁজছেন। আমাকে বললেন উনার সাথে স্টোরি আর স্ক্রিনপ্লে নিয়ে কাজ করতে।”
“ওয়াও অর্কো! এটা তো অনেক বড় খবর! নিশি কবির কিন্তু যেমন-তেমন গল্প নিয়ে কোনোদিন কাজ করে না। উনি তোমার লেখা পছন্দ করেছেন মানে এটা আসলেই বিগ ডিল!”
“কিন্তু আমি তো কোনোদিন সিনেমার জন্য স্ক্রিপ্ট লিখিনি,” অর্কো একটু ইতস্তত করে বলল।
“আরেহ, তাতে কী হয়েছে? তুমি তো বই লিখতে গিয়েও কোনোদিন ভাবোনি যে এত বড় লেখক হবে! কাল গিয়ে আগে ওনার সাথে বসো। শোনো উনি কী বলতে চান, ওনার প্ল্যান কী। আমার তো মনে হয় দারুণ কিছু হবে।”
অর্পিতার এই চনমনে উৎসাহ অর্কোর ভেতরের সমস্ত সংশয় উড়িয়ে দিল। অর্কো মুচকি হেসে সাইড টেবিলের ডিম লাইটের সুইচটা বন্ধ করে দিল।
“ঠিক আছে, কাল দুপুরে ওনার সাথে ধানমন্ডিতে মিটিং। এখন ঘুমানো যাক।”
বাইরে তখন রাতের ঢাকা শহর শেষ প্রহরে এসে ঠেকেছে। অর্পিতার চাদরের ওমে মাথা রেখে চোখ বুজল অর্কো।
পরদিন বিকেল ঠিক তিনটায় ধানমন্ডি আট নম্বরের রবীন্দ্র সরোবরের পাশের ক্যাফেতে পৌঁছাল অর্কো। লেকপাড়ের গাছগুলোর ছায়ায় ক্যাফেটার আউটডোর সিটিংটা বেশ শান্ত। লেকের জলে মৃদু বাতাস দুলছে, দূর থেকে ভেসে আসছে তরুণ-তরুণীদের টুকটাক আড্ডার আওয়াজ।
কাঁচঘেরা ছাতার নিচে এক কোণের টেবিলে আগে থেকেই বসে ছিলেন নিশি কবির। চোখে গাঢ় কালো সানগ্লাস , গায়ে হালকা জলপাই রঙের ব্লেজার, চুলগুলো খুব স্মার্ট করে টপনট করা। টেবিলে একটা ব্ল্যাক কফির মগ আর আইপ্যাড।
অর্কো কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই নিশি কবির চশমাটা নামিয়ে হাসিমুখে উঠে দাঁড়ালেন।
“হাই অর্কো! প্লিজ, বসুন,” নিশি হাত বাড়িয়ে দিলেন।
অর্কো হ্যান্ডশেক করে কাঠের চেয়ারটাতে বসল।
“আসসালামু আলাইকুম ম্যাডাম।”
“অফিশিয়াল ম্যাডাম বাদ দেন তো, জাস্ট নিশি বলুন,”
নিশি কবির অর্কোর মুখের দিকে একটু তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
“সো, দ্য ফেমাস অর্কো আহমেদ ইন পারসন! অনেস্টলি স্পিকিং, আপনি যতটা ডার্ক আর ডিপ লেখেন, ইন রিয়েলিটি আপনি কিন্তু দেখতে মাচ মোর চার্মিং অ্যান্ড হ্যান্ডসাম!”
অর্কো একটু অপ্রস্তুত হয়ে হাসল।
“থ্যাংক ইউ। আপনিও যা বললেন, তার চেয়ে অনেক বেশি বাড়িয়ে বললেন মনে হয়।”
“নট অ্যাট অল, আই অলওয়েজ সে হোয়াট আই ফিল,” নিশি কফিতে এক চুমুক দিয়ে বললেন।
ঠিক তখনই ক্যাফের পাশের ওয়াকওয়ে দিয়ে হেঁটে যাওয়া তিন-চারজন তরুণ-তরুণী হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। তাদের মধ্যে এক মেয়ে চোখ বড় বড় করে অর্কোর দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে কিছু বলল। পরক্ষণেই তারা উচ্ছ্বসিত হয়ে টেবিলের কাছে এগিয়ে এলো।
“ভাইয়া! আপনি অর্কো আহমেদ না? শেষ মানুষটির ডায়েরির রাইটার?
এক তরুণী কাঁধের ব্যাগ থেকে অর্কোর একটা বই বের করে ফেলল।
অর্কো হাসিমুখে নিজের সিট থেকে উঠে দাঁড়াল। সে খুব আন্তরিকভাবে তাদের সাথে দুটো সেলফি তুলল। ছেলেমেয়েরা থ্যাংক ইউ জানিয়ে চলে গেল।
তারা চলে যাওয়ার পরই নিশি বললেন,
“ইমপ্রেসিভ! বাংলাদেশে লিটারেচার নিয়ে এমন ক্রেজ কিন্তু খুব রেয়ার।”
ওয়েটার এসে মেনু দিতেই অর্কো একটা ক্যাপুচিনো অর্ডার করল। কফি আসতেই নিশি কবির এবার পুরোপুরি প্রফেশনাল মুডে ফিরে এলেন। তিনি আইপ্যাডের স্ক্রিন অন করে একটু ঝুঁকে বসলেন।
“লুক অর্কো, আমাদের দেশের প্রবলেমটা কী জানেন?”
নিশির গলার স্বর কিছুটা গম্ভীর হয়ে এলো।
“বাংলাদেশের বেশিরভাগ অডিয়েন্স ভালো জিনিস হজম করতে পারে না। তারা বড্ড বেশি সস্তা জিনিস খায়। আর এই জন্যই তো আমাদের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি সাউথ ইন্ডিয়ান তামিল সিনেমার থার্ড ক্লাস কপি দিয়ে ভরে গেছে। কিন্তু আমি কখনো স্রোতে গা ভাসাতে রাজি নই।”
অর্কো কফির কাপে চুমুক দিয়ে বলল,
“আমি জানি। আপনার আগের দুটো কাজ দেখলেই সেটা বোঝা যায়।”
“এবার আমি সম্পূর্ণ আনকম্প্রোমাইজিং একটা ডার্ক, সাইকোলজিক্যাল কাল্ট-বেজড মুভি বানাতে চাই। কনসেপ্টটা শুনুন—ব্রিটিশ আমলে বাংলার এক গোপন বনেদি পরিবারে একটা ভয়ংকর অকাল্ট কাল্টের জন্ম হয়েছিল, যারা মানুষের অবচেতন মন আর রক্ত নিয়ে খেলা করত। ইতিহাস ভেবে সবাই সেটা ভুলে গিয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ করে এই ২০৩০ এর দশকে, আজকের হাইপার-মডার্ন ঢাকা সিটিতে সেই কাল্ট আবার ফিরে এসেছে একদম নতুন রূপে! ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড হোয়াট আই অ্যাম টকিং অ্যাবাউট, অর্কো?”
অর্কোর চোখের পাতা স্থির হয়ে গেল।
“কনসেপ্টটা মারাত্মক ইন্টারেস্টিং, এখানে সাসপেন্সের চেয়েও হিউম্যান সাইকোলজি আর হ্যালুসিনেশনের যে খেলাটা তৈরি করা যাবে, তা অডিয়েন্সকে একদম সিটের সাথে আটকে রাখবে।”
“আই নিউ ইট!” নিশি কবির টেবিল চাপড়ে হেসে উঠলেন।
“আমি জানতাম এই জিনিস একমাত্র আপনিই ধরতে পারবেন। আমি চাই আপনি এই প্লটের ওপর একটা কমপ্লিট স্টোরি ট্রিটমেন্ট আর স্ক্রিনপ্লে রেডি করবেন।”
“আমি অবশ্যই পুরো ট্রাই করবো,আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে আমি আপনাকে একটা রাফ ড্রাফট দেব।”
আলোচনা শেষ হতে হতে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে এলো।
নিশি কবির নিজের ব্যাগ থেকে ওয়ালেট বের করে কার্ড দিতে গেলেন ক্যাফের বিল মেটানোর জন্য। কিন্তু অর্কো দ্রুত এগিয়ে গিয়ে ক্যাশ টাকা ওয়েটারের হাতে তুলে দিয়ে বিল মিটিয়ে দিল।
নিশি কবির একটু অবাক হয়ে অর্কোর দিকে তাকালেন।
“বাপরে! প্রপার ওল্ড-স্কুল জেন্টলম্যান! নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না। আপনার ওয়াইফ কিন্তু রিয়েলি লাকি, অর্কো।”
অর্কো শান্ত গলায় হাসল,
“লাকি আসলে আমি, কারণ উনি আমার জীবনে আছেন।”
নিশি কবির অর্কোর এই দৃঢ় আর অনুগত জবাবটা শুনে আরও একটু মুগ্ধ হলেন। তিনি সানগ্লাসটা চোখে লাগিয়ে হ্যান্ডশেক করলেন।
“আই রেসপেক্ট দ্যাট। অল দ্য বেস্ট অর্কো। ড্রাফটের জন্য ওয়েট করছি।”
নিশি কবির ক্যাফে থেকে বেরিয়ে নিজের গাড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন।
অর্কো লেকপাড়ে দাঁড়িয়ে সন্ধ্যার ঠান্ডা বাতাসে একটা লম্বা নিঃশ্বাস নিল। সাহিত্যের পাতার পর এবার এক নতুন ভিজ্যুয়াল ক্যানভাস তার সামনে হাতছানি দিচ্ছে যেখানে প্রতিটি দৃশ্য হতে যাচ্ছে আরও অন্ধকার, আরও রহস্যময়।
পরের একটা মাস কেটে গেল তীব্র এক ব্যস্ততার ভেতর দিয়ে।
একদিকে অর্পার এইচএসসি পরীক্ষা। প্রতিদিন সকালে অর্পাকে সময়মতো প্রস্তুত করে পরীক্ষাকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া, বাইরে পানির বোতল হাতে অন্য অভিভাবকদের ভিড়ে দাঁড়িয়ে থাকা, আবার পরীক্ষা শেষে হাসিমুখে ওকে বাসায় নিয়ে আসা অর্কো নিজের সবটুকু দায়িত্ব পালন করছিল একজন বড় ভাইয়ের মতো।
আর অন্যদিকে ছিল নিশি কবিরের সেই সিনেমার কাজ।
প্রতিদিন রাতে পরিবারের সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর অর্কো বসে যেত তার স্টাডি রুমে। ব্রিটিশ আমলের গোপন কাল্টের ইতিহাস, বাংলার প্রাচীন ভৌগোলিক প্রেক্ষাপট আর ২০৩০-এর আধুনিক ঢাকার অন্ধকার এক সুতোয় বেঁধে সে একটানা লিখে গেল এক পূর্ণাঙ্গ চিত্রনাট্য। গল্পের নাম দিল কাল্ট অব সাইলেন্স।
এক মাস পর, এক ঝলমলে বিকেলে চিত্রনাট্যের স্পাইরাল বাইন্ডিং করা ড্রাফটটা হাতে নিয়ে বনানীর এগারো নম্বর রোডের এক ডুপ্লেক্স ভবনে পৌঁছাল অর্কো। এটাই নিশি কবিরের প্রোডাকশন স্টুডিও ব্ল্যাক ফ্রেম পিকচার্স ।
স্টুডিওর ভেতরটা ছিল শান্ত ও নান্দনিক। কাঁচঘেরা আধুনিক ইন্টেরিয়র, দেয়ালে আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের পোস্টার আর একপাশে সাজানো বেশ কিছু পুরস্কারের ট্রফি।
নিশি কবির নিজের ব্যক্তিগত কেবিনে বসে ছিলেন। অর্কো ঘরে ঢুকতেই তিনি কাজ ফেলে এক চওড়া হাসিতে উঠে দাঁড়ালেন।
“ওয়েলকাম অর্কো! প্লিজ, কাম ইন,”
অর্কো টেবিলের ওপর মোটা চিত্রনাট্যটা নামিয়ে রেখে বলল,
“ম্যাডাম, পুরো স্টোরি ট্রিটমেন্ট, ক্যারেক্টার আর্ক আর ফার্স্ট ড্রাফটের স্ক্রিনপ্লে রেডি। দেখে বলতে পারেন কেমন হলো।”
নিশি কবির ভ্রু কুঁচকে চোখের কোণ দিয়ে একটু তাকিয়ে বললেন,
“আপনাকে কতবার বলেছি আমাকে ম্যাডাম বলবেন না? ইটস জাস্ট নিশি!”
অর্কো একটু অপ্রস্তুত হয়ে হেসে বলল,
“স্যরি... নিশি।”
“দ্যাটস বেটার,”
নিশি চিত্রনাট্যটা হাতে নিয়ে সোফায় বসলেন।
“আই ওয়াজ লিটারেলি কাউন্টিং ডেইজ ফর দিস!”
নিশি খুব নিবিষ্ট মনে পাতা ওল্টাতে লাগলেন।
অর্কো উল্টো দিকের সিঙ্গেল সোফায় বসে অপেক্ষা করছিল। ঘরের ভেতরের সেন্ট্রাল এসির মৃদু শব্দের মাঝে শুধু কাগজের খসখস আওয়াজ হচ্ছিল। প্রথম বিশটা পাতা পড়ার পর নিশি কবিরের চোখের পাতা যেন আর নড়ছিল না। ক্লাইম্যাক্সের মোড় আর সংলাপগুলো পড়তে পড়তে তাঁর চোখ দুটো এক অদ্ভুত বিস্ময়ে স্থির হয়ে রইল।
প্রায় আধঘণ্টা পর নিশি স্ক্রিপ্টটা বুকের ওপর চেপে ধরে মুখ তুললেন। তাঁর চোখে তখন এক ঘোরের ছাপ।
“মাই গুডনেস অর্কো!”
নিশি লম্বা একটা শ্বাস ফেলে বলে উঠলেন।
“দিস ইজ পিওর জিনিয়াস! ব্রিটিশ আমলের সেই ট্র্যাডিশনাল কাল্ট যেভাবে আপনি মডার্ন ঢাকার সাইকিয়াট্রিস্টের চেম্বারে কানেক্ট করলেন... আই অ্যাম জাস্ট স্পীচলেস! এটা সিনেমার হিস্ট্রিতে একটা ল্যান্ডমার্ক হতে যাচ্ছে!”
“থ্যাংক ইউ নিশি,” অর্কো একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে হাসল।
নিশি কবির সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তিনি কফি মেকার থেকে ধোঁয়া ওঠা দুই কাপ কফি বানিয়ে এনে একটা মগ অর্কোর হাতে দিলেন।
তারপর তিনি নিজের চেয়ারে না গিয়ে সরাসরি অর্কোর কাছাকাছি, টি-টেবিলের এক কোণায় একটু হেলান দিয়ে বসলেন। নিশি কফির মগে এক চুমুক দিয়ে অর্কোর চোখের দিকে তাকালেন।
“ইউ নো অর্কো,”
নিশি খুব নিচু গলায় বললেন,
“আপনার সাথে যতবার কথা বলি, আমার খুব অবাক লাগে। একটা মানুষের চিন্তাভাবনা এত ডিপ, এত আনপ্রেডিক্টেবল কীভাবে হতে পারে? সত্যি বলছি... আই উইশ আপনার সাথে আমার আরও কয়েক বছর আগে পরিচয় হতো!”
অর্কো একটু হেসে কফির মগে চোখ রাখল।
“আসলে আমি খুব সাধারণ একজন মানুষ নিশি। এই সবকিছুই গল্পের প্রতি একধরনের ভালোবাসা থেকে আসে, আলাদা কিছু না।”
নিশি মৃদু হেসে অর্কোর দিকে এক পলক চেয়ে বললেন,
“ইউ নো অর্কো, ইয়োর ওয়াইফ ইজ রিয়েলি লাকি টু হ্যাভ আ গ্রেট ম্যান লাইক ইউ।”
অর্কোর মুখে এক অনাবিল প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল। সে খুব শান্ত অথচ গভীর আবেগে বলল,
“আমি তো আপনাকে আগেও বলেছি আসলে লাকি তো আমি। আজকে আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, এই পুরো অর্জনের পেছনে অর্পিতার অবদান সবচেয়ে বেশি। ও না থাকলে এই অর্কো আহমেদ কোনোদিন তৈরিই হতো না।”
নিশি কবির এক মুহূর্ত চুপ করে অর্কোর চোখের দিকে চেয়ে রইলেন। নিশি চোখের দৃষ্টি একটু নামিয়ে আবার অর্কোর দিকে তাকিয়ে বললেন,
“এই যে এত লয়ালটি আপনার...এই জিনিসটাই তো আপনাকে আরও বেশি স্পেশাল করে তোলে। আজকের যুগে এই লয়ালটি সবার মধ্যে থাকে না।”
নিশি একটু থেমে কফির শেষ চুমুকটা নিলেন। তারপর খুব প্রফেশনাল মেজাজে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বললেন,
“নেক্সট উইকেই আমরা অফিশিয়াল কন্ট্রাক্ট সাইন করবো এবং প্রি-প্রোডাকশনের কাজ শুরু করে দেব। আর হ্যাঁ... শুটিংয়ের সেটেও কিন্তু আপনাকে আমার পাশে লাগবে ডেফিনেটলি,”
অর্কোও উঠে দাঁড়াল। বনানীর স্টুডিও থেকে যখন অর্কো নিচে নেমে এলো, তখন বিকেলের নরম রোদ গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে ঠিকরে পড়ছে। অর্ক রওনা দিল বাসার দিকে।
এক সপ্তাহ পর এক ভরদুপুরে
ব্ল্যাক ফ্রেম পিকচার্স এর অফিশিয়াল পেজ থেকে রিলিজ পেল সিনেমার প্রথম অফিশিয়াল টিজার পোস্টার— কাল্ট অব সাইলেন্স।
কালো আর ছাইরঙা কুয়াশায় ঢাকা এক প্রাচীন বনেদি বাড়ির আবছায়া, আর তার পেছনে ২০৩০-এর আধুনিক ঢাকার স্কাইলাইন। পোস্টারের নিচে বড় হরফে লেখা—
গল্প ও চিত্রনাট্য: অর্কো আহমেদ
পরিচালনা: নিশি কবির।
পোস্টারটি রিলিজ হওয়ামাত্রই সোশ্যাল মিডিয়ায় তুমুল আলোচনার ঝড় উঠল।
এর দুই দিন পরেই গুলশানের এক পাঁচতারা হোটেলের বলরুমে আয়োজন করা হলো জমকালো এক প্রেস কনফারেন্স।
হলরুমের ভেতরে তখন ডজনখানেক টিভি চ্যানেল আর নিউজ পোর্টালের ক্যামেরার ঝলকানি। মঞ্চের লম্বা টেবিলটাতে দিয়ে সাজানো মাইক্রোফোনের সারি। মঞ্চে পাশাপাশি বসেছিলেন ডিরেক্টর নিশি কবির, সিনেমার প্রধান অভিনেতা আরিয়ান, নায়িকা আর একদম মাঝখানে কালো ব্লেজার পরা অর্কো আহমেদ। শুরুতেই বক্তব্য দিতে উঠলেন নিশি কবির।
“লুক এভরিওয়ান,”
নিশি আত্মবিশ্বাসী গলায় বললেন।
“আপনারা জানেন আমি স্রোতে গা ভাসাই না। বাট দিস টাইম, অর্কো আহমেদ আমাকে এমন একটা মাস্টারপিস স্ক্রিপ্ট দিয়েছেন, যা এই দেশের সিনেমার ধারা বদলে দেবে। অর্কো ইজ নট জাস্ট আ রাইটার, হি ইজ আ পিওর জিনিয়াস! ওনার মতো ডার্ক আর ডিপ সাইকোলজি খুব কম রাইটার বুঝতে পারে। উইদাউট অর্কো, দিস মুভি ওয়াজ লিটারেলি ইমপসিবল!”
নিশির বক্তব্যের পর শুরু হলো সাংবাদিকদের প্রশ্নোত্তর পর্ব।
প্রথম সারির এক জ্যেষ্ঠ সাংস্কৃতিক সাংবাদিক মাইক হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“অর্কো স্যার, আপনি তো এত দিন উপন্যাসের পাতায় লিখেছেন, যেখানে কোনো বাঁধাধরা ফ্রেম থাকে না। কিন্তু উপন্যাসের সেই বিশাল ক্যানভাস থেকে সিনেমার দুই ঘণ্টার চিত্রনাট্যে আসার এক্সপেরিয়েন্স কেমন ছিল?”
অর্কো নিজের সামনের মাইক্রোফোনটা অন করে খুব মার্জিত ও শান্ত গলায় উত্তর দিল—
“খুবই ইন্টারেস্টিং একটা জার্নি ছিল। বইয়ের পাতায় পাঠক নিজের কল্পনায় একটা দৃশ্য তৈরি করে নেয়, কিন্তু সিনেমার স্ক্রিপ্টে সেই দৃশ্যটাই ফ্রেমের ভেতর নির্দিষ্ট করে দিতে হয়। তবে মিডিয়াম যাই হোক, মূল উদ্দেশ্য কিন্তু এক দর্শকের ভেতরের অনুভূতি আর মন স্পর্শ করা। নিশির সাথে কাজ করার কারণে এই ট্রানজিশনটা আমার জন্য অনেক সহজ হয়েছে।”
এরপর আরেক তরুণ রিপোর্টার প্রশ্ন করলেন,
“অর্কো স্যার, কাল্ট আর অকাল্ট সাইকোলজি নিয়ে আমাদের দেশে তো সিনেমা খুব কম হয়। এই গল্পটা কি সাধারণ দর্শকদের কাছে একটু বেশি জটিল বা অবোধ্য মনে হতে পারে?”
অর্কো একটু হেসে উত্তর দিল,
“আসলে আমরা অনেক সময় দর্শকদের আন্ডারএস্টিমেট করি। দর্শক যদি টানটান সাসপেন্স আর ভালো মেকিং পায়, তবে তারা যে কোনো জটিল গল্পই গ্রহণ করে। এই ছবিতে ভয় আর রহস্যের আড়ালে মূলত মানুষের মনের এক চিরন্তন লড়াই দেখানো হয়েছে, যা যে কারও সাথে কানেক্ট করবে।”
পুরো হলরুম তখন অর্কোর উত্তর মুগ্ধ হয়ে শুনছিল। ক্যামেরার ফ্ল্যাশগুলো একটানা তার মুখের ওপর আলো ফেলছিল। কিন্তু ঠিক তখনই পেছনের সারি থেকে এক সাংবাদিক দাঁড়িয়ে মাইক্রোফোন হাতে নিল।
“অর্কো স্যার, সিনেমার বাইরে একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন করতে চাই, শোনা যায়, আপনি সফল হওয়ার পর নাকি আপনার নিজের জন্মদাতা বাবাকে আর দেখেন না? মেসের দিনে বাবাকে ফেলে বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছিলেন, এখন এত খ্যাতি আর টাকার পরও বাবার কোনো খোঁজ নেন না। এই রিউমারটা কি সত্যি?”
মুহূর্তের মধ্যে পুরো রুমের গম্ভীর পরিবেশ যেন পাথরের মতো জমে বরফ হয়ে গেল।
অর্কর বুকের ভেতর এক নিমেষে পুরোনো সেই ক্ষতের তীব্র চাবুক এসে লাগল। মেসের অন্ধকার, বাবার সেই নির্মম কথা আর ঘর ছাড়ার রাতের স্মৃতিগুলো তার গলার কাছে এক অসহ্য যন্ত্রণা তৈরি করল। অর্কো মাইকের সামনে স্তব্ধ হয়ে বসে রইল।
কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘটে গেল এক তুলকালাম কাণ্ড!
পাশে বসে থাকা নিশি কবিরের চেহারা রাগে এক নিমেষে লাল হয়ে উঠল। তিনি এক ঝটকায় নিজের সামনের মাইক্রোফোনটা টেনে নিলেন। তাঁর চোখ দিয়ে যেন আগুন ঝরছিল।
“এক্সকিউজ মি!” নিশি কবিরের সেই বজ্রকঠিন ধমকে পুরো হলরুম থমকে গেল।
নিশি সরাসরি সেই সাংবাদিকের দিকে আঙুল তুলে তীব্র গলায় বলে উঠলেন,
“এটা একটা হাই-প্রোফাইল সিনেমার অফিশিয়াল প্রেস কনফারেন্স! কোনো সস্তা পার্সোনাল ড্রামা বা আপনাদের ভিউ পাওয়ার চিপ গসিপের প্ল্যাটফর্ম নয়! একজন জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখকের কাজের সম্মান রাখতে শিখুন। ব্যক্তিগত আক্রমণ করে সস্তা হেডলাইন বানানোর এই নোংরামি আমার বরদাশত করবো না!”
নিশি আর এক সেকেন্ডও বসলেন না। তিনি এক ঝটকায় চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন।
“ইনাফ কোয়েশ্চনস ফর টুডে এভরিওয়ান! থ্যাংক ইউ!”
নিশির ডাকে পুরো টিম একযোগে মঞ্চ ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
হলরুম জুড়ে তখন সাংবাদিকদের তুমুল হট্টগোল আর ক্যামেরার শাটারের অবিরাম ক্লিক। নিশি নিজেই এগিয়ে এসে অর্কোর হাত ধরে ভিআইপি এক্সিটের দিকে নিয়ে গেলেন। বাইরের করিডোরে এসে অর্কো নিশি কবিরের দিকে তাকাল। নিশির নিঃশ্বাস তখনো ক্ষোভে দ্রুত ওঠানামা করছে।
প্রেস কনফারেন্স শেষ হওয়ার ঘণ্টা দুয়েক পরের কথা।
গুলশানের সেই হোটেলের দ্বিতীয় তলার এক শান্ত, নিরিবিলি ভিআইপি লাউঞ্জে বসে ছিলেন নিশি কবির আর অর্কো। কাঁচের টেবিলের ওপর দুটি ধোঁয়া ওঠা ব্ল্যাক কফির মগ আর এক বোতল পানি।
নিশি নিজের ফোনের স্ক্রিনে দ্রুত আঙুল চালাচ্ছিলেন। হঠাৎ তাঁর ভ্রু জোড়া কুঁচকে গেল, চোখের দৃষ্টিতে নেমে এলো তীব্র বিরক্তি। সোশ্যাল মিডিয়ায় ইতিমধ্যে মাত্র কিছুক্ষণ আগের সেই ঘটনার ক্লিপ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। ফেসবুক আর ইউটিউবের বিভিন্ন এন্টারটেইনমেন্ট পেজ ও নিউজ পোর্টালগুলো প্রেস কনফারেন্সের সেই বিশ সেকেন্ডের ভিডিও কেটে শিরোনামে পোস্ট করছে—
“সাংবাদিকের প্রশ্নে মেজাজ হারালেন পরিচালক নিশি কবির!”
“প্রেস কনফারেন্সে তুলকালাম: সাংবাদিকের ওপর চড়াও হলেন নির্মাতা!”
নিশি কবির রাগে ফোনটা একপ্রকার আছড়ে ফেললেন কাঁচের টেবিলের ওপর।
“চিট ফাকিং বাস্টার্ডস!” নিশি দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠলেন।
“সস্তা ভিউ আর রিচের জন্য এরা কী না করতে পারে! পুরো সিনেমার কনসেপ্ট আর স্ক্রিপ্ট নিয়ে এক ঘণ্টা ধরে এত ভালো ভালো কথা বললাম, সেগুলোর কোনো নিউজ নাই! আর এই বিশ সেকেন্ডের পার্সোনাল ড্রামা নিয়ে সবার চুলকানি শুরু হয়ে গেছে!”
অর্কো শান্ত গলায় কফির মগে চুমুক দিয়ে বলল,
“আসলে আজকাল মিডিয়া তো কনটেন্টের চেয়ে কন্ট্রোভার্সি বেশি খোঁজে।”
নিশি কফির মগটা হাতে নিয়ে লম্বা একটা শ্বাস ফেললেন। তিনি অর্কোর মুখের দিকে তাকিয়ে কিছুটা শান্ত হলেন।
নিশি সোজা হয়ে বসে বললেন,
“লুক অর্কো,আপনাকে একটা রিয়েলিস্টিক অ্যাডভাইস দিই। আপনি তো এই গ্ল্যামার আর মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রিতে এখনো তুলনামূলক নতুন। মাত্র বছর দেড়েক হলো আপনি ফেম আর লাইমলাইটের চরম চূড়ায় এসেছেন। আপনাকে বুঝতে হবে এই শকুনদের কীভাবে হ্যান্ডেল করতে হয়।”
অর্কো নিবিষ্ট মনে শুনছিল।
নিশি বললেন,
“এরা কিন্তু সবসময় আপনার উইক পয়েন্ট খুঁজবে। আপনার পাস্ট লাইফ, আপনার ফ্যামিলি ট্রমা যেগুলো আপনার ব্যক্তিগত কষ্ট, সেগুলোকে টেনে এনে পাবলিকলি ট্রল করবে সস্তা হেডলাইনের জন্য। আপনি যদি আবেগপ্রবণ হয়ে ক্যামেরার সামনে কিছু একটা বলে ফেলেন, এরা সেটাকেই তিল থেকে তাল বানিয়ে আপনাকে ছিঁড়ে খাবে। সো, অলওয়েজ বি ভেরি কেয়ারফুল ফ্রম দিজ বাস্টার্ডস। কখনো ক্যামেরার সামনে নিজের পার্সোনাল ফ্রাস্ট্রেশন শো করবেন না।”
অর্কো মাথা নাড়ল।
“থ্যাংক ইউ নিশি। আমি আসলেই একটু অপ্রস্তুত হয়ে গিয়েছিলাম।”
“ইটস ওকে, শুরুতে সবারই এমন হয়,”
নিশি কফিতে শেষ চুমুক দিয়ে আবার পুরোপুরি কাজের মুডে ফিরে এলেন।
“যাই হোক, কামিং টু দ্য মেইন পয়েন্ট। নেক্সট উইকের বুধবার থেকেই আমাদের ফার্স্ট শিডিউলের শুটিং শুরু হচ্ছে পুরান ঢাকার এক জমিদারবাড়িতে। সেটে কিন্তু আপনাকে রেগুলার প্রেজেন্ট থাকতে হবে, অর্কো!”
অর্কো একটু অবাক হয়ে তাকাল।
“বাট নিশি, শুটিংয়ের সেটে থেকে আমি আসলে কী করবো? ডিরেকশন, ক্যামেরা, লাইটিং এসব তো আপনার আর আপনার টেকনিক্যাল টিমের কাজ।”
নিশি হেসে অর্কোর দিকে তাকালেন।
“আরেহ ভাই, ক্যামেরা ফ্রেম ঠিক করার জন্য আমার সিনেমাটোগ্রাফার আছে ঠিকই, বাট ক্যারেক্টারের ইমোশন তো আপনার মাথার সৃষ্টি!”
নিশি খুব আন্তরিক গলায় বোঝালেন।
“একটা সাইকোলজিক্যাল কাল্ট মুভিতে ডায়লগ ডেলিভারি আর অ্যাক্টরদের চোখের এক্সপ্রেশন কেমন হবে, কোন সিনের অন্ধকারটা কতটা ডিপ হবে এটা আপনার চেয়ে ভালো আর কেউ ফিল করতে পারবে না। আমার অ্যাক্টররা যাতে প্রতিটা সিন পারফেক্টলি এক্সিকিউট করতে পারে, সেজন্য অন-স্পট আপনার গাইডেন্স মাস্ট। আই ওয়ান্ট ইউ রাইট নেক্সট টু মাই মনিটর।”
অর্কো নিশির কথার গভীরতা বুঝতে পারল। অর্কো হাসিমুখে বলল,
“ঠিক আছে নিশি,বুধবার সকাল থেকেই আমি সেটে থাকব।”
লাউঞ্জের নরম আলোর নিচে কফির শেষ চুমুক দিয়ে দুজন উঠে দাঁড়াল।
বাইরে তখন সন্ধ্যার গুলশানের রাস্তা আলোয় ঝলমল করছে। মিডিয়ার আলোচনা আর ক্ষণিকের কোলাহল পেছনে ফেলে অর্কো এবার প্রস্তুত হতে লাগল সিনেমার ক্যামেরার পেছনের এক সম্পূর্ণ নতুন, রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়ার জন্য।
রাত সাড়ে আটটায় বাসায় ফিরল অর্কো।
কলিংবেল বাজতেই দরজা খুলে দিল অর্পিতা। অর্কোর গায়ের ব্লেজারটা হাতে নিয়ে সে এক পলক অর্কোর মুখের দিকে তাকাল। ড্রয়িংরুমের সোফায় বসতেই অর্পিতা এক গ্লাস ঠান্ডা পানি এগিয়ে দিয়ে বলল,
“আমি বিকেলের ওই ভাইরাল ক্লিপটা দেখলাম অর্কো। নিশি আপু কিন্তু বিন্দুমাত্র ভুল কিছু বলেনি, একদম উচিত জবাব দিয়েছে! অথচ দেখো, হলুদ সাংবাদিকরা ভিউ পাওয়ার জন্য ওটাকে কীভাবে বিকৃত করে ছড়াচ্ছে!”
বাবার প্রসঙ্গটা আসতেই অর্কোর বুকের ভেতর পুরোনো সেই চিনচিনে ব্যথাটা আবার একটু মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। সে এই অপ্রীতিকর টপিকটা আর বাড়াতে চাইল না। অর্কো এক ঢোক পানি খেয়ে হেসে অর্পিতার হাতটা ধরে প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে দিল।
“আরেহ বাদ দাও তো এসব আজব মিডিয়ার চিপ ড্রামা! ওসব নিয়ে ভেবে মাথা নষ্ট করার কোনো মানে হয় না। সারাদিন পর পেটে প্রচণ্ড ক্ষুধা লেগেছে। বলো তো আজ কী রান্না করেছ? জলদি খাবার দাও।”
অর্পিতা মুচকি হেসে অর্কোর গালটা আলতো করে ছুঁয়ে বলল,
“তোমার পছন্দের মেনুই করেছি। হাত-মুখ ধুয়ে টেবিলে আসো, আমি খাবার দিচ্ছি।”
ডাইনিং টেবিলে বসতেই অর্পিতা বাটিতে করে নিয়ে এলো ধোঁয়া ওঠা বাসমতী চালের গরম ভাত আর অর্কোর সবচেয়ে প্রিয় কষানো ঝাল ঝাল গরুর মাংসের রেজালা। সাথে শসা-টমেটোর সালাদ আর লেবু। গরুর মাংসের সেই চেনা দেশি মসলার সুবাসে পুরো ডাইনিং স্পেসটা এক মুহূর্তে ভরে উঠল। অর্কো তৃপ্তি নিয়ে প্রথম লোকমাটা মুখে দিতে যাবে, ঠিক তখনই ডাইনিং টেবিলের ওপর রাখা তার ফোনটা গান গেয়ে উঠল।
স্ক্রিনে নাম ভাসছে— “রাশেদ”।
অর্কো লাউডস্পিকার অন করে ফোনটা রিসিভ করল,
“কী রে দোস্ত! কী খবর?”
ওপাশ থেকে এক লাফে রাশেদের সেই চিরচেনা উচ্চৈঃস্বরের চনমনে গলা ভেসে এলো—
“মামা! কী অবস্থা তোর? আমি তো নতুন বউ নিয়ে ঢাকা চলে আসছি রে! মিরপুর দুই নম্বরে একটা সুন্দর দুই রুমের ফ্ল্যাটও ভাড়া নিয়ে ফেলছি আজ সকালে।”
“আরেহ জোস! অভিনন্দন মামা!”
“আরে তুই আমাকে কী অভিনন্দন দিবি!”
রাশেদ ওপাশ থেকে হা হা করে হেসে উঠল।
“ফেসবুকে ঢুকে দেখি তোদের সিনেমার প্রেস কনফারেন্সের ভিডিও ভাইরাল! শালা, তুই দেশের সেরা ডিরেক্টরের সিনেমার গল্প আর স্ক্রিপ্ট লিখে ফেললি? সেই তো ! তুই তো পুরো লেভেল ক্রস করে গেছিস!”
অর্পিতা পাশ থেকে মিষ্টি করে হেসে বলল,
“ভাইয়া, শুনলাম নতুন বাসায় উঠেছেন। নতুন ভাবিকে নিয়ে কবে আমাদের বাসায় আসছেন?”
“আরে ভাবি! আসসালামু আলাইকুম,”
রাশেদ ফোনের ওপাশ থেকে বলল।
“আগে আমাদের এই নতুন সংসারটা একটু গুছিয়ে নিই। কাল বাদে পরশু কিন্তু আপনারা সবাই আমাদের নতুন বাসায় দাওয়াত! মরিয়ম নিজ হাতে কাচ্চি রাঁধবে বলেছে। আর অর্কো আহমেদকে কিন্তু আসতেই হবে, কোনো বাহানা চলবে না!”
“তোর বাসায় কি না গিয়ে পারি রে পাগল? “অবশ্যই যাব” অর্কো হেসে বলল।
“ঠিক আছে , এখন খেয়ে নে। পরে কথা হবে!”
বলে রাশেদ একগাল হেসে ফোনটা কেটে দিল।
টেবিলের ওপর তখন গরম ভাতের ধোঁয়া উড়ছিল। বাইরে পুরো মিডিয়া আর ফেসবুক হয়তো এক সস্তা বিতর্কের পেছনে ছুটছে, কিন্তু এই ডাইনিং টেবিলের চার দেওয়ালের মাঝে অর্পিতার হাতের গরুর মাংস পেয়ে অর্ক এক মুহূর্তের জন্য সব ভুলে গেল।
রাত তখন গভীর। উত্তরার শোবার ঘরটায় টিমটিম করে জ্বলছিল একটা নরম নীল ডিম লাইট।
বিছানায় অর্কোর বাঁ হাতের ওপর মাথা রেখে পরম শান্তিতে ঘুমাচ্ছিল অর্পিতা। তার একটা হাত আলতো করে রাখা ছিল অর্কোর বুকের ওপর। সে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে ছিল একদৃষ্টিতে।
বিকেলের প্রেস কনফারেন্সে সেই সাংবাদিকের করা বিষাক্ত প্রশ্নটা মনের গভীরের চাপা পড়ে থাকা এক পুরোনো ক্ষতকে যেন আবার খুঁড়ে বের করেছে।
“শোনা যায় আপনি নাকি বাবাকে ফেলে চলে এসেছেন... বাবার কোনো খোঁজ নেন না...”
অর্কো অর্পিতার ঘুম না ভেঙে খুব আস্তে ডান হাত দিয়ে সাইড টেবিল থেকে ফোনটা তুলে নিল। ব্রাইটনেস একদম কমিয়ে সে গ্যালারির অনেক পুরোনো একটা ফোল্ডার খুলল।
স্ক্রিনের ওপর ভেসে উঠল একটি পুরোনো, কিছুটা ঘোলাটে হয়ে যাওয়া ছবি। ফরিদপুরের পৈতৃক বাড়ির বারান্দায় কাঠের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছেন এক রাশভারী ভদ্রলোক। গায়ে সাদা সুতির পাঞ্জাবি, মুখে সেই চেনা কাঠিন্য। ছবিটার দিকে তাকাতেই অর্কোর চোখের সামনে পুরোনো স্মৃতিগুলো একের পর এক সিনেমার মতো ভেসে উঠতে লাগল।
মা মারা যাওয়ার পর থেকেই ফরিদপুরের সেই বাড়িতে অর্কোর জীবনটা বিষাক্ত হয়ে উঠেছিল। অর্কো যখন রাত জেগে ডায়েরির পাতায় গল্প লিখত, বাবা তখন এসে তীব্র ব্যঙ্গ করতেন। তারপর একদিন ঘটেছিল সেই ভয়ংকর ঘটনা।
সেদিন বিকেলে অর্কো বাহিরে থেকে ফিরে দেখেছিল, উঠোনের এক কোণে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। বাবা তার বুকশেলফ থেকে টেনে বের করে তার কৈশোরের সমস্ত ডায়েরি, শত শত ছোটগল্প আর অপ্রকাশিত কবিতার খাতাগুলো জ্বলন্ত আগুনে ফেলে দিয়েছিলেন। অর্কো সেদিন চিৎকার করে আগুনে হাত দিয়ে খাতাগুলো বাঁচাতে চেয়েছিল, কিন্তু ততক্ষণে সব পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল। বাবা তখন বুক ফুলিয়ে চিৎকার করে বলেছিলেন,
“এইসব অপদার্থের মতো ছাইপাঁশ লেখা আমি আমার ঘরে বরদাশত করবো না!”
সেই রাতেই একটা পুরোনো ব্যাগে গোটা দুয়েক জামা আর অবশিষ্ট কিছু সাদা কাগজ ভরে অর্কো শেষবারের মতো ফরিদপুরের ভিটেমাটি ছেড়ে ঢাকার বাসে উঠেছিল। ঢাকায় এসে ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধীনে একটি সাধারণ কলেজে সে ইংলিশে অনার্সে ভর্তি হয়। মেসের ভ্যাপসা ঘরে টিউশনি আর সস্তা কনটেন্ট লিখে কোনোমতে দিন পার করছিল সে। ঢাকায় আসার শুরুর দিকে বাবা তাকে একটাই কথা বলতেন লেখালেখি বাদ দিয়ে যেন বিসিএস বা ব্যাংকের চাকরির জন্য ঘাটে। কিন্তু আজ থেকে প্রায় পাঁচ-ছয় বছর আগের এক বিকেলে সম্পর্কের সেই শেষ সুতোটাও চিরতরে ছিঁড়ে গিয়েছিল।
সেদিন হঠাৎ করেই বাবা ফার্মগেটের সেই অন্ধকার মেসের চিলেকোঠায় এসে হাজির হয়েছিলেন। মেসের স্যাঁতসেঁতে ঘরের মেঝেতে ছড়ানো পাণ্ডুলিপির পাতা আর অর্কোর আধপেটা খাওয়া রোগা শরীর দেখে তিনি ক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন। মেসের সেই ছোট ঘরে শুরু হয়েছিল এক তীব্র, নারকীয় চিৎকার-চেঁচামেচি। বাবা টেবিলের ওপর রাখা খাতাগুলো টেনে মেঝেতে আছড়ে ফেলে এক ভয়ংকর আলটিমেটাম দিয়েছিলেন—
“হয় এই মুহূর্তে এইসব আবর্জনা ডাস্টবিনে ফেলে আমার সাথে ফরিদপুর ফিরে যাবি, নয়তো আজ থেকে তুই আমার জন্য মৃত!”
অর্কো সেদিন মেঝের কাগজগুলো পরম শ্রদ্ধায় কুড়িয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল,
“বাবা, এই কাগজগুলোই আমার আত্মা। আমি এগুলো ছাড়তে পারব না।”
বাবা এক মুহূর্তও আর দাঁড়াননি। তিনি দাঁতে দাঁত চেপে শেষ অভিশাপটা দিয়ে মেসের দরজা সশব্দে টেনে দিয়ে চলে গিয়েছিলেন—
“তোর মতো কুলাঙ্গার একদিন এই ঢাকার রাস্তায় না খেয়ে ভিখারির মতো মরবে!”
সেই দিনের পর থেকে আজ পর্যন্ত গত পাঁচ-ছয়টি বছর ধরে বাবার সাথে তার আর একটা কথাও হয়নি। কোনো ফোন বাজেনি, কোনো খবরাখবর আসেনি।
কিন্তু আজ... এতগুলো বছর পর, জীবনের সমস্ত অন্ধকার পেরিয়ে যখন সে খ্যাতির শীর্ষে দাঁড়িয়েছে, দেশের সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছে, তখন বুকের ভেতরটা কেমন যেন এক অদ্ভুত হাহাকারে দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছিল।
অর্কো ছবির সেই মুখটার দিকে চেয়ে মনে মনে ভাবল—মানুষটা এখন কেমন আছে? এই পাঁচ-ছয় বছরে কি বাবার বয়স আরও অনেক বেড়ে গেছে? মা চলে যাওয়ার পর তো বাবা একাই ছিলেন ওই বিশাল গ্রামের বাড়িতে। মানুষটা কি এখনো আগের মতোই একরোখা, নাকি বয়সের ভারে নিঃসঙ্গ হয়ে গেছেন? হুট করে এত বছর পর এভাবে গিয়ে দাঁড়ালে বাবা কি আদৌ তাকে ঘরে ঢুকতে দেবেন? নাকি আবার সেই পুরোনো ক্ষোভ নিয়ে মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দেবেন?
অর্কো একটা লম্বা, গরম নিঃশ্বাস ফেলল।
সে মনে মনে একটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল। আর পালিয়ে থাকা নয়। পরশুদিন সকালে সে একাই যাবে ফরিদপুরের সেই গ্রামে।
ঢাকা থেকে ফরিদপুর যেতে মেরেকেটে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টার বেশি সময় লাগে না। অর্পা যদি এখন এইচএসসি পরীক্ষার শেষ মুহূর্তের চূড়ান্ত প্রস্তুতিতে না থাকত, তবে সে অর্পিতা আর অর্পাকে সাথে নিয়েই যেত। কিন্তু অর্পার পড়ালেখার এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে কোনো পারিবারিক টানাপোড়েনের ছায়া ফেলা ঠিক হবে না। তাছাড়া প্রথমবার একা গিয়েই বাবার মুখোমুখি হওয়াটা সবচেয়ে ভালো।
অর্কো ফোনের স্ক্রিনটা অফ করে সাইড টেবিলে রেখে দিল। সে আলতো করে চাদরটা টেনে অর্পিতার গায়ের ওপর ভালো করে মেলে দিল। অর্পিতা ঘুমের ঘোরে একটু নড়েচড়ে অর্কোর বুকের সাথে আরও একটু লেপটে শুলো।
অর্কো নিজের চোখ দুটো বুজল। বাইরে রাতের ঢাকা শহর তখন ভোরের আলো ফোটার অপেক্ষায়, আর অর্কোর মনের ভেতরে তখন তৈরি হচ্ছিল নিজের হারানো অতীত আর বাবার মুখোমুখি হওয়ার এক গভীর, অনিশ্চিত অথচ অনিবার্য সফরের প্রস্তুতি।
পরদিন সকালের নরম রোদ ডাইনিং টেবিলের ওপর এসে পড়েছিল।
রান্নাঘর থেকে গরম পরোটা আর ডিম ভাজার সুবাস ভেসে আসছিল। অর্পা আগেই নাস্তা সেরে নিজের রুমে টেস্ট পেপারের সলভে বসে গেছে। টেবিলে তখন ধোঁয়া ওঠা দুই কাপ চা আর নাস্তা নিয়ে বসল অর্পিতা। অর্কো চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে একটু নাড়াচাড়া করল। তার মুখের ভেতর একটা চাপা ভাবনার ছায়া।
“অর্পিতা...”
অর্কো একটু থেমে খুব শান্ত গলায় ডাকল।
অর্পিতা পরোটায় এক টুকরো ডিম মুড়ে মুখে দিতে গিয়ে তাকাল,
“হুম, বলো?”
“আমি কাল সকালে ফরিদপুর যাব।”
অর্পিতার হাতের খাবারটা মাঝপথেই থেমে গেল। সে চশমার ওপর দিয়ে চোখ বড় বড় করে অর্কোর দিকে তাকাল।
“ফরিদপুর? মানে তোমার বাবার কাছে?” অর্পিতার গলার স্বরে একরাশ উদ্বেগ আর আতঙ্ক ফুটে উঠল।
“সিরিয়াসলি অর্কো? এটা কিন্তু একদম ভালো আইডিয়া না! বাদ দাও না প্লিজ... যে মানুষটা তোমার সব খাতা পুড়িয়ে দিল, মেসের মধ্যে এসে তোমাকে ভিখারি বলে অভিশাপ দিয়ে গেল, এই ছয় বছর একটা দিনের জন্যও কোনো খোঁজ নিল না তুমি হুট করে কেন তাঁর কাছে যাবে? উনি যদি আবার তোমাকে আগের মতো সবার সামনে অপমান করেন?”
অর্কো চায়ের কাপটা টেবিলে নামিয়ে রাখল। সে অর্পিতার একটা হাত নিজের দুই হাতের ভেতর আলতো করে তুলে নিল।
“অর্পিতা, ঠান্ডা মাথায় একটু ভাবো, বাবা যা করেছিলেন, সেটা যে ভুল ছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু দিনশেষে তো উনিই আমার জন্মদাতা বাবা। মা মারা যাওয়ার পর থেকে ওই বিশাল গ্রামের বাড়িতে মানুষটা কিন্তু একদম একা হয়ে গেছেন।”
অর্কো একটু থেমে আবার বলতে লাগল,
“আজ আমি সফল অর্পিতা। মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি, সম্মান পেয়েছি, আমার পেটের ক্ষুধা মিটে গেছে। এখন আমার মনে বাবার প্রতি কোনো রাগ বা ক্ষোভ জমে নেই। বয়স তো বাবারও অনেক হয়েছে... মানুষটা এখন কেমন আছে, অন্তত নিজের চোখে গিয়ে একবার দেখে আসি। উনি যদি আবারও আমার মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দেন, যদি আবারও গালাগালি করেন তাতেও আমার কোনো আফসোস থাকবে না। অন্তত এই জীবনে আমার এই গ্লানি নিয়ে বাঁচতে হবে না যে আমি নিজে থেকে একবার চেষ্টা করিনি।”
অর্পিতা অপলক দৃষ্টিতে অর্কোর শান্ত চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। অর্পিতা নরম গলায় বলল,
“ঠিক আছে, তুমি যাও। নিজের বাবার সাথে দেখা করতে তো আর কোনো দ্বিধার জায়গা থাকতে পারে না।”
নাস্তা শেষ হতেই দুজনে চলে এলো বেডরুমে।
আলমারি থেকে অর্পিতা একটা ছোট ট্রাভেল ব্যাগ বের করে বিছানার ওপর রাখল। অর্কো বেছে বেছে দুটো সুতির ভালো ইস্ত্রি করা পাঞ্জাবি আর প্যান্ট ব্যাগে ভরল।
অর্পিতা ব্যাগের চেইন লাগাতে লাগাতে বলল,
“ফরিদপুর ঢোকার মুখে বড় মিষ্টির দোকান থেকে ভালো দেখে ছানার মিষ্টি আর ফলমূল কিনে নেবে। আর বাবার প্রেশার বা ডায়াবেটিসের কোনো সমস্যা আছে কি না খোঁজ নিয়ে এসো।”
“হ্যাঁ, আমি সব দেখে নেব,” অর্কো হেসে অর্পিতার কাঁধে হাত রাখল।
সকালের সোনালী রোদে ঢাকা থেকে একটি এসি বাসে চেপে বসল অর্কো।
পদ্মা সেতু পার হওয়ার সময় নিচের সুবিশাল জলরাশির দিকে তাকিয়ে তার মনের ভেতরের অস্থিরতা যেন কিছুটা হালকা হয়ে এলো। মসৃণ এক্সপ্রেসওয়ে পেরিয়ে মাত্র আড়াই ঘণ্টার মাথায় বাস এসে থামল ফরিদপুর বাস টার্মিনালে।
বাস থেকে নামতেই চারপাশের পরিবর্তনটা অর্কোর চোখে পড়ল।
ছয় বছর আগের সেই শান্ত, ধীরগতির ফরিদপুর এখন আর নেই। শহরের রাস্তাগুলো চওড়া পিচঢালা, মোড়ে মোড়ে নতুন শপিং কমপ্লেক্স, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার একটানা টুংটাং আর সোলার স্ট্রিট লাইট।
টার্মিনালের মোড় থেকে বড় এক প্যাকেট টাটকা ছানার মিষ্টি আর ভালো ফলমূল কিনে সে একটা অটোরিকশা নিয়ে রওনা দিল নিজের পৈতৃক গ্রামের দিকে।
গ্রামের মেঠোপথটাও এখন পাকা সড়কে রূপ নিয়েছে। দুপাশের চেনা বাঁশঝাড় আর আমবাগানগুলো পেরিয়ে অটোরিকশা যখন তাদের পুরোনো পাড়ার মুখে এসে থামল, অর্কো ভাড়া মিটিয়ে কাঁধের ব্যাগটা নিয়ে রাস্তায় নামল।
কিন্তু নিজের চেনা বাড়ির সীমানায় পা রাখতেই অর্কো এক লহমায় থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।
তার চোখের সামনে যেন এক অবিশ্বাস্য বিভ্রম!
কোথায় সেই তার শৈশবের পুরোনো, চুনখসে যাওয়া শ্যাওলাধরা একতলা ইট-টিনের ঘর?
সেই পুরোনো ঘরের জায়গায় এখন সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে একটি সুদৃশ্য, চকচকে নতুন রঙের দোতলা পাকা বাড়ি! স্টিলের গ্রিল দেওয়া বারান্দা, সামনে নতুন করে বাঁধানো সীমানা প্রাচীর আর একটা বড় কালো লোহার মেইন গেট।
অর্কো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে ভাবল হয়তো ভুল করে অন্য কারও বাড়ির সামনে চলে এসেছে।
রাস্তার পাশের এক সাইকেল আরোহীকে ডেকে অর্কো একটু ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করল,
“ভাই, এটা কি জালাল আহমেদ সাহেবের বাড়ি?”
লোকটি সাইকেল থামিয়ে অবাক হয়ে তাকাল।
“হ্যাঁ ভাই, জালাল মাস্টারেরই তো নতুন বাড়ি। আপনি ওনার বাড়ি চিনেন না?”
অর্কোর পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল।
বাবা এই বয়সে এমন আলিশান দোতলা বাড়ি বানিয়ে ফেললেন? কীভাবে? পেনশনের টাকায় তো কোনোমতে সংসার চলার কথা! এই বিশাল বাড়ির টাকা বাবা পেলেন কোথা থেকে?
হতভম্ব হয়ে অর্কো যখন মেইন গেটের দিকে এগোতে যাবে, ঠিক তখনই উল্টো দিক থেকে হাতে লাঠি নিয়ে হেঁটে আসছিলেন পাড়ার এক প্রবীণ মুরুব্বি রহমত চাচা।
অর্কোকে দেখেই রহমত চাচা চশমার ওপর দিয়ে চোখ ছোট করে তাকালেন। কয়েক সেকেন্ড নিবিষ্ট মনে দেখে হঠাৎ তাঁর মুখে এক চওড়া আনন্দের হাসি ফুটে উঠল।
“আরে! তুমি জালাল মাস্টারের পোলা অর্কো না?”
রহমত চাচা লাঠিতে ভর দিয়ে দ্রুতপায়ে এগিয়ে এলেন।
“আরে বাপু! তোমারে তো আজকাল টিভিতে দেখি, মোবাইলেও কত খবর দেখি! ওই যে কী জানি বিরাট পুরস্কার পাইলা টিভিতে দেখলাম প্রধানমন্ত্রীর হাত দিয়া! কত বড় বড় বই লিখছো! তা খুব ভালো লাগলো বাপু, দেশের মধ্যে আমাগো এই অজপাড়াগাঁয়ের নামটা তুমি উজ্জ্বল করলা!”
অর্কো বিনীতভাবে নিচু হয়ে রহমত চাচার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করল।
“চাচা, আসসালামু আলাইকুম। আপনারা সবাই ভালো আছেন?”
“সব ভালো বাপু, সব ভালো,”
রহমত চাচা স্নেহে অর্কোর পিঠ চাপড়ে দিলেন।
তারপর রহমত চাচা এই নতুন দোতলা বাড়িটার দিকে একবার তাকিয়ে রহস্যময় এক হাসি দিলেন। তাঁর চোখের দৃষ্টিতে যেন এক না বলা আনন্দের ইঙ্গিত।
“তা বাপু, বাইরে খাড়ায়া আছো ক্যান?”
রহমত চাচা গেটের দিকে ইশারা করে খুব অর্থপূর্ণ গলায় বললেন,
“যাও বাপু, বাড়ির ভেতরে যাও। তোমার বাপের কাছে যাও। তোমার লেইগা ঘরের ভেতরে এক বিরাট উপহার অপেক্ষা করতেছে!”
অর্কো চমকে উঠে রহমত চাচার মুখের দিকে তাকাল।
“উপহার? কিসের উপহার চাচা?”
রহমত চাচা কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি শুধু মৃদু হেসে লাঠি ঠুকঠুক করে মেঠোপথ ধরে সামনের দিকে হেঁটে চলে গেলেন। অর্কো একাকী দাঁড়িয়ে রইল সেই নতুন দোতলা বাড়ির কালো লোহার গেটের সামনে। ভেতরে পা বাড়ানোর আগে তার বুকের ভেতর হৃৎস্পন্দন যেন দ্বিগুণ গতিতে চলতে শুরু করল। এত বছর পর এই অচেনা দরজার ওপাশে তার জন্য ঠিক কী অপেক্ষা করছে—তা জানার এক তীব্র উৎকণ্ঠা আর বিস্ময় তাকে ঘিরে ধরল।
লোহার কালো গেটটা ঠেলে ভেতরে ঢুকল অর্কো।
সামনে এক সুন্দর বাগান, সেখানে বেলী আর গাঁদা ফুলের গাছ বাতাসে দুলছে। পুরো বাড়ির দেওয়ালে টাটকা রঙের গন্ধ। অর্কো দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়ে নিচতলার কাঠের প্রধান দরজার সামনে এসে হালকা করে নক করল। কয়েক সেকেন্ড পর দরজা খুলে এক অপরিচিত ভদ্রলোক সামনে এসে দাঁড়ালেন। পরনে লুঙ্গি আর স্যান্ডো গেঞ্জি, মুখে একরাশ কৌতূহল।
“কাকে চান ভাই?”
ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন।
অর্কো একটু ইতস্তত করে বলল,
“জালাল আহমেদ সাহেব কি আছেন? মানে জালাল মাস্টার...”
ভদ্রলোক একগাল হেসে বললেন,
“ওহ, মাস্টার সাহেব তো ওপরে দোতলায় থাকেন! আমরা তো ভাড়াটিয়া। আপনি সিঁড়ি দিয়ে সোজা দোতলায় চলে যান।”
“ভাড়াটিয়া!”
অর্কোর বিস্ময়ের মাত্রা যেন আরও এক ধাপ বেড়ে গেল।
ভদ্রলোক দরজা টেনে দিতেই অর্কো ভারী পায়ে টাইলস বসানো ঝকঝকে সিঁড়ি বেয়ে দোতলার দিকে উঠতে লাগল। প্রতিটি সিঁড়ির ধাপ পার হওয়ার সাথে সাথে তার বুকের ভেতরের ধুকপুকানি বাড়ছিল। ছয় বছর পর সেই ভয়ংকর বিদায়ের স্মৃতি, মেসের দরজায় বাবার সেই শেষ অভিশাপের কথা মনে পড়তেই তার হাত-পা কাঁপতে শুরু করল।
দোতলার প্রধান দরজার সামনে এসে দাঁড়াল অর্কো। কাঠের দরজায় পেতলের সুন্দর হাতল লাগানো। অর্কো কাঁপাকাঁপা আঙুল তুলে দরজায় আস্তে করে তিনটি টোকা দিল।
কয়েক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা। তারপর ভেতরে হালকা পায়ের আওয়াজ পাওয়া গেল।
ছিটকিনি খোলার শব্দ হয়ে দরজাটা ধীরে ধীরে খুলে গেল।
দরজার ওপাশে এসে দাঁড়িয়েছে আনুমানিক বাইশ-তেইশ বছর বয়সী একটি তরুণী। পরনে সাধারণ সুতির সালোয়ার কামিজ, মাথায় ওড়না টানা।
মেয়েটি দরজা খুলেই অর্কোর মুখের দিকে এক পলক তাকাল। আর তাকানোমাত্রই যেন এক অবিশ্বাস্য অলৌকিক দৃশ্য দেখে মেয়েটি পাথরের মতো জমে বরফ হয়ে গেল! তার চোখের পাতা স্থির, মুখে কোনো ভাষা নেই।
পরের মুহূর্তেই মেয়েটি দরজার পাল্লা ছেড়ে দিয়ে উল্টো দিকে এক প্রকার চিৎকার করে বাড়ির ভেতরের দিকে ছুটল—
“মা! ও মা! জলদি আসো! দেখো কে এসেছে!”
অর্কো হতভম্ব হয়ে দরজার মুখে দাঁড়িয়ে রইল। সে কিছুই বুঝতে পারছিল না। মেয়েটি তাকে দেখে এভাবে চিৎকার করে উঠল কেন? আর কে এই মেয়ে? ঠিক তখনই ভেতরের ঘর থেকে দ্রুতপায়ে বেরিয়ে এলেন পঞ্চাশোর্ধ্ব এক ভদ্রমহিলা। তাঁর পরনে মার্জিত সুতির শাড়ি, মুখে চশমা, কাঁচাপাকা চুল।
দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা অর্কোর দিকে চোখ পড়তেই ভদ্রমহিলার চোখ দুটো মুহূর্তের মধ্যে জলে টলমল করে উঠল। তাঁর মুখে ফুটে উঠল এক অপার্থিব স্বস্তি আর আবেগের ছাপ।
ভদ্রমহিলা এক মুহূর্তও কোনো দূরত্ব রাখলেন না। তিনি সোজা এগিয়ে এসে অর্কোর দুই হাত থেকে মিষ্টির প্যাকেট, ফলের ব্যাগ আর ট্রাভেল ব্যাগটা নিজের হাতে তুলে নিলেন।
তারপর ভেজা গলায় বললেন—
“আসো বাবা! ভেতরে আসো। কতদিন পর ঘরে ফিরলে তুমি!”
অর্কো যেন নিজের চোখ আর কান কোনোটাকেই আর বিশ্বাস করতে পারছিল না। সে কোনো কথা বলতে পারল না। তার সমস্ত চিন্তাশক্তি এক নিমেষে গুলিয়ে গেল। এই বিলাসবহুল দোতলা বাড়ি, এই নিচতলার ভাড়াটিয়া, এই অচেনা তরুণী, আর এই অপরিচিত ভদ্রমহিলা—যিনি তাকে এত নিবিড়ভাবে বাবা বলে বুকে টেনে নিচ্ছেন... এরা কারা?
মাথার ভেতর হাজারটা অনুত্তরিত প্রশ্নের ঝড় নিয়ে অর্কো এক পা এক পা করে সেই দোতলার
দেওয়ালে বড় বড় কাঁচের ফ্রেমের পেইন্টিং, নিচে দামি টাইলসের মেঝের ওপর পরিপাটি সোফা সেট আর একপাশে নতুন ফ্রিজ। অর্কো এক মুহূর্তের জন্য ভাবল, সে হয়তো ভুল কোনো বাড়ির ভুল কোনো দরজায় এসে ঢুকে পড়েছে। হয়তো এই মানুষগুলো তাকে টিভিতে বা ফেসবুকে দেখে চিনে ফেলেছে, তাই এমন বিখ্যাত কাউকে দেখে আপ্যায়ন করছে!
অর্কো একটু পিছিয়ে গিয়ে কাঁপাকাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল,
"আচ্ছা... এটা কি সত্যিই জালাল আহমেদ মাস্টারের বাড়ি?"
ভদ্রমহিলা মুখে এক স্নিগ্ধ, মায়াবী হাসি টেনে বললেন,
"হ্যাঁ বাবা, এটা তো তোমার বাবারই বাড়ি।"
অর্কোর বুকের ভেতরের বিভ্রান্তিটা এবার চরমে গিয়ে ঠেকল। সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে সরাসরি জিজ্ঞেস করল,
"তাহলে... আপনারা কারা?"
ভদ্রমহিলা অর্কোর চোখের দিকে চেয়ে একটু থমকালেন। তারপর এক অদ্ভুত প্রশান্তি নিয়ে খুব নরম গলায় বললেন—
"আমি তোমার বাবার স্ত্রী... আর ও আমার মেয়ে সামিহা। আমার বড় একটা ছেলে আছে রিয়াদ, সে ইতালিতে থাকে।"
মুহূর্তের মধ্যে যেন অর্কোর মাথার ওপর পুরো আকাশটা ভেঙে পড়ল! তার সমস্ত ইন্দ্রিয় যেন এক সেকেন্ডের জন্য অবশ হয়ে গেল। বাবা... দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন?
মা মারা যাওয়ার পর যে মানুষটা একা হয়ে গিয়েছিলেন, যে মানুষটা মেসের চার দেয়ালে এসে তাকে নিঃস্ব বলে অভিশাপ দিয়ে ঘর ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন সেই মানুষটা এই ছয় বছরে সম্পূর্ণ নতুন এক সংসার পেতে বসেছেন! তাঁর একজন নতুন স্ত্রী আছে, এক মেয়ে আছে, আরেক ছেলে আছে যে সুদূর প্রবাসে থাকে! অর্কো কোনো কথা বলতে পারল না। তার সমস্ত শরীর যেন পাথরের মতো ভারী হয়ে এলো।
সে শুকনো গলায় কোনোমতে জিজ্ঞেস করল,
"বাবা... বাবা কোথায়?"
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তেইশ-চব্বিশ বছরের সেই মেয়েটি তখন চোখ বড় বড় করে অর্কোর দিকে চেয়ে ছিল। সে এক পা এগিয়ে এসে এক চওড়া, উচ্ছ্বসিত হাসিতে বলল—
"বাবা তো একটু আগেই মোড়ের বড় বাজারে গেছেন ভাইয়া! এই তো এখনই চলে আসবেন। ভাইয়া, আমার নাম সামিহা! আমি কিন্তু আপনার এক নম্বর ফ্যান! আপনার শেষ মানুষটির ডায়েরি থেকে শুরু করে দশ দিন,বানুরিয়া সব কটা বই আমি নিজে কিনে পড়েছি!"
অর্কোর মাথা তখন ভনভন করে ঘুরছিল। এত বড় বড় ঘটনা এই ছয় বছরে ঘটে গেছে, অথচ সে যার একবিন্দুও জানত না!
সে চারপাশে চোখ বুলিয়ে দেওয়ালে হাত রেখে জিজ্ঞেস করল,
"কিন্তু... এই দোতলা পাকা বাড়ি? এত বড় বিল্ডিং আসলো কীভাবে?"
ভদ্রমহিলা হেসে ড্রয়িংরুমের সেন্ট্রাল টেবিলের ওপর রাখা কাঁচের জগ থেকে এক গ্লাস পানি ঢেলে অর্কোর হাতে দিলেন।
"পানিটা খাও বাবা,"
ভদ্রমহিলা খুব আপন করে বললেন।
"এই বাড়িটা আমার ইতালিতে থাকা ছেলে রিয়াদ বানিয়েছে। বছর দুয়েক আগে সে বিদেশ থেকে টাকা পাঠিয়ে বলল, বাবার শরীর তো দিন দিন দুর্বল হচ্ছে, এই বয়সে ওই পুরোনো স্যাঁতসেঁতে ভাঙা ঘরে বাবার অনেক কষ্ট হয়। তাই রিয়াদই পুরো পুরোনো বাড়িটা ভেঙে নতুন করে এই দোতলা পাকা বাড়িটা তুলে দিল, যাতে তোমার বাবার শেষ বয়সটা একটু শান্তিতে কাটে। আর নিচতলাটা ভাড়া দেওয়া হয়েছে যাতে সংসারের হাতখরচ আর বাবার ওষুধের টাকাটা চলে আসে।"
অর্কো গ্লাসের পানির দিকে তাকিয়ে রইল। তার হাত তখনো সামান্য কাঁপছে। যে বাবার জন্য তার মনের ভেতর এত বছর ধরে অপরাধবোধ আর অনুশোচনার এক অন্ধকার পাহাড় জমেছিল, সেই বাবা আজ এক নতুন সাজানো সংসারে, নিজের আরেক ছেলের ভালোবাসায় এক সুরক্ষিত আশ্রয়ে সচ্ছলভাবে বাস করছেন।
ঠিক তখনই নিচতলার সিঁড়িতে ভারী জুতো পরে কারও উঠে আসার চেনা, পরিচিত পদশব্দ পাওয়া গেল। সামিহা দরজার দিকে তাকিয়ে আনন্দিত গলায় বলে উঠল,
"ওই তো! বাবা বাজার থেকে চলে এসেছে!"
অর্কোর বুকের ভেতরের রক্ত যেন এক নিমেষে জমাট বেঁধে গেল। সে দরজার দিকে ঘুরে তাকাল। ছয় বছর পর, তার জীবনের সমস্ত অতীত আর বর্তমান যেন এক বিন্দুতে এসে মুখোমুখি হওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।
সিঁড়ির সেই পায়ের শব্দটা এসে থামল দরজার সামনে। তবে বাবা নন, নিচতলার ভাড়াটিয়া ভদ্রলোক বিদ্যুৎ বিলের কাগজটা দিতে এসেছিলেন।
ড্রয়িংরুমের নরম সোফা, দেওয়ালে বাঁধানো নতুন ঘড়ির টিকটিক শব্দ আর চারপাশের এই ঝকঝকে পরিপাটি সংসারের দিকে তাকিয়ে অর্কোর বুকের ভেতর তখন তীব্র এক অস্থিরতা কাজ করছিল। এখানে আর এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকার মতো শক্তি তার ছিল না।
অর্কো উঠে দাঁড়াল।
“আমি আজকে আসি,” অর্কো খুব নিচু গলায় বলল।
ভদ্রমহিলা আঁতকে উঠে সামনে এগিয়ে এলেন,
“কী বলছ বাবা! এত বছর পর বাড়িতে পা রাখলে, তোমার বাবা তো আর পাঁচ মিনিটের মধ্যে চলে আসবেন! দুপুরে ভাত না খেয়ে তুমি কোথায় যাবে?”
সামিহাও আকুল হয়ে বলল, “ভাইয়া, প্লিজ যেয়ো না! বাবা কত খুশি হবেন আপনাকে দেখলে!”
