বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
রাস্তার ধারে খালিশপুর পেপার মিলসের ম্যানেজার সাহেবের বাসা। ডুপলেক্স বাংলো বাড়ি। বাসার সামনে একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ। রোজ সকালে রাস্তাটা লাল হয়ে থাকে। রোজ সকাল আর সন্ধ্যায় তারেক সেই লাল রাস্তায় গাছের আড়াল থেকে ম্যানেজার সাহেবের লাল টুকটুকে গাড়িটা দেখে।
রাস্তার ঠিক অপর পাশে জহিরুদ্দিন মজুমদারের এক তলা কোয়ার্টার। ৩ টা শোবার ঘর, একটা বৈঠকখানা আর একটা বাথরুম। জহিরুদ্দিন সাহেব পেপার মিলসের একাউন্টস সেকশানের কেরানী। তারেক তাঁর ছোট ছেলে। উনার আরেকটা মেয়ে আছে, নাম শিউলী। জহিরুদ্দিন সাহেবের স্ত্রী'র নাম রেহেনুমা খানম। ভদ্রমহিলা সারাদিন অকারণে শিউলীকে মারধোর করেন। রোজ বিকেলে জহিরুদ্দিন সাহেব মিল থেকে রওনা দিয়ে বাসার হাফ কিলোমিটার দূর থেকে তাঁর স্ত্রীর চিৎকার শুনতে পান। "হারামজাদীর বাচ্চা, এক কিলাসে দুইবার ফেল করিছিস, মুখে পাউডার মেখে ইশকুলি যাওয়ার জন্যি তোরে ইশকুলি ভর্তি করিছি? নটি বাড়ি ঢুকায় দেব তোরে আমি। নাইকা হওয়ার শখ করিছ?" ক্লাস এইট পড়ুয়া কোন মেয়ের গায়ে অকারণে হাত তোলা কতটা শোভন সেটা নিয়ে জহিরুদ্দিন সাহেবের সন্দেহ আছে কিন্তু তিনি তাঁর স্ত্রীকে কিছু বলেন না। রেহেনুমা খানম ক্লাস টু পাশ। উনাকে কিছু বলে লাভ নেই। জহিরুদ্দিন সাহেব এক হাতে টিফিন ক্যারিয়ার আরেক হাতে ছাতা নিয়ে গুটি গুটি পায়ে পেপার মিলসের রাস্তা ধরে বাসার দিকে আগান। মাঝে মাঝে অন্য কর্মচারীরা বাড়ি না ফিরে উনাকে ক্লাবে এসে এক প্রস্থ তাশ খেলতে বলেন। উনাকে এসব টানে না। প্রতি রাতে ২ থেকে ৩ ঘন্টা কারেন্ট থাকে না। উনি এই সময়টা উনার ছেলে তারেককে নিয়ে হাঁটতে বের হন। মাঝে মাঝে শিউলী তাদের সাথে যাবার মৃদু একটা আবদার করে। সেই আবদারের আওয়াজ রেহেনুমা খানমের অকথ্য শব্দের আওয়াজের আড়ালে আলাদা করে শোনা যায় না।
আমরা যে সময়টার কথা বলছি সেটা ১৯৯৫ সাল। সেই সময় কল কারখানায় ঘাম ঝরত, গার্মেন্টস বিপ্লব হয়ে ওঠেনি। কারখানা বন্ধ হয়ে খালিশপুর পেপার মিলসের আবাসিক এলাকায় তখনো র্যাব ৬ এর হেড কোয়ার্টার তৈরি হয়নি। রোজ সকালে সব কোয়ার্টার থেকে ছাতা আর টিফিন ক্যারিয়ার হাতে একদল মানুষ নিষ্ঠার সাথে কাজ করতে পেপার মিলসের দিকে দ্রুত হেঁটে যেতেন। আবার রোজ বিকেলে তারা অলস পায়ে গল্পের ছন্দে ঘরে ফিরতেন। সন্ধ্যার পর হয়ত ক্লাব হাউজে তাশ, ক্যারাম বা দাবা খেলার আসর বসত। মহিলারা ভালো কিছু রান্না হলেই পাশের বাসায় একটা বাটিতে করে পাঠিয়ে দিতেন। এগুলো তখন ভদ্রতা ছিল না, অধিকার ছিল। কম বয়সী ছেলেরা রোজ বিকেলে