বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
কাছে বসে আছে কোরা, আস্তে করে রানার বাহুতে হাত রাখল। ‘তুমি খুবই গরীব, জিম?’ গলা শুনে তাকে আন্তরিক বলেই মনে হয়।
হাতের ইশারায় গাড়ি আর জামাকাপড় দেখাল রানা। ‘তোমার কি মনে হয়, কোরা? আমাকে দেখে কি রকফেলারদের ভাই-বেরাদার মনে হচ্ছে?’
হেসে উঠল কোরা, মিষ্টি জলতরঙ্গের মত আওয়াজে ভরে উঠল গাড়ির ভেতরটা। মনে মনে বিব্রত বোধ করল রানা। যে খেলা ও খেলছে সেটা খেলার রুচি হচ্ছে না, অথচ উপায় নেই। মেয়েটা সত্যি সুন্দরী। পরিস্থিতি অন্যরকম হলে হয়তো সময়টা রানা উপভোগই করত, কিন্তু এখন প্রতিটি মুহূর্ত সতর্ক থাকতে হচ্ছে। সুকৌশলে ওর সঙ্গে জুটিয়ে দেয়া হয়েছে মেয়েটাকে, ওর ওজন বোঝার জন্যে, দরকারে চিরব্যবস্থা করার জন্যে।
‘আমি তোমাকে পছন্দ করে ফেলেছি, জিম,’ বলল কোরা। ‘সত্যি এত কম সময়ে কাউকে আমি পছন্দ করতে পারিনি আগে।’
‘আমিও তোমাকে পছন্দ করে ফেলেছি, কোরা,’ বলল রানা। ‘আচরণে মনে হয়েছে তুমিও আমাকে পছন্দ করেছ, কিন্তু কিছু বলিনি। মায়াহুয়ারেজ পর্যন্ত
১৫
সময়টা ভালই কাটবে মনে হচ্ছে। তারপর একটু ঝামেলা হতে পারে। বোঝোই তো পুলিসকে সব রিপোর্ট করতে হবে। পুলিসের সব কাজই ঝামেলার ব্যাপার।’
হাসল কোরা, তারপর এমন একটা কথা বলল যে রানার মাথায় সতর্ক ঘণ্টি বেজে উঠল। বেশি কথা বলে ফেলেছে ও। সম্ভবত মেয়েটার সন্দেহ জাগিয়ে দিয়েছে নিজেরই অজান্তে। ‘মজার কথা বলো তুমি, জিম। কখনও মনে হয় তুমি শিক্ষিত, কখনও মনে হয় অশিক্ষিত। কোনটা ঠিক, জিম?’
সেরা চেষ্টাই করল রানা মেয়েটাকে বিশ্বাস করানোর। ‘অবাক হওয়ার কিছু নেই। আমি কিছুদিন কলেজে পড়েছি। সে অনেক দিন আগের কথা। ভুলে যেতে চেষ্টা করেছি পরে, কিন্তু কখনও কখনও ভুলে যাই আমি কে, তখন মুখ দিয়ে ভদ্রলোকের ভাষা বের হয়। কেন? খুব অবাক লাগে?’
মেয়েটাকে শ্রাগ করতে দেখল রানা, বুঝতে পারছে মেয়েটাকে আবার দ্বিধায় ফেলে দিয়েছে ও। কি বিশ্বাস করবে আর কি করবে না তা নিয়ে ভাবনায় পড়ে গিয়েছে কোরা। বোধহয় ভাবছে কিভাবে এগোবে এবার। রানার আন্দাজ সঠিক হলো, আরও কাছে সরে এলো কোরা। মেয়েটা কম খেলোয়াড় নয়, কাজের ক্ষতি না হলে ফাঁক তালে মজা লোটার অভ্যেসও আছে। কোরার পরবর্তী কথাগুলো ওর ধারণাকে আরও জোরাল করল। নতুন মিথ্যের জাল পাতছে কোরা। নতুন মিথ্যে দিয়ে পুরানোগুলোকে সত্যে পরিণত করছে।
‘আমি তোমাকে বিরাট একটা মিথ্যে কথা বলেছি,’ রানার হাঁটুতে হাত রাখল কোরা, আস্তে আস্তে ঊরু পর্যন্ত বোলাচ্ছে। ‘ওই লোকগুলো আমাকে রেপ করার চেষ্টা করছিল না। ওরা আমাকে ঠকাতে চেয়েছিল। ওদের সঙ্গে থাকা শেষ হতে টাকা দিতে গড়িমসি করছিল। হারামজাদা সবকয়টা। ওরা টাকা না দেয়ায় ওদের সঙ্গে হাতাহাতি হয়, ওরা আমার জামাকাপড় সব ছিঁড়ে ফেলেছে। বুঝতে পারছ, জিম? আমি পিউটা। পতিতা। নিউ ইয়র্কে আমার অনেক খদ্দের, রোজগারও ভাল। কোনও কোনও রাতে পঞ্চাশ ডলার। কিন্তু এখানে...আমি মায়াহুয়ারেজে এসেছিলাম এক কাযিনের সঙ্গে দেখা করতে। কথা ছিল কাজ করব না, শুধু বিশ্রাম নেব কয়েকদিন, কিন্তু আমার কাযিন ওই লোকগুলোর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল। ওরা আমাকে মাছ ধরতে
যাওয়ার আমন্ত্রণ জানাল। মাছ ধরা আর...তুমি তো জানোই কি। আমি যেতে চাইনি, কিন্তু টাকা তো টাকাই, কি বলো? তারপর হারামজাদারা মজা লুটে টাকা দিতে অস্বীকার করল। আমি তোমাকে পছন্দ করি, জিম। মিথ্যে বলেছি বলে তুমি কি আমার ওপর খুব রাগ করেছ?’ রানার কানে ঠোঁট ঘষল কোরা।
রানা বুঝতে পারছে, মেয়েটা স্ট্র্যাটেজি পাল্টে সরাসরি আক্রমণের পথ বেছে নিয়েছে। এখনও মেয়েটা মিথ্যে বলছে, অস্ট্রেলিয়ানটা বা যার জন্যেই কাজ করুক না সে, তবে রানা ধারণা করল এখনকার কথাগুলো আধা সত্যি ধরনের। মেয়েটার পেশা সম্বন্ধে ওর মনে কোনও দ্বিধা নেই, ঠিকই বলেছে কোরা। তবে স্বীকার করতেই হয় যে মেয়েটা পাকা অভিনেত্রী।
সহজেই মেয়েটার উদ্দেশ্য বুঝতে পারছে রানা। আধা সত্যি কথা বলে সম্পূর্ণ মিথ্যে গেলানোর চেষ্টা করছে কোরা ওকে। ওর বোঝা হয়ে গেছে যে মেয়েটা বীচ খেউমার কাভারটা মোটেই বিশ্বাস করেনি, যদিও বিশ্বাস করার ভান করছে, যৌন আকর্ষণ দিয়ে ওকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে পরে কি ঘটে দেখতে চাইছে।
মায়াহুয়ারেজের কাছে চলে এসেছে ওরা। রানা কিছু বলার আগেই সরে বসল কোরা। একটা ফিলিং স্টেশন আর জেনারেল স্টোরের আলো দেখা যাচ্ছে পথের ধারে। গাড়িটার তেল দরকার। স্টেশনের সামনে থামল রানা, ঠিক করে ফেলেছে কোরাকে স্থানীয় এজেন্টের হাতে তুলে দেবে ইন্টারোগেশনের জন্যে। পাকা মেয়ে। বুঝতে পারছে সহজ হবে না মেয়েটার মুখ খোলানো। তবে সময় পেলে কাজটা অসম্ভবও নয়।
স্যান হুয়ান এখনও অনেক দূরে। পন্সও কাছে নয়। পুরোটা পথ সতর্ক চোখ রাখতে হবে মেয়েটার ওপর। এর কাছ থেকে কবীর চৌধুরীর আস্তানা সম্বন্ধে তথ্য জানা গেলে ওর জন্যে ভেতরে ঢুকে লুকিয়ে থাকা সহজ হবে। কবীর চৌধুরীর সঙ্গেই সোনার কাছে পৌঁছোতে হবে ওকে। এখন আর অন্য কোনও পথে সোনার কাছে যাওয়ার সময় নেই।
নাকে-মুখে ফুটকিওয়ালা একটা কিশোর স্টোরের সামনে মোটা এক মহিলার সঙ্গে কথা বলছিল, ভাঙাচোরা গাড়িটা স্টেশনের সামনে থামতে দেখে এগিয়ে এলো, জানালার কাছে এসে সন্দেহের চোখে তাকাল রানার দিকে।
দশ ডলারের একটা নোট বের করল রানা পকেট থেকে।
‘তেল লাগবে।’
‘সি, সেনোর।’
কম্বল জড়িয়ে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে কোরা। তার হাত ধরল রানা। ওর পরবর্তী কাজটা যতটা সম্ভব বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে হবে।
গাড়ি থেকে বের হয়ে স্টোরের সামনে মোটা মহিলার কাছে গিয়ে দাঁড়াল ওরা। দুনিয়ার সব জেনারেল স্টোরে যে গন্ধ থাকে এ দোকানটা থেকেও সেই একই গন্ধ আসছে, সেই সঙ্গে যুুক্ত হয়েছে ট্রপিকাল মরিচের সুবাস। কোরার হাতে বিশ ডলারের একটা নোট দিল রানা। ‘যা দরকার কিনে ফেলো, কোরা। বিশ ডলারের মধ্যে থাকবে। এর বেশি আমি দিতে পারব না।’
দোকানের ভেতর ঢুকে মোটা মহিলার সঙ্গে ড্রেস, স্যান্ডেল আর প্যান্টির দাম নিয়ে কথা বলতে শুরু করল কোরা। একটা সিগারেট ধরিয়ে দরজার কাছে বাইরে দাঁড়াল রানা। তাড়াহুড়ো করছে কোরা, ভাব দেখে মনে হচ্ছে দেরি হলে ট্রেন মিস হয়ে যাবে। কাপড়চোপড় কিনে পেছনের ঘরে চলে গেল পোশাক পরতে। রানা চলে এলো ফিলিং স্টেশনে, ফোন করল স্যান হুয়ানে, বিসিআই এজেন্টকে পেয়ে গেল প্রথম রিঙেই।
‘হ্যালো?’
‘আশফাক? রানা।’
১৬
‘বলুন!’
‘একটা মেয়ে জুটেছে সঙ্গে। পথে বিপদ হতে পারে। আমি সকালে যোগাযোগ না করলে হেড অফিস থেকে নির্দেশ চেয়ে সে অনুযায়ী কাজ করবে। আমরা এখন জানি যে গ্যালোস কেতে আস্তানা গেড়েছে কবীর চৌধুরী।’
‘আর কিছু, মাসুদ ভাই?’