অর্কো কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে একটু ম্লান হাসল। সে টেবিলের ওপর মিষ্টি আর ফলের ব্যাগগুলো দেখিয়ে বলল,
“মিষ্টিগুলো বাবার জন্য এনেছিলাম, আপনারা খাবেন। আমার ঢাকায় জরুরি কাজ আছে, আমাকে এখনই বের হতে হবে।”
তাদের শত অনুনয় আর আকুতির মাঝেও অর্কো আর সেখানে দাঁড়াল না। সে খুব দ্রুতপায়ে সালাম জানিয়ে দোতলার দরজা পেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো।
কালো লোহার গেটটা পেরিয়ে মেঠোপথে নামতেই তার বুকের ভেতরটা যেন খাঁ খাঁ করে উঠল।
কিছুদূর হেঁটেই রাস্তার মোড়ে, পুরোনো এক বটগাছের নিচে টিনের চালের সেই পরিচিত চায়ের টং দোকানটা চোখে পড়ল।
দোকানের চুলায় কেটলি বসিয়ে চা বানাচ্ছিল আমান অর্কোরই বয়সী, ত্রিশ-একত্রিশ বছরের এক চেনা যুবক। শৈশবে পাড়ার প্রাইমারি স্কুল আর খেলার মাঠে অর্কোর সাথেই কেটেছে তার কৈশোর।
অর্কো দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
“আমান, এক কাপ চা দে তো রে।”
গলার আওয়াজটা শুনে আমান কেতলি থেকে মুখ তুলে তাকাল। এক পলক দেখেই সে যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না। হাতের কাপ-পিরিচ একপাশে রেখে সে এক লাফে কাঠের চৌকাঠ ডিঙিয়ে বাইরে চলে এলো।
“আরে অর্কো! তুই!”
আমান কোনো কথা না বাড়িয়ে দুই হাত বাড়িয়ে অর্কোকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বুকে চেপে ধরল। তার মুখে তখন একরাশ বিস্ময় আর উচ্ছ্বাস।
“শালা! কত বছর পর গ্রামে আইলি তুই!”
আমান অর্কোর কাঁধ ধরে একটু ঝাঁকিয়ে দিয়ে হাসল।
“টিভিতে দেহি, ফেসবুকে তোর কত বড় বড় খবর দেহি ! তোরে দেইখা যে কী ভালো লাগতেছে রে ভাই! বোস, তুই বেঞ্চে বোস, তোরে আজ আমার স্পেশাল মালাই চা খাওয়াব।”
অর্কো কোনোমতে একটা শুকনো হাসি দিয়ে বেঞ্চের এক কোণায় বসল।
আমান খাঁটি দুধের কড়া মালাই চা বানিয়ে এক গ্লাস অর্কোর হাতে দিল। তারপর নিজে পাশে এসে বসে বলল,
“কত বছর পর গ্রামে আইসা নিজের পুরোনো বাড়ির জায়গায় দোতলা বিল্ডিং দেইখা তো চরম শক খাইয়া গেলি, তাই না রে দোস্ত?”
অর্কো ধোঁয়া ওঠা চায়ের গ্লাসে হাত রেখে আমানের দিকে তাকাল। তার চোখের দৃষ্টিতে ছিল গভীর এক জিজ্ঞাসা।
“আমান... বাবার এই দ্বিতীয় বিয়ের বিষয়টা কী হয়েছিল আসলে? তুই তো সব জানিস।”
আমান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হঠাৎ বেশ গম্ভীর হয়ে গেল।
“ঘটনা তো বেশিদিনের না রে অর্কো, এই বছর চারেক আগের কথা,”
আমান খুব ধীর গলায় বলতে শুরু করল।
“তোর মা মারা যাওয়ার পর আর তুই ঢাকা চইলা যাওয়ার পর মাস্টার কাকা তো একেবারে একা হইয়া ভাইঙ্গা পড়ছিলেন। তারপর একদিন ওনার কঠিন টাইফয়েড আর জন্ডিস হলো। ওই পুরান স্যাঁতসেঁতে ঘরে একা পইড়া ছিলেন, মুখে এক ফোঁটা পানি তুইলা দেওয়ার মতো কেউ ছিল না। ওনার এমন অসহায় অবস্থা আর কান্নাকাটি দেইখা পাড়ার মুরুব্বিরা সবাই মিল্লা একদিন সিদ্ধান্ত নিল ওনারে এই বয়সে একা রাখা যাইব না।”
আমান চুলার আঁচ একটু কমিয়ে বলল,
“পাশের গ্রামের কাদের চাচার বিধবা বউ তোর ওই নতুন কাকিমা, মানুষটা এককথায় মাটির মানুষ। পাড়ার মুরুব্বিরা মিলেই চার বছর আগে ওনাদের বিয়েটা পড়াইয়া দেয়। কাকিমা ঘরে আসার পর থিকাই দিনরাত সেবাযত্ন কইরা মাস্টার কাকাকে একদম সুস্থ কইরা তুলছে। আর ওনার বড় ছেলে রিয়াদ ইতালিতে থাইকা সৎ বাপের লেইগা যা করল, আজকের যুগে নিজের পেটের পোলাপানও এত কিছু করে না ! রিয়াদই তো এই দোতলা বাড়ি তুইলা দিয়া বাপের শেষ বয়সটা রাজার মতো কইরা দিল।”
আমানের কথাগুলো যেন এক একটা তপ্ত তীরের মতো অর্কোর বুকের পাঁজর ভেদ করে ভেতরে ঢুকে গেল। তার চোখের পাতা ভিজে এক ফোঁটা নোনা পানি চায়ের গ্লাসের ভেতর টুপ করে খসে পড়ল। কোনো শান্তি বা স্বস্তি নয় এক তীব্র, বুকফাটা অপরাধবোধ যেন এক নিমেষে অর্কোর পুরো অস্তিত্বকে দুমড়েমুচড়ে দিল। বুকের ওপর নেমে এলো টন খানেক ওজনের এক নির্মম পাথর।
যে সময়টাতে সে ঢাকায় নিজের ক্ষোভ আর অভিমানকে আঁকড়ে ধরে বসে ছিল, যে সময়টাতে সে নিজের জেদ আর স্বপ্নের অহংকারে নিজেকে বড় ভাবছিল ঠিক সেই সময়টাতে তার বৃদ্ধ বাবা এই গ্রামের এক অন্ধকার ঘরে এক ফোঁটা পানির জন্য একা একা কেঁদেছেন! যে সেবা, যে পরম যত্ন একজন জন্মদাতা বাবার প্রাপ্য ছিল তার নিজের রক্তের ছেলের কাছ থেকে, সেই দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে অন্য এক অচেনা মায়ের পরদেশি ছেলেকে!
অর্কোর গলার কাছে কী যেন এক অসহ্য কান্নার দলা পাকিয়ে এলো।
সে কোনো কথা বলতে পারল না। কাঁপাকাঁপা হাতে চায়ের শেষ চুমুকটা দিয়ে সে গ্লাসটা নামিয়ে রাখল। আমানকে কোনোমতে জড়িয়ে ধরে সে বিদায় নিল।
বটগাছের ছায়া পেরিয়ে যখন সে বাসস্ট্যান্ডের দিকে ধীরপায়ে এগোতে লাগল, তখন দুপুরের চড়া রোদে পুরো ফরিদপুরের আকাশটা তার কাছে কেমন যেন ঝাপসা লাগছিল।
ফরিদপুর বাসস্ট্যান্ডের ধুলাবালি আর মানুষের হট্টগোলের মাঝে একা দাঁড়িয়ে ছিল অর্কো।
ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হওয়া একটি দূরপাল্লার বাসের দরজার দিকে সে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। কাঁধের ট্রাভেল ব্যাগটার চেয়েও তার বুকের ভেতরের অপরাধবোধের পাথরটা তখন শতগুণ বেশি ভারী লাগছিল। বুক চিরে বেরিয়ে আসা প্রতিটি নিঃশ্বাসে যেন জ্বলছিল এক নীরব অনুশোচনা।
ঠিক তখনই পেছন থেকে কারও একটি ভারী, কিছুটা কাঁপতে থাকা হাত এসে পড়ল অর্কোর ডান কাঁধের ওপর। অর্কো চমকে উঠে ধীরপায়ে পেছন ফিরল।
আর পেছন ফিরতেই যেন পুরো বাসস্ট্যান্ডের সমস্ত কোলাহল, গাড়ির তীব্র হর্ন আর মানুষের চিৎকার এক সেকেন্ডের মধ্যে নিথর হয়ে গেল। সামনে দাঁড়িয়ে আছেন জালাল আহমেদ।
তার বাবা। ছয় বছর আগের সেই শক্তপোক্ত, চওড়া কপালের মানুষটির চেহারায় এখন বয়সের স্পষ্ট ছাপ। মাথার চুলগুলো ধবধবে সাদা হয়ে গেছে, চোখের নিচে চামড়া ঝুলে পড়েছে, কিন্তু সেই চোখের গভীরের রাশভারী দৃষ্টিটা এখনো ঠিক আগের মতোই অপরিবর্তিত। হাতে বাজারের একটি প্লাস্টিকের থলে।
অর্কোর পুরো শরীর যেন পাথরের মতো জমে বরফ হয়ে গেল।
তার বুকের ভেতর থেকে এক তীব্র আর্তনাদ উঠে আসছিল। তার ইচ্ছে করছিল এই মুহূর্তেই রাস্তার ধুলায় বসে পড়ে বাবার পা দুটো জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে ওঠে, চিৎকার করে বলে—
“আমাকে মাফ করে দাও বাবা!”
কিন্তু তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। তার শরীর যেন সম্পূর্ণ অবশ হয়ে গেছে।
জালাল আহমেদ একদৃষ্টিতে ছেলের মুখের দিকে চেয়ে রইলেন। তাঁর চোখের পাতায় কোনো রাগের আগুন ছিল না, ছিল এক অচেনা, নিভৃত টানাপোড়েন।
তিনি অর্কোর কোনো প্রশ্নের সুযোগ দিলেন না। কোনো কুশল বিনিময় করলেন না। কেবল খুব শান্ত অথচ অটল এক দৃঢ়তায় বললেন—
“বাসায় চলো।”
কথাটা বলেই তিনি এক মুহূর্তও আর দাঁড়ালেন না। বাজারের ব্যাগটা হাতে নিয়ে তিনি ঘুরে দাঁড়িয়ে মেঠোপথের দিকে হাঁটা শুরু করলেন এবং রাস্তার মোড় থেকে একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে হাত নেড়ে ডাক দিলেন।
অর্কো মন্ত্রমুগ্ধের মতো বাবার পিছু পিছু গিয়ে অটোরিকশায় উঠল।
পুরো পথটাতে দুজনের মাঝে আর একটি শব্দও উচ্চারিত হলো না।
অটোরিকশার পেছনের সিটে পাশাপাশি বসে ছিল বাবা আর ছেলে। বাতাস এসে অর্কোর চুল উড়িয়ে দিচ্ছিল, আর পাশে বসে থাকা বাবার ধবধবে সাদা পাঞ্জাবির কোণা এসে ছুঁয়ে যাচ্ছিল অর্কোর হাত। অটোরিকশা যখন আবার সেই দোতলা বাড়ির লোহার গেটের সামনে এসে থামল, তখন দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা সামিহা আর তার মা একযোগে চোখ বড় বড় করে তাকাল।
জালাল আহমেদ জুতো খুলে ঘরের ভেতরে ঢুকলেন। বাজারের থলেটা ডাইনিং টেবিলের ওপর নামিয়ে রেখে তিনি এক পলকও অর্কোর দিকে তাকালেন না।
তিনি সোজা নিজের স্ত্রীর দিকে ফিরে অত্যন্ত গম্ভীর ও স্পষ্ট গলায় বললেন,
“সামিহার মা, ওরে খাইতে দাও। আমার বাসা থেইকা কেউ খালি পেটে যায় না, যাইবও না।”
কথাটা শেষ করেই তিনি ধীরপায়ে নিজের শোবার ঘরের দিকে চলে গেলেন এবং ভেতরের কাঠের দরজাটা টেনে দিলেন।
ড্রয়িংরুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল অর্কো।
বাবার সেই কঠোর কণ্ঠের ভেতরের যে অসীম মমতা আর অধিকারবোধ লুকিয়ে ছিল, তা অর্কোর বুকের প্রতিটি শিরায় গিয়ে যেন এক তীব্র কাঁপন ধরিয়ে দিল।
ডাইনিং টেবিলের ওপর তখন খাবার সাজানোর তোড়জোড় শুরু হয়ে গিয়েছিল।
হাত-মুখ ধুয়ে অর্কো যখন কাঠের চেয়ারটায় বসল, তখন তার সামনে একের পর এক ধোঁয়া ওঠা বাটি এসে জড়ো হতে লাগল। আয়োজনের কোনো কমতি ছিল না। বাসমতী চালের গরম ভাত, কাঁচা মরিচ আর পেঁয়াজে ভাজা পদ্মার টাটকা ইলিশ মাছের পেটি, কড়া মসলায় কষানো লালচে গরুর মাংসের ভুনা, সাথে ঘন মুগ ডাল, আলুভর্তা আর শসা-লেবুর সালাদ।
সামিহার মা অর্কোর পাতে গরম ভাত বেড়ে দিয়ে এক টুকরো বড় ইলিশ মাছ তুলে দিলেন।
“নাও বাবা, পেট ভরে খাও,”
তিনি অত্যন্ত মমতাময়ী গলায় বললেন।
“গ্রামের নদীর আসল ইলিশ। তোমার বাবা বাজার থেকে নিয়ে এসেই বললেন আজ যেন ভালো করে সবকিছু রাঁধি।”
অর্কো ভাতের প্রথম লোকমাটা মুখে তুলল। কত বছর পর সেই বাবার আনা বাজারের ইলিশের চেনা স্বাদ তার জিহ্বায় ফিরে এলো! গলার ভেতরটা কেমন যেন ভারী হয়ে উঠল।
সামিহা টেবিলের উল্টো পাশের চেয়ারে বসে দুই হাতে চিবুক ঠেকিয়ে খুব আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে ছিল।
“ভাইয়া, ঢাকার লাইফ কেমন?” সামিহা চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞেস করল।
“সবসময় তো এত জ্যাম আর ব্যস্ততা শুনি। আপনি থাকেন কোথায়? আপনার লেখালেখির সময় পান কীভাবে?”
অর্কো হেসে এক লোকমা ভাত খেয়ে বলল,
“উত্তরার দিকে থাকি। শান্ত পরিবেশ, বারান্দা দিয়ে সুন্দর বাতাস আসে। আর লেখার জন্য রাতটাই আমার সেরা সময়।”
সামিহা একরাশ উত্তেজনা নিয়ে বলল,
“ আর ওই যে নিশি কবিরের সাথে সিনেমাটা করছেন? ফেসবুকে তো পোস্টার দেখে পুরা কাঁপাকাঁপি অবস্থা! কাল্ট অব সাইলেন্স ! ভাইয়া, সত্যি ওই ব্রিটিশ আমলের কাল্ট নিয়ে গল্পটা? সিনেমার নায়ক কে? আরিয়ান না?”
অর্কো সামিহার এমন উচ্ছ্বাস দেখে না হেসে পারল না।
“হ্যাঁ, আরিয়ানই মেইন লিড। তবে শুধু ভয় বা অ্যাকশন না, মানুষের মনের টানাপোড়েন নিয়েই গল্পটা। তোমার পছন্দ হবে।”
সামিহার মা ডালের বাটিটা এগিয়ে দিতে দিতে খুব নরম গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
“তা বাবা... তোমার বউয়ের কথা তো কিছু বললে না। বউমা কেমন আছে?”
বউয়ের কথা শুনতেই অর্কোর মুখে এক অনাবিল, পরম তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল।
“অসম্ভব ভালো একটা মেয়ে। মাস্টার্স শেষ করেছে। আমার জীবনের যত ঝড় গেছে, ও সবসময় আমার পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল।”
অর্কো পকেট থেকে ফোনটা বের করে অর্পিতার একটা সুন্দর ছবি বের করে সামিহার মার সামনে ধরল। ছবিতে অর্পিতা হালকা নীল তাঁতের শাড়ি পরে বারান্দার হাসনাহেনা গাছের পাশে দাঁড়িয়ে মিষ্টি করে হাসছে। সামিহার মা চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে এক অপার্থিব স্নেহে চোখ দুটো উজ্জ্বল করে ফেললেন।
“মাশাআল্লাহ! কী যে মায়াবী আর শান্ত একটা চেহারা! দেখলেই মনটা জুড়িয়ে যায় বাবা। তোমার মতো গুণী ছেলের জন্য এমন একটা লক্ষ্মী মেয়েই দরকার ছিল।”
তিনি অর্কোর পাতে আরও এক টুকরো গরুর মাংস তুলে দিয়ে খুব আন্তরিক গলায় বললেন,
“পরের বার কিন্তু ভুলেও একা আসবে না বাবা। এবার তো হুট করে আসায় নিয়ে আসোনি, পরের বার একদম বউমাকে সাথে নিয়ে আসবে। আমার হাতের পোলাও আর হাঁসের মাংস খাইয়ে ওকে আদর করবো।”
“হ্যাঁ ভাইয়া! ভাবিকে নিয়ে আসতেই হবে!” সামিহাও আবদার করে উঠল।
খাওয়া শেষ করে বেসিনে হাত ধুয়ে নিল অর্কো।
তোয়ালে দিয়ে হাত মুছতে মুছতে সে করিডোরের শেষ মাথায় বাবার ঘরের দিকে তাকাল। ভেতর থেকে কোনো আওয়াজ আসছিল না। অর্কো এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে পা বাড়াল সেই দরজার দিকে। কাঠের দরজার ওপর আলতো করে দুটি টোকা দিল সে। ভেতর থেকে কোনো সাড়া এলো না, তবে দরজার পাল্লাটা সামান্য খোলাই ছিল। অর্কো খুব সন্তর্পণে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল।
ঘরটা বেশ বড় আর ছিমছাম। এক কোণে একটি কাঠের আলমারি, জায়নামাজ আর সাইড টেবিলে সুশৃঙ্খলভাবে সাজিয়ে রাখা প্রেশার আর ডায়াবেটিসের ওষুধের কয়েকটি স্ট্রিপ। জানালার ওপাশে দুপুরের শান্ত রোদ এসে পড়েছে মেঝের ওপর। বিছানার একপাশে হেলান দিয়ে বসে ছিলেন জালাল সাহেব হাতে ধরা একটি ধর্মীয় বই।
অর্কো ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে বিছানার পাশে মেঝের ওপর হাঁটু গেড়ে বসল। তারপর কোনো দ্বিধা না করে পরম ভক্তিতে বাবার দুটি শক্ত, রুক্ষ পা নিজের দুই হাতের মুঠোয় তুলে নিল।
অর্কোর গলার স্বর কান্নায় রুদ্ধ হয়ে এলো।
“বাবা...আমাকে মাফ করে দাও বাবা। আমি তখন বুঝিনি... এতগুলো বছর নিজের অভিমানের জেদে দূরে ছিলাম, তোমার কোনো খোঁজ নিইনি... আমি অনেক বড় অপরাধ করেছি বাবা। আমাকে মাফ করে দাও।”
জালাল সাহেব হাতের বইটা ধীরে ধীরে বন্ধ করে কোলে রাখলেন। তিনি পা দুটো টেনে সরিয়ে নিলেন না। কিন্তু তাঁর মুখে কোনো কান্নার ভাব বা আবেগের আতিশয্য দেখা গেল না। তিনি একদৃষ্টিতে জানালার ওপাশের দূরের আকাশটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। কয়েক মুহূর্তের এক ভারী, দমবন্ধ করা নিস্তব্ধতা নেমে এলো ঘরের ভেতর।
তারপর জালাল সাহেব অত্যন্ত গম্ভীর, ভারী এবং কাটা কাটা গলায় বলতে শুরু করলেন—
“জীবনে যে পথ বেছে নিয়েছিস, সেই পথে হাঁটতে গিয়ে পেছনের দিকে তাকালে গতি থেমে যায়। তুই তোর নিজের জেদে জিতেছিস, ভালো কথা। আমি চেয়েছিলাম তুই আর দশটা সাধারণ ছেলের মতো নিরাপদ ছাদের নিচে থাকিস, অভাবের কষ্ট না দেখিস। কিন্তু তুই নিজের ইচ্ছায় আগুনের পথ বেছে নিয়েছিলি। আগুন ছুঁলে মানুষ হয় পুড়ে ছাই হয়, নয়তো খাঁটি সোনা হয়ে বের হয়ে আসে।”
অর্কো মাথা তুলে বাবার চোখের দিকে তাকাল,
“বাবা, তুমি কি আমাকে ক্ষমা করবে না?”
জালাল সাহেব কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি শুধু নিজের হাত থেকে চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রাখলেন। সেই নিস্তব্ধতার ওজন যেন যে কোনো শব্দের চেয়েও অনেক বেশি ভারী ছিল। অর্কো বুঝতে পারল ছয় বছরের ক্ষত এক মুহূর্তে কথার জাদুতে ধুয়ে ফেলা যায় না। কিন্তু বাবার এই নীরবতার ভেতরেই লুকিয়ে ছিল এক অদৃশ্য প্রলেপ।
অর্কো চোখ মুছে উঠে দাঁড়াল।
সে টেবিলের ওপর রাখা ট্রাভেল ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিয়ে দরজার দিকে পা বাড়াল। সে যখন দরজার চৌকাঠে পা দিতে যাবে, ঠিক তখনই পেছন থেকে কণ্ঠ ভেসে এলো—
“আজকে... থেকে যা।”
অর্কোর পায়ের পাতা যেন মেঝের সাথে আটকে গেল। তার চোখের কোণ দিয়ে আবার নোনা পানি নেমে এলো। সে ফিরে তাকিয়ে দেখল, বাবা এখনো জানালার দিকে মুখ করে বসে আছেন, কিন্তু তাঁর চিবুকটা আবেগের ভারে সামান্য কাঁপছে। অর্কো খুব শান্ত, নরম গলায় বলল,
“না বাবা... ঢাকায় অনেক কাজ জমে আছে। নতুন সিনেমার শুটিং শুরু হবে সামনের সপ্তাহে, অর্পারও এইচএসসি পরীক্ষা চলছে। আমাকে আজই ফিরতে হবে।”
অর্কো ঘর থেকে বের হয়ে এলো।
ড্রয়িংরুম পেরিয়ে যখন সে সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল, তখন পেছনে হালকা পায়ের শব্দ হলো।
নিচে নেমে মেইন গেটের সামনে এসে অর্কো দেখল শুধু সামিহা আর তার মা নয়, স্বয়ং জালাল সাহেব ও ধীরপায়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এসে গেটের সামনে দাঁড়িয়েছেন। অর্কো গেট পেরিয়ে মেঠোপথ ধরে সামনের বড় রাস্তার দিকে হাঁটতে শুরু করল। দুপুরের নরম বাতাস তার চুলে এসে লাগছিল। সে যখন বিশ-তিরিশ হাত দূরে চলে গেছে, ঠিক তখনই পেছন থেকে সেই পরিচিত, আওয়াজ ভেসে এলো—
“পরের বার বউমাকে নিয়ে আসবি।”
অর্কো চলার গতি থামিয়ে এক মুহূর্তের জন্য পেছনে ফিরে তাকাল।
লোহার গেটের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন তার বাবা হাত দুটো পেছনে বাঁধা।
অর্কো মৃদু হেসে মাথা নোয়াল।
রাত তখন ঠিক দশটা।
উত্তরার চারতলার ফ্ল্যাটের দরজায় এসে কলিংবেলের সুইচে চাপ দিল অর্কো। ভেতর থেকে অর্পিতা দ্রুতপায়ে এসে দরজা খুলে দিল। অর্কো ভেতরে ঢুকল, তার হাতে ফরিদপুরের বাসস্ট্যান্ডের মোড় থেকে কেনা খাঁটি ছানার মিষ্টি আর চমচমের বড় একটা শক্ত প্যাকেট।
ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই দেখা গেল টেলিভিশনের পর্দায় একটা হালকা কমেডি নাটক চলছে, আর সোফায় পা তুলে বসে একগাল তৃপ্তির হাসি নিয়ে টিভি দেখছে অর্পা। আজ সকালেই তার শেষ এইচএসসি পরীক্ষাটি শেষ হয়েছে। এতগুলো মাসের একটানা পড়ার টেবিলের কঠিন শৃঙ্খল আর রাত জাগার ক্লান্তি শেষে তার চেহারায় এখন স্বস্তির উজ্জ্বল হাসি।
দরজার আওয়াজ পেয়ে অর্পা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল।
“দুলাভাই! এসে পড়েছ?”
অর্কো কোনোমতে একটা মৃদু হাসি দিল।
“এই নাও অর্পা, তোমার পরীক্ষা শেষের মিষ্টি,” অর্কো প্যাকেটটা টি-টেবিলের ওপর রাখল।
“ফরিদপুরের স্পেশাল চমচম!”
অর্পা এক লাফে সোফা থেকে নেমে মিষ্টির বক্সটা খুলতে খুলতে বলল,
“থ্যাংক ইউ দুলাভাই!”
অর্কো ড্রয়িংরুমের সোফায় গিয়ে বসল।
তার শরীরটা ঢাকায় ফিরে এসেছে ঠিকই, কিন্তু মনটা তখনো পড়ে আছে ফরিদপুরের সেই মেঠোপথ আর দোতলা বাড়ির বারান্দায়। তার চোখ দুটোতে তখনো এক তীব্র ঘোরের আচ্ছন্নতা। পুরো ঘটনাটা যেন তার মস্তিষ্কে কোনো অবাস্তব সিনেমার মতো বাজছিল।
রান্নাঘর থেকে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি হাতে নিয়ে দ্রুতপায়ে ড্রয়িংরুমে এলো অর্পিতা।
সে দ্রুত এগিয়ে এসে সোফায় অর্কোর ঠিক পাশে বসল এবং পানির গ্লাসটা অর্কোর হাতের তালুতে গুঁজে দিল।
অর্পিতা খুব শঙ্কিত গলায় জিজ্ঞেস করল,
“পানিটা খাও আগে। কী হয়েছে বলো তো? বাবা কি কিছু বলেছেন? কোনো খারাপ ব্যবহার করেছেন তোমার সাথে?”
অর্কো এক ঢোক পানি খেয়ে গ্লাসটা টেবিলে নামিয়ে রাখল। সে অর্পিতার চোখের দিকে তাকাল।
“খারাপ ব্যবহার করেননি অর্পিতা,”
অর্কো খুব ধীর, কিন্তু ভারী গলায় বলতে শুরু করল।
“কিন্তু যা দেখে এসেছি, তা আমি এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না।”
অর্পিতা চশমার ওপর দিয়ে চোখ বড় বড় করে তাকাল,
“কী দেখেছ?”
অর্কো একে একে পুরো ঘটনাটা বলতে লাগল—
সেই পুরোনো ভাঙা ঘরের জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা নতুন দোতলা বাড়ি, নিচতলার ভাড়াটিয়া, দরজা খুলে দেওয়া সেই তেইশ বছরের মেয়ে সামিহা, আর পঞ্চাশোর্ধ্ব মহিলা...
“বাবা চার বছর আগে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন, অর্পিতা।”
অর্পিতার মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। সে স্তব্ধ হয়ে হা করে তাকিয়ে রইল।
অর্কো বলতে থাকল,
“মা মারা যাওয়ার পর আর আমি চলে আসার পর বাবা কঠিন টাইফয়েডে একা ঘরে ধুঁকেছিলেন। পাড়ার মুরুব্বিরা মিলে ওনাদের বিয়ে দেন। আর ওই ভদ্রমহিলার ছেলে রিয়াদ সে ইতালিতে থাকে। সে বিদেশ থেকে টাকা পাঠিয়ে বাবার শেষ বয়সের আরামের জন্য এই দোতলা বাড়িটা তুলে দিয়েছে।”
অর্পিতা নিজের কপালে হাত দিয়ে সোফায় হেলান দিল।
“মাই গড অর্কো! এগুলো তো পুরো সিনেমার মতো শোনাচ্ছে! বাবা তাহলে এত বছর ধরে সম্পূর্ণ নতুন একটা পরিবার নিয়ে আছেন?”
“হ্যাঁ,”
অর্কো একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলল।
“আমি তো পুরো শকড হয়ে গিয়েছিলাম। তারপর আমি চলে আসার জন্য যখন বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে ছিলাম, বাবা নিজে গিয়ে আমার কাঁধে হাত রাখলেন। আমাকে একপ্রকার টেনে আবার বাসায় নিয়ে আসলেন। আমাকে না খাইয়ে ছাড়লেন না।”
অর্কো অর্পিতার হাতটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরল। তার চোখের কোণায় তখন এক ফোঁটা জল চিকচিক করছে।
“আর আমি যখন বাড়ি ছেড়ে চলে আসছিলাম অর্পিতা... বাবা নিজে মেইন গেট পর্যন্ত নেমে এসেছিলেন। তারপর একদম গম্ভীর গলায় আমাকে বললেন পরের বার বউমাকে নিয়ে আসবি।”
অর্পিতা কিছু বলল না। তার কথা গুলো মানতে অনেক কষ্ট হচ্ছিল। সে অর্কর হাতট আরো শক্ত করে ধরে বসে রইল।
পরের বুধবার সকাল থেকেই পুরান ঢাকার এক প্রাচীন জমিদারবাড়িতে শুরু হলো সিনেমার মূল শুটিং। ভেজা স্যাঁতসেঁতে দেওয়াল, বিশাল খিলানওয়ালা ছাদ আর ধুলোমাখা প্রাচীন কাঠের সিঁড়ি—
কাল্ট অব সাইলেন্স এর গল্পের জন্য লোকেশনটা ছিল একদম নিখুঁত। পুরো বাড়িটা জুড়ে তখন এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। বিশাল বিশাল মুভি স্পটলাইট, মেঝেতে ছড়ানো মোটা তারের জটলা, স্মোক মেশিনের ধোঁয়া আর প্রোডাকশন ক্রুদের অবিরাম ছোটাছুটি। সেটের মনিটরের সামনে পাশাপাশি পাতা ছিল দুটি কাঠের ফোল্ডিং চেয়ার। একটিতে হেডফোন গলায় ঝুলিয়ে বসে ছিলেন নিশি কবির আর ঠিক তাঁর পাশেই বসে ছিল অর্কো।
“সাইলেন্স অন সেট! ক্যামেরা... রোলিং... অ্যান্ড... অ্যাকশন!”
নিশির তীক্ষ্ণ আওয়াজে পুরো বাড়িটা এক লহমায় পিনপতন নিস্তব্ধতায় ডুবে গেল।
ক্যামেরার ফ্রেমের ভেতরে তখন প্রধান অভিনেতা আরিয়ান একটি প্রাচীন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে হ্যালুসিনেশনের শিকার এক যুবকের ভয়ার্ত অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করছিল।
টানা তিনটি টেক নেওয়ার পর নিশি “কাট” বললেন। তিনি কিছুটা অতৃপ্তি নিয়ে ক্যাপটা খুলে চুল ঠিক করলেন। প্রচণ্ড গরমে তাঁর কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছিল, তবুও কাজে এক ফোঁটা ছাড় দিতে তিনি নারাজ। নিশি অর্কোর দিকে ফিরে বললেন,
“অর্কো, সিনের ভিউটা ভালো আসছে, বাট আরিয়ানের চোখের ভেতর ওই আনকন্ট্রোলড ভয়টা মিসিং লাগছে। কী করা যায় বলুন তো?”
অর্কো মনিটরের দিকে একটু ঝুঁকে দেখল। তারপর খুব শান্ত গলায় বলল,
“আরিয়ান আসলে ভয়টাকে বাইরে প্রকাশ করতে গিয়ে বেশি জোরে চিৎকার করছে। কিন্তু কাল্টের ভয়টা তো ভেতরের। ও যদি ডায়লগটা ফিসফিস করে বলে আর চোখের পলক না ফেলে একদম স্থির থাকে তাহলে ভয়টা অনেক বেশি ডার্ক লাগবে।”
নিশি এক মুহূর্ত ভাবলেন। তারপর চোখ চকচক করে ডেকে উঠলেন,
“আরিয়ান! লিসেন টু অর্কো!”
অর্কোর কথা শুনে আরিয়ান নতুন করে শটটা দিল। এবার ঘরের আলো-আঁধারির মাঝে আরিয়ানের সেই নিথর চোখের চাহনি আর কাঁপাকাঁপা ফিসফিসানি মনিটরের স্ক্রিনে ফুটে উঠতেই নিশির মুখে এক চওড়া হাসি ছড়িয়ে পড়ল।
“পারফেক্ট! দিস ইজ হোয়াট আই ওয়ান্টেড!”
নিশি হাততালি দিয়ে উঠলেন।
দুপুরের ব্রেক দিতেই অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টররা সেট গোছাতে লাগল। নিশি তাঁর চেয়ারটা একটু টেনে অর্কোর খুব কাছাকাছি এলেন। তিনি নিজের বোতল থেকে ঠান্ডা পানি খেয়ে এক গ্লাস পানি অর্কোর দিকে বাড়িয়ে দিলেন।
“ইউ আর আ জিনিয়াস, অর্কো,”
নিশি টি-শার্টের হাতা দিয়ে কপাল মুছতে মুছতে হাসলেন।
“আপনার ওই একটা ছোট্ট চেঞ্জে পুরো সিনটার ডেপথ একদম অন্য লেভেলে চলে গেল!”
অর্কো পানির গ্লাসটা হাতে নিয়ে বলল,
“থ্যাংক ইউ নিশি। আপনি যেভাবে ভিজ্যুয়ালাইজ করছেন, সেটা সত্যিই অসাধারণ।”
নিশি কফির ফ্লাস্ক থেকে দুই কাপ ব্ল্যাক কফি ঢাললেন। একটা কাপ অর্কোর হাতে দিয়ে তিনি মনিটরের টেবিলে একটু হেলান দিয়ে বসলেন। তাঁর মুখটা অর্কোর খুব কাছে।
“ইউ নো অর্কো,”
নিশি খুব নিচু, মায়াবী গলায় বললেন,
“শুটিংয়ের সেটে এত হাজারটা প্রেশার আর টেনশনের মাঝেও আপনাকে পাশে দেখলে আই ফিল সো মাচ রিফ্রেশড। এত সিরিয়াস হয়ে থাকেন কেন বলুন তো? একটু হাসলে কি আপনার এই হ্যান্ডসামনেস কমে যাবে?”
অর্কো একটু অপ্রস্তুত হয়ে হাসল। সে কফির কাপে চোখ রেখে খুব সংযত গলায় বলল,
“কাজের মাঝে তো কাজের কথাই মাথায় ঘোরে নিশি।”
“দ্যাটস হোয়াট আই লাইক অ্যাবাউট ইউ,”
নিশি একটু চোখ টিপে হাসলেন।
“এত সিনসিয়ার মানুষ আজকের যুগে পাওয়া আসলেই টাফ।”
টানা ছয়টি মাসের হাড়ভাঙা খাটুনি আর নির্ঘুম রাতের পর অবশেষে শেষ হলো কাল্ট অব সাইলেন্স এর পুরো মহাযজ্ঞ। পুরান ঢাকার স্যাঁতসেঁতে অলিগলি থেকে শুরু করে শ্রীমঙ্গলের গভীর বনানী আর আধুনিক ঢাকার কাঁচঘেরা সাইকিয়াট্রিস্টের চেম্বার প্রতিটি দৃশ্যের শুটিং, নিখুঁত এডিটিং, ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর আর কালার গ্রেডিংয়ের প্রতিটি ফ্রেমে যেন প্রাণ ঢেলে দেওয়া হয়েছিল।
এরই মাঝে প্রকাশিত হয়েছিল অর্পার বহুল প্রতীক্ষিত এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল। প্রত্যাশা মতোই বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ ৫.০০ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে সে। উত্তরার বাসায় তখন বাঁধভাঙা আনন্দের হাওয়া। মিষ্টিমুখ আর উৎসব শেষে অর্পা এবার কোনো সময় নষ্ট না করে ফার্মগেটের নামকরা মেডিকেল অ্যাডমিশন কোচিংয়ে ভর্তি হয়ে গেছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সে এখন মগ্ন দেশের শীর্ষ সরকারি মেডিকেল কলেজে চান্স পাওয়ার চূড়ান্ত প্রস্তুতিতে।
এদিকে সিনেমার পুরো পোস্ট-প্রোডাকশনের কাজ শেষে রেডি হলো চূড়ান্ত মাস্টার প্রিন্ট।
গুলশানের এক প্রাইভেট সাউন্ড স্টুডিওর প্রিভিউ থিয়েটারে আয়োজন করা হলো এক অতি গোপনীয় ও এক্সক্লুসিভ স্ক্রিনিং। বাইরে কাউকেই জানতে দেওয়া হয়নি। বিশাল ডলবি অ্যাটমস সাউন্ড সিস্টেম আর ফোর কে লেজার প্রজেক্টরের সেই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অন্ধকার হলরুমে তখন উপস্থিত ছিলেন মাত্র তিনজন মানুষ পরিচালক নিশি কবির, কাহিনী ও চিত্রনাট্যকার অর্কো আহমেদ এবং সিনেমার মূল প্রযোজক ইফতেখার সাহেব। হলরুমের সমস্ত আলো নিভে গেল।
পর্দার ওপর ভেসে উঠল ব্ল্যাক ফ্রেম পিকচার্স এর লোগো। তারপর এক ভুতুড়ে, নিস্তব্ধ অ্যাম্বিয়েন্ট ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের সাথে শুরু হলো সিনেমার প্রথম দৃশ্য।পরবর্তী দুই ঘণ্টা পনেরো মিনিট যেন হলের ভেতর কারও কোনো শ্বাস নেওয়ার শব্দও পাওয়া গেল না।
পর্দার দৃশ্যগুলো এত বেশি সাইকোলজিক্যাল, এত বেশি টানটান আর অন্ধকার বাস্তবতায় ভরা ছিল যে খোদ অর্কো নিজেও যেন নিজের লেখা গল্প দেখে শিউরে উঠছিল। ব্রিটিশ আমলের সেই গোপন অকাল্ট রিচুয়ালের দৃশ্যপটগুলো যখন আধুনিক ঢাকার অপরাধ আর মনের হ্যালুসিনেশনের সাথে এসে মিশেছে, তখন অভিনেতাদের চোখের চাহনি আর ডায়লগ ডেলিভারি পুরো শরীরের লোম খাড়া করে দিচ্ছিল। ক্লাইম্যাক্সের সেই অভাবনীয় মোড়টায় এসে মনে হচ্ছিল পর্দা ফেটে বুঝি রক্ত আর হাহাকার বেরিয়ে আসবে।
অবশেষে এক গভীর, নিথর অন্ধকারের ভেতর দিয়ে সিনেমার পর্দা কালো হয়ে এলো।
সাউন্ডবক্সের অন্তিম সুরটা মিলিয়ে গিয়ে প্রজেক্টরের আলোয় ভেসে উঠল শেষ লেখাটি—
“গল্প ও চিত্রনাট্য: অর্কো আহমেদ”
“পরিচালনা: নিশি কবির”
হলরুমের নরম হলুদ বাতিগুলো ধীরে ধীরে জ্বলে উঠল।
পুরো থিয়েটারে তখন এক স্তব্ধ, ভারী নিস্তব্ধতা।
প্রিভিউ থিয়েটারের সিলিংয়ের নরম হলুদ আলোগুলো তখন পুরোপুরি জ্বলে উঠেছে।
প্রযোজক ইফতেখার সাহেব এগিয়ে এসে অর্কোর হাতটা শক্ত করে ধরে ঝাঁকিয়ে দিলেন। তাঁর চোখে তখনো ঘোরের রেশ।
ইফতেখার সাহেব উচ্ছ্বসিত গলায় বললেন,
“আপনার মতো এত পাওয়ারফুল আর ডেপথওয়ালা চিত্রনাট্যকার এই ইন্ডাস্ট্রিতে এর আগে আসেনি। ক্যারেক্টারগুলোর যে সাইকোলজিক্যাল লেয়ার্স আপনি বানিয়েছেন, তা লিটারেলি হলিউড স্ট্যান্ডার্ড! উই আর ডেফিনেটলি মেকিং হিস্ট্রি!”
নিশি কবিরও সোফার কাছে দাঁড়িয়ে মৃদু হেসে হাততালি দিলেন।
“আই টোল্ড ইউ ইফতেখার, অর্কোর ব্রেন নিয়ে কোনো ডাউট রাখার সুযোগ নেই। হি ইজ অ্যাবসলুটলি ব্রিলিয়ান্ট!”
ঠিক তখনই ইফতেখার সাহেবের পকেটের ফোনটা তীব্র শব্দে বেজে উঠল।
স্ক্রিনে চোখ বুলিয়ে তিনি বললেন,
“সেন্সর বোর্ডের একজন মেম্বার কল দিয়েছেন। তোমরা একটু বসো, আমি বাইরে থেকে আর্জেন্ট কলটা ব্যাক করে আসছি।”
ইফতেখার সাহেব ভারী সাউন্ডপ্রুফ দরজাটা ঠেলে করিডোরে বেরিয়ে গেলেন। দরজাটা নিজ থেকেই আবার নিঃশব্দে আটকে গেল। বিশাল, আরামদায়ক সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন থিয়েটার রুমের ভেতরে তখন কেবল দুজন মানুষ নিশি কবির আর অর্কো।
ঘরের ভেতরের এসির মৃদু শোঁ শোঁ আওয়াজ ছাড়া আর কোনো শব্দ ছিল না। নিশি এক কোণের টেবিল থেকে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি ঢেলে হাতে নিলেন। তারপর ধীরপায়ে হেঁটে এসে তিনি নিজের সিটে না বসে সোজা অর্কোর রিক্লাইনার সিটের হাতলের ওপর একটু ঝুঁকে দাঁড়ালেন।
নিশির দৃষ্টি তখন অর্কোর চোখের ওপর স্থির।
“ইউ নো অর্কো,”
নিশি পানির গ্লাসটা অর্কোর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে খুব নিচু ফিসফিসানিতে বললেন,
“পুরো মুভিটা স্ক্রিনে দেখার সময় আই ওয়াজ জাস্ট লুকিং অ্যাট ইউ। একজন মানুষের মাথায় এত ডেপথ কীভাবে থাকতে পারে বলুন তো? ইউ আর জাস্ট সো ইররেজিস্টেবল! আপনার এই জিনিয়াস ডার্ক ব্রেন আর তার সাথে এই সফট, ইনোসেন্ট লুক... ইটস আ ডেডলি কম্বিনেশন!”
নিশি এক পা আরও এগিয়ে এলেন। তাঁর শরীরের পারফিউমের মিষ্টি ঘ্রাণ আর এত ঘনিষ্ঠ উপস্থিতি মুহূর্তের মধ্যে ঘরের বাতাসকে ভারী করে তুলল।
অর্কোর ভেতরে এক তীব্র অস্বস্তি কাজ করতে লাগল। কাজের বাইরে এমন ব্যক্তিগত সীমানা পেরিয়ে যাওয়া আচরণে সে কোনোভাবেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছিল না। অর্কো খুব সন্তর্পণে এক পা পিছিয়ে গেল এবং হাতের পানির গ্লাসটা পাশের সাইড টেবিলে নামিয়ে রাখল। সে পকেট থেকে ফোনটা বের করে স্ক্রিনে সময় দেখার ভান করল।
“থ্যাংক ইউ সো মাচ নিশি, আপনার প্রশংসার জন্য,বাট আমাকে এখন বের হতে হবে। অর্পিতা অনেকক্ষণ ধরে বাসায় অপেক্ষা করছে, ও কলও দিচ্ছে। দেরি হলে ও চিন্তা করবে। আজ আমি আসি।”
নিশি কবির এক মুহূর্ত থমকে গেলেন। অর্কোর এই অনড়, শান্ত অথচ স্পষ্ট দেয়ালটা দেখে তিনি একটু অপ্রস্তুত হয়ে হাসার চেষ্টা করলেন।
“আরেহ, এত তাড়া কিসের অর্কো? সেলিব্রেশনের তো কেবল শুরু...”
অর্কো বিনীতভাবে নিজের কাঁধের ব্যাগটা তুলে নিল।
“আজকের মতো আসি নিশি। টেক কেয়ার।”
অর্কো আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না। সে দ্রুতপায়ে প্রিভিউ থিয়েটারের ভারী দরজাটা ঠেলে বাইরে করিডোরে বেরিয়ে এলো। করিডোর পেরিয়ে যখন সে স্টুডিওর মূল ফটক দিয়ে গুলশানের রাস্তায় নামল, তখন সন্ধ্যার ঠান্ডা বাতাস এসে তার মুখে লাগল।
অর্কো একটা লম্বা, স্বস্তির নিঃশ্বাস নিল।
রাত সাড়ে নয়টায় উত্তরার ফ্ল্যাটে ফিরল অর্কো।
ঘরে ঢুকেই সে সোজা ওয়াশরুমে গিয়ে মাথায় মুখে ঠান্ডা পানির ঝাপটা দিল। শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে যেন সে গুলশানের সেই বন্ধ থিয়েটার রুমের ভারী পারফিউমের ঘ্রাণ আর অস্বস্তিকর বাতাসের সমস্ত রেশ ধুয়ে ফেলতে চাইল। শরীরটা জুড়ালেও মনের ভেতরের অস্থিরতাটা কোনোভাবেই কাটছিল না। খাওয়াদাওয়া সেরে ঘরের সব লাইট অফ করে দেওয়া হলো।পড়া শেষ করে অর্পাও নিজের রুমে ঘুমিয়ে পড়েছে। শোবার ঘরে তখন জ্বলছিল সেই পরিচিত মৃদু নীল রঙের নাইট ল্যাম্প।
বিছানায় শুয়ে ছিল অর্পিতা। অর্কো এসে তার পাশে শুলো। তারপর কোনো কথা না বলে, এক তীব্র আকুলতায় অর্পিতাকে বুকের একদম গভীরে টেনে নিল। অর্কর এমন অস্বাভাবিক শক্ত বাঁধন আর ঘন নিঃশ্বাসের শব্দ পেয়ে অর্পিতা একটু অবাক হয়ে গেল।
“কিছু হয়েছে অর্কো? শরীর খারাপ লাগছে? কোনো সমস্যা?”
অর্কো খুব ফিসফিস করে বলল—
“না... কিছু হয়নি। তোমাকে অনেক ভালোবাসি আমি।”
সে কোনো বাড়তি প্রশ্ন করল না। সে নিজের হাত দুটো দিয়ে অর্কোর পিঠটা পরম আশ্রয়ে জড়িয়ে ধরে আরও কাছে টেনে নিল।
পরের কয়েকটা দিন অর্কোর কাটল পল্টনে বন্ধু প্রকাশন এর নতুন অফিসে। কাঁচঘেরা বড় কেবিনে বসে রফিক সাহেবের সাথে চা খেতে খেতে নতুন বইয়ের প্রকাশনা ও বিপণন নিয়ে নানা বিষয়ে আলোচনা চলছিল। এরই মাঝে অর্কোর মোবাইলটা প্রায়ই টেবিলের ওপর কেঁপে উঠছিল।
স্ক্রিনে একের পর এক মেসেজ আর কল ভাসছিল নিশি কবিরের। গুলশানের সেই প্রিভিউ রুমের অস্বস্তিকর ঘটনার পর থেকেই অর্কো নিশিকে কিছুটা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছিল। প্রফেশনাল মেসেজের খুব সংক্ষিপ্ত উত্তর দেওয়া ছাড়া সে কোনো বাড়তি আলাপে জড়ায়নি। সামনে ঈদুল ফিতর। আর এই ঈদেই দেশজুড়ে শীর্ষ প্রেক্ষাগৃহগুলোতে মুক্তি পেতে যাচ্ছে তাঁদের বহুল প্রতীক্ষিত সিনেমা কাল্ট অব সাইলেন্স।
নিশির একটি দীর্ঘ টেক্সট এলো “ঈদের দিন সন্ধ্যায় স্টার সিনেপ্লেক্সে আমাদের গ্র্যান্ড প্রিমিয়ার শো। অ্যাজ দ্য স্ক্রিনপ্লে রাইটার, ইউর প্রেজেন্স ইজ অ্যাবসলুটলি ম্যান্ডেটরি অর্কো! আপনাকে কিন্তু আসতেই হবে।”
অর্কো এক মুহূর্ত স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। সে কোনো ঝামেলা বা মন কষাকষি বাড়াতে চাইল না। সে খুব মেপে একটি ছোট রিপ্লাই পাঠাল—
“আচ্ছা, ঠিক আছে... আমি ভেবে দেখছি।”
ফোনটা টেবিলের ওপর উল্টো করে রেখে অর্কো রফিক সাহেবের দিকে ফিরল। রফিক সাহেব চশমাটা নাকের ওপর নামিয়ে খুব শান্ত দৃষ্টিতে অর্কোর মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তিনি চায়ের কাপে একটা চুমুক দিয়ে বললেন,
“কী খবর বাবা? তোমার সেই নতুন বইটার লেখার কাজ কতদূর?”
অর্কো একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে বলল—
“আঙ্কেল, সত্যি বলতে সরাসরি ইংরেজিতে উপন্যাস লেখাটা সম্ভবত আমার পক্ষে আর হয়ে উঠছে না। কনসেপ্টটা আমার মাথায় একদম পরিষ্কার, কিন্তু ইংরেজিতে লিখতে বসলেই মনে হচ্ছে আমার ভেতরের ফিলোসফিটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। শব্দগুলো বড্ড কাঠের মতো শক্ত লাগছে। কী করা যায় বলুন তো?”
রফিক সাহেব একটু হেসে হেলান দিয়ে বসলেন। তিনি খুব সহজ গলায় বললেন,
“এতে এত হতাশ হওয়ার কী আছে বাবা? তুমি পুরো উপন্যাসটা তোমার নিজের মাতৃভাষা বাংলায় লেখো যে ভাষায় তোমার কলম মুক্ত নদীর মতো ছোটে। তারপর কোনো আন্তর্জাতিক মানের পেশাদার লিটারেরি ট্রান্সলেটর দিয়ে ওটাকে নিখুঁত ইংরেজিতে অনুবাদ করিয়ে বিশ্ববাজারে ছেড়ে দেব!”
“এটা কি নিজের লেখার সাথে একধরনের চিটিং হয়ে যাবে না? আমি নিজে ইংরেজি ভাষায় লিখতে পারলাম না, অন্যের অনুবাদ দিয়ে প্রকাশ করলাম তাহলে আমার নিজস্ব সৃষ্টির স্বর আর ক্রেডিট কি অক্ষুণ্ণ থাকবে?”
রফিক সাহেব একগাল হেসে হাত তুলে অর্কোকে থামিয়ে দিলেন।
“আরেহ বাবা! এটাকে চিটিং বলো কীভাবে? বিশ্বসাহিত্যের পুরো ইতিহাসটাই তো দাঁড়িয়ে আছে অনুবাদের শক্ত কাঁধের ওপর! গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ যখন তাঁর অমর সৃষ্টি ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিটিউড লিখেছিলেন, সেটা ছিল স্প্যানিশে। গ্রেগরি রাবাসার কালজয়ী ইংরেজি অনুবাদের মধ্য দিয়েই তা বিশ্ব জয় করেছে। জাপানের হারুকি মুরাকামি, রাশিয়ার দস্তয়েভস্কি আর তলস্তয় এঁরা কেউই কিন্তু মূল বই ইংরেজিতে লেখেননি। সবাই নিজের মাতৃভাষার আত্মা ঢেলে লিখে গেছেন, আর দক্ষ অনুবাদকরা সেই আত্মাকে ছড়িয়ে দিয়েছেন পুরো পৃথিবীর পাঠকের দরবারে।”
“থ্যাংক ইউ আঙ্কেল। আমি চেষ্টা করব আজ রাত থেকেই আমি বাংলায় খসড়া শুরু করার।”
মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার দিন দুপুরে যখন পরীক্ষাকেন্দ্র থেকে অর্পাকে নিয়ে বাসায় ফিরল অর্কো আর অর্পিতা, তখন পুরো গাড়ির ভেতর এক থমথমে নীরবতা। ঘরে ঢুকেই অর্পা সোজা নিজের শোবার ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। পরীক্ষার হলের তীব্র চাপ আর শেষ মুহূর্তের বিভ্রান্তিতে গোটা চারেক সহজ প্রশ্ন ভুল দাগিয়ে এসেছে সে। নেগেটিভ মার্কিংয়ের ভয় আর মনের মতো পরীক্ষা না হওয়ার হতাশায় সে বিছানায় মুখ গুঁজে অঝোরে কাঁদতে লাগল।
অর্পিতা দরজায় ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকল। পেছনে অর্কো। অর্পিতা গিয়ে বিছানায় অর্পার পাশে বসল।
“পরীক্ষা যেমন হওয়ার হয়ে গেছে। তুই তোর সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করেছিস, এটাই সবচেয়ে বড় কথা।”
অর্কো খুব শান্ত গলায় বলল,
“শোনো অর্পা, একটা পরীক্ষা দিয়ে জীবনের সবকিছু শেষ হয়ে যায় না। তুমি যতটুকু পরিশ্রম করেছ, তার প্রতি আমাদের বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। রেজাল্ট যা-ই আসুক, আমরা সবসময় তোমার পাশে আছি। নিজেকে কষ্ট দিয়ো না।”
পরের দুটো দিন উত্তরার বাসায় কাটল এক দমবন্ধ করা উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে।
অবশেষে পরীক্ষার দুই দিন পর সন্ধ্যার দিকে ওয়েবসাইটে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশিত হলো। ডাইনিং টেবিলে ল্যাপটপের সামনে বসেছিল অর্কো আর অর্পিতা। অর্পা পাশে দাঁড়িয়ে কাঁপতে কাঁপতে নিজের হাতের আঙুলগুলো মোচড়াচ্ছিল।
অর্কো রেজাল্ট পোর্টালে অর্পার রোল নম্বর আর রেজিস্ট্রেশন টাইপ করে এন্টার চাপল।
মুহূর্তের মধ্যে স্ক্রিন লোড হয়ে ভেসে উঠল মেরিট লিস্ট আর বরাদ্দকৃত মেডিকেল কলেজের নাম—
নির্বাচিত: এম. আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ, দিনাজপুর (সরকারি)।
স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্তের জন্য যেন পুরো ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
অর্পার চোখ দিয়ে আবার পানি ঝরে পড়ল। তবে এবার আর শুধুই হতাশার নয়, তার সাথে মিশে ছিল এক বিরাট স্বস্তির কান্না।
“আমি ঢাকায় থাকতে পারলাম না আপু...আমাকে এত দূরে চলে যেতে হবে যদি আরও ভালো করে পড়াশোনা করতাম তাহলে আরও ভালো কিছু হতো।
“আরে পাগলী! সরকারি মেডিকেলে চান্স পাওয়া যে কত বড় ভাগ্যের ব্যাপার, তুই জানিস? লাখ লাখ ছেলেমেয়ে এই চান্সের জন্য রাস্তায় কান্নাকাটি করে! আমাদের বাবার স্বপ্ন তুই সত্যি করলি এটা তো ভাব!”
অর্কো বলল,
“দিনাজপুর কি পৃথিবীর বাইরে অর্পা? আমরা তোমাকে নিয়ে যাব, ওখানে সুন্দর হোস্টেলে রেখে আসব।তুমি এখন একজন ভবিষ্যৎ ডাক্তার। নিজের যোগ্যতায় তুমি এটা অর্জন করেছ, তোমার মাথা নিচু করার কোনো কারণ নেই।”
মিষ্টির প্যাকেট খুলে অর্পিতা নিজের হাতে অর্পার মুখে মিষ্টি তুলে দিল।
এদিকে দেখতে দেখতে ঘনিয়ে এলো পবিত্র ঈদুল ফিতর।
চাঁদরাতে সকাল থেকেই মেতে উঠল উৎসবের আমেজ। সারাটা দিন অর্কো, অর্পিতা আর অর্পা মিলে ঢাকার বড় বড় শপিং মলগুলোতে চষে বেড়াল। সারাদিনের ঘোরাঘুরি আর আনন্দ শেষে রাত আটটার দিকে যখন একগাদা শপিং ব্যাগ হাতে তারা উত্তরার ফ্ল্যাটে ঢুকল, তখন তিনজনই ক্লান্ত ।
ড্রয়িংরুমের সোফায় ব্যাগগুলো নামিয়ে রেখে অর্পিতা রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াতে যাবে, ঠিক তখনই অর্কোর পকেটের ফোনটা তীব্র শব্দে বেজে উঠল।
স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে—
“নিশি কবির”
অর্কো কলটা রিসিভ করে কানে ধরল।
“হ্যালো, আসসালামু আলাইকুম নিশি।”
ওপাশ থেকে নিশি কবিরের অত্যন্ত ব্যস্ত ও কিছুটা উত্তেজিত কণ্ঠ ভেসে এলো—
“ওয়ালাইকুম আসসালাম অর্কো। আপনি এখন কোথায়?”
“এই তো মাত্র ফ্যামিলি নিয়ে ঈদের শপিং শেষ করে বাসায় ফিরলাম,”
অর্কো খুব স্বাভাবিক গলায় বলল।
“লুক অর্কো, আই নিড ইউ রাইট নাও অ্যাট মাই বনানী অফিস,কালকে আমাদের মুভি রিলিজ, আর লাস্ট মোমেন্টে সেন্সর বোর্ডের ফাইনাল সার্টিফিকেট আর কিছু ডিস্ট্রিবিউশন সংক্রান্ত ক্রিটিক্যাল ইস্যু নিয়ে ইমার্জেন্সি ডিসকাশন আছে। প্রডিউসার ইফতেখার সাহেবও আসছেন। ইউ হ্যাভ টু কাম টু মাই অফিস রাইট অ্যাওয়ে।”
অর্কো একটু ইতস্তত করে ঘড়ির দিকে তাকাল।
“বাট নিশি, এখন তো রাত সোয়া আটটা বাজে। চাঁদরাত... ফ্যামিলিকে তো একটু সময় দেওয়া দরকার।”
“আই নো অর্কো, আই এম রিয়েলি সরি ফর দিস,বাট এটা আমাদের পুরো সিনেমার জন্য ভীষণ ইম্পর্ট্যান্ট একটা ব্যাপার। মাত্র এক-দেড় ঘণ্টার ডিসকাশন, প্লিজ চলে আসুন। আই অ্যাম ওয়েটিং ফর ইউ।”
ক্লিক। নিশি আর কোনো কথা না বাড়িয়ে ফোনটা কেটে দিলেন।
অর্কো ফোনটা নামিয়ে একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। অর্পিতা ব্যাগ গোছানো থামিয়ে উদ্বেগের সাথে অর্কোর দিকে তাকাল।
“কী হয়েছে অর্কো? কোনো প্রবলেম?”
অর্পিতা জিজ্ঞেস করল।
“নিশি কল দিয়েছিল,”
অর্কো একটু বিরক্ত মুখে বলল।
“কাল মুভি রিলিজ তো, তাই লাস্ট মোমেন্টের কিছু সেন্সর আর ডিস্ট্রিবিউশনের পেপারওয়ার্কের জন্য আমাকে এখনই বনানী অফিসে যেতে বলছে।”
অর্পিতা একটু হাসল,
“এত বড় একটা সিনেমা কাল রিলিজ হচ্ছে, ওদের একটু টেনশন হওয়া তো স্বাভাবিক। তুমি গিয়ে কাজটা সেরে এসো। আমরা তো বাসাতেই আছি, তাড়াতাড়ি ফিরে এসো কিন্তু।”
কোনো উপায় না দেখে অর্কো নিজের ওয়ালেট আর গাড়ির চাবিটা হাতে নিল। বনানীর এগারো নম্বর রোডের সেই ডুপ্লেক্স স্টুডিওতে যখন অর্কো পৌঁছাল, তখন ঘড়ির কাঁটা রাত নয়টা ছুঁইছুঁই।
কাঁচের কেবিনের ভেতরে তখন এক গম্ভীর ও ধোঁয়াটে পরিবেশ। টেবিলের ওপর একগাদা সরকারি ফাইল, সিলমোহর মারা কাগজপত্র আর কফির কাপ ছড়ানো। সোফায় বসে ছিলেন প্রযোজক ইফতেখার সাহেব, আর টেবিলের উল্টো পাশে দাঁড়িয়ে অস্থিরভাবে পায়চারি করছিলেন নিশি কবির।
অর্কো ঘরে ঢুকতেই নিশি এক লম্বা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন,
“থ্যাংক গড অর্কো, ইউ আর হেয়ার! প্লিজ, বসুন।”
অর্কো সোফায় বসে একটু চিন্তিত গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কী হয়েছে নিশি? কোনো সিরিয়াস প্রবলেম?”
নিশি টেবিলের ওপর রাখা লাল ফোল্ডারটা অর্কোর সামনে এগিয়ে দিয়ে তীব্র ক্ষোভে বলতে শুরু করলেন—
“ইউ ওন্ট বিলিভ দিস অর্কো! সেন্সর বোর্ডের কিছু মেম্বার আর আমাদের ইন্ডাস্ট্রির একটা পুরানো করাপ্ট সিন্ডিকেট লাস্ট মোমেন্টে চেষ্টা করছিল আমাদের সিনেমার ক্লাইম্যাক্সের পুরো সাইকোলজিক্যাল পার্টটাই কেটে বাদ দিতে! ওনারা অবজেকশন তুলেছিলেন যে ব্রিটিশ আমলের কাল্ট রিচুয়ালের সিনগুলো নাকি অতিরিক্ত ডার্ক আর সোসাইটির জন্য ভায়োলেন্ট। অথচ ওই সিনগুলো কেটে ফেললে গল্পের তো কোনো লজিক বা সোল ই থাকে না!”
ইফতেখার সাহেব কফির কাপটা নামিয়ে হতাশ গলায় যোগ করলেন,
“শুধু সেন্সরই নয় অর্কো সাহেব, হল আর সিনেপ্লেক্সের শো বরাদ্দের ক্ষেত্রেও নোংরা পলিটিক্স হয়েছে। আমরা কিন্তু খুব বেশি শো পাইনি। সব বড় বড় হল আর ম্যাক্সিমাম প্রাইম স্লটগুলো দখল করে বসে আছে সেই সস্তা তামিল সিনেমার কপি করা কমার্শিয়াল অ্যাকশন মুভিগুলো। ওরাই পুরো মার্কেট বুক করে ফেলেছে।”
নিশি চোখ ছোট করে আত্মবিশ্বাসের সাথে বললেন,
“আমি সরাসরি মিনিস্ট্রির হাই লেভেলে কথা বলেছি, আমাদের লিগ্যাল টিম নিয়ে ফাইট করেছি। ফাইনালি আই ম্যানেজড ইট! কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিন কাটা ছাড়াই আমরা প্রপার এ-গ্রেড আনকাট সেন্সর সার্টিফিকেট ক্লিয়ার করে নিয়ে এসেছি। আর সিনেপ্লেক্সে আমাদের প্রথম গ্র্যান্ড প্রিমিয়ার শো হবে কাল বিকেল চারটায়। উই আর গোয়িং অল আউট উইথ দিস ফোর পিএম শো!”
অর্কো একটা লম্বা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
“থ্যাংক গড! প্রতিকূলতার মাঝেও এটা বিরাট একটা পাওয়া।”
এরপর ইফতেখার সাহেব ড্রয়ার থেকে কিছু অফিশিয়াল রয়্যালটি, আন্তর্জাতিক ওটিটি ডিস্ট্রিবিউশন আর চিত্রনাট্যকারের চূড়ান্ত কপিরাইট ক্লিয়ারেন্সের চুক্তিপত্র বের করে অর্কোর সামনে মেলে ধরলেন। অর্কো খুব মনোযোগ দিয়ে প্রতিটি পাতায় চোখ বুলিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় স্বাক্ষর করে দিল। সব পেপারওয়ার্ক শেষ হতেই ইফতেখার সাহেব ঘড়ির দিকে তাকিয়ে নিজের ফাইলগুলো ব্যাগে ভরলেন। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে হেসে বললেন,
“ওকে এভরিওয়ান, এভরিথিং ইজ ডান অ্যান্ড সিলড! কাল বিকেল চারটায় স্টার সিনেপ্লেক্সের রেড কার্পেটে দেখা হচ্ছে। আমি আজ তাহলে আসি, চাঁদরাতে বাসায় ফ্যামিলি ওয়েট করছে।”
অর্কোও নিজের ফোনটা পকেটে পুরে ইফতেখার সাহেবের সাথে সাথে উঠে দাঁড়াল।
“হ্যাঁ, আমিও তাহলে আপনার সাথে—”
“অর্কো, ওয়েট,”
নিশি কবিরের তীক্ষ্ণ ও কোমল কণ্ঠটা ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে অর্কোকে মাঝপথেই থামিয়ে দিল।
“আপনি একটু বসুন অর্কো... আপনার সাথে আমার পার্সোনালি কিছু ইম্পর্ট্যান্ট কথা আছে।”
ইফতেখার সাহেব বেরিয়ে যেতেই ভারী কাঁচের দরজাটা নিঃশব্দে আটকে গেল। কেবিনের ভেতর তখন আবার সেই নিঝুম, কিছুটা ধোঁয়াটে এসির বাতাস। নিশি কবির সোফা ছেড়ে উঠে ডুপ্লেক্সের এক কোণে থাকা ওপেন কিচেন আর মিনি-বারের দিকে এগিয়ে গেলেন। ক্যাবিনেট খুলতে খুলতে তিনি অর্কোর দিকে ফিরে ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করলেন—
“সো অর্কো, কী খাবেন বলুন? কফি নাকি চা দেব? অথবা... হোয়াট অ্যাবাউট সাম বিয়ার?”
অর্কো একটু হেসে মাথা নাড়ল।
“আমি ড্রিংক করি না নিশি, এটা তো আপনাকে আগেও অনেকবার বলেছি। জাস্ট এক কাপ নরমাল কফি হলে ভালো হয়।”
“আই নো, আই নো,”
নিশি খুব মায়াবী গলায় বললেন।
“একদম প্রপার গুড বয় যাকে বলে! কোনো ব্যাড হ্যাবিট নেই, কোনো উইকনেস নেই... এই যুগে আপনার মতো এমন পারফেক্ট জেন্টলম্যান দেখাটাই তো মিরাকল!”
অর্কো কোনো উত্তর না দিয়ে শুধু শান্ত মুখে বসে রইল। খানিক বাদে নিশি কফি মেকার থেকে ধোঁয়া ওঠা ব্ল্যাক কফির মগ এনে অর্কোর সামনের টেবিলে নামিয়ে রাখলেন। এবার কিন্তু তিনি আগের মতো গায়ে পড়া ঘনিষ্ঠতা দেখালেন না, বরং উল্টো দিকের সোফায় নিজের কফির কাপ নিয়ে বসলেন।
নিশির চেহারায় এবার খুব আন্তরিক আর পেশাদার এক নরম আভা ফুটে উঠল।
“লুক অর্কো,”
নিশি কফির মগটা দুই হাতে ধরে একটু ইতস্তত করে বললেন,
“আই একচুয়ালি ওয়ান্টেড টু সে সরি। প্রিভিউ রুমের ওই দিনের ঘটনাটার জন্য... আই নো আমি একটু বেশি পার্সোনাল হয়ে গিয়েছিলাম। আপনাকে ওভাবে আনকমফোর্টেবল ফিল করানো আমার একদমই উচিত হয়নি। আই অ্যাম জাস্ট সরি ফর দ্যাট।”
অর্কো কফির মগে এক চুমুক দিয়ে নিশির চোখের দিকে তাকাল।
“ইটস টোটালি ফাইন নিশি, সমস্যা নেই,” অর্কো খুব সহজ গলায় বলল।
“উই আর কুল।”
নিশি এক চওড়া স্বস্তির হাসি দিলেন। তিনি নিজের ব্যাগের চেইন খুলে চকচকে সোনালী খামের একটি ফোল্ডার বের করলেন। সেখান থেকে সিনেপ্লেক্সের তিনটি প্রিমিয়াম ভিআইপি লাউঞ্জ টিকিট অর্কোর সামনে এগিয়ে দিলেন।
“এই নিন,” নিশি বললেন।
“কাল বিকেল চারটার প্রিমিয়ারের তিনটা ভিআইপি টিকিট। অর্পিতা আর অর্পাকে নিয়ে আসুন। অর্পিতার সাথে তো আমার এখনো সামনাসামনি প্রপারলি দেখা হয়নি, কাল কথা বলা যাবে।”
অর্কো টিকিটগুলো হাতে নিয়ে ধন্যবাদ দিল।
“থ্যাংক ইউ নিশি। ওরা দুজনই খুব এক্সাইটেড সিনেমাটা দেখার জন্য।”
অর্কো টিকিটগুলো ওয়ালেটে ঢুকিয়ে উঠে দাঁড়াল।
“তাহলে আমি আজ আসি নিশি। বাসায় যেতে হবে।”
নিশি কবিরও সোফা ছেড়ে উঠে
স্টুডিও থেকে নিচে নেমে যখন সে গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসল, তখন ঘড়িতে রাত দশটা পার হয়ে গেছে।
ঈদের বিকেলের স্নিগ্ধ রোদে ঠিক পৌনে চারটায় স্টার সিনেপ্লেক্সের সামনে এসে নামল অর্কো, অর্পিতা আর অর্পা। ঈদের ছুটি কাটাতে রাশেদ তার নতুন বউ মরিয়মকে নিয়ে আগেই ময়মনসিংহের গ্রামের বাড়িতে চলে গেছে, তাই ওকে আর মেলায় বা প্রিমিয়ারে আসার জন্য কোনো জোরাজুরি করেনি অর্কো। সিনেপ্লেক্সের লবিতে পা রাখতেই দেখা গেল চারপাশের দৃশ্যটা একদম জমজমাট। সিন্ডিকেট যতই হল দখলের চেষ্টা করুক না কেন, সোশ্যাল মিডিয়ার তুমুল হাইপ আর অর্কো-নিশি জুটির প্রথম সিনেমার খবর ছড়িয়ে পড়ায় ঢাকার তরুণ প্রজন্ম, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আর রুচিশীল দর্শকদের ভিড়ে বিকেল চারটার শো হাউজফুল হয়ে গেছে। লবিতে তখন সিনেমা সমালোচক আর সাংবাদিকদের ভিড়। ভিআইপি লাউঞ্জের দরজা দিয়ে ঢুকতেই তাঁদের স্বাগত জানালেন নিশি কবির। অর্কোকে দেখা মাত্রই তিনি এগিয়ে এলেন, তবে তাঁর চোখ আটকে গেল অর্পিতার দিকে।
নিশি হাত বাড়িয়ে অর্পিতার সাথে খুব মার্জিতভাবে হ্যান্ডশেক করলেন।
"সো, ইউ আর দ্য ফেমাস অর্পিতা! ফাইনালি উই মিট!"
