বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
পলিটিক্যাল থ্রিলার,কনস্পিরেসি
(পর্ব-৬)
পাঁচ
এক কথায় বিশ্বজিতের পরিচয় দিতে
গেলে বলতে হয় সে একজন চোর।
তবে এখানেই থেমে গেলে তার
সম্পর্কে একটা ভুল ধারণার অবকাশ
থাকে।সাধারণ চোরের সাথে
বিশ্বজিতের তুলনা করলে তার প্রতি
খানিক অবিচারও করা হয় বৈকি!
বিশ্বজিত চুরিকে অনেকটা শিল্পের
পর্যায়ে নিয়ে গেছে।শুরু থেকেই বলা
যাক।
বিশ্বজিতের বাবা পেশায় একজন
নরসুন্দর ছিলেন।সমাজের
মানুষগুলো এই ধরনের পেশার উপর
পুরোপুরি নির্ভরশীল হলেও এই
মানুষগুলোকে নিজেদের পাশে
দেখতে চায় না।বিশ্বজিতকেও
ছোটবেলা থেকেই অবহেলার মধ্যে
বড় হতে হয়েছে।
মনোবিজ্ঞানীরা হয়ত বলবেন,তখন
থেকেই বিশ্বজিতের মধ্যে ধনী
শ্রেণীদের প্রতি এক ধরনের ঘৃণা
জন্মায়।যা কিনা তার চোর হয়ে
ওঠার পেছনে অংকুর হিসেবে কাজ
করেছে।তবে বিশ্বজিতের কাহিনী
আরো খানিকটা জটিল।
বিশ্বজিতের বাবা ছেলেকে
উচ্চশিক্ষিত করেছেন পয়সার
নিদারুণ অভাব সত্বেও।তিনি
চেয়েছিলেন তার সন্তান যেন অন্তত
সমাজের উঁচু তলায় গিয়ে দাঁড়াতে
পারে।বিশ্বজিত বাবার স্বপ্ন পুরণ
করেছে।সে এখন মাঝে মধ্যেই
সমাজের উঁচু তলায় গিয়ে
দাঁড়ায়,এরপর তলা কেটে আবার
বেরিয়েও আসে!
যাইহোক,পড়াশোনা শেষ করবার পর
উঁচু তলায় দাঁড়ানো তো দুরের
কথা,একটা চাকরি পর্যন্ত যোগার
কার সম্ভব হলনা বিশ্বজিতের
পক্ষে।চোখের সামনে বাবা ধুকে ধুকে
মারা গেল।বাবার মৃত্যুর পর মা
স্ট্রোক করে ঘরে পড়ে গেলেন।
মায়ের চিকিৎসার টাকার জন্য হন্যে
হয়ে ঘুরে বেড়াল বিশ্বজিত পথে
পথে।কোথাও একটা ছোট্ট চাকরিও
মিলল না।এক জায়গায় কথাবার্তা
চলছিল।কিন্তু যখনই শুনল ওর বাবা
নরসুন্দর,সোজা বাংলায়
নাপিত,সাথে সথে ওকে এক প্রকার
দুর দুর করে তাড়িয়ে দেয়া হল।
দিশেহারা বিশ্বজিতের বদলে যাবার
কাহিনী শুরু হল এক রাতে।
সেদিন রাতে একজায়গায় ইন্টারভিউ
দিয়ে বাড়ি ফিরছিল বিশ্বজিত।রাত
তখন বেশ গভীর হয়েছে।রাস্তা দিয়ে
হাঁটতে হাঁটতেই দেখল রাস্তার পাশের
একটা একতলা বাড়ি থেকে এক
লোক ফোনে কথা বলতে বলতে বের
হচ্ছে।ওকে দেখেনি।বেশ জোর গলায়
বলছে।সবকিছু স্পষ্টই শুনতে পেল
বিশ্বজিত।
‘হ্যালো,শোনো,আমার ওয়াইফের
আজ রাতে ডেলিভারি তো,আমি এখন
হাসপাতালে যাচ্ছি।বাসায় কেউ নেই।
আমি আজ রাতে ফিরব না।তোমাকে
আজ রাতে আমার বাসায় এসে
থাকতে হবে।আমি যাবার পথে
তোমার বাসায় চাবি দিয়ে যাচ্ছি,তুমি
দোকান থেকে ফিরে খাওয়া দাওয়া
করে,আমার বাসায় এসে রাতে
থেকো।ওকে,ওকে,দেরী হলে সমস্যা
নেই।রাতে থাকলেই হবে।’
লোকটা চলে গেল।বিশ্বজিত দাঁড়িয়ে
রইল জায়গায়।লক্ষ্য স্থির করে
ফেলেছে।
কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে বাড়ির
পাশের নির্জন গলিতে ঢুকে পড়ল।এই
গলি ঘেসেই বাড়ির দেয়াল।দেয়ালের
উপরে পেরেক থাকলেও কালের
অত্যাচারে ভোঁতা হয়ে এসেছে
ওগুলো।তেমন কোনো সমস্যা
ছাড়াই টপকে যেতে পারল।বাড়ির
আঙ্গিনায় তো ঢুকে পড়া গেল,এখন
ভেতরে ঢুকবে কিভাবে?