‘না। রাখি।’
ফিলিং স্টেশন থেকে বেরিয়ে এসে সিগারেটটা মাটিতে ফেলে পা দিয়ে নিভিয়ে দিল রানা, জানল না এই মাত্র কোরাও একটা ফোন করেছে জেনারেল স্টোর থেকে। অবশ্য জানলেও কি ঘটে তা দেখার জন্যে অপেক্ষা করা ছাড়া ওর আর কিছু করার ছিল না।
গাড়ির কাছে যেতেই হাসিমুখে ওর দিকে তাকাল ছোকরা, ডান হাত বাড়িয়ে দিল। ‘আরও দু’ডলার, সেনোর। টাঙ্কি একেবারে খালি ছিল, ভরে দিয়েছি।’
পাঁচ ডলারের একটা নোট দিল রানা ওকে। ‘বাকিটা তোমার।’
দু’কানের কাছে গিয়ে ঠেকল ছোকরার হাসি, চলে গেল স্টোরের দিকে।
গোপন কম্পার্টমেন্ট খুলে ট্র্যান্সমিটারটা বের করল রানা, গুঁজে রাখল কোমরে। কম্পার্টমেন্ট বন্ধ করে পেছনের সীট ফেলে দিল আবার। ও সিধে হচ্ছে এমন সময়ে স্টোর থেকে বেরিয়ে এলো কোরা, পরনে লাল একটা সস্তা ড্রেস। তাতেও ভালই মানিয়েছে মেয়েটাকে। হতে পারে পতিতা, কিন্তু দেখতে সে যথেষ্ট সুন্দরী। চুল আঁচড়ে মাথায় একটা লাল রুমাল বেঁধেছে, কুমারী কিশোরীদের মত নিষ্পাপ লাগছে তাকে দেখতে। মোটা মহিলার কাছ থেকে ধার করে পাউডার আর লিপস্টিকও ব্যবহার করেছে।
গাড়িটা স্টার্ট দিয়ে সামনে বাড়াল রানা, মনের ভেতরটা খচখচ করছে। মেয়েটাকে আগের চেয়ে অনেক বেশি আÍবিশ্বাসী মনে হচ্ছে ওর। ফোন করেছে কাউকে? তাই হবে।
একটা লিকার স্টোরের সামনে আবার থামল রানা। দোকান মালিক হারিকেনের কবল থেকে দোকান বাঁচানোর জন্যে জানালাগুলোর বাইরে পেরেক ঠুকে বোর্ড আটকাচ্ছে। বৃষ্টির তোড় আগের চেয়ে বেড়ে গেছে অনেক। গাড়ির কাঁচ অস্পষ্ট হয়ে গেছে, ওয়াইপার পানি সরিয়ে কুলিয়ে উঠতে পারছে না। থেকে থেকে দমকা বাতাসের ঝাপটা এসে লাগছে গাড়ির ফাঁকফোকর দিয়ে। হারিকেন এখনও অনেক দূরে, তবে আগমনী সংবাদ প্রেরণ করছে থেকে থেকে।
ক্যালিফোর্নিয়ার তৈরি কমদামী এক গ্যালন ওয়াইন কিনল রানা। ওকে বিদায় করেই ব্যস্ত হয়ে দোকান বন্ধ করে দিল মালিক, দোকানের পেছন দিকেই তার বাসা। ছেলেমেয়ে আর বউয়ের সাহায্য নিয়ে তাক থেকে বোতল নামিয়ে বেজমেন্টে নামিয়ে রাখছে।
গাড়িতে ফিরে ওয়াইনের জগের মুখ খুলে কোরার দিকে বাড়িয়ে দিল রানা। পাকা হাতে ভারী জগ মুখে তুলে দীর্ঘ চুমুক দিল কোরা। ড্যাশবোর্ড থেকে একটা রোড ম্যাপ নিয়ে সিলিং লাইটের স্বল্প আলোয় চোখ বুলাল রানা, টের পাচ্ছে ওর দিকে চেয়ে আছে মেয়েটা, অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো ওর, মনে হলো তীব্র ঘৃণা ঝরছে কোরার চোখ থেকে। এতই জোরাল অনুভূতি যে স্পষ্ট বুঝল রানা যে কারণেই হোক, ওকে ভয়ঙ্কর রকমের ঘৃণা করে মেয়েটা। সাধারণ কোনও ভাড়াটে পতিতা নয় সে এখন, আগের সেই নজরে রাখার ব্যাপারটা যেন বদলে গেছে, কোরা এখন শুধু নজর রাখার দায়িত্ব পালন করছে না, যেন ওর শেষ পরিণতি দেখার তীব্র আকাক্সক্ষা নিয়ে অপেক্ষা করছে।
ম্যাপ থেকে চোখ তুলল রানা, সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি সরিয়ে নিল কোরা, সামনের দিকে চেয়ে আছে নিষ্পলক।
পরবর্তী শহর হারমিংগুয়েরস। ছোট শহর। সেখান থেকে একশো পঁচাত্তর মাইল দূরে পন্স। মাঝখানে লোকবসতি নেই বললেই চলে। দুয়েকটা ছোট বসতি যা আছে তার মাঝখানে অন্ধকার নির্জন পথ। ওখানে যেকোন বিপদ হতে পারে। বিরক্তির সঙ্গে স্কুবা ছোরাটার কথা ভাবল রানা। ওয়ালথার পি.পি.কেটার জন্যে আফসোস হচ্ছে। ওটা সঙ্গে থাকলে অনেকটা নিশ্চিন্ত বোধ করত।
ম্যাপটা ভাঁজ করে রেখে দিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিল রানা। মায়াহুয়ারেজের আবছা আলো পেছনে পড়ে গেল। একচোখো দানবের চোখের মত জ্বলছে হেডলাইট, সে হলদে আলোয় সোনার টুকরো মনে হচ্ছে বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটা। আগের চেয়ে আরও বেড়ে গেছে বৃষ্টির বেগ, এখন ঝরছে অঝোর ধারায়, উইন্ডশিল্ডে পড়ে পটর পটর আওয়াজ করছে। এখনও কাজ করছে ওয়াইপার, তবে সামনের দিকে দশ ফুটের পর আর দৃষ্টি চলে না। গাড়ির গতি বিশ মাইলের ওপরে ওঠাতে পারছে না রানা। সমুদ্রের তীর ধরে গেছে রাস্তা, মাঝে মাঝেই হামলা করছে দমকা বাতাস, থরথর করে কাঁপিয়ে ছাড়ছে প্রাগৈতিহাসিক গাড়িটাকে।
একটানা পথ চলছে ওরা, কোরা খুব একটা কথা বলছে না। মাঝে মাঝে ওয়াইনের জগ তুলে চুমুক দিচ্ছে, বাড়িয়ে দিচ্ছে রানার দিকে। বারবার এক পায়ের ওপর আরেক পা তুলে বসছে মেয়েটা, রানা চোখের কোণে দেখল সস্তা ড্রেসটা কোরার ঊরু ছেড়ে প্রায় কোমরের কাছে উঠে গেছে। পোশাকটা টেনে নামানোর কোনও চেষ্টা নেই কোরার। তার দরকারও নেই। পা-ই তার রোজগারের উৎস।
আরও কয়েক মাইল পেরিয়ে গাড়ি থামাল রানা, নিশ্চিন্ত হবার জন্যে এক টানে কোরাকে নিয়ে এলো গায়ের কাছে। প্রথমে বাধা দিতে চেষ্টা করল মেয়েটা, আড়ষ্ট হয়ে থাকল, তারপর দেহ শিথিল করে রানার গায়ে এলিয়ে পড়ল। হেসে উঠল কোরা। হাসিতে কোনও ক্ষোভ নেই।
‘অদ্ভুত লোক তুমি, জিম,’ বলল কোরা। ‘পতিতাকে চুমু খেতে আপত্তি আছে তোমার? অনেকের আছে। তারা আর সবই করে, কিন্তু কখনও চুমু খায় না পতিতাদের।’
‘আমার কোনও আপত্তি নেই।’ কোরার সারা গায়ে হাত বোলাচ্ছে রানা। সাড়া দিতে শুরু করেছে কোরা, রানার কানে ঠোঁট ঘষল। পেশাদারী দক্ষতা দিয়ে রানাকে উত্তেজিত করে তুলতে চাইছে। একটু পর সন্তুষ্ট বোধ করল রানা,
১৭
মেয়েটার কাছে কোনও অস্ত্র নেই। স্টোরের মোটা মহিলা কোরাকে ছুরি বা পিস্তল সাপ-াই দেয়নি।
সামান্য সময়ের জন্যে রানার কানের ওপর থেকে মুখ সরাল কোরা, এক নাগাড়ে কয়েকটা প্রশড়ব করল, ‘ফিলিং স্টেশনে তুমি তোমার বন্ধুকে ফোন করেছ, জিম? কি বলল সে? টাকা দেবে? আমাকে স্যান হুয়ানের পে-নে তুলে দেবে তুমি?’
‘করেছি ফোন। ধার চাইতে গড়িমসি করছিল, কিন্তু অনুরোধ করতে শেষ পর্যন্ত রাজি হয়েছে। স্যান হুয়ানে যাচ্ছি আমরা, ওখানে চুটিয়ে ফুর্তি করব দু’জনে মিলে।’ সহজেই মিথ্যে বলছে রানা, বাধছে না কোনও, ও ভাল করেই জানে পন্স পর্যন্ত যাওয়ার আগেই হামলা হবে, কাজেই ওর কথা সত্যি কি মিথ্যে সেটা জানার সুযোগ নেই কোরার।
অস্বস্তি বোধ করতে শুরু করল রানা। মেয়েটা ওর শরীরের যত্রতত্র হাতাতে শুরু করেছে। অভিজ্ঞতা সবসময়েই কাজে আসে। কোরার বেলায়ও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না। মেয়েটাকে ঠেলে সরিয়ে দিতেও পারছে না রানা। ও যে রোল পে- করছে তাতে সেটা মানায় না। তাছাড়া এখনও কিঞ্চিত সম্ভাবনা আছে যে ওর অনুমান কোরার ক্ষেত্রে ভুলও হতে পারে।
‘ওসব পরে, লক্ষ্মীসোনা। আগে একবার স্যান হুয়ানে পৌঁছে নিই, তারপর দেখবে কি হয়।’
কোরাকে জড়িয়ে ধরে কপালে একটা চুমু দিল রানা, আস্তে করে নেতিয়ে পড়া মেয়েটাকে সরিয়ে দিয়ে আবার হুইলের দিকে মনোযোগ দিল। পরবর্তী দু’মাইল ওয়াইনের নেশায় জড়ানো গলায় বলে গেল কোরা স্যান হুয়ানে রানাকে সে কিভাবে তৃপ্ত করবে। মাঝেসাঝে এখনও ওয়াইনের জগে চুমুক দিচ্ছে সে, তবে কতটা গিলছে সে-ব্যাপারে রানার মনে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। যতবার চুমুক দিয়েছে তাতে এক ঢোক করে খেলেও এখন তার অচেতন হয়ে পড়ার কথা।
বাতাসের গতি আরও বেড়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে বৃষ্টির বেগ। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো ভেজা শ্র্যাপনেলের মত আঘাত হানছে গাড়ির গায়ে।
হারমিংগুয়েরসের এক মাইল আগে হঠাৎ করে তীক্ষè বাঁক নিয়ে সাগরের দিক থেকে তীরের দিকে গেছে রাস্তাটা। মেরামতির কাজ চলছে, এক ধারে রোড কনস্ট্রাকশনের যন্ত্রপাতি দেখা গেল। ওগুলো পাশ কাটাল রানা, সামনে দেখা যাচ্ছে একটা লাল বাতি, ঝড়ো বাতাসে দুলছে ঘড়ির পেন্ডুলামের মত। ওটার আলোয় নিচের চকচকে সাইনবোর্ডটা পড়া যাচ্ছে: বিপজ্জনক! সামনে রাস্তা মেরামত করা হচ্ছে।
আসলেই রাস্তা মেরামতির কাজ চলছে। আসার পথেও দেখেছে রানা। বড় কোনও কাজ হচ্ছে তা নয়, সামান্য মেরামতি।
আপাত দৃষ্টিতে রানার মনে হলো কোনও কারণ ছাড়াই হঠাৎ করে ওয়াইনের জগটা নামিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরল কোরা। পরমুহূর্তে সতর্ক হয়ে উঠল ও। নরম গলায় ফিসফিস করছে কোরা, ‘আমি এমন খেলা দেব যে সারাজীবনে আমাকে ভুলতে পারবে না, ডার্লিং। স্যান হুয়ানে গিয়ে কি পাবে তা আগেই একটু চেখে দেখো।’ রানার গালে ভেজা ঠোঁট বুলাচ্ছে সে, কানের লতি জিভ দিয়ে চাটছে।
অস্বস্তিতে নড়েচড়ে বসল রানা, হুইল থেকে হাত উঠিয়ে মেয়েটাকে ঠেলে সরিয়ে দেবে কিনা ভাবল। চোখ সামনের দিকে। ভারী বৃষ্টির মধ্যে লাল বাতির নিচে এক পুলিস এসে দাঁড়িয়েছে। হাত নেড়ে থামতে ইশারা করছে। তার আরেক হাতে একটা বোর্ড, তাতে উজ্জ্বল কালিতে লেখা: থামুন, ইন্সপেকশন করা হবে।
এখানে এই নির্জন রাস্তায় এত রাতে পুলিশ ইন্সপেকশনের কোনও কারণ নেই। তাদের কোনও গাড়িও দেখা গেল না। রাস্তার ওপর কোমর সমান উচ্চতায় একটা বাঁশ দিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করা হয়েছে। বুঝতে রানার দেরি হলো না যে এটা মেয়েটার সেই ফাঁদ। গ্যাস পেডালে পা চেপে বসল ওর। যক্ষ্মা রোগীর মত মরণ কাশি কেশে উঠে গতি বাড়াল প্রাচীন এঞ্জিন। ঠেলে কোরাকে গায়ের ওপর থেকে সরিয়ে দিল রানা, গাড়িটা তীরের মত ছুটে যাচ্ছে নকল পুলিসের দিকে। মড়াৎ করে ভেঙে গেল বাঁশের বাধা। শেষ মুহূর্তে বিরাট এক লাফে গাড়ির গতিপথ থেকে ছিটকে সরে গেল নকল পুলিস। ঘাড় ফিরিয়ে দেখল রানা, ভারসাম্য ফিরে পেয়েই রিভলভার বের করেছে লোকটা। কানের পাশে একটা শিস শুনল। চুরচুর হয়ে ভেঙে গেল গাড়ির কাঁচ, পরমুহূর্তে অস্ত্রটার গর্জন শুনতে পেল।
বাঘিনীর মত ঝাঁপিয়ে পড়েছে কোরা রানার ওপর, খামচি মারছে, তারই ফাঁকে চেষ্টা করছে হুইলের দখল নিতে, ইগনিশনের চাবির দিকে হাত বাড়াল। হাতের ঝাপটায় মেয়েটাকে সরিয়ে দিল রানা। ওর হাতে কামড় বসাল কোরা। প্রচণ্ড জোরে হাতের ধাক্কায় মেয়েটার মাথা সীটের সঙ্গে ঠুকে দিল রানা, ফুঁপিয়ে ওঠা শুনতে পেল। মাত্র এক মুহূর্তের জন্যে অবশ হয়ে বসে থাকল কোরা, তারপর সমস্ত শরীর দিয়ে পড়ল রানার ওপর, চেষ্টা করছে চাবি ঘুরিয়ে গাড়ির এঞ্জিন বন্ধ করতে, গলা ছেড়ে বারবার একই কথা বলছে, ‘বাস্টার্ডো! তুই আমার রেমনকে খুন করেছিস!’