অর্পিতা মিষ্টি করে হাসল
"আসসালামু আলাইকুম নিশি আপু।"
"ওয়ালাইকুম আসসালাম,ইউ নো অর্পিতা, অর্কো তো সারাক্ষণ শুধু আপনার প্রশংসাই করে। বাট ইন পারসন ইউ আর লুকিং সো প্রিটি!"
"ধন্যবাদ আপু"
নিশি হেসে ভিআইপি সারির মাঝখানের সিটগুলোতে তাঁদের বসিয়ে দিলেন। নিশি নিজে বসলেন অর্কোর ঠিক পাশের রিক্লাইনার সিটে। সিনেমা শুরু হতেই পুরো হলের আলো নিভে গেল।
পর্দায় যখন ‘কাল্ট অব সাইলেন্স’-এর প্রতিটি দৃশ্য চলতে লাগল, তখন হলের শত শত দর্শকের শ্বাস যেন এক হয়ে আটকে ছিল। অর্কোর লেখা তীক্ষ্ণ সংলাপ আর নিশির মাস্টারক্লাস ডিরেকশনে দর্শকরা রীতিমতো শিউরে উঠছিল। সিনেমা শেষ হতেই পুরো থিয়েটার জুড়ে শুরু হলো এক নাগারে করতালির গর্জন! দর্শকরা আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে হাততালি দিতে লাগল। অনেকে হুইসেল দিয়ে নিশি আর অর্কোর নাম ধরে চিৎকার করতে শুরু করল। সবাই যখন ভিড় ঠেলে বের হয়ে বেজমেন্টের পার্কিং লটে অর্কোর গাড়ির সামনে এলো, তখন ঘড়িতে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা।
নিশি কবিরও তাঁদের এগিয়ে দিতে গাড়ির দরজা পর্যন্ত এলেন। তাঁর চোখেমুখে তখন সিনেমা সুপারহিট হওয়ার এক আনন্দের ঝলকানি।
"কংগ্র্যাটস অর্কো! ইউ মেড মি আ ভেরি হ্যাপি ওম্যান টুডে। আপনার মতো এমন একটা জিনিয়াসের সাথে কাজ করাটা তো লিটারেলি একটা নেশার মতো হয়ে গেছে! আই জাস্ট কান্ট ওয়েট ফর আওয়ার নেক্সট প্রজেক্ট... খুব জলদি আবার দেখা হচ্ছে আমাদের।"
"থ্যাংক ইউ নিশি। অল দ্য বেস্ট ফর দ্য মুভি।"
অর্কো ড্রাইভিং সিটে বসে ইঞ্জিন স্টার্ট দিল। পাশে অর্পিতা, আর পেছনের সিটে অর্পা।
এয়ারপোর্ট রোডের মসৃণ হাইওয়ে ধরে গাড়ি যখন দ্রুতগতিতে উত্তরার দিকে ছুটছিল, ঠিক তখনই অর্পিতার হঠাৎ এক তীব্র, একটানা শুকনো কাশি শুরু হলো। প্রথমে অর্কো ভাবল হয়তো গাড়ির এসি বা ধুলোর কারণে কাশি হচ্ছে। কিন্তু কাশিটা থামার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না; অর্পিতা বুকের ওপর হাত চেপে ধরে কাশতে কাশতে কুঁকড়ে যেতে লাগল। অর্কো এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে অন্য হাতে ড্যাশবোর্ডের বক্স থেকে তড়িঘড়ি করে কয়েকটি সাদা টিস্যু পেপার টেনে অর্পিতার দিকে বাড়িয়ে দিল।
“পানি খাবে অর্পিতা? পানি দেব?”
অর্কো উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করল।
অর্পিতা টিস্যু দিয়ে মুখ চেপে ধরে কোনোমতে মাথা নাড়ল। পেছনের সিট থেকে অর্পাও ঘাবড়ে গিয়ে ঝুঁকে এলো।
“কী হয়েছে আপু? কাশি হচ্ছে কেন এত?”
কয়েক সেকেন্ড পর কাশির বেগটা একটু কমতেই অর্পিতা মুখ থেকে টিস্যু পেপারটা সরাল।
আর টিস্যুর দিকে তাকানোমাত্রই গাড়ির ভেতরে যেন এক নিমেষে জমাট বরফের মতো এক ভয়ংকর নিস্তব্ধতা নেমে এলো। সাদা টিস্যুর মাঝখানে তাজা, উজ্জ্বল লাল রঙের রক্তের ছোপ!
“আপু! রক্ত!”
অর্পা পেছনের সিট থেকে চিৎকার দিয়ে উঠল।
অর্কোর হাত থেকে স্টিয়ারিং যেন এক মুহূর্তের জন্য কেঁপে কোনো কথা না বলে, কড়া ব্রেক চেপে গাড়িটা ইউ-টার্ন নিয়ে সে তীরের বেগে ছোটাল হাসপাতালের ইমার্জেন্সি গেটের দিকে।
ইমার্জেন্সির উজ্জ্বল সাদা লাইটের নিচে অর্পিতাকে ধরে স্ট্রেচারে বসাল অর্কো।
কিন্তু ঈদের রাত হওয়ায় হাসপাতালের বড় বড় সিনিয়র স্পেশালিস্ট ডাক্তাররা কেউই অন-ডিউটিতে ছিলেন না। ইমার্জেন্সির কয়েকজন ডিউটি মেডিকেল অফিসার আর ইন্টার্ন ডাক্তার অর্পিতার প্রেশার, পালস আর স্টেথোস্কোপ দিয়ে বুক পরীক্ষা করলেন। তারপর টর্চের আলো ফেলে ভালো করে গলা আর মুখের ভেতরটা দেখলেন। সব পরীক্ষা শেষে বয়সে তরুণ এক ডিউটি ডাক্তার স্টেথোস্কোপটা গলায় ঝুলিয়ে খুব স্বাভাবিক, নির্লিপ্ত গলায় বললেন—
“ঘাবড়ানোর মতো কিচ্ছু হয়নি ভাইয়া। ঈদের সময় তো অনেকেই বাইরে অতিরিক্ত মসলাদার তেল-ঝালের খাবার খায়, তার ওপর আবহাওয়া পরিবর্তনের জন্য গলায় ড্রাই কফের ইনফেকশন হয়েছে। অতিরিক্ত জোরে জোরে কাশির কারণে গলার ভেতরের পাতলা মিউকাস মেমব্রেন হয়তো সামান্য ছিলে গিয়ে একটু রক্তের দাগ এসেছে। শি ইজ অ্যাবসোলিউটলি ফাইন, ডোন্ট ওয়ারি অ্যাবাউট ইট।”
ডাক্তার একটা সাধারণ কাশির সিরাপ আর অ্যান্টিহিস্টামিন ট্যাবলেটের প্রেসক্রিপশন লিখে অর্কোর হাতে দিয়ে বললেন,
“সিরাপটা দিনে তিনবার খাবেন, আর ঠান্ডা পানি বা এসির বাতাস একটু এড়িয়ে চলবেন। ঠিক হয়ে যাবে।”
“দেখেছ? আমি তো আগেই বলেছিলাম সামান্য কাশির জন্য এত ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তুমি শুধু শুধু প্যানিক করছিলে।”
অর্কো কোনো কথা না বলে প্রেসক্রিপশনটা হাতে নিল।
ফার্মেসি থেকে ওষুধগুলো কিনে তারা যখন আবার গাড়িতে উঠল, তখন বাইরে ঈদের রাতের নিঝুম বাতাস বইছিল। ঈদের পরের দিনগুলো যেভাবে কাটবে বলে অর্কো ভেবেছিল, বাস্তবতা সেভাবে এগোলো না।
কাল্ট অব সাইলেন্স নিয়ে চলচ্চিত্র সমালোচক আর গুটিকয়েক রুচিশীল দর্শকের মধ্যে তুমুল প্রশংসা হলেও, বক্স অফিসে সিনেমাটি কোনো অভাবনীয় ঝড় তুলতে পারল না। হলমালিকরা খুব দ্রুতই তাদের সিংহভাগ শো ছেড়ে দিল সেইসব সস্তা অ্যাকশনধর্মী ছবির দখলে। শেষ পর্যন্ত কোনোমতে সিনেমার মূল প্রযোজনা ব্যয়টুকু রিকভার করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু সিনেমার এই গড়পড়তা ব্যবসায়িক ফলাফলের চেয়েও অর্কোর মাথার ভেতরে তখন এক অন্য অন্ধকার ঘনীভূত হচ্ছিল।
অর্পিতার কাশিটা কিছুতেই কমছিল না।
বরং দিন যত গড়াচ্ছিল, কাশির তীব্রতা যেন আরও বাড়ছিল। রাতের বেলা ঘুমাতে গেলেই একটানা শুকনো কাশি শুরু হতো, বুকের ভেতর থেকে এক অচেনা সাঁই-সাঁই শব্দ বের হতো। সাধারণ কাশির সিরাপ আর অ্যান্টিহিস্টামিন কোনো কাজেই আসছিল না। অর্পিতা বারবার বলত,
“ধুর, এটা সামান্য সিজনাল অ্যালার্জি, তুমি শুধু শুধু অতিরিক্ত টেনশন করছ।”
কিন্তু অর্কো আর কোনো ঝুঁকি নিতে চাইল না।
অর্কো অর্পিতাকে নিয়ে সোজা চলে গেল এক স্বনামধন্য বেসরকারি হাসপাতালের দেশের শীর্ষস্থানীয় বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ও পালমোনোলজিস্টের চেম্বারে।
সত্তরোর্ধ্ব প্রবীণ চিকিৎসক খুব নিবিড়ভাবে স্টেথোস্কোপ দিয়ে অর্পিতার বুক আর পিঠ পরীক্ষা করলেন। গলার ভেতরে টর্চের আলো ফেলে দেখে তিনি একটি লম্বা প্রেসক্রিপশন লিখলেন—ডিজিটাল চেস্ট এক্স-রে, সিবিসি, ইএসআর, সিরাম আইজিই এবং লাং ফাংশন টেস্ট
“আগে সব টেস্টগুলো করিয়ে নিয়ে আসুন,” ডাক্তার গম্ভীর মুখে বললেন।
“কাশি দিয়ে রক্ত আসার হিস্ট্রি থাকলে কোনো পরীক্ষা বাকি রাখা ঠিক হবে না।”
পরের দুই দিন ধরে বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে সবগুলো টেস্ট করানো হলো। রক্তের নমুনা দেওয়া থেকে শুরু করে এক্স-রে রুমের ঠান্ডা মেশিনের সামনে দাঁড়িয়ে অর্পিতা যখন পরীক্ষাগুলো দিচ্ছিল, অর্কো বাইরে করিডোরে পায়চারি করতে করতে মনে মনে শুধু প্রার্থনা করছিল। অবশেষে টেস্টের সমস্ত রিপোর্ট হাতে এলো।
রিপোর্টের ফাইলগুলো নিয়ে যখন তারা আবার চিকিৎসকের চেম্বারে ঢুকল, ডাক্তার চশমাটা চোখের ওপর ঠিক করে আলো জ্বালানো স্ক্রিনে এক্স-রে প্লেটটা ঝুলিয়ে দিলেন। তারপর একটার পর একটা প্যাথলজি রিপোর্ট খুব খুঁটিয়ে পরীক্ষা করতে লাগলেন।
রিপোর্টগুলো দেখা শেষ করে ডাক্তার বেশ কিছুটা অবাক হয়েই ফাইলটা টেবিলে রাখলেন।
“ইন্টারেস্টিং...” ডাক্তার একটু ভ্রু কুঁচকে অর্কোর দিকে তাকালেন।
“রিপোর্টে কিন্তু কোনো অ্যাবনরমালিটি নেই। লাংসে কোনো ইনফেকশন, নিউমোনিয়া কিংবা কোনো প্রকার স্পট নেই। বুকের এক্স-রে একদম ক্লিয়ার, রক্তের সব প্যারামিটারও একদম পারফেক্ট।”
অর্কো স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার চেষ্টা করল, কিন্তু মনের খচখচানিটা দূর হলো না।
“তাহলে ও এত কাশছে কেন স্যার? কাশি দিয়ে তো সেদিন রক্তও এসেছিল!”
ডাক্তার চেয়ারে হেলান দিয়ে বললেন,
“যেহেতু সব রিপোর্ট নরমাল, ইট সিমস লাইক আ টিপিক্যাল কেস অব কাফ-ভ্যারিয়েন্ট অ্যাজমা। অনেক সময় বড় বয়সে এসে ধুলোবালি বা কোল্ড অ্যালার্জি থেকে হুট করে এই ধরনের রেসপিরেটরি হাইপার-রেসপন্সিভনেস দেখা দেয়। জোরে কাশির ধাক্কায় গলার ভেতরের ভেসেল ফেটে গিয়ে রক্ত আসাটা খুব রেয়ার নয়।”
ডাক্তার একটি নতুন প্রেসক্রিপশনে দুটি বিশেষ ইনহেলার, মন্টিলুকাস্ট এবং অ্যালার্জির ওষুধ লিখে দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন—
“এই রোটাহেলারের ক্যাপসুলটা সকালে আর রাতে পাফ করে টানবেন। ইনহেলার নিয়মিত নিলে ব্রঙ্কাস রিল্যাক্স হবে এবং কাশি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। এক মাস পর আমাকে এসে একবার দেখাবেন।”
হাসপাতাল থেকে বের হয়ে ওষুধের দোকান থেকে ইনহেলার আর প্রেসক্রিপশনের সব ওষুধ কিনে গাড়িতে উঠল অর্কো।
গাড়িতে বসে অর্পিতা একটু হেসে বলল,
“শুনলে তো? ডাক্তারও বলল কিচ্ছু হয়নি। তুমি তো ভেবেই নিয়েছিলে আমার বড় কোনো অসুখ হয়ে গেছে!”
পরের সপ্তাহেই অর্পার মেডিকেল কলেজের ক্লাস শুরুর তারিখ চূড়ান্ত হয়ে গেল।
ভোরে ব্যাগ গোছানোর সময় থেকেই অর্পার মুখটা কালো হয়ে ছিল। শোবার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে সে দেখছিল অর্পিতা বিছানায় বসে ক্লান্ত মুখে ইনহেলারের পাফ টানছে। বোনের এমন অসুস্থ শরীর রেখে এত দূরে চলে যেতে অর্পার মন কিছুতেই সায় দিচ্ছিল না। অর্পাকে লাগেজ টেনে আনতে দেখে অর্পিতা একটু কেশে বলল,
“কী রে, মুখ এমন পেঁচার মতো করে রেখেছিস কেন?”
অর্পা লাগেজটা মেঝের ওপর ফেলে দিয়ে ছলছল চোখে অর্পিতার পাশে এসে বসল।
“আপু, তোমার শরীর তো ভালো না। কাশিটা এখনো কমেনি। আমি এই অবস্থায় দিনাজপুরে গিয়ে কীভাবে একা থাকব বলো তো? কয়টা দিন পর গেলে হতো না?”
অর্পিতা এক ধমক দিয়ে অর্পার গালটা টেনে দিল।
“একদম পাগলামি করবি না অর্পা! মেডিকেলের ওরিয়েন্টেশন আর শুরুর দিকের ক্লাস মিস দিলে তুই পড়াশোনায় পিছিয়ে যাবি। আমি তো নিয়মিত ওষুধ খাচ্ছি, ইনহেলার নিচ্ছি, দুই-তিন দিনেই ঠিক হয়ে যাব। তুই শুধু নিজের পড়ালেখায় মন দে।”
অর্কো ড্রয়িংরুম থেকে ব্যাগটা গাড়িতে তুলতে তুলতে ঘরে এসে বলল,
“শোনো অর্পা, তোমার আপুর সমস্ত দেখভালের দায়িত্ব আমার। তুমি একদম কোনো দুশ্চিন্তা করবে না।”
সকাল সাতটায় প্রাইভেট কারে চড়ে তিনজন রওনা হলো দিনাজপুরের উদ্দেশ্যে।
সেতু পেরিয়ে উত্তরবঙ্গের সবুজ হাইওয়ে ধরে টানা ছয় ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে দুপুরের দিকে তারা পৌঁছাল কলেজ ক্যাম্পাসে।
কিন্তু কলেজের ছাত্রী হোস্টেলে ঢুকতেই অর্কোর ভ্রু কুঁচকে গেল। পুরোনো ভবনের একটি ছোট্ট স্যাঁতসেঁতে রুমে চার-পাঁচজন শিক্ষার্থীর গাদাগাদি অবস্থা, বারান্দায় অচেনা বিশৃঙ্খলা আর ওয়াশরুমের পরিবেশও খুব একটা ভালো ছিল না। এমন দমবন্ধ করা পরিবেশে মেডিকেলের মতো কঠিন পড়াশোনা চালানো অসম্ভব। অর্কো এক মুহূর্তের জন্যও সেখানে অর্পাকে রাখার ঝুঁকি নিল না। সে সোজা হোস্টেল সুপারকে জানিয়ে অর্পাকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো।
ক্যাম্পাসের ঠিক পেছনের শান্ত, নিরিবিলি আবাসিক এলাকায় খোঁজাখুঁজি করে তারা দোতলার একটি চমৎকার, আলো-বাতাসে ভরা দুই রুমের নতুন ফ্ল্যাট পেয়ে গেল। ভাগ্যক্রমে অর্পার মেডিকেল কোচিংয়েরই এক ঘনিষ্ঠ বান্ধবী তনিমা যে নিজেও এই মেডিকেল কলেজে চান্স পেয়েছে, সেও থাকার জন্য ভালো জায়গা খুঁজছিল। দুই বান্ধবী মিলে ফ্ল্যাটটা শেয়ার করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়ে গেল।
বিকেলের মধ্যেই স্থানীয় বাজার থেকে নতুন তোশক, পড়ার টেবিল, চেয়ার, ফ্যান, পর্দার কাপড় আর এক মাসের রান্নাবান্নার হাঁড়ি-পাতিল ও চাল-ডালের রসদ কিনে ফ্ল্যাটটা একদম সুন্দর পরিপাটি করে সাজিয়ে দেওয়া হলো। সন্ধ্যা নামার মুখে বিদায়ের সময় এসে দাঁড়াল।
অর্পা দরজার মুখে দাঁড়িয়ে দুই হাতে অর্পিতাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
“আপু, সাবধানে থেকো। নিয়মিত ওষুধ খেয়ো প্লিজ।”
অর্পিতা চোখ মুছে ওর মাথায় হাত রাখল।
“তুইও ভালো থাকিস অর্পা। প্রতিদিন রাতে আমাকে ফোন দিবি।”
অর্কো অর্পার হাতে হাতখরচের টাকা আর এটিএম কার্ডটা দিয়ে হাসিমুখে বলল,
“শোনো অর্পা, কোনো সমস্যা হলে দ্বিধা না করে সাথে সাথে ফোন দেবে। খুব ভালো করে ডাক্তার হও।”
অর্পা মাথা নেড়ে সালাম করল।
দিনাজপুরের সেই নিরিবিলি গলি পেরিয়ে গাড়ি যখন ঢাকার ফিরতি হাইওয়েতে উঠল, তখন রাতের অন্ধকার চারপাশ ঘিরে ধরেছে।
গাড়ির সামনের সিটে হেলান দিয়ে চোখ বুজে ছিল অর্পিতা। দীর্ঘ সফরের ক্লান্তিতে তার শরীরটা ভেঙে আসছিল, মাঝে মাঝে সে খুব আলতো করে নিজের ওড়না দিয়ে মুখ চেপে কাশছিল।
ঢাকায় ফেরার পর থেকেই অর্পিতার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হতে শুরু করল।
দিনাজপুরের সেই দীর্ঘ সফরের ধকল যেন তার শরীর আর সইতে পারছিল না। রাতের পর রাত তার সেই দমবন্ধ করা কাশি আর শ্বাসকষ্ট চলতেই থাকল। ইনহেলার টানলে হয়তো মিনিট পনেরো-কুড়ির জন্য একটু শ্বাস নিতে পারত, কিন্তু পরক্ষণেই আবার শুরু হতো সেই নিঃশব্দ যন্ত্রণা। কোনো সাধারণ ওষুধেই আর কাজ হচ্ছিল না। অর্কো আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। সে দেশের সবচেয়ে শীর্ষস্থানীয় মেডিসিন ও বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপকের ব্যক্তিগত অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিল।
অধ্যাপক সমস্ত আগের রিপোর্ট আর ইতিহাস খুঁটিয়ে দেখে কিছু উচ্চমাত্রার নতুন ওষুধ ও অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রাইব করলেন।
নতুন ওষুধগুলো শুরু করার পর কাশির তীব্রতা হয়তো কিছুটা কমে এলো, কিন্তু অর্পিতার সারা শরীরে ভর করল এক অচেনা, নিস্তেজ দুর্বলতা। তার হাত-পা কেমন যেন ভারী হয়ে আসছিল, বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ানোর শক্তিটুকুও যেন পাচ্ছিল না সে। মুখের সেই স্বাভাবিক সতেজতা উধাও হয়ে চামড়ায় এক ফ্যাকাশে ভাব নেমে এসেছিল। সারাটা দিন সে শোবার ঘরের বিছানায় দুর্বল শরীরে শুয়ে থাকত।
বিকেলের নরম আলো তখন জানালার ভারী পর্দার ফাঁক দিয়ে শোবার ঘরের মেঝের ওপর এসে পড়েছে। বিছানায় ক্লান্ত চোখে শুয়ে ছিল অর্পিতা। অর্কো তার ঠিক পাশে বসে পরম মমতায় অর্পিতার শীর্ণ, ঠান্ডা হাতটা নিজের দুই হাতের তালুতে ধরে রেখেছিল। পাশে রাখা এক বাটি গরম চিকেন স্যুপ আর ওষুধের স্ট্রিপ। অর্পিতা আধবোজা চোখে তাকিয়ে একটু ম্লান হাসার চেষ্টা করল।
"অর্কো... তুমি এভাবে সারাক্ষণ আমার পাশে বসে থাকলে তোমার লেখার কাজ কখন করবে?"
অর্কো অর্পিতার কপালে হাত বুলিয়ে খুব নিচু গলায় বলল,
"তুমি ভালো না থাকলে আমার এই লেখালেখি দিয়ে কী হবে বলো? আগে তুমি সুস্থ হয়ে ওঠো।"
"আরেহ, আমি তো ভালোই আছি," অর্পিতা খুব দুর্বল গলায় ফিসফিস করে বলল।
"কাশি তো প্রায় কমেই গেছে, শুধু শরীরটা একটু বেশি দুর্বল লাগছে। দুই দিন রেস্ট নিলেই একদম ফিট হয়ে যাব।"
অর্কো মুখে একটা আশ্বস্ত করা হাসি ফুটিয়ে রাখলেও, অর্পিতার এই অতিরিক্ত নিস্তেজ চোখের দিকে তাকিয়ে তার বুকের ভেতর এক অজানা ভয় কাঁটার মতো বিঁধছিল।
ঠিক তখনই ফ্ল্যাটের সদর দরজায় কলিংবেলের চেনা শব্দ বেজে উঠল।
টুং... টাং...
দরজাটা খুলতেই সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখে অর্কো কোনো কথা বলার আগেই ঘটল এক অভাবনীয় কাণ্ড।
ঠাস!
রাশেদের ডান হাতের একটা শক্ত চড় এসে সরাসরি বসল অর্কোর বাঁ গালের ওপর। অর্কো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মরিয়ম ভয়ে অর্কোর দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠে রাশেদের হাত চেপে ধরল,
“কী করছেন আপনি! ওনার গায়ে হাত তুলছেন কেন!”
রাশেদের চোখ দুটো তখন রাগে, হতাশায় আর বুকফাটা অভিমানে একদম লাল হয়ে উঠেছে। সে অর্কোর দিকে তাকিয়ে কাঁপাকাঁপা গলায় একপ্রকার চিৎকার করে উঠল—
“তোর সাহস তো কম না অর্কো! বাসায় বসে আমাকে নিউজ আর অনলাইনের খবর দেখে জানতে হবে ভাবি অসুস্থ? তুই আমাকে একটা ফোন দিতে পারলি না রে? আমি তোর এত বড় পর হয়ে গেলাম?”
বিভিন্ন নিউজ পেজে যখন স্ক্রল যাচ্ছিল—জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক অর্কো আহমেদের স্ত্রী গুরুতর অসুস্থ
সেই খবর দেখেই মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছিল রাশেদের। বউকে নিয়ে সাথে সাথে সিএনজি নিয়ে সোজা উত্তরার বাসায় ছুটে এসেছে সে। অর্কো কোনো প্রতিবাদ করল না। সে মাথা নিচু করে দরজার চৌকাঠ ধরে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর আর কোনো কথা না বাড়িয়ে সোজা শোবার ঘরের দিকে পা বাড়াল। ভেতরে ঢুকে বিছানায় শোয়া ফ্যাকাশে, নিস্তেজ অর্পিতাকে দেখেই রাশেদের সমস্ত রাগ এক লহমায় যেন পানি হয়ে গেল। সে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে খাটের পাশের চেয়ারটায় বসল।
“ভাবি...” রাশেদের কণ্ঠটা একদম নরম হয়ে এলো।
“কী অবস্থা বানিয়ে ফেলেছেন নিজের শরীরের? অর্কো তো না হয় একটা বোকা, আপনিও আমাকে একটা ফোন দিয়ে জানাতে পারলেন না?”
মরিয়মও ব্যাগ রেখে দ্রুত শোবার ঘরে এসে অর্পিতার বিছানার একপাশে বসল।
অর্পিতা বিছানায় হেলান দিয়ে একটু ম্লান হাসার চেষ্টা করল।
“ভাইয়া... অর্কোর ওপর রাগ করবেন না প্লিজ। আপনারা নতুন সংসার মাত্র গুছিয়ে উঠছেন, ও শুধু আপনাদের অহেতুক টেনশনে ফেলতে চায়নি।”
“টেনশন মানে কী ভাবি? আমরা কি আপনাদের পর কেউ? যে সুখের সময় পাশে বসে বিরিয়ানি খাবে আর বিপদের সময় খবরও পাবে না, সে কেমন ভাই হলো?”
অর্কো দরজার পাশে এসে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল।
অর্পিতা খুব ধীরে ধীরে ডাক্তার দেখানো, সব রিপোর্ট নরমাল আসা আর কাশির তীব্রতা কিছুটা কমলেও শরীরের এই টানা দুর্বলতার কথাগুলো বুঝিয়ে বলল।
রাশেদ পুরো ঘরটায় একবার চোখ বুলিয়ে নিল। অর্পা এখন দিনাজপুরে পড়া নিয়ে ব্যস্ত। পুরো ফ্ল্যাটটা বড্ড নিঃঝুম হয়ে আছে। অর্পিতা অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে থাকায় ঘরের সব কাজ, রান্নাবান্না থেকে শুরু করে ওষুধ খাওয়ানো সবকিছু একা হাতে টানতে গিয়ে অর্কোর মুখটাও কেমন শুকিয়ে গেছে। রাশেদ একটা লম্বা শ্বাস ফেলে অর্কোর দিকে তাকাল।
শোবার ঘরে মরিয়ম আর অর্পিতা নিচু গলায় কথা বলছিল।
রাশেদ চোখের ইশারায় অর্কোকে ডেকে বলল,
“চল, একটু বারান্দায় যাই।”
দুজনে ড্রয়িংরুম পেরিয়ে দক্ষিণের খোলা বারান্দাটায় এসে দাঁড়াল। টবের হাসনাহেনা আর জুঁইয়ের পাতার ফাঁক দিয়ে উত্তরার হালকা বাতাস এসে লাগছিল গায়ে। রাশেদ বারান্দার গ্রিলে দুই হাত রেখে অর্কোর দিকে মুখ ফেরাল। তার চোখের দৃষ্টিতে ছিল গভীর এক জিজ্ঞাসা।
“এবার বল তো, আসল ঘটনাটা কী?” রাশেদ খুব নিচু কিন্তু স্পষ্ট গলায় জিজ্ঞেস করল।
“তুই তো ঘরের ভেতর সবার সামনে খালি নরমাল কাশি আর অ্যাজমার কথা বললি। কিন্তু তোর চোখের ভেতর তো অন্য এক ভয় দেখতে পাচ্ছি। তোর মাথায় কি কোনো পাহাড় ভেঙে পড়েছে?”
অর্কোর গলার স্বর কাঁপছিল,
“ঈদের রাতে যখন সিনেমা দেখে ফিরছিলাম, গাড়িতে হঠাৎ ওর এমন কাশি শুরু হলো... টিস্যু দিয়ে মুখ মুছতেই দেখলাম তাজা রক্ত! অথচ ডাক্তাররা বলে গলার সামান্য ঘষা লেগেছে। সব বড় বড় টেস্টের রিপোর্ট একদম নরমাল আসে, অথচ ইনহেলার নিলেও ওর কোনো আরাম হয় না। দিন দিন মেয়েটা কেমন যেন বিছানায় শুকিয়ে যাচ্ছে, নিজের পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়ানোর শক্তিটুকু পাচ্ছে না।”
অর্কো হঠাৎ নিজের প্যান্টের পকেটে হাত দিল। সেখান থেকে একটি বেনসন সিগারেটের প্যাকেট আর দেশলাই বের করল সে। কাঁপাকাঁপা আঙুলে একটা সিগারেট ঠোঁটে গুঁজে সে কাঠি জ্বালাল।
ধোঁয়ার একরাশ কুণ্ডলী বাতাসে ছড়িয়ে পড়তেই রাশেদ চোখ বড় বড় করে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল।
“তুই সিগারেট ধরালি? তুই না বছর দুয়েক আগে ভাবির হাতে হাত রেখে এই ছাইপাঁশ খাওয়া একদম ছেড়ে দিয়েছিলি?”
অর্কো সিগারেটে একটা লম্বা টান দিল। তার চোখ দুটো লাল হয়ে উঠেছে।
“আমি আর নিতে পারতেছি না রে ভাই,”
অর্কোর চোখ দিয়ে যেন হাহাকার ঝরে পড়ছিল।
“তীব্র ডিপ্রেশন আর টেনশনে আমার মাথা পাগল হয়ে যাচ্ছে। রাতে যখন ও আমার হাত ধরে নিস্তেজ হয়ে শুয়ে থাকে, আমার মনে হয় আমি শ্বাস নিতে পারছি না। সবকিছু কেমন যেন অন্ধকার লাগে।”
রাশেদ অর্কোর এই ভেঙে পড়া রূপ দেখে এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। রাশেদ এক পা এগিয়ে এসে খুব শক্ত করে অর্কোর কাঁধে হাত রাখল।
“পাগলের মতো কথা বলিস না তো,বড় বড় স্পেশালিস্ট ডাক্তাররা বলছে ওর ফুসফুস ভালো আছে, সব রিপোর্ট নরমাল। সিজনাল একটা ধাক্কা গেছে, রিকভার করতে একটু সময় তো লাগবেই। সব ঠিক হয়ে যাবে রে অর্কো। এত সহজে ভেঙে পড়লে চলবে?”
কথাটা শেষ করেই রাশেদ এক ঝটকায় অর্কোর আঙুলের ফাঁক থেকে জ্বলন্ত সিগারেটটা টেনে নিজের হাতে নিয়ে নিল। সিগারেটে নিজে একটা ছোট্ট টান দিয়ে সে ধোঁয়া ছাড়ল, তারপর বারান্দার রেলিংয়ের ওপাশে এক ফ্লিকে জ্বলন্ত সিগারেটটা বাতাসে ছুড়ে ফেলে দিল।
“আর ভুলেও এইসব বিষ মুখে দিবি না,ভাবিকে সুস্থ করার জন্য তোর নিজের শক্ত থাকা সবার আগে দরকার। তুই ভেঙে পড়লে ও কার ওপর ভরসা করবে বল?”
অর্ক কিছু বলল না শুধু রাস্তার দিকে।
সন্ধ্যার মুখে মুখে রাশেদ আর মরিয়ম বিদায় নিয়ে মিরপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হলো। সদর দরজাটা আস্তে করে আটকে দিয়ে অর্কো ধীরপায়ে ফিরে এলো শোবার ঘরে।
পুরো ফ্ল্যাটটায় তখন এক নিঝুম, থমথমে অন্ধকার নেমে এসেছে। জানালার ভারী পর্দাগুলো টানা, ড্রয়িংরুমের কোনো বাতি জ্বালানো নেই। শোবার ঘরের এক কোণে শুধু জ্বলছিল একটা হালকা নীল ডিম লাইট। সেই আবছা আলোয় ঘরের প্রতিটি ছায়াকে কেমন যেন অদ্ভুত রকমের ভারী লাগছিল। অর্কো এসে বসল বিছানার একদম কিনারে।
সে পরম মমতায় নিজের হাতের আঙুল দিয়ে অর্পিতার কপালে জমে থাকা অবাধ্য চুলগুলো আলতো করে সরিয়ে দিতে লাগল।
“আমার চোখের দিকে একটু তাকাও তো।”
অর্কো একটু ঝুঁকে এলো। সে অর্পিতার চোখের খুব কাছাকাছি নিজের মুখটা নিয়ে গেল।
“তাকিয়ে আছি তো। কিছু বলবে?”
অর্পিতা সিলিংয়ের দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে একটা দীর্ঘ, ভারী নিঃশ্বাস ফেলল।
“মাঝে মাঝে এই বিছানায় শুয়ে শুয়ে পুরোনো দিনগুলোর কথা ভাবি,সেই যে খালার বাসায় তুমি প্রথম মিষ্টি নিয়ে এলে... ওরা তোমাকে কত অপমান করল, কত তাচ্ছিল্য করল। তারপর ফার্মগেটের সেই মেসের ঘর, তোমার ছেঁড়া জুতো, এক কাপ চায়ের টাকা বাঁচিয়ে তোমার আমার সাথে দেখা করতে যাওয়া... মনে আছে সেই কাজী অফিসের কথা? যেখানে অন্য মেয়েরা কত লাখ টাকার দেনমোহর চায়, আর আমি চেয়েছিলাম মাত্র এক টাকা। কারণ আমি জানতাম, তোমার মতো মানুষকে কোনো টাকা দিয়ে মাপা যায় না।”
অর্কো কোনো কথা বলতে পারল না, শুধু অর্পিতার হাতটা আরও নিবিড়ভাবে নিজের বুকের ওপর চেপে ধরে রাখল।
অর্পিতা অর্কোর চোখের দিকে তাকাল। তার চোখের কোণায় তখন নোনা পানি চিকচিক করছে।
“আমরা কত কষ্ট করলাম বলো তো অর্কো? কতগুলো বছর পেটে পাথর বেঁধে দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করলাম। আর আজ যখন তোমার এত নামডাক, তোমার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে লাখ লাখ টাকা, আমাদের এত বড় একটা সুন্দর ফ্ল্যাট... ঠিক তখনই কেন সবকিছু এমন ওলটপালট হতে শুরু করল? কেন এই শরীরটা এভাবে অসময়ে ভেঙে পড়তে লাগল বলো তো?”
“এভাবে বোলো না তো।”
অর্পিতা থামল না।
“তুমি তো জানো, আমি কাউকে কখনো বলিনি... কিন্তু আমি না মনে মনে কত হাজারটা স্বপ্ন দেখতাম অর্কো,আমি ভাবতাম আমাদের এই বাসার বারান্দাটায় একটা ছোট্ট দোলনা থাকবে। ছুটির দিনে তুমি ল্যাপটপ নিয়ে স্টাডি রুমে বসে লিখবে, আর আমাদের একটা ছোট্ট বাচ্চা সারা ঘর খেলনা ছড়িয়ে দৌড়াদৌড়ি করবে। সে গিয়ে তোমার কোল জড়িয়ে ধরবে, আমি এসে পড়ার ডিস্টার্ব করার জন্য বকা দেব, আর তুমি তাকে কোলে তুলে নিয়ে হাসবে... আমি মা হব, তুমি বাবা হবে... এই সাধারণ সুখটুকু কি আমাদের কপালে লেখা ছিল না অর্কো?”
“এভাবে কথা বোলো না, তোমার কিছু হয় নি সুধু শ্বাসকষ্ট আর কাশি এতে এত ভেঙ্গে যেও না অর্পিতা আমাদের সব হবে দেখ। সামান্য একটা কাশি আর দুর্বলতার জন্য তুমি আমাদের পুরো ভবিষ্যৎকে কেন প্রশ্নবিদ্ধ করছ? বড় বড় স্পেশালিস্টরা দেখেছে, কোনো খারাপ রোগ ধরা পড়েনি। দরকার হলে আমি তোমাকে নিয়ে দেশের বাইরে যাব সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক, যেখানে যেতে হয় নিয়ে যাব! আমার সমস্ত বইয়ের রয়্যালটি, আমার সব সম্পত্তি বিক্রি করে হলেও তোমাকে আমি পুরোপুরি সুস্থ করে তুলব। আমাদের ঘর বাচ্চাদের হাসিতে ভরে উঠবে, তোমার প্রতিটা অপূর্ণ স্বপ্ন সত্যি হবে। তুমি শুধু আমার হাতটা শক্ত করে ধরে রাখো।”
অর্পিতা কোনো তর্ক করল না অর্পিতা খুব ধীরে ফিসফিস করে বলল,
“আমি তো আছি অর্কো, আমি তোমার পাশেই আছি। শুধু মাঝে মাঝে ভয় লাগে... আমি ছাড়া তো তোমাকে দেখার আর কেউ নেই। ঠিকমতো না খেয়ে থাকলে কে তোমাকে বকা দেবে বলো তো?”
“তুমিই দেবে,চিরকাল তুমিই দেবে।”
পরের একটা সপ্তাহ অর্কো নিজেকে বাইরের পুরো পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলল।
ফোনের রিংটোন সাইলেন্ট করে সে রেখে দিয়েছিল ড্রয়ারের ভেতর। বিভিন্ন মিডিয়া হাউজের সাংবাদিক, ইউটিউবার কিংবা প্রকাশনা জগতের মানুষেরা বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও সে কারও ফোন ধরেনি। নতুন ইংরেজি উপন্যাস লেখার সমস্ত কাজ, খসড়া আর পরিকল্পনা একপাশে সরিয়ে রেখে সে চব্বিশটা ঘণ্টা শুধু অর্পিতার পাশে ছায়ার মতো লেগে রইল। সারাদিন সময়মতো গরম গরম স্যুপ বানানো, ফলের রস তৈরি করা, ওষুধের রুটিন ঠিক রাখা আর অর্পিতার মাথায় হাত বুলিয়ে গল্প শোনানো—এই ছিল তার একমাত্র পৃথিবী।
টানা কয়েক দিনের বিশ্রামে আর অর্কোর এমন নিঃস্বার্থ সেবায় অর্পিতার শারীরিক অবস্থা আগের চেয়ে কিছুটা উন্নতির দিকে গেল। কাশির দমকটা অনেকটাই কমে এসেছে, মুখের ফ্যাকাশে ভাবটা কেটে হালকা একটু সতেজতা ফিরে এসেছে।
বিকেলের দিকে শোবার ঘরে অর্পিতার পিঠের পেছনে দুটো নরম বালিশ ঠেস দিয়ে বসিয়ে রেখেছিল অর্কো। হাতে একটি ধোঁয়া ওঠা গরম চিকেন স্যুপের বাটি।
অর্কো চামচে করে স্যুপ তুলে সাবধানে ফুঁ দিয়ে অর্পিতার মুখে তুলে দিচ্ছিল।
অর্পিতা এক চামচ স্যুপ মুখে নিয়ে একটু হেসে বলল,
“আমি এখন নিজেই খেতে পারব অর্কো। তুমি শুধু শুধু আমাকে একবারে বাচ্চার মতো বানিয়ে ফেলছ!”
“একদম চুপচাপ খাও তো,তুমি নিজে খেতে গেলে অর্ধেক ফেলে দেবে।”
ঠিক তখনই ফ্ল্যাটের সদর দরজায় কলিংবেল বেজে উঠল।
টুং... টাং...
অর্কো একটু অবাক হলো। এই অসময়ে কে এলো? রাশেদ আসলে তো আগেই ফোন দেয়। সে স্যুপের বাটিটা সাইড টেবিলে রেখে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। ছিটকিনি খুলে দরজাটা ফাঁক করতেই অর্কোর চোখ দুটো বিস্ময়ে স্থির হয়ে গেল। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছেন স্বয়ং নিশি কবির! এক হাতে ঝুলছে একটি বড়সড় বিলাসবহুল ফলের বাস্কেট—ড্রাগন ফ্রুট, আপেল, আঙুর আর বেদানা দিয়ে সাজানো।
অর্কো স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থেকে অপ্রস্তুত গলায় বলে উঠল,
“নিশি? আপনি! মানে... আপনি আমার বাসার অ্যাড্রেস চিনলেন কীভাবে?”
নিশি কবির সানগ্লাস টা নাকের ওপর একটু নামিয়ে হাসি
“লুক অর্কো, একজন ফিল্ম ডিরেক্টর যাকে খুঁজতে চায়, তার কাছে পৌঁছানো কি কোনো ব্যাপার? তাছাড়া আপনার মতো একজন ব্রিলিয়ান্ট আর স্পেশাল মানুষকে খুঁজে বের করা তো আরও ইজি! আই অলওয়েজ ফাইন্ড হোয়াট আই ওয়ান্ট।”
অর্কো কিছু বলার আগেই নিশি ফলের ঝুড়িটা হাতে নিয়ে এক পা এগিয়ে ভেতরে ঢুকে এলেন।
“আর এভাবে দরজায় দাঁড় করিয়ে রেখেই কথা বলবেন নাকি?”
নিশি মৃদু হেসে অর্কোর চোখের দিকে চেয়ে বললেন,
“আপনার ওয়াইফ কোন রুমে? ওনাকে একটু দেখতে এসেছি।”
কথাটা বলেই নিশি কবির খুব সাবধানে পা বাড়িয়ে সোজা অর্পিতার শোবার ঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন। শোবার ঘরে পা রাখতেই নিশি কবিরকে দেখে অর্পিতা কিছুটা চমকে গেল।
বিছানায় বালিশে ঠেস দিয়ে বসে ছিল অর্পিতা, গায়ে পাতলা চাদর জড়ানো। নিশিকে এভাবে ফলের ঝুড়ি হাতে নিজের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে একটু অপ্রস্তুত হয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে বসল।
“নিশি আপু? আপনি!”
অর্পিতা মুখে একটু ম্লান হাসি টেনে বলল।
“প্লিজ অর্পিতা, উঠবেন না। জাস্ট রিল্যাক্স,”
নিশি এগিয়ে এসে ফলের ঝুড়িটা সাইড টেবিলে রাখলেন। তারপর বিছানার পাশের কাঠের চেয়ারটায় খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বসলেন। নিশির চোখের দৃষ্টিতে তখন কোনো মেকি আড়ম্বর ছিল না, ছিল এক খাঁটি ও পরিণত সহমর্মিতা। তিনি খুব নরম গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
“এখন কেমন ফিল করছেন অর্পিতা? আই ওয়াজ রিয়েলি ওরিড অ্যাবাউট ইউ।”
অর্পিতা একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
“আগের চেয়ে একটু বেটার আপু। কাশিটা কমেছে, শুধু শরীরটা বেশ দুর্বল। তবে অর্কো তো একদম বাচ্চার মতো দিনরাত সেবা করছে... সময়মতো স্যুপ, ওষুধ সব একাই দেখতেছে।”
নিশি খুব নিবিড়ভাবে অর্পিতার শান্ত, মায়াবী মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
নিশি এবার চেয়ারে হেলান দিয়ে ঘরের চারপাশটায় একবার তীক্ষ্ণ চোখে তাকালেন।
স্টাডি রুমের খোলা দরজার ভেতর ছড়ানো কিছু কাগজপত্র, ডাইনিংয়ের টেবিলে ওষুধের ফাঁকা প্যাকেট, কিচেনের কোণে রাখা স্যুপের খালি বাটি আর অর্কোর মুখের ওপর জমে থাকা নির্ঘুম রাতের স্পষ্ট ক্লান্তি সবকিছু নিশির চোখে মুহূর্তেই ধরা পড়ল। দেশের এক নম্বর বেস্টসেলার লেখক, যার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে লাখ লাখ টাকার রয়্যালটি জমা হচ্ছে, সে এই বিশাল ফ্ল্যাটে নিজের হাতে ঘর ঝাড়ু দেওয়া থেকে শুরু করে স্ত্রীর প্রতি বেলার পথ্য আর সেবা একা হাতে সামলাচ্ছে!
নিশি কবির সোজা হয়ে বসলেন।
“সিরিয়াসলি অর্কো? আমি ভাবতেই পারছি না আপনি এই বিশাল ফ্ল্যাট আর অর্পিতার এত বড় নার্সিং একা হাতে সামলাচ্ছেন! আপনি তো পুরো বিধ্বস্ত হয়ে যাচ্ছেন! এত টাকা ইনকাম করে কী করবেন যদি বাসায় একটা প্রপার ফুল-টাইম মেইড না রাখতে পারেন, মিস্টার অর্কো?”
অর্কো দরজার কড়া ধরে একটু ম্লান হেসে বলল,
"আসলে আমরা দুজনই সবসময় খুব সাধারণ জীবনে অভ্যস্ত নিশি। তাছাড়া অর্পিতার সেবা করতে আমার বিন্দুমাত্র কষ্ট হচ্ছে না। ও ভালো থাকলে আমার আর কোনো কিছুরই দরকার নেই।"
নিশি কবির এক মুহূর্ত চোখ বড় বড় করে অর্কোর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর একটা লম্বা শ্বাস ফেলে মাথা নাড়লেন।
"ইউ আর জাস্ট ইম্পসিবল অর্কো!"
নিশি ব্যাগ থেকে নিজের ফোন বের করতে করতে বললেন।
"আবেগ দিয়ে আর্ট হতে পারে, বাট রিয়েল লাইফ চলে না। আপনি এখানে দাঁড়িয়ে থাকুন, আমি দেখছি।"
নিশি সোজা ঘর থেকে বেরিয়ে ড্রয়িংরুমে চলে গেলেন। সেখানে গিয়ে তিনি ফোনে খুব দ্রুত ইংরেজিতে কারো সাথে কথা বলতে শুরু করলেন। অর্কো আর অর্পিতা অবাক হয়ে একে অপরের মুখের দিকে তাকাল। মিনিট ত্রিশেক পরের কথা। ফ্ল্যাটের সদর দরজায় কলিংবেল বেজে উঠল।
নিশি নিজেই এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দিলেন। দরজার ওপাশ থেকে ভেতরে ঢুকল তিনজন মানুষ দুজন পরিপাটি ইউনিফর্ম পরা প্রফেশনাল ফিমেল নার্স, আর একজন চটপটে, মার্জিত চেহারার তরুণী। নিশি তাঁদের ড্রয়িংরুমে নিয়ে এসে অর্কোর দিকে হাত তুলে পরিচয় করিয়ে দিলেন
"দিস ইজ মেরি অ্যান্ড সুমি, ধানমন্ডির নামকরা প্রাইভেট কেয়ার এজেন্সির ট্রেন্ড নার্স। এরা শিফটে অর্পিতার প্রেসার, টেম্পারেচার আর মেডিসিন মনিটর করবে। আর ও প্রাপ্তি হাইলি ট্রেইন্ড প্রফেশনাল হাউসকিপার। ও বাসার স্পেশাল ডায়েট কুকিং, নিউট্রিশন আর পুরো ফ্ল্যাটের ক্লিনিং নিখুঁতভাবে সামলাবে।"
এবার অর্কোর কপালে স্পষ্ট বিরক্তির ভাঁজ পড়ল। তার গলার স্বর হঠাৎ করেই বেশ শক্ত ও গম্ভীর হয়ে উঠল।
"লুক নিশি, উইথ ডিউ রেসপেক্ট... আপনি কিন্তু একটু বেশি ইন্টারফেয়ার করছেন,এটা আমার পরিবার, আমার বাসা। আমার স্ত্রীর টেককেয়ার করার জন্য আমি একাই যথেষ্ট। আপনার এত টেনশন নেওয়ার বিন্দুমাত্র দরকার নেই। প্লিজ ওনাদের সবাইকে এখনই চলে যেতে বলুন।"
ঘরের ভেতর এক মুহূর্তের জন্য এক অস্বস্তিকর নিস্তব্ধতা নেমে এলো। নিশি কবির অর্কোর এই অনমনীয়, রুক্ষ রূপ দেখে একটুও রাগ করলেন না। বরং তিনি খুব শান্ত চোখে অর্কোর চোখের দিকে চেয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
"লুক অর্কো, আমি শুধু হেল্প করতে চেয়েছিলাম,বাট ফাইন! আপনি যখন এতই একরোখা..."
নিশি দুই নার্সের দিকে ফিরে বললেন,
"মেরি, সুমি, সরি ফর দ্য ট্রাবল। তোমরা চলে যাও, আই উইল ক্লিয়ার ইউর ভিজিট ফি।"
নার্স দুজন বিনীতভাবে সালাম দিয়ে দরজা পেরিয়ে চলে গেল। তারপর নিশি প্রাপ্তির দিকে ইঙ্গিত করে অর্কোকে বললেন,
"নার্সদের তো ফিরিয়ে দিলাম, বাট প্রাপ্তি কিন্তু এই বাসায় থাকবে। উনাকে আমি কিছুতেই যেতে দেব না। পুরো বাসার হাইজেনিক কুকিং আর ঘরদোর অন্তত ও প্রপারলি দেখাশোনা করুক।"
অর্কো তবুও মাথা নাড়ল,
"না নিশি, দরকার নেই—"
"রেখে দাও না অর্কো..." শোবার ঘর থেকে অর্পিতার দুর্বল কিন্তু খুব শান্ত কণ্ঠটা ভেসে এলো।
অর্কো ফিরে তাকাল। অর্পিতা বিছানায় উঠে বসে খুব নরম গলায় বলল,
"নিশি আপু একদম ভুল বলেননি অর্কো। এই অসুস্থ শরীরে বাসার কোনো কাজ তো আমার পক্ষে করা পসিবল হচ্ছে না। তুমি বাজার, রান্না, আমার সেবা আর নিজের লেখালেখি একা আর কত টানবে বলো তো? প্রাপ্তি থাকলে আমাদের দুজনের জন্যই একটু শান্তি হবে। রেখে দাও ওকে।"
অর্পিতার এই ক্লান্ত মুখের আকুতির দিকে তাকিয়ে অর্কো আর কোনো কথা বাড়াতে পারল না। তার সমস্ত বিরক্তি এক নিমেষে নরম হয়ে এলো।
সে প্রাপ্তির দিকে তাকিয়ে খুব বিনীতভাবে বলল,
"ঠিক আছে... তুমি ভেতরে এসো।"
নিশি কবিরের মুখে তখন এক বিজয়ের মৃদু, মায়াবী হাসি ফুটে উঠল।
নিশি কবির ড্রয়িংরুমে ঘুরে দাঁড়িয়ে অর্কোর দিকে তাকালেন।
“বাই দ্য ওয়ে অর্কো, আপনাদের গেস্ট রুম কোন দিকে?” নিশি খুব স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করলেন।
অর্কো করিডোরের দিকে আঙুল তুলে বলল,
“ডান পাশের ওই রুমটা।”
নিশি প্রাপ্তিকে নিয়ে সেই গেস্ট রুমের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলেন। রুমটা বেশ পরিপাটি আর আলো-বাতাসে ভরা, এক কোণে সুন্দর একটা খাট আর আলমারি।
নিশি প্রাপ্তির দিকে তাকিয়ে বললেন,
“তুমি এই রুমে থাকবে, অলরাইট? নিজের লাগেজ গুছিয়ে নাও। অ্যান্ড ডোন্ট ওয়ারি অ্যাবাউট দ্য স্যালারি... মিস্টার অর্কো প্রতি মাসের এক তারিখে তোমার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেবে। ইজন্ট ইট, মিস্টার অর্কো?”
নিশি দরজার দিকে ফিরে অর্কোর দিকে তাকিয়ে চোখ ছোট করে একটু হাসি দিলেন।
অর্কো দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে একটা চাপা নিঃশ্বাস ফেলল। এই পরিস্থিতিতে আর কোনো দ্বিমত করার উপায় ছিল না। সে খুব বিনীত গলায় বলল,
“হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। স্যালারি নিয়ে কোনো চিন্তা করতে হবে না, আমি প্রতি মাসেই সময়মতো দিয়ে দেব।”
প্রাপ্তি মাথা ঝুঁকিয়ে বলল,
“থ্যাংক ইউ স্যার, থ্যাংক ইউ ম্যাম।”
এরপর নিশি কবির শোবার ঘরে গিয়ে অর্পিতার বিছানার পাশে দাঁড়ালেন।
“আমি তাহলে আজ আসছি অর্পিতা,প্রপারলি রেস্ট নেবেন, আর কোনো দরকার হলে প্রাপ্তিকে বলবেন। আই উইল কিপ চেকিং অন ইউ।”
অর্পিতা বিছানা থেকে একটু হেসে বলল,
“অনেক ধন্যবাদ নিশি আপু। আপনি নিজে এসে এত কিছু করে দিলেন...”
“আরেহ, ইটস মাই প্লেজার,”
কথাটা শেষ করেই নিশি কবির লিফটের লবির দিকে এগিয়ে গেলেন। অর্কো দরজায় দাঁড়িয়ে কয়েক সেকেন্ড সেই চলে যাওয়া ছায়ার দিকে চেয়ে রইল। তারপর সদর দরজাটা আলতো করে আটকে দিয়ে সে আবার নিজের শান্ত, ঘরোয়া আশ্রয়ের ভেতর ফিরে এলো।
এইভাবে দেখতে দেখতে আরও কয়েকটা সপ্তাহ কেটে গেল।
বাসার সমস্ত রান্নাবান্না আর ঘরদোরের দেখাশোনার দায়িত্ব প্রাপ্তি একাই খুব গুছিয়ে সামলে নিচ্ছিল। প্রতিদিন সকালে টাটকা ফলের জুস, দুপুরে পুষ্টিকর স্যুপ আর ডিম-দুধের যত্ন সবকিছুই চলছিল একদম ঘড়ির কাঁটা ধরে। অর্পিতার সেই ভয়ংকর কাশি আর শ্বাসকষ্ট এখন পুরোপুরি থেমে গেছে। তবে কাশি কমলেও শরীরের ভেতরের সেই অচেনা ক্লান্তি আর দুর্বলতা যেন তাকে পুরোপুরি ছেড়ে যাচ্ছিল না। একটু হাঁটাহাঁটি করলেই সে হাঁপিয়ে উঠত, শরীর জুড়ে থাকত এক অদ্ভুত নিস্তেজ ভাব। ডাক্তার স্পষ্ট করেই বলে দিয়েছিলেন শারীরিক ধাক্কাটা বেশ বড় গেছে, তাই কোনো তাড়াহুড়ো না করে অন্তত কয়েকটা মাস ভালোমন্দ পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে এবং পুরো বিশ্রামে থাকতে হবে। অর্কো এই সময়টাতে অর্পিতাকে এক মুহূর্তের জন্যও চোখের আড়াল করত না।
এদিকে প্রকাশনা জগতে তখন অর্কো আহমেদকে নিয়ে এক অন্যরকম তোলপাড়। বইমেলার সেই অভাবনীয় সাফল্যের পর পাঠকরা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিনিয়ত অপেক্ষা করছিল তার পরবর্তী সৃষ্টির জন্য।
পল্টনের অফিস থেকে প্রায় প্রতি দুই-তিন দিন পরপরই ফোন দিতেন রফিক সাহেব।
“পাঠকরা কিন্তু আমাদের পেজে ইনবক্স করে পাগল করে দিচ্ছে! প্রেসের মালিকরাও বারবার তাড়া দিচ্ছে। তোমার সেই নতুন উপন্যাসের কাজ কতদূর বাবা? ড্রাফটটা কি এ মাসেই হাতে পাব?”
কিন্তু অর্কো প্রতিবারই খুব নরম অথচ অনড় গলায় না করে দিত।
“না আঙ্কেল,” অর্কো ফোনে একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বলত।
“আমি এই মুহূর্তে কোনো নতুন বইয়ের কাজে হাত দিতে পারছি না। অর্পিতার শরীরটা এখনো খুব একটা ভালো না, অসম্ভব দুর্বল হয়ে আছে। ও পুরোপুরি সুস্থ হয়ে নিজের পায়ে স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত আমি মাথায় কোনো লেখার প্রেশার নিতে পারব না। আমাকে আপাতত কয়েকটা মাস একদম ব্রেক দিন আঙ্কেল।”
রফিক সাহেব একটু মন খারাপ করলেও অর্কোর এই পারিবারিক দায়বদ্ধতার সামনে আর কোনো জোর করতে পারতেন না। ফোনটা রেখে দিয়ে অর্কো এসে বসত বারান্দায়, অর্পিতার ঠিক পাশের বেতের চেয়ারটায়।
প্রাপ্তি বিকেলে দুজনের জন্য দুটি কাপে রং চা আর হালকা কিছু ফল কেটে দিয়ে যেত। অর্পিতা চায়ে চুমুক দিয়ে বারান্দার হাসনাহেনা গাছটার দিকে তাকিয়ে আলতো করে হাসত। অর্কো অর্পিতার শীর্ণ হাতটা নিজের হাতের ভেতর টেনে নিয়ে বসে থাকত ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
বিকেলের মিঠে রোদে উত্তরার চারতলার বারান্দায় বেতের চেয়ারটায় হেলান দিয়ে বসে ছিল অর্পিতা। তার গায়ে জড়ানো একটি হালকা সুতির চাদর। টবের হাসনাহেনা আর জুঁইয়ের সবুজ পাতার মাঝে ফুটে থাকা সাদা পাপড়িগুলো আলতো করে আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দেখছিল সে। অর্কো পাশে রাখা অন্য একটা চেয়ারে বসে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল অর্পিতার মুখের দিকে।
“অর্পিতা...” অর্কো খুব নরম গলায় বলল।
অর্পিতা পাতা থেকে হাত সরিয়ে অর্কোর দিকে মুখ ফেরাল।
“হুম?”
“ঘরে বসে থাকতে থাকতে তোমার মন নিশ্চয়ই খারাপ হয়ে গেছে,” অর্কো বলল।
“চলো না, আমরা ঢাকার বাইরে কোথাও থেকে একটু ঘুরে আসি? শ্রীমঙ্গল কিংবা সিলেটের কোনো নিরিবিলি রিসোর্টে যাই... সবুজ গাছপালা আর খোলা বাতাস পেলে তোমার শরীর আর মন দুটোই ভালো লাগবে।”
অর্পিতা একটু হাসল সে বলল,
“আমি কোনো রিসোর্টে বা পাহাড়ে যেতে চাই না অর্কো। আমি তোমার গ্রামে যেতে চাই। তোমার বাবা আর ওই নতুন মায়ের সাথে দেখা করতে চাই।”
গ্রামের কথা শুনতেই অর্কোর বুকের ভেতর যেন পুরোনো এক আড়ষ্টতা এসে ভর করল। সে একটু ইতস্তত করে চোখ নামিয়ে নিল।
“গ্রামের বাড়ি?” অর্কোর গলার স্বর কিছুটা দমে গেল।
“জানি না অর্পিতা... ওখানে গেলে আমার মনের ভেতর কেমন যেন একটা অস্বস্তি কাজ করে। পুরোনো সেই পোড়া ডায়েরি, বাবার সেই কঠোর চোখ, আর এই নতুন পরিবার... এত কিছু আমি আবার নতুন করে কীভাবে ফেস করবো, কীভাবে প্রসেস করবো বুঝতে পারছি না।”
“অর্কো, তুমি এভাবে ভেবো না প্লিজ, পরিস্থিতির চাপে পড়ে মেসের সেই দিনগুলোতে তোমার হয়তো কোনো উপায় ছিল না, তুমি নিজের জেদ নিয়ে লড়েছ। কিন্তু অজান্তেই তুমি তোমার জন্মদাতা বাবার মনে কতখানি গভীর ক্ষত আর শূন্যতা তৈরি করে রেখেছিলে, সেটা ভেবে দেখেছ? মানুষটা সারা জীবন হয়তো নিজের শাসন দিয়ে ভালোবাসাকে ঢেকে রেখেছিলেন, নিজের মনের নরম আবেগটা তোমাকে কোনোদিন বুঝতে দেননি।”
অর্পিতা অর্কোর চোখের দিকে অপলক চেয়ে রইল।
“কিন্তু আজ মানুষটার বয়স হয়েছে অর্কো। শেষ বয়সে যখন তিনি নিজে সব অভিমান ভুলে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে তোমাকে বলে দিলেন পরের বার বউমাকে নিয়ে আসবি তখন কি তুমি ওনার বুকের ভেতরের আর্তিটা টের পাওনি? বাবা তো নিজের সমস্ত দেওয়াল ভেঙে তোমার হাত ধরার জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। পরিবার তো ক্ষোভ পুষে রাখার জায়গা নয় অর্কো। আজ তোমার জীবনে এত সম্মান, এত টাকা... এই সময়ে বাবার মাথায় হাত রেখে দোয়া নেওয়ার চেয়ে বড় সুখ আর কী হতে পারে বলো তো?”
অর্কো কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তখনই অর্পিতার কোলে রাখা মোবাইলটা একটি পরিচিত মিউজিক বাজিয়ে সশব্দে জ্বলে উঠল।
স্ক্রিনের ওপর বড় বড় অক্ষরে ভেসে উঠল—
“অর্পা (ভিডিও কল)”।
অর্পিতা স্ক্রিনে আঙুল ছুঁইয়ে কলটা রিসিভ করতেই ফোনের পর্দায় ভেসে উঠল অর্পার উচ্ছ্বসিত মুখ। পেছনে তার পড়ার টেবিল আর দেওয়াল জুড়ে ঝোলানো বড় বড় চার্ট। মাথায় এলোমেলো চুল
“আপু! দুলাভাই!” অর্পা ফোনের ওপাশ থেকে একগাল হেসে বলে উঠল।
অর্পিতা ফোনটা একটু উঁচিয়ে ধরে হাসল,
“কী রে অর্পা! কেমন আছিস? পড়াশোনা কেমন চলছে?”
“সবকিছু দারুণ চলছে আপু!”
অর্পা খুব আগ্রহ নিয়ে বলতে লাগল।
“অ্যানাটমি আর ফিজিওলজির ক্লাসগুলো যে কী চমৎকার! তনিমা আর আমি তো সারাদিন একসাথে বসে হাড়ের নাম মুখস্থ করি। হোস্টেলে না থেকে এই ফ্ল্যাটটায় উঠে যে কী আরাম হয়েছে, তোমায় কী বলব! রান্নার একটা খালাও পেয়ে গেছি আমরা, উনি এসে সব রান্না করে দিয়ে যান।”
“মেয়ে মানুষ হয়ে এখনো নিজের হাতে দুটা ভাত রাঁধতে পারিস না? সব বিষয়ে শুধু আরাম খোঁজা! আর কত দিন এভাবে চলবে রে? কাল-পরশু তো তোকেও বিয়ে দিতে হবে, শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে কী করবি তখন?”
অর্পা ওপাশ থেকে মুখ ভেংচে হেসে ফেলল,
“আরেহ আপু, আগে তো ডাক্তার হয়ে নিই! তখন রোগীর প্রেসক্রিপশন লিখব নাকি রান্নাঘরে গিয়ে খুন্তি নাড়ব? দুলাভাইকে বলে আমি নিজে একজন শেফ রেখে দেব!”
অর্কো পাশ থেকে একটু হেসে মাথা নাড়ল। কিন্তু কথা বলতে বলতেই হঠাৎ অর্পার নজর গেল স্ক্রিনে ভেসে থাকা অর্পিতার মুখের দিকে। তার মুখের সেই হাসির রেশটা মুহূর্তের মধ্যে মিলিয়ে গেল। সে স্ক্রিনের আরও কাছে নিজের মুখটা নিয়ে এলো।
“কিন্তু আপু... তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন? তোমাকে তো ভীষণ শুকনো আর রোগা লাগছে আপু! গালের হাড় একদম বের হয়ে গেছে। চোখ দুটোও কেমন যেন কোটরে ঢুকে গেছে। তুমি কি ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করছ না? দুলাভাই, তুমি আপুকে কী খাওয়াচ্ছ বলো তো?”
অর্পিতা একটু অপ্রস্তুত হয়ে চাদরটা গায়ের ওপর টেনে নিল।
“ধুর পাগলী! রোগা দেখাবে কেন? একটু অসুস্থ ছিলাম তো, তাই শরীরটা সামান্য শুকিয়েছে। আমি একদম ঠিক আছি। তুই নিজের পড়ালেখার দিকে মন দে, আমাদের নিয়ে চিন্তা করতে হবে না।”
“একদম ফাঁকিবাজি করবা না আপু,” অর্পা কড়া গলায় বলল।
“নিয়মিত দুধ, ডিম আর ফল খাবা। সামনে ফার্স্ট টার্ম পরীক্ষা শেষ হলেই আমি কিন্তু দৌড়ে ঢাকা আসব তোমাকে দেখতে। আমি রাখলাম হ্যাঁ? দুলাভাই, আপুর খেয়াল রেখো!”
অর্পা হাত নেড়ে কলটা কেটে দিল।
ঠিক তখনই ট্রেতে করে ধোঁয়া ওঠা দুটি সিরামিকের কাপে আদা-চা নিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াল প্রাপ্তি।
“স্যার, চা এনেছি,”
প্রাপ্তি খুব পরিপাটি করে ছোট গোল কাঠের টেবিলটার ওপর কাপ দুটো নামিয়ে রাখল।
অর্কো মাথা নেড়ে বলল,
“থ্যাংক ইউ প্রাপ্তি।”
প্রাপ্তি নিঃশব্দে চলে যেতেই বারান্দায় আবার সেই বিকেলের শান্ত নিস্তব্ধতা ফিরে এলো।
পশ্চিমের আকাশে তখন রক্তিম আভা ছড়িয়ে সূর্য ডুবছে। অর্কো চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে দেখল অর্পিতা তখনো একহাতে নিজের কাপটা ধরে আনমনা দৃষ্টিতে আকাশের দিকে চেয়ে আছে।
হঠাৎ অর্পিতা মুখ ফিরিয়ে সোজা অর্কোর চোখের দিকে তাকাল। তার চাহনিতে ছিল এক গভীর, নাছোড়বান্দা আকুলতা।
“আমাকে নিয়ে চলো অর্কো,” অর্পিতা খুব নিচু অথচ দৃঢ় গলায় বলল।
অর্কো চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে কপালে একটু হাত বোলাল। তার ভেতরে এখনো দ্বিধার এক বিশাল পাহাড়।
“অর্পিতা, তুমি বুঝতে পারছ না, তোমার শরীর এখনো পুরোপুরি সারেনি। একটু হাঁটলেই তুমি হাঁপিয়ে ওঠো। এই দুর্বল শরীর নিয়ে ঢাকা থেকে ফরিদপুরের ওই গ্রামে যাওয়া কি ঠিক হবে? কটা দিন যাক, তুমি আরেকটু ফিট হও...”
কিন্তু অর্পিতা কোনো যুক্তি শুনল না। সে অর্কোর হাতটা নিজের দুই হাতের তালুতে তুলে নিয়ে এমন এক মায়াবী দৃষ্টিতে তাকাল, যে দৃষ্টির সামনে অর্কোর সমস্ত প্রতিরোধ এক লহমায় ভেঙে পড়ল। জীবনে অর্পিতার কোনো কথাই অর্কো কোনোদিন ফেলতে পারেনি, আজও পারল না।
অর্কো একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে অর্পিতার গালের ওপর আলতো করে হাত রাখল।
“কবে যাবে বলো?”
অর্পিতা অর্কোর চোখের দিকে চেয়ে একটু মিষ্টি হেসে বলল,
“পরশুদিন যাই চলো? সকালে একটু আগে বের হলে দুপুরের মধ্যেই পৌঁছে যাব।”
অর্কো অর্পিতার মুখের দিকে তাকিয়ে আর কোনো আপত্তি তুলল না। সে মুচকি হেসে সায় দিল,
“আচ্ছা বেশ, পরশুই যাব।”
বারান্দার মৃদু বাতাসে তখন হাসনাহেনার মিষ্টি ঘ্রাণ ভাসছিল। দূরের রাস্তায় টিমটিম করে জ্বলে ওঠা সোডিয়াম লাইটের দিকে তাকিয়ে অর্পিতা খুব নিচু গলায় ফিসফিস করে বলল—
“তোমায় আমি অনেক কষ্ট দিলাম, তাই না অর্কো? এই কটা দিন নিজের অসুস্থ শরীরটা নিয়ে তোমাকে শুধু জ্বালিয়েই মারলাম।”
অর্কো নিজের অন্য হাতটা বাড়িয়ে অর্পিতার মাথায় পরম মায়ায় হাত বুলিয়ে দিল।
“কষ্ট কোথায় পেলে অর্পিতা? এই কটা দিনে আমি বরং আরও অনেক বেশি করে তোমার কাছে আসতে পেরেছি। তোমাকে নিজের হাতে একটু সেবা করতে পেরেছি। সত্যি বলতে, তুমি শুধু আমার পাশে থাকলে আমার কোনো কিছুতেই এক ফোঁটাও কষ্ট লাগে না।”
অর্পিতা কাঁধ থেকে একটু মুখ তুলে বাঁকা চোখে অর্কোর দিকে
“তাই নাকি রাইটার সাহেব! আপনি তো দেখছি ইদানীং বেশ ভালোই ফ্লার্ট করা শিখে গেছেন! অবশ্য শুনতে আমার কিন্তু খারাপ লাগছে না। তা বলি, বিয়ের আগে এইসব রোমান্টিক কথা কোথায় লুকিয়ে রেখেছিলেন শুনি? তখন তো একদম কাঠের পুতুলের মতো গম্ভীর হয়ে থাকতেন!”