বাড়ির পেছন দিকে চলে গেল সে।
বাগানের মধ্যে একটা ভারী পাথর
পাওয়া গেল।ওটা নিয়ে খানিক কসরত
করল তালার উপর।জোরালো শব্দ
হলেও আমল দিলনা তাতে।সে ঢাকা
শহরের অবস্থা জানে।পাশাপাশি
ফ্ল্যাট হলেও ভয়ের একটা ব্যাপার
ছিল,কিন্ত এই গোটা বাড়িতে একটাই
ইউনিট।চারপাশেই দেয়াল দিয়ে ঘেরা।
অতএব শব্দ নিয়ে চিন্তা করার মত
সৌজন্যতাবোধ প্রতিবেশীরা কেউ
দেখাতে যাবেনা।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই তালা ভেঙ্গে
ফেলল বিশ্বজিত।
বুকটা প্রচন্ড বেগে ছুটে চললেও
সাহস হারাল না সে।বারবার প্রবোধ
দিয়ে গেল,সহসা কারো ফিরে আসার
সম্ভবনা নেই।যাকে রাতে থাকতে
বলে গেছে সে দোকান থেকে নিজের
বাড়িতে ফিরবে,খাওয়া দাওয়া করবে
এরপর এখানে আসবে।ততক্ষণে
কাজ হয়ে যাবে ওর।এখন একটাই ভয়
মালিক না আবার ফেরত চলে আসে।
দেখা গেল ভুলে কিছু একটা ফেলে
গেছে,জরূরী কিছু।
মাথা থেকে চিন্তা ভাবনা ছুড়ে ফেলে
আলমারির খোঁজ করতে লাগল।
স্টিলের আলমারির খোঁজ পেতেই
ওটা খোলা নিয়ে মাথা ঘামাতে হল
ওকে।দুটো উপায় আছে।এক,চাবি
খুঁজে নিয়ে আলমারি খোলা,যদি
আদৌ বাড়িতে থেকে থাকে।অথবা
লক ভেঙ্গে ফেলা।
চাবি খোজার ঝামেলায় গেলনা
বিশ্বজিত।রান্নাঘর থেকে একটা দা
আর মশলা বাটার শিল নিয়ে এল।দা
আর শিল দিয়ে স্টিল কেটে লক নষ্ট
করল।কিন্তু পুরো আলমারি তন্ন
তন্ন করেও কাপড় চোপড় ছাড়া আর
কিছুই পাওয়া গেলনা।মাথায় রক্ত
উঠে গেল ওর।টাকা পয়সা না
থাকলেও গয়নাগাটি তো কিছু থাকবে
নাকি?