মৃত স্কুবা ড্রাইভারের নাম বোধহয় রেমন ছিল। এতক্ষণে মেয়েটার রাগের কারণ বুঝতে পারছে রানা। গাড়ির ভেতর দিয়ে আরেকটা বুলেট বেরিয়ে গেল। অবশিষ্ট কাঁচগুলো ঝুরঝুর করে খসে পড়ল। বিস্ফারিত হলো রানার চোখ। দ্বিতীয় একটা ব্যারিয়ার দেখা যাচ্ছে সামনে। গায়ের জোরে ধাক্কা মেরে কোরাকে জানালার দিকে ঠেলে দিল রানা। ঠকাশ করে জানালায় বাড়ি খেল কোরার মাথা। জ্ঞান হারালো মেয়েটা।
গাড়িটা চলি-শ মাইল বেগে ছুটছে, ধুঁকছে এঞ্জিন, যেকোন সময়ে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সামনের রাস্তায় চোখ রানার। রাস্তা জুড়ে আড়াআড়ি দাঁড়িয়ে আছে একটা বড় গাড়ি, হুড তুলে কি যেন করার ভান করছে এক লোক। গাড়িটা
১৮
আসতে দেখে সরে দাঁড়াল, হাতে একটা টমিগান। ট্যাট-ট্যাট করে গর্জে উঠল অস্ত্রটা। গাড়ির একমাত্র হেডলাইটটা চুরমার হয়ে গেল।
এগোনোর পথ বন্ধ! রাস্তার দু’ধার খাড়াভাবে নেমে গেছে নিচে। কতটা নিচে তা দেখা যাচ্ছে না।
গাড়িটার পেছন দিক দিয়ে পার হলো রানা, রাস্তা ছেড়ে নেমে যেতে শুরু করল, কোথায় তা জানে না। এখন পর্যন্ত ওকে লক্ষ্য করে গুলি করেনি লোকগুলো। সম্ভবত মেয়েটার উপস্থিতিই তার কারণ। কোরা না থাকলে পরিস্থিতি হয়তো ভিনড়বরকম হতো।
গাড়ির পেছনে এসে ঠকঠক করে বিঁধল এক ঝাঁক বুলেট। তীরের মত নেমে যাচ্ছে ওরা ঢাল বেয়ে। সামনে নিকষ কালো অন্ধকার। হুইলের সঙ্গে লড়ছে রানা, আশা করছে প্রাগৈতিহাসিক গাড়িটা উল্টে যাবে না। বুঝতে পারছে এখনও পালানোর সুযোগ আছে। অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া কঠিন হবে না। ওর মনে হলো অন্ধকারে রোলার কোস্টারে করে বিদ্যুৎ বেগে নিচের দিকে নামছে। গাড়ির গতি দ্রুত বেড়ে চলেছে। চাকাগুলো এখনও মাটিতে কামড় বসাতে পারছে। গ্যাস পেডালে পায়ের চাপ আরও বাড়াল রানা, পুরোনো এঞ্জিনের গর্জন শুনে বুঝতে পারল গতির সঙ্গে তাল মেলাতে চেষ্টা করছে ওটা।
প্রচণ্ড একটা ঝাঁকি খেয়ে সমতল জমিতে নেমে এলো ওরা। রানার গায়ে এসে পড়ল প্রায় অচেতন কোরা। ঠেলে মেয়েটাকে সরিয়ে দিল রানা, সামনে কি আছে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। গাছ, টিলা, নাকি বেড়া?
সামনের চাকা দুটো হঠাৎ করেই মাটির ছোঁয়া হারাল। ঝাঁকি খেয়ে থেমে গেল গাড়ি, নাকটা কিসে যেন ধাক্কা খেল। রেডিয়েটরটা দুমড়ে মুচড়ে গেল। কেশে উঠে বন্ধ হয়ে গেল এঞ্জিন। দরজা খুলে বের হওয়ার চেষ্টা করল রানা, ভয় পাচ্ছে আগুন ধরে যাবে গাড়িতে। আটকে গেছে দরজাটা, খুলছে না। কোরাকে ঠেলে মেঝেতে ফেলল রানা, ওর দিকের দরজা খোলার চেষ্টা করল। দ্বিতীয় লাথিতে খুলল দোমড়ানো দরজা। পা বাড়িয়ে চমকে গেল রানা। শূন্যে ভাসছে ও, তারপর পতন শুরু হলো। দশফুট নিচে একটা কাদাময় খাদের ভেতর পড়ল ও। এক হাঁটু পানি থাকায় ব্যথা লাগল না।
কাদা খামচে খাদ থেকে উঠে গাড়ির সামনের দিকে চলে এলো ও। বাতাস আর বৃষ্টির তোড়ে পাঁচ ফুট দূরের কিছুও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। অনেক পেছনে আলোর আভা দেখে বুঝল আসছে লোকগুলো। এখনও অন্তত তিনশো গজ দূরে আছে। রেডিয়েটর খামচে ধরে বনেটের ওপর ওঠার চেষ্টা করল রানা, মেয়েটাকে হারাতে রাজি নয়। তাছাড়া জ্ঞান ফিরলে কোরা চিৎকার করে লোকগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করবে, সেটা হতে দেয়া যায় না।
গাড়ির ভেতরে পড়ে আছে কোরা, কোনও নড়াচড়া নেই। পেছনের সীট তুলে দ্রুত হাতে গোপন কম্পার্টমেন্ট খুলল রানা, ওয়াটারপ্রƒফিঙে মোড়া নোটবই আর ফিল্ম কোমরে গুঁজে নিল। স্কুবা ছোরাটা স্পর্শ করে দেখল একবার। ওটা ব্যবহার করার কোনও ইচ্ছে নেই ওর, প্রতিপক্ষ সাবমেশিনগান সহ খুঁজছে ওকে।
সামনের সীটে পিছলে সরে এসে দেখল কাছের বাতিটা এখন বড়জোর একশো গজ দূরে আছে। আর দেরি করা ঠিক হবে না, ঝটপট সরে পড়া দরকার। লোকগুলো নিশ্চয়ই এলাকাটা চেনে, তাদের জানার কথা যে সামনে খাদ আছে, রানা ওটা পার হতে পারবে না।
মেয়েটাকে সঙ্গে নেবে স্থির করেছে রানা, যদিও ব্যাপারটা এখন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পাগলামি মনে হচ্ছে, তবে স্যান হুয়ানে কোনমতে পৌঁছোতে পারলে কোরার মুখ খোলানো খুব কঠিন হবে না। মেয়েটার পা ধরে টানল রানা, ওর হাতে খুলে এলো একটা সস্তা স্যান্ডেল। গাড়ি থেকে কোরাকে অর্ধেক বের করতেই ভণিতা ছেড়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল মেয়েটা রানার ওপর, দু’হাতের বড় বড় নখ দিয়ে খামচি মারতে শুরু করল। ফায়ার সার্ভিসের সাইরেনের মত চিৎকার শুরু করেছে।
জোরে টান লাগাল রানা, পরমুহূর্তে পেটে জোরাল এক লাথি খেয়ে পিছলে চলে গেল বাইরে, আবার গিয়ে পড়ল কাদাময় খাদের ভেতর। একটানা চিৎকার করছে মেয়েলোকটা, কোনও শব্দ উচ্চারণ করছে না, রাগ জেদ আর ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ ঘটছে ফুটন্ত লাভার মত।
কোরাকে নেয়া যাবে না। লোকগুলো ওই চিৎকার শুনে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে এসে হাজির হবে। দ্রুত চিন্তা করছে রানা। দক্ষিণ দিকে যাচ্ছিল ও, রাস্তা জুড়ে থাকা গাড়িটা বামদিক দিয়ে পাশ কাটিয়েছে, তারমানে এই খাদটা উত্তর-দক্ষিণে গেছে। ওকে যেতে হবে উত্তরে, মায়াহুয়ারেজের দিকে। দ্রুত পা চালাল রানা, সিদ্ধান্ত পালটে ফেলেছে ও, বিসিআই এজেন্টের সঙ্গে দেখা করে অস্ত্র নিতে গিয়ে দেরি করবে না, কবীর চৌধুরীর আস্তানায় হানা দেবে, প্রহরীর কাছ থেকে কেড়ে নেবে অস্ত্র। ঝুঁকি নেয়া হয়ে যাচ্ছে, তবে এরা রিপোর্ট করার পর ভেতরে ঢোকা আরও বেশি কঠিন হবে। খুঁজতে থাকুক এরা ওকে এখানে, ওদের গাড়ি নিয়ে চম্পট দেবে ও।
লোকগুলো বেআক্কেল। গাড়ির কাছে কাউকে পাহারায় রাখার প্রয়োজন মনে করেনি, ভেবেছে লেজ গুটিয়ে পালাবে রানা ওদের ধাওয়া খেয়ে। মাঠে নেমে গেছে সবাই, চিৎকার করে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখছে।
লোকগুলোকে আরও সামনে বাড়তে দিল রানা, তারপর খাদ থেকে উঠে এলো রাস্তায়। গাড়ির পাশে চলে এলো। চাবিটা নিয়ে গেছে ড্রাইভার। ইগনিশনের তার ছিঁড়ে জোড়া লাগাল ও। প্রথম চেষ্টাতেই স্টার্ট নিল ফাইন টিউন করা শক্তিশালী এঞ্জিন। গাড়ি ঘুরিয়ে ফিরতি পথে রওনা হয়ে গেল রানা, পেছনে হৈ-চৈ শুনতে পেয়ে হাসিটা আরেকটু চওড়া হলো। ক্রমেই বাড়ছে গাড়ির গতি।
১৯
চার
হুইস্কির নেশা জড়ানো ঘুমের ভেতর থেকে দুঃস্বপড়ব দেখে জেগে উঠল জোসেফ ক্যালডন, চুপ করে শুয়ে কিছুক্ষণ বাতাস আর বৃষ্টির বিরামহীন আওয়াজ শুনল। শেষ আবহাওয়া রিপোর্টে বলেছে হারিকেনটা ওদের ওপর সরাসরি আঘাত করবে না, উত্তর-পশ্চিমে সরতে সরতে পাশ থেকে সামান্য ঝাপটা দিয়ে যাবে। কি ঘটবে তাতে আপাতত ক্যালডনের কিছু যায় আসে না। তার মনে হচ্ছে দুনিয়াটা জাহানড়বাম হয়ে গেলেও কিছু যাবে আসবে না। গুঙিয়ে উঠল ক্যালডন, দাঁত দিয়ে জিভ স্পর্শ করল, মনে হলো জিভটা জুতোর খসখসে সুখতলা হয়ে গেছে। ওই বীচ খেউমার হুইস্কির মত বাজে হুইস্কি গত কয়েক বছরে গেলেনি সে। মনে হচ্ছে রীতিমত বিষক্রিয়া হয়েছে।
মৃদু আলোর আভা ছড়ানো রিস্টওয়াচের দিকে তাকাল সে। রাত একটার সামান্য বেশি। বীচ খেউমা এখন কোথায় সেটা ভাবল একবার। আরেকবার গুঙিয়ে উঠে কট থেকে পা নামাল সে, নাকের ভেতর আঙুল, অন্ধকারে ভ্রƒ কুঁচকে তাকিয়ে আছে। হারামজাদা খেউমা কোনও আখ খেত বা খাদের মধ্যে মরে পড়ে থাকলে বাঁচা যায়। ওই শালার জন্যেই এখন বিপদে পড়তে যাচ্ছে সে।
প্যান্টের পায়ায় আঙুল মুছে ভারী জুতো জোড়া পরে নিল ক্যালডন। লুকিয়ে রাখা রামের মজুদে এবার হাত দিতেই হচ্ছে। বেশ কয়েক দিন হলো বোতল থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করেছে সে, কিন্তু এখন জাহানড়বামে যাক সব।
শরীরটা খুব খারাপ লাগছে, গা গোলাচ্ছে। কোলম্যান লণ্ঠনটা না জ্বেলে বালির মেঝের ওপর দিয়ে একটা কমলালেবুর বাক্সের কাছে চলে এলো সে। ওটা ডেস্ক কেবিনেট আর ফুট লকার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অন্ধের মত খুঁজল ভেতরে, পরিচিত আকৃতি হাতে ঠেকতে বের করে আনল অ্যাসপিরিনের একটা বোতল। ছয়টা ট্যাবলেট হাতের মুঠোয় নিয়ে ক্যান্টিনের গরম পানি দিয়ে গিলে ফেলল। পানির স্বাদে বিকৃত হয়ে গেল তার চেহারা।
একটু পরেই বেশ ভাল ঠেকল। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিল সে। রামের বোতলগুলো বেশি দূরে নেই, খানিক বাদে নেশায় সব ভুলে যাওয়া যাবে। রিভলভারের ওয়েব বেল্ট পরে নিয়ে জ্যাকেট গায়ে চড়াল। বিরক্তিতে ভ্রƒ কুঁচকে উঠল, জ্যাকেটটা ভেজা আর ময়লা। হাফ প্যান্টটাও তাই। অথচ পরিষ্কার থাকতে ভালবাসে সে। নিজেকেই ঘৃণা করতে মন চাইছে এখন। পরিষ্কার থাকার অধিকার আছে সব মানুষের। খোঁচা খোঁচা দাড়িভরা মুখে হাত বোলাল। রাইফেলসে যখন ছিল তখন যুদ্ধের সময় ছাড়া পরিষ্কার থাকা যেত। ঠোঁট প্রসারিত হলো ক্যালডনের। আর্মিতে সময়টা চমৎকার কেটেছে। কিন্তু সেসব এখন অতীত। বর্তমানে মস্ত সমস্যায় জড়িয়ে গেছে সে।
আর্মিতে কবীর চৌধুরীর চাকরির মত বেতন এত পাওয়া যেত না। না, বলতেই হয়, মিস্টার চৌধুরীর হাত দরাজ। মানুষটা ভদ্রলোক। আর ভদ্রলোকদের দু’চোখে দেখতে পারে না ক্যালডন। বেতন দেবেন ঠিকই, যতক্ষণ না কাজ ভণ্ডুল করে কেউ। কোনও দয়া নেই লোকটার। কাজে ভুল হলে লাথি মেরে খেদিয়ে দেবেন দুনিয়ার বাইরে, পরমুহূর্তে ভুলে যাবেন লোকটার কথা। ক্যালডন নিজেই কবীর চৌধুরীর ঠাণ্ডা মাথার খুনের সাক্ষী। শুধু এইড্স্ নিরাময়ের পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে গিয়েই অন্তত পঞ্চাশজন লোক খুন করেছেন বস্। তাঁর হয়ে বেশ কিছু কাজ সে নিজেও করেছে।
তাঁবুর খুঁটিতে গাঁথা একটা পেরেক থেকে বুশ হ্যাটটা খুলে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো সে। কাঁদছে প্রকৃতি অঝোর ধারায়। হু-হু করে বাতাস বইছে বৃষ্টি বুকে নিয়ে। ঘুমিয়ে পড়ে কাজে ফাঁকি না দিলে সামনে কোথাও একজন গার্ড থাকার কথা। হারামজাদা থাকুক আর না থাকুক আপাতত কিছু বলবে না সে। হুইস্কির প্রভাব দ্রুত কেটে যাচ্ছে। শীঘ্রি রামের বোতলগুলো খুঁজে বের করতে না পারলে নেশা একেবারেই টুটে যাবে। আর তার মানেই দুশ্চিন্তার পালা। একবার পেটে মদ পড়লে ভাল করে ভেবে দেখতে পারবে সে পরিস্থিতিটা, বুঝতে পারবে ঠিক কতটা বিপদে আছে সে। হয়তো আসলে কোনও বিপদ হবেই না, ভাগ্যের সহায়তায় বেঁচে যাবে সে।
বাতাসের ঝাপটায় জোরেশোরে এসে তার মুখে আছড়ে পড়ছে বৃষ্টি। একটা সিগারেট ধরানোর জন্যে আবার কিছুক্ষণের জন্যে তাঁবুর ভেতর ঢুকল সে, ভাবছে বেশিদিন তার ভাগ্য আর সহায়তা নাও করতে পারে। কবীর চৌধুরীর সামনে এমনিতেই অনেকবার সে মিথ্যে বলে ক্ষমা পেয়েছে। এবার হয়তো...