মাঠে ফুটবল খেলতে যেত। তখনো বাংলাদেশ আই সি সি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জেতেনি তাই ক্রিকেটটা তখনো উড়ে এসে জুড়ে বসতে পারে নাই। স্কুল কলেজের মেয়েরা এর ওর বাসায় বিকেলে এসে গল্পের বই বা 'কোথাও কেউ নেই' নাটক নিয়ে গল্প করত। শুধু শিউলীদের বাসায় কেউ আসত না। রেহেনুমা খানম সব মেয়েকে জিজ্ঞেস করতেন শিউলী কোন ছেলের দিকে তাকিয়ে হাসি দেয়, কোন ছেলে শিউলীকে ফলো করে, কেন শিউলী স্কুলে যাবার সময় পাউডার মেখে যায়। শিউলী প্রতিদিন নিয়ম করে মায়ের হাতে থাপ্পড় খায়। রেহেনুমা খানম চুলের মুঠি ধরে থাপ্পড় মারেন। এই সিস্টেমটা ভালো। এভাবে মারলে কেউ হুট করে দৌড়ে পালিয়ে যেতে পারে না।
তবে কেউ তারেককে কিছু বলে না। তারেকের বয়স ৬ বছর। সে সারাদিন এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ায়। বিকেলে সবাই যখন ফুটবল খেলে তারেক তখন লেকের পাড়ে গিয়ে পাখির বাসা খোঁজে। পড়াশুনায় বিশেষ মনোযোগ না থাকলেও ম্যানেজার সাহেবের গাড়িটার দিকে তার খুব মনোযোগ। কি সুন্দর একটা গাড়ি। টুকটুকে লাল রং, ভো ভো আওয়াজ দিয়ে স্টার্ট নেয়। গাড়ির ড্রাইভার সাদেক মিয়াকে তারেক খেয়াল করেছে। সে লক্ষ্য করেছে সাদেক মিয়া গাড়ির সাথে কথা বলে। একদিন সাদেক মিয়া বাংলোর পোর্চের নিচে দাঁড় করিয়ে গাড়ি ধুচ্ছে আর বলছে, "তোর আজকে মেলা কস্ট হবে, তোরে নিয়ে ঝিনেদা যাবো। মন খারাপ করিসনে বাপ, রাস্তা যে খারাপ, তোর জন্যি মেলা মায়া লাগতিছে।" তারেক কান পেতে শুনছিল। গাড়িটা আসলেও জবাব দিল কি না সেটা নিয়ে সে মুটামুটি কনফিউজড। যদি জবাব দিয়ে থাকে, কি জবাব দিয়েছিল? একটা গাড়ি থাকলে তার গাড়ির সাথেও কথা বলে দেখা যেত।সন্ধ্যার সময় বাড়ি ফিরে তারেক দেখে রেহেনুমা খানম শিউলী কে খুন্তি দিয়ে মারছেন। শিউলী চুপচাপ মার খেয়ে গেল। আজকের মার খাবার কারণ শিউলীর বইয়ের পাতায় গোলাপ ফুলের পাপড়ি পাওয়া গিয়েছে। রেহেনুমা খানমের ধারণা শিউলী স্কুলের সামনের বখাটেদের সাথে মেলামেশা করে এবং অচিরেই সে ফুলতলা বাজারের বেশ্যাদের দলে যোগ দেবে, এখন শুধুই তার ডাঙ্গর হবার অপেক্ষা। শিউলী এসবে কোন প্রতিবাদ করে না, কান্নাকাটিও করে না। সে চুপচাপ মার খেয়ে হারিকেনে কেরোসিন ভরতে গেল। একটু পরেই কারেন্ট চলে যাবে, তখন হারিকেন না জ্বললে তাকে আরেক প্রস্থ মারধোর কর্মসূচির মধ্যে দিয়ে যেতে হবে। তারেককে এক গ্লাস দুধ দেয়া হল। দুধ খেয়ে তারেক শিউলীকে বলল,
-- আপা, আব্বাকে বলে একটা গাড়ি কিনা যায় না?
-- গাড়ি?
-- হ্যা আপা। ম্যানেজার চাচাদের গাড়ির মত গাড়ি।
শিউলী মুখে হাসি ফুটিয়ে বলে,
-- ঠিক অমন লাল টুকটুকে?