অর্কো হাসতে হাসতে বলল,
“মাথা খুলতে আর এসব মিষ্টি কথা বলতে তো ভাই আগে পেট ভরা থাকা লাগে, মন শান্ত থাকা লাগে! বিয়ের আগে তো পেটে ভাত ছিল না, মাথায় ছিল মেসের ভাড়া আর প্রকাশকদের ধমকের চিন্তা। বিয়ের পর তোমার হাতের রান্না খেয়ে খেয়ে পেটও ভরল, আর তোমার ভালোবাসায় মনটাও শান্ত হলো। এখন তো এসব ভেতর থেকে অটোমেটিক বের হবেই!”
অর্পিতা অর্কোর পেটে আলতো করে একটা গুঁতো দিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠল।
“থাক, হয়েছে! আর বানিয়ে বানিয়ে পামপট্টি দিতে হবে না! এসব কথা বাদ দাও তো। চলো ভেতরে যাই, ব্যাগ গোছাতে হবে। আর কাল সকালে একবার একটু মার্কেটে যেতে হবে।”
“মার্কেটে কেন?”
অর্কো একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
“খালি হাতে কি শ্বশুরবাড়ি যাওয়া যায় নাকি? বাবার জন্য একটা ভালো সুতির পাঞ্জাবি নিতে হবে, নতুন মায়ের জন্য একটা সুন্দর তাঁতের শাড়ি নিতে হবে। আর ওই যে মেয়েটা... যে তোমার বিরাট ফ্যান, ওর নাম যেন কী?”
অর্কো হাসিমুখে বলল,
“সামিহা।”
“হ্যাঁ, সামিহা, সামিহার জন্যও তো সুন্দর একটা ড্রেস নিতে হবে। চলো, ভেতরে যাই।”
সন্ধ্যা পেরিয়ে রাতের অন্ধকার তখন উত্তরার বারান্দাটাকে স্নিগ্ধ এক চাদরে ঢেকে দিচ্ছিল। অর্কো চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে অর্পিতার পিছু পিছু ভেতরে পা বাড়াল।
পরশুদিন সকালে মিষ্টি রোদ উঠতে না উঠতেই রওনা দেওয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেল। গাড়ির পেছনের ট্রাংকে ট্রাভেল ব্যাগ, মিষ্টির প্যাকেট আর কেনাকাটা করা কাপড়ের শপিং ব্যাগগুলো গুছিয়ে রাখল অর্কো। বের হওয়ার আগে অর্পিতা ড্রয়িংরুমে দাঁড়িয়ে প্রাপ্তিকে সব বুঝিয়ে বলল—
“প্রাপ্তি, আমরা দুই-তিন দিনের জন্য একটু ঢাকার বাইরে যাচ্ছি। বাসাটা কিন্তু ভালো করে দেখে-শুনে রেখো। কোনো দরকার হলে সাথে সাথে আমাদের ফোন দেবে।”
প্রাপ্তি বিনম্রভাবে মাথা নেড়ে বলল,
“জি ম্যাম, আপনি একদম চিন্তা করবেন না। আমি সব ঠিকঠাক দেখে রাখব। সাবধানে যাবেন আপনারা।”
ফ্ল্যাটের মূল ফটক লক করে লিফটে নেমে তারা গাড়িতে গিয়ে বসল। ড্রাইভিং সিটে অর্কো, আর পাশে হালকা গোলাপি রঙের তাঁতের সুতির শাড়ি পরে বসেছে অর্পিতা। গাড়ি যখন পদ্মা সেতুর মসৃণ সড়কে উঠল, তখন গাড়ির ভেতরের নীরবতা কাটাতে অর্পিতা সাউন্ডবক্সে মৃদু সুরে কিছু পছন্দের পুরোনো বাংলা গান ছেড়ে দিল।
গান বাজছিল ঠিকই, কিন্তু অর্কোর বুকের ভেতর তখন এক তীব্র উৎকণ্ঠার টানাপোড়েন। স্টিয়ারিং ধরে রাখতে গিয়ে তার হাতের তালু বারবার ঘেমে উঠছিল। অর্পিতা অর্কোর এই চাপা অস্থিরতাটা টের পেয়ে মৃদু হাসল।
“এত টেনশন করছ কেন বলো তো? সব সুন্দরভাবেই হবে, তুমি দেখো।”
পদ্মা সেতু পার হয়ে ফরিদপুরের গ্রামের পাকা সড়কে যখন গাড়ি ঢুকল, ঘড়িতে তখন দুপুর পৌনে একটা।
দোতলা নতুন বাড়িটার কালো লোহার গেটের সামনে গাড়ি থামাল অর্কো। ইঞ্জিন বন্ধ করে সে অর্পিতার দিকে তাকাল। অর্পিতার মুখে কিছুটা জার্নির ক্লান্তি থাকলেও চোখে ছিল একরাশ গভীর কৌতূহল আর মায়া। গাড়ি থেকে মিষ্টির প্যাকেট আর শপিং ব্যাগগুলো হাতে নিয়ে অর্কো আর অর্পিতা সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে এলো। দোতলার কাঠের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অর্কো আস্তে করে তিনটি টোকা দিল।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ছিটকিনি খোলার শব্দ হলো এবং দরজা খুলে সামনে এসে দাঁড়ালেন সামিহার মা। দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা অর্কো আর তার পাশে শাড়ি পরা অর্পিতাকে দেখা মাত্রই ভদ্রমহিলার চোখেমুখে যেন এক অপার্থিব আনন্দের চমক খেলে গেল।
অর্পিতা আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। সে খুব বিনীতভাবে নিচু হয়ে ভদ্রমহিলার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করল।
“আসসালামু আলাইকুম মা...”
ভদ্রমহিলা দ্রুত হাত বাড়িয়ে অর্পিতাকে জড়িয়ে ধরে বুকে টেনে নিলেন।
“ওয়ালাইকুম আসসালাম মা... কিন্তু এ কী অবস্থা হয়েছে তোমার? মুখটা এমন শুকিয়ে একদম ফ্যাকাশে হয়ে গেছে কেন! টিভিতে ওই পুরস্কার নেওয়ার দিন তোমাকে দেখেছিলাম কত সুন্দর, ফুটফুটে এক রাজকন্যার মতো চেহারা ছিল তোমার! কী হয়েছে তোমার শরীরটার, বলো তো মা?”
অর্পিতা হেসে বলল,
“তেমন কিছু না মা। ঈদের পর হুট করে একটু কড়া কাশি আর বুকে ইনফেকশন মতো হয়েছিল। আপনি দোয়া করবেন, ঠিক হয়ে যাব।”
ভদ্রমহিলা অর্পিতার মাথায় হাত বুলিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“দোয়া তো সবসময় করি মা। এত দূর থেকে জার্নি করে এসেছ, চলো আগে ভেতরে এসে বসো।”
অর্পিতাকে ধরে তিনি ড্রয়িংরুমের সোফায় এনে বসালেন। অর্কো হাতের ট্রাভেল ব্যাগ আর মিষ্টির প্যাকেটগুলো একপাশে রেখে ঘরের চারপাশটায় একবার চোখ বুলিয়ে নিল।
“সামিহা কোথায় আন্টি?” অর্কো খুব স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করল।
শব্দটা শোনামাত্রই ভদ্রমহিলার মুখের হাসির রেখাটা যেন এক মুহূর্তের জন্য একটু থমকে গেল। তিনি অর্কোর মুখের দিকে তাকিয়ে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন।
“এখনো মা হিসেবে মেনে নিতে পারোনি অর্কো? অবশ্য দোষ তো তোমার নয় বাবা। তোমার নিজের গর্ভধারিণী মায়ের জায়গা তো আমি এই জীবনে কোনোদিন পূরণ করতে পারব না, সেই দাবিও আমার নেই। যাই হোক বাবা... তুমি যা খুশি তা-ই ডেকো আমাকে। তাতে আমার মনে কোনো কষ্ট নেই। আর সামিহা তো কলেজে গেছে, ওর ক্লাস শেষ হওয়ার সময় হয়ে এসেছে, একটু পরই বাড়ি ফিরে আসবে।”
পরিবেশের এই অস্বস্তিকর নিস্তব্ধতা কাটাতে অর্কো একটু গলা খাঁকারি দিয়ে নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল,
“বাবা কই?”
ভদ্রমহিলা নিজের আঁচলটা ঠিক করে করিডোরের শেষ মাথার ঘরের দিকে ইশারা করলেন।
“তোমার বাবা তাঁর নিজের ঘরেই আছেন। সকাল থেকে কতবার যে বারান্দায় গিয়ে রাস্তার দিকে চেয়ে চেয়ে দেখেছেন তোমরা কখন আসবে! যাও বাবা, ওনার ঘরে যাও।”
অর্কো আর দেরি করল না। দরজাটা খোলাই ছিল। অর্কো আলতো করে হাত ধরে অর্পিতাকে নিয়ে ঘরের ভেতর ঢুকল।
দুপুরের মিষ্টি রোদ এসে পড়েছিল মেঝের ওপর। কাঠের একটা চেয়ারে চশমা চোখে দিয়ে বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন জালাল সাহেব। অর্কোদের পায়ের আওয়াজ পেয়েও তিনি এক পলকের জন্যও কাগজ থেকে চোখ সরালেন না।
অর্পিতা খুব ধীরপায়ে এগিয়ে গেল। তারপর অত্যন্ত শ্রদ্ধায় নিচু হয়ে জালাল সাহেবের পায়ের পাতায় হাত দিয়ে সালাম করল।
“আসসালামু আলাইকুম, বাবা...”
জালাল সাহেব খবরের কাগজটা সামান্য একটু নামালেন। চশমার ওপর দিয়ে তিনি একবার শুধু অর্পিতার মুখের দিকে তাকালেন। তাঁর চেহারায় কোনো হাসির রেখা ফুটে উঠল না; সেই চেনা রাশভারী, কঠোর ভাবটা তেমনি অটল রইল।
তিনি শুধু হাতটা সামান্য তুলে একদম গম্ভীর গলায় বললেন—
“বেঁচে থাকো, মা।”
অর্পিতা উঠে দাঁড়িয়ে খুব নরম গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কেমন আছেন বাবা? শরীর ভালো আছে তো আপনার? ঠিকমতো সময়মতো ওষুধ খাচ্ছেন?”
জালাল সাহেব খবরের কাগজের পাতায় আবার দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেন। অত্যন্ত শুষ্ক আর নির্লিপ্ত গলায় উত্তর দিলেন,
“হুম, ভালোই আছি। এই বয়সের শরীর যেমন থাকার কথা, তেমনই আছে।”
ঘরের ভেতরের আবহাওয়াটা কেমন যেন ভারী হয়ে আসছিল। ঠিক তখনই বাইরে করিডোরে দ্রুত পায়ের শব্দ শোনা গেল।
“ভাবি এসেছে? কোথায় ভাবি?”
কলেজের ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে এক লাফে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ল সামিহা। দরজায় অর্পিতাকে দেখামাত্রই তার চোখমুখ আনন্দে ঝলমল করে উঠল।
“আসসালামু আলাইকুম, ভাবি!”
সামিহা এক ছুটে এসে কোনো দ্বিধা ছাড়াই অর্পিতাকে জড়িয়ে ধরল।
“আপনি সত্যিই এসেছেন!”
অর্পিতা হেসে সামিহার পিঠে হাত রাখল।
“ওয়ালাইকুম আসসালাম। অনেক দূর থেকে তোমার গল্প শুনেছি।”
“চলুন ভাবি, আমার রুমে চলুন,”
সামিহা অর্পিতার হাত ধরে টানতে লাগল।
“এত দূর থেকে জার্নি করে এসেছেন, হাত-মুখ ধুয়ে একটু ফ্রেশ হবেন। মা অনেক কিছু রান্না করেছে আজ!”
অর্পিতা সামিহার সাথে পা বাড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যে ঘরের ভেতর আবার এক পিনপতন নীরবতা নেমে এলো। অর্কো একাকী দাঁড়িয়ে রইল সেই খাটের পাশে।
জালাল সাহেব চেয়ারে বসে আগের মতোই একমনে খবরের কাগজ পড়ে যাচ্ছিলেন। যেন ঘরের ভেতরে অর্কো নামের কোনো মানুষের অস্তিত্বই নেই। কাগজের খসখস শব্দ ছাড়া পুরো ঘরে আর কোনো শব্দ ছিল না। অর্কো কোনো কথা বলতে পারল না, শুধু মাথা নিচু করে বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইল। মিনিট দুয়েক এভাবে নিস্তব্ধতায় কেটে যাওয়ার পর, খবরের কাগজের ওপাশ থেকেই জালাল সাহেবের গম্ভীর কণ্ঠটা ভেসে এলো—
“কিছু বলবা?”
অর্কো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলআঙুলগুলো সামান্য কাঁপছিল।গলার কাছে আটকে থাকা কান্নার দলাটা কোনোমতে গিলে সে কাঁপাকাঁপা গলায় বলতে শুরু করল—
“বাবা... আমি সত্যিই খুব লজ্জিত। এই কয় বছরে হয়তো বই লিখে আমি সবার কাছে বড় লেখক হয়েছি, কিন্তু একজন ছেলে হিসেবে আমি পুরোপুরি হেরে গেছি। যে সময়টাতে তোমার অসুস্থ শরীরে পাশে থাকা দরকার ছিল, সে সময় আমি নিজের জেদ নিয়ে দূরে পড়েছিলাম। পারলে আমাকে মাফ করে দিয়ো বাবা।”
খবরের কাগজের পাতাটা এক চুলও নড়ল না। জালাল সাহেব মুখের সামনে কাগজটা তেমনি ধরে রাখলেন। তাঁর চোখ খবরের লাইনেই নিবদ্ধ রইল তিনি শুধু বললেন—
“সমস্যা নেই। তোমার যা করার ছিল তুমি করছ।”
কথাটা বলেই তিনি কাগজের একটা পাতা ওল্টালেন।
অর্কো এক পা এগিয়ে এসে রুদ্ধশ্বাসে বলল,
“বাবা, তুমি কি আমার ওপর এখনো রাগ করে আছ? আমি জানি... আমি যা করেছি, তার জন্য তুমি আমাকে কোনোদিনও মাফ করবে না। আমার সেই অধিকারও নেই।”
এবার জালাল সাহেব এক মুহূর্তের জন্য কাগজ পড়া থামালেন। তবে কাগজটা নামালেন না।
“তোমার ওপর রাগ করলে তো তোমাকে আমি ক্ষমা করবো। রাগ তো মানুষের ওপর সাময়িক হয় অর্কো। তুমি যা পারছ করছ, নিজের দমে সফল হইছ। কারও কাছে হাত পাততে হয় নাই, নিজের পায়ে দাঁড়াইছ এটা ভালো কথা।”
জালাল সাহেব একটু থেমে বললেন,
“কিন্তু একটা কথা মনে রাইখো অর্কো... মানুষের জীবনে যখন হঠাৎ অনেক টাকা আর খ্যাতি আসে, তখন চোখের সামনে এক ধরনের কুয়াশা তৈরি হয়। মানুষ ভাবতে শুরু করে সে বুঝি সব জয় করে ফেলছে। কিন্তু জীবনের আসল পরীক্ষা বইয়ের পাতায় কিংবা হাততালির মাঝে থাকে না। আসল পরীক্ষা শুরু হয় যখন অন্ধকার নামে, যখন নিজের বলতে শুধু চারপাশের রক্ত আর ভালোবাসার মানুষগুলো ছাড়া আর কেউ অবশিষ্ট থাকে না।”
অর্কো একদৃষ্টিতে চেয়ে রইল খবরের কাগজ ধরে রাখা সেই দুটি হাত আর বাবার সাদা চুলগুলোর দিকে। তার ইচ্ছে করছিল এই মুহূর্তেই সব লজ্জা, সব দ্বিধা ছুড়ে ফেলে সামনে গিয়ে বাবার সেই শরীরটাকে দুই হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরবে কিন্তু সে পারল না।
জালাল সাহেব আবার খবরের কাগজের পাতায় চোখ ফিরিয়ে নিলেন। তিনি আগের মতোই নির্বিকার, যেন কোনো কথাই হয়নি। অর্কোর চোখের কোণে জমে ওঠা এক ফোঁটা নোনা পানি টুপ করে মেঝের ওপর খসে পড়ল। মাথা ঝুঁকিয়ে খুব নিচু গলায় বলল—
“আসসালামু আলাইকুম, বাবা।”
কাগজের ওপাশ থেকে কোনো উত্তর এলো না। অর্কো ধীরপায়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে বাবার ঘরের দরজা পেরিয়ে বাইরে করিডোরে বেরিয়ে এলো।
দুপুরের খাওয়ার টেবিলে সামিহার মা নিজের হাতে রেঁধেছিলেন হাঁসের মাংসের ভুনা, রুই মাছের ঝোল আর নতুন চালের পয়েশ। অর্পিতার প্লেটে বারবার খাবার তুলে দিচ্ছিলেন তিনি, অর্পিতাও হাসিমুখে গল্প করছিল সামিহার সাথে।
সন্ধ্যার পর চারপাশ যখন নিঝুম অন্ধকারে ঢেকে গেল, অর্কো একটু পায়চারি করার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে একা একা বেরিয়ে এলো। মেঠোপথের ঠান্ডা বাতাস বুকভরে নিতে নিতে সে বটগাছের সেই মোড়ের দিকে হাঁটা দিল।
কিন্তু মোড়ে পৌঁছে দেখল আমানের চায়ের দোকানের টিনের ঝাপটা অর্ধেক নামানো। ভেতর থেকে টিমটিম করে আলো চুইয়ে পড়ছে আর ভেসে আসছে ফোনে বাজতে থাকা লালনগীতির চড়া সুর।
অর্কো টিনের ঝাপের ওপর আস্তে করে দুইবার টোকা দিল।
ভেতর থেকে গানের আওয়াজ ছাপিয়ে আমানের কর্কশ, চড়া গলার হাঁক ভেসে এলো—
“দোকান বন্ধ! আইজ আর বেচাবিক্রি নাই, কাইলকা আহেন!”
অর্কো একটু হেসে বলল,
“আরে আমান, আমি রে! অর্কো।”
মুহূর্তের মধ্যে গানের আওয়াজ কিছুটা কমে গেল। ভেতর থেকে ছিটকিনি খোলার খটখট শব্দ হয়ে টিনের ঝাপটা পুরো খুলে গেল। সামনে দাঁড়িয়ে আমান।
“আরে তুই!” আমান একগাল চওড়া হাসি দিয়ে একপাশে সরে দাঁড়াল।
“আয় আয়, ভেতরে আয়! ভেতরে বইয়া বয়।”
অর্কো নিচু হয়ে দোকানের ভেতর ঢুকল। টিনের খুপরির ভেতর পুরোনো একটা বেঞ্চ আর কেরোসিনের চুলা। আমান চুলার আগুন একটু উসকে দিয়ে লুঙ্গিটা শক্ত করে বেঁধে বলল,
“চা খাবি? তুই তো এহন বড়লোক মানুষ, বড় শহরের বড় লেখক! কফি খাইবি নাকি ক? আমাগো এই অজপাড়াগাঁয়ে কেউ কফি খায় না হাচা, তয় শহরের দুই-একটা পোলাপান আইসা খোঁজে বইলা মোড়ের বাজার থিকা কিছু ছোট পাতা আইন্না রাখছি। বানাইয়া দিমু নাকি এক মগ?”
অর্কো বেঞ্চে বসে হেসে বলল,
“দে, কফিই দে।”
চুলার নীলচে আলোয় হঠাৎ আমানের মুখের দিকে চোখ পড়তেই অর্কো একটু থমকে গেল। আমানের চোখ দুটো জবাফুলের মতো টকটকে লাল হয়ে আছে, চোখের পাতা ভারী, কথাগুলো কিছুটা জড়িয়ে আসছে।
অর্কো ভ্রু কুঁচকে খুব নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কী রে আমান, তুই আবার ছাই-পাঁশ খেয়েছিস নাকি?”
আমান মুখ ফিরিয়ে এক অদ্ভুত,হাসি দিল।
“আরে থো তো তোর ভালোমানুষি! এই দুনিয়ায় এইডাই তো একমাত্র শান্তি রে অর্কো! বেশি না, হপ্তায় এই দুই-তিন দিন একটু বসি। রাইতে একখান টান না দিলে বুকটা কেমন জানি খালি খালি লাগে, ঘুম আহে না। তুই খাইবি নাকি ক? একখান টান দিয়া দেখবি মনের যতেক দুঃখ-কষ্ট সব এক লহমায় ফুরাইয়া গেছে!”
অর্কো মাথা নেড়ে খুব শক্ত গলায় বলল,
“না, আমি এসব জিনিস খাই না।”
আমান একটা লম্বা শ্বাস ফেলে কেতলি থেকে ফুটন্ত গরম পানি একটা কাঁচের গ্লাসে ঢালল। তারপর কাঁচি দিয়ে ছোট একটা নেসক্যাফের প্যাকেটের মুখ কেটে গুঁড়ো কফিটা ঢেলে দিল পানির ভেতর। চামচ দিয়ে খুব যত্ন করে নেড়ে সে ধোঁয়া ওঠা কালো কফির গ্লাসটা অর্কোর সামনে বাড়িয়ে দিল।
“ল, খা,”
আমান বেঞ্চের অন্যপাশে বসে একটা বিড়ি ধরাল।
“তোর আর আমাগো নসিব কি এক রে অর্কো? তুই বড় মানুষ, তোর জগৎ আলাদা। আর আমরা পইড়া রইছি এই আঁধারের কুয়ায়।”
অর্কো ধোঁয়া ওঠা ব্ল্যাক কফির গ্লাসে একটা ছোট চুমুক দিল। কফির তিতা ঝাঁজটা তার গলার ভেতর দিয়ে নামতেই সে টিনের ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে থাকা বাইরের নিঝুম রাতের অন্ধকারের দিকে চেয়ে রইল।
অর্কো কালো কফির গ্লাসে আরেকটা ছোট চুমুক দিয়ে শান্ত চোখে আমানের দিকে তাকাল।
“কষ্ট করা লাগে রে আমান,”
অর্কো খুব ধীর গলায় বলল।
“ঘরে বসে ভাগ্যের দোষ দিলে তো আর কিছু বদলায় না। এই দুনিয়ায় কষ্ট ছাড়া আসলে কোনো কিছুই পাওয়া যায় না রে ভাই।”
ঠিক তখনই দোকানের টিনের খোলা ঝাপের বাইরে থেকে পাঞ্জাবি আর টুপি পরা কয়েকজন মুসল্লির পায়ের চটি জুতো টানার শব্দ পাওয়া গেল। মসজিদ থেকে এশার নামাজ পড়ে বাড়ি ফিরছিলেন তাঁরা। তাঁদের মধ্য থেকেই লাঠিতে ভর দিয়ে দোকানে ঢুকলেন তারেক চাচা।দোকানের ভেতর আলোয় অর্কোকে দেখেই তারেক চাচার চোখ চকচক করে উঠল। তিনি লাঠিটা একপাশে ঠেকিয়ে সোজা এসে বেঞ্চে অর্কোর একদম গা ঘেঁষে বসলেন।
“আরে আমান! কড়া দেইখা এক কাপ লাল চা বানা তো বাপু,” তারেক চাচা আমানকে হাঁক দিলেন।
তারপর তিনি অর্কোর দিকে ফিরে মুখে এক চওড়া হাসি টেনে বললেন,
“কী অর্কো বাপু? বাপের লগে দেখা-সাক্ষাৎ হইলো? বাপ-ব্যাটার মান-অভিমান ভাঙলো তো? সব ভালা?”
অর্কো একটু মাথা ঝুঁকিয়ে বলল,
“জি কাকা, সব ভালো।”
“হুনলাম তোমারে নাকি সরকার থিকা এক্কেরে প্রধানমন্ত্রীর হাত দিয়া বড় খেতাব দিছে! টিভিতে দেখলাম কত বড় বড় মানুষের লগে তোমার উঠাবসা। তা বাপু, তোমার তো এহন ম্যালা ট্যাকা হইছে! আমাগো এই গ্রামের লাইগা কিছু করো! মোড়ের মাথায় একটা সুন্দর মাদ্রাসা বানাইয়া দেও, মসজিদের লাইগা কিছু অনুদান দেও! বড় মানুষ হইছো যখন, গ্রামের হক আদায় করবা না?”
অর্কো একটু অপ্রস্তুত হয়ে খুব বিনম্র গলায় বলল,
“আমি অতি সামান্য একজন মানুষ কাকা। আপনারা যেমনটা ভাবছেন, অত টাকা-পয়সা আমার হয়নি।”
“হইছে হইছে! ট্যাকাঅলা মানুষ হইলে হগলেই এই এক কতা কয়! আমাগো চোখ ফাঁকি দেওন যাইবো না বাপু। আরেকখান কতা বাপু... হুনলাম ঢাকা থিকা তোমার বউরে নিয়া আইছো? তা বউমারে কইবা একটু পর্দা কইরা চলবার। এইরহম খোলামেলা ঢংয়ে বাড়ির বাইরে ঘুরাফেরা করা কিন্তু আমাগো গেরামে ভালা চোখে দেখে না মাইনষে। দশ জনের কুনজর পড়বো!”
কথাটা শোনামাত্রই অর্কোর বুকের ভেতর যেন এক তীব্র ক্ষোভের আগুন দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। তার ইচ্ছে করছিল মুখের ওপর কড়া জবাব দিতে। কিন্তু ভদ্রতার খাতিরে সে নিজেকে কোনোমতে সংযত করল। অর্কো গ্লাসটা টেবিলে নামিয়ে রেখে উঠে দাঁড়াল।
“চেষ্টা করবো কাকা। আজ আসি আমি।”
কথাটা বলেই অর্কো পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে একটি কড়কড়ে দুইশত টাকার নোট টেনে বের করল। সে নোটটা আমানের কাঠের ক্যাশবক্সের ওপর রাখল। আমান চোখ বড় বড় করে নোটটা ঠেলে ফিরিয়ে দিতে গেল,
“আরে তুই এইডা কী করস অর্কো! বন্ধুর থিকা ট্যাকা নিমু ক্যান রে? ট্যাকা পকেটে ভর!”
অর্কো আমানের হাতটা আলতো করে চেপে ধরে বলল,
“রাখ আমান। কফির বিলও রাখিস, কাকার চায়ের বিলও রাখিস। আর বাকি টাকা ফেরত দেওয়া লাগবে না, তুই রেখে দিস।”
তারেক চাচা হাঁ করে সেই দুইশত টাকার নোটটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
অর্কো আর এক সেকেন্ডও সেই দোকানে দাঁড়াল না। সে টিনের ঝাপ পেরিয়ে রাতের মেঠোপথে নেমে এলো।
রাত তখন ঠিক নয়টা।
রাতের খাওয়া-দাওয়া বেশ আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। অর্পিতা খাওয়ার পরপরই শরীর দুর্বল থাকায় সাইডের রুমে গিয়ে শুয়ে পড়েছে। অর্কো বাড়ির ছাদে উঠে এলো।
দোতলার এই ছাদটা বেশ খোলামেলা। এক কোণে পেতে রাখা একটি পুরোনো কাঠের চৌকি। অর্কো সেই চৌকিতে পা ঝুলিয়ে বসল। গ্রামের রাত তখন একদম নিঝুম। আকাশে হাজারটা তারা ফুটে উঠেছে, দূরের বাঁশঝাড়ের ওপাশ থেকে ভেসে আসছে ঝিঁঝিঁ পোকার একঘেয়ে একটানা ডাক আর নরম ঠান্ডা বাতাস।
ঠিক তখনই ছাদের সিঁড়ির লোহার দরজায় একটা হালকা আওয়াজ হলো।
অর্কো পেছন ফিরে দেখল ধবধবে সাদা লুঙ্গি আর ফতুয়া পরা তার বাবা ছাদে উঠে আসছেন। বাবাকে দেখে অর্কো অপ্রস্তুত হয়ে চৌকি ছেড়ে তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়াতে গেল। কিন্তু জালাল সাহেব এক হাত সামান্য তুলে ইশারা করলেন। মুখে কোনো শব্দ না করে শুধু হাত নেড়ে তাকে বসে থাকতে বললেন।
অর্কো আবার চৌকিতে বসল।
জালাল সাহেব ধীরপায়ে এগিয়ে এসে সেই চৌকির অন্য এক প্রান্তে,হঠাৎ জালাল সাহেব বলে উঠলেন—
“তোমাকে পৈতৃক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করেছিলাম আমি। রাগের মাথায় বাড়ি ছাড়ার সময় ত্যাজ্য করার কথা বলছিলাম। তুমি কিছু মনে করো নাই তো?”
হঠাৎ এমন অপ্রত্যাশিত এক প্রশ্নে অর্কো রীতিমতো স্তম্ভিত হয়ে গেল।
“না, বাবা...” অর্কোর গলার স্বর সামান্য কেঁপে উঠল।
“কখনো কিছু মনে করিনি।”
তিনি একদৃষ্টিতে অন্ধকারের দিকে চেয়ে কথা বলতে লাগলেন—
“মনে করলেও আমার কিছু আসত-যেত না। তবে একটা শিক্ষা জীবনে সবসময় মনে রাখবা বাপ-দাদার রেখে যাওয়া ভিটেমাটি মেপে মেপে যারা বাঁচে, তারা জীবনে কোনোদিন নিজের পায়ের আসল জোরটুকু টের পায় না।”
জালাল আহমেদ একটা দীর্ঘ, ভারী নিঃশ্বাস ফেলে বললেন,
“গ্রামে এসেছ, গ্রামের মানুষের অনেক চোখ, অনেক কথা থাকবে। সবাই তোমার সাকসেস দেখে হিংসা করবে, আজেবাজে কথা বলবে। পুরুষ মানুষের কাজ হলো এইসব ফালতু কথায় কান না দিয়ে নিজের লক্ষ্যে অবিচল থাকা।”
অর্ক বুঝতে পারলো যে হয়ত তারেক চাচা তাঁকে কিছু বলেছেন। অর্ক কন কথা বলল না সুধু বসে সব কথা মন দিয়ে শুনছিল।
জালাল সাহেব নিজের দুর্বল হাঁটুতে হাত দিয়ে ভর করে ধীরে ধীরে চৌকি ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।
ছাদের সিঁড়ির দরজার দিকে পা বাড়ানোর আগে তিনি একবার পেছন ফিরে অর্কোর দিকে তাকিয়ে বললেন,
“রাত হইছে অনেক। এটা ঢাকা শহর না যে সারা রাইত জেগে থাকবা। ঘরে যাও, ঘুমিয়ে পড়ো।”
জালাল সাহেব আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেলেন। অর্কো একাকী বসে রইল সেই অন্ধকার ছাদের চৌকিতে।
এর দুই দিন পর ঢাকায় ফিরে এলো অর্কো আর অর্পিতা।
গ্রামের মুক্ত হাওয়া অর্পিতার মনে যেন দারুণ এক ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। তার মুখের সেই ফ্যাকাশে ভাবটা অনেকটাই কেটে গিয়ে এক সতেজ আভা ফিরে এসেছিল। সে এখন ঘরের ভেতর নিজের মতো স্বাভাবিকভাবে হাঁটাহাঁটি করতে পারছিল। অর্কোও দীর্ঘদিনের বিরতি ভেঙে আবার তার চেনা টেবিলে বসল।
সে তার নতুন উপন্যাসের খসড়া নিয়ে পুরোদমে কাজ শুরু করল। সেই সাথে ওটিটি প্ল্যাটফর্মের নামকরা দুটি প্রডাকশন হাউজের জন্য সাইকোলজিক্যাল ড্রামা ও থ্রিলার জনরার দুটি ওয়েব সিরিজের চিত্রনাট্য লেখার কাজও এগিয়ে নিচ্ছিল সে। ঘরে প্রাপ্তি সবকিছু খুব নিখুঁতভাবে সামলাচ্ছিল, ফলে অর্কোর মাথায় সংসারের কোনো বাড়তি চাপ ছিল না।
এমনই এক শান্ত বিকেলে স্টাডি রুমে বসে যখন অর্কো একটি ক্রাইম সিরিজের ক্লাইম্যাক্স লিখছিল, ঠিক তখনই দরজার কলিংবেল বেজে উঠল। দরজা খুলতেই দেখা গেল নিশি কবির দাঁড়িয়ে আছেন। ঘরে ঢুকেই ড্রয়িংরুমে সোফায় বসা অর্পিতার দিকে নজর যেতেই নিশির চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
“হাই অর্পিতা!” নিশি এগিয়ে এসে অর্পিতার কাঁধে আলতো করে হাত রাখলেন।
“লুকিং সো মাচ বেটার! মুখের এই ফ্রেশ লুকটা দেখে আই অ্যাম সো হ্যাপি!”
অর্পিতা হেসে বলল,
“হ্যাঁ আপু, গ্রাম থেকে একটু ঘুরে এসে শরীরটা বেশ হালকা লাগছে।”
নিশি রান্নাঘরের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাপ্তিকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন,
“প্রাপ্তি, ওনার ওষুধ আর হাইজেনিক ডায়েট ঠিকমতো চলছে তো?”
প্রাপ্তি বিনীতভাবে মাথা নেড়ে বলল,
“জি ম্যাম, একদম রুটিন মেনে সব চলছে।”
“ভেরি গুড,”
নিশি এবার ড্রয়িংরুমের সিঙ্গেল সোফায় বসে অর্কোর দিকে তাকালেন।
“লুক অর্কো, আমার নেক্সট প্রজেক্টের কনসেপ্ট ফাইনাল। এবার আমি সম্পূর্ণ আপসহীন একটা পিওর হরর মুভি বানাতে চাই। কোনো সস্তা জাম্পস্কেয়ার না একদম পিওর সাইকোলজিক্যাল ডার্ক ফোকলোর আর সুপারন্যাচারাল হরর। আপনি কি পারবেন?”
অর্কো একটু হাসল।
“হরর আর ডার্ক সাইকোলজি তো আমার চিরকালের প্রিয়। অবশ্যই পারব।”
“দ্যাটস দ্য স্পিরিট!” নিশি উৎসাহিত হয়ে বললেন।
“তাহলে আর এক মুহূর্তও দেরি না করে আজ থেকেই কাজ শুরু করে দিন।”
অর্কো একটু ইতস্তত করে বলল,
“বাট নিশি... একটা কথা না বলে পারছি না। আমাদের আগের সিনেমা তো বক্স অফিসে একদম এভারেজ গেল। কোনোমতে প্রডাকশন কস্টটা রিকভার করেছে ঠিকই, বাট কমার্শিয়ালি তো কোনো বড় হিট হয়নি। আমাকে দিয়ে আবার এত বড় একটা বিগ বাজেটের প্রজেক্টে রিস্ক নেওয়া কি আপনার ঠিক হবে?”
“আর ইউ সিরিয়াস অর্কো? আপনি তো আপনার পুরো আত্মা ঢেলে দিয়েছিলেন ওই স্ক্রিপ্টে! সমস্যা তো আপনার লেখায় বা আমার মেকিংয়ে ছিল না, সমস্যা ছিল আমাদের দেশের ট্র্যাডিশনাল সাধারণ অডিয়েন্সের টেস্টে। ওরা এখনো সস্তা অ্যাকশন আর মসলাদার বিনোদন ছাড়া গভীর কিছু হজম করতে পারে না। কিন্তু ওটিটি আর ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম সার্কিটে মুভিটার যে হিউজ রেসপন্স আর প্রশংসা এসেছে, দ্যাট ওয়াজ আনবিলিভেবল! সো কোনো ডাউট রাখবেন না। এবার আশা করি আমাদের এই হরর সিনেমা পুরো হল কাঁপিয়ে দেবে।”
নিশি কবির ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। তিনি খুব নিচু গলায় অর্কোর দিকে চেয়ে বললেন—
“তাছাড়া আপনার এই ডার্ক আর ইনটেন্স ব্রেনটার সাথে কাজ করা তো লিটারেলি একটা নেশার মতো অর্কো... এই অ্যাডিকশন কি এত সহজে ছাড়া যায়? চিত্রনাট্য রেডি করুন, খুব জলদি আমরা বসব।”
এইভাবেই দেখতে দেখতে কেটে গেল আরও এক-দেড়টা মাস।
অর্কোর লেখা দুটি সাইকোলজিক্যাল ওয়েব সিরিজ দেশের শীর্ষস্থানীয় ওটিটি প্ল্যাটফর্মে মুক্তি পাওয়ার পর দর্শকমহলে অভাবনীয় সাড়া ফেলল। সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে তার লেখা চরিত্র আর প্লট নিয়ে আলোচনা-বিশ্লেষণের ঝড় বয়ে গেল। দৈনিকের সাহিত্য পাতা থেকে শুরু করে শীর্ষ টেলিভিশন চ্যানেল আর পডকাস্টগুলোতে নিয়মিত ইন্টারভিউ দিতে হচ্ছিল অর্কোকে।
সেই সাথে নিশি কবিরের সেই পিওর হরর সিনেমার চিত্রনাট্যের কাজও দুর্দান্ত গতিতে এগিয়ে চলছিল। অর্পিতা এখন পুরোপুরি সুস্থ। তার গায়ের সেই ফ্যাকাশে ভাবটা কেটে গিয়ে ত্বকে আবার চেনা লাবণ্য ফিরে এসেছে। সে প্রাপ্তির সাথে মিলে রান্নাঘরে টুকটাক কাজ করছে, বারান্দার গাছগুলোর যত্ন নিচ্ছে। জীবনটা যেন আবার এক ছন্দে ফিরতে শুরু করেছিল।
এরই মাঝে অর্কো খেয়াল করল, বিয়ে করে রাশেদের আর কোনো হদিসই পাওয়া যাচ্ছে না! নতুন সংসারে ঢুকে সে যেন একদম হাওয়া হয়ে গেছে।
একদিন বিকেলে অর্কো নিজেই ফোন দিল রাশেদকে।
“কী রে” অর্কো হেসে বলল।
“বিয়ে করলি তো করলি, একেবারে বন্ধুদের ভুলে সংসার নিয়ে ডুব দিলি? তোকে তো আর খুঁজেই পাওয়া যায় না রে!”
ওপাশ থেকে রাশেদ একগাল চওড়া হেসে বলল,
“আরে মামা, তুই তো বুঝবি না! নতুন সংসার, তার ওপর এয়ারপোর্টের কাউন্টারে কাজের এত প্রেশার... মরিয়মরে নিয়ে বাজারে দৌড়াতে দৌড়াতেই দিন পার হয়ে যায়। তুই কেমন আছিস ক? ভাবির শরীর কেমন?”
“অর্পিতা এখন একদম সুস্থ,” অর্কো তৃপ্তির সুরে বলল।
“তোর আর মরিয়মের তো আসার নামগন্ধই নেই। একদিন সময় করে চলে আয় না মিরপুর থেকে।”
“এই তো সামনে চলে আসব ভাবির হাতের রান্না খাইতে!”
রাশেদ হাসতে হাসতে বলল। খানিকক্ষণ হালকা আড্ডা দিয়ে ফোনটা রেখে দিল অর্কো।
রাত তখন সাড়ে আটটা। ড্রয়িংরুমের টিভিতে অর্কো একটি নতুন রহস্য সিনেমা প্লে করল।
সে শোবার ঘরের দিকে তাকিয়ে একটু গলা উঁচিয়ে ডাক দিল,
“অর্পিতা! জলদি আসো, সিনেমা কিন্তু শুরু হয়ে যাচ্ছে!”
“এই তো আসছি!”
এক বাটি আলুর চিপস হাতে নিয়ে হাসিমুখে ড্রয়িংরুমে এসে ঢুকল অর্পিতা।সে এসে সোফায় অর্কোর একদম গা ঘেঁষে বসল। টিভির পর্দায় তখন সিনেমার শুরুর রহস্যময় মিউজিক বাজছে। অর্কো অর্পিতার কাঁধে হাত রেখে বাটি থেকে একটা চিপস তুলে মুখে দিল। অর্পিতাও হাসিমুখে বাটি থেকে দুটো চিপস নিয়ে চিবোতে লাগল।
কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘটল সেই চরম অপ্রত্যাশিত ও ভয়াল কাণ্ড।
হঠাৎ এক টুকরো চিপস গিলতে গিয়ে অর্পিতার গলার ভেতরে কী যেন একটা তীব্র খোঁচা লাগল। মুহূর্তের মধ্যে তার বুক চিরে উঠে এলো এক অদ্ভুত, গভীর ও দমবন্ধ করা কাশি।
“কী হলো অর্পিতা? গলায় আটকেছে?”
অর্কো ঘাবড়ে গিয়ে সোজা হয়ে বসল।
অর্পিতা কাশির বেগ থামাতে দুই হাত দিয়ে শক্ত করে নিজের মুখ চেপে ধরল। তার বুকের খাঁচাটা অস্বাভাবিকভাবে ওঠানামা করছিল। একটানা তিনটি প্রচণ্ড ঝাঁকুনির কাশি দিয়ে সে যখন মুখ থেকে হাত সরাল মুহূর্তের মধ্যে পুরো ঘরের সমস্ত বাতাস যেন বরফের মতো জমে গেল।
অর্পিতার ডান হাতের সাদা তালুর ঠিক মাঝখানে পড়ে রয়েছে এক দলা তাজা, ঘন ও উজ্জ্বল লাল রঙের রক্তের বড় ফোঁটা! টিস্যুর কোনো হালকা ছোপ নয় একেবারে থকথকে, টকটকে তাজা রক্ত!
গলার কোনো সামান্য ছিলে যাওয়া কিংবা সাধারণ কাশির ধাক্কা থেকে এত বড় তাজা রক্তের ফোঁটা বের হতে পারে না। অর্পিতা নিজের রক্তাক্ত হাতের তালুটা শাড়ির আঁচলে আড়াল করার চেষ্টা করে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল,
“কিচ্ছু হয়নি অর্কো... প্লিজ তুমি অস্থির হয়ো না! চিপসের শক্ত কোণাটা হয়তো গলায় খামচি দিয়েছে... শান্ত হও তুমি।”
“না! অনেক হয়েছে, আর না!” অর্কোর গলার স্বর আতঙ্কে আর জেদে ফেটে পড়ল।
সে সোফা থেকে উঠে পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে এক সেকেন্ডের মধ্যে আবার কল দিল রাশেদকে। ওপাশ থেকে রিং হতেই রাশেদ অবাক হয়ে ফোন তুলল,
“কী রে ? আবার কল দিলি?”
অর্কো কোনো ভূমিকা না করে একপ্রকার আর্তনাদ করে উঠল—
“রাশেদ! তুই এয়ারলাইন্সের ট্রাভেল কাউন্টারে আছিস, আমাকে এখনই বল... সিঙ্গাপুরের মেডিকেল ভিসা আর দুটো টিকিট আর্জেন্ট ম্যানেজ করে দিতে পারবি?”
রাশেদ ওপাশ থেকে হকচকিয়ে গেল।
“কী বলিস এইসব! কী হইছে রে অর্কো? মাত্র পনেরো মিনিট আগেই না তোর সাথে কথা বললাম! সব তো ঠিকঠাক ছিল!”
“তুই পারবি নাকি সেটা বল! আমার কোনো কথা শোনার সময় নেই রাশেদ! তুই পারবি?”
অর্কোর এই অস্বাভাবিক, ভেঙে পড়া কণ্ঠস্বর শুনে রাশেদ এক সেকেন্ডে গম্ভীর হয়ে গেল। সে আর কোনো বাড়তি প্রশ্ন না করে সরাসরি কাজের কথায় চলে এলো—
“পারব অন্তত চেষ্টা না করে বসে থাকব না। তুই এখনই আমার অফিসে চলে আয়। আমি সিঙ্গাপুরের হসপিটালের ইন্টারন্যাশনাল পেশেন্ট ডেস্কের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। যদি ওরা মেডিকেল একসেপ্টেন্স বা ইনভিটেশন দ্রুত পাঠাতে পারে, তাহলে অথরাইজড ভিসা চ্যানেল দিয়ে আর্জেন্ট বেসিসে অ্যাপ্লিকেশন পুশ করবো।”
রাশেদ এক নিঃশ্বাসে বলে গেল—
“কিন্তু তোদের অরিজিনাল পাসপোর্ট, রিসেন্ট ছবি আর মেডিকেল পেপারস লাগবে। ডাক্তারের রিপোর্ট, প্রেসক্রিপশন যা আছে সব নিয়ে আয়। আর যদি সম্ভব হয়, অর্পিতার কন্ডিশনের একটা প্রপার মেডিকেল সামারিও নিয়ে আসিস।”
“আমি সব নিয়ে এখনই আসছি।”
অর্কো ফোনটা কেটে দিয়ে সোজা শোবার ঘরের দিকে ছুটল।
আলমারির নিচের ড্রয়ারটা এক ঝটকায় টেনে খুলে সে নিজের আর অর্পিতার পাসপোর্ট, তাদের সাম্প্রতিক পাসপোর্ট সাইজ ছবি, ডাক্তারের সমস্ত পুরোনো প্রেসক্রিপশন, এক্স-রে প্লেট আর প্যাথলজি রিপোর্টের পুরো ফাইলটা একটা ব্যাগে গুছিয়ে নিল।
অর্পিতা ড্রয়িংরুম থেকে ধীরে ধীরে শোবার ঘরের দরজার কাছে এসে দাঁড়াল।
“তুমি শুধু শুধু পাগলামি করছ অর্কো!” অর্পিতা অর্কোর হাতটা চেপে ধরে বলল।
“রাত এখন প্রায় নয়টা বাজে! এই রাতে তুমি কোথায় যাচ্ছ? আমার কিচ্ছু হয়নি অর্কো, বিশ্বাস করো! তুমি একটু শান্ত হও...”
সে আলতো করে অর্পিতার হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে খুব শক্ত গলায় বলল—
“তুমি এর আগেও অসুস্থ হয়েছিলে অর্পিতা। আমি নিজের চোখে সবকিছু নরমাল হতে দেখে ভেবেছিলাম বিপদ কেটে গেছে। কিন্তু আমি আর কোনো রিস্ক নেব না! এক সেকেন্ডের জন্যও কোনো ভুল করবো না। তুমি ঘরে থাকো, আমি রাশেদের অফিসে কাগজপত্র দিয়ে আসছি।”
অর্কো ব্যাগটা হাতে নিয়ে সদর দরজার দিকে পা বাড়াল।
জুতো পরার সময় সে রান্নাঘরের দরজায় এসে দাঁড়ানো প্রাপ্তির দিকে তাকিয়ে খুব সতর্ক গলায় নির্দেশ দিল—
“প্রাপ্তি, আমি একটু জরুরি কাজে বের হচ্ছি। তুমি কোনোভাবেই অর্পিতাকে একা ছাড়বে না। ওর পাশে বসে থাকবে, কোনো সমস্যা হলে সাথে সাথে আমাকে ফোনে জানাবে। আমি দ্রুত ফিরছি।”
প্রাপ্তি ভয়ে ভয়ে মাথা নেড়ে বলল,
“জি স্যার, আপনি যান। আমি ম্যামের পাশেই আছি।”
অর্কো আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। ফ্ল্যাটের দরজাটা টেনে দিয়ে সে ঝড়ের গতিতে সিঁড়ির দিকে নেমে গেল।
মিরপুর দুই নম্বরে রাশেদের ট্রাভেল এজেন্সির অফিসে যখন অর্কো পৌঁছাল, ঘড়িতে তখন রাত পৌনে দশটা।
অফিসের কাঁচের কেবিনে বসে কম্পিউটারের সামনে একা কাজ করছিল রাশেদ। অর্কো ভেতরে ঢুকেই টেবিলের ওপর সমস্ত কাগজপত্রের ফাইলটা নামিয়ে রাখল অর্পিতা আর তার পাসপোর্ট, সাম্প্রতিক ছবি, ডাক্তারের সমস্ত প্রেসক্রিপশন আর এক্স-রে রিপোর্ট।
রাশেদ এক মুহূর্তও নষ্ট করল না। সে স্ক্যানারে সব কাগজপত্র স্ক্যান করে দ্রুত সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালের ইন্টারন্যাশনাল পেশেন্ট সার্ভিসের পোর্টালে পাঠাল এবং ঢাকায় সিঙ্গাপুর ই-ভিসার অথরাইজড এজেন্সির শীর্ষ কর্তাদের সাথে একে একে ফোনে কথা বলতে শুরু করল।
কিন্তু প্রায় এক ঘণ্টা ধরে বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগের পর রাশেদ ফোনটা টেবিলে রেখে কপালে হাত দিয়ে বসে পড়ল। তার চেহারায় স্পষ্ট হতাশার ছাপ।
“কী হলো রে রাশেদ?” অর্কো রুদ্ধশ্বাসে জিজ্ঞেস করল।
রাশেদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“মামা, মাউন্ট এলিজাবেথ থেকে মেডিকেল একসেপ্টেন্স লেটার হয়তো রাতেই নিয়ে নেওয়া যাবে, কিন্তু আসল জটটা লাগছে সিঙ্গাপুর আইসিএ-তে। এজেন্সি আর ডেসপ্যাচ টিম স্পষ্ট বলে দিল, মেডিকেল গ্রাউন্ডে সুপার-আর্জেন্ট অ্যাপ্লিকেশন করলেও তাদের সিস্টেমে এপ্রুভাল আসতে মিনিমাম ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা সময় লাগে। এর আগে কোনোভাবেই ভিসা জেনারেট হওয়া পসিবল না।”
“তিন দিন!” অর্কোর পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল।
“তিন দিন ধরে অর্পিতা এই অবস্থায় রক্ত ফেলবে আর আমি বসে বসে অপেক্ষা করব? কালকের মধ্যেই আমার ফ্লাইট লাগবে রাশেদ!”
অর্কো দিশেহারা হয়ে নিজের পকেট থেকে ফোন বের করল। সে কাঁপাকাঁপা হাতে এক সচিবকে কল দিয়ে পুরো বিষয়টি খুলে বলল।
কিন্তু ওপাশ থেকে ভদ্রলোক অসহায় গলায় বললেন,
“অর্কো ভাই, অন্য কোনো কান্ট্রি হলে আমরা ব্যবস্থা করতে পারতাম। কিন্তু সিঙ্গাপুরের ইমিগ্রেশন সিস্টেম সম্পূর্ণ অটোমেটেড আর অসম্ভব কড়া। তাদের হাইকমিশনের কনসুলার সেকশন সরাসরি হস্তক্ষেপ না করলে ঢাকা থেকে কারও ক্ষমতা নেই ওদের সার্ভার বাইপাস করে রাতারাতি ভিসা বের করার।”
অর্কো ফোনটা কেটে দিয়ে মাথায় দুই হাত দিয়ে বসে রইল। চারপাশটা যেন এক গভীর অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে। ঠিক তখনই তার মস্তিষ্কে এক ঝলক বিদ্যুতের মতো একটি নাম ভেসে উঠল—
ইশরাক আহমেদ! অর্কো আর এক সেকেন্ডও দ্বিধা করল না। রাত তখন সাড়ে এগারোটা পেরিয়ে গেছে। সে কাঁপাকাঁপা আঙুলে ইশরাক আহমেদের নম্বরে ডায়াল করল।
কয়েকটা রিং হতেই ওপাশ থেকে সেই শান্ত, গভীর ও চেনা ভরাট কণ্ঠ ভেসে এলো—
“হ্যালো অর্কো, কেমন আছ? এত রাতে?”
অর্কো আর নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারল না। তার গলা দিয়ে কান্নার মতো ভারী শব্দ বেরিয়ে এলো। সে খুব দ্রুত অর্পিতার কাশির সাথে তাজা রক্ত পড়ার ঘটনা, মাউন্ট এলিজাবেথের প্রস্তুতি এবং সিঙ্গাপুর আইসিএ-র তিন দিনের আটকে থাকা নিয়মের সমস্ত জটিলতা এক নিঃশ্বাসে খুলে বলল। ইশরাক পুরোটা সময় এক মুহূর্তের জন্যও অর্কোর কথা থামালেন না। পুরো ঘটনা শুনে তিনি অত্যন্ত শান্ত অথচ অভয় দেওয়া এক দৃঢ় গলায় বললেন—
“তুমি কোনো টেনশন নিয়ো না অর্কো। একদম শান্ত হও। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কনসুলার উইং আর ঢাকায় নিযুক্ত সিঙ্গাপুরের অনারারি কনসাল জেনারেল উভয়ের সাথেই আমার যোগাযোগ আছে। আমি চেষ্টা করে দেখছি তুমি রাশেদের কাছেই থাকো।”
ফোনটা কেটে গেল।
কেবিনের ভেতর ঘড়ির কাঁটার শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ ছিল না। অর্কো নিস্তব্ধ হয়ে বসে রইল।
মিনিট চল্লিশেক পরের কথা। হঠাৎ রাশেদের কম্পিউটার মনিটরে একটি নোটিফিকেশনের শব্দ হলো এবং সেই সাথে রাশেদের ফোনটা বেজে উঠল।
ফোনের ওপাশ থেকে সিঙ্গাপুর ভিসা প্রসেসিং এজেন্সির প্রধান কর্মকর্তা অবিশ্বাস্য গলায় বললেন—
“ভাই! আপনারা কার রেফারেন্স লাগিয়েছেন জানি না, বাট সিঙ্গাপুর হাইকমিশন থেকে সরাসরি একটি স্পেশাল ডিপ্লোমেটিক ক্লিয়ারেন্স মেমো আমাদের সার্ভারে পুশ করা হয়েছে! পেশেন্ট আর অ্যাটেনডেন্ট দুজনের ই-ভিসাই সিস্টেম অলরেডি স্পেশাল প্রায়োরিটিতে প্রসেস করে ফেলেছে। কাল সকাল দশটার আগেই অফিসিয়ালি ই-ভিসার কপি আপনার ইনবক্সে চলে আসবে!”
রাশেদ চেয়ার ছেড়ে এক লাফে দাঁড়িয়ে পড়ল। সে অর্কোর দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল,
“মামা! কাজ হয়ে গেছে! কাল সকাল দশটাতেই আমাদের হাতে ভিসা চলে আসবে! আমি দুপুরের সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের দুটো টিকিট এখনই লক করছি!”
সে সাথে সাথে ইশরাকে আবার ফোন করল। ফোন রিসিভ হতেই অর্কো রুদ্ধকণ্ঠে বলল,
“স্যার... আপনার এই ঋণ আমি কোনোদিন শোধ করতে পারব না স্যার। ভিসা কাল সকালেই হয়ে যাচ্ছে...”
ইশরাক ওপাশ থেকে মৃদু হাসলেন।
“ধন্যবাদ দেওয়ার কিছু নেই অর্কো, আর তুমি আমাকে আবার স্যার বলছ?” ইশরাক আহমেদ বললেন।
“তুমি আমার ছোট ভাইয়ের মতো। অর্পিতার চিকিৎসা সবচেয়ে জরুরি। কোনো প্রকার দ্বিধা করবে না সিঙ্গাপুরে গিয়ে হাসপাতালের বিল, ওষুধ কিংবা যেকোনো প্রয়োজনে যদি একটা পয়সারও ঘাটতি পড়ে, আমাকে শুধু একটা ফোন দেবে। তুমি শক্ত থাকো, অর্পিতাকে সুস্থ করে দেশে ফিরিয়ে আনো।”
ফোনটা নামিয়ে রেখে অর্কো একটা গভীর, মুক্ত নিঃশ্বাস ফেলল।
পরদিন দুপুরের সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে অর্পিতাকে নিয়ে বিমানে চেপে বসল অর্কো। মেঘের ওপর দিয়ে বিমান যখন শান্ত গতিতে উড়ে চলছিল, জানালার কাঁচের পাশে হেলান দিয়ে বসে ছিল অর্পিতা। বিকেলের নরম আলো এসে পড়েছিল তার মুখের ওপর। সেই চেনা ফ্যাকাশে ভাবটা যেন আবার ফিরে এসেছে, চোখের নিচে কালচে ছায়া।
অর্পিতা একটা লম্বা শ্বাস ফেলে ক্ষোভ আর আদরের মিশেলে অর্কোর দিকে তাকাল।
“শুধু শুধু এতগুলো টাকা নষ্ট করছ অর্কো, আমার কিচ্ছু হয়নি। সামান্য কাশির জন্য এভাবে লাখ লাখ টাকা খরচ করে বিদেশে আসার কোনো মানে হয়? একটু আগে এয়ারপোর্টে বসে অর্পাকে ফোন দিয়েছিলাম, মেয়েটা দিনাজপুরে বসে কান্না করতে করতে শেষ হয়ে যাচ্ছে... তুমি শুধু শুধু সবাইকে বিপদে ফেললে আর অহেতুক আতঙ্কের মধ্যে ফেলে দিলে।”
অর্কো কোনো কথা বলল না। সে শুধু নিঃশব্দে বিমানের পাতলা কম্বলটা টেনে অর্পিতার বুকের ওপর ভালো করে মেলে দিল।
ফ্লাইট শেষে চাঙ্গি এয়ারপোর্টে নেমেই তারা সময় নষ্ট করল না। ট্যাক্সি নিয়ে অর্কো সোজা চলে গেল মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালের ইমার্জেন্সি কেয়ারে।
আন্তর্জাতিক মানের কাঁচঘেরা সুবিশাল সেই হাসপাতালের শীতল বাতাসে পা রাখামাত্রই শুরু হলো এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। ইন্টারন্যাশনাল পেশেন্ট সার্ভিসের তত্ত্বাবধানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের একটি দল তাৎক্ষণিকভাবে অর্পিতার যাবতীয় ভাইটালস, ইমার্জেন্সি ব্লাড প্যানেল আর বেসিক রেসপিরেটরি চেকআপ শুরু করল। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সেইসব জরুরি পরীক্ষার রিপোর্ট আসতেই চিকিৎসকরা কিছুটা ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। অদ্ভুতভাবে, এখানেও প্রাথমিক সমস্ত জরুরি রিপোর্ট একদম নরমাল ! রক্তে কোনো ইনফেকশন নেই, ব্লাড গ্যাস অ্যানালাইসিস পারফেক্ট, এমনকি প্রেশার আর পালসও একদম স্বাভাবিক মানুষের মতো।
যেহেতু কাশির সাথে তাজা রক্ত পড়ার সুনির্দিষ্ট ইতিহাস রয়েছে, তাই সিঙ্গাপুরের চিকিৎসকরা কোনো ঝুঁকি নিতে চাইলেন না। সিনিয়র কনসালট্যান্টরা নির্দেশ দিলেন আরও গভীরে গিয়ে নিখুঁত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোর জন্য। নতুন করে নেওয়া হলো ডিজিটাল হাই-রেজ্যুলেশন চেস্ট এক্স-রে, অটোইমিউন স্ক্রিনিং, আর একের পর এক অ্যাডভান্সড টেস্ট।
অর্কো হাসপাতালের ধবধবে সাদা, ঠান্ডা করিডোরে দাঁড়িয়ে শুধু একদৃষ্টিতে সব দেখে যাচ্ছিল।
কাঁচের পার্টিশনের ওপাশে সে দেখছিল নার্সরা কীভাবে অর্পিতার হাতের শিরা খুঁজে ক্যানুলা পরাচ্ছে, কীভাবে একটার পর একটা টেস্টটিউবে ওর শরীর থেকে লাল রক্ত টেনে নেওয়া হচ্ছে। অর্পিতা ব্যথায় মুখ কুঁচকে তাকাচ্ছিল, কিন্তু অর্কো শুধু বাইরে পাথরের মতো নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
এরপর অর্পিতাকে নিয়ে যাওয়া হলো রেডিওলজি ব্লকের এমআরআই রুমে। অর্কো ভারী দরজার ফাঁক দিয়ে দেখতে পেল একটি সংকীর্ণ, শীতল সাদা শয্যায় শুইয়ে দেওয়া হয়েছে অর্পিতাকে। তার মাথায় বিশেষ হেডফোন পরিয়ে, বিশাল গোলাকার এক ভয়াল যান্ত্রিক সুড়ঙ্গের মতো দেখতে এমআরআই মেশিনের পেটের ভেতর ধীরে ধীরে ঠেলে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে অর্পিতাকে।
এমআরআই ও অন্যান্য জটিল পরীক্ষার প্রায় তিন ঘণ্টা পর অর্কো আর অর্পিতাকে ডেকে নেওয়া হলো হাসপাতালের পাঁচতলার একটি বিশেষ কনসালটেশন রুমে।
ঘরের আবহাওয়া ছিল নিস্তব্ধ, ছিমছাম আর কাঁচঘেরা জানালার ওপাশে দূর সিঙ্গাপুরের সুউচ্চ অট্টালিকাগুলো দেখা যাচ্ছিল। টেবিলের ওপাশে বসে ছিলেন মধ্যবয়সী এক নারী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। বয়স আনুমানিক পঁয়তাল্লিশ থেকে পঞ্চাশের কোঠায়। অ্যাপ্রনের কলারের পাশে চকচকে মেটাল ব্যাজে লেখা—Dr. Charlotte, Senior Consultant, Pulmonary & Cellular Pathology।
টেবিলের ওপর বিছানো ছিল অর্পিতার ব্রেইন ও চেস্ট এমআরআই-এর বিশালাকার ফিল্ম, থ্রি-ডি মাইক্রো-কন্ট্রাস্ট সিটি স্ক্যানের কালার শিট আর বেশ কিছু বায়োমার্কার প্যাথলজি রিপোর্ট।
ডা. শার্লটের কপালে ছিল গভীর চিন্তার স্পষ্ট ভাঁজ। অর্কো আর অর্পিতা এসে সামনের দুটি চেয়ারে বসতেই তিনি চশমাটা টেবিলের ওপর রাখলেন। তাঁর নীলচে চোখে কোনো কৃত্রিম সান্ত্বনা ছিল না; ছিল এক চরম, অপ্রিয় বাস্তবতার শীতল ছায়া।
তিনি এক মুহূর্ত অর্পিতার ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকালেন,
“Mr. Ahmed... Mrs. Ahmed. I’m afraid I don’t have comfortable news for you.”
অর্কোর সে কোনোমতে নিজের শুকনো ঠোঁট ভিজিয়ে বলল—
“Please be direct, Doctor. What is wrong with my wife?”
ডা. শার্লট এমআরআই আর সেলুলার ইমেজিংয়ের প্লেটটা তুলে স্ক্রিনের আলোর সামনে ধরলেন। একটি বিশেষ অংশের দিকে কলমের ডগা দিয়ে ইঙ্গিত করে বললেন—
“We checked the cell tests, detailed scans, and blood tests twice. What Orpita is suffering from is an extremely rare condition something we’ve never seen before. In my twenty-five years of medical research across Europe and Asia, I have never come across a case like this, not even in medical records. As far as modern science knows... she may be what we call Patient Zero.”
অর্ক স্তব্ধ হয়ে ডা. শার্লটের চোখের দিকে চেয়ে রইল।
ডা. শার্লট অত্যন্ত শান্তভাবে ব্যাখ্যা করতে লাগলেন—
“For now, we’re calling it Idiopathic Neuro Alveolar Sclerosis, or INAS. It’s an extremely aggressive and very rare disease that affects the deepest blood vessels and nerve connections in the lungs.”
অর্পিতা নিজের চাদরটা শক্ত করে চেপে ধরে নিঃশব্দে শুনছিল। ডা. শার্লট অর্কোর চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন—
“Now, you need to understand why all her previous tests in Dhaka came back completely normal. This disease doesn’t behave like a normal infection, pneumonia, or tumor. It works silently, at a microscopic level. It slowly weakens the tiny blood vessels around the air sacs in her lungs, while also damaging the nerve signals that control her breathing.”
ডা. শার্লট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে টেবিলের ফাইলে হাত রাখলেন।
“Because the lung tissue looks normal on the surface, regular X-rays and blood tests can’t detect the disease. But underneath, the tiny blood vessels are becoming dangerously weak. A sudden spasm, a deep cough, or even a little physical stress can cause one of these vessels to break. That’s why she suddenly coughed up fresh blood. And that’s only the beginning.”
অর্কোর গলার কাছে শব্দ আটকে আসছিল। সে কাঁপাকাঁপা গলায় টেবিলের ওপর হাত রেখে ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করল—
“Doctor... what does that mean? How do we treat it? Can we perform surgery? Money is not an issue at all. I can bear any expense! Please tell me how to cure her!”
ডা. শার্লট অর্কোর সেই অসহায়, মরিয়া চোখের দিকে তাকিয়ে কয়েক সেকেন্ড নীরব রইলেন।
তিনি খুব ধীরে মাথা নাড়লেন।
“I’m deeply sorry, Mr. Ahmed. But because this disease has never been documented before, there is no proven treatment, no standard medicine, and no known surgery for it. We can’t simply operate on tiny nerve connections spread throughout the lungs.”
ডা. শার্লট অর্কর দিকে তাকিয়ে বললেন,
“I’m sorry, Mr. Ahmed... I really am. But as the disease progresses, her body will slowly struggle to get enough oxygen. She’ll become weaker and more exhausted over time.
And I’m afraid it doesn’t stop there. The damage may eventually start affecting the nerves outside her lungs as well. She could begin to lose muscle strength and coordination. Her movements may become difficult... and over time, she could even become paralyzed.
I wish I had better news for you. I really do. But if the disease reaches its most advanced stage, her lungs may no longer be able to support her breathing on their own. At that point... she could become dependent on life support. I’m truly sorry, Mr. Ahmed. I know this is a lot to take in.”
অর্কো যেন আর নিজের কানে বিশ্বাস করতে পারছিল না। তার চোখের সামনে পুরো পৃথিবীটা এক নিমেষে শূন্য হয়ে গেল। প্যারালাইসিস... লাইফ সাপোর্ট... কোনো চিকিৎসা নেই!
অর্পিতা এক ফোঁটাও কান্না করল না। সে চুপচাপ বসে ছিল।
অর্কো স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল ডা. শার্লটের সেই রিপোর্টের ফাইলের দিকে। অর্কোর দুই চোখ দিয়ে তখন অঝোরে পানি গড়িয়ে পড়ছিল। সে নিজের সিট ছেড়ে একপ্রকার টেবিলের ওপর ঝুঁকে পড়ল,
“Doctor, please... there must be something! Any experimental drug? Any clinical trial in America, Europe, or Switzerland? I can take her anywhere! কোনো উপায়ই কি নেই ডাক্তার? একটা পারসেন্ট আশাও কি নেই?”
ডা. শার্লট নিজের হাত দুটি টেবিলের ওপর রাখলেন। তিনি খুব ধীরে, অত্যন্ত বেদনাহত গলায় মাথা নাড়লেন—
“I am truly sorry, Mr. Ahmed. There really is no way. If there was even a fraction of a percent chance anywhere in the world in Boston, Zurich, or Tokyo I would have personally written a referral for you right now. But the science for this disease simply does not exist yet.”
ডা. শার্লট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অর্কোর ব্যাকুল চোখের দিকে তাকালেন,
“Right now, medical science is completely helpless here. All you can do is pray to God... We are truly, deeply sorry. My only advice to you as a fellow human being is take her home, surround her with love, and enjoy every single day you have together. Make beautiful memories... because I’m afraid she doesn’t have much time left with her.”
শব্দগুলো যেন এক একটা তপ্ত লোহার শেলের মতো অর্কোর কানের পর্দায় এসে ধাক্কা খেল। ঘরের চারপাশের কাঁচের দেওয়াল, উজ্জ্বল সাদা লাইট আর সিঙ্গাপুরের ঝলমলে স্কাইলাইন সবকিছু যেন এক নিমেষে ঘোরানো এক অন্ধকারের অতলে তলিয়ে গেল। সে চেয়ারে বসে দুই হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে নিঃশব্দে কাঁপতে লাগল। কিন্তু পাশে বসে থাকা মানুষটার মধ্যে কোনো কান্নাকাটি ছিল না।
হাসপাতাল থেকে বের হয়ে সামনের রাস্তা ধরে একটু হেঁটে ওরা একটি পার্কের কাঠের বেঞ্চে এসে বসল। সিঙ্গাপুরের সন্ধ্যার বাতাসটা ছিল অদ্ভুত রকমের শান্ত। চারপাশে বড় বড় পাম গাছ আর দূরে আধুনিক আলোর ঝলকানি। অর্কো বেঞ্চে বসে সামনের পিচঢালা রাস্তার দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। ডা. শার্লটের ঘরের ভেতর বুক চাপড়ে কাঁদতে কাঁদতে চোখের সমস্ত জল যেন সে ওখানেই ফেলে এসেছে। এখন তার চোখের পাতা দুটো একদম শুকনো, চোখের কোল ফুলে লাল হয়ে আছে, বুকের ভেতর চলছে এক অসাড়, নিস্তব্ধ হাহাকার।
কিন্তু পাশে বসে থাকা মানুষটার মুখে ছিল একদম বিপরীত দৃশ্য।
অর্পিতা নিজের চাদরটা ঠিক করে অর্কোর দিকে মুখ ফেরাল। তার মুখে ফুটে উঠল হাসি। সে নিজের হাতটা বাড়িয়ে অর্কোর ফোলা গালটা একটু টেনে দিল।
“আরে অর্কো! তুমি একদম বাচ্চাদের মতো কান্না করছ কেন বলো তো?” অর্পিতা খিলখিল করে হেসে উঠল।
“দেখো তো তোমার চোখ দুটো ফুলে কী বাজে অবস্থা হয়েছে! আয় হায়, বিখ্যাত লেখককে তো চেনাই যাচ্ছে না! এই শোনো না... সিঙ্গাপুরে নাকি কত সুন্দর সুন্দর ঘোরার জায়গা আছে! মেরিনা বে, গার্ডেন্স বাই দ্য বে... যাবে নাকি একটু ঘুরে আসি?”
অর্কো যেন নিজের চোখ আর কান কোনোটাকেই বিশ্বাস করতে পারল না,
“তুমি কেন বুঝতে পারছ না অর্পিতা? ডাক্তার ভেতরে বসে কী বলল তুমি নিজের কানে শোনোনি? আমাদের জীবনের সব শেষ হয়ে যাচ্ছে, আর তুমি এখনো হাসিমুখে ঘুরতে যাওয়ার কথা বলছ?”
“তো কী হয়েছে অর্কো?” অর্পিতা খুব সহজ, শান্ত গলায় বলল।
“ডাক্তার তো ওনার বিজ্ঞানের কথা বলেছেন। কিন্তু এই দুনিয়ায় কি কেউ কোনোদিন আজীবন বেঁচে থাকার টিকিট কেটে এসেছে? সবাইকে তো একদিন না একদিন মরতেই হবে অর্কো কেউ একটু আগে চলে যাবে, কেউ হয়তো কিছুদিন পরে যাবে। তাই বলে যে কটা দিন আমরা একসাথে হাত ধরে শ্বাস নিতে পারছি, সেই সময়টুকু কি শুধু কান্না আর আফসোস করে নষ্ট করবো?”
