বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

কনকতরী-০১

"উপন্যাস" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X ১ কনকতরী প্রথম প্রকাশ: ২০০৩ এক পুন্টা হিগুয়েরো, পুয়ের্টো রিকোর মায়াহুয়েজ আর অ্যাকুয়াডিয়া শহরের ঠিক মাঝখানে। দীর্ঘ একটা আঙুল যেন, বেরিয়ে এসেছে মোনা প্যাসেজের গাঢ় নীল সাগরের বুকে তর্জনীর মত। ডোমিনিকান মেইনল্যান্ড থেকে পুন্টার দূরত্ব একশো মাইল। মাঝখান দিয়ে বয়ে যাচ্ছে পুয়ের্টো রিকোর রুপোলি-নীল গভীর জলরাশি। সরু একটা প্যাসেজ ওটা, পাথুরে, কোরাল রীফের কারণে কোথাও কোথাও অগভীর এবং অত্যন্ত বিপজ্জনক। মোনা প্যাসেজে বিচিত্র সামুদ্রিক প্রাণীর অভাব নেই। নিরীহ প্রাণী যেমন আছে, তেমনি আছে ভয়ঙ্কর বিপজ্জনক হাঙর, ব্যারাকুডা আর অন্যান্য মাছ। হারিকেন অঞ্চল। অগভীর পানিতে নিমজ্জিত জাহাজেরও সীমাসংখ্যা নেই। কয়েক শতাব্দীর জাহাজ রয়েছে তার মধ্যে। আছে স্প্যানিশদের স্বর্ণবাহী গ্যালিয়ন। অবশ্য ওগুলোর সমস্ত সম্পদ বহু আগেই উদ্ধার করা হয়ে গিয়েছে। একচিলতে সোনাও আর পাওয়া যায় না এখন। তবে জাহাজ থেকে ফেলা এবং পড়ে যাওয়া জিনিস ঢেউয়ের সঙ্গে তীরে চলে আসে, সেগুলো সংগ্রহের জন্যে বালুকাবেলায় এখনও ঘুরে বেড়ায় বীচ খেউমা (ঈড়সনবৎ)রা বা সৈকত-টোকাইরা। এখন মাঝ আগস্ট। ভারী বাতাসে ভাসছে অগ্রসরমান হারিকেনের গন্ধ। একজন বীচ খেউমা নির্জন ঝড়ো সৈকতে হাজির, সোনালী বালির ওপর দিয়ে ধীর পায়ে পুন্টা হিগুয়েরোর দিকে এগোচ্ছে সে। লোকটা বেশ দীর্ঘ, চওড়া কাঁধদুটো দেখলে মনে হয় রাগবি খেলে। সরু কোমর, শক্তিশালী পা। তবে শারীরিক শক্তিমত্তা ততটা বোঝা যাচ্ছে না এখন। লোকটার পরনে গরিবী পোশাক, হাঁটছে কাঁধ ঝুঁকিয়ে একটু কুঁজো হয়ে, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। এক পায়ের বুড়ো আঙুল বেরিয়ে এসেছে ছেঁড়া জুতোর নাক ছিঁড়ে। শার্টটা তালিপট্টি মারা। নোংরা জিন্সের প্যান্ট দেখলে মনে হয় কোনদিন ধোয়া হয়নি। গালে তার চারদিনের না কামানো খোঁচা খোঁচা দাড়ি। মাথায় একটা ছেঁড়া স্ট্র হ্যাট। চেহারা দেখলে বোঝা যায় কষ্টে আছে। ভকভক করে সস্তা হুইস্কির গন্ধ বের হচ্ছে মুখ থেকে। তবে টলছে না সে, ধীর পায়ে সৈকতের ওপর দিয়ে তারের বেড়ার দিকে এগিয়ে চলেছে। বারোটা তার দিয়ে দুর্ভেদ্য করা হয়েছে বেড়া। তার ওপর আছে কয়েক সারি কাঁটাতার, নেমে গেছে অগভীর পানিতে, যাতে সৈকত থেকে কেউ ভেতরে ঢুকতে না পারে। শার্টের পকেট থেকে তামাক বের করে সিগারেট তৈরি করতে একটু থামল বীচ খেউমা। তার পিঠে একটা পুরানো আর্মি ন্যাপস্যাক ঝুলছে, হাতে একটা লাঠি। লাঠির এক মাথা চেঁছে চোখা করা। অলস ভাবে সিগারেট তৈরি করে সৈকতের শেষ মাথায় এসে দাঁড়াল সে। সোনালী সৈকতে সাদা ফেনা রেখে ফিরে যাচ্ছে ছোট ছোট ঢেউ। সামুদ্রিক বাতাস থেকে আড়াল করে সিগারেটটা ধরাল সে, একটা এঞ্জিনের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে, আসছে এদিকেই। সম্ভবত জীপ গাড়ি। লোকটার দাড়িভরা চেহারায় ক্ষণিকের জন্যে মৃদু হাসি দেখা দিল। নাক-মুখ দিয়ে নীল ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে উঁচু বেড়াটার দিকে এগোল সে, ভাব দেখে মনে হলো না কোনও বিপদের আশঙ্কা করছে। এবার জীপটাকে দেখতে পেল, একটা বালির ঢিবির গা বেয়ে আড়াআড়ি আসছে। দু’জন লোক আছে জীপে, পরনে খাকি ইউনিফর্ম। ড্রাইভার লোকটাকে দূর থেকে দেখে নিগ্রো বলে মনে হলো। তার পাশের লোকটা সাদা, বেঁটে এবং মোটা। মাথায় অস্ট্রেলিয়ান বুশ হ্যাট। বেড়ার কাছে পৌঁছে গেছে বীচ খেউমা, মাথা উঁচু করে কাঁটাতারের সারি দেখল। বেড়ার নিচে কংক্রিটের দেয়াল, যাতে তলা দিয়ে খুঁড়ে ভেতরে কেউ ঢুকতে না পারে। খুঁটির গায়ে ঝুলছে একটা সাদা সাইনবোর্ড। লাল হরফে স্প্যানিশে লেখা: আর এগোবেন না। ট্রেসপাসারদের কড়া জিজ্ঞেসাবাদ করা হবে। একই কথা ইংরেজিতেও লেখা আছে। সিগারেটটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে সৈকতের প্রান্তে চলে গেল বীচ খেউমা, বেড়ার শেষ মাথা পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢোকার ইচ্ছে। ঘ্যাঁচ করে ব্রেক করে থামল জীপটা, বিশ ফুট দূরেও নয়। সাদা লোকটা লাফ দিয়ে নামল জীপ থেকে, দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসছে। ‘দাঁড়াও!’ কড়া গলায় নির্দেশ দিল লোকটা। ‘আর এগোবে না। অক্ষরজ্ঞান নেই নাকি? দেখছ না সাইনবোর্ডে কি লেখা আছে?’ বেড়ার পাশে থমকে দাঁড়িয়ে হাতের লাঠিতে ভর দিল বীচ খেউমা, তাকিয়ে আছে এগিয়ে আসা মোটা লোকটার দিকে। আন্দাজ করল লোকটার বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি হবে। নড়াচড়া দেখে বোঝা যাচ্ছে দেহে যথেষ্ট শক্তি রাখে। আর্মিতে ছিল বোধহয়। পরনে আর্মির জুতো, তবে মোজাটা সাদা। খাকি হাফ প্যান্ট আর বুশ জ্যাকেট পরে আছে। প্যান্ট আর জ্যাকেট ইস্ত্রি করা, নতুন। জ্যাকেটের বুকের কাছটা ফাঁক হয়ে আছে, দেখা যাচ্ছে কাঁচাপাকা ঘন লোম। মোটা কোমরে ঝুলছে একটা ওয়েব হোলস্টার। ওরকম হোলস্টার ইংরেজ আর অস্ট্রেলিয়ান আর্মি অফিসাররা ব্যবহার করে। বোতামবন্ধ ফ্ল্যাপের তলা দিয়ে চকচকে কালো একটা রিভলভারও দেখতে পেল বীচ খেউমা। বেড়ার দু’পাশে মুখোমুখি দাঁড়াল দুজন, পরস্পরের চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। সশস্ত্র লোকটাই প্রথমে মুখ খুলল। ‘কি ব্যাপার, কি লেখা আছে পড়তে পারো না?’ মোটকুর চোখের দৃষ্টির সামনে ইচ্ছে করেই চোখ নামিয়ে নিল বীচ খেউমা। অন্যদিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল, ‘পড়েছি। কিন্তু সাইনবোর্ডের কথা মেনে চলতে হবে হবে কেন? আমি তো কারও কোনও ক্ষতি করছি না, সৈকতে খুঁজে ২ দেখছি কিছু পাওয়া যায় কিনা।’ বুড়ো আঙুল দিয়ে সাইনটা আবার দেখাল মোটকু। ‘ওখানে যা লেখা আছে সেটা খামোকা লেখা হয়নি। ভেতরে ঢুকলে বিপদ ছাড়া আর কিছুই পাবে না তুমি। যা বলছি করো, সরে পড়ো এখান থেকে।’ চট করে জীপে বসা নিগ্রো ড্রাইভারের ওপর থেকে ঘুরে এলো বীচ খেউমার দৃষ্টি। পেছনের সীট থেকে একটা স্টেনগান হাতে তুলে নিয়েছে সে। না, এরা ভড়কি দিচ্ছে না। সামনের লোকটার ওপর দৃষ্টি ফেরাল বীচ খেউমা। এবার তার চোখে জেদ আর রাগের ছাপ। ‘আমি তো বলেছি কারও কোন ক্ষতি করছি না। এভাবে আমাকে বেড়া দিয়ে আটকে দেয়ার অধিকার নেই আপনাদের।’ মোটকুর লাল চেহারায় ধীরে ধীরে হাসি ফুটে উঠল। ধূসর ভ্রƒ জোড়ার নিচে জ্বলজ্বল করে উঠল নীল দুই চোখ। চোখের নিচে ঝুলছে মাংসের পুটলি। নাকটা ভাঙা। অনেকদিন আগে ভেঙেছিল, হাড় নেই। সরু ঠোঁটে ঠোঁট চেপে বসায় লম্বা একটা রেখার মত লাগছে মুখটা। কাঁচাপাকা লোমওয়ালা একটা হাত ওয়েব হোলস্টারের ওপর রাখল সে। কথা যখন বলল তখন বলল অত্যন্ত শান্ত, প্রায় বন্ধুত্বপূর্ণ কণ্ঠে। ‘কাউকে ঢুকতে না দেয়ার অধিকার আছে আমার, বুঝলে? এটা ব্যক্তিগত সম্পত্তি। আমি আছি কাউকে ঢুকতে না দেয়ার দায়িত্বে। এই বেড়া থেকে অন্য প্রান্তে পাঁচ মাইল দূরের বেড়া পর্যন্ত ব্যক্তিগত সম্পত্তি। এটা প্রস্থে। দৈর্ঘ্যে জমি আছে দশ মাইল। কাউকে ঢুকতে না দেয়ার আইনগত অধিকার আছে আমার। বিশ্বাস না করলে কোনও উকিলের সঙ্গে কথা বলে দেখতে পারো।’ হোলস্টারের ওপর থেকে হাত সরিয়ে ঊরুর পাশে রাখল সে, ঠোঁট সামান্য ফাঁক করে করুণার হাসি নিয়ে বীচ খেউমাকে দেখল। ‘আমার কথা বুঝতে পেরেছ? দেখতে তুমি যতই নির্বোধের মত হও না কেন, বুঝতে না পারার কোনও কারণ তো দেখতে পাচ্ছি না। সোজা নিজের পথে চলে যাও, তাতে তোমার আমার দু’জনেরই অনেক ঝামেলা কমবে।’ কঠোর হয়ে গেল চেহারাটা। ‘যেদিক থেকে এসেছ সেদিকেই যাবে তুমি, বুঝেছ?’ বীচ খেউমা একদৃষ্টিতে চেয়ে আছে মোটা লোকটার দিকে। আকৃতির দিক দিয়ে লোকটা তার তুলনায় অনেক ছোট। কাঁধ সোজা করল বীচ খেউমা, দেখে মনে হলো দৈর্ঘ্যে অন্তত এক ফুট বেড়ে গিয়েছে সে। ঘাড়-ত্যাড়ামির একটা ভাব ফুটল তার চেহারায়, আসলে দেখতে চাইছে প্রয়োজনে কতটা বেপরোয়া হবে লোকগুলো। একবারও সাগরের দিকে তাকাচ্ছে না। চায় না এক মাইল দূরবর্তী দ্বীপটার ব্যাপারে তার কোনও কৌতূহল আছে সেটা এরা বুঝতে পারুক। ‘আমার তো মনে হয় আইন আমার পক্ষে আছে,’ বলল বীচ খেউমা। ‘আইন বলে ডাঙা পর্যন্তই সম্পত্তির সীমা, সাগরে কারও কোনও সম্পত্তি থাকতে পারবে না। তোমাদের বেড়াও ওই পর্যন্তই। আমি যদি ওটা এড়িয়ে পানির ওপর দিয়ে যাই তাহলে সেটাকে ট্রেসপাসিং বলা যায় না। কি, আমি ঠিক বলেছি, মিস্টার?’ ব্যাগ নামিয়ে চ্যাপ্টা একটা মদের বোতল বের করল বীচ খেউমা। বোতলটা সোনালী তরলে অর্ধেক ভর্তি। সামনের লোকটার ওপর থেকে চোখ না সরিয়েই সস্তা হুইস্কির বোতলে চুমুক দিল সে। সতর্ক, যাতে বেশি মদ পেটে না যায়। বোতলের মুখে জিভটা খানিকটা ঢুকিয়ে রেখেছে। ড্রিঙ্ক করলে অসুবিধে নেই তার, কিন্তু হুইস্কিটা এতই বাজে আর কম দামী যে বাড়াবাড়ি করতে গেলে বমি হয়ে যেতে পারে। বমি করে ফেললে এত কষ্ট করে জমানো নাটক মাটি হয়ে যাবে। চোখে ঈর্ষা নিয়ে বীচ খেউমাকে মদ গিলতে দেখছে জোসেফ ক্যালডন। অস্ট্রেলিয়ান আর্মিতে এক সময় মেজর ছিল, এখন সে কবীর চৌধুরীর ব্যক্তিগত বাহিনীর প্রধান। ভাল বেতন পায় সে, কিন্তু কবীর চৌধুরী তার মদ খাওয়ায় বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। এক সপ্তাহ আগে তাকে শেষ বারের মত সতর্ক করে দেয়া হয়েছে, সেই থেকে সে তৃষ্ণার্ত। এখন এক পেগ ড্রিঙ্কের জন্যে যা খুশি করতে পারবে বলে মনে হলো ওর। চোখের সামনে কেউ মদ না খেলে হয়তো কষ্ট করে নিজেকে সামলে রাখতে পারত। কিন্তু এখন হারামজাদা ভবঘুরে টোকাই চোখের সামনে হুইস্কি গিলছে। ব্যাপারটা তার কাছে রীতিমত অত্যাচারের সামিল মনে হলো। রাগে জ্বলে উঠল সারাশরীর। বীচ খেউমাকে একহাত নেয়ার তীব্র ইচ্ছে জেগে উঠল তার অন্তরে। সে কিছু বলার আগেই বেড়ার ফাঁক দিয়ে বোতলটা বাড়িয়ে দিল বীচ খেউমা। ‘কি, মিস্টার, চলবে নাকি একটু?’ খপ করে বোতলটা ধরে ওর হাত থেকে প্রায় ছিনিয়ে নিল জোসেফ, ঠোঁটে তুলে চোখ বুজে চুমুক দিল। ঢকঢক করে গিলছে। ঘনঘন ওঠানামা করছে কণ্ঠার হাড়। সস্তা কড়া হুইস্কি, কিন্তু ওটাই জোসেফের মনে হলো দুনিয়ার সেরা মাল। দুনিয়ায় আনন্দ বলতে তো এই মদ খাওয়াই, আর কি! ক্ষণিকের জন্যে বোতলটা নামাল সে, বড় করে শ্বাস নিয়ে হাতের উল্টোপিঠে মুখ মুছল, তারপর আবার মুখে তুলল। বেড়ার এপাশে দাঁড়িয়ে আছে বীচ খেউমা, খোঁচা খোঁচা দাড়িভরা চেহারায় প্রচ্ছনড়ব হাসির আভাস। কিছুই তার চোখ এড়াচ্ছে না। কাত করে পরা বুশ হ্যাটের সামনের দিকে একটা ইনফ্যান্ট্রি ব্যাজ দেখা যাচ্ছে। রয়াল অস্ট্রেলিয়ান রাইফেলসের ব্যাজ। নামকরা একটা রেজিমেন্ট। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে ওই বুশ হ্যাটটা মোটা লোকটার গর্বের জিনিস। ব্যবহারের ফলে কাপড় কোথাও কোথাও পাতলা হয়ে গেছে, বয়সের ভারে কুঁচকে গেছে অনেক জায়গায়, কিন্তু হ্যাটটা পরিষ্কার, চকচক করছে ব্যাজটা। আর্মিতে ছিল লোকটা, ভাবল বীচ খেউমা। দেখেই বোঝা যায় অ্যালকোহলিক। কথাটা মনে গেঁথে রাখল সে। হুইস্কি শেষ করেছে জোসেফ ক্যালডন, বোতলটা ফিরতি ঢেউয়ের মাঝে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বীচ খেউমার দিকে তাকিয়ে হাসল। ‘সরি, বাম্, হুইস্কি দেখলে ৩ আর নিজেকে সামলাতে পারি না। বদ অভ্যেস। আমার মা বহু চেষ্টা করেও আমাকে বোতল ছাড়াতে পারেনি।’ নার্ভাস ভঙ্গিতে হাসল বীচ খেউমা। ‘আমি কিছু মনে করিনি, বন্ধু। ব্যাগে আরও এক বোতল আছে। তৃষ্ণার্ত মানুষকে ড্রিঙ্ক দিতে ভাল লাগে আমার।’ আবার বোকার মত হাসল সে, বালিতে দাগ কাটল ছেঁড়া জুতো দিয়ে। ‘আসলে আমি খুব বন্ধুবৎসল মানুষ, বুঝলে? নিজের মত চলি, কারও কোনও ক্ষতির মধ্যে আমি নেই।’ ছনড়বছাড়া ভবঘুরে হাভাতে লোকটার দিকে তাকিয়ে একটা ভাবনা খেলে গেল জোসেফ ক্যালডনের মাথায়, হাসি চেপে রাখল সে। হুইস্কি শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু একে নিয়ে এখনও সামান্য মজা করার অবকাশ আছে। ভ্রƒ কুঁচকে তাকাল সে হতদরিদ্র লোকটার দিকে। ‘ভেবো না ওই হুইস্কির জন্যে তুমি কোনও সুবিধে পাবে আমার কাছে। এবার যাও, সোজা কেটে পড়ো। বীট ইট! রওনা হয়ে যাও, যেদিক থেকে এসেছিলে।’ বীচ খেউমা কিছু বলার আগেই নিচু গলায় ডাক দিল নিগ্রো ড্রাইভার, ইশারায় কব্জি দেখাচ্ছে। অনেকখানি সৈকত তাদের টহল দিতে হবে। সম্ভবত এরা একা নয়, সৈকতের অন্য প্রান্ত থেকে টহল দিয়ে নিশ্চয়ই এগিয়ে আসছে অন্তত আরেকটা জীপ। ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করতে ইশারা করল ক্যালডন, বীচ খেউমার দিকে ফিরল, এবার তার কণ্ঠস্বর অনেক নরম শোনাল। ‘ঠিক আছে, তোমার সঙ্গে পরিচয় হয়ে গেছে, এখন আর কঠোর হতে পারব না। তাছাড়া তোমার সমস্ত হুইস্কি আমি শেষ করে ফেলেছি। বিনিময়ে কিছু অন্তত করা উচিত আমার। ঠিক আছে, যাও তুমি। তবে সাবধান থেকো, পানি ছেড়ে ডাঙার দিকে আসবে না, আর পথে কোথাও থামবে না।...দাঁড়াও, আর কোনও দলের হাতে পড়তে পারো, যাতে বিপদ না হয় সেজন্যে একটা নোট লিখে দিচ্ছি।’ পকেট থেকে কাগজ বের করে কি যেন লিখে ভাঁজ করে বাড়িয়ে দিল সে। ওটা হাতে নিয়ে ক্যালডনের চোখে তাকাল বীচ খেউমা। দৃষ্টিটা তার পছন্দ হলো না। লোকটার ঠোঁটে হাসির রেখাটাও সতর্ক করছে তাকে, কিন্তু পাত্তা না দিয়ে বলল, ‘অনেক ধন্যবাদ, মিস্টার। এদিক দিয়ে না গেলে আমাকে অনেক পথ ঘুরে যেতে হত। সত্যিই আমি কৃতজ্ঞ।’ চওড়া হাসল ক্যালডন। ‘যাও তাহলে। দেরি কিসের, যেকোন মুহূর্তে আমি হয়তো মত বদলে ফেলতে পারি, শিগ্গির রওনা হয়ে যাও।’ কথা শেষ করে জীপ গাড়ির দিকে পা বাড়াল সে, নিগ্রো ড্রাইভার অধৈর্য চেহারায় হাতে স্টেনগান নিয়ে অপেক্ষা করছে। বেড়ার শেষ প্রান্ত পার হয়ে পানির ভেতর দিয়ে এগোল বীচ খেউমা, জুতো ভিজে গেছে সেটা কেয়ার দিচ্ছে না। মাইলের পর মাইল সৈকত পাড়ি দিতে হবে তাকে, ধীরেসুস্থে চলেছে। জীপটা নিচু গিয়ারে রওনা হয়ে গেল, আওয়াজ শুনতে পেল সে। পেছনে ফিরে তাকাল না, কিন্তু দেহের প্রতিটা পেশি টানটান হয়ে গেল তার, ঝড়ের বেগে কাজ করছে মাথা, ভাবছে এরপর কি আসতে পারে। অসি খুব দ্রুত তার সিদ্ধান্ত পাল্টেছে, ব্যাপারটা অস্বাভাবিক। লোকটার নীচ চোখে চাতুরির ছাপ ঢাকা থাকেনি। জীপটা দ্বিতীয় গিয়ারে চলছে এখন, চওড়া টায়ারগুলো বালিতে দাঁত বসানোয় স্পীড বাড়ছে দ্রুত। ওর আড়াআড়ি এগিয়ে চলেছে জীপটা, কিন্তু দূরত্ব বজায় রাখছে পঞ্চাশ গজ। হঠাৎ করেই অস্ট্রেলিয়ান লোকটার চিৎকার শুনতে পেল, ‘অ্যাই হারামজাদা! অ্যাই! এখানে কি!’ চমকে গেছে এমন ভঙ্গিতে ঘুরে দাঁড়াল বীচ খেউমা। স্পষ্ট বুঝতে পারছে কি ঘটতে চলেছে। লোকটা নোংরা আনন্দ পাবার লোভ সামলাতে পারবে না। পঞ্চাশ গজ দূরে থেমে দাঁড়াল জীপ। নিগ্রো ড্রাইভার হাসছে, গ্যাস পেডালে পায়ের চাপ বাড়াল, আবার এগিয়ে আসতে শুরু করল জীপটা। স্টেনগান এখন অস্ট্রেলিয়ান লোকটার হাতে। হাসছে সে-ও। ‘কিরে ব্যাটা, জানিস না অনধিকার প্রবেশ করেছিস তুই? দাঁড়া তোকে এমন শিক্ষা দেব...’ এক পশলা গুলি করল ক্যালডন। বীচ খেউমার পায়ের কাছে বালিতে নাক গুঁজল বুলেটগুলো। একটা বুলেট লোকটার ছেঁড়া জুতোর গোড়ালিতে আঁচড় কেটে গেল। হাত থেকে লাঠি ফেলে হাত দুটো মাথার ওপর তুলে ফেলল বীচ খেউমা, বেকায়দা ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আতঙ্কিত স্বরে চেঁচাল, ‘গুলি করবেন না! গুলি করবেন না, সার! আর আসব না! ফিরে যাচ্ছি আমি! দয়া করে গুলি করবেন না!’ নিগ্রো ড্রাইভার আর অস্ট্রেলিয়ান প্রাক্তন মেজর, দু’জনই গলা ছেড়ে হাসছে। আরও একটু এগিয়ে এল জীপটা। আরেক দফা গুলি বের হলো স্টেনগান থেকে। বীচ খেউমার পায়ের কাছে বালি ছিটকে উঠল। একটা বুলেট লাগল তার পিঠে ঝোলানো ব্যাগে। ‘নাচ, শালা!’ হাসির ফাঁকে চিৎকার করল ক্যালডন। ‘নাচ!’ মাথার ওপর দু’হাত তুলে রেখেই বেড়া পার হয়ে নিষিদ্ধ এলাকা থেকে বের হতে দৌড় দিল বীচ খেউমা। সমানে চেঁচাচ্ছে, ‘মারবেন না, স্যার! মারবেন না!’ তার পায়ের কাছে বালি খুঁড়ছে স্টেনগানের বুলেট। ছপাৎ ছপাৎ পানি ভেঙে বেড়া পার হয়ে বেড়ার বাইরের সৈকতে চলে এল সে। লম্বা লম্বা পায়ে ঝেড়ে দৌড়াচ্ছে। এখন আর তার চেহারা দেখতে পাচ্ছে না বেড়ার ওপারের লোকগুলো। গুলি বন্ধ হয়ে গেছে। হাসি ফুটে উঠল রানার চেহারায়, যেজন্যে এসেছিল তা জানা হয়ে গিয়েছে। কবীর চৌধুরীর আস্তানা এটা। গ্যালোস কে। এবার মার্ভিন লংফেলোর নির্দেশিত জায়গায় খায়রুল কবিরের প্রেমিকা ডোনা ডানের সঙ্গে দেখা হলে জানা যাবে সোনা উদ্ধার করতে হলে কি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে তাকে। ওর মাথার ওপর দিয়ে বাতাসে শিস কেটে ছুটে গেল আরেকটা বুলেট। দৌড় থামাল না রানা। দৌড়াচ্ছে মাথার ওপর দু’হাত তুলে। রাহাত খানের কথা ৪ ভাবল ও। এখন যদি তিনি দেখতেন ওর দৌড়, তাহলে মান-সম্মান নিয়ে টানাটানি পড়ে যেত। দুই রানা এজেন্সি। লন্ডন। ঠোঁটে সিগারেট, চেয়ারে হেলান দিয়ে টেবিলে দু’পা তুলে আয়েস করে বসে আছে রানা, কোলের ওপর মোটা একটা ফাইল, গভীর মনোযোগে পড়ছে ওটা। স্বামী খুন হয়েছে। স্ত্রী দায়ী নয় সম্ভবত। দু’জনেরই পরকীয়া প্রেম ছিল। দু’জনই দু’জনের ব্যাপারটা জানত, এ নিয়ে তাদের মাঝে সমঝোতাও ছিল। এখন রানা ভদ্রলোকের ব্যবসা সংক্রান্ত তথ্যগুলো পড়ছে। জটিল কেস। দরজার বাইরে ঝুলছে ডু নট ডিস্টার্ব লেখা কার্ড। দরজায় নক হলো। টেবিল থেকে পা নামিয়ে নিল রানা। ‘কাম ইন।’ হাসান ঢুকল ঘরে। ‘মাসুদ ভাই, বিরক্ত করলাম।’ হাসল রানা। ‘করে তো ফেলেছ। কি দরকার?’ ‘হংকং থেকে একটা মেসেজ এসেছে, মাসুদ ভাই, আমাদের এজেন্ট পাঠিয়েছে।’ টেবিলে রানার সামনে চিকন একটা ফাইল নামিয়ে রাখল হাসান। ‘বলছে কবীর চৌধুরী একটা জাহাজ নিয়ে হংকং ছেড়েছে। সম্ভবত তার সঙ্গে বাংলাদেশী তেল বেচা দুই বিলিয়ন ডলারের সোনা আছে।’ রানা চুপ করে আছে দেখে চেহারাটা আরও গম্ভীর করে তুলল হাসান। ‘সি আই এ-র একটা তদন্ত রিপোর্টে পড়লাম, পুয়ের্টো রিকোয় সরকারের কাছ থেকে প্রচুর জমি লীয নিয়েছে কবীর চৌধুরী, ছদ্মনামে। সরকারকে গবেষণার কাজে সাহায্য করায় তার এলাকায় কাউকে নাক গলাতে দেবে না ওরা।’ আড়মোড়া ভেঙে সিধে হয়ে বসল রানা। পূর্ণ গতিতে কাজ শুরু করেছে মাথা। হাসান বিসিআই জুনিয়ার এজেন্ট, কাজেই জিজ্ঞেস করল, ‘বস্ জানেন?’ ‘মেজর জেনারেল? জানেন। হংকং থেকে তাঁর কাছেই মেসেজটা আগে পাঠানো হয়েছে।’ লাল ফোনটার দিকে তাকাল রানা, কুসংস্কারে ওর বিশ্বাস নেই, নইলে নিজেকে পীর-ফকির-মিসকিন বলে দাবি করতে পারত। ও তাকানোর সঙ্গে সঙ্গে পিইপ পিইপ করে বেজে উঠল লাল ফোন। হাসানকে বসতে ইঙ্গিত করে ক্রেডল কানে ঠেকাল রানা। ‘রানা?’ রানার বুকের ভেতর একঝলক রক্ত ছলাৎ করে উঠল রাহাত খানের গুরুগম্ভীর কণ্ঠস্বর শুনে। ‘জ্বী, স্যার।’ ‘শুনেছ? কবীর চৌধুরী রওনা দিয়েছে।’ ‘এই মাত্র শুনলাম, স্যার।’ ‘হাতের সমস্ত কাজ বুঝিয়ে দাও অন্যদের। এখুনি পুয়ের্টো রিকো যাচ্ছ তুমি। ধারণা করছি কবীর চৌধুরী জাহাজ ত্যাগ করে এতক্ষণে ওখানে পৌঁছে গেছে।’ ‘জ্বী, স্যার।’ ‘খায়রুল কবীরের বর্তমান প্রেমিকা ব্রিটিশ সিক্রেট সার্ভিসের স্ল-ীপার এজেন্ট। তার কাছ থেকে জানা গেছে পুয়ের্টো রিকোতে ঘাঁটি গেড়েছে কবীর চৌধুরী। ব্রিটিশ সিক্রেট সার্ভিস জানিয়েছে ওখানে মেয়েটা তোমার সঙ্গে দেখা করবে। রওনা হওয়ার আগে কোথায় দেখা হবে সেটা লংফেলোর কাছ থেকে জেনে নিয়ো। রানা, আশা করছি সফল হবে তুমি। সোনাগুলো আমাদের তেল বিক্রির টাকায় কেনা। ওগুলো আশা করছি উদ্ধার করতে পারবে।’ খুট করে একটা আওয়াজ হলো। রিসিভার নামিয়ে রেখেছেন রাহাত খান। * পাঁচদিন আগে লন্ডন ছেড়েছে ও, প্যান অ্যামের ফ্লাইটে পুয়ের্টো রিকো পৌঁছেছে। এখন বসে আছে লক্কড়মার্কা একটা গাড়িতে, বেড়া থেকে তিন মাইল দূরে, কোস্টাল হাইওয়ে থেকে এক হাজার গজ দূরে জঙ্গলের ভেতর একটা ফাঁকা জায়গায়। চাঁদ ওঠেনি আজ রাতে। নিশাচর পাখি আর পোকামাকড়ের কোনও আওয়াজ নেই, চারপাশ কবরের মত নীরব। দক্ষিণ-পশ্চিম থেকে হারিকেন নামের সমূহ বিপদ এগিয়ে আসছে সেটা কিভাবে যেন বুঝে ফেলেছে প্রাণীগুলো। চাঁদ ঢেকে রাখা মেঘ ছাড়া নড়ছে না কোনও কিছু। অনেক উঁচুতে ভাসছে মেঘগুলো, রং দেখে মনে হয় কারখানার নোংরা ধোঁয়া দিয়ে তৈরি। বেশিরভাগ নক্ষত্রও ঢাকা পড়েছে ওই মেঘে। দাড়ির চুলকানি অসহ্য ঠেকায় গাড়ির ফেন্ডার মিররটা ব্যবহার করে ফ্ল্যাশ লাইটের আলোয় শেভ করল রানা। সান হুয়ানের এসমারেল্ডো থেকে উনিশশো ঊনপঞ্চাশ সালের এই ভাঙাচোরা গাড়িটা কিনেছে ও। জিনিসটা এতই পুরানো যে ওর কাভারের সঙ্গে মানিয়ে গেছে চমৎকার। পুয়ের্টো রিকো অত্যন্ত জনবহুল হলেও এত পশ্চিমের এই বিরান অঞ্চলে লোক বসতি প্রায় নেই বললেই চলে। দক্ষিণে সবচেয়ে কাছের গ্রাম বলতে রিংকন, সেটাও অনেক দূরে। এলাকাটা এতই নির্জন যে কনড্যাডো, ডাইভ-ইন আর সুপারমার্কেট এদেশে আছে বলে বিশ্বাস হয় না। পাহাড়ী অঞ্চল এটা। সবুজ টিলার দেশ। ছাড়া ছাড়া ভাবে যারা এখানে বাস করে তারা এখনও ঝোপ দিয়ে তৈরি কুঁড়েতে থাকে। সারাদিনের ঘটনাগুলো একবার ঝালিয়ে নিল রানা মনে মনে, আগামীকালের ৫ ঝুঁকিগুলোর কথা ভাবছে। কালকে দেখা করার কথা খায়রুল কবীরের নতুন প্রেমিকা ডোনা ডানের সঙ্গে। সোনা কবে আসবে সেটা জানা যাবে। সম্ভবত দু’তিনদিনের মধ্যেই আসবে। সেক্ষেত্রে বলতে হয় বড় দেরি হয়ে গেল। এখন আর বাংলার গৌরবে গিয়ে সোনা উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়ার সময় নেই। সোহেলকে খবরটা জানিয়ে দিতে হবে। যা করার সোহেলই করবে। ফ্ল্যাশলাইটটা নিয়ে সরু একটা বুনো পথ ধরে লাইমস্টোনের তৈরি প্রাকৃতিক একটা ডোবার পাড়ে চলে এল রানা। টিলা থেকে নামা সরু জলধারায় পরিপূর্ণ হয়ে আছে ডোবাটা। পরিষ্কার টলটলে পানি। চারধারে হিবিসকাস, অলিন্ডার, পইনসিয়ানা আর কোকো পামগাছ দিয়ে ঘেরা। পুবের পাহাড়ে জন্মেছে বুনো কলা আর স্ট্রবেরি। দক্ষিণে মায়াহুয়ারেজের দিকে সরু সৈকতরেখায় আছে ঘন আখের জঙ্গল। পুয়ের্টো রিকোর জমি উর্বর, প্রাকৃতিক সম্পদের অভাব নেই, কিন্তু তার সদ্ব্যবহার হয় না। অনেকটা বাংলাদেশের মতই অবস্থা। চাইলে অনেক কিছুই করা সম্ভব, কিন্তু অব্যবস্থাপনার কারণে কিছুই হচ্ছে না। দেশে উপযুক্ত নেতৃত্বের অভাবই এর মূল কারণ। জামাকাপড় খুলে একটা বাটারফ্লাই গাছের গোড়ায় রাখল রানা, ফ্ল্যাশলাইটটা একটা পাথরের ওপর নামিয়ে রেখে নেমে পড়ল প্রাকৃতিক সুইমিং পুলে। ঈষৎ উষ্ণ পানির পরশে মনে হলো নরম ভেলভেট শরীরকে জড়িয়ে ধরেছে। ইচ্ছে মত সাবান মাখল ও, তারপর ডুব দিল কয়েকবার। শেষে আয়েস করে পাথরে হেলান দিয়ে বসল। সারা শরীর পানির তলায়, শুধু মাথাটা জেগে আছে। এখন যদি অস্ট্রেলিয়ান লোকটা রানাকে দেখত তাহলে বিস্ময়ে চোখ কপালে উঠত তার। দ্বিতীয়বার তাকে ভাবতে হত বিকেলে কি পরিমাণ ঝুঁকি নিয়েছে চিতাবাঘের মত ক্ষিপ্র যুবককে নিয়ে বিপজ্জনক খেলা করতে গিয়ে। রানার প্রতিটা নড়াচড়ায় সাবলীল পৌরুষদীপ্ত ছন্দ। দীর্ঘ সময় নিয়ে গোসল করল রানা। গোসল শেষে সন্তুষ্ট মনে ফিরে গেল গাড়িটার কাছে। মনটা ফুরফুর করছে, হালকা শিস দিচ্ছে ও। ওর লড়ঝড়ে গাড়িটায় একটা জিনিস একেবারেই বেমানান। পেছনের সীটের নিচে একটা ফল্স্ কম্পার্টমেন্ট তৈরি করা হয়েছে স্থানীয় বিসিআই কন্ট্যাক্টের সহায়তায়। খুব তাড়াহুড়োয় তৈরি হলেও পেশাদার কারও পক্ষেও কম্পার্টমেন্টটা খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা কম। ড্যাশবোর্ড থেকে একটা স্লঙঊু ড্রাইভার নিয়ে ফ্ল্যাশলাইটের আলোয় সীট উঁচিয়ে একটা স্লঙঊু খুলল রানা। লম্বা গর্তটায় একসঙ্গে অনেক কিছু ঠাঁই পেয়েছে। নতুন একটা ডেনিম জিন্সের প্যান্ট আর স্পোর্ট শার্ট পরে নিয়ে সবকিছু একবার চেক করল ও। সন্তুষ্ট হয়ে পায়ে গলাল একটা স্যান্ডেল। ডিমান্ড রেগুলেটর সহ দুই টিউবের একটা অ্যাকুয়ালাং, মাস্ক, বড় দুটো ফ্লিপার, দুইশো অ্যাটমসফিয়ার প্রেশারের দুটো বাতাস ভরা ট্যাঙ্কÑএকটা ডোনা ডানের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার, অন্যটা ফেরার জন্য। কম্পাস, ক্যামেরা, ঘড়ি, ওয়েইট বেল্ট, ছুরি, ডাইভারের অন্যান্য টূল, একটা শক্তিশালী ট্র্যান্সমিটারÑযা যা দরকার তার সবই আছে। সঙ্গে করে ওয়ালথার পি.পি.কে. নিয়ে আসেনি ও। স্টিলেটোটাও নেই। ধরা পড়লে একজন বীচ খেউমার কাছে ওগুলো থাকার কোনও যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করা যাবে না। ওগুলো না এনে ভালই হয়েছে। তবে নিজেকে অরক্ষিত মনে হচ্ছে অস্ত্রগুলো সঙ্গে না থাকায়। কম্পার্টমেন্ট থেকে ভয়ঙ্করদর্শন একটা ম্যাশেটি বের করে কিছুক্ষণ ওটার দিকে চেয়ে থাকল রানা। বিপজ্জনক একটা জিনিস, প্রায় কাটলাসের সমান দীর্ঘ। ফলার একদিক এতই তীক্ষèধার যে এক কোপে মানুষের কল-া নামিয়ে দেয়া যাবে। একপাশে ম্যাশেটিটা নামিয়ে রাখল ও। আজকে একবার ভেবেছিল সৈকতে যাবার সময় ওটা সঙ্গে নেবে। পরে কি ভেবে নেয়নি। না নেয়াটা ভাল হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ান খুনীটা সন্দেহ করে বসতে পারত। সেক্ষেত্রে সহজে তার হাত থেকে ছাড়া পাওয়া মুশকিল হত। আপাতত কবীর চৌধুরীর আস্তানায় হানা দেয়ার কোনও ইচ্ছে ওর নেই। আগে ডোনা ডানের সঙ্গে দেখা করে সে কি তথ্য সাপ-াই দিতে চায় তা জানতে হবে, তারপর অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা। প-াস্টিকে মোড়া ছোট একটা চৌকো বাক্স বের করে সীটটা আবার নামিয়ে রাখল রানা। বাক্সটা ওর রাতের খাবার। বীন আর দুটো স্যান্ডউইচ। সঙ্গে করে স্কচ হুইস্কির ছোট দুটো বোতলও নিয়ে এসেছে ও। আস্তে ধীরে খাওয়া সারল রানা, খাওয়া শেষে হাত-মুখ ধুয়ে আরাম করে একটা সিগারেট ধরাল, কষে টান দিয়ে একরাশ ধোঁয়া ছাড়ল। জানে ঝুঁকি নেয়া হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু রাস্তা থেকে ও এত দূরে আছে যে সিগারেটের ধোঁয়ার গন্ধ কারও নাকে যাবার কথা নয়। জঙ্গলের ভেতর আপাতত নিজেকে নিরাপদ মনে করছে ও। অনুভূতি ওকে সতর্ক করছে না। আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকাল। দৈত্যাকার পাহাড় আকৃতির মেঘগুলো দ্রুতগতিতে ছুটে চলেছে। বাতাসের বেগও বেড়েছে। গাছের পাতায় শিরশিরে আওয়াজ তুলে বয়ে যাচ্ছে অবিরাম। ঘুমানোর আগে গ-াভ্স্ কম্পার্টমেন্ট থেকে একটা কোঁচকানো রোড ম্যাপ বের করল ও। কাগজটার ভাঁজে পেঁয়াজের খোসার মত পাতলা কাগজে ছোট একটা চার্ট আছে। ফ্ল্যাশলাইটের আলোয় অনেকক্ষণ ধরে চার্টটা দেখল রানা, মাঝে মাঝে পেন্সিল দিয়ে মন্তব্য লিখল পাশে। কাজটা শেষ করে সীট নামিয়ে হেলান দিয়ে চোখ বুজল, গায়ের ওপর টেনে নিল একটা নেভি ব-্যাঙ্কেট। কালকের দিনটা অত্যন্ত ব্যস্ততায় কাটবে। শতাব্দী পুরানো একটা স্প্যানিশ গ্যালিয়নের কাছে ডোনা ডানের সঙ্গে দেখা করতে যেতে হবে ওকে। গ্যালিয়নটা সতেরোশো পনেরো সালে সবকয়জন নাবিক নিয়ে ডুবে যায়। মোনা প্যাসেজে ডুবেছিল ওটা, গ্যালোস কে থেকে তিন মাইল দূরে। দশ ফ্যাদম পানির নিচে পড়ে আছে। তার মানে ষাট ফুট নিচে। ডোনা ডানের সঙ্গে দেখা করতে নির্দেশ দিয়েছেন রাহাত খান। কারও চোখে ৬ পড়া চলবে না। কিছুতেই যেন ডোনা ডানের কাভার নষ্ট না হয়। যদি মেয়েটার ভুলে কোনও বিপদ হয় তাহলে রানা তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করবে না, সরে আসবে যত দ্রুত সম্ভব। হাসল রানা, রাহাত খান ভাল করেই জানেন পরিস্থিতি অমন হলে বসের নির্দেশ মানবে না ও। ঘুমিয়ে পড়ার আগে ম্যাশেটিটা কম্বলের নিচে দেহের পাশে রাখল ও। কালকে খোলা সাগরে যেতে হবে ভাবতেই আরেকটা চিন্তা মাথায় দোলা দিল। হারিকেন আসছে সেটা আগে জানা যায়নি। পরিস্থিতি খুবই বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। মন থেকে সমস্ত চিন্তা ঝেঁটিয়ে বিদায় করল রানা, ঘুমিয়ে পড়তে দু’মিনিটও লাগল না ওর। পরদিন দুপুর ঠিক দেড়টায় অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে চারপাশটা ঘুরে দেখল রানা। কেউ ধারেকাছে আসেনি, জঙ্গলে অনুপ্রবেশের কোনও চিহ্ন নেই। প্রাণ বলতে আছে শুধু কিছু পাখি আর দূরবর্তী পাহাড়ের পাদদেশে ঘাসজমিতে চরে বেড়ানো কয়েকটা গরু। সারা সকাল ও ব্যয় করেছে প্রাচীন গাড়িটার কারবুরেটর, প-াগ আর গ্যাস লাইন পরিষ্কার করে। দু’বার স্টার্ট দিয়ে দেখেছে, প্রবল আপত্তি জানালেও এখনও সচল আছে প্রাগৈতিহাসিক এঞ্জিন। আশা করা যায় গাড়িটা ওকে স্যান হুয়ানে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারবে। তবে আজকে যদি কপাল মন্দ হয় তাহলে কোনওদিনই আর ফিরে যাবার কথা ভাবতে হবে না ওকে। হাসল রানা, জীবনে কম ঝুঁকি তো নেয়নি ও। আজও বেঁচে আছে। একদিন ভাগ্যটা হয়তো আর সহায়তা করবে না, অথবা এমন ভুল করবে যে বাঁচার আর উপায় থাকবে না। ভাগ্য মুখ ফিরিয়ে নেবে। সেদিনটা ওর জীবনের শেষ দিন। কিন্তু মরতে তো সবাইকেই হয়। মৃত্যুই জীবনের একমাত্র স্থির সত্য। আজকে যদি মরতে হয় তাহলেও পিছিয়ে যাবার কোনও অর্থ নেই। রানা জানে, এ পেশা ও স্বেচ্ছায় কোনওদিনই ছাড়তে পারবে না। নিরাপদ জীবন ওর জন্যে নয়। রহস্য রোমাঞ্চ আর বিপদ না থাকলে ওর মনের একটা বিরাট অংশ মরে যাবে। জঙ্গলের ধারে গিয়ে দাঁড়াল রানা, সোহানার কথা ভাবছে। সোহানা দূরে চলে গেছে। রূপাও তাই। যারাই ওর জীবনে এসেছে, হৃদয়ে ছাপ রাখতে পেরেছে, তাদের কেউ ওর জীবনে স্থায়ী অবস্থান করে নেয়নি। সুলতার কথা মনে পড়ল। ওই একটা মেয়ে ওকে সত্যি বেঁধে ফেলেছিল। তারপর রেবেকা...