-- হ্যা হ্যা। অমন অমন। ভো ভো শব্দ করবে।
-- আচ্ছা আব্বাকে আজকে বলিস।
গাড়ির কথা শুনে জহিরুদ্দিন সাহেব মৃদু হাসলেন। তারেক আশা আশা চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে আছে। জহিরুদ্দিন সাহেব বললেন,
-- ঠিক আছে কিনে দেব।
-- সত্যি বাবা?
-- হ্যা সত্যি।
-- কবে?
-- এই তো সামনের মাসে।
-- একদম ম্যানেজার চাচার গাড়ির মত? আমি গাড়ির সামনে বসব।
-- ড্রাইভারের পাশে বসে গাড়ি চালাবি?
-- হ্যা হ্যা।
তারেকের আনন্দের বাঁধ ভেঙে গেল। পরদিন খালিশপুর পেপার মিলস সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্লাস ওয়ানের সবাই জেনে গেল তাদের সহপাঠী তারেক সামনের মাস থেকে গাড়িতে করে স্কুলে আসবে।
জহিরুদ্দিন সাহেবের গাড়ি দূরে থাক, সাইকেল কেনার ও সামর্থ নেই। কয়েকবার ভেবেছিলেন ছেলেকে বলবেন, "বাবা আমি গাড়ি কেনার টাকা পাবো কোথায়?"। কিন্তু ৬ বছরের বাচ্চার মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি বলতে পারেন নি। বাচ্চা মানুষ, কাল হয়ত ভুলে যাবে।
কিন্তু কেন জানি তারেক ভুলল না। পরের মাসের প্রথম দিন সে বাবার কাছে জিজ্ঞেস করল তাদের গাড়ি কবে আসবে। জহিরুদ্দিন সাহেব কিছুটা মন খারাপ করলেন। কিন্তু মুখে বললেন এই তো সামনের সপ্তাহে।
পরের সপ্তাহে জাপানে ভয়ঙ্কর এক বন্যা হল। বিটিভি'র ৮ টার খবরে সেই বন্যার ভিডিও দেখানো হল। সেখানে দেখা গেল, বন্যায় একটা লাল গাড়ি ভেসে ভেসে চলে যাচ্ছে। শিউলী তারেককে ডেকে বলল, "দেখ দেখ আমাদের গাড়ি ভেসে চলে গেল!" তারেক বাবাকে জিজ্ঞেস করল। জহিরুদ্দিন সাহেব চুপ করে থাকলেন। তারেক কিছুই বুঝতে পারে না। সে শিউলীকে বলল, "আপা, আমাদের গাড়ি কি তাহলে আসবে না?" শিউলী খুব মন খারাপের মুখ করে বলল, "ভেসে গেল তো। কিভাবে আসবে বল? মন খারাপ করিস না। বড় হয়ে নিজে একটা গাড়ি কিনে নিস।"
তারেক খুব মন খারাপ করে স্কুলে গেল। স্কুলের সবাই এর মধ্যে জেনে গেছে তারেক চাপাবাজ। গাড়ি কাহিনী শুনে উপরের ক্লাসের বড় ভাই শামীম তারেকের একটা নাম দিলেন। 'চাপা তারেক'। ক্লাসরুম, খেলার মাঠ সর্বত্র 'চাপা তারেক' গুঞ্জনে মুখরিত হতে থাকে। তারেক মাঝে মাঝে কৃষ্ণচূড়া গাছের গুড়ি ধরে একা একা কাঁদে। একদিন তাকে কাঁদতে দেখে ম্যানেজার সাহেবের ৫ বছর বয়সী নাতি জাফির তাকে দোতলা থেকে জিজ্ঞেস করল,
-- এই ছেলে তুমি কাঁদছ কেন? তোমার ও কি আমার মত মুসলমানি হয়েছে? তুমি কি খুব ব্যাথা পেয়েছ? আমার ডাক্তার বেলাল ডাক্তার। অনেক ভালো ডাক্তার। কোন ব্যাথা নাই।