অর্পিতা অর্কোর হাত ধরে একটু টান দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।
“তুমি ওঠো তো! চলো তো আমার সাথে! আমার একটা ঠান্ডা চকোলেট আইসক্রিম খেতে ভীষণ মন চাইছে। চলো তো অর্কো, একটা আইসক্রিম খাই!”
অর্কো বোকার মতো নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল তার অর্পিতার দিকে। সে আর কোনো কথা বলতে পারল না।
অর্পিতার হাত ধরে সে নিঃশব্দে বেঞ্চ ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। পার্কের মোড়ে এক ছোট পার্লার থেকে চকোলেট কোন আইসক্রিমটা কিনে নিয়ে অর্পিতা আবার ফুটপাতের পাশের কাঠের বেঞ্চটায় এসে বসল। আইসক্রিমের কোনটার ওপর গাঢ় ডার্ক চকোলেটের আস্তরণ। অর্পিতা চোখ বন্ধ করে খুব তৃপ্তি নিয়ে এক কামড় দিয়ে আইসক্রিম খেতে লাগল। আর অর্কো একটু দূরে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টিতে শুধু তার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল।
“কী দেখছ তুমি ওভাবে হাঁ করে? আমি কিন্তু আমার এই চকোলেট আইসক্রিমের এক ফোঁটাও তোমাকে ভাগ দেব না! তোমার লাগলে তুমি নিজে দোকানে যাও, টাকা দিয়ে কিনে খাও!”
অর্কোর শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁটের কোণে এক হাসি ফুটে উঠল। সে খুব নিচু গলায় বলল,
“না, আমার আইসক্রিম লাগবে না। তুমিই খাও।”
অর্পিতা টিস্যু দিয়ে ঠোঁটের কোণের চকোলেটের দাগ মুছতে মুছতে বলল,
“সিঙ্গাপুরের মতো এত সুন্দর আর আলোর ঝলমল করা একটা শহরে এসেও কেউ এমন গম্ভীর দেবদাসের মতো দাঁড়িয়ে থাকে? এই শহরের বাতাসটাই তো কেমন সুন্দর আর পরিষ্কার!”
অর্কো এগিয়ে এসে বেঞ্চে অর্পিতার ঠিক পাশে বসল। সে অর্পিতার আইসক্রিম না ধরা খালি হাতটা নিজের দুই হাতের তালুর ভেতর পরম যত্নে তুলে নিল। অর্পিতা শেষ কামড় দিয়ে আইসক্রিমটা শেষ করে তৃপ্তির এক নিঃশ্বাস ফেলল। তারপর অর্কোর কাঁধে নিজের মাথাটা আলতো করে হেলিয়ে দিয়ে সামনের উজ্জ্বল আলোর শহরটার দিকে তাকাল।
“কাল কিন্তু আমরা একদম সকাল সকাল বের হব। আমি গুগল করে সব দেখেছি। ওই যে কাঁচের বিশাল ডোমের ভেতর সুন্দর ফুলের বাগান আছে গার্ডেন্স বাই দ্য বে, ওখানে যাব। আর ওই মেরিনা বে-র সামনে দাঁড়িয়ে তোমার সাথে আমি অনেক, অনেক ছবি তুলব! অনেক দিন হলো তোমার সাথে আমার কোনো ভালো ছবি তোলা হয় না। তোমার ফোনের ক্যামেরা কিন্তু রেডি রেখো, আমি একদম মন ভরে ছবি তুলব কাল।”
অর্কো অর্পিতার মুখের দিকে তাকাল অর্কোর গলার কাছে কান্নার এক বিশাল পাথর চেপে বসেছিল, কিন্তু সে সব কষ্ট গিলে ফেলে খুব শক্ত করে হাসল।
“হ্যাঁ অর্পিতা,” অর্কো হাত বুলিয়ে দিল অর্পিতার চুলে।
“কাল আমরা বের হব। তুমি যত ছবি তুলতে চাও, যত জায়গায় যেতে চাও... আমি তোমাকে নিয়ে যাব।”
পরদিন সকালের ঝলমলে রোদে হোটেল থেকে বের হলো অর্কো আর অর্পিতা। দিনের শুরুতেই তারা গেল মারলায়ন পার্ক আর মেরিনা বে-র খোলা ওয়াটারফ্রন্টে। নীল জলরাশির ওপর তখন সকালের রোদ হিরের দানার মতো চিকচিক করছিল। দূর থেকে দেখা যাচ্ছিল তিন স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সেই সুবিশাল মেরিনা বে স্যান্ডসের আইকনিক কাঠামো। অর্পিতা রেলিংয়ের কাছে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে দিল।
“অর্কো! ফোন বের করো, জলদি আমার একটা সুন্দর ছবি তোলো!”
অর্কো পকেট থেকে ফোন বের করে হাঁটু গেড়ে বসল। ক্যামেরার ফ্রেম ঠিক করে তিন-চারটা ছবি তোলার পর অর্পিতা ছুটে এসে স্ক্রিনে চোখ বোলাল। তারপর মুখ ভেংচে বলে উঠল,
“ধুর অর্কো! এত বড় একজন লেখক, আর একটা ভালো ছবি তুলতে পারো না? দেখো আমার পা কেটে ফেলেছ! আলো কোন দিক থেকে আসছে সেটাও খেয়াল নেই! একটু নিচু হয়ে ফ্রেম করো তো!”
“আচ্ছা বাবা, সরি! এবার একদম পারফেক্ট হবে, যাও দাঁড়াও।”
অর্পিতা আবার গিয়ে দাঁড়াল। অর্কো ক্যামেরার লেন্স দিয়ে দেখল বাতাসে অর্পিতার ওড়না উড়ছে, আর তার মুখে ছড়িয়ে আছে এক হাসি। অর্কো একের পর এক ছবি তুলে যেতে
দুপুরের দিকে তারা গেল গার্ডেন্স বাই দ্য বে-র সুবিশাল কাঁচের ডোমের ভেতরে ফ্লাওয়ার ডোম আর ক্লাউড ফরেস্টে। ভেতরে ঢুকতেই চারপাশের ঠান্ডা, আর্দ্র কুয়াশা তাদের শরীর ছুঁয়ে গেল। শত শত রঙের অর্কিড আর বিশ্বের নানা প্রান্তের হাজারো প্রজাতির বিচিত্র সব ফুল কাঁচের সেই প্রাসাদের ভেতর ফুটে আছে। মাথার ওপর থেকে নেমে আসা বিশালাকার কৃত্রিম ঝরনার শব্দে পুরো জায়গাটা যেন অন্য এক গ্রহের মতো লাগছিল।
অর্পিতা মুগ্ধ হয়ে একটি বিরল বেগুনি অর্কিডের পাপড়িতে আলতো করে আঙুল ছোঁয়াল।
“অর্কো, দেখো...মানুষ কত নিখুঁত করে বিজ্ঞান দিয়ে প্রকৃতি সাজিয়ে রাখতে পারে! ঢাকার গরমে আমাদের বারান্দার হাসনাহেনা গাছটা বাঁচিয়ে রাখতে আমার কত কষ্ট হয়, আর এখানে কাঁচের ভেতর আস্ত একটা রূপকথার জগত বানিয়ে রেখেছে!”
অর্কো বলল,
“এও গুলো ফুলের মধ্যে আসল ফুলতো তুমি”
“ফাজলামি কোরো না তো! সব সময় শুধু আজেবাজে কথা”
বিকেলের দিকে তারা গেল ব্যস্ত শপিং মলগুলোতে। দোকানের পর দোকান ঘুরে অর্পিতা কেনাকাটা করছিল, তবে নিজের জন্য একটা জিনিসও নয়।
“এটা অর্পার জন্য নিই,”
একটা ব্র্যান্ডেড দোকানের কাউন্টারে দাঁড়িয়ে অর্পিতা একটি সুন্দর স্টেথোস্কোপ কেস আর একটি গোলাপি রঙের হাতঘড়ি দেখাল।
“মেয়েটা যখন সাদা অ্যাপ্রন পরে গলায় স্টেথোস্কোপ ঝুলাবে, এই ঘড়িটা হাতে থাকলে কত সুন্দর ডক্টর ডক্টর লাগবে, তাই না অর্কো?”
“হ্যাঁ, একদম নিখুঁত,”
অর্কো হাসিমুখে কার্ড এগিয়ে দিয়ে বিল মিটিয়ে দিল।
শুধু অর্পা নয় সামিহার জন্য কেনা হলো একটা চমৎকার সিল্কের স্কার্ফ আর পারফিউম, বাবার জন্য খাঁটি চামড়ার কমফোর্টেবল জুতো, আর নতুন মায়ের জন্য একটা চমৎকার চাদর। এমনকি রাশেদের জন্য একটি লেদার ওয়ালেট আর মরিয়মের জন্য সুন্দর এক সেট চকচকে কানের দুলও ব্যাগে ভরল অর্পিতা।
শপিং ব্যাগগুলো হাতে নিয়ে যখন তারা এক জুয়েলারি শপের সামনে দিয়ে যাচ্ছিল, অর্কোর নজর আটকে গেল কাঁচের বাক্সের ভেতর রাখা একটি সরু, নিখুঁত রূপালী চেইনের দিকে—যার লকেটে ছোট একটি নীল পাথরের তারা জ্বলজ্বল করছে। অর্কো অর্পিতার হাত ধরে দোকানের ভেতরে নিয়ে গেল।
“অর্কো, ভেতরে যাচ্ছ কেন? আমাদের কেনাকাটা তো শেষ!”
অর্কো কোনো কথা না শুনে সেই তারা দেওয়া লকেটটা কিনে নিল। তারপর অর্পিতার পেছনে গিয়ে, খুব সন্তর্পণে ওর খোঁপা করা চুলের নিচ দিয়ে চেইনটা ওর গলায় পরিয়ে দিল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অর্পিতা নিজের গলার সেই উজ্জ্বল লকেটের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেল।
“এটা কিসের জন্য অর্কো?”
“এই তারাটা সবসময় তোমার সাথে থাকবে। আমার অর্পিতার জন্য।”
সন্ধ্যার পর তারা আবার ফিরে এলো মেরিনা বে-র কাঠের ডেকে।
হাঁটাহাঁটি করে দুজনের পা ক্লান্ত হয়ে এসেছিল। তারা রেলিংয়ের পাশের কাঠের পাটাতনের ওপর পাশাপাশি বসল। সামনে তখন শুরু হয়েছে মেরিনা বে-র বিখ্যাত ওয়াটার অ্যান্ড লাইট শো। বিশাল ফোয়ারার জলের পর্দায় লেজারের আলোয় রঙবেরঙের প্রতিচ্ছবি নাচছে, বেজে উঠছে অর্কেস্ট্রার রাজকীয় সুর।
“অর্কো...”
“হুম?”
“আজকের দিনটা না... আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর একটা দিন,”
পরের দুই-তিনটি দিন যেন এক ঘোরের ভেতর দিয়ে কেটে গেল।
অর্কো আর অর্পিতা ঘুরে বেড়াল সিঙ্গাপুরের নানা প্রান্তে। তারা সেন্টোসা আইল্যান্ডে গেল, ক্যাবল কারে চড়ে নীল সমুদ্রের ওপর দিয়ে ভেসে বেড়াল, শান্ত বিকেলে ক্লার্ক কি-র নদীর পাড়ে বসে বাতাস উপভোগ করল, আর চায়না টাউনের পুরোনো গলির ছোট ছোট অ্যান্টিক শপগুলোতে ঘুরে বেড়াল। অর্পিতার শরীরে ক্লান্তি ছিল, অল্প একটু হাঁটলেই তাকে কোথাও বসে বিশ্রাম নিতে হতো। অর্কো সবসময় তার ব্যাকপ্যাকে ইনহেলার, পানির বোতল আর পালস অক্সিমিটার সাথে নিয়ে ঘুরত। কিন্তু শারীরিক সমস্ত দুর্বলতাকে ছাপিয়ে অর্পিতার চোখেমুখে ছিল এক তৃপ্তি।
তৃতীয় দিন দুপুরে হোটেলের রুমে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল অর্পিতা।অর্কো আলতো করে কম্বলটা অর্পিতার গায়ের ওপর টেনে দিয়ে নিঃশব্দে ব্যালকনির দরজায় এসে দাঁড়াল। ঠিক তখনই পকেটের মোবাইলটা ভাইব্রেট করে উঠল। স্ক্রিনে তাকিয়ে অর্কো দেখল কলটি এসেছে ঢাকা থেকে—ইশরাক আহমেদ।
অর্কো ব্যালকনির কাঁচের দরজাটা সাবধানে টেনে দিয়ে ফোনটা রিসিভ করল।
“আসসালামু আলাইকুম”
“ওয়ালাইকুম আসসালাম অর্কো। কেমন আছ তোমরা? আমি আসলে গত দুই দিন তোমাদের ডিস্টার্ব করতে চাইনি। ডাক্তার কী বললেন? টেস্টের সমস্ত রিপোর্ট কী এলো অর্কো?”
“আসলে...মেডিকেল সায়েন্স আমাদের সব আশা শেষ করে দিয়েছে ভাইয়া।”
ওপাশ থেকে ইশরাক মুহূর্তের মধ্যে সোজা হয়ে বসলেন।
“কী বলছ অর্কো! পরিষ্কার করে বলো, কী হয়েছে?”
অর্কো ব্যালকনির গ্রিল শক্ত করে চেপে ধরে ডা. শার্লটের সমস্ত পরীক্ষার ফলাফল আর নির্মম বাস্তবতার কথা খুলে বলল—
“রোগটার নাম ইডিওপ্যাথিক নিউরো অ্যালভিওলার স্ক্লেরোসিস। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে যার কোনো পূর্ববর্তী রেকর্ড নেই, যে কারণে অর্পিতাকে।পৃথিবীর কোনো দেশেই এর কোনো সার্জারি, থেরাপি বা প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়নি। ধীরে ধীরে তার ফুসফুসের কোষগুলো নষ্ট হবে, স্নায়ু অবশ হয়ে একসময় হয়তো পুরো শরীর প্যারালাইসিস হয়ে যাবে এবং জীবনের শেষ দিনগুলোতে লাইফ সাপোর্টের অক্সিজেন ছাড়া সে আর শ্বাস নিতে পারবে না।“
অর্কো কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“ডাক্তার বলেছেন... ওর হাতে আর খুব বেশি সময় নেই ভাইয়া।”
ফোনের ওপাশে নেমে এলো এক দীর্ঘ, স্তব্ধ ও ভারী নীরবতা। কয়েক মুহূর্ত পর ফোনের ওপাশ থেকে ইশরাক আহমেদের দীর্ঘশ্বাস আর কাঁপাকাঁপা কণ্ঠ ভেসে এলো—
“মাই গড অর্কো... পেশেন্ট জিরো? কোনো চিকিৎসাই নেই? এটা কীভাবে সম্ভব!”
ইশরাক নিজেকে একটু সামলে নিয়ে খুব ভারাক্রান্ত গলায় বললেন,
“আমি বিশ্বাস করতে পারছি না অর্কো। মনটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল শুনে। তবে তুমি ভেঙে পড়ো না। আমি আমার পরিচিত আন্তর্জাতিক কিছু বড় মেডিকেল রিসার্চ সেন্টারে এই কেস হিস্ট্রি নিয়ে কথা বলব, যদি কোথাও কোনো নতুন ট্রায়াল থাকে। আর তুমি... তুমি শক্ত থাকো অর্কো। অর্পিতার সামনে নিজের এক ফোঁটা চোখের জলও ফেলবে না। ও যেন কোনোদিন না বোঝে যে তুমি আশা ছেড়ে দিয়েছ।”
অর্কো একহাতে চোখ মুছে খুব নিচু গলায় বলল,
“ও সব জানে ভাইয়া... ডা. শার্লট যখন কথা বলছিলেন, ও পাশে বসেই সব শুনেছে। কিন্তু ও এক ফোঁটাও কাঁদেনি। ও বরং আমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে, আইসক্রিম খাওয়ার কথা বলে আমাকে হাসানোর চেষ্টা করছে।”
কথাটা শুনে ইশরাক ওপাশে স্তব্ধ হয়ে রইলেন।
“অবিশ্বাস্য এক মেয়ে অর্কো... যত দ্রুত সম্ভব নিরাপদে দেশে ফিরে এসো। ঢাকায় নেমেই আমাকে একটা ফোন দিয়ো। আমি তোমাদের পাশে আছি।”
ফোনটা কেটে গেল।
সিঙ্গাপুরের মাটিতে কাটল আরও দুটো দিন।
সেই দুই দিনে সিঙ্গাপুরের শেষ মুহূর্তের স্মৃতিটুকু জমিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি নিজের ভেতরের এই ভয়াল সত্যটা আর পরিবারের কাছে চেপে রাখতে পারল না অর্কো। সে একে একে ফোন দিল সবাইকে। খবরটা শোনার পর ওপাশ থেকে রাশেদ চিৎকার উঠল। সে বিশ্বাসই করতে পারছিল না এমন একটা প্রাণবন্ত মেয়ের ভেতরে এমন মরণব্যাধি বাসা বেঁধেছে। ফরিদপুরের বাড়িতে জালাল সাহেব ফোনের ওপাশে কয়েক মিনিট একদম পাথর হয়ে স্তব্ধ হয়ে রইলেন। তাঁর ভারী, কাঁপাকাঁপা শ্বাস ছাড়া কোনো শব্দ এলো না; কেবল শেষ মুহূর্তে নিচু গলায় বললেন,
“আল্লাহর ওপর ভরসা রাখো।”
কিন্তু সবচেয়ে বেশি ভেঙে পড়ল দিনাজপুরে থাকা অর্পা।
মেডিকেলের পড়ার টেবিলে বসে ফোনের ওপাশে সে এমন তীব্র কান্নায় ভেঙে পড়ল যে তার শ্বাস আটকে আসছিল। সে বুক চাপড়ে চিৎকার করে বলতে লাগল—
“আমি ডাক্তার হয়ে কী করবো দুলাভাই? এত কষ্ট করে পড়াশোনা করে আমার কী লাভ যদি আমি আমার নিজের আপুকেই বাঁচাতে না পারি! আমি আর এক মুহূর্তও এই দিনাজপুরে থাকব না! আমি সব পড়ালেখা ছেড়ে দিয়ে এখনই ঢাকায় আপুর কাছে চলে আসব!”
অর্কো অনেক কষ্টে অর্পাকে বোঝাল যে অর্পিতার এই কঠিন সময়ে অর্পাকে ভেঙে পড়লে চলবে না, অর্পিতার সামনে তাকে আরও অনেক বেশি শক্ত থাকতে হবে।
অবশেষে সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে অর্পিতাকে নিয়ে ঢাকার ফিরতি ফ্লাইটে উঠল অর্কো। রাত সাড়ে আটটায় বিমান এসে নামল হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। দীর্ঘ জার্নির ধকলে অর্পিতা তখন ভীষণ ক্লান্ত, তার মুখে কালো মাস্ক পরা, গায়ে শাল জড়ানো। সে অর্কোর হাতটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে ধীরপায়ে হাঁটছিল। কিন্তু লাগেজ নিয়ে ভিআইপি অ্যারাইভাল গেট পেরিয়ে বাইরে বের হতেই অর্কোর চোখমুখে একরাশ বিরক্তি আর আতঙ্ক এসে ভর করল।
চ্যানেলগুলোতে ততক্ষণে সিঙ্গাপুরের মেডিকেল কেসের খবর চাউর হয়ে গেছে—
“সিঙ্গাপুর থেকে ফিরছেন অর্কো আহমেদ: স্ত্রীর দুরারোগ্য ব্যাধি নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য!” টার্মিনালের বের হওয়ার মুখে ভিড় করে দাঁড়িয়ে ছিল অন্তত বিশ-পঁচিশজন মিডিয়ার সাংবাদিক, ক্যামেরাম্যান আর মাইক হাতে কিছু ক্ষ্যাপাটে ইউটিউবার। অর্কো আর অর্পিতাকে দেখা মাত্রই ক্যামেরার তীব্র সাদা ফ্ল্যাশলাইট আর ঝলসানো লাইটগুলো একযোগে অর্পিতার মুখের ওপর এসে পড়ল।
“অর্কো স্যার! ম্যামের কী হয়েছে? সিঙ্গাপুরের ডাক্তাররা কি জবাব দিয়ে দিয়েছে?”
“ম্যামের কি বিরল রোগ হয়েছে? কিছু বলুন অর্কো স্যার!”
সাংবাদিকরা গায়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়তে লাগল। অসুস্থ অর্পিতা তীব্র আলোর ঝলকানিতে চোখ চেপে ধরে অর্কোর বুকের ভেতর মুখ লুকাল। ভিড়ের চাপে সে কাঁপতে কাঁপতে কাশতে শুরু করল।অর্ক শুধু ভাবছিল ওরা খবর পেলো কিভাবে?
অর্কো নিজের শরীর দিয়ে অর্পিতাকে আগলে রেখে চিৎকার করে উঠল,
“প্লিজ সাইড দিন! আমার স্ত্রী অসুস্থ, ওর নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে! ক্যামেরা বন্ধ করুন আপনারা!”
কিন্তু সস্তা ভিউয়ের লোভে উন্মত্ত হয়ে ওঠা মিডিয়ার দল কোনো কথাই শুনল না। ঠিক তখনই এক অতি-উৎসাহী সাংবাদিক ভিড় ঠেলে একদম অর্কোর মুখের সামনে ভারী মেটাল বডির মাইক্রোফোনটা প্রায় গুঁজে দিল। মাইক্রোফোনের শক্ত স্পঞ্জটা অর্পিতার শালের কোণায় এসে আঘাত করল। সাংবাদিকটি নির্লজ্জের মতো চিৎকার করে প্রশ্ন করল,
“স্যার! একটা কমেন্ট করুন! সত্যিই কি ম্যামের হাতে আর বেশিদিন সময় নেই?”
সে এক ঝটকায় নিজের ডান হাত বাড়িয়ে সাংবাদিকের হাত থেকে সেই ভারী মাইক্রোফোনটা ছিনিয়ে নিল। তারপর কোনো কিছু না ভেবে মাইক্রোফোনটা দিয়ে সজোরে বাড়ি মারল সাংবাদিকের মুখের ওপর!
মচমচ!
সাংবাদিকের চোখের চশমাটা এক ঝটকায় ভেঙে চুরমার হয়ে নাকে-মুখে ঢুকে গেল। রক্ত ছিটকে পড়ে সাংবাদিকটি চিৎকার করে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। মুহূর্তের মধ্যে পুরো বিমানবন্দর টার্মিনালে এক নারকীয় হট্টগোল আর হইচই পড়ে গেল!
“অর্কো আহমেদ হাত তুলেছে! ক্যামেরা ঘোরাও! ক্যামেরা বন্ধ করবা না!”
সাংবাদিকদের চিৎকারে চারপাশ কেঁপে উঠল।পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতেই এয়ারপোর্ট পুলিশ ব্যাটালিয়নের একদল অফিসার লাঠি উঁচিয়ে দ্রুত দৌড়ে এলো। পুলিশ সদস্যরা চিৎকার করে সাংবাদিকদের ভিড় ঠেলে পেছনে সরিয়ে দিল,
“পিছে হটেন! সবাই সাইড দেন! কেউ সামনে আসবেন না!”
তারা দ্রুত ভিআইপি ড্রাইভওয়ের দিকে নিয়ে গিয়ে অর্কোর আগে থেকে প্রস্তুত থাকা গাড়ির দরজা খুলে দিল। অর্কো অর্পিতাকে সাবধানে পেছনের সিটে তুলে দিয়ে নিজে ভেতরে ঢুকল।
গাড়ির দরজা সশব্দে বন্ধ হতেই ড্রাইভার তীব্র গতিতে এক্সিলারেটরে চাপ দিল।
গাড়ির পেছনের সিটে বসে অর্কোর বুক তখন কামারের হাপরের মতো দ্রুত ওঠানামা করছিল। তার হাত তখনো কাঁপছে।
উত্তরার ফ্ল্যাটে এসে পৌঁছাতেই দরজা খুলে দিল প্রাপ্তি।
ভেতরে ঢুকেই অর্পিতা জুতো খুলে সোজা শোবার ঘরে গিয়ে ধপাস করে বিছানায় শুয়ে পড়ল। দীর্ঘ সফরের ক্লান্তি আর এয়ারপোর্টের সেই অনাকাঙ্ক্ষিত উত্তেজনায় তার শরীর একদম ভেঙে আসছিল।
অর্পিতা চাদরটা গায়ের ওপর টেনে নিয়ে একটু ভ্রু কুঁচকে অর্কোর দিকে তাকাল।
“এয়ারপোর্টে এটা করে কি তুমি ঠিক করলে অর্কো?একদম ঠিক হয়নি কিন্তু! মিডিয়ার মানুষ... ওদের তো স্বভাবই এমন সস্তা কথা বলে উসকানি দেওয়া। তুমি নিজে ওভাবে গায়ে হাত তুলতে গেলে কেন?”
অর্কো খাটের কিনারে বসে একহাতে নিজের কপাল ডলতে লাগল। তার গলার স্বর তখনো একটু থমথমে—
“আর কী করতাম বলো? নিজের চোখের সামনে দেখলাম ওই লোকটা তোমার মুখের ওপর মাইক গুঁজে দিয়ে ওইরকম নোংরা একটা প্রশ্ন করল! ।”
অর্পিতা একটা লম্বা শ্বাস ফেলে ব্যাগ থেকে নিজের ফোনটা বের করল।সে একটু ইনস্টাগ্রাম স্ক্রোল করতেই তার চোখ বড় বড় হয়ে গেল।
পুরো ফিড জুড়ে তখন শাহজালাল এয়ারপোর্টের সেই মারামারির ভিডিও দাবানলের মতো ট্রেন্ডিংয়ে ভাসছে! বিভিন্ন বিনোদন পেজ আর মিমাররা স্লো-মোশনে অর্কোর মাইক কেড়ে নিয়ে বাড়ি মারার ক্লিপ কেটে ব্যাকগ্রাউন্ডে মিউজিক বসিয়ে দিয়েছে। ক্যাপশনে লেখা—
“লেখক যখন কলম ছেড়ে মাইক ধরেন!”
ভিডিওগুলো দেখতে দেখতে অর্পিতা হঠাৎ খিলখিল করে হেসে ফেলল।
“আরে দেখছো কাণ্ড!”
অর্পিতা হাসতে হাসতে বিছানায় গড়াগড়ি খাওয়ার মতো অবস্থা,
“কীভাবে জিনিসটা তুমি এক টানে মারলা! হাহাহা... এই দেখো, পুরো মিম বানিয়ে ভাইরাল করে দিয়েছে! একেকটা কমেন্ট পড়লে হাসতে হাসতে পেট ফেটে যাবে!”
অর্কো অর্পিতার মুখের এই অদম্য হাসির দিকে তাকিয়ে একটু থতমত খেয়ে গেল। এই মেয়েটার মন যে ঠিক কী দিয়ে তৈরি, তা অর্কো আজ এত বছর সংসার করেও পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারে না।
ঠিক তখনই শোবার ঘরের খোলা দরজায় প্রাপ্তি এসে দাঁড়াল।
প্রাপ্তির পেছনে দুজন ডেলিভারিম্যান চাকাওয়ালা স্ট্যান্ডে বসানো বড় একটি নীল রঙের মেডিকেল অক্সিজেন সিলিন্ডার সাবধানে ঠেলে ঘরে নিয়ে এলো। একপাশে রাখা অক্সিজেন মাস্ক আর নেবুলাইজার কিট।
প্রাপ্তি বলল,
“স্যার, আপনি এয়ারপোর্ট থেকে ফোনে বলেছিলেন না? আমি সন্ধ্যার আগেই ধানমন্ডির সেই কেয়ার এজেন্সি থেকে এই অক্সিজেন সিলিন্ডার আর রেগুলেটরের ব্যবস্থা করে রেখেছি।”
ডেলিভারিম্যানরা সিলিন্ডারটা ড্রেসিং টেবিলের পাশে দেয়াল ঘেঁষে সেট করে দিয়ে চলে গেল।
অর্পিতা বিছানায় উঠে বসে সেই প্রকান্ড সিলিন্ডারের দিকে তাকিয়ে চোখ কপালে তুলল।
“আরেহ! এখনই কি তোমরা আমাকে আরও বেশি অসুস্থ বানাতে চাচ্ছ নাকি? আমি তো এখনো অত অসুস্থ হইনি যে ঘরে অক্সিজেন সিলিন্ডার বসিয়ে রেখে পুরো আইসিইউ বানিয়ে ফেলতে হবে!”
“এনে রাখলাম অর্পিতা, চোখের সামনে থাকুক। দরকার না পড়লে তো আলহামদুলিল্লাহ, কিন্তু আপৎকালীন সময়ে হাতের কাছে থাকাটা ভালো। এখন বলো, তুমি কী খাবে? এয়ারপোর্ট থেকে নেমে কিছুই তো মুখে দাওনি।”
অর্পিতা একটু ভেবে ঠোঁট উল্টে বলল,
“আমার না একটু কড়া আদা চা খেতে মন চাইছে। সিঙ্গাপুরে গিয়ে ওইসব মিষ্টি মিষ্টি কফি খেতে খেতে গায়ের স্বাদ নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক মিস করেছি দেশি চা! দাঁড়াও, আমি নিজেই কিচেনে গিয়ে ঝাল ঝাল করে এক কাপ আদা চা বানিয়ে আনি।”
“আরে তুমি বসো, প্রাপ্তি বানিয়ে দিচ্ছে—” অর্কো বলতে গেল।
কিন্তু অর্পিতা কোনো কথা না শুনে বিছানা থেকে পা নামাল। সে খুব স্বাভাবিকভাবেই উঠে দাঁড়াতে গেল। কিন্তু দুই পায়ে মেঝের ওপর ভর দিয়ে সোজা হতেই সে ভারসাম্য হারিয়ে এক ঝটকায় আবার বিছানার ওপর আছড়ে পড়ল।
“ম্যাম!”
দরজার কাছ থেকে প্রাপ্তি এক লাফে ছুটে এসে অর্পিতার হাত ধরে ফেলল।
প্রাপ্তি খুব ব্যস্ত হয়ে বলল,
“ম্যাম, আপনার একদম ওঠার কোনো দরকার নেই! আমি এখনই চমৎকার করে আদা দিয়ে কড়া চা বানিয়ে নিয়ে আসছি, আপনি প্লিজ একদম শান্ত হয়ে রেস্ট নিন!”
প্রাপ্তি অর্পিতার পায়ের ওপর চাদরটা টেনে দিয়ে দ্রুত রান্নাঘরের দিকে ছুটে গেল।
সে নিজের দুই হাঁটুতে হাত বুলিয়ে হেসে বলল—
“দেখেছ অর্কো... কী অবস্থা! একদম বুড়ি হয়ে গেছি! হাহা...”
অর্কোর গলার স্বর শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল সে আর কিছু বলল না।
পরের এক-দেড়টা মাস কেটে গেল এক অবিরাম, নীরব লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে।
এই সময়ের মধ্যে অর্কো তার লেখালেখির জগৎকে সম্পূর্ণভাবে বিদায় জানিয়ে দিল। নিশি কবিরের সেই বিগ বাজেটের হরর সিনেমার চিত্রনাট্য, ওটিটি প্ল্যাটফর্মের নতুন সিরিজের কাজ—সব প্রজেক্ট সে মাঝপথেই বন্ধ করে দিল। প্রডাকশন হাউসগুলো বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও অর্কো স্পষ্ট জানিয়ে দিল, সে আর কোনো স্ক্রিপ্ট লিখবে না। স্টাডি রুমের ল্যাপটপটা বন্ধ হয়ে টেবিলের এক কোণে পড়ে রইল ধুলোবালির ভিড়ে। অর্কোর চব্বিশ ঘণ্টার ধ্যান-জ্ঞান হয়ে উঠল শুধু একটি মানুষ—তার অর্পিতা।
এদিকে রোগটা তার নিজস্ব গতিতে নিঃশব্দে শিকড় ছড়াচ্ছিল। অর্পিতার পায়ের জোর একটু একটু করে কমে আসছিল। সে একেবারে শয্যাশায়ী হয়নি ঠিকই, কিন্তু একা একা নিজের পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়ানোর ভারসাম্যটুকু সে পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছিল। বিছানা থেকে ওয়াশরুম কিংবা ডাইনিং টেবিলে যাওয়ার জন্য কারও না কারও শক্ত হাতের ভরসা ছাড়া তার আর কোনো উপায় ছিল না। অর্কো ছায়ার মতো সবসময় ওকে আগলে রাখত, শক্ত করে ধরে ধরে ঘরের ভেতর অল্প অল্প হাঁটাত।
প্রায় দুই মাস পর, একদিন দুপুরের দিকে সদর দরজায় কলিংবেল বেজে উঠল।
প্রাপ্তি দরজা খুলতেই দেখা গেল কাঁধে বড় ট্রাভেল ব্যাগ ঝুলিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে ঘরে ঢুকল অর্পা। দিনাজপুরে তার মেডিকেলের প্রথম টার্মের পরীক্ষা শেষ হয়েছে আজ সকালেই, আর পরীক্ষা শেষ হওয়া মাত্রই সে সোজা ঢাকার বাসে চেপে বসেছে।
জুতো জোড়া দরজার মুখে ফেলেই অর্পা সোজা ছুটল আপুর শোবার ঘরের দিকে।
কিন্তু ঘরের দরজায় পা রেখেই সে পাথরের মতো থমকে দাঁড়িয়ে গেল।
বিছানার ওপর বালিশে ঠেস দিয়ে বসে আছে তার আপু—দুই মাস আগের সেই উজ্জ্বল মুখটা শুকিয়ে একদম অর্ধেক হয়ে গেছে, গায়ের চামড়ায় এক ফ্যাকাশে নিস্তেজ ভাব। আর ঘরের এক কোণে ড্রেসিং টেবিলের পাশে রাখা সেই প্রকান্ড নীল রঙের মেডিকেল অক্সিজেন সিলিন্ডারটা দেখামাত্রই অর্পার বুকের ভেতর যেন এক নিমেষে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
“আপু!”
অর্পিতা কিছু বলার আগেই অর্পা কাঁধের ব্যাগটা মেঝের ওপর ফেলে দিয়ে এক লাফে বিছানার কাছে ছুটে এলো। সে অর্পিতার কোলের ওপর মুখ গুঁজে এক বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়ল।
“আপু... এ কী অবস্থা করেছ তুমি নিজের? আমি দিনাজপুরে বসে এক ফোঁটাও শান্তি পাচ্ছিলাম না আপু! বইয়ের পাতা খুললেই তোমার এই মুখটা ভেসে উঠত... তুমি এত দুর্বল কেন হয়ে গেলে আপু?”
“কী রে পাগলী! এভাবে কেউ ছোট বাচ্চার মতো কাঁদে নাকি? আমি তো ভালোই আছি রে। একটু দুর্বলতা, এই তো... দেখিস ঠিক হয়ে যাব। তুই এত দূর থেকে জার্নি করে এসেছিস, আগে শান্ত হ।”
অর্পিতা সাইড টেবিলের ওপর রাখা সিঙ্গাপুর থেকে আনা শপিং ব্যাগটার দিকে ইশারা করল।
“এই দেখ, তোর জন্য সিঙ্গাপুর থেকে কী নিয়ে এসেছি,”
অর্পিতা ব্যাগ থেকে সেই চমৎকার থোস্কোপ কেস আর নিখুঁত গোলাপি রঙের হাতঘড়িটা বের করে অর্পার হাতে তুলে দিল।
“তুই যখন বড় ডাক্তার হবি, সাদা অ্যাপ্রনের সাথে এই হাতঘড়িটা পরবি। কত সুন্দর লাগবে তোকে!”
অর্পা ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে নিজের ওড়না দিয়ে চোখ মুছল। অর্পিতা এবার বিছানার চাদরটা সরিয়ে অর্কোর দিকে তাকাল।
“অর্কো... আমাকে একটু ধরো তো। অর্পাকে একটু হেঁটে দেখাই, নইলে মেয়েটা ভাববে আমি একদম অচল হয়ে গেছি!”
“আরে তুমি এখন উঠতে যেয়ো না—” অর্পা আঁতকে উঠে বলল।
কিন্তু অর্কো কোনো কথা না বাড়িয়ে এগিয়ে এলো। সে খুব আলতো করে অর্পিতার কোমরে এক হাত দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল এবং অন্য হাত দিয়ে অর্পিতার হাতটা শক্ত করে নিজের মুঠোয় তুলে নিল।
অর্পিতা মেঝের ওপর পা রাখল।
পায়ে কিছুটা অনুভূতি আর শক্তি এখনো ছিল, তবে নিজের শক্তিতে শরীরের ভারসাম্য ধরে রাখার ক্ষমতাটুকু আর নেই। অর্কোর কাঁধে আর বুকে পুরো শরীরের ভর দিয়ে, খুব ধীরপায়ে সে বিছানা থেকে জানালার দিকে কয়েক পা হেঁটে গেল। জানালার কাছে দাঁড়িয়ে অর্পিতা ঘুরে অর্পার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসল।
“দেখলি তো? আমি কিন্তু এখনো নিজের পায়ে হাঁটতে পারি!”
“আমাদের ফার্স্ট টার্মের পরীক্ষা শেষ,সামনে পুরো এক মাসের টার্ম ব্রেক আছে। এই আগামী এক মাস আমি এই বাসাতেই থাকব আপু। কোনো দিনাজপুরে যাচ্ছি না, কোথাও যাচ্ছি না! সারাদিন আমি তোমার পাশে থাকব, নিজের হাতে তোমাকে ওষুধ খাওয়াব আর ধরে ধরে হাঁটাব দেখি তোমার অসুখ কত বড়!”
অর্পিতার মুখে একরাশ স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল।
এর তিন-চার দিন পরের কথা।
বিকেলের দিকে উত্তরার ফ্ল্যাটে এসে উপস্থিত হলেন নিশি কবির।
তাঁর সেই চেনা চটপটে, গ্ল্যামারাস রূপটা আজ কেমন যেন অনেকটাই ম্লান। চোখে সানগ্লাস নেই, পরনে একটি সাধারণ ছাইরঙা কুর্তি আর মুখে একরাশ গভীর বিষাদ। এয়ারপোর্টের সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা আর সোশ্যাল মিডিয়ার খবরগুলো তিনি আগেই জেনেছিলেন, কিন্তু ড্রয়িংরুমে বসে অর্কোর মুখে যখন ডা. শার্লটের সেই বৃত্তান্ত শুনলেন, নিশি স্তব্ধ হয়ে পাথরের মতো বসে রইলেন।
তিনি শোবার ঘরে গিয়ে অর্পিতার কাছে কিছুক্ষণ বসলেন। বিছানায় আধশোয়া অর্পিতার পায়ের কাছে বসে তখন একমনে বই পড়ছিল অর্পা।
ড্রয়িংরুমে ফিরে এসে নিশি এক গ্লাস পানি খেয়ে একটা লম্বা, ভারী শ্বাস ফেললেন। তারপর অর্কোর দিকে তাকিয়ে খুব দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভরা গলায় বলতে শুরু করলেন—
“লুক অর্কো, আই নো দিস ইজ ডেফিনেটলি নট দ্য রাইট টাইম টু টক অ্যাবাউট ওয়ার্ক। আপনার মনের ওপর দিয়ে কী ঝড় যাচ্ছে, সেটা আমি খুব ভালো করেই ফিল করতে পারছি। বাট একটা কথা না বলে পারছি না...”
নিশি একটু থামলেন। তাঁর গলার স্বর কিছুটা নিচু হয়ে এলো।
“আমাদের সেই হরর মুভির চিত্রনাট্য কিন্তু অলরেডি প্রায় ৮০% শেষ হয়ে গিয়েছিল। প্রডাকশন হাউস আর ইনভেস্টররা পুরো প্রজেক্টটা নিয়ে একদম আটকে আছে। আপনি কি একটু কষ্ট করে... নিজের সুবিধাজনক সময়ে বসে বাকি ২০% স্ক্রিপ্টটা শেষ করে দিতে পারবেন? এই ক্লাইম্যাক্সটুকু আপনি ছাড়া আর কারও পক্ষে লেখা সম্ভব নয়।”
সে না বলতে যাবে, ঠিক তখনই শোবার ঘরের দরজা দিয়ে অর্পিতার কণ্ঠটা ভেসে এলো।
“একটু দেখো না অর্কো...”
অর্কো ঘুরে তাকাল। অর্পিতা বিছানায় উঠে বসে খুব শান্ত দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে আছে।
অর্পিতা খুব নরম গলায় বোঝাতে লাগল,
“নিশি আপু এত বড় একটা প্রজেক্ট নিয়ে ফেঁসে আছেন, আর তো সামান্য একটুখানি কাজ বাকি। তাছাড়া সারাদিন আমার পাশে বসে বসে দুশ্চিন্তা করার চেয়ে দিনে এক-আধ ঘণ্টা টেবিলে বসলে তোমার মনটাও একটু ডাইভার্ট হবে। আমার জন্য তো ঘরে অর্পা আছে, প্রাপ্তি আছে। তুমি কাজটা শেষ করে দাও না অর্কো?”
অর্কো নিশির দিকে ফিরে খুব ধীর গলায় বলল,
“ঠিক আছে নিশি... আমি রাতের বেলা বসে বাকি অংশটুকু শেষ করে দেব।”
নিশি কবিরের মুখে একরাশ স্বস্তি আর কৃতজ্ঞতার ছায়া ফুটে উঠল। তিনি সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। দরজার কাছে গিয়ে তিনি অর্কোর খুব কাছে এলেন। অর্কোর কাঁধে আলতো করে একটা হাত রেখে খুব গভীর ও আন্তরিক গলায় বললেন—
“থ্যাংক ইউ সো মাচ অর্কো। আপনার এই ডেডিকেশনের ঋণ আমি কোনোদিন শোধ করতে পারব না। আর শুনুন... যেকোনো প্রয়োজনে, হাসপাতালে কোনো স্পেশাল এরেঞ্জমেন্ট কিংবা যেকোনো সাপোর্টের দরকার হলে দ্বিধা না করে আমাকে জাস্ট একটা কল দেবেন। আই অ্যাম অলওয়েজ দেয়ার ফর ইউ গাইস, অ্যানিটাইম।”
নিশি অর্পিতা আর অর্পার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে গেলেন।
কয়েক দিনের মাথায় অর্পিতার ফুসফুসের কার্যক্ষমতা আরও কিছুটা নেমে গেল।
এখন আর শুধু বিশ্রাম দিয়ে হচ্ছিল না; ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী দিনে কয়েক ঘণ্টা করে নাকের ভেতর সরু প্লাস্টিকের ন্যাজাল ক্যানুলা দিয়ে সিলিন্ডার থেকে অক্সিজেন দিতে হচ্ছিল। শোবার ঘরে তখন হালকা একটা হিসহিস শব্দ তুলে অক্সিজেন বইছিল।
বিছানায় বালিশে ঠেস দিয়ে বসেছিল অর্পিতা। দুই কানের ওপর দিয়ে ঘুরিয়ে নাকের দুই ছিদ্রে সেট করা সেই স্বচ্ছ প্লাস্টিকের সরু নল। অর্কো এসে খাটের পাশে বসতেই অর্পিতা আয়নায় নিজের মুখের দিকে এক পলক তাকিয়ে একটু চোখ মটকাল।
“দেখো তো অর্কো!”
অর্পিতা নাকের প্লাস্টিকের নলটার দিকে ইঙ্গিত করে হাসিমুখে বলল,
“কী ফানি লাগতেছে আমাকে! মনে হচ্ছে নাকের মধ্যে কে যেন জোর করে দুইটা প্লাস্টিকের কলম গুঁজে রেখে দিয়েছে!”
বিছানার পাশে বসে থাকা অর্পা বোনের এমন রসিকতা শুনে আর হাসি চেপে রাখতে পারল না। সে খিলখিল করে হেসে উঠল,
“আপু! তুমি সত্যি না... এই অবস্থার মধ্যেও তোমার মাথায় এমন আজব কথা আসে!”
ঠিক তখনই ফ্ল্যাটের সদর দরজায় খুব অস্থির ও ঘন ঘন কয়েকটা কলিংবেল বেজে উঠল।
টুং টাং... টুং টাং...
কেউ একজন যেন দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ব্যাকুল হয়ে বেল টিপেই চলেছে।
“কে এলো এই অসময়ে?” অর্পা অবাক হয়ে দরজার দিকে তাকাল।
অর্কো শোবার ঘর থেকে বেরিয়ে ড্রয়িংরুম পেরিয়ে সদর দরজার ছিটকিনি খুলে দিল।
দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছেন বন্ধু প্রকাশন এর বহু পুরোনো কর্মচারী মন্টু মিয়া। রফিক সাহেবের ছায়ার মতো বিশ্বস্ত সহকারী। মন্টু মিয়ার পরনের শার্ট ঘামে ভিজে জবজব করছে, ধুলোবালি মাখা শরীর, বুকটা হাঁপড়ের মতো ওঠানামা করছে আর চোখ দুটো লাল হয়ে একরাশ অশ্রুতে ভেসে যাচ্ছে। অর্কো চমকে উঠে বলল,
“মন্টু ভাই? আপনি! কী হয়েছে? এত হাঁপাচ্ছেন কেন? ভেতরে আসুন...”
মন্টু মিয়া দরজার চৌকাঠটা এক হাতে খামচে ধরে কোনোমতে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। তাঁর মুখ দিয়ে কোনো স্বাভাবিক কথা বের হচ্ছিল না, কান্নায় বুক ফেটে এক বুকভাঙা চিৎকার বেরিয়ে এলো—
“স্যার... ও অর্কো স্যার! রফিক স্যার আর দুনিয়াতে নাই স্যার! রফিক স্যার আমাদের ছাইড়া চইলা গেছেন!”
মুহূর্তের মধ্যে অর্কোর মাথার ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়ল! তার পা দুটো মেঝের ওপর অবশ হয়ে জমে গেল। মন্টু মিয়া দরজায় বসে পড়ে ডুকরে কেঁদে উঠলেন—
“বিকেলে বাংলাবাজার প্রেস থেকে নতুন বইয়ের কাগজ দেখে অফিসে ফেরার পথে গাড়িতেই হঠাৎ ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল স্যার...হাসপাতালে নেওয়ার আগেই ডাক্তাররা কইয়া দিল সব শেষ! রফিক স্যার আর নাই স্যার! আপনি একটু চলেন স্যার!”
অর্কো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। অর্কো আর এক সেকেন্ডও দেরি করল না।
সে অর্পাকে চোখের ইশারায় করিডোরের এক কোণে ডেকে নিয়ে এলো। অর্পার কাঁধে শক্ত করে হাত রেখে খুব নিচু, কাঁপাকাঁপা ফিসফিসানিতে বলল—
“অর্পা, রফিক আঙ্কেল আর নেই। একটু আগে হঠাৎ ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন। আমি ওনার বাসায় যাচ্ছি। কিন্তু খবরদার... এই খবরটা অর্পিতাকে হুট করে ডিরেক্টলি বলে দিয়ো না। ওর হার্ট আর ফুসফুস এমনিতেই খুব দুর্বল, কোনোভাবেই যেন কোনো শক না পায়। ধীরে-সুস্থে বুঝিয়ে বোলো... আমি যত দ্রুত পারি দেখে চলে আসছি।”
সে পরিস্থিতি বুঝে দ্রুত মাথা নেড়ে বলল,
“তুমি যাও দুলাভাই। আমি আপুকে সাবধানে দেখছি, তুমি কোনো চিন্তা কোরো না।”
অর্কো আর কালবিলম্ব না করে মন্টু মিয়াকে সাথে নিয়ে নিচে নেমে নিজের গাড়িতে উঠল।
রাতের ফাঁকা রাস্তা দিয়ে তীব্র গতিতে গাড়ি ছুটল শান্তিনগরের দিকে। পুরো পথটাতে গাড়ির ভেতর শুধু মন্টু মিয়ার বুকফাটা কান্নার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। মন্টু মিয়া বিলাপ করতে করতে বলছিলেন, কেমন করে গাড়ির সিটে বসে বুকে হাত চেপে শেষ নিঃশ্বাসটা ফেলেছিলেন এই প্রবীণ মানুষটি।
শান্তিনগরের পুরোনো আবাসিক গলির ভেতর সেই তিনতলা বাড়িটার সামনে পৌঁছাতেই দেখা গেল বাইরে পাড়া-প্রতিবেশী, বাংলাবাজারের কয়েকজন পুরোনো প্রকাশক আর প্রেসের কর্মচারীদের ভিড়। সবার মুখেই এক স্তব্ধ শোকের ছায়া।
অর্কো ভারী পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচতলার ড্রয়িংরুমে ঢুকল।
ঘরের সমস্ত সোফা আর আসবাবপত্র দেওয়ালের দিকে সরিয়ে রাখা হয়েছে। মেঝের একদম মাঝখানে পাতা রয়েছে একটি কাঠের খাটিয়া। আর সেই খাটিয়ার ওপর সাদা চাদরে ঢেকে শোয়ানো রয়েছে রফিক সাহেবের নিথর মরদেহ। পাশে টিমটিম করে জ্বলছে আগরবাতি, বাতাসে গোলাপজলের হালকা সুবাস। মানুষটার সেই চিরচেনা হাসিভরা রাশভারী মুখটা এখন চিরতরে নিস্তব্ধ, চোখ দুটো চিরদিনের জন্য বন্ধ। ভেতরের শোবার ঘরগুলো থেকে ভেসে আসছিল রফিক সাহেবের স্ত্রী ও বাড়ির মহিলাদের একটানা বুকভাঙা আহাজারি আর কান্নার আওয়াজ। সেই কান্নার প্রতিটা সুর পুরো ঘরটার বাতাসকে ভারী করে তুলেছিল।
খাটিয়ার ঠিক কাছে মেঝের ওপর হাঁটু মুড়ে স্তব্ধ হয়ে বসে ছিল সাতাশ-আঠাশ বছর বয়সী এক যুবক। রফিক সাহেবের বড় ছেলে ফয়সাল। পরনে তার সাধারণ একটা চেক শার্ট আর ট্রাউজার, চুলগুলো এলোমেলো, চোখ দুটো কেঁদে কেঁদে টকটকে লাল হয়ে আছে। এর আগে সামনাসামনি কোনোদিন তাদের দেখা হয়নি; রফিক সাহেবের মুখেই শুধু অর্কো শুনেছিল তাঁর বড় ছেলে একটি কোম্পানিতে চাকরি করে।
অর্কো ধীরপায়ে এগিয়ে গেল সেই খাটিয়ার পাশে।
সে নিঃশব্দে গিয়ে বসল ফয়সালের পাশে, মেঝের এক কোণায়।
পাশে একজন মানুষের উপস্থিতি টের পেয়ে ফয়সাল মুখ তুলে তাকাল। অর্কো কোনো কথা বলতে পারল না। সে শুধু তার একটি হাত বাড়িয়ে খুব শক্ত করে ফয়সালের কাঁধের ওপর চেপে ধরল। ফয়সাল অর্কোর হাতটা নিজের দুই হাতের তালুতে শক্ত করে চেপে ধরে ভেজা গলায় বলে উঠল—
“স্যার, আপনি আসছেন? বাবা গতকাল রাতেও খাবার টেবিলে বসে শুধু আপনার কথাই বলছিলেন...আর আজ... আজ তিনি হুট করে আমাদের এভাবে একা ফেলে চলে গেলেন স্যার!”
অর্কো ফয়সালের দিকে তাকিয়ে দেখল, ছেলেটা কাঁদতে কাঁদতে একদম হাঁপিয়ে উঠেছে। দীর্ঘ সময় ধরে বুক চাপড়ে কান্নার কারণে তার বুকটা বারবার বিষম খাওয়ার মতো কেঁপে উঠছিল, চোখের পাতা ফুলে রক্তাভ হয়ে গেছে।
ফয়সাল কোনোমতে এক ঢোক গিলে কাঁপাকাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল,
“আপনার স্ত্রী কেমন আছেন স্যার? ভাবির শরীর কি আগের চেয়ে একটু ভালো?”
এমন চরম শোকের মুহূর্তেও এই ছেলেটি যে তার বাবার কাছে শোনা গল্পের সূত্র ধরে অর্পিতার খোঁজ নিচ্ছে, তা দেখে অর্কোর বুকের ভেতরটা এক গভীর বেদনায় ভারী হয়ে উঠল।
ফয়সাল চোখ মুছে একটা ভাঙা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে লাগল—
“স্যার, আমি একটা প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে ছোটখাটো চাকরি করি। বাবা আমাকে আর আমার দুই বোনকে এই দুনিয়ায় ফেলে চলে গেলেন স্যার... আমার বড় বোনের বিয়ে হয়ে গেছে, ও শ্বশুরবাড়িতে থাকে। কিন্তু আমার ছোট বোনটা... ও তো মাত্র কিছুদিন আগে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করল। ওর পুরো ভবিষ্যৎটা এখনো সামনে পড়ে আছে। প্রকাশনীর এত বড় দায়ভার, সংসারের এত দায়িত্ব... ওর কী হবে স্যার, সংসারটা কীভাবে চলবে আমি কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না!”
অর্কো মেঝের ওপর একটু সোজা হয়ে বসল।
“শোনো ফয়সাল,ভেঙে পড়লে কিন্তু চলবে না। আল্লাহ আছেন, তিনি কোনো বান্দাকে অভিভাবকহীন করে রাখেন না। বাবা দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন ঠিকই, কিন্তু ওনার সম্মান, ওনার আত্মমর্যাদা আর ওনার পুরো রক্তটুকু তোমার ধমনীতে রেখে গেছেন।”
অর্কো ফয়সালের চোখের দিকে তাকিয়ে খুব দৃঢ় গলায় বোঝাতে লাগল—
“তুমি এই পরিবারের বড় ছেলে ফয়সাল। বাবার জায়গায় এখন তোমাকেই শক্ত হয়ে দাঁড়াতে হবে। তুমি যদি এভাবে ভেঙে পড়ো, তাহলে ভেতরে বসে থাকা তোমার মা আর তোমার ছোট বোনটা কার ওপর ভরসা করে বাঁচবে বলো? পুরুষ মানুষের জীবনে এমন কিছু কঠিন সময় আসে যখন চোখের জল ভেতরে চেপে পাথর হয়ে যেতে হয়। তুমি কোনো ভয় পাবে না। বন্ধু প্রকাশন রফিক আঙ্কেলের স্মৃতি, এই প্রতিষ্ঠান বন্ধ হবে না। আর তোমার পরিবারের যেকোনো প্রয়োজনে, যেকোনো বিপদে আমি তোমার বড় ভাইয়ের মতো পাশে আছি। তুমি শক্ত থাকো ফয়সাল, তোমাকে ঘুরে দাঁড়াতেই হবে।”
ফয়সাল চোখ মুছে ধরা মাথা নাড়ল। খাটিয়ায় শোয়ানো রফিক সাহেবের শান্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে অর্কো মনে মনে অনুভব করল বটবৃক্ষ হয়তো ঝড়ে ভেঙে পড়েছে, কিন্তু তার রেখে যাওয়া শিকড় আর ভালোবাসার দায়টুকু আজ তাকে নিজের কাঁধে তুলে নিতেই হবে।
ড্রয়িংরুমের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা পাড়ার এক প্রবীণ মুরুব্বি হঠাৎ গলা উঁচিয়ে ডাক দিলেন—
“বাবারা, জানাযার সময় হয়ে আসছে। মসজিদ প্রাঙ্গণে সবাই অপেক্ষা করছে... মুর্দারকে এবার কাঁধে তোলেন।”
মুহূর্তের মধ্যে পুরো ঘরে এক শোকাতুর ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেল। অর্কো আর এক সেকেন্ডও পেছনে দাঁড়িয়ে রইল না। সে এগিয়ে গিয়ে খাটিয়ার সামনের ডান দিকের কাঠের হাতলটায় নিজের শক্ত কাঁধ পেতে দিল। উল্টো পাশে দাঁড়াল ফয়সাল। পাড়ার আরও দুজন তরুণ পেছনের দিকটা ধরে একযোগে খাটিয়া তুলে নিল।
“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ...”
ধীর গুঞ্জনে কলেমা পড়তে পড়তে মানুষগুলোর সাথে পা মেলাল অর্কো। কাঁধের ওপর কাঠের সেই ভারটুকু যেন শুধুই এক মৃতদেহের ওজন ছিল না; ছিল তার গোটা সাহিত্যজীবনের সবচেয়ে বড় ঋণের নিঃশব্দ প্রতীক। গলির রাস্তা পেরিয়ে খাটিয়া নিয়ে যাওয়া হলো শান্তিনগর জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে।
মসজিদের সামনের চত্বরে শত শত মুসল্লির দীর্ঘ কাতার তৈরি হলো। ফয়সালের ঠিক পাশেই কাতারে দাঁড়াল অর্কো। চার তাকবিরে সম্পন্ন হলো রফিক সাহেবের জানাযার নামাজ। হাত তুলে মুনাজাতে অংশ নেওয়ার সময় অর্কোর চোখ দিয়ে অঝোরে জল ঝরছিল।
জানাযা শেষে খাটিয়া যখন আজিমপুর কবরস্থানের গাড়িতে তোলার প্রস্তুতি চলছিল, অর্কো একবার ফিরে এলো রফিক সাহেবের সেই শোকার্ত বাড়ির ভেতরে।
ভেতরের ঘরের মেঝেতে সাদা চাদরের ওপর বসে বিলাপ করছিলেন রফিক সাহেবের স্ত্রী। পাশে বসে আছে তাঁর দুই মেয়ে বড় মেয়ে অপরাজিতা আর ছোট মেয়ে ওহনা। আর ড্রয়িংরুমের দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন অপরাজিতার স্বামী সাফনিন। অর্কো ভেতরে গিয়ে খুব বিনীতভাবে রফিক সাহেবের স্ত্রীর সামনে মেঝের ওপর বসল।
ভদ্রমহিলা মুখ তুলে অর্কোকে দেখেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। তিনি অর্কোর মাথায় হাত রেখে ধরা গলায় বললেন—
“বাবা অর্কো... তোমার আঙ্কেল তোমাকে খুব ভালোবাসত। নিজের ছেলের মতোই ভাবত। তোমার বইটা ছাপানোর জন্য নিজের জমিটা পর্যন্ত বন্ধক রেখেছিল। আমি রাগ করেছিলাম... কিন্তু উনি বলেছিল, ‘অর্কোর জন্য এটা করতে পারলে আমার কোনো আফসোস নেই।”
অর্কোর গলার ভেতরটা ভারী হয়ে উঠল,
“আন্টি, আঙ্কেল শুধু আমার প্রকাশক ছিলেন না, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় বটবৃক্ষ ছিলেন। আপনারা কোনোদিন নিজেদের একা ভাববেন না। এই সংসারের যেকোনো প্রয়োজনে আমি ফয়সালের মতো আপনাদের আরেক সন্তান হিসেবে পাশে আছি।”
অপরাজিতা চোখ মুছতে মুছতে পাশে এসে খুব নিচু গলায় বলল,
“বাবা সবসময় আপনার লেখার প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকতেন ভাইয়া। বাবাকে এভাবে এত অসময়ে হারিয়ে ফেলব, আমরা কেউই কোনোদিন ভাবিনি।”
ওহনা মায়ের চাদরের কোণ ধরে কেঁদে কেঁদে বলে উঠল—
“ভাইয়া... আব্বু তো শুধু আমার গ্র্যাজুয়েশনটাই দেখে গেল! আব্বুকে নিয়ে আমার কত স্বপ্ন ছিল... চাকরি পেয়ে আব্বুকে প্রথম বেতন দিয়ে পাঞ্জাবি কিনে দেব... আমার কোনো সাফল্যই তো আর আব্বু দেখে যেতে পারল না ভাইয়া!”
ওহনার বুকফাটা কান্নায় ঘরের বাতাস ভারী হয়ে এলো।
“আঙ্কেল যেখানেই থাকুন না কেন, তিনি সবসময় তোমার দিকে তাকিয়ে থাকবেন। বাবার অপূর্ণ সব স্বপ্ন তোমাকেই পূরণ করতে হবে। কোনো ভয় পাবে না।”
পরিবারের প্রতিটি মানুষের কাছ থেকে একরাশ বুকভাঙা বেদনা নিয়ে বিদায় নিল অর্কো।
রাত তখন বারোটা পার হয়ে গেছে। আজিমপুর পুরোনো গোরস্তানের আলো-আঁধারির মাঝে তখন এক থমথমে নীরবতা। হালকা কাদা আর ভেজা মাটির ঘ্রাণ ছড়িয়ে আছে চারপাশের বাতাসে।
খোড়া কবরের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল রফিক সাহেবের পরিবারের ঘনিষ্ঠ মানুষজন। সবার সাথে এক কাতারে দাঁড়িয়ে ছিল অর্কো, ফয়সাল আর বড় মেয়ের জামাই সাফনিন।
সবার সাথে হাত মিলিয়ে এক মুঠো এক মুঠো করে মাটি কবরে ঢেলে দিল অর্কো।
“মিনহা খালাকনাকুম ওয়া ফিহা নুঈদুকুম...”
বাঁশের চ্যাটাই আর কাঁচা মাটির নিচে চিরতরে হারিয়ে গেলেন বন্ধু প্রকাশনের সেই হাসিমুখের বটবৃক্ষ। শেষ মুনাজাত শেষে কবরস্থানের ভিড় যখন ধীরে ধীরে পাতলা হয়ে এলো, তখন কবরের লাগানো ছোট গাছের গুঁড়ির পাশে ফয়সালের কাঁধে আলতো করে হাত রাখল অর্কো। ফয়সালের দুহাতে তখনো লেগে আছে বাবার কবরের তাজা ভেজা মাটি।
“শক্ত থাকো ফয়সাল,বাবার এত বড় প্রকাশনীর ঐতিহ্য আর দায়ভার... এই পুরো দায়িত্বটা কিন্তু এখন তোমার ওপর।”
ফয়সাল শার্টের হাতা দিয়ে চোখের পানি মুছে একটা লম্বা, ভাঙা দীর্ঘশ্বাস ফেলল,
“স্যার, আমি তো প্রাইভেট একটা প্রতিষ্ঠানে ফুল-টাইম জব করি। সত্যি বলতে, আমার পক্ষে একার হাতে এত বড় প্রকাশনী সামলানো হয়তো পুরোপুরি সম্ভব হবে না। কিন্তু বাবার এই সারাজীবনের স্বপ্ন আমি কোনোভাবেই ধুলোয় মিশে যেতে দেব না। আমি দেখে নেব কী করা যায়... মন্টু আর বাবার পুরোনো লোকজনকে নিয়ে কিছু একটা ব্যবস্থা আমি ঠিকই করে ফেলব।”
সে খুব স্নেহে ফয়সালের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলল—
“আর শোনো ফয়সাল... আমাকে আর কোনোদিন স্যার বলবে না। ভাই বলে ডাকবে। তোমার বাবার কাছে আমি ওনার নিজের ছেলের মতোই ছিলাম। সো তুমি আর আমি তো ভাই-ই। কোনো দ্বিধা রাখবে না।”
ফয়সালের চোখ দুটো আবার ভিজে এলো। সে মাথা ঝুঁকিয়ে ধরা গলায় বলল,
“জি, অর্কো ভাই।”
অর্কো এবার ঘুরে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সাফনিনের দিকে তাকাল,
“সাফনিন ভাই, অপরাজিতাকে এই সময়টায় একটু বেশি করে টেককেয়ার করবেন। ওকে মানসিক সাপোর্ট দেবেন। বাবার শোকটা মেয়েদের বুকে খুব বাজেভাবে আঘাত করে। ওর এখন আপনার সাপোর্ট সবচেয়ে বেশি দরকার।”
সাফনিন দৃঢ়ভাবে মাথা নাড়ল,
“আপনি একদম চিন্তা করবেন না ,আমি অপরাজিতার পাশে সবসময় আছি। ও যেন একা বোধ না করে, আমি সব খেয়াল রাখব।”
কবরস্থানের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে সবার কাছ থেকে শেষ বিদায় নিল অর্কো।
উত্তরার ফ্ল্যাটের দরজাটা নিঃশব্দে খুলে ভেতরে ঢুকল অর্কো। পুরো বাড়িটায় তখন এক নিঝুম, থমথমে অন্ধকার। শুধু শোবার ঘর থেকে মৃদু নীল আলোর একটা রেখা করিডোরে চুইয়ে পড়ছে।
পা টিপে টিপে শোবার ঘরে ঢুকতেই দেখা গেল খাটের পাশে বসে ছিল অর্পা, আর এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল প্রাপ্তি। বিছানায় বালিশে হেলান দিয়ে শান্ত মুখে শুয়েছিল অর্পিতা। নাকের সরু নল দিয়ে তখনো অক্সিজেনের একটা হালকা হিসহিস শব্দ ঘরে অনুরণিত হচ্ছিল।
অর্কোকে ঘরে ঢুকতে দেখেই অর্পা আর প্রাপ্তি নিঃশব্দে উঠে দাঁড়াল। তারা কোনো কথা না বলে অর্কোকে জায়গা ছেড়ে দিয়ে ধীরপায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল এবং পেছনের কাঠের দরজাটা আলতো করে টেনে দিল। অর্কো এসে বসল বিছানার একদম কিনারে, অর্পিতার ঠিক পাশে। গোরস্তানের ভেজা মাটির গন্ধ আর দীর্ঘ ক্লান্তিতে তার চোখ দুটো ভার হয়ে ছিল।
“রফিক আঙ্কেলকে রেখে এলে?”
অর্পিতা খুব নিচু কিন্তু একদম সহজ গলায় জিজ্ঞেস করল।
অর্কো কোনো কথা বলতে পারল না। সে শুধু নিঃশব্দে মাথা নিচু করে সায় দিল।
“মানুষ তো সবসময় বেঁচে থাকে না অর্কো,এই দুনিয়ায় কেউ কোনোদিন আজীবন থাকতে আসে না। সবাইকে এক দিন না এক দিন বিদায় নিতেই হয়। কেউ হয়তো আমাদের একটু আগে ছেড়ে চলে যায়, কেউ হয়তো কয়েক দিন পরে যায়। এই তো জীবন।”
অর্পিতা একটু থামল। সে এক পলক জানালার ওপাশের রাতের অন্ধকারের দিকে তাকাল, তারপর আবার চোখ ফেরাল অর্কোর মুখের ওপর।
“আচ্ছা অর্কো...আমি মরে যাওয়ার পর তুমি কীভাবে একা একা থাকবা বলো তো? আমি এই বিছানায় শুয়ে শুয়ে সারাদিন শুধু এই একটা কথাই ভাবি। তোমার তো নিজের কোনো খেয়াল থাকে না অর্কো,”
অর্পিতা ফিসফিস করে বলল,
“স্টাডি রুমে ল্যাপটপ নিয়ে বসলে তুমি খাওয়ার কথা ভুলে যাও, ওষুধ খাওয়ার সময় মনে থাকে না, কোন জামাটা কোথায় রেখেছ সেটাও খুঁজে পাও না। আমি না থাকলে কে তোমাকে এভাবে বকা দিয়ে দিয়ে খাওয়াবে বলো তো? কে তোমার খেয়াল রাখবে?”
অর্পিতা অর্কোর হাতের ওপর নিজের হাতটা আলতো করে ছুঁইয়ে দিল।
“আমি চলে যাওয়ার পর তুমি কিন্তু একা একা থাকবে না অর্কো,তুমি একটা বিয়ে করে নিয়ো। এমন কাউকে তোমার এই ঘরে নিয়ে এসো যে তোমাকে ভালো রাখবে, যে তোমার কাজগুলোকে সম্মান করবে, আর আমার চেয়েও বেশি ভালোবাসা দিয়ে তোমার যত্ন নেবে। তুমি কিন্তু একা থাকবে না, আমাকে কথা দাও।”
অর্কোর গলার কাছে এসে সমস্ত শব্দ রুদ্ধ হয়ে গেল। সে কোনো প্রতিবাদ করতে পারল না, কোনো চিৎকার করতে পারল না। অর্কো কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু অর্পিতার সেই শীর্ণ, কাঁপতে থাকা হাতটা টেনে নিজের চোখের ওপর চেপে ধরল। তার চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়া নোনা জলে ভিজে যেতে লাগল অর্পিতার হাতের তালু।
অর্পিতা অর্কোর ভেতরের এই সীমাহীন যন্ত্রণাটুকু বুঝতে পারল। সে আর ওই বিষাদময় প্রসঙ্গের গভীরে গেল না। সে খুব আলতো করে অর্কোর হাতের ওপর নিজের বুড়ো আঙুল বুলিয়ে দিয়ে বিষয়ের মোড় ঘুরিয়ে নিল।
“মুভির স্ক্রিপ্ট কি শেষ অর্কো লেখা? নিশি আপুর যে কাজটা বাকি ছিল?”
অর্কো একটু চোখ মুছে ভেজা গলায় বলল,
“হ্যাঁ, শেষ। আজ বিকেলেই শেষ কুড়ি পারসেন্টের ড্রাফটটা কমপ্লিট করে ফেলেছি। কাল সকালে নিশিকে পাঠিয়ে দেব।”
অর্পিতার মুখে এক চিলতে স্বস্তির আলো ফুটে উঠল।
“ভালো করেছ। নিজের ওপর কাজ জমিয়ে রাখতে নেই।”
তারপর অর্পিতা একটু থেমে, ঘরের মৃদু নীল আলোর দিকে তাকিয়ে খুব ধীর গলায় জিজ্ঞেস করল—
“তুমি বাসায় আমার কথা জানিয়েছ অর্কো? ওরা কি জানে যে আমার এই অবস্থা?”