সিগারেটে গোটা তিনেক টান দেবার পর আবার বাইরে বের হলো সে, হাতের মুঠোয় সিগারেট লুকিয়ে রেখেছে যাতে নিভে না যায়। এক মিনিট পুরো হবার আগেই ভিজে চুপচুপে হয়ে গেল ক্যালডন। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো গরম, দমকা বাতাসে ছিটকে আসছে নানা দিক থেকে। ভালই লাগল তার। অনেক দিন পর গোসলটা হয়ে যাচ্ছে।
কেউ চ্যালেঞ্জ করল না। কোথাও প্রহরীর দেখা নেই। ব্যাটা বোধহয় সুন্দরী পতিতাটার সঙ্গে মজা লুটছে, ভাবল সে। কোরা ল্যানযস। মেয়েটা প্রায় হাতের মুঠোয় এনে ফেলেছিল বীচ খেউমাকে। হারামজাদা পালিয়েছে সেটা কোরার দোষ নয়।
অন্ধকারে বৃষ্টিবাদলার মধ্যে সামনের কিছু দেখতে পাচ্ছে না ক্যালডন, তবে পতিতার তাঁবু কোথায় সেটা মনের চোখে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। কাছাকাছি মোট ছয়টা তাঁবু আছে। একটু দূরেই বাঁকা চাঁদের মত সৈকত। ঢেউ আছড়ে পড়ার আওয়াজ আসছে ওদিক থেকে। বামদিকে রেডিও টেন্ট, অপারেটর স্পার্ক বোধহয় ঘুমাচ্ছে। ডানদিকে বাকি চারটে তাঁবু। শেষ তাঁবুটা খালি করে
২০
মেয়েলোকটাকে থাকতে দিয়েছে সে।
সৈকতে চলে এলো ক্যালডন। একটা স্টীলের পিয়ার সাগরের একশো ফুট গভীর পর্যন্ত চলে গেছে। এমনিতে মিস্টার চৌধুরীর ক্রিস-ক্র্যাফট এখানেই থাকে, কিন্তু এখন আছে গ্যালোস কে’র নিরাপদ বন্দরে। এখানে থাকলে বোটটা ভেঙে চুরমার হয়ে যেত, ভাবল ক্যালডন। পায়ারের ওপর সগর্জনে আছড়ে পড়ছে সাগরের উন্মত্ত ঢেউ। সাদা ফেনায় মাঝে মাঝেই ঢেকে যাচ্ছে স্টীলের কাঠামোটা। অন্ধকারেও সাদা ফেনা পরিষ্কার দেখা যায়। ফসফোরেসেন্স।
ক্রিস-ক্র্যাফট না থাকার অর্থ চৌধুরীর বর্বর হিংস্র ক্রুদের সঙ্গে সৈকতে আটকা পড়ে গেছে সে। কবীর চৌধুরী আছেন তাঁর বিলাসবহুল ভিলায়। দুনিয়ার সেরা খাবার সার্ভ করা হচ্ছে তাঁকে, সেরা মদটা মুখের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে। আর এদিকে ক্যালডনকে সহ্য করতে হচ্ছে প্রকৃতির অত্যাচার। বরাবরের মতই পিয়ারের কাছে দাঁড়িয়ে এক মাইল দূরের গ্যালোস কে’র আবছা আলোর দিকে তাকিয়ে থাকল ক্যালডন, নিজের জন্যে করুণা হচ্ছে। কাঁধ ঝাঁকিয়ে ঘুরে দাঁড়াল সে, সৈকতে আছে সেটাই হয়তো ভাল হয়েছে। যেভাবে কাজে ব্যর্থ হয়েছে সে, তাতে এখানে থাকাই নিরাপদ। তাছাড়া মদ খেয়েছে সে। চৌধুরীর আশেপাশে থাকলে চৌধুরী নির্ঘাত টের পেয়ে যেতেন, এক মিনিটে পেট থেকে টেনে বের করে ফেলতেন এদিকে কি ঘটেছে। লোকটার চোখ সব দেখতে পায়। মিথ্যে বলা তাঁর কাছে অর্থহীন।
প্রহরীর এখনও দেখা নেই। আন্দাজে মদের মজুদ লক্ষ্য করে এগিয়ে চলল ক্যালডন, উঁচু একটা বালির ঢিবির কাছে এসে উঠতে শুরু করল বালি বেয়ে। পায়ের তলায় বসে যাচ্ছে ভেজা বালি, এগোনো কঠিন। ওপরে উঠে একটু থামল দম নিতে। এখান থেকে গ্যালোস কে’র আলো আরও স্পষ্ট দেখা যায়। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে মিস্টার চৌধুরীকে অভিশাপ দিল সে। কুকুরের মত পরিশ্রম করছে সে, আর চৌধুরী এখন মহা আরামে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছেন।
ঢিবি বেয়ে নামতে শুরু করল ক্যালডন। বীচ খেউমার কথা মনে পড়তেই নিজেকে গালি দিল। লোকটাকে খুন করে ফেলা উচিত ছিল। নির্দেশ যখন সে মানেইনি, তো ঝুঁকি নিয়ে লোকটাকে বাঁচিয়ে রাখার দরকার ছিল না। খুন করে পরে মিস্টার চৌধুরীর প্রশেড়বর জবাব দেয়াও বোধহয় ভাল ছিল।
বুনো কলা আর পামগাছের মাঝখানে জন্মানো কয়েকটা প্যালমেটোর সামনে থামল সে। স্মৃতির সাহায্য নিয়ে বামদিকের পাম গাছের কাছ থেকে চার কদম বামে সরে এসে বালি খুঁড়তে শুরু করল। বুকের ভেতরটা নড়ে উঠল হাতে বালি ছাড়া আর কিছু না ঠেকায়। তারপর একটা বোতলের মসৃণ গোল মাথায় হাতের ছোঁয়া লাগল। ফোঁস করে স্বস্তির শ্বাস ফেলল ক্যালডন। আছে! বোতলটা তুলে এনে মুখ খুলে ঠোঁটে লাগিয়ে দীর্ঘ চুমুক দিল। গলা বেয়ে নামতে শুরু করল গরম তরল।
চারটে বোতল নিয়ে তাঁবুতে ফিরল সে। ফেরার পথেও প্রহরীকে দেখেনি। রাগ হয়নি সেজন্যে। বোতল পাওয়া গেছে এটা একটা বিরাট স্বস্তির ব্যাপার। প্রহরী বোধহয় পাহারা ছেড়ে পতিতাটার সঙ্গে গিয়ে শুয়েছে। তা শুক। কিছু যায় আসে না। এই দুর্যোগের রাতে এখানে কেউ আসবে না মরতে।
কটে বসে রাম গিলতে গিলতে ঝড়ো বাতাসের আওয়াজ আর বৃষ্টির একটানা তান শুনল সে। সর্বক্ষণ আফসোস করছে। মিস্টার চৌধুরীকে বীচ খেউমার সঙ্গে দেখা হওয়ার কথাটা জানানো দরকার ছিল। তাহলে আজকে এই ভয়ের মধ্যে থাকতে হতো না।
পরিষ্কার নির্দেশ দিয়েছেন কবীর চৌধুরী। কাউকে আমার এলাকায় ঢুকতে দেবে না। কাউকে না। আমার নির্দেশ ছাড়া তোমরা কেউ পাহারা বাদ দিয়ে বেড়ার বাইরে যাবে না। এই নির্দেশটাও সে অমান্য করেছে। ঢকঢক করে রাম গিলল ক্যালডন, আস্তে করে মাথা নাড়ল।
শালার টোকাই। না, দোষ পুরোপুরি টোকাইয়ের না। লোকটার হুইস্কি খেয়ে নিজেকে বিরাট একটা কিছু মনে হচ্ছিল, তখনই সে মজা করার সিদ্ধান্ত নেয়। ভবঘুরেটার ভেতরে ঢোকার প্রচেষ্টা রিপোর্ট করেনি সে। ড্রাইভার হারলেমকে বলেছিল কাউকে কিছু না জানাতে। সে হেসে বলেছে কেউ জানবে না। জানানোর দায়িত্ব তার নয়, কাজেই লোকটা নিরাপদ। তার ড্রিঙ্কিঙের ব্যাপারেও কাউকে কখনও কিছু বলেনি হারলেম, সহজ পথে টাকা কামানোর উপায় না দেখলে গা নড়ায় না সে। না, হারলেম তাকে বিপদে ফেলবে না।
রামে দীর্ঘ একটা চুমুক দিয়ে আরেকটা সিগারেট ধরাল ক্যালডন। কোরার কথা ভাবল খানিক। পেটের কাছটা শিরশির করে উঠল। কিন্তু রামে চুমুক দিয়ে মেয়েটার কথা ভুলে গেল আবার। যদি ইচ্ছে হয় তো ওর কাছে যাওয়া যাবে, মেয়েটা তো আর পালিয়ে যাচ্ছে না।
সমস্যা হচ্ছে, আপনমনে ভাবল ক্যালডন, নিজের ইচ্ছে অনুযায়ী কাজ করেছে সে, তারপর প্যাঁচ লেগে গেছে সবকিছুতে। সাগরে আজকে কি ঘটেছে সেটা তার পরিষ্কার জানা নেই। শুধু শুনেছে রেমন খুন হয়েছে। বীচ খেউমার কথাটা রিপোর্ট করলে তার আর কোনও দায়দায়িত্ব থাকত না, কিন্তু...