হঠাৎ মনে পড়ে গেল,আরেকটা কাঠের
আলমারি দেখেছে সে।যদিও স্টিলের
আলমারি রেখে কাঠের ওয়ারড্রোবে
দামী জিনিস রাখার সম্ভবনা খুবই
কম।তবুও এবার বিশ্বজিত ঝাপিয়ে
পড়ল ওটার উপরে।খুব সহজেই চাড়া
দিয়ে কবজা ভেঙ্গে ফেলল
ওয়ারড্রোবের।
খুলতেই চক্ষু ছানাবড়া হয়ে গেল ওর।
ভেতরে নগদ বেশ কিছু টাকা ছাড়াও
প্রচুর গয়না রয়েছে।
এমন পরিস্থিতে যে কেউই সব
হাতিয়ে নিত।কিন্তু বিশ্বজিত
নিয়ন্ত্রণ হারাল না।নগদ টাকা
সামান্য কিছু নিল।বাড়ির মালিকের
স্ত্রীর ডেলিভারি আজ।যেকোনো
মুহুর্তে নগদ টাকার প্রয়োজন হতে
পারে।
বিশ্বজিত অর্ধেক গয়না একটা
কাপড়ে প্যাঁচালো।সেগুলোর দামও
তিন লাখ টাকার কম হবেনা।কিছু
বনেদী গয়না ছিল,ওগুলো ছুঁয়েও
দেখল না।সম্ভবত পারিবারিক
ঐতিহ্য এগুলো।
পরবর্তী দুই মিনিটের মধ্যে গয়নার
পোটলাটা নিয়ে বেরিয়ে এল
বিশ্বজিত।
সে রাতেই ওর মা মারা যান।আর
পরেরদিন ওকে উপহাস করতেই যেন
হাজির হয় একটা এপয়েন্টমেন্ট
লেটার!
দ্বিতীয়বার সেটা পড়ে দেখার
প্রয়োজন বোধ করেনি বিশ্বজিত।
টুকরো টুকরো করে ছিঁড়েছে চিঠিটা।
যতগুলো টুকরো করা সম্ভব।এটার
কোনো প্রয়োজন নেই তার।সে তার
কাজ পেয়ে গেছে।
বোকা না বিশ্বজিত।জানে,গতরাতের
ঘটনা ছিল স্রেফ তার সৌভাগ্য।
এমনটা প্রতিদিন হবেনা।এ পেশায়
থাকতে চাইলে তাকে অনেক কিছু
শিখতে হবে।
এর পরের একটা মাস সে এক দক্ষ
তালা চাবি মেরামতের কারিগরের
কাছে তালার জাদু শিখল।যেকোনো
তালা দু মিনিটের মধ্যে খুলে ফেলবার
মত দক্ষতা,সরঞ্জাম যোগার
করল।শিখল আরো অনেক কিছুই।
এখন সে কোনো দড়ি দড়ার সাহায্য
ছাড়াই বহুতল ভবনে তরতরিয়ে উঠে
যেতে পারে জানালা,কার্নিশ কিংবা
পানির পাইপকে সম্বল করেই।
এমনকি এক ম্যাজিশিয়ানের কাছ
থেকে হাত সাফাইটাও শিখে নিয়েছে
কী মনে করে।
তার চুরির বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য আছে
যা অন্য সবার থেকে আলাদা করে
ওকে।দু বছর ধরে এ পেশায় আছে
বিশ্বজিত।এই দু বছরে ওর চুরির
সংখ্যা মাত্র সাতটি।এর বেশি
প্রয়োজনও হয়না।তার এক একটা
দাঁওকে পুকুর চুরি বলা যায়!একটা চুরি
থেকে যে পরিমাণ টাকা সে আয় করে
তাতে করে পরবর্তী এক বছর রাজার
হালে থাকতে পারবে সে।কিন্তু চুরি
করাটা তার শুধু পেশাই না,নেশায়
পরিণত হয়েছে।যার ফলে
উত্তেজনার লোভে হলেও ওকে চুরি
করতে হয়।
বিশ্বজিতের কাজের প্রাণ ভোমরা
হল তার প্ল্যান।এক একটা চুরির
আগে সে কমপক্ষে একমাস ধরে
স্টাডি করে তার টার্গেট।পুরো
এলাকার ম্যাপ,তার টার্গেটের
অবস্থান,একাধিক এস্কেপ রুটসহ
সব কিছু মাথার মধ্যে গেঁথে নিয়েই
সে মূল কাজে হাত দেয়।এজন্যই তার
চুরির পরিমাণ এত কম।আর তার
টার্গেটগুলো,বলাই বাহুল্য রুই
