বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

কৃষ্ণকলি

"ফ্যান্টাসি" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান Suborna Akhter Zhumur (০ পয়েন্ট)

X এতোদিনে কৃষ্ণকলি বধূ হলো। এতোদিনে তার মাথায় ঘোমটা উঠলো। লাল টুকটুকে বৌ সেজে নারীর আকাঙ্ক্ষিত অবস্থার স্বাদ পেলো। কোনো এক কনে দেখা রোদ্দুরে তাকে দেখলে সবাই অবাক হবে। বলবে, "ইশ! বৌ সাজলে কৃষ্ণকলিকে কি সুন্দরই না লাগে!" এমন কথা শোনার সময় ঘনিয়ে এলো। ভালোবাসার মানুষকে বিয়ে করে বৌ সাজার আলাদা পরিতৃপ্তি আছে। কৃষ্ণকলি সেই অম্লমধুর পরিতৃপ্তি পেলো। একটি মেয়ে বৌ সাজার আগে তার মনের ভেতর যে উৎসব হয়, কৃষ্ণকলি অগোচরে আনমনে সেই স্বাদ নিতে চাইলো। সত্যিকারের বৌ সাজার দিনকয়েক আগেই ছটফটে মেয়েটি ঘরের দরজাটা চুপটি করে বন্ধ করে মনের দরজা হাট করে খুলে দিয়ে একমনে বৌ সাজতে থাকলো। জামা ছেড়ে বেনারসি পড়ে নিলো। শাড়ি পড়ে একলাফে খাটের উপর উঠলো, আবার লাফিয়েই নীচে নেমে গেলো। পায়ে নূপুর পড়লো। চোখে কাজল লাগিয়ে কাজল কালো চোখদুটি আরো মায়াবী করে নিলো। দুই হাত ভরতি চুড়ি পরে আয়নার সামনে গিয়ে চুড়িগুলো বাজিয়ে দেখলো। গোলাপ রঙা ঠোট দুটিকে লিপস্টিক দিয়ে আরো রাঙিয়ে নিলো। তারপর, সোজা আয়নার সামনে। ডান থেকে বামে আর বাম থেকে ডানে নড়েচড়ে নিজেকে ভালোভাবে দেখে নিলো। এবার আয়না বরাবর দূর থেকে হেটে এলো কনের ঢঙে। আয়নায় চোখ পড়তেই ক্ষণেক্ষণে লাজে রাঙা হয়ে যাচ্ছে কৃষ্ণকলি। দেখে যেন মনে হচ্ছে, লাজে রাঙা লজ্জাবতী লাল টুকটুকে বৌ। চুড়িগুলো আবারো ঝনঝন শব্দে নাড়লো। কিছুক্ষণ ভেবে, আয়নার দিকে মুখ সোজা করে দাঁড়িয়ে ভেঙচি কাটলো। মুখ গোমরা করে ছলছল চোখে বসে পড়লো হঠাৎ। ওটা অভিমান করলে কেমন দেখাবে সেটা দেখার জন্য। প্রিয় মানুষটার সাথে তো মাঝেমাঝে অভিমান করতেই হবে। কারণ, কৃষ্ণকলি তো বড্ড অভিমানী! কী যেন মনে করে মুচকি হেসে উঠলো হঠাৎ। মুচকি হাসিতে তাকে লক্ষী বৌয়ের মতোই লাগে। শৈশব, কৈশোর চোখের সামনে এসে দাঁড়ালো হঠাৎ দমকা হাওয়ার মতো। ভেবেভেবে বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠলো। জন্ম থেকে এতোদিন, এতোগুলো বছর পর্যন্ত যে আশ্রয়, ছোট্ট জগৎ ছিলো তার সেই জগতে তার আয়ু আর স্বল্পক্ষণ। থেকেথেকে চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে তার। বুকফাটা আর্তনাদে বুকের ভেতরটা তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে কালবৈশাখী ঝড়ের মতো। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো সে। পাছে কেউ শুনে ফেলবে, সেই ভয়ে। বাবার মৃত্যুর পর থেকে মা হচ্ছে কৃষ্ণকলির মা ও বাবা দুইটি সত্তা। মা হচ্ছে তার জীবনে বটবৃক্ষের শীতল ছায়ার মতো, তৃষ্ণায় সুমিষ্ট পানির মতো। মায়ের কোলেই ছিলো কৃষ্ণকলির একমাত্র শান্তি আর ভরসার আশ্রয়। মায়ের সাথে তার আত্নার সম্পর্ক। বন্ধুর মতোই সব কথা মায়ের কাছে প্রকাশ করে। নইলে সে শান্তি পায়না। তাই মনের ঘরে যখন প্রথম ফাগুনের রং লেগেছিলো তক্ষুনি সে তার মাকে জানিয়ে দিয়েছিলো প্রাণের মানুষটার কথা। মা অমত করেনি। কারণ, আচারব্যবহার, পারিবারিক অবস্থা, পাত্রের শিক্ষাদীক্ষা সবকিছু মিলিয়েই অপছন্দ করার মতো কিছুই নেই। ছেলেটা দেখতেও ভারী মিষ্টি। ছোটো থেকেই সবার আদরের আদরিনী কৃষ্ণকলি। মা আর ভাই তাকে আগলে আগলে রেখেছে। প্রতিদিন মা যত্ন করে তার চুলে বেনী গেঁথে দিতো। সেই বেনী ছন্দেছন্দে দুলিয়ে ছুটে বেড়াতো কৃষ্ণকলি। ভাইয়ের কথা মনে এলেই চোখ ফেটে জল এলো কৃষ্ণকলির। একমাত্র বোনকে কখনোই একটুও বকেনি তার ভাই। মুখ ফুটে চাওয়ার আগেই সব চাহিদা পূরণ করেছে ভাই তার একমাত্র বোনটির। স্মৃতির এ্যালবামে আরো ধরা দিলো একমাত্র প্রিয় বান্ধবীর মুখ। প্রতিদিনের ছোটোখাটো সমস্ত কথা যার কাছে না বললে চোখের ঘুম হারাম হয়ে যেতো কৃষ্ণকলির। একসাথে খাওয়া, একই সাথে হাতে হাত রেখে ঘুরে বেড়ানো, একই সাথে দুজনে বৃষ্টিতে ভেজার সেই মুহূর্তগুলো যেন চোখের সামনে আয়নার মতো একেরপর এক ভেসে আসছে তার। দিন যতোই এগোতে লাগলো ততোই কৃষ্ণকলির বুকটা ফাঁকাফাঁকা অনুভব হতে লাগলো। মনে হচ্ছে কিছু একটা দমকা ঝড়ো হাওয়ার মতো এসে তার বালিকাবেলার ডানপিটে দুষ্টুমিষ্টি সময়গুলোকে তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এমন একটা জীবনে সে পা ফেলতে চলেছে যেখানে ইচ্ছে করলেই বালিকাবেলার সেই শ্রুতিমধুর স্বাধীনতা মেলেনা। বধূ বেশে আলতা রাঙা পা ফেলতে হবে অন্যের ঘরে। খাঁচায় বন্দী পাখির মতোই হবে বোধহয় তার জীবন! ভেবেভেবে অজানা আশংকায় কেঁপে উঠছে তার হৃদয়। যদিও সে নিশ্চিতভাবে জানে, সেখানেও ভালোবাসা আছে। অন্য সুর, অন্য রঙে সাজবে সেই জীবন। তবুও দুটি জীবনের মধ্যে কোথায় যেন অদৃশ্য এক দেয়াল থেকে যাবে। যেখানে, ডানা থাকলেও ওড়া যাবেনা, যখনতখন মুক্ত হাওয়ায় ভেসে বেড়ানো যাবেনা। যদিও, কারো হৃদয়ের মণিকোঠায় থাকা ভালোবাসার মায়াজালে বন্দী হওয়াতেও অজানা সুখের ছোঁয়া থাকে। বিয়ের দিন কৃষ্ণকলিকে অসাধারণ মায়াবতী সুন্দরী দেখাচ্ছিলো। গায়ে হলুদের চিহ্ন তখনো কিছুটা ছিলো। পাড়াসুদ্ধ লোক তাকে দেখে অবাক হলো। শ্যামবর্ণা কৃষ্ণকলিকে যারা কালো বলে খোঁটা দিতো, তাদের মুখ ভাঙলো। রবীন্দ্রনাথ যথার্থই বলেছেন-- "কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি কালো তারে বলে গায়ের লোক; মেঘলা দিনে দেখেছিলেম মাঠে কালোমেয়ের কালো হরিণ চোখ; ঘোমটা মাথায় ছিলনা তার মোটে মুক্তবেণী পিঠের পরে লোটে; কালো? তা সে যতোই কালো হোক দেখেছি তার কালো হরিণ চোখ।। সারা বাড়ি আনন্দে বিহ্বল হলো। ছোটোবড়ো সবাই আনন্দে রং মাখছিলো। কিন্তু