বিশেষ করে বিচ খেউমার জন্যে নিজে থেকে ফাঁদটা পাতা মস্ত ভুল হয়ে গেছে। গুঙিয়ে উঠল ক্যালডন, বালুর মাছি যেখানে যেখানে কামড়েছে সেসব জায়গা খসখস করে চুলকাতে শুরু করল। মদ সবসময়েই তাকে বোকা বানিয়ে দেয়, অথচ মদ ছাড়ার কথা সে ভাবতেও পারে না। এত বছর মদ গেলার পর এখন আর ছাড়া সম্ভবও নয়।
বিকেলে যখন মিস্টার চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলল তখন বীচ খেউমার কথা রিপোর্ট করেনি সে। আসলে তখন খেউমার দেয়া হুইস্কির নেশা পুরোপুরি কাটেনি। সে চেয়েছিল যত দ্রুত সম্ভব ফোন রেখে দিতে। বেশি খেলে গলা শুনেই মিস্টার চৌধুরী বুঝে যান কখন সে ড্রিঙ্ক করছে। আজকে অবশ্য টের পাননি। সেকারণে তাকে গ্যালোস কে’তে কৈফিয়ত দিতে যেতে হয়নি। রামের প্রভাবে ভয় কমে আসছে এখন। বিশ মিনিট পর ক্যালডনের মনে হলো সে আসলে কবীর চৌধুরীকেও ভয় পায় না।
২১
বোতলে চুমুক দিতে দিতে গতকালের কথা ভাবল সে। রেমন রেমিরেজ গত রাতে পতিতাটার কাছে থেকেছিল। কোরা ল্যানযস পাগলের মত ভালবাসে রেমনকে। রেমনের দিক থেকে ব্যাপারটা ভিনড়ব ছিল। ঠেকার কাজ চালিয়ে নিচ্ছিল সে। ভীষণ নারী লোলুপ ছিল রেমন। আর দ্বীপে মেয়েদের আগমনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আছে মিস্টার চৌধুরীর।
রেমনের অভিসারের খবর মিস্টার চৌধুরীর কাছে পৌঁছে দিয়েছিল সে। ওই পর্যন্ত সব ঠিকই ছিল।
আরেক চুমুক রাম খেল ক্যালডন, তিক্ত হাসল। রেমন রেমিরেজকে সে পছন্দ করত না। এক খুনী কখনোই আরেক খুনীকে পছন্দ করে না। লোকটা সে যত কর্কশ হোক, বলতেই হয় পতিতাটার সঙ্গে নরম আচরণ করত রেমন। লোকটার বড় বড় দাঁত বের করা হাসি মনের চোখে দেখতে পেল ক্যালডন। ক্রিস-ক্র্যাফট থেকে নেমে তাকে রেমন হাসতে হাসতে বলেছিল, ‘চাইলে তোমরা সবাই কোরার কাছে যেতে পারো। বাজি ধরতে পারি তোমাদের একাকিত্ব ভুলিয়ে দেবে কোরা। ঝড়ের পুরোটা সময় দারুণ কাটবে তোমাদের।’
রেমন যতই হাসুক, অন্যরা হাসতে পারেনি। পতিতা হোক আর যাই হোক সে রেমনকে ভালবাসে, অন্য কাউকে নেবে না। শ্রাগ করল ক্যালডন, মেয়েলোক; পতিতা হলেও বড় আজব সৃষ্টি।
তখনও কোনও গণ্ডগোল হয়নি। তারপর কে’তে তৎপরতা শুরু হলো। সেসময় সে স্পার্কের সঙ্গে রেডিও টেন্টে ছিল। এক স্কুবা ডাইভারের কথা উত্তেজিত স্বরে বলাবলি করা হচ্ছিল। পাইলট সাগরে রক্ত দেখেছে রিপোর্ট করতেই ব্যস্ততা আরও বেড়ে যায়। লোকটার ওসময়ে ওখানে থাকার কথা নয়। বীচ খেউমা ছাড়া আর কোনও লোকও এদিকে দেখা যায়নি গত কয়েকদিনে। খবরটা শুনেই পেটের কাছে দলা পাকিয়ে গিয়েছিল তার, মুহূর্তে বুঝতে পেরেছিল রেমনকে খুন করা লোকটা সেই বীচ খেউমা না হয়ে যায় না। এটাকে অনুভূতি বলা হোক বা ইনটুইশন, তার ধারণা স্থির হয়ে গিয়েছিল। যে লোকটাকে নিয়ে সে আগের দিন মজা করেছে সে-ই এই ডাইভার। অথচ রিপোর্ট করেনি সে। রিপোর্ট করেনি কারণ সে মাতাল ছিল। এধরনের ভুল মিস্টার চৌধুরী কখনোই ক্ষমা করবেন না।
রেডিও টেন্ট থেকে বেরিয়ে গ্যালোস কে’র ব্যস্ততা দেখেছে সে। কপ্টার উড়ছিল আকাশে। সেসনা বিমানটা চক্কর কাটছিল। ক্রিস-ক্র্যাফট আর অন্য বোটগুলো টহল দিতে বেরিয়ে এসেছিল নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে খোলা সাগরে।
রেডিও টেন্ট থেকে মিস্টার চৌধুরীর গলা শুনতে পাচ্ছিল সে। নিজের হাতে কর্তৃত্ব তুলে নিয়েছিলেন চৌধুরী। বীচ খেউমা যেই হোক না কেন তাকে মিস্টার চৌধুরী অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিলেন। সর্বাÍক চেষ্টা করেছেন লোকটাকে ধরতে।
মদে চুমুক দিয়ে সিগারেটের জ্বলজ্বলে আগুনের দিকে তাকিয়ে থাকল ক্যালডন। আবহাওয়া রিপোর্ট অনুযায়ী সত্যি যদি হারিকেন সরাসরি আঘাত নাও হানে, তবুও ঝড়-বৃষ্টির জন্যে আজকে ভোরের আলো ফুটতে অনেক দেরি হবে। হোক দেরি। কিছুই ভাল লাগছে না ক্যালডনের। সে এখন ড্রিঙ্ক করবে, ভুলে যাবে সমস্ত আসনড়ব সমস্যার কথা।
প্রথম বোতলটা দেখতে দেখতে শেষ হয়ে যাওয়ায় অবাক হলো ক্যালডন। যতটা লাগছে তার চেয়ে অনেক ভাল লাগার কথা, অথচ লাগছে না। চিন্তাও দূর হচ্ছে না। বারবার মিস্টার চৌধুরীর গলা শুনতে পাচ্ছে সে কানের কাছে।
আরেকটা রামের বোতল খুলে তাঁবুর বাইরে হুঙ্কার ছাড়া বাতাসের আওয়াজ শুনল ক্যালডন, হোলস্টার থেকে তেল মাখানো রিভলভারটা বের করে আদরের সঙ্গে হাত বুলাতে শুরু করল। রিভলভার তার কাছে সবসময়েই পিস্তলের চেয়ে ভাল বলে মনে হয়। অটোমেটিক জ্যাম হয়ে যায়। ক্লিপ স্প্রিং ঢিলে হয়ে যায়। রিভলভারে সে সমস্যা নেই। এই রিভলভারটা প্রায় নতুন। তার সবচেয়ে পছন্দের ওয়েবলি অবশ্য নয়, তবে চমৎকার জিনিস। স্মিথ অ্যান্ড ওয়েসন .৪১ ম্যাগনাম। নিখুঁত লক্ষ্যে গুলি পাঠাতে এর জুড়ি নেই। প্রচুর ব্যবহারে রিভলভারটার জায়গায় জায়গায় রং উঠে গেছে ইতিমধ্যেই।
সামান্য সময়ের জন্যে কানের কাছে একটা গলা শুনতে পেল ক্যালডন। দেরি কিসের, মুখের ভেতর নলটা পুরে দিয়ে ট্রিগারটা টেনে দাও। মাথাটা খেলাও, একটু সাহস করো। কবীর চৌধুরীর উর্বর মস্তিষ্ক প্রসূত ভয়ঙ্কর যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুকে ফাঁকি দিতে হলে এটুকু তোমার করতেই হবে। টানো ট্রিগার, বোকা কোথাকার। দেরি কোরো না। বয়স কত হলো সে খেয়াল আছে? ছাপ্পানড়ব। কত মানুষ অনেক আগেই মারা যায়! অনেক মানুষ মেরেছ তুমি। খুন করে পার পেয়ে গেছ বারবার। অনেক তো হলো, এবার ট্রিগারটা টেনে খেলা শেষ করে দাও। ফাঁকি দিয়ে চলে যাও পৃথিবী ছেড়ে। এটাই সহজ পথ। ট্রিগারটা টিপে দাও, ক্যালডন।
রিভলভারটা হোলস্টারে রেখে দিল ক্যালডন। রামের কারণে আÍহননের চিন্তা মাথায় আসছে। এখনও আশা শেষ হয়ে যায়নি। শেষ পর্যন্ত হয়তো কিছুই ঘটবে না। মিস্টার চৌধুরী হয়তো টেরই পাবেন না সৈকত ছেড়ে সে বাইরে গিয়েছিল, বীচ খেউমার গাড়িটা জঙ্গলের ভেতর খুঁজে পেয়েছে, সেই সঙ্গে হেলাফেলায় ফেলে যাওয়া বীচ খেউমার পোশাক আর খালি একটা স্কচের বোতল।
ফোঁশ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল ক্যালডন। অনেক দূরে রেঞ্জের বাইরে থেকে শক্তিশালী বিনকিউলার দিয়ে বীচ খেউমাকে আসতে দেখেছে তারা। তখন তাকে দেখে বীচ খেউমা মনে হচ্ছিল না, মনে হচ্ছিল ক্ষিপ্র একটা বাঘ। প্রতিদ্বন্দ¡ী শক্ত হলে চিনতে ভুল হয় না ক্যালডনের। ওই লোক মিস্টার চৌধুরী যাকে হন্যে হয়ে খুঁজেছে সেই লোক না হয়ে যায় না।
সাইটে লোকটাকে পেয়েছিল সে। ওই রেঞ্জ থেকেও স্টেনগানের এক পশলা গুলিতে ঝামেলা মিটিয়ে দেয়া যেত। তার বদলে মেয়েলোকটাকে কাজে লাগিয়ে কৌশল করতে গেছে সে, শর্টকাট পথে লোকদের নিয়ে মায়াহুয়েজে হাজির
২২
হয়েছে। ওখানে কোরা ফোন করতে ফাঁদ পেতেছে আরও সামনে।
আগের চেয়ে আস্তে আস্তে রামের বোতলে চুমুক দিচ্ছে এখন ক্যালডন, মনের মাঝে ব্যর্থতার একটা উপযুক্ত অজুহাত খুঁজছে। ওখানে মিস্টার চৌধুরীর এলাকায় লোকটাকে খুন করা বিপজ্জনক ছিল। কে বলতে পারে কেউ দেখছিল কিনা। তাছাড়া অধীনস্থ লোকগুলোকে একটা নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত সে বিশ্বাস করতে পারে, কিন্তু মেয়েমানুষের মুখ বন্ধ থাকবে কিনা তা কে জানে। কোরাও তখন সঙ্গে ছিল।
আস্তে করে মাথা নাড়ল ক্যালডন, একটা যুক্তিও ধোপে টিকবে না। আসলে নিজের কাছে স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, তখন তখনই লোকটাকে খুন করতে চায়নি সে। জানতে চেয়েছিল কার জন্যে লোকটা কাজ করছে, সেলোক কেন মিস্টার চৌধুরীর ব্যাপারে এত উৎসাহ দেখাচ্ছে। তথ্যগুলো জানতে পারলে মিস্টার চৌধুরীর সামনে দাঁড়ানো যেত। বীচ খেউমার কথাটা রিপোর্ট না করার অপরাধও তাতে ঢাকা পড়ে যেত।
বোতলের মুখটা পেঁচিয়ে লাগাল ক্যালডন, আপাতত যথেষ্ট হয়েছে। প্রহরীর কি হলো সেটা জানা দরকার। তাছাড়া সেই মেয়েলোকটারও খোঁজ নেয়া দরকার। হঠাৎ করেই কামনা জেগে উঠল কোরার কথা ভাবতে গিয়ে। রামটা এতক্ষণে সত্যিই কাজ করতে শুরু করেছে। বেশ ভাল লাগছে এখন। হ্যাঁ, মেয়েলোকটার কাছে যাবে সে। যাওয়া দরকার। তাকে সাবধান করে দিতে হবে, যাতে মুখ না খোলে। সে এমন একটা ভাব করবে যে ব্যাপারটা তেমন একটা গুরুতর নয়, সে শুধু চাইছে না লোকে জানুক কিরকম বোকা বনেছে তারা সবাই ওই লোকটার কাছে।
তাঁবু ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এলো সে, লক্ষ করল বাতাস আর বৃষ্টির বেগ আগের চেয়ে বাড়েনি। আসলেই হয়তো হারিকেনের আসল ঝাপটা এদিকে লাগবে না।
মেয়েটার তাঁবুর দিকে পা বাড়িয়ে নিজের আরেকটা ভুল স্বীকার করল ক্যালডন। রেমন মারা গেছে খবরটা কোরাকে দেয়া ঠিক হয়নি। মেয়েটা প্রথমে পাগলের মত আচরণ করছিল, তারপর একটু শান্ত হয়ে নেতিয়ে পড়ল। খানিক পর বলতে শুরু করল সে আগে প্রতিশোধ নেবে, তারপর আÍহত্যা করবে। রেমনকে ছাড়া তার বেঁচে থাকার কোনও ইচ্ছে নেই।
বালি আর বৃষ্টির ঝাপটা থেকে বাঁচানোর জন্যে জীপ গাড়ি তারপুলিন দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে, ওটা পাশ কাটাল ক্যালডন, পৌঁছে গেল কোরার তাঁবুর সামনে। ঠোঁট বাঁকা করে হাসল। মেয়েমানুষ! বিশেষ করে প্রেমে পড়া মেয়েমানুষ বড় আজব চিড়িয়া। তারওপর যদি হয় প্রেমে পাগল স্প্যানিশ পতিতা তাহলে আর কোনও কথা নেই। কোরাকে নজরে রাখতে হবে। কোনও ভাবে বিপদ কাটাতে পারলে কিছুতেই কোরাকে মুখ খোলার সুযোগ দেয়া যাবে না। একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়তো যথেষ্ট হবে। তাঁবুর ভেতরে ঢুকল ক্যালডন।
কটের ওপর নড়েচড়ে শুলো কোরা। ‘কে?’
‘আমি জোসেফ।’ অন্ধকারে হাতড়ে কটের কাছে চলে এলো ক্যালডন। মেয়েলোকটার গন্ধ এসে লাগল নাকে। সস্তা পারফিউম আর পতিতার ঘামের মিশ্র গন্ধ। পেটের ভেতরটা কেমন গুলিয়ে উঠল ক্যালডনের। তাতে কি? প্রচুর রাম গিলেছে সে, ভাল লাগছে এখন। এখন এসব খেয়াল করার সময় নয়। জাহানড়বামে যাক দুনিয়া। যতক্ষণ পারছে জীবনটা সে উপভোগ করবে না কেন? মিস্টার চৌধুরীর ভয়ে আগেই মরে যাবার কোনও অর্থ হয় না। সান্ত্বনা পেল মনে, শেষ পর্যন্ত কিচ্ছু হবে না ওর। খামোকা ভেবে ভেবে মনের মাঝে ভয় পাকিয়ে তুলছে সে।
‘কি চাও, জোসেফ? আমি ক্লান্ত। ঘুমাব এখন।’
কটের ওপর বসল ক্যালডন, হাত বাড়িয়ে কোরার ঊরু পেয়ে হাত বুলাল। সস্তা লাল কাপড়টা কোমরে উঠে আছে। ভাল।
পা সরিয়ে নিল কোরা, চাপা স্বরে বলল, ‘জ্বালাতন কোরো না, জোসেফ, আমার কাছে কিন্তু একটা বে-ড আছে।’
হাসল ক্যালডন। মেয়েটা সম্ভবত সত্যি কথাই বলছে। দুনিয়ার নানা প্রান্তে আগেও দেখেছে সে, পতিতারা ছোট একটা বে-ড জিভের সমান্তরালে মুখের ভেতর রাখে। কেউ যদি তাদের সঙ্গে বাড়াবাড়ি করে বা ঠকাতে চায় তাহলে এক পোঁচে চামড়া-মাংস চিরে দেয়। কয়েক পোঁচে যেকোন লোকের বারোটা বেজে যেতে বাধ্য।
আবার কোরার ঊরুতে হাত রাখল ক্যালডন। ‘কোরা, কোরা, অমন করো কেন? অত রাগ কি ভাল? আমি জোসেফ। টাকা আছে আমার কাছে। চট করে বিশ ডলার পেতে চাইলে রাজি হয়ে যাও।’
‘না, চাই না টাকা। আমি এখন কাউকে আনন্দ দেব না। আমি শোক পালন করছি রেমনের জন্যে। চলে যাও।’
হাসতে গিয়েও সামলে নিল ক্যালডন। ‘বেশ কোরা, তুমি যদি শোক পালন করো তাহলে...ঠিক আছে, আমি দুঃখিত, চলে যাচ্ছি।’
চরম আনন্দ পেতে বড় ইচ্ছে করছে। কোরার নধর শরীরটা নিয়ে খেলতে না পারলে জীবনটা এখন ব্যর্থ হয়ে যাবে মনে হচ্ছে, কিন্তু উঠে দাঁড়াল ক্যালডন, বে-ডের পোঁচ খাওয়ার কোনও ইচ্ছে নেই তার।
কোরা বলল, ‘তুমি যদি আমার একটা কাজ করে দাও তাহলে দশ মিনিটের জন্যে আমি শোক পালনে বিরতি দিতে পারি।’
‘কি করতে হবে বলো। পারলে নিশ্চয়ই করব।’
‘আমি রেমনের শরীরটা চাই। যাজকের প্রার্থনার পর চার্চের উঠানে ওকে কবর দেব। দ্বীপে ওর দেহটা আছে, তাই না?’