কাতলাই হয়ে থাকে।এখন পর্যন্ত
ওর কোনো কাজে ব্যার্থতার নজির
নেই।প্রথমবারের মত এখন আর
দয়াও দেখায় না সে।যাদের সে
টার্গেট করে তাদের দয়া দেখানোর
কোনো মানেই হয়না।যতটুকু সম্ভব
কাঁচিয়ে নিয়ে আসে!নগদ টাকা আর
গয়না ছাড়া আর কিছুই ওকে আগ্রহী
করতে পারেনা।
এভাবেই গত একমাস আগে সে একটা
টার্গেট ঠিক করে।কিন্তু টার্গেটকে
স্টাডি করতে গিয়েই বেশ কিছু
রহস্যময় ব্যাপার তার নজরে পড়ে
যায়।আগ্রহী হয়ে পড়ে বিশ্বজিত।
ওর টার্গেটের উপর নজর রাখতে শুরু
করবার পর মাঝে মধ্যেই একটা
কালো রঙের গাড়িকে দেখতে পেত
ওর আশেপাশে।যেন ছায়ার মত
অনুসরন করে চলেছে ওকে।আশ্চর্য
হয়ে গিয়েছিল বিশ্বজিত।আজ
পর্যন্ত যে কটা অপারেশন
(বিশ্বজিত ওর চুরিকে অপারেশন
বলে!)ও করেছে,আগে থেকে টের
পাওয়া তো দুরে থাক,চুরি করে বের
হয়ে আসার আগ পর্যন্ত কেউ
ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারত না কত বড়
সর্বনাশের বার্তা রেখে এসেছে সে।
সেই মুহুর্তে বুদ্ধিমানের কাজ হত
এই কাজটা ছেড়ে অন্য কোনো
টার্গেট ঠিক করা।কিন্তু বিশ্বজিত
সব সময়ই ওর এই পেশাকে একটা
চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে।এজন্য
ওর টার্গেটগুলোও হয় চ্যালেঞ্জিং।
এতবড় একটা চ্যালেঞ্জ গ্রহন না
করবার কোনো কারণ বিশ্বজিতের
সামনে ছিলনা।
জেদ চেপে যায় ওর মধ্যে।পুরনো
প্ল্যানটাকেই আরো মডিফাই করতে
থাকে।দীর্ঘ পরিকল্পনার পর
অবশেষে গতরাতে ওর টার্গেট
এরিয়ায় ঢুকে পড়ে।সেখানে
ঘটনাক্রমে সে খুঁজে পায় অদ্ভুত
এবং ভয়াবহ এক ফাইল।ফাইলটা
পড়ার সাথে সাথেই বুঝতে পারে
সামনেই খুব বড় একটা বিপদ দেশের
প্রতিটা মানুষের জন্য অপেক্ষা করে
আছে। সময়মত প্রতিহত করতে না
পারলে বিপর্যয় নেমে আসবে
অচিরেই।
ফাইলটা একবার চুরি করে আনতে
চেয়েছিল,পরক্ষণেই বুঝতে পারল
সেটা চুড়ান্ত বোকামি হবে।ফাইল চুরি
হলেই সতর্ক হয়ে যাবে কালপ্রিট।
অবশেষে কোনো কিছু চুরি না করেই
বেরিয়ে আসে ও।
বাড়িটা থেকে বেরিয়েই বুঝতে পারে
ওর সব পরিকল্পনা মাঠে মারা গেছে।
চুরির ঘটনা কী করে যেন টের পেয়ে
গেছে ওকে অনুসরন করতে থাকা
রহস্যময় সেই গাড়ি এবং তার
আরোহীরা।
বিশ্বজিত জানেনা,গাড়ির আরোহীরা
কারা,কী চায়,কেনই বা ওকে অনুসরন
করছে।তাও নতুন টার্গেটের ব্যাপারে
খোঁজ খবর শুরু করবার পরই এই
হ্যাপা দেখা দিয়েছে।অদ্ভুত ব্যাপার
হল এই গাড়ির আরোহী কিংবা
আরোহীরা তাকে কোনো ধরনের
বাধা দেয়নি।বিশ্বজিতের একবার
সন্দেহ হয়েছিল টার্গেটের সাথে
রহস্যময় এই গাড়ির আরোহীদের
আদৌ কোনো সম্পর্ক আছে কিনা।
নাকি কাকতালীয় সম্পুর্নটাই। নয়ত
ওকে কোনো ধরনের বাধা কেন দেয়া
হলনা?
তবে গতরাতে চুরি না করে এরিয়া
থেকে বেরিয়েই বুঝতে পারে ওর
কোনো পদক্ষেপই অজানা নয়
রহস্যময় অনুসরনকারীদের।বাড়িটার
কিছুটা দুরেই ঘাপটি মেরে ছিল
গাড়িটা।তেমন কোনো আড়ালও
নেয়নি।যেন বিশ্বজিতের চোখে
পড়বার জন্যই অপেক্ষা করছিল।
বিশ্বজিত বাজি রেখে বলতে
পারবে,ওকে টার্গেট এরিয়ায় ঢুকতেও
দেখেছে ওরা।কিন্তু রহস্যময়
কোনো কারনে নীরব দর্শকের
ভূমিকা পালন করে গিয়েছে।
আরোহীরা গতরাতেও চেহারা
দেখায়নি ওকে।সেজন্য খুব সহজেই
লেজটা খসিয়ে ফেলতে পেরেছিল।
নিরাপদে বাড়ি ফিরতেই বিশ্বজিতের
মধ্যে ভয় ঢুকে যায়।ফাইলটার
লেখাগুলো যেন ওকে সমুদ্রের
বিশাল এক একটা ঢেউয়ের মত এসে
তলিয়ে দিচ্ছিল ভাবনা অতলে।শুধু
মাথায় খেলে যায়,আগত বিপর্যয় যে
করেই হোক ঠেকাতে হবে। আর এই
বিপর্যয় রোধ করবার মত ক্ষমতা
রয়েছে একমাত্র সিক্রেট শ্যাডোর।
বিশ্বজিত যে পেশায় আছে তাতে
দেশের সবগুলো আইন শৃঙ্খলা
রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপারে খোঁজ
খবর রাখতে হয় ওকে।সিক্রেট
শ্যাডো প্রচলিত অর্থে আইন
শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে না
পড়লেও যদি কোনো প্রতিষ্ঠানকে
বিশ্বজিত ভয় পেয়ে থাকে তবে সেটা
এই সিক্রেট শ্যাডো। সিক্রেট
শ্যাডোর হেড অফ অপারেশন মেজর
সাইফ হাসানের ব্যাপারেও ভাল
ধারণা রাখে সে।
জানে,কেউ কিছু করতে পারলে
সাইফই পারবে।কিন্তু সবচাইতে বড়
সমস্যা, সাইফকে দেবার মত নিরেট
কোনো প্রমান তার হাতে নেই।সে
গিয়ে সরাসরি সব খুলে বলবে, সেটাও
সম্ভব না।সিক্রেট শ্যাডো ওর
সম্পর্কে সব খোঁজ খবর করতে শুরু
করলেই সর্বনাশ!
ঠিক তখনই মাস্টার মাইন্ড
বিশ্বজিতের মাথায় খেলে যায় একটা
পরিকল্পনা।
ভাগ্য বদলে যাবার রাতে ভাগ্যের
সহায়তায় চুরি করতে গিয়ে একটা
জিনিস খুব ভালমতই শিখেছে
বিশ্বজিত।সেদিন রাতে বাড়ির
মালিকের স্টিলের আলমারিতে টাকা
পয়সা না রেখে কাঠের আলমারিতে
রাখাটা বেশ ভালই ভুগিয়েছিল ওকে।
তখনই বিশ্বজিত "ডাইভার্শন"
ব্যাপারটা শিখে ফেলে।খুবই কাজের
প্রমাণিত হয়েছে এই পদ্ধতিটা।
বেশিরভাগ অপারেশনের ক্ষেত্রেই
ডাইভার্শন ক্রিয়েট করে থাকে
বিশ্বজিত।সিক্রেট শ্যাডোকে বাগে
আনতে এখানেও সেই একই পদ্ধতি
অবলম্বন করবার সিদ্ধান্ত নেয় সে।
সাধারনত ডাইভার্শন ক্রিয়েট করা