ন্যাংটা জাফিরের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে তারেক বাড়ি ফিরে আসে।সন্ধ্যা হয়ে গেছে। বাসা থেকে রেহেনুমা খানমের চিল্লাচিল্লি শোনা যাচ্ছে। অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শোনা যাচ্ছে। অনেক দূরে ছাতা আর টিফিন ক্যারিয়ার হাতে একটা ছায়া আধো আধো অন্ধকারে হেঁটে হেঁটে এদিকে আসছেন। তারেক জানে সেটা তার বাবা।আজ বিকালে শিউলীর সমাজ বইয়ের ভাঁজে একটা প্রেম পত্র পাওয়া গিয়েছে। পত্রদাতার নাম রফিক। রেহেনুমা খানম পড়ালিখা জানেন না। উনি পাশের বাসার ভাবীদের ডেকে এনে সেই প্রেম পত্র রিডিং পড়িয়ে শুনলেন। চিঠি পাঠের আসর শেষে সবার সামনে উনি শিউলীকে নটির বেটি গালি দিয়ে গলায় বটি চেপে ধরলেন। শিউলীর বান্ধবীরাও এসেছিল। একজন জানাল তার বড় ভাই শিউলীকে স্কুল ফাঁকি দিয়ে রফিকের হাত ধরে গ্যারিসন সিনেমা হলের সামনে ঘুরাঘুরি করতে দেখেছে। শিউলী আজ মার খেতে খেতে কামিজ খুলে ফেলল। ব্যাপারটা ইচ্ছাকৃত না। কিন্তু রেহেনুমা খানম সবার সামনেই মারতে মারতে বললেন, "কাপড় খুলার মেলা শখ না? দাঁড়া তোর শখ মিটাচ্ছি আইজকে।" আশেপাশের মহিলাদের কয়জন থামাতে আসেন। এক ভদ্রমহিলা বললেন, "মেরে আর কি করবেন, বিয়ে দিয়ে দেন, এই মেয়েকে সামলানো সম্ভব না। সবে ক্লাস এইটের মেয়ে আর তার কান্ডটা কি!"
রাত ৮টায় কারেন্ট চলে গেল। শিউলী হারিকেন নিয়ে কেরোসিন ভরতে গেল। রাত ৮টা ১০ মিনিটে শিউলী গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিল। রাত ৮টা ১২ মিনিটে মেয়ের গায়ে আগুন জ্বলতে দেখে রেহেনুমা খানম অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন। রাত ৮টা ১৪ মিনিটে সবার চেস্টায় সেই আগুন নেভানো হল। খবর মনে হয় দাবানলের মত, তৈরি হতে সময় নেয় ছড়াতে নেয় না। গায়ে আগুন লাগানোর খবর ম্যানেজার সাহেব পেয়ে নিজে চলে আসলেন। শিউলীর অবস্থা ভালো না। শরীরের বেশিরভাগ অংশ পুড়ে গিয়েছে। রেহেনুমা খানমের জ্ঞান ফিরেছে। ম্যানেজার সাহেব সাদেক মিয়াকে বলে তাঁর গাড়ি বের করালেন। জহিরুদ্দিন সাহেব "ও আল্লাহ, আমার সাথে তুমি এইটা কইরো না গো আল্লাহ" বলে চিৎকার দিতে দিতে মেয়েকে কোলে নিয়ে গাড়িতে উঠলেন।
তারেক গাড়ির সামনে বসল। ড্রাইভারের পাশে। গাড়ির গন্তব্যস্থল তৎকালীন আড়াইশো বেড, বর্তমানে খুলনা মেডিকেল কলেজ। নতুন রাস্তার মোড় পার হবার সময় শিউলী মারা যায়। রেহেনুমা খানম গাড়ির পিছনে বসে মুখ দিয়ে ফ্যানা বের করে অজ্ঞান হয়ে যান। জহিরুদ্দিন সাহেব "ও মা, ও শিউলী মা, ও আমার মা রে, ও আল্লাহ, এইটা তুমি কি করলা?" বলে প্রবল জোরে চিৎকার করতে থাকেন। হার্জ সাহেব বেঁচে থাকলে সেই চিৎকারের কম্পাংক নিয়ে একটা মতামত পাওয়া যেত।
তারেক তখন এক দৃষ্টিতে সাদেক মিয়ার হাতে ধরা গাড়ির স্টেয়ারিং এর দিকে তাকিয়ে আছে। গাড়িটা কি সুন্দর! শুধু কেমন জানি একটা মাংস পোড়া গন্ধ। চিৎকার, গোঙ্গানি বা কান্নার শব্দের মাঝেও খুব মৃদু শব্দে তারেক সাদেক মিয়ার কন্ঠে কয়েকবার বার "ইন্নানিল্লাহি অয়ান্নি ইলাইহে রাজিউন" শুনতে পায়।
গাড়িটা কথা বলতে পারে কি না সেটা সাদেক চাচাকে জিজ্ঞেস করতে হবে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now