‘হ্যাঁ,’ রামের নেশায় নিদ্বির্ধায় মিথ্যে বলল ক্যালডন। একথাই মেয়েটা শুনতে চাইছে। রেমন যে এখন হাঙরের পেটে সেটা সে কোরাকে বলেনি, শুধু বলেছে আগন্তুকের হাতে রেমন খুন হয়েছে।
‘আমার রেমনকে ওরা নিশ্চয়ই এখনও কবর দেয়নি?’
২৩
‘না,’ সত্যি কথাই বলল ক্যালডন।
‘আমি চাই না অপরিচিত একদল মানুষ ওকে কবর দিক। আমি নিজে ওকে কবর দেব। আমাকে যদি দ্বীপে নিয়ে গিয়ে ওর দেহ বুঝিয়ে দাও তাহলে এখন যা ইচ্ছে করতে পারো আমাকে নিয়ে।’
রামের প্রতিক্রিয়ায় সমস্ত দ্বিধা দূর হয়ে গেছে ক্যালডনের। কথা দিলেই তা রাখতে হবে এমন নয়। তাছাড়া মেয়েটার ওপর কড়া নজর রাখবে সেটা তো আগেই ঠিক করা হয়ে গেছে। কোরা কোনও ঝামেলা করতে পারবে না। পরেরটা পরে ভেবে দেখা যাবে। বলল, ‘ঠিক আছে, কোরা, আমি রাজি। তোমাকে লুকিয়ে দ্বীপে নিয়ে যেতে হবে। ইউনিফর্ম পরিয়ে নিলে কেউ সন্দেহ করবে বলে মনে হয় না।’
‘রেমনের দেহ পাওয়াটাই আসল, কিভাবে আমাকে ওখানে নিয়ে যাবে সেটা তোমার ব্যাপার।’ কাপড় সরানোর খসখস আওয়াজ হলো। ক্যাঁচকোঁচ করে উঠল কটটা। ফিসফিস করে কোরা বলল, ‘যা করার তাড়াতাড়ি করবে। আমি এখন পাপ করছি। আমার রেমন মরে গেছে আর আমি তোমার সঙ্গে ফুর্তিতে অংশ নিচ্ছি। তবে ভেবো না বিশ ডলার না দিয়ে তুমি চলে যেতে পারবে।’
হাসল ক্যালডন, মনে মনে পতিতাকে গালি দিচ্ছে। বিশ ডলারের একটা নোট ধরিয়ে দিল মেয়েটার হাতে। দু’মিনিট পর ব্যস্ত ক্যালডনকে জিজ্ঞেস করল কোরা, ‘তোমার কি মনে হয় ওই লোকটার সঙ্গে আবার আমাদের দেখা হবে? যেলোকটা রেমনকে খুন করেছে?’
মুহূর্তের জন্যে থমকে গেল ক্যালডন। কোরা কথাটা না বললে মনেও আসত না তার। এখন মেয়েটা বলায় মনের মাঝে কে যেন বলছে আবার ওই দীর্ঘদেহী লোকটার সঙ্গে দেখা হবে। ফিরে আসবেই লোকটা। এখন মনে হচ্ছে ঘটনা মাত্র শুরু হয়েছে।
‘হ্যাঁ, আবার ওর সঙ্গে দেখা হবে। অন্তত আমি চাই দেখা হোক। এবার আমি ওকে খুন করব।’
তাঁবুর ছাদটা অন্ধকারে দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু কোরা ল্যানযস ছাদের দিকেই চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। কিছুই সে অনুভব করছে না। আর মাত্র কিছুক্ষণ, তারপরই শুয়োরটা তার গায়ের ওপর থেকে সরে যাবে।
‘তুমি না,’ বলল কোরা, ‘আমি ওকে খুন করব। খুন করব রেমনের জন্যে।’
পাঁচ
গ্যালোস কে। তীর থেকে এক মাইলের সামান্য বেশি দূরে। ওই এক দেড় মাইল শান্ত সাগরে রানার জন্যে সাঁতরে পাড়ি দেয়া কোনও ব্যাপারই নয়, কিন্তু এখন প্রবল স্রোত আর ক্ষিপ্ত ঢেউয়ের কারণে ওর মনে হচ্ছে কোনদিনই আর গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে না।
আধ ঘণ্টা হলো এক নাগাড়ে ঢেউ আর স্রোতের বিরুদ্ধে লড়াই করছে ও। গ্যালোস কে’র আলো দেখে বুঝতে পারছে আর দশ মিনিটের ভেতর দ্বীপটায় পৌঁছে যাবে। প্রহরী থাকবে নিশ্চয়ই সৈকতে। সাবধানে ওকে উঠতে হবে তীরে।
বিশ্রাম নিতে একটু থামল রানা, ট্র্যান্সমিটারের সুইচ অন করল, এবার অন্য ফ্রিকোয়েন্সিতে।
‘কিরে?’ জিজ্ঞেস করল সোহেল।
‘নেমেছি সাগরে,’ জবাব দিল রানা।
‘এক মিনিট ট্র্যান্সমিশন অন রাখ, তোর বেয়ারিংটা পেয়ে যাব।’
‘রওনা হয়েছিস?’
‘হয়েছি। বাংলার গৌরব থেকেই বলছি। সাগরের কি অবস্থা?’
আট ফুট উঁচু একটা ঢেউ রানার মুখে বাড়ি মেরে চলে গেল। নোনা পানি কুলি করে ফেলে দিয়ে বলল রানা, ‘ভাল না রে। তবে গ্যালোস কে’র কাছাকাছি চলে এসেছি। ওভার।’
‘কে. সি. রওনা দিলে যোগাযোগ করিস। চিনা জাহাজটা কোথায় থাকবে কিছু জেনেছিস? হারিকেনের মধ্যে আছি, বিশ ফুট সামনেও কিছু দেখা যাচ্ছে না। ওভার।’
দু’মিনিট এক নাগাড়ে কথা বলে গেল রানা, জানাল কবীর চৌধুরীর সঙ্গেই চিনা জাহাজে ওঠার চেষ্টা করবে ও, সেখান থেকে ট্র্যান্সমিটারের সাহায্যে জানাবে কোন্দিকে চলেছে। বাংলার গৌরব ওর বেয়ারিং অনুযায়ী ইন্টারসেপ্ট করলে ঝামেলা হবার কথা নয়।
কথা শেষ করে ট্র্যান্সমিটারটা বন্ধ করে দিল রানা, আবার সাঁতার কাটতে শুরু করল। বেশির ভাগ ঢেউই দশ ফুটের চেয়ে কম উচ্চতার, খুব একটা অসুুবিধে হচ্ছে না ওগুলোকে সামাল দিতে। একবার কম্পাস রিডিং নিল। ঠিক পথেই আছে। গ্যালোস কে তিন মাইল দীর্ঘ আর মাঝখানটা আধ মাইল চওড়া। দ্বীপের দু’পাশে তৈরি হয়েছে সরু ফানেল, চমৎকার প্রাকৃতিক বন্দর। দ্বীপের উত্তরদিকটা জংলা, চিরহরিৎ বন আর ঝোপ ঝাড়ের সমষ্টি। ওদিকে কবীর চৌধুরীর লোক না থাকারই কথা।
দ্বীপের দক্ষিণ দিকটা পাথর আর ঝোপঝাড়ের সমন¦য়। মাঝে মাঝে জন্মেছে লডউড, নারকেল গাছ, ঘন ফার্ন, স্প্যানিশ বেয়োনেট, পালমেটো আর আছে বুনো হেলিকোনিয়াÑকলাগাছের খালাতো ভাই, তবে ফল ধরে না। পেছন দিকে কিছু মেহগনি গাছও আছে। ওগুলোকে জড়িয়ে রাখা আঙুরের গাছগুলো রানার কব্জির চেয়েও চওড়া। জায়গায় জায়গায় বালির বিস্তৃতি। এদিক দিয়ে উঠলেও ধরা পড়ার সম্ভাবনা কম। দ্বীপের মাঝখানটাই আসলে বিপজ্জনক। ওখানে টিলার মাথায় কবীর চৌধুুরীর প্রাসাদে বাতি জ্বলছে, দেখতে পেল রানা। কবীর চৌধুরীর সঙ্গে দেখা হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা মনে আসতে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল ওর
২৪
মুখে।
ঢেউ এখন রানাকে এগোতে সাহায্য করছে, ঠেলছে একটা কোরাল রীফের দিকে। ওখানে বাড়ি খেয়ে ঘূর্ণি সৃষ্টি হচ্ছে, সাদা ফেনা তুলে ভেঙে যাচ্ছে ঢেউয়ের মাথাগুলো। স্রোতের টানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ইচ্ছে করেই সামান্য দক্ষিণে সরল রানা, এড়িয়ে গেল কোরাল রীফ। রীফের পেছনে পানি অপেক্ষাকৃত শান্ত, এগোল সেদিকে। সৈকত আর একশো গজ দূরে।
ক্রল করে সৈকতে উঠল ও, কনুইয়ের সাহায্যে সামনে এগিয়ে চলল। এতই গাঢ় অন্ধকার যে সামনে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। বালিতে কান পেতে শুনল। মাঝে মাঝে দুয়েকটা কাঁকড়া বালি ঘষটে খসখস শব্দ করে গর্তে গিয়ে ঢুকছে, এছাড়া আছে বাতাস আর বৃষ্টির বিরতিহীন একঘেয়ে আওয়াজ।
থামল রানা, পরবর্তী দশ মিনিট মূর্তির মত পড়ে থাকল বালিতে। কান পেতে আছে, চোখ সইয়ে নিচ্ছে আঁধারে। তারপর আওয়াজটা শুনতে পেল। কে যেন পাথরে রাইফেলের বাঁট ঠুকেছে। খুব কাছেই কোথাও। বড়জোর বিশ গজ দূরে আছে লোকটা।
মুহূর্তের জন্যে বিস্ময় বোধ করল রানা। দ্বীপের এই নির্জন বিরান দক্ষিণ প্রান্তে গার্ড থাকার কারণ কি? মনে মনে গ্যালোস কে’র ম্যাপটা আরেকবার ঝালিয়ে নিল রানা।
দ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তে ভাঙা দুর্গের খুব কাছেই কোথাও আছে ও এখন। ভগড়বস্তূপে এখনও ফাঁসিকাঠ আছে কয়েকটা, সেই থেকে দ্বীপের এই নাম। দুর্গটা স্প্যানিশরা আঠারোশো আটানব্বুই সাল পর্যন্ত ব্যবহার করেছে। ততদিনে মানুষের মনোভাব পাল্টে গেছে, আগের মত জনসমক্ষে ফাঁসির রেওয়াজ উঠে গেছে, ফলে ফাঁসি অনুষ্ঠিত হতো লোকচক্ষুর আড়ালে, দুর্গের দুর্ভেদ্য দেয়ালের ভেতর।
ম্যাপে কালো একটা চারকোনা দাগের সাহায্যে দুর্গের অবস্থান বোঝানো হয়েছে। ধ্বংসাবশেষ ছাড়া কিছুই নেই এখন, ইঁদুর আর ছোট ছোট বুনো প্রাণীর আস্তানা। তারপরও পাহারা বসানো হয়েছে এখানে। কেন?
কিছুক্ষণের জন্যে বাতাসের গতি কমে গেছে। বৃষ্টির তোড়ও আগের মত নেই। হারিকেন একটু বিশ্রাম নিয়ে নিচ্ছে। আবার পাথরে রাইফেলের বাঁট ঠোকার আওয়াজ শুনতে পেল রানা। বিড়বিড় করে অভিযোগের সুরে কি যেন বলল লোকটা। রানা বুঝতে পারছে না লোকটা দুর্গ পাহারা দিচ্ছে নাকি সৈকত। কবীর চৌধুরী দ্বীপে অনাহুত অতিথি আশা করছে?
বাতাসে নাক তুলে গন্ধ শুঁকল রানা। ভাজা মাংস আর স্টুর গন্ধ আসছে ডানদিকে, দুর্গের কাছ থেকে। আবার বাতাসের ঝাপটা শুরু হয়ে যাবার আগের মুহূর্তে রানার মনে হলো একসঙ্গে অনেক মানুষের চাপা গলা শুনতে পেয়েছে ও আবছা ভাবে। দুর্গের দিকে তাকিয়ে থাকল রানা, একটা আলোও নেই কোথাও। গাঢ় অন্ধকার।
বাতাস যখন কম ছিল তখন একটা সিগারেট রোল করতে শুরু করেছিল প্রহরী, নতুন করে বাতাসের আক্রমণ আরম্ভ হওয়ায় তার হাত থেকে কাগজ আর তামাক উড়ে গেল। বৃষ্টি আর বাতাসের আওয়াজ ছাপিয়ে লোকটার গালি শুনতে পেল রানা। আস্তে ধীরে ক্রল করে গলার আওয়াজ লক্ষ্য করে এগোতে শুরু করল ও।
কালোর ভেতর আরও কালো একটা আকৃতি চোখে পড়তে থামল রানা, সৈকতের বালি পেরিয়ে মসৃণ, ভেজা পাথরের ওপর চলে এসেছে। দুটো বোল্ডারের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে লোকটা, একটু কুঁজো হয়ে আছে, বোধহয় আবার সিগারেট তৈরির চেষ্টা করছে। প্রহরীর বারো ফুটের ভেতর চলে এসেছে রানা, আর সামনে বাড়তে সাহস পাচ্ছে না, নুড়ি পাথর থাকতে পারে, সামান্য আওয়াজ হলেও সতর্ক হয়ে যাবে লোকটা। হাতড়ে হাতড়ে মুঠোর সমান বড় একটা পাথর তুলে নিল রানা, স্কুবা ছোরাটা চলে এসেছে অপর হাতে। ছোরাটা পাথরের ওপর ঘষল রানা। লোকটা বোধহয় শুনতে পায়নি, নড়ল না। আবার গাল বকল গার্ড, সিগারেট তৈরি করতে অসুবিধে হচ্ছে। লোকটা এই বৃষ্টির মধ্যে সিগারেট ধরাবে কিভাবে ভেবে পেল না রানা।
ছোরাটা আবার ঘষল রানা। এবার গার্ড শুনতে পেয়েছে। জিজ্ঞেস করল, ‘কে?’