হয় মনোযোগ অন্য দিকে ফেরাবার
জন্য, কিন্তু বিশ্বজিত এক্ষেত্রে
ডাইভার্শন পদ্ধতিকে কাজে লাগায়
সিক্রেট শ্যাডো তথা সাইফের
মনোযোগ নিজের দিকে আকৃষ্ট
করার জন্য।
নিচ্ছিদ্র পরিকল্পনার মাধ্যমে
নিজের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে
সক্ষম হয়েছে সিক্রেট শ্যাডোকে।
কিছু অর্থ এবং প্ল্যানের
প্রয়োজন হয়েছে এই ডাইভার্শন
ক্রিয়েট করতে।আশা করছে,খুব
শিঘ্রই ওর সাথে সাইফ হাসানের
মুখোমুখি দেখা হতে যাচ্ছে।সেই
মুহুর্তটা নিঃসন্দেহে বিশ্বজিতের
জন্য স্বরনীয় একটা মুহুর্ত হয়ে
থাকবে।সাইফের সম্পর্কে যতটুকু
জেনেছে তাতে করে তার মত মাস্টার
মাইন্ডও তাকে শ্রদ্ধা করতে বাধ্য।
হয়ত এর মূল্য হিসেবে ওকে ওর এই
চুরির নেশাটা ছাড়তে হবে।তাতে
করেও যদি দেশটা আসন্ন ভয়াবহ
বিপর্যয় থেকে বেঁচে যায় তাতেও
রাজি বিশ্বজিত।
তবে ওর গোটা পরিকল্পনার মধ্যে
দুটো অংশ আছে।এক,ফোনটার
মাধ্যমে ওর প্রতি সিক্রেট
শ্যাডোর আগ্রহ এবং ওর কাছে
পৌছবার একটা রাস্তা তৈরি করা
হয়েছে,যাতে করে সিক্রেট
শ্যাডোকে ও সরাসরিই জানাতে
পারে ব্যাপারটা।
তখন ওকে উপেক্ষা করবার মত
বোকামি সিক্রেট শ্যাডো করবেনা।
দুই,ফোন সেটটাই স্বয়ং একটা
মেসেজ।এই ফোনের মাধ্যমেই খুবই
সুক্ষ্মভাবে একটা মেসেজ দিতে
চেয়েছে বিশ্বজিত।যদিও সেটা খুবই
সুক্ষ্ম এবং সেটা অনুধাবন করতে
ভাগ্যেরও বেশ খানিকটা জোর
লাগবে,এরপরও সাইফ কোনো
একভাবে যদি মেসেজটা পেয়ে যায়
তাহলে হয়ত বিশ্বজিতকে ছাড়াই
বিপদটা সম্পর্কে একটা ধারনা পাবে।
সে রকম প্রখর বুদ্ধি এই ছেলেটার
আছে।সেক্ষেত্রে সাইফের সাথে
বিশ্বজিতের সাথে দেখা না হলেও
আশা করা যায় বিপর্যয়টা রোধ করা
সম্ভব হবে সিক্রেট শ্যাডোর
পক্ষে।
সন্ধ্যা ঘনিয়েছে অনেক আগেই।
বিশ্বজিত মিরপুরে একটা
এপার্টমেন্টে দু রুমের পিচ্চি একটা
ফ্ল্যাট নিয়ে থাকে।কেউ নেই ওর
সাথে থাকবার মত।বিয়ে থা করেনি।
যদি কখনো এই পেশা এবং নেশাটা
কাটাতে পারে সেদিন ভেবে দেখবে।
আপাতত একাই থাকছে ফ্ল্যাটটাতে।
ওর এপার্টমেন্টের ওয়াচম্যানকে
হাত করে নিয়েছে ও।মাঝে মধ্যে ভাল
উপকারে আসে লোকটা। তবে
লোকটা যদি জানতে পারত সে
আসলে একজন পেশাদার চোরকে
সাহায্য করছে,তাহলে তার মুখভঙ্গি
দর্শনীয় একটা বস্তুতে পরিণত হত
নিঃসন্দেহে!