আরও কত মানুষ। কেউ বন্ধু, কেউ বান্ধবী, কেউ প্রেমিকা। কেউই বাঁধনে জড়িয়ে আটকে রাখতে পারেনি ওকে। দীর্ঘশ্বাস ফেলল রানা, একা পথ চলাই ওর কপালের লিখন, নিয়তি। রাস্তার দিকে তাকাল। আজকে সামান্য ট্র্যাফিক আছে। পনেরো মিনিটে দুটো গাড়ি যেতে দেখল। এতক্ষণে রেডিওতে হারিকেনের পূর্বাভাষ প্রচারিত হয়ে যাবার কথা। ট্যুরিস্টরা হোটেলের ধারকাছ থেকে নড়বে না। আদিবাসীরা দরজা জানালা বোর্ড দিয়ে আটকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাবে। দুটোর সময় জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এল ও, সড়ক পার হয়ে সৈকতে চলে এল। সাগরের শান্ত পানি দেখে বোঝা যায় না ভয়ঙ্কর হারিকেন আসনড়ব। তবে মোনা প্যাসেজের পানির রং বদলে গেছে। আকাশও তার রং পাল্টেছে। সব এখন গাঢ় ধূসর। কালো মেঘের আড়ালে সূর্যটা সম্পূর্ণ ঢাকা পড়েছে, কোথায় আছে বোঝা যাচ্ছে না। কালকের চেয়ে বাতাস বেড়েছে, সৈকতের জায়গায় জায়গায় পাক খেয়ে উড়ছে ধুলোর ঘূর্ণি। কোকো পামগুলোর মাথা বার বার নুইয়ে দিচ্ছে দমকা বাতাস। রানার হাতে ছোটখাট টর্পেডোর মত গোল একটা জিনিস, লম্বায় তিন ফুট আর ব্যাস এক ফুট। এক মাথায় ধরার জন্যে দুটো গ্রিপ আছে, অন্যমাথায় ছোট একটা প্রপেলার। জিনিসটা আসলে টর্পেডোর ঠিক উল্টো বলা চলে। ওজন ঠেলে এগিয়ে যাওয়ার বদলে এটা ওজন টেনে নিয়ে যায়। ব্যাটারিচালিত। খুদে সী স্কুটারটা গাড়ির তলায় স্লঙঊু দিয়ে আটকানো ছিল। এটার সাহায্য নিয়ে ডুবে যাওয়া এল কংকুইসটেডরের ধ্বংসাবশেষের কাছে পৌঁছোতে চায় রানা। শক্তি ব্যয় করতে ও রাজি নয়, ওখানে যেকোন ধরনের বিপদ মোকাবিলা করার জন্যে শারীরিক ভাবে সম্পূর্ণ ফিট থাকা প্রয়োজন। অল্প পানি ভেঙে গভীর পানিতে চলে এল রানা, ডুব দেয়ার পর মোটামুটি নিশ্চিন্ত বোধ করল। স্কুবা ডাইভারের পোশাক পরা অবস্থায় কারও চোখে পড়ে গেলে তার মনে নানা প্রশেড়বর উদয় হওয়া স্বাভাবিক। চার্টটা স্মৃতিতে গেঁথে নিয়ে পুড়িয়ে ফেলেছে রানা। এখন কম্পাসের ওপর চোখ রেখে এগিয়ে চলেছে পানির তলা দিয়ে। সাগরের এক মাইল বা তার কিছু বেশি দূরে ডুবেছিল এল কংকুইসটেডর, পশ্চিম দিক থেকে বড়জোর এক পয়েন্ট উত্তরে। বোতামে চাপ দিয়ে সী স্কুটারের প্রপেলার চালু করল রানা, স্কুটারের হ্যান্ডেল শক্ত করে ধরে রেখেছে। পানির দশ ফুট নিচ দিয়ে ওকে টেনে নিয়ে চলল স্কুটার। যতক্ষণ সম্ভব কম গভীরতায় থাকতে চাইছে ও বাতাস বাঁচানোর জন্যে। তারপরও গন্তব্যে পৌঁছোনোর পর সিলিন্ডারে খুব বেশি বাতাস থাকবে না। ফিরে আসার সময় সম্ভবত রিজার্ভ বাতাসের ওপর নির্ভর করতে হবে ওকে। খুব সামান্য পানিই আলোড়িত করছে স্কুটারের প্রপেলার, তবুও মাছের দল আকৃষ্ট হলো। বিরাট একটা গ্র“পার ওর পেছন পেছন আসতে শুরু করল। কোরালের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় রং বদল করে ছদ্মবেশ ধরল ওটা। রামধনুর মত সাতরঙা ছোট মাছের ঝাঁকের মাঝ দিয়ে এগিয়ে চলেছে রানা। ওকে এগোতে দেখে লাল নীল হলুদ সবুজ কমলা বেগুনী নানা রঙের ঝিলিক তুলে ছিটকে সরে পথ করে দিচ্ছে মাছগুলো। দশ মিনিট পর চারটে দীর্ঘ ছায়া নজর কাড়ল ওর। একটু লক্ষ করতেই বুঝতে পারল ওগুলো কি। ব্যারাকুডা! একসঙ্গে চারটে। অস্বাভাবিক একটা ব্যাপার। সবকিছুতে নাক গলানো ব্যারাকুডার বদ-অভ্যেস, কৌতূহল মেটার আগে পর্যন্ত পিছ ছাড়বে না ওগুলো। দেখতে যতটা কুৎসিত আসলে ততটা হিংস্র নয় ব্যারাকুডা। আপাতত বিপদের আশঙ্কা করছে না রানা। তবে নিশ্চিন্তও বোধ ৭ করতে পারছে না। গ্র“পারটাকে যদি ব্যারাকুডাগুলো আক্রমণ করে বসে তাহলে পানিতে রক্ত ছড়িয়ে পড়বে। এদিকের সাগরে রক্ত মানেই হাঙরের আগমন। নাগালের মধ্যে যা পাবে সেটাই আক্রমণ করবে হাঙরের পাল। একটানা এগিয়ে চলেছে রানা। সঙ্গীদের চেয়ে সাহসী একটা ব্যারাকুডা ওর পাশে চলে এল, অ্যালিগেটরের মত চোয়াল খুলে বন্ধ করে চোখ ঘুরিয়ে দেখল রানাকে, এগিয়ে চলেছে সমান গতিতে। ওটার সুচের মত তীক্ষè দাঁতের সারি স্পষ্ট দেখতে পেল রানা, পাত্তা দিল না, তবে ছুরিটা খাপ থেকে বের করে ডানহাতে ধরে রাখল। বিড়বিড় করে বলল, ‘চলে যা, আমি তোকে বিরক্ত করছি না, তুইও করিস না।’ বুঝতে পারছে চারটে মাছ যদি একসঙ্গে হামলা করে বসে তাহলে এই ছুরি দিয়ে কিছুই করতে পারবে না ও। গভীরতা বাড়িয়ে ব্যারাকুডাগুলোকে খসানোর চেষ্টা করল রানা, কোরালের মাঝ দিয়ে একটা ক্যানিয়ন ধরে এগোল, চোখ কম্পাসের ওপর। ক্যানিয়ন থেকে যখন বের হলো তখন গ্র“পারটা চলে গেছে, ছোট মাছগুলোও নেই, কিন্তু ব্যারাকুডার দল ঠিকই অনুসরণ করছে পঞ্চাশ গজ দূর থেকে। ভাব দেখে মনে হলো না ওগুলোর কোনও বদ মতলব আছে। বড় মাছের শিকার কোনও ছোট মাছ রানার চোখে পড়ল না। একটাও টারপন, বনিটো বা øূক নেই, অথচ মোনা প্যাসেজে ওগুলোর ভিড় থাকার কথা। ওপরের সাগর অশান্ত হলেও নিচে পানি একেবারেই শান্ত, কাঁচের মত পরিষ্কার। বাতাস কম খরচ করার জন্যে আবার দশ ফুট গভীরতায় ফিরে এলো রানা, আরেকটু হলেই একটা স্টিং রে’র সঙ্গে ধাক্কা লেগে যেত। ওড়ার ভঙ্গিতে দ্রুত গতিতে চলে গেল ওটা। কোরালের একটা ঘন ঝাড় সামনে পড়ায় দিক বদলাতে হলো রানাকে। ওটার গায়ে সী ফ্যান আর স্পঞ্জ জন্মেছে। ওগুলোকে পাশ কাটিয়ে এগোল রানা। মাস্কের ভেতর খানিকটা পানি ঢুকে পড়ায় সামনেটা ভাল দেখা যাচ্ছে না। চিৎ হয়ে জোরে জোরে শ্বাস ফেলে পানিটুকু বের করে দিল ও। আবার যখন পেছনে তাকাল, দেখল এখন মাত্র দুটো ব্যারাকুডা ওকে অনুসরণ করছে। কিছুটা নিশ্চিন্ত বোধ করল রানা। ডোনা ডানের দেয়া তথ্য অনুযায়ী এল কংকুইসটেডর আর বেশি দূরে নেই। চায়ের পেয়ালা আকৃতির একটা বেসিনের মাঝখানে শুয়ে আছে জাহাজটা। রীফের কারণে মাত্র ষাট ফুট গভীরে ডুবেছে। পেয়ালার মাঝখানে থাকার কারণেই সম্ভবত এতদিন পরেও ওটার কাঠের তৈরি খোল মোটামুটি অক্ষত। খুব বেশি কিছু আশা করছে না রানা, ওটাকে জাহাজ হিসেবে চেনা সহজ হবে বলেও ভাবছে না। শত বছরের ঝড়, সামুদ্রিক আগাছা আর পোকা এতদিনে তাদের ছাপ রেখেছে নিশ্চয়ই। খোলের আবছা একটা আকৃতি থাকবে বড়জোর, হয়তো থাকবে দুয়েকটা প্রবাল ছাওয়া কামান, এর বেশি কিছু নয়। তাতে রানার কিছু আসে যায় না, ও এখানে সোনা ভরা স্প্যানিশ গ্যালিয়নের খোঁজে আসেনি, এসেছে ডোনা ডানের সঙ্গে দেখা করতে। ডোনা ডান একটা নোট বই দেবে ওকে। তাতে লেখা থাকার কথা বাংলাদেশী তেল বিক্রির দুই বিলিয়ন ডলার সোনার হদিস। অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নিতে হবে তারপর। বারবার কম্পাস আর ঘড়ি দেখছে রানা। সামনে খুব কাছেই কোথাও আছে জাহাজটা। একবার পেছনে ফিরে তাকাল, এখনও অনুসরণ করছে ব্যারাকুডা দুটো। সামনে মুখ ফেরাতেই দেখতে পেল এল কংকুইসটেডরকে। ওর ঠিক নিচেই কোরালের মাঝ থেকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে কাঠের একটা মাস্তুল। ও যা ভেবেছিল তার চেয়ে অনেক ভাল অবস্থায় আছে জাহাজটা। ওটার বো আর বুলওয়ার্ক দেখতে পেল। পেছনে যেখানে মিযেন থাকার কথা সেখানে এখনও অক্ষত আছে পূপ কেবিন। ব্যাপারটা অস্বাভাবিক। খুবই অস্বাভাবিক। জাহাজের ডেক এবং অন্যান্য অংশ ঢাকা পড়েছে সাদা বালিতে। আরও নিচে নেমে জাহাজটা পরীক্ষা করার আগে পাঁচ ফুট গভীরতায় উঠে এলো রানা, কোনও নৌকোর তলদেশের ছায়া আছে কিনা দেখতে চায়। ডোনা ডান নিশ্চয়ই গ্যালোস কে থেকে তিন মাইল সাঁতরে আসবে না। নৌকোর চিহ্নমাত্র নেই। ঘড়ির দিকে তাকাল রানা। রঁদিভুর আরও পনেরো মিনিট বাকি আছে। এল কংকুইসটাডরের কঙ্কালের কাছে নেমে এলো রানা, আরেকবার পেছন ফিরে তাকাল। ব্যারাকুডা দুটো এখনও আছে, ছয়ফুট লম্বা, সাপের মত কিলবিলে দেহ। বারবার চোয়াল খুলে বন্ধ করে ক্ষুরের মত দাঁতগুলো কিড়মিড় করছে। ডোনা ডানকে পানিতে হঠাৎ করে নামতে দেখে ঘাবড়ে গিয়ে আক্রমণ না করে বসে ব্যাটারা। হামলা করলে মহিলাকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে হবে ওকে। আর তার মানেই রক্ত। একবার এদিকের সাগরে রক্তের গন্ধ পেলে দলে দলে হাজির হবে ক্ষুধার্ত হাঙর। ভাবনাটা রানার পছন্দ হলো না। নিজের ওপর বিরক্ত হলো রানা, পানির নিচে ডুবুরিদের প্রায়ই মানসিক চাপের মুখোমুখি হতে হয়। ওর সেটা জানা আছে, অথচ অপেক্ষা করতে গিয়ে নিজের অজান্তেই নার্ভাস হয়ে পড়ছে। মিশন সফল করতে হলে এধরনের অস্থিরতা মোটেই কাম্য নয়। স্কুটারটার মটর বন্ধ হয়ে গেল। ব্যাটারি শেষ। বড় বড় ফ্লিপারগুলো নেড়ে ষাট ফুট গভীরে ডুবন্ত জাহাজের ধ্বংসাবশেষের কাছে চলে এলো রানা, টের পেল কানের পর্দার ওপর পানির চাপ বেড়ে গেছে। সতেরোশো পনেরো সাল থেকে টিকে আছে পূপ কেবিন, স্টার্ন পার হয়ে সরাসরি সেটার দিকে এগোল। কাছে যেতেই বুঝতে পারল পূপ কেবিনটা টিকে থাকা মোটেই অস্বাভাবিক কোনও ঘটনা নয়, পানির তলায় যতড়ব করে কেউ একজন মেরামত করেছে ওটা। পূপ কেবিন আর জাহাজের ডেকের প্রতিটা কোনা স্টীলের বার দিয়ে মজবুত করা হয়েছে। কিছু কিছু প-্যাঙ্ক আর বোর্ড আসল নয়, অ্যাল্যুমিনিয়ামের তৈরি, কাঠের রং করা। লম্বা লম্বা স্টীলের বীম সাগরের গভীরে পুঁতে কেবিনটাকে ঠেকা দেয়া হয়েছে যাতে ধসে না পড়ে। চারপাশে তাকিয়ে ভাল করে দেখল রানা। একটা রীফের ওপরে গামলা মত জায়গায় বসে আছে জাহাজটা। প্রাকৃতিক ভাবেই কিছুটা রক্ষা পেয়েছে, কিন্তু আসলে এখনও টিকে আছে শুধু স্টীলের বীমগুলোর কারণে। মাস্কের তলায় ভ্রƒ কুঁচকে গেল রানার। ডোনা ডান হয়তো ৮ জাহাজটার ব্যাপারে কিছু জানাবে ওকে। ব্রীফিং ছাড়াই বলতে গেলে আসতে হয়েছে ওকে, কাজেই রওনা হবার কিছু আগে জাহাজটার কথা শুনেছে। এব্যাপারে ওকে কিছু জানানো হয়নি। পূপ কেবিন যেখানে শেষ হয়েছে সেখানে হাজির হলো রানা। কিছু নেই। দশ ফুট নিচে কাদার নিচে চাপা পড়েছে হাল্কের আকৃতি। পুরানো কামান গোলাকার মুখটা হাঁ করে চেয়ে আছে ওর দিকে। এবড়োখেবড়ো একটা গোলক দেখতে পেল, পড়ে আছে কামানের পাশে। এক সময় ওটা বোধহয় কামানের গোলা ছিল। পূপ কেবিনটাকে শক্ত করে ধরে রাখা স্টীলের বীমগুলো পরখ করে দেখল রানা। ফ্ল্যাশ লাইটের আলোয় দেখল বীমের গায়ে খোদাই করা আছে, কে. বি. দুই হাজার দুই। কবীর চৌধুরী? পাগল বিজ্ঞানী বা অন্য কেউ কেন এল কংকুইসটেডরের মত একটা ধ্বংসপ্রাপ্ত জাহাজ সংস্কার করবে সেটা ওর মাথায় ঢুকল না। সিনেমা? কোনও সিনেমার শূটিং করা হয়েছে এখানে? না। তেমন কিছু হলে ব্রিটিশ সিক্রেট সার্ভিস ওকে জানাত। এবার স্টীলের দরজাটা দেখতে পেল রানা। প্রকাণ্ড একটা দরজা, আধখোলা। নতুন তৈরি। সামনে বেড়ে রানা দেখল ভারী দরজাটাকে ধরে রাখার জন্যে স্টীল দিয়ে নতুন একটা আকৃতি দাঁড় করানো হয়েছে। মোটা একটা অব্যবহৃত শেকল আর তালা ঝুলছে দরজার একটা কড়ায়। অন্ধকার কেবিনের ভেতর ঢুকে ফ্ল্যাশ লাইট জ্বালল রানা, মনে মনে ভাবছে এখন একটা অক্টোপাস বা জায়ান্ট স্কুইড ভেতরে থাকলে ষোলো কলা পূর্ণ হয়। কিছুই নেই কেবিনের ভেতরে। ষোলো ফুট বাই ষোলো ফুট আকৃতির ফাঁকা কেবিন খাঁ-খাঁ করছে। কেবিনের ভেতর একটা চক্কর মারল রানা। কেবিনটা স্টীলের বার দিয়ে ভেতর থেকেও মজবুত করা হয়েছে। ভ্রƒর কুঞ্চন আরও বাড়ল রানার। এতকিছু যে করেছে সে কেবিনটা খালি ফেলে রেখেছে কেন? মূল্যবান কিছু নিশ্চয়ই ছিল এখানে, অথবা মূল্যবান কিছু রাখার জন্যে জায়গাটাকে ব্যবহার করা হবে। কেবিন থেকে বেরিয়ে ওপরে তাকাতেই রানা বুঝতে পারল এখন আর ও একা নয়, মহিলা স্ল-ীপার এজেন্ট হাজির হয়েছে। ছোট একটা ক্যাটাম্যারানের জোড়া খোল দেখা যাচ্ছে ছায়া ছায়া মত, দুলছে ঢেউয়ের দোলায়। কাজটা দ্রুত সেরে নিতে চাইছে রানা, মন বলছে এখানে বেশিক্ষণ থাকা মোটেই নিরাপদ হবে না। মহিলা এখনও পানিতে নামেনি। ব্যারাকুডা দুটোকে দেখতে পেল রানা, চুপচাপ ওকে লক্ষ করছে, প্রায় অনড়, শুধু মাঝে মাঝে ফিনগুলো নাড়ছে। সাগরে নেমেছে ডোনা ডান, তাকে ঘিরে রুপোলি বুদ্বুদ ঘুরপাক খেয়ে ওপরের দিকে উঠছে। অপেক্ষা করছে রানা, খেয়াল করল মেয়েটা মাত্র একটা বাতাসের ট্যাঙ্ক নিয়ে নেমেছে। বেশিক্ষণ তার পানির নিচে থাকার ইচ্ছে নেই, রানার হাতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েই ফিরে যাবে। রানাকে দেখতে পেয়েছে ডোনা ডান, সাবলীল গতিতে এগিয়ে আসছে। দ্রুত নড়ছে সুগঠিত পা দুটো। পানির তলায় দেখে মনে হচ্ছে বাতাসে উড়ছে তার দীর্ঘ সোনালী চুল। একটা বিকিনি পরনে, তাতে যৌবনের উচ্ছ্বাস মোটেও ঢাকা থাকেনি। সরু কোমর, সুউনড়বত বুক, মাস্কের কারণে চেহারাটা দেখা যাচ্ছে না, তবে খায়রুল কবীরের রুচির ওপর আস্থা আছে রানার। প্রেমিকা হিসেবে বেছে নিয়েছে যখন, মেয়েটা অপূর্ব সুন্দরীই হবে। নিজের ওপর বিরক্ত বোধ করল রানা, এখানে ও মেয়েটার সৌন্দর্য বিচার করতে আসেনি। রানার গভীরতায় নেমে এসে মুখোমুখি হলো ডোনা ডান, মাস্কের মাঝ দিয়ে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। মেয়েটার এক হাতে ছোট একটা বর্শা, অন্য হাতে ওয়াটারপ্রƒফিঙে মোড়া বই মত কি যেন একটা। পানিতে একটা প্রশড়ববোধক চিহ্ন আঁকল ডোনা ডান। বুকে তিনবার টোকা দিয়ে জবাব দিল রানা, তারপর ঘড়ি দেখাল। দ্রুত শেষ হয়ে আসছে ওর প্রথম সিলিন্ডারের বাতাস। বুঝতে পেরেছে, আস্তে করে মাথা দোলাল ডোনা ডান, আরও এগিয়ে এসে ওয়াটারপ্রƒফিঙে মোড়া জিনিসটা রানার হাতে দিল। ওটা ট্রাঙ্কের ভেতর গুঁজে রাখল রানা। এবার হাতের বর্শাটা দিয়ে ওপরে খোঁচা মারার ভঙ্গি করল ডোনা ডান। কি যেন বলতে চাইছে মেয়েটা, মাস্কের ভেতর দিয়ে দাঁত দেখা গেল। বারবার মুখ নেড়ে ইশারা করছে। মাথা নাড়ল রানা, বুঝতে পারছে না। অধৈর্য হয়ে উঠেছে ডোনা, বর্শাটা ওপরে তুলে কি যেন বলছে, বোঝা যাচ্ছে না কিছু। আবার মাথা নাড়ল রানা, ঘড়ির দিকে ইশারা করল। যতটা সময় থাকার কথা ছিল তার চেয়ে বেশিই এখানে থেকেছে ও, এবার রওনা হতে হবে। আসলেই দেরি হয়ে গেছে। পানির সামান্য ওপরে এসে থেমেছে একটা ছোট হেলিকপ্টার, ওটার রোটরের বাতাসের ঝাপটায় ওপরের অশান্ত পানি আরও অশান্ত হয়ে উঠল। ঝপ করে নামল একজন ফ্রগম্যান, সোজা ওদের দিকে আসছে। প্রমাদ গুনল রানা, নিরস্ত্র অবস্থায় কিছুই করার নেই ওর। একটা স্টীলের বীমে হাত রেখে লোকটাকে এগিয়ে আসতে দেখছে ডোনা বিস্ফারিত চোখে। মনে হলো ভয়ে অবশ হয়ে গেছে মেয়েটা, অবশ্য সামলে উঠল দ্রুত, হাতের ইশারায় রানার কাছে দেয়া বইটা দেখিয়ে বার বার হাত নাড়ল, রানাকে সরে যেতে বলছে। পায়ের সঙ্গে আটকানো খাপ থেকে ছোরাটা টেনে বের করল রানা, ডোনা ডানের সামনে এসে তাকে আড়াল করে দাঁড়াল। ইশারা করল পূপ কেবিনটার দিকে, ডোনা ডান বুঝতে পারল না। বর্শাটা সামনে বাগিয়ে ধরেছে আÍরক্ষার ৯ জন্যে। ফ্লিপার নেড়ে দ্রুত ওদের দিকে এগিয়ে আসছে কালো রাবারের সুট পরা ফ্রগম্যান। অনেক দেরিতে দেখল রানা লোকটার হাতের স্পিয়ার গান। মাস্কের তলায় খুনের আনন্দে জ্বলজ্বল করছে তার চোখ। ছয়ফুট দূরে পয়েন্ট ব-্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে ট্রিগারে চাপ দিল সে। নিঃশব্দে পানি কেটে ছুটে এলো শক্তিশালী সি ও টু। ঠিক সে মুহূর্তে ডোনা ডান শরীর মুচড়ে চলে এলো রানার সামনে। বর্শাটা বাম বুকে গাঁথল তার, পিঠ দিয়ে বেরিয়ে গেল ফলা। পানিতে পাক খেয়ে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল তাজা রক্ত, আস্তে আস্তে মিশে যাচ্ছে নীল পানির সঙ্গে। মৃত্যু যন্ত্রণায় মাস্কটা টান দিয়ে খুলে ফেলল ডোনা, চকিতে রানা দেখতে পেল অপূর্ব সুন্দর চেহারাটা। কিছুই করার নেই ওর, মেয়েটা মরে যাচ্ছে চোখের সামনে। ডোনার অবশ হাত থেকে বর্শাটা নিল রানা, ডোনার কথা আর ভাবছে না। দ্রুত কিছু একটা করতে হবে, ভাগ্যও ভাল থাকতে হবে, নইলে শীঘ্রি ডোনা ডানের পরিণতি হবে ওরও। পেছনে হটে গেছে ফ্রগম্যান, রিলোড করে নিয়ে আবার সামনে বাড়ল। সাবলীল গতি দেখে মনে হলো কালো একটা হাঙর। স্পিয়ার গানটা এবার দু’হাতে ধরেছে লোকটা, যাতে কোনমতেই মিস না হয়। মারা গেছে ডোনা ডান, কিন্তু রানাকে বাঁচাতে এখনও ভূমিকা রাখতে পারবে। যুবতীর পেছনে সরে এলো রানা, গায়ের জোরে মেয়েটাকে ফ্রগম্যানের দিকে ঠেলল। দেরিতে ট্রিগার টেনেছে ফ্রগম্যান, বুদ্বুদ তুলে ছুটে এলো বর্শাটা, ঘ্যাঁচ করে বিঁধল ডোনার পেটে। রক্তের গন্ধে যদি নাও হয় তবু স্পিয়ার গানের শকওয়েভের কারণে শীঘ্রি হাজির হবে হাঙরের দল। রানাকে পাশ কাটাল ফ্রগম্যান, রিলোড করছে স্পিয়ার গান। বর্শা হাতে তাকে অনুসরণ করল রানা, সমস্ত শক্তি দিয়ে পা নাড়ছে গতি বাড়ানোর জন্যে। হাতের কাছে পেয়ে লোকটার একটা ফ্লিপার আঁকড়ে ধরল। রানা কাছে চলে এসেছে বুঝতে পেরেই স্পিয়ার গানটা রিলোড করার চেষ্টা বাদ দিল ফ্রগম্যান, হাত থেকে পিস্তলটা ফেলে দিয়ে এক টানে কোমরের বেল্ট থেকে বের করে আনল একটা চকচকে ধারাল ছোরা, ঘুরতে চেষ্টা করল, রানার মুখোমুখি হতে চায়। টান দিয়ে তার দুটো ফ্লিপারই খুলে নিল রানা, ভারসাম্য হারানো লোকটার আরও কাছে যেতে চেষ্টা করছে। ছোরা চালাল ফ্রগম্যান, কাঁধে ইস্পাতের স্পর্শ পেল রানা, হাতের ঝাপটায় নিচে নামল, বর্শাটা বিঁধিয়ে দিল ফ্রগম্যানের পাঁজরের হাড়ের নিচে। হাতের চাপ বাড়াল। পড়পড় করে মাংসের ভেতর ঢুকছে চোখা ফলাটা। চাপ আরও বাড়াল রানা, পিঠ দিয়ে বের হলো বর্শার ফলা। পিঠ আর বুক, দু’দিক থেকে রক্ত বের হচ্ছে ফ্রগম্যানের, মিশে যাচ্ছে পানির সঙ্গে। শরীর মোচড়াল লোকটা, দু’হাতে বুক খামচে বর্শাটা বের করার চেষ্টা করল। চোখের কোণে দেখতে পেল রানা, ব্যারাকুডা দুটো দশ ফুট দূরত্বে চলে এসেছে, চোয়াল খুলছে বারবার, উত্তেজনায় ঘনঘন নাড়ছে ডর্সাল ফিন। পরিষ্কার পানিতে সরে যাওয়া দরকার। পূপ কেবিনের দিকে এগোল রানা। ডোনা ডানের দেহটা হাতের কাছে ভাসতে দেখে চিবুক ধরে সঙ্গে নিয়ে চলল। ফ্রগম্যানও বাদ গেল না। দুটো দেহই কেবিনের ভেতর ঢোকাল রানা, আলো জ্বালল। কেবিনের ভেতরে ভুতুড়ে লাগল দুই ব্যাটারির টর্চের আলো। মাস্ক খুলে দ্রুত হাতে ফ্রগম্যানের ছবি তুলে নিল ও, কাজটা সেরে বেরিয়ে এলো কেবিন থেকে। ধক করে উঠল ওর বুকটা। হাঙরের দল হাজির হয়েছে। প্রথম দর্শনে ছয়টা গুনল রানা, ওর বাতাসের ট্যাঙ্ক