পাথরের মত স্থির হয়ে আছে রানা।
‘কে ওখানে?’
ডানহাতে স্কুবা ছোরাটা বাগিয়ে ধরেছে রানা, থ্রোইং নাইফের মত করে ব্যবহার করার ইচ্ছে। পা ঘষটে এগিয়ে আসতে শুরু করল গার্ড, পাথরের সঙ্গে ঠোকর খেতে খেতে আসছে রাইফেলের বাঁট। একেবারেই অ্যামেচার। প্রফেশনাল হলে আওয়াজ শুনেই কাউকে জানাত।
একটা খালি পা রানার বামহাতে এসে লাগল। কোবরার মত ছোবল দিল রানা, গার্ডের পা আঁকড়ে ধরে এক ঝটকায় উঠে বসল, ছোরাটা আমূল ঢুকিয়ে দিল গার্ডের বুকে। ঝড়ো বাতাসের আওয়াজের নিচে চাপা পড়ে গেল গার্ডের মৃত্যুপূর্ব গোঙানি। দু’হাতে লোকটাকে ধরে আস্তে করে শুইয়ে দিল রানা পাথরের ওপর, শক্ত করে ধরে রাখল। কয়েকবার খিঁচুনি দিয়ে স্থির হয়ে গেল শরীরটা।
লাশটা সৈকতে ফিরিয়ে আনল রানা, বালি খুঁড়ে কবর দিল। অল্প পানিতে নেমে গায়ে লাগা রক্তের ছিটে পরিষ্কার করে নিল। কুকুর থাকতে পারে। রক্তের গন্ধে ওগুলো সহজেই আকৃষ্ট হয়।
পাথরের ওপর বসে অন্ধকারে রাইফেলটা দক্ষ হাতে পরখ করে দেখল। পুরোনো একটা লী এনফিল্ড ওটা, এধরনের রাইফেল বাংলাদেশী পুলিস এখনও ব্যবহার করে। থ্রী নট থ্রী। এম কে ওয়ান। বল অ্যামুনিশ্যন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে এটা ব্যবহার করে জার্মানদের বোকা বানিয়ে দিয়েছিল ব্রিটিশরা। দক্ষ লোকের হাতে পড়লে মারাÍক একটা অস্ত্র। মাঝের আঙুলটা ট্রিগারে রেখে তর্জনী বোল্টের ওপর রাখলে মিনিটে চলি-শটা করে গুলি ছোঁড়া যায়। রাইফেলটা পরখ শেষে সঙ্গে
২৫
নিয়ে ক্রল করে আবার ভাঙা দুর্গের দিকে এগোল রানা। বাতাসে ভাসছে ভাজা মাংসের জোর গন্ধ।
আসছি আমি, কবীর চৌধুরী, মনে মনে বলল রানা।
ছয়
রানার সঙ্গে যোগাযোগ হবার পর বাংলার গৌরবের রেডিয়োরূম থেকে বেরিয়ে ওয়ার্ডরূমে চলে এলো সোহেল। ওর জন্যে এ কামরাটা নির্দিষ্ট করা হয়েছে। দরজায় দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে বাংলাদেশ আর্মির দু’জন চৌকস সোলজার।
ঘরের ভেতর ওর অপেক্ষায় কয়েকজন আমেরিকান আর ব্রিটিশ এজেন্ট অপেক্ষা করছে। সোহেলকে ঢুকতে দেখে কৌতূহলী চেহারায় তাকাল তারা। কয়েকজনের হাতে কফির কাপ, সাদা উর্দি পরা স্টুয়ার্ড দিয়ে গেছে একটু আগে। সোজা একটা টেবিলের সামনে থামল সোহেল, ওটাকে ডেস্ক হিসেবে ব্যবহার করছে। কারও দিকে তাকাল না। ভীষণ চিন্তিত দেখাচ্ছে তাকে। একটু পর নির্দিষ্ট কাউকে উদ্দেশ না করে বলল, ‘প-্যান বি কার্যকর হচ্ছে। রানা আমাদের সঙ্গে যোগ দিতে না পারায় সরাসরি কবীর চৌধুরীর সঙ্গে সোনার খোঁজে যাবার চেষ্টা করবে। চিনা জাহাজটাকে আমরা চেষ্টা করব ইন্টারসেপ্ট করতে। যদি না পারি, তাহলে রানার সঙ্গে যোগাযোগ করে পরবর্তী কর্মপন্থা নির্ধারণ করব।’ সিআইয়ের এজেন্টদের দিকে তাকাল সোহেল। ‘আপনারা চাইছেন কবীর চৌধুরীর সাহায্য নিয়ে পুয়ের্টো রিকো যাতে হাইতিতে বিপ-ব ঘটাতে না পারে সেটা নিশ্চিত করতে। রানার সঙ্গে যোগাযোগের পর ও কি করল তা জানা গেলে নিজেদের দায়িত্বে যা করার করবেন আপনারা, সৈন্য নামিয়ে দখল করে নেবেন কবীর চৌধুরীর আস্তানা। এখন থেকে দু’ঘণ্টা পর পর যোগাযোগ করবে রানা।’
সোহেলের বক্তব্য শেষ হবার পর কথা বলল না কেউ।
একটু পর রাডার রিপোর্ট এলো, এখনও স্লিঙঊনে কোনও জাহাজের চিহ্ন নেই।
*
সামনে বাড়তে গিয়ে আরেকজন গার্ডকে খুন করতে হয়েছে রানার। লোকটা আকৃতিতে ওর সমানই হবে। পোশাকটা পরে নিয়ে কপালের ওপর ক্যাপ টেনে এনে দুর্গটা ও পায়চারি করে বেড়িয়েছে। এক ঘণ্টা হলো এখনও কেউ কিছু সন্দেহ করেনি।
রানড়বা, ঘুম আর আড্ডায় ব্যস্ত লোকগুলো। অন্তত তিনশো ভাড়াটে খুনী হবে, নানা অস্ত্রে সজ্জিত। একসঙ্গে এত রকমের অস্ত্র আগে কখনও দেখেনি রানা। নতুন গ্রেনেড; প্রথম বিশ্বযুুদ্ধের মিল্স্ বোম, কারবাইন, মাউজার, এনফিল্ড; ভিয়েতনামে ব্যবহার করা এম ১৪ আর এম ১৬; প্রাচীন ওয়াটার কূল্ড্ ব্রাউনিং মেশিনগান, বার্স, স্টেন, থম্পসন্স, বাযুকাÑএকটা নব্বুই ক্যালিবারের অ্যান্টি ট্যাঙ্ক রাইফেলÑকি নেই। এমন কি কয়েকটা ফ্লেইম থ্রোয়ারও দেখতে পেয়েছে রানা। বিশাল একটা পাহাড়ী গুহায় আরও আছে নেট দিয়ে ঢাকা ছয়টা পিটি বোট। ওখানে পৌঁছোতে কোমর সমান উঁচু ঘাস পেরিয়ে আসতে হয়েছে ওকে, সাঁতরে ঢুকতে হয়েছে গুহায়। প্রহরী ছিল কয়েকজন, তাস পেটানোয় ব্যস্ত, কেউ টের পায়নি অনাহুত আগন্তুকের আগমন।
বিদ্যুতের ঝিলিকে পিয়ারের পাশে ভেড়ানো বোটগুলোকে প্রথম দেখতে পায় রানা। প্রহরীরা গুহার মুখের কাছে আছে দেখে আন্দাজ করেছে বোটগুলোতে প্রহরী থাকবে না। সতর্ক নজর রাখল আধঘণ্টা। কোনও আওয়াজ পাওয়া গেল না বোটগুলোর কাছে। সাঁতরে কাছে চলে গেল রানা, শুধু মাথার খানিকটা পানির ওপরে। এক নজরেই বুঝতে পারল এগুলো এলকো টাইপ বোট। মজবুত জিনিস, ঝড়ো সাগরেও নির্বিঘেড়ব এগুলোর ওপর ভরসা করা যায়। দেখে যতই পুরনো মনে হোক জিনিসগুলো নির্ভরযোগ্য। কবীর চৌধুরী নিশ্চয়ই রিকন্ডিশন করেছে ওগুলোকে।
যেটাতে সুন্দর রং করা ওটাকেই ফ্ল্যাগ শিপ মনে হলো রানার, নেট তুলে ডেক টপকে এঞ্জিন রূমে চলে এলো ও। ট্র্যান্সমিটারের সুইচ অন করল। নীরবতায় মৃদু খড়খড় শব্দও অস্বাভাবিক জোরাল শোনাল। এক মুহূর্ত পর থামল আওয়াজটা।
নিচু গলায় বলল রানা, ‘রানা বলছি, ওভার।’
‘বল্,’ ভেসে এলো সোহেলের যান্ত্রিক গলা।
‘ছয়টা বোট নিয়ে হাইতি আক্রমণ শুরু করবে কবীর চৌধুরী, সিআইএ-র এজেন্টকে জানিয়ে দে নিজেদের সৈন্য নিয়ে যাতে ওগুলো আক্রমণ করে দখল করার ব্যবস্থা করে। তবে আমি রওনা হওয়ার আগে পর্যন্ত যেভাবে হোক ওদের ঠেকিয়ে রাখবি। তোদের রাডার স্লিঙঊনে কোনও জাহাজের দেখা পেলি?’
‘না। হারিকেনের কারণে কিছু বোঝা যাচ্ছে না।’
‘তিনশো লোক আছে কবীর চৌধুরীর সেটা ওদের বলিস। সহজ হবে না এদের বাগে আনা।’
‘ওরা পে-ন থেকে মেরিন নামাবে ঠিক করেছে। কয় ঘণ্টা সময় চাইব ওদের কাছে?’
‘পিটি বোটগুলো রওনা হওয়ার আগে পর্যন্ত কিছুই নিশ্চিত হয়ে বলা যায় না। তবে সম্ভবত আজকেই আসছে চিনা জাহাজ। কবীর চৌধুরী দেরি করবে বলে মনে হয় না। ভোর পর্যন্ত ওদের ঠেকিয়ে রাখতে পারলে আমার মনে হয় যথেষ্ট হবে।’
‘তাহলে এই কথাই রইল। আর কিছু?’
‘তেমন কিছু না। শুধু নীলাকে আমার তরফ থেকে ঠোঁটে একটা চুমু দিস, আমি কিছু মাইন্ড করব না।’
‘তবে রে, শালা, এমন ভয়ঙ্কর অ্যাসাইনমেন্টেও ফাজলামি? দাঁড়া বস্কে যদি
২৬
রিপোর্ট না করি!’