আজ সন্ধ্যায় ওয়াচম্যান মারফত
খবর পেয়েছে অজ্ঞাত পরিচয় কেউ
একজন প্রতিবেশীদের কাছে খোঁজ
করছিল ওর।
সেই "অজ্ঞাত" ব্যাক্তির পরিচয়
নিয়ে ওর মনে সামান্য দ্বিধা রয়েছে।
প্রথমে ভেবেছিল এটা সম্ভবত সেই
রহস্যময় অনুসরনকারীদের কাজ।
পরক্ষণেই বাতিল করতে হয়েছে
চিন্তাটা।ওদের এমন কোনো
প্রয়োজন পড়েনি যে প্রতিবেশীদের
থেকে ওর খোঁজ করতে হবে।আবার
সিক্রেট শ্যাডোও এত তাড়াতাড়ি
ওর পাত্তা লাগিয়ে ফেলবে সেটাও
কেমন অবিশ্বাস্য ঠেকে।যদিও
সিক্রেট শ্যাডো হবারই সম্ভবনা
বেশি।
কিন্তু রহস্যময় অনুসরনকারীরাও
ভাবিয়ে তুলছে ওকে।আজ সিক্রেট
শ্যাডোকে কল করবার সময়ও
ওদের দেখতে পেয়েছে বিশ্বজিত।
ওরা কী চায় ওর কাছে?গতরাতের
টার্গেটের সাথে কী ধরনের সম্পর্ক
ওদের?ওকে বাধাই বা দিলনা কেন
চুরির আগে?এখনই বা অনুসরন করছে
কেন?
বিশ্বজিত অবশ্য একটা সম্ভবনা
দাঁড় করিয়েছে।ওর ধারনা এই
গ্রুপটাও ওর টার্গেট এরিয়ায়
কোনো উদ্দেশ্যে নিয়ে অনুপ্রবেশ
করতেই চেয়েছিল। এমন সময়
বিশ্বজিতকে টার্গেটের উপর নজর
রাখতে দেখে ফেলে ওরা।হয়ত
কোনোভাবে ওর সম্পর্কে খোঁজ
খবর করেছে।এরপর ওকেই ঘুটি
হিসেবে ব্যাবহার করে।এখন ওর কাছ
থেকে জরুরী ইনফর্মেশন নিংড়ে বের
করার তালে আছে।
লাভ নেই।ওর কাছে যে ইনফর্মেশন
আছে সেটা প্রাণ গেলেও লিক আউট
হতে দেবেনা সে।
অবশ্য এই গোটা হাইপোথিসিসে
প্রচুর 'কিন্তু' এবং 'যদি' আছে।
সন্তুষ্ট নয় বিশ্বজিত।
চুলোয় যাক সব।গত কয়েকদিন ধরে
প্রচুর ধকল গিয়েছে।এখন টানা
একটা ঘুম দিতে না পারলে অচল হয়ে
যাবে ও।
এপার্টমেন্টে চলে এসেছে।তিনতলায়
ওর ফ্ল্যাট।লিফট বিজি থাকলে এক
দৌড়ে উঠে পড়ে সিড়ি বেয়ে।আজও
প্রচন্ড ক্লান্তি সত্বেও লিফটের
অপেক্ষায় থাকতে রাজি নয়
বিশ্বজিত।সিড়ির দিকেই এগোলো।
দোতলার ল্যান্ডিং-এ এসেছে এমন
সময় একতলার সিড়িতে যেন কারো
পায়ের আওয়াজ পেল ক্ষনিকের
জন্য।
ব্যাপারটা অস্বাভাবিক।পাবলিক
এখন দোতলাতে উঠতেও লিফট
ব্যাবহার করে।বিশ্বজিত একবার
হাসপাতালে এক অদ্ভুত লোকের
দেখা পেয়েছিল। হাসপাতালের মত
পাবলিক লিফট সাধারনত
লিফটম্যানের মাধ্যমে পরিচালিত
হয়।যখন নামবে তখন গ্রাউন্ড
ফ্লোরে যাবার আগ পর্যন্ত আর
উঠবেনা।আবার নীচ থেকে লোক
নিয়ে উপরে যাবে।তো সেই লোকটা
দশতলা থেকে লিফটে করে গ্রাউন্ড
ফ্লোরে গিয়েছিল যাতে লিফট যখন
আবার উপরে উঠবে তখন সে বারো
তলায় নামতে পারে!
ঘটনাটা ভাবতে গিয়ে আনমনেই মুচকি
হাসি ফুটল বিশ্বজিতের মুখে।মাথা
নাড়ল।ওরই ভুল হয়েছে।কেউ নেই
নীচে।এখন আর কোনো শব্দ পাওয়া
যাচ্ছেনা।সব নিশ্চুপ।
বিশ্বজিত তিনতলার ফ্ল্যাটের
সামনে দাঁড়িয়ে দরজায় চাবি ঢোকাল।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now