“হ্যাঁ, জানিয়েছি, সিঙ্গাপুরে বসেই বাবাকে ফোন দিয়ে সব খুলে বলেছিলাম। শুনে বাবা অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে ছিলেন... কোনো কথা বলতে পারছিলেন না। সামিহার মা আর সামিহাও কান্নাকাটি করেছে।”
অর্কো একটু থেমে অর্পিতার কপালে হাত রেখে যোগ করল—
“বাবা বলেছেন... তিনি হয়তো কিছুদিনের মধ্যেই ঢাকায় এই বাসায় আসবেন তোমাকে দেখতে।”
বাবার আসার কথা শুনে অর্পিতার ফ্যাকাশে ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল।
অর্পিতা সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে একটু ম্লান হেসে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“দেখেছ অর্কো...বাবা জীবনে প্রথমবার আমাদের এই বাসায় আসবেন... আর আমার এমন কপাল, আমি নিজের হাতে রেঁধে মানুষটাকে একবেলা খাওয়াতেও পারব না।”
“তুমি এসব নিয়ে একদম মন খারাপ করবে না অর্পিতা। তুমি ওনার সামনে বসে হাসিমুখে কথা বলবে, এটাই বাবার কাছে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় পাওয়া। এখন এসব চিন্তা ছাড়ো তো... রাত অনেক হয়েছে, এবার ঘুমানো উচিত। তোমার শরীরটার এখন প্রচুর বিশ্রাম দরকার।”
অর্কো বিছানা থেকে উঠে গিয়ে সাইড টেবিলের ওপর রাখা নীল বাতিটার সুইচ অফ করে দিল।
চারটি দিন কেটে গেল এক নিয়মতান্ত্রিক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে।
সিঙ্গাপুরের প্রেসক্রিপশন মেনে অর্পিতার জন্য একজন পেশাদার ফিজিওথেরাপিস্টের ব্যবস্থা করেছিল অর্কো। প্রতিদিন সকালে এসে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে অর্পিতার পায়ে বিভিন্ন রিহ্যাবিলিটেশন এক্সারসাইজ করিয়ে দিতেন থেরাপিস্ট তানিয়া।
সকালের নরম রোদে শোবার ঘরের বিছানায় বসে অর্পিতার দুই পায়ের পাতার মাংসপেশি আর হাঁটুর জয়েন্টগুলো খুব নিবিড়ভাবে ম্যাসাজ ও স্ট্রেচিং করাচ্ছিলেন তানিয়া। অর্পিতা নিজের সমস্ত মনোযোগ দিয়ে তানিয়ার হাতের চাপের বিপরীতে পা ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছিল।
অর্পিতার পায়ের মুভমেন্ট দেখে তানিয়া ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অর্কোর দিকে তাকিয়ে আশ্বস্ত করার মতো একটা হাসি দিলেন।
“ওনার পায়ে কিন্তু এখনো মাশাআল্লাহ বেশ ভালো রেসপন্স আর শক্তি আছে,”
তানিয়া খুব ইতিবাচক গলায় বললেন,
“নার্ভগুলো এখনো পুরোপুরি অবশ হয়ে যায়নি। নিয়ম করে যদি এভাবে রেগুলার প্রোপার থেরাপি চালিয়ে যাওয়া যায়, তবে আশা করি হুট করে ফুল প্যারালাইসিসের যে ঝুঁকিটা থাকে, সেটা অনেকটাই কমবে। পেশিগুলো অন্তত সহজে শক্ত হয়ে যাবে না।”
তানিয়ার মুখে এমন এক চিলতে আশার কথা শুনে অর্কোর বুকের ভেতরের জমে থাকা অন্ধকার যেন সামান্য হলেও একটু হালকা হলো। বিছানায় শুয়ে থাকা অর্পিতাও একটু হাসল।
ঠিক তখনই সদর দরজায় কলিংবেলের মিষ্টি শব্দ বেজে উঠল।
টুং... টাং...
ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে নোটস পড়ছিল অর্পা। সে বই রেখে উঠে গিয়ে সদর দরজাটা খুলে দিল।
মিনিটখানেক পর অর্পা শোবার ঘরের দরজার কাছে এসে উঁকি দিল। তার মুখে একরাশ কৌতূহল।
“দুলাভাই...বাইরে একটা মেয়ে এসেছে। বলল উনি নাকি রফিক আঙ্কেলের ছোট মেয়ে ওহনা আপু।”
রফিক সাহেবের ছোট মেয়ে ওহনা এসেছে শুনে অর্কো বেশ কিছুটা অবাক হলো। বাবার আকস্মিক মৃত্যুর সেই শোকের রেশ এখনো তাঁদের পরিবারে কাটেনি, এই পরিস্থিতিতে মেয়েটি হঠাৎ এত সকালে উত্তরার বাসায় কেন এলো?
অর্কো করিডোরে এগিয়ে এসে রান্নাঘরের দিকে মুখ করে ডাক দিল,
“প্রাপ্তি!”
প্রাপ্তি দ্রুত কিচেন থেকে বেরিয়ে এলো,
“জি স্যার?”
“রফিক আঙ্কেলের মেয়ে এসেছেন,উনাকে নিয়ে গিয়ে স্টাডি রুমে বসাও। ফ্যানটা ছেড়ে দাও আর ভালো করে এক কাপ চা আর কিছু বিস্কুট নাস্তা দাও। তানিয়া আপুর কাজটা শেষ হলেই আমি হাত-মুখ ধুয়ে পাঁচ মিনিটের মধ্যে আসছি।”
“জি স্যার, আমি দেখছি,”
প্রাপ্তি মাথা নেড়ে ড্রয়িংরুমের দিকে এগিয়ে গেল ওহনাকে সাদরে ভেতরে নিয়ে আসার জন্য।
তানিয়ার থেরাপি শেষ হতেই অর্কো বেসিনে গিয়ে চোখেমুখে পানির ঝাপটা দিল। তারপর তোয়ালে দিয়ে হাত মুছতে মুছতে সে পা বাড়াল স্টাডি রুমের দিকে।
স্টাডি রুমের কাঁচের জানালার পাশে কাঠের চেয়ারটায় খুব জড়সড় হয়ে বসেছিল ওহনা। কোলের ওপর একটি কালো অফিসিয়াল ফাইল ধরা। সামনের টেবিলে রাখা ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ আর বিস্কুটের প্লেট। অর্কোকে ঘরে ঢুকতে দেখেই সে খুব শ্রদ্ধায় চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
“আরে ওহনা, বসো বসো... দাঁড়াতে হবে না,”
অর্কো হাসিমুখে সামনের রিভলভিং চেয়ারটায় বসল।
ওহনা আবার ধীরে ধীরে বসল। তার চোখে এখনো বাবার বিচ্ছেদের সেই গভীর ক্লান্তির ছাপ রয়ে গেছে। অর্কো টেবিলের ওপর হাত রেখে খুব আন্তরিক গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কেমন আছ তুমি? বাসায় আন্টি আর ফয়সাল কেমন আছেন? আপু আর ভাইয়া কি এখনও বাসায় আছেন, নাকি নিজের বাসায় ফিরে গেছেন?”
ওহনা চায়ের কাপে একটু হাত ছুঁইয়ে খুব ধীর গলায় বলল,
“আমরা সবাই মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি... আম্মা এখনো মাঝেমধ্যেই আব্বুর জামাকাপড় বুকে জড়িয়ে বসে কাঁদেন। কিন্তু জীবন তো আর আটকে থাকে না। ভাইয়াও অফিসে জয়েন করেছে।”
অর্কো একটু তাকিয়ে বলল,
“ এখন কী করছ ওহনা?”
ওহনা এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর নিজের কোলের ওপর রাখা ফাইলটার ওপর হাত রেখে মুখ তুলে তাকাল,
“আসলে ভাইয়া, একটা বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছি,ফয়সাল ভাইয়া তো নিজের প্রাইভেট চাকরিতে প্রচণ্ড ব্যস্ত। সারাদিন অফিস করে প্রকাশনীতে বসার মতো সময় ওর একদমই নেই। কিন্তু আব্বুর সারাজীবনের রক্ত-ঘামে গড়া বন্ধু প্রকাশন আমি কোনোভাবেই মুখ থুবড়ে পড়তে দেব না। তাই আমি ঠিক করেছি... প্রকাশনীর পুরো দায়িত্বটা আমিই নিজের কাঁধে তুলে নেব। এখন থেকে আমিই বন্ধু প্রকাশন চালাব।”
ওহনার এমন স্পষ্ট ও সাহসী সিদ্ধান্ত শুনে অর্কো এক মুহূর্তের জন্য যেন চমকে গেল।
রফিক সাহেবের এই চব্বিশ-পঁচিশ বছরের তরুণী মেয়েটি বাবার মৃত্যুর মাত্র কয়েক দিনের মাথায় এমন এক বিশাল বাণিজ্যিক ও সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠানের হাল ধরার মতো শক্ত মেরুদণ্ড নিয়ে দাঁড়িয়েছে—এটা দেখে অর্কোর বুকটা এক অদ্ভুত শ্রদ্ধায় ভরে উঠল। ওহনা ফাইলটা খুলে কিছু কাগজপত্র অর্কোর সামনে বাড়িয়ে দিল।
“মন্টু কাকার সাথে বসে কাল অফিসের সব পেপারস দেখলাম। আপনার আগের বইগুলোর নতুন এডিশন আর রয়্যালটি সংক্রান্ত কিছু অফিশিয়াল পেপারওয়ার্ক বাকি ছিল। মন্টু কাকা বললেন এগুলোতে আপনার সিগনেচার লাগবে... স্যার।”
শব্দটা শুনেই অর্কো একটু হেসে হাত তুলে ওকে থামিয়ে দিল।
“শোনো ওহনা, আমাকে একদম স্যার বলবে না, তোমার ভাই ফয়সালকেও আমি বলেছি, তোমাকেও বলছি আমাকে ভাই বলে ডাকবে।”
অর্কো কলমটা টেনে নিয়ে কাগজের নির্দিষ্ট জায়গাগুলোতে সই করে দিল। ফাইলটা বন্ধ করে ওহনার হাতে ফেরত দিয়ে সে বলল—
“তোমার এই সিদ্ধান্তটা জেনে আমার মনটা ভরে গেল ওহনা। আঙ্কেল বেঁচে থাকলে আজ সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন। প্রকাশনী চালাতে গিয়ে যেকোনো সমস্যা, যেকোনো জটিলতায় আমাকে সবসময় নিজের বড় ভাইয়ের মতো পাশে পাবে। কোনো চিন্তা করবে না।”
ওহনার চোখ দুটো কৃতজ্ঞতায় একটু চিকচিক করে উঠল। সে ফাইলটা ব্যাগে ভরে উঠে দাঁড়াতে গেল, কিন্তু পরক্ষণেই একটু ইতস্তত করে খুব নরম গলায় জিজ্ঞেস করল—
“অর্পিতা ম্যামের শরীর এখন কেমন আছে ভাইয়া? বাইরে তো অনেক কথাই শুনলাম...”
সে একটা লম্বা শ্বাস ফেলে খুব নিচু গলায় বলল,
“শারীরিক লড়াই চলছে ওহনা। পায়ের জোর অনেকটাই কমে এসেছে, এখন নিয়মিত ফিজিওথেরাপি দিতে হচ্ছে। বাসায় সবসময় অক্সিজেন লাগছে... তোমরা দোয়া কোরো ওর জন্য।”
ওহনা এক মুহূর্ত অর্কোর চোখের ভেতরের সেই চাপা হাহাকারটা দেখে শিউরে উঠল। সে খুব কাতর গলায় বলল,
“আল্লাহ যেন ম্যামকে একদম সুস্থ করে দেন ভাইয়া। আমি মনেপ্রাণে দোয়া করবো। আমি আসি তাহলে আজ...”
ওহনা ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে সালাম দিয়ে ড্রয়িংরুমের দিকে পা বাড়াল।
অর্কো ওহনাকে সদর দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে বিদায় জানাল।
বিকেলের দিকে উত্তরার আকাশটা কেমন যেন মেঘলা হয়ে এলো।
কয়েক দিন ধরে ঘরের চার দেয়ালে বন্দি থাকতে থাকতে অর্পিতার দমবন্ধ লাগছিল। অর্কো তাই আর দেরি করল না। গাড়ির পেছনের ট্রাংকে একটি ফোল্ডিং হুইলচেয়ার আর ছোট একটি পোর্টেবল অক্সিজেন সিলিন্ডার তুলে নিয়ে সে অর্পিতাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।
গাড়ি এসে থামল হাতিরঝিলের এক শান্ত ব্রিজের নিচের পার্কিং স্পটে।
হুইলচেয়ারটা খুলে অর্পিতাকে খুব সাবধানে কোলে করে এনে সিটে বসাল অর্কো। তার গায়ে জড়িয়ে দেওয়া হলো হালকা একটা চাদর। চেয়ারের পেছনের ফ্রেমে শক্ত করে আটকে দেওয়া হলো সেই ছোট পোর্টেবল সিলিন্ডারটা, যেখান থেকে সরু নলটা অর্পিতার নাকের নিচে এসে মিলেছে।
অর্কো আস্তে আস্তে হুইলচেয়ারটা ঠেলে হাতিরঝিলের ওয়াকওয়ে ধরে হাঁটতে শুরু করল।
আকাশে তখন ঘন মেঘ জমেছে। লেকের ওপর দিয়ে বয়ে আসছে এলোমেলো ঠান্ডা বাতাস, যা অর্পিতার শাড়ির আঁচল আর কপালের চুলগুলোকে উড়িয়ে দিচ্ছিল। বাতাসের সাথে সাথে হাতিরঝিলের সেই বহু পুরোনো, পরিচিত পানির ভেজা শ্যাওলা আর কিছুটা পচা গন্ধ এসে নাকে লাগল। ঢাকার এই এক অদ্ভুত বাস্তবতা এত পরিবর্তন, এত ফ্লাইওভার, কিন্তু এই পানির ভারী গন্ধটুকু আজও ঠিক আগের মতোই আছে।
অর্পিতা দুই হাত কোলের ওপর জড়ো করে সামনের কালো জলরাশির দিকে তাকিয়ে ছিল।
“মনে আছে তোমার?”
অর্পিতা শান্ত গলায় বলল,
“ফার্মগেটের সেই মেস থেকে তুমি যখন সারা দুপুর হেঁটে হেঁটে ক্লান্ত হয়ে এখানে আসতে... তোমার পকেটে তখন মেরেকেটে বিশ-তিরিশটা টাকা থাকত।”
“মনে আছে,তুমি অফিস থেকে ফেরার পথে তেজগাঁওয়ের মোড় থেকে রিকশা না নিয়ে হেঁটে চলে আসতে। তারপর আমরা ওই সিমেন্টের বেঞ্চিটায় বসতাম।”
“আর দশ টাকার লালচে কাগজের ঠোঙায় বাদাম কিনতাম,তুমি বেছে বেছে তিনটা দানাওয়ালা বাদামগুলো ভেঙে আমার হাতে তুলে দিতে। আমি যখন বলতাম তুমিও খাও, তুমি বলতে তোমার নাকি খিদে নেই। আসলে তোমার পকেটে আরেকটা ঠোঙা কেনার টাকা ছিল না।”
“তুমি তো তখন সবকিছুই বুঝতে পারতে অর্পিতা। মুখ ফুটে কোনোদিন একটা অভিযোগ করোনি।”
“অভিযোগ কেন করবো? টাকা না থাকলে কি ভালোবাসা কমে যায় নাকি? তখন আমাদের টাকা ছিল না সত্যি, কিন্তু কত স্বপ্ন ছিল! তুমি পাণ্ডুলিপির গল্প বলতে... আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে শুনতাম। আমরা ভাবতাম আমাদের কি কোনোদিন নিজের একটা ছোট্ট ঘর হবে? কোনোদিন কি আমরা শান্তিতে একবেলা খেতে পারব?”
অর্পিতা একটু থেমে নিজের কোলের চাদরটা ঠিক করল,
“আজ আমাদের ঘর হয়েছে, টাকা হয়েছে... সবই হলো অর্কো। শুধু ওই দশ টাকার বাদামের ঠোঙাটা আর ফিরে এলো না।”
অর্কো হুইলচেয়ারটা রেলিংয়ের কাছে এনে থামাল। সে এক পা এগিয়ে অর্পিতার পাশে দাঁড়িয়ে লেকের জলের দিকে তাকাল। মেঘলা আকাশের নিচে হাতিরঝিলের ওপাশের শহরটা তখন একটু একটু করে জ্বলে উঠতে শুরু করেছে। দূর থেকে ভেসে আসছে গাড়ির মৃদু হর্ন আর পানির ওপর বাতাসের ঝাপটা।
ঠিক তখনই পাশ দিয়ে কাঠের ডালায় গরম বালু আর বাদাম নিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল এক বাদামওয়ালা। টিনের ডালা থেকে ভাজা চিনাবাদামের চেনা সুবাস ছড়াচ্ছিল বাতাসে।
অর্কো লোকটাকে ইশারা করে থামাল। তারপর অর্পিতার দিকে তাকিয়ে বলল—
“বাদাম খাবে অর্পিতা? আজ কিন্তু আর দশ টাকার না... আজ পুরো দুই ঠোঙাই কিনব!”
অর্পিতা চোখ দুটো উজ্জ্বল করে হেসে মাথা নাড়ল।
“খাব।”
অর্কো গরম গরম দুই ঠোঙা বাদাম কিনে নিল। বাদামওয়ালার কাছ থেকে পুরোনো খবরের কাগজের ঠোঙাটা হাতে নিয়ে সে হুইলচেয়ারের সামনে এসে দাঁড়াল। খসখস শব্দ করে শক্ত খোসা ছাড়িয়ে, লালচে পাতলা চামড়াটা ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে সে পরম যত্নে দুটো করে বাদামের দানা অর্পিতার মুখে তুলে দিতে লাগল। অর্পিতা খুব শান্ত মুখে চিবোতে লাগল।
বাদাম চিবোতে চিবোতেই হঠাৎ অর্পিতার নজর গেল লেকের কিনারে নুয়ে থাকা এক কদম গাছের ডালের দিকে। ঠান্ডা বাতাসে গাছের পাতাগুলো কাঁপছিল, আর একদম শেষ মাথার একটা সরু ডালে খুব কাছাকাছি গা ঘেঁষে বসে ছিল দুটো ছোট চড়ুই পাখি। তারা একে অপরের পালকে ঠোঁট ঘষছিল।
অর্পিতা নিজের ওড়নার নিচ থেকে ফোনটা বের করল। খুব সাবধানে দুই হাতে ফোনটা ধরে জুম করে সেই পাখি দুটোর চমৎকার একটা ছবি তুলল সে।
স্ক্রিনটা ঘুরিয়ে অর্কোর সামনে ধরে অর্পিতা বলল,
“দেখো তো অর্কো... কেমন লাগছে ছবিটা? একদম ঠিকঠাক ফ্রেম হয়েছে না?”
অর্কো স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে একটু হাসল।
“খুব সুন্দর হয়েছে।”
অর্পিতা ফোনটা আবার ব্যাগে রেখে দিল। অর্কো ঠোঙাটা পকেটে পুরে আবার হাত রাখল হুইলচেয়ারের হাতলে। ধীরপায়ে সে অর্পিতাকে নিয়ে ওয়াকওয়ে ধরে সামনের দিকে এগোতে লাগল। কিছুদূর এগোতেই ব্রিজের গোড়ার কাছে চোখে পড়ল এক পুরোনো হাওয়াই মিঠাইওয়ালা। বাঁশের লম্বা লাঠির সাথে পলিথিনে মোড়ানো থোকা থোকা গোলাপি রঙের তুলতুলে মিষ্টিগুলো ঝুলছে।
অর্পিতা এক হাত তুলে ইশারা করে বলল,
“অর্কো! ওই দেখো হাওয়াই মিঠাই! আমাকে একটা গোলাপি রঙের হাওয়াই মিঠাই কিনে দেবে?”
অর্কো থমকে দাঁড়িয়ে একটু কপালে ভাঁজ ফেলল,
“আরেহ অর্পিতা! এইগুলো রাস্তায় কীভাবে বানায় আল্লাহই জানে! কোন নোংরা পরিবেশে, কী রঙের কেমিক্যাল দিয়ে তৈরি করে... এখন তোমার এই শরীরে এসব খোলাখুলির জিনিস খাওয়া কি ঠিক হবে বলো তো?”
“হ্যাঁ, ঠিকই তো বলেছ! আমার তো একদম অলিম্পিক খেলোয়াড়ের মতো ফিট শরীর, সামান্য একটা হাওয়াই মিঠাইয়ের মিষ্টি পেটে গেলেই বুঝি আমার শরীর খারাপ হয়ে যাবে! তাছাড়া মেসের জীবনে ফার্মগেটের ওই নর্দমার পাশের টং দোকানের পোড়া তেলের পেঁয়াজু আর বাসি সিঙ্গাড়া যখন পরম আনন্দে এনে খাওয়াতে, তখন তোমার এই ইউরোপীয় হাইজিনের জ্ঞান কোথায় লুকিয়ে রেখেছিলে শুনি?”
অর্কো আর নিজের হাসি আটকে রাখতে পারল না,
“তুমি না... আসলেই একটা আস্ত পাগল!”
অর্কো হাসতে হাসতেই মাথা নাড়ল।
সে আর কোনো তর্ক না বাড়িয়ে হনহন করে গিয়ে হাওয়াই মিঠাইওয়ালাকে ডাক দিল। সবচেয়ে বড় আর টাটকা দেখে একটা গোলাপি হাওয়াই মিঠাই কিনে এনে সে পলিথিনের মুখটা আলতো করে খুলে অর্পিতার কোলের ওপর মেলে ধরল। অর্পিতা এক চিমটি তুলতুলে গোলাপি মিষ্টি ছিঁড়ে নিয়ে মুখে দিল।
হাতিরঝিলের ওপর তখন সন্ধ্যার গাঢ় অন্ধকার নেমে এসেছে। অর্কো পেছন থেকে খুব আলতো করে হুইলচেয়ারটা ঠেলে নিয়ে যাচ্ছিল।
সন্ধ্যার আঁধার গাঢ় হয়ে নামতেই অর্কো হুইলচেয়ার ঘুরিয়ে পার্কিংয়ের দিকে ফিরে এলো।
গাড়ির পেছনের ট্রাংক খুলে সে ছোট পোর্টেবল সিলিন্ডারটা সাবধানে খুলে রাখল এবং হুইলচেয়ারটা ভাঁজ করে ভেতরে তুলে দিল। তারপর কোনো কথা না বলে, খুব আলতো করে অর্পিতাকে দুই হাতের ওপর তুলে নিল সে। অর্পিতার শরীরটা যে আগের চেয়ে কতখানি হালকা আর পলকা হয়ে গেছে, তা কোলে তুলে নেওয়ার মুহূর্তে অর্কো বুঝতে পারল।
অর্কো খুব সাবধানে অর্পিতাকে গাড়ির সামনের সিটে বসিয়ে দিল। সিটবেল্টটা পরম যত্নে পরিয়ে দিয়ে, তার নাকের নিচে অক্সিজেনের সরু নলটা ঠিক করে দিয়ে সে ড্রাইভিং সিটে এসে বসল।
পাশের সিটে বসা অর্পিতার কোলে তখনো ধরা ছিল সেই গোলাপি হাওয়াই মিঠাইয়ের প্যাকেটটা। সে এক চিমটি করে মিষ্টি ছিঁড়ে মুখে দিচ্ছিল আর আনমনা চোখে জানালার ওপাশের ছুটে চলা আলো দেখছিল।
হঠাৎ অর্পিতা মুখ ফিরিয়ে অর্কোর দিকে তাকাল।
“আচ্ছা অর্কো...” অর্পিতা খুব নরম গলায় জিজ্ঞেস করল,
“ছোটবেলায় তোমার আসলে স্বপ্ন কী ছিল? বড় হয়ে তুমি ঠিক কী হতে চেয়েছিলে?”
অর্কো গিয়ার বদলাতে বদলাতে একটু ম্লান হাসল।
“ছোটবেলায় তো অত কিছু বুঝতাম না অর্পিতা, তখন শুধু একটা কথাই মাথায় ঘুরত নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে, অভাব দূর করে নিজের মতো কিছু একটা করতে হবে। তারপর যখন একটু বড় হয়ে বই পড়া আর লেখার জগতের ভেতরে ঢুকলাম... আস্তে আস্তে এমনভাবে সেই মোহে জড়িয়ে গেলাম যে লেখালেখি ছাড়া আমার জীবনে আর দ্বিতীয় কোনো কিছুর অস্তিত্বই থাকল না।”
অর্পিতা মিষ্টিটা মুখের ভেতর গলিয়ে নিয়ে অর্কোর প্রোফাইলের দিকে অপলক চেয়ে রইল।
“তাহলে এখন?”
অর্পিতা ধীর গলায় জিজ্ঞেস করল,
“এখন তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন কী অর্কো?”
“এখন আমার জীবনের একটাই স্বপ্ন অর্পিতা... তোমাকে শুধু আগের মতো পুরোপুরি সুস্থ দেখতে চাই।”
অর্কো পরিবেশের এই দমবন্ধ করা বিষাদটা কাটাতে নিজেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রসঙ্গ পালটাল। সে খুব সহজ গলায় জিজ্ঞেস করল—
“আচ্ছা অর্পিতা, তোমার যে বাবার ভিটা বা বাড়ি ছিল জামালপুরে... সেখানে কি এখন কেউ নেই? কেউ থাকে না?”
“না অর্কো, কেউ থাকে না,”
অর্পিতা একটা হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“বাবা-মা মারা যাওয়ার পর মামা-খালারা তো নিজেদের ভাগবাটোয়ারা করে সবকিছু বেচে দিয়েছে। আমাদের হয়তো ভিটার একটুখানি জায়গা বা পুরোনো ঘরটা পড়ে আছে। কিন্তু সেখানে যাওয়ার মতো কেউ নেই। অনেক... অনেকগুলো বছর কেটে গেছে, ওমুখো হওয়া হয় না।”
অর্কো রেড সিগন্যালে গাড়ি থামিয়ে অর্পিতার ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকাল। তার চোখের দৃষ্টিতে ছিল গভীর এক আকুলতা।
“তোমার কী ইচ্ছে অর্পিতা? তোমার এখন জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন কী বলো তো?”
অর্পিতা জানালার ওপাশে রাতের দূর আকাশের তারাদের দিকে তাকাল সে খুব নিচু, স্বপ্নিল গলায় বলতে শুরু করল—
“আমার না খুব ইচ্ছে অর্কো... আমার একটা বিশাল বড় সবুজ বাগান থাকবে। চারপাশ জুড়ে থাকবে হাজারটা রঙের ফুল আর ফলের গাছ। আর সেই বাগানের ঠিক মাঝখানটায় থাকবে ছোট্ট একটা একতলা বাড়ি ওই যে বিদেশে যেমন কটেজগুলো থাকে না? বড় বড় কাঁচের জানালা, কাঠের মেঝে আর একটা খোলা বারান্দা... ঠিক ওইরকম একটা ঘর। যেখানে কোনো গাড়ির হর্ন থাকবে না, কোনো শহরের কোলাহল থাকবে না... থাকবে শুধু পাখির ডাক আর ফুলের সুবাস।”
সিগন্যালের আলো সবুজ হতেই অর্কো আবার গাড়ি স্টার্ট দিল। সে মুখে আর কোনো কথা বলল না।
বাসায় ফিরে খুব সাবধানে অর্পিতাকে শোবার ঘরের বিছানায় শুইয়ে দিল অর্কো।
নাকের নিচে অক্সিজেনের নলটা নিখুঁতভাবে পরিয়ে দিয়ে, গায়ের ওপর নরম কম্বলটা টেনে দিতেই ক্লান্তিতে দুচোখ বুজল অর্পিতা। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার শ্বাসপ্রশ্বাস গভীর আর শান্ত হয়ে এলো।
অর্কো শোবার ঘরের বাতি নিভিয়ে ধীরপায়ে চলে এলো তার স্টাডি রুমে।
কিন্তু চেয়ারে বসার পর তার মাথায় আর কোনো ক্লান্তি কাজ করছিল না। তার মস্তিষ্কের প্রতিটি কোষে তখন একটাই চিন্তা পাগলের মতো ঘুরপাক খাচ্ছিল একটি বিশাল সবুজ বাগান, আর তার মাঝখানে কাঁচের বড় বড় জানালার একটি ছোট্ট কটেজ।
অর্কো আর এক সেকেন্ডও নষ্ট করল না। সে ল্যাপটপ অন করে গভীর গবেষণায় বসে গেল।
ঢাকার আশেপাশে কোথায় এমন নিরিবিলি, শান্ত ও সবুজ জায়গা পাওয়া সম্ভব তা খুঁজতে গিয়ে তার নজর আটকে গেল পূর্বাচল এবং ৩০০ ফিট এক্সপ্রেসওয়ের লাগোয়া নিরিবিলি অঞ্চলগুলোতে। শহরের কোলাহল নেই, অথচ হাসপাতালের কোনো জরুরি প্রয়োজনে মাত্র আধঘণ্টায় ঢাকায় পৌঁছানো সম্ভব। কিন্তু হিসেব মেলাতে গিয়ে অর্কোর চোখ স্থির হয়ে গেল।
পূর্বাচলের দিকে অন্তত দশ-বারো কাঠা জমি কেনা, সেখানে বিদেশের মতো কাঁচ আর কাঠের মডার্ন একতলা ইকো-কটেজ নির্মাণ করা এবং পুরো চত্বর জুড়ে ল্যান্ডস্কেপিং করে বিশাল এক ফুলের বাগান সাজানো সব খরচ মিলিয়ে আনুমানিক প্রয়োজন অন্তত চার কোটি থেকে পাঁচ কোটি টাকা!
এত বিপুল পরিমাণ অর্থ এই মুহূর্তে অর্কোর হাতে নেই।
সে সাথে সাথে তার ব্যাংকের অ্যাপ খুলে সেভিংস অ্যাকাউন্টের ব্যালান্স চেক করল।
বইমেলার রয়্যালটি, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারের প্রাইজমানি আর আগের প্রজেক্টগুলোর সমস্ত সঞ্চয় মিলিয়ে তার অ্যাকাউন্টে এই মুহূর্তে জমা রয়েছে সর্বমোট ৮৬ লাখ টাকা।কিন্তু সময় তো তাদের পক্ষে নেই; বইয়ের রয়্যালটির জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করার মতো সময় অর্পিতার শরীরে আর অবশিষ্ট নেই।
তাহলে এত দ্রুত এই বিশাল অংকের টাকা কীভাবে আসবে?
অর্কোর মাথায় এলো এই দেশে একমাত্র মূলধারার মেগা-বাজেটের কমার্শিয়াল সিনেমার ইন্ডাস্ট্রিই পারে এক ধাক্কায় এত বড় অংকের সাইনিং মানি আর রিমুনারেশন দিতে।
সে তড়িঘড়ি করে নিজের অফিশিয়াল ইমেইল ইনবক্সটা খুলল।
সেখানে জমা হয়ে ছিল দেশের বিভিন্ন প্রযোজনা সংস্থা আর পরিচালকদের পাঠানো ডজন ডজন অফার। অর্কো চিরকাল নিজের জাত বাঁচিয়ে চলা এক ক্ল্যাসিক সাহিত্যিক; সস্তা নাচ-গান বা বাণিজ্যিক ফর্মুলা ছবিতে নিজের কলম বিক্রি করতে চায়নি বলে সে এত দিন এই ইমেইলগুলোর কোনো রিপ্লাই দেয়নি।
স্ক্রোল করতে করতে হঠাৎ একটি ইমেইলে গিয়ে অর্কোর চোখ আটকে গেল।
মেইলটি পাঠিয়েছেন দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও শীর্ষ বাণিজ্যিক ধারার ব্লকবাস্টার পরিচালক হায়মান নাফি।
যিনি একের পর এক কোটি টাকার ব্যবসা সফল অ্যাকশন ও রোমান্টিক সিনেমা বানিয়ে দেশের সিনেমা হল কাঁপিয়ে দেন। মেইলে হায়মান নাফি লিখেছিলেন—তিনি তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় মেগা-বাজেটের অ্যাকশন-রোমান্টিক সিনেমার জন্য অর্কোর হাত দিয়ে একটি কমার্শিয়াল কিন্তু ইমোশনালি পাওয়ারফুল গল্প ও চিত্রনাট্য লেখাতে চান। এজন্য অর্কোকে যেকোনো রেকর্ড পরিমাণ পারিশ্রমিক দিতে তিনি প্রস্তুত।
অর্কোর সামনে তখন দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী পথ খোলা।
একদিকে তার আজন্ম লালিত সাহিত্যিক শুচিতা, জাতীয় পুরস্কার পাওয়া এক গভীর তাত্ত্বিক লেখকের আভিজাত্য আর সামাজিক সম্মান—যা বাণিজ্যিক ছবির সস্তা অ্যাকশন আর ফর্মুলার নিচে ধুলোয় মিশে যেতে পারে।
আর অন্যদিকে তার ভালোবাসার মানুষটির অন্তিম এক অপূর্ণ স্বপ্ন। যে নারী আর কয়েকটা মাস পর হয়তো এই সুন্দর পৃথিবীর আলো দেখতে পাবে না।
অর্কো এক সেকেন্ডও দ্বিধা করল না।
নিজের তথাকথিত আভিজাত্য, সাহিত্যিক ইগো আর অহংকারকে নিজের পায়ের নিচে মাড়িয়ে দিতে তার এক মুহূর্তও হাত কাঁপল না।
অর্কো সাথে সাথে হায়মান নাফির ইমেইলের রিপ্লাই বাটনে ক্লিক করল। সে ইংরেজিতে একটি মাত্র লাইন টাইপ করে সেন্ড বাটনে চাপ দিল—
“Dear Nafi Bhai, I am open to work. Let’s meet and discuss the project.”
মেইলটা চলে যেতেই অর্কো চেয়ারে হেলান দিয়ে একটা লম্বা শ্বাস নিল।
পরদিন সকাল দশটায় গুলশান দুই নম্বরের এক বহুতল ভবনে পৌঁছাল অর্কো।
এটাই দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী বাণিজ্যিক প্রযোজনা সংস্থা নাফি ফিল্মস ইন্টারন্যাশনাল এর প্রধান কার্যালয়। কাঁচঘেরা বিশালাকার কর্পোরেট ফ্লোর, দেয়ালে ঝুলছে কোটি টাকার সব ব্লকবাস্টার অ্যাকশন সিনেমার বিশাল বিলবোর্ড আর পোস্টার। ভেতরে শত শত তরুণ সহকারী পরিচালক আর টেকনিশিয়ানদের চঞ্চল ছোটাছুটি।
কেবিনে অর্কোকে অভ্যর্থনা জানালেন পরিচালক হায়মান নাফি। বয়স চল্লিশের কোঠায়, গায়ে ফিটেড কালো ব্লেজার, চোখে চশমা । অর্কো ঘরে ঢুকতেই নাফি সোফা ছেড়ে উঠে এসে খুব আন্তরিকভাবে অর্কোর হাত জড়িয়ে ধরলেন।
“ওয়েলকাম অর্কো ভাই! কাল রাতে আপনার ইমেইলটা পেয়ে যে কী পরিমাণ খুশি হয়েছি, আপনাকে বোঝাতে পারব না। আপনার মতো এত বড় মাপের লেখক আমার সিনেমায় কাজ করবেন, এটা তো আমাদের পুরো ইন্ডাস্ট্রির জন্যই বিরাট সম্মানের ব্যাপার।”
নাফি অর্কোকে আরামদায়ক লেদার সোফায় বসিয়ে কফির ব্যবস্থা করলেন। তারপর কোনো সরাসরি টেবিলের ওপর একটি ভারী প্রজেক্ট ড্রাফট মেলে ধরলেন।
“শোনেন অর্কো ভাই,”
নাফি খুব গম্ভীর ও স্পষ্ট গলায় বললেন,
“আমি এবার কোনো দায়সারা বা সাধারণ সিনেমা বানাব না। এটা হবে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেটের ছবি। পুরো সিনেমার মোট বাজেট ধরা হয়েছে ৭০ কোটি টাকা! বাইরে বড় বড় দেশে শুটিং হবে, হলিউডের টেকনিশিয়ান থাকবে। আর এই ৭০ কোটির পুরো প্রজেক্টের একমাত্র কাহিনী, চিত্রনাট্য আর সংলাপ লেখার জন্য আমরা আপনাকে অফার করছি পুরো ৫ কোটি টাকা।”
“পাঁচ কোটি টাকা!”
সংখ্যাটা শুনে অর্কোর বুকের ভেতর যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। এদেশের সিনেমার ইতিহাসে কোনো চিত্রনাট্যকারের জন্য এমন অংকের পারিশ্রমিক স্রেফ অভাবনীয়।
হায়মান নাফি সোফায় একটু ঝুঁকে এসে খুব গভীর ও নিবিড় চোখে অর্কোর দিকে তাকালেন—
“কিন্তু আমার একটাই শর্ত অর্কো ভাই। আমার লাগবে দেশের সেরা একটা স্ক্রিপ্ট। সস্তা কোনো মারদাঙ্গা বা তামিল ছবির কপি না। টানটান অ্যাকশন তো থাকবেই, কিন্তু গল্পের ভেতর এমন এক নিখাদ ভালোবাসার আবেগ থাকতে হবে যা দেখে সাধারণ দর্শকেরা প্রেক্ষাগৃহে একদম চোখের পানিতে ভেসে যায়। আপনার লেখার ভেতরে যে মানুষের মনের গভীর টানাপোড়েন থাকে, সেটাই আমার এই বিশাল বাজেটের ভেতর দরকার।”
অর্কো খুব শান্ত গলায় মাথা নাড়ল।
“আমি বুঝতে পেরেছি নাফি ভাই। গল্পের গভীরতায় কোনো ঘাটতি থাকবে না।”
“আলহামদুলিল্লাহ,” নাফি হাসলেন।
“টাকার হিসাব একদম পরিষ্কার। চুক্তিতে সই করার সাথে সাথেই আমরা আপনাকে ৬০% অ্যাডভান্স ট্রান্সফার করে দেব মানে ৩ কোটি টাকা আজকেই আপনার ব্যাংকে চলে যাবে। আর বাকি ৪০% পাবেন প্রথম শো আর টিকিট বিক্রির পর।”
নাফি এবার ক্যালেন্ডারের দিকে ইশারা করে বললেন,
“এখন তো সেপ্টেম্বর মাস চলছে। আগামী বছর রোজার ঈদ পড়বে মার্চ মাসে। ঈদের বড় রিলিজের টার্গেট আমাদের। পুরো স্ক্রিপ্টটা যদি আপনি অক্টোবরের লাস্টে আমাকে বুঝিয়ে দিতে পারেন, তাহলে আমরা নভেম্বর থেকে টানা চার মাস শুটিংয়ে নেমে যেতে পারব।”
সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর হাতে সময় মাত্র পৌনে দুই মাস। কিন্তু অর্কোর বুকের ভেতর তখন অন্য এক তাগিদ। এই তিন কোটি টাকার সাইনিং মানি হাতে পেলেই সে কাল সকালেই পূর্বাচলের জমি কিনে অর্পিতার সেই স্বপ্নের একতলা কটেজ আর বাগানের কাজ শুরু করে দিতে পারবে।
অর্কো এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করল না। সে খুব দৃঢ় গলায় নাফির দিকে তাকিয়ে বলল—
“কাজ হয়ে যাবে নাফি ভাই, কোনো সমস্যা নেই। অক্টোবরের শেষ সপ্তাহের মধ্যেই আপনি পুরো চিত্রনাট্য হাতে পেয়ে যাবেন।”
হায়মান নাফি একগাল হেসে ড্রয়ার থেকে অফিসিয়াল চুক্তিনামা আর এগ্রিমেন্টের ফাইল বের করলেন। অর্কো প্রতিটি পাতায় খুব যত্ন করে নিজের সই বসিয়ে দিল এবং ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট ইনফরমেশন লিখে ফাইলটা নাফির হাতে তুলে দিল।
নাফি খুব শ্রদ্ধার সাথে অর্কোর সাথে হাত মেলালেন।
“আপনার ওপর আমার পুরো ভরসা আছে অর্কো ভাই।”
সই শেষ হতেই নাফি কেবিনের দরজার দিকে মুখ করে তাঁর পিএসকে ডেকে আনলেন।
“সোহেল, আমাদের দুজনের চুক্তিনামা হাতে একটা ভালো ছবি তোলো তো,” নাফি হাসিমুখে বললেন।
নাফি আর অর্কো পাশাপাশি দাঁড়িয়ে হাতে কালো চামড়ায় বাঁধানো সেই অফিসিয়াল চুক্তিনামাটা ধরলেন। পেছনে কাঁচের দেয়ালে ঝুলছিল নাফি ফিল্মসের সোনালী মনোগ্রাম। সোহেল তার পেশাদার ক্যামেরা দিয়ে কয়েকটা ফ্রেমের ছবি তুলে নিল।
ছবি তোলা শেষ করে নাফি খুব শ্রদ্ধার সাথে অর্কোর হাত জড়িয়ে ধরে ঝাঁকিয়ে দিলেন।
“আপনার ওপর আমার পুরো ভরসা আছে অর্কো ভাই। এটা আমাদের যৌথ এক ঐতিহাসিক যাত্রা হতে চলেছে।”
অফিস থেকে বের হয়ে যখন অর্কো লিফটে নেমে নিজের গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসল, তখন তার পকেটের ফোনটা কেঁপে উঠল। ব্যাংকের অফিশিয়াল এসএমএস—
“আপনার অ্যাকাউন্টে ৩,০০,০০,০০০ (তিন কোটি) টাকা সফলভাবে জমা হয়েছে।”
অর্কো ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে রইল।
নিজের এতদিনের সাহিত্যিক শুচিতা আর সব নিয়ম ভেঙে সে আজ কোটি টাকার বাণিজ্যিক চুক্তিতে সই করেছে। কিন্তু তার মনে এক ফোঁটাও অনুশোচনা নেই। গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে এক মুহূর্তের জন্য চোখ বুজল অর্কো। তারপর আর কোনো সময় নষ্ট না করে ড্যাশবোর্ডে ফোন সেট করে কল দিল রাশেদকে। দুই রিং হতেই ওপাশ থেকে রাশেদের আওয়াজ ভেসে এলো,
“কী রে অর্কো! কী খবর তোর?”
“তুই কি এখন ফ্রি আছিস?” অর্কো সোজা জিজ্ঞেস করল।
“আজকে তো শনিবার, আমার তো অফ-ডে! বাসাতেই আছি। কেন রে, তুই কই?”
“তুই মিরপুর দশ নম্বর মোড়ে এসে দাঁড়া,আমি আসতেছি তোকে নিতে।”
“আরে কী ব্যাপার বলবি তো? হুট করে মিরপুর আসতেছিস কেন?”
“গাড়িতে ওঠ, তারপর বলছি। তুই দাঁড়া,”
অর্কো আর কথা না বাড়িয়ে ফোনটা কেটে দিল।
গুলশান থেকে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালিয়ে অর্কো পৌঁছাল মিরপুর দশ নম্বর গোলচত্বরের কাছে। রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল রাশেদ। অর্কো গাড়ি থামিয়ে হর্ন দিতেই রাশেদ দরজা খুলে সামনের সিটে এসে বসল।
“কী রে, হুট করে গাড়ি নিয়ে এলি?” রাশেদ সিটবেল্ট বাঁধতে বাঁধতে জিজ্ঞেস করল।
“গাড়ি সোজা কুড়িল আর পূর্বাচলের এক্সপ্রেসওয়ের দিকে ঘুরাচ্ছিস ক্যান? যাবি কই বল তো?”
গাড়ি যখন কুড়িল পেরিয়ে ৩০০ ফিটের খোলা রাস্তায় উঠল, তখন অর্কো একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে কথা শুরু করল।
“শোন রাশেদ... সেদিন বিকেলে অর্পিতাকে নিয়ে যখন হাতিরঝিলে গিয়েছিলাম, ও আমাকে ওর একটা স্বপ্নের কথা বলেছিল। ওর খুব ইচ্ছে ওর একটা বড় সবুজ বাগান থাকবে, আর সেই বাগানের মাঝখানে থাকবে ছোট্ট একটা একতলা কটেজ ওই যে বিদেশে যেমন মডার্ন কাঁচ আর কাঠের বাড়ি থাকে না? যেখানে কোনো কোলাহল থাকবে না, শুধু ফুল আর পাখির ডাক থাকবে।”
অর্কোর গলার স্বর কিছুটা ভারী হয়ে এলো,
“ডাক্তার বলে দিয়েছে ওর হাতে সময় খুব কম। দিন দিন ওর শরীর দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। আমি ওর এই একটা স্বপ্ন যেভাবেই হোক সত্যি করতে চাই রে। আমার জমানো টাকা ছিল মাত্র ৮৬ লাখ।”
রাশেদ অবাক হয়ে বলল,
“তো হঠাৎ পূর্বাচলে জমি কিনতে যাচ্ছিস কীভাবে?”
“টাকার ব্যবস্থা হয়ে গেছে, আজ সকালেই আমি হায়মান নাফির অফিসে গিয়েছিলাম।”
“হায়মান নাফি!” রাশেদ চোখ বড় বড় করে তাকাল।
“হ্যাঁ,”
অর্কো বলল,
“নাফি ভাই দেশের সবচেয়ে বড় ৭০ কোটি টাকার অ্যাকশন-রোমান্টিক সিনেমা বানাচ্ছেন। আর সেই ছবির পুরো স্ক্রিপ্ট লেখার জন্য উনি আমাকে অফার করেছেন ৫ কোটি টাকা। আজ সকালেই চুক্তিতে সই করে এসেছি। আমার অ্যাকাউন্টে ৩ কোটি টাকার সাইনিং অ্যাডভান্স চলেও এসেছে।”
রাশেদ যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। সে হাঁ করে অর্কোর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
“কী বলিস এইসব!”
রাশেদ অবিশ্বাস্য চোখে জিজ্ঞেস করল,
“তুই তো এইসব কমার্শিয়াল অ্যাকশন মুভি সবসময় হেইট করতি, তাহলে হুট করে এটা করতে গেলি? আর হায়মান নাফির সাথে এত তাড়াতাড়ি যোগাযোগ করলি কীভাবে? এত দ্রুত সব ফাইনাল করে ফেললি কীভাবে?”
অর্কো সামনের পিচঢালা রাস্তার দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত গলায় বলল—
“নাফি ভাই আমাকে প্রায় এক-দুই সপ্তাহ ধরেই নিয়মিত মেইল পাঠাচ্ছিলেন। বারবার ওনার টিমের মাধ্যমে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছিলেন। আমি এতদিন কোনো রিপ্লাই দিইনি। কিন্তু কাল রাতে যখন দেখলাম অর্পিতার এই কটেজের জন্য আমার আরও ৪ কোটি টাকার বেশি লাগবে, তখন আর এক সেকেন্ডও দেরি করলাম না। কাল রাতেই মেইলের রিপ্লাই দিলাম, আর আজ সকালে গিয়ে সই করে আসলাম। টাকাটা তো আমার দরকারই ছিল রে রাশেদ।”
রাশেদ আর কোনো কথা বলতে পারল না। সে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল অর্কোর মুখের দিকে।
রাশেদ আবেগ সামলে একটু হাসল।
“চল, আজকে পুরো পূর্বাচল ঘুরে ভাবির জন্য সেরা জমিটাই পছন্দ করে আসব।”
পূর্বাচলের চওড়া পিচঢালা সড়ক আর বিভিন্ন সেক্টরের ভেতরে গাড়ি নিয়ে ঘুরতে লাগল অর্কো আর রাশেদ। কিন্তু গত দেড় ঘণ্টা ধরে চার-পাঁচটা প্লট দেখেও কোনোটাই ঠিকঠাক পছন্দ হচ্ছিল না। কোনোটা হয়তো মাত্র পাঁচ বা ছয় কাঠার ছোট্ট প্লট—যেখানে কটেজ বানালে খোলামেলা কোনো বাগান করার জায়গাই থাকে না। আবার কোনো কোনো জমি এত বড় আর এমন প্রত্যন্ত নিচু এলাকায় যে আশেপাশে কোনো পাকা রাস্তা বা জরুরি দোকানপাটের নামগন্ধও নেই। অর্পিতার এই অসুস্থ শরীরের জন্য হাসপাতাল, ফার্মেসি আর নিত্যপ্রয়োজনীয় সুবিধার বাইরে একদম জনমানবহীন এলাকায় গিয়ে ওঠাও নিরাপদ নয়।
ঘুরতে ঘুরতেই হঠাৎ গাড়ির ড্যাশবোর্ডে রাখা অর্কোর ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভাসছে—অর্পিতা। অর্কো কলটা রিসিভ করে কানে ধরল।
“হ্যালো, অর্পিতা?”
“অর্কো! এইমাত্র ফেসবুকে ঢুকতেই দেখলাম নাফি ফিল্মসের অফিশিয়াল পেজ থেকে তোমার আর হায়মান নাফির ছবি পোস্ট করা হয়েছে! ক্যাপশনে লেখা বছরের সেরা মেগাপ্রজেক্টে অর্কো আহমেদ! তুমি ওনার সাথে চুক্তি সই করেছ? কী করছ তুমি অর্কো? তুমি না এইসব কমার্শিয়াল অ্যাকশন ছবি একদম দেখতে পারতে না?”
অর্কো একটু ঢোক গিলে স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরল। সে খুব নরম গলায় বলল,
“আমি বাসায় এসে তোমাকে সব শান্ত মাথায় বুঝিয়ে বলছি অর্পিতা। দাঁড়াও, এখন খুব দরকারি একটা কাজে একটু বাইরে আছি। তুমি খেয়েছ তো? রেস্ট নাও... আমি দ্রুত ফিরে আসছি।”
অর্কো আর কথা না বাড়িয়ে খুব সাবধানে ফোনটা কেটে দিল।
ঠিক তখনই পাশের সিটে বসে নিজের মোবাইলে গুগল ম্যাপের স্যাটেলাইট ভিউ দেখছিল রাশেদ। সে হঠাৎ ম্যাপের একটি বিশেষ পয়েন্টে জুম করে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল—
“অর্কো, এই এরিয়াটা একটু দেখ তো... চল তো এই দিকটায় কোনো ভালো নিষ্কণ্টক জমি আছে কি না দেখে আসি। বাই দ্য ওয়ে, তোর আসলে কতটুকু জমি লাগবে বলে মনে হয়?”
অর্কো সামনের দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্ত ভাবল।
“মিনিমাম ১২ থেকে ১৫ কাঠা তো লাগবেই রে রাশেদ,”
রাশেদের দেখানো ম্যাপের লোকেশনটার দিকে চোখ বুলিয়ে অর্কোর চোখমুখ হঠাৎ কিছুটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
“হ্যাঁ, আইডিয়াটা খারাপ না চল, গিয়ে দেখি এই এরিয়াটায় কোনো ভালো প্লট খালি আছে কি না। এলাকাটা কিন্তু আসলেই বেশ ভালো রে রাশেদ। দেখ পাশে দরকারি সব গ্রোসারি শপ আর ফার্মেসি আছে, মেইন পিচঢালা রোডের সাথে একদম ডিরেক্ট কানেকশন, পাশে বেশ সুন্দর শান্ত একটা আবাসিক এলাকা গড়ে উঠেছে। আর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এখান থেকে একটু দূরেই একটা আর্মি ক্যাম্প আছে। চল, এই এলাকাটা ভালো করে খুঁজে দেখি।”
প্রধান সড়ক থেকে কিছুটা ভেতরে ঢুকতেই অর্কোর চোখ আটকে গেল একটি চমৎকার প্লটের ওপর।
প্রায় চল্লিশ ফুট চওড়া পিচঢালা রাস্তার ঠিক মাথায় উঁচু ভিটের একখণ্ড নিষ্কণ্টক জমি। চারপাশ দিয়ে হালকা সীমানা প্রাচীর দেওয়া, ভেতরে ঘন সবুজ ঘাস আর এক কোণে দুটো পুরোনো মেহগনি গাছ বাতাসে দুলছে। ঠিক অর্পিতার বর্ণনার সাথে মিলে যাওয়া এক স্বপ্নের মতো ক্যানভাস। সামনেই বড় বড় অক্ষরে লোহার বোর্ডে লেখা—
“জরুরি ভিত্তিতে ১৪ কাঠা উঁচু জমি বিক্রয় হইবে”
নিচে একটি ফোন নম্বর দেওয়া।
অর্কো গাড়ি থামাতেই রাশেদ মোবাইল বের করে বোর্ডে লেখা নম্বরটিতে ডায়াল করল।
লাউডস্পিকার অন করতেই ওপাশ থেকে বেশ রাশভারী কিন্তু ভদ্র এক বয়স্ক কণ্ঠ ভেসে এলো,
“হ্যালো, আসসালামু আলাইকুম।”
“ওয়ালাইকুম আসসালাম ভাই,” রাশেদ বলল।
“আমরা আপনার পূর্বাচলের ওই চৌদ্দ কাঠার প্লটের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। জমিটা কি এখনো অবিক্রীত আছে?”
“হ্যাঁ ভাই, জমি তো খালিই আছে, আপনারা ওখানেই দাঁড়ান। আমি তো পাশেই, ওই পেছনের তিনতলা সাদা বাড়িটাতেই থাকি। আমি পাঁচ মিনিটের ভেতর হেঁটে আসছি।”
মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই সাদা পাঞ্জাবি আর পায়জামা পরা ষাটোর্ধ্ব এক ভদ্রলোক হেঁটে এলেন। মুখে সফেদ দাড়ি, বেশ পরিপাটি আর মার্জিত চেহারা।
কাছে এসে তিনি হাসিমুখে হাত বাড়িয়ে দিলেন।
“আসসালামু আলাইকুম। আমি একেএম আসাদুজ্জামান।”
অর্কো আর রাশেদ সালাম দিয়ে হ্যান্ডশেক করল। আসাদুজ্জামান সাহেব হঠাৎ অর্কোর মুখের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে একটু থমকালেন।
“আরে! আপনি তো কথাসাহিত্যিক অর্কো আহমেদ না? বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেলেন”
অর্কো একটু বিনীতভাবে হেসে মাথা নোয়াল।
“জি আঙ্কেল, আমিই অর্কো।”
“মাশাআল্লাহ! আপনি আমার জমিতে এসেছেন, এটা তো আমার জন্য বিরাট আনন্দের ব্যাপার!”
আসাদুজ্জামান সাহেব জমিটা দেখিয়ে খুব আন্তরিক গলায় বলতে লাগলেন,
“পুরো চৌদ্দ কাঠা জমি। মেইন রোডের একদম কাছে, বিদ্যুৎ আর পানির লাইন একদম হাতের নাগালে। আর একটু ওপাশে তাকালেই তো আর্মি ক্যাম্প দেখতে পাচ্ছেন, সিকিউরিটি নিয়ে এই এলাকায় আজীবন কোনো চিন্তা করতে হবে না।”
রাশেদ একটু এগিয়ে এসে বলল,
“আঙ্কেল, জায়গাটা আমাদের পছন্দ হয়েছে। আপনি মালিক , সরাসরি বলেন প্রতি কাঠা কত হলে ছাড়বেন?”
আসাদুজ্জামান সাহেব একটু ভেবে বললেন,
“দেখেন বাবা, এই এলাকায় এখন কাঠাপ্রতি বিশ-বাইশ লাখ টাকার নিচে কোনো ভালো উঁচু জমি নেই। যেহেতু অর্কো বাবার মতো একজন গুণী মানুষ নিজে এসেছেন, আমি অতিরিক্ত কোনো দাম বলব না। একদামে কাঠাপ্রতি ১৮ লাখ টাকা হলে আমি ছেড়ে দেব।”
চৌদ্দ কাঠা ১৮ লাখ করে ধরলে মোট দাম দাঁড়ায় প্রায় আড়াই কোটি টাকার বেশি।
রাশেদ একটু হেসে বলল,
“আঙ্কেল, আমরা কিন্তু কোনো কমার্শিয়াল ডেভেলপার বা ফ্ল্যাট বানানোর পার্টি না। অর্কো নিজের থাকার জন্য সামনে একটা সুন্দর বাগান আর ছোট একতলা বাড়ি করবে। আর কোনো কিস্তি বা পেছানোর ব্যাপার নাই, পুরো টাকা আমরা একসাথে ক্যাশ পে-অর্ডারে দিয়ে জমি রেজিস্ট্রি করে নেব। আপনি একটু বিবেচনা করে সম্মানজনক একটা দাম বলেন।”
অর্কোও খুব নরম গলায় বলল,
“আঙ্কেল, আমার স্ত্রীর শারীরিক অবস্থা খুব একটা ভালো না। ও খোলামেলা একটা বাগান খুব পছন্দ করে। ওর জন্যই মূলত জায়গাটা নেওয়া। আপনি একটু সাহায্য করলে আমার খুব উপকার হয়।”
তারপর একটা লম্বা শ্বাস ফেলে মুচকি হেসে বললেন—
“ঠিক আছে অর্কো বাবা। তোমার স্ত্রীর জন্য যখন নিচ্ছ, আমি আর কোনো দরদামে যাব না। একদম ফাইনাল কাঠাপ্রতি সাড়ে ১৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এর এক পয়সাও নিচে আমার পক্ষে নামা সম্ভব না। চৌদ্দ কাঠায় মোট দুই কোটি পয়তাল্লিশ লাখ টাকা।”
রাশেদ অর্কোর দিকে তাকাল। পূর্বাচলের এত প্রাইম লোকেশনের জন্য এই দামটা সত্যিই অসম্ভব ভালো এবং বাস্তবসম্মত। অর্কো সাথে সাথে রাজি হয়ে গেল।
“আলহামদুলিল্লাহ আঙ্কেল। আমি এই দামেই জমি নিচ্ছি,”
অর্কো নিজের পকেট থেকে ফোন বের করল।
আসাদুজ্জামান সাহেব বললেন,
“তাহলে বাবা, তুমি আপাতত বায়না হিসেবে পাঁচ লাখ টাকার একটা টোকেন দিয়ে যাও। আমি কাল সকালের মধ্যেই আমার উকিলকে দিয়ে সিএস, এসএ, আরএস আর মিউটেশনের সমস্ত মূল দলিল রেডি রাখব। কাল দুপুরে তোমরা কাগজপত্র দেখে সন্তুষ্ট হলে বাকি টাকা পে-অর্ডার করে সোজা রেজিস্ট্রি অফিসে চলে যাব।”
“ঠিক আছে আঙ্কেল। আমি এখনই আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টোকেনের পাঁচ লাখ টাকা ট্রান্সফার করে দিচ্ছি। বাকি দুই কোটি একচল্লিশ লাখ টাকা কাল পেপারওয়ার্ক শেষ হলে রেজিস্ট্রি টেবিলে পে-অর্ডার পেয়ে যাবেন।”
পাঁচ মিনিটের মধ্যে অর্কো ব্যাংকের অ্যাপ দিয়ে আসাদুজ্জামান সাহেবের অ্যাকাউন্টে পাঁচ লাখ টাকার বায়না ট্রান্সফার করে দিল। সব কথাবার্তা পাকা করে তারা যখন গাড়িতে উঠল, তখন বিকেলের সোনাঝরা রোদ এসে পড়েছে পূর্বাচলের সেই সবুজ জমির ওপর।
ইঞ্জিন স্টার্ট দিয়ে গাড়ি এবার উত্তরার দিকে ঘুরিয়ে নিল অর্কো। এত বড় একটা কাজের প্রথম ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন করে তার বুকের ভেতর তখন বইছিল এক পরম স্বস্তির হাওয়া।
৩০০ ফিট এক্সপ্রেসওয়ে ধরে গাড়ি যখন ঢাকার দিকে ছুটছিল, স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে অর্কোর মাথায় তখন টাকার জটিল অঙ্ক ঘুরপাক খাচ্ছিল।
সে পাশের সিটে বসা রাশেদের দিকে তাকিয়ে একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বলল—
“হিসেবটা দেখছিস রাশেদ? এত দামের জমি... প্রায় সব টাকাই তো এক ঝটকায় চলে গেল রে। নাফি ভাইয়ের কাছ থেকে অ্যাডভান্স পেয়েছিলাম তিন কোটি টাকা। জমির রেজিস্ট্রেশনের খরচ মেটালে আমার অ্যাকাউন্টে অবশিষ্ট থাকবে এই ধর এক কোটির কিছু বেশি টাকা। আর স্ক্রিপ্টের বাকি দুই কোটি তো পাব আরও সেই কত মাস পর, সিনেমা রিলিজের পর... ততদিনে কি এই এক কোটি দিয়ে এত বড় জমি বাউন্ডারি দেওয়া, কটেজ তোলা আর বাগান করা সম্ভব?”
রাশেদ সিটে হেলান দিয়ে শুনছিল। অর্কো আবার বলল—
“অর্পিতার তো সময় কম রে। এত বড় কাজটা কাদের দিয়ে করানো যায় বল তো? তোর পরিচিত বিশ্বস্ত কোনো ফার্ম বা ইঞ্জিনিয়ার আছে? অভিজ্ঞ কারও সাথে বসে প্ল্যান রেডি করে খরচের পুরো বাজেটটা দাঁড় করালে খুব সুবিধা হতো।”
রাশেদ এক মুহূর্ত ভাবল। তারপরই তার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
“দাঁড়া, একটা ব্যবস্থা করতেছি,”
রাশেদ পকেট থেকে নিজের ফোনটা বের করল।
সে দ্রুত একটি নম্বরে ডায়াল করে স্পিকারে দিয়ে কানে ধরল। কয়েকটা রিং হতেই ওপাশ থেকে এক রাশভারী ও ব্যস্ত কণ্ঠ ভেসে এলো—
“হ্যাঁ রাশেদ, বলো। কী খবর?”
“আসসালামু আলাইকুম আশফাক ভাই,আপনি এখন কই? অফিসে?”
“হ্যাঁ, অফিসে। একটা রিসোর্টের আর্কিটেকচারাল ডিজাইন নিয়ে বসে আছি। কোনো কাজ ছিল?”
“বিশাল একটা কাজ আছে ভাই,আমাদের লেখক অর্কো জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত অর্কো আহমেদ, উনি পূর্বাচলে আজই চৌদ্দ কাঠা জমি ফাইনাল করেছেন। সেখানে খুব দ্রুত একটা কটেজ আর খোলামেলা ফুলের বাগান করতে হবে। প্রি-ফেব্রিকেটেড স্টিল আর গ্লাসের কাজ, যাতে খুব অল্প সময়ে রেডি করা যায়। আপনি কি কাল সকালে আপনার চিফ আর্কিটেক্ট আর টিম নিয়ে কিছু স্যাম্পল প্ল্যানসহ ওনার বাসায় আসতে পারবেন?”
ওপাশ থেকে ইঞ্জিনিয়ার আশফাক সাহেব বেশ উৎসাহিত হয়ে উঠলেন।
“অর্কো আহমেদ! ওনার তো আমি নিজেও বিরাট ফ্যান! অবশ্যই পারব রাশেদ। কাল দুপুরে আমি ড্রয়িং, থ্রি-ডি মডেল ক্যাটালগ আর এস্টিমেশন শিট নিয়ে সোজা ওনার উত্তরার ফ্ল্যাটে চলে আসব।”
“থ্যাংক ইউ আশফাক ভাই, কাল দেখা হচ্ছে।”
ফোনটা কেটে দিয়ে রাশেদ অর্কোর কাঁধে একটা জোরে চাপড় দিল। তার মুখে বিজয়ের হাসি।
“কাজ শেষ মামা! কালই ইঞ্জিনিয়ার আশফাক ভাই পুরো টিম নিয়ে প্ল্যান আর খরচের হিসাবসহ তোর বাসায় হাজির হবে। তুই ভাবিকে সারপ্রাইজটা কাল সকালেই ওনাদের সামনে দিস। একদম তৈরি ক্যাটালগ দেখে ভাবি নিজে পছন্দ করতে পারবে ওনার ঘর কেমন হবে।”
অর্কো একটু হাসল, কিন্তু তার কপালের চিন্তার রেখা পুরোপুরি মুছল,
“কিন্তু হাতে থাকা এই এক কোটির কিছু বেশি টাকা কি এনাফ হবে রে রাশেদ? আর্কিটেকচারাল কাজ, বিদেশি গাছপালা আর ইন্টেরিয়র মেলালে তো আরও টাকার প্রয়োজন পড়তে পারে। তবে দেখি... নিশির সেই হরর সিনেমার স্ক্রিপ্ট তো জমা দিয়ে দিয়েছি, নিশির কাছ থেকেও আগের রয়্যালটি আর পারিশ্রমিক বাবদ এখনো প্রায় ৪০ লাখ টাকার মতো পাওয়ার কথা।”
রাশেদ একমত হয়ে মাথা নাড়ল।
“কাল সকালে আশফাক ভাই আসুক, ড্রয়িংটা আগে ফাইনাল করি।”
রাশেদকে মিরপুরের রাস্তায় নামিয়ে দিয়ে গাড়ি নিয়ে উত্তরার বাসায় যখন ফিরল অর্কো, তখন বাইরে বেশ ভালোভাবেই সন্ধ্যা নেমে এসেছে।
কলিংবেল বাজিয়ে ভেতরে ঢুকতেই দেখা গেল ড্রয়িংরুমের সোফায় বালিশে ঠেস দিয়ে বসে আছে অর্পিতা। নাকের নিচে যথারীতি সেই সরু প্লাস্টিকের নলের অক্সিজেন সাপোর্ট, তবে তার চোখেমুখে ছিল স্পষ্ট এক বিচলিত উৎকণ্ঠা। পাশে এক কোণায় মেডিকেলের মোটা গাইড বই খুলে বসে ছিল অর্পা। অর্কোকে ঘরে ঢুকতে দেখেই অর্পিতা যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল, কিন্তু পরক্ষণেই তার ভ্রু দুটো কুঁচকে গেল।
“কই ছিলে তুমি সারাদিন অর্কো? সেই সকাল দশটায় বের হলে, এখন বাইরে মাগরিবের আজান পড়ে সন্ধ্যা হয়ে গেছে! আর ফেসবুকে ওই ছবিটা কী দেখলাম? হায়মান নাফির সাথে সিনেমা নিয়ে কী করছ তুমি বলো তো?”
অর্কো জুতো খুলে চাবিটা সাইড টেবিলে রেখে খুব শান্ত মুখে এগিয়ে এলো। সে সোফায় অর্পিতার ঠিক পাশে বসে একটু হেসে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল—
“আরেহ অর্পিতা, এত বিচলিত হচ্ছ কেন? ভাবলাম এতদিন তো শুধু ডার্ক সাইকোলজি আর নিজের পুরোনো চেনা অনেক কাজ করলাম। এবার একটু আলাদা কমার্শিয়াল জনরায় কাজ করে দেখি কেমন হয়। নাফি ভাই তো গত এক-দেড় সপ্তাহ ধরেই বড় বাজেটের এই প্রজেক্টটা নিয়ে আমার পেছনে লেগেছিলেন। অনেকগুলো বড় অফার তো এমনিতেই পেন্ডিং ছিল, তাই ভাবলাম এটা করেই ফেলি। এই তো... এসব পেপারওয়ার্ক আর আলোচনা করতেই একটু দেরি হয়ে গেল। তুমি ঠিকমতো সময়মতো খাওয়াদাওয়া করেছ তো?”
অর্পিতা অর্কোর মুখের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“হ্যাঁ, খেয়েছি,প্রাপ্তি আর অর্পা সময়মতো চিকেন স্যুপ আর নরম ভাত খাইয়ে দিয়েছে। ওষুধও খেয়েছি। কিন্তু তুমি হঠাৎ এই কমার্শিয়াল অ্যাকশন ছবিতে ঢুকলে... তোমার সাহিত্যিক ইমেজ নষ্ট হবে না অর্কো?”
“কিচ্ছু নষ্ট হবে না, তুমি অত চিন্তা কোরো না তো,”
তারপর সে সোফার উল্টো দিকে বইয়ের ওপর গাল ঠেকিয়ে বসে থাকা অর্পার দিকে তাকিয়ে একটু হাসল।
“অর্পা তোমার এই এক মাসের ছুটির তো মনে হয় আর দশ দিনের মতো বাকি আছে, তাই না?”
অর্পা বই থেকে মুখ তুলে একটা মলিন হাসি দিল।
“হ্যাঁ দুলাভাই... আর মাত্র দশটা দিন বাকি,”
অর্পা খুব মনমরা গলায় বলল,
“দিনাজপুরে ফিরে যেতে আমার একটুও মন টানছে না দুলাভাই। আপুকে এই অসুস্থ অবস্থায় রেখে ওই দূর ক্যাম্পাসে একা একা গিয়ে বসে থাকতে আমার একদম ইচ্ছে করছে না। আপুকে আমি খুব মিস করবো... মনটা কেমন যেন ছটফট করে।”
অর্পিতা বলল,
“কী রে বোকা মেয়ে! পড়ালেখা বাদ দিয়ে আমার কাছে বসে থাকলে তোর চলবে? তুই তো অনেক বড় ডাক্তার হবি!”
অর্কোও খুব ভরসা দিয়ে অর্পাকে বলল—
“আপু একদম ঠিক বলেছে অর্পা। মন খারাপ করার কোনো কারণ নেই। দিনাজপুর তো এমন কোনো দূরের পথ না। তুমি যাবে, মন দিয়ে ক্লাস করবে, আর সামনে মিড এক্সামটা শেষ হওয়া মাত্রই আবার সোজা ঢাকা চলে আসবে। আমরা তো এখানেই আছি।”
অর্পা একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে মাথা নাড়ল।
পরদিন সকালে সাব-রেজিস্ট্রি অফিস খোলার অনেক আগেই ঘুম থেকে উঠে দ্রুত প্রস্তুত হয়ে নিল অর্কো।
তার মনে তখন একই সাথে প্রবল তাড়া আর এক অদ্ভুত উত্তেজনা। একদিকে জমি রেজিস্ট্রি করার কাজ, অন্যদিকে দুপুরের দিকে ইঞ্জিনিয়ার আশফাক সাহেবের দলবল নিয়ে কটেজ আর বাগানের থ্রি-ডি প্ল্যান নিয়ে বাসায় আসার কথা। সব মিলিয়ে সময়ের এক চরম টানাটানি।
শোবার ঘরে তখন ফিজিওথেরাপিস্ট তানিয়া এসে অর্পিতার পায়ের নিয়মিত থেরাপি শুরু করে দিয়েছিলেন। বিছানায় আধশোয়া অর্পিতার পায়ে বিভিন্ন মুভমেন্ট দেওয়া হচ্ছিল।
অর্কো শোবার ঘরে উঁকি দিয়ে খুব নরম গলায় বলল,
“অর্পিতা, আমার একটা জরুরি অফিশিয়াল কাজ আছে বাইরে। আমি ঘণ্টা দুই-তিনের মধ্যে সব কাজ সেরে চলে আসছি। তুমি ঠিকমতো নাস্তা খেয়ে থেরাপিটা শেষ করো।”
অর্পিতা একটু হেসে মাথা নেড়ে বলল,
“আচ্ছা, সাবধানে যেয়ো কিন্তু।”
অর্কো আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। ব্যাংক থেকে আগের দিন রেডি করিয়ে রাখা দুই কোটি পয়তাল্লিশ লাখ টাকার পে-অর্ডারের ফাইল, পাসপোর্ট সাইজ ছবি আর জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপিগুলো একটি ফাইলে নিয়ে সে নিচে নেমে গাড়িতে উঠল।
মিরপুর থেকে রাশেদকে তুলে নিয়ে সোজা পূর্বাচল সংলগ্ন সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে পৌঁছাল তারা।
রেজিস্ট্রি অফিসের সামনে উকিলের চেম্বারে আসাদুজ্জামান সাহেব আগে থেকেই সমস্ত মূল কাগজপত্র নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। সিএস, এসএ, আরএস খতিয়ান, নামজারি পর্চা আর হালনাগাদ খাজনার রসিদ রাশেদ আর অর্কো খুব খুঁটিয়ে সব লিগ্যাল ডকুমেন্ট যাচাই করে নিল। কোনো প্রকার ভেজাল বা জটিলতা ছিল না।
ঘণ্টাখানেকের মধ্যে সাব-রেজিস্ট্রারের এজলাসে গিয়ে আঙুলের ছাপ, ছবি আর প্রয়োজনীয় সমস্ত সই সম্পন্ন হলো। দলিল রেজিস্ট্রি হওয়ার সাথে সাথে অর্কো ব্যাংকের সেই বিশাল অংকের পে-অর্ডার আসাদুজ্জামান সাহেবের হাতে পরম শ্রদ্ধায় তুলে দিল। কাগজপত্র আর চূড়ান্ত রসিদ পকেটে পুরে রাশেদকে নিয়ে যখন অর্কো উত্তরার ফ্ল্যাটে ফিরে এলো, ঘড়িতে তখন বেলা পৌনে একটা। সব মিলিয়ে প্রায় তিন ঘণ্টার এই সফল দৌড়ঝাঁপ শেষে সদর দরজা খুলে ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই দেখা গেল সোফায় বসে বইয়ের পাতা ওল্টাচ্ছিল অর্পিতা। অর্কোর সাথে রাশেদকে ঘরে ঢুকতে দেখেই অর্পিতার ফ্যাকাশে মুখে এক নিমেষে একরাশ নির্মল আনন্দ খেলে গেল। তার চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
“আরে রাশেদ ভাই!”
অর্পিতা সোফায় একটু সোজা হয়ে বসে মুখে এক চওড়া হাসি টেনে বলল,
“আপনি এসেছেন? কতদিন পর দেখা হলো আপনার সাথে!”
রাশেদ ড্রয়িংরুমের সিঙ্গেল সোফাটায় গিয়ে বসল।
“আসসালামু আলাইকুম ভাবি! কী খবর আপনার? আজ কিন্তু আপনার চেহারা দেখে অনেক ভালো লাগতেছে। চোখের নিচের সেই কালচে ভাবটা অনেকটাই কেটে গেছে মাশাআল্লাহ।”
অর্পিতা হেসে সালামের উত্তর দিল,
“ওয়ালাইকুম আসসালাম ভাইয়া। এই তো আছি একরকম। তা মরিয়ম কেমন আছে? ও আসেনি আপনার সাথে? একা একা চলে আসলেন যে?”
রাশেদ একটু মাথা চুলকে হেসে বলল,
“মরিয়ম ভালো আছে ভাবি। আসলে ও তো স্কুলে জয়েন করেছে, আজ খাতা দেখার একটু চাপ ছিল। ওরে বলেছিলাম সাথে আসতে, ও বলল সামনের শুক্রবার একদম পুরো ছুটির দিন নিয়ে আসবে, আপনার পাশে বসে সারাদিন জমিয়ে আড্ডা দেবে।”
“হ্যাঁ, মরিয়মকে নিয়ে আসবেন অবশ্যই,”
অর্পিতা বইটা কোলের ওপর বন্ধ করে রেখে একটু আনমনা দৃষ্টিতে ড্রয়িংরুমের চারপাশটায় চোখ বোলাল,
“আমি তো ভাইয়া এখন সারাদিন এই ড্রয়িংরুমের সোফাটায় বসেই সময় পার করি। পায়ের জোর তো আর আগের মতো নেই, একা একা হাঁটাচলা করতে ভয় লাগে। তাই এখানেই বসে থাকি... টিভি দেখি, বই পড়ি, আর জানালার দিকে চেয়ে চেয়ে বাইরের আকাশ দেখি। আগের মতো তো আর জীবনটা নেই ভাইয়া। একসময় কত দৌড়াদৌড়ি করেছি, সংসারের প্রতিটা কোণা নিজের হাতে সাজিয়েছি... এখন সব যেন কেমন বদলে গেছে।”
“ভাবি, এভাবে মন ছোট করবেন না একদম। তা ছাড়া অর্কো তো চব্বিশ ঘণ্টা আপনার ছায়ার মতো পাশে আছে।নিজের মনের জোরটা একদম হারাবেন না।”
ঠিক সেই মুহূর্তেই ফ্ল্যাটের সদর দরজায় কলিংবেল বেজে উঠল।
টুং... টাং...
অর্কো আর রাশেদ মুহূর্তের মধ্যে একে অপরের মুখের দিকে তাকাল। অর্কো উঠে গিয়ে সদর দরজাটা খুলে দিল।
দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার আশফাক সাহেব। সাথে তাঁর অফিসের তরুণ এক সহকারী আর্কিটেক্ট এবং ফাইলপত্র হাতে আরেকজন কর্মী। আশফাক সাহেবের হাতে বড় একটি ল্যাপটপ ব্যাগ, আর সহকারীর কাঁধে ঝুলছে বড় বড় ব্লু-প্রিন্টের ড্রয়িং টিউব।
“আসসালামু আলাইকুম অর্কো ভাই!” আশফাক সাহেব হাসিমুখে হাত বাড়িয়ে দিলেন।
“সময়মতোই চলে এলাম।”
“ওয়ালাইকুম আসসালাম আশফাক ভাই। আসুন, ভেতরে আসুন,”
অর্কো তাঁদের ড্রয়িংরুমে নিয়ে এলো।
ড্রয়িংরুমের সোফায় এতজন অচেনা মানুষকে ফাইলপত্র আর ড্রয়িং টিউব নিয়ে ঢুকতে দেখে অর্পিতা বেশ কিছুটা অবাক হয়ে গেল। সে চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে একটু দ্বিধাদ্বন্দ্বে অর্কোর দিকে তাকাল।
“এনারা কারা অর্কো? কোনো নতুন কাজের ব্যাপার?”
অর্কো সোফায় অর্পিতার ঠিক পাশে এসে বসল। সে খুব শান্তভাবে অর্পিতার হাতটা নিজের দুই হাতের ভেতর তুলে নিল,
“অর্পিতা, মনে আছে সেদিন সন্ধ্যায় হাতিরঝিলে বসে তুমি আমাকে কী বলেছিলে? তোমার খুব ইচ্ছে ছিল তোমার একটা বড় সবুজ বাগান থাকবে, আর সেই বাগানের মাঝখানে থাকবে কাঁচের জানালার চমৎকার একতলা একটা কটেজ... যেখানে তুমি মনভরে নিঃশ্বাস নিতে পারবে।”
অর্পিতা চোখ বড় বড় করে অর্কোর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
অর্কো একটু হেসে বলল,
“আজ সকালে আমি আর রাশেদ রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়েছিলাম। পূর্বাচলের শান্ত নিরিবিলি এলাকায় মেইন রোডের একদম কাছে ঠিক চৌদ্দ কাঠার একটা উঁচু জমি রেজিস্ট্রি হয়ে গেছে। আর ইনি হচ্ছেন ইঞ্জিনিয়ার আশফাক ভাই। ওনারা তোমার সেই স্বপ্নের কটেজ আর বাগানের পুরো ডিজাইনটা তৈরি করে নিয়ে এসেছেন।”
মুহূর্তের মধ্যে অর্পিতার মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। সে যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতেই পারছিল না।
“তুমি কি পাগল হয়ে গেছো অর্কো?”
অর্পিতা একপ্রকার শক্ত গলায় ধমক দেওয়ার মতো করে বলে উঠল,
“পূর্বাচলে চৌদ্দ কাঠা জমি! তারপর সেখানে কটেজ আর এত বড় বাগান... তুমি জানো এতে কত টাকা লাগে? এত কোটি টাকা কেন খরচ করতে গেলে তুমি বলো তো? আমাদের কি এই ফ্ল্যাটে জায়গা হচ্ছিল না? তুমি এমন পাগলামি কীভাবে করতে পারলে অর্কো এতো টাকা তুমি কথায় পেলে?”
অর্কো অর্পিতার এই বকুনি শুনে কেবল মুচকি হাসল। সে কোনো পাল্টা তর্ক না করে পেছনের সোফায় বসা রাশেদের দিকে তাকাল।
“রাশেদ, আমার স্টাডি রুমের ক্যাবিনেট থেকে পোর্টেবল প্রজেক্টর আর সাদা পর্দাটা একটু নিয়ে আয় তো রে।”
“এই তো নিয়ে আসছি!”
রাশেদ এক লাফে উঠে স্টাডি রুমের দিকে চলে গেল।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই রাশেদ ট্রাইপডসহ সাদা প্রজেক্টর স্ক্রিন আর ছোট প্রজেক্টরটি এনে ড্রয়িংরুমের সেন্ট্রাল টেবিলের ওপর রাখল। ইঞ্জিনিয়ার আশফাক সাহেব আর তাঁর সহকারী এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করলেন না। ড্রয়িংরুমের জানালার পর্দাগুলো টেনে দিয়ে কিছুটা অন্ধকার করা হলো। তারপর দেয়ালের পাশে সাদা পর্দাটা টানিয়ে ল্যাপটপের সাথে প্রজেক্টরের ক্যাবল জুড়ে দিলেন আশফাক সাহেব। মেশিন অন হতেই লেন্স থেকে নীলচে আলো ছিটকে এসে পড়ল সাদা পর্দার ওপর।
প্রজেক্টরের নীলচে আলোয় পুরো ড্রয়িংরুমের দেয়াল জুড়ে স্পষ্ট হয়ে উঠল স্থাপত্যের নিখুঁত এক ব্লু-প্রিন্ট।
ড্রয়িংরুমের সবাই—সোফায় বসা অর্পিতা, পাশে অর্কো, এক কোণে দাঁড়ানো অর্পা, দরজার কাছে থাকা প্রাপ্তি আর পেছনের সোফায় বসা রাশেদ—একযোগে তাকিয়ে রইল স্ক্রিনের দিকে। পর্দার ঠিক ওপরে বড় বড় হরফে লেখা:
“RESIDENTIAL COTTAGE ESTATE — 14 KATHA (10,080 SQ FT) A HOME AMIDST NATURE”
ইঞ্জিনিয়ার আশফাক সাহেব লেজার পয়েন্টার হাতে প্রজেক্টর স্ক্রিনের সামনে এসে দাঁড়ালেন।
“ভাই, ভাবি... প্লিজ স্ক্রিনের দিকে খেয়াল করুন,”
আশফাক সাহেব লেজারের লাল বিন্দুটা সাইট প্ল্যানের চারকোণায় ঘুরিয়ে বলতে শুরু করলেন।
“পুরো জমিটা হচ্ছে দৈর্ঘ্য ১৪৪ ফুট আর প্রস্থে ৭০ ফুট অর্থাৎ মোট ১০,০৮০ স্কয়ার ফিটের ১৪ কাঠা। চারপাশ দিয়ে সরকারি নিয়ম মেনে ৫ ফুটের সেটব্যাক খালি রাখা হয়েছে।”
আশফাক সাহেব এবার পয়েন্টারটা সামনের দিকে ধরলেন।
“পাবলিক রোড থেকে ঢোকার জন্য এখানে ১২ ফুট চওড়া মেইন গেট। গেট দিয়ে ঢুকতেই বাঁ পাশে ১৬ ফুট বাই ২০ ফুটের কার পার্কিং, যেখানে অনায়াসে দুটো বড় গাড়ি রাখা যাবে। ঠিক পাশেই ৮ ফুট বাই ৮ ফুটের গার্ড রুম আর ১০ ফুট বাই ৮ ফুটের ইউটিলিটি স্টোর ও জেনারেটর রুম রাখা হয়েছে।”
পয়েন্টারটা এবার এগিয়ে গেল সামনের বিশাল খোলা চত্বরে।
“গাড়ি পার্ক করে ভেতরে ঢোকার পুরো পথটা তৈরি হবে কার্ভড গ্রাভেল আর স্টেপিং স্টোন দিয়ে। সামনে কোনো কনক্রিট নেই পুরোটাই ২৮ ফুট বাই ২৪ ফুটের বিশাল একটি সবুজ বৃত্তাকার লন। চারপাশ দিয়ে নানা জাতের ফুলের গাছ, ঝোপঝাড় আর পাম ট্রি দিয়ে বাউন্ডারি ঢাকা থাকবে, যাতে রাস্তা থেকে ভেতরে কিছু দেখা না যায়।”
রাশেদ সোফায় একটু সামনে ঝুঁকে এসে মুগ্ধ গলায় বলে উঠল,
“আশফাক ভাই, সামনের এই কার্ভড লনের আইডিয়াটা কিন্তু দারুণ!”
আশফাক সাহেব হাসলেন। তারপর পয়েন্টারটা সোজা কটেজের ওপর ফেললেন।
“এবার মূল কটেজে আসি। পুরো জমিতে আমরা কনক্রিটের কোনো জঙ্গল বানাব না। ১০ হাজার স্কয়ার ফিটের মধ্যে মূল কটেজের বিল্ট-আপ এরিয়া মাত্র ১,৭০০ স্কয়ার ফিট—বাকি ৫,২০০ স্কয়ার ফিটেরও বেশি জায়গা পুরোটাই খোলা বাগান আর ঘাসের চত্বর।”
আশফাক সাহেব অর্পিতার দিকে তাকিয়ে খুব নরম গলায় বললেন,
“কটেজের সামনে ৮ ফুট চওড়া বড় বারান্দা। সিঁড়ির ঠিক পাশেই আমরা একটি জেন্টল স্লোপের হুইলচেয়ার র্যাম্প রেখেছি, যাতে কোনো স্টেপ ছাড়াই যেকোনো সময় হুইলচেয়ার নিয়ে একদম বারান্দা হয়ে ড্রয়িংরুমে ঢুকে যাওয়া যায়।ভেতরে ঢুকলেই ১৬ ফুট বাই ১৪ ফুটের ড্রয়িং বা লিভিং এরিয়া,”
আশফাক সাহেব ভেতরে দেখাতে লাগলেন,
“তার পেছনেই ১২ ফুট বাই ১০ ফুটের ডাইনিং, আর একদম মাঝে ১০ ফুট বাই ১০ ফুটের মডার্ন কিচেন। বাঁ পাশে সবচেয়ে আলো-বাতাস পাওয়া কর্নারটায় রাখা হয়েছে ১৪ ফুট বাই ১২ ফুটের মাস্টার বেডরুম। এই রুমের দুটি দেওয়াল জুড়েই থাকবে ফ্লোর-টু-সিলিং কাঁচের স্লাইডিং উইন্ডো—বিছানায় শুয়েই যেন বাইরের পুরো বাগানটা চোখে পড়ে।”
আশফাক সাহেব এবার কটেজের পেছনের অংশটায় লেজার ফেললেন।
“আর কটেজের ঠিক পেছনে রয়েছে আমাদের আসল আকর্ষণ,পেছনের বাঁ পাশে রাখা হয়েছে ২২ ফুট বাই ১৮ ফুটের একটি শান্ত, নীল পানির আর্টিফিশিয়াল পুকুর। পুকুরের ওপর কাঠ দিয়ে তৈরি একটি এক্সটেন্ডেড উডেন ডেক থাকবে, যেখানে দুটো আরামকেদারা পাতা থাকবে পানিতে পা ঝুলিয়ে বসার জন্য। আর পুকুরের ঠিক ওপাশে পেছনের বাগানের ছায়ায় থাকবে ১৬ ফুট বাই ১৬ ফুটের একটি গোল বাঁধানো সিটিং এরিয়া।”
লেজারের আলোটা এবার চলে গেল কটেজের পশ্চিম পাশে।
“আর ভাবি, আপনার জন্য স্পেশাল ব্যবস্থা মাস্টার বেডরুমের লাগোয়া পশ্চিম চত্বরে রাখা হয়েছে ১৪ ফুট বাই ২০ ফুটের একটি সুন্দর কিচেন বা ভেজিটেবল গার্ডেন। এখানে নিজের হাতে টাটকা শাকসবজি, টমেটো, ধনেপাতা লাগানো যাবে।”
দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাপ্তি মুখ হেসে বলল,
“কিচেনের পেছনে আলাদা একটা এক্সিট ডোর আছে স্যার। সবজি বাগান থেকে সোজা টাটকা শাকপাতা তুলে কিচেনে নিয়ে আসা যাবে, খুব সুবিধা হবে।”
আশফাক সাহেব ড্রয়িংয়ের একদম নিচের ডান কোণে লেখা একটি উদ্ধৃতির ওপর আলো ফেললেন। সেখানে খুব নান্দনিক ফন্টে লেখা—
“A home, a garden, a forever kind of peace...”
অর্কো স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে সোফায় বসে থাকা অর্পিতার মুখের দিকে তাকাল।
অর্পিতা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল সেই পুকুর আর কাঠের ডেকটার দিকে। তার চোখ দিয়ে তখন টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ছে। অর্কো খুব নিচু গলায় অর্পিতার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল—
“পছন্দ হয়েছে তোমার, অর্পিতা?”
অর্পিতা কাঁপা হাতে নিজের চশমাটা খুলে অর্কোর হাতের ওপর শক্ত করে মাথা রাখল। সে কোনোমতে ভেজা গলায় বলল—
“এটা তো আমার স্বপ্নের চেয়েও অনেক বেশি সুন্দর রে অর্কো... অনেক বেশি সুন্দর।”
অর্কো ড্রয়িংরুমের প্রজেক্টর স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে সোজা তাকাল আশফাক সাহেবের দিকে।
“ডিজাইন নিয়ে কোনো কথা হবে না আশফাক ভাই, এটা নিখুঁত হয়েছে। কিন্তু এখন আমার দুটো একদম প্র্যাকটিক্যাল বিষয় জানা দরকার। প্রথমত, এই পুরো প্রজেক্টটা শেষ করতে আমাদের মোটামুটি কত টাকা খরচ দাঁড়াবে? আর দ্বিতীয়ত, সবচেয়ে জরুরি যেটা কাজটা কমপ্লিট করতে আপনাদের কতদিন সময় লাগবে? আমার কিন্তু খুব জলদি প্রয়োজন, যত দ্রুত সম্ভব হ্যান্ডওভার লাগবে।”
আশফাক সাহেব ল্যাপটপের পাশে রাখা তাঁর এস্টিমেশন নোটপ্যাডটা খুলে চশমাটা নাকের ওপর একটু নামালেন,
“অর্কো ভাই, আমরা আগেই রাশেদের সাথে কথা বলে হিসেবটা একদম আইটেম ওয়াইজ ব্রেকডাউন করে রেখেছি। আমি আপনাকে সরাসরি রাফ ফিগারটা দিচ্ছি।”
আশফাক সাহেব নোটপ্যাডের পাতায় পেনসিল দিয়ে নির্দেশ করে বললেন,
“আমাদের মূল কটেজটা ১,৭০০ স্কয়ার ফিটের, সাথে ৩০০ স্কয়ার ফিটের ফ্রন্ট বারান্দা। যেহেতু আমরা আরসিসি কনক্রিটের ভারী ঢালাইয়ে যাচ্ছি না, বরং প্রি-ফেব্রিকেটেড হেভি স্টিল ফ্রেম, ইনসুলেটেড ড্রাই-ওয়াল প্যানেল আর ফ্লোর-টু-সিলিং টেম্পার্ড গ্লাস ইউজ করছি ইন্টেরিয়র, কিচেন ক্যাবিনেট আর বাথরুম ফিটিংসহ মূল কটেজটাতে খরচ পড়বে প্রায় ৫৫ থেকে ৫৮ লাখ টাকা।”
তিনি পাতার পরের অংশে গেলেন,
“এরপর আসেন সাইট ডেভেলপমেন্টে। পুরো ১৪ কাঠা জমির চারপাশ দিয়ে ৪৩০ রানিং ফিটের বাউন্ডারি ওয়াল, মেইন ড্রাইভওয়ের ১২ ফুট লোহার গেট, গার্ড রুম আর ইউটিলিটি স্টোরে যাবে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ লাখ। পেছনের ২২ বাই ১৮ ফুটের পুকুর খনন, পাড় বাঁধাই, কাঠের ডেক আর পানি রিসার্কুলেশনের পাম্পে লাগবে আরও ১০ লাখের মতো।”
আশফাক সাহেব অর্পিতার দিকে একবার তাকিয়ে বললেন,
“আর বাকি রইল আপনার এই ৫ হাজার স্কয়ার ফিটের বিশাল ল্যান্ডস্কেপিং। রেডি টার্ফ ঘাস বিছানো, নার্সারি থেকে বড় বড় ট্রান্সপ্লান্টেড ফলের গাছ এনে বসানো, ফুলের চত্বর, কার্ভড পেভমেন্ট আর পেছনের বসার জায়গা—এতে যাবে প্রায় ১৫ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে এক্সট্রা কিছু আনসিন কস্টসহ আমাদের টোটাল বাজেট দাঁড়াবে ১ কোটি ২৫ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।”
বাজেটটা শুনে অর্কোর কপাল কিছুটা হালকা হলো। জমির দাম দেওয়ার পর তার হাতে থাকা জমানো টাকা আর নাফির অ্যাডভান্সের অবশিষ্ট মিলিয়ে প্রায় এই অংকের টাকাই তার অ্যাকাউন্টে মজুত আছে। ফলে অর্থের দিক থেকে কোনো বড় ধাক্কা আসবে না।
“আর টাইমলাইন, আশফাক ভাই? কতদিন?”
আশফাক সাহেব একটু ভেবে বাস্তবসম্মত গলায় বললেন,
“দেখেন অর্কো ভাই, নরমাল ইটের গাঁথুনি দিয়ে এই প্রজেক্ট করতে গেলে যে কারোরই কমপক্ষে আট থেকে দশ মাস লাগত। কিন্তু আপনার এমার্জেন্সির কথা মাথায় রেখে আমি পুরো কনস্ট্রাকশন মেথডটাই সাজিয়েছি ফাস্ট-ট্র্যাকে। আমরা প্রি-ইঞ্জিনিয়ার্ড স্টিল স্ট্রাকচার ব্যবহার করছি, যেটা ফ্যাক্টরিতে আগে থেকেই মাপমতো তৈরি হয়ে সাইটে এসে শুধু বোল্ট দিয়ে দাঁড়িয়ে যাবে।”
তিনি সময়সীমাটা পরিষ্কার করলেন—
“আমি সাইটে একই সাথে তিনটে আলাদা টিম নামাব। টিম “এ” যখন কটেজের সয়েল টেস্ট আর পাইলিং-ফাউন্ডেশনের কাজ করবে, টিম “বি” তখন বাউন্ডারি আর পুকুর খননের কাজ এগিয়ে রাখবে। আর স্ট্রাকচার দাঁড়িয়ে গেলেই টিম “সি” নেমে যাবে ল্যান্ডস্কেপিং আর গাছ লাগানোর কাজে। দিন আর রাতের ডাবল শিফটে লেবার খাটালে কোনো বৃষ্টি বা বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে আমি আপনাকে সাড়ে তিন থেকে সর্বোচ্চ চার মাসের মধ্যে কমপ্লিট রেডি কটেজের চাবি বুঝিয়ে দিতে পারব।”
রাশেদ সোফায় বসে মাথা নাড়ল,
“সাড়ে তিন থেকে চার মাস কিন্তু আসলেই বেশ ফাস্ট। কাজ প্যারালালি চললে সময় অনেক বেঁচে যাবে।”
অর্কো আশফাক সাহেবের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে খুব দৃঢ় গলায় বলল—
“ঠিক আছে আশফাক ভাই। টাকার জন্য আপনার কোনো কাজ এক ঘণ্টার জন্যও আটকাবে না। আপনি আগামীকাল সকাল থেকেই আপনার সার্ভে টিম নিয়ে পূর্বাচলের সাইটে কাজ শুরু করে দিন।”
আশফাক সাহেব হাসিমুখে হাত মেলালেন।
“ইনশাআল্লাহ অর্কো ভাই। কাল থেকেই সাইটে মাটি পরীক্ষার কাজ শুরু হচ্ছে।”
ল্যাপটপ আর ড্রয়িংগুলো গুছিয়ে নিয়ে আশফাক সাহেবরা বিদায় নিলেন।
ড্রয়িংরুমের দরজা বন্ধ হতেই পুরো বাসাটায় আবার সেই শান্ত নিস্তব্ধতা নেমে এলো। প্রাপ্তি চায়ের কাপগুলো নিয়ে কিচেনে চলে গেল।
অর্কো সোফার কাছে এসে খুব সন্তর্পণে অর্পিতাকে দুই বাহুর ওপর তুলে নিল। অর্পিতা নিজের দুর্বল হাত দুটো অর্কোর গলার সাথে জড়িয়ে রাখল। তাকে শোবার ঘরে নিয়ে এসে বিছানায় খুব নরমভাবে শুইয়ে দিল অর্কো। মাথার নিচে দুটো বালিশ ঠিক করে দিয়ে, কম্বলটা টেনে সে খাটের কিনারে বসল। অর্পিতা একটু দম নিয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকাল। তার চোখে তখন স্পষ্ট এক চিন্তার রেখা।
“অর্কো, একটা জরুরি কথা বলি?”
“বলো, শুনছি।”
অর্পিতা অর্কোর মুখের দিকে চেয়ে খুব বাস্তবসম্মত গলায় বলতে শুরু করল—
“তুমি কিন্তু অনেক বড় একটা ঝুঁকি নিচ্ছ অর্কো। আজ জমির জন্য পে-অর্ডারে চলে গেল ২ কোটি পয়লাল্লিশ লাখ টাকা। এখন আবার কটেজ আর বাগানের জন্য চলে যাবে আরও প্রায় ১ কোটি ৩৫ লাখ। এভাবে নিজের জমানো সব লিকুইড ক্যাশ একবারে ঢেলে দেওয়া কি ঠিক হচ্ছে? আমার শরীরের তো কোনো ভরসা নেই অর্কো... যেকোনো দিন হুট করে বড় কোনো ইমার্জেন্সি আসতে পারে, হুট করে আবার সিঙ্গাপুরে ছোটানো লাগতে পারে। তখন যদি হাতে কোনো ক্যাশ টাকা না থাকে, তখন কী করবে?”
অর্পিতা একটু থেমে আবার বলল,
“আমার মনে হয় সব জমানো ক্যাশ টাকা এভাবে শেষ না করে তুমি ব্যাংক থেকে একটা লোন নেওয়ার ব্যবস্থা করো। যেহেতু জমিটা তোমার নামে কেনা হয়ে গেছে, জমির দলিল মর্টগেজ রেখে একটা ল্যান্ড বা কন্সট্রাকশন লোন নেওয়া যায় না? কিছু ক্যাশ টাকা সবসময় নিজেদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সেফটি হিসেবে থাকা খুব দরকার।”
অর্কো খুব শান্ত গলায় অর্পিতাকে পুরো হিসাবটা খুলে বলল—
“তুমি একদম খাঁটি একটা কথা বলেছ অর্পিতা। তবে শোনো, নাফি ভাইয়ের সাথে সিনেমার মোট চুক্তি কিন্তু ৫ কোটি টাকার। আজ সকালেই ৬০% অ্যাডভান্স হিসেবে ৩ কোটি টাকা আমার অ্যাকাউন্টে ঢুকে গেছে। আর বাকি ৪০% মানে আরও ২ কোটি টাকা পাব আগামী মার্চে সিনেমা রিলিজ আর টিকিট বিক্রি শুরু হলে। এছাড়া নিশির হরর সিনেমার স্ক্রিপ্টও তো রেডি, ওখান থেকেও আগের কাজের বাকি মিলিয়ে সামনের সপ্তাহেই প্রায় ৪০ লাখ টাকার মতো ক্লিয়ার হয়ে যাবে।”
অর্কো একটু ঝুঁকে এসে অর্পিতার চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
“তবে তোমার লোনের আইডিয়াটা খুবই প্র্যাকটিক্যাল। আজকেই তো জমির মূল দলিল পেয়ে গেছি। কালই আমি ব্যাংকের ব্রাঞ্চ ম্যানেজারের সাথে কথা বলব। জমির দলিল দেখিয়ে ৫০ বা ৬০ লাখ টাকার একটা কন্সট্রাকশন লোন প্রসেস করিয়ে রাখব। তাহলে কটেজের কাজও স্মুথলি চলবে, আর আমাদের অ্যাকাউন্টে যে কোনো মেডিকেল ইমার্জেন্সির জন্য পর্যাপ্ত ক্যাশ ব্যাকআপও সবসময় রেডি থাকবে।”
অর্পিতা একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। তার মুখের চিন্তার ভাবটা অনেকটাই কেটে গেল।
সে অর্কোর আঙুলগুলো একটু শক্ত করে চেপে ধরে মৃদু হেসে বলল,
“হ্যাঁ, এটাই ভালো হবে। জীবন তো সবসময় সোজা লাইনে চলে না, তাই একটু সেফ থাকা ভালো।”
এইভাবে দেখতে দেখতে আরও একটা সপ্তাহ কেটে গেল।
অর্পিতার কথামতো ব্যাংকের ধানমন্ডি ব্রাঞ্চ থেকে জমির মূল দলিল মর্টগেজ রেখে দ্রুত ৬০ লাখ টাকার একটি কন্সট্রাকশন লোনও অনুমোদন করিয়ে নিল অর্কো। ফলে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে যে কোনো জরুরি চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত ক্যাশ ব্যাকআপ রেডি রইল।
এদিকে পূর্বাচলের সাইটে পুরোদমে কাজ শুরু হয়ে গেছে। আশফাক সাহেবের সার্ভে টিম জমি মেপে চারপাশ দিয়ে বাউন্ডারি ওয়ালের গাঁথুনি শুরু করেছে, আর পেছনের অংশে ব্যাকহো লোডার দিয়ে পুকুর খননের কাজ এগোচ্ছে দ্রুতগতিতে। সবকিছু যেন ঘড়ির কাঁটার সাথে পাল্লা দিয়ে চলছিল। এর ফাঁকে ফাঁকে অর্কো গভীর রাতে স্টাডি রুমে বসে হায়মান নাফির সেই মেগা কমার্শিয়াল সিনেমার ড্রাফট লিখতে শুরু করল।
এমনই এক দুপুরে উত্তরার ফ্ল্যাটে এলেন নিশি কবির।
আগের কাজের বকেয়া আর হরর সিনেমার চিত্রনাট্যের চুক্তি অনুযায়ী ৪০ লাখ টাকার একটি পে-অর্ডারের চেক বুঝিয়ে দিতেই তিনি নিজে এসেছিলেন। ঘরে ঢুকেই নিশি সোজা চলে গেলেন অর্পিতার শোবার ঘরে।
বিছানার পাশে বসে তিনি প্রায় মিনিট বিশেক খুব আন্তরিকভাবে অর্পিতার সাথে গল্প করলেন। অর্পিতার থেরাপি কেমন চলছে, শারীরিক দুর্বলতা কিছুটা কমেছে কি না—সব খোঁজখবর নিয়ে তিনি খুব মিষ্টি মুখে বিদায় জানিয়ে ঘর থেকে বের হলেন।
কিন্তু শোবার ঘর থেকে বেরিয়ে ডাইনিং স্পেসে পা রাখামাত্রই নিশির মুখের সেই মিষ্টি হাসিটা এক নিমেষে মুছে গেল।
তিনি চেকভর্তি খামটা ডাইনিং টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখলেন। তারপর হাত দুটো বুকের ওপর আড়াআড়ি বেঁধে সোজা অর্কোর চোখের দিকে তাকালেন। তাঁর চোখে তখন স্পষ্ট একরাশ ক্ষোভ আর গভীর হতাশা।
“আই ওয়ান্টেড টু টক টু ইউ অ্যাবাউট সামথিং সিরিয়াস, অর্কো, আপনি কি সত্যি সত্যিই হায়মান নাফির ওই সিনেমায় সাইন করেছেন?”
অর্কো টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে খুব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করল।
“হ্যাঁ, সাইন করেছি।”
নিশির গলার স্বর এবার তীব্র আপত্তির সুরে চড়ে উঠল—
“আপনি কি কাজটা ঠিক করলেন অর্কো? ওই সস্তা কমার্শিয়াল সিনেমায় ঢুকে নিজের স্ট্যান্ডার্ড ড্রপ করলেন? আই অলওয়েজ থট ইউ ওয়্যার আ ম্যান অব ওয়ার্ডস! যে মানুষটার প্রতিটি গল্পে গভীর জীবনবোধ আর ক্লাসিক সাহিত্যের ছোঁয়া থাকত, সে কিনা হুট করে নাচ-গান আর ভারতীয় সিনেমার কপি করা অ্যাকশন ছবির জন্য নিজের কলমটা তুলে দিল? বিশ্বাস করুন, খবরটা দেখে আই ওয়াজ সো ডিসঅ্যাপয়েন্টেড ইন ইউ!”
সে খুব দায়সারা একটা যুক্তি দিয়ে ব্যাপারটি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল—
“লুক নিশি, এটাকে এত বড় ইস্যু বানানোর তো কিছু নেই। একজন পেশাদার লেখক হিসেবে আমার মনে হয়েছে সব ধরনের জনরাতেই কাজ করে দেখা উচিত। সারাজীবন শুধু আর্ট আর ডার্ক ঘরানায় আটকে থাকলে তো আর পুরো দেশের মূলধারার সাধারণ দর্শকদের মন বোঝা যায় না। তাই ভাবলাম একটু কমার্শিয়াল ধারাটাও এক্সপ্লোর করে দেখি।”
নিশি কবির এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে অর্কোর মুখের দিকে চেয়ে রইলেন। তারপর ঠোঁটের কোণে একরাশ তাচ্ছিল্যের হাসি টেনে মাথা নাড়লেন,
“কাম অন অর্কো! ডোন্ট গিভ মি দ্যাট ক্র্যাপ! আপনি আমাকে এইসব সস্তা এক্সকিউজ বিশ্বাস করাতে পারবেন না! যে অর্কো আহমেদকে আমি এত ঘনিষ্ঠভাবে দেখেছি, সে শুধুমাত্র “এক্সপ্লোর” করার জন্য নিজের জাত বিসর্জন দিয়ে কমার্শিয়াল মসলা ছবির খাতায় নাম লেখাবে এটা কোনোদিন বিশ্বাসযোগ্য নয়। ইউ আর ডেফিনেটলি হাইডিং সামথিং ফ্রম মি।”
অর্কো কোনো উত্তর দিল না। সে পাথরের মতো মুখ করে শান্ত দৃষ্টিতে নিশির দিকে চেয়ে রইল।
নিশি নিজের ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিলেন।
“বাট যাই হোক, এটা আপনার জীবন, আপনার চয়েস”
নিশি দরজার দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে খুব নিচু গলায় বললেন,
“আশা করি নিজের এই ভুলের জন্য আপনাকে ভবিষ্যতে আফসোস করতে হবে না।”
নিশি কবির আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালেন না। সদর দরজাটা টেনে দিয়ে তিনি লিফটের দিকে চলে গেলেন।
ডাইনিংরুমের আলোয় টেবিলের ওপর পড়ে রইল সেই চল্লিশ লাখ টাকার চেক। অর্কো টেবিলের এক কোণে হাত রেখে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
এইভাবে দেখতে দেখতে আরও একটি মাস পার হয়ে গেল।
এই এক মাসে অর্পিতার শারীরিক অবস্থা বাইরে থেকে খুব একটা এলোমেলো না দেখালেও, তার পায়ের শক্তি কিন্তু দ্রুত নিভে আসছিল। সে এখন আর একদমই একা একা হাঁটাহাঁটি করতে পারত না। পায়ের পাতা থেকে কোমর পর্যন্ত প্রায় অবশ হওয়ার পর্যায়ে চলে এসেছিল; একটু নড়াচড়া করতে হলেও তাকে দুই পাশ থেকে শক্ত করে ধরে ধরে এক পা এক পা করে টেনে নিয়ে যেতে হতো। নিজের পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতাটুকু সে পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছিল। এদিকে ছুটির এক মাস শেষ হওয়ায় চোখের জলে বুক ভাসিয়ে দিনাজপুর ফিরে যেতে হয়েছে অর্পাকে। প্রতিদিন বিকেলে ক্লাস শেষে সে ফোন দিয়ে আপুর খোঁজ নেয়।
অক্টোবরের এক শান্ত, মিষ্টি বিকেলে অর্পিতাকে নিয়ে পূর্বাচলের উদ্দেশ্যে গাড়ি ছোটাল অর্কো।
গাড়ির পেছনের ট্রাংকে যথারীতি সেই ফোল্ডিং হুইলচেয়ার আর পোর্টেবল ছোট অক্সিজেন সিলিন্ডার। গাড়ি যখন পূর্বাচলের সেই চৌদ্দ কাঠা প্লটের লোহার মূল ফটকের সামনে এসে থামল, তখন চারপাশের দৃশ্য দেখে অর্পিতা বেশ কিছুটা অবাক হয়ে গেল।
এক মাসেই কাজের অগ্রগতি ছিল চোখে পড়ার মতো। আশফাক সাহেবের ডাবল শিফটের টিম সাইটের রূপ অনেকটাই বদলে ফেলেছে।
পুরো চৌদ্দ কাঠা জমির চারপাশ দিয়ে নিখুঁতভাবে ইটের বাউন্ডারি ওয়ালের গাঁথুনি শেষ হয়ে প্লাস্টার হয়ে গেছে। বারো ফুট চওড়া কালো লোহার মেইন গেটটা বসে গেছে নিজের জায়গায়। পেছনের অংশে বাইশ বাই আঠারো ফুটের সেই পুকুরটা সুন্দর করে খনন করা শেষ, পাড়গুলো ইট আর পাথর দিয়ে বাঁধাই করে পানি তোলার প্রস্তুতি চলছে।
আর মূল কটেজের জায়গায় কংক্রিটের নিরেট প্লিন্থ আর ফাউন্ডেশনের ওপর দাঁড়িয়ে গেছে প্রি-ফেব্রিকেটেড কালো রঙের হেভি স্টিলের মূল কাঠামো আর ছাদের ট্রাস। মেঝেতে শক্ত ঢালাই হয়ে গেছে, আর মিস্ত্রিরা তখন ইনসুলেটেড ড্রাই-ওয়াল প্যানেল বসানোর তোড়জোড় করছিল। সামনের লনটায় মাটি ভরাট করে লেভেল করা হয়েছে, বাঁকানো পেভমেন্টের দাগ কাটা শেষ, আর বাউন্ডারি দেয়াল ঘেঁষে লাগানো হয়েছে কিছু তরুণ পাম গাছ আর বোগেনভেলিয়ার চারা।
অর্কো গাড়ি থেকে নেমে খুব অর্পিতাকে কোলে তুলে নিল। অর্পিতার পা দুটো প্রায় অসাড় হয়ে ঝুলে রইল, সে নিজের হাত দিয়ে অর্কোর গলা জড়িয়ে রাখল। তাকে খুব সাবধানে হুইলচেয়ারে বসিয়ে খুব ধীরপায়ে হুইলচেয়ার ঠেলে ভেতরে নিয়ে এলো।
পুকুরের পাড় ঘেঁষে বয়ে আসা ঠান্ডা বাতাসে অর্পিতার ওড়না উড়ছিল। সে অপলক দৃষ্টিতে নিজের স্বপ্নের বাড়িটাকে একটু একটু করে মাটির ওপর দাঁড়িয়ে যেতে দেখছিল। তার মুখে তখন এক অপার্থিব, নিষ্পাপ মুগ্ধতার হাসি।
ঠিক সেই মুহূর্তেই অর্কোর পকেটের ফোনটা কেঁপে উঠল।
স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখল কল এসেছে উত্তরার বাসা থেকে—প্রাপ্তি।
অর্কো কলটা রিসিভ করে কানে ধরল,
“হ্যাঁ প্রাপ্তি, বলো।”
“স্যার, আপনার বাবা, মা আর বোন এসেছেন গ্রাম থেকে। একটু আগেই ওনারা ফরিদপুর থেকে এসে পৌঁছেছেন। আমি ওনাদের ড্রয়িংরুমে বসিয়ে চা-নাস্তা আর পানি দিয়েছি, আর ওনাদের থাকার জন্য পাশের রুমটা পরিপাটি করে গুছিয়ে দিয়েছি। ম্যামের তো শরীর খারাপ, আপনারা কোনো তাড়াহুড়ো করবেন না স্যার, একদম ধীরে-সুস্থে চলে আসুন।”
সে ফোনটা পকেটে পুরে একটু নিচু হয়ে হুইলচেয়ারে বসা অর্পিতার মুখের দিকে তাকাল।
“অর্পিতা...ফরিদপুর থেকে বাবা এসেছেন। সাথে সামিহা ও আন্টি ও এসেছে।”
পূর্বাচল থেকে ফিরে যখন উত্তরার ফ্ল্যাটে ঢুকল ওরা, তখন সন্ধ্যা নেমে গেছে।
দরজা খুলে দিল প্রাপ্তি। ভেতরে ড্রয়িংরুমে সোফায় বসে ছিলেন জালাল সাহেব, সামিহার মা আর সামিহা। টেবিলে চায়ের কাপ রাখা।
অর্কো অর্পিতাকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে ভেতরে নিয়ে আসতেই সামিহার মা আর সামিহা বেশ অবাক হয়ে তাকাল। অর্পিতার নাকের প্লাস্টিকের নল আর হুইলচেয়ারে বসা অবস্থা দেখে সামিহার মা উঠে কাছে এলেন।
“অর্পিতা, তোমার এই অবস্থা? হুইলচেয়ার ছাড়া কি একদমই হাঁটতে পারছ না মা?”
সামিহাও এগিয়ে এসে পাশে দাঁড়াল।
“ভাবি, আপনার পায়ের সমস্যা কি আরও বেড়েছে নাকি? আমরা তো ভাবছিলাম আপনি অনেকটাই ভালো আছেন।”
অর্পিতা একটু হেসে মাথা নাড়ল।
“না, তেমন কিছু না। একা একা হাঁটার ব্যালান্সটা একটু কমেছে তো, তাই অর্কো জোর করে এই চেয়ারে বসিয়ে রাখে। আপনারা কখন আসলেন? জার্নিতে কোনো সমস্যা হয়নি তো?”
“না, সকাল দশটার বাসে উঠছিলাম,”
সামিহার মা বললেন,
“আসায় সময় একদমই লাগেনি। আড়াইটার মধ্যেই ঢাকায় নেমে গেছি। কিন্তু তোমার চেহারা তো শুকিয়ে গেছে অর্পিতা।”
বাবা সোফায় আগের মতোই চুপচাপ বসে ছিলেন। গায়ে সুতির ফতুয়া আর লুঙ্গি। মুখটা একটু গম্ভীর, যেমন তিনি সবসময়েই থাকেন। অর্পিতার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে তিনি খুব স্বাভাবিক গলায় অর্কোকে বললেন—
“ওরে ড্রয়িংরুমে বসিয়ে না রেখে ঘরে নিয়ে শোয়াও। বাইরে থেকে এসে বেশিক্ষণ বসে থাকলে শরীর খারাপ লাগবে।”
অর্কো হুইলচেয়ার ঠেলে অর্পিতাকে শোবার ঘরে নিয়ে গেল। খুব সাবধানে ওকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে মাথার বালিশটা ঠিক করে দিল। প্রাপ্তি এসে ঘরের বড় সিলিন্ডারের সাথে নলটা বদলে দিয়ে গেল। সামিহার মা আর সামিহা ঘরে এসে খাটের একপাশে বসল।
“তোমার জন্য গ্রাম থেকে খাঁটি ঘি আর খেজুরের গুড়ের কিছু সন্দেশ বানিয়ে নিয়ে এসেছিলাম, ফ্রিজে রেখে দিয়েছি। অল্প অল্প করে খেয়ো।”
“থ্যাংক ইউ মা,” অর্পিতা হাসল।
“আমি অবশ্যই খাব।”
সামিহা ঘরের চারপাশটায় একবার চোখ বুলিয়ে বলল,
“বাসাটা বেশ সুন্দর আর শান্ত ভাবি। তবে আপনার এই অবস্থা দেখে একটু খারাপই লাগছে। ডাক্তার কী বলছে এখন?”
“ডাক্তার বলেছে রেস্ট নিতে আর থেরাপি দিতে,”
অর্কো খাটের পাশে এসে বলল,
“প্রতিদিন সকালে থেরাপিস্ট এসে এক ঘণ্টা এক্সারসাইজ করায়। একটু সময় লাগবে।”
প্রাপ্তি কিচেন থেকে চা নিয়ে এলো। শোবার ঘরের জানালার পর্দাগুলো টানা ছিল। সেখানে বসে অর্পিতা আর সামিহার মা গ্রামের টুকটাক গল্প শুরু করলেন কেমন ধান হয়েছে, গ্রামের কার কী অবস্থা।
দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর পুরো বাসাটা শান্ত হয়ে এলো।
জার্নির ক্লান্তিতে অর্পিতার পাশে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে সামিহা আর তার মা। ড্রয়িংরুমের বাতি নেভানো, চারপাশ বেশ নিঝুম। অর্কো তার স্টাডি রুমে বসে ল্যাপটপে হায়মান নাফির সেই কমার্শিয়াল সিনেমার চিত্রনাট্যের শেষ রিভিশন দিচ্ছিল। পুরো চিত্রনাট্য লেখা শেষ, এখন শুধু বানান আর কিছু ছোটখাটো সিন রি-অ্যারেঞ্জ করে ফাইনাল ফাইলটা নাফির ইমেইলে পাঠিয়ে দেবে। ঠিক তখনই দরজায় মৃদু খটখট শব্দ হলো।
অর্কো মুখ তুলে দেখল জালাল সাহেব ঘরে ঢুকছেন। হাতে একটা পুরোনো খাকি রঙের ফাইল। জালাল সাহেবের মুখটা বরাবরের মতোই ভাবলেশহীন ও গম্ভীর। অর্কো ল্যাপটপ থেকে হাত সরিয়ে সোজা হয়ে বসল।
“বাবা, কিছু লাগবে?”
জালাল সাহেব চেয়ারের পাশে এসে একটু দাঁড়ালেন। ঘরের বুকশেলফ আর পড়ার টেবিলের চারপাশটায় একবার চোখ বুলিয়ে তিনি খুব নিচু ও রাশভারী গলায় জিজ্ঞেস করলেন—
“এই বাসার ভাড়া কত দাও মাসে?”
অর্কো একটু অবাক হলেও বলল,
“মাসে পঁয়তাল্লিশ হাজার টাকা বাবা। সার্ভিস চার্জ আলাদা।”
জালাল সাহেব ঘরের জানালার দিকে তাকিয়ে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন। তারপর আবার সেই একই গম্ভীর গলায় হুট করে জিজ্ঞেস করলেন—
“তোমার ধুলাবালির যে অ্যালার্জি ছিল... সেটা কি আগের মতোই আছে, নাকি একটু কমছে?”
হঠাৎ এই প্রশ্নটা শুনে অর্কোর বুকের ভেতর কেমন যেন একটু নড়ে উঠল। সেই ছোটবেলায় শীতে বা ধুলোয় তার শ্বাসকষ্টের মতো অ্যালার্জি হতো, তখন বাজার থেকে গরম জিলাপি আর তুলসী পাতা এনে দিত জালাল সাহেব। এত বছর পরও মানুষটার এই ছোট কথা মনে আছে!
অর্কো নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
“এখন আগের চেয়ে বেশ কম বাবা। মাঝেমধ্যে ধুলোবালি বেশি হলে একটু হাঁচি হয়, তাছাড়া তেমন সমস্যা হয় না।”
জালাল সাহেব আর কোনো কথা বাড়ালেন না। তিনি নিজের হাতের খাকি রঙের ফাইলটা থেকে একটা দলিল বের করলেন। তারপর সেটা অর্কোর ল্যাপটপের ঠিক সামনে টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখলেন।
অর্কো একটু ঝুঁকে দলিলের ওপর চোখ বোলাল।
ফরিদপুরের কানাইপুরে তাদের পৈতৃক বাড়ির সীমানা ঘেঁষে যে আমবাগান আর ফসলি জমিটার অংশ ছিল, সেটা রেজিস্ট্রি করে সম্পূর্ণ অর্কোর নামে লিখে দেওয়া হয়েছে। দলিলে একদম নতুন সিলমোহর আর সাব-রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষর।
অর্কো হকচকিয়ে মুখ তুলে তাকাল।
“বাবা, এটা কেন করছ? আমার তো এই জমির দরকার নেই বাবা।”
তিনি টেবিলের ওপর দলিলটা হাত দিয়ে সামান্য ঠেলে দিয়ে একদম সোজাসাপ্টা গলায় বললেন—
“এই জমিটা তোমারে দেব বলে আমি আগেই নিয়ত করে রেখেছিলাম। কে কী করল না করল সেটা আমার দেখার বিষয় না। তোমার যেটা হক, তোমার পাওনা আমি তোমারে বুঝিয়ে দিলাম।”
অর্কো কিছু একটা বলতে গেল, কিন্তু জালাল সাহেব তাকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ দিলেন না। তিনি যেমন গম্ভীর মুখে ঘরে ঢুকেছিলেন, ঠিক তেমনি শান্ত ও ধীরপায়ে স্টাডি রুমের দরজা পেরিয়ে ড্রয়িংরুমের দিকে চলে গেলেন।
টেবিলের ওপর ল্যাপটপের স্ক্রিনের আলো এসে পড়ছিল সেই নতুন দলিলের ওপর। অর্কো একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল খোলা কাগজটার দিকে।
পরদিন ভোরের আলো ফুটতেই উত্তরার ফ্ল্যাটটাতে একটা চাপা ব্যস্ততা তৈরি হলো।
হেমন্তের শুরুর দিকের সকালের বাতাসটা ছিল কিছুটা ঠান্ডা। জানালার কাঁচ ঘেঁষে একটা আবছা কুয়াশার চাদর জমেছিল। রান্নাঘরে তখন চুলার ওপর চায়ের কেটলি ফুটছিল মৃদু শোঁ শোঁ শব্দে। সামিহার মা খুব ভোরে উঠেই রান্নাঘরে গিয়েছিলেন; আগের রাতে ফ্রিজে রেখে দেওয়া রুটি আর ডিম ভাজছিলেন তিনি। প্রাপ্তি এক কোণে দাঁড়িয়ে সাহায্য করতে চাইলেও তিনি তাকে সরিয়ে দিয়েছিলেন নিজের হাতে কিছু একটা বানিয়ে খাইয়ে যাওয়ার তাগিদ যেন তাঁর প্রতিটি কাজের মধ্যে স্পষ্ট ছিল।
ড্রয়িংরুমের কাঁচের টি-টেবিলের ওপর তখন রাখা ছিল তাঁদের গোছানো ব্যাগ। ফরিদপুর থেকে আসার সময় যে ব্যাগটা হালকা ছিল, যাওয়ার সময় সেটা আরও ভারী হয়ে উঠেছিল। অর্কো আগের রাতেই পাপ্তিকে দিয়ে ভালো ব্র্যান্ডের শাল, সামিহার জন্য কিছু বই আর শুকনো মিষ্টি কিনে ব্যাগে পুরে দিয়েছিল।
শোবার ঘরে বিছানায় বালিশে ঠেস দিয়ে বসে ছিল অর্পিতা। সকালের নরম আলো এসে পড়েছিল তার ফ্যাকাশে মুখে। নাকের নিচে সেই চেনা প্লাস্টিকের অক্সিজেন নলটা হালকা কাঁপছিল।
জালাল সাহেব জুতো পরে ড্রয়িংরুমে এসে দাঁড়ালেন। গায়ে সেই ধবধবে সাদা সুতির পাঞ্জাবি, চোখে চশমা। মুখটা বরাবরের মতোই ভাবলেশহীন, কিন্তু চোখের দৃষ্টিতে ছিল দীর্ঘ সফরের এক শান্ত প্রস্তুতি। অর্কো স্টাডি রুম থেকে বেরিয়ে বাবার সামনে এসে দাঁড়াল। তার গলার স্বরে ছিল একরাশ দ্বিধা আর আন্তরিক অনুরোধ।
“বাবা, এত তাড়া কিসের? মাত্র তো পরশু আসলেন। শরীরটার ওপর দিয়ে এত বড় জার্নি গেল... আর দুটো দিন থেকে যেতেন। অর্পিতারও ভালো লাগত, ঘরের পরিবেশটাও কত সুন্দর জমে উঠেছিল।”
সোফায় বসা সামিহা কাঁধে নিজের ওড়নাটা ঠিক করে চায়ের কাপটা নামিয়ে রাখল। সে একটু ম্লান হেসে বলল,
“ভাইয়া, থাকতে তো ইচ্ছা করছিল খুব। কিন্তু আমার কলেজে টানা প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস শুরু হয়ে যাবে কাল থেকেই। কয়েকটা ল্যাব মিস দিলে টেস্টে ঝামেলা করবে। তাছাড়া বাবারও তো গ্রামের কিছু ব্যাংকের কাজ বাকি পড়ে আছে।”
সামিহার মা শোবার ঘর থেকে অর্পিতার কপালে হাত বুলিয়ে দিয়ে বেরিয়ে এলেন। তাঁর চোখ দুটো ভিজে উঠেছিল। তিনি অর্কোর দিকে চেয়ে বললেন,
“তুমি কিছু মনে কোরো না বাবা। সামিহার পড়াশোনার ক্ষতি হলে ওর বাবা আবার অস্থির হয়ে পড়বেন। তবে মনটা পড়ে রইল বউমার কাছেই। মেয়েটাকে এই বিছানায় এভাবে রেখে যেতে বুকটা কেমন যেন খাঁ খাঁ করছে।”
অর্কো কোনো কথা বলতে পারল না। সে শুধু নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল। জালাল সাহেব শোবার ঘরের খোলা দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন। তিনি ভেতরে ঢুকলেন না, দরজার চৌকাঠ ধরে দাঁড়িয়ে এক পলক তাকালেন বিছানায় শুয়ে থাকা অর্পিতার দিকে।
অর্পিতা বিছানা থেকে একটু হাত তুলে সালাম দিল।
“সাবধানে যাবেন বাবা... নিজের খেয়াল রাখবেন।”
জালাল সাহেব কয়েক সেকেন্ড নিঃশব্দে অর্পিতার চোখের দিকে চেয়ে রইলেন। তিনি খুব ভারী গলায় বললেন—
“তুমি শরীরের যত্ন নিয়ো মা। ওষুধপত্র ঠিকমতো খেয়ো।”
তারপর তিনি ঘুরে অর্কোর দিকে তাকালেন,
“গ্রামে আইসো।”
কথাটা বলেই জালাল সাহেব এক মুহূর্তও আর দাঁড়ালেন না। হাতে ছাতা আর ব্যাগটা তুলে নিয়ে তিনি ধীরপায়ে ফ্ল্যাটের সদর দরজার দিকে পা বাড়ালেন।
অর্কো আর কথা না বাড়িয়ে নিচে নেমে এলো তাঁদের এগিয়ে দিতে।
নিচে তখন সকালের রোদ পিচঢালা রাস্তার ওপর চকচক করছে। অর্কো আগেই একটি গাড়ি বুক করে রেখেছিল। গাড়ির পেছনের ট্রাংকে ব্যাগগুলো তুলে দিয়ে সে বাবার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করল। গাড়িটা যখন উত্তরার গলি পেরিয়ে মেইন রোডের দিকে মোড় নিল, অর্কো ফুটপাতে একা দাঁড়িয়ে রইল।
অর্কো এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার লিফটে চেপে চারতলার ফ্ল্যাটে ফিরে এলো।
ভেতরে ঢুকতেই এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা যেন তাকে গ্রাস করতে চাইল। মাত্র আধা ঘণ্টা আগেও যে ঘরটাতে মানুষের কথার শব্দ ছিল, চায়ের কাপের ঠুংঠাং আওয়াজ ছিল, সেই ফ্ল্যাটটা এখন আবার পাথরের মতো নিঝুম।
ড্রয়িংরুমে খালি চায়ের কাপগুলো পড়ে রয়েছে, এক কোণে বাতাসে হালকা ঘিয়ের সুবাস। শোবার ঘরে ঢুকে অর্কো দেখল অর্পিতা জানালার দিকে তাকিয়ে আছে শূন্য চোখে। অক্সিজেনের সেই চেনা একটানা হিসহিস শব্দ ছাড়া পুরো ঘরে আর কোনো শব্দ নেই।
অর্কো নিঃশব্দে গিয়ে বসল অর্পিতার পাশে। অর্পিতা নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে অর্কোর হাতের ওপর রাখল।
“বাড়িটা হুট করে কেমন খালি হয়ে গেল, তাই না অর্কো?”
অর্কো কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু অর্পিতার আঙুলগুলো নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে জানালার ওপাশের আলোটার দিকে চেয়ে রইল।
গুলশান দুই নম্বরের সেই বহুতল ভবনের কর্পোরেট ফ্লোরটিতে পা রাখতেই এক অদ্ভুত কর্মচাঞ্চল্য চোখে পড়ল। নাফি ফিল্মস ইন্টারন্যাশনাল এর করিডোরে সহকারী পরিচালক আর টেকনিশিয়ানদের দ্রুত পদচারণা, কাঁচের পার্টিশনের ওপাশে লাইট ও ট্রাইপডের প্রস্তুতি, আর সাউন্ডরুম থেকে ভেসে আসা মৃদু ট্র্যাকের আওয়াজ। এই পুরো জৌলুসময় বাণিজ্যিক সাম্রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন একজনই মানুষ হায়মান নাফি।
ব্যক্তিগত কেবিনের ভারী কাঁচের দরজা ঠেলে অর্কো ভেতরে ঢুকতেই ঘটল এক অভাবনীয় ঘটনা।
চেয়ারে বসে থাকা হায়মান নাফি অর্কোকে দেখামাত্রই আক্ষরিক অর্থেই নিজের রিভলভিং লেদার চেয়ার ছেড়ে এক লাফে সোজা দাঁড়িয়ে পড়লেন।
টেবিলের ওপর পড়ে ছিল অর্কোর পাঠানো চিত্রনাট্যের পুরো প্রিন্টআউট প্রতিটা পাতার কোণায় মার্কারের দাগ, লাল কালির নোট আর অজস্র ভাঁজ। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, পুরো চিত্রনাট্যটি তিনি কাল রাত থেকে এক নিঃশ্বাসে একাধিকবার পড়েছেন।
“অর্কো ভাই!”
হায়মান নাফি দুই হাত বাড়িয়ে টেবিল ঘুরে এগিয়ে এলেন। তিনি কোনো আনুষ্ঠানিক হ্যান্ডশেকের সুযোগ না দিয়ে অর্কোকে প্রায় দুই হাত দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে পিঠ চাপড়ে দিলেন। তাঁর গলার স্বরে তখন তীব্র এক ঘোরের রেশ।
“দিস ইজ পিওর গোল্ড, অর্কো ভাই! পিওর ম্যাজিক!”
নাফি উত্তেজনার চোটে ঘরের ভেতর দু-পা পায়চারি করে আবার ফিরে এলেন,
“আমি কাল রাত এগারোটায় আপনার মেইলটা ওপেন করেছিলাম। ভেবেছিলাম প্রথম কুড়ি-তিরিশ পাতা পড়ে শুয়ে পড়ব। বাট বিলিভ মি, ভোর পাঁচটা পর্যন্ত আমি এক ফোঁটা চোখের পলক ফেলতে পারিনি! এই দেশে অ্যাকশন সিনেমা তো অনেকেই বানায়, কিন্তু বন্দুকের গুলির শব্দের পেছনে মানুষের বুকের ভেতরের এমন হাহাকার... অ্যাকশনের সাথে এই লেভেলের ইমোশনাল ডেপথ কেউ কোনোদিন ভাবতেও পারেনি! ইন্টারভ্যালের ওই সিনটা আর ক্লাইম্যাক্সের ওই সংলাপ... এটা দেখার পর হলের দর্শক সিট ছেড়ে দাঁড়িয়ে হাততালি দেবে, আর চোখ দিয়ে পানি ফেলবে! আই অ্যাম জাস্ট স্পীচলেস!”
নাফি নিজের হাতে এসপ্রেসো মেশিনের সুইচ অন করে এক মগ ব্ল্যাক কফি এনে অর্কোর সামনে নামিয়ে রাখলেন। তাঁর চোখমুখ তখন বিজয়ের অহংকারে উদ্ভাসিত।
“আমাদের পুরো ৭০ কোটি টাকার প্রজেক্টের আসল ভিত্তি আপনি দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন,”
নাফি চেয়ারে বসে টেবিলের ওপর দুই হাত রেখে একটু ঝুঁকে এলেন।
“আগামী সপ্তাহেই আমরা প্রি-প্রোডাকশন লক করে শুটিং শিডিউল নামিয়ে দিচ্ছি। বাট অর্কো ভাই... কামিং টু দ্য মোস্ট ইম্পর্ট্যান্ট পয়েন্ট।”
নাফি নিজের ড্রয়ার খুলে চামড়ায় বাঁধানো একটি নতুন নীল ফোল্ডার বের করলেন। খুব সন্তর্পণে সেটা অর্কোর সামনে মেলে ধরে এক অদম্য আগ্রহ নিয়ে বললেন—
“আমি চাই না আমাদের এই পার্টনারশিপ শুধু একটা সিনেমাতেই থেমে থাকুক। আপনি আমার সিনেমাকে যে উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, এরপর আর কোনো সাধারণ স্ক্রিপ্টে হাত দেওয়ার সাহস আমার হবে না। আমার নেক্সট বিগ প্রজেক্ট যা আমরা আগামী বছরের শেষে শুরু করবো, আমি চাই আপনি আজকেই সেই প্রজেক্টের চুক্তিতে সাইন করবেন।”
নাফি পকেট থেকে একটি মসৃণ ফাউন্টেন পেন বের করে খাতার ওপর রাখলেন। তাঁর গলার স্বরে ছিল একরাশ জোর আর আবদার—
“টাকা নিয়ে আপনি বিন্দুমাত্র ভাববেন না অর্কো ভাই। এই প্রজেক্টে আপনাকে যা দিয়েছি, নেক্সট প্রজেক্টে তার চেয়েও অনেক বেশি পাবেন। আপনি সাইনিং অ্যামাউন্ট যা চাইবেন, আমি এখনই চেকে সই করে দিচ্ছি। বাট আই নিড ইউ লকড ইন ফর মাই নেক্সট ফিল্ম রাইট নাও!”
অর্কো শান্ত দৃষ্টিতে টেবিলের ওপর রাখা সেই খোলা দলিলের পাতার দিকে তাকাল। অর্কো কফির মগে একটা ছোট চুমুক দিল। তারপর খুব ধীর, অত্যন্ত মার্জিত এবং শান্ত ভঙ্গিতে সেই ফাউন্টেন পেনটি তুলে আলতো করে ফোল্ডারের ওপর ফিরিয়ে রাখল। সে মুখ তুলে হায়মান নাফির চোখের দিকে চাইল,
“অনেক ধন্যবাদ নাফি ভাই, আপনি আমার স্ক্রিপ্ট এত পছন্দ করেছেন, একজন গল্পকার হিসেবে এটা আমার জন্য অনেক বড় একটা প্রাপ্তি। কিন্তু নেক্সট প্রজেক্টের এই প্রস্তাবটা... আমাকে মাফ করবেন নাফি ভাই, আমি গ্রহণ করতে পারছি না।”
নাফি যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলেন না। তিনি একটু থতমত খেয়ে চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করলেন।
“কী বলছেন অর্কো ভাই?”
নাফি কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে হেসে বললেন,
“পারিশ্রমিক নিয়ে কোনো ইস্যু? আপনি যা বলবেন, উই ক্যান অলওয়েজ নেগোশিয়েট! নাকি অন্য কোনো প্রোডাকশন হাউস আপনাকে এর চেয়ে বড় অফার দিয়েছে?”
অর্কো খুব শান্তভাবে মাথা নাড়ল,
“না নাফি ভাই, টাকা-পয়সার কোনো বিষয় নেই। আর অন্য কোনো হাউসের সাথে কাজ করার প্রশ্নই আসে না। এই সিনেমার পর আমি আপাতত কোনো সিনেমার চিত্রনাট্য লিখছি না।”
“বাট কেন অর্কো ভাই?”
অর্কো কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। অর্কো শুধু খুব মার্জিতভাবে চোখ নামিয়ে বলল—
“একান্তই ব্যক্তিগত কিছু কারণ নাফি ভাই। এই বিষয়ে আমি আর বিস্তারিত কিছু বলতে পারছি না। আশা করি আপনি আমাকে ভুল বুঝবেন না।”
কেবিনের ভেতর কয়েক মুহূর্তের এক থমথমে নীরবতা নেমে এলো। শুধু এসির শোঁ শোঁ শব্দটা শোনা গেল। নাফি একটা দীর্ঘ, ভারী নিঃশ্বাস ফেললেন। তিনি টেবিলের ওপর থেকে সেই নীল ফোল্ডারটি টেনে নিজের ড্রয়ারে তুলে রাখলেন। তারপর মুখ তুলে অর্কোর দিকে চেয়ে খুব আন্তরিকভাবে মাথা নোয়ালেন।
“আই রেসপেক্ট দ্যাট, অর্কো ভাই,একজন মানুষের ব্যক্তিগত সীমানাকে সম্মান জানানোটা সবচেয়ে জরুরি। আপনি কেন বলছেন না, সেটা আমি আর জানতে চাইব না। তবে আমাদের এই একটা প্রজেক্টের কাজ যেন আমরা মন দিয়ে শেষ করতে পারি, এটাই আমার একমাত্র চাওয়া।”
অর্কো সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
“অবশ্যই নাফি ভাই। প্রি-প্রোডাকশনের যেকোনো ছোটখাটো রিভিশনে আমি সবসময় আছি।”
অফিস থেকে বের হয়ে যখন অর্কো লিফটে নেমে গুলশানের রাস্তায় এলো, তখন দুপুরের চড়া রোদ নেমেছে শহরের বুকে। গাড়ির হর্ন, মানুষের অবিরাম ব্যস্ততা আর চারপাশের বিলবোর্ডগুলোতে ভেসে থাকা সাফল্যের চাকচিক্য পেছনে ফেলে অর্কো নিজের গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসল।
ডিসেম্বরের মাঝামাঝি। দেখতে দেখতে প্রায় দেড়টা মাস কেটে গেল।
শীতের সকালগুলো এখন বেশ ঠান্ডা। বাইরে কুয়াশা থাকে, আর উত্তরার রাস্তাগুলোতে সকালের দিকে লোকজনের চলাচলও একটু দেরিতে শুরু হয়।
এই দেড়টা মাসে অর্পিতার শরীরটা আরও অনেক খারাপের দিকে গেছে। সিঙ্গাপুরের ডাক্তার যে কথা বলেছিল, সেটাই যেন সত্যি হয়ে দাঁড়াল। কোমর থেকে দুই পায়ের পাতা পর্যন্ত এখন একদম অবশ হয়ে গেছে তার। পায়ে চিমটি কাটলেও কোনো অনুভূতি পাওয়া যায় না। বিছানা থেকে ওঠা বা বাথরুমে যাওয়ার কোনো ক্ষমতাই আর অবশিষ্ট নেই; অর্কোকেই কোলে তুলে ওকে হুইলচেয়ারে বসাতে হয়। আর নাকের নিচে অক্সিজেনের সেই সরু নলটা এখন সারাক্ষণই লেগে থাকে। এত কষ্টের মাঝেও অর্পিতা মুখ গোমড়া করে বসে থাকে না। যখনই অর্কো সামনে আসে, ও কেমন যেন সহজ মুখে একটু হাসে। যেন কিছুই হয়নি, যেন এই রোগটা খুব সাধারণ একটা ব্যাপার।
এদিকে পূর্বাচলের নতুন বাড়ির কাজ কিন্তু নির্ধারিত সময়ের বেশ আগেই শেষ হয়ে গেছে।
ইঞ্জিনিয়ার আশফাক সাহেব কথা রেখেছিলেন। তিনি দিনরাত লোক খাটিয়ে ডিসেম্বরের এই দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যেই পুরো কাজ বুঝিয়ে দিয়েছেন। একতলা কটেজ, বড় বড় কাঁচের স্লাইডিং জানালা, পেছনের পুকুর আর কাঠের ডেক সবকিছু একদম ছবির মতো সুন্দর হয়েছে। আর সবচেয়ে সুন্দর হয়েছে অর্পিতার সেই স্বপ্নের বাগানটা। নার্সারি থেকে এনে বসানো নানা জাতের গোলাপ, হাসনাহেনা আর চারপাশের সবুজ ঘাস দিয়ে পুরো জায়গাটা ভরে উঠেছে। আশফাক সাহেব চাবি বুঝিয়ে দিয়ে বলেছিলেন,
“অর্কো ভাই, আপনাদের বাড়ি একদম রেডি।” আজ সেই উত্তরার বাসাটা ছেড়ে দেওয়ার দিন।
সকাল থেকেই লোকজন এসে খাট, সোফা আর বড় বড় আলমারি ট্রাকে তুলে নিয়ে পূর্বাচলের দিকে রওনা হয়ে গেছে। কাপড়চোপড় আর টুকটাক জিনিস আগেই পাঠানো শেষ। পুরো চারতলার ফ্ল্যাটটা এখন একদম ফাঁকা পড়ে আছে।
ড্রয়িংরুমের মাঝখানে হুইলচেয়ারে বসে ছিল অর্পিতা। গায়ে একটা হালকা উলের শাল জড়ানো। নিচে গাড়ি রেডি করে প্রাপ্তি তখন শেষ কয়েকটা ছোট ব্যাগ নামাতে গেছে।
অর্কো ড্রয়িংরুমের একপাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে চারপাশটা দেখছিল।
বাসাটা খালি হতেই অদ্ভুত একটা নীরবতা নেমে এসেছে। দেওয়ালে ছবির ফ্রেমের পুরোনো দাগগুলো স্পষ্ট হয়ে আছে। এই খালি ঘরের দিকে তাকিয়ে অর্কোর মনের ভেতর পুরোনো স্মৃতিগুলো একটার পর একটা ভেসে উঠতে লাগল।
ইন্দিরা রোডের সেই ছোট্ট, দমবন্ধ করা বাসাটার কথা মনে পড়ল অর্কোর। মেসের জীবন আর কষ্টের পর ইন্দিরা রোডের ওই ছোট্ট ফ্ল্যাটেই ওরা সংসার শুরু করেছিল। তারপর যখন অর্কোর বইয়ের নামডাক ছড়াতে শুরু করল, তখন সেখান থেকে এই উত্তরায় চলে আসে তারা। এটাই ছিল তাদের জীবনের প্রথম বড় বাসা। এত বড় ড্রয়িংরুম, খোলামেলা ব্যালকনি দেখে সেদিন অর্পিতা কত খুশি হয়েছিল! সে হাসতে হাসতে বলেছিল,
“অর্কো, এটা কিন্তু আমাদের প্রথম বড় বাসা। এখানে আমি প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিতে পারব।”
অর্কো ধীরপায়ে বারান্দাটায় গিয়ে দাঁড়াল।
বারান্দাটা এখন একদম খালি। টবগুলো সব আগেই পূর্বাচলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই বারান্দায় দাঁড়িয়ে আর এই বাসার ছাদে উঠে সন্ধ্যার পর কত সময় কেটেছে ওদের! ঠান্ডা বাতাসে অর্পিতা তার কাঁধে মাথা রাখত, শহরের আলো দেখত আর জীবনের কত ছোট ছোট গল্প করত। তারপর অর্কো ফিরে তাকাল স্টাডি রুমের খালি দরজাটার দিকে।
এই ঘরে বসেই টেবিল ল্যাম্পের আলোয় রাতের পর রাত জেগে সে তার প্রথম সিনেমার চিত্রনাট্য লিখেছিল। লিখতে গিয়ে যখনই আটকে যেত, অর্পিতা এক কাপ চা বানিয়ে নিয়ে এসে বলত,
“তুমি একদম বেশি চাপ নিচ্ছ। একটু চোখ বন্ধ করো, দেখবে সব ঠিকঠাক লিখতে পারছ।”
এই চার দেয়ালের ভেতরে অর্কোর জীবনের কত বড় বড় পরিবর্তন এসেছে। অভাবের দিন পেরিয়ে সফলতার মুখ দেখা, প্রথম সিনেমার সাফল্য, আবার এই বাসায় বসেই অর্পিতার এই কঠিন অসুখের শুরু। সবকিছু মিলিয়ে এই বাসাটার মায়া কাটানো অর্কোর জন্য খুব সহজ ছিল না।
“অর্কো...”