খালি হয়ে গেছে, রিজার্ভের সুইচ অন করল। শীঘ্রি এই কসাইখানা থেকে সরে পড়তে হবে ওকে। ব্যারাকুডাগুলো হাঙর আসায় চটে গেছে, হঠাৎ করেই একটা হাঙরকে আক্রমণ করে বসল দুটো মিলে। দশ ফুট একটা টাইগার শার্ক যোগ দিল তাদের সঙ্গে, ব্যারাকুডা দুটোকে আক্রমণ করল। এল কংকুইসটেডরের চারপাশের পানি খয়েরী হয়ে উঠছে। ওপরের দিকে তাকাল রানা। হেলিকপ্টারের ছায়াটা দূরে সরে যাচ্ছে। পানির ওপরে সেই আলোড়নও নেই। পাইলট বোধহয় রক্ত দেখে সাহায্য আনতে গেছে। কাছেই গ্যালোস কে। ওখানে কবীর চৌধুরীর লোক থাকবে। হাতে আর সময় নেই। একটা স্টীল বীমের পাশে দাঁড়িয়ে চারদিকটা দেখল রানা। চারটে হাঙর লড়াইতে অংশ নেয়নি। ওগুলো পূপ কেবিনের দরজার কাছে ভাসতে থাকা অদ্ভুত খাবারের দিকে কৌতূহলী চোখে তাকাচ্ছে। পনেরো ফুট দীর্ঘ একটা হ্যামারহেড রানাকে পাশ কাটিয়ে কেবিনের দরজার কাছে থেমে দাঁড়াল, তারপর কি ভেবে সরে গেল দূরে। বাকি তিনটে রানাকে ঘিরে চক্কর মারছে। রানার প্রথম ট্যাঙ্কের রিজার্ভ শেষ হয়ে গেছে। দ্বিতীয় ট্যাঙ্কের সুইচ অন করল ও। ভাবছে কি করবে। পূপ কেবিনের ভেতরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দিলে বাতাস শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিপদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে, তবে এটা স্থায়ী কোনও সমাধান হলো না। একটু পরেই আরও লোক নিয়ে ফিরে আসবে হেলিকপ্টার। এবার হয়তো সঙ্গে কোনও বোটও আসবে। ওকে খুন করতে চেষ্টা করতে হবে না ওদের, কেবিনের বাইরে অপেক্ষা করলেই চলবে, বাতাস শেষ হয়ে গেলে এমনিতেই দম আটকে মারা যাবে ও। ডোনা ডানের দেহটা কেবিনের দরজার কাছে চলে এসেছে। ওটার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল রানা কি করতে হবে ওকে। ফিরে চলল ও কেবিনের দিকে। ফ্রগম্যান আর ডোনার দেহ দুটো ঠেলে দিল বাইরে। ওকে পাশ কাটাল একটা ব্যারাকুডার অর্ধেক শরীর। অন্যটা এখনও টাইগার শার্কের সঙ্গে লড়ছে। ওগুলোকে ঘিরে চক্কর দিচ্ছে অন্য হাঙরগুলো, হেরে যাওয়া যোদ্ধার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। অর্ধেক ব্যারাকুডার দেহের দিকে এক্সপ্রেস ট্রেনের গতিতে ছুটে এলো একটা হ্যামারহেড। খোলা চোয়ালের ভেতর ছয় সারি ক্ষুরধার দাঁত পরিষ্কার দেখতে পেল রানা। পিঠের কাছটা শিরশির করে উঠল ভয়ে। শিকারের ১০ গায়ে কামড় বসানোর সময় বিদঘুটে আওয়াজ করছে হাঙরগুলো। অস্পষ্ট, ভোঁতা আর হিংস্র। কেবিন থেকে বেরিয়ে সাঁতার কাটতে শুরু করল রানা। একবার কম্পাসের দিকে তাকাল। দক্ষিণ দিকে চলেছে। যেকোন সময় সার্চ শুরু হতে পারে। স্কুবা ডাইভারের খবর পৌঁছে গেছে ওদের কাছে। ওরা জানবে কতটা বাতাস আছে ওর। ধরে নেবে সবচেয়ে কাছের উপকূলের দিকে যাবে ও। কাছের তীর আর এক মাইল দূরে। একশো গজ সরে আসার আগে পেছনে তাকাতে সাহস পেল না ও। তারপর তাকাল যখন, দেখল কংকুইসটেডরের কাছে লাল-খয়েরী ফেনা ঘুরপাক খাচ্ছে হাঙরগুলোর তাণ্ডবে। ফোঁস করে স্বস্তির শ্বাস ফেলল। হাঙর অনুসরণ করেনি ওকে। আধ মাইল দূরে সরে এলো রানা। এখনও কোনও হাঙর আসছে না ওকে অনুসরণ করে। কবীর চৌধুরীর লোক এখনও পানিতে নামেনি। তবে বিপদ শেষ হয়নি, বাতাস খরচ করে দক্ষিণ দিকে চলেছে ও, পশ্চিমে সরছে দুই পয়েন্ট। কাছের তীরের বদলে মোনা প্যাসেজে বেরিয়ে যাবার ইচ্ছে। লোকগুলো ভাববে ও পুবে যাবে। আন্দাজ করে নেবে ওর বাতাস বেশি নেই। সার্চ করলে জাহাজটার ধ্বংসাবশেষের পুবে সার্চ করে সময় নষ্ট করবে আগে। ওর লাশটা না পেলে তখন সার্চের পরিধি বাড়াবে। ততক্ষণে কপাল ভাল থাকলে ওদের আওতার বাইরে চলে যেতে পারবে রানা। ডোনা ডানের চেহারাটা চোখের সামনে ভাসল রানার। মেয়েটা টেরও পায়নি কখন তার কাভার নষ্ট হয়ে গেছে। আজকে যা ঘটেছে তাতে বোঝা যাচ্ছে ঠাণ্ডা আর বুদ্ধিমান মাথা কাজ করছে আড়াল থেকে। কবীর চোধুরী আর খায়রুল কবীর। নোট বইটা হাত দিয়ে স্পর্শ করল রানা। মারা যাবার আগে অনেক কিছু জেনেছিল ডোনা? নোট বইটাতে কি লেখা আছে তা না জানা পর্যন্ত কিছুই বোঝার উপায় নেই। বাতাস শেষ হয়ে গেল রানার, রিজার্ভের সুইচ অন করল। এই গভীরতায় থাকলে আরও পাঁচ মিনিট অক্সিজেন পাবে ও। পাঁচ ফুট নিচ দিয়ে তীরের দিকে ঘুরপথে এগিয়ে চলেছে রানা। একটু পরই ওকে পানির ওপর মুখ জাগাতে হবে। ওপরে কি চলছে আল-াহ মালুম। কবীর চৌধুরীর লোকদের সার্চের আওতার বাইরে চলে আসতে পেরেছে কিনা কে জানে। রিজার্ভ বাতাস শেষ হয়ে যেতে বাক্ল্স্ ঢিল করে ট্যাঙ্কটা খুলে ফেলল রানা, ওয়েইট বেল্টও বাদ গেল না। ফেলে দিল হাতের বর্শাটা। মাস্কটা খুলল না। ওর ধারণা ঠিক হলে আরও বহুক্ষণ ওকে পানির নিচ দিয়ে সাঁতার কেটে এগোতে হবে। খুব সাবধানে পানির ওপর সামান্য একটু মুখ তুলল ও, বুক ভরে টেনে নিল তাজা বাতাস। চোখ দুটো তীর খুঁজছে। সমুদ্র আগের চেয়ে উত্তাল হয়ে উঠেছে। কিছুটা স্বস্তি পেল। সবুজ পানির ওপর প্রায়ই দেখা যাচ্ছে এখন সাদা ফেনা। হারিকেনটা এখনও অনেক দক্ষিণ-পুবে আছে, তবে আঙুল বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিচ্ছে এদিকের সাগর। হাল ছেড়ে দেয়নি কবীর চৌধুরীর লোকরা। হেলিকপ্টারটা দেখার আগেই ওটার আওয়াজ শুনতে পেল রানা। আধমাইল দক্ষিণ-পুবে সাগরের ওপর দিয়ে চক্কর মারছে। কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে থাকল রানা, ঢেউয়ের দোলায় দুলছে চিত হয়ে। নির্দিষ্ট একটা ছক ধরে সার্চ করে চলেছে হেলিকপ্টার, সূর্যের একচিলতে আলোয় চিকচিক করছে রোটরবে-ডগুলো। রেফারেন্স রাখার জন্যে একটা মার্কার ফেলল সাগরে। দক্ষ লোক, সন্দেহ নেই কোনও। হেলিকপ্টারের দিকে মনোযোগ এতই বেশি যে পে-নের ডানার বাতাস কাটার চাপা হিসহিস আওয়াজটা অনেক দেরিতে শুনল রানা। ওটার এঞ্জিনটা অফ করে রাখা, বাতাসে গ-াইড করছে। সার্চের পুরানো কৌশল, কিন্তু আরেকটু হলেই ধরা পড়ত রানা। ছোট পে-ন, সম্ভবত সেসনা, অনেক ওপরে উঠে এঞ্জিন বন্ধ করে দিয়ে গ-াইড করে এগিয়ে আসছে পুব দিকে। এখন আর বেশি ওপরে নেই। আস্তে করে ডুবে গেল রানা, মনে মনে প্রশংসা করল, কেউ একজন ওরই মত করে ভেবেছে যে সরাসরি হয়তো তীরের দিকে যাবে না ও। পানির সামান্য নিচে চিত হয়ে ঢেউয়ের দোলায় দুলছে রানা, ওর ঠিক মাথার ওপর দিয়ে পার হয়ে গেল পে-নটা। ওকে দেখতে পেয়েছে? পে-নের এঞ্জিনটা গর্জন ছেড়ে চালু হলো, আবার ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছে। নাক জাগাল রানা, উদগ্রীব হয়ে তাকাল পে-নটার দিকে। ওটা যদি ফিরে আসে বা কোনও মার্কার ফেলে তার মানে বিপদে পড়ে গেছে ও। সোজা পশ্চিম দিয়ে চলল পে-ন। স্বস্তির শ্বাস ফেলল রানা। ওকে ওরা দেখেনি। দু’মিনিট চুপ করে ভাসল রানা, বিশ্রাম নিয়ে নিল, কম্পাস দেখে দিক ঠিক করল, তারপর রওনা হলো আবার। একবার কারও চোখে পড়লেই বিপদে পড়ে যাবে ও। তীর থেকে এত দূরে একা ওকে সাঁতার কাটতে দেখলে কবীর চৌধুরীর লোকদের বুঝতে অসুবিধে হবে না, যাকে তারা খুঁজছে ও-ই সে। সেক্ষেত্রে নিশ্চিন্তে গুলি করে মারা হবে ওকে, ওর কিছু করার থাকবে না। সন্ধের আঁধার ঘনাতে শুরু করেছে। হেলিকপ্টারের গায়ে পড়া সূর্যের আলো বেশ কিছুক্ষণ আগেই উধাও হয়ে গেছে। সাগরটা ধূসর রং ধরেছে। আটলান্টিক আর ক্যারিবিয়ানের মাঝখানের মোনা প্যাসেজে এখন ঢেউ নেই বললেই চলে। স্রোত যা আছে সেটা রানাকে উত্তর দিকে ঠেলছে, বাড়িয়ে দিচ্ছে পরিশ্রম। পে-নটা আবার ফিরে এসেছে, রানার বেশ অনেকটা দক্ষিণে খুঁজছে ওকে। ডুব দিল রানা, বুঝতে পারছে জাহাজের ধ্বংসাবশেষ থেকে অন্তত তিন মাইল দক্ষিণে সরে এসেছে ও। স্রোতের কারণে পুয়ের্টো রিকোর তীর এখনও দু’তিন মাইল দূরে। ও জানে চেষ্টা করলে প্রায় পাঁচ মিনিট পানির নিচে ডুব দিয়ে থাকতে ১১ পারবে। সেভাবে এগোনোই কম ঝুঁকিপূর্ণ। ঠিক করল, বারবার ডুব দিয়ে এগোবে ও, দম নিতে উঠবে ঠেকায় পড়লে। ছোট পে-নটা আবার ফিরে আসছে, এবার রানার আরও কাছাকাছি দিয়ে উড়ছে ওটা। নিচু মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়েছে হেলিকপ্টার। আগের মত উঁচুতে নেই মেঘের দল। কোনও কোনও জায়গায় মেঘের কলাম নেমে এসেছে সাগরের গায়ে। দম নিতে উঠছে রানা, টের পাচ্ছে বাতাসের বেগ বেড়ে গেছে। ভেজা বাতাস বেশ গরম। দু’একদিন দেরি হবে হারিকেনটা আসতে। ভাগ্যকে ধন্যবাদ দিল রানা, এমনিতেই সাধ্যের অতীত করতে হবে ওকে তীরে পৌঁছোতে হলে। অর্ধেক পথ পেরোতেই একদল বনিটোর মাঝখানে পড়ে গেল রানা। হাজার হাজার মাছ, রানাকেও নিজেদের সঙ্গী মনে করেছে, ঠেলা ধাক্কা দিচ্ছে চারপাশ থেকে। ভেসে উঠল রানা, চারপাশে তাকাল। ডানদিকে মাইল খানেক দূরে কয়েকটা ফিশিং বোট মাছ ধরছে। একবার ভাবল সাঁতরে গিয়ে ওগুলোর একটাতে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে চিন্তাটা মাথা থেকে দূর করে দিল। পরিশ্রম হয়তো অনেক কম হবে বোটে গিয়ে উঠলে, কিন্তু লোকের কৌতূহল হবে, মুখ খুলবে অনেকে, প্রকাশ হয়ে যাবে ওর উপস্থিতি। মিশনের স্বার্থে সেটা হতে দেয়া যায় না। তাছাড়া ওগুলো আসলেই জেলেদের বোট কিনা তাতেও সন্দেহের অবকাশ আছে। কবীর চৌধুরীর লোক হবার সম্ভাবনাই বেশি। আগুয়ান হারিকেনের মাঝে জেলেদের মাছ ধরতে বের হওয়ার কথা নয়। আবার ডুব দিয়ে এগোল রানা, একটা ব্যাপারে স্বস্তি বোধ করছে। ও যখন তীরে পৌঁছোবে তখন এতই আঁধার হয়ে যাবে যে কোথায় উঠবে জানা না থাকলে সহজে ওকে স্পট করতে পারবে না কেউ। তিন ঘণ্টা পর সৈকতে পৌঁছোল ও, শরীরে তখন শক্তি বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। ঢেউয়ের প্রান্ত ছাড়িয়ে শুয়ে পড়ল সৈকতে। শেষ এক ঘণ্টা ওর মনে হয়েছে কোনদিনই আর তীরে পৌঁছোনো হবে না। চিত হয়ে শুয়ে আকাশের দিকে তাকাল। আরও নিচে নেমে আসছে ধূসর পাহাড় আকৃতির মেঘ। বাতাস এখনও নিচু সুরে হিসহিস আওয়াজ করছে, বালি ছিটিয়ে দিচ্ছে রানার গায়ে। ট্রাঙ্কের গায়ে হাত দিয়ে ওয়াটারপ্রƒফিঙে মোড়া বই আকৃতির জিনিসটা স্পর্শ করল রানা। ডোনা ডান মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে জিনিসটা দিয়েছে ওকে। তথ্যগুলো গুরুত্বপূর্ণ না হলে ওর গতকাল এবং আজকের সমস্ত পরিশ্রম বৃথা হয়ে যাবে। পাঁচ মিনিট চুপচাপ বিশ্রাম নিল রানা, তারপর ধীরেসুস্থে উঠে দাঁড়িয়ে পা বাড়াল যেখানে গাড়ি রেখেছে সেই জঙ্গলের দিকে। ততক্ষণে পরিপূর্ণ আঁধার নেমেছে। দূরে আলো দেখতে পেল, মিটমিট করছে। মায়াহুয়ারেজের আলো। ফ্লিপার খুলে ফেলল রানা, গাড়ির কাছে ফিরে যাবে কিনা আরেকবার ভাবল। ঝুঁকি নেয়া হয়ে যায়। নিশ্চিত হবার উপায় নেই গাড়িটার উপস্থিতি ওই অস্ট্রেলিয়ান হারামজাদার জানা হয়ে গিয়েছে কিনা। লোকটা যদি কারও কাছে রিপোর্ট করে তাহলে সেলোক হয়তো দুই আর দুই চার মিলিয়ে বসে আছে। সার্চ পার্টি পাঠিয়েছে হয়তো। গাড়িটা খুঁজে পেয়েও থাকতে পারে। ধারণা করে নেবে আজকের ঘটনার সঙ্গে সেই বীচ খেউমার যোগসাজশ আছে। সেক্ষেত্রে গাড়ির কাছে ফাঁদ পাতবে ওরা। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ান লোকটা তখন ওকে সন্দেহ করেনি, সাধারণ এক বীচ খেউমা ধরে নিয়ে মজা করেছে, কাজেই পরবর্তীতে তার সন্দেহ না হওয়ারই কথা। কৈফিয়ত দিতে হবে বলে মদ্যপ লোকটা হয়তো কর্তৃপক্ষকে রিপোর্টও করেনি। রানা এতই ক্লান্ত যে গাড়ির কাছে না ফেরার চিন্তাটা নানা যুক্তি বের করে বাতিল করে দিল। মায়াহুয়ারেজের আলোর দিকে আরেকবার তাকাল। অনেক দূরে শহরটা। তাছাড়া ওখানে সুইমিং সুট পরে গেলে খামোকা অনেক লোকের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হবে। সোজা উত্তর দিকে এগোল রানা। ওদিকেই ঘন জঙ্গলের ভেতর গাড়িটা আছে। দেড় ঘণ্টা লাগল গাড়ির কাছে পৌঁছোতে। বাদাম গাছ আর কোকো পামের সারি দেখে গাড়ির অবস্থান বুঝতে পারল রানা। সৈকতে কারও সঙ্গে দেখা হয়নি ওর। মাঝে মাঝে রাস্তায় দেখেছে দুয়েকটা গাড়ি। প্রতিবার বালিতে শুয়ে পড়ে গাড়ির আলো এড়িয়ে গেছে ও। সরাসরি না এগিয়ে ঘুর পথে জঙ্গলের দূরবর্তী প্রান্তে ঝোপের ভেতর থেকে নজর রাখল রানা, সন্দেহজনক কোনও কিছু চোখে না পড়ায় আধ ঘণ্টা পর গাড়ির কাছে এলো। বুড়ো গাড়ি নিথর দাঁড়িয়ে আছে, অন্ধকারের বুকে আরও কালো একটা আকৃতি। বাতাসের আওয়াজ ছাড়া চারপাশে আর কোনও শব্দ নেই। পোশাক বদলে নিল রানা, স্কুবা নাইফটা ছাড়া আর সবকিছু গোল পাকিয়ে ফেলে দিল ডোবার জলে। ওয়াটারপ্রƒফিঙে মোড়া বইটা ফ্ল্যাশ লাইটের আলোয় একবার পড়ে রেখে দিল গোপন কম্পার্টমেন্টে, ভ্রƒ কুঁচকে গেছে। ডোনা ডান যে তথ্য দিয়েছে তা অবাস্তব বলে মনে হয়। পুয়ের্টো রিকো সরকার হাইতির বিপ-বীদের অস্ত্র চালান দেবে কু করার জন্যে। নিজ খরচায় তাদের সহায়তা দিচ্ছে কবীর চৌধুরী। আগামী কাল বা পরশু চীন থেকে রওনা হওয়া স্বর্ণবাহী জাহাজটা আসবে। ওটাতে অস্ত্র ছাড়াও দুই বিলিয়ন ডলারের সোনা থাকবে। বিপ-ব সফল হলে কবীর চৌধুরী হাইতিতেও একটা আস্তানা গাড়বে। পুয়ের্টো রিকোর মত ছোট দেশও হাইতির ওপর তাদের প্রভাব খাটাতে পারবে। পুয়ের্টো রিকোর সরকার এবং হাইতির ক্ষমতায় বসা বিপ-বীরা সর্ব বিষয়ে কবীর চৌধুরীকে সাহায্য করবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই পাঁচটা পিটি বোটে করে অস্ত্র নিয়ে হাইতির উদ্দেশে রওনা হবে কবীর চৌধুুরী। খায়রুল কবীর তার সঙ্গে আছে। বাপ-ব্যাটা মিলে দক্ষিণ আমেরিকায় নিরাপদ আস্তানা তৈরি করে ল্যাবরেটরি করবে, সেই সঙ্গে একটা সংগঠন দাঁড় করাবে, স্মাগলিং থেকে শুরু করে ড্রাগের ব্যবসাও বাদ যাবে না তাদের সংগঠনের কার্যক্রমে। মাফিয়ার একটা বিকল্প শক্তি দক্ষিণ আমেরিকায় প্রতিষ্ঠিত করতে যাচ্ছে কবীর চৌধুরী। সেজন্যে নানা দেশ থেকে লোক সংগ্রহও হয়ে গিয়েছে। প্রাইভেট একটা আর্মি গড়ে তুলেছে কবীর চৌধুরী। ১২ গোপন কম্পার্টমেন্ট থেকে ট্র্যান্সমিটারটা বের করল রানা, অন করতেই খড়খড় আওয়াজ করতে শুরু করল যন্ত্রটা। একটু পরই ক্লিক করে একটা আওয়াজ হলো, পরমুহূর্তে কোমল একটা গলা জিজ্ঞেস করল, ‘নেম প-ীজ?’ ‘এম আর নাইন।’ ‘চেকিং। ওয়েইট আ মিনিট। ওকে। গো অন।’ ডোনা ডানের দেয়া তথ্যগুলো সংক্ষেপে কোডেড মেসেজে জানিয়ে সহজ কোডে বাংলায় বলে গেল রানা। ‘পাখিকে উড়তে হবে। নৌকোয় মাঝিমাল-া ছাড়াও পাহারাদার থাকতে হবে। আসল মালবাহী নৌকো আগামী কাল বা পরশু ঘাটে ভিড়বে। আস্তানায় ঢুকতে যাচ্ছি, তবে পরে। আপাতত আর কিছু জানানোর নেই।’ পাখি অর্থাৎ সোহেলের এখন ক্যালিফোর্নিয়ায় থাকার কথা। ওখানে এম ভি বাংলার গৌরব অপেক্ষা করছে। দেড়শো বাংলাদেশী সৈন্য থাকার কথা জাহাজটায়। চিনা জাহাজ আগামী কাল বা পরশুদিন সোনা নিয়ে আসছে। কবীর চৌধুরীর আস্তানায় ঢুকবে ও, তবে আপাতত নয়। আর কিছু জানানোর নেই। ‘ওকে। গট ইট। ক্লিয়ারিং।’ খুট করে একটা আওয়াজ হলো, সংযোগ বিচ্ছিনড়ব হয়ে গেল। আবার খড়খড় শুরু করেছে ট্র্যান্সমিটার। সুইচটা অফ করে দিল রানা। কবীর চৌধুরীর এলাকায় ঢুকতে হলে আগে অস্ত্র দরকার। সেটা বিসিআই এজেন্টের কাছ থেকে যোগাড় করতে স্যান হুয়ানে যেতে হবে ওকে। কাল সন্ধের আগেই আবার ফিরতে হবে, নইলে কবীর চৌধুরী রওনা হয়ে যেতে পারে। হাতে একদম সময় নেই। গাড়িটা স্টার্ট নিচ্ছে না। তৃতীয়বার হ্যান্ডেলবার ঘোরানোর পর খকখক করে কেশে উঠে সচল হলো এঞ্জিন, বনেটটা থরথর করে কাঁপতে শুরু করল। একমাত্র হেডলাইটটা জ্বেলে হাইওয়েতে উঠে এলো রানা, দক্ষিণ দিকে চলেছে। এই গাড়িতে করে স্যান হুয়ান পর্যন্ত পৌঁছোনো যাবে কিনা কে জানে, কিন্তু পন্স পর্যন্ত হয়তো এঞ্জিনটা ধকল সইতে পারবে। সেখান থেকে পে-নে করে স্যান হুয়ানে যাওয়া যাবে। স্যান হুয়ানের একটা মিসাইল ট্র্যাকিং সিস্টেমে বিসিআইয়ের এজেন্ট অপেক্ষা করছে। তাকে জানিয়ে রাখতে হবে এদিকের খবর। দরকারে রানাকে সে সাহায্য করতে পারবে। ক্যাঁচকোঁচ লক্কর-ঝক্কর নানান আওয়াজ তুলে ছুটে চলেছে গাড়িটা। একটা সিগারেট ধরাল রানা, ভ্রƒ কুঁচকে ভাবছে। বড্ড দেরি হয়ে গেছে। এখন আর বাংলার গৌরবে গিয়ে ওঠার সময় নেই। এখান থেকেই সোনার কাছাকাছি যাবার ব্যবস্থা করতে হবে। ট্র্যান্সমিটারের সাহায্যে সোহেলের সঙ্গে যোগাযোগ করবে, তাকে বলবে জাহাজ নিয়ে আসতে। কবীর চৌধুরীর জাহাজটা আক্রমণ করে সোনা আর অস্ত্র কেড়ে নেয়া যাবে। সময় এবং সুযোগ হলে পিটি বোটগুলোও খুঁজে বের করে ধ্বংস করতে হবে। রাস্তার ধারের ঝোপ থেকে ছিটকে বের হলো উলঙ্গ মেয়েটা, তারস্বরে চেঁচাচ্ছে। সরাসরি গাড়িটার হেডলাইটের ক্ষীণ আলোর সামনে চলে এলো। দু’হাত তুলে থামতে ইশারা করছে। ব্রেক কষে গাড়ির গতি কমাল রানা। মেয়েটা বারবার পেছনে তাকাচ্ছে। এঞ্জিনের কোঁকানির ওপর দিয়ে মেয়েটার চিৎকার শুনতে পেল ও। ‘হেল্প! হেল্প মি! প-ীইজ!’ গাড়িটা থামিয়ে ফেলেছে রানা, এঞ্জিনটা কেশে উঠে বন্ধ হয়ে গেল। মেয়েটা ছুটে আসছে, চেঁচাচ্ছে এক নাগাড়ে, তারস্বরে। গাড়ি থেকে নেমে আলোর কাছ থেকে সরে গেল রানা, অপেক্ষা করছে। কোনও ফাঁদ হলে সহজ টার্গেট হওয়ার কোনও ইচ্ছে নেই। মেয়েটার গায়ে কোনও কাপড় নেই। একটা মাত্র ছোট্ট প্যান্টি পরনে, ওটার কোনার দিকগুলো ছেঁড়া। শরীর ঢাকার কোনও চেষ্টা করছে না মেয়েটা, দৌড়ে আসছে। রানার বুকের মাঝে ঝাঁপিয়ে পড়ল। মুখের কোণে ফেনা উঠে গেছে দৌড়ে আসতে গিয়ে। ‘প-ীইজ! প-ীইজ মিস্টার! আমাকে সাহায্য করো! ওরা আমাকে রেপ করতে চায়!’ তিন একই সঙ্গে অনেকগুলো ভাবনা খেলে গেল রানার মাথায়। এসপিয়োনাজে উলঙ্গ মেয়ে ব্যবহার করে শত্র“কে থামিয়ে ফাঁদে ফেলা একটা অতি পুরোনো কৌশল। ফাঁদ এটা? লোকগুলো কোথায়? কয়জন ওরা? অস্ত্র ছাড়া ওর কি করার আছে? মেয়েটাকে বুকের ওপর থেকে সরিয়ে আলোর পাশে বসিয়ে দিল রানা, সামনের অন্ধকারে তাকাল। হাতে বেরিয়ে এসেছে তীক্ষèধার স্কুবা ছোরাটা। মনে মনে ভাবছে ম্যাশেটিটা এখন থাকলে কাজে দিত। আখ খেতের ধারে খচমচ আওয়াজ হচ্ছে। আঁধারে সামনে বাড়ল রানা, ছোরা বাগিয়ে রেখেছে। আন্দাজ করছে, ফাঁদ পাতা হয়েছে। কারা জড়িত তাদের দেখতে চায় ও, সম্ভব হলে তাদের আলাপ শুনতে চায়। আড়ালে থেকে কাছাকাছি পৌঁছোতে পারলে মেয়েটা সত্যি বলছে কিনা তা জানা যাবে সহজেই। যদি সত্যি না হয় তাহলে যেকোন সময় আক্রমণ শুরু হয়ে যেতে পারে। সামনে থেকে কে যেন কর্কশ গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘হোসে? কোরা কই? কোরা?’ আরেকটা গলা ফিসফিস করল, ‘পুলিস?’ সাহস করে কথা বলে উঠল রানা। ‘পুলিস। থামো! গুলি করব এক্ষুণি!’ নিচু হয়ে একঝাড় জ্যাকারান্ডা ঝোপের ভেতর থামল রানা, অপেক্ষা করল। ১৩ আন্ডারব্রাশ ভেঙে এগিয়ে চলেছে কয়েকজন, আওয়াজটা শীঘ্রি দূরে সরে মিলিয়ে গেল। ফিরে চলল রানা গাড়ির দিকে, হাসছে মৃদু। ফাঁদ তাতে কোনও সন্দেহ নেই ওর, নইলে এত সহজে চলে যেত না লোকগুলো। আস্তে ধীরে খেলবে ঠিক করেছে ও। ও বুঝেছে সেটা মেয়েটাকে বুঝতে দেয়া চলবে না। মেয়েটা ভাবতে থাকুক ও-ই রানাকে খেলিয়ে তুলছে। বীচ খেউমা হিসেবেই মেয়েটার সঙ্গে আলাপ করবে, ঠিক করেছে ও। পরিচয়টা এখনও বজায় আছে কিনা সেটাও তাতে আঁচ করা যাবে। যেখানে রেখে গেছে সেখানেই অপেক্ষা করছে মেয়েটা। এখনও সুউনড়বত স্তন আর সুগঠিত ক্ষীণ কটি ঢাকার কোনও চেষ্টা নেই। দু’হাতে ছেঁড়া প্যান্টি ঢেকে রেখেছে। রানাকে এগোতে দেখে একটু পিছিয়ে গেল মেয়েটা। অভিনয়টুকুর প্রশংসা করল রানা। যে কেউ ভাববে এ মেয়ে এমন এক অসহায় আতঙ্কিত যুবতী যাকে আরেকটু হলেই পৈশাচিক ধর্ষণের শিকার হতে হতো। ‘ওরা চলে গেছে, সেনোর? ওদের তুমি ভাগিয়ে দিয়েছ?’ ভাল ইংরেজি বলে মেয়েটা, যদিও পুয়ের্টো রিকোর টান স্পষ্ট। আস্তে করে মাথা দোলাল রানা, কিছু বলছে না। আপাদমস্তক দেখল মেয়েটাকে। যথেষ্ট লম্বা মেয়েটা। কালো চুল কাঁধে লুটাচ্ছে। হঠাৎ করেই মেয়েটার কব্জি ধরে ফ্যাকাসে আলো ছড়ানো হেডলাইটের সামনে নিয়ে এলো রানা। নিজের অভিনয় ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা ওর ভালই জানা আছে, কিন্তু এই মুহূর্তে নারীলোভী এক সুবিধেবাদীর ভূমিকায় মোটামুটি উৎরে গেল। মেয়েটা ভাবুক ফুটন্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত উনুনে এসে পড়েছে। মেয়েটা পেছনে সরার চেষ্টা করতেই হ্যাঁচকা টানে তাকে গায়ের কাছে নিয়ে এলো রানা। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজাল। ঠোঁট গোল করে মৃদু শিস দিয়ে বলল, ‘ভয় কি, সোনা? আমি কি বাঘ না ভালুক? তোমাকে একটু দেখতে দাও। আমি তোমাকে বাঁচিয়েছি, কি, বাঁচাইনি?’ কালো প্যান্টি থেকে হাত সরাল মেয়েটি, চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। কোরবানীর পশু কিনছে এমন ভঙ্গিতে তাকে দেখল রানা। ‘আমরা কি এখান থেকে সরে যেতে পারি না, সেনোর?’ জিজ্ঞেস করল যুবতী। ‘আমাকে যারা রেপ করতে চেষ্টা করছিল তারা হয়তো ফিরে আসবে।’ হাসি চাপল রানা। বিপদের কোনও সম্ভাবনা নেই। ওরা দেখছে সন্দেহ নেই, কিন্তু কিছু করবে না। ফাঁদটা সামনে কোথাও পাতা হয়েছে। ‘একটু ভাল করে দেখে নিই, তারপর যাব,’ বলল রানা। ‘সেনোরিটা, নাকি সেনোরা তুমি, ডার্লিং?’ পান পাতার মত চেহারা মেয়েটার, ঠোঁটে টকটকে লাল লিপস্টিক, দাঁতগুলো চকচকে সাদা, অমসৃণ। চোখ দুটোই মেয়েটার আসল সৌন্দর্য। বড় বড় চোখ, গভীর নীল। জ্বলজ্বলে চোখে রানাকে দেখছে। ‘সেনোরিটা,’ বলল মেয়েটা। ‘সেনোরা হলে এই বাজে পরিস্থিতিতে পড়তে হতো না আমাকে। স্বামী থাকত সঙ্গে।’ ঘুরে দাঁড়াল মেয়েটা, দু’হাতে স্তন ঢাকল। মাথায় ঝাঁকি দিয়ে চুলগুলো ঠিক করে নিয়ে ভ্রƒ কুঁচকে রানার দিকে তাকাল। ‘আমার ধারণা তুমি যথেষ্ট দেখেছ, সেনোর। অনেক বেশিই দেখেছ। তুমি নিশ্চয়ই ওদের মত নও, যে জানোয়ারগুলো আমাকে ধর্ষণ করতে চেয়েছিল? তাহলে বলব ঈশ্বরের অস্তিত্ব নেই।’ গাড়ির ভেতরে হাত ঢুকিয়ে কম্বলটা বের করে মেয়েটার হাতে দিল রানা, দেখল খুশি হয়ে ওটা গায়ে জড়াল মেয়েটা। আবহাওয়া ঠাণ্ডা হয়ে আসছে, ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। এতই সূক্ষ্ম যে প্রথমে কুয়াশা বলে মনে হয়। হারিকেনের প্রথম আলামত। শীঘ্রি সাগরে নিুচাপের প্রভাবে ভারী বর্ষণ শুরু হবে। আঙুল দিয়ে গাড়িটা দেখাল রানা। ‘ভেতরে ঢোকো। চিন্তা কোরো না, আমি ধর্ষণ করি না। নাম কি তোমার?’ ‘কোরা।’ শরীর কম্বলে মুড়ে সামনের সীটে রানার পাশে বসল কোরা। কয়েক বারের চেষ্টায় এঞ্জিনটা স্টার্ট নিল, গিয়ার দিয়ে সামনে বাড়ল রানা। স্পষ্ট বুঝতে পারছে বেশ কয়েক জোড়া চোখ ঝোপের ভেতর থেকে অনুসরণ করছে ওকে। ভ্রƒ কুঁচকে উঠল কোরার। হতাশ হয়েছে? হয়তো আশা করেছিল এখানেই গাড়িতে তুলে সুযোগ নিতে চেষ্টা করবে রানা। ঝরঝরে গাড়িটা ওর কাভারের সঙ্গে ভাল মানিয়ে গেছে। মেয়েটা হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যেই ধরে নেবে আসলে সাধারণ এক ফকির টাইপের বীচ খেউমা ছাড়া আর কিছুই নয় ও। সেক্ষেত্রে বুঝবে ওদের এত কষ্টের পরিকল্পনা আর ফাঁদ পাতা বৃথা। রানাও সেটাই বোঝাবার চেষ্টার ত্র“টি করবে না। আধ মাইল পেরিয়ে গেল, কেউ ওরা কোনও কথা বলল না। অন্ধকারের বুক চিরে তিরিশ মাইল গতিতে কোঁকাতে কোঁকাতে ছুটছে গাড়ি। একমাত্র হেডলাইটটা ঢিলে হয়ে গেছে, দেখে মনে হচ্ছে বড়সড় একটা জ্বলন্ত চোখ। নির্জন দীর্ঘ রাস্তায় একটা গাড়িও নেই। মেয়েটার চেহারাতেই স্পষ্ট যে প্রাণপণে মাথা খাটাচ্ছে, পরিস্থিতিটা বুঝতে চেষ্টা করছে। চুপ করে আছে রানা, চাইছে প্রথম চালটা মেয়েটাই দিক। মেয়েটা তার অভিনয় শুরু করার পরও বেশ খানিকক্ষণ বিপদের আশঙ্কা করছে না ও। ‘আমরা কোথায় যাচ্ছি, সেনোর?’ পাশ ফিরে জিজ্ঞেস করল মেয়েটা। বীচ খেউমাদের মতই গা ছাড়া ভাবে কাঁধ ঝাঁকাল রানা। ‘জানি না আসলে। কেয়ারও করি না। ঘুরিফিরি এদিকেই। সব জায়গাই আমার জন্যে সমান। তুমি কোথায় যেতে চাও, সেনোরিটা?’ জবাবটা মনে মনে জানে রানা। মেয়েটাকে আদেশ করা হয়েছে ওর সঙ্গে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত থাকতে। মৃত্যুটা ওর মৃত্যু। অবশ্য যদি রানা ধরা খেয়ে যায় যে ও বীচ খেউমা নয়, তাহলেই। অস্ট্রেলিয়ান লোকটার ওপর শ্রদ্ধা জন্মাল রানার। ব্যাটা কাজে গাফিলতি করেনি। নিশ্চয়ই রিপোর্ট করেছে কর্তৃপক্ষের ১৪ কাছে। দুই আর দুইয়ে চার মেলাতে ভুল করেনি। অস্ট্রেলিয়ান না হলে আর কেউ ধরে নিয়েছে ওর সঙ্গে আজকে ঘটে যাওয়া ঘটনার যোগসাজস আছে। ছেঁড়া সূত্র বলতে রানাই কেবল বাকি। সেজন্যেই ওর পেছনে লোক লাগানো হয়েছে। প্রাকৃতিক পূলটার কথা মনে আসতে নিজের ওপর বিরক্ত বোধ করল রানা। গিয়ারগুলো ডোবার মধ্যে ফেলে আসা মোটেই ঠিক কাজ হয়নি। বীচ খেউমারা কখনও কিছু ফেলে যায় না। ওগুলো খুঁজে পাওয়ার অর্থ ওর কাভার ফুটো হয়ে যাওয়া। মেয়েটা ঠিক করেছে কিভাবে খেলবে। সীটে ওর ধারে আরও ঘেঁষে এলো কোরা। গলার স্বর আগের চেয়ে কোমল, নিচু। ‘আমি স্যান হুয়ানে যেতে চাই। ওখানে আমাকে পৌঁছে দেবে, প-ীজ? ওখানে আমার বন্ধু বান্ধব আছে, ওরা আমাকে টাকা-পয়সা আর পোশাক দিয়ে সাহায্য করবে। ওখান থেকে সহজেই নিউ ইয়র্কে ফিরতে পারব আমি।’ চওড়া হাসি হাসল রানা। ওর সেরা হাসিটাই উপহার দিল। সোহেলের মতে ওর এই হাসি দেখলে যেকোন মেয়ে গলে যাবে। ‘শুনে ভাল লাগল যে স্যান হুয়ানে তোমার বন্ধু বান্ধব আছে, সেনোরিটা। বন্ধু থাকা সবসময় ভাল। স্যান হুয়ানে তোমাকে পৌঁছে দিতে পারলে আমি খুবই খুশি হতাম, কিন্তু একটা ব্যাপার তোমার নজর এড়িয়ে গেছে।’ আরও একটু কাছে সরে এলো মেয়েটা। মিষ্টি মাদকতাময় পারফিউমের গন্ধ পেল রানা। মনে মনে হাসল। ঠিকই ধরেছে ও, যৌন প্রলোভনের সেই পুরোনো ফাঁদ আসছে সামনে। ফাঁদটা পুরোনো হলেও ব্যর্থ হয় কমই। দুর্বল মুহূর্তে একটা ভুল, ব্যস, ওটাই হৃৎস্পন্দন থামিয়ে দেয়ার জন্যে যথেষ্ট। ‘বুঝতে পারলাম না। কি ব্যাপার আমার চোখ এড়িয়ে গেছে, সেনোর?’ পুরোনো এঞ্জিনের হুডটা দেখাল রানা। ‘এটা। এটার কথা তুমি মাথায় রাখোনি। খেয়াল করে শোনো।’ গতি একটু বাড়াল রানা। রড যেকোন সময় খুলে আসবে, আওয়াজ বেড়ে গেছে চতুর্গুণ। মেয়েটা সম্ভবত গাড়ির ব্যাপারে কিছু জানে না, কিন্তু আওয়াজটাই বোঝার জন্যে যথেষ্ট। ট্যাপেটের আর্তনাদ কানে তালা ধরিয়ে দিচ্ছে। কর্কশ আওয়াজ ছাড়ছে ডিফারেনশিয়াল। বিরক্তি আর উপলব্ধির ছাপ পড়ল মেয়েটার চেহারায়, মুখ কোঁচকাল। হতাশ বোধ করছে। ভাবছে আসলেই যদি রানা বীচ খেউমা হয় তাহলে তাকে নিয়ে কি করবে। শীঘ্রি হারিকেন আঘাত হানবে, তার মধ্যে একটা ভবঘুরের সঙ্গে ভাঙা গাড়িতে এই বিরান এলাকায় বেহুদা ফেঁসে যেতে হলে কারও ভাল লাগার কথা নয়। সামান্য একটু উসকে দিতে হবে, সিদ্ধান্ত নিল রানা। আস্তে ধীরে মেয়েটাকে আবার খেলতে বাধ্য করতে হবে। হাসল রানা, ঝুঁকে মেয়েটার ঊরুতে হাত রেখে চাপ দিল একটু। ‘চিন্তা কোরো না, হানি। আপাতত আমাদের কোনও বিপদ নেই, আসো না, একটু মজা করি দু’জনে মিলে? টাকা-পয়সা খুব একটা নেই আমার, কিন্তু সামান্য কিছু তো আছে। সাবধানে চালালে গাড়িটাও হয়তো পন্স পর্যন্ত নিয়ে যাবে আমাদের। তোমার যেমন বন্ধু আছে, তেমনি পন্সে আমারও বন্ধু আছে। ওদের কাছে ধার পেলে হয়তো তোমাকে আমি নিউ ইয়র্কের টিকেট করে দেব। কি পছন্দ হচ্ছে আমার কথা, শুগার?’ ঊরুতে হাত রাখায় সরেনি মেয়েটা, কিন্তু এবার ভ্রƒ কুঁচকে তাকাল। ‘কেউ আমাকে হানি বা শুগার বলে ডাকুক তা আমি পছন্দ করি না, সেনোর! তার চেয়ে আমাকে কোরা বলে ডেকো, ওটাই আমার নাম। কোরা ল্যানযস। তোমার নাম কি, সেনোর?’ শ্রাগ করল রানা। মানুষ সমাজের যত নিচু স্তরেরই হোক না কেন তারও একটা আÍমর্যাদা থাকে। সেটাই দেখিয়েছে কোরা। ‘ঠিক আছে, কোরা, তুমি না চাইলে আদর করে ডাকব না। আমার নাম জিম। জিম হপকিন্স।’ নকল পরিচয় পত্রে এই নামই লেখা আছে ওর। পেশা: ভবঘুরে। শিউরে উঠল কোরা, রানার আরও কাছে ঘেঁষে এলো। ‘আমি হয়তো তোমার সঙ্গে পে-নে করে স্যান হুয়ানে যাব, জিম, অবশ্য তুমি যদি টাকা যোগাড় করতে পারো, তবেই। হয়তো যাবও না। আমি কিছু ঠিক করিনি এখনও।...শীত লাগছে আমার। মুয়ে ফ্রিয়ো! গাড়ি নামের এই আবর্জনায় ড্রিঙ্কট্রিঙ্ক কিছু রেখেছো তুমি?’ পূলে ফেলে আসা স্কচের বোতলের জন্যে মনটা হু-হু করে উঠল রানার। তবে ওসব না এনে ভাল হয়েছে। ছোটখাট এসব ভুলই এজেন্টদের ধরিয়ে দেয়। গরীব বীচ বামদের পক্ষে দামী স্কচ কেনা সম্ভব নয়। ‘দুঃখিত,’ বলল রানা, ‘সঙ্গে কোনও ড্রিঙ্ক নেই। মায়াহুয়ারেজের আগে কোথাও পাওয়াও যাবে না। ওখানে থেমে নেব ওয়াইন। মনে হয় টাকা যা আছে তাতে কুলিয়ে যাবে।’ খুবই


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮১ জন


এ জাতীয় গল্প

→ কনকতরী-০১

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now