‘রাখি সোহেল, এবার কবীর চৌধুরীর আসল আস্তানায় ঢোকার চেষ্টা করব। ওভার।’
‘সাবধানে থাকিস। ওভার।’
আবার খড়খড় করছে ট্র্যান্সমিটার। সুইচ অফ করে দিল রানা, নেট সরিয়ে বোট থেকে নিঃশব্দে নেমে সাঁতরে বেরিয়ে এলো গুহা থেকে, চলে এলো যেখানে প্রথমে তীর থেকে উঠেছিল।
আরেকবার দুর্গটা চক্কর মেরে দেখে নিয়ে দ্বীপের মাঝ বরাবর রওনা দিল ও, ভিলার উঠানের কাছে পৌঁছোতেই কুকুরগুলো ছায়ার মত নিঃশব্দে ধেয়ে এলো। একটা দুটো নয়, একসঙ্গে দশ বারোটা খুনে ডোবারম্যান পিনশার। একমাত্র কতর্ব্যটাই পালন করল রানা, রাইফেলটা ছুঁড়ে ফেলে ঝেড়ে দৌড় দিল। সামনে কি আছে দেখতে পাচ্ছে না। যখন হড়াস করে গর্তটায় পড়ল তখনও বুঝে উঠতে পারল না কি হলো। দশ ফুট নিচু গর্তটা আখ আর পাম গাছের পাতা দিয়ে ঢাকা ছিল। পড়ার সময় একটা তারে পা লাগল ওর, শকুনের বাচ্চার মত তীক্ষè চিৎকার শুরু করল কয়েকটা সাইরেন। গোড়ালির ব্যথা সত্ত্বেও মুহূর্তে বুঝে ফেলল রানা, ওর উপস্থিতি আর গোপন নেই, এখনই ধরা পড়ে যাবে ও। গর্ত ঘিরে দাঁড়িয়ে প্রচণ্ড হাঁক ছাড়তে শুরু করেছে কুকুরগুলো।
দেড় মিনিটের মাথায় কুকুরগুলোকে সরিয়ে নেয়া হলো, গর্তের কিনারায় এসে দাঁড়াল পনেরোজন প্রহরী, প্রত্যেকের হাতে উদ্যত টমিগান। একটা দড়ির মই ফেলা হলো নিচে, সুবোধ বালকের মত ওপরে উঠে এলো রানা। সার্চ করে ওর ছোরা আর ট্র্যান্সমিটার কেড়ে নেয়া হলো, ঠেলা ধাক্কা দিয়ে নিয়ে আসা হলো একটা পাতাল ঘরে। জেলের সেল মনে করার কোনও কারণ নেই ঘরটাকে। অ্যাটাচড্ বাথ, মেঝেতে পুরু কার্পেট, দেয়ালে প্রাকৃতিক দুর্যোগের দুর্লভ ছবিÑরীতিমত বিলাস বহুল ঘর।
পনেরো মিনিট পেরিয়ে গেল। বাইরের প্যাসেজেও পুরু কার্পেট পাতা, ফলে পায়ের শব্দ শুনতে পায়নি ও। দরজা খুলে যেতে উঠে দাঁড়াল, দেখল সামনে দাঁড়িয়ে আছে গোমড়া মুখো অস্ট্রেলিয়ানটা। এই লোকই মদ খেয়ে সৈকতে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল, কোরা ল্যানযসকে লেলিয়ে দিয়ে ধরতে চেয়েছিল ওকে। এখনও তার পরনে সেই একই পোশাক, মাথায় বুশ হ্যাট। এখন অবশ্য বুশ জ্যাকেটটা কাদা মাখা, শর্টস কুঁচকে আছে; কিন্তু একটু আগে শেভ করেছে সে, বোধহয় কবীর চৌধুরীর সামনে যেতে হবে বলে। রানার দিকে পা বাড়িয়ে ভয়ালদর্শন রিভলভারটা বের করল সে। রানার নাকে ভক করে এসে লাগল কড়া রামের বিশ্রী দুর্গন্ধ।
রিভলভার নাড়ল ক্যালডন, এক পাশে সরে দাঁড়াল। ‘বস্ ডেকেছেন তাঁর স্টাডিতে। কোনও চালাকি নয়, আগে বাড়ো।’
‘আবার তাহলে দেখা হলো,’ পা বাড়িয়ে বলল রানা।
মাথা নাড়ল ক্যালডন। লালচে চোখে রানাকে কড়া দৃষ্টিতে দেখে নিয়ে বলল, ‘ভুল বকছ তুমি। জীবনে আমি আগে দেখিনি তোমাকে কখনও। কোনও ফন্দি থাকলে ভুলে যাও। পা চালাও শীঘ্রি, মিস্টার চৌধুরী অপেক্ষা করতে পছন্দ করেন না।’
লোকটার চোখে মুহূর্তের জন্যে পরিচয়ের ছাপ ফুটে উঠতে দেখেছে রানা। আরও একটা জিনিস ছিল তার চাহনিতে। অস্বস্তি। কোনও কারণে লোকটা চাইছে না আগে ওদের দেখা হয়েছে সেটা প্রকাশিত হোক। অস্ট্রেলিয়ানটার আচরণের একটা কারণই খুঁজে পেল রানা, বলল, ‘ঠিকই বলেছ তুমি। ক্ষণিকের জন্যে বোকা হয়ে গিয়েছিলাম তোমাকে দেখে, মনে হচ্ছিল আমার পরিচিত একজন, কিন্তু এখন বুঝতে পারছি ভুল করেছি।’
শীতল হাসল ক্যালডন।
দরজা পার হবার পর আরও দু’জন গার্ড পিছু নিল ওদের, দু’জনের হাতেই টমিগান।
‘আমাকে নিয়ে ভাবতে হবে না তোমাকে,’ নিচু স্বরে বলল ক্যালডন, ‘নিজের হাল নিয়ে চিন্তা করো। তোমার জায়গায় আমি হলে এতক্ষণে প্যান্টে পেশাব করে দিতাম।’
একটা সিঁড়ির গোড়ায় চলে এলো ওরা। বাঁকা হয়ে ওপরে উঠে গেছে সিঁড়ি। ওপরে উঠতে শুরু না করে পাশের একটা দরজা খুলে রানাকে ইশারা করল অস্ট্রেলিয়ান মেজর। ‘ভেতরে ঢোকো, আমি তোমাকে একটা জিনিস দেখাতে চাই।’ গার্ডদের হাতের ঝাপটায় বাইরে অপেক্ষা করতে বলে রিভলভারটা রানার দিকে তাক করল সে। ‘ঢোকো। কোনও চালাকি নয়।’
দীর্ঘ একটা সরু ঘরে প্রবেশ করল রানা। পুরো ঘরটা মজবুত কংক্রিটে তৈরি, সিলিং থেকে ঝুলছে কয়েকটা হাজার ওয়াটের বাল্ব্, উজ্জ্বল আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে যায়। ঘরের শেষ প্রান্তে দ্রুত নড়ছে কয়েকটা টার্গেট। শ্যূটিং গ্যালারি। প্র্যাকটিস রেঞ্জ। বাতাসে ভাসছে পোড়া করডাইটের গন্ধ। একটু আগেই এখানে কেউ প্র্যাকটিস করছিল।
জীবন্ত টার্গেটে, বুঝতে পারল রানা। দুটো খুঁটির সঙ্গে লটকে আছে কবীর চৌধুরীর অবাধ্য দুই মার্সেনারি, চিবুক ঠেকে আছে তাদের রক্তাক্ত বুকের সঙ্গে।
‘ওরা নির্দেশ অমান্য করেছিল,’ বলল ক্যালডন নির্বিকার কণ্ঠে। ‘বস্ অবাধ্যতা একদম সহ্য করতে পারেন না। এদের দেখে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ সামনে কি আসছে?’
গার্ডটা দরজার বাইরে, কথা শুনতে পাবে না, জিজ্ঞেস করল রানা, ‘ঠিক কতটা বিপদে পড়েছি আমি?’
‘যতটা বিপদে পড়া সম্ভব। আমার আন্দাজ যদি সঠিক হয় তাহলে আমাদের মাঝে বড়জোর আর এক ঘণ্টা বিচরণ করবে তুমি।’
চুপ করে দাঁড়িয়ে লাশ দুটো দেখছে রানা, অস্ট্রেলিয়ান মেজর কাছে এসে ওর কিডনিতে রিভলভারের নল দিয়ে খোঁচা মারল, রামের বোটকা গন্ধ ভরা মুখটা রানার কানের কাছে এনে বলল, ‘আমরা কিন্তু পরস্পরকে আগে কখনও দেখিনি
২৭
সেটা মনে রেখো। সৈকতে দেখা হওয়ার কথা ভুলে যাও। আমার কথা শুনলে চেষ্টা করে দেখব কি করতে পারি। হয়তো তোমাকে এই বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারব। ঠিক আছে? বুঝেছ আমি কি বলেছি?’
‘বুঝেছি,’ বলল রানা, মনে মনে বলল, ‘কবীর চৌধুরী আমাকে দেখলে আমি শেষ, সেক্ষেত্রে তোমাকে সঙ্গে নিয়েই যাব আমি, বদের হাড্ডি!’
রানাকে সামনে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠল ওরা, চমৎকার করে সাজানো একের পর এক করিডর পেরিয়ে চলল। কয়েকটা দরজা পার হলো। প্রত্যেকটা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সশস্ত্র প্রহরী। যে দরজাগুলো খোলা দেখল সেগুলোর ভেতরে টেবিলে বসে কাজ করছে লোকজন, ম্যাপ দেখছে গভীর মনোযোগে, চার্ট তৈরি করছেÑপ্রত্যেকের পরনে সবুজ ইউনিফর্ম, কাঁধে পদমর্যাদাসূচক ইনসিগনিয়া।
‘ছোটখাটো একটা সেনাবাহিনী,’ মন্তব্য করল রানা।
রিভলভার দিয়ে ওর পিঠে জোরাল এক গুঁতো মারল ক্যালডন। ‘চুপ! একদম চুপ! একটা কথাও না।’ রানা বুঝতে পারল গার্ডদের সামনে কঠোরতা দেখাচ্ছে লোকটা।
বিশাল একটা ওক কাঠের দরজার সামনে থামল ওরা। নক না করেই রানাকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢুকল ক্যালডন, দরজাটা পেছনে বন্ধ করে দিল। চট করে গার্ডদের অবস্থান দেখে নিল রানা, হাসি হাসি চেহারা করে অপেক্ষাকৃত তরুণ গার্ডকে বলল, ‘সিগারেট হবে একটা?’
পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে বাড়িয়ে দিচ্ছিল তরুণ প্রহরী, কিন্তু পাশেরজন হাতের ঝাপটায় প্যাকেটটা ফেলে ঘোঁৎ করে উঠল। ‘গাধা নাকি! বস্ জানলে খুন হয়ে যাবে।’
দুঃখিত চেহারা করল রানা। মনে মনে ভাবছে আসলেই পাগল বৈজ্ঞানিককে যমের মত ভয় পায় তার লোকরা।
অস্ট্রেলিয়ান মেজর বেরিয়ে এসেছে। রানাকে হাতের ইশারা করল। ‘ভেতরে যাও, বস্ ডাকছেন। চালাকির চেষ্টা কোরো না। কোনও জানালা নেই ওঘরে, এই দরজা ছাড়া বেরোবার কোনও পথ নেই। আর বাইরে আমরা পাহারায় থাকছি।’
শীতল হাসল রানা। ‘তোমাদের বসের কোনও ক্ষতি করে দিতে পারি আমি সে-ভয় পাচ্ছ না?’
রানাকে আপাদমস্তক দেখল ক্যালডন, চোখে অবহেলার দৃষ্টি ফুটে উঠল। ‘তুমি স্বয়ং শয়তান হলেও বোধহয় আশঙ্কা করতাম না।’
দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল রানা। ঘরটা গোলাকার, বিশাল; বিলাসবহুল আসবাবপত্র, সুরুচির সঙ্গে সাজানো। মেঝেতে দামী কার্পেট, দেয়ালে দু®প্রাপ্য ও দুর্মূল্য পেইন্টিং। ছাদে বসানো কোমল আলোগুলো সরাসরি চোখে এসে লাগছে না, কেমন একটা মোহময় আবহ তৈরি করেছে। বাতাসে ভাসছে বিখ্যাত বাদক ভিভালডির বেহালার মিষ্টি মৃদু সুরলহরী।
‘রানা!’ বিশাল ডেস্কের পেছনে সিধে হয়ে বসল কবীর চৌধুরী। বিস্ময় কাটিয়ে দ্রুত সামলে নিল নিজেকে। ‘তাহলে দেখা হলো আবার। বোসো, রানা, বোসো। আমি তোমাকে আশা করিনি।’
মৃদু আলোয় চোখ সইয়ে নেয়ার ফাঁকে এগিয়ে গিয়ে চামড়া মোড়া চেয়ারে বসল রানা, সরাসরি কবীর চৌধুরীর চোখের দিকে তাকাল। ‘কবে হুঁশ হবে তোমার, চৌধুরী? দেশের সঙ্গে বেঈমানী করে নিজেকে মানুষ ভাবো কি করে? ঘৃণ্য একটা কীট তুমি। তুমি...’
‘হয়েছে, রানা, হয়েছে,’ হাত তুলে ওকে থামিয়ে দিল কবীর চৌধুরী, আরেক হাত ডেস্কের ওপর তুলে আনল। সে হাতে একটা ল্যুগার পিস্তল, সরাসরি রানার বুক লক্ষ্য করে ধরা। ‘তোমার এসব সস্তা আদর্শের কপচানি আগেও বহুবার শোনার দুর্ভাগ্য হয়েছে আমার। আমার আদর্শ কি জানো? যার শক্তি আছে, যার বুদ্ধি আছে, যে যোগ্য, যার প্রতিভা আছে; দুনিয়া তার জন্যে খোলা। সে নিজের জন্যে যা প্রয়োজন তা করবে, সাধ্য থাকলে জয় করে নেবে পৃথিবী। চেষ্টা তো অন্তত করবেই। সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা করে নিজেকে আমি বঞ্চিত করব কেন? এই যেমন তুমি...কি পেয়েছ তুমি দেশের কাছ থেকে? সামান্য বেতন...আর? জীবনের ঝুঁকি নিয়েছ, দেশকে বিপদের হাত থেকে রক্ষা করেছ, তার বিনিময়ে বেতনটা কি যথেষ্ট?’
হাসল রানা। ‘তোমার পাগলামি আজও গেল না কবীর চৌধুরী। মানুষ হতে পারলে না, চিরটা কাল জানোয়ারই রয়ে গেলে।’
টকটকে লাল হয়ে উঠল কবীর চৌধুরীর চেহারা, চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, ‘অনেক আগে থেকে আঠার মত আমার পেছনে লেগে আছ তুমি। বারবার আমার কাজে বিঘড়ব সৃষ্টি করেছ, বারবার মস্ত ক্ষতি করে দিয়েছ আমার। সারাজীবনে মূল্যবান যেসব কাজ করেছি তার সত্তর ভাগ নষ্ট হয়ে গেছে তোমার জন্যে। এখন আমি জানি কি কারণে ক্ষতি হয়েছে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অভাব ছিল আমার। সেটা এবার আমি অর্জন করে নেব। এমন ব্যবস্থা নেব যে তোমার মতো লোকরা আমার ধারেকাছে আসতে পারবে না।’ থামল কবীর চৌধুরী, গম্ভীর চেহারায় রানাকে কিছুক্ষণ দেখল একদৃষ্টিতে, তারপর ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘সত্যি বলছি, রানা, ভেবে এসেছি নিজের হাতে তোমাকে খুন করতে পারলে স্বস্তি পাব। কিন্তু এখন কি মনে হচ্ছে জানো? আমার হাতে মরার যোগ্যতা তোমার নেই। যেভাবে উজবুকের মত ধরা পড়লে...তোমার কাছ থেকে আরও ভাল কিছু আশা করেছিলাম আমি। সেজন্যেই সিদ্ধান্ত পাল্টেছি। সাধারণ এক মদ্যপের হাতে তোমাকে মরতে হবে। বলো এরচেয়ে বেশি অপমান তোমাকে আমি কিভাবে করতে পারি?’
হাসছে কবীর চৌধুরী, চোখ দুটো অস্বাভাবিক রকম জ্বলজ্বল করছে। ‘কি করতে যাচ্ছি, জানো, রানা? হাইতি দখল করে পুতুল সরকার বসাব। দু’দেশে, পুয়ের্টো রিকো আর হাইতিতে গড়ে তুলব
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now