অর্পিতা হুইলচেয়ার থেকে খুব নরম গলায় ডাকল।
অর্কো ঘুরে তাকাল। অর্পিতা একটু মুচকি হেসে ওর দিকে হাত বাড়িয়ে দিল,
“কী ভাবছ বলো তো? ইন্দিরা রোডের সেই ছোট্ট বাসা ছেড়ে যখন এখানে এসেছিলাম, তখন তো কত আনন্দ হয়েছিল। এখন আবার এই বড় বাসা ছেড়ে আমরা আমাদের নিজের সুন্দর একটা বাড়িতে যাচ্ছি। সেখানে কত সুন্দর বাগান আছে, ফুলের গাছ আছে। মন খারাপ করছ কেন?”
অর্কো অর্পিতার কাছে এসে ওর সামনে একটু ঝুঁকল। অর্পিতার ঠান্ডা হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে একটু হাসার চেষ্টা করল।
“মন খারাপ না অর্পিতা,”
অর্কো বলল,
“আসলে এই বাসাটাতে আমাদের কত স্মৃতি আছে... তাই ভাবছিলাম।”
“স্মৃতি তো মনের ভেতরে থাকে অর্কো, দেওয়ালে থাকে না,যেখানেই যাব, এগুলো আমাদের সাথেই থাকবে। চলো, এবার বের হই।”
দরজাটা টেনে দিতেই একটা শব্দ হয়ে লক হয়ে গেল। অর্কো শেষবারের মতো সেই বন্ধ দরজার দিকে একবার তাকাল। তারপর অর্পিতাকে নিয়ে লিফটের দিকে পা বাড়াল।
কুড়িল ফ্লাইওভার পার হয়ে গাড়ি যখন ৩০০ ফিটের চওড়া রাস্তায় উঠল, তখন দুপুরের মিষ্টি রোদ চারপাশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
গাড়ির সামনের সিটে অর্কোর পাশে বসেছিল অর্পিতা। পেছনের সিটে বেশ কিছু দরকারি হাতব্যাগ আর ফ্লাস্ক নিয়ে বসেছিল প্রাপ্তি। জানালা দিয়ে হালকা ঠান্ডা বাতাস আসছিল, আর অর্পিতা খুব শান্ত চোখে বাইরের খোলা আকাশ দেখছিল। শহরের ঘিঞ্জি দালানকোঠা আর ট্রাফিকের জ্যাম পেছনে ফেলে যতই তারা পূর্বাচলের ভেতরের দিকে এগোচ্ছিল, চারপাশের বাতাসটা ততই হালকা আর তাজা লাগছিল। মেইন রোড থেকে নেমে পিচঢালা রাস্তা ধরে কিছুদূর যেতেই চোখে পড়ল নতুন তৈরি হওয়া কালো রঙের বড় লোহার গেটটা। গেটের সামনে পৌঁছাতেই দেখা গেল গেট খোলাই আছে। আর ভেতরে ড্রাইভওয়ের সামনে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছে রাশেদ আর মরিয়ম। তারা সকালেই ট্রাকের সাথে চলে এসেছিল যাতে সব মালামাল ঠিকঠাক নামিয়ে গুছিয়ে রাখা যায়। গাড়ি এসে থামল কটেজের পার্কিং স্পেসে। গাড়ি থামতেই রাশেদ এগিয়ে এসে দরজা খুলে দিল। তার মুখে একগাল চওড়া হাসি।
“ওয়েলকাম ভাবি! ওয়েলকাম টু ইয়োর নিউ কিংডম!”
মরিয়মও হাসিমুখে এগিয়ে এসে বলল,
“আসসালামু আলাইকুম ভাবি! আসেন, দেখেন আপনার বাড়ি কিন্তু পুরো তৈরি!”
অর্কো গাড়ি থেকে নেমে পেছনের ট্রাংক থেকে হুইলচেয়ারটা বের করে সেট করল। তারপর খুব সাবধানে অর্পিতাকে কোলে তুলে নিয়ে চেয়ারে বসিয়ে দিল। প্রাপ্তিও ব্যাগগুলো হাতে নিয়ে তাদের পেছনে হাঁটা শুরু করল।
গেট দিয়ে ভেতরে পা রাখতেই অর্পিতা যেন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল।
চারপাশের দৃশ্যটা এতটাই খোলামেলা আর সুন্দর ছিল যে বিশ্বাস করাই কঠিন এটা ঢাকার এত কাছে কোনো জায়গা। লনের একপাশে লাল, সাদা আর হলুদ গোলাপের ছোট ছোট ঝাড়। বাতাসে মৃদু সুবাস ছড়াচ্ছে সদ্য লাগানো হাসনাহেনা আর বেলি ফুলের গাছ। বাউন্ডারি দেওয়ালের ধার ঘেঁষে বেড়ে উঠছে কিছু পাম ট্রি আর রঙিন পাতার গাছ। মাঝখান দিয়ে কটেজের দিকে চলে গেছে আঁকাবাঁকা মসৃণ পাথরের হাঁটার রাস্তা।
অর্পিতা চোখ বড় বড় করে চারপাশটা দেখছিল।
“অর্কো...এটা সত্যি সত্যি আমাদের বাড়ি?”
অর্কো একটু হেসে হুইলচেয়ার ঠেলতে ঠেলতে বলল,
“হ্যাঁ অর্পিতা, এটা তোমার সেই স্বপ্নের বাড়ি।”
কটেজটা একতলা হলেও দেখতে একদম বিদেশের ছবির মতো। ছিমছাম আধুনিক ডিজাইন, কাঠের রঙের টেক্সচার দেওয়া দেওয়াল আর বড় বড় কাঁচের স্লাইডিং দেয়াল। কটেজের সামনের বারান্দাটায় ওঠার জন্য কোনো সিঁড়ি ভাঙতে হলো না; আশফাক সাহেব যে ঢালু র্যাম্পটা বানিয়ে দিয়েছিলেন, সেটা দিয়ে খুব সহজেই হুইলচেয়ারটা সোজা বারান্দায় উঠে গেল।
বারান্দা পেরিয়ে ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই দেখা গেল পুরো ঘরটা আলোয় ভেসে যাচ্ছে।
বিশাল বড় কাঁচের স্লাইডিং দেয়াল দিয়ে বাইরের পুরো বাগানটা ঘরের ভেতরে বসেই স্পষ্ট দেখা যায়। ছেলেরা খাট আর সোফাগুলো আগেই জায়গা মতো বসিয়ে দিয়ে গেছে। মরিয়ম খুব পরিপাটি করে ড্রয়িংরুমের সোফায় কুশনগুলো সাজিয়ে রেখেছিল।
মরিয়ম হাসিমুখে এসে অর্পিতার পাশে দাঁড়াল।
“ভাবি, দেখেন তো সোফাটা এই কোণায় দিয়েছি, ঠিক আছে তো? আর ওই যে ডাইনিং টেবিলটা রাখছি জানালার ঠিক পাশে, যাতে খাওয়ার সময় বাইরের বাগানটা দেখা যায়।”
অর্পিতা চারপাশ দেখে মুগ্ধ হয়ে বলল,
“খুব সুন্দর হয়েছে মরিয়ম! তোমরা এত কষ্ট করে সব গুছিয়ে ফেলেছ!”
রাশেদ নিজের কপাল থেকে ঘাম মুছে একটু কায়দা করে বলল,
“কষ্ট মানে ভাবি! সকাল থেকে এই ট্রাকে মাল তোলা আর নামানো... আমার কোমরের যে বারোটা বেজে গেছে! অর্কো কিন্তু আমারে এক কাপ চা-ও খাওয়ায় নাই এখনো!”
মরিয়ম রাশেদের দিকে তাকিয়ে চোখ মটকাল।
“আহা রে! উনি তো খালি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হুকুম দিছেন, সব কাজ তো করেছে ট্রাকের ছেলেরা! তোমার এত ভাব কিসের শুনি?”
মরিয়মের কথায় অর্পিতা শব্দ করে একটু হেসে ফেলল। ড্রয়িংরুম পেরিয়ে এবার কিচেনের দিকে যাওয়া হলো।
কিচেনটা দেখেই প্রাপ্তির চোখ চকচক করে উঠল। চকচকে মডার্ন কাউন্টারটপ, ক্যাবিনেট আর একটা বড় কাঁচের জানালা। কিচেনের একপাশে আলাদা একটা দরজা আছে, যা দিয়ে সোজা চলে যাওয়া যায় পশ্চিম পাশের সবজি বাগানের দিকে।
প্রাপ্তি কিচেনে ঢুকে খুশিতে বলে উঠল,
“স্যার, কিচেনটা তো অনেক সুন্দর! আর ওই যে দরজার ওপাশে সুন্দর খালি জায়গাটা, ওখানে আমি ভাবির জন্য লালশাক, ধনেপাতা আর টমেটো গাছ লাগাব। রান্না করতে করতে একদম টাটকা পাতা তুলে আনা যাবে।”
এরপর অর্কো অর্পিতাকে নিয়ে এলো মাস্টার বেডরুমে।
এই রুমটায় ঢুকতেই অর্পিতার মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হলো না। বিছানায় শুয়ে মাথা ঘোরালেই চোখের সামনে পুরো সবুজ বাগান আর ফুলের গাছগুলো ভেসে ওঠে। রোদের নরম আলো ঘরের কাঠের মেঝেতে এসে পড়েছে। ঠিক যেন কাঁচের এক শান্ত প্রাসাদের ভেতর দাঁড়িয়ে আছে তারা।
রাশেদ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলল,
“আর ভাবি, পাশের রুমটা কিন্তু অর্পার জন্য একদম রেডি করে রাখা হয়েছে। ওর পড়ার টেবিলটা জানালার সামনে পাতা আছে। ও দিনাজপুর থেকে ছুটিতে আসলে দেখেই লাফালাফি শুরু করবে।”
অর্পিতা একটু ভিজে গলায় বলল,
“অর্পা দেখলে যে কী খুশি হবে!”
সবশেষে অর্কো হুইলচেয়ার ঘুরিয়ে নিয়ে এলো কটেজের পেছনের অংশে।
আর এই জায়গাটা দেখেই অর্পিতার বুকটা এক অদ্ভুত শান্তিতে ভরে গেল। কটেজের পেছনে সুন্দর করে বাঁধানো একটি শান্ত পুকুর। স্বচ্ছ পানিতে দুপুরের আকাশ আর গাছের ছায়া কাঁপছে। পুকুরের ওপর কাঠ দিয়ে সুন্দর একটা ডেক বানানো হয়েছে, যা পানির কিছুটা ওপর পর্যন্ত চলে গেছে। সেখানে দুটো আরামদায়ক বেতের চেয়ার পাতা।
অর্কো হুইলচেয়ারটা কাঠের ডেকের ওপর এনে থামাল।
পুকুরের ঠান্ডা বাতাস এসে অর্পিতার গায়ের শাল আর মুখের চুলগুলোকে আলতো করে উড়িয়ে দিল। দূর থেকে পাখির কিচিরমিচির আওয়াজ ভেসে আসছিল। শহরের কোনো গাড়ির হর্ন নেই, কোনো চিৎকার-চেঁচামেচি নেই; আছে শুধু পাতার মর্মর শব্দ আর এক অনন্ত নীরবতা।
রাশেদ আর মরিয়ম পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল। মরিয়ম খুব নরম গলায় বলল,
“ভাবি, এই ডেকের ওপর বসে বিকেলে চা খাওয়ার যে কী আরাম হবে, আপনি ভাবতেও পারবেন না!”
অর্পিতা নিজের অবশ পা দুটোর দিকে একবার তাকাল। তারপর হাত বাড়িয়ে দিয়ে খুব শক্ত করে অর্কোর হাতটা নিজের মুঠোয় চেপে ধরল।
“আমার জন্য এত কিছু করলে তুমি? এত সুন্দর একটা পৃথিবী তুমি আমার জন্য বানালে?”
অর্কো ডেকের ওপর অর্পিতার হুইলচেয়ারের পাশে এসে হাঁটু গেড়ে বসল,
“তোমার চেয়ে সুন্দর তো আর কিছু হতে পারে না অর্পিতা,তুমি শুধু ভালো থাকো। এই খোলা বাতাসে তুমি মনভরে নিঃশ্বাস নাও, এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া।”
রাশেদ আর মরিয়ম একটু দূরে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে তাদের দিকে তাকিয়ে রইল।
কেটে গেল আরও একটা মাস। ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে শুরু হলো নতুন বছর।
জানুয়ারির শীত পূর্বাচলের এই খোলামেলা চত্বরে একটু বেশিই জাঁকিয়ে বসেছিল। শহরের মতো এখানে চারদিকে ইট-পাথরের দালান নেই, তাই ভোরের কুয়াশা কেটে রোদ উঠতে উঠতে বেশ বেলা হয়ে যেত। চারপাশের গাছপালা আর পুকুরের শান্ত জলে তখন এক অদ্ভুত স্নিগ্ধ শীতলতা ছড়িয়ে থাকত।
এই এক মাসে অর্পিতার শরীরটা যেন চোখের পলকে আরও ভেঙে পড়ল।
আগের সেই অবশ হয়ে যাওয়া দুই পায়ের সাথে এখন যোগ হয়েছে নতুন এক ভয়ংকর উপসর্গ। প্রায়ই তার শরীরে হঠাৎ তীব্র খিঁচুনি উঠত। হাত-পাগুলো শক্ত হয়ে কাঁপতে থাকত, মুখ দিয়ে কেমন যেন গোঙানির মতো শব্দ বের হতো। খিঁচুনি থামার পর শরীরটা একদম নিস্তেজ হয়ে পড়ে থাকত বিছানায়। অর্পিতা এখন আর হুইলচেয়ারেও একা বসতে পারে না; সে এখন পুরোপুরি শয্যাশায়ী। বিছানা থেকে একটু কাত হতে গেলেও কারও না কারও হাত লাগে। গায়ের মাংস শুকিয়ে হাড়গুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, চামড়ায় জমেছে ফ্যাকাশে এক অদ্ভুত শুভ্রতা। চব্বিশটা ঘণ্টা নাকের নিচে লাগানো থাকে অক্সিজেনের নল।
এরই মাঝে দিনাজপুর মেডিকেল থেকে কয়েক দিনের ছুটি নিয়ে কটেজে এসেছে অর্পা।
বোনের এমন করুণ অবস্থা দেখে প্রথম দিন ঘরে ঢুকেই সে বাথরুমে গিয়ে নিঃশব্দে কেঁদেছিল। কিন্তু অর্পিতার সামনে এসে সে একদম শক্ত থাকার চেষ্টা করে। দিনের বেশিরভাগ সময় সে আপুর পাশে বসে থাকে, মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় আর মেডিকেলের নতুন নতুন মজার গল্প শুনিয়ে অর্পিতার মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করে।
সেদিন দুপুরের রোদটা ছিল বেশ নরম আর মিষ্টি।
সকাল থেকে হালকা কুয়াশা থাকলেও দুপুরের দিকে মিষ্টি রোদ এসে পড়েছিল পেছনের পুকুরের কাঠের ডেকটার ওপর। কটেজের বন্ধ ঘরে শুয়ে থাকতে থাকতে অর্পিতা খুব মৃদু গলায় বলেছিল,
“অর্কো... একটু বাইরে যাব। ওই পুকুরের রোদটায় একটু বসব।”
অর্কো এক মুহূর্তও না করেনি। সে শোবার ঘরে রাখা বড় কাঠের আরামকেদারাটায় নরম গদি আর চাদর পেতে ডেকের ওপর টেনে নিয়ে গেল।
তারপর অর্কো আর প্রাপ্তি দুজন মিলে খুব সন্তর্পণে অর্পিতাকে বিছানা থেকে তুলল। অর্পিতার পুরো শরীরটা তখন একদম তুলোর মতো হালকা আর নরম হয়ে গেছে। অর্কো এক হাত দিয়ে অর্পিতার পিঠ আর অন্য হাত দিয়ে কোমর শক্ত করে আগলে রাখল, আর প্রাপ্তি সাবধানে তার অসাড় পা দুটো ধরে ধীরে ধীরে ঘর থেকে বের করে আনল। গায়ে ভারী একটা লাল শাল ভালো করে জড়িয়ে দিয়ে তাকে ডেকের সেই আরামকেদারায় বসিয়ে দেওয়া হলো। পাশে স্ট্যান্ডে ঝুলিয়ে দেওয়া হলো অক্সিজেন সিলিন্ডার।
অর্পা ভেতর থেকে এক বাটি হালকা গরম স্যুপ আর একটা ছোট কুশন নিয়ে এসে অর্পিতার পায়ের নিচে গুঁজে দিল।
“আপু, রোদটা খুব আরাম লাগছে না?”
অর্পা হাসিমুখে জিজ্ঞেস করল।
অর্পিতা একটু চোখের পাতা নাড়িয়ে মৃদু হাসল। সে কোনো কথা বলল না, শুধু পুকুরের শান্ত জলের ওপর রোদের চিকচিক করা আলোর দিকে চেয়ে রইল। বাতাসে নার্সারি থেকে আনা সেই হাসনাহেনা আর বেলি ফুলের একটা মৃদু ঘ্রাণ ভেসে আসছিল।
অর্পা আর প্রাপ্তি কিছুক্ষণ পর টুকটাক কাজের জন্য ভেতরের দিকে চলে গেল।
ডেকের ওপর তখন শুধুই দুজন মানুষ। অর্পিতা আরামকেদারায় আধশোয়া হয়ে বসে আছে, আর তার ঠিক পাশেই কাঠের পাটাতনে পা ঝুলিয়ে বসে আছে অর্কো। অর্কোর চোখ তখন অর্পিতার মুখের ওপর স্থির। হঠাৎ অর্পিতা খুব ধীরে নিজের শুকিয়ে যাওয়া হাতটা বাড়িয়ে দিল।
হাতটা যেন তুলতেও তার প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছিল। অর্কো সাথে সাথে এগিয়ে এসে অর্পিতার সেই হাতটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় তুলে নিল।
অর্পিতা খুব নিচু, কাঁপাকাঁপা গলায় বলল—
“আমাকে অনেক ভালোবাসো, তাই না অর্কো?”
অর্কো একটু চমকে তাকাল। সে কিছু বলার আগেই অর্পিতার চোখ দুটো ভিজে উঠল। টপটপ করে দুই ফোঁটা নোনা জল গড়িয়ে পড়ল তার গাল বেয়ে।
সে খুব কষ্টে বলতে শুরু করল—
“তুমি সারাজীবন শুধু কষ্টই করে গেলে অর্কো। কত দিন না খেয়ে থেকেছ, কত মানুষের অপমান সহ্য করেছ... যখন তোমার জীবনে একটু ভালো দিন এলো, যখন তোমার একটু শান্তিতে বাঁচার কথা ছিল... ঠিক তখনই এই আমি এসে তোমাকে আবার কষ্টের সাগরে ফেলে দিলাম। এখন সারাদিন-রাত তোমাকে আমি শুধু এই পঙ্গু শরীরটা দিয়ে কষ্টই দিয়ে যাচ্ছি রে অর্কো...”
সে অর্পিতার হাতটা আরও শক্ত করে চেপে ধরে অস্থির গলায় বলে উঠল—
“কী বলছ এসব পাগলের মতো অর্পিতা? এসব আজেবাজে কথা তোমার মাথায় আসে কীভাবে?”
কিছুক্ষণ একমনে সেই মাটির দিকে চেয়ে থেকে অর্পিতা আবার মুখ ফেরাল অর্কোর দিকে।
“আমার একটা কথা রাখবে?”
অর্কো চোখ মুছে একটু ঝুঁকে এলো।
“কী কথা, বলো?”
“আমি চলে যাওয়ার পর...আমাকে ওই বাগানটার পাশে কবর দিয়ো, কেমন? ওই যে হাসনাহেনা গাছটার নিচে... আমি তোমার কাছেই থাকতে চাই অর্কো। তুমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে বা ডেকের ওপর বসে যখন চা খাবে, আমি যেন তোমার পাশেই থাকি।”
সে অর্পিতার হাতটা প্রায় আঁকড়ে ধরে অস্থির গলায় বলে উঠল—
“তুমি কেন বারবার এইসব আজেবাজে কথা বলছ অর্পিতা? কেন বলছ এসব? তোমার কিচ্ছু হবে না! আমি আছি তো তোমার পাশে... দরকার হলে আবার দেশের বাইরে যাব, অন্য ডাক্তার দেখাব। তুমি এভাবে মৃত্যুর কথা বলবে না প্লিজ!”
অর্পিতা একটা হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“আমি বাস্তবতা মেনে নিয়েছি অর্কো,আমাকে আর মিথ্যা সান্ত্বনা দিয়ে লাভ নেই । আমার শরীরের ভেতর কী হচ্ছে, সেটা তো আমি নিজের চেয়ে ভালো আর কেউ টের পাচ্ছে না। সময় তো আসলে ফুরিয়ে এসেছে অর্কো... এটা অস্বীকার করে তো কোনো লাভ নেই।”
অর্পিতা একটু থামল। অক্সিজেনের পাইপের ভেতর দিয়ে একটা গভীর নিঃশ্বাস টেনে সে অর্কোর চোখের দিকে অপলক চেয়ে রইল।
“আমি চলে যাওয়ার পর...”
অর্পিতার গলার স্বর এবার একটু ভারী হয়ে এলো,
“অর্পার সব দায়িত্ব কিন্তু তোমার অর্কো। মেয়েটা একদম একা হয়ে যাবে। ও ডাক্তার হওয়া পর্যন্ত, ওর নিজের পায়ে দাঁড়ানো আর ওকে একটা ভালো ছেলের সাথে বিয়ে দেওয়া পর্যন্ত এই পুরো দায়িত্বটা আজ আমি তোমার কাঁধে দিয়ে গেলাম। তুমি ওকে একটু দেখে রেখো অর্কো।”
অর্কোর গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছিল না। তার চোখের জল তখন বাঁধভাঙা নদীর মতো নামছে।
অর্পিতা আবার বলল—
“আর শোনো... জামালপুরে আমাদের গ্রামের ভিটার পাশে আমার নামে সামান্য একটু জমি আছে। বাবা বেঁচে থাকতে আমার নামে লিখে দিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে কিন্তু অর্পাকেই নমিনি করা আছে। আমি না থাকলে হয়তো আত্মীয়স্বজনরা মেয়েটাকে একা পেয়ে ওটা দখল করার চেষ্টা করতে পারে। তুমি একটু কাগজপত্রগুলো দেখে নিও অর্কো... ও যেন ওর ন্যায্য প্রাপ্যটুকু ঠিকঠাক
অর্কো আর নিজের কান্না ধরে রাখতে পারল না।
সে আরামকেদারার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে অর্পিতার কোলের ওপর নিজের মাথাটা গুঁজে দিল। অর্পিতার সেই বরফের মতো ঠান্ডা হাত দুটো নিজের দুই হাত দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে সে এক অসহায় বাচ্চার মতো কেঁদে ফেলল।
অর্পিতা কিছু বলল না। সে শুধু নিজের কাঁপতে থাকা দুর্বল হাতটা তুলে খুব পরম মমতায় অর্কোর চুলে আঙুল বুলিয়ে দিতে লাগল।
পুকুরের শান্ত জলের ওপর তখন বিকেলের মিঠে রোদটা ধীরে ধীরে হেলে পড়ছিল। শীতের ঠান্ডা বাতাসে ঝরে পড়ছিল হাসনাহেনার শুকনো পাপড়ি। আর সেই নিরিবিলি কটেজের ডেকের ওপর বসে দুটি রক্তাক্ত হৃদয় এক নিঃশব্দ অঙ্গীকারে একে অপরকে আঁকড়ে ধরে রইল।
পরের দুটো দিন যেন এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্নের মতো কাটল।
পূর্বাচলের কটেজের ভেতরের পরিবেশটা মুহূর্তের মধ্যে ভারী হয়ে এলো। অর্পিতার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটল অবিশ্বাস্য দ্রুততায়। সিলিন্ডার থেকে পুরো মাত্রায় অক্সিজেন দেওয়ার পরও তার শ্বাস নিতে প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছিল; বুকের খাঁচাটা অস্বাভাবিকভাবে দেবে যাচ্ছিল আর গলার ভেতর থেকে এক অচেনা গোঙানির শব্দ বের হচ্ছিল। ঘন ঘন তীব্র খিঁচুনি হচ্ছিল, আর একপর্যায়ে অর্পিতা সম্পূর্ণ নিস্তেজ হয়ে চোখ বুজল ডাকলে আর কোনো সাড়া দিচ্ছিল না।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতেই অর্কো আর এক সেকেন্ডও দেরি করল না। দ্রুত ফোন করে ঢাকা থেকে লাইফ সাপোর্ট সংবলিত একটি অ্যাম্বুলেন্স আনানো হলো।
সাইরেনের তীক্ষ্ণ শব্দে রাতের রাস্তা কাঁপিয়ে অ্যাম্বুলেন্স এসে পৌঁছাল রাজধানীর এক নামকরা বেসরকারি হাসপাতালের ইমার্জেন্সি গেটে। স্ট্রেচারে করে অর্পিতাকে নামিয়ে কালবিলম্ব না করে সোজা নিয়ে যাওয়া হলো হাসপাতালের চারতলার সেন্ট্রাল আইসিইউতে।
ভারী কাঁচের দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল। ভেতরে শুরু হলো ডাক্তার আর নার্সদের দ্রুত ছোটাছুটি।
আইসিইউর বাইরের ঠান্ডা করিডোরে তখন নেমে এসেছে এক দমবন্ধ করা নিস্তব্ধতা।
দেয়ালের উজ্জ্বল সাদা টিউবলাইটের আলো আর মেঝের কড়া অ্যান্টিসেপ্টিকের গন্ধ চারপাশটাকে কেমন যেন ভৌতিক করে তুলেছিল। করিডোরের স্টিলের একটা বেঞ্চে দুই হাতে মাথা চেপে পাথরের মতো বসে ছিল অর্কো। তার পুরো শরীর তখন থরথর করে কাঁপছিল, চোখের পাতা দুটো ফুলে লাল হয়ে উঠেছে। পাশে দাঁড়িয়ে কাঁপতে কাঁপতে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল অর্পা। ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে মেডিকেলে পড়া মেয়েটা আজ বিজ্ঞানের এই সবচেয়ে নিষ্ঠুর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে একদম অসহায় এক বোনের মতো ভেঙে পড়েছে। এক কোণে দাঁড়িয়ে ওড়না দিয়ে চোখ মুছছিল প্রাপ্তি। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর আইসিইউর অটোমেটিক কাঁচের দরজাটা হালকা শব্দ করে খুলে গেল।
ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন আইসিইউর সিনিয়র কনসালট্যান্ট। তিনি মুখের সার্জিক্যাল মাস্কটা খুলে গলায় ঝুলিয়ে নিলেন। তাঁর চোখেমুখে স্পষ্ট একরাশ অপারগতা আর ক্লান্তির ছাপ।
ডাক্তারকে বের হতে দেখেই অর্কো ছিটকে উঠে এগিয়ে এলো। অর্পা আর প্রাপ্তিও এক পা এগিয়ে এলো রুদ্ধশ্বাসে।
অর্কোর গলা দিয়ে কোনোমতে একটা ভাঙা স্বর বের হলো।
“অর্পিতা কেমন আছে?”
ডাক্তার কয়েক সেকেন্ড খুব বেদনাহত দৃষ্টিতে অর্কোর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ডাক্তার একটা ভারী দীর্ঘশ্বাস ফেলে খুব নিচু ও সহানুভূতিশীল গলায় বলতে শুরু করলেন—
“আপনি তো সবকিছু আগে থেকেই জানেন অর্কো সাহেব। আপনারা সিঙ্গাপুর পর্যন্ত গিয়েছেন... রোগের শেষ পরিণতি কী হতে পারে, সেটা আপনারা ভালো করেই জানেন। আমরা আমাদের সবটুকু চেষ্টা করেছি, কিন্তু ম্যামের ফুসফুসের নার্ভগুলো আর একদমই রেসপন্স করছে না। মাল্টি অর্গান ফেইলিওরের দিকে চলে যাচ্ছে।”
ডাক্তার একটু থামলেন। তিনি এক হাত বাড়িয়ে খুব সান্ত্বনা দেওয়ার ভঙ্গিতে অর্কোর কাঁধে রাখলেন।
“ম্যামের সময় একদম শেষ হয়ে আসছে অর্কো সাহেব... জানি এই সত্যটা মেনে নেওয়া আপনার জন্য কতটা কষ্টের, কতটা নির্মম। কিন্তু সত্যটা হলো চিকিৎসা বিজ্ঞানের দিক থেকে আমাদের আর কিচ্ছু করার নেই।”
অর্পা এক বুকফাটা চিৎকার দিয়ে নিজের দুই হাতে মুখ ঢেকে বসে পড়ল। প্রাপ্তি দ্রুত এগিয়ে গিয়ে অর্পাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল। ডাক্তার অর্কোর চোখের দিকে তাকিয়ে খুব নরম গলায় বললেন—
“আপনি ভেতরে যান অর্কো সাহেব... ভেন্টিলেটরের মাঝেও ওনার একটু জ্ঞান ফিরেছে। ওনার চোখ আপনাকে খুঁজছে। আপনি ভেতরে যান।”
আইসিইউর ভেতরটা ছিল অসম্ভব রকমের ঠান্ডা আর নিস্তব্ধ।
চারপাশে নানা রকম জটিল যন্ত্রপাতির একটানা মৃদু বিপ-বিপ শব্দ, স্যালাইনের ড্রিপ আর মনিটরের পর্দায় ভেসে থাকা হৃদস্পন্দনের ওঠানামা। উজ্জ্বল নিয়ন বাতির নিচে ধবধবে সাদা বিছানায় শুয়ে ছিল অর্পিতা। তার গায়ের রক্তশূন্য ফ্যাকাশে চামড়াটা যেন বিছানার চাদরের সাথে মিশে গেছে। অর্কো কাঁপতে কাঁপতে এসে বিছানার পাশের নীল প্লাস্টিকের টুলটায় বসল।
সে খুব সাবধানে, পরম মমতায় অর্পিতার সেই বরফের মতো ঠান্ডা ও শীর্ণ হাতটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় তুলে নিল। অর্কোর চোখ দিয়ে তখন অবিরাম পানি গড়িয়ে পড়ে অর্পিতার হাতের তালু ভিজিয়ে দিচ্ছিল।
হাতের চেনা স্পর্শ পেতেই অর্পিতা খুব ধীরে চোখের পাতা খুলল।
অক্সিজেন মাস্কের নিচ থেকে তার ঠোঁট দুটো সামান্য কেঁপে উঠল। সে অর্কোর চোখের দিকে তাকিয়ে এক মায়াবী হাসি দিল।
অর্পিতা খুব মৃদু, প্রায় ফিসফিস করা গলায় বলল—
“ভয় পেয়ো না অর্কো... আমার কিচ্ছু হবে না।”
অর্কো কোনো কথা বলতে পারল না, সে শুধু এক দৃষ্টিতে অর্পিতার মুখের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। অর্পিতা একটু শ্বাস নিয়ে আবার খুব কষ্টে বলতে শুরু করল—
“আমি জানি অর্কো... আমি যদি চলে যাই, নিজেকে তোমার সামলাতে অনেক কষ্ট হবে। তোমাকে তো আমি অনেক ভালো করেই বুঝি ... তুমি তো নিজের একটুও খেয়াল রাখো না। কিন্তু দেখো, এই নিয়তির সামনে আমাদের কি কিছু করার আছে বলো? কিচ্ছু করার নেই তো। এমন যদি হতো যে তুমি কোনো চেষ্টা করোনি, তাহলেও একটা আফসোস থাকত। তুমি তো আমার জন্য নিজের সবটুকু দিয়েছ অর্কো... এত চেষ্টা কেউ কারও জন্য করে না।”
“আমি তোমাকে যেতে দেব না অর্পিতা...”
অর্কো রুদ্ধশ্বাসে বলে উঠল,
“আমি কোনোভাবেই তোমাকে ছেড়ে থাকতে পারব না! তোমার সাথে আমার এখনো কত কথা বাকি, কত কিছু করা বাকি! আমাদের কত স্বপ্ন ছিল অর্পিতা... আমাদের একটা ছোট্ট পরিবার হবে, আমাদের ছেলেমেয়ে হবে, তারা ওই সুন্দর বাগানে সারা দুপুর দৌড়াদৌড়ি করে খেলবে... তুমি বলেছিলে না তুমি বারান্দায় বসে ওদের হাসিমুখ দেখবে? তুমি আমাকে এভাবে মাঝপথে ফেলে যেতে পারো না অর্পিতা!”
সে নিজের শেষ শক্তিকটুকু এক করে অর্কোর হাতের ওপর একটু চাপ দেওয়ার চেষ্টা করল।
“পাগলামি কোরো না অর্কো...একদম পাগলামি কোরো না। শান্ত হও... এই সময়টায় তোমাকে অনেক শক্ত থাকতে হবে অর্কো। বাইরে অর্পা দাঁড়িয়ে আছে দেখেছ? মেয়েটা একদম একা হয়ে যাবে... তুমি যদি এভাবে ভেঙে পড়ো, তাহলে ওকে কে আগলে রাখবে বলো? তোমাকে ওর জন্য শক্ত হতে হবে অর্কো... খুব শক্ত।”
ঠিক তখনই আইসিইউর একজন নার্স দ্রুতপায়ে বিছানার পাশে এসে দাঁড়ালেন।
“স্যার, এবার একটু বাইরে যান প্লিজ। আইসিইউতে পেশেন্টের পাশে এতক্ষণ থাকার নিয়ম নেই... ইনফেকশনের ঝুঁকি থাকে।”
নার্সের কথা শেষ হতে না হতেই পেছনের পর্দা সরিয়ে ভেতরে ঢুকলেন সেই সিনিয়র ডাক্তার।
তিনি নার্সের দিকে তাকিয়ে খুব শান্তভাবে হাত তুলে ইশারা করলেন। তিনি খুব ধীরে বললেন—
“থাকুক, কোনো সমস্যা নেই।”
ডাক্তার খুব ভালো করেই জানতেন, বিজ্ঞানের আর কোনো নিয়মই এই মানুষটাকে আর আটকে রাখতে পারবে না। এই শেষ মুহূর্তের স্পর্শটুকুই এখন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ওষুধ। ডাক্তারের ইশারায় আইসিইউর ভারী কাঁচের দরজা ঠেলে ভেতরে পা রাখল অর্পা। মেয়েটার সারা শরীর তখন ভয়ে আর কান্নায় কাঁপছিল। তার পেছনেই খুব জড়সড় হয়ে, দুচোখ ভাসিয়ে ভেতরে এলো প্রাপ্তি। এতগুলো মেশিনের নল আর মনিটরের শব্দের মাঝে আপুকে এভাবে নিথর হয়ে পড়ে থাকতে দেখে অর্পার পায়ের শক্তি যেন হারিয়ে গেল। সে টলতে টলতে এসে বিছানার অন্যপাশে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। অর্পিতা চোখ ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকাল।
এবার তার কথা বলতে বড্ড বেশি কষ্ট হচ্ছিল। প্রতিটি শব্দের জন্য তার বুকের ভেতর থেকে যেন এক একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস টেনে বের করতে হচ্ছিল। গলার স্বর একদম নিচু আর ভাঙা হয়ে আসছিল।
অর্পিতা খুব দুর্বল আঙুল সামান্য নাড়িয়ে প্রাপ্তির দিকে তাকাল।
“প্রাপ্তি...”
অর্পিতা খুব কষ্টে ফিসফিস করে ডাকল। প্রাপ্তি এক পা এগিয়ে এসে বিছানার রেলিং ধরে কেঁদে ফেলল।
“জি ম্যাম...”
অর্পিতা এক ম্লান হাসি ফুটিয়ে খুব ধীর গলায় বলল—
“তুমি এই কয়টা মাস... নিজের পরিবারের মতো আমার সেবা করেছ রে প্রাপ্তি। এই অসুস্থ শরীরটা নিয়ে তোমাকে কত খাটিয়েছি... তোমার অনেক ঋণ। তোমাকে অনেক ধন্যবাদ বোন... তুমি খুব ভালো থেকো।”
প্রাপ্তি ওড়না দিয়ে নিজের মুখ চেপে করে কেঁদে উঠল।
“ম্যাম, প্লিজ এসব বলবেন না... আপনি সুস্থ হয়ে উঠবেন ম্যাম, আপনি বাড়ি ফিরে আসবেন!”
অর্পিতা আর কিছু বলতে পারল না। সে ক্লান্তিতে চোখ বুজল কয়েক সেকেন্ডের জন্য। মনিটরের বিপ-বিপ শব্দটা যেন আরও একটু ধীর হয়ে আসছিল। তারপর সে চোখ মেলে তাকাল পাশে বসে কান্নায় ভেঙে পড়া অর্পার দিকে।
অর্পিতা নিজের কাঁপতে থাকা ঠান্ডা হাতটা অতি কষ্টে কয়েক ইঞ্চি তুলে অর্পার মাথায় ছোঁয়াল। অর্পা দুই হাত দিয়ে আপুর সেই হাতটা আঁকড়ে ধরে নিজের গালে চেপে ধরল।
“আপু... ও আপু! আমাকে ফেলে যেয়ো না আপু!” অর্পা কান্নায় ভেঙে পড়ল।
অর্পিতা নিজের সমস্ত শক্তি জড়ো করে অর্পার চোখের দিকে তাকাল,
“তুই ভালোমতো লেখাপড়া করবি... ঠিক আছে অর্পা? আমাদের বাবার স্বপ্ন... আমার স্বপ্ন... তুই অনেক বড় ডাক্তার হবি। কোনোদিন অন্যায়ের সাথে আপস করবি না। আর অর্কোর কথা শুনবি... তোকে কিন্তু অনেক শক্ত হতে হবে অর্পা। মানুষ হতে হবে... ঠিক আছে?”
ডাক্তার এবার খুব ধীরে এগিয়ে এসে অর্পার কাঁধে হাত রাখলেন। তাঁর গলার স্বর ছিল অত্যন্ত সংযত ও নরম। তিনি আইসিইউর নিয়মের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন,
“আপনারা যদি এবার একটু বাইরে যেতেন ভালো হতো... আইসিইউতে একসাথে এত মানুষ থাকা আসলেই ঠিক না। অর্কো সাহেব, আপনি ভেতরে থাকতে পারেন।”
অর্পা চোখ মুছে শেষবারের মতো আপুর মুখের দিকে একবার তাকাল। তারপর প্রাপ্তির হাত ধরে কাঁদতে কাঁদতে ভারী কাঁচের দরজা পেরিয়ে বাইরে করিডোরে চলে গেল। দরজাটা নিঃশব্দে আটকে গেল তাদের পেছনে। আইসিইউর ভেতর আবার নেমে এলো সেই নিঝুম, শীতল নীরবতা।
মনিটরের পর্দায় হৃৎস্পন্দনের রেখাগুলো তখন আরও একটু ধীর ওঠানামা করছিল। ঘরের ভেতরে শুধু অক্সিজেনের হালকা সুর আর যন্ত্রপাতির একঘেয়ে মৃদু শব্দ। অর্কো প্লাস্টিকের টুলটা টেনে নিয়ে বিছানার একদম মুখোমুখি বসল।
সে অর্পিতার আরেকটা হাত নিজের হাতের তালুর ওপর রেখে পকেট থেকে ফোনটা বের করল। সে গ্যালারির পুরোনো ফোল্ডারগুলো খুলতে লাগল। তারপর ফোনের পর্দাটা অর্পিতার চোখের সামনে একটু কাত করে ধরল।
“অর্পিতা... দেখো তো,”
অর্কো খুব নিচু, ভেজা গলায় বলল।
স্ক্রিনের ওপর ভেসে উঠল তাঁদের পুরোনো একটি ছবি। বইমেলার সেই প্রথম সাফল্যের দিন অর্পিতা নীল রঙের একটা সুতির শাড়ি পরে অর্কোর হাত ধরে দাঁড়িয়ে মিষ্টি করে হাসছে।
অর্কোর গলার ভেতর কান্না জমে আসছিল, কিন্তু সে নিজেকে সামলে মুখে একটা মৃদু হাসির রেখা টেনে এনে বলতে লাগল—
“মনে আছে এই ছবিটার কথা? বইমেলায় সেদিন কত মানুষের ভিড় ছিল! তুমি মেসের সেই পুরোনো দিনগুলোর কথা ভুলে গিয়ে আমার হাতটা শক্ত করে ধরে বলেছিলে—আমি জানতাম তুমি একদিন অনেক বড় লেখক হবে।”
অর্কো আঙুল দিয়ে স্ক্রিনটা সরাল। এবার ভেসে এলো সিঙ্গাপুরের সেই ছবিগুলো।
মেরিনা বে-র খোলা আকাশের নিচে অর্পিতার চুলে বাতাস উড়ছে, পেছনে লেকের নীল জল। গার্ডেন্স বাই দ্য বে-র সেই বিশাল কাঁচের প্রাসাদে বেগুনি রঙের অর্কিড ফুলের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অর্পিতার নিষ্পাপ হাসিমুখ। আর সেই মোড়ের কাঠের বেঞ্চে বসে চকলেট আইসক্রিম খাওয়ার সেই ছবিটা।
অর্কো অর্পিতার মুখের দিকে তাকিয়ে খুব আদরে ফিসফিস করে বলল—
“মনে আছে সিঙ্গাপুরে তুমি কীভাবে ওই চকলেট আইসক্রিমটা একাই খেয়ে শেষ করেছিলে? আমাকে এক ফোঁটাও ভাগ দিতে চাওনি! বলেছিলে—টাকা দিয়ে নিজে গিয়ে কিনে খাও! কী পরিমাণ যে দুষ্টুমি করেছিলে সেদিন তুমি...”
অর্পিতার চোখ দুটো তখন জলে টলমল করছিল। তার এখন কথা বলার মতো একদমই কোনো শক্তি ছিল না। প্রতিটি নিঃশ্বাস নিতে গিয়ে তার বুকের খাঁচাটায় প্রচণ্ড টান লাগছিল। সে কোনো উত্তর দিতে পারল না, শুধু অপলক দৃষ্টিতে স্ক্রিনের সেই হাসিমুখগুলোর দিকে চেয়ে রইল।
তারপর অর্পিতা নিজের শরীরের সমস্ত শক্তিটুকু যেন নিজের ডান হাতের আঙুলগুলোতে এনে জড়ো করল। অসম্ভব কষ্টে, ধীরে ধীরে সে তার কাঁপতে থাকা দুর্বল হাতটা বিছানা থেকে কয়েক ইঞ্চি ওপরে তুলল। অর্কো একটু ঝুঁকে এলো।
অর্পিতার ঠান্ডা, শুকিয়ে যাওয়া আঙুলগুলো এসে ঠেকল অর্কোর ভেজা গালের ওপর। খুব আলতো করে, পরম নির্ভরতায় সে অর্কোর গালে হাত বোলাতে লাগল।
অর্পিতার ঠান্ডা আঙুলগুলো তখনো অর্কোর গালে রাখা ছিল। চোখের কোণ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে পড়তে সে অসম্ভব কষ্টে, এক একটা শব্দ ভেঙে ফিসফিস করে বলল—
“মনে আছে আমার অর্কো... সব মনে আছে...”
কথাটা শেষ হতে না হতেই অর্পিতার শরীরটা হঠাৎ এক তীব্র ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল। তার বুকের খাঁচাটা অস্বাভাবিকভাবে ওপরে উঠে আটকে গেল। অক্সিজেন মাস্কের ভেতর দিয়ে সে প্রাণপণে বাতাস টেনে নেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু বাতাস যেন আর ভেতরে ঢুকছিল না। তার চোখ দুটো বিস্ফোরিত হয়ে স্থির হয়ে যেতে লাগল। মুহূর্তের মধ্যে আইসিইউর মনিটরগুলো তীব্র শব্দে অ্যালার্ম বাজিয়ে উঠল। পর্দার ওপর রক্তচাপ আর অক্সিজেনের মাত্রা অবিশ্বাস্য দ্রুততায় শূন্যের দিকে নামতে শুরু করল। মনিটরের সেই তীক্ষ্ণ চিৎকারে আইসিইউর পর্দা ঠেলে এক দৌড়ে ভেতরে ছুটে এলেন দুজন ডাক্তার আর নার্স।
“পেশেন্ট কোল্যাপ্স করছে! ব্র্যাডিকার্ডিয়া! সিস্টোলিক প্রেশার ফল করছে দ্রুত!”
ডাক্তারের চিৎকারে পুরো কেবিনে এক নারকীয় ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেল। ডাক্তারদের কাজের জায়গা করে দিতে অর্কো ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে এক পা পিছিয়ে বাইরে চলে যেতে চাইল। কিন্তু সে পা বাড়াতে পারল না। বিছানায় শুয়ে থাকা অর্পিতা নিজের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে অর্কোর হাতটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছিল। তার আঙুলগুলো যেন কোনোমতেই অর্কোর হাত ছাড়তে চাইছিল না। ডাক্তার অর্কোর দিকে এক পলক তাকিয়ে দ্রুত বললেন—
“হাত ছাড়বেন না অর্কো সাহেব... আপনি এভাবেই থাকুন।”
ডাক্তাররা দ্রুত স্টেথোস্কোপ বসালেন, ইনজেকশন পুশ করলেন, বুকের ওপর হাত রেখে পরীক্ষা করতে লাগলেন। আর ঠিক সেই চরম হুড়োহুড়ির মাঝেই অর্কোর হাতের তালুতে ঘটে গেল এক নিঃশব্দ পরিবর্তন। অর্পিতার সেই শক্ত করে ধরে রাখা আঙুলগুলোর বাঁধন ধীরে ধীরে আলগা হয়ে এলো। খুব নরমভাবে, অতি সন্তর্পণে তার হাতের মুঠোটা পুরোপুরি খুলে গেল। অর্পিতার নির্জীব হাতটা আস্তে করে খসে পড়ে বিছানার সাদা চাদরের ওপর স্থির হয়ে রইল। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই আইসিইউর সমস্ত মেশিনের আলাদা আলাদা শব্দগুলো থেমে গিয়ে এক হয়ে গেল।
মনিটরের পর্দায় ভেসে থাকা হৃদস্পন্দনের সমস্ত ঢেউ মুহূর্তের মধ্যে এক লম্বা, একটানা সমান্তরাল রেখায় রূপ নিল। একটি মাত্র একটানা তীক্ষ্ণ ধাতব সুর পুরো ঘরটাকে যেন বরফের মতো নিথর করে দিল।
অর্পিতার বুকের ওঠানামা সম্পূর্ণ থেমে গেছে। তার মুখের সমস্ত ছটফটানি, সমস্ত কষ্ট এক নিমেষে মুছে গিয়ে সেখানে নেমে এসেছে এক নীরবতার শান্ত রূপ।
ডাক্তার স্টেথোস্কোপটা কান থেকে নামিয়ে নিলেন। তিনি টর্চের আলো ফেলে অর্পিতার নিথর চোখের পাতা পরীক্ষা করলেন। তারপর এক গভীর, ভারী দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনিটরের সেই কর্কশ অ্যালার্মটা হাত দিয়ে বন্ধ করে দিলেন। আইসিইউর ভেতর নেমে এলো এক নীরবতা।
ডাক্তার খুব ধীরে ফিরে দাঁড়ালেন অর্কোর সামনে। মাথা নিচু করে বললেন—
“উই আর এক্সট্রিমলি সরি, স্যার... শি ইজ নো মোর।”
ডাক্তার আর নার্সরা আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ালেন না। তাঁরা মুখ নিচু করে এক এক করে ভারী কাঁচের দরজা ঠেলে বাইরে করিডোরে বেরিয়ে গেলেন। দরজাটা খোলার সাথে সাথেই বাইরের করিডোর থেকে এক বুকফাটা, নারকীয় কান্নার রোল ভেসে এলো। ডাক্তারের মুখ দেখেই করিডোরের মেঝেতে আছড়ে পড়ে ডুকরে কেঁদে উঠল অর্পা। তার সাথে প্রাপ্তির বাঁধভাঙা আহাজারি আর চিৎকার কাঁচের দেওয়াল ভেদ করে ভেতরে আসছিল।
কিন্তু আইসিইউর ভেতরের মানুষটি তখন অন্য এক জগতে চলে গেছে। অর্কো এক ফোঁটাও চিৎকার করল না। সে কাঁদছিলও না। তার চোখ দিয়ে এক ফোঁটা জলও নামল না। তার পুরো শরীর যেন এক পলকে জমে পাথর হয়ে গেছে। কোনো অনুভূতি নেই, কোনো প্রতিক্রিয়া নেই, কোনো ভাষা নেই। গোটা পৃথিবীটা যেন তার চারপাশে শূন্যে মিলিয়ে গেছে। সে কোনো কথা বলল না।
সে শুধু খুব শান্তভাবে, নিঃশব্দে চেয়ারটায় বসে বিছানার চাদরের ওপর পড়ে থাকা অর্পিতার সেই নিথর, নিস্তব্ধ ঠান্ডা হাতটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে রইল।
হাসপাতালের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে সেই দিন বিকেলেই একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে অর্পিতার মরদেহ নিয়ে আসা হলো পূর্বাচলের সেই কটেজে।
যে বাড়িটাতে আর কিছুদিন পর অর্পিতার হাসিমুখে বাঁচার কথা ছিল, সেই বাড়ির চত্বরেই আজ নেমে এলো নিঃসীম এক স্তব্ধতার ছায়া। অ্যাম্বুলেন্সের পেছনের দরজা খুলতেই কটেজের উঠোনে এক হৃদয়বিদারক কান্নার রোল ভেঙে পড়ল।
খবর পেয়ে ততক্ষণে কটেজে এসে জড়ো হয়েছিলেন তাঁদের জীবনের প্রতিটি কাছের মানুষ।
সবার আগেই ছুটে এসেছিলেন রাশেদ আর মরিয়ম। রাশেদ উঠোনে দাঁড়িয়ে বাচ্চাদের মতো ডুকরে ডুকরে কাঁদছিল, আর মরিয়ম ভেতরে গিয়ে মেঝেতে ভেঙে পড়া অর্পা আর প্রাপ্তিকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে রেখেছিল। খবর পেয়ে ফরিদপুর থেকে দ্রুত ছুটে এসেছিলেন বাবা জালাল আহমেদ, সামিহা আর তার মা। জালাল সাহেব বারান্দার এক কোণে দাঁড়িয়ে পাথরের মতো নিথর চোখে চেয়ে ছিলেন। সামিহার মা শোবার ঘরে গিয়ে অর্পিতার সাদা কাপড়ে ঢাকা মুখের ওপর হাত রেখে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন।
এসেছিল রফিক সাহেবের পুরো পরিবার তাঁর স্ত্রী, ছেলে ফয়সাল, দুই মেয়ে অপরাজিতা ও ওহনা এবং বড় মেয়ের জামাই সাফনিন। ফয়সাল এসে একমুহূর্তের জন্যও অর্কোর পাশ ছাড়েনি, শক্ত করে তার হাত চেপে ধরে রেখেছিল।
আর বিকেলের দিকে একে একে এসে উপস্থিত হলেন বিনোদন ও সাহিত্য জগতের মানুষজন।
গাড়ি থেকে নেমে এলেন নিশি কবির। তাঁর চোখে কোনো সানগ্লাস ছিল না, চেহারায় ছিল না কোনো গ্ল্যামারের ছোঁয়া; একজোড়া লাল হয়ে ওঠা চোখ নিয়ে তিনি ড্রয়িংরুমে গিয়ে অর্পিতার খাটিয়ার কাছে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। এলেন হায়মান নাফি। তিনি এসে অর্কোর কাঁধে হাত রেখে পরম সমবেদনায় মাথা নোয়ালেন। আর সন্ধ্যার মুখে কটেজের লোহার গেট পেরিয়ে এসে দাঁড়ালেন ইশরাক আহমেদ। তিনি কোনো ভারী সান্ত্বনার কথা বললেন না, শুধু পরম স্নেহে অর্কোর মাথায় হাত রেখে এক গভীর নির্ভরতার ছোঁয়া দিয়ে পাশে দাঁড়ালেন। মহিলারা ঘরের ভেতরে অর্পিতার শেষ গোসল আর কাফনের কাজ সম্পন্ন করলেন। বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল গোলাপজল আর আতরের চেনা সুবাস। কাফন পরানো শেষ হলে একটি কাঠের খাটিয়ায় তোলা হলো অর্পিতার নিথর দেহ। খাটিয়া নিয়ে যাওয়া হবে এলাকার স্থানীয় জামে মসজিদে, সেখানেই অনুষ্ঠিত হবে জানাযার নামাজ। খাটিয়া তোলার সময় অর্কো ধীরপায়ে এগিয়ে এসে সামনের ডান দিকের কাঠের হাতলটায় নিজের কাঁধ পেতে দিল। আর খাটিয়াটা কাঁধে তুলে নেওয়ার মুহূর্তেই অর্কোর বুকের ভেতর যেন এক ভয়ংকর ভার এসে নামল।
অসুখের শেষ দিনগুলোতে অর্পিতার শরীরটা শুকিয়ে একদম তুলোর মতো হালকা হয়ে গিয়েছিল। অর্কো কতবার তাকে নিজের দুই বাহুর ওপর খুব সহজে এক ঘর থেকে অন্য ঘরে কোলে তুলে নিয়েছে। কিন্তু আজ যখন সেই একই শরীর খাটিয়ায় শুয়ে অর্কোর কাঁধের ওপর উঠল, তখন সেই কাঠের ভার যেন পৃথিবীর সমস্ত পাথরের চেয়েও কোটি গুণ বেশি ভারী মনে হতে লাগল। মনে হচ্ছিল সে যেন শুধু একটা খাটিয়া বইছে না, সে যেন নিজের কাঁধে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে তার গোটা জীবন। তার পা দুটো বারবার কাঁপছিল, তবুও সে দাঁতে দাঁত চেপে মসজিদ পানে এগিয়ে গেল।
স্থানীয় জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে তখন শত শত মানুষের ভিড়।
মসজিদের ভেতর ও চত্বরে কাতার বেঁধে দাঁড়ালেন সবাই জালাল শাহেব, অর্কো, ফয়সাল, সাফনিন, রাশেদ,নাফি, ইশরাক এবং স্থানীয় মুসল্লিরা। ইমাম সাহেবের পেছনে দাঁড়িয়ে চার তাকবিরে সম্পন্ন হলো অর্পিতার জানাযার নামাজ।
জানাযা শেষ করে খাটিয়া আবার ফিরিয়ে আনা হলো সেই কটেজে।
পেছনের সীমানা প্রাচীর ঘেঁষে ফুটে থাকা হাসনাহেনা আর বেলি গাছের ছায়ায় যেখানে মাত্র দুই দিন আগে ডেকের ওপর বসে অর্পিতা নিজের আঙুল তুলে দেখিয়েছিল, ঠিক সেখানেই খুঁড়ে রাখা হয়েছিল কবরের মাটি। খুব সাবধানে, পরম মমতায় অর্পিতার কাফনে মোড়ানো দেহটি কবরের শীতল মাটির ওপর নামিয়ে দিল অর্কো আর ফয়সাল,সাথে ছিল কবর খোঁড়ার লোকজন।
বাঁশের চ্যাটাই বিছিয়ে দেওয়ার পর সবাই একে একে মুঠো মুঠো করে ভেজা মাটি ঢালতে লাগল। অর্কো যখন নিজের দুই হাত ভরে সেই ভেজা মাটি অর্পিতার কবরের ওপর ঢেলে দিল, তখন তার চোখ ফেটে নোনা পানি নামলেও মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। মুনাজাতের পর চারপাশ ধীরে ধীরে নিঝুম হয়ে এলো।
কবরের ওপর বিছিয়ে দেওয়া হলো বাগানের কিছু তাজা হাসনাহেনা আর বেলি ফুল। শীতের সন্ধ্যার ঠান্ডা বাতাস বইছিল কটেজের খোলা চত্বরে। সবাই একে একে সরে গেলেও, অর্কো সেই তাজা মাটির ঢিবির পাশে একা দাঁড়িয়ে রইল।
অর্পিতার সেই শেষ অনুরোধটা তখন বাতাসের প্রতিটি ঢেউয়ে অর্কোর কানে বাজছিল—
“আমি চলে যাওয়ার পর আমাকে ওই বাগানের পাশে কবর দিয়ো... আমি তোমার কাছেই থাকতে চাই।”
মাগরিবের আজান শেষ হতেই পূর্বাচলের সেই কটেজ চত্বর ধীরে ধীরে ফাঁকা হতে শুরু করল।
আমন্ত্রিত মানুষজন, দূর-দূরান্ত থেকে আসা শুভাকাঙ্ক্ষী আর পাড়া-প্রতিবেশীরা একে একে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। এত বড় একটা ঝড়ের পর পুরো বাড়িটায় নেমে এলো এক ভারী, নিস্তব্ধ শূন্যতা। সবাই চলে গেলেও অর্কোর বাবা জালাল সাহেব, সামিহা আর তার মা থেকে গেলেন। এমন পরিস্থিতিতে একা রেখে ফিরে যাওয়ার মতো মানসিকতা তাঁদের ছিল না।
কটেজের ভেতরে তখনো কান্নার দমক থামেনি।
শোবার ঘরের মেঝের ওপর বসে অর্পিতার একটি পুরোনো চাদর বুকে জড়িয়ে একটানা কেঁদে যাচ্ছিল অর্পা। তার চোখ দুটো ফুলে একদম লাল হয়ে গেছে, বুকটা বারবার বিষম খাওয়ার মতো উঠছে। সামিহা ওর পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল, আর সামিহার মা অর্পাকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু এই মুহূর্তে কোনো সান্ত্বনাই অর্পার কাছে পৌঁছাচ্ছিল না; যে বোন তাকে মায়ের মতো আগলে বড় করেছে, তাকে আজ চিরতরে মাটির নিচে রেখে আসার ক্ষত কোনো কথা দিয়ে মোছা সম্ভব নয়।
ড্রাইভওয়ের মুখে নিজের গাড়ির কাছে একা দাঁড়িয়ে ছিলেন নিশি কবির।
তিনি তখনই চলে যাননি; ভিড় কমার অপেক্ষায় ছিলেন। এবার বিদায় নেওয়ার পালা। তিনি ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে ধীরপায়ে এগিয়ে এলেন বারান্দার দিকে, যেখানে রেলিংয়ে হাত রেখে একা দাঁড়িয়ে ছিল অর্কো। তার চোখ তখনো আটকে ছিল পেছনের বাগানের সেই তাজা কবরের দিকে।
“অর্কো...” নিশি কবির খুব নিচু, কাঁপাকাঁপা গলায় ডাকলেন।
অর্কো ধীরে ধীরে মুখ ফেরাল। নিশির চোখের দিকে তাকাতেই দেখল, এই নারী পরিচালকের চিরচেনা সেই স্মার্ট আর কড়া রূপটা আজ কোথাও নেই। তাঁর চোখ দুটো ভিজে লাল হয়ে আছে, মুখে এক চরম অপরাধবোধের ছায়া। নিশি কটেজের চারপাশের বাগান, বড় বড় কাঁচের জানালা আর পেছনের সেই কবরের দিকে একবার তাকালেন। তারপর একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে অর্কোর চোখের দিকে চেয়ে বললেন—
“আমি পরে জানতে পেরেছি অর্কো... আপনি কেন হায়মান নাফির ওই কমার্শিয়াল সিনেমায় সাইন করেছিলেন।”
অর্কো কোনো কথা বলল না, শুধু শান্ত চোখে নিশির দিকে চেয়ে রইল।
নিশির গলার স্বর এবার কান্নায় ভিজে এলো। তিনি খুব অনুতপ্ত গলায় বলতে শুরু করলেন—
“সেদিন উত্তরার বাসায় আপনার ওপর রাগ দেখিয়ে কত আজেবাজে কথা বলেছিলাম... বলেছিলাম আপনি নিজের স্ট্যান্ডার্ড নষ্ট করছেন, টাকার লোভে নিজের জাত বিসর্জন দিচ্ছেন! অথচ আপনি... আপনি নিজের সমস্ত অহংকার আর ভালোলাগা একপাশে সরিয়ে রেখেছিলেন শুধু এই মেয়েটার একটা শেষ স্বপ্ন পূরণ করবেন বলে! আই অ্যাম রিয়েলি সো সরি অর্কো... আমি আপনাকে বড্ড ভুল বুঝেছিলাম।”
অর্কোর মুখে কোনো ক্ষোভ বা রাগ ফুটে উঠল না। সে ডিসেম্বরের ঠান্ডা বাতাসটা বুকভরে নিয়ে খুব শান্ত গলায় বলল—
“সরি বলতে হবে না নিশি। আপনার কোনো দোষ ছিল না। বাইরে থেকে দেখলে যে কারও সেটাই মনে হতো। আর অর্পিতার জন্য আমি যা করেছি... তাতে আমার নিজেরও কোনো আফসোস নেই। ওর এই শেষ ইচ্ছাটা পূরণ করতে পেরেছি, এটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় শান্তি।”
নিশি কবির অপলক দৃষ্টিতে অর্কোর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।নিশি নিজের চোখ মুছে খুব নরম গলায় বললেন,
“অর্পিতা সত্যিই খুব ভাগ্যবান ছিল যে আপনার মতো একজন মানুষকে পাশে পেয়েছিল। আর শুনুন... আমি জানি এই ক্ষতি পূরণ করার মতো কোনো ভাষা দুনিয়ায় নেই। তবু বলি, জীবনে যেকোনো দরকারে, যেকোনো বিপদে আমাকে নিঃসংকোচে একটা কল দেবেন। আমি সবসময় পাশে আছি।”
অর্কো একটু মাথা ঝুঁকিয়ে বলল,
“থ্যাংক ইউ নিশি। আপনি এত দূর থেকে এসেছিলেন, অনেক ধন্যবাদ।”
নিশি কবির আর কোনো কথা বাড়ালেন না। তিনি আরেকবার পেছনের বাগানের দিকে তাকিয়ে মনে মনে অর্পিতার আত্মার জন্য প্রার্থনা করলেন। তারপর ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে নিজের গাড়িতে উঠলেন। গাড়ির লাল ব্যাকলাইট দুটো কুয়াশাচ্ছন্ন পিচঢালা রাস্তা ধরে ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
পূর্বাচলের খোলামেলা আকাশের নিচে কুয়াশা আরও ঘন হয়ে নেমে এসেছে। কটেজের ভেতরের সব আলোগুলো নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে; শুধু ড্রয়িংরুমের কাঁচের দেয়াল ঘেঁষে টিমটিম করে জ্বলছে একটা হালকা হলদে বাতি। সারাদিনের কান্নাকাটি আর ক্লান্তির পর অর্পা হয়তো একটু চোখ বুজেছে, গেস্ট রুমে বাবা আর সামিহার মা-ও নিঃশব্দে শুয়ে আছেন। পুরো বাড়িটা এক নিথর, নিস্তব্ধ চাদরে ঢাকা।
অর্কো বারান্দা থেকে ধীরপায়ে নেমে এলো ঘাসের ওপর।
শীতের রাতে ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশির তার খালি পায়ে বরফের মতো ঠান্ডা স্পর্শ দিল। সেদিকে তার কোনো খেয়াল ছিল না। সে আঁকাবাঁকা পাথরের পথটা ধরে এক পা এক পা করে এগিয়ে যেতে লাগল কটেজের পেছনের সেই পুকুরপাড়ের দিকে।পুকুরের স্থির জলে তখন রাতের আবছা অন্ধকারের ছায়া কাঁপছে। ডেকটা পেরিয়ে অর্কো এসে পৌঁছাল সীমানা প্রাচীরের লাগোয়া সেই কোণার বাগানটায়—যেখানে বাতাসে এখনো ভেসে আসছে হাসনাহেনার তীব্র সুবাস আর ভিজে মাটির সোঁদা গন্ধ।
সামনে পড়ে রয়েছে সদ্য তৈরি করা সেই তাজা মাটির ঢিবি। সাদা বেলি আর হাসনাহেনার পাপড়িগুলো শিশিরে ভিজে মাটির গায়ে লেপটে আছে। অর্কো আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। সে খুব সন্তর্পণে, পরম মমতায় সেই মাটির ঢিবির একদম কিনারে ঘাসের ওপর হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল।
সে নিজের কাঁপতে থাকা ডান হাতটা বাড়িয়ে দিল। তারপর খুব আলতো করে, যেন একটু জোরে চাপ লাগলে অর্পিতা ব্যথা পাবে ঠিক সেই ভয়ে আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দিল কবরের ঠান্ডা ভেজা মাটি।
সে মাটির একটু কাছে ঝুঁকে এলো। যেন ওপাশের মানুষটা খুব মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনছে, ঠিক সেভাবে খুব নিচু, কাঁপাকাঁপা গলায় বলতে শুরু করল—
“দেখো অর্পিতা... তোমার পছন্দের সেই হাসনাহেনা গাছটার নিচেই তোমাকে জায়গা করে দিয়েছি। তুমি যেমনটা চেয়েছিলে, ঠিক তেমনই হয়েছে রে। আমাদের এত বড় একটা বাগান হয়েছে, চারপাশ জুড়ে কত ফুল ফুটেছে... কিন্তু যার জন্য এই পুরো পৃথিবীটা সাজালাম, সেই তুমিই তো আজ এত নিচে ঘুমিয়ে রইলে।”
অর্কো একমুঠো ভেজা মাটি নিজের হাতের তালুর ভেতর তুলে নিয়ে শক্ত করে চেপে ধরল। শীতের কনকনে বাতাস তখন গাছের পাতাগুলোকে কাঁপিয়ে দিয়ে বয়ে যাচ্ছিল। দূর থেকে ভেসে আসছিল রাতের পাখির মৃদু ডাক। অথচ অর্কোর কাছে মনে হচ্ছিল, চারপাশটা যেন হঠাৎ অস্বাভাবিকভাবে নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। সে ধীরে ধীরে মাটির ওপর নিজের কপালটা আলতো করে ঠেকিয়ে দিল। চোখ দুটো বন্ধ হয়ে এলো। বুকের ভেতর জমে থাকা কথাগুলো একে একে গলার কাছে এসে আটকে যাচ্ছিল। কত কথা জমে ছিল তার কত স্বপ্ন, কত অভিমান, কত না-বলা ইচ্ছে। অর্পিতাকে নিয়ে দেখা সেই স্বপ্নগুলো, একসঙ্গে কাটানোর কথা থাকা দিনগুলো... সবকিছুই যেন হঠাৎ থেমে গেছে। অর্কো আর কিছু বলল না। শুধু কবরের ভেজা মাটিতে কপাল ঠেকিয়ে অনেকক্ষণ নিঃশব্দে পড়ে রইল। কারণ তার এখনও অর্পিতার সঙ্গে অনেক কথা ছিল।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now