কৃষ্ণকলির মনে আনন্দের ছিটেফোঁটাও ছিলোনা। সারা বাড়ি ঘুরে দেখলো সে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ঘরের প্রতিটা কোন দেখে নিলো। যেন এদেখাই শেষ দেখা। কারণ, বিয়ের পর থেকে তো এ বাড়ির ঘরে যখনতখন দস্যিপনা করে নূপুর পায়ে ঝমঝমিয়ে ছুটে বেড়াতে পারবেনা সে। পায়ে যে তার শিকল বাধা পড়বে! তারপর সেই ক্ষণ এলো। কতো নিষ্ঠুর, শ্বাসরুদ্ধকর সেই ক্ষণ!! যখন মা তার নাড়িছেঁড়া ধনকে অন্যের হাতে তুলে দিয়ে বিদায় জানালো। কৃষ্ণকলির নতুন জীবনে ছন্দ এলো। ছোট্ট একটা মিষ্টি সংসার তার। যাকে নিয়ে চোখে রাজ্যের স্বপ্ন ভীড় করতো, যাকে হারানোর ভয়ে চোখের ঘুম হারাম হয়ে যেতো সেই মানুষটাকে সারাজীবনের জন্য আপন করে পেয়েছে সে। নতুন বধূর আগমনে সারা বাড়িতে আনন্দ উপচে পড়ছে। নূপুর পায়ে অবাক চোখে সারাবাড়ি ঘুরে দেখে কৃষ্ণকলি। আর তার বর তো তাকে সারাক্ষণ চোখেচোখে রাখে, চোখের আড়াল হলেই যেন অস্থির হয়ে যায়। রান্নাঘরে কৃষ্ণকলিকে একা কাজ করতে দেয়না, নিজেও হাত লাগায় সাথে। হয়তো কখনো মশলা বেটে দেয়, কখনো বাসন ধুয়ে দেয়, কখনোবা নিজের হাতে রান্না করে খাওয়ায় বৌকে। আর খোঁপা বেধে দেয়া, নিজের হাতে সাজিয়ে দেয়া তো রয়েছেই! তবুও, বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠে অব্যক্ত চাপাকান্নায়। মা যে বড্ড একা। রাতে একমাত্র কলিজার টুকরো মেয়েকে পাখির ছানার মতো বুকের মাঝে আগলে ঘুমানোর অভ্যাস তার। আনমনে জানালায় পাশে দাড়িয়ে অজানায় চোখ মেলে নীরবে চোখেরজল ফেলে সে। কৃষ্ণকলি বধূ সেজে এই অচেনা, অজানা সংসারে অভিযোজিত হয়ে যেন অথই সমুদ্রে পড়লো। কৃষ্ণকলির ভালোবাসার মানুষটা কিন্তু তার না বলা কথাগুলো বুঝে নিতে পারে। প্রায়ই মায়ের কাছে মেয়েকে নিয়ে যায় সে। কারণ, মেয়েটা যে শুধু তারই জন্যে নিজের জগৎ, আপনজনদের ছেড়ে চলে এসেছে।। কৃষ্ণকলি তার ভালোবাসার মানুষটিকে সত্যিই চিনতে ভুল করেনি। চাপা স্বভাবের কৃষ্ণকলির মুখ ফুটে কোনোকিছু চেয়ে নেয়ার অভ্যাস কখনোই ছিলনা। কৃষ্ণকলি অবাক হয়ে মাঝেমাঝে ভাবে, কীভাবে এই মানুষটা তার ভালোলাগা, মন্দলাগা, না বলা কথা, রাগ ও অভিমানের কারণগুলো চোখের দিকে তাকিয়েই বুঝে যায়!! ভালোবাসার পূর্ণতায় পুরোপুরিভাবে পরিপূর্ণ সে। ছোটোখাটো খুনসুটি, সীমাহীন ভালোবাসায় ভরা তার জীবন। কোনো বৃষ্টিমুখর দিনে দেখা যায় কৃষ্ণকলি তার স্বামীর সঙে ছন্দ তুলে উঠোনে নেচে বেড়াচ্ছে। হয়তোবা, দুজনে আনমনে গেয়ে ওঠে -- "আজ যেমন করে গাইছে আকাশ তেমনি করে গাও গো; আজ যেমন করে চাইছে আকাশ তেমনি করে চাও গো।। SUBORNA AKHTER ZHUMUR


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১২০৭ জন


এ জাতীয় গল্প

→ কৃষ্ণকলি
→ কৃষ্